ডাকিণী (১৫তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আলেস ডায়ারীর প্রথম পাতায় নিজের পরিচয় দিয়েছে। তারপর স্বাভাবিক দিনপঞ্জিকা। তারপর তার জীবনে মার্টিনীর আগমন। অতপর মার্টিনীর বিদায়। সবশেষে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষনা ও কপালে আংটির ছ্যাকা প্রদান। ডায়ারী থেকে এটা নিশ্চিত যে আলেস এবং মার্টিনীর মৃত্যু সামান্য কদিনের ব্যবধানে একই ভাবে অর্থাৎ ফাঁসিতে ঝুলে হয়েছিলো। তারমানে আলেস যদি ভুত হয়ে গিয়ে থাকে তবে সম্ভবত মার্টিনীর ও একই পরিণতি হয়েছে। আর ওর কপালে দেয়া আংটির দাগটা নিছক যন্ত্রনা প্রদানের জন্যে দেয়া হয়নি। ওর ডায়ারীতে এ দাগকে ডাইনী চিহ্নিতকারী চিহ্ন হিসাবে উল্লেখ করেছে। তারমানে কেবলমাত্র ডাইনীদের কপালেই এভাবে ছ্যাকা দেওয়া হতো। অন্যকোন অপরাধীকে নয়।
প্রাচীন পুরাতত্ত্ব (Anthropology) এর একটা বইতে পড়েছিলাম প্রাচীন ফারাও সম্রাটরা তাদের মৃত্যুর পর সমাধিস্থ করার জন্যে জীবদ্দশায়ই পিরামিড বানাতেন। তাদের মৃত্যুর পর সমাহিত করার সময় ধন রত্নের সাথে অনেক জীবন্ত দাস দাসীকেও জীবন্ত কবর দেওয়া হত। কবর দেয়ার পুর্বে তাদের বুক পীঠ ও শরীরের অন্যান্য অংশে দাসত্বের বন্ধন হিসেবে খাঁজকাটা উত্তপ্ত ধাতব পিণ্ড দিয়ে ছ্যাকা দেয়া হতো। অতপর সেই ধাতব পিণ্ডটা সম্রাটের মুকুটে এটেঁ দিয়ে সেটা মাথায় পরিয়ে মৃতদেহকে গোপন কক্ষে সমাহিত করতো। ফারাওরা নাকি বিশ্বাস করতো এসব পুড়া দাগ দাসদাসীদের আত্মাকে পরলোকে পাড়ি জমানো থেকে বিরত রাখবে এবং ঐ ধাতব পিণ্ডটা মাথায় থাকার দরুন মৃত সম্রাট সেসব দাসদাসীদের আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন।
আমার ধারণা আলেসের কপালে ঐ আংটির ছ্যাকাটাও সে ধরনের একটা বিশ্বাস থেকেই দেয়া হয়েছিলো। ঐ শয়তান প্রিস্টটা জানতো সে চিরকাল বেঁচে থাকবে না। একটা সময় তাকে মৃত্যুবরণ করতেই হবে। কিন্তু ও যদি মৃত্যুর পর মহাযাত্রায় সামিল হয় তবে তাকে জীবদ্দশায় কৃত অপরাধের জন্যে নির্ঘাত নরকে চরম শাস্তি পেতে হবে। তাই সে জীবদ্দশায়ই তন্ত্র মন্ত্র খাটিয়ে মৃত্যুর পর তার মহাযাত্রাকে থামানোর আয়োজন করে। মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে সুখকর ও যৌনসম্ভোগময় করার জন্যে সে ফারাওদের বানানো ধাতব পিন্ডের আদলে একটা জাদুকরী আংটি বানিয়ে নেয়। সেই আংটির বৈশিষ্ট্য ছিলো এটা দ্বারা যার কপালেই ছ্যাকা দেয়া হবে তার আত্মাই মৃত্যুর পর এই আংটির মালিকের দাসে পরিণত হবে। শুধু আলেস আর মার্টিনী নয়। জীবদ্দশায় শতশত মেয়েকে সে ডাইনী অপবাদ দিয়ে মৃত্যু দন্ডে দণ্ডিত করে। মৃত্যুর পুর্বে তাদের সবার কপালেই সে আংটির ছ্যাকা দেয় যেন মৃত্যুর পর তারা সবাই তার যৌনদাস (Sex slave) এ পরিণত হয়। অবশেষে প্রিস্টের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তাকে আংটি সহ কবরস্থ করে। ওর সাথে সাথে শতশত অভাগা ডাইনিদের আত্মাও তার কবরে আটকা পড়ে দাসী হিসেবে। এতগুলি বছর ধরে সে মেয়েগুলির আত্মাকে ভোগ করে আসছে। তাদের মধ্যে থেকে মাত্র একজন সেই দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো। সে আর কেউ নয়, আলেস। তার কারণ আলেস বেসমেন্টে বন্দি থাকতে এক অসাধারণ কাজ করেছিলো যা অন্য মেয়েগুলি করেনি। তার প্রাত্যহিক স্মৃতিগুলিকে বাইবেলে লিপিবদ্ধ করা। তার এই স্মৃতির টানে সে প্রিস্টের বন্দিত্বের শৃঙ্খলকে উপেক্ষা করতে পেরেছিলো। তাইতো সে প্রিস্টের সাথে একই কবরের ভেতরে থাকার পরিবর্তে এই কটেজে পড়ে আছে। কিন্তু ওর সম্পূর্ণ মুক্তি এবং পরপারে যাত্রার জন্যে সেই আংটিটা প্রয়োজন। ওটা ধ্বংস করতে পারলেই আলেস সহ বাকিসব আত্মাগুলি মুক্তি মিলবে।
আমাকেই ঐ আংটিটা জোগাড় করে আনতে হবে। অন্তত আলেস তাই চায়। সেজন্যেই ঐদিন আমি যখন টবে পা বেধে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছিলাম, তখন কৌশলে আলেস স্বপ্নের মাধ্যমে আমায় প্রিস্টের কবরটা দেখিয়ে দিয়েছিলো। তারপর বাথরুমে আয়নায় ফুটে উঠা লেখা আর দুঃস্বপ্নের মাধ্যমে সে আমায় ওটা উদ্ধার করার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু আমি সেসব ইঙ্গিত অনবরত উপেক্ষা করায় সে ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে একরাত বেসমেন্টে আটকে রাখে। সেরাতে আমি বেসমেন্টে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে সে আমায় তার জীবনের শেষ পরিণতিটা দেখিয়ে দেয়।
এভাবেই ও আমায় একের পর এক বার্তা দিয়ে যাচ্ছিলো আর আমি সেগুলি উপেক্ষা করে ভাবছিলাম ও আমায় ভয় দেখাতে চাইছে। অতপর আজ যখন আলেসকে তাড়ানোর জন্যে আদিনকে কটেজে নিয়ে আসি তখন স্বাভাবতই আলেস খুবই মর্মাহত হয়। কুয়োর কাছে আদিনের আক্সিডেন্ট, আলেসের প্রভাবযুক্ত কক্ষে আদিনের বই জ্বলে যাওয়া ইত্যদির মাধ্যমে আলেস তার ক্ষোভের প্রকাশ ঘটায়।
যাক তাহলে। এতদিন পর আমি আলেসকে বুঝতে শিখলাম। অশরীরী আলেসের হৃদয়ের ভাষা সত্যিই চমৎকার। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সব কিছুর বিনিময়ে হলেও আমি আলেসকে এখান থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করব। আমি যাব সেই খ্রিস্টান গোরস্তানে, প্রিস্টের কবর খুঁড়ে সেই আংটিটা নিয়ে আসতে।
(চলবে)

ডাকিণী (১১তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
(১০ম পর্বের পর থেকে)
ভয়ে চিৎকার এক সময় মনে হল গলা ফেটে রক্ত বেরুবে। নাহ। এভাবে মাথা গরম করলে এখান থেকে বেরুনো যাবে না। আলেসের মতো সারা জীবনের জন্যে এখানে আটকে পড়বো। মায়ের উপদেশগুলি মনে পড়লো। বিপদে মাথা ঠান্ডা না রাখলে ঘাড়ের উপর মাথাটা আস্ত থাকবে না। ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম। একটা সময় ভয়, উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে এলো। স্থির হয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কয়েকটা গুরুতর ভুলের কারণে আমি এখানে আটকে গেছি। প্রথম ভুল হলো আলেসকে বিশ্বাস করা। ওকে বন্ধু ভাবা। একটা অশান্ত আত্মা কখনোই কারো বন্ধু হতে পারে না। আমার কোনভাবেই আলেসের ডাকে সাড়া দেয়া উচিৎ হয়নি। ওর ডায়ারী মতে একাকীত্বই ওকে ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের থেকেও বেশী কষ্ট দেয়। তবে কি ও আমাকে মেরে ওর মতোই অশরীরী বানিয়ে নিবে, কেবল ওকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে! মনে পড়লো একবার টিভিতে একটা রিয়ালিটি হরর শো তে এক প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বলেছিলো যে ভয় হলো কালো-আত্মার প্রধান অস্ত্র। ওদের নাকি আকার আকৃতি, স্থিতি-জড়তা নেই। তাই ওরা কাউকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে না। কিন্তু ওরা শিকারকে ভয় দেখাতে থাকে যতক্ষণ না ভিক্টিম অতিরিক্ত ভয়ে হার্ট আটাক বা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার মতো আত্মঘাতী কিছু একটা করে বসে। ওদের ভয় না পেলেই ওদের হাতে মৃত্যুর আশংকা বুঝি ৯৯ ভাগ কমে যায়। আমি কখনোই টিভিতে দেখানো উদ্ভট কোন কিছু বিশ্বাস করি না। তবে এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে বিশ্বাস না করে উপায় নেই। মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলাম আজ যদি এখানে মরতেই হয় তো ভয়হীন ভাবে নিজের আত্মসম্মান নিয়েই মরবো। আলেসের ভয়ে ভীত হয়ে হার্ট ফেইল করে মরবো। চিৎকার করে বললাম, “আলেস। তুমি হয়তো আমায় মেরে ফেলতে পারবে কিন্তু ভয় দেখাতে পারবে না।” বদ্ধ বন্দিশালায় আমার চিৎকার প্রতিধ্বনি তুললো।
ভয় তাড়ানোর জন্যে মেঝেতে বসে বসে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলাম। কখন যে চোখ জুড়িয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। যখন চোখ খুললাম তখন দেখলাম সিড়ির খোলা মুখ দিয়ে চুইয়ে দিনের আলো ঢুকছে! আমি কালকের ভয়ঙ্কর রাতটা উৎরে গেছি। ওয়াও! আমি এখনো বেঁচে আছি! কিন্তু রাতে কিসে আমার সেলের দরজা আটকেছিলো! ভাবতেই উঠে গিয়ে সেলের দরজাটা পরীক্ষা করলাম! আশ্চর্য! দরজায় বাহিরে থেকে একটা বিশাল তালা ঝুলছে! তারমানে গতরাতে যখন আমি যখন সেলে প্রবেশ করি তখনই কেউ একজন আমাকে বাহিরে তালা মেরে আটকে দেয়! কিন্তু কে সেটা! আলেস? মনে হয় না। লাইব্রেরীতে বেশ কয়েকবারই আলেস আমায় ভেতরে রেখে দরজা আটকে দিয়েছিলো। কিন্তু তখন তো ওর তালার প্রয়োজন হয় নি! কিন্তু এখন দরজায় তালা ঝুলানো কেন! অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেলো এটা কোন মানুষের কাজ! আশেপাশে মানুষ থাকতে পারে ভাবতেই নিজের কাপড় চোপড় নিয়ে সচেতন হয়ে উঠলাম। মনে পড়ে গতরাতে গোসল শেষে একটা তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়েছিলাম আমি। কিন্ত ওটা এখানে আটকে পড়ার পর একটা শক্তিশালী দমকা হাওয়ায় উড়ে যায়। কিন্তু ওটা এখন কোথায়? চারিদিকে খুঁজাখুঁজি করেও আমি সেই সাদা তোয়ালেটা খুজে পেলাম না। তবে সেলের কোনে বাদামি রঙের তালি মারা ছেড়া এক প্রস্থ কাপড় পেলাম। অগত্যা সেটাই জড়িয়ে নিলাম দেহে। তখনই আমি কতগুলি ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। ওরা সিড়ি ভেঙ্গে এদিকেই এগিয়ে আসছে! নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলাম কারা ওরা? কি চায় ওরা আমার কাছে? কিন্তু উত্তরটা আমার জানা নেই।
কারাগারের শিকের ওপাশে বিচিত্র বেশভূষার কতজন বিশালদেহী পুরুষ এসে উপস্থিত হল। আশ্চর্য ব্যাপার হল ওদের সবার দেহ ভারী বর্মাবৃত, আর হাতে বেঢপ লম্বা তরোয়াল। তবে এদের মধ্যে একজনের হাতে তরোয়ালের বদলে ঝিলিক দিচ্ছে লকলকে সাপের চামরার চাবুক! এই বন্দুকের যুগে এদের এহেন অস্ত্র সস্ত্র দেখে আমার নিতান্তই হাসি পেল। মনে মনে ভাবলাম ইশ, আমার ডেজার্ট ঈগলটা (আমার লাইসেন্স করা পিস্তল) এখন যদি হাতের কাছে থাকতো তো সবকটার পায়েই একটা করে বিচি ঢুকিয়ে দিতাম। আমাকে সারারাত এখানে আটকে রাখার জন্যে এটাই হতো ওদের উচিৎ শিক্ষা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। পিস্তলটা আমি আমার বেডরুমে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে ফেলে এসেছি। ওদের তিনজনের মধ্যে তলোয়ারওয়ালা দুজন বাহিরে দাড়িয়ে রইলো। আর চাবুকওয়ালাটা আমার সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। তারপর সোজা আমার দিকে এগিয়ে এসেই সপাৎসপাৎ দু ঘা বসিয়ে দিলো। আমার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। কোথায় মেরেছে জানি না কিন্তু সারাটা শরীর জ্বলতেছে। আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাড়ালাম। লোকটা আমার চুল ধরে টানতে টানতে সেল থেকে বের করে সিড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যেতে লাগলো। ওদের এহেন ব্যবহারে আমি চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম। মহিলাদের প্রতি এতটুকু মর্যাদাবোধ বা সৌজন্য এদের মধ্যে নেই। সিড়ি বেয়ে যতই উপরে উঠছি ততই একদল মানুষের সম্মেলিত শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। ওরা আমায় কটেজের কাঠের সিড়ি ধরে একদম ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে গিয়ে দেখলাম এক ঝাক মানুষ নিচে জড়ো হয়েছে! আমার কটেজে এরা ঢুকলো কি করে! আমি যখন বিষ্ময়ে উপস্থিত জনতাকে দেখছিলাম তখনই চাবুকওয়ালাটা এসে আমার হাত দুটো পিছ মোড়া করে বেধে দিলো। কি হচ্ছে এসব! বিষ্ময় আর ভয়ে নুয়ে পরার উপক্রম। এবার দু তলোয়ারওয়ালা আমার দুপাশে এসে, দু কাঁধ শক্ত করে ধরলো। এত শক্ত যে মনে হলো শোল্ডার জয়েন্ট গুঁড়ো হয়ে যাবে। ওদিকে চাবুকওয়ালাটা ছাদে একটা খাম্বার সাথে বাধা দড়ি এনে আমার গলায় ফাঁস পড়িয়ে দিলো। হায় খোদা! এরা কি আমায় ফাঁসি দিতে চলেছে? তলোয়ারওয়ালা দুজন আমার কাঁধ ধরে ঠেলতে ঠেলতে ছাদের কিনারায় নিয়ে গেল। উপস্থিত জনতা প্রবল হর্সধ্বনি দিয়ে আমার আসন্ন মৃত্যুকে স্বাগত জানালো। আমি মা কে শেষবার দেখার জন্যে হৃদয়ে এক প্রবল আকুতি অনুভব করলাম। জীবনে কতই না দুঃখ দিয়েছি মাকে। মা আমাকে যে কাজটাই নিষেধ করতো সেটাই আমি প্রথমে করতাম। মায়ের অবাধ্য হওয়াটাই আমার কাছে একটা থ্রিল ছিলো। কিন্তু তবুও মা একটু রাগ করলেও পরক্ষণেই খুকি বলে আমায় জড়িয়ে ধরতো। মায়ের মিষ্টি চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ একজন আমায় ছাদের উপর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলেছে। কিন্তু একদম মাটিতে আছড়ে পরার বদলে আমার গলায় পড়ানো দড়িটিতে আমি ঝুলতে লাগলাম! হায় খোদা! এরা আমায় ফাঁসি দিয়ে দিচ্ছে! আমি মারা যাচ্ছি! বাতাসের অভাবে ফুসফুসটা যেন ফেটে যাবে! হৃদপিণ্ডটা ধীরেধীরে থেমে আসছে। অনুভব করলাম সারা শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়েছে। ব্যাথার অনুভুতিগুলি আস্তে আস্তে ভোঁতা হয়ে এলো। নিঃসীম কালো আধার চোখ দুটোকে ঢেকে দিলো।
(চলবে)

ডাকিণী (৯ম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

(৮ম পর্বের পর থেকে)

সেরাতে তিনটে বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। প্রথমে দেখলাম আমি অফিস শেষে গাড়িতে করে প্রতিদিনের মতোই আমার কর্টেজে ফিরছি। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে হেঁটেহেঁটে কর্টেজের দিকে আসছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আমার কটেজের ছাদ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে বাথরুমের আয়নায় দেখা সেই মেয়েটা ঝুলে আছে। তার ঘাড় ভেঙ্গে একপাশে বেঁকে আছে। হা করা মুখটা আমার দিকেই ফেরানো। নিষ্প্রাণ চোখ দুটো আমারই দিকে অপলক চেয়ে আছে। হায় হায়! আমার কটেজে একটা মরা লাশ ঝুলছে! আমি ভাবতে শুরু করলাম এটা কে নিয়ে কি করা যায়। পুলিশে ফোন দিবো না কি বিশাল কটেজের কোথাও গর্ত করে পুঁতে দিবো। কিছুই বুঝতে পারছিলাম নাহ। তখনই লাশটা আমার দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত হাসি দেয় এতে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। ওর চোখ দুটো যেন জ্বলছিলো! আমি ভয় পেয়ে কটেজ থেকে দৌড়ে পালাতে শুরু করি। দৌড়াতে দৌড়াতে যখনই কুয়ার পাশ দিয়ে প্রধান ফটকের কাছে চলে আসি তখনই আমার পথ রোধ করে একটা অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জলিত হয়। আমি বিষ্ময়ে দু পা পিছিয়ে আসে। অগ্নিকোণ্ডে সুষ্পষ্ট দেখলাম একটা লাশ পোড়ানো হচ্ছে। আমি বাংলাদেশে থাকতে বেশ কয়েকবার শশ্মান ঘাটে লাশ পুড়াতে দেখেছি। তাই ব্যাপারটা এতটা ভয়াবহ লাগল নাহ। কিন্তু লাশটা কার? মনে কৌতুহল নিয়ে আমি অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি গেলাম। কাছে যেতেই পুড়তে থাকা লাশটা হঠাৎ দাড়িয়ে গেল। লাশটার ঘাড়টা ছিলো পেছনের দিকে বাঁকানো! বুঝতে বাকি রইল না এটা সেই মেয়েটার লাশ যাকে আমি খানিক আগে আমার কটেজের ছাদে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখেছি। ভয়ে আমি জমে কাঠ হয়ে গেলাম। পা দুটোর সাথে যেন কয়েক মন ওজনের পাথর আটকে দেয়া হয়েছে! একসময় পুড়তে থাকা লাশটা চিৎকার করে উঠলো! লাশটার আর্তচিৎকারে আমি হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেলাম। বুঝলাম আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে। তাই ঘুরেই কটেজের দিকে ফিরে দৌড় দিলাম। কিছুদূর যেতেই কতগুলি হাত আমায় ঝাপটে ধরলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম কতগুলি কালো আলখাল্লা পরিহিত লোক আমাকে ধরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি এই ছোটাছোটিতে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে ওদের বাঁধা দিতে পারলাম নাহ। ওরা সিঁড়ি বেয়ে আমায় কটেজের ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে পৌছতেই ওরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে হাত পা বেধে দিলো। আমি কটেজের ছাদ থেকে মাটির দিকে মুখ করে ঝুলছি। নীচে আমি একদল অপেক্ষমান জনতাকে দেখতে পেলাম, কিন্তু এদের কাউকেই আমি চিনি নাহ। অতপর আমি শুনলাম কে যেন চেঁচিয়ে বলছে “তিন তিনজন মানুষ খুনের অপরাধে তোমাকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। অতপর এক বিশ্রী চেহারার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা, সাদা আলখাল্লা পরিহিত এক মাঝ বয়সী লোক এসে আমায় কষে থাপ্পড় মারলো! আমি ব্যাথায় কেঁদে ফেললাম। চারপাশে তখন হাসির রোল উঠলো। তারপর দেখলাম লোকটা তার হাতের কড়ে আঙ্গুল থেকে বিচিত্র নকশা খচিত আংটি খলে নিয়ে একটা ধাতব শিকে ঝুলিয়ে জ্বলন্ত গনগনে কয়লার উপর বসিয়ে গরম করতে লাগলো। আলেসের ডায়ারীটা পড়া থাকায় আমি বুঝতে পারলাম এখন কি হতে যাচ্ছে। ওই লোকটা আংটি গরম করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিতে যাচ্ছে। আতংকে আমার হাত পা অসার হয়ে আসলো। দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে আমি হাত পায়েবাঁধন খুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যতই চেষ্টা করছি দড়ির বাঁধন গুলি যেন মাংস কেটে আরো গভীরে বসে যাচ্ছে। এরই মধ্যে উত্তপ্ত আংটি টকটকে লাল হয়ে গেছে। লোকটা আংটা দিয়ে সেটা ধরে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সবকিছুই যেন স্লোমোশনে হচ্ছিলো। যেন অনন্তকাল লাগলো লোকটার দশ কদম হেটে আমার কাছে পোঁছাতে। অতঃপর লোকটা গরম আংটিটা বাগিয়ে ধরলো আমার কপাল বরাবর। ওটা ধীরেধীরে এগিয়ে আসছে, আরো কাছে! আমি যতটা সম্ভব মাথাটা পেছনে হেলিয়ে ওটার কাছ থেকে যতটা সম্ভব দুরে সরে যেতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু লোকটা শেষ পর্যন্ত আমার নাগাল পেয়ে গেলো। উত্তপ্ত আংটিটা ও ঠেসে ধরলো আমার কপালে। আমি এতদিন জানতাম মানুষের স্বপ্নের কোন রং থাকে নাহ। স্বপ্নে মানুষ স্পর্ষ, ব্যাথা অনুভব করে নাহ। কিন্তু গতরাতের স্বপ্নে আমি গনগনে কয়লার টকটকে লাল রঙ দেখেছি। তারপর লোকটা যখন ওটা আমার কপালে ঠেসে ধরলো তখন মনে হলো আমার কপালে একটা বুলেট ঢুকছে। এটা যেন আমার কপাল পুড়িয়ে হাড় ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে! এত্ত বেশী যন্ত্রনা হচ্ছিলো যে আমি ঘুমের মাঝে চিৎকার করে উঠে বসলাম। যাক বাবা। একটা ভয়াবহ স্বপ্ন থেকে বাঁচা গেলো। আজ ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেছে! আজ অফিসে যে কি হবে। লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠেই তৈরি হয়ে অফিসপাণে ছুটলাম। তাড়াহুড়োয় নাস্তা করতে ভুলে গেলাম। অফিসে পৌছাতে পৌছাতে আধা ঘন্টা দেরি হয়ে গেল। যে অফিসের প্রধান নির্বাহীই অফিসে আসতে আধাঘণ্টা দেরি করে সে অফিসের ভবিষ্যৎ তো শুধুই অন্ধকার। সবার সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে হাটতে হাটতে নিজের অফিসে গিয়ে বসলাম। আমি এসব আর সইতে পারছি নাহ। আলেসের ব্যাপারটা একটা এসপারওসপার করতেই হবে আমাকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এসব উদ্ভট স্বপ্ন গুলির পেছনে নিঃসন্দেহে ওর হাত আছে। কিন্তু আমাকে এসব দেখিয়ে ওর লাভটা কি? প্রকৃতপক্ষে ও কি চায় আমার কাছ থেকে? ও কি সত্যিই বন্ধুপ্রতিম? নাকি বন্ধুত্বের নাম ভাঙ্গিয়ে ও আমার উপর ভর করে এই জীবন্ত জগতে ফিরে আসতে চায়? আমি কিছুই জানি না। এতগুলো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমি কিছুতেই অফিসে মনযোগ দিতে পারলাম না।
আজ অফিসের সময়টা যেন খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল। অফিস ছেড়ে আমার কর্টেজে ফিরতে কেমন জানি ভয়ভয় করছে। কেন জানি মনে হচ্ছে আমি ওখানে নিরাপদ না। ওখানে আজ রাতে বাজে কিছু হতে চলেছে। গতরাতের ভয়াবহ স্বপ্নটা যেন তারই আগামবার্তা বহন করছিলো।
আজ বাহিরে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম। সাধারণত আমি বাহিরে খাই না। তবে আজ অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না বলে এভাবে খানিকটা অতিরিক্ত সময় বাহিরে কাটালাম। অতঃপর নিজের মনকে অনেক কিছু বলে প্রবোধ দিয়ে কটেজের পথ ধরলাম। ফিরতে ফিরতে সূর্যাস্ত হয়ে গেল। গুধুলির আধারে কটেজটা সেই অভিশপ্ত গীর্জার অবয়ব ধারণ করলো। মনের মধ্যে চাপা দেওয়া ভয়টা আবার ফিরে এলো। গ্যারেজে গাড়িটা পার্ক করে কটেজের দিকে হাটা শুরু করলাম। হাটতে হাটতে হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগলো কি হবে যদি গতরাতের স্বপ্নটা এখন সত্যি হয়ে যায়? যদি ওখানে গিয়ে দেখি ছাদ থেকে একটা মরা লাশ ফাঁসিতে ঝুলছে! কটেজের ছাদের দিকে তাকালাম। এতদুর থেকে গুধুলির অধাঁরে কিছুই দেখতে পারলাম না। সত্যি সত্যিই ঝুলছে কি না তা নিশ্চিত হতে আমাকে কটেজের আরো কাছে যেতে হবে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা হাতুড়ি পিটাচ্ছে। আমি এলো মেলো পদক্ষেপে কাপাঁ কাপাঁ পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি সেই অভিশপ্ত কটেজটার দিকে।

 

ডাকিণী (৮ম পর্ব)

2

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি শেষ করে বিড়বিড় করে বললাম, হায় আলেস। এসব বিচারের নামে প্রহসন তোমার জন্মের আগেও মানব সমাজে ছিলো, তোমার মৃত্যুর পরে এখনো টিকে আছে। তোমার আগে সক্রেটিস, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস প্রমুখ এর শিকার হয়েছেন। তোমার পরে, আমেরিকার লুথার কিং, ইতালির মোসলিনী, মার্কো, প্রমুখ। এমনকি এই কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের নামে প্রহসন হয়ে গেছে। মানব সমাজে কোন কালেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, আর কখনো হবেও না। তাই বলে তুমি মরে গিয়েও এই কর্টেজকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে? পরপারে তোমার জন্যে নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। হয়তো ওখানে মার্টিনী তোমার পথ চেয়ে আছে। তুমি যাচ্ছ না কেন? লাইব্রেরীর এক কোন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। দরজায় লেখা ভাসলো, “মুক্তি দাও আমায়।” এবার আমি গলা চড়িয়ে বললাম, কিন্তু কিসের মুক্তি? কার থেকে মুক্তি? প্রত্যুত্তরে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন লেখা বেরুলো।
আলেসের লেখায়,
“বাহ। আজ সকাল হতে না হতেই এক প্রহরী এসে আমায় কতগুলি ফল, পানি, আর রুটি দিলো। প্রথমে এদের এই আকর্ষিক মহানুভবতার কারণ বুঝতে না পারলেও এখন ভালই বুঝতে পারছি। চারদিন পর যখন আমার লাশটা শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হবে তখন সে জীর্ণশীর্ণ দেহ থেকে যথেষ্ট যৌন সুখ নাও পেতে পারে। তাই এই চারদিন আমাকে খাইয়ে দাইয়ে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। আমি গতরাতে আমার ডাকিণী হওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছি। আমার ডাকিণী হওয়ার আসল কারণ হল আমার বাবার ফেলে যাওয়া পারিবারিক সরাইখানাটি। আমাদের সরাইখানাটি শহরের প্রায় তোরণদ্বারে অবস্থিত। শহর থেকে যারাই বেরুয় বা যারাই শহরে নতুন আসে তারা সবাই এই সরাইখানায় রাত কাটাতো। ফলে আমাদের প্রচুর মুনাফা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ওটা আমার মালিকানাধীন ছিলো। এমতাবস্থায় যেহেতু আমার কোন সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিলো নাহ তাই আমি মারা গেলে সরাইখানাটি পরিতাজ্য সম্পত্তি হিসাবে গির্জার অধীনে চলে যাবে। গির্জার প্রিস্ট ও সেবকদের জন্যে অতিরিক্ত আয়ের উৎস খুলবে। তাই শুধু এই সরাইখানাটির মালিকানার জন্যেই আমি আজ এক ভয়ঙ্কর ডাকিণীতে পরিণত হয়েছি। এসব বিচার, ডাকিণী অপবাদ, কেবল লোক দেখানোর নাটক বৈকি আর কিছু নয়। সবই স্পষ্টত ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমি এতে এতটাই জড়িয়ে গেছি যে মৃত্যুর পরেও আমি এ থেকে বেরুতে পারব নাহ। রবিবার প্রার্থনার পর ফাঁসির দড়ি আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে আসবে নাহ। আসবে আমাকে এখানে চিরতরে বেধে রাখতে। চারিদিকে কেবলি অন্ধকার। আমি একা একা এর মধ্যে কেবলই তলিয়ে যাচ্ছি, আরো গহীনে। কপালে দাসত্বের চিহ্ন নিয়ে। ”
পরের পাতায়,
” আজ দুপুরে ওরা আমায় সেই পুকুরে নিয়ে গেছিলো গোছল করাতে। কাল যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। তাই আজ শরীরটাকে একটু ঘসা মাজা করে একে প্রিস্টের যৌন শুদ্ধিকরণের জন্যে তৈরি করে নিতে হবে তো। আমি গোসল করতেই চাইছিলাম নাহ। কিন্তু আমাকে গোসল করানোর জন্যে দুজন বিশালদেহী মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। ওদের সাথে জোরাজোরি করার শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট নেই। তাই বাধ্য হয়েই সুবোধ মেয়ের মতো গোসল করে নিলাম। ওরা আমার সারা দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিষ্কার করে দিলো। ওরা আমার স্তন যৌনি নিতম্বে সবচেয়ে বেশী মনযোগ দিয়ে পরিষ্কার করলো। বুঝলাম এরা প্রফেশনাল। এদের কাজই হল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মেয়েদের দেহকে প্রিস্টের বিকৃত কামনা পুরণের জন্যে তৈরি করা। ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।”
ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৭ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি পড়ার পর মনে হয়েছিল আলেস তবে এভাবেই ধুকেধুকে মরেছিল! আজ পোল্যান্ডে প্রতি বছর ৬০ হাজার টন মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এদেশেরই একটা অকুতোভয় কন্যা একসময় খাবারের অভাবে ধুকেধুকে মরতে হয়েছিলো। নিজের দেশের(বাংলাদেশ) দিকে তাকিয়ে দুঃখ হল। সেই অজ্ঞতা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পোল্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণ নুয়ে পড়ার পরেও আজ উন্নতির শীর্ষে। কিন্তু আমার সুজলা সুফলা শস্য শামলা বাংলাদেশ আজো তৃতীয়বিশ্বের ক্ষুদা আর দারিদ্র পীড়িতদের কাঁতারে। যাহোক, ক্ষানিকের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আলেসের মৃত। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টাতেই আবারো আলেসের লেখা বেড়িয়ে পড়লো।

“আজ সন্ধ্যায় এক রক্ষী দুটো ভূট্টা আর এক মশক পানি নিয়ে এসেছিল। আমি ওর কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে খাবার নেইনি। কেন জানি মনে হল সেই হয়তো আমার মার্টিনীকে খুন করেছে। হয়তো ওর হাতে এখনো মৃত মার্টিনীর রক্ত লেগে আছে। গত রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল। ওর হাত থেকে খাবার নেওয়াটা আমার কাছে সেই স্বপ্নে দেখা মার্টিনীর ঝুলন্ত লাশ থেকে ঝরা রক্ত খাবার মতোই নিকৃষ্ট মনে হলো। আমি শুয়ে থাকলাম। ও কিছুক্ষণ খাবার হাতে দাড়িয়ে থাকল। যখন দেখলো আমি উঠে ওর কাছ থেকে খাবার নিচ্ছি নাহ তখন সে মশক আর ভূট্টা দুটো আমার সেলের ভেতর ছুড়ে ফেলে চলে গেল। মাটিতে পড়ে মশক ফেটে মেঝেতে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। সে পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মেঝে থেকে সবটুকু পানি চুষে খেলাম। আহ পানি…..ঈশ্বরের এক মহিমান্বিত উপহার। পানিটুকু খাওয়ার পর আমি ভূট্টা দুটো কুড়িয়ে খেতে লাগলাম। পানির অভাবে আমার গলাটা এতটাই শুকিয়ে গেছিলো যে ভূট্টার দানাগুলি বারবার আটকে যাচ্ছিলো। খাবার সময় গলায় প্রচন্ড জ্বালাপোড়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিলো যেন জ্বলন্ত কয়লা খাচ্ছি। কিন্তু তবুও পেটের দায়ে না খেয়ে উপায় ছিলো নাহ। একটা ভূট্টা খাওয়ার পর যখন অপরটিতে কামড় বসালাম তখন মনে পড়লো মার্টিনীর কথা। ও থাকলে হয়তো দুজনে ভাগ করে খেতাম। এতে পেট কম ভরলেই মনটা আনন্দে ভরে যেত। বুকের গহীন থেকে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। মনেমনে বললাম আমি আর পারছি না প্রভু।এই নৃসংশতা থেকে এবার আমায় মুক্তি দাও। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চল প্রভু। আজ রাতই যেন আমার এই ঘৃন্য জীবনের শেষ রাত হয়। কিন্তু প্রভু যীশু আমার গতরাতের প্রার্থনা অগ্রাহ্য করলেন। আমি বেঁচে রইলাম আরেকটি দুর্বিষহ দিনের অভিজ্ঞতা গ্রহণের জন্যে। ”

তার পরের পৃষ্টায় আবার লিখেছে,
” আজ সকালে এক প্রহরীর লাথি খেয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গল। অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল শরীর নিয়ে আমি এতটাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে প্রহরীর হাঁকডাঁকে কোন কাজই হয়নি। বাধ্য হয়েই ওকে কষ্ট করে সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আমাকে জাগাতে হয়েছে। আমাকে লাথি মেরে সে তার এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের শোধ নিতে চাইছে। ব্যাথ্যা পেলেও আমি ওকে কিছুই বললাম নাহ। ইদানীং ব্যাথা পেতে পেতে তা মুখবুজে সহ্য করাও শিখে ফেলেছি। শুধু অবাধ্য চোখ দুটো কোন বাধা মানে না। ব্যাথা পেলেই কয়েক ফোঁটা জল ছেড়ে দেয়। প্রহরী আমায় এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তৈরি হয়ে যেতে। আজ নাকি জনসম্মুখে আমার বিচার করা হবে। কাপড় পড়তে গিয়েও আমার মার্টিনীকে মনে পড়ে গেল। এইতো সেদিন আমরা একটা কাপড়কে দুজনে ভাগ করে পড়েছিলাম। আজ তার অনুপস্থিতিতে এ কাপড়ের মালিক আমি একাই। কিন্তু এই একাকীত্বই আমাকে সবচেয়ে বেশী যন্ত্রনা দিচ্ছে। ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের আঘাত বা অন্যকোন নির্যাতন নয়। মানুষের স্মৃতির এক আশ্চর্য ত্রুটি হল দুঃখ ভুলে যাওয়া কিন্তু সুখময় দিনগুলি মনে রাখা। মার্টিনীর সাথে সেই সুখময় দিনগুলির স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। মৃত্যু ব্যাতিত এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ খুলা নেই। কাপড় পরা মাত্র ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে একসময় আমরা একতালা গীর্জার ছাদে পৌছে গেলাম। রক্ষীরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে বেঁধে দিল। পূর্ব দিগন্তে তখন সবে মাত্র গ্রীষ্ম ঝলমলে সূর্যোদয় হয়েছে। তার উষ্ম পরশ আমার ভাঙ্গাচুরা শরীরটাকে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। একজন ঘোষক এসে গ্রামবাসীকে গীর্জা প্রাঙ্গণে একত্রিত হওয়ার আহব্বান জানালো। মানুষজন ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু করলো। তারপর সম্মান্বিত পাদ্রী গীর্জার ছাদে এসে বসলেন। শুরু হল তিন তিনটে খুনের দায়ে অভিযুক্ত ডাকিনী আলেসের বিচার।”
তার পরের পৃষ্টায়,
” মাননীয় পাদ্রী একে একে আমার উপর আনা সকল অভিযোগ উপস্থিত সবাইকে পড়ে শুনালেন! প্রথম অভিযোগ হল আমি নাকি সরাইখানার একক মালিক হওয়ার আশায় আমার বাবাকে অভিশাপ দিয়ে মেরে ফেলেছি। কি অদ্ভুত অভিযোগ। বাবা বেঁচে থাকতে আমি কখনোই সরাইখানায় যেতাম না। আমার ব্যবসাপাতিতে একটুও আগ্রহ ছিলো নাহ। যে জিনিসে আমার আগ্রহই নেই তার একচ্ছত্র মালিকানার জন্যে আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে খুন করব! এটা ভাবা যায়? তাছাড়াও বাবার সম্পত্তি তো তার একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার কপালেই জুটতো। তাকে খুন করে ছিনিয়ে নেবার কোন প্রয়োজনই তো ছিলো না। তবুও আমি পিতৃঘাতী। এটাই কি পৃথিবীর ন্যায়বিচারের উদাহরণ?
তার পরের অভিযোগ, আমি নাকি সামান্য কটা স্বর্নমুদ্রা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যে সরাইখানার এক ঘুমন্ত অতীথিকে খুন করেছি! ঐ মদ্যপ বুড়োটার কাছে স্বর্নমুদ্রা থাকলে তো নিবো। সে যা আয় করে সবই আমার সরাইখানায় মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। ওর কাছে স্বর্নমুদ্রা আছে এমনটা ভাবাও পাগলামি। আর যদি ঘুর্ণাক্ষরে দু একটা স্বর্নমুদ্রা থাকতো এবং আমার সেটার প্রয়োজন হতো তো আমি ওকে দু বোতল মদ দিয়েই তা বাগিয়ে নিতে পারতাম। খামাখা ওকে খুন করতে যেতাম কেন?আমার এই অতিসাধারণ যুক্তি তর্ক গুলি বিচারে গ্রহণ করা হলো নাহ। আমাকে ওই মদ্যপটার খুনি হিসাবেই চিহ্নিত করা হলো।
অতপর ওই অভাগা রক্ষীকে হত্যার অভিযোগ উঠলো। এবং যথারীতি সকল যুক্তিতর্কের উর্ধে উঠে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। অতপর প্রিস্ট এসে সর্বসম্মুখে আমার গালে চড় মারলেন। নিচে গীর্জা প্রাঙ্গণে গণজমায়েতের মাঝে ওনেক শিশুও ছিলো। এতো গুলি লোকের সামনে এভাবে অপমানিত হওয়ার লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হলো। অতঃপর বিচারের রায় ঘোষনা করা হলো। “ডাইনি আলেসকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর গীর্জা প্রাঙ্গণে সর্বসম্মুখে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। ” মৃত্যুদণ্ড শব্দটা আমার কানে যেন মধু বর্ষণ করলো। আর মাত্র চারদিন। এর পরেই আমি এই নির্মম পৃথিবী ছেড়ে আমার স্রষ্টার পাণ পাড়ি জমাবো। শাস্তি ঘোষনার পর প্রিস্ট তার হাতের আংটি খুলে তা আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিলেন। গভীর একটা পোড়া দাগ আংটির উপর মুদ্রিত নকশা সমেত আমার কপালে বসে গেল। এটা সেই চিহ্ন যা দ্বারা একজন ডাইনিকে চিহ্নিত করা হয়। কপালের অসহ্য জ্বালাপোড়া আর মিথ্যা ডাইনি অপবাদের যন্ত্রনায় আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। আমার কান্না দেখে উপস্থিত অনেকেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। অতপর প্রিস্ট সগর্বে গীর্জার ছাদ থেকে নেমে গেলেন। প্রিস্ট চলে যেতেই উপস্থিত জনতা আমার দিকে বৃষ্টির মত পাথর ছুড়তে লাগলো! যারা পাথর ছুড়ছিল তাদের প্রায় সবাইকেই আমি চিনি। তাদের মধ্যে ছিলো জোসেফ আন্টোনিও, সেই মোখপোড়া চাষি। গতবছর ওর ক্ষেতের ফসল আগাম শীতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফসল ফলাতে পারেনি বলে সে বউ বাচ্চা নিয়ে শীতে উপোস করে মরতে বসেছিলো। একরাতে সে আমাদের বাসায় এসে কিছু অর্থকড়ি ভিক্ষা চায়। আমার বাবা ওকে সাফ মানা করে দেন। কিন্তু ওর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে আমি আমার বড়দিনের উপহার কেনার জন্যে জমানো টাকার পুরোটাই তার হাতে তুলে দেই। সেই শীতের রাতে সে আমাকে মা মেরী অবতার বলে কুর্নিশ করেছিল। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের ব্যবধ্যানে আজ রোদ্রউজ্জল গৃষ্মে সে আমাকে ডাইনি বলে পাথর ছুড়ছে! কতই না দ্রুত এই মানুষগুলি বদলে যায়। তারপর চোখ পড়লো রজার বরিসের দিকে। আমার প্রাক্তন প্রেমিক। সেও সবার সাথে তাল মিলিয়ে আমার দিকে সমানে পাথর ছুড়ছে। অথছ কদিন আগেও সে কতনা মধুর কন্ঠে আমার রূপের প্রসংশা করতো। প্রতি বৃহষ্পতিবার সন্ধায় ও আমাদের গোয়ালঘরের পেছনে আমার সাথে মিলিত হবার জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো। আমিও বোকার মতো বাবার চোখকে ফাকি দিয়ে ওর মতো একটা লম্পটের সাথে মিলিত হতাম। ও আমাকে স্বর্গদেবী বলে ডাকতো। এইতো দুমাস আগেও সে তার স্বর্গদেবীকে বিছানায় পাবার জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আজ সেই স্বর্গ দেবীকে নরকের ডাইনি বলে গালি দিচ্ছে আর খুজে খুঁজে বড় পাথরগুলি বের করে ছুড়ে মারছে। ধ্বংস হোক এমন স্বার্থপর লম্পট পুরুষজাতির। ওর দিকে তাকাতেও আমার ঘেন্না হচ্ছে।
গীর্জা প্রাঙ্গণের এক কোণে কতগুলি শিশু কিশোর জড় হয়ে হৈ হোল্লড় করছে আর আমার দিকে পাথর মারছে। কচি অপ্রস্তুত হাতে ছোড়া পাথরগুলির বেশীরভাগই লক্ষভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের মধ্যে আমি আলেক্স রবার্ট উইলসন কে দেখতে পেলাম। ওর মা আমার প্রতিবেশী। ছেলেটা দেখতে খুবই সুন্দর। কচি বয়স ৪-৫ হবে। এইতো সেদিন ওর জন্মের সময় খুব বেশী তুষার ঝড় হয়েছিল। রাস্তায় তুষার জমে আমাদের গ্রামটা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এমন প্রতিকুল পরিবেশে ওর মায়ের যখন প্রসব বেদনা উঠে তখন কোন ধাত্রীকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো নাহ। ওদিকে সে তার মায়ের যৌনিতে উল্টো হয়ে আটকে গেছিলো। ওর বাবা বাড়ি ছিলো নাহ। লোকটা কাঠ কাটতে পার্শ্ববর্তী উইলো জঙ্গলে গিয়েছিলো। ওর মা ঘরে সম্পূর্ণ একা কাতরাচ্ছিলো। সেদিন তার আর্তচিৎকার শুনে আমি ওদের বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম। গরম পানি তৈরি করে, ওর মা কে শুইয়ে আমি নিজের হাতে ছেলেটাকে টেনে বের করেছিলাম। আমার হাত ধরেই ও এই পৃথিবীতে এসেছিলো। কৃতজ্ঞতাবশত তার মা আমার নামের সাথে মিলিয়ে তার নামকরণ করেন আলেক্স। আজ সেও আমার পর হয়ে গেছে! অতপর পাথরের আঘাতের তীব্রতায় আমি এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। রক্ষীরা আমার অজ্ঞান দেহকে বয়ে সেলের ভেতর নিয়ে এলো। জানিনা কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম রাত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই দেখলাম সেলের এক কোনে রক্ষীরা খাবার আর পানি রেখে গেছে। হয়তো জীবনের শেষ চারটে দিন ওরা আমায় অভুক্ত রাখতে চায় না। খেয়ে দেয়ে আমি আবারো লিখতে বসলাম। মৃত্যু প্রতিক্ষায়, জীবনের আতিবাহিত আরেকটি দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনের বর্ণনা।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৬ষ্ঠ পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

মার্টিনির জন্যে আমার হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। স্রষ্টাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতে লাগলো আমার কাছে। এভাবে পুতুলের মতো একটা মেয়েকে অকালে এভাবে নিয়ে গেল কেন? কি দোষ ছিলো তার? একজন বা কয়েকজনের প্রাণ নিলে সে খুনি। কিন্তু একে একে যে সবার প্রাণ যে হরণ করে সেই ঈশ্বর। জগতের কি অমোঘ লীলা! পরের পৃষ্টায় গেলাম,

আলেস লিখেছে,
“কাল রাতে একটুও ঘুমুতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই মার্টিনীর চেহারাটা ভেসে উঠছে! জানি আজ রাতে ওর মৃতদেহটাকে শুদ্ধিকরণের নামে প্রিস্ট ভোগ উৎসবে মেতে উঠবে। আমি যেন ওর আত্মার আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। গীর্জার ঐ উপরের তলায় সে সাহায্যের জন্যে হাহাকার করছে। ওর অতৃপ্ত আত্মাটা হয়তো অসহায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে, নিজের প্রাণহীন দেহটাকে কিভাবে ঐ জানোয়ারটা খুবলে খুবলে খাচ্ছে! ছিঃ। কোন মানুষ তার স্বজাতির মৃতদেহের এমন অমর্যাদা করতে পারে তা আমার জানা ছিলো নাহ। তাও আবার ঈশ্বর গৃহ গীর্জার ভেতরে বসে! হে ঈশ্বর তোমার গজব দিয়ে এই নষ্ট গীর্জাকে ধ্বংস করে দাও। এই শয়তানের আখড়া পুড়িয়ে ছাই করে ফেলো! প্রতিদিনকার মতো আজ সকালেও ওরা খাবার দিয়ে গেছে। চারটে রুটি। কিন্তু আজ আমি কার সাথে ভাগ করে খাব? মার্টিনী তো চলে গেছে। তাই খাবারের পুটলিটা আমি সেলের ফাঁক গলে ওদের উপর ছুড়ে ফেলে দিলাম। আর চিৎকার করে বললাম, তোদের খাবার তোরাই খা। শুধু আমার মার্টিনীকে ফিরিয়ে দে। এক শয়তান রক্ষী ভেঙ্গচি কেটে বলল, “ঐ ডাইনিকে নরকে পাঠানো হয়েছে। শীঘ্রই তোকেও সেখানে পাঠানো হবে।” যদিও আমি খুন না করেও খুনের দায়ে দোষী তবুও জীবনে কখনোই আমার মনে কারো প্রাণনাশের স্পৃহা জাগেনি। কিন্তু আজ প্রচন্ড ইচ্ছা করছিলো ঐ রক্ষীকে মেরে নরকে পাঠিয়ে দেই। একরাশ থুথু ওর মুখে ছিটিয়ে দিলাম। শয়তানটা অপর রক্ষীর হাত থেকে চাবুক নিয়ে আমার সেলে ঢুকে আমাকে খুব পিটালো। নিয়মিত চাবুক খেতে খেতে আমার পিটে পূঁজ হয়ে গেছে। ও যখন এই ক্ষত বিক্ষত পিঠে আবার মারলো তখন মনে হলো প্রতিটা চাবুক যেন পিঠ ভেদ করে হৃদপিন্ডে আঘাত করছে। খুব বেশীক্ষণ এ আঘাত সহ্য করতে হয়নি আমায়। দুচারটা চাবুক খাবার পরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সেলে সম্পূর্ণ একা আবিষ্কার করলাম। একাকীত্ব আর শূন্যতা পুরো হৃদয়কে গ্রাস করলো। এই একাকীত্ব থেকে বাঁচতেই বাইবেলটা নিয়ে লিখতে বসলাম।”

এ পৃষ্ঠাটা পড়ে চোখ বন্ধ করতেই যেন আলেসের ক্ষত বিক্ষত পিঠটা দেখতে পেলাম। ওহ! এই সাহসী মেয়েটা এতকিছু সহ্য করতে পেরেছে শুধু মার্টিনীর অপমান ছাড়া। তাই রক্ষীটা যখন মার্টিনীকে নরকে পাঠানোর কথা বলে তখনই সে সাপের মতো ফুসে উঠেছে। নির্যাতন নিশ্চিত যেনেও এর প্রতিবাদ করেছে! শুধু অনুভব করলাম জেলের অন্ধপ্রকোষ্টে এই দুই নারীর প্রেম অবলীলায় লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের মত প্রেমগাথাঁকে ম্লান করে দেবার যোগ্যতা রাখে।

পরের পৃষ্টায়,
“সেদিনের ঘটনার পর থেকে আজ দুদিন হয়ে গেল, ওরা আমাকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর সপ্তাহ খানেক আগের সেই নোংরা শুদ্ধিকরণের পর থেকেই ওরা আমাকে নগ্ন করে রেখেছে। ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম এগিয়ে আসছে বলে ঠান্ডা থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছি। কিন্তু পিপাসায় বোধ শক্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করেছে। গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি মার্টিনীকে আমার সেলের ভেতর ফাঁসীতে ঝুলানো হয়েছে। ওর ঘাড় ভেঙ্গে ধড়টা বেকায়দা ভাবে ঝুলছে। মৃত্যু যন্ত্রনায় সুন্দর মুখটা হা হয়ে জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে। ওর খোলা মুখ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে আর আমি তৃষ্ণার তাড়নায় মেঝে থেকে সে রক্ত চেটে চেটে খাচ্ছি। উহঃ। কি বীভৎস স্বপ্ন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি অনেক ক্ষণ কেঁদেছিলাম। কিন্তু তৃষ্ণায় সবটুকু পানিই শুকিয়ে গেছে। চোখ থেকে বেরুনোর মত আর কোন পানি অবশিষ্ট ছিলো না। দুপুরের দিকে তৃষ্ণার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে অঞ্জলি ভরে নিজের মুত্র পান করেছি। হলুদ বিস্বাদ তরলটা যেন আমার পিপাসাটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছি, তাড়াতাড়ি খাবার -পানি না পেলে আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত। তাই শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে এখন লিখতেছি। জীবনের শেষ অক্ষরমালা। জীবনের শেষ শব্দ, মার্টিনী।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৫ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

সেদিন অফিসে মন দিতে পারলাম নাহ। ঘুমের ঘোরে একসময় ডেস্কে মাথা ফেলেই কুপোকাত। কপাল ভাল অফিসে আমিই এক্সিকিউটিভ অফিসার। আমার উপরে কেউ নেই। আমার কোন বস থাকলে এতক্ষণে সোজা ঘাড় ধরে অফিস থেকে বের করে দিত। আজ বিকালটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। অফিস যেন শেষ হতেই চাইছে না। অবশেষে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় চলে এলাম। কাপড় ছেড়ে একটা লম্বা শাওয়ার নিলাম। আয়নায় চোখ যেতেই দেখলাম আলেস আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এবার ওকে দেখে মোটেও ভয় পেলাম না। বরং দুষ্টুমি করে চোখ টিপলাম। ও মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। ওকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে মন চাইলো। অঞ্জলিতে পানি নিয়ে আয়নায় ছিটিয়ে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আলেস আয়না থেকে চলে গেছে। শাওয়ার সেরে ডিনার রেঁধে খাবার টেবিলে বসলাম। খাবার টেবিলে আমি একটা প্লেট টেনে নিলাম আরেকটি প্লেট পেতে রাখলাম আলেসের জন্যে। জানি ও খাবার দাবার সহ সকল জাগতিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে তবুও কেন জানি ওকে ছেড়ে খেতে বসতে আমার বিবেকে বাধলো। খাবার শেষে লাইব্রেরীতে ফিরে গেলাম। আলেসের ডায়ারীটা আমার পড়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েই আছে। কাল বিলম্ব না করে পড়া শুরু করলাম।

” গত দুটো দিন কিছুই লিখতে পারিনি। প্রচন্ড জ্বর এসেছিল আমার। শরীরটা সেরাতের ধকল সহ্য করতে পারেনি। আধোঘুম আধোজাগরণেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ যখন হুশ হল তখন দেখলাম মার্টিনী আমাকে ওর কাপড় পড়িয়ে দিয়ে নিজে নগ্ন হয়ে আমার মাথার পাশে বসে আছে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ও হেসে সুপ্রভাত জানালো। নগ্ন মার্টিনীকে তখন আমার ভেনাসের চেয়েও বেশী সুন্দরি মনে হচ্ছিলো। ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, “জ্বর গায়ে নগ্ন থাকা ঠিক না। তাই আমার কাপড়টা খুলে তোমায় পড়িয়ে দিয়েছি। আর আমি তো জানিই তুমি আমাকে কাপড় ছাড়াই বেশী ভালবাস।” ওর কথা শুনে চোখে জল চলে আসলো। একটাই কাপড় আমরা দুজন ভাগ করে পড়তেছি। ও শুধু আমার জন্যে এই শীতেও সারাটি রাত নগ্ন থেকেই কাটিয়ে দিয়েছে! হায় ঈশ্বর! এ তোমার কেমন অসম বন্টন। তুমি মার্টিনীর হৃদয়ে যতটা ভালবাসা দিয়েছো তার এক কানাকড়িও যদি প্রিস্টের হৃদয়ে দিতে তবে আজ আমাদের এতটা কষ্ট পেতে হত না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে মার্টিনীকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। ও যে আমার জীবনের শেষ আশ্রয়। আমার ভেনাস দেবী। আমার স্বর্গের রাণী। আমরা দুজন দুজনাতে হারিয়ে গেলাম। এই মেয়েটা আমাকে স্বর্গসুখে ভাসিয়ে দিল। ওর সান্নিধ্যে এই নরকটা এক স্বর্গউদ্যানে পরিণত হল। মিলন শেষে আমরা দুজন একসাথে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ অনুভব করলাম মার্টিনী আমাকে ঘুমে রেখে উঠে চলে যাচ্ছে। মিটমিট চোখে দেখলাম ও এলোমেলো পা ফেলে উঠে সেলের এক কোণে যেয়ে বমি করলো। বুঝলাম ও অন্তঃসত্ত্বা। প্রিস্টের সন্তান ওর পেটে। দুদিনের ব্যবধানে আমাকেও ওর পরিণতি বহন করতে হবে। আমার পেটে হাত বুলালাম। কিছুই টের পেলাম না। কিন্তু আমি জানি এখানে একটা শুকরছানা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। শুধু একটাই আশা, মৃত্যুই পারে আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিয়ে আমার স্রষ্টার কাছে ফিরিয়ে নিতে। মার্টিনী ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে গভীর মমতা মাখা কন্ঠে বলল, “কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাস করে বাচ্চাটা কার আমি সোজা তোমাকে দেখিয়ে দেব। কি মনে হয়? পারবে তো আমার বাচ্চাটার বাবা হতে?” আমি ওর সুডৌল স্তনে চিমটি কেটে বললাম, যদি তুমি আমায় বিয়ে করে মিসেস আলেস হয়ে যাও তবেই পারব। আমার উত্তর শুনে ও উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। আমিও প্রাণ খুলে হাসলাম। এই বাহ্যিক হাসি ঠাট্টার আড়ালে প্রকৃত সত্যটা আমরা দুজনেই জানি। নিতান্ত ভাগ্যগুণে যদি আমরা এখান থেকে বেরুতেও পারি তবুও আমি আলেসকে বিয়ে করতে পারব নাহ। আমাদের সমাজ দুটো মেয়ের বিয়েকে কখনোই মেনে নিবে নাহ, তারা একে অন্যকে যতই ভালবাসুক না কেন।”
মনেমনে ভাবতে লাগলাম আলেস যদি এখনো বেঁচে থাকতো তবে কতই না খুশি হত। আজ আধুনিক পোল্যান্ড সমকামী বিবাহকে বৈধতা দিয়েছে। ইশ যদি আমি আলেস আর মার্টিনীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারতাম কত না মজা হত! এসব ভাবতে ভাবতেই পরের পৃষ্টায় গেলাম,
” আমার হৃদয়টা আজ ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না মার্টিনী আর নেই। আর কখনোই ও আমাকে ভালবাসবে নাহ। ওর নিষ্পাপ কচি চেহারাটা আর কখনোই আমি দেখতে পাব না! ওর মিষ্টি চুমু যা আমার শত নির্যাতন নিষ্পেষণকে মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিত তা আজ থেকে অতীত হয়ে গেছে। ওর জাদুকরী হাতের স্পর্শ যা আমায় নিমিষেই চরম যৌন সুখে ভাসিয়ে দিত, সে হাত দুটো আজ নিথর হয়ে পড়ে আছে! আজ ভোরে কতিপয় রক্ষী এসে বলল মার্টিনীর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ওকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। ও নির্লিপ্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো আমার দেহটার কি হবে? অপর এক রক্ষী উত্তর দিলো প্রিস্ট তোমার দেহকে পরপর তিন রাত শুদ্ধিকরণ শেষে আগুনে পুড়িয়ে দিবেন। এ গীর্জার নিয়ম অনুসারে বুঝি সকল ডাকিণীদেরই এই নিয়মে সমাহিত করার হয়। একথা শুনে মার্টিনী বাচ্চা মেয়েদের মতো ঢুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমাকে বাঁচাও আলেস। শয়তানটা শুদ্ধিকরণের নামে আমার মৃতদেহের সাথেও সঙ্গম করবে! ঈশ্বরের দোহাই লাগে, আমাকে বাঁচাও।” আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম। আমি বেঁচে থাকতে আমার ভেনাসকে এখান থেকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে নাহ। মনেমনে প্রার্থনা করলাম হে ঈশ্বর আমায় শক্তি দাও, আমায় গ্রহণ কর। মার্টিনীকে নিতে প্রথম রক্ষী সেলে প্রবেশ করা মাত্র আমি ওর উপর হামলে পড়লাম। ও তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। আমি ওর গলায় কামড় বসিয়ে দিলাম। ফিংকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসলো ওর গলা থেকে। এমন সময় আরেকটি রক্ষী আমার মাথার পেছনে বাড়ি মারলো। আঘাতের তীব্রতায় আমার চোখের সামনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে সেলে একা আবিষ্কার করলাম। বুঝলাম মার্টিনীকে ওরা নিয়ে গেছে চিরতরে! হায় ঈশ্বর, তুমি ওকে স্বর্গে যীশুর ঠিক পাশেই স্থান দিও। আমেন।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৪র্থ পর্ব)

1

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

এরপরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

“আজ হঠাৎ এক প্রহরী এসে চিৎকার করে আমাকে গালিগালাজ করতে লাগল। দুদিন আগে আমি যে রক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছিলাম সে নাকি সিমিলিয়ার যুদ্ধে মারা গেছে। স্বভাবতই এর ধরে নিয়েছে আমিই ওকে খুন করেছি। এই নিয়ে তিন তিনটা খুনের দায় আমার গলায় ঝুলছে। হায় ঈশ্বর, এই নির্বোধরাও কি তোমার সৃষ্টি? যুদ্ধে তো মানুষ যায় মারতে আর না হয় মরতে। না হয় ঐ রক্ষীটা মারা গেছে। কিন্তু তুমি তো জানো আমি ওকে খুন করিনি। আমি কাউকেই খুন করিনি। এরা শুধু শুধু আমাকে এখানে ধরে এনেছে। হায় ঈশ্বর। তুমি এর সুষ্ট বিচার কর। তুমি এই পাপীকে ক্ষমা কর। রক্ষীরা বলাবলি করতে লাগলো যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ততই নাকি মঙ্গল। এসব শুনে মার্টিনী খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। ও আমায় জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল। এ মুহূর্তে ওকে আমার কাছে ঈশ্বরের দূত মনে হল। এই অপবাদ, ঘৃনা, লাঞ্চনা, নিগ্রহের মাঝেও কেবল আমাকে ভালবাসতেই যেন ঈশ্বর স্বর্গ থেকে এক অপ্সরী মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ ঈশ্বর। এই পাপীকে দয়া করার জন্যে।”
তার পরের পৃষ্ঠা,
“আজ সন্ধায় ওরা আমাকে শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। সেলের দরজা খুলে ওরা যখন আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন মার্টিনীর সে কি কান্না। আমি তখনো জানতাম না শুদ্ধিকরণ জিনিসটা কি। যাওয়ার সময় আমি যতক্ষণ সম্ভব ওকে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। ও উন্মাদের মতো মাটিতে পড়ে নিজের চুল ছিঁড়ছে আর বিলাপ করছে। একটা সময় সেলের দেয়ালের আড়ালে ও ঢাকা পড়ে গেল। আমি সর্বশক্তিতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “মার্টিনী, আমি তোমায় ভালবাসি।” রক্ষীরা আমাকে নিয়ে একসময় প্রিস্টের কক্ষে পৌছে গেল। গীর্জার উঁচু তলায় সুরম্য কক্ষে, বিলাসবহুল আসনে অধিষ্ঠিত শ্মশ্রুমন্ডিত প্রিস্টকে দেখে আমি অবনত হয়ে সম্মান জানালাম। অতপর উনার পায়ে ধরে বললাম, “ধর্মাবতার, আপনি আমাকে চেনেন। আমি শৈশবে আপনার গীর্জায় দুবছর বিদ্যার্থী ছিলাম। আমার জীবনে এমন কোন রবিবার নেই যেদিন আমি সাপ্তাহিক প্রার্থনায় ফাঁকি দিয়েছি। আমি স্রষ্টার একজন একনিষ্ঠ সেবিকা হিসাবেই জীবনে বেঁচে থাকতে চাই। মা মেরীর কসম আমি ডাকিণী নই।”
প্রিস্ট আমার মাথায় লাথি মেরে বললেন আমি নাকি একজন ছদ্মবেশী ডাকিণী। ধার্মিকতার ছদ্মবেশ নিয়ে আমি নাকি ৩ জন কে খুন করেছি। তাই আমার অবধারিত শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু দন্ডের আগে অবশ্যই আমার দেহটাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে যেন মৃত্যুর পর আমার পাপাত্মা আমার দেহে আর ফেরত আসতে না পারে। প্রিস্টের ইঙ্গিতে দুজন রক্ষী এসে আমার দুহাত শক্ত করে চেপে ধরল। আর প্রিস্ট ছুরি দিয়ে আমার পরিধেয় কাপড় কেটে ফেলে আমাকে উলঙ্গ করে দিল। আমি লজ্জায় অপমানে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচালাম। আমার বিশ্বাস ছিল হয়তো মা মেরী আমার চিৎকার শুনে সাহায্য করতে আসবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে প্রিস্টের বিশাল হাতের চড় খেয়ে আমি লুটিয়ে পড়লাম।”
এ পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমার হাত পা অসার হয়ে আসতে শুরু করলো। অনেকটাই অনুমান করতে পারছিলাম এর পর অসহায় আলেসের উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টালাম।
” ওরা আমাকে পাশের কক্ষের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শেকলের সাথে বেধে দিলো। অতঃপর প্রিস্ট এসে আমার নগ্ন দেহে পানিপড়া ছিটিয়ে দিল।তারপর সে আমার দেহটাকে পুরো রাত জুড়ে চারবার ভোগ করল। আমি সারারাত মা মেরীকে ডেকেছি একটু সাহায্যের জন্যে। কিন্তু উনি আমার ডাক কবুল করেননি। সকালে আমাকে এই বিধ্বস্ত দেহেই সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরা আমাকে গোসলও করতে দেয়নি। আমার দুপায়ের মাঝখানে এতবেশী ব্যাথা করছিল যে আমি হাঁটতে পারছিলাম নাহ। কিন্তু রক্ষীদের নির্দয় চাবুকের আঘাতে টলতে টলতে কোনরকমে আমার সেলে পৌছালাম। সেলে মার্টিনী শুয়ে ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি খানিকটা ইতস্তত করলাম। আমার সারা দেহে রক্ত আর বীর্যের মাখামাখি। এ দেহে ওকে জড়িয়ে ধরলে তার কাপড় নোংরা হয়ে যাবে। কিন্তু ও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল নাহ। একটা সময় আমি ক্লান্ত দেহটা ওর বাহুডোরে এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে আমি আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। দেখলাম গীর্জার প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিশ ছোট্ট আলেসকে নিতে আমার বাবা মা এসেছেন। সাথে করে গরম ভূট্টা ভাজা আর রাইয়ের মন্ড নিয়ে এসেছেন। এসব পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে! তারপর বাবা মায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখলাম মার্টিনী তার কাপড়ের ছোট্ট কোন ছিড়ে একটা রুমাল বানিয়েছে। আর মশক থেকে পানি নিয়ে সে রুমাল ভিজিয়ে আমার দেহের নোংরা রক্ত, বীর্য মুছে দিচ্ছে। ঘৃণায় আমার মুখ বেঁকে গেল। ছিঃ। এটা যদি শুদ্ধিকরণ তবে কালিমালেপন কি? কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বাইবেলটায় লিখতে বসলাম। গতরাতের ঘটনা নিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। এভাবে ভোগ হওয়া হয়তো আমার কপালে লিখা ছিলো। কিন্তু আমার একটাই আফসোস। আমি ঐ প্রিস্টের মতো এক সাক্ষাৎ শয়তানকে ধর্মাবতার ডেকেছি। তার পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছি। এর চেয়ে আমি মরে গেলেই ভাল হতো। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়া শেষে আমার সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছিল! নিঃসন্দেহে আলেস অনেক সাহসী আর মানসিক শক্তি সম্পন্ন ছিল। এতটা নির্যাতনের পরেও সে ভেঙ্গে পড়েনি। স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস অটুট রেখেছিল। কিন্তু ধর্মের ধ্বজা ধারিদের ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা আমাকে বিষ্মিত করে। একেই হয়তো বলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এটাই হল ধর্ম ব্যবসার চরম রূপ। আলেসের মতই সেসব ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি ঘৃণায় নিজের অজান্তেই আমার মুখ কুঁচকে গেল। পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথেই আমার বেডরুমে অ্যালার্ম বেজে ঊঠলো! কি আশ্চর্য! আমি সারাটি রাত লাইব্রেরীতে আলেসের ডায়েরী পড়েই কাটিয়ে দিয়েছি! আলেসকে আমার একাকীত্বের বন্ধু, সুখ দুখের সাথী মনে হল। বিড়বিড় করে বললাম, তোমাকে ভালবাসি আলেস।

যাক। অনেক হয়েছে। এবার উঠে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমি আমার কটেজ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি নাহ। আমি এখানেই থাকব। আলেসের সাথে। আপাতত অফিসে যাচ্ছি। আলেসকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে নাহ। কিন্তু অফিসে যে যেতেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৩য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পরদিন ঘড়ির আলার্ম শুনে ঘুম ভাঙ্গলো। নিজেকে বাথরুমের ফ্লোরে আবিষ্কার করলাম। মাথাটা খানিকটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে জমাট বেধে আছে। টলমল পায়ে উঠে ভয়ে ভয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। এবার সবকিছু ঠিকঠাক। প্রতিবিম্বে আমিই আছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নাস্তা সেরে অফিসে গেলাম। অফিসের সহকর্মীদের কপালের আঘাতের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি। ওরা নিজনিজ কাজেই ব্যস্ত হয়ে গেল। সেদিন অফিস শেষে বাড়ি ফিরে কাপড় চোপড় গোছগাছ করতে শুরু করে দিলাম। আমি আর এ কটেজে থাকব নাহ। আর যাওয়ার আগে আলেসের ডাইরিটাকে পুড়িয়ে দিয়ে যাব। হয়তো এটাই ওর মুক্তির শেষ পথ। আমার ক্লজিটের সকল কাপড় লাগেজে পুরে নিলাম। তারপর লাইব্রেরিতে গেলাম আলেসের ডাইরিটা নিতে। লাইব্রেরীতে ঢুকা মাত্র লাইব্রেরীর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি সভয়ে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই দরজার ঠিক ওপাশ থেকে এক আর্তচিৎকার ভেসে এলো। এবার আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। তারপর সারা বাড়িতে যেন প্রলয় শুরু হল। জিনিসপত্র ভাঙ্গার আওয়াজ, কান্নার বিলাপ, দেয়ালে আঁচড় কাটা, আরো বিভিন্ন রকমের শব্দ। এক সময় আমি অসহ্য হয়ে চিৎকার করে বললাম, “আলেস, তুমি কি আমায় মেরে ফেলতে চাও? ” খানিক পরেই দরজায় লেখা উঠলো, “নাহ, চলে যেও নাহ। আমায় সাহায্য কর বন্ধু। ” অতঃপর দরজা খুলে গেল। আমি দৌড়ে আমার রুমে গেলাম। যেভাবে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনেছিলাম তাতে অনুমান করেছি আমার রুমের কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু রুমে ঢুকে দেখলাম সবকিছুই স্বাভাবিক ও সাজানো গোছানো। তারপর বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলাম। আমি জানিনা আলেস কে। ওর উপর হওয়া নির্যাতন আমাকে ব্যথিত করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আমার কটেজে একটা অশরীরীর উপস্থিতি মেনে নেব। একটা সময় কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। আয়নায় দেখা বিম্বের সেই মেয়েটি আমার পায়ের কাছে পড়ে কাঁদছে। তার মুখ কালো কাপড়ে বাধা। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু মুখে কাপড় থাকার কারণে পারছে নাহ।এক সময় সে তার কটিবস্ত্রের মধ্য থেকে সেই বাইবেলটা বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর ঘুরে চলে গেল। মাঝরাতে স্বপ্নটা দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠে দুগ্লাস পানি খেলাম। তারপর ফ্রিজ থেকে দুটুকরো স্যান্ডুইচ খেয়ে রওনা হলাম লাইব্রেরী পানে। রহস্যের সব জট এখন ঐ বাইবেলের দিকে ইঙ্গিত করছে যাতে লেখা আছে আলেসের ডায়ারী। লাইব্রেরীতে গিয়ে ওটা বের করে আবার আলেসের লেখা পড়তে শুরু করলাম।
“আজ সকালে রক্ষীরা আমাদের খাবারের সাথে সাথে মার্টিনীর জন্যে দুই প্রস্থ কাপড়ও দিয়ে গেল। ও যখন কাপড় পরছিল তখন আমার হৃদয়ে হতাশা মোচড় দিয়ে উঠলো! ওর নিজের কাপড় আছে। এখন থেকে ও হয়তো আমার কোলে ঘুমুতে চাইবে নাহ। কিন্তু পরক্ষণে সে হতাশা উবে গেল। নীল কাপড়ে ওকে রাজকুমারীর মত লাগছে। আমি ওর উপর থেকে চোখ ফিরাতে পারছিলাম নাহ। ব্যাপারটা ওর নজর এড়ালো নাহ। ও মৃদু হেসে জিজ্ঞাস করলো কেমন লাগছে ওকে। আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারলাম, অসাধারণ। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে আজ রাতে আমার কোলেই শুয়ে পড়লো! তবে কি সেও আমাকে ভালবাসে? নাকি এটা নিছক একত্রে ভাল থাকার অভিনয়। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু ও দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। আমার বুকে ও বারবার মুখ ঘসছে। মনে হচ্ছে যেন ভালবাসার শেষ আশ্রয় খুঁজছে। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম। এই মেয়ে দুটো প্রমাণ করে গেছে, ভালবাসা স্থান, কাল, উঁচু নীচু, জাত ভেদ, বর্ণ লীঙ্গ ভেদাভেদ মানে নাহ। ভালবাসা ভালবাসাই। পৃষ্ঠা উল্টে পরের পাতায় গেলাম।
” কাল এক স্বপ্নময় রাত কাটিয়েছি আমি আর মার্টিনী। ওকে এভাবে কাছে পাবো কখনোই কল্পনা করিনি। এই মেয়েটা শুধু দেখতেই সুন্দরি না, বিছানায়ও অসাধারণ। ঈশ্বরের অমায়িক সৃষ্টি। হে স্রষ্টা আমায় ক্ষমা কর । আমার হেন পাপ মোচন কর। কিন্তু আমার পাপের শাস্তি তুমি মার্টিনীকে দিওনা কভু। দরকার হলে ওর মৃত্যুদ্যুতকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও তবুও ওকে এই নরক থেকে উদ্ধার কর প্রভু। আমেন।”
তার পরদিন ও লিখেছে,
“আজ ধরে আনার ৭ দিন পর ওরা আমাকে আর মার্টিনীকে একটা ছোট্ট পুকুরে নিয়ে যায় গোসল করাতে। যাহোক ওরা একদম নির্দয় নয়। পুকুরের উষ্ম প্রস্রবণে গা ডুবিয়ে দিতেই চাবুকের ক্ষতগুলিতে অসহ্য জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল। আমি আর মার্টিনী জল ছিটানোর খেলায় মেতে উঠলাম। কিন্তু বেরসিক রক্ষীদের তা পছন্দ হল নাহ। একটা নেতা গোছের রক্ষী এসে আমার আর মার্টিনীর দিকে পাথর ছুড়ে মারতে লাগল। আমি নীচু হয়ে যাওয়ায় পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা পেলাম কিন্তু বেচারি মার্টিনীর আহত মাথায় আবারো একটা পাথরের আঘাত লাগল! আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। এরা আমার সামনে আমার প্রিয়াকে আঘাত করতে পারে নাহ। আমি ওদের চিৎকার করে অভিশাপ দিলাম যেন সে শীঘ্রই নরকে প্রবেশ করে। আমার অভিশাপ শুনে ঐ রক্ষী সভয়ে পিছিয়ে গেল। ওরা আমাকে ডাইনি ভাবে। তাই আমার অভিশাপকে ভয় পেয়েছে। নিজেকে একটু হলেও ক্ষমতাবান মনে হল। মার্টিনীকে আর আমাকে আবার সেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। প্রভু তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকের এই চমৎকার দিনের জন্যে। ”

এই পৃষ্ঠা পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার লাইব্রেরীর দরজা সশব্দে বন্ধ হল। আর ধুলোর মধ্যে লেখা ফুটলো, আলেস+মার্টিনী। এই প্রথম আমি আলেসের ডায়রি পড়ে হাসলাম। মেয়ে দুটো এত্তসবের মাঝেও প্রেমে পড়েছিল আর জেলখানায় চুটিয়ে প্রেম করছিল। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তখনই খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। আমিও সে হাসিতে যোগ দিলাম। আলেসের প্রতি আমার ভয় ভীতি সবকিছুই কেটে গেল। নিঃসঙ্গ কর্টেজে এমন একজন সঙ্গিনী পাওয়া মন্দ কি? হোক না সে অশরীরী।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (২য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

“আজ হঠাৎ করে আমার সেলের দরজা খুলে, আমার সমবয়সী এক নগ্ন মেয়েকে ছুড়ে ভেতরে ফেলা হল। রক্ষীরা চেঁচিয়ে বলল, “দুই ডাকিণী একসাথে মর।” ওরা যতবারই আমাকে ডাকিণী বলেছে আমি উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এবার আমি নবাগত মেয়েটিকে দেখে খানিকটা আভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটা এক কোথায় অপরূপা সুন্দরী। মুখের ছলে যাওয়া চাবুকের দাগ কিংবা সারা শরীরের নির্যাতনের চিহ্ন তার সৌন্দর্য্যকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। ও বার দুয়েক মাথা তুলার চেষ্টা করতেই জ্ঞান হারালো। আমি ওর কাছে যেয়ে ওকে দেখতে লাগলাম। ওর অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। ওর মাথার পেছনে বড় একটা ক্ষত যা থেকে তখনো রক্ত বেরুচ্ছিল। আমি আমার কোটিবন্ধনী দিয়ে ওর মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিলাম। এই শীতে অসুস্থ মেয়েটাকে ধুকেধুকে মরতে দেখে আমার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো। চাবুকের অসংখ্য আঘাতে আমার নিজের কাপড়ই ছিড়ে একাকার। তবুও যতটা সম্ভব ওকে আমার কোলে জড়িয়ে রেখে গরম রাখার চেষ্টা করলাম। দেয়ালে টাঙ্গানো একটা মশাল এনে ওর পাশে পুঁতে দিলাম। ওকে কোলে নিয়েই এখন লেখতেছি। মশালের আলোয় ওকে আরো অপূর্ব লাগছে। আমাকে ক্ষমা কর ঈশ্বর। আমি তোমার এই অপরূপ সৃষ্টির প্রেমে পড়ে গেছি। ”
এই পৃষ্ঠা পড়ে বুঝলাম আলেস এক নারী সমকামী ছিল। ওই মেয়েটার সহচর্য এই নিদারুণ বন্দিত্বেও ওর হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার তোলেছিল। অথবা হয়তো ও সমকামী ছিলনা কিন্তু পরিস্থিতি ওর মনে খানিকের মোহের সৃষ্টি করে। কিন্তু নতুন মেয়েটার নাম কি ছিল? প্রশ্নটা আমার মাথায় আসতেই লাইব্রেরীর দরিজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ধুলি মাখা দরজার কপাটে আলেসের সুস্পষ্ট হস্থাক্ষরে একটা নাম ফুটে উঠলো, “মার্টিনী।” ক্ষানিক পরেই তা আবার ধুলায় মিলিয়ে গেল। এবার প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আলেস মরে গিয়ে আমার কর্টেজে আটকে পড়েছে। আজ এই লাইব্রেরীতে ও আমার সাথে আছে। কিন্তু আমি ওকে দেখতে পারছি নাহ। এটা ভাবতেই আমার ঘাড়ের সবকটি লোম দাড়িয়ে গেল! প্রচন্ড ভাবে ঘামতে শুরু করলাম। ঠিক তখনই বদ্ধ ঘরে কোথা থেকে একটা দমকা হাওয়া এসে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে আলেসের লেখা পরবর্তী পৃষ্টায় নিয়ে গেল। বুঝলাম আলেস চাইছে যেন আমি ওর লেখা পড়ি। আমার মনে হলো ও দরজা আটকে আমার পালানোর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন যদি আমি ওর ইঙ্গিত না শুনি তবে এই বদ্ধ লাইব্রেরীতে ও হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে। ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকালাম। দরজায় আবার লেখা উঠলো, “সাহায্য কর বন্ধু। ” তারপর আস্তে করে দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলে যাওয়ায় আমার মনে কিছুটা সাহস ফিরে আসলো। আলেস আমাকে বন্ধু বলে সম্বোধকরেছে! ওর সাহায্যের প্রয়োজন। কিন্তু কেন? শেষ মেষ কি হয়েছিল ওর ভাগ্যে। এসব কৌতুহল আমাকে ওর পরবর্তী পৃষ্ঠা পড়তে বাধ্য করল। সেখানে লেখা ছিল,
“আজ সকালে আমার কোলেই মেয়েটার জ্ঞান ফিরলো। আমি ওকে শুভ সকাল জানালাম। কিন্তু ও ভাবলেশহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তন্মধ্যে রক্ষীরা চলে আসলো। আমাকে এখানে নিয়ে আসার তৃতীয় দিনের মাথায় ওরা প্রথম আমাকে খাবার দিলে। খাবার বলতে ছিল চার টুকরো বাসী পঁচা রুটি আর এক মশক পানি। আমি দুটুকরো রুটি ঐ মেয়েটাকে দিয়ে দিলাম। ও বুভুক্ষুর মত গোগ্রাসে গিললো। খাবার শেষে পানিটুকু আমরা দুজন ভাগ করে খেলাম। স্রষ্টাকে অসংখ্য ধন্যবাদ উনি অভুক্তদের খেতে দিয়েছেন, তৃজ্ঞার্তদের পান করিয়েছেন। আমি এবার মেয়েটার কাছে গিয়ে ওর মাথার ক্ষতটা দেখলাম। সারতে অনেক দেরি হবে মনে হচ্ছে। তবে সেরে যাবে। খেয়াল করলাম ওর নগ্ন দেহে ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে গেছে। সারারাত জ্বলতে জ্বলতে মশালটাও নিভে গেছে। ও ঠান্ডায় মারা যেতে বসেছে। ওকে আবার আমার কোলে নিয়ে আসলাম। প্রথমে বাধা দিলেও এক সময় ও বাধ্য হয়েই এসে আমার কোলে বসল। আমার ছেড়া কাপড়টুকু আমি আমাদের দুজনের দেহের উপর টেনে দিলাম। ও আমার বুকে মাথা গুজঁলো। ও খানিকটা স্থির হলে আমি ওর সাথে কথা বলতে শুরু করিলাম। ও জানালো তার নাম মার্টিনী গুয়েন্থার। ও নিমেসুয়েরার পাহাড়ি গ্রামে থাকতো। ওর বাবা একজন ভেষজ চিকিৎসক। ওর বাবাকে স্থানীয় গীর্জার প্রিস্ট খুন করে। তার অপরাধ ছিলো সে একজন পানিতে ডুবা ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। ছেলেটার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও ওর বাবা ছেলেটাকে বুকে হাত দিয়ে চেপে বাঁচিয়ে ফেলে। প্রিস্টের মতে ছেলেটা মারা গিয়েছিল। কিন্তু ওর বাবা ছেলেটিকে মৃত্যুর ওপার থেকে কালোজাদুর মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছে। এর অপরাধে প্রিস্ট ছেলেটি ও মার্টিনীর বাবাকে শুলে চড়ায়। মার্টিনীকে ডাইনি আখ্যায়িত করে একরাত উলঙ্গ করে বরফে বেধে রাখে। পরদিন ওকে এখানে নিয়ে এসে …… মার্টিনী আর বলতে পারছিলো না। ও ফোঁপিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বুঝে গেলাম প্রিস্ট ওকে সারাদিন ভোগ করে রাতে আমার সেলে ছুড়ে ফেলেছিলো। আমি মার্টিনীকে আরো শক্ত করে আমার বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছুক্ষণ পর ও ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ওকে কোলে নিয়েই আবার লিখতে শুরু করলাম। ”
পৃষ্ঠাটা উল্টাতে গিয়ে খেয়াল হল ওটার অর্ধেকটা আমার চোখের পানিতে ভিজে গেছে। মনের মধ্যে ওসব ধর্ম ব্যাবসায়ী প্রিস্ট বাপিস্টদের প্রতি তীব্র ঘৃনা অনুভব করলাম। তখনই বেডরুমে আমার ফোনটা বেজে উঠে। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আমার রুমে ঢুকে ফোন ধরলাম। আম্মু ফোন দিয়েছে। আবার আম্মু আমাকে কাঁদতে দেখে ফেলল। জিজ্ঞাস করল আমার বাগদত্তার সাথে কোন সমস্যা হয়েছে কি নাহ। আম্মুকে উল্টাপাল্টা বলে আমি প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলাম। আম্মুর সাথে কথা শেষে চোখমুখ ধুতে বাথরুমে ঢুকলাম। বেসিনে নীচু হয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে যখন মাথা তুললাম তখন আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব ছিলো নাহ। ওটা অন্য একটা মেয়ে ছিলো। আমার অনুভব করলাম এটাই আলেস। আয়নার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। চিৎকার করে বাথরুমে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

দ্রষ্টব্যঃ

লেখিকা বলেছেনঃ আসলে উপন্যাসটিতে সমকামিতা আনতে চাইনি। কিন্তু আমি চাইছিলাম একটা টোটাল উপন্যাস যাতে একসাথে ভয় রোমাঞ্চ প্রেম ভালবাসা থাকবে। প্রথমে ভেবেছিলাম আলেসের সাথে একটা রক্ষীর প্রেম ঘটাবো। কিন্তু সেটা অতিরঞ্জন হয়ে যাবে। সবাই জানে মধ্যযুগীয় রক্ষীরা ভালবাসা বিবর্জিত খুনে লুটেরা টাইপের। তারপর চাইলাম আলেসের সাথে অন্য এক পুরুষ বন্দির প্রেম ঘটাবো। কিন্তু মধ্যযুগে ডাকিনীদের পুরুষ বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা হত। তাই সেটাও অসম্ভব। শেষে বাধ্য হয়েই মার্টিনীকে আনতে হয়েছে।