কে ওখানে

1

যারা ভুত বিশ্বাস করেন না এ লেখাটি তাদের জন্য নয় । কেননা এটা একটি ভুত সংক্রান্ত লেখা বা ঘটনা । যা কিনা আজো আমার কাছে জীবন্ত । এখন ও আমি মাঝ রাত্রিরে জেগে বসে থাকি ভুতের ভয়ে । ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে । কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এইতো সেদিন ঘটলো ঘটনাটি । ঘটনাটির কথা মনে হলে হাত পা আমার এখনও ঠান্ডা হয়ে যায় ।

আমারা তখন পুরানো ঢাকাতে থাকি । বাবা সরকারি চাকুরি করেন । বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করেই আমরা বড় লোক হয়ে গেলাম । তা ও বাবার এক ফুপুর কল্যাণে । বাবার বড়লোক ফুপুর মৃত্যুর পর তার বিষয় সম্পতির ছোট একটি অংশ আমাদের বড়লোক করে দিল রাতারাতি ।

আমারা ভাড়া বাসা থেকে আমরা নিজেদের বাড়ীতে উঠলাম । তাও আবার তিন তলা বাড়ী । ৬টা ভাড়াটিয়াসহ বিশাল বাড়ী । আমরা উঠেছি দোতালায় । সারা দিন ভাই বোনদের সঙ্গে আনন্দ করে সময় কাটে । বাড়ীর সামনে দু’টো বড় বড় মেহগনি গাছ । তার একটিতে ছোটকাকু দোলনা টানিয়ে দেয়াতে আমাদের আনন্দের মাত্রা বেড়ে গেছে কয়েক গুন । সারা দিন হৈই চৈই । বিকেল বেলা সবাই মিলে ছাদে খেলা করতাম । এতো বিশাল ছাদ আমি আগে কখনও কল্পনাও করতে পারতাম না তা আবার নিজেদের । ছাদ সাধারনত মা তালা দিয়ে রাখতেন । শুধু বকেল বেলায় খুলে দিতেন । সন্ধ্যার পর শুধু পড়তে বসতাম । রাতে খাওয়া দাওয়ার পর কাকুর কাছে গল্প শুনতে বসা । কাকু নিত্য নতুন ভূতের গল্প বলে আমাদের ভয় পাইয়ে দিতেন । মাঝে মাঝে মাও আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিতেন । গল্প শেষে মা প্রায়ই হেসে বলতেন । ভুত বলে কিছু নেই ।

দেখতে দেখতে আমার এস এস সি পরীক্ষা চলে এলো । ভাল রেজাল্ট করতে পারলে বাবা রেসিং সাইকেল কিনে দেবো । তাই রাত জেগে পড়া শুনা করছি । ভাল রেজাল্ট করার চাইতে আমার সাইকেলটার দিকেই বেশি মনোযোগ । বাসার সবাই ঘুমিয়ে গেলেও আমি সারা রাত জেগে পড়ি । মাঝে মাঝে ঘরের ভেতর হাটা হাটি করি । বেশি খারাপ লাগলে ছাদে চলে যাই । কাকুর ভাষ্য মতে রাতের একটি ভাষা আছে । তাছাড়া রাতের আকাশ ও আমার দেখতে খুব ভাল লাগে । বিশাল রহস্যময় আকাশের শৈল্পিক কারুকার্য আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে ।

সেদিন ছিল পূণিমার রাত । রাত প্রায় তিনটা বাজে । আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম । বাসার সবাই ঘুম । হঠাৎ ছাদ থেকে ধুপ ধুপ শব্দ ভেসে এলো । বিকেল বেলায় আমরা ছাদে খেললে যেমনটি শব্দ হয় ঠিক তেমনটি । আমি বেশ অবাক হলাম , এতো রাতে ছাদে আবার কে খেলছে !

কাকু আর আমি একই রুমে থাকি । বেশ কয়েকবার শব্দ হওয়ায় কাকুকে ডাক দিলাম । কাকুর উঠার নামটি নেই । নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে । অনেকক্ষন ডাকা ডাকি করার পরে কোন রকম মাথা তুলে বললেন তুই গিয়ে দেখনা কে ?
ইদুর টিদুর হবে হয়তো । বলে কাকু আবার নাক ডাকতে শুরু করলেন । এদিকে ছাদের শব্দ দৌড়া দৌড়ি পর্যায় পৌছে গেছে । আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম আমার তেমন ভয় করছেন । বরং দেখতে ইচ্ছে করছে এতো রাতে ছাদে কে দৌড়া দৌড়ি করছে ।

আমাদের রান্না ঘরের দেয়ালে মা ছাদের চাবি ঝুলিয়ে রাখেন । আমি ঘর থেকে বেড় হয়ে ছাদের চাবি নিলাম । আমাদের ফ্লাট থেকে বেড় হতেই ডান দিক দিয়ে উঠে গেছে ছাদের সিঁড়ি । প্রতিটি বারান্দায় বাতি জ্বলছে । তিন তলার বারান্দা গুরে ছাদের সিঁড়ি । আমি ছাদের সিঁড়িতে উঠার পরও আমার কোন ভয় লাগছিল না । তিন তলা থেকে ছাদের ছাদের দরজা দেখা যায় । বন্ধ দরজা । তালা দেখা যাচ্ছে । তবে ছাদে শব্দ করছে কে ?

আমি ছাদের তালা খুলে ফেললাম । চাঁদের আলোয় ছাদ ভেসে যাচ্ছে । ছাদে বেড় হলেই সামনে রবিন চাচ্চুদের ৪ তলা বাড়ী । রবিন চাচ্চুদের বাসা থেকে আমাদের পুরো ছাদটা দেখা যায় ।

ছাদের এ মাথা ; ও মাথা বেশ ভাল করে দেখলাম কেউ নেই । আমি বেশ অবাক হলাম । তা হলে শব্দ করলো কে ? পানির ট্যেন্কির উপড় দেখলাম । না । কেউ নেই । এবার কিন্তু আমার গা বেশ কেমন ছমছম করছে । আশে পাশের বাড়িগুলোর দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়ে আমি নীচে নেমে এলাম ।

ঘরে এসে ডকডক করে দু গ্লাস পানি খেলাম । এমনিতেই আমি বারবার হিশু পায় বলে রাতেরবেলা পানি কম খাই । কিন্তু সেদিন তেস্টা যেনো আর মিটছিলো না । ২য় গ্লাস পানি শেষ করার মুর্হুতে আবার ধুপ ধুপ শব্দ ভেসে এলো । আমি গ্লেলাসটি রেখে উঠে পড়লাম । ছাদের সিঁড়িতে এসে দেখি ছাদ তালা মারই আছে । দরজা বন্ধ । কিন্তু দরজার ওপাশেই কে যেনো দৌড়াচ্ছে । আমি ভয়ে ভয়ে তালা খুলে ছাদে এলাম । আবারও চাঁদের আলোয় চোখ ভেসে গেলো । আমি পুরো ছাদ বেশ ভাল করে দেখলাম । না । কেই নেই । নিজেকে কেমন বোকাবোকা মনে হলো । নিজেকে শান্তনা দিলাম হয়তো রাত জেগে পড়ার ফলে উল্টা পাল্টা শব্দ শুনছি ।

ছাদ তালা দিয়ে নামার জন্য পেছন গুড়তেই চমকে উঠলাম । হাতের ডান পাশে সিঁড়ির শেষ মাথার ছাদের দেয়াল ঘেষে কে যেনো বসে আছে । ভয়ে আমার বুক তখন হাপারের মতো উঠা নামা করছে । আমি কোন রকম জিজ্ঞষ করলাম । কে ! কে ওখানে ? হালকা আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্চে দু’হাটুর মাঝ খানে মাথা রেখে কে যেনো বসে আছে ।
ছোট্র শরীরটা দেখে আট দশ বছরের বাচ্চা বলে মনে হলো । আমি কানে তখন কিচ্ছু শুনছি না ।
চোখেও ভাল করে দেখছি বলে মনে হলো না ।
শুধু তাকিয়ে আছি । আর জোড়ে জোড়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করছি কে ! কে ওখানে ?

বেশ কয়েক বার চিৎকার করতেই সামনে বসে থাকা কায়াটা হাটু থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো । ভয়ে আমি চমকে উঠলাম । জাপানি ভুতের সিনামায় দেখা আট নয় বছরের একটি ছেলে আমার দিকে হাটু থেকে মুখ তুলে তাকালো । বড় বড় দুটো চোখ । সমস্ত মুখ কেমন ফেকাসে হয়ে আছে ।
অনেকক্ষন পানিতে ভিজলে চামড়া যেরকম ফেকাসে হয় তেমনটি ।
আমি আরো জোড়ে চিৎকার করলাম কে কে ?
ছেলেটি কোন উত্তর দিলো না শুধু একটি হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো ।
আমি ভয়ে তখন কি ভাবে যে নীচে নেমে এলাম বলতে পারবো না ।
যখন চোখ খুললাম তখন দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি মা ;বাবা,কাকু আর একজন ডাক্টার আমায় ঘিরে আছেন ।

বাবা কাকুকে বকছেন আমদের কেন ভুতের গল্প শুনায় তার জন্য । মা’র হাতের ফাঁক দিয়ে আমার চোখ যখন দরজার কাছে গেলো তখন আবার চমকে উঠলাম । ছাদে দেখা ছেলেটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে । আমার চোখা চোখি হতেই । ডান হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো । আমি আবার জ্ঞান হারালাম ।

সে বার আমাকে অনেকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো । কিন্তু আশ্চযের বিষয় সে রাতের পর ঐ ছেলেটিকে আর কোনদিন দেখা যায়নি আমাদের ছাদে দেখা যায়নি। সে রাতে অবশ্য আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল সেটি হলো আমাদের পাশের বাসার রবিন চাচ্চু মারা গিয়েছিলো । ভাল মানুষ হঠাৎ নাকি কি দেখে খুব ভয় পেয়েছিলেন । প্রিয় পাঠক এ দুটো ঘটনার মাঝে কোন মিল আছে কিনা আমি বলতে পারবনা ।আপনারা ভেবে দেখুন ।।

শেয়ার করেছেনঃ Mirza Jubayer Mamun

রাত জাগা পাখি

0

রাত জাগা পাখি নামে আমাদের একটা গ্রুপ আছে। আমরা চার বন্ধু মিলে এই গ্রুপ বানিয়েছি।গভীর রাতে ফুল কানন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আমাদের আড্ডা বসে। গ্রুপে মাঝে মাঝে অতিথী মেম্বাররা আসে। এক রাত আড্ডাদিতেই তাদের কাপড়ে চোপড়ে হয়ে যায় বলে তারা আর দ্বিতীয় বার আড্ডায় আসেনা। তাতে অবশ্য আমাদের সমস্যা নেই। শেয়ালের ডাক শুনেই যারা ভয় পায় তাদের না আসাই ভালো।রাত জাগা পাখিরমেম্বারদের মধ্যে আমি আর পুলক সবচাইতে এক্টিভ। রাহাত আর জনি ইদানিং বিদ্যা দেবীর আরাধনা করেই রাত কাটায়।আজো তারা বিদ্যা দেবীর পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে অগ্যতা আমি আর পুলকই ঘর থেকে হলাম। পুলকের বাড়ি আমার বাড়ির পাশেই। বের হয়েই পুলক কে পেয়ে গেলাম। দুইজন মিলে গল্প করতে করতে এগোতে লাগলাম।গন্তব্য স্কুলের মাঠ। পারার কে কবে কি করলো এরকম হালকা চালের গল্প হচ্ছিলো। এর মাঝে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই পুলক বলে উঠলো “ রাতুল তুই রুমুর চিন্তা বাদ দে,লাভ নাই”
আকাশ থেকে পড়লাম!রুমুর কথা ও কিভাবে জানলো!আমি তো কাউকেই বলিনি আমার ওকে ভালো লাগে।পুলকের দিকে অবাক চোখে তাকালাম।ও যেনো আমার মনের কথা বুঝেই কৈফিয়ত দিলো “ দোস্ত তুই না বললেও আমি বুঝি” হঠাৎ করে পুলককে কেমন অচেনা ঠেকলো। নিজের অজান্তে শিড়দাড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো। সামান্য রুমুর কথায় নাকি অমাবস্যার ভুতুড়ে পরিবেশে এমন হলো তা বুঝতে পারলাম না। পুলক কে বললাম “আজ ভালো লাগছেনা।চল ফিরে যাই।“ পুলক আমার কথা শুনে আকাশ বাতাস কাপিয়ে হাসতে লাগলো “ দোস্ত আজকের ওয়েদারের সাথে তোর ভয়টা খুব মানাইছে।“
“ফালতু কথা রাখ তো। ভয় পাওয়ার কথা কখন বললাম! ঠিক আছে চল” কথা বললেই লস্‌! একরাশ বিরক্তি আর অজানা ভয় নিয়ে হাটতে হাটতে মাঠে পৌছালাম। মাঠের এক পাশে আম গাছটার সাথে অস্পষ্ট কি যেনোএকটা চোখে পড়লো।পুলক কে দেখাতেই পুলক এগিয়ে গেলো গাছের দিকে।আমিও পিছু নিলাম।গাছের কাছে পৌছেই বরফের মতো জমে গেলাম।পায়ে যেনো শিকড় গজিয়ে গেছে।গাছের সাথে পুলককে বেধে রাখা হয়েছে! তাঁহলে আমার পাশে কে?পুলক কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো “ দোস্ত সন্ধ্যা থেকে বাইন্ধ্যা রাখছে,তারাতারি দড়ি খুলে দে”
পুলকের কথা আমার কানে গেলো,দুরে শেয়ালের ডাক ও শুনতে পেলাম। কিন্তু এক বিন্দু নড়তে পারলাম না।আমার সামনে এক পুলক, পাশে আরেক পুলক!এতোটুকু নড়ার ক্ষমতা নেই। আর মধ্যে পুলক বলেই চলেছে “ দোস্ত প্লিজ খুলে দে” আমি প্রানপণে আল্লাহ্‌কে ডাকতে লাগলাম।সমস্ত শক্তি এক করে দুই পুলক কে রেখেই ঝেরে দৌড় দিলাম। আমার পেছনে পায়ের শব্দ পাচ্ছি।পায়ের শব্দ দ্রুত এগিয়ে আসছে।এক সময় পেছনের মুর্তি আমার কাধ খামচে ধরলো “ রাতুল দাড়া ঐ বান্ধা লোক টা আমি না, তুই আমারে ফেলে যাইস না”
আমি এক ঝটকায় হাত সড়িয়ে নিয়ে উলটো ঘুরে আবার মাঠের দিকে দৌড়াতে লাগলাম।পেছনে আর পায়ের আওয়াজ আসছেনা।বন্ধুকে ফেলে গিয়ে একবার বেঈমানী করেছি দ্বিতীয়বার আর করলামনা।গাছের কাছে গিয়ে পুলকের বাধন খুলে দিলাম।পুলক আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। এক ফোটা সাহসও বাকি ছিলো না। পুলকের ওপর ভরসা করে শরীর ছেড়ে দিলাম।পুলক যেদিকে ছুটছে আমিও চোখ বন্ধ করে সেদিকেই ছুটছি।হঠাৎ পুলক থেমে গেলো।
“ দোস্ত বাড়ি আসছি?” কাঁপা গলায় আমি বললাম।
“ হ তোর শ্বশুড় বাড়ি আইছোস”অচেনা একটা কণ্ঠ অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠলো।
চমকে গিয়ে পুলকের দিকে ভালোকরে তাকাতেই যা দেখলাম তা জ্ঞান হারানোর জন্যে যথেষ্ঠ!জ্ঞান ফেরার পর বিছানায় নিজেকে আবিস্কার করলাম। সবার মুখে যা শুনলাম তার সারমর্ম হলো আমাকে পরেরদিন সকালে মোসলেম ডাকাতের কবরের পাশে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে।সেই মোসলেম ডাকাত যাকে কিনা গতবছর স্কুলের ঐ গাছের সাথে বেধে পেটানো হয়েছিলো।এলাকাব াসির মার খেয়েই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর পুলক বেশ অসুস্থ্য হয়ে পড়ে…দশদিন পর পুলক মারা যায়…আর আমি? আমি প্রতি রাতে স্বপ্নে দেখি পুলক আমার কাধ খামছে বলছে “দোস্ত ঐ বান্ধা লোকটা আমি না!আমারে ফেলে যাইস না!”

লেখক : আনিসুল হক

রাজসাক্ষী

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

অতনুর পুরো নাম শিহাব শাহিন অতনু, ওর নানার রাখা নাম। ওদের বাড়ি উত্তর বঙ্গে, বর্ডারের কাছে। জায়গাটা ভয়াবহ রকমের দুর্গম। ইলেক্ট্রিসিটি তো দূরের কথা, একটা খাম্বাও নেই। যাতায়াতের মাধ্যম পায়ে হাঁটা পথ। প্রায় ১০মাইল হাঁটলে পাকা রাস্তা পাওয়া যায়। অতনুর এই অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম হলেও ওর আধুনিক নামই বলে দেয় ওদের পরিবার গ্রামের আর ১০টা পরিবার থেকে আলাদা। ছোটবেলা বাবা মারা যাওয়ার পর নানা বাড়িতেই বেড়ে ওঠে। ওর নানারা ওপারের লোক, যুদ্ধের পর এপারে চলে আসে। পরিবারের নামটাই যা ছিল, এছাড়া একেবারে নিঃস্ব হয়ে এপারে আসতে হয়। ও আবছা ভাবে জানে যে নানারা নাকি শুদ্ধ ব্রাহ্মণ ছিলেন, পরে ধর্মান্তরিত হয়েছেন।

ওর পরিবারে ৩টা আজব ঘটনা ঘটেছে। ওর বড় মামা, মেজ খালু আর মেজ নানা তিনজনই খুন হন। বর্ডার এলাকায় এসব স্বাভাবিক ঘটনা, তাই কোন থানা পুলিশ হয়নি। লাশ পাওয়ার পর ২-৪ দিন চোখের পানি ফেলে আবার কাজে মন দিয়েছে সবাই। এইসব ঘটনা যখন ঘটে তখন ওর বয়স ১১, আজ থেকে ১৭ বছর আগের কথা। তারপর ও বড় হয়ে এখন ঢাকায় থাকে। তিন দিন হল গ্রামে এসেছে শেষ যেটুকু ভিটামাটি ছিল তা বেঁচে দিতে।

শনিবার রাত। গ্রামে এখন এক ছোট মামা ছাড়া আর কেউ থাকে না। বিশ রুমের একটা টিনশেড দোতলা বাড়ি পুরো ফাঁকা পড়ে থাকে। ও উপরের ঘরটা নিলো। রাতে বেশ চাঁদ দেখতে দেখতে ঘুমানো যাবে। গ্রামে কতদিন রাত কাটানো হয়না।

রাত তিনটায় একটু টয়লেট পেলো ওর। এখানের একটা সমস্যা হচ্ছে টয়লেট করতে নিচে নামতে হয়। কি আর করা, নেমে টয়লেট সারলো। কলপাড়ে এসে হাত ধুতে যাবে, দেখল দুজন লোক বসে আছে নিচতলার বারান্দায়। কিছু নিয়ে তর্কাতর্কি হচ্ছে ওদের মধ্যে বোঝা গেল। খেয়াল করলো টর্চ আনতে ভুলে গেছে ও। কিন্তু এত রাতে এখানে বসে ঝগড়া করছে কারা? ভালমত তাকালো, দেখলো একটা লোক উঠে দাঁড়িয়েছে। তীব্র রেগে গেছে সে, আচমকা একটা ছুরি বের করে আমুল বসিয়ে দিল সে অপর লোকটার বুকে। পিচ করে একটা শব্দ হল। আঁতকে উঠল ও, খুন!! দ্রুত লুকানোর জায়গা খুঁজল ও, পেলোনা। ওদিকে লোকটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ও। কিন্তু লোকটা ওর চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল, ওর দিকে তাকালও না। লোকটা একটু দূরে ডোবার ধারে গেলে চাঁদের আলো পড়লো লাশটার মুখে। চাঁদের আলোয় চিনতে কোন সমস্যা হলনা। বড় মামা!! লাশটা আর কারো না, বড় মামার!!

সারা গা ঝিমঝিম করে উঠল ওর। দ্রুত ছুটল বাম পাশের ঝোপের দিকে, ওখানে বড় মামার কবর আছে। গিয়ে যা দেখল তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

কবরটা খোঁড়া, চারিদিকে মাটি ছড়িয়ে আছে, একটা রক্ত মাখা ইট পড়ে আছে পাশে!!

গ্রামের লোকদের ডাকে জ্ঞান ফেরে অতনুর। কবরের পাশে পড়ে আছে ও। চারিদিকে অনেক লোকজন, এক এক জনের এক এক জিজ্ঞাসা। তার মাঝেই কবরের দিকে তাকাল ও, সব সুস্থ, স্বাভাবিক, শান্ত। কবরের মাটি দেখে সহজেই বোঝা যায় গত ১৭ বছরে কেউ তা খোঁড়েনি। তবে কি দুঃস্বপ্ন দেখছিল ও? তাই হবে হয়ত। ধীরে ধীরে লোকের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল ও, তখুনি চোখ আটকাল একটা ইটের দিকে। গোল, একপাশে রক্ত মাখা। বুকটা ছাঁৎ করে উঠল ওর! ঠিক তখুনি, একটু গড়িয়ে পাশের ডোবাটায় পড়ে গেলো সেটা।

এই ঘটনার ২ ঘণ্টা পরেই বাসে করে ঢাকায় চলে আসে ও। কাউকে কিছু জানায় না। সবকিছু একটা দুঃস্বপ্ন বলে ভেবে নেয়।

দুই দিন পর। বাসায় কেউ নেই। একা ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিল ও, এমন সময় কারেন্ট চলে গেলো। মোম জ্বালাতে রান্নাঘরে যায় ও, আইপিএস টাও আবার নষ্ট।

ফিরে এসে দেখে ড্রয়িংরুম ভর্তি ৬-৭ জন লোক। সবার মুখে লাল কাপড় বাঁধা। একটা লোককে বেঁধে রেখেছে তারা। মোমের আলোয় চিনতে কষ্ট হয়না, ওটা মেজ খালু!!!

হটাৎ লোকগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে খালুর উপর। মুহূর্তে টুকরো টুকরো করে ফেলে ছুরি দিয়ে। শুধু ধড় আর মাথাটা রেখে বাকি হাত,পা আলাদা হয়ে যায়। এক ফোঁটা রক্ত ছিটে এসে লাগে ওর শার্টে। ওখানেই জ্ঞান হারায় ও।

জ্ঞান ফেরে পরদিন হসপিটালে। ঘরে ফেরার পর দেখে সব ঠিক আছে, তবে তার শার্টে রক্তের দাগ লাগলো কিভাবে, স্ত্রীর এই প্রশ্নের জবাব সে দিতে পারলনা।

চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন একটা মানুষিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও। তীব্র কঠিন ওষুধ খেয়ে স্রেফ বেঁচে আছে। দুটি মৃত্যু ঘটনার রাজসাক্ষী হয়ে, তৃতীয় ঘটনাটি ঘটার অপেক্ষায়।

শেয়ার করেছেনঃ Kallîum Cyanîde Pîxel

(ভূতুড়ে গল্প)

অর্গ্যানের সুর

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

সকাল থেকে রাত অব্দি একটানা বৃষ্টি হচ্ছে । সেই সাথে মাঝে মাঝে বজ্রপাত । বিদ্যুৎ নেই তাই মোম জ্বালিয়ে শেলী উপন্যাস লিখছে । খুব শীঘ্রই তার এ উপন্যাসটা প্রকাশিত হবে । ঔপন্যাসিক হিসেবে শেলী রোজালীন বেশ নাম করা । নির্জনতা শেলীর ভাল লাগে । তাই হেনরিভিলে একটা বাড়ি কিনেছে কয়েক মাস আগে । বাড়িটা অর্ধ পুরোনো । বাড়ির মালিক ছিলেন হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক জেন কারমাইকেল । বাড়িটার একটা ভুতুড়ে গুজব রয়েছে বলে কেউ কিনতে চায়নি । এ বাড়িতে রাতের বেলায় নাকি অর্গ্যানের সুর ভেসে আসে মাঝে মাঝে ।

অনেকদিন বাড়িটা খালি পড়ে ছিল । পত্রিকায় বাড়ি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে শেলী একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল । তখনই হেনরিভিলে এই বাড়িটার খোঁজ পেয়ে অতি অল্প দামে শেলী বাড়িটি কিনে নেয় । তার মনের মত জায়গায় বাড়িটা পেয়ে শেলী এ জন্য আনন্দিত , উৎফুল্ল । এ বাড়িতে বেশ কিছু পুরোনা আসবাবপত্রের সাথে একটা পুরোনো অর্গ্যান ছিল । জিনিসগুলো একটা আলাদা ঘরে রেখে শেলী নিজের জিনিসপত্র দিয়ে ঘর সাজিয়ে নিয়েছে ।

অবিবাহিত শেলীর রান্নাবান্নার কাজ করে হাউজকিপার জুন মারিয়া । বেশ হাসি খুশি মহিলা । শেলী তাকে খুব পছন্দ করে । বৃষ্টির কারণে আজ আসতে পারেনি । তাই শেলীকে আজ খাবার কিনে খেতে হয়েছে । তার উপন্যাসটা প্রায় শেষের পথে । কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকাশককে দিয়ে দেবে ।

শেলী এক মনে লিখে চলেছে । ওদিকে টেবিলে রাখা মোমটা গলে গলে প্রায় শেষ । কিন্তু সেদিকে শেলীর খেয়াল নেই । বসার ঘরে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে । দপ করে মোমটা নিভে গেলে শেলী চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে আর একটা মোম জ্বালিয়ে আনল । হঠাৎই সে খেয়াল করল তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে । মোম হাতে নিয়ে রান্না ঘরের ফ্রিজ খুলে স্যান্ডউইচের প্যাকেট আর মিল্কশেক বের করল । টেলিফোনের শব্দ পেয়ে খাবারগুলো রান্না ঘরের টেবিলে রেখে নিজের ঘরে ফিরে এলো । হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জুনের কণ্ঠ ভেসে এলো । জুন বলল, ‘মিস শেলী আপনার কোন অসুবিধা হয়নিতো ? আসলে আমি বৃষ্টির কারণে আসতে পারিনি । লাইন খারাপ থাকায় ফোনও করতে পারিনি ।` শেলী হেসে বলল , ‘না না আমার কোন অসুবিধা হয়নি । তুমি কোন চিন্তা কর না । কাল বৃষ্টি কমলে চলে এসো ।` ‘আচ্ছা ঠিক আছে রাখি ।` শেলী ফোন রেখে রান্না ঘরে এসে দেখল খাবারগুলো নেই । হঠাৎই পাশের ঘর থেকে দুপদাপ শব্দ ভেসে এল শেলীর কানে । শেলী রান্না ঘর থেকে ছুটে বের হল । শব্দ শেষ হতে না হতেই পুরোনো অর্গ্যানটা বেজে উঠল মৃদুভাবে । ভীষণ ভয় পেল সে । পুরোনো অর্গ্যান কে বাজাতে পারে ভাবতে ভাবতে রুমের দিকে এগিয়ে গেল । আলতো করে দরজাটা খুলে উঁকি দিয়ে কাউকে দেখতে পেল না সে । পুরোনা অর্গ্যানটা পড়ে রয়েছে অনড় হয়ে । দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল । ভাবল সবই তার মনের কল্পনা । ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতে যাবে অমনি আবার অর্গ্যানটা বাজতে লাগল আগের চেয়ে কিছুটা জোরে । শেলী আবার দরজা খুলে উঁকি দিয়েই স্থির হয়ে গেল । ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার শরীরে । দেখল বেশ মনোযোগ দিয়ে অর্গ্যান বাজাচ্ছে কালো আলখেল্লা পড়া কেউ একজন । শেলী কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি ? এখানে কেন ?` শেলীর কথায় আগন্তুক অর্গ্যান বাজানো বন্ধ করে দিয়ে ধীরে ধীরে শেলীর দিকে আসতে লাগল । শেলী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আগন্তুকের চেহারা দেখেই তার গলা চিরে বেরোলো চিৎকার । হাত থেকে মোমটা পড়ে গিয়ে নিভে গেল । প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত হল কাছাকাছি কোথাও । সেই সাথে বিদ্যুৎ চমকলো । সেই আলোয় দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোমশ শরীরের এক ভয়ঙ্কর জীব । মানুষের মত দুটি করে হাত পা থাকলেও মুখটা দেখতে একেবারে নেকড়ের মত । চোখ দুটো টকটকে লাল। দুটি বড় বড় দাঁত বেরিয়ে আছে ঠাঁটের বাইরে । অজ্ঞান হয়ে গেল শেলী । অনেক পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে শেলী প্রাণপণে দৌড় দিল নিজের ঘরের দিকে । বসার ঘর দিয়ে যাওয়ার সময় সোফার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল সে । কোন রকমে উঠে আবার দৌড় দিয়ে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল । কাঁপা হাতে টর্চ জ্বেলে টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল শেলী কিন্তু টেলিফোনের রিসিভার তুলতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল । টেলিফোন ডেড । কিছুক্ষণ আগেই সে জুনের সাথে কথা বলেছে । বাইরে বৃষ্টির বদলে এখন ঝড় শুরু হয়েছে । ঝড়ের কারণে কোথাও হয়ত তার ছিড়ে গেছে । নেকড়েরূপী জীবটা দরজায় আঘাত করছে । শেলী দৌড়ে গিয়ে ড্রয়ার খুলে তার লাইসেন্স করা রিভলভারটা হাতে তুলে নিল । অদ্ভুত প্রাণীটা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে শেলী গুলি চালাল । প্রাণীটা লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে । শেলী প্রাণপণে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের দরজার কাছে চলে গেল । কিন্তু দরজাটা খুলতে পারল না । ওদিকে অদ্ভুত প্রাণী উঠে দাঁড়িয়ে শেলীকে আবার ধরার জন্য ছুটে এলো । শেলী চিৎকার করলেও তার কান্না বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে । প্রাণীটি বিকট শব্দ করতে করতে তার দিকে ধেয়ে আসছে দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শেলী দৌড়ে জানালা খুলতে চেষ্টা করল । কিন্তু খুলতে পারল না । পাশে রাখা একটা চেয়ার নিয়ে জানালার কাঁচে আঘাত করল । কাঁচ ভাঙার পর কোন রকমে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে । জ্ঞানশূণ্য হয়ে এই নির্জন জায়গায় শেলী ছুটতে লাগল প্রাণপণে । কাদায় হোচট খেয়ে পড়ে গেল বার
কয়েক । প্রাণীটাও ছুটে চলেছে তার দিকে । শেলীও প্রচন্ড বেগে দৌড়াতে লাগল । হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল রাস্তার পাশের ছোট্ট একটা খাদে । কোন রকমে উঠে দেখল প্রাণীটা নেই । বৃষ্টির মধ্যে যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখল প্রাণীর কোন চিহ্নই নেই । স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধপ করে বসে পড়ল রাস্তার পাশে । শহরটাতে বাড়িঘরের ঘনত্ব কম । দূরে একটা খামার বাড়ি চোখে পড়ল তার । ক্ষণিকের জন্য সে বাড়িটা দেখলো বজ্রপাতের আলোয় । শেলী বাড়িটার দিকে দৌড়াতে লাগল । হঠাৎ রাস্তায় দেখতে পেল হেড লাইট জ্বেলে দ্রুতবেগে ছুটে আসছে একটা গাড়ি । রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে শেলী বাঁচার আনন্দে গাড়িটা কাছে আসতেই সে চিৎকার করে থামতে বলল । সাহায্য প্রার্থনা শুনে গাড়ির ড্রাইভারের সহানুভুতি হল । তাড়াতাড়ি শেলী বলল, ‘আমাকে বাঁচান একটা ভুত আমাকে তাড়া করেছে । যে কোন সময় সে চলে আসতে পারে ।` ড্রাইভার কোন কথা বলল না । শেলী তার চেহারা দেখতে পেল না। কারণ লম্বা একটা হ্যাটের কোণা দিয়ে সে মুখ ঢেকে রেখেছে । তুমুল বৃষ্টি শুরু হতে লাগল । সেই সাথে ঘন ঘন হতে লাগল বজ্রপাত । শেলী আবার করজোরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, `প্লিজ আমাকে বাঁচান ।` লোকটা হ্যাট খুলে ফেলল । শেলী অন্ধকারে লোকটার মুখ দেখতে পেল না । লোকটা বলল, `এত তাড়া কিসের ?` শেলী আবার কেঁদে বলল, `আমাকে একটা ভুত তাড়া করেছে ।` লোকটা খনখনে হাসি দিয়ে বলল, `তাই নাকি !’ শেলী চমকে উঠল । লোকটার মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল গাড়ির ড্রাইভার আর কেউ নয় স্বয়ং সেই অদ্ভুত প্রাণী । কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শেলী উল্টো দিকে দৌড়াতে লাগল । ভুতটাও গাড়ি নিয়ে তার পেছনে ধাওয়া করল । এক সময় গাড়ির ধাক্কায় শেলী উল্টে পড়ে গেল রাস্তার উপর । ভুতটা বাইরে বেরিয়ে শেলীর দূরবস্থা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল । শেলী ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে বলল, `তুমি কেন আমাকে মারতে এসেছ ?` বিকট কণ্ঠে ভুতটা বলল, `আমি এই বাড়িতে কাউকে থাকতে দেব না ।` কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে গাড়িতে উঠে ভুতটা শেলীর গায়ের উপর দিয়ে চালিয়ে দিল । তারপর হাসতে হাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল বাতাসের মধ্যে । পড়ে রইল শেলী রোজালীনের রক্তাক্ত বিকৃত লাশ ।

ঊর্মি খান   (ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

আজরাইল

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

ঘটনার শুরু আজ থেকে চার বছর আগে এক রাতে। আমি সিলেট এর ওসমানী মেডিকেল এ একটা সেমিনার শেষ করে নিজেই ড্রাইভ করে ফিরছিলাম ঢাকায়। সাধারণত আমার পাজেরো টা আমার খুব প্রিয় হওয়াতে আমি কাউকে ড্রাইভার রাখিনি। সেদিন ও আমি নিজেই চালিয়ে নিয়ে আসছিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। পথে খানিক টা ঘুম ঘুম ভাব আসলেও মন টা সতেজ ছিল- কারন সেই সেমিনারে আমি আমার গবেষনার জন্য পেয়েছি প্রচুর হাততালি। সাংবাদিক রা ফটাফট ছবি তুলে নিয়েছিল আমার। পরদিন পত্রিকায় আমার ছবি সহ লিড নিউজ ও হবার কথা ই ছিল এবং হয়েছিল ও তাই। আমি একটা বিশেষ হার্ট সার্জারি আবিষ্কার করেছিলাম- যেটা আজ পৃথিবীর সব দেশে দেশে রোগীদের জীবন বাঁচাচ্ছে- মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন জীবনের।সেমিনারের সফলতা তাই জুড়ে ছিল আমার মনে প্রানে।

রাস্তায় যেতে যেতে সেদিন আমি গান শুনছিলাম। গানের তালে তালে ধীর গতিতে গাড়ি চালাই আমি। বেশি গতি আমি কখনোই তুলিনা।সেদিন ও ৫০ এর কাছাকাছি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। সিলেট থেকে রওনা দিয়ে উজানভাটি এলাকার কাছাকাছি আসতেই হটাত করে আমার সামনে এক সাদা পাঞ্জাবি পড়া বৃদ্ধ লোক এসে দাঁড়ায়। রাত তখন প্রায় দুইটা। এই সময় রাস্তায় হাইওয়ের গাড়ি গুলো ছাড়া কোন যানবাহন ও ছিলনা। হটাত করে আমার সামনে কোত্থেকে লোকটা এসে পড়ল কিছু বুঝে ওঠার আগেই। আমি ও লোকটাকে বাঁচাতে গিয়ে ও পারলাম না। সোজা সেই লোকের ঊপর চালাতে বাধ্য হলাম। আর সেখানেই গাড়ির সামনের অংশে বাড়ি খেয়ে লোকটা ছিটকে পড়ল হাত পাঁচেক দূরে। আমি হার্ড ব্রেক কষে সেইবৃদ্ধের কাছে ছুটে গেলাম। কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ। মাথার কাছটায় আঘাতে মৃত্যু বরন করেছে বৃদ্ধ ততক্ষনে। জীবনে ও আমি কোন দিন এক্সিডেন্ট করিনি।সেটাই ছিল আমার প্রথম এক্সিডেন্ট। আমি দিশেহারা হয়ে যাই। কিভাবে কি করব বুঝে ঊঠতে না পেরে কিছুক্ষন ঝিম মেরে থাকলাম সেখানেই। তারপর বৃদ্ধকে গাড়িতে তুললাম। পাশে বসিয়ে আবার ড্রাইভ করলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে।

ঢাকায় পৌছে সোজা মেডিক্যাল এ নিয়ে গেলাম লাশ টাকে। সেখানে গিয়েই পুলিশ কে জানানো হল। পুলিশ এসে আমার কাছ থেকে জবানবন্ধি নিয়ে লাশ টা থানায় নিয়ে গেল। আমি প্রথমে ঠিক করেছিলাম পুলিশ কে সব খুলে বলব। কিন্তু পরে কি ভেবে যেন আমি মিথ্যে বলি। পুলিশ ও আমার কথা গুলো কোন রকম সন্দেহ ছাড়াই বিশ্বাস করে। নিজের কাছে আমি কিছু টা অপরাধী বোধ করলে ও নিজের ইমেজ বাঁচাতে এই মিথ্যেটা আমাকে বলতেই হয়েছে।

তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো মাস। আমি আমার আবিষ্কৃত প্যারা সার্জারি সিস্টেম এর জন্য অনেক গুলো পুরষ্কার ও পাই। খ্যাতি আর অর্থ দুটোই এসে ধরা দেয় আমাকে। ধীরে ধীরে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস বেড়ে চলে আমার। নিজেকে কিছুটা ঈশ্বরের সমপর্যায়ের ভাবতে থাকি। এরজন্য মিডিয়া ও কম দায়ী নয়।খবরের পাতায় কারো না কারো জীবন বাঁচানোর জন্য আমি ঊঠে আসতে থাকি নিয়মিত ভাবে। ধীরে ধীরে আমি অনেক অনেক বেশী অহংকারী হয়ে ঊঠি। কাউকেই পরোয়া না করার একটা ভাব চলে আসে আমার মাঝে। মানুষ কে আমি মনে করতে শুরু করি হাতের পুতুল। আমি চাইলেই যেকোন মৃত্যু পথযাত্রীর জীবন বাচিয়ে দিতে পারতাম। এই জন্য আমার কাছেই ছুটে আসতে লাগল হাজারো মানুষ। এই যশ আর খ্যাতি যখন তুঙ্গে তখন আমার কাছেই রুগী হয়ে আসেন বাংলাদেশের প্রথিত যশা রাজনীতিবিদ রেজোয়ানুল হক। আমি বাকি সবার মত উনাকেও আস্বস্থ করেছিলাম যে উনার কিছু ই হবেনা।

যেদিন উনার অপারেশন – সেদিন আমি আরো দুটি হার্ট অপারেশন করে ফেলেছিলাম। তাই কিছু টা ক্লান্তি ছিল। একটানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপারেশন গুলো করতে হয়। তাই ক্লান্তি ভর করে সহজেই। আমি ক্লান্ত থাকলে ও মনে মনে পুলকিত ছিলাম কারন এর পরেই আমি রেজোয়ানুল হকের অপারেশন করবো। উনাকে যখন অজ্ঞান করা হল তখন আমি নিজের কস্টিউম পড়ছি। জুনিয়র ডাক্তার কে দিয়েই এগুলো করাই আমি। আমি শুধু গিয়ে কাটাকাটির কাজ টা করি। সেদিন ও জুনিয়র তিনজন ডাক্তার মিলে সব প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা সেরে আমাকে কল দিল। আমি ও গেলাম। আর গিয়েই শুরু করলাম অপারেশন। ওপেন হার্ট সার্জারি ছিল সেটা। আমি যখন সব কেটে কুটে মাত্র হার্ট টাকে দেখতে লাগলাম এমন সময় আমার চোখ গেল ওটি রুমের বাম কোনায়। সেখানে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে সেই বৃদ্ধ। আমি দেখে চোখের পলক ফেলতেই দেখি উনি নেই। হ্যালুসিনেশন মনে করে আবার অপারেশন শুরু করলাম। রেজোয়ানুল হকের হার্ট এর নিলয় এর দুটো শিরায় চর্বি জমেছিল। আমি সেগুলো পরিষ্কার করতে করতে হটাত করে কানের কাছে একটা কাশির শব্দ শুনলাম। প্রথমে পাত্তা দিলাম না। কারন এইখানে কোন ভুল হলেই রোগী মারা যাবেন। আমার কোন রকম ভুলের কারনে এতবড় মানুষ টার মৃত্যু হবে ভেবে আমি আবার মনযোগ দিলাম। কিন্তু আবার কাশির শব্দ আসল। কাশিটা আসছিল বাম দিক থেকে। আমি বামে মাথা ঘুরিয়ে দেখি বৃদ্ধ হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ঠোট নাড়ার আগেই বলে ঊঠল –

“বাবাজি তুমি তো উনাকে বাঁচাতে পারবানা”

আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি আকাশ পাতাল চিন্তা করে চলেছি। একজন মৃত মানুষ কিভাবে আমার পাশে এসে দাড়াতে পারে সেটাই মাথায় আসছিল না। আমি কোন উত্তর দেবার আগেই সেই লোকটি বলল-

“ কি বুঝতে পারছো নাতো? শোনো- আমি জানি তুমি অনেক চেষ্টা করবে উনাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু পারবেনা”- বলেই আবার হেসে দিল সাদা পাঞ্জাবি পড়া বৃদ্ধ।

আমি বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছি উনার দিকে। কি বলব বুঝতে পারছিনা। উনাকে কি বলবো বুঝতে বুঝতে কাটিয়ে দিলাম পাঁচ সেকেন্ড। তারপর আবার মনযোগ দিলাম অপারেশনে। রোগীর অপারেশন সাকসেস হল। আমি ও হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। সেলাই করে দিয়ে শেষ বার ড্রেস করতে দিয়ে আমি মাস্ক খুলতে যাব এমন সময় হটাত করে রোগীর পালস রেট গেল বেড়ে। মেশিন গুলো যেন চিৎকার শুরু করে দিয়েছে।

হটাত করে বুকের ভেতর ধপধপ করা শুরু করল। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে রোগীর প্রেশার দেখলাম- বেড়েই চলেছে প্রেশার। হটাত করে এই অবস্থা হবার কথা না। আমি কয়েকজন ডাক্তারকে বললাম প্রেশারের ইনজেকশন দিতে। ওরা সেটা দিতেই প্রেশার ডাউন হওয়া শুরু করল। কিন্তু আবার ও বিপত্তি। এবার প্রেশার কমতে লাগল। আমি আবার টেনশনে পড়ে গেলাম। কিন্তু কোনভাবেই কিছু করতে পারলাম না। রোগীর হার্ট বিট ভয়ানক ভাবে কমতে কমতে একেবারে শুন্য হয়ে গেল নিমিশে। এবং আমি তাকিয়ে তাকিয়ে রেজোয়ানুল হকের মরে যাওয়া দেখলাম। প্রথম বার আমার সামনে এক রোগী বলে কয়ে মরে গেল- আমি কিছুই করতে পারলাম না।

আমি আমার রুমে এসে বসে পড়লাম। রাগে আমার গা জ্বলতে শুরু করল। নিজেকে অনেক অসহায় মনে হতে লাগল। পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় রেজোয়ানুল হকের পাশাপাশি আমার হতাশাগ্রস্থ মুখ ও প্রকাশিত হল। মিডিয়া এমন এক জিনিস- কাঊকে মাথায় তুলতে দেরী করেনা- কাউকে মাটিতে আছাড় মারতে ও দেরী করেনা। আমাকে ও মাটিতে নামিয়ে আনল ওরা। আমার বিরূদ্ধে হত্যা মামলা রজু করা হল সেই নেতার দলের লোকজনের পক্ষ থেকে। কিন্তু সরকার আমার পাশে ছিল বলে মামলা ধোপে টেকেনি। টাকা পয়সা খাইয়ে পুলিশ আর আদালতের সবকটাকে কিনে নিয়েছিলাম।

তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি ও ফিরে আসি বাস্তব জীবনে। রোগীদের সেবায় মনযোগ দেই। ছোটখাট অপারেশন এ যোগ যেই। এরপর আসতে আসতে আমার জীবন স্বাভাবিক হয়ে ঊঠে।কিন্তু এর ঠিক ছয় মাস পড়েই এই মহিলা ডাক্তার কে অপারেশনের দায়িত্ব পরে আমার উপর। আমি নিরুপায় ছিলাম। উনাকে আমি কর্মজীবনে শ্রদ্ধা করতাম। আমার শিক্ষিকা ছিলেন। উনার হার্টে ব্লক ধরা পড়াতে উনাকে অপারেশনের দায়িত্ব উনি নিজেই আমাকে দেন। খুব ছোট অপারেশন। হরহামেশাই এই ধরনের অপারেশন হত-এখন ও হয়। হার্টের যে ধমনী গুলো ব্লক হয়ে যায় সেগুলোতে রিং পড়ানোর কাজ। আমি প্রথমে রাজি হইনি। কিন্তু রোগীর পীড়াপীড়ি তে রাজি হই।

অপারেশন টেবিলের সামনে এসেই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কারন সেখানে সেই দিনের মতই বাম কোনায় বসে ছিল সেই বৃদ্ধ। উনাকে দেখেই বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠে আমার। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠে মন।

কিন্তু বাধ্য হয়ে আমাকে অপারেশন করতে হয়। আমি ও শুরু করি। হার্টের ধমনী একটাতে রিং পড়ানো শেষ করে আরেকটা যখন ধরবো এমন সময় কানের কাছে ফিসফিস করে বৃদ্ধ সেই আগের মতই বলল-

“বাবাজি- আজকা ও তুমি উনারে বাচাতি পারবানা”

হাসি হাসি মুখের ভেতর যেন রাজ্যের ঘৃণা। আমি উনার চেহারার দিকে এক পলক তাকিয়েই আবার কাজ শুরু করলাম। কিন্তু রিং পড়াতে গিয়েই হটাত করে ভুল করে কেটে গেল ধমনী টা। গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করল। নিরুপায় হয়ে তিন চার জন মিলে সেই রক্ত বন্ধ করে ধমনী পরিষ্কার করে জোড়া লাগাতে বসল। আমি নিজেও হাত দিলাম। কিন্তু যা হবার তাই হল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে রোগীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেল। আমি রক্তের জন্য লোক পাঠালাম। কিন্তু সামান্য ও পজেটিভ রক্ত সেখানে ছিলনা। এতবড় একটা হাসপাতালে ও পজেটিভ রক্ত না পেয়ে সেই ডাক্তার আপা মারা গেলেন চোখের সামনে। আমার কিছু ই করার ছিলনা।

এরপর একদম ভেঙ্গে পড়েছিলাম আমি। আমার পরিবার থেকে বিয়ে করার জন্য চাপ আসল। আমি ও বিয়ে করলাম। মিতি- আমার বৌ- লক্ষ্মী বৌ আমার। যাকে বলে একেবারেই আটপৌরে মেয়ে। বিয়ে হয়েছে আমাদের মাত্র তিন সপ্তাহ। এরমাঝেই আমাকে করেছে আপন। কিন্তু ভাগ্য সহায় না থাকলে যা হয়- বিয়ের তিন সপ্তাহের মাথায় ওর আব্দার রাখতে গেলাম কক্সবাজার এ। সেখানে প্রথম দিনেই একটা আছাড় খেল মিতি বাথরুমে। প্রথমে আমি তেমন কিছু না বলে পাত্তা না দিলে ও পরে বুঝতে পারি মিতির কোন একটা বিশেষ সমস্যা হয়েছে।

তখনই আমি মিতিকে নিয়ে আসি ঢাকায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানতে পারি মিতির মাথায় রক্তক্ষরণ হয়েছে আছাড়ের ফলে। খুব দ্রুত মিতিকে অপারেশন করাতে হবে। নিজের স্ত্রী বলে মিতির অপারেশন আমি করতে চাইনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে সব ভাল ভাল সার্জন রা দেশের বাইরে থাকাতে আমাকেই দায়িত্ব নিতে হল। আমি ও মেনে নিলাম অর্পিত দায়িত্ব।

আমি এখন বসে আছি মিতির রুমের সামনে। আরেকটু পর মিতির অপারেশন। আমি মিতির দিকেই তাকিয়ে ছিলাম- কিন্তু হটাত করে চোখ গেল মিতির কেবিনের বাম কোনায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে সেই বৃদ্ধ। জানিনা কি হবে আজকে। যে কোন ভাবে মিতিকে বাঁচাতেই হবে। কিন্তু আজরাইলের বেশে বৃদ্ধের মুচকি হাসি দেখে আমার আশার প্রদিপ নিভতে শুরু করে দিয়েছে……

(সমাপ্ত)

লিখেছেন : নষ্ট কবি   (ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

নামহীন ভৌতিক কাহিনী

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

আজকে আপনাদের সাথে যেই ঘটনাটি শেয়ার করছি তা আমার মামার মুখ থেকে শোনা। ঘটনা যার সাথে ঘটেছিলো সে আমার মামার বন্ধু। ঘটনাটি ঘটে নওগাঁ শহরের একটি রাস্তায় । এই ঘটনাটির যার সাথে ঘটে তার নাম হাবিব। মামার বন্ধু সেই সুবাদে আমিও উনাকে হাবিব মামা বলেডাকতাম। হাবিব মামা নিজের বাসায় রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। কোন চাকরি না পেয়ে পরিচিত এক লোকের সি এন জি চালাতেন। ঘটনাটি ঘটে যখন হাবিব মামা এক রাতে সিএনজি নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। তখন রাত প্রায় ২ টা বাজে । তিনি হঠাৎ দেখলেন দুইজন মধ্যবয়সী হুজুর ধরনের ব্যক্তি তাকে সিএনজি থামানোর জন্য অনুরোধ করছে । তা দেখে সে থামল এবং একজন হুজুর তার সাথে কথা বললো ।

হুজুরঃ ভাই আমরা খুব বিপদে পড়েছি ।

হাবিবঃ আপনাদের কি হয়েছে জানতে পারি ?

হুজুরঃ সামনে আমাদের এক বন্ধু একটি লাশ নিয়ে দাড়িয়ে আছে । ওই লাশটাকে নিয়ে আমাদের সামনের গ্রামে যেতে হবে । তুমি কি আমাদের পৌঁছে দিতে পারবে?

হাবিব মামা কিছুক্ষণ ভাবলো ।তার মাঝে উনাদের জন্য দয়া হলো ।সে আবার কথা বললো ।

হাবিবঃ আমি আপনাদের পৌঁছে দিব ।

হুজুরঃ ধন্যবাদ তোমাকে ।

এটা বলে দুইজন সিএনজ়িতে উঠে পড়লো । কিছু দূরে যেতেই হাবিব মামা দেখলো আরেকজন হুজুর লাশ নিয়ে দাড়িয়ে আছে ।লাশটি কাপড় দিয়ে প্যাচানো । হাবিব মামা উনার সামনে এসে সিএনজ়ি থামালো ।এরপর দুই হুজুর নামলো এবং তিনহুজুর লাশটি নিয়ে উঠলো । তারপর তারা হাবিব মামাকে সিএনজ়ি চালাতে বললো । আর একজন হুজুর ওর সাথে কথা বলতে থাকলো ।

হুজ়ুরঃ সামনের গ্রামে যেতে কতক্ষন লাগবে ?

হাবিবঃ প্রায় ৪০ মিনিট ।

হুজুরঃ তুমি পেছনের দিকে চাইবে না । লাশের অবস্থা বেশি ভালো না । দেখলে ভয় পাবে ।

হাবিবঃ আচ্ছা হুজুর ।

তারপর হাবিব মামা সিএনজি চালাতে শুরু করলো । কিন্তু সে লাশ দেখার আকর্ষণ অনুভব করলো কিন্তু সে সাহস পেলো না । এর ৫ থেকে ৬ মিনিট পর সে এক অদ্ভুত বাজে শব্দ শুনতে পারলো ।এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করলো । সে তার মনের ভয় দূর করার জন্য সামনের লুকিং গ্লাস দিয়ে পেছনের দিকে চইলো । চেয়ে যা দেখতে পারলো যা সে কেনো, আমরা কেউ কোনোদিন ভাবতে পারি না । কল্পনাও করতে পারি না। সে দেখলো ওই তিন হুজুর লাশটিকে ছিড়ে ছিড়ে শকুনের মত খাচ্ছে। কেউ কলিজা, তো কেউ বুকের রক্ত পান করছে। তা দেখে সে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।
যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখনসে হাসপাতালে ভর্তি। তার সারা শরীরে ব্যান্ডেজ । তাকে সকালে রাস্তার পাশে একটি খাল থেকে উদ্ধার করা হয় । এখন সে সুস্থ আছে । কিন্তু ওইদিনের ঘটনার পর থেকে আজও সে সন্ধ্যারপর আর সিএনজি নিয়ে বের হয় নি । তিনি নওগাঁ থেকে ঢাকায় চলে এসে একটা ব্যবসা শুরু করেন। তাকে আজও ওইদিনের ঘটনা তাড়া দিয়ে বেড়ায় ।

জানিয়েছেনঃ সায়েদ তৌফিকুর নাইম (ভূতুড়ে গল্প)

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব ১৩

1

ঢাকার গুলশান ২ এলাকায় একটা এপার্টমেন্ট ছিল।। কোনও ফ্যামিলিই ঐ এপার্টমেন্টে বেশি দিন থাকতে পারতো না।। তারা নানা ধরনের প্রবলেম ফেস করতো।। সবই আধিভৌতিক।। যেমন, রুমের দেয়াল থেকে রক্ত পড়তে দেখা, ঘুমানোর সময় রুমের ভেতর বাচ্চা কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া ইত্যাদি।। এছাড়াও প্রতি রুমের মধ্যে ভ্যাপসা একটা ভাব লক্ষ্য করা যেতো।। এপার্টমেন্টটিতে কেউ থাকতে পারে না দেখে ডেভেলপাররা ঐ এপার্টমেন্টটি ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।। এপার্টমেন্ট ভাঙার সময় শ্রমিকরা স্টোর রুমে একটি সিল করা কফিন খুঁজে পায়।। কফিনের ভেতরটি মাটি দিয়ে ভরা ছিল।। মাটি সরানোর পর একটি ৬-৭ বছরের বাচ্চার ডেড বডি পাওয়া যায়।। বাচ্চাটার লাশ এতই জীবন্ত ছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল বাচ্চাটাকে মাত্রই কফিনে রাখা হয়েছে।। এছাড়া কফিনটির ভেতর একটি কাগজ ছিল, যেখানে পবিত্র কুরআন শরীফের কিছু আয়াত উল্টা করে লেখা ছিল।। ধারণা করা হয়, লাশটাকে শয়তানের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হয়েছিলো।। গুলশান ২ এর মতো জায়গাতেও এই ধরনের ঘটনা আসলেই অনাকাঙ্ক্ষিত।। তবে, জানা যায়, যেইসব ঘরে শয়তানের পূজা করা হয়, সেখানে কেই শান্তিতে বাস করতে পারে না।।

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব ৪

0

পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার দোহসোহ গ্রামে ভালোবাসা নিয়ে বিরোধের সুত্র ধরে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যায়।। ঘটনাটি পৃথক পৃথকভাবে ঘটেছিলো।। আগে মারা যায় মেয়েটি, এরপর ছেলেটি ফাঁস নেয়।।

ঘটনাটির ২ মাস পরে স্থানীয় এক কৃষক সুলতান কবির টিপু তার বাড়ির বাগানে একটি মেয়ে এবং ছেলেকে বসে থাকতে দেখেন।। তাদের দুইজনের পড়নেই ছিল সাদা কাপড়।। এই সময় চোর মনে করে নিজের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে তিনি তাদের ধরতে গেলে দেখেন, ছেলে মেয়ে দুটোর চেহারা হুবুহু ঐ দুটো ছেলে মেয়ের মতো।। তারচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, উনাদের দুইজনের উপস্থিতিতে সেই ছেলে-মেয়ে দুটো চোখের সামনে গায়েব হয়ে যায়।।

এরপরের ঘটনা আরো ভয়াবহ।।

রাতে গ্রামের বাজার থেকে দলবল মিলে ফিরছিলেন একদল দোকানি।। পথিমধ্যে একটি পুরানো বট গাছ পড়ে।। লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা কোনো ভয় ডর ছাড়াই পথ চলছিলেন।। হটাত তাদের মাঝে একজন লক্ষ্য করেন গাছে দুটো ফাঁস দেয় লাশ ঝুলছে।। দুটোর পড়নেই সাদা কাপড়।। দেহের গঠন দেখে বুঝা যাচ্ছিল, একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে।। তারা সবাই সেই গাছের নিচেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন দিনের আলো ফোটার জন্য।। কিন্তু, মিনিট বিশেক পর সেই ঝুলন্ত দেহগুলোর একটাও চোখে পড়ে না।। গায়েব হয়ে যায় প্রায় ১০-১২ জন লোকের চোখের সামনেই।।

কবরের আযাব সম্পর্কে একটি ভয়ানক ঘটনা!!!! {সংগৃহীত}

1

বিশ্ব যুদ্ধের সময় পরাশক্তিধরদের হিন্দুস্থানে আক্রমন করার সময় ইংরেজ বাহিনীকে সিঙ্গাপুর ও বার্মায় অস্ত্র রাখতে হয়ছিল। অস্ত্র রাখার সময় ইংরেজ জেনারেল সৈন্যদেরকে অনুমতি দিল, যে সৈন্য পলায়ন করে প্রান বাঁচাতে পারবে সে যেন তার প্রান বাঁচায়। সৈন্যদের এক মেজর তোফায়েল তার এক সাথী মেজর নেহাল সিং এর সাথে পালিয়ে গেল।

মেজর তোফায়েল বর্ণনা করেন: আমরা উভয়ে অন্ধকার রাতে ঘোড়ায় চড়ে বের হলাম এবং বার্মার রণাঙ্গন ধরে ঘোড়া হাঁকালাম। বার্মার ঘন জন-মানব হীন অন্ধকার ভয়ানক জঙ্গল বিশিষ্ট এলাকা, যা অতিক্রম করা অত্যন্ত দূরহ কাজ ছিল। যাই হোক আমরা অনুমানের ভিত্তিতে হিন্দুস্থানের জেলা আসাম মূখি হলাম। যেখানে জাপানীদের আক্রমন থাকা সত্বেও ইংরেজদের প্রাধান্য বিস্তার করছিল। পরামর্শের ভিত্তিতে রাস্তা অতিক্রম করতে থাকলাম। এর মধ্যে কত রাত অতিক্রম হয়েছে তার কোন হিসাব আমাদের কাছে ছিল না। পানাহার সামগ্রী শেষ হয়ে আসছিল। জঙ্গল ও নদ-নদীর উপর দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। কোন কোন সময় ভয়ঙ্কর সাপ-বিচ্ছুর মুখো মুখিও হতে হয়েছে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পথ চলেছি। একদিন সামনে এক খালী জায়গায় একটি কবরস্থান চোখে পরল।

সেখানে প্রায় ২৫-৩০টি কবর হবে । এক কবরে মৃতের প্রায় অর্ধেক দেহ পঁচা গলা অবস্থায় কবরের বাইরে পরেছিল। লাশের উপর ছোট একটি বিচ্ছু বারবার দংশন করছিল। আর লাশ খুব ভয়ঙ্করভাবে চিল্লাছিল। কোন জীবিত মানুষকে যেমন কোন বিচ্ছু দংশন করলে তার বিষাক্ততার ফলে সে কাঁদত তা এমন মনে হচ্ছিল। যা জীবিত অন্যান্য মানুষকে ও প্রাণীকে বেঁহুশ করে দিতে যথেষ্ট ছিল। সত্যিই এ এক ভয়ানক দৃশ্য ছিল। মেজর নেহাল সিং আমার বাধা সত্বেও বিচ্ছুটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল, এতে একটি অগ্নিশিখা বিচ্ছুরিত হল বটে কিন্তু বিচ্ছুর কিছু হয় নাই। নেহাল সিং আবারো গুলি করার প্রস্তুতি নিল, আমি তাকে কঠোর ভাবে বাধা দিলাম এবং তার পথে তাকে চলতে বললাম, কিন্তু সে আমার কথায় কর্ণপাত না করে কবর স্থানের এক মৃতকে বাঁচাতে গিয়ে বিচ্ছুকে আবার গুলি করল। আবারো একটি অগ্নিশিখা বিচ্ছুরিত হল বটে কিন্তু বিচ্ছুর কিছুই হলোনা। বরং বিচ্ছুটি তখন লাশকে ছেড়ে আমাদের দিকে ছুটে আসতে লাগল। আমি তখন নিহাল সিংকে বললাম: “বিচ্ছু ও লাশ ছেড়ে এখান থেকে ভাগ, বিচ্ছু্ আমাদের দিকে এগিয়ে আসা আশংকা মুক্ত নয়”। আমরা ঘোড়া চালাতে শুরু করলাম, কিছুদূর যাওয়ার পর পিছনে তাকিয়ে দেখি, বিচ্ছুটি পিছনে পিছনে খুব দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। আমরা ঘোড়াকে আরো দ্রুত চালাতে শুরু করলাম। কয়েক মাইল চলার পর এক নদী সামনে পরল, যা খুবই গভীর মনে হচ্ছিল। একটু থেমে চিন্তা করতে লাগলাম, নদীতে ঘোড়া নিক্ষেপ করব না নদীর তীর ধরে চলে কোন রাস্তা খোঁজব। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তের পূর্বে ঐ বিচ্ছুটি আমাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। আমরা লক্ষ্য করলাম যে আমরা সশস্ত্র হওয়া সত্বেও এ বিচ্ছুটি আমাদেরকে আতংকিত করে তুলেছিল। এমনকি আমাদের ঘোড়াও লাফাচ্ছিল যেন সেও ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত। বিচ্ছু নিহাল সিং এর দিকে এগোচ্ছিল। নিহাল সিং ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাপিয়ে পড়ল। আর তার পিছে পিছে বিচ্ছুও নদীতে ঝাপিয়ে পরল। আল্লাহ জানেন বিচ্ছু ঘোড়ার শরীরের কোন অংশে কেটেছিল যার ফলে সেটিও এ অস্বাভাবিক আঘাতের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। ঘোড়াটি কাঁপতে শুরু করল। নেহাল সিং ভয়ানক ভাবে চিৎকার করে আমাকে বলতে লাগল: “তোফায়েল আমি ডুবে যাচ্ছি, জ্বলে যাচ্ছি, আমাকে বিচ্ছু থেকে বাঁচাও”। আমিও তখন ঘোড়া নিয়ে

ঝাপিয়ে পড়লাম এবং বাম হাত তার দিকে বাড়ালাম। সে তখন আমাকে খুব শক্ত করে ধরে নিল। আমার মনে হচ্ছিল এটা নদীর স্বভাবিক পানি নয়, বরং কোন বিষাক্ত পানি, যা শুধু আমার হাত নয় সমস্ত শরীরই জালিয়ে দিবে। আমি তখন আমার অস্ত্র বের করে আমার বাম হাত কেটে ফেলে নিজেকে রক্ষা করে দ্রুত নদীর তীর ধরে চলতে শুরু করলাম। মেজর নেহাল সিং আমাকে চিৎকার করে ডাকতে থাকল আর পানিতে ডুবতে লাগল। নদীর বড় বড় ঢেউ তাকে গ্রাস করতে লাগল। এ হল আল্লাহর শাস্তি…. বিচ্ছু নিজের কাজ করে চলে যাচ্ছিল, আমার সামনে আসে নাই। আল্লাহর সৈন্যদের মধ্যে সে একাই এক গায়েবী সৈন্যের মত। সে আমার কোন ক্ষতি করে নাই যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই চলে গেল।

রাতের বিভীষিকা !!!!!!!!

4

আজ কাজে আসতে কামালের একটু দেরী হয়ে যায় । এখন বাজে সকাল প্রায় ৯ টা ৪৫ মিনিট । হাজিরা খাতায় সই করতে করতে কামাল একবার আশে পাশে চোখ বুলায় তারপর ঝট করে হাজিরের ঘরে লিখে ফেলে ৯টা ৩০ মিনটি । তার পর পাশের টেবিলে বসা এক বুড়োকে লক্ষ্য করে বলে- বুঝলেন কলিম চাচা বউডার শরীর বেশি ভালা না । আট মাস চলতাছে । অনেক চিন্তায় আছি । বাসায় কেউ নাই যে দেখভাল করবো । কি যে করি ? একটু থেমে আবার বলে -আমারই সব করতে হয় । তার উপর টাকা পয়সার সমস্যায় আছি ।

-একটা কামের লোক রাখতে পারো না মিঞা ? পাশের টেবিলে বসে থাকা ৬০ বছর বয়সের বৃদ্ব কলিম মিয়া কথাটা বলে কিছুটা থামে , তারপর আবার বলে – জানো তো পরপর তিনদিন লেট হইলে এক দিনের বেতন পানিতে যাইবো । তোমার এ মাসে ওলরেডি ৭ দিন লেট । মানে ২ দিনের বেতন নাই । ব্যাপারটা মাথায় রাইখো ।

কামাল কিছু বলে না মাথা নাড়ায় । সে ব্যাপারটা জানে ।

সরওয়াদি হাসপাতালের এ্যম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসাবে গত মাস দু’য়েক আগে যোগ দিয়েছে কামাল । ওর কাজ হলো সারাদিন এ্যম্বুলেস চালান । যেদিন কাজের চাপ থাকে সেদিন এতো বেশি থাকে যে খাওয়া দাওয়ার সময় থাকে না । আর যেদিন কাজের চাপ কম থাকে সেদিন দেখা যায় দু’একটা ট্রিপ মারার পরই বসে বসে ঝিমোতে হয় । তবে কাজের মধ্যেই থাকতে বেশি ভাল লাগে কামালের । তার উপর কখন ও সখন ও দু’পয়সা উপরি পাওয়া যায় । শুরুতে রুগি ,লাশ পরিবহন করতে একটু খারাপই লাগত । কিন্তু এখন তা সয়ে গেছে । ও চিন্তা করে দেখেছে যাত্রী পরিবহন করার চেয়ে রুগি আর লাশ পরিবহন করাই নিরাপদ। হাউকাউ চেচামেচি কম করে । সই করে এ্যম্বুলেন্সের চাবির জন্য দোতালায় উঠতেই শান্তি দিদির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় । তিনি প্রায় দৈড়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দিকে যাচ্ছিলেন । শান্তি দিদি হাসপাতালের সিনিয়র নার্স । কামালকে বেশ স্নেহ্ করে । ঠিক কামালের মতো দেখতে নাকি তার এক ভাই ছিল ।

– কি দিদি কি খবর ?

– ২১ নম্বর রুগির অবস্হা বেশি ভাল না রে । স্যারদের খবর দিতে গেছিলাম । তোর বউ কেমন আছে ? কোন চিন্তা করবি না আমরা আছি । শান্তি দিদি দাঁড়ায় না ।

কামাল কিছু বলার সুযোগ না পেয়ে হেসে অফিস রুমে ঢুকে যায় । সেখান থেকে চাবি নিয়ে সোজা বাহার ভাইয়ের চায়ের দোকানে । চাবি নেয়ার মানে কামাল গাড়ি সহ রেডি । কল আসলেই চলে যাবে । বাহার ভাই এর দোকানে কামাল এলাহি ভাইকে দেখতে পায় । আরো কয়েকজনকে নিয়ে বসে চা খাচ্ছে আর হাত নেড়ে নেড়ে কি যেন বলছে । এলাহি ভাই এই হাসপাতালের ড্রাইভার ইউনিয়নের নেতা । তার হুকুম ছাড়া হাসপাতালের একটা গাড়িও চলে না । তার কথাই আইন । কামাল কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বলে ভাই কেমন আছেন ?

সালামের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে এলাহি মিয়া বলে – কি ব্যাপার কামাল আজকাল থাকো কৈই ? ইউনিয়িন অফিসে আসো টাস না । শুধু কি রুগিগো সেবা করলে চলবো ? নিজের ভবিষ্যতের দিকে ও তো তাকাইতে হইবো, না কি ? সর্মথনের আশায় এলাহি মিয়া পাশে বসে থাকা অন্য সবার দিকে তাকায় । সবাই মাথা নেড়ে তাকে সর্মথন দেয় ।

– লিডার কামাল মিয়ার তো বাচ্চা হইবো । পাশে বসে লম্বা মতো তেল চোরা জহির বলে ।

-আবে কামালের বাচ্চা হইবো নাকি ? ক’ওর বউ এর বাচ্চা হইবো । আরেকজন কথাটা বলার সাথে সাথে সবাই হো হো করে হেসে উঠে । কামাল কিচ্ছু বলে না । মুখে হাসি হাসি একটা ভাব করে রাখে । যেন খুব মজা পাচ্ছে ।

-বস । চাটা খাও । তয় ভাই বাচ্চা হওনের পর কিন্তু ইউনিয়নের জন্য সময় দিবা । আমি তো শালায় তোমগো লাইগা খাটতে খাটতে শেষ । আর যে কোন দরকারে আমার ফোন দিবা । তোমগো লাইগা আমার জান কোরবান । বলে এলাহি মিয়া দল বল নিয়া চলে যায় ।

কামাল বুঝতে পারে আজকের দিনটা ওর বসে বসেই কাটবে । চায়ের দোকানে দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর ও কোন কল আসেনা । কামাল উঠে ওর এ্যম্বলেন্সের কাছে চলে আসে । ১৭ নম্বর এ্যম্বুলেন্স । দরাজা খুলে ও এ্যম্বুলেন্সে উঠে রেডিও চালিয় কতোক্ষন খবর শুনে ।

এমন সময় সোলেমান এসে একটা ঠিকানা দিয়ে যায় । গুলশান যেতে হবে । রুগী নিয়ে আসতে হবে । কামাল বের হয়ে যায় । যাবার সময় একটা কলা আর বন রুটি নিয়ে নেয় বাহার এর দোকান থেকে দুপুরের খাবার হিসাবে খাবে বলে । খাতায় লিখে রাখতে বলে ও টান দিয়ে গাড়ী নিয়ে বেড় হয়ে যায় । হাসপাতালের গাড়ি চালালে আরেকটা সুবিধা হলো রাস্তায় সাজেন্টের সঙ্গে ঝামেলায় পরতে হয় না । কথায় আছে এ্যম্বুলেন্সের সাইরেন শুনলে প্রধান মন্ত্রীর গাড়ীও নাকি সাইড দেয় । কথাটা অনেকটা সত্য ।

দেশের অবস্থা খুব একটা ভাল না । রাস্তা ঘাটে প্রচুর জ্যাম । তাড়াতাড়ি গুলশান থেকে ফিরতে পারলেই দ্বায়িত্ব শেষ করে বাসায় ফেরা যায় । মায়া বাসায় একলা । দুবার এর মধ্যে ওর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে । মায়া বলেছে ও ভাল আছে । কোন সমস্যা নাই । তাই ও এখন অনেকটা নিশ্চিন্তে আছে । গুলশান থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায় । দোতালায় চাবি জমা দেবার জন্য আসতেই কামাল খবর পায় শান্তি দিদি ওকে কয়েকবার খুঁজেছে । অফিস রুমে খবর দিয়ে রেখেছে যেন ও আসলেই যেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডে চলে আসে ।

৭ নম্বর ওয়ার্ডটা খুব বড় । ঢুকতেই হাতের ডান পাশে নার্সদের বসার জায়গা । শান্তি দিদি সেখানেই বসে আছেন । ওকে দেখে বলেন- কামাল এদিকে আয় । তোর সঙ্গে কথা আছে ।

-দিদি বাসায় যেতে হবে । তাড়াতাড়ি কও কি কইবা । কামাল একটা খালি চেয়ার টেনে বসে পরে ।

-তোর বউ কেমন আছে ?

-আছে কোনরকম । দিদি রাইত হইছে । কাজের কথা কও । বউডা একলা ঘরে । কামাল তাড়া দেয় ।

-আরে বছ না ছেমরা । কাজ ছাড়া কি তোরে ডাকছি ? কামাল মাথা নাড়ে দিদি ঠিক বলেছ কাজ ছাড়া ডাকেনি । শুন ২১ নম্বর বেডের রুগীডা মারা গেছে । লাশ মর্গে আছে । তোরে একটু দিয়া আইতে হইবো ।

-কি কও ? এ্যই রাইতের বেলা ? জাকিরের তো নাইট ,ও’রে কও ? কামাল চলে যাবার জন্য দাঁড়িয়ে যায় ।

-আরে শুন ; শুন; তোর তো টাকা দরকার । মালদার পাটি ; পাথের খরচ বাদ দিয়াও মনে হয় হাজার পাঁচেক দিবো । জাকির গেছে সাভারে আসলে কমু । ও মনে হয় রাজি হইয়া যাইবো । সামনে তোর পোলা পাইন হইবো হাতে টাকা পয়সা দরকার তাই আমি তোরে কইলাম । এখন যাওয়া না যাওয়া তোর মর্জি ।

পাঁচ হাজার ! কামাল একটু দ্বিধায় পরে যায় । আসলেই তো ওর হাতে তেমন টাকা পয়সা নাই । প্রতি মাসে মাটির ব্যাংটাতে এতোদিন যা জমিয়েছে সব মিলিয়ে হয়তো হাজার পাঁচেকই হবে । এ সময় পাঁচ হাজার টাকা হলে বাচ্চা হওনের সময় অনেক নিশ্চিত হওয়া যায় ।

-কিন্তু দিদি মায়া তো বাসায় একলা । দেরী করলে ভয় পাইতে পারে ।

-আরে ছেমরা কয় কি ? ভয় পাইবো কেন ? লাগলে আমি যাওনের সময় একবার দেইখা যামু । শান্তি দিদি খাতায় কিছু লিখতে লিখতে বলে ।

– কৈই যাইতে হইবো ? মাথা চুলকাতে চুলকাতে কামাল জিজ্ঞাসা করে ।

-কুমিল্লা । শান্তি দিদি লেখা বন্ধ না করেই বলে ।

-ও মা কও কি দিদি ? কুমিল্লা ! কামাল আতকে উঠে । তাইলে তো ফিরতে ফিরতে ভোর হইয়া যাইবো ।

-আরে না । ভোর হইবো না । এ্যই ধর তিনটা চারইটা বাজতে পারে ।

-হেইডা তো ভোরই । কাইল আবার ডিইটি আছে না ? কখন ঘুমামু কখন কামে আমু ।

-কাইল ১২ দিকে আবি ।সুপার স্যাররে আমি কইয়া রাখুম । কোন অসুবিধা হইবো না । শান্তি দিদি ফাইলটা আলমারিতে রাখতে রাখতে বলে ।

-একটা কথা কও তো দিদি তোমার এতো গর্জ কেন ? ভালাই পাইছো মনে হয় ।

-আরে ছেমরা মর । আমার আবার গর্জ কি ? তুই যখন মরবি তখন তোর লাইগাও আমি মাইষের হাতে পায়ে ধরমু ।

-আহা দিদি রাগ করো কেন ?

-শুন । দিদি কামালের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে । যে মরছে সে অনেক বড় লোক আছিল । বড়লোকগো যেমন খাসলত ভালা হয় না । এই ব্যাডারও তাই আছিল । শেষ বয়সে তিনডা বিয়া করছে । কচি কচি মাইয়া গুলি এই এক সপ্তাহ বুইড়াডার লাগি যা করলো । এখন মরার পরও লাশ নিয়া বইয়া আছে । তুই যাইয়া পৌছে দিয়ে আয় । তোর কাম শেষ । শান্তি দিদি ওর হাতে একটা সাদা খাম দেয় ।

-কি এইডা ? কামাল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ।

-কি আবার টাকা আর ঠিকানা যেহানে যাবি । যা গাড়িতে গিয়া ব।

-কিন্তু দিদি এতোটা পথ এই রাইতের বেলায় লাশ নিয়া একলা যাইতে পারুম না ।

-আরে ছেমড়া একলা যাবি কেন । বুইড়ার তিন বউ যাইবো তোর লগে । দেখিস আবার না তুই বুইড়া হইয়া যাছ ।নিজের রসিকতায় নিজেই শান্তি দিদি হেসে উঠে ।

-কি যে কওনা দিদি ? আমি তাইলে গাড়িতে যাই ।

-যা । আর শুন বউরে নিয়া চিন্তা করবি না । আমি তোর দিদি আছি । যা ভাগ ।

কামাল বের হয়ে যায় । হঠাৎ করে টাকাটা পেয়ে মেজাজ ভাল হয়ে গেছে । যেতে যেতে মায়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলে । মায়াকে জানায় – ওকে এখন কুমিল্লা যেতে হচ্ছে , ফিরতে রাত হবে । মায়া যেন কোন চিন্তা না করে । যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ও ফিরে আসবে ।

কামাল নীচে নেমে দেখে লাশ ওর গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে । মনির মিয়া গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে ।

এতো ভারী কারো শরীর হয় ? চাইর জন মিল্লাও তুলতে যে কষ্ঠটা হইলো । কামালের দিকে তাকিয়ে হাত ঢোলতে ঢোলতে কথা গুলো এক নি:শ্বাসে বলে মনির মিঞা ।

-অনেক ভারী নাকি ? পাল্টা জিজ্ঞাসা করে কামাল তাকায় এ্যম্বুলেন্সের ভেতরে । বাম পাশের বেডের উপর লাশটা রেখে সাদা একটা চাদর দিয়ে লাশটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে । মিনির মিঞা বাম দিকের দরজা বন্ধ করে দেয় । কালো বোরকা পরা লম্বা মতোন দু’জন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির পাশে । একবার কামালের দিকে তাকিয়ে দু’জন নীচু স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকে । কামালের কান পর্যন্ত সে কথার আওয়াজ পৌছায় না । কাগজ নিয়ে আরেক জন বোরকা পড়া মহিলা কামাল এর কাছে এসে বলে – আপনিই কি যাবেন ভাই ?

-কামাল উপরে নীচে হা সূর্চক মাথা নাড়ে ।

-তা হলে চুলুন রওনা হই । মহিলা মিনির মিয়ার হাতে কয়েকটা একশ টাকার নোট দিয়ে অন্য দুজন মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে – কৈই তোমরা আস ।

সবাই উঠে বসতেই কামাল এ্যম্বুলেন্স ছেড়ে দেয় । ঘড়িতে তখন কাটায় কাটায় রাত ১২ টা বাজে ।

রাস্তায় খুব একটা গাড়ি নেই । সোডিয়াম বাতির আলোয় পথ ঘাট কেমন ভৌতিক মনে হচ্ছে । কামাল এমনিতে ভুত প্রেত বিশ্বাস করে না । তবু এ নির্জন রাতে কেন যেন ওর শরীরে কাটা দিয়ে যায় । গাড়ির গতি ঘন্টায় ৬০ রাখে কামাল । মনে মনে ঠিক করে কোন অবস্থাতেই গাড়ির গতি ৬০কি.মি: এর উপড় নেবে না । কামালের শশুরই ছিল ওর ওস্তাদ । সে শিখিয়েছে রাতের বেলা রাস্তা ঘাট যতোই ফাঁকা হোক না কেন একটা নিদিষ্ট গতিতে গাড়ী চালালে কোন এক্সিডেন্ট হয় না । কামাল কথাটা বিশ্বাস করে । তাই আগে বাগে মনে মনে গাড়ির গতি ঠিক করে নেয় ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার ।সংসদ ভবন এর সামনে আসতেই বৃষ্টি শুরু হলো । কামাল মনে মনে বলে- বৃষ্টি হবার আর সময় পেল না । কামাল গাড়ীর গতি আরো কমিয়ে আনে । আসাদ গেটে আড়ং এর সামনে আসতেই সিগনাল পরে গেল । কামাল একবার ভাবলো টান দিয়ে চলে যাবে কিনা ? কিন্তু পরক্ষনেই ভাবলো; না । অস্থির হবার কিছু নাই ।

ও গাড়ী থামিয়ে গ্রীন বাতির জন্য অপেক্ষা করে । রাস্তা প্রায় ফাঁকা । কোন জন মানব নেই । ডানে বামে তাকালে ওর কেমন একটা গা ছমছম করে উঠে । দুর ! যতোসব ফালতু চিন্তা ভাবনা । এক কিলোও আসতে পারলাম না আর ভুতের চিন্তা পেয়ে বসেছে । নিজেক নিজেই সান্তনা দেয় কামাল । হঠাৎ বাম পাশের জানলা দিয়ে একটা মুখ উকি দিতে চমকে উঠে চিৎকার করে কামাল কে ? কে ?

জানালায় দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে আছে এক বুড়া । মাথায় এলোমেলে সাদা চুল । দু’হাত দিয়ে জানালার কাঁচ চেপে আছে । দাঁত গুলোও কেমন ফাঁক ফাঁক । লোকটা বলে উঠে- দে ; দে; টাকা দে । ভাত খামু টাকা দে ।

মেজাজ খারাপ হয়ে যায় কামালের । মনে হয় নাইমা দুইটা চড় মারে । হারমজাদা ভিক্ষা চাওনের আর কোন সময় পায় না । মর যাইয়া । ও শার্ট ফাঁক করে বুকে থুতু দেয় ।

মনে মনে গজগজ করলেও বুক পকেট হাতরে পাঁচ টাকার একটা নোট বেড় করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে ধরে । লোকটা টাকা না নিয়ে বলে -ভাগ । ভাগ । তাড়াতাড়ি ভাগ ।

কথার আগা মাথা বুঝতে পারে না ও । কামালের মনে করে হয়তো পাগল- টাগল হইবো । ঠিক এই সময় ওর পেছনের ছোট জানলায় টোকা দেবার শব্দ হয় । কামাল ওর ঠিক পিঠ লাগোয়া যে জানালাটা সেটা একটু ফাঁক করে ও ০পেছনে না তাকিয়েই বলে- জ্বি বলেন ?

-কি হয়েছে ? পেছন থেকে তিন জনের একজন জিজ্ঞাসা করে ।

-না কিছুনা ।

সিগনাল ছেড়ে দেওয়ায় কামাল গাড়ী টানদেয় । কামাল বাম পাশের মিররে তাকিয়ে বুড়োটাকে আর দেখতে পায় না । মনে মনে ভাবে আরে গেলো কোথায় ? ও একটু সামনে ঝুকে ফুটপাতটা দেখতে চেষ্টা করে ;কিন্তু বুড়োকে আর দেখতে না পেয়ে বেশ অবাক হয় ও ; তারপর ফার্মগেটের দিকে টার্ন্ নেয় ।

পেছন থেকে ফিস ফিস করে কথা বলার শব্দ কানে আসে কামালের । এই নিরবতায় তাতে ও কিছুটা সাহস পায় কামাল । মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি শো শো করে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে । রাতে রাস্তায় বেশির ভাগ ট্রাকই চলে । দানবের মতো ট্রাকগুলি ঘোত ঘোত শব্দ করে চলে যায় । সায়দাবাদ ; যাত্রাবাড়ি হয়ে কামাল গাড়ি চালাতে থাকে শনির আখড়া দিয়ে কুমিল্লার দিকে । এ রাস্তাটা ওর বেশ পরিচিত । একটানা বৃষ্টি হচ্ছে । মনে হয়ে আজ সারা রাতই হবে । মাঝে মাঝে বিকট শব্দে বিদ্যুত চমকাচ্ছে । শীত; শীত একটা ভাব চলে এসেছে । কামাল পানির বোতল খুলে পানি খায় । আশে পাশের দোকান পাট সব বন্ধ । আজ মনে হচ্ছে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কম । পেছন থেকে আবারও টুক টুক করে শব্দ হয় ।

– জ্বি বলেন ? কামাল মাথাটা একটু পেছনে নিয়ে বলে ।

-আমরা একটু নামবো ? এক জন বলে । কামাল অবাক হয় ।

-এখানে ?

-জ্বি । আপনি কি একটু থামেন ।

-মনে হয় দাউদকান্দি এসে পরেছি । সেখানে থামলে হতো না ?

-না । সামনের বড় গাছটার কাছে থামুন । পেছন থেকে অন্য একটি কন্ঠ বলে উঠে । কথাটা আদেশেয মতো শুনার ওর কাছে । কামাল এ্যম্বুলেন্সটা রাস্তার পাশে একটা বড় গাছের গা ঘেষে দাঁড় করিয়ে দেয় । পেছনের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ও জানালাটা দিয়ে পেছনে তাকায় । আধো আলোয় যা দেখতে পায় তাতে কামাল এর মাথা ঘুরে উঠে । সিটের উপর মৃত ব্যক্তি বসে আছে । শুধু বসেই নেই ; হাত নেড়ে নেড়ে কি যেনো বলছে । ও প্রচন্ড রকমের ভয় পেয়ে যায় । কামাল পেছন থেকে চোখ সরিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করে । সামনে তাকালে দু’ছায়া দেখতে পায় ও । কোন শরীর নেই । শুধু বোঝা যাচ্ছে দেহের অস্তিত্ব । বাতাসে ভেসে ভেসে ছায়া দু’কামালের দিকেই আসছে । ভয়ে ওর জান বের হয়ে যাবার জোগার । মনে হচ্ছে মরে যাবে । নিজেকে সিটের সঙ্গে চেপে রাখে ও। মনে হচ্ছে নিজেকে সিটের ভেতর ডুকিয়ে ফেলতে পারলে ভয় কিছুটা কমে যেতো । মনে মনে আল্লাহ্ ; আল্লাহ্ করতে থাকে । ছায়া দু’টো ওর পাশ দিয়ে পেছনে চলে যায় । পেছন থেকে হঠাৎ হাসির শব্দ ভেসে আসে । কামাল সাহস সঞ্চয় করে আবার পেছনে তাকায় ।

লাশটা গাড়ি থেকে নেমে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে । শরীরে জড়ানো মুদ্দারের কাপড় এলোমেলো ঝুলে আছে । লোকটার হাতে সাদা কাপরের একটা পুটলির মতো কিছু । দু’জন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে লোকটার ঠিক সামনে । একজন পুটুলিটি একটু ফাঁক করেতেই কামাল একটি শিশুর মাথা দেখতে পায় ।

লোকটা পুটুলিটা গাড়ির ভেতরে ছুরে মারে । প্রায় সাথে সাথে হুরমুর করে সবাই গাড়িতে উঠে পরে গাড়িতে। কামালের শরীর শক্ত হয়ে গেছে । একবার ভাবলো গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দেবে কিনা । কিন্তু কোথায় যাবে ? তার চেয়ে ভাল কিছু না দেখার ভান করে থাকলে হয়তো জানে বেচে যাওয়া যাবে । ও মনে মনে প্রার্থনা করে আল্লাহ্ বাঁচাও । পেছন থেকে টোকা দেবার শব্দ আসতেই কামাল চমকে উঠে – গাড়ি চালান । ভারী এটা কন্ঠ বলে । কামাল চাবিতে হাত দিতেই গাড়ি স্টাট হয়ে যায় । কামালের মাথা কাজ করছে না । গাড়ি রাস্তায় উঠার সময় সাইড মিররে দেখতে পায় ছায়া দু’টো এখনও দাঁড়িয়ে আছে । হাতে ধরে আছে সাদা মতো দু’টো পুটুলি । এখন আর বৃষ্টি পড়ছে না ; তবে মাঝে মাঝে বিদ্যূত চমকাচ্ছে । মেইন রাস্তা ধরে গাড়ি চালাচ্ছে কামাল । ও চালাচ্ছে না বলে গাড়ি নিজে নিজে চলছে বললেই ভাল শুনায় । কেননা এই মুর্হুতে গাড়ির উপর ওর কোন কন্ট্রোল নেই । ও শুধু চুপচাপ বসে আছে । গাড়ি নিজে নিজে চলছে । পেছন থেকে চুক চুক শব্দ ভেসে আসছে । কামাল নিজেকে সামলে সাহস সঞ্চয় করে আবার পেছনে তাকায় । দেখতে পায় দু’জন করে দুপাশে বসে সবাই সামনের দিকে ঝুকে বাচ্চাটা

খাচ্ছে। দু’জনের হাতে বাচ্চাটার ছেড়া পা ; অন্য দু,জনের হাতে বাচ্চাটার ছেড়া দুটো হাত । বাচ্চার মাথাটা নীচে পড়ে আছে । চোখ দুটো খোলা । কামাল এ সমগ্র শরীর গুলিয়ে উঠে । বমি পেয়ে যায় । কি করবে বুঝতে পারে না । সারা শরীর কাঁপছে । মনে হচ্ছে ও মরে যাবে । সামনে ডান পাশে একটা বাড়ী দেখা যাচ্ছে । বারান্দায় আলো জ্বলছে । কামাল সমস্ত শক্তি দিয়ে ব্রেক চেপে ধরে । এ্যম্বুলেন্সটি একটা প্রচন্ড ঝাকি খেয়ে থেমে যায় । পেছনে বসে থাকা সবাই ধাক্কা খেয়ে কামাল এর দিকে চলে আসে । পেছন থেকে হালকা একটা কাশির শব্দ শোনা যায় । পুরুষ কন্ঠে কেউ একজন বলে – কি হলো ; কি হলো ? আগে বলেছিলাম তোরা ধৈর্য্য ধর । আমার কথা শুনলি না । এখন হলো তো । ড্রাইবার হারামজাদা সব দেখেছে । ধর হারামজাদাটারে । তারপর আবারও কাশির শব্দ । ছিড়ে টুকরা টুকরা করে ফেল । কামালের পেছনের জানালা দিয়ে একটা হাত বেড় হয়ে আসে কামালের দিকে -থামলি কেন চালা চালা । হাতটা থেকে তখনও টপ টপ করে রক্ত পড়ছে । কামাল সামনের দিকে সড়ে এসে পেছনে তাকালে দেখতে পায় শেয়ালের মতো একটা মুখ । চোখ দুটো জ্বলছে । জিহ্বাটা বের হয়ে আছে । কামাল জ্ঞান হারিয়ে সিটের উপর লুটিয়ে পরে ।

পরিশেষ : পরের দিনে ভোরে মসজিদে ফজরের নামাজ শেষে ফেরার সময় মুসুল্লিরা কামাল কে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে । জ্ঞান ফিরে আসার পর কামাল আর কিছু মনে করতে পারে না । আর ওর এ্যম্বুলেন্সটি থেমে ছিলে রাস্তার পাশের একটি বাড়ীর সামনে । এ্যম্বুলেন্সটির পেছনে একটি সাদা কাপড়ের মোড়ান অবস্থায় পাওয়া যায় একটি বাচ্চা ছেলের দেহের অবশিষ্ট অংশ ।