ডাকিণী (৮ম পর্ব)

2

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি শেষ করে বিড়বিড় করে বললাম, হায় আলেস। এসব বিচারের নামে প্রহসন তোমার জন্মের আগেও মানব সমাজে ছিলো, তোমার মৃত্যুর পরে এখনো টিকে আছে। তোমার আগে সক্রেটিস, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস প্রমুখ এর শিকার হয়েছেন। তোমার পরে, আমেরিকার লুথার কিং, ইতালির মোসলিনী, মার্কো, প্রমুখ। এমনকি এই কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের নামে প্রহসন হয়ে গেছে। মানব সমাজে কোন কালেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, আর কখনো হবেও না। তাই বলে তুমি মরে গিয়েও এই কর্টেজকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে? পরপারে তোমার জন্যে নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। হয়তো ওখানে মার্টিনী তোমার পথ চেয়ে আছে। তুমি যাচ্ছ না কেন? লাইব্রেরীর এক কোন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। দরজায় লেখা ভাসলো, “মুক্তি দাও আমায়।” এবার আমি গলা চড়িয়ে বললাম, কিন্তু কিসের মুক্তি? কার থেকে মুক্তি? প্রত্যুত্তরে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন লেখা বেরুলো।
আলেসের লেখায়,
“বাহ। আজ সকাল হতে না হতেই এক প্রহরী এসে আমায় কতগুলি ফল, পানি, আর রুটি দিলো। প্রথমে এদের এই আকর্ষিক মহানুভবতার কারণ বুঝতে না পারলেও এখন ভালই বুঝতে পারছি। চারদিন পর যখন আমার লাশটা শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হবে তখন সে জীর্ণশীর্ণ দেহ থেকে যথেষ্ট যৌন সুখ নাও পেতে পারে। তাই এই চারদিন আমাকে খাইয়ে দাইয়ে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। আমি গতরাতে আমার ডাকিণী হওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছি। আমার ডাকিণী হওয়ার আসল কারণ হল আমার বাবার ফেলে যাওয়া পারিবারিক সরাইখানাটি। আমাদের সরাইখানাটি শহরের প্রায় তোরণদ্বারে অবস্থিত। শহর থেকে যারাই বেরুয় বা যারাই শহরে নতুন আসে তারা সবাই এই সরাইখানায় রাত কাটাতো। ফলে আমাদের প্রচুর মুনাফা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ওটা আমার মালিকানাধীন ছিলো। এমতাবস্থায় যেহেতু আমার কোন সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিলো নাহ তাই আমি মারা গেলে সরাইখানাটি পরিতাজ্য সম্পত্তি হিসাবে গির্জার অধীনে চলে যাবে। গির্জার প্রিস্ট ও সেবকদের জন্যে অতিরিক্ত আয়ের উৎস খুলবে। তাই শুধু এই সরাইখানাটির মালিকানার জন্যেই আমি আজ এক ভয়ঙ্কর ডাকিণীতে পরিণত হয়েছি। এসব বিচার, ডাকিণী অপবাদ, কেবল লোক দেখানোর নাটক বৈকি আর কিছু নয়। সবই স্পষ্টত ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমি এতে এতটাই জড়িয়ে গেছি যে মৃত্যুর পরেও আমি এ থেকে বেরুতে পারব নাহ। রবিবার প্রার্থনার পর ফাঁসির দড়ি আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে আসবে নাহ। আসবে আমাকে এখানে চিরতরে বেধে রাখতে। চারিদিকে কেবলি অন্ধকার। আমি একা একা এর মধ্যে কেবলই তলিয়ে যাচ্ছি, আরো গহীনে। কপালে দাসত্বের চিহ্ন নিয়ে। ”
পরের পাতায়,
” আজ দুপুরে ওরা আমায় সেই পুকুরে নিয়ে গেছিলো গোছল করাতে। কাল যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। তাই আজ শরীরটাকে একটু ঘসা মাজা করে একে প্রিস্টের যৌন শুদ্ধিকরণের জন্যে তৈরি করে নিতে হবে তো। আমি গোসল করতেই চাইছিলাম নাহ। কিন্তু আমাকে গোসল করানোর জন্যে দুজন বিশালদেহী মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। ওদের সাথে জোরাজোরি করার শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট নেই। তাই বাধ্য হয়েই সুবোধ মেয়ের মতো গোসল করে নিলাম। ওরা আমার সারা দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিষ্কার করে দিলো। ওরা আমার স্তন যৌনি নিতম্বে সবচেয়ে বেশী মনযোগ দিয়ে পরিষ্কার করলো। বুঝলাম এরা প্রফেশনাল। এদের কাজই হল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মেয়েদের দেহকে প্রিস্টের বিকৃত কামনা পুরণের জন্যে তৈরি করা। ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।”
ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৭ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি পড়ার পর মনে হয়েছিল আলেস তবে এভাবেই ধুকেধুকে মরেছিল! আজ পোল্যান্ডে প্রতি বছর ৬০ হাজার টন মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এদেশেরই একটা অকুতোভয় কন্যা একসময় খাবারের অভাবে ধুকেধুকে মরতে হয়েছিলো। নিজের দেশের(বাংলাদেশ) দিকে তাকিয়ে দুঃখ হল। সেই অজ্ঞতা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পোল্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণ নুয়ে পড়ার পরেও আজ উন্নতির শীর্ষে। কিন্তু আমার সুজলা সুফলা শস্য শামলা বাংলাদেশ আজো তৃতীয়বিশ্বের ক্ষুদা আর দারিদ্র পীড়িতদের কাঁতারে। যাহোক, ক্ষানিকের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আলেসের মৃত। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টাতেই আবারো আলেসের লেখা বেড়িয়ে পড়লো।

“আজ সন্ধ্যায় এক রক্ষী দুটো ভূট্টা আর এক মশক পানি নিয়ে এসেছিল। আমি ওর কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে খাবার নেইনি। কেন জানি মনে হল সেই হয়তো আমার মার্টিনীকে খুন করেছে। হয়তো ওর হাতে এখনো মৃত মার্টিনীর রক্ত লেগে আছে। গত রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল। ওর হাত থেকে খাবার নেওয়াটা আমার কাছে সেই স্বপ্নে দেখা মার্টিনীর ঝুলন্ত লাশ থেকে ঝরা রক্ত খাবার মতোই নিকৃষ্ট মনে হলো। আমি শুয়ে থাকলাম। ও কিছুক্ষণ খাবার হাতে দাড়িয়ে থাকল। যখন দেখলো আমি উঠে ওর কাছ থেকে খাবার নিচ্ছি নাহ তখন সে মশক আর ভূট্টা দুটো আমার সেলের ভেতর ছুড়ে ফেলে চলে গেল। মাটিতে পড়ে মশক ফেটে মেঝেতে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। সে পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মেঝে থেকে সবটুকু পানি চুষে খেলাম। আহ পানি…..ঈশ্বরের এক মহিমান্বিত উপহার। পানিটুকু খাওয়ার পর আমি ভূট্টা দুটো কুড়িয়ে খেতে লাগলাম। পানির অভাবে আমার গলাটা এতটাই শুকিয়ে গেছিলো যে ভূট্টার দানাগুলি বারবার আটকে যাচ্ছিলো। খাবার সময় গলায় প্রচন্ড জ্বালাপোড়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিলো যেন জ্বলন্ত কয়লা খাচ্ছি। কিন্তু তবুও পেটের দায়ে না খেয়ে উপায় ছিলো নাহ। একটা ভূট্টা খাওয়ার পর যখন অপরটিতে কামড় বসালাম তখন মনে পড়লো মার্টিনীর কথা। ও থাকলে হয়তো দুজনে ভাগ করে খেতাম। এতে পেট কম ভরলেই মনটা আনন্দে ভরে যেত। বুকের গহীন থেকে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। মনেমনে বললাম আমি আর পারছি না প্রভু।এই নৃসংশতা থেকে এবার আমায় মুক্তি দাও। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চল প্রভু। আজ রাতই যেন আমার এই ঘৃন্য জীবনের শেষ রাত হয়। কিন্তু প্রভু যীশু আমার গতরাতের প্রার্থনা অগ্রাহ্য করলেন। আমি বেঁচে রইলাম আরেকটি দুর্বিষহ দিনের অভিজ্ঞতা গ্রহণের জন্যে। ”

তার পরের পৃষ্টায় আবার লিখেছে,
” আজ সকালে এক প্রহরীর লাথি খেয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গল। অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল শরীর নিয়ে আমি এতটাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে প্রহরীর হাঁকডাঁকে কোন কাজই হয়নি। বাধ্য হয়েই ওকে কষ্ট করে সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আমাকে জাগাতে হয়েছে। আমাকে লাথি মেরে সে তার এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের শোধ নিতে চাইছে। ব্যাথ্যা পেলেও আমি ওকে কিছুই বললাম নাহ। ইদানীং ব্যাথা পেতে পেতে তা মুখবুজে সহ্য করাও শিখে ফেলেছি। শুধু অবাধ্য চোখ দুটো কোন বাধা মানে না। ব্যাথা পেলেই কয়েক ফোঁটা জল ছেড়ে দেয়। প্রহরী আমায় এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তৈরি হয়ে যেতে। আজ নাকি জনসম্মুখে আমার বিচার করা হবে। কাপড় পড়তে গিয়েও আমার মার্টিনীকে মনে পড়ে গেল। এইতো সেদিন আমরা একটা কাপড়কে দুজনে ভাগ করে পড়েছিলাম। আজ তার অনুপস্থিতিতে এ কাপড়ের মালিক আমি একাই। কিন্তু এই একাকীত্বই আমাকে সবচেয়ে বেশী যন্ত্রনা দিচ্ছে। ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের আঘাত বা অন্যকোন নির্যাতন নয়। মানুষের স্মৃতির এক আশ্চর্য ত্রুটি হল দুঃখ ভুলে যাওয়া কিন্তু সুখময় দিনগুলি মনে রাখা। মার্টিনীর সাথে সেই সুখময় দিনগুলির স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। মৃত্যু ব্যাতিত এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ খুলা নেই। কাপড় পরা মাত্র ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে একসময় আমরা একতালা গীর্জার ছাদে পৌছে গেলাম। রক্ষীরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে বেঁধে দিল। পূর্ব দিগন্তে তখন সবে মাত্র গ্রীষ্ম ঝলমলে সূর্যোদয় হয়েছে। তার উষ্ম পরশ আমার ভাঙ্গাচুরা শরীরটাকে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। একজন ঘোষক এসে গ্রামবাসীকে গীর্জা প্রাঙ্গণে একত্রিত হওয়ার আহব্বান জানালো। মানুষজন ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু করলো। তারপর সম্মান্বিত পাদ্রী গীর্জার ছাদে এসে বসলেন। শুরু হল তিন তিনটে খুনের দায়ে অভিযুক্ত ডাকিনী আলেসের বিচার।”
তার পরের পৃষ্টায়,
” মাননীয় পাদ্রী একে একে আমার উপর আনা সকল অভিযোগ উপস্থিত সবাইকে পড়ে শুনালেন! প্রথম অভিযোগ হল আমি নাকি সরাইখানার একক মালিক হওয়ার আশায় আমার বাবাকে অভিশাপ দিয়ে মেরে ফেলেছি। কি অদ্ভুত অভিযোগ। বাবা বেঁচে থাকতে আমি কখনোই সরাইখানায় যেতাম না। আমার ব্যবসাপাতিতে একটুও আগ্রহ ছিলো নাহ। যে জিনিসে আমার আগ্রহই নেই তার একচ্ছত্র মালিকানার জন্যে আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে খুন করব! এটা ভাবা যায়? তাছাড়াও বাবার সম্পত্তি তো তার একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার কপালেই জুটতো। তাকে খুন করে ছিনিয়ে নেবার কোন প্রয়োজনই তো ছিলো না। তবুও আমি পিতৃঘাতী। এটাই কি পৃথিবীর ন্যায়বিচারের উদাহরণ?
তার পরের অভিযোগ, আমি নাকি সামান্য কটা স্বর্নমুদ্রা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যে সরাইখানার এক ঘুমন্ত অতীথিকে খুন করেছি! ঐ মদ্যপ বুড়োটার কাছে স্বর্নমুদ্রা থাকলে তো নিবো। সে যা আয় করে সবই আমার সরাইখানায় মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। ওর কাছে স্বর্নমুদ্রা আছে এমনটা ভাবাও পাগলামি। আর যদি ঘুর্ণাক্ষরে দু একটা স্বর্নমুদ্রা থাকতো এবং আমার সেটার প্রয়োজন হতো তো আমি ওকে দু বোতল মদ দিয়েই তা বাগিয়ে নিতে পারতাম। খামাখা ওকে খুন করতে যেতাম কেন?আমার এই অতিসাধারণ যুক্তি তর্ক গুলি বিচারে গ্রহণ করা হলো নাহ। আমাকে ওই মদ্যপটার খুনি হিসাবেই চিহ্নিত করা হলো।
অতপর ওই অভাগা রক্ষীকে হত্যার অভিযোগ উঠলো। এবং যথারীতি সকল যুক্তিতর্কের উর্ধে উঠে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। অতপর প্রিস্ট এসে সর্বসম্মুখে আমার গালে চড় মারলেন। নিচে গীর্জা প্রাঙ্গণে গণজমায়েতের মাঝে ওনেক শিশুও ছিলো। এতো গুলি লোকের সামনে এভাবে অপমানিত হওয়ার লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হলো। অতঃপর বিচারের রায় ঘোষনা করা হলো। “ডাইনি আলেসকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর গীর্জা প্রাঙ্গণে সর্বসম্মুখে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। ” মৃত্যুদণ্ড শব্দটা আমার কানে যেন মধু বর্ষণ করলো। আর মাত্র চারদিন। এর পরেই আমি এই নির্মম পৃথিবী ছেড়ে আমার স্রষ্টার পাণ পাড়ি জমাবো। শাস্তি ঘোষনার পর প্রিস্ট তার হাতের আংটি খুলে তা আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিলেন। গভীর একটা পোড়া দাগ আংটির উপর মুদ্রিত নকশা সমেত আমার কপালে বসে গেল। এটা সেই চিহ্ন যা দ্বারা একজন ডাইনিকে চিহ্নিত করা হয়। কপালের অসহ্য জ্বালাপোড়া আর মিথ্যা ডাইনি অপবাদের যন্ত্রনায় আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। আমার কান্না দেখে উপস্থিত অনেকেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। অতপর প্রিস্ট সগর্বে গীর্জার ছাদ থেকে নেমে গেলেন। প্রিস্ট চলে যেতেই উপস্থিত জনতা আমার দিকে বৃষ্টির মত পাথর ছুড়তে লাগলো! যারা পাথর ছুড়ছিল তাদের প্রায় সবাইকেই আমি চিনি। তাদের মধ্যে ছিলো জোসেফ আন্টোনিও, সেই মোখপোড়া চাষি। গতবছর ওর ক্ষেতের ফসল আগাম শীতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফসল ফলাতে পারেনি বলে সে বউ বাচ্চা নিয়ে শীতে উপোস করে মরতে বসেছিলো। একরাতে সে আমাদের বাসায় এসে কিছু অর্থকড়ি ভিক্ষা চায়। আমার বাবা ওকে সাফ মানা করে দেন। কিন্তু ওর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে আমি আমার বড়দিনের উপহার কেনার জন্যে জমানো টাকার পুরোটাই তার হাতে তুলে দেই। সেই শীতের রাতে সে আমাকে মা মেরী অবতার বলে কুর্নিশ করেছিল। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের ব্যবধ্যানে আজ রোদ্রউজ্জল গৃষ্মে সে আমাকে ডাইনি বলে পাথর ছুড়ছে! কতই না দ্রুত এই মানুষগুলি বদলে যায়। তারপর চোখ পড়লো রজার বরিসের দিকে। আমার প্রাক্তন প্রেমিক। সেও সবার সাথে তাল মিলিয়ে আমার দিকে সমানে পাথর ছুড়ছে। অথছ কদিন আগেও সে কতনা মধুর কন্ঠে আমার রূপের প্রসংশা করতো। প্রতি বৃহষ্পতিবার সন্ধায় ও আমাদের গোয়ালঘরের পেছনে আমার সাথে মিলিত হবার জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো। আমিও বোকার মতো বাবার চোখকে ফাকি দিয়ে ওর মতো একটা লম্পটের সাথে মিলিত হতাম। ও আমাকে স্বর্গদেবী বলে ডাকতো। এইতো দুমাস আগেও সে তার স্বর্গদেবীকে বিছানায় পাবার জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আজ সেই স্বর্গ দেবীকে নরকের ডাইনি বলে গালি দিচ্ছে আর খুজে খুঁজে বড় পাথরগুলি বের করে ছুড়ে মারছে। ধ্বংস হোক এমন স্বার্থপর লম্পট পুরুষজাতির। ওর দিকে তাকাতেও আমার ঘেন্না হচ্ছে।
গীর্জা প্রাঙ্গণের এক কোণে কতগুলি শিশু কিশোর জড় হয়ে হৈ হোল্লড় করছে আর আমার দিকে পাথর মারছে। কচি অপ্রস্তুত হাতে ছোড়া পাথরগুলির বেশীরভাগই লক্ষভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের মধ্যে আমি আলেক্স রবার্ট উইলসন কে দেখতে পেলাম। ওর মা আমার প্রতিবেশী। ছেলেটা দেখতে খুবই সুন্দর। কচি বয়স ৪-৫ হবে। এইতো সেদিন ওর জন্মের সময় খুব বেশী তুষার ঝড় হয়েছিল। রাস্তায় তুষার জমে আমাদের গ্রামটা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এমন প্রতিকুল পরিবেশে ওর মায়ের যখন প্রসব বেদনা উঠে তখন কোন ধাত্রীকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো নাহ। ওদিকে সে তার মায়ের যৌনিতে উল্টো হয়ে আটকে গেছিলো। ওর বাবা বাড়ি ছিলো নাহ। লোকটা কাঠ কাটতে পার্শ্ববর্তী উইলো জঙ্গলে গিয়েছিলো। ওর মা ঘরে সম্পূর্ণ একা কাতরাচ্ছিলো। সেদিন তার আর্তচিৎকার শুনে আমি ওদের বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম। গরম পানি তৈরি করে, ওর মা কে শুইয়ে আমি নিজের হাতে ছেলেটাকে টেনে বের করেছিলাম। আমার হাত ধরেই ও এই পৃথিবীতে এসেছিলো। কৃতজ্ঞতাবশত তার মা আমার নামের সাথে মিলিয়ে তার নামকরণ করেন আলেক্স। আজ সেও আমার পর হয়ে গেছে! অতপর পাথরের আঘাতের তীব্রতায় আমি এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। রক্ষীরা আমার অজ্ঞান দেহকে বয়ে সেলের ভেতর নিয়ে এলো। জানিনা কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম রাত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই দেখলাম সেলের এক কোনে রক্ষীরা খাবার আর পানি রেখে গেছে। হয়তো জীবনের শেষ চারটে দিন ওরা আমায় অভুক্ত রাখতে চায় না। খেয়ে দেয়ে আমি আবারো লিখতে বসলাম। মৃত্যু প্রতিক্ষায়, জীবনের আতিবাহিত আরেকটি দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনের বর্ণনা।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৬ষ্ঠ পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

মার্টিনির জন্যে আমার হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। স্রষ্টাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতে লাগলো আমার কাছে। এভাবে পুতুলের মতো একটা মেয়েকে অকালে এভাবে নিয়ে গেল কেন? কি দোষ ছিলো তার? একজন বা কয়েকজনের প্রাণ নিলে সে খুনি। কিন্তু একে একে যে সবার প্রাণ যে হরণ করে সেই ঈশ্বর। জগতের কি অমোঘ লীলা! পরের পৃষ্টায় গেলাম,

আলেস লিখেছে,
“কাল রাতে একটুও ঘুমুতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই মার্টিনীর চেহারাটা ভেসে উঠছে! জানি আজ রাতে ওর মৃতদেহটাকে শুদ্ধিকরণের নামে প্রিস্ট ভোগ উৎসবে মেতে উঠবে। আমি যেন ওর আত্মার আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। গীর্জার ঐ উপরের তলায় সে সাহায্যের জন্যে হাহাকার করছে। ওর অতৃপ্ত আত্মাটা হয়তো অসহায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে, নিজের প্রাণহীন দেহটাকে কিভাবে ঐ জানোয়ারটা খুবলে খুবলে খাচ্ছে! ছিঃ। কোন মানুষ তার স্বজাতির মৃতদেহের এমন অমর্যাদা করতে পারে তা আমার জানা ছিলো নাহ। তাও আবার ঈশ্বর গৃহ গীর্জার ভেতরে বসে! হে ঈশ্বর তোমার গজব দিয়ে এই নষ্ট গীর্জাকে ধ্বংস করে দাও। এই শয়তানের আখড়া পুড়িয়ে ছাই করে ফেলো! প্রতিদিনকার মতো আজ সকালেও ওরা খাবার দিয়ে গেছে। চারটে রুটি। কিন্তু আজ আমি কার সাথে ভাগ করে খাব? মার্টিনী তো চলে গেছে। তাই খাবারের পুটলিটা আমি সেলের ফাঁক গলে ওদের উপর ছুড়ে ফেলে দিলাম। আর চিৎকার করে বললাম, তোদের খাবার তোরাই খা। শুধু আমার মার্টিনীকে ফিরিয়ে দে। এক শয়তান রক্ষী ভেঙ্গচি কেটে বলল, “ঐ ডাইনিকে নরকে পাঠানো হয়েছে। শীঘ্রই তোকেও সেখানে পাঠানো হবে।” যদিও আমি খুন না করেও খুনের দায়ে দোষী তবুও জীবনে কখনোই আমার মনে কারো প্রাণনাশের স্পৃহা জাগেনি। কিন্তু আজ প্রচন্ড ইচ্ছা করছিলো ঐ রক্ষীকে মেরে নরকে পাঠিয়ে দেই। একরাশ থুথু ওর মুখে ছিটিয়ে দিলাম। শয়তানটা অপর রক্ষীর হাত থেকে চাবুক নিয়ে আমার সেলে ঢুকে আমাকে খুব পিটালো। নিয়মিত চাবুক খেতে খেতে আমার পিটে পূঁজ হয়ে গেছে। ও যখন এই ক্ষত বিক্ষত পিঠে আবার মারলো তখন মনে হলো প্রতিটা চাবুক যেন পিঠ ভেদ করে হৃদপিন্ডে আঘাত করছে। খুব বেশীক্ষণ এ আঘাত সহ্য করতে হয়নি আমায়। দুচারটা চাবুক খাবার পরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সেলে সম্পূর্ণ একা আবিষ্কার করলাম। একাকীত্ব আর শূন্যতা পুরো হৃদয়কে গ্রাস করলো। এই একাকীত্ব থেকে বাঁচতেই বাইবেলটা নিয়ে লিখতে বসলাম।”

এ পৃষ্ঠাটা পড়ে চোখ বন্ধ করতেই যেন আলেসের ক্ষত বিক্ষত পিঠটা দেখতে পেলাম। ওহ! এই সাহসী মেয়েটা এতকিছু সহ্য করতে পেরেছে শুধু মার্টিনীর অপমান ছাড়া। তাই রক্ষীটা যখন মার্টিনীকে নরকে পাঠানোর কথা বলে তখনই সে সাপের মতো ফুসে উঠেছে। নির্যাতন নিশ্চিত যেনেও এর প্রতিবাদ করেছে! শুধু অনুভব করলাম জেলের অন্ধপ্রকোষ্টে এই দুই নারীর প্রেম অবলীলায় লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের মত প্রেমগাথাঁকে ম্লান করে দেবার যোগ্যতা রাখে।

পরের পৃষ্টায়,
“সেদিনের ঘটনার পর থেকে আজ দুদিন হয়ে গেল, ওরা আমাকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর সপ্তাহ খানেক আগের সেই নোংরা শুদ্ধিকরণের পর থেকেই ওরা আমাকে নগ্ন করে রেখেছে। ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম এগিয়ে আসছে বলে ঠান্ডা থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছি। কিন্তু পিপাসায় বোধ শক্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করেছে। গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি মার্টিনীকে আমার সেলের ভেতর ফাঁসীতে ঝুলানো হয়েছে। ওর ঘাড় ভেঙ্গে ধড়টা বেকায়দা ভাবে ঝুলছে। মৃত্যু যন্ত্রনায় সুন্দর মুখটা হা হয়ে জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে। ওর খোলা মুখ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে আর আমি তৃষ্ণার তাড়নায় মেঝে থেকে সে রক্ত চেটে চেটে খাচ্ছি। উহঃ। কি বীভৎস স্বপ্ন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি অনেক ক্ষণ কেঁদেছিলাম। কিন্তু তৃষ্ণায় সবটুকু পানিই শুকিয়ে গেছে। চোখ থেকে বেরুনোর মত আর কোন পানি অবশিষ্ট ছিলো না। দুপুরের দিকে তৃষ্ণার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে অঞ্জলি ভরে নিজের মুত্র পান করেছি। হলুদ বিস্বাদ তরলটা যেন আমার পিপাসাটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছি, তাড়াতাড়ি খাবার -পানি না পেলে আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত। তাই শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে এখন লিখতেছি। জীবনের শেষ অক্ষরমালা। জীবনের শেষ শব্দ, মার্টিনী।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৫ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

সেদিন অফিসে মন দিতে পারলাম নাহ। ঘুমের ঘোরে একসময় ডেস্কে মাথা ফেলেই কুপোকাত। কপাল ভাল অফিসে আমিই এক্সিকিউটিভ অফিসার। আমার উপরে কেউ নেই। আমার কোন বস থাকলে এতক্ষণে সোজা ঘাড় ধরে অফিস থেকে বের করে দিত। আজ বিকালটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। অফিস যেন শেষ হতেই চাইছে না। অবশেষে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় চলে এলাম। কাপড় ছেড়ে একটা লম্বা শাওয়ার নিলাম। আয়নায় চোখ যেতেই দেখলাম আলেস আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এবার ওকে দেখে মোটেও ভয় পেলাম না। বরং দুষ্টুমি করে চোখ টিপলাম। ও মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। ওকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে মন চাইলো। অঞ্জলিতে পানি নিয়ে আয়নায় ছিটিয়ে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আলেস আয়না থেকে চলে গেছে। শাওয়ার সেরে ডিনার রেঁধে খাবার টেবিলে বসলাম। খাবার টেবিলে আমি একটা প্লেট টেনে নিলাম আরেকটি প্লেট পেতে রাখলাম আলেসের জন্যে। জানি ও খাবার দাবার সহ সকল জাগতিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে তবুও কেন জানি ওকে ছেড়ে খেতে বসতে আমার বিবেকে বাধলো। খাবার শেষে লাইব্রেরীতে ফিরে গেলাম। আলেসের ডায়ারীটা আমার পড়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েই আছে। কাল বিলম্ব না করে পড়া শুরু করলাম।

” গত দুটো দিন কিছুই লিখতে পারিনি। প্রচন্ড জ্বর এসেছিল আমার। শরীরটা সেরাতের ধকল সহ্য করতে পারেনি। আধোঘুম আধোজাগরণেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ যখন হুশ হল তখন দেখলাম মার্টিনী আমাকে ওর কাপড় পড়িয়ে দিয়ে নিজে নগ্ন হয়ে আমার মাথার পাশে বসে আছে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ও হেসে সুপ্রভাত জানালো। নগ্ন মার্টিনীকে তখন আমার ভেনাসের চেয়েও বেশী সুন্দরি মনে হচ্ছিলো। ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, “জ্বর গায়ে নগ্ন থাকা ঠিক না। তাই আমার কাপড়টা খুলে তোমায় পড়িয়ে দিয়েছি। আর আমি তো জানিই তুমি আমাকে কাপড় ছাড়াই বেশী ভালবাস।” ওর কথা শুনে চোখে জল চলে আসলো। একটাই কাপড় আমরা দুজন ভাগ করে পড়তেছি। ও শুধু আমার জন্যে এই শীতেও সারাটি রাত নগ্ন থেকেই কাটিয়ে দিয়েছে! হায় ঈশ্বর! এ তোমার কেমন অসম বন্টন। তুমি মার্টিনীর হৃদয়ে যতটা ভালবাসা দিয়েছো তার এক কানাকড়িও যদি প্রিস্টের হৃদয়ে দিতে তবে আজ আমাদের এতটা কষ্ট পেতে হত না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে মার্টিনীকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। ও যে আমার জীবনের শেষ আশ্রয়। আমার ভেনাস দেবী। আমার স্বর্গের রাণী। আমরা দুজন দুজনাতে হারিয়ে গেলাম। এই মেয়েটা আমাকে স্বর্গসুখে ভাসিয়ে দিল। ওর সান্নিধ্যে এই নরকটা এক স্বর্গউদ্যানে পরিণত হল। মিলন শেষে আমরা দুজন একসাথে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ অনুভব করলাম মার্টিনী আমাকে ঘুমে রেখে উঠে চলে যাচ্ছে। মিটমিট চোখে দেখলাম ও এলোমেলো পা ফেলে উঠে সেলের এক কোণে যেয়ে বমি করলো। বুঝলাম ও অন্তঃসত্ত্বা। প্রিস্টের সন্তান ওর পেটে। দুদিনের ব্যবধানে আমাকেও ওর পরিণতি বহন করতে হবে। আমার পেটে হাত বুলালাম। কিছুই টের পেলাম না। কিন্তু আমি জানি এখানে একটা শুকরছানা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। শুধু একটাই আশা, মৃত্যুই পারে আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিয়ে আমার স্রষ্টার কাছে ফিরিয়ে নিতে। মার্টিনী ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে গভীর মমতা মাখা কন্ঠে বলল, “কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাস করে বাচ্চাটা কার আমি সোজা তোমাকে দেখিয়ে দেব। কি মনে হয়? পারবে তো আমার বাচ্চাটার বাবা হতে?” আমি ওর সুডৌল স্তনে চিমটি কেটে বললাম, যদি তুমি আমায় বিয়ে করে মিসেস আলেস হয়ে যাও তবেই পারব। আমার উত্তর শুনে ও উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। আমিও প্রাণ খুলে হাসলাম। এই বাহ্যিক হাসি ঠাট্টার আড়ালে প্রকৃত সত্যটা আমরা দুজনেই জানি। নিতান্ত ভাগ্যগুণে যদি আমরা এখান থেকে বেরুতেও পারি তবুও আমি আলেসকে বিয়ে করতে পারব নাহ। আমাদের সমাজ দুটো মেয়ের বিয়েকে কখনোই মেনে নিবে নাহ, তারা একে অন্যকে যতই ভালবাসুক না কেন।”
মনেমনে ভাবতে লাগলাম আলেস যদি এখনো বেঁচে থাকতো তবে কতই না খুশি হত। আজ আধুনিক পোল্যান্ড সমকামী বিবাহকে বৈধতা দিয়েছে। ইশ যদি আমি আলেস আর মার্টিনীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারতাম কত না মজা হত! এসব ভাবতে ভাবতেই পরের পৃষ্টায় গেলাম,
” আমার হৃদয়টা আজ ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না মার্টিনী আর নেই। আর কখনোই ও আমাকে ভালবাসবে নাহ। ওর নিষ্পাপ কচি চেহারাটা আর কখনোই আমি দেখতে পাব না! ওর মিষ্টি চুমু যা আমার শত নির্যাতন নিষ্পেষণকে মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিত তা আজ থেকে অতীত হয়ে গেছে। ওর জাদুকরী হাতের স্পর্শ যা আমায় নিমিষেই চরম যৌন সুখে ভাসিয়ে দিত, সে হাত দুটো আজ নিথর হয়ে পড়ে আছে! আজ ভোরে কতিপয় রক্ষী এসে বলল মার্টিনীর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ওকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। ও নির্লিপ্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো আমার দেহটার কি হবে? অপর এক রক্ষী উত্তর দিলো প্রিস্ট তোমার দেহকে পরপর তিন রাত শুদ্ধিকরণ শেষে আগুনে পুড়িয়ে দিবেন। এ গীর্জার নিয়ম অনুসারে বুঝি সকল ডাকিণীদেরই এই নিয়মে সমাহিত করার হয়। একথা শুনে মার্টিনী বাচ্চা মেয়েদের মতো ঢুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমাকে বাঁচাও আলেস। শয়তানটা শুদ্ধিকরণের নামে আমার মৃতদেহের সাথেও সঙ্গম করবে! ঈশ্বরের দোহাই লাগে, আমাকে বাঁচাও।” আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম। আমি বেঁচে থাকতে আমার ভেনাসকে এখান থেকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে নাহ। মনেমনে প্রার্থনা করলাম হে ঈশ্বর আমায় শক্তি দাও, আমায় গ্রহণ কর। মার্টিনীকে নিতে প্রথম রক্ষী সেলে প্রবেশ করা মাত্র আমি ওর উপর হামলে পড়লাম। ও তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। আমি ওর গলায় কামড় বসিয়ে দিলাম। ফিংকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসলো ওর গলা থেকে। এমন সময় আরেকটি রক্ষী আমার মাথার পেছনে বাড়ি মারলো। আঘাতের তীব্রতায় আমার চোখের সামনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে সেলে একা আবিষ্কার করলাম। বুঝলাম মার্টিনীকে ওরা নিয়ে গেছে চিরতরে! হায় ঈশ্বর, তুমি ওকে স্বর্গে যীশুর ঠিক পাশেই স্থান দিও। আমেন।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৪র্থ পর্ব)

1

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

এরপরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

“আজ হঠাৎ এক প্রহরী এসে চিৎকার করে আমাকে গালিগালাজ করতে লাগল। দুদিন আগে আমি যে রক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছিলাম সে নাকি সিমিলিয়ার যুদ্ধে মারা গেছে। স্বভাবতই এর ধরে নিয়েছে আমিই ওকে খুন করেছি। এই নিয়ে তিন তিনটা খুনের দায় আমার গলায় ঝুলছে। হায় ঈশ্বর, এই নির্বোধরাও কি তোমার সৃষ্টি? যুদ্ধে তো মানুষ যায় মারতে আর না হয় মরতে। না হয় ঐ রক্ষীটা মারা গেছে। কিন্তু তুমি তো জানো আমি ওকে খুন করিনি। আমি কাউকেই খুন করিনি। এরা শুধু শুধু আমাকে এখানে ধরে এনেছে। হায় ঈশ্বর। তুমি এর সুষ্ট বিচার কর। তুমি এই পাপীকে ক্ষমা কর। রক্ষীরা বলাবলি করতে লাগলো যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ততই নাকি মঙ্গল। এসব শুনে মার্টিনী খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। ও আমায় জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল। এ মুহূর্তে ওকে আমার কাছে ঈশ্বরের দূত মনে হল। এই অপবাদ, ঘৃনা, লাঞ্চনা, নিগ্রহের মাঝেও কেবল আমাকে ভালবাসতেই যেন ঈশ্বর স্বর্গ থেকে এক অপ্সরী মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ ঈশ্বর। এই পাপীকে দয়া করার জন্যে।”
তার পরের পৃষ্ঠা,
“আজ সন্ধায় ওরা আমাকে শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। সেলের দরজা খুলে ওরা যখন আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন মার্টিনীর সে কি কান্না। আমি তখনো জানতাম না শুদ্ধিকরণ জিনিসটা কি। যাওয়ার সময় আমি যতক্ষণ সম্ভব ওকে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। ও উন্মাদের মতো মাটিতে পড়ে নিজের চুল ছিঁড়ছে আর বিলাপ করছে। একটা সময় সেলের দেয়ালের আড়ালে ও ঢাকা পড়ে গেল। আমি সর্বশক্তিতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “মার্টিনী, আমি তোমায় ভালবাসি।” রক্ষীরা আমাকে নিয়ে একসময় প্রিস্টের কক্ষে পৌছে গেল। গীর্জার উঁচু তলায় সুরম্য কক্ষে, বিলাসবহুল আসনে অধিষ্ঠিত শ্মশ্রুমন্ডিত প্রিস্টকে দেখে আমি অবনত হয়ে সম্মান জানালাম। অতপর উনার পায়ে ধরে বললাম, “ধর্মাবতার, আপনি আমাকে চেনেন। আমি শৈশবে আপনার গীর্জায় দুবছর বিদ্যার্থী ছিলাম। আমার জীবনে এমন কোন রবিবার নেই যেদিন আমি সাপ্তাহিক প্রার্থনায় ফাঁকি দিয়েছি। আমি স্রষ্টার একজন একনিষ্ঠ সেবিকা হিসাবেই জীবনে বেঁচে থাকতে চাই। মা মেরীর কসম আমি ডাকিণী নই।”
প্রিস্ট আমার মাথায় লাথি মেরে বললেন আমি নাকি একজন ছদ্মবেশী ডাকিণী। ধার্মিকতার ছদ্মবেশ নিয়ে আমি নাকি ৩ জন কে খুন করেছি। তাই আমার অবধারিত শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু দন্ডের আগে অবশ্যই আমার দেহটাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে যেন মৃত্যুর পর আমার পাপাত্মা আমার দেহে আর ফেরত আসতে না পারে। প্রিস্টের ইঙ্গিতে দুজন রক্ষী এসে আমার দুহাত শক্ত করে চেপে ধরল। আর প্রিস্ট ছুরি দিয়ে আমার পরিধেয় কাপড় কেটে ফেলে আমাকে উলঙ্গ করে দিল। আমি লজ্জায় অপমানে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচালাম। আমার বিশ্বাস ছিল হয়তো মা মেরী আমার চিৎকার শুনে সাহায্য করতে আসবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে প্রিস্টের বিশাল হাতের চড় খেয়ে আমি লুটিয়ে পড়লাম।”
এ পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমার হাত পা অসার হয়ে আসতে শুরু করলো। অনেকটাই অনুমান করতে পারছিলাম এর পর অসহায় আলেসের উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টালাম।
” ওরা আমাকে পাশের কক্ষের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শেকলের সাথে বেধে দিলো। অতঃপর প্রিস্ট এসে আমার নগ্ন দেহে পানিপড়া ছিটিয়ে দিল।তারপর সে আমার দেহটাকে পুরো রাত জুড়ে চারবার ভোগ করল। আমি সারারাত মা মেরীকে ডেকেছি একটু সাহায্যের জন্যে। কিন্তু উনি আমার ডাক কবুল করেননি। সকালে আমাকে এই বিধ্বস্ত দেহেই সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরা আমাকে গোসলও করতে দেয়নি। আমার দুপায়ের মাঝখানে এতবেশী ব্যাথা করছিল যে আমি হাঁটতে পারছিলাম নাহ। কিন্তু রক্ষীদের নির্দয় চাবুকের আঘাতে টলতে টলতে কোনরকমে আমার সেলে পৌছালাম। সেলে মার্টিনী শুয়ে ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি খানিকটা ইতস্তত করলাম। আমার সারা দেহে রক্ত আর বীর্যের মাখামাখি। এ দেহে ওকে জড়িয়ে ধরলে তার কাপড় নোংরা হয়ে যাবে। কিন্তু ও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল নাহ। একটা সময় আমি ক্লান্ত দেহটা ওর বাহুডোরে এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে আমি আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। দেখলাম গীর্জার প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিশ ছোট্ট আলেসকে নিতে আমার বাবা মা এসেছেন। সাথে করে গরম ভূট্টা ভাজা আর রাইয়ের মন্ড নিয়ে এসেছেন। এসব পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে! তারপর বাবা মায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখলাম মার্টিনী তার কাপড়ের ছোট্ট কোন ছিড়ে একটা রুমাল বানিয়েছে। আর মশক থেকে পানি নিয়ে সে রুমাল ভিজিয়ে আমার দেহের নোংরা রক্ত, বীর্য মুছে দিচ্ছে। ঘৃণায় আমার মুখ বেঁকে গেল। ছিঃ। এটা যদি শুদ্ধিকরণ তবে কালিমালেপন কি? কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বাইবেলটায় লিখতে বসলাম। গতরাতের ঘটনা নিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। এভাবে ভোগ হওয়া হয়তো আমার কপালে লিখা ছিলো। কিন্তু আমার একটাই আফসোস। আমি ঐ প্রিস্টের মতো এক সাক্ষাৎ শয়তানকে ধর্মাবতার ডেকেছি। তার পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছি। এর চেয়ে আমি মরে গেলেই ভাল হতো। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়া শেষে আমার সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছিল! নিঃসন্দেহে আলেস অনেক সাহসী আর মানসিক শক্তি সম্পন্ন ছিল। এতটা নির্যাতনের পরেও সে ভেঙ্গে পড়েনি। স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস অটুট রেখেছিল। কিন্তু ধর্মের ধ্বজা ধারিদের ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা আমাকে বিষ্মিত করে। একেই হয়তো বলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এটাই হল ধর্ম ব্যবসার চরম রূপ। আলেসের মতই সেসব ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি ঘৃণায় নিজের অজান্তেই আমার মুখ কুঁচকে গেল। পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথেই আমার বেডরুমে অ্যালার্ম বেজে ঊঠলো! কি আশ্চর্য! আমি সারাটি রাত লাইব্রেরীতে আলেসের ডায়েরী পড়েই কাটিয়ে দিয়েছি! আলেসকে আমার একাকীত্বের বন্ধু, সুখ দুখের সাথী মনে হল। বিড়বিড় করে বললাম, তোমাকে ভালবাসি আলেস।

যাক। অনেক হয়েছে। এবার উঠে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমি আমার কটেজ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি নাহ। আমি এখানেই থাকব। আলেসের সাথে। আপাতত অফিসে যাচ্ছি। আলেসকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে নাহ। কিন্তু অফিসে যে যেতেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৩য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পরদিন ঘড়ির আলার্ম শুনে ঘুম ভাঙ্গলো। নিজেকে বাথরুমের ফ্লোরে আবিষ্কার করলাম। মাথাটা খানিকটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে জমাট বেধে আছে। টলমল পায়ে উঠে ভয়ে ভয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। এবার সবকিছু ঠিকঠাক। প্রতিবিম্বে আমিই আছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নাস্তা সেরে অফিসে গেলাম। অফিসের সহকর্মীদের কপালের আঘাতের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি। ওরা নিজনিজ কাজেই ব্যস্ত হয়ে গেল। সেদিন অফিস শেষে বাড়ি ফিরে কাপড় চোপড় গোছগাছ করতে শুরু করে দিলাম। আমি আর এ কটেজে থাকব নাহ। আর যাওয়ার আগে আলেসের ডাইরিটাকে পুড়িয়ে দিয়ে যাব। হয়তো এটাই ওর মুক্তির শেষ পথ। আমার ক্লজিটের সকল কাপড় লাগেজে পুরে নিলাম। তারপর লাইব্রেরিতে গেলাম আলেসের ডাইরিটা নিতে। লাইব্রেরীতে ঢুকা মাত্র লাইব্রেরীর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি সভয়ে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই দরজার ঠিক ওপাশ থেকে এক আর্তচিৎকার ভেসে এলো। এবার আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। তারপর সারা বাড়িতে যেন প্রলয় শুরু হল। জিনিসপত্র ভাঙ্গার আওয়াজ, কান্নার বিলাপ, দেয়ালে আঁচড় কাটা, আরো বিভিন্ন রকমের শব্দ। এক সময় আমি অসহ্য হয়ে চিৎকার করে বললাম, “আলেস, তুমি কি আমায় মেরে ফেলতে চাও? ” খানিক পরেই দরজায় লেখা উঠলো, “নাহ, চলে যেও নাহ। আমায় সাহায্য কর বন্ধু। ” অতঃপর দরজা খুলে গেল। আমি দৌড়ে আমার রুমে গেলাম। যেভাবে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনেছিলাম তাতে অনুমান করেছি আমার রুমের কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু রুমে ঢুকে দেখলাম সবকিছুই স্বাভাবিক ও সাজানো গোছানো। তারপর বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলাম। আমি জানিনা আলেস কে। ওর উপর হওয়া নির্যাতন আমাকে ব্যথিত করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আমার কটেজে একটা অশরীরীর উপস্থিতি মেনে নেব। একটা সময় কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। আয়নায় দেখা বিম্বের সেই মেয়েটি আমার পায়ের কাছে পড়ে কাঁদছে। তার মুখ কালো কাপড়ে বাধা। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু মুখে কাপড় থাকার কারণে পারছে নাহ।এক সময় সে তার কটিবস্ত্রের মধ্য থেকে সেই বাইবেলটা বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর ঘুরে চলে গেল। মাঝরাতে স্বপ্নটা দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠে দুগ্লাস পানি খেলাম। তারপর ফ্রিজ থেকে দুটুকরো স্যান্ডুইচ খেয়ে রওনা হলাম লাইব্রেরী পানে। রহস্যের সব জট এখন ঐ বাইবেলের দিকে ইঙ্গিত করছে যাতে লেখা আছে আলেসের ডায়ারী। লাইব্রেরীতে গিয়ে ওটা বের করে আবার আলেসের লেখা পড়তে শুরু করলাম।
“আজ সকালে রক্ষীরা আমাদের খাবারের সাথে সাথে মার্টিনীর জন্যে দুই প্রস্থ কাপড়ও দিয়ে গেল। ও যখন কাপড় পরছিল তখন আমার হৃদয়ে হতাশা মোচড় দিয়ে উঠলো! ওর নিজের কাপড় আছে। এখন থেকে ও হয়তো আমার কোলে ঘুমুতে চাইবে নাহ। কিন্তু পরক্ষণে সে হতাশা উবে গেল। নীল কাপড়ে ওকে রাজকুমারীর মত লাগছে। আমি ওর উপর থেকে চোখ ফিরাতে পারছিলাম নাহ। ব্যাপারটা ওর নজর এড়ালো নাহ। ও মৃদু হেসে জিজ্ঞাস করলো কেমন লাগছে ওকে। আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারলাম, অসাধারণ। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে আজ রাতে আমার কোলেই শুয়ে পড়লো! তবে কি সেও আমাকে ভালবাসে? নাকি এটা নিছক একত্রে ভাল থাকার অভিনয়। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু ও দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। আমার বুকে ও বারবার মুখ ঘসছে। মনে হচ্ছে যেন ভালবাসার শেষ আশ্রয় খুঁজছে। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম। এই মেয়ে দুটো প্রমাণ করে গেছে, ভালবাসা স্থান, কাল, উঁচু নীচু, জাত ভেদ, বর্ণ লীঙ্গ ভেদাভেদ মানে নাহ। ভালবাসা ভালবাসাই। পৃষ্ঠা উল্টে পরের পাতায় গেলাম।
” কাল এক স্বপ্নময় রাত কাটিয়েছি আমি আর মার্টিনী। ওকে এভাবে কাছে পাবো কখনোই কল্পনা করিনি। এই মেয়েটা শুধু দেখতেই সুন্দরি না, বিছানায়ও অসাধারণ। ঈশ্বরের অমায়িক সৃষ্টি। হে স্রষ্টা আমায় ক্ষমা কর । আমার হেন পাপ মোচন কর। কিন্তু আমার পাপের শাস্তি তুমি মার্টিনীকে দিওনা কভু। দরকার হলে ওর মৃত্যুদ্যুতকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও তবুও ওকে এই নরক থেকে উদ্ধার কর প্রভু। আমেন।”
তার পরদিন ও লিখেছে,
“আজ ধরে আনার ৭ দিন পর ওরা আমাকে আর মার্টিনীকে একটা ছোট্ট পুকুরে নিয়ে যায় গোসল করাতে। যাহোক ওরা একদম নির্দয় নয়। পুকুরের উষ্ম প্রস্রবণে গা ডুবিয়ে দিতেই চাবুকের ক্ষতগুলিতে অসহ্য জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল। আমি আর মার্টিনী জল ছিটানোর খেলায় মেতে উঠলাম। কিন্তু বেরসিক রক্ষীদের তা পছন্দ হল নাহ। একটা নেতা গোছের রক্ষী এসে আমার আর মার্টিনীর দিকে পাথর ছুড়ে মারতে লাগল। আমি নীচু হয়ে যাওয়ায় পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা পেলাম কিন্তু বেচারি মার্টিনীর আহত মাথায় আবারো একটা পাথরের আঘাত লাগল! আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। এরা আমার সামনে আমার প্রিয়াকে আঘাত করতে পারে নাহ। আমি ওদের চিৎকার করে অভিশাপ দিলাম যেন সে শীঘ্রই নরকে প্রবেশ করে। আমার অভিশাপ শুনে ঐ রক্ষী সভয়ে পিছিয়ে গেল। ওরা আমাকে ডাইনি ভাবে। তাই আমার অভিশাপকে ভয় পেয়েছে। নিজেকে একটু হলেও ক্ষমতাবান মনে হল। মার্টিনীকে আর আমাকে আবার সেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। প্রভু তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকের এই চমৎকার দিনের জন্যে। ”

এই পৃষ্ঠা পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার লাইব্রেরীর দরজা সশব্দে বন্ধ হল। আর ধুলোর মধ্যে লেখা ফুটলো, আলেস+মার্টিনী। এই প্রথম আমি আলেসের ডায়রি পড়ে হাসলাম। মেয়ে দুটো এত্তসবের মাঝেও প্রেমে পড়েছিল আর জেলখানায় চুটিয়ে প্রেম করছিল। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তখনই খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। আমিও সে হাসিতে যোগ দিলাম। আলেসের প্রতি আমার ভয় ভীতি সবকিছুই কেটে গেল। নিঃসঙ্গ কর্টেজে এমন একজন সঙ্গিনী পাওয়া মন্দ কি? হোক না সে অশরীরী।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (২য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

“আজ হঠাৎ করে আমার সেলের দরজা খুলে, আমার সমবয়সী এক নগ্ন মেয়েকে ছুড়ে ভেতরে ফেলা হল। রক্ষীরা চেঁচিয়ে বলল, “দুই ডাকিণী একসাথে মর।” ওরা যতবারই আমাকে ডাকিণী বলেছে আমি উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এবার আমি নবাগত মেয়েটিকে দেখে খানিকটা আভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটা এক কোথায় অপরূপা সুন্দরী। মুখের ছলে যাওয়া চাবুকের দাগ কিংবা সারা শরীরের নির্যাতনের চিহ্ন তার সৌন্দর্য্যকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। ও বার দুয়েক মাথা তুলার চেষ্টা করতেই জ্ঞান হারালো। আমি ওর কাছে যেয়ে ওকে দেখতে লাগলাম। ওর অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। ওর মাথার পেছনে বড় একটা ক্ষত যা থেকে তখনো রক্ত বেরুচ্ছিল। আমি আমার কোটিবন্ধনী দিয়ে ওর মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিলাম। এই শীতে অসুস্থ মেয়েটাকে ধুকেধুকে মরতে দেখে আমার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো। চাবুকের অসংখ্য আঘাতে আমার নিজের কাপড়ই ছিড়ে একাকার। তবুও যতটা সম্ভব ওকে আমার কোলে জড়িয়ে রেখে গরম রাখার চেষ্টা করলাম। দেয়ালে টাঙ্গানো একটা মশাল এনে ওর পাশে পুঁতে দিলাম। ওকে কোলে নিয়েই এখন লেখতেছি। মশালের আলোয় ওকে আরো অপূর্ব লাগছে। আমাকে ক্ষমা কর ঈশ্বর। আমি তোমার এই অপরূপ সৃষ্টির প্রেমে পড়ে গেছি। ”
এই পৃষ্ঠা পড়ে বুঝলাম আলেস এক নারী সমকামী ছিল। ওই মেয়েটার সহচর্য এই নিদারুণ বন্দিত্বেও ওর হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার তোলেছিল। অথবা হয়তো ও সমকামী ছিলনা কিন্তু পরিস্থিতি ওর মনে খানিকের মোহের সৃষ্টি করে। কিন্তু নতুন মেয়েটার নাম কি ছিল? প্রশ্নটা আমার মাথায় আসতেই লাইব্রেরীর দরিজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ধুলি মাখা দরজার কপাটে আলেসের সুস্পষ্ট হস্থাক্ষরে একটা নাম ফুটে উঠলো, “মার্টিনী।” ক্ষানিক পরেই তা আবার ধুলায় মিলিয়ে গেল। এবার প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আলেস মরে গিয়ে আমার কর্টেজে আটকে পড়েছে। আজ এই লাইব্রেরীতে ও আমার সাথে আছে। কিন্তু আমি ওকে দেখতে পারছি নাহ। এটা ভাবতেই আমার ঘাড়ের সবকটি লোম দাড়িয়ে গেল! প্রচন্ড ভাবে ঘামতে শুরু করলাম। ঠিক তখনই বদ্ধ ঘরে কোথা থেকে একটা দমকা হাওয়া এসে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে আলেসের লেখা পরবর্তী পৃষ্টায় নিয়ে গেল। বুঝলাম আলেস চাইছে যেন আমি ওর লেখা পড়ি। আমার মনে হলো ও দরজা আটকে আমার পালানোর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন যদি আমি ওর ইঙ্গিত না শুনি তবে এই বদ্ধ লাইব্রেরীতে ও হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে। ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকালাম। দরজায় আবার লেখা উঠলো, “সাহায্য কর বন্ধু। ” তারপর আস্তে করে দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলে যাওয়ায় আমার মনে কিছুটা সাহস ফিরে আসলো। আলেস আমাকে বন্ধু বলে সম্বোধকরেছে! ওর সাহায্যের প্রয়োজন। কিন্তু কেন? শেষ মেষ কি হয়েছিল ওর ভাগ্যে। এসব কৌতুহল আমাকে ওর পরবর্তী পৃষ্ঠা পড়তে বাধ্য করল। সেখানে লেখা ছিল,
“আজ সকালে আমার কোলেই মেয়েটার জ্ঞান ফিরলো। আমি ওকে শুভ সকাল জানালাম। কিন্তু ও ভাবলেশহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তন্মধ্যে রক্ষীরা চলে আসলো। আমাকে এখানে নিয়ে আসার তৃতীয় দিনের মাথায় ওরা প্রথম আমাকে খাবার দিলে। খাবার বলতে ছিল চার টুকরো বাসী পঁচা রুটি আর এক মশক পানি। আমি দুটুকরো রুটি ঐ মেয়েটাকে দিয়ে দিলাম। ও বুভুক্ষুর মত গোগ্রাসে গিললো। খাবার শেষে পানিটুকু আমরা দুজন ভাগ করে খেলাম। স্রষ্টাকে অসংখ্য ধন্যবাদ উনি অভুক্তদের খেতে দিয়েছেন, তৃজ্ঞার্তদের পান করিয়েছেন। আমি এবার মেয়েটার কাছে গিয়ে ওর মাথার ক্ষতটা দেখলাম। সারতে অনেক দেরি হবে মনে হচ্ছে। তবে সেরে যাবে। খেয়াল করলাম ওর নগ্ন দেহে ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে গেছে। সারারাত জ্বলতে জ্বলতে মশালটাও নিভে গেছে। ও ঠান্ডায় মারা যেতে বসেছে। ওকে আবার আমার কোলে নিয়ে আসলাম। প্রথমে বাধা দিলেও এক সময় ও বাধ্য হয়েই এসে আমার কোলে বসল। আমার ছেড়া কাপড়টুকু আমি আমাদের দুজনের দেহের উপর টেনে দিলাম। ও আমার বুকে মাথা গুজঁলো। ও খানিকটা স্থির হলে আমি ওর সাথে কথা বলতে শুরু করিলাম। ও জানালো তার নাম মার্টিনী গুয়েন্থার। ও নিমেসুয়েরার পাহাড়ি গ্রামে থাকতো। ওর বাবা একজন ভেষজ চিকিৎসক। ওর বাবাকে স্থানীয় গীর্জার প্রিস্ট খুন করে। তার অপরাধ ছিলো সে একজন পানিতে ডুবা ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। ছেলেটার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও ওর বাবা ছেলেটাকে বুকে হাত দিয়ে চেপে বাঁচিয়ে ফেলে। প্রিস্টের মতে ছেলেটা মারা গিয়েছিল। কিন্তু ওর বাবা ছেলেটিকে মৃত্যুর ওপার থেকে কালোজাদুর মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছে। এর অপরাধে প্রিস্ট ছেলেটি ও মার্টিনীর বাবাকে শুলে চড়ায়। মার্টিনীকে ডাইনি আখ্যায়িত করে একরাত উলঙ্গ করে বরফে বেধে রাখে। পরদিন ওকে এখানে নিয়ে এসে …… মার্টিনী আর বলতে পারছিলো না। ও ফোঁপিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বুঝে গেলাম প্রিস্ট ওকে সারাদিন ভোগ করে রাতে আমার সেলে ছুড়ে ফেলেছিলো। আমি মার্টিনীকে আরো শক্ত করে আমার বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছুক্ষণ পর ও ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ওকে কোলে নিয়েই আবার লিখতে শুরু করলাম। ”
পৃষ্ঠাটা উল্টাতে গিয়ে খেয়াল হল ওটার অর্ধেকটা আমার চোখের পানিতে ভিজে গেছে। মনের মধ্যে ওসব ধর্ম ব্যাবসায়ী প্রিস্ট বাপিস্টদের প্রতি তীব্র ঘৃনা অনুভব করলাম। তখনই বেডরুমে আমার ফোনটা বেজে উঠে। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আমার রুমে ঢুকে ফোন ধরলাম। আম্মু ফোন দিয়েছে। আবার আম্মু আমাকে কাঁদতে দেখে ফেলল। জিজ্ঞাস করল আমার বাগদত্তার সাথে কোন সমস্যা হয়েছে কি নাহ। আম্মুকে উল্টাপাল্টা বলে আমি প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলাম। আম্মুর সাথে কথা শেষে চোখমুখ ধুতে বাথরুমে ঢুকলাম। বেসিনে নীচু হয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে যখন মাথা তুললাম তখন আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব ছিলো নাহ। ওটা অন্য একটা মেয়ে ছিলো। আমার অনুভব করলাম এটাই আলেস। আয়নার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। চিৎকার করে বাথরুমে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

দ্রষ্টব্যঃ

লেখিকা বলেছেনঃ আসলে উপন্যাসটিতে সমকামিতা আনতে চাইনি। কিন্তু আমি চাইছিলাম একটা টোটাল উপন্যাস যাতে একসাথে ভয় রোমাঞ্চ প্রেম ভালবাসা থাকবে। প্রথমে ভেবেছিলাম আলেসের সাথে একটা রক্ষীর প্রেম ঘটাবো। কিন্তু সেটা অতিরঞ্জন হয়ে যাবে। সবাই জানে মধ্যযুগীয় রক্ষীরা ভালবাসা বিবর্জিত খুনে লুটেরা টাইপের। তারপর চাইলাম আলেসের সাথে অন্য এক পুরুষ বন্দির প্রেম ঘটাবো। কিন্তু মধ্যযুগে ডাকিনীদের পুরুষ বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা হত। তাই সেটাও অসম্ভব। শেষে বাধ্য হয়েই মার্টিনীকে আনতে হয়েছে।

ডাকিণী (১ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

আজ আমার নতুন কর্টেজ কিনলাম। ফার্মাসিউটিক্যালস এ নতুন চাকুরী পেয়ে যেন কপাল হঠাৎ খুলে গেছে আমার। পাঁচ মাসের বেতন জমিয়ে কিনে ফেললাম এই কর্টেজটা। বিশাল কর্টেজ। সে তুলনায় প্রায় পানির দামে কিনেছি। ৭০ হাজার ইউরোতে এই বিশাল কর্টেজটা শুধু কপালগুণেই জুটতে পারে। কর্টেজটা আমি পোলিশ সরকারের কাছ থেকে নিলামে কিনেছি। এটা আগে একটা গীর্জা ছিল। সারাটা দিন পুরো কর্টেজ ঘুরে ফিরে দেখলাম। ওনেক পুরাতন বাড়িতেই ভুগর্ভস্থ কুঠুরি থাকে, কিন্তু আমার কর্টেজের ভুগর্ভস্থ কুঠরি বেশ ভিন্ন ধরনের। এক সারিতে পাঁচটা ঘর সবগুলিতেই ধাতব শিখ দিয়ে ঘেরা। কেমন যেন জেলখানা জেলখানা ভাব। উপরে একটা বিশাল লাইব্রেরি পুরাতন বই পুস্তকে ঠাসা। লাইব্রেরীতে কয়েকটা বই ঘাটতেই একটা পুরাতন বাইবেল আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মনে হল বাইবেলটা যেন টেনে আমার হাতটা তার উপর নিয়ে গেল। বাইবেলটার প্রথম পাতা উল্টাতেই একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। বাইবেলের প্রতিটা পাতার একপিঠে ছাপা আর অপর পিঠে কাঠ কয়লায় ছোট ছোট মেয়েলী হস্থাক্ষরে পোলিশ ভাষায় লেখায়। ধর্মকর্মে আমার এতটুকু আগ্রহ নেই তাই বাইবেল বাদ দিয়ে উল্টোপিঠের লেখাগুলি পড়তে শুরু করলাম। লেখার উপরে শিরোনাম ছিল ডাকিণী। প্রথম পাতার সরল বঙ্গানুবাদ হবে অনেকটা এরকম,
“আমি এক হতভাগী। নাম আলেস ভন্টেইজিয়ান। আমাকে ওরা ডাকিণীবিদ্যা চর্চার অপরাধে এখানে ধরে এনেছে। আমার বাবার একটা সরাইখানা ছিল। মা অনেক আগেই মারা গেছেন। গত সপ্তাহে বাবাও মারা যান। বাবার মৃত্যু পর আমিই সরাইখানার মালিক হই ও তাকে হারানোর শোক ভুলে কাজে মন দেই। সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে আসছিলো। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে দুদিন আগে। আমার সরাইখানায় একজন অতীথি মারা যায়। আমার যতটুকু বিশ্বাস লোকটা অতিরিক্ত মদ গিলে অক্কা পেয়েছে। কিন্তু কারা যেন গুজব ছড়িয়ে দেয় আমি নাকি ডাকিণী। আমি বুঝি ডাকিণীবিদ্যা প্রয়োগ করে আমার বাবা আর ওই অতীথিকে খুন করেছি। অতপর গীর্জা থেকে প্রিস্টের নির্দেশে আমাকে এখানে বন্দি করে আনা হল। সরাইখানাটা গীর্জার সম্পত্তি হিসাবে দখল করে নেওয়া হল। ডাকিণীবিদ্যার কিছুই জানিনা আমি। তবুও ওরা আমাকে কষে চাবুক মারল। কতবার আমি ওদের বললাম আমি ডাকিণী নই, আমি আলেস, তোমরা সবাই আমাকে চেন, আমি প্রতি রবিবার গীর্জায় প্রার্থনায় আসি, কিন্তু ওরা কেউ আমার কথা শুনল নাহ। একসময় আমি জ্ঞান হারালাম। তারপর জেগে দেখি আমি এখানে পড়ে আছি। জানিনা আমাকে আরো কত শাস্তি সইতে হবে তবুও আমি পণ করেছি যাই হোক না কেন আমি ডাকিণীর অপবাদ স্বীকার করব নাহ। বাইবেলটা আমার কুঠোরির এক কোণে পড়ে ছিল। মশালের নিচে থেকে এক টুকরা কয়লা নিয়ে পবিত্র বাইবেলে আমি ইশ্বরের নামে শপথ করে লিখছি, আমি ডাকিণী নই। ”
প্রথম পাতা পড়ার পরে মনের অজান্তেই মেয়েটার জন্যে চোখে পানি চলে আসলো। আমি জানতাম মধ্যযুগে মেয়েদের ডাকিণী অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হত কিন্তু কখন ভাবিনী এমন একজন ভিক্টিমের সাথে এভাবে পরিচিত হব। বুঝতে পারলাম আমার কর্টেজটাই সেদিনের গীর্জা ছিল আর কর্টেজের ভুগর্ভস্থ পাঁচ কুঠোরির কোন একটাতেই আলেসকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার পরের পৃষ্টার গতবাধা বাইবেলের লেখা উল্টাতেই আলেসের লেখাটা পেয়ে গেলাম।
“আজ দুদিন হল আমি এখানে আছি। এর মধ্যে এরা আমাকে একফোঁটা পানিও খেতে দেয় নি। একবার আমার প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে আমি ওদের অনেক ডাকলাম কিন্তু কেউ আমাকে বাহিরে নিয়ে গেল না। শেষে বাধ্য হয়েই এক কোণে কাজ সারলাম। হে ঈশ্বর কোন অপরাধে এই শাস্তি দিচ্ছ আমায়। খানি আগে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। মা কে স্বপ্নে দেখলাম আমার জন্যে গোশত আর রুটি নিয়ে এসেছে। তারপর জেগে দেখি একটা ইঁদুর আমার পায়ের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। ওটাকে ধরে ওর গলায় দাঁত ফুটিয়ে দিলাম। দুদিন উপোস থাকার পর এই ইঁদুরের রক্ত আমার পিপাসার্থ গলায় অমৃতসম মনে হল। ইঁদুরটা খানিকটা খাওয়ার পরেই এক পাহারাদার আমাকে দেখে ফেলল। ও চিৎকার করে বলতে লাগল আমি নাকি ইঁদুরটা খেয়ে প্রমান করে দিয়েছি আমি একটা ডাকিণী। আরো কয়েকজন পাহারাদার এসে ওর সাথে যোগ দিল। আমি ওদের বললাম আমি ক্ষুধার্ত হয়েই এটা খেয়েছি কিন্তু ওরা শুনল নাহ। একজন শিখের ফাক দিয়ে হাত গলিয়ে আমার গালে সশব্দে চড় বসিয়ে দিল। আমি মাটিতে পড়ে গেলে ওরা আমার সেলে ঢুকে ইঁদুরের বাকীটুকু নিয়ে গেল, প্রিস্টকে আমার ডাকিণীবিদ্যা চর্চার প্রমাণ দেখাবে বলে। আজ যা ঘটলো তাতে ওদের কাছে আমার ডাকিণী হওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেল। কিন্তু ঈশ্বর তো জানেন আমি ডাকিণী নই, আমি তার একনিষ্ঠ সেবক।”
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি ঢুকরে কেঁদে উঠলাম। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের উপর চলা অমানুষিক নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা পড়ে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমার মায়ের কাছে উদভ্রান্তের মতো ফোন দিলাম। আম্মু আমার লালচে চোখ আর ফোলে উঠা নাক দেখে আতঁকে উঠলো। আমি আম্মুকে আলেসের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম আম্মু, তোমাকে খুব মিস করছি তাই চোখে জল চলে আসছে। আম্মু কিছুক্ষণ আমাকে খুটিয়ে দেখে একগাল হেসে বলল পাগলী মেয়ে আমার। চিন্তা করিস নাহ। আগামী উইকএন্ডেই আমি তোর নতুন বাসায় বেড়াতে আসব। আমাকে দাওয়াত দিবি তো? আমিও খানিক হেসে বললাম নাহ। তোমাকে দাওয়াত দেওয়ার কি আছে? তোমাকে তো কোলে করে আমার বাড়িতে নিয়ে আসব। এভাবে আম্মুর সাথে কথা বলতে বলতে একসময় মন ভালো হয়ে গেল। সেদিন আর আলেসের ডায়েরি পড়িনি। পাছে যদি আবার মন খারাপ হয়ে যায়। একটা কমেডি মুভি দেখে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। কাল আবার অফিসে যেতে হবে।
সেরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমার কর্টেজের পেছনে কুয়োর পাশেই একটা মাঝারি ক্যাম্পফায়ারের মতো অগ্নিকুণ্ড যা জ্বলতে জ্বলতে একসময় একটা নারীমূর্তির আকৃতি ধারণ করলো, আর পর একটা কর্কশ চিৎকার, আর অগ্নিকুণ্ডটা দপ করে নিভে গেল।
পরদিন সকালে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে বাথরুমের আয়নায় চোখ পড়লো। ধুলি মাখা আয়নায় কে যেন ছোট ছোট হস্থাক্ষরে পোলিশ অক্ষরে সাইন দিয়েছে আলেস। চমকে দুপা পিছিয়ে আসলাম। তারপরে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গিয়ে আয়নায় ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম ওখানে কিছুই লিখা নেই। পুরোটাই ধুলি মাখা। আপন মনেই হাসতে লাগলাম। বুঝলাম এসব অচেতন মনের ফালতু কল্পনা। সেদিন অফিসের শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বিকালেই ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার মাসিক শুরু হয়েছিল তাই আরো বেশী ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। বিকালে সূর্যালোক থাকতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই কর্টেজের কোন বাতিই জ্বালাই নি। রাত ঘনিয়ে এলে কর্টেজটা অন্ধকারই থেকে যায়। মাঝরাতে একটা করুণ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। অন্ধকার রুমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না আমি। কিন্তু মনে হচ্ছিলো কান্নাটা আমার পাশের লাইব্রেরী থেকেই আসছে।হাতড়ে হাতড়ে রুমের আলো জ্বালিয়ে গেলাম পাশের লাইব্রেরীতে। যাওয়ার সময় আমার ডেজার্ট ঈগল পিস্তলটা সাথে নিলাম। ভাবলাম হয়তো কর্টেজে কোন নেকড়ে ঢুকেছে। রাতে মাঝেমধ্যে নেকড়ের ডাক অনেকটা মানুষের কান্নার মতোই মনে হয়। তাই আমি ঝুকি নিতে চাই না। আমার রুম থেকে বেরুনোর সাথে সাথেই কান্নার আওয়াজটা থেমে গেল। লাইব্রেরীতে গিয়ে আলো জ্বালালাম। লাইব্রেরীতে কিছুই নেই। তবে গতকালের বাইবেলটা ডেস্কে খোলা পড়ে আছে। আমি কাছে গিয়ে দেখলাম গতদিন আলেসের যে দুই পাতা আমি পড়েছিলাম তার পরবর্তী পাতা অর্থাৎ তৃতীয় পাতা বেরিয়ে আছে। যেন আমার পড়ার অপেক্ষায়। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে গতকাল আমি বাইবেলটা বন্ধ করে শেলফে তুলে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ এটা ডেস্কে এলো কিভাবে? ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে বাইবেলটা তুলে আলেসের লেখাগুলি পড়তে শুরু করলাম। ও লিখেছে, …….

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

বুনো শিয়ালের টিলা [শেষ অংশ]

0

ধূপের মালসাটি বিছানার কোণে রেখে য়ংদ্দ এসে আমার সামনে দাঁড়াল। কী যেন বলতে চায় মনে হল।আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কিছু বলবে?

য়ংদ্দ চুপ করে মাথা নীচু করে রইল। তারপর বলল, আপনি আজ এইখান থেইকে চইলে যান বাবু।

চলে যাব। কেন? আমি অবাক।

য়ংদ্দ ইতস্তত করে। তারপর বলল, আপনে এইখান থেইকে এখনি চইলে যান বাবু।

কী বলছ তুমি।মৃদু ধমক দিলাম লোকটাকে। আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। ধমক খেয়েও লোকটা ভড়কে গেল না। বরং বলল, নাইলে বিপদে পড়িবেন।

আমি য়ংদ্দর ওপর বিরক্ত হলাম। কী কারণে চলে যাব সেটাই তো বলছে না।ও স্থানীয় কুসংস্কারগ্রস্থ মানুষ। ওর কথায় আমি যাব কেন? আমার কেমন জেদ চেপে যায়। আজ ভোরে যামিনীরঞ্জন বলল, আজ কার্তিক মাসের সাত তারিখ। আজ রাতে মাইসাং ভিলায় মাইসাং চৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী জাগ্রত হবে। আপনি ভিলা থেকে চলে যান। আশ্চর্য! য়ংদ্দও আমাকে চলে যেতেবলছে। ভাবলাম এদের কথায় এখন ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে ফিয়াট পালিওসটা চালিয়ে সিধে কমলছড়ি থেকে ঢাকায় চলে গেলে ব্যাপারটা হাস্যকর দেখাবে না ?

ভোরে উঠে হাঁটাহাঁটি করি বলে আমি সাধারণত রাত দশটার মধ্যেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ি। তার আগে বিছানায় শুয়ে লেখাটায় একবার চোখবুলাই । মাথার কাছে টেবিলের ওপর কুপি জ্বলেছিল। ম্লান আলোয় পড়ছি। হাতে একটা বল পয়েন্ট। নতুন আইডিয়া এলে লিখে রাখি। এলোমেলো ভাবে লিখছি …,

এক্সটিএক্স-থ্রি গ্রহেরই অন্য একটি অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত উন্নত সভ্যতার আরেকটি নভোচারীর দল অবতরণ করবে। লৌহযুগে। ওদেরও স্মৃতি থাকবে এক্সটিএক্স-থ্রিবাসীর মনে । লিখিত ভাষার আবিস্কার পর তারা স্মৃতিকথা লিখে রাখবে। পরবর্তীতে এক্সটিএক্স-থ্রি গ্রহে উন্নত সভ্যতার বিকাশ হয়। আমাদের স্মৃতিকথাই একমাত্র সত্য- এই দাবিতে এক্সটিএক্স-থ্রিবাসী দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে … লেখাটায় টেকনিক্যাল তেমন কিছু নেই। মহাকাশের দূরতম এক সৌরজগতের একটি গ্রহে ঘটনা ঘটছে বলেই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। এক্সটিএক্স-থ্রি গ্রহের সভ্যতার অগ্রগতি … সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তন … বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক উন্নতি … আণবিক শক্তির আবিস্কার…স্মৃতিকথা নিয়ে বিভেদ …

দরজার কাছে খুট করে শব্দ হল। মুখতুলে তাকালাম। ঘরের মধ্যে তিনটেআবছা ছায়ামূর্তি আমার দিকে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। এর আগে এদের কখনও দেখিনি তা সত্ত্বেও মাইসাংচৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলীকে চিনতে পারলাম। … আমি জানি ওরা মিথ্যে। ছায়া। মরিচিকা। যামিনীরঞ্জনের গল্প থেকে উঠে এসেছে। এই মুহূর্তে আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কে যেন মাথার ভিতর থেকে বলল …

সোয়েব পালাও। ঘরে গিয়ে গাড়ির চাবি নাও। নীচে ফিয়াট পালিওসটা যাও দেরি করো না

…আমি উঠে দাঁড়ালাম। তারপর দাঁড়িয়ে থাকলাম। মাইসাং চৌধুরি থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি দাঁড়িয়েই থাকলাম। ভীষণ ঘামছি। তৃষ্ণা টের পেলাম। য়ংদ্দ ! বলে আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার গলায় স্বর ফুটল না।

আমার ঘুম ভেঙে গেল …

ঘরে অন্ধকার। কূপি কখন নিভে গেছে। জানালার কাছে জ্যোস্নার আলো। বাতাসে হালকা ধূপের গন্ধ। এখন ক’টা বাজে? টেবিলের ওপর হাতঘড়িটা আছে । আন্দাজে হাত বাড়ালাম। তিনটে বাজতে দশ মিনিট।লেখাটা পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টেবিলের ওপর একটা জগ আর গ্লাস। অসম্ভব তৃষ্ণা পেয়েছে। পানি খেলাম।

আজ রাতে আর ঘুম হবে না। গায়ে চাদর ধরিয়ে একটি সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। আকাশে পূর্ণিমার ধবধবে সাদা আলোয় কুয়াশার মিশেল । বেশ শীতও করছি। ভিলার পিছনে ঘন বাঁশঝাড়ের দিক থেকে পাহাড়ি শেয়াল ডাক ভেসে এল। ডাকে শরীরের রক্ত জমে যায়। ভালো করে তাকিয়ে নীচে য়ংদ্দ কে দেখলাম। আশ্চর্য! এত রাতে য়ংদ্দওখানে কি করছে? য়ংদ্দর ঠিক পাশে যামিনীরঞ্জন দাঁড়িয়ে । আমি চমকেউঠলাম। লোকটা য়ংদ্দ কে কী যেন বলছিল। কিন্তু, ওখানে … ওখানে যামিনী রঞ্জন কেন? কুয়াশায় কী যেন নড়ছিল। ভালো করে চেয়ে দেখি বুনো শেয়াল। একটি-দুটি নয- অজস্র। গুণে শেষ করা যাবে না। আমি সিগারেটে টান দিতে ভুলে গেছি। কুয়াশা ফুঁড়ে তিনটি ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। আমি চমকেউঠলাম। আমার হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ল। এদের আমি এর আগে কখনও দেখিনি। তবে মাইসাং থংজা, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী কে চিনতে ভুল হল না। অমঙ্গলী মুখ তুলে ওপরে তাকালো। আমাকে দেখছে?আমি আর ওই দৃশ্য এই মুহূর্তে মায়াছায়া মিথ্যে মরিচিকা ভাবতে পারলাম না । আমি জানি এবার আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে না। আমি তিনটি প্রেত দেখতে পাচ্ছি। যারাঅনেক অনেক দিন আগে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে মরে গিয়েছিল। ঠিক তখুনি আমার মাথার ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল …

সোয়েব! পালাও। ঘরে গিয়ে গাড়ির চাবি নাও। তারপর নীচে নেমে যাও। দেরি করো না। যাও। আমি ঘরে চলে এলাম। টেবিলের ওপর গাড়ির চাবি নেই। আমার বুক ধক করে উঠল…কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কারা যেন উঠে আসছে। আমার পা আটকেআছে। দরজার ওপাশে বুনো শেয়ালরা ভয়ানক গর্জন । আমার চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল ….

আমার চোখেমুখে গরম লাগছিল টের পেলাম । চোখ খুলে একটা গাছ দেখতেপেলাম । ডালপালার ফাঁকে সূর্যেরআলো। গাছটা কৃষ্ণচূড়া বলে মনে হল। কাকপাখিরা সব ডাকছিল। টের পেলাম মাঝ্যাং বিহারের ঠান্ডা চাতালের ওপর শুয়ে আছি।

আমি এখানে এলাম কী করে? আমার পাশে লাল রঙের চীবর পরা সেই বৃদ্ধ ভিক্ষু বসে আছেন। বৃদ্ধেরপাশে একটি তামার পাত্র। তাতে টলটলে পানি। পানিতে কয়েকটি পদ্মপাপড়ি। বৃদ্ধ ভিক্ষু আমার চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। কীঠান্ডা সুগন্ধী পানি। হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি অনুভব করলাম …

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুনো শিয়ালের টিলা [৩য় অংশ]

0

মাইসাং চৌধুরির বয়স তখন প্রায় সত্তর। এসব কথা আমি আমার বাপঠাকুর্দার কাছে শুনেছি। সত্যমিথ্যা বলতে পারব না। বলে যামিনীরঞ্জন চুপ করে রইল।

তারপর? আমি ততক্ষণে গল্পের মধ্যে ঢুকে গেছি। কিছুটা আঁচও করতে পারছি। দীর্ঘদিন গল্প লিখলে এ ধরণের ক্ষমতা জন্মায়।

তারপর মানে … ইয়ে আর কী …মাইসাং চৌধুরি নাকি উদ্ভিন্ন যৌবনা অমঙ্গলীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন । ওই বয়েসে … মানে বুঝতেই পারছেন … পথের কাঁটা দূরকরতে মাইসাং চৌধুরি পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন।

কথাটা শুনে আমার ভ্রুঁ কুঁচকে যায়। এটাই তাহলে গল্পের ক্লাইমেক্স? বেশ কমন প্লট।

যামিনীরঞ্জন বলল, যামিনীরঞ্জন নামে মাইসাং চৌধুরির এক পোষা গুপ্তঘাতক ছিল।

যামিনীরঞ্জন? আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম।

হ্যাঁ। যামিনীরঞ্জন। বলে লোকটা মাথা নাড়ল।

আপনার … আপনার নামও তো যামিনীরঞ্জন। বলে লোকটার আঙুলের প্রবালের দিকে তাকালাম।

যামিনীরঞ্জন হাসল। আহা, জগতে কত লোকের নামই তো যামিনীরঞ্জন। আহ্, শোনেন না তারপর কী হল। কার্তিক মাসের এক শীতের রাত। যামিনীরঞ্জন ধারালো বার্মিজ কিরিচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঘুমন্ত থিরিথুধম্মার ধড় থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। তারপর বিভৎস মৃতদেহটা মাইসাং ভিলার পিছনে বাঁশবনে ফেলে রাখে । পাহাড়ি শেয়ালরা তার ক্ষতবিক্ষত শরীর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। বলতে বলতে কেমন ফুঁসে ওঠে লোকটা। মুখচোখ কেমন কুঁচকে গেছে।

আমি চমকে উঠলাম । আপনি … আপনি এসব জানলেন কি করে?

যামিনীরঞ্জন কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, আহা, তখন আমি বললাম কী। বললাম না আমি এসব বাপঠাকুর্দার মুখে শুনেছি। সত্যিমিথ্যা জানি না।

আমি চুপ করে থাকি। ক্লাইমেক্সটা হঠাৎ করেই বিভৎস রূপ নেয়াতে অস্বস্তি বোধ করতে থাকি।

যামিনীরঞ্জন বলল, কার্তিক মাসেরসাত তারিখ রাতে যামিনীরঞ্জন থিরিথুধম্মা কে খুন করে । ওদিকে কী হল শুনুন। অমঙ্গলী থিরিথুধম্মার সাধনসঙ্গিণী ছিল বটে, তবে থিরিথুধম্মার মৃত্যুর পর অমঙ্গলী বৃদ্ধ চৌধুরির মনোরঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু, কী এক অজ্ঞাত কারণে থিরিথুধম্মার মৃত্যুর এক বছর পরই ওই কার্তিক মাসেরই সাত তারিখ রাতে ধারালো বার্মিজ কিরিচ দিয়ে হাতের শিরা কেটে অমঙ্গলী আত্মহত্যা করে।

ওহ্। বেশ গোছানো প্লট। আমি গল্প লিখে আনন্দ পাই, আর যামিনীরঞ্জন গল্প বলে আনন্দ পায়। এ ধরণের কল্পনাপ্রবণ মানুষ আমি এর আগেও ঢের দেখেছি।

যামিনীরঞ্জন বলে চলেছে, অমঙ্গলীর আত্মহত্যার পর মাইসাং চৌধুরি নাকি উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। মাইসাং ভিলার পিছনে বাঁশবনে আনারস ক্ষেতে মূল্যবান রত্নপাথর ছড়াতেন। পাহাড়ি শিয়ালের ডাক শুনলে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়তেন। অমঙ্গলীর আত্মহত্যার ঠিক এক বছর পর কার্তিক মাসের সাত তারিখ রাতে একটি ছায়ামূর্তি ঘুমন্ত মাইসাং চৌধুরি বুকে বার্মিজ কিরিচ ঢুকিয়ে খুন করে। বলে চুপ করে রইল। আমি চেঙ্গী নদীর জলের শব্দ শুনছি। দীর্ঘশ্বাস ফেলব কিনা ভাবছি।

একটু পর নিরবতা ভেঙে যামিনীরঞ্জন বলল, মাইসাং চৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী… এরা তিনজন আজও কার্তিক মাসের সাত তারিখ রাতে মাইসাং ভিলায় ফিরে আসে।

কথাটা শুনে আমি চমকে উঠলাম না। কারণ এই কথাটা বিশ্বাসযোগ্য না।মৃত ব্যাক্তির ফিরে আসা ভৌতিক কাহিনীর খুবই একটা কমন প্লট। যা একুশ শতকের লেখকেরা এড়িয়েই যান।তবে ক্যামেরার কাজ ভালো হলে এ ধরনে হরর ফিলম বেশ উপভোগ্যই হয়।

যামিনীরঞ্জন উঠে দাঁড়াল। গায়ে ভালো করে চাদর জড়িয়ে বলল, আজ কার্তিক মাসের সাত তারিখ। আজ মধ্যরাতে মাইসাং চৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী মাইসাং ভিলায় জাগ্রত হবে। আপনি আজই এখান থেকে চলে যান। নইলে বিপদে পড়বেন । বলে লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলেন। একটু পর কুয়াশায়মিলিয়ে গেল।

আমি পাথরের বসে থাকি। মনের মধ্যে ক্ষীণ অস্বস্তি পাক খাচ্ছে। মাঝ্যাং বিহারে যাওযার ইচ্ছে ছিল। মনটা দূষিত হয়ে যাওয়ায় আজ আর মাঝ্যাং বিহারে যাব না ঠিক করলাম। মনের মধ্যে অস্থিরতা নিয়ে মাইসাং ভিলায় ফিরে এলাম।

বাথরুম থেকে ফিরে একটা সিগারেট ধরালাম। তারপর দোতলায় বারান্দায় বসলাম। আটটার মতন বাজে। কার্তিক সকালের টলটলে রোদ। বাতাসে সূর্যমূখি ফুলের গন্ধ। য়ংদ্দ চা নিয়ে এল। তাকে কেমন গম্ভীর দেখালো। তার হলদে মুখটি কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। কী যেন বলতে চায়। যামিনীরঞ্জন আজ যে গল্পটা বলল তা কি য়ংদ্দ জানে? য়ংদ্দ কদ্দিন ধরে মাইসাং ভিলা তে আছে?

সকাল বেলাটায় লিখে কাটল। মহাকাশের দূরতম এক সৌরজগতের এক গ্রহে পৃথিবীর নভোচারীরা অবতরণ করেছে। এদের মধ্যে বাঙালি নভোচারী সায়েম হকও রয়েছে । গ্রহটির একটি ডিজিটাল নাম দিয়েছি। এক্সটিএক্স-থ্রি।এই অবধি লিখেছি। কাহিনীতে এখনও ক্লাইমেক্স আনতে পারছি না। ক্লাইমেক্স ছাড়া গল্প জমবে না। লিখতে- লিখতে যামিনীরঞ্জনের গল্পটা কখন ভুলে গেছি …

দুপুরে খেতে বসে দেখি য়ংদ্দ ছোট ছোট পাহাড়ি আলু দিয়ে বনমোরগের মাংস রেঁধেছে । ঝাল ঝাল স্বাদ । লালচে ধোওয়া ওঠা জুমভাতের সঙ্গে মাখিয়ে খেতে ভালোই লাগছিল। বুনো জলপাইয়ের আচার ভাতের আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

লেখায় বিষম ঘোর লেগেছিল। লিখে- লিখেই দুপুর আর বিকেলটা কেটে গেল। সন্ধ্যার ঠিক আগে-আগে আজকের মতো লেখা শেষ করলাম। নীচের বাগানের সূর্যমূখীর ঝাড় খুব টানছিল। ভাবছি নীচে নেমে একবার বাগানে যাব কিনা। ঠিক তখনই চা নিয়ে এল য়ংদ্দ । একটা সিগারেট ধরালাম। য়ংদ্দ কী এক বুনোপাতা মিশিয়েছে চায়ে; লেবু -লেবু স্বাদ। আশ্চর্য! দুধ চায়ে কেমন লেবু-লেবু স্বাদ! বেশ লাগছিল কিন্তু চুমুক দিতে। দুধটাও টকে যায়নি।

সন্ধ্যার পর টলটলে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়ল । বেশ কুয়াশা ছড়িয়েছে। আমি সাধারণত সন্ধ্যার পর লিখি না। তাছাড়া মাইসাং ভিলায় ইলেকট্রিসিটিও নেই। বারান্দায় শীত করছিল। ঘরে এসে গায়ে চাদর জড়িয়ে একটা ইজিচেয়ারে বসেছি। য়ংদ্দ কূপি জ্বালিয়ে এনে টেবিলের ওপর রাখল। সন্ধ্যার পর মশা তাড়ানোর জন্য ধূপও জ্বালায় । এদিকটায় মশার ভীষণ উৎপাত। দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। অবশ্য ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় ঔষুধপত্র সবই এনেছি।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের