ডাকিণী (১৪তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আদিন ড্রাইভওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো মসৃণ গতিতে। ওর গাড়িটা যেই প্রধান ফটকের সামনে কুয়োর নিকটবর্তী হলো অমনি রাস্তা থেকে ছিটকে সোজা কুয়ার দেয়ালে ধাক্কা খেলো! হায় খোদা! ও আক্সিডেন্ট করেছে! দৌড়ে ওর গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি ওর মাথাটা স্টিয়ারিং হুইলের উপর ঝুলে আছে। আমি বার দুয়েক ডেকে কোন সাড়া পেলাম না। ওকে অনেক কষ্টে টেনে গাড়ি থেকে বের করে মাটিতে শুইয়ে দিলাম। যাক বাবা। বেঁচে আছে। শ্বাস নিচ্ছে। তবে মাথা থেকে তখনো ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি পুলিশে ফোন দিলাম। পুলিশ আসার আগেই ওর জ্ঞান ফিরলো। আমি ওর শার্ট খুলে মাথাটার ক্ষতটা পেঁচিয়ে দিলাম। রক্তক্ষরণ ততক্ষণে প্রায় থেমে গেছে। তবে কিছুটা রক্ত এখনো চুইয়ে পড়ছে মাথা থেকে। ও চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো। কেমন নিষ্প্রাণ সেই চাউনি। ওর চোখের দিকে তাকিয়েই আমি বললাম কি ব্যাপার আদিন? জীবনে প্রথম গাড়ি চালাচ্ছিলে নাকি? এরকম সোজা রাস্তায় কেউ এমন আক্সিডেন্ট করে। ও বিড়বিড় করে বলল, “ওর আংটি প্রয়োজন। সেই আংটি।” এইটুকু বলেই সে আবার জ্ঞান হারালো। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। ওরা আদিনকে আম্বুল্যান্সে করে নিয়ে গেল। আমি ওদের যাত্রাপথে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। যতক্ষণ না গাড়িগুলি বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। ওরা চলে যেতেই নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হতে লাগলো। দুদিন পর ছেলেটার বিয়ে ছিলো। এ ঝামেলায় ওকে না জড়ালেও তো চলতো। ওর জীবনকে আমিই সংকটে ফেলে দিলাম।
আদিনকে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে এসেছিলো। এবার আমার কটেজে ফিরতে হবে। মনটা সায় না দিলেও আমি নিরুপায়। কটেজে ঢুকতেই লাইব্রেরীতে দাউদাউ লেলিহান শিখা দেখতে পেলাম। দৌড়ে যেয়ে লাইব্রেরীর দরজা খুলতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। লাইব্রেরীর মেঝেতে রাখা আদিনের ধর্মগ্রন্থে আগুন লেগে গেছে। পাশেই জ্বালানো মোমবাতিটা নিভে আছে। লাইব্রেরীতে এতগুলি বই পুস্তক রয়েছে। এসবে আগুন লাগলে আর থামানো যাবে না। তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু একটা করতে হবে। লাইব্রেরী থেকে এক দৌড়ে আমার রুমে চলে এলাম। উদ্দেশ্য ছিলো বাথরুম থেকে পানি নিয়ে লাইব্রেরীতে জ্বলন্ত ইহুদি ধর্মীয় পুস্তকে ঢালবো। কিন্তু রুমে ঢুকতেই দেখলাম এখানকার মেঝেতে রাখা বইটিও সমানে পুড়ছে। তবে কি বাড়ির প্রতি কক্ষের মেঝেতে রাখা সবগুলি বই পুড়তে শুরু করেছে! এ যেন অনেকটা “সর্বাঙ্গে ব্যাথা-পানি দিবো কোথা” পরিস্থিতি। এই বইগুলি থেকে সারাটা কটেজে আগুন ছড়িয়ে পড়তে খুব একটা বেশী সময় লাগবে না। তার আগেই আমাকে এই কটেজ ছেড়ে বেরুতে হবে। যেই আমি ঘুরে চলে যেতে শুরু করলাম তখনই আগুনটা দপ করে নিভে গেলো। পেছনে ফিরে তাকালাম। মেঝেতে শুধু বইটার ছাই অবশিষ্ট রয়েছে। আমি দৌড়ে লাইব্রেরীতে গিয়েও দেখলাম একই অবস্থা। আগুন নিভে গেছে। তারপর ডায়নিং রুমে গেলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য। এখানকার বইটা অক্ষত আছে এবং মোমবাতিটাও জ্বলছে। কটেজের সবগুলি কক্ষই আমি চেক করলাম। বেসমেন্ট, আমার বেডরুম আর লাইব্রেরী বাদে বাকী সব কক্ষেই বইগুলি অক্ষত অবস্থায় আছে আর পাশেই মোমবাতি জ্বলতেছে। হঠাৎ আলেসের ব্যাপারটা ধরে ফেললাম। গতরাতে ও আমায় বেসমেন্টে নিয়ে গিয়ে সেরাতে দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছিলো। সেই স্বপ্নে আলেসের জায়গায় আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলাম। ওর মৃত্যুদণ্ডের পর ওর দেহটাকে প্রথমে প্রধান ফটকের পাশের কুয়োতে চুবানো হয়, তারপর লাইব্রেরীর টেবিলে শুয়ানো হয়। অতঃপর তৎকালিক প্রিস্টের কক্ষ তথা আমার বেডরুম ধর্ষণ করা হয়। ওর লাশটা যেসব জায়গায় নেয়া হয়েছিলো ওর আত্মার প্রভাব সেই সব জায়গাতেই সীমাবদ্ধ। তাইতো কুয়োর পাশ দিয়ে ড্রাইভ করে যাওয়ার সময় আজ আদিনের আক্সিডেন্ট হয়েছে। বাড়িতে অন্যসব কক্ষের বইগুলি অক্ষত থাকলেও লাইব্রেরী আর আমার বেডরুমের বই দুটো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনুভব করলাম আমাকে দেখানো স্বপ্ন গুলি নিছক ভয় দেখানোর জন্যেই নয়। আলেসের ডায়ারীর প্রতিটা পাতা, রাতে দেখা প্রতিটা স্বপ্ন আলেসের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট বার্তা বহন করছিলো। কিন্তু ভয়ে আমার চিন্তাশক্তি লোপ পাওয়ায় আমি সেগুলির মর্ম উদ্ধার করতে পারিনি। সেরাতে আমি আলেসের ডায়ারীটা আবার পড়লাম। সাথে সাথে ওর দেখানো স্বপ্ন গুলি নিয়েও চিন্তা করলাম। ধীরেধীরে সবকিছুই দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে গেল।
(চলবে)

ডাকিণী (১০ম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

(৯ম পর্বের পর থেকে)

নাহ। কটেজের ছাদটা তো একদমই ফাঁকা। গলায় দড়ি দিয়ে কেউ ঝুলছে না। সামান্য একটা স্বপ্নকে নিয়ে আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম। ভাবতেই নিজেকে হাস্যকর মনে হল। খুশি মনে শিস দিতে দিতে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। উহঃ, ঘরের ভেতরটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে! অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেয়ালে সুইচ খুজতে লাগলাম। হঠাৎ কিসে যেন পা বেধে আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। মাথাটা মেঝেতে ঠুকে গেল। অনেকটা নিঃশব্দেই জ্ঞান হারালাম।
যখন চোখ খুললাম তখন নিজেকে পার্শবর্তী খ্রিস্টান সিমেট্রিতে আবিষ্কার করলাম। সারি সারি কবরের নাম ফলক দাড়িয়ে আছে চারপাশে। আমি চারদিকে অপ্রস্তুত হয়ে হেটে হেটে দেখতে লাগলাম কবর গুলি। হঠাৎ একট কবরের নাম ফলকে চোখ আটকে গেল। ওতে লেখা ছিল, “স্যারিয়ান জোসেফ ভেলমন্ড, গীর্জার সম্মান্বিত প্রিস্ট। ১৪২০-১৪৯৮।” কেন জানি মনে হল এটাই সেই নরপশু প্রিস্টের কবর। ওর কবরের কাছে যেয়ে নাম ফলকের উপর খুদাই করা একটা আংটির চিহ্ন। সেই আংটি যা দিয়ে সে ডাকিনীদের কপালে ছ্যাঁকা দিত। এই আংটিকেই আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। যাক, আর কোন সন্দেহ নেই এটাই সেই শয়তানের কবর। একরাশ ঘৃনা হৃদয়ের গভীর থেকে ওর জন্যে উগলে বেরিয়ে এলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম জীবনে যদি কখনো এই শহরের গভর্ণর নির্বাচিত হই তবে আমার প্রথম কাজ হবে এই শয়তানটার কবরের উপর একটা পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা। আইডিয়াটা আমার খুব মনে ধরলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম আশেপাশে কেউ নেই। মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হলো। ভবিষ্যতের পাবলিক টয়লেটের উদ্ধোধন আজকে করে ফেললে কেমন হয়? আজই, এখনই এই শয়তানটার কবরে প্রসাব করে দিলেই তো উদ্ধোধন হয়ে যাবে! যেই ভাবা সেই কাজ। স্কার্টটা নিচে নামিয়ে, দিলাম শয়তানটাকে ভিজিয়ে। প্রস্রাব শেষে অনেক খানি থুথু ও ছিটিয়ে দিলাম ওর কবরে। অতপর লাথি মেরে কবরের নামফলটা মাটিতে ফেলে দিলাম। যাক। এখন অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে। এবার কটেজে ফিরতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেছে। অভিশপ্ত কবরটা ফেলে চলে যাওয়ার জন্যে যখনই উঠে দাড়ালাম, সাথে সাথেই মাটি ফুড়ে একটা হাত এসে আমার পায়ে আঁকড়ে ধরলো। চাঁদনি আলোয় স্পষ্ট দেখলাম ঐ হাতের মধ্যমায় জ্বলজ্বল করছে সেই গনগনে লাল আংটি। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কি অসুরিক শক্তি হাতটায়। আমার এক পা এত শক্ত করে আকড়ে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে ছিঁড়ে নিয়ে যাবে। আমি প্রাণপণে অপর পা দিয়ে অনবরত ওর হাতে লাথি মারতে লাগলাম। কিন্তু ও আমায় কিছুতেই ছাড়লো নাহ। একটু একটু করে কবরের পাশে টেনে নিয়ে গেল। তারপর একটা হেচকা টানে টেনে নিলো একদম কবরের ভেতরে।

কবরের ভেতরটায় নিরেট অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছিলো নাহ। ঐ আংটি পরা হাতটাকে নাহ। তবে এইটুকু জানি ঐ হাতের মালিক এ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আশেপাশে কোথাও বসে আছে। আমাকে চরম শাস্তি দেয়ার জন্যে। হঠাৎ মনে পড়লো আমার পকেটে নেক্সাস ফোনটা আছে। ওটা বের করে ওর স্কিনের আলোয় কিছুটা হলেও ভেতরটা দেখতে পারবো। প্রয়োজন হলে সাহায্যের জন্যে পুলিশে ফোন দেয়া যাবে। পকেট টা হাতড়ে ফোনটা বের করে আনলাম। পাওয়ার বাটনটা টিপে সামনে বাড়িয়ে ধরলাম। আরে! এটাতো সেই কবরের ভেতরটা নয়। এটা আমার কটেজ। পাশেই দেখলাম একটা ফুলের টব ভেঙ্গে পড়ে আছে। বুঝলাম আমার কটেজে প্রবেশের পর এই টবে পা বেধেই আমি উল্টে পরে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। কবরস্থান আর প্রিস্টের কবরের ঘটনাটা নিছক অজ্ঞান অবস্থায় দেখা আরেকটি দুঃস্বপ্ন। আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে উঠে বসলাম। তারপর খেয়াল হলো আমার স্কার্ট সম্পূর্ণ ভিজে গেছে! হায় ঈশ্বর! আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছি! ধ্যাত। মোবাইলের আলোয় সহজেই দেয়ালের সুইচবোর্ড খুজে নিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিলাম। উজ্জ্বল আলোয় চোখ সয়ে এলে যেখানে আমি পড়ে গেছিলাম সেদিকে ফিরে তাকালাম। আমার প্রস্রাবটুকু সেখানে কার্পেটকে ভিজিয়ে একটা গোলাকার চাকতির মতো দাগ তৈরি করেছে। অনেকটা স্বপ্নে দেখা সেই আংটির আকৃতি। কিন্তু এই আংটির রহস্যটা কি? আলেস কি এই আংটির জন্যে এত দিন এখানে পড়ে আছে। সম্ভবত ও চায় যেন আমি আংটিটা এনে দেই। অন্তত উদ্ভট স্বপ্ন গুলি আমাকে সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। একটু আগে ও আমায় দেখিয়ে দিয়েছে আংটিটা কোথায় আছে। খ্রিস্টান কবরস্থানে সেই মৃত প্রিস্টের কবরের ভেতর। চোখ বন্ধ করতেই সেই আংটি পরা হাতের ছবি মনে ভেসে উঠলো, যা স্বপ্নে আমার পা চেপে ধরেছিলো। উহঃ। আমি আর ভাবতে পারছিনা। মাথায় আঘাতের যন্ত্রনা, প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ, সারাদিনের ক্লান্তি সব মিলিয়ে একটা নরকের আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। আমি সব কিছুকেই উপেক্ষা করে, সোজা বাথরুমে গোসল করতে ঢুকলাম।
গোসল করতে করতে হঠাৎ আয়নায় চোখ গেল। আমার প্রতিবিম্ব দেখলাম কপালটা ফুলে একটা আলু গজিয়েছে। বুঝলাম এটা একটু আগে পড়ে যাওয়ার ফল। ইশ। কেন যে মোবাইলের আলো জ্বালানোর কথা প্রথমেই মাথায় এলো নাহ। তাহলে এভাবে অন্ধকারে পড়ে যেতে হত নাহ। এসব যখন ভাবছিলাম তখন হঠাৎ আয়নায় আমার প্রতিবিম্বটা বদলে আলেসের চাহারা ফুটে উঠলো। আসলে ওর উপস্থিতিটা এখন অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। এখন আর ওকে দেখে এখন আর আগের মতো ভয় বা আনন্দ কিছুই হয়। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। খানিক পরে ও আয়না থেকে চলে গেল। কিন্তু আয়নার ধুলোর মাঝে লেখা ফুটলো, “আংটিটা পুড়াও। আমায় মুক্তি দাও।”

আমি লেখাটা মুছে না যাওয়া পর্যন্ত ওটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রকৃতপক্ষে কি চায় আলেস? প্রথমে আমায় ওর ডায়ারী পড়াতে চাইলো। এখন আবার একটা আংটি চাইছে যেটা কবরের ভেতরে প্রিস্টের লাশের হাতে পড়ানো আছে। কি করতে চায় ও সেই আংটি দিয়ে? ঐ আংটি এনে না দিলে ও কি আমার ক্ষতি করবে? আর কি করলে এসব বিদঘুটে স্বপ্ন আমার পিছু ছাড়বে? এ প্রশ্নগুলি আমায় পাগল করে দিচ্ছে। আমি এর সমাধান চাই। আমাকে এর সমাধান করতেই হবে। গোসল সেরে খানিকটা হালকা লাগলো। তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাহিরে আসা মাত্র শুনতে পেলাম একটা মেয়েলী কন্ঠ একটানা আমার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। সাঞ্জে সাঞ্জে সাঞ্জে …… এক অমোঘ আকর্ষণ এ ডাকে। আমি অনেকটা মোহবিষ্টের মতো এগিয়ে গেলাম ঐ ডাকটা লক্ষ্য করে। কিন্তু এটা আগের মতো লাইব্রেরী থেকে আসছে নাহ। এটা আসছে আমার ঠিক পায়ের নীচ থেকে! বেসমেন্ট! আলেস আমাকে সেই বেসমেন্টের বন্দিশালায় ডাকছে? কিন্তু ওখানে তো সম্পূর্ণ অন্ধকার। বেসমেন্টে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগানো হয়নি। আমি সেই ডাক উপেক্ষা করে আবার আমার বেডরুমে ফিরে এসে দু গ্লাস পানি খেলাম। ডাকটা তখনো চলছে। আমার মনের একটা অংশ বলছে বেসমেন্টে নেমে দেখে আসো, আলেস কি জন্যে ডাকছে। হয়তো ও আমায় এমন কিছু দেখাতে চায় যা ওর আত্মার মুক্তিতে সহায়তা করবে। অপর অংশ বলছে আলেস থেকে দুরে থাকো। যাই হোক না কেন ও একটা অশরীরী। ওই অন্ধকার বেসমেন্টে ও আমার যে কোন ধরনের ক্ষতি করতে পারে! কিছুক্ষণ ভাবতে ভাবতে এ দুটো মনের লড়াইয়ে অনুসন্ধিৎসু মনটাই বিজয়ী হল। আমি বেসমেন্টের দরজা খুলে আমার ফোনটায় আলো জ্বেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। সিড়ি ভেঙ্গে যতই নিচে নামছি ডাকটা যেন ততই জোরালো হচ্ছে। একটা সময় সেই এক সারির পাঁচটা সেলের সামনে এসে দাড়ালাম। বুঝতে পারলাম ডাকটা আসছে ডান দিক থেকে ৩ নম্বর সেলের ভেতর থেকে। ভয়ে হৃদপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। সমস্ত মানসিক শক্তি একত্রিত করে আমি ঐ সেলে ফোনের আলো ফেললাম। নাহ। বাকি সেল গুলির মতোই ওটাও সম্পূর্ণ খালি। সেই পুরানো দিনের মতো সেলটায় কোন তালা ঝুলছে নাহ। ভেতরে কোন বন্দিও নেই। তবুও সেল গুলির অবয়বে নিষ্ঠুরতার ছাপ এতটুকু কমে নি। হঠাৎ মনে খেয়াল জাগলো, ভেতরে ঢুকে দেখলে কেমন হয়? আমি বুঝতে চাই কিভাবে আলেস আর মার্টিনী এখানে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাতো। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ৮ ফিট বাই ৮ ফিটের এক বর্গাকার সেল। তিন দিকেই পাথুড়ে দেয়াল। শুধু সামনের দিকটায় শিখ দিয়ে আটকানো। তাতে ৫ ফিট বাই ৩ ফিটের একটা দরজা, কয়েদীদের ভেতরে আনা নেয়ার জন্যে। ভেতরটা সম্পূর্ণ খালি। কোন আসবাবপত্র নেই। এসব যখন ঘুরে ফিরে দেখছিলাম তখনই হঠাৎ সেলের দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল! আমি উন্মাদের মতো দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বশক্তিতে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু তালা না থাকা সত্ত্বেও দরজাটা শক্ত হয়ে আটকে গেছে। হায় হায়। এই শতাব্দী প্রাচীন বন্দিশালায় এখন আমি বন্দি হয়ে পড়েছি! না কি আলেস আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছে! ভয়ের এক ঠান্ডা স্রোত ঘাড় বেয়ে নেমে গেল! আবার মনে পড়লো হাতে ধরে থাকা ফোনটার কথা। আমি পুলিশে মেসেজ দিয়ে আমাকে এখান থেকে উদ্ধারের জন্যে বলতে পারি। কিন্তু ফোনের দিকে তাকাতেই সেই আশা গুড়েবালি হয়ে গেল। ওয়াই ফাই কানেকশন লস্ট দেখাচ্ছে। তার চেয়েও ভয়াবহ কথাটা হল ফোনে মাত্র ৪% চার্জ আছে। একটু পরেই এর স্কিনের আলো বন্ধ হয়ে যাবে। আমি ভয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি। যদিও জানি এ বিশাল শূন্য কটেজে কেউই আমার চিৎকার শুনবে নাহ। সেলের দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে কাঁদ ব্যাথা হয়ে গেছে। তবুও খুলছে নাহ। একসময় চলতে চলতে বার দুয়েক লো ব্যাটারি সিগনাল দিয়ে ফোনটা অফ হয়ে গেল। নিরেট আধার পুরো সেলটা কে গ্রাস করে নিল। অবিশ্বাস্য ভাবে বদ্ধ বেসমেন্টের ভেতরই একটা ঝটকা বাতাস এসে আমার শরীরে পেঁচানো তোয়ালেটা উড়িয়ে নিয়ে গেল। সেলের ভেতর প্রায় সব জায়গা হাতড়েও আমি তোয়ালেটা পেলাম নাহ। আমি এটারই ভয় পাচ্ছিলাম। আলেসের মৃত্যুর শত শত বছর পরে ওর সেলে, ওরই মতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আমি আটকে পড়েছি!

(চলবে)

রহস্য গল্প: “সানি সাইড হাউজ”

1

sunnyside farm house১৮ নাম্বার সাব ওয়ে স্টেশন পার হলেই মারুয়ামা পাহাড়ের দিকে মাটির নিচ দিয়ে সোজা একটা টানেল গিয়েছে। টানেলটা পার হলেই একটা টি রুম। সব সময় খোলা থাকে। আর খুব সুন্দর জাপানি ক্লাসিকেল মিউজিকের সুর ভেসে আসে। টি রুম টার কাছেই দুটো জাপানি ট্রাডিশনাল বাড়ি। লাল রংয়ের যে দুতলা বাড়িটি। সেটির নাম “সানিসাইড হাউজ”।এই বাড়িটির এমন সুন্দর নাম শুনেই নিশুতির খুব ভাল লেগে গেল।এইতো তিন মাস হয় হোক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে এসেছে।

হোক্কাইডো দ্বীপের সুপরিকল্পিত সাপ্পোরো শহরের সব কিছুতে তার মন ছুয়েঁ গেল। বাড়ির মালিকের নাম সাইতো। তার চার মেয়ে। দুই মেয়ে বিয়ে করেছে আর দুই মেয়ে চাকরি করছে। “সানিসাইড হাউজ”টি মেইন রোডের সাথে। আর সকালের সূর্যের আলোটা যেন তার হাউজেই প্রথম ধরা দেয়। তাছাড়া বাড়িটি সাধারন জাপানি বাড়ির মতো হলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অসাধারন। বাড়ির মালিক রিটায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ার। তাই প্রযুক্তি নিয়ে তার একটু বেশী জ্ঞান।তার বাড়ির দুতলায় উঠতেই একটা সেন্সর লাইট লাগানো আছে। উপরে কেউ উঠতে গেলে প্রথম সিড়িতে পাড়া দিতেই দেখা যাবে সেন্সর লাইট জলে উঠে। তাই সিকিউরিটি ভাল দেখে মনে মনে স্বস্তি খুঁজে পেল। এখানে বাংলা ভাষাভাষীর লোক সংখ্যা কম। বাঙালি কমিউনিটি যারা আছে তারা দূরে থাকে। তাছাড়া এইতো গত মাসে কমিউনিটির একটা প্রোগ্রাম হলো।

নিশুতির সাথে কয়েকজন বাঙালি ভাবির সাথে পরিচয় হলো। সবাইকে ভাল লাগলেও দু একজনের দৃষ্টি আর অতি কৌতুহলী আচরন যেন নিজের মন কে বিষিয়ে দিচিছল। মনে হচিছল এমন ভয়াবহ পরিচয়টা না হলেই ভাল হতো। বিষাক্ত সঙ্গীর থেকে নিসঙগতা অনেক নিরাপদ। কেন একা একা বিদেশে পড়তে আসছে? বিয়ে কেন করেনি? তার কোন এ্যাফেয়ার আছে কিনা? এই জাতীয় প্রশ্ন গুলো করে তার জীবনের কোন সমাধান খুজেঁ দিবে না। বরং তাকে অপ্রস্তুত করে বিকৃত মজা নেওয়াই আনন্দ। যাইহোক নিজেকে প্রশ্নের থেকে দূরে রাখতেই সে নিজস্ব কমিউনিটি এড়িয়ে থাকে। বাঙালি কমিউনিটির চোখের সামনে যাওয়া মানে নিজেকে আলোচনার কোন ইস্যুতে পরিনত করা। তার চেয়ে সারা দিন ল্যাব করার পর সানিসাইড হাউজের করিডোরে দাড়িয়ে নিঃসঙগতায় ডুবে থাকাও আনন্দের ।

নিশুতির রুম থেকে চারটা রুম পরে একটা রুম। সে রুমটায় তালা লক করা ছিল ।প্রথমে মাসের শেষের দিকের ঘটনা। ঠিক এমন মার্চের বরফাচ্ছন্ন শহরের নিসঙগতা দেখতে দেখতে নিজের রুমের সামনের করিডোরে চা খাচিছলো। একটি অত্যন্ত সুন্দরি জাপানি মেয়ে সে রুম থেকে হাসি মুখে বের হয়ে এলো। নিশুতি তাকে নিজের রুমে নিয়ে আসে। সে টুকটাক বাংলা পারে। নিশুতিও অনেকটা জাপানিজ শিখে গিয়েছে। ভালই দিন কেটে যাচিছল। হঠাৎ একদিন স্বপ্ন দেখে ঐ মেয়েটির রুমে আগুন লেগেছে।

কিন্তু সে নিজের রুম খুলে যেতে পারছে না। রাতে বেলা মারাত্মক ভয় পেয়েছিল। মেয়েটিকে রাতের স্বপ্নের গল্প টা বলার জন্য অপেক্ষা করছিল। পরের দিন থেকে সে মেয়েটিকে সে দেখতে পায় না। তার রুমের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আরো দুই মাস কেটে যায়। কোন এক ছুটির দিন দেখে বাড়িওয়ালা একজন কে দেখানোর জন্য রুমটা খুলছে। নিশুতি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,সে মেয়েটি কোথায়? যে নিয়মিতভাবে তার সাথে চা খেতো। বাড়িওয়ালা অবাক হয়ে বলল, তোমার তো তাকে দেখার কথা নয়।

আয়কা নামের সে মেয়েটি তুমি আসার আগেই আগুনে পুড়ে এ রুমে আত্মহনন করে ছিল।সে আর স্বপ্নেরর কথাটা বলতে পারলো না। বুকের ভিতরটা কেমন দুক করে উঠলো। আয়কার স্মৃতি গুলো যেন জীবন্ত হয়ে ছায়ার মতো হাটতে লাগলো। এক টা তীব্র অশান্তি মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। মনেহয় সেন্সর লাইট টা বুঝি জলে উঠলো। কেউ বুঝি কলিংবেল বাজালো। জীবন যেন বাস্তবতা আর কল্পনা কে এক করে চলতে লাগলো।

তারপর একদিন এই “সানিসাইড হাউজ ” ত্যাগ করে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ডরমিটরি তে উঠলো। পেছনে সানিসাইড হাউজের দিকে তাকালো না। আর মনে মনে ভাবলো যে কোন বাড়িতে প্রথম সূর্যের আলোর সরাসরি অনুপ্রবেশ কল্পনাকে ঠিক উজ্জীবিত করে। কিন্তু কিছু অন্ধকার ও লুকিয়ে থাকে যা সূর্যের আলোতেও ধরা পড়ে না।

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [শেষ অংশ]

1

কক্ষের বিশাল জানালা দিয়ে হু হ করে চৈত্ররাতের বাতাস ঢুকলেও আমার ভীষণ গরম লাগছিল। পায়জামা পরে খালি গায়েই ছিলাম। বেশি গরম লাগলে নীচে নেমে দীঘির জলে সাঁতার কেটে আসব বলে ঠিক করলাম।
লিখলাম … প্রাথমিক ভাবে আমার ইনামগড়ের জমিদারবাড়ির এরিয়া প্রায় ছয় একর বলে মনে হয়েছে। অবশ্য কম হতে পারে আবার বেশিও হতে পারে। সবচে উল্লেখযোগ্য যেটা, লেবুবাগানে বৌদ্ধদেবী তারার একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে।মন্দিরটি সন্দেহ নেই পাল আমলের নির্মিত। কাজেই প্রায় হাজার বছরের পুরনো হওয়ার কথা। এটা একটা অনন্য ডিসকভারীই বলা যায়। তবে কিছু প্রশ্ন জাগে …
টাইপ করতে করতে মনে হল আকাশ থেকেফুটফুটে জ্যোস্না ঝরছে। অলিন্দে দাঁড়ালে দেখতে পাব চৈত্রপূর্ণিমার পূর্র্ণযৌবনা চাঁদ আর ঝাউদীঘির টলটলে রূপালি জল । বেশ বুঝতে পারছি যে আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। না হোক। কত রাতই তো আমার বই পড়ে কেটেছে। দূরথেকে হুইশিলের আওয়াজ ভেসে এল। কুউউউ ঝিকঝিক। মাঝরাতের ট্রেন। স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকারের মুখটা মনে পড়ে গেল । ভদ্রলোক যদি জানতেন যে আমি এই মধ্যরাতে জমিদার হেমেন্দু বিকাশরায় চৌধুরীর শয়ন কক্ষে বসে আছি এবং ঝাউদীঘির টলটলে রূপালি জলে উদোম হয়ে সাঁতার কাটার প্ল্যাট আঁটছি …
আমি লিখছিলাম … সেনআমলে সেনরাজাগণ বৌদ্ধদের ওপর প্রচন্ড দমনপীড়ন চালিয়েছিলেন । তাহলে লেবুবাগানের ওই বৌদ্ধমন্দিরটি কি ভাবে আজও ইনট্যাক্ট রয়েছে? এই বিষয়টির গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা কি?
এই পর্যন্ত লিখলাম। আসলে ইতিহাসএবং প্রত্নতত্ত্ব হল অনেকটা গোয়েন্দা কাহিনীর মতো । অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। তখন মাথায় জট পাকিয়ে যায় । সিগারেট টানতে টানতে পায়চারি না করলে আমার আবার মাথার জট খুলে না।
আমি দিনের বেলায় ধূমপান থেকে বিরত থাকি। রাতের হিসেব অবশ্য অন্যরকম। মালবোরোর সাদা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম।
তারপর উঠে অলিন্দে চলে এলাম।
মার্চরাত্রির স্নিগ্নধবল জ্যোস্নায় ভীষন মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ঝাউগাছের পাতা ছুঁয়ে মধুর চৈত্র বাতাস ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।মুহূর্তেই আমি পুরনো ইতিহাসের গূঢ় জিজ্ঞাসার কথা ভুলে গেলাম ।
প্রকৃতির মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম। প্রকৃতি ঘুমিয়ে পড়েছে। কী নির্জন চরাচর! কেবল একটি রাতচরা পাখি কর্কস কন্ঠে ডেকে গেলে সে অটুট নির্জনতা ক্ষণিকেরজন্য ভেঙে পড়ল। তাকিয়ে দেখলাম ঝাউদীঘির রূপালি জলে কাঁপন উঠেছে। মাছ নিশ্চয়ই। আজ যে রুইমাছ খেলাম ওই দীঘিরই বোধহয়। ওসমান গাজী ধরে রেখেছিল। আমি যে আসছি সে তো ওসমান গাজী জানতই ।
ঝাউদীঘির পানি থেকে একটা মাথা ভেসে উঠল।
মানুষের মাথা।
আমার শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে গেল।
মাথাটা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে ঠেকল । তারপর ধীরে ধীরে উঠে এল। জলে ভেজা শরীরের পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এক হাতে একটা কোদাল। অন্য হাতে টুকরি। সে মুখ তুলে দোতলার অলিন্দের দিকে তাকাল। আমি আমূল কেঁপে উঠলাম। আমার হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ল। ঝাউদীঘির মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুর? কিন্তু কিন্তু তা কি করে সম্ভব? ততক্ষণে দীঘির পানিতে আরও অনেক মাথা ভেসে উঠে। আমি কি ভুল দেখছি? আমার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে?
অবচেতন মনে কে যেন তাড়া দিল।
আমি দিগবিদিগ দৌড়ে নীচে চলে এলাম।
অন্ধকারে বেশ ক’বার ঠোক্কর খেলাম। অবশ্য যন্ত্রণা টের পেলাম না। আমার শরীর ভীষন কাঁপছিল।
ওসমান গাজী ! ওসমান গাজী ! আমার মুখে কথা ফুটল না।
ওসমান গাজী টিনসেড থেকে বেড়িয়ে এল। বলল, হজুর জলদি গাড়িতে উঠেন।বলেই এক লাফে জুরীগাড়িতে চড়ে বসল ওসমান গাজী।
আমিও দরজা খুলে ভিতরে বসতে দেরি করলাম না । থরথর করে কাঁপছিলাম। ঘামে শরীর ভিজে গেছে।
জ্যোস্নামাখা লেবুবনের মাঝখান দিকে ঘোড়াগাড়ি ছুটছে।
দু’পাশের লেবুগাছগুলি ভীষন কাঁপছিল। অশুভ আত্মার তপ্ত নিঃশ্বাস টের পাচ্ছিলাম যেন। দেখতে দেখতে জুরীগাড়ি শালজঙ্গলে উঠে এল। ঘোড়া দুটি ভীষণ চিঁ হি চিঁ হি করছে। ওরাও ভয় পেয়েছে। দু’পাশের শালজঙ্গলেওযেন ঝড় উঠেছে। ভয়ানক শনশন আওয়াজ হচ্ছে । গাছগুলি দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। জুরীগাড়ি একবার কী সেরধাক্কায় ভয়ানক কেঁপে উঠল। ওসমান গাজী প্রাণপন চেষ্টা করে তাল সামলালো।
তারপর কখন যেন রেলস্টেশনের সামনে জুরীগাড়িটা থামল ওসমান গাজী ।
নামেন হুজুর। আর কোনও ভয় নাই।
আমি দরজা খুলেই এক লাফে নীচে এলাম।
তারপর ছুটে গেলাম স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে।
স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সিগারেট ফুঁকছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, বুঝেছি। বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। যাক। আধঘন্টা পরেই ঝিকড়গাছার একটি ট্রেন আছে। সেই ট্রেনে আপনাকে তুলে দেব। এখন আমার ঘরে আসুন। কিছু একটা পরে নিন।

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [২য় অংশ]

1

 

সবাই বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী নাকি ঝাউদীঘির জল থেকে কয়েক শ মানুষ ভেসে উঠতে দেখেছিলেন। মানুষগুলির পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি; এক হাতেকোদাল, অন্য হাতে টুকরি।

বলেন কী!

হ্যাঁ। ইনামগড়ের লোকে বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী ঝাউদীঘি থেকে মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুরদের উঠে আসতে দেখেই মারা গেছেন।

কথাটা আমার কেন যেন ঠিক বিশ্বাস হল না। আমি ঠান্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবলাম।

(১) জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। হয়তো হার্ট অ্যাটাক করেছিল। সেই আমলের মানুষ আজকের দিনের মতো এত স্বাস্থসচেতন ছিল কি? আর ডাক্তারি বিদ্যের জোর তো তথইবচ

(২) ঝাউদীঘি থেকে মৃত শ্রমিকদের তো জীবিত উঠে আসার প্রশ্নই আসে না।

(৩) এ দেশের মানুষ ভীষন গল্পপ্রিয়। অনেকে আবার ভালো গল্প-বলিয়ে। স্টেশনমাস্টারটি সেরকমই গুণধর একজন মানুষ । নির্জন স্টেশনের নিঃসঙ্গ মানুষটি আমাকে দেখে গা ছমছমে গল্প ফেদেছেন, সমস্ত প্রতিভা উজার করে দিয়েছেন। গল্পবরং উপভোগ করাই ভালো। তর্ক করে লাভ নেই।
আমি গত তিরিশ বছর পেশাগত কাজে কতপুরনো বাড়িতে কাটিয়েছি। কই, কখনও তো কোনও অশুভ প্রেতাত্মা ভয়াল রূপ ধরে আমার সামনে এল না । বন্ধুরা আমাকে ডাকাবুকো বলে। পরলোকে অবিশ্বাসী বলেও আমার দুর্নামও আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, পরের বছর চৈত্র মাসের গোড়ায় মারা গেলেন জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ট পুত্র জমিদার দিব্যেন্দুপ্রকাশ রায়চৌধুরী। ওই একই ভাবে। গরমে ঘুম আসছিল না। মাঝরাতে অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ ঢলে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
ওহ্ ।
আপনাকে তখন একবার বলেছি সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধর ইন্ডিয়া চলে যায়। এখন নাকি রায়চৌধুরী পরিবারের অনেকেই বিলেতে থাকেন।
আচ্ছা।
স্টেশনের বাইরে খটাখট খটাখট ঘোড়া ক্ষুরের আওয়াজ পেলাম।
স্টেশনমাস্টার সচকিত হয়ে বললেন,আপনার লোক বুঝি এসে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাদিক সাহেব? অমন অশুভ জায়গায় আপনার না গেলে চলে না?
মৃদু হেসে বললাম, উপায় নেই। সরকারি কাজে এসেছি। বলে ভারী সুটকেশটা তুলে নিলাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, ঠিক আছে। অশুভ জায়গায় যখন যাচ্ছেন যান। কিন্ত বলে রাখি, আমি সারারাতই স্টেশনে আছি। তেমন কোনও বিপদ টের পেলেই ছুটে আসবেন ।
কথাটা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
কেয়ার টেকারের নাম ওসমান গাজী। বৃদ্ধই বলা যায় । তবে স্বাস্থ বেশ ভালো। এই বয়েসেও বেশ গাট্টাগোট্টা। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় নীল রঙের মখমলের টুপি। টুপির নীচে পিছনের দিকে চুল যা বেরিয়ে আছে তার সব পাকা। বসন্তের দাগ ভরতি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ফিরোজা রঙের সদরিয়া আর চোস্ত পাজামা পরে ছিল ওসমান গাজী । বৃদ্ধের হাঁটাচলার ভঙ্গি খুবই নিরীহ । কথাবার্তায়ও অত্যন্ত বিনয়ী।
ওসমান গাজী আমার সুটকেশটা ঘোড়াগাড়িতে তুলে দিল। ইনামগড়ের রাস্তায় যে আজও এই একুশ শতকের বাহনটি চলে সেটি জানতাম না। নিছক ছ্যাকড়া গাড়ি হলে না-হয় এক কথা ছিল, এ তো দেখছি রীতিমতো জমিদার আমলের আলিশান জুরীগাড়ি! ভিতরে সবজে রঙের গদিওয়ালা বসার আসন। ওপর থেকে ঝুলছে ছোট ছোট ঘন্টি লাগানো ঝালর। ছোট আয়নাও বসানো রয়েছে দেখলাম। বেশ উপভোগই করলাম উনিশ শতকী বাহনটা।
শালজঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পিচরাস্তা বেঁকে চলে গিয়েছে। শেষবেলায় উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে ছিল। সবে চৈত্রের শুরু। বনে অজস্র শুকনো পাতা। আচমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঘোড়াগাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিতেই একটা ময়ূর চোখে পড়ল । বেশ পুরনো আমলের আবহ। পথটা ধীরে ধীরে সরু হয়ে উঠেছে। দু’পাশে এখন ঘন লেবুবাগান। লেবুবাগানে আলোআধাঁরির খেলা আর কাক-পাখিদের অসহ্য কিচিরমিচির।
লেবুবাগানের মাঝখানে একটা টিনসেড। তারই সামনে ঘোড়াগাড়ি থামল। ঘোড়াগাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি। একতলা টিনসেডের সামনে একচিলতে বারান্দা। খাওয়ার টেবিল। কাঠের একটা বেঞ্চি। ওসমান গাজী বেঞ্চির ওপর আমার সুটকেশটা রেখেঅত্যন্ত বিনীত কন্ঠে বলল- সে এই টিনসেডেই থাকে। আমার থাকার ব্যবস্থাও নাকি সে ওখানেই করেছে।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম রান্নার জায়গা বাদেও ছোট ছোট দুটি ঘর। একটা ঘরের মেঝেতে কোদাল ও টুকরি দেখলাম। হয়তো ওগুলি বাগানে কাজ করার সময় ওসমান গাজীর কাজে লাগে।
লেবুবাগানের ভিতর ছোট্ট একটি পুরনো মন্দিরও চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম।বৌদ্ধদেবী তারার মন্দির। বাংলাদেশে এ ধরনের মন্দির রেয়ার। আমি ঝটপট আমার ক্যানন রিবেল এক্সএসটা বের করলাম। তারপর বিভিন্ন অ্যাঙেলে ছবি তুলে নিলাম।
তখনও যেহেতু দিনের আলো ছিল। আমি জমিদার বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখব ভাবলাম। অল্প একটু ঘুরে যা মনে হল আমার। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দিটা অন্তত ছয় একরের কম হবে না। মূল ভবনের ইমারতগুলি বেশ উঁচু উঁচু । দেখেই বুঝলাম উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।রায়চৌধুরীরা যে জৌলুসপূর্র্ণ জীবনযাপন করত তাও বোঝা গেল। এখন অবশ্য ইমারতগুলি – দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে যা হয়-ইঁদুর, চিকা, চামচিকা, চড়–ই পাখি আর কবুতর দখলে চলে গেছে।
প্রধান প্রবেশপথের বাম পাশে মূলভবনের এলাকার মধ্যেই খোলা জায়গায় একটি কৃষ্ণমন্দির। তারই ডান পাশে মূল ভবনের বহির্বাটি এবং প্রবেশপথ। তারপর বর্গাকার একটি চত্বর। পূর্ব দিকে চত্বরমুখী সমতল ছাদবিশিষ্ট আরও একটি মন্দির। মন্দিরের সামনের অলিন্দ এবং মন্দিরের ছাদটি রয়েছে চারটি স্তম্ভের উপর । মূল বাড়িটি তিনটি প্রধান মহলে বিন্যস্ত। আয়না মহল, রানী মহল এবং ঠাকুরবাড়ির মহল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দলদালানের ইট ক্ষয়ে গেছে।
একতলার কক্ষের দরজা-জানালাগুলিভেঙে পড়েছে । অনেক দরজায় আবার তালা। তালাগুলি ওসমান গাজী কে দিয়ে ভাঙাতে হবে। একতলার একটি কক্ষে বড় বড় ছ’-সাতটি সিন্দুক দেখলাম । সিন্দুকগুলি খুলে দেখতে হবে। ভিতরে যা আছে তার লিষ্ট করতে হবে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [২য় অংশ]

0

 

এই সময়ে মন্দিরের জলসমূহ রক্তবর্ণ ধারণ করিতে দেখাযায়।
হুমম।কামাখ্যা মন্দির বেশ রহস্যময় আর বিচিত্র স্থান বলেই তো মনে হচ্ছে। আমি মনে মনে ভাবলাম। এই ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠলাম মঙ্গল ভট্টারক না-আবার আমার মনের কথা পড়ে ফেলেন। হাজার হলেও সিদ্ধযোগী। চারিদিকে একবার আমতা- আমতা করে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললাম, সারা জীবন আপনি এত যে কষ্ঠ করলেন। কিন্তু আপনি কি কোনও ধরণের অলৌকিক শক্তি হাসিল … মানে… অর্জন করেছেন?
মঙ্গল ভট্টারক মৃদু হাসলেন। তারপর হাসি থামিয়ে খানিকটা পরিহাসের স্বরে বললেন, আমি দিব্যশক্তি অর্জন করিয়াছি কিনা তাহা তুমি সময় হইলেই টের পাইবে বৎস।
মানে? এই মুহূর্তে আমার মুখটা নিশ্চয় বেকুবের মতন দেখাচ্ছে।
মঙ্গল ভট্টারক অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে বললেন, জঙ্গলবাড়িতে অত্যন্ত সাবধানে থাকিবে বৎস।
আমি চমকে উঠলাম।মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, ক্য ক্য কেন … কেন আমাকে সাবধানে থাকতে বলছেন?
মঙ্গল ভট্টারক বললেন, তুমি যে জঙ্গলবাড়িতে বাস কর তাহা অভিশপ্ত।
আশ্চর্য! আমি যে জঙ্গলবাড়িতে থাকি সে খবর মঙ্গল ভট্টারক কী ভাবে জানলেন? অরু বলেছে কি? গতকালতো অরু মঙ্গল ভট্টারক কে দেখেছিল। আমি বললাম, অভিশপ্ত? কই আমি তো কিছু টের পাইনি।
জঙ্গলবাড়ি অভিশপ্ত কি অভিশপ্ত নহে তাহা অবিলম্বেই টের পাইবে বৎস। কথাটা বলে চোখ বুজলেন মঙ্গল ভট্টারক। যেন গভীর ধ্যানে ডুবে গেছেন।
মনের মধ্যে ভীষণ অস্বস্তি টের পাচ্ছি। এখানে বসে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। তাছাড়া এখন এই আসন্ন সন্ধ্যায় গুহায় ঝাঁক ঝাঁক বাদুড় ঢুকবে। তাতে ধ্যানস্থ সন্ন্যাসীর ধ্যানের ব্যঘাত ঘটবে কিনা জানি না-আমি আহত হলেও হতে পারি। একবার চারিদিকে তাকিয়ে উঠেদাঁড়ালাম। তখনই ক্ষীন জলধারা শুনতে পেলাম। কাছেই কোথাও ঝরনা আছে। হাঁটতে-হাঁটতে গুহামুখের কাছে চলে এলাম। ভাবলাম আজ এখানে না এলেই বুঝি ভালো হত। প্রতিটি মানুষই জানে যে তার চলার পথে বিপদ-আপদ ওত পেতে থাকে। কিন্তু ওতপেতে থাকা বিপদটা কেউ নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দিলে অস্বস্তি তো হবেই।
যখন জঙ্গলবাড়ি ফিরে এলাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে উঠেছে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট জায়গা । শক্ত গামার কাঠের তৈরি সদর দরজাটি বেশ বড়। গেটের পাশে বিশাল একটা শিল কড়ই গাছ। ভিতরে ঢুকলে দু’পাশে কাঠের স্তূপ চোখে পড়বে; ডান পাশে কাঁটাতারের ওধারে চোখে পড়বে চাপালিশ, শমী আর বনকাপাস গাছের ঘন জঙ্গল; চোখে পড়বে লালচে কামদেব কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট দোতলা বাড়ি। দোতলায় ছোট একটি বারান্দা। বারান্দার দু’পাশে নীচ থেকে মাটি ফুঁড়ে উঠে গেছে শ্যামলতা, অনন্ত কান্তা ও মিঠাবিষ লতা । বাড়ির পিছনে ছাঁচি বেতের ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের পিছনে বেশ বড় একটি টিলা। টিলায় গুহাও আছে।
মাস দুয়েক হল আমি এই জঙ্গলবাড়িতে এসেছি । আগে থাকতাম থানচির কাছাকাছি একটা টংঘরে। ওখানেই আমার কাঠের আড়ত। আমার বাবা শেষ জীবনে কাঠের ব্যবসায় নেমেছিলেন। মৃত্যুর আগে ব্যবসা আমাকে বুঝিয়েদেন। ব্যবসায় নামার আগে আমি কক্সবাজার শহরে লেখাপড়া করতাম।
তো, হাজারও সমস্য সত্ত্বেও ব্যবসা ভালোই চলছে। বছর দুয়েক আগে ড্রাইভারসহ (মাহুত) একটা সেকেন্ড হ্যান্ড হাতিও কিনেছি। হাতি নাম: রুস্তম। মাহুতের নাম অরু। অরুই তো গতকাল রুস্তমকে ঝরনায় গোছল করাতে গিয়ে মঙ্গল ভট্টারক কে দেখল। অরু বেশ বিশ্বস্ত। অরুর গায়ের রং তামাটে।তবে বয়স বোঝা যায় না। অরুরা নাকি বংশানুক্রমিকভাবে মাহুতের কাজ করে আসছে।
তবে এই নির্জন জঙ্গুলে পরিবেশে আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী অরু নয়। রামু। একুশ/বাইশ বছর বয়েসি এই স্থানীয় ছেলেটি আমার ভীষণ ভক্ত। রামুই জঙ্গলবাড়ি দেখাশোনা করে। রান্নাবান্নাও রামুই করে। রামু বেশ হাসিখুশি ছেলে। হলদে মঙ্গোলয়েড মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগেই আছে। ভারি ঝকঝকে দাঁত। রামু রোজ দু-বেলা কাঞ্জল গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজে। এটাই রামুর ঝকঝকে দাঁতের রহস্য কিনা কে জানে।
আমরা বাড়ি টেকনাফ শহরে । টেকনাফ শহরে আমাদের বেশ কিছু পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে। সেসবের দেখাশোনা করতেই মাঝে-মাঝে আমাকে বান্দরবান থেকে টেকনাফ যেতে হয়। আমার মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। ছোটএক বোন ছিল। আফরোজার শ্বশুরবাড়ি কক্সবাজার শহরে । ছোটবোন সুখেই ঘরসংসার করছে। বলতে গেলে আমার কোনও পিছুটানই নেই । তার ওপর আমারআবার ভবঘুরে স্বভাব। জঙ্গলে ভালোনা লাগলে আবার হয়তো টেকনাফ শহরেই ফিরে আসব।
বহুদিন পর বাড়ি গেলাম।
মাজেদা ফুপু আমায় ফোন করে ডেকে পাঠালেন। মাজেদা ফুপু বাবার চাচাতো বোন। থাকেন টেকনাফ শহরের পুরনো বার্মিজ মার্কেটের কাছে। মাজেদা ফুপু বিধবা। তবে বেশ ধনী। আফজাল ফুপার চিংড়ির ব্যবসা ছিল। কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে বাসও ছিল।আরাকানের সঙ্গেও নাকি কী সব গোপন ব্যবসাও ছিল শোনা যায়।
আমার নাম কামরুল হলেও মাজেদা ফুপু আমাকে ছেলেবেলা থেকেই আদর করে ‘তোতা’ নামে ডাকেন। আমাকে দেখেমাজেদা ফুপু বললেন, কি রে তোতা? তুই বিয়ে করবি না? বিয়ের বয়স হল।
আমি কি আর বলব। চুপ করে রইলাম। মাজেদা ফুপু সবই জানেন। ব্যবসার কাজে গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই । তার ওপর মা-বাবা নেই। বিয়ের কথা কে তুলবে? এদিকে আমার বয়সও ত্রিশের কোঠায় ঠেকল। তাই ভাবলাম, জঙ্গলবাড়িতে আমার পাশে একটা উষ্ণ-কোমল আর মমতাময়ী বউ থাকলে মন্দ কি।
পাত্রী মাজেদা ফুপুই ঠিক করে রেখেছেন। পাত্রী মাজেদা ফুপুর ননদের মেয়ে- থাকে উখিয়া। পাত্রীর মা-বাবা নেই। পাত্রীর নাম: পিয়ালী। (কি সুন্দর নাম) উখিয়া গিয়ে পাত্রী দেখে এলাম। গায়ের রং শ্যামলাই বলা যায়। তবে চোখ দুটি এতই গভীর যে আমার হবু বউয়ের মনে হয় না চোখে কাজল লাগানোর দরকার হয়। তবে পিয়ালীকে কিছুটা দুঃখী বলে মনে হল। হয়তো নতুন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মা-বাবার কথা ভাবছে। মনে মনে ভাবলাম আমি আর পিয়ালী যখন রুস্তমের পিঠে চড়ে বনের ভিতরে বেড়াব তখন ওর সব দুঃখ ঘুচে যাবে।
পিয়ালীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল।
আমরা জঙ্গলবাড়িতে ফিরে এলাম।

চলবে

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুড়ো হুজুর

1

এখন যে ঘটনাটি আমি আপনাদের কাছে শেয়ার করছি সেটি আমাদের নিজ গ্রামের ঘটনা।

গভীর রাত। চারপাশে শুধু সুনসান নিরবতা। কোথাও কোন জন-মানুষের সাড়া শব্দ নেই। আর ঠিক সে সময় শোনা গেল ঘোড়া খুরের সেই টগবগ টগবগ আওয়াজ। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে ঘোড়ায় চড়ে কেউ একজন গ্রামে এসেছে। কিন্তু এতো রাতে কে আসে কেউ তা বুঝতে পারতো না। কিন্তু এক সময় গ্রামের কিছু মানুষ তাকে দেখতে পায়। দেখে লম্বা জুব্বা পড়া মাথায় কালো পাগড়ি বাঁধা আর মুখে লম্বা দাড়িওয়ালা তিনজন লোক। আসে ধূসর রঙ্গের একটি ঘোড়ায় চরে। তখন মানুষের মাঝে পশ্ন জাগে কে তিনি আর কেনই বা এই গভীর রাতে এই গ্রামে আসে। তাকে দেখা যেতো প্রতি বৃহস্পতি বার গভীর রাতে। এবং তাকে দেখেছে এমন লোকের সংখ্যা আমাদের গ্রামে ৫০ এর উপরে হবে। এর মধ্যে আমার কয়েকজন নিকট আত্মীয় ও আছে। আর এমন দুজন অত্মীয়র মুখ থেকে শুনা কথা আপনাদের কাছে শেয়ার করছি।

প্রথম:- আজ থেকে ১৫ বছর আগের কথা। আমার এক বড় ভাই ছিল নাম তার কাশেম। আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তার পাশের ছিলো ছোট্ট একটি কাছারি ঘর। আর সেই ঘরে আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে থাকতো কাশেম ভাই। একদিন গভীর রাতে তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাহিরে গেলেন। রাস্তার ধারে থাকা একটি নারিকেল গাছের পাশে বসে তিনি প্রসাব করতে লাগেন। ঠিক এমন সময় তিনি খেয়াল করেন দূর থেকে ঘোড়ার টগবগ টগবগ আওয়াজ তার কানে ভেসে আসছে। তিনি তখন রাস্তার উপর দাড়িয়ে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এমন সময় লক্ষ্য করলেন ঘোড়ায় চড়ে কেউ একজন এদিকে আসছে। তিনি তখন আবার চুপ করে নারিকেল গাছের পাশে গিয়ে বসে থাকলেন। এক সময় লোকটি ঘোড়ায় চড়ে তার সামনে দিয়ে চলে গেল। পরে তিনি দ্রুত ঘরে চলে আসলেন।সেদিন রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন কেউ একজন তাকে বলছে এই ঘটনা কাউকে না বলার জন্য।কিন্তু পরদিন সকালে এই ঘটনা তিনি সবাইকে বলেন।
দ্বিতীয়:- ২০০৬ সালের ঘটনা। আমাদের গ্রামের এক ছেলে নাম সাহিদ। প্রায় সময় সে গ্রামের দোকানে ক্যারাম খেলে রাত করে বাড়িতে ফিরতো। একদিন চাঁদনী প্রসর গভীর রাতে দোকান থেকে বাড়িতে যাওয়ার পথে সে লক্ষ্য করে মসজিদের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খাম্বাটির মধ্যে একটি ঘোড়া বাঁধা আছে। এতো রাতে এখানে ঘোড়াটিকে বাঁধা দেখে সে কিছুটা অবাক হলেন। মসজিদের একপাশে একটি জানালা খোলা ছিলো। সে তখন সাহস করে মসজিদের ভেতর কি আছে দেখতে চাইলো। দেখে মসজিদের ভেতর সাদা জুব্বা পড়া একজন লোক নামাজ পড়ছে। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ও তাকে স্পর্শ দেখা যাচ্ছে। আর চারদিকটা যেন আলোয় ভরে আছে। যা দেখে সে ভয় পেয়ে গেলো। সে তখন কোন শব্দ না করে জানালার পাশ থেকে এসে বাড়ির দিকে রওনা হল। কিছু দূর যাওয়ার পরে সে পিছনের দিকে তাকালেন। দেখে তার থেকে একটু দূরে জুব্বা পড়া সে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে। সে তখন ভয়ে দৌড় দিয়ে বাড়িতে চলে আসে। তাকে ও রাতে স্বপ্ন দেখালো এই ঘটনা কাউকে না বলতে। কিন্তু সকালে এই ঘটনা সে সবাইকে বলে দেয়।

তবে অবশ্যই গত পাঁচ বছর ধরে কেউ তাকে দেখেছে এমন কথা শুনা যায়নি।

[বি:দ্র:-আজ থেক বহু বছর আগে আমাদের গ্রামে বুড় হুজুর নামের একজন বুজুর্গ আলেম ছিলো। গ্রামে সবাই তাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। আর লোকের মুখে শুনা যায় বুড় হুজুরের সাথে ছিল নুরুল ইসলাম নামের এক জ্বীন। বুড় হুজুর যেদিন মারা যায় সেদিন ছিলো বৃহস্পতি বার দিবাগত রাতে আর তাকে দাপন করা হয় মসজিদের পাশে। এখন তার কবরের উপর উঠেছে মস্ত বড় এক আম গাছ। কেউ ঐ আম গাছের উপর উঠেনা। গ্রামের মানুষের ধারনা ঘোড়ায় চড়ে আসা লোকটি বুড় হুজুর হবে। তবে ভিন্ন মত ও আছে কারো মতে উনি হল বুড় হুজুরের সে জ্বীনটি। যে কিনা আজো বেঁচে আছে পৃথিবীর মাঝে।]

By Shohag Dewan.

শবসাধকের কাল্ট – ১ম পর্ব

0

জ্যোস্নার আবছা আলোয় দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক (নাকি শব?) বেরিয়ে এল। আশ্চর্য! কে লোকটা? এতরাতে কি করছিল মর্গে?এখন প্রায় শেষরাত। জানলার পাশে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম। অনেক দূরে কুকুর ডাকছিল। হঠাৎ মর্গের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। ভালো করে লোকটাকে দেখাও গেল না। চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল কলাঝোপের আড়ালে। চোখের ভুল? লাশকাটা ঘরটা অবশ্য বেশ দূরে। চারতলা সরকারি কোয়ার্টারের জানালার পাশ থেকে দেখছি। রাতজাগার ফলে হয়তো আমি চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখছি। বছর খানেক ধরে ইনসমনিয়ায় ভুগছি। রাতে ভালো ঘুমও হয় না। বই পড়ে, মুভি দেখে, ঘরে পায়চারী করে কিংবা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে, সিগারেট টেনে রাত কাটে। আবছা অন্ধকারে টেবিলের কাছে এলাম। এলজিটা তুলে দেখলাম: দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। ইশতিয়াক বিছানার ওপর হাত পা ছড়িয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে। ঘরে বেনসনের গন্ধ ভাসছিল। শালা চেইন স্মোকার। আজই ঢাকা থেকে এসেছে। কালই চলে যাবে। ইশতিয়াক আমার ছেলেবেলার বন্ধু। চারুকলা থেকে পাস করেছে। খুবই আমুদে আর অস্থির। চাকরি- বাকরিতে মন বসে না। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। মুভি পাগল। আমার জন্য ৬/৭টা ডিভিডি এনেছে। আজ রাত জেগে ল্যাপটপে একটা মুভি দেখছিলাম। নেকক্রোমানটি। পুরনো দিনের জার্মান হরর ছবি।শসম্ভোগ বা নেক্রোফিলিয়ার ব্যাপারটার জন্য ছবিটা বিতর্কিত। যদিও‘কাল্ট ফিলিম’- এর মর্যাদা পেয়েছে নেকক্রোমানটি। আমি নির্জনতাপ্রিয় মুখচোরা মানুষ। ডাক্তারি করি জেলা সদরে সরকারি হাসপাতালে। নির্জন এই শহরটাও আমার বেশ ভালো লেগে। বড়োখেবড়ো হলেও ছিমছাম নির্জন পথঘাট। ঘুমন্ত দোকানপাট, ঘরবাড়ি। লাল রঙের নিঝঝুম রেলস্টেশন। শীতল সর্পিল রেললাইন। হলুদ-হলুদ সরকারি কোয়ার্টারস। প্রাচীন মন্দির। অ-দূষিত বাতাস।…মর্গটা আমার কোয়ার্টারের পিছনেই। হাসপাতালে আসতে যেতে চোখে পড়ে। একতলা হলুদ দালান। সামনে বড় সিমেন্ট বাঁধানো একটি চাতাল। চারপাশে ঘন গাছপালা। পচা পাতাভরা পুকুর। শ্যাওলাধরা দেয়াল। নাড়িকেল গাছ। তারপর রেললাইন। নিরিবিলি এই মফস্বল শহরে দিনগুলি বেশ কেটে যাচ্ছে। রোজ দু’বেলা হাসপাতালে যাই, রোগী দেখি। ধৈর্যশীল চিকিৎসক হিসেবে সামান্য নামও ছড়িয়েছে। স্থানীয় লোকজন শ্রদ্ধভক্তি করে। মাঝেমধ্যে ইশতিয়াক-এর মতন দু- একজন বন্ধুও আসে বেড়াতে। দু- একদিন থেকে চলে যায়। আমার একজন পিয়ন আছে। নাম মুখতার। মধ্যবয়েসি লোক। মিশমিশে কালো থলথলে শরীর। মুখতারকে শার্ট- প্যান্টে একেবারেই মানায় না। মাথাটা মুড়িয়ে রাখে। মাথার তালুও কালো। সেই কালো তালুর মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল। কানে ছোট্ট একটা পিতলের রিং। মুখতার সন্ন্যাস নিয়েছে কিনা বোঝা গেল না। কথা কম বলে। তবে কথাবার্তায় অনেকবারই অসংলগ্নতা টের পেয়েছি। তবে মুখতার-এর রান্নার হাত ভালো। আর বেশ বিশ্বস্ত। রাতে অবশ্য চোখ লাল থাকে তার । নেশাটেশা করে মনে হল। বাজার সদাই মুখতারই করে। মাছমাংস খায় না দেখি। মুখতার মনে হয় গৃহীসন্ন্যাসী। সকালবেলা ইশতিয়াক কে বিদায় দিতে রেলস্টেশনে এসেছি। ইশতিয়াক বেশ রোম্যান্টিক জীবন কাটাচ্ছে। ট্রেন পেলে বাসে চড়বে না। ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে রেলস্টেশন বাইরে চলে এসেছি। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। দেখলাম একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে জিন্নাত আলী দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখেই সালাম দিল। লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সে। থাকে পিছনের রেলওয়ে কলোনিতে । জিন্নাত আলী বিপত্নীক। একটি মেয়ে বাবার সংসারে থাকে । মধ্যবয়েসি মেয়ের নাম মুমতাজ। মুমতাজ রক্তশূন্যতায় ভুগছিল। মাস কয়েক আগে অবস্থা কাহিল হলে ওরই ট্রিটমেন্ট করতে গিয়েছিলাম। আমি সাধারণত স্থানীয় গরিব লোকদের কাছ থেকে ফি- টি নিইনা। জিন্নাত আলী সেটা মন
ে রেখেছে। মাঝেমধ্যে দেখা হলে সালাম দেয়। জিন্নাত আলী বলল, রিকশা নিবেন স্যার? ডাইকা দিমু? না, না। আমি হেঁটেই যাব। বিসটি ছার। অসুবিধে নেই। বলে হাঁটতে থাকি। স্টেশন থেকে আমার কোয়ার্টারটা কাছেই। বড় রাস্তায় খানিক হেঁটে বাঁয়ে মোড় নিলে কালিবাড়ির গলি। সে গলি পেরিয়ে মর্গের পিছন দিয়ে মিনিট দশকের পথ । কালিবাড়ির গলিটা বেশ সরু। গলিতে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ঝিরঝির বৃষ্টিটা থেমে রোদ উঠল। গলির বাঁ পাশে একটা কালো রঙের লোহার গেইটের সামনে দেখলাম গফুর আসকারী সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোক আমার মোটামুটি পরিচিত। ধ্যাপক। এখন অবশ্য রিটায়ার করেছেন। লোকটা বেশ অদ্ভূত। বয়স ষাটের কাছাকাছি।মাথায় টাক-টাক নেই; একমাথা ধবধবে চুল। চোখে পুরু লেন্সের কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচ বেশ ধূসর। বৃদ্ধ বেশ লম্বা আর ফরসা। স্বাস্থও ভালো। তবে মুখ কেমন ফ্যাকাশে। অ্যানিমিক মনে হয়। ভদ্রলোক আমাকে দেখে কেন যেন গেইটের ভিতরে ঢুকে যেতে চাইলেন। তার আগেই আমি সালাম দিয়ে বললাম, কেমন আছেন? গফুর আসকারী মুহূর্তেই ভোল পালটে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললেন, আরে ইয়াংম্যান যে। খবর কী? ভালো । বললাম। বলে হাসলাম। গফুর আসকারী গেইটটা খুলে বললেন, এসো এসো। বাসায় এসো। এক কাপ চা খেয়ে যও। গেইটের ওধারে ছোট্ট শ্রীহীন বাগান। বাগান মানে পেঁপে, শুপারি আর এঁটে কলার অযত্ন লালিত ঝোপ। গফুর আসকারী বিপত্নীক এবং নিঃসন্তান। দেখাশোনার জন্য আবদুর রহমান নামে একটা লোক আছে। মাস ঝয়েক আগে তারই অসুখ হয়েছিল। আমিই তখন টিট্রমেন্ট করেছিলাম। তখনই গফুর আসকারীর সঙ্গে পরিচয়। কলাঝোপের মাঝখান দিয়ে সরু পথ। তারপর একতলা লালটালির ছাদের বাংলোবাড়ি। ছোট্ট লাল মেঝের বারান্দা। বসার ঘরে সোফা কিংবা আসবাবপত্রের বদলে শ্রীহীন কাঠের তিনটে চেয়ার আর চার- পাঁচটা আলমারী। আলমারী ভর্তি বাংলা- ইংরেজি বই। গফুর আসকারী অধ্যাপনা করেছেন দর্শনশাস্ত্রে । বইয়ের এরকম কালেকশন থাকাই স্বাভাবিক। গফুর আসকারী বললেন, তুমি ঐ চেয়ারে বস। আমি একটা চেয়ারে বসতে যাব গফুর আসকারী বললেন, না, না। ডানপাশেরটায় বস । হ্যাঁ। ঠিক আছে। বস। আমি চা করে আনি। হাসি চেপে বৃদ্ধের দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম, চা আপনি বানাবেন? কেন?আবদুর রহমান কি বাসায় নাই? বৃদ্ধ বললেন, আর বলো না ডাক্তার। দেশে যাব বলে দু’দিনের ছুটি নিয়ে ছেলেটা সেই যে গেল। প্রায় দু সপ্তাহ হল-এখনও ফিরে এল না। দেখ দেকি কী কান্ড। বৃদ্ধের ফরসা মুখে অবশ্য বিরক্তির কোনও চিহ্ন দেখতে পেলাম না। ফিরে এল না? আশ্চর্য! কেন? কি ভাবে বলি বল? যাক, সে ছেলে চুলায় যাক। তুমি বস। চলে যেও না। আমি এখুনি চা তৈরি করে নিয়ে আসি। বৃদ্ধ ভিতরে চলে গেলেন। বসার ঘরে ঢুকেই কেমন পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম। ইঁদুর বিড়াল মরে পচে গেলে যে রকম গন্ধ ছড়ায়। ঠিক সেই রকম। গন্ধের উৎস বোঝা গেল না। বাগানে কিছু মরে পড়ে থাকতে পারে। বুড়োর খেয়াল নেই। ছন্নছাড়া লোকের ছন্নছাড়া সংসার। বইয়ের আলমারীতে একটা বইয়ের ওপর চোখ আটকে গেল। গ্যাবরিয়েলি উইটকপ-এর দি নেকক্রোফিলিয়াক ; একেই বলে কোইন্সিডেন্স। গতরাত্রেই নেকক্রোমানটি ছবিটা দেখছিলাম। শবদেহের প্রতি এক ধরনের যৌন আকর্ষনকে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় বলা হয়নেকক্রোফিলিয়া । এই যৌন আকর্ষনকে আমেরিকান সাইক্রিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন- এর ডাগায়নোস্টিক অ্যান্ড স্ট্রাটেস্টিটিকাল ম্যানুয়ালপ্যারাফিলিয়া বর্গের অন্তর্ভূক্ত করেছে। প্যারাফিলিয়া শব্দটি গ্রিক । এর অর্থ প্রেম। তবে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় শব্দটির মানে স্বাভাবিক উপায়ের বদলে অস্বাভাবিক বিষয়ে বা পরিস্থিতিতে যৌনবোধ জাগ্রত হওয়া। এতে ব্যক্তির আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে । মনে পড়ল কাল অনেক রাতে দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল।শবদেহের প্রতি এক ধরনের য
ৌন আকর্ষনকে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় বলা হয় নেকক্রোফিলিয়া । কেউ লাশকাটা ঘরে ওই কাজটা করে না তো? অবশ্য এমনটা ভাবার কোনওই কারণ নেই। গফুর আসকারী এক কাপ চা নিয়ে ফিরলেন। কাপ নিতে বললাম, আপনার চা কই? লাজুককন্ঠে বৃদ্ধ বললেন, চা আমি রান্নাঘরে বসেই খেয়ে এসেছি। বলেই ধপ করে কাঠের চেয়ারের ওপর বসলেন। অরেকটু হলেই উলটে পড়তেন। আগেই লক্ষ্য করেছি গফুর আসকারী বেশ মজার মানুষ । লেবু চা । চুমুক দিয়ে বোঝা গেল চিনির বদলে গুড় দিয়েছেন। আরও বোঝা গেল দর্শনের এই অধ্যাপকটি বেশ উদ্ভট আর উৎকেন্দ্রীক মানুষ। বৃদ্ধকে দেখে বরাবারই আমার বেশ খানিকটা খাপছাড়া আর উদভ্রান্ত মনে হয়েছে। চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, কাল রাত্রে অদ্ভূত এক দৃশ্য দেখলাম। কি বল তো শুনি? বৃদ্ধ ঝুঁকে পড়লেন। দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল।তখন অনেক রাত। এই ধরুন শেষ রাত। হুমম। তো? গফুর আসকারী সাহেব স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। চশমার কাঁচে কুয়াশা জমে আছে। বড় বড় দুটি কর্নিয়া দেখা যায়। তবে কাঁচ এত ঘোলা হওয়ায় তিনি দেখছেন কীভাবে তা ঠিক ভেবে পেলাম না। বললাম, না, মানে… নেক্রোফিলিয়াক কেউ হতে পারে কি? এই নিয়ে তো আপনি বেশ পড়াশোনা করেছেন দেখলাম। বলে চায়ে চুমুক দিলাম। গফুর আসকারী যতই পাগলাটে লোক হোক, চায়ের স্বাদ দারুন হয়েছে। যাওয়ার সময় রেসিপিটা জেনে নিতে হবে। বৃদ্ধ বললেন, হুমম হতে পারে। তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমন প্রবণতা অতি সাধারণ মানুষের ভিতরেও সুপ্ত থাকতে পারে। শোন একটা ঘটনা বলি। তখন আমি সোহাগপুর কলেজে পড়াই। সেই সময়টায় আমি তন্ত্র, শবসাধনা এসব নিয়ে খুব পড়াশোনা করছিলাম। বয়স কম । জানে সাহস ছিল। রাতবিরেতে শ্মশানে-গোরস্থা নে ঘুরে বেড়াতাম। ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। আমি আতকে উঠে বললাম, বলেন কী! হ্যাঁ। আমি একটা বিষয়ে আগ্রহ বোধ করলে তার শেষ দেখেই তবে ছাড়ি, বুঝলে। বুঝলাম। তা আপনি শ্মশানে- কবরস্থানে মাঝরাতে ঘাপটি মেরে বসে থাকতেন কেন? বলে ছোট্ট চুমুকে চাটুকু শেষ করে কাপটা সামনের বেতের টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। বৃদ্ধ বললেন, হাতেনাতে শবসাধকদের ধরব বলে। ধরতে পেরেছেন কখনও? আমার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগার। হুমম। একবার ধরেছি। তখন আমি সৈয়দনগর মহিলা কলেজে বদলি হয়েছি। শহরের উপকন্ঠে নদীর ধারে কবরখানা। এক মধ্যরাত্রে একটা বহেড়া গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছি। দেখি গুটিশুটি পায়ে কে যেন এসে কবরের মাটি খুঁড়তে লাগল। গিয়ে জাপটে ধরলাম। কে সে? আবদুর রহমান। আবদুর রহমান! ঠিক আছে, ধরলেন। তারপর? আমার কৌতূহল চরমে উঠেছে। ধরার পর কতক্ষণ চলল ধস্তাধস্তি। আবদুর রহমান-এর বয়স তখন এই আঠারো কি উনিশ। টেনে- হিচঁড়ে ঘরে নিয়ে এলাম। কিছুতেই বলবে না কবরখানায় কেন গিয়েছিল। সে যা হোক। ওকে ধীরে ধীরে থেরাপি দিয়ে সুস্থ করে তুললাম। এখন ও সুস্থ। তবে আবার কেন পালাল ঠিক বুঝতে পারছি না। পালিয়েছে মানে? প্রায়ই তো পালায়। পাজী, নচ্ছাড় ছেলে একটা। বলতে বলতে গফুর আসকারী হাই তুললেন । বললেন, আমার এখন ঘুম পাচ্ছে ডাক্তার। তুমি না হয় চুপটি করে বস। আমি ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিই। না। না। আমি ঘুমান। আমি এখন যাই। পরে সময় করে একদিন আসব। আর একটা কথা। ইয়ে …মানে… আপনি কি বইটই ধার দেন? বই? না,না। আমি ওই কাজটি কক্ষনো করি না। তুমি বরং অন্যকিছু ধার নাও। এই ফুলদানীটা ধার নেবে? ফুলদানী? না থাক। আমি বরং এখন যাই। বই যখন ধার দেন না। তখন গুড় দেওয়া লেবু চায়ের রেসিপিও বলবেন না। বাগান পেরিয়ে গলিতে বেরিয়ে মনে মনে হাসলাম। কিন্তু আমার হাসা উচিত নয়। আমি ডাক্তার। গফুর আসকারী এমনিতে ভালো মানুষ তবে ঐ একটু …। মর্গের পিছন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি। আবদুর রহমান পালিয়ে গেল কেন? সে গোরস্থানে কবর খুঁড়ত? কেন? কথাটা বৃদ্ধ এড়িয়ে গেলেন। কেন? বসার ঘরে পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম
। কেন? গফুর আসকারীর পাগলামী কোনও কারণে চরমে পৌঁছে যায়নি তো? রহস্য ঘনীভূত হয়ে উঠল।রহস্য যখন ঘনীভূত হয়ে উঠলই … তখন কাউকে না কাউকে তো সন্দেহ করতেই হয়।

১ম পর্ব সমাপ্ত

by ইমন জুবায়ের

নকশা – শেষ পর্ব

1

রুমাকে প্রায়ই একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে ভাবতাম। কিন্তু সে এত অল্প সময়ের জন্য আসত যে আর জিজ্ঞেস করা হত না। একদিন জিজ্ঞেস করে ফেললাম,
-‘আচ্ছা তুই যাদের জন্য চলে গেলি, তাদের কিছু করতে ইচ্ছা হয় না?’
-‘ ইচ্ছা ত হয়। কিন্তু উপায় নাই’
-‘কেন?’
-‘আমরা ত নিজ থেকে কিছু করতে পারি না। সাবজেক্ট কে দিয়ে করাই।’
-‘আমি যদি করি?’
-‘তুই পারবি না। তুই হাবলু’
-‘ না পারব। বল কি করতে হবে’
-‘ না বলব না’
এরপর থেকে রুমার জন্য আমার খুব মায়া হত। আমি ঠিক করলাম রুমার জন্য একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু কিভাবে করব তা কিছুতেই মাথায় আসছিল না। আমাকে যা করতে হবে তা তিনজনের সাথে করতে হবে। তিনজনকে একসাথে পাব কি করে? ভাবতে শুরু করলাম। মাথায় একটা প্ল্যান আসল । কিন্তু সেটা বেশ কঠিন। আমি একদিন হারুন স্যারের বাসায় গেলাম। স্যারের সাথে আমার যোগাযোগ সব সময়ই ছিল। শুনে হয়ত অবাক লাগবে যে আমি জার্মানী থেকে ফিরে আসার পর তিনি তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। স্যারকে বললাম আমাদের গ্রামে একটা ফার্মহাউজ এর ডিজাইন করেছি। কন্সট্রাকশান কাজ দেখতে যদি স্যার দয়া করে আমার সাথে গ্রামে গিয়ে একরাত থাকতেন তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। স্যার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। পরদিন সকালে একটা মাইক্রো বাসে আমি, হারুন স্যার, রশিদ স্যার, মোস্তাক স্যার আর ফিরোজ স্যার আমাদের গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দুপুর নাগাদ কন্সট্রাকশান সাইটে পৌছলাম। দোতলা ফার্মহাউজের সব কলাম আর বিম তোলা শেষ। এখন শুধু পার্টিশান ওয়াল আর ফ্লোর ঢালাই এর কাজ বাকি। সিড়ির ঢালাই তখনও শেষ হয়নি। একজন রাজমিস্ত্রী কে বলা আছে সে যেন সময় মত কাঁচা সিড়ির উপর ভুল করে একটা বালুর বস্তা ফেলে। আমরা পাঁচজন দোতলার সিড়ির নিচে গিয়ে দাড়ালাম। স্যারকে কিছুক্ষন ডিজাইন বোঝানোর পর আমি মোস্তাক স্যারের সাথে সিগারেট খাবার জন্য একটু দূরে যেতেই সিড়িটা তাদের তিনজনের উপর ধসে পড়ল। হারুন স্যারের মাথা থ্যাঁতলে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মারা গেলেন। রশিদ স্যার আর ফিরোজ স্যার হাসপাতাল পর্যন্ত পৌছতে পারলেন কিন্তু বাঁচলেন না। আমার পরিকল্পনা একশভাগ সফল হল। মোস্তাক স্যার কে সময় মত জায়গা থেকে সরাতে পেরেছিলাম, তাই কোন অঘটন ঘটেনি। এর প্রায় তিন বছর পর একদিন সকালে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের দু’জন সদস্য আমার বাসায় এলেন। তাদের সাথে সেই রাজমিস্ত্রীটিও ছিল। সিনথিয়া প্রায়ই আমার কাছ থেকে বিশ্বস্ত আর ভদ্রগোচের মিস্ত্রীদের ঠিকানা চাইত। কারন মহিলা আর্কিটেক্টের কথা নাকি তাঁরা সহজে শুনতে চায় ন। আর তাকে এই মিস্ত্রীটির ঠিকানা দিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছিলাম। রুমার ডিজাইন করা সবচেয়ে বড় নক্শাটি এখন আমার ঘরের আলমাড়িতে পড়ে আছে। নক্শাটি বাস্তবে দেখে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না তা আমি জানতাম। তাই খারাপ লাগছেনা।
তবে আমি এই নক্শাটি এমন কারও হাতে তুলে দিব যেন সে অথবা তাঁর নিকট কোন উত্তরসূরী খুব কম সময়ের মধ্যে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পাতাল পথে চলে যেতে পারে। আমার এমন কাউকে খুঁজ়ে বের করতে হবে যার স্নায়বিক চাপ দূর্বল নয়। সে যেন আমায় দেখে ততটা ভয় না পায় যতটা আমি পেতাম রুমা কে দেখে। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি একটা প্লাটফর্মের উপর। আমার চারপাশ উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। আমার পরনে সাদা কালো ডোরাকাটা পোশাক। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে, কারন এরকম কালো কাপড়ে ঢাকা তিনজন মানুষকে আমি সরিয়ে ফেলতে পেরেছি, যাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে থাকার কোন অধিকার নেই। রুমা অনেক্ষন ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমিও অধীর আগ্রহে তার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।

সমাপ্ত

-by জোবায়ের বিন ইসলাম

আমার বন্ধু রিয়ান-পর্ব-১

0

রিয়ানকে দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই প্রথম রিয়ান আমাকে না জানিয়ে কোথায় যে ডুব মেরেছে বুঝতে পারছি না। সেবার বাড়ি থেকে পালিয়ে ও যে বান্দরবান গিয়েছিলো তা একমাত্র আমিই জানতাম। আমাদের ক্লাসমেট শান্তা আর সজীবের রিলেশনের ব্যাপারটা ওদের বাসায় জানিয়ে একটা ঝামেলার সৃষ্টি করেছিলো রিয়ান,সেটাও একমাত্র আমিই জানতাম। আর সেই রিয়ান দুদিন ধরে কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় যে গেছে আল্লাহ মালুম। রাগ লাগছে আমার আবার সাথে সাথে দুশ্চিন্তাও হচ্ছে ওর জন্য। কোন ঝামেলায় পড়ে নাই তো ও। আর যদি কোথাও যেয়েই থাকে তাহলে আমাকে বললো না কেন?

কি এমন জরুরী কাজ পড়লো ?? মাঝে মাঝেই রিয়ান এমন হাওয়া হয়ে যায় তাই ওর বাবা মা তেমন দুশ্চিন্তা করছেন না ; কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কোথাও কোন বড় অঘটন ঘটেছে। ওকে মোবাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। কোন পজেটিভ নিউজ পাবো না জেনেও রিয়ানের আম্মাকে ফোন করলাম।

-অ্যান্টি রিয়ানের কোন খোজ পেলেন?

-না বাবা। জানোই তো ও বরাবরই এমন করে। দেখো ঠিকই ৪-৫দিন পর এসে হাজির হবে।

-জ্বি অ্যান্টি,তাই হবে হ্য়ত। ঠিক আছে রাখি।

অ্যান্টিকে বলতেও পারলাম না যে অন্যবারের মত নিশ্চিত মনে বসে থাকতে পারছি না আমি। কারণ এবার যে রিয়ান আমাকেই কিছু বলে যায় নাই। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছি শেষ কখন,কি কথা বললাম রিয়ানের সাথে। হ্যা মনে পড়েছে,রিয়ান সেদিন রাতে রাস্তা দিয়ে হাটছিলো যথারীতি অন্যান্য দিনের মত। রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা ওর শখ। হাটতে হাটতে আমাকে ফোন করেছিলো,কথা বলছিলাম দুজন।

হঠাৎ রিয়ান “পরে ফোন দিচ্ছি” বলেই কলটা কেটে দিলো। ব্যস এইটুকুই। তারপর থেকেই ওকে ফোনে আর পাওয়া যাচ্ছে না। ধ্যাত কারেন্ট চলে গেলো। মোমবাতি জ্বালিয়ে ড্রইংরুমে এসে বসলাম। আব্বা আম্মা গেছেন ছোটমামার বাসায়। কখন আসবেন ঠিক নেই। ওহ এত গরম লাগছে কেন আমার। এখন তো শীতকাল!! যদিও শীতের মাত্রাটা কম,কিন্তু গরম লাগার কথা না।ভাপসা গরমের সাথে পোড়া পোড়া গন্ধও পাচ্ছি। মনে হচ্ছে বাথটাবে বসে থাকি। দরজায় নক করার আওয়াজে চিন্তায় ছেদ ঘটলো। কিন্তু কলিং বেল না বাজিয়ে দরজায় নক করছে কোন বেকুব। একটু বিরক্তি নিয়েই দরজা খুললাম। রিয়ান দাড়িয়ে বাইরে!! কোন কথা না শুনে গালাগাল শুরু করলাম ওকে। “কোথায় ছিলি? আর কাউকে নাহোক আমাকে তো বলে যেতে পারতি। কারো কেয়ার তো তুই কখোনোই করিস নাই,ভাবতাম আমার জন্য একটু হলেও দরদ আছে তোর। কিন্তু না,আমাকেও অপ্রয়োজনীয় মনে করিস তুই। এখন আর চুপ করে দাড়িয়ে না থেকে ভিতরে এসে বোস। বলে আমিই আগে ঘরে ঢুকলাম। সোফায় বসতে যেয়ে দেখলাম রিয়ান ঘরে ঢোকেনি। দরজায় তাকিয়ে দেখলাম সেখানে কেউ নাই। আরে একটু আগেও তো রিয়ান ছিলো এখানে। ভীষণ রাগ লাগলো আমার। রিয়ান কি শুরু করেছে এসব। “দরজা খুলে রেখেছিস কেন?” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাবা বললেন।“না মানে…” বলতে যেয়েও চেপে গেলাম। বাবা মা পছন্দ করেন না,আমি রিয়ানের সাথে মিশি। কারন রিয়ান আগে ড্রাগ এডিক্ট ছিলো কিন্তু এখন ও পুরাপুরি সুস্থ, কিন্তু সেকথা বাবা মাকে কে বোঝাবে? চুপচাপ নিজের ঘরে চলে আসলাম। তাহলে কি বাবা মা কে দেখেই রিয়ান চলে গেল। বাবা মা থাকলে ও বাসায় আসে না।ও জানে বাবা মা চান না আমি ওর সাথে মিশি। রাগ কিছুটা কমে গেল আমার। কিন্তু রিয়ান এত চুপচাপ ছিলো কেন? ৫ মিনিট ধরে আমি এতগুলো কথা বললাম্, ও না উত্তর দিলো না নিজে থেকে কিছু বললো। তবুও আশ্বস্ত হলাম এটা চিন্তা করে ও ফিরে তো এসেছে। খুশী হলাম অনেক্,রিয়ান কে ছাড়া আমিও যে অচল। রাতের খাবার খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম। অনেক সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। নাস্তা খেয়ে ভার্সিটিতে যাবো বলে ফোন দিলাম রিয়ানকে। ফোন বন্ধ। ফাজিলটা নিশ্চই ফোনে চার্জ দেয়নি। আন্টির মোবাইলে ফোন করলাম। আমি হ্যালো বলতেই আন্টি বললেনঃ “ কি বাবা রিয়ানের কোন খোজঁ পেলে?”

আন্টির কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম। রিয়ান কি তবে বাসায় যায়নি? কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলাম। রিয়ান কি শুরু করেছে এগুলো? কাল রাতে দেখা হলো আমার সাথে ,এখন আবার লাপাত্ত্বা। এই ছেলের কপালে যে কি আছে আল্লাহ জানে। এতই বেশি রাগ লাগছে আমার যে মনে হচ্ছে রিয়ানের সাথে যোগাযোগ করাই বন্ধ করে দেই। আর ওকে ফোন দিবো না ডিসাইড করলাম। একাই রওনা দিলাম ভার্সিটির দিকে। সন্ধায় বাসায় ফিরে শুনলাম বাবা দেশের বাড়িতে যাবেন বলে ঠিক করছেন। আমরাও যাবো সাথে,৫ দিন পর ঢাকায় ফিরবো। আমার ঢাকার বাইরে যেতে ভালো লাগে না কিন্তু বাবার উপর কথা বলার সাহস আমার নেই। পরদিন অনেক সকালে আমরা রওনা হলাম বাগেরহাটের পথে। পৌছালাম বিকাল ৩টায়। খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই ঘুরতে বের হলাম। ছোট্ট একটি মফস্বল শহর বাগেরহাট কিন্তু খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। রাস্তা ঘাট চিনি না কিন্তু তবুও হাটতেই থাকলাম। দড়াটানা নদীর তীরে যেতেই এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে গেলো। চুপচাপ এক গাছের নিচে বসেই সারাবিকেল পার করে দিলাম। শেষ বিকেলের লালচে কালো আভাটুকুও মিলিয়ে গেলো নদীতে তবুও বসে রইলাম মনোমুগ্ধের মত। ঠান্ডা বাতাসে গায়ে রীতিমত কাঁপন ধরে গেলো।সকাল থেকে এত ব্যস্ত ছিলাম যে রিয়ানের ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। এখন মনে পড়ে গেল। নতুন করে ভাবনাগুলো এসে একসাথে ঘিরে ধরলো আমায়। খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো আমার;অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে উঠে দাড়ালাম। ওহ! হঠাৎ করে এত গরম লাগছে কেন? এত গরমে মানুষ জামা কাপড় পড়ে থাকে কিভাবে;আমি আবার পড়েছি ফুল স্লীভ টি-শার্ট। মনে হলো একটানে শার্ট খুলে ফেলি।চুপচাপ হাটতে থাকলাম।একটু সামনে হেটে আসতেই মনে হলো দূরে কেউ গাছের নিচে কেউ বসে আছে। যে কেউ বসে থাকতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমার কেন জানি ভীষন অস্বস্তি লাগতে লাগলো।কারণ যে বসে আছে তার বসার গড়ন আমার খুব পরিচিত,তার চুলগুলোও লম্বা;ঠিক যেন রিয়ানের মত। ওটা রিয়ান না তো ?? মনে হলো সেও আমাকে দেখছে। হাটতে হাটতে ছেলেটির কাছে চলে আসলাম আমি। যা ভেবেছি ঠিক তাই।রিয়ানই!! কিন্তু ও এখানে কি করছে? আমি বেশ রাগান্বিত হয়েই ডাকলাম “রিয়ান!” রিয়ান খুব আস্তে,খুবই আস্তে উচ্চারণ করলো “স্বাধীন আমাকে সাহায্য কর” আমি অবাক হয়ে গেলাম ওর গলার স্বর শুনে।রিয়ানের ভয়েজ তো এমন কখনোই ছিলো না।এতই আস্তে এবং ফ্যাসফ্যাসে গলা যে ও কি বললো তা বুঝতে আমার কিছুটা সময় লাগলো।কি বলবো ঐ মূহর্তে ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ আমার কাঁধে হাত রাখলো। ফিরে দেখি একটা লোক। আমাকে তাকাতে দেখে জিজ্ঞেস করলো “ভাই কি শহরে নতুন?” “না,আমার দাদাবাড়ি এখানে। কিন্তু আমরা ঢাকায় থাকি” “তাইলে ভাইজান একটা কথা কই,এই জায়গা খুব একটা সুবিধার না।বাড়িত যান,এইখানে খাড়াবার দরকার কি ? শীতের রাইত, লোকজন কম,কি হয় কওয়া যায় না।” এটুকু লোকটা হাটা শুরু করলো। রিয়ানের দিকে ঘুরতেই দেখি ও নেই। নদীর পাড়ে যতটুকু চোখ যায় দেখি শুধু লোকটি হেটে যাচ্ছে আর আমি দাড়িয়ে আছি।হাওয়ার মিলিয়ে যাওয়ার মত এত তাড়াতাড়ি রিয়ান গেলো কোথায় ?? একটু একটু ভয় লাগলো আমার। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম রিয়ান আমাকে কিছু বলতে চায়;বলার জন্যই আসে আমার কাছে কিন্তু সামনে থাকলে চলে যায়।রিয়ান জানলোই বা কিভাবে আমি এখন বাগেরহাটে।আগে তো ও কখনো আসে নাই এদিকে!!ও জানতো আমার দাদাবাড়ি বাগেরহাটে,কিন্তু ঠিক এখানে আসলেই যে আমাকে এখন পাওয়া যাবে তা তো রিয়ানের জানার কথা না!! খাপে খাপ মিলাতে পারলাম না আমি। মাথা ঘুরতে লাগলো;বাড়ির দিকে রওনা হলাম আমি।এত ঠান্ডা লাগছে যে গরম কাপড় পড়ে বের হলাম না কেন ভাবছি। একটা কথা খেয়াল করা মাত্রই আমার গাঁ শিরশির করে উঠলো। ঢাকায় আমার বাসায় যেদিন রিয়ান এসেছিলো ঔদিন ঠান্ডার মাঝেও অস্বাভাবিক গরম লেগেছিলো আমার এ
বং আজও লাগলো। রিয়ান চলে যাবার পর আবার ঠান্ডা লাগা শুরু করলো!!এমন কেন হলো? রিয়ান কি তবে অশরীরী কিছু একটা??আর কিছু ভাবতে পারলাম না ঠান্ডার মধ্যে ভয়ে শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো।

 

রোদেঁশী

১ম পর্ব সমাপ্ত