ডাকিণী ৪৯তম পর্ব (খ অংশ)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
লাইব্রেরীতে সবকিছুই তৈরি করে বইটা খুলে বসলাম। সমগ্র বইটাই দুর্বোধ্য হিব্রু ভাষায় লেখা। বইয়ের মাঝামাঝিতে একটা পৃষ্টা ভাঙা। সম্ভবত কেউ একজন একে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলো। এই পৃষ্টায় হিব্রু লেখার সাথে গালিচায় শোয়ানো একটা লাশের স্কেচ আকাঁ। তারপাশেই হিজিবিজি টানা ইংলিশ হরফে একটা মন্ত্রের উচ্চারণ লেখা রয়েছে। সম্ভবত লেখাটা আদিনের। বুঝলাম এটাই সেই আত্মা ঢুকানোর মন্ত্র। আমি ওটা দেখে দেখে সঠিক উচ্চারণে মুখস্থ করে নিলাম। তারপর পৃষ্টা উল্টাতেই আদিনের হস্তাক্ষরে সহজ ইংরেজিতে লেখা কার্যপ্রণালী পেয়ে গেলাম। আদিনের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেলো। ছেলেটা আমার জন্যে এতো কিছু করেছে। কিন্তু শেষমেষ ও নিজের জন্যে কিছুই করতে পারলো না।
কার্যপ্রণালী অনুসারে, প্রথমে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে দেহটা ধুইয়ে নিতে হবে। তারপর দেহের কপালে যে আত্মাটা প্রবেশ করানো হবে তার নাম পবিত্র কাঠ কয়লা দিয়ে লিখতে হবে। তারপর দেহটাকে চিৎ করে শুইয়ে মুখটা হাঁ করিয়ে রাখতে হবে। সবশেষে মন্ত্রটা পাঁচবার ঐ আত্মার নাম ধরে জপতে হবে।
বাস। এইটুকুই! মন্ত্রটা গুনগুন করে আওড়াতে আওড়াতে কিচেনে গেলাম জগ ভরে বিশুদ্ধ পানি আনতে। ততারপর স্টোররুম ঘেটে কতগুলি ভাঙা কাঠের টুকরো এনে স্টোভে পুড়িয়ে কাঠ কয়লা বানিয়ে নিলাম। তারপর ওগুলি নিয়ে লাইব্রেরীতে ফিরে আসলাম। লাইব্রেরীতে ফিরে মনিকার দেহটাকে ভালো করে পানি দিয়ে ধুইয়ে পবিত্র করে নিলাম। তারপর ওর কপালে লিখলাম কাঠ কয়লার কালিতে লিখলাম “ALACE” । তারপর আংটিটা ওর আরেকটি অক্ষত আঙুলে পরিয়ে দিয়ে মন্ত্র পড়া শুরু করলাম। প্রতিবার মন্ত্র পড়ার শুরুতে ও শেষে আলেস ভন্টেইজিয়ান নামটা উচ্চারণ করতে ভুললাম না। কেন জানি ভয় হচ্ছিলো আলেসকে ঢুকাতে যেয়ে যদি অন্য কাউকে ঢুকিয়ে বসি তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। যদি মারগারেট আবার ঢুকে পড়ে ওতে! নাহ। তা কি করে সম্ভব। মারগারেট মনিকার দেহে তার দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, না ওই আংটিটা পড়ে ছিলো, না কপালে ওটার ছ্যাকা খেয়েছিলো। তারমানে ওর আত্মাটা মৃত্যুর সাথে সাথে চিরায়ত নিয়মেই পরপারে পারি জমায়। ফ্রিজে কেবল মনিকার দেহটা পড়ে থাকে। এখন এই দেহে ভালয় ভালয় আলেসকে ঢুকাতে পারলেই হলো।
মন্ত্র পড়া শেষ হলে তীর্থের কাকের মতো লাশটার দিকে চেয়ে রইলাম একটু প্রাণের স্পন্দন পাওয়ার আশায়। সময় টিকটিক করে বয়ে যেতে শুরু করলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এভাবে প্রায় আধা ঘন্টা পেরিয়ে গেলো। না আলেস চোখ খুলছে, না একটু শ্বাস নিচ্ছে। সম্ভবত আমার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আদিন কি তবে একটা ফাও বই এনে আমায় ইম্প্রেসড করার চেষ্টা করছিলো? কিন্তু ও যদি ফ্রড হয়ে থাকে তবে কেনো মারগারেট ওকে খুন করবে? নিশ্চই ওর পরিকল্পনাটা কার্যকর ছিলো বলেই মারগারেটের আতেঁ ঘা পড়েছিলো। তাই সে ওকে রাস্তার কাঁটা ভেবে সরিয়ে দিয়েছে। সমস্যাটা সম্ভবত আমার কারণেই হয়েছে। আমার মন্ত্র উচ্চারণে ভুল থাকতে পারে। কিংবা আলেস এ দেহে ঢুকতে চায় নি, ও কেবল পরপারে মার্টিনীর কাছে ফিরে যেতে চাইছে। অথবা জমে থাকা দেহটা আত্মার অনুপ্রবেশের জন্যে মোটেও উপযুক্ত নয়। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হতাশ হয়ে লাইব্রেরীর মেঝেতে বসে পড়লাম। হতাশা আর ক্লান্তি আমায় চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো।
খানিক্ষণ জিরিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পুরো প্রক্রিয়াটার পুনরাবৃত্তি করবো। তবে লাইব্রেরীতে নয়। বেসমেন্টে। ওখানে নিশ্চিতভাবে আলেসের উপস্থিতি ও প্রভাব সর্বউচ্চ পরিমাণে রয়েছে। তাই ওখানে কাজ করলে ও কিছুতেই এই প্রক্রিয়া থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। তবে তার আগে মনিকার দেহটা কিচেনে নিয়ে গিয়ে কুসুম গরম পানিতে স্নান করিয়ে আনবো। এতে ওর জমাটা বাধা দেহটা পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। আরেকটি জিনিস খেয়াল হলো। মনিকার কপালে কাঠ কয়লায় লেখা আলেসের নামটা আমি ইংরেজিতে লিখেছি। কিন্তু আলেস তো ইংরেজি জানে না। ঠিক করলাম ওটা মুছে দিয়ে পোলিশ ভাষায় ওর নামটা লেখবো। ঠিক যেমন ওর ডায়ারীতে লেখা আছে, “আলেস ভন্টেইজিয়ান”। এত কিছু করার পরেও যদি কাজ না হয় তবে আদিনের মায়ের বাপ। আমি ওর বইটা ছিড়ে কুটিকুটি করে ইঁদুর দিয়ে খাওয়াবো। হুহ। আমার সাথে ফাজলামো?
ভারি জমে থাকা দেহটা আবার কিচেনে বয়ে নিয়ে গেলাম। তারপর সিংকের গরম পানির কল ছেড়ে ওর দেহে ঈষদুষ্ণ গরম পানির ধারা বইয়ে দিলাম। এভাবে আরো আধাঘন্টা পানি দেওয়ার পর ওর দেহটা নমনীয় উষ্ম আর আদ্র হয়ে এলো। এবার ফের কাজ শুরু করা যেতে পারে। ওর দেহটা কাঁধে করে বেসমেন্টে বয়ে নিয়ে গেলাম। এবার বরফ জমে না থাকায় ওর দেহটা বেশ হালকা লাগছে। বেসমেন্টে এসে দেহটাকে ঠিক আলেসের সেলের ভেতরেই চিৎ করে শুইয়ে দিলাম। তারপর সংশোধিত কার্যপ্রণালীতে আবার রিচুয়ালটা সম্পন্ন করলাম। পাঁচবার স্পষ্ট উচ্চারণে মন্ত্র পড়ার পরেও মনিকার দেহে আলেসের কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। আমি একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করতে লাগলাম, এক ঝাঁক আশায় বুক বেঁধে। এই বুঝি আলেস চোখ খুলে উঠে বসবে। কিন্তু প্রথম দশ মিনিট তেমন কিছুই হলো না। অপেক্ষা করতে করতে আমার মাথা বিগড়ে গেলো। সব রাগ গিয়ে পড়লো আদিনের ওই বইটার উপর। শালা অকাজের বই। তোকে আজ ছিড়েই ফেলবো। যখনই বইটা ছিঁড়ার জন্যে হাত বাড়ালাম তখনই নিস্তব্দ বেসমেন্টে একটা ক্ষীণ নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। সাথে সাথেই আমি কান খাড়া করলাম। কয়েক মুহুর্ত পরে আবার শুনে বুঝতে পারলাম শব্দটা মনিকার দেহ থেকেই আসছে।
এগিয়ে গিয়ে আমি মনিকার ঝুকে মনিকার নাকের কাছে হাত রাখলাম। আরে! এই তো! শ্বাস নিচ্ছে! এবার আমি ওর মাথাটা আমার কোলে তুলে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। এই তো লক্ষী মেয়ে। জেগে উঠো। প্লীজ। এই তো হচ্ছে।
ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের হার ক্রমাগত দ্রুত হল। ওর হাতটা ধরে আমি ওর পালসরেটটা চেক করলাম। একটু দ্রুত তবে স্বাভাবিকের প্রায় কাছা কাছি। এবার আমি ওর নাম ধরে ডাকতে লাগলাম।
আমি: “আলেস, আলেস ওঠো। আর কতকাল এভাবে ঘুমিয়ে থাকবে তুমি? এবার তো উঠো। আলেস!!!!”
দু তিনবার ডাকতেই ও চোখ মেলে তাকালো। কেমন ঘোলা আর শূন্য সেই দৃষ্টি। ওতে প্রত্যাবর্তণের আনন্দের চেয়ে বিষাদই যেনো বেশী ছিলো। খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকেই ও হড়হড় করে আমার কোলেই বমি করে দিলো। আহারে বেচারি। নতুন দেহে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। আমি ওর পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিলাম। বমি করা শেষে ও অনেক্ষণ কাশলো। বুঝতে পারছি। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে এ দেহে। তারপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে গেলেই আমায় ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে টলমলো পায়ে উঠে দাড়ালো। ওর কান্ড দেখে আমি ভিষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
আমি: “কি ব্যাপার? তুমি ঠিক আছো আলেলেলে,,,,,”
ওকে প্রশ্ন করতে যেয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। চেয়ে দেখি ও কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন জ্যান্ত খেয়ে নেবে!
আমার মনে খটকা লাগলো। আমার উপর এতটা রেগে আছে কেনো ও? ওর তো আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিৎ। আমার জন্যেই এত বছর পর একটা অক্ষত দেহে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। এতে আমার উপর চটে যাওয়ার কি হলো? আচ্ছে, ও কি সত্যিই আলেস? না কি মারগারেট এই সুযোগে ফিরে এসেছে আমার উপর তার দ্বিতীয় মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে?
(চলবে)

ডাকিণী ৪৯তম পর্ব (ক অংশ)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
আমি দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরীতে। লাইব্রেরীতে যেয়ে দেখি, আলেসের ডায়ারীটা পড়ে আছে টেবিলে, আর এর পৃষ্টাগুলি দমকা বাতাসে একে একে উল্টাচ্ছে! আশ্চর্য! এটা তো আলেসই তাহলে! কিন্তু ও যায় নি কেনো? ডায়ারীর দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই ব্যাপারটা বুঝে গেলাম। আলেস আংটিটা আনতে বলেছিলো তার নিজের মুক্তির জন্যে নয়। তার ভালবাসার মার্টিনীর মুক্তির জন্যে। ও মার্টিনীকে ছাড়া ওপারে যাবে না। প্রকৃতপক্ষে এদের ভালবাসার বাধন এতটা জোরালো যে ওরা একজন অপরজন কে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে নি। তাই মার্টিনীর মুক্তিকেই প্রকারান্তরে আলেস তার নিজের মুক্তির মতোই দেখে আসছিলো। কিন্তু আংটিটা উদ্ধারের পর মার্টিনী সহ অন্য মেয়েদের মুক্তি হলেও আলেসের ইহলৌকিক বন্ধনটা এখনো রয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ওর আটকে থাকার কারণ ওই আংটিটা নয়, নইলে ও অন্য মেদের সাথেই প্রিস্টের কবরে বন্দি থাকতো, এ কটেজে মুক্ত হয়ে ঘুরতো না। যে জিনিসটা আলেসকে এখাবে বেধেঁ রেখেছে সেটা হলো এই ডায়ারী।
নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়গুলির স্মৃতিযুক্ত এ ডায়ারীটাই ওকে এই বদ্ধ কটেজে হাজার বছর ধরে বন্দি করে রেখেছে। কিন্তু এতোদিন আমি ওর উপস্থিতি টের পাইনি কেন? ওকে আমি এতোদিন খুঁজলাম কিন্তু ও ধরা দিলো না কিন্তু আজ নিজে থেকেই তার উপস্থিতি ঘোষনা দিচ্ছে! ব্যাপারটা কেমন জানি গোলমেলে! মারগারেটের আত্মার প্রভাবেই কি ও নিশ্চুপ হয়ে ছিলো! কিন্তু এতদিন তো জানতাম খারাপ আত্মাগুলি মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে! এখন দেখছি এরা একে ওপরের উপরেও প্রভাব বিস্তার করে! কিন্তু তা কি করে সম্ভব? মনিকা তো ওকে সেই প্রথম থেকেই অনুভব করে আসছে। সেদিন মনিকাকে একা রেখে আমি অফিস গেলে মারগারেট ও চলে আসে আমার সাথে। কারণ আমি নিজের অজান্তেই মারগারেটের বাহন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যেসব জায়গায় যেতাম মারগারেট ও চলে আসতো সাথে সাথে। আমার ও মারগারেটের অনুপস্থিতিতে মনিকা লাইব্রেরীতে আলেসকে অনুভব করে ও ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে দিশেহারা হয়ে ও আমায় ফোন দেয়, তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু কপাল খারাপ যে সেরাত আমায় স্টারদের সেইফ হাউসেই কাটাতে হয়। শেষরাতে আমি কটেজে ফিরতেই সাথে করে মারগারেটও ফিরে আসে এবং মনিকাকে লাইব্রেরীতে ওর বই পড়তে দেখে ফেলে। তারপর মেয়েটাকে ভয় দেখিয়ে অজ্ঞান করে দেয়। তার কয়েকদিন পরে মনিকা অভিযোগ করেছিলো যে, বেসমেন্ট থেকে কে যেনো ওর নাম ধরে ডাকছে। ওটাও আলেসই ছিলো। বেসমেন্ট থেকে কেবল আলেসই ডাকতে পারে। ওটা ওরই আস্তানা। ওখানে মারগারেটের কোন প্রভাব নেই। সবিশেষে বেসমেন্টে আদিনের মোমবাতিটা নিভে যাওয়ার কারণও এই আলেস। সে মোমবাতি নিভিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলো কিন্তু আমি ও আদিন ব্যাপারটাকে নিছক দমকা বাতাসের কারসাজি ভেবে ভুল করেছিলাম। আমাদের আগেই বুঝা উচিৎ ছিলো যে বদ্ধ বেসমেন্টে দমকা বাতাস কখনোই নিজে থেকে সৃষ্টি হয় না। যদি না অন্য কেউ সেই বদ্ধ বাতাসে ঢেউ না তুলে। আলেস আগেও ছিলো এখনো এই কটেজেই আছে। কেবল এতদিন ও আমায় এড়িয়ে চলছিলো মাত্র। আমার উপস্থিতিতে লাইব্রেরীতে ও নিজেকে নিরব রেখেছিলো, তাছাড়া বেসমেন্টে দুরাত ঘুমালেও ও আমায় কোন দুঃস্বপ্ন দেখায় নি। তবে কি এতোদিন আমার সাথে এমন কিছু ছিলো যা আলেসকে আমার থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলো? হা, অবশ্যই। ওই আংটি! আলেসের চরম অনিহা থাকা সত্তেও তার কপালে আংটির ছ্যাকা দিয়েছিলো। এরপর থেকে ওই আংটিপরা যে কাউকেই ও প্রিস্ট ভেবে ভয় পায়, ও তাদের থেকে দুরে সরে থাকে। ওই আংটির ভয়েই ও আমায় এড়িয়ে যাচ্ছিলো। এখন আংটিটা আমার হাতে নেই বলেই ও আমায় এখানে টেনে এনেছে। পৃষ্টা উল্টাতে থাকা ডায়ারীটাই আলেসের মুক্তির পথ নির্দেশ করছে। ডায়ারীটাকে পুড়িয়ে দিলেই আলেস মুক্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমাবে। এগিয়ে গিয়ে আলেসের ডায়ারীটা হাতে তুলে নিলাম! এত সুন্দর ডায়ারীটা এভাবে পুড়িয়ে দিতে একটুও ইচ্ছা করছিলো না।
ডায়ারীটা নিয়ে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে কিচেনে চলে এলাম। উদ্দেশ্য ছিলো ওটাকে পুড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু না। ঠিক তখনই আমার কটেজের কলিংবেলটা বেজে উঠে। আশ্চর্য! এই অসময়ে আবার কে এলো! ওদিকে কিচেনের কোণে মনিকার লাশটা পড়ে আছে। যদি আগুন্তুক এটাকে দেখে ফেলে তো আমার কেল্লাফতে। বাকিটা জীবন চোদ্দশিকের ভেতরে পঁচে মরতে হবে। আলেসের ডায়ারীটা স্টোভের পাশে রেখে দ্রুত মনিকার লাশটা টেনে এনে একটা কিচেন রেক এর পেছনে লুকিয়ে ফেললাম। তারপর দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম। আমি এতক্ষণ ঠিক এদেরই ভয় পাচ্ছিলাম। পুলিশ!
একটা ছয় ফুট উঁচু বিশাল দেহী অফিসার আর রুক্ষ চেহারার তার মহিলা ডেপুটি। ওদের দেখে আমি এতটাই ভড়কে গিয়েছিলাম যে ওদের সাথে কথা বলতেও ভুলে যাই। ওরাই প্রথম কথা বলা শুরু করে,
পুলিশ: “সরি ম্যাম, আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করার জন্যে। কিন্তু আমরা সত্যিই দুঃখিত। আমরা আপনার বেডরুমের সীলগালা খুলে দিতে ও আপনার বেডরুম থেকে জব্দ করা মালামাল গুলি ফেরত দিতে এসেছি।”
আমি: “ওহ, আচ্ছা আচ্ছা। ভেতরে আসুন। ”
ওরা প্রায় একঘন্টা সময় নিয়ে বেডরুমটা ভাল করে ফের পরীক্ষা করলো প্রথম দফায় ফেলে যাওয়া কোন সম্ভাব্য সুত্রের আশায়। তারপর বেডরুমে পড়ে থাকা সকল কাঁচের টুকরা সতর্ক হাতে সরালো। মেঝেতে জমাট বাধা আদিনের রক্ত ভাল করে ধুয়ে মুছে সেখানে ডিজইনফেক্টেন্ট ছড়িয়ে দিলো। তারপর একটা লাগেজে করে আমার বেডরুম থেকে জব্দ করা জিনিসপত্র গুলি ফেরত দিয়ে গেলো। ওরা চলে যেতে যেতে বিকাল ৯টা বেজে গেলো। ওরা চলে গেলে আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাগ্যিস ওরা মনিকার মৃতদেহটা দেখতে পায়নি। কৌতুহলবশত আমার ফেরৎ পাওয়া মাল গুলি পুলিশের দেওয়া লিস্টের সাথে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম! আরে! ওগুলোর মধ্যে তো আদিনের সেই জাদুবিদ্যার বইটা রয়েছে। যেটা ও এনেছিলো মারগারেটের আত্মাকে আমার দেহে প্রবেশ করানোর জন্যে। হঠাৎ আমার চোখের সামনে একটা সরল সমীকরণ মিলে গেলো!
লাইব্রেরীতে আংটির ছ্যাকা খাওয়া আলেসের আত্মা, কিচেনে মনিকার মৃতদেহ, ড্রয়িংরুমের পেডাল ডাস্টবিনে সেই জাদুকরী আংটি, আর আমার বেডরুমে সদ্য ফেরৎ পাওয়া আদিনের জাদুবিদ্যার বই। এগুলি সব একত্রে মিলালেই পাওয়া যাবে মনিকাকে খুনের দায় থেকে মুক্তি।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম মনিকার দেহে আলেসের আত্মাটাকে ঢুকিয়ে দিবো। এতে আমি যেমন খুনের দায় থেকে মুক্তি পাবো, আলেসও নতুন জীবন ফিরে পাবে। খুনের দায় থেকে বাঁচার জন্যে এটাই একমাত্র উপায়। আত্মা প্রতিস্থাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ আমার কটেজের ভেতরই বিভিন্ন কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বেডরুম থেকে বইটা নিয়ে এসে লাইব্রেরীতে রাখলাম। কিচেনে ঢুকে মনিকার দেহটাকেও সন্তর্পণে লাইব্রেরীতে বয়ে এনে টেবিলের উপর শুইয়ে দিলাম। ওর দেহটা তখনো জমাট বাধাই আছে! তবে ইতিমধ্যেই ওটা থেকে অনেকটা বরফ গলে কিচেনের ফ্লোর ভাসিয়ে দিয়েছে। ড্রয়িংরুমের ডাস্টবিনের সব ময়লা হাতড়ে মনিকার কাটা আঙুলটা বের করলাম। আংটিটা ওটার সাথেই লেগে ছিলো। আঙুল থেকে আংটিটা বের করে নিয়ে লাইব্রেরীতে ফিরে এলাম। এবার কাজ শুরু করা যাক।
(চলবে)

ডাকিণী ৪৮তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
বেচারি মারগারেট। এত বছর পর প্রথমবারের মতো জীবন্ত জগতে ফিরে চোখ খুলতেই ও আমাকে ওর গলা চিপে ধরতে দেখেছিলো। যতই যাদুশক্তির অধিকারী হোক না কেন এমন দৃশ্য স্বভাবতই ওর হৃদপিণ্ডটা কাঁপয়ে দিয়েছিলো। ভয়ে দ্বিকজ্ঞিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ও ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে ছুটে সোজা কিচেনের ডিপ ফ্রিজে ঢুকে পড়ে। ভাগ্য ভালো যে মারগারেট ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডায় জমে যাওয়ার ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত ছিলো না। মধ্যযুগে ওর জীবদ্দশায় পোল্যান্ডে ফ্রিজ আসবে কোথা থেকে? ও ফ্রিজটাকে নিছক একটা লুকানোর জায়গা ভেবে ঢুকে পড়েছিলো। এখন ও টের পাবে কত ধানে কত চাল, আর ফ্রিজে ঢুকলেই জমে তাল।আমার ভয় ছিলো মারগারেট হয়তো জাদুবলে লকটা খুলে ফেলবে। তাই রান্নাঘরের ভারী ওভেন আর ডিশ ক্লিনারটা বয়ে এনে ফ্রিজের ডালার উপর রাখলাম। এবার আর কিছুতেই ফ্রিজটা খুলবে না।
ফ্রিজের দেয়ালে একটা আলতো লাথি বসিয়ে দিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিলাম আমি ওর অবস্থান জেনে গেছি। ও ভয়ে সর্বশক্তিতে চেঁচালো আর ফ্রিজের ডালায় ধাক্কাতে শুরু করলো। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। ওর চিৎকার আমার কানে রক মিউজিকের মতোই সুরেলা শুনালো।
চেঁচাতে চেঁচাতে এক সময় ও ক্লান্ত হয়ে চুপ মেরে দিলো। তারপর শুরু করলো মিনতি। পোলিশ ভাষায় ও বলল, “সাঞ্জে আমি মনিকাই। কেন তুমি আমায় মারতে চাইছো? আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি?তোমায় আমি ভালিবেসেছিলাম। এটাতো কোন অন্যায় নয়। তবে কেন আমায় এ শাস্তি দিচ্ছো? ”
হায় রে বোকা মারগারেট। আমাকে ধোকা দেয়া এতো সোজা না। মনিকার ভাব নিয়ে আমার মন গলাতে চাইছে। কিন্তু যত্ত সমস্যা হয়েছে ওই ভাষাতত্বে। মনিকা এতো ভালো পোলিশ জীবনেও বলতে পারবে না। কিন্তু মারগারেট অবলীলায় পোলিশ বলে যাচ্ছে। ওর এসব বৃথা প্রচেষ্টা দেখে আমার নিতান্তই হাসি পেলো।
আমি: “দেখো মারগারেট, আমি ভালো করেই জানি তুমি কে। এসব ভান ধরে কাজ হবে না। তুমি আমার বন্ধু আদিনকে মেরেছো। আমার সন্তানতুল্য মনিকাকে আমার হাত দিয়ে খুন করিয়েছো। ভেবেছিলে এসব করে তুমি পার পেয়ে যাবে। কিন্তু না। আজ তোমাকে মরতেই হবে। তুমি মরবেই।”
ওর ছদ্দবেশ কাজ করছে না দেখে ও এভার স্বরূপে আবির্ভূত হলো,
মারগারেট: “দেখো সাঞ্জে। পৃথিবীতে একজনকে বেঁচে থাকতে হলে অন্যজনকে মরতেই হয়। আমি শুধু বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমায় অন্যায়ভাবে হত্যা করে। এতগুলি বছর পর আমি আবার যখন আজ বেঁচে উঠেছি তখন তুমি আবার আমায় হত্যা করতে নেমেছো। এটাই কি তোমার বিবেক? ”
ভুতের মুখে রাম নাম। যে নিজেই একরাতের ব্যবধানে দুই দুইজন মানুষকে খুন করেছে সে আমার বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তুলছে! গেলো মাথা বিগড়ে।
আমি: “হা আমি বিবেকহীন অমানুষ। আর তুমি খুব বিবেকসম্পন্ন মানবতা দরদী তাই না? তোমার বিবেক নিয়ে ফ্রিজেই জমে মরো। ঠিক যেমন করে তুমি আমার বন্ধুদের মেরেছিলে।”
ওর সাথে কথা বলার সকল ইচ্ছা আমার মন থেকে উবে গেলো। অনেক হয়েছে। এবার ওকে একা একা শান্তিতে মরতে দেওয়া উচিৎ। আমি কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে ড্রয়িংরুমের রক্ত পরিষ্কার করলাম। মনিকার কাটা আঙ্গুলটা কুড়িয়ে নিলাম। তারপর আংটি সহই ওটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। যাক বাবা। এখন আর আমায় অভিশপ্ত আংটিটা সার্বক্ষণিকভাবে পড়ে থাকতে হবে না। ওদিকে ফ্রিজের ভেতর মারগারেট চিৎকার করেই চলেছে। আশাকরি আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ও জমে কাঠ হয় যাবে। আমার অফিসে যাবার সময় ও হয়ে এলো। কাপড় বদলে অফিসের পথ ধরলাম। আজ আর নাস্তা করা হলো না।
অফিসের কর্মচারীরা আজকে খুবই প্রফুল্ল। আজ যে আমি ইন্সপেক্টর মনিকাকে সাথে করে নিয়ে আসি নি
ওদের সবারই প্রায় একই প্রশ্ন ছিলো। মনিকা কি বাল্টিসে আছে না চলে গেছে। ও থাকলে তো সবাইকে আট্যেনশন থাকবে হবে। কখন হুট করে অফিসে ভিজিট দিতে চলে আসবে কে জানে। কিন্তু আমি ওদের সবার কাছে মিথ্যা বললাম। মনিকা কাল রাতেই চলে গেছে। ওরা সবাই খুশি মনে রিলাক্স মুডে যার যার কাজে চলে গেলো। এতগুলি লোকের সামনে মিথ্যা বলতে যেয়ে আমার কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরলো। ক্ষানিকের জন্যে মনে হলো মিথ্যাচারই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন।
সারাদিন অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে কটেজে ফিরলাম। আজ থেকে আমার কটেজ অশরীরী মুক্ত। কিন্তু মনিকার জন্যে সত্যিই অনেক খারাপ লাগছে। আমার লক্ষি মেয়েটা। দু চোখ বেয়ে অজান্তেই জল ঝরতে লাগলো। শ্রাবণের অবাধ বৃষ্টি।
কটেজে ফিরে প্রথম কিচেনে গেলাম মারগারেটের কি হাল হয়েছে তা দেখতে। ফ্রিজটা তো বন্ধই মনে হচ্ছে। এবার ভালয় ভালয় মারগারেট ভেতরে থাকলেই হলো। ওভেন আর ডিশ ক্লিনার দুটো ফ্রিজের ডালার উপর থেকে সরিয়ে দিলাম। তারপরএকটা কিচেন নাইফ তুলে বাগিয়ে ধরলাম। এতক্ষণেও যদি মারগারেট মরে না গিয়ে থাকে তো এই চাকু দিয়ে ওকে গেঁথে দেব। তবুও বুকটা দুরুদুরু করছে। কি হবে যদি ফ্রিজটা খুলে দেখি মারগারেট ওখানে নেই? যদি ও তার যাদু বিদ্যা কাজে লাগিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে থাকে? কিংবা ফ্রিজ খুলতেই একটা মোক্ষম আক্রমণে আমায় শেষ করে দেয়? দুর! বদ্ধ ফ্রিজে কেউ সারাদিন ধরে বেঁচে থাকতে পারে না কি? হয়তো ও সত্যি সত্যিই জমে কাঠ হয়ে আছে। আমি মিছেমিছিই ভয় পাচ্ছি। যা হবার হবে ভেবে এক টানে ফ্রিজের ডালাটা খুলে ফেললাম।
নাহ। ও ঠিক ঠিকই মরে গেছে। জমে কাঠ না, একদম জমে পাথর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশটা কটেজ থেকে সরাতে হবে। আদিনের মৃত্যুর তদন্তকারী অফিসাররা যদি কোন কারণে ফেরৎ এসে মনিকার লাশটা দেখে ফেলে তো আমায় নির্ঘাত গারদে ঢুকাবে। ঠিক করলাম মনিকার লাশটা আজ রাতের আধারেই গুম করে দিবো। বিশাল কটেজের যেকোন এক কোনে সাড়ে তিন হাত নীচে পুতে দিলেই হলো। ওর ব্যাবহার্য কাপড় চোপড়, জিনিসপত্র আজ রাতেই পুড়িয়ে দেবো। কাল থেকে আমার জীবনে আরেকটি নতুন দিন শুরু হতে যাচ্ছে।
ওর লাশটা জমে অসম্ভব ভারী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় আমি ওকে বাহিরে বয়ে নিয়ে যেতে পারবো না। তাই লাশটা গলার জন্যে ফ্রিজের বাহিরে রেখে দিলাম। কিচেনের কাজ আপাতত শেষ। এবার গেস্টরুমে যেয়ে মনিকার ব্যবহার্য জিনিসপত্র বের করে নিতে হবে।
কিচেন থেকে একটা বস্তা নিয়ে গেলাম গেস্টরুমে। ওতে একে একে মনিকার জিনিসপত্র ভরতে লাগলাম। প্রথমে শুরু করলাম বাথরুম থেকে। ওর শাম্পু, ফেইসওয়াশ, লোশন, ন্যাপকিন, স্যান্ডেল, ব্যাবহৃত অন্তর্বাস সবই একে একে বস্তায় ভরলাম।
তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে ওর ক্লজিটের কাপড় চোপড়, বিছানার কভার, জুতা, মুজা, চিরুনি, আয়না, হাতঘড়ি সবই ভেতরে পুরলাম। তখনই ওর আই ফোনটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ওটা বের করে মনিকার সাম্প্রতিক কার্যাবলী দেখতে লাগলাম। আজ সকালে গুগল প্লাসে লিখেছে, “সাঞ্জের সাথে অসাধারণ সময় কাটছে। ভাবছি আরো একটা সপ্তাহ বাল্টিসে কাটিয়ে দেবো।” ওই পোষ্টে ২০ লাইক ও ১১ কমেন্ট। তারপর ও গত শুক্রবার আমাদের বীচ ভ্রমণের ছবিও গুগলে আপলোড করেছে। আমাকে নিয়ে অন্য কয়েকটা সামাজিক যোগাযোগের মাধম্যে ওর আরো কয়েকটা পোষ্টও আছে। তারমানে ওর বন্ধুরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে সে আমার এখানে থাকছে! এখন যদি ও গুম হয়ে যায় তো এসব পোষ্টের বদৌলতে সন্দেহের সবগুলি আঙুল আমার দিকেই তাক হবে। তারপর পুলিশ এসে কটেজে কয়েকটা ডোবারম্যান ছেড়ে দিলেই হলো। যত গোপনেই, যতগভীরেই দাফন করি না কেনো, ওরা মনিকার লাশটা সহজেই খুড়ে বের করে ফেলবে। আমি ফেসে গেছি। ভয়াবহ ভাবে ফেঁসে গেছি। এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ নেই। হতাশ হয়ে গেস্টরুমের বিছানায় ধপ করে বসে পড়লাম। যখন ভাবছিলাম সব শেষ তখনই লাইব্রেরী থেকে একটা করুণ কান্নার ধ্বনি শুনতে পেলাম! বিলাপের সুরটা আমার কাছে খুবই পরিচিত মনে হলো। আরে! এটা তো আলেসের কান্না! লাইব্রেরীতে ও কি করছে? ওকি তবে পরপারে ফিরে যায় নি? গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরীতে।
(চলবে)

ডাকিণী ৪৭তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমারই চোখের সামনে পরপর দুদিনে আমার দুজন বন্ধু প্রাণ হারালো মারগারেটের হাতে। এতোক্ষণ ছাড়ানো না গেলেও মনিকা মারা যাবার সাথে সাথে ডান হাতটা সুবোধ বালকের মতো ওর গলা ছেড়ে উঠে এলো। কিন্তু মনিকার নিষ্প্রাণ হাত দুটো তখনো আমার ডান হাতটাক্র আকড়ে ধরেছিলো। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ও এই হাতটা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে লড়ে গেছে। বিষ্ময়ের ঘোর কাটতেই আমি মনিকাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। “মনিকা, আমি সত্যি দুঃখিত মনিকা, আমি কখনোই তোকে মারতে চাইনি। তোকে যে আমি আমার মেয়ের মতো ভালবাসিরে।”
কিন্তু মনিকা আর ফিরলো না। ও ঠায় শুয়ে রইলো। ওর বিষ্ফোরিত চোখ দুটো অবাক বিষ্ময়ে আমারই দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে জড়িয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম, “মনিকা রে রে রে রে,,,,,,”
আবেগআপ্লুত হয়ে আমি ডান হাতটা থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছিলাম। আমি জানতাম মারগারেট আমার ক্রোধকেই কেবল ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এখন জানলাম ও আমার যেকোন উচ্চ আবেগকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটা রাগ হোক, বা দুঃখ। মনিকাকে হারানোর ব্যাথায় কাতর হয়ে আমি যখন ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম তখন আমার ডানহাতটা নিঃশব্দে হাত থেকে আংটিটা খুলে ওর হাতে পড়িয়ে দেয়।
আমি ওকে আমার বুকের সাথে জড়িয়ে ধিরেছিলাম। হঠাৎ ওর নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পেলাম! আশ্চর্য! ওকি তবে বেঁচে আছে? ডানহাতটা এনে পরীক্ষা করার জন্যে ওর নাকের কাছে ধরিলাম! আরে হা! ও তো নিঃশ্বাস নিচ্ছে! ওয়াও!
কিন্তু পরীক্ষা করার সময় আমার ডান হাতের দিকে নজর যেতেই মনটা আতঙ্কে ছেয়ে গেলো। হাতটা একদমই খালি। কোন আঙ্গুলেই আংটিটা পড়ানো নেই! কোথায় গেলো আংটিটা? হায় হায়! এটা মনিকার হাতে গেলো কি করে! বুঝলাম মারগারেট আমার দেহে নয়, এবার মনিকার দেহে ফিরে আসতে চাইছে। ওকে আমার থামাতেই হবে। দ্রুত ওর হাত থেকে আংটিটা খুলতে গেলাম, কিন্তু ততক্ষণে ওর আংটিপরা হাতটা মুঠো হয়ে গেছে। কিছুতেই আংটি খুলতে দেবে না। ওদিকে ওর শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। যেকোন সময় ও চোখ মেলে জেগে উঠবে। অগত্যা ওর মুঠো করা হাতের আংটিপরা আঙ্গুলটাকে মোচড়ে ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। মটমট করে হাঁড় ভাঙ্গার শব্দ হলো। কিন্তু ওর আঙ্গুলটা কিছুতেই বিচ্ছিন্ন করতে পারলাম না। ওটা বেকায়দায় ভেঙ্গে গিয়ে উল্টোদিকে ঝুলে আছে। ওদিকে ওর চোখ পিটপিট করা শুরি করে দিয়েছে! যেকোন সময় চোখ খুলে জেগে উঠবে! সাঞ্জে বেঁচে থাকতে তোকে কিছুতেই চোখ খুলতে দেবে না শয়তান।
ওর ঝুলে থাকা আঙুলটাকে আমি কামড়েই ছিড়ে ফেললাম। ফিংকি দিয়ে ওর হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগলো। ভেবেছিলাম দেহ থেকে আংটিটা বিচ্ছিন্ন করে দিলেই ও আবার নিথর হয়ে যাবে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিলো। আসলে আংটিটা প্রয়োজন মৃতদেহে আত্মাকে প্রবেশ করাতে। মনিকার দেহে মারগারেটের আত্মা ইতিমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছে। তাইতো ওর শ্বাস প্রশ্বাস চালু হয়েছে। এখন কালক্ষেপণের মাধ্যমে ওর আত্মাটা নতুন দেহের নিয়ন্ত্রণ নিতে শিখছে। তাই শুধু আংটিটা বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ওকে আর থামিয়ে দেওয়া যাবে না। ওকে থামাতে হলে আবারো খুন করতে হবে। ওর গলাটা আবার টিপে ধরতে গেলাম। হাতটা ওর গলা স্পর্ষ করা মাত্র ও চোখ খুলে তাকালো। আমি খুবই দ্বিধান্বিত ছিলাম, মনিকা কি সত্যিই মরে গিয়ে মারগারেটকে দেহে জায়গা করে দিয়েছে? নাকি এটা সত্যি সত্যিই মনিকা, কোন ভাবে আমার ভয়ঙ্কর ডান হাতটার কবল থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধাটা কেটে গেলো। মনিকা না মরলে কি আমার হাতটা ওর গলা ছেড়ে দিতো? মোটেও না। তারমানে ওটা মারগারেটই।
সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে আবার মনিকার দেহে ঢুকা মারগারেটের গলা চিপে ধরতে গেলাম। কিন্তু তখনই মারগারেট ত্রাহি চিৎকার ছেড়ে উঠে বসলো। আমি সভয়ে পিছিয়ে গেলাম। হলিউডে অনেক মুভিতে দেখেছি মৃত মানুষ জেগে উঠলে জম্বি হয়ে যায়। তখন জ্যান্ত মানুষকে খেতে শুরু করে দেয়। মারগারেটও কি তাই করবে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আমার কি করা উচিৎ।
ও আমাকে ভড়কে দিয়েছিলো ক্ষাণিকের জন্যে। আমি যখন আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলাম ও সেই সুযোগে ড্রয়িংরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। আমিও দ্রুত আতঙ্ক কাটিয়ে ওর পিছু ধাওয়া করি।
আমি: “তোকে আজ কিছুতেই ছাড়বো না মারগারেট। মেরেই ফেলবো।”
ও এক ছোটে কিচেনে ঢুকে পড়লো। কিচেনের পেছনে একটা জানালা আছে। ও সহজেই ওটা গলে বেরিয়ে যেতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব ছুটে যেয়ে কিচেনে ঢুকে পড়লাম। প্রথমেই চোখ গেলো জানালাটার দিকে। ওটা ভেতর থেকেই বন্ধ আছে। তারমানে ও এখনো কিচেনেই আছে! কিন্তু কোথায়! হয়তো কিচেনের কোন তাকের আড়ালে লুকিয়ে আছে। অসাবধানতা বশত ওর কাছে চলে গেলেই কিচেন নাইফটা বুকে সেঁধিয়ে দিবে। কিন্তু আমিও এর শেষ না দেখে ছাড়ছি না। হয় ওকে মেরে আমার বন্ধুদের মৃত্যুর বদলা নিবো, নইলে অন্যদের মতো ওর হাতে নিজের প্রাণটা বিসর্জন দিয়ে পরপারে পাড়ি জমাবো।
কিচেনের একটা একটা করে প্রতিটা রেকের পেছনটা আমি ভালো করে চেক করলাম। কিন্তু মারগারেটকে কোথাও পেলাম না। আশ্চর্য! হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো নাকি ডাইনীটা? ঠিক তখনি একটা মৃদু গোঙ্গানি আওয়াজ ভেসে এলো। বুঝলাম আঙুল হারানোর ব্যাথ্যা ওকে কষ্ট দিতে শুরু করেছে। ভালো করে কান পাতলাম। আরে! ওটাতো রান্নাঘরের কোনে রাখা ডিপ ফ্রিজটা থেকে আসছে। বুঝলাম ঘুঘু এবার নিজেই এসে ফাঁদে ধরা পড়েছে। গুটিগুটি পায়ে নিঃশব্দে ফ্রিজের কাছে চলে গেলাম। হা। এই তো গোঙ্গানিটা আবারো শোনা যাচ্ছে। মুখে একটা আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ফুটলো। মনেমনে বললাম এবার তোমার পরপারে যাওয়ার পালা মারগারেট। তারপর ফ্রিজের লকটা বাহিরে থেকে শক্ত করে লাগিয়ে দিলাম।
(চলবে)

ডাকিণী ৪৬তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
***** আপনাদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে যে, আপনার বয়স ১৮+ না হলে এই পর্বটি পড়বেন না। *****
মনিকাকে ফোন দিতে যেয়ে দেখি ও ফোন ধরছে না। অনেক চিন্তা হলো মেয়েটার জন্যে।! কিন্তু আমারও তো মানুষের শরীর। ক্লান্তি যে আমার উপরও ভর করে। বিশেষ করে এমন একটা বিদঘুটে দিনের পর। তাই মনিকাকে খোজা বাদ দিয়ে আমি কাউচের উপর দেহটা এলিয়ে দিলাম। মারগারেটের আবির্ভাবের পর কতদিন আমি ওই ঝাড়বাতিটার নিচ দিয়ে হেটে গেছি। বুঝলাম কেবল এই আংটিটার জন্যেই ঝাড়বাতিটা আমার মাথায় পড়ে নি। আভ্যন্তরিণ ক্ষত না থাকার শর্তটা বারবার আমার জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। স্থির করলাম নিশ্চিত মৃত্যুর ঠিক আগ মুহুর্ত ব্যাতিত কখনই আমি আংটিটা খুলবো না। কিন্তু আজকের এই ঘটনাটা আদিনের পরিবারের উপর কি দুর্বিষহ প্রভাব ফেলবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা খেয়াল নেই। কিন্তু দুঃস্বপ্ন আর আমার পিছু ছাড়লো না। স্বপ্নে দেখলাম আমি কাউচের উপর ঠায় ঘুমিয়ে আছি। পেছন থেকে মনিকা পা টিপেটিপে এসে আমার ছুরিটা ঠিক হৃদপিণ্ড বরাবর আমূলে বসিয়ে দিয়েছে। মাঝরাতে চিৎকার করে জেগে উঠলাম। কি অদ্ভুত। ঘুম থেকে জেগে মনিকার জন্যে খুবই দুশ্চিন্তা হলো। ওদিকে ফের ঘুমিয়ে পড়তেও ভয় করছে। আবার না জানি কোন দুঃস্বপ্ন দেখি।তারপরেই হঠাৎ মনে পড়লো বেসমেন্টের কথা। গতরাতে বেসমেন্টে ঘুমিয়েছিলাম। একটা দুঃস্বপ্নও দেখিনি। আজ আবারো ওখানে যেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই হলো। আর কোন দুঃস্বপ্ন দেখতে হবে না। কাউচ থেকে একটা কোশন নিয়ে চলে গেলাম বেসমেন্টে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ভয়াবহ বেসমেন্টটাই এখন আমার কাছে স্বর্গতুল্য মনে হচ্ছে। আলেসের স্মৃতি স্বরণে ওর সেলে ঢুকে, কুশনে মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার ভাবনাটা সঠিকই ছিলো। বাকিটা রাত কোন দুঃস্বপ্ন ছাড়াই এক ঘুমে কাটিয়ে দিলাম। বেসমেন্টে চুইয়ে ঢুকা সকেলের স্নিগ্ধ আভায় ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙতেই আবারো সেই পুরাতন চিন্তাটা পেয়ে বসলো। মনিকা ঠিক আছে তো। দুড়ধাড় করে সিড়ি ভেঙে উপরে উঠে এলাম। কটেজে ফিরতেই দেখি মনিকা ড্রয়িংরুমে বসে গুনগুনিয়ে গান গাইছে। যাক বাবা, ও ঠিকই আছে তাহলে। আমি এগিয়ে যেয়ে ওকে সুপ্রভাত জানালাম। “গুডমর্নিং হানি। কখন আসলে? কাল সারাটা দিন কোথায় ছিলে? ফোনও ধরনি। আমি তো এদিকে দুশ্চিন্তায় মরি। ”
মনিকা: “ওহ সাঞ্জে ডার্লিং। গির্জা থেকে ফেরার পথে একটা হ্যান্ডসাম ছেলের সাথে দেখা হয়ে গেলো। ওর সাথে সারাদিন ঘুরার পর আমরা একসাথে ডিনার করি। তারপর রাতটা ওর ওখানেই কাটিয়ে দিয়েছি। হিহিহিহিহি! আজ সকালে ও আমায় কটেজের ফটকে গাড়িতে করে নামিয়ে দিয়ে গেছে। ”
আমি ওর নাক টিপে দিয়ে বললাম, “যাহ। ভালোই ডেটিং শিখেছো দেখছি। কিন্তু আমার ফোনটা ধরলে কি এমন দোষ হতো? সারাটি রাত আমায় কতটা টেনশন করিয়েছো তুমি জানো?”
মনিকা: “ওহ ডার্লিং, তুমি যখন অমন শক্তিশালী বলিষ্ঠ কোন ছেলের সাথে ঘুমুতে যাও তখন ফোন রিসিভ করার মতো সামান্য একটা কাজও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠে। কিন্তু একি! তোমার গলায় ব্যান্ডেজ কেনো? কি হয়ে হয়েছে ওখানে”
আমি: “ও কিছু না। সামান্য কেটে গিয়েছে আর কি।”
ভদকার গন্ধে ওর মুখ মৌ মৌ করছিলো। মদ ছাড়ার পর থেকে আমি আর এর গন্ধ সইতে পারি না। বেশীক্ষণ ওই গন্ধ শুকলে হয়তো পাগল হয়ে ঐ বাজে জিনিসটা আবার খেয়ে ফেলতে পারি। তাই আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “আচ্ছা ডার্লিং, বুঝলাম। এখন লক্ষী মেয়ের মতো এখানে বসে অপেক্ষা করো। আমি ব্রেকফাস্ট বানিয়ে আনছি।” আমি ঘুরতেই ও আমার হাত ধরে টেনে কাউচে ওর পাশে বসিয়ে দিলো।
মনিকা: “না না ডার্লিং। ওসব ব্রেকফাস্টে আমার অরুচি ধরে গেছে। আজ তোমায় দিয়েই ব্রেকফাস্ট করবো। ”
আমি: “যাহ দুষ্টু। কি যে বলে না,,,,”
মনিকা ওর লাল টুকটুকে স্কার্টটা টেনে কোমড় অবধি উঠিয়ে দিলো। প্রথমেই চোখ গেলো ওর গুপ্ত ত্রিভুজে। আরে! ও স্কার্টের নিচে কোন প্যান্টি পড়েনি। সবটাই বেরিয়ে রয়েছে। এই মেয়েটার বুঝি লজ্জা শরম বলে কিছু নেই। তারপর চোখ পড়লো ওর মসৃণ উরুতে। সেখানে স্কচ টেপ দিয়ে দুই উরুতে দুটো বিয়ার কেন আটকানো। ও একটা ক্যান খুলে আমায় দিলো আরেকটি নিজে খেতে শুরু করলো। কিন্তু স্কার্ট আর টেনে নামালো না।
আমি: “দেখ ডার্লিং আমি তো মাস খানেক হলো আলকোহল ছেড়ে দিয়েছি। তাই এখন আর এটা খেতে পারছি না। আমি সত্যিই দুঃখিত। ”
মনিকা: ” গতরাতের অসাধারণ অভিজ্ঞতার জন্যে কৃতজ্ঞতা সরূপ ছেলেটা বিয়ার ক্যান দুটো আমায় উপহার দিয়েছে। তুমি যদি একটা না খাও তো খুব কষ্ট পাবো। আজকে অন্তত খেয়ে নাও তারপর থেকে ছেড়ে দিও। প্লীজ।”
আমি: “আচ্ছা বাবা, এই যে খাচ্ছি। ”
ছোট্ট এক ঢুক গিলে নিলাম। বহুদিন পর আলকোহল খেতে পেয়ে দেহটা যেন আরো খাবার জন্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। এক নিঃশ্বাসে ক্যানটা সাবাড় করে দিলাম। কিন্তু ক্যান শেষ করতেই একটা অপরাধবোধ আমার মাথায় ঝেকে বসলো। আমি আম্মুর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর কখনো মদ ছোয়েও দেখবো না। কিন্তু আজ সেটা ভেঙ্গে ফেলেছি।আর এই মেয়েটাই বা কি! ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না এতো লক্ষী একটা মেয়ে শুধু এক জোড়া বিয়ার ক্যানের জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দিলো। ও যা বেতন পায় তাতে প্রতিদিন অমন এক ডজন বিয়ার ক্যান ও নিমিষেই কিনতে পারে। একজন অচেনা পুরুষের কাছে ওর এতটা সহজলভ্য হওয়ার কি দরকার ছিলো তা আমার মাথায় ঢুকলো না। কেন জানি মনে হলো মনিকা নিছক একজোড়া বিয়ার ক্যানের জন্যে দেহ বিলায় নি। ও এই ভয়াবহ কটেজ থেকে একরাতের জন্যে নিষ্কৃতি চাইছিলো মাত্র।
মনিকা: “কি ভাবছো সাঞ্জে? এইটুকু খেয়েই মাথা ধরে আসছে বুঝি? হিহিহিহিহি। ”
মনিকার এহেন প্রশ্নে আমি আবারো বাস্তবে ফিরে এলাম। আবার চোখ পড়লো ওর অনাবৃত ত্রিভুজটার দিকে।
আমি: “কি যে বলো না মনিকা, সাঞ্জে অমন আরো একশোটা ক্যান খেয়েও ঠিকই সারাদিন অফিস করতে পারবে। হিহিহিহিহি।
মনিকা: “এই না হলে আমাদের সিইও ম্যাডাম। দ্য সুপার সেক্সি আনসিংকেবল সাঞ্জে। হিহিহিহিহি। ”
আমি: “হিহিহিহিহি। আচ্ছা মনিকা, তুমি আজ পেন্টি পড়লে না কেনো? ”
মনিকা: “পেন্টি পড়ে কি লাভ ডার্লিং? মেয়েদের যৌনিকে সবসময়ই পুরুষের জন্যে তৈরী রাখাই ভালো।”
আমি: “যাহ দুষ্টু। ”
তারপর মনিকা হঠাৎ ওর ক্যানটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, “আমার ক্যান থেকে আরো কয়েক ঢুক গিলে নাও ডার্লিং। তোমায় খুব তৃষ্মার্ত দেখাচ্ছে।”
কিন্তুু ততক্ষণে মায়ের সাথে করা ওয়াদা ভঙ্গের অনুশোচনা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো। আমি দৃঢ় কন্ঠে তা প্রত্যাহার করলাম, “নাহ মনিকা, আমি আর খাবই না।”
মনিকা ক্যানের বাকিটা বিয়ার ওর অনাবৃত যৌনিতে ঢেলে দিয়ে বলল, ” এই নে রে যৌনি। তুই ই খা বাকিটা। আজ তোর জন্যেই কপালে ফ্রি বিয়ার জুটলো। ”
ওর হাস্যকর বাচনভঙ্গি দেখে আমি হুহুহুহুহু করে হেসে উঠলাম।
কিন্তু ও সেটাকে যৌনতার প্রতি গ্রীন সিগনাল ভেবে ভয়ানক ভুল করলো।
ও বলল, “সাঞ্জে ডার্লিং। আমার ওখানটা একটু চুষে দাও না প্লীজ। ”
আমি: “যাহ। কি বলছো এসব। মাথা খারাপ হলো না কি? ”
ও খপ করে আমার চুল মুঠো করে ধরে মাথাটা ওর তলপেটের কাছে টেনে নিয়ে গেলো। তারপর খেকিয়ে উঠে বলল, “চুষবি না কেন বীচ? চেয়ে দেখ কি সুন্দর যৌনি। তোর যৌনিটা আরো হাজারবার দুধ দিয়ে ধুলেও আমারটার মতো এতো সুন্দর হবে না। ”
আমার চুলের উপর প্রচন্ড টান পড়ছে। চরম অনিচ্ছা সত্বেও আমার মুখ ওর যৌনিদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার মুখটা ওর যৌনির এতটা কাছে চলে গেছে যে ওর বিদঘুটে গন্ধটা স্পষ্ট টের পাচ্ছি। ওর পিউবিক হেয়ার গুলি সেই অচেনা পুরুষের বীর্যে মাখামাখি হয়ে লেপ্টে আছে। আমার পেট উল্টে বমি আসতে চাইলো। অনেক কষ্টে সেটা থামালাম। তারপর আমি চিৎকার করে প্রতিবাদ জানালাম, “দেখো মনিকা, আমি এঙ্গেইজড। আমি আমার বাগদত্তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাই। প্লীজ আমার সাথে এমনটা করো না। প্লীজ। ”
ও পাল্টা খেকিয়ে উঠলো, “এঙ্গেইজড তাই না? পুরুষের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চাও। কিন্তু কেন? কোন পুরুষই বিশ্বস্ত নয়। ওরা সুযোগ পেলেই অন্য মেয়েকে চেখে নেয়। একটা মামুলি পুরুষের জন্যে তুমি আমায় হতাশ করতে পারো না সাঞ্জে। তোমাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিন থেকেই আমি তোমায় মনে প্রাণে চেয়ে আসছি। আজ আমি সে চাওয়া পুরণ করবই।”
আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে ওর যৌনি থেকে মাথা সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ও কোমড় উঁচু করে ওর যৌনিটা আমার মুখে ঘসে দিলো। সাথে সাথে একগাদা দুর্গন্ধময় আঠালো তরল আমার সারা মুখে লেপ্টে গেলো। ওয়াক ওয়াক। ছিঃ, ,,,,
আমার মাথার ভেতর রাগটা চাড়া দিয়ে উঠলো। কিন্তু এবার আমি সতর্ক। আর মারগারেটকে আমার ক্রোধের সুযোগ নিতে দেবো না। মনিকাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমায় এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ওর উপর রাগ করে নয়। আমি এবার ওকে কাতর কন্ঠে বললাম, “মনিকা প্লীজ। আমার বাগদত্তা মোটেও বিশ্বাসঘাতক নয়। প্লীজ। আমাকে ওর সামনে নীচু করে দিও না। ”
কিন্তু তখনই মনিকার চোখ গেলো আমার ডান হাতে পড়ে থাকা মারগারেটের আংটির দিকে! “ওহ, এটা তোমার সেই বাগদত্তার দেওয়া আংটিটাই? খুল বলছি। ওটা এখন খুলে ফেলো। খুলে ফেলো বলছি। অন্যের এঙ্গেইজমেন্টের আংটি পড়ে আমার সাথে সেক্স করা যাবে না।”
ও সেই আংটিটা টেনে খুলতে লাগলো। আমি হাতটা প্রাণপণে মুঠো করে ধরলাম যেনো ও কিছুতেই আংটিটা খুলতে না পারে। অতপর আমি মরিয়া হয়ে বললাম, “মনিকা, প্লীজ, বিশ্বাস করো আমি সমকামী নই। সমকামী ভালবাসার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আমার ব্যাক্তিগত জীবনের জন্যে ওটাকে যথার্থ মনে করি না।”
মনিকা: “সমকামী নও তো কি হলো? আজ থেকে সমকামী হয়ে যাবে। নাও। এবার চোষা শুরু করো।”
আমি: “আমি এটা চুষতে পারবো না। আমার বমি হয়ে যাবে। প্লীজ আমাকে ক্ষমা করো। ”
মনিকা: ” বারে! সেদিন বীচে তুই ঘুমিয়ে পড়লে আমি তোর যৌনিটা চুষে দিয়েছিলাম। তবে আজ কেন তুই আমারটা চুষতে পারবি না? ”
সেদিন বীচ থেকে ফেরার সময় বিকিনি ঢিলা হয়ে যাওয়ার রহস্যটা এখন বুঝতে পারছি। মনিকা আমার ঘুমন্ত দেহের সাথেও যৌনতায় লিপ্ত হয়েছিলো! ঠিক যেমন শয়তান প্রিস্টটা আলেসের মৃতদেহের সাথে সঙ্গম করেছিলো। এই ভাবনাটা আমার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলো। সুযোগসন্ধানী মারগারেটের পরোয়া না করেই আমি আবার ক্রোদ্ধ হয়ে উঠলাম।
রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আমি খাটি বাংলায় হুঙ্কার দিয়ে উঠলাম, “কি বললি রে মাগি, তুই আমার ঘুমন্ত দেহের সাথে সেক্স করেছিস। তোকে আজ আমি মেরেই ফেলবো।”
ধা করে একটা ঘুষি বসিয়ে দিলাম মনিকার চোয়ালে। প্রথমত ও আমার মুখে ভিনদেশী চিৎকার শুনে হৎচকিয়ে গিয়েছিলো। তার উপর সাঞ্জের দুনিয়া কাঁপানো ঘুষি। ও কাউচের উপর একদম চিৎ হয়ে পড়লো। রাগের মাথায় আমি লাফিয়ে ওর বুকের উপর উঠে বসলাম। আমার অজান্তেই আংটিপরা হাতটা মনিকার গলা চেপে ধরেছে। মনিকা বাধা দেওয়ার সুযোগই পেলো না। ওর গলা দিয়ে গড়গড় শব্দ বেরুতে শুরু করলো। অনুভব করলাম আমার নিচে পড়ে থাকা ওর দেহে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেছে। আমি ডান হাতটা কিছুতেই ওর গলা থেকে সরাতে পারছি না। বা হাত দিয়ে ডান হাতটাকে ছাড়িয়ে আনতে চাইলাম। কিন্তু ওটা প্রচন্ড জোরে মনিকার গলা আকড়ে আছে। আমি কিছুই করতে পারলাম না। মনিকাও তার হাত দুটো দিয়ে আমার ডান হাতটা ছাড়ানোর সর্বউচ্চ চেষ্টা চালালো। কিন্তু আমাদের তিন তিনটে হাতকে উপেক্ষা করে ডান হাতটা তার কাজ চালিয়ে গেলো। আমি আর মনিকার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। মৃত্যুযন্ত্রণায় ওর চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মনিকা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ছড় শব্দে প্রস্রাব করে দিলো। অবশেষে একসময় ওর দেহটা কাঁপুনি থামিয়ে একদম স্থির হয়ে গেলো। বুঝলাম ও আর এই পৃথিবীতে নেই।
(চলবে)

ডাকিণী ৩৯তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আলেসের অশরীরীর যেমন সর্বউচ্চ প্রভাবযুক্ত স্থান ছিলো বেসমেন্টের বন্দিশালা, তেমনি মারগারেটের অশরীরীর উচ্চ প্রভাবযুক্ত স্থান হলো কুয়োর ভেতর আর তার চারপাশে। শুক্রবার সকালে আমি আর মনিকা অফিসে যাওয়ার পথে কুয়োর কাছাকাছি হতেই মারগারেট মনিকার উপর বান মারে। ও হয়তো চাইছিলো মনিকাকে চিরতরে শেষ করে দিতে। কিন্তু আমি মনিকাকে নিয়ে ওর প্রভাবযুক্ত অঞ্চল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসায় ও সেদিন বেঁচে যায়। তবে ওর সামান্য রক্তবমি হয়। এ ঘটনার পর মারগারেট আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ও মনিকার উপস্থিতিতেই আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
শুক্রবার অফিস থেকে ফিরে আবার যখন বিদ্যুতের কার্ড আনতে যাচ্ছিলাম, মার্গারেট তার প্রথম পদক্ষেপ উঠায়। ও গাড়িটাকে কুয়োয় ফেলে আমাকে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছিলো। বুদ্ধিটা ভালই ছিলো। সীটবেল্ট বাধা থাকায় কুয়োর দেয়ালে গাড়ির ধাক্কায় আমার আভ্যন্তরীণ আঘাতের সম্ভাবনা সর্বনিম্ন ছিলো। আর ডুবে মরলে আমার আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অক্ষতই থাকতো। তারপর সকালে যে যাদুর সাহায্যে ও মনিকাকে বমি করিয়েছিলো সেই একই পদ্ধতিতে আমায় বমি করিয়ে নিলেই দেহটা ওর ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠতো। কিন্তু আমি পড়ন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসলে ওর এত সুন্দর পরিকল্পনাটা ভেস্তে যায়।
তারপর আমি টাবে গোসল করতে ঢুকলে ও আবারো আমাকে খুন করার চেষ্টা করে। ও প্রথমে আয়না ভাঙ্গার শব্দ শুনিয়ে আমার মনযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। তারপর টাবে ফেলে খুন করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু আমি উপস্থিত বুদ্ধি আর দৈহিক শক্তি বলে ট্যাব ফাটিয়ে সেখান থেকে জান্ত বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই।
কটেজের ভেতর খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে মারগারেট আমায় ওর সর্বউচ্চ প্রভাব যুক্ত অঞ্চল তথা কুয়োয় নিয়ে চুবিয়ে মারতে সচেষ্ট হয়। সেরাতে মনিকার খুঁজে আমি যখন কটেজের বাহিরে এসেছিলাম মারগারেট তখন আমার সামনে মনিকার কুয়োয় ঝাপ দেওয়ার মিথ্যা নাটক উপস্থাপন করে। আমিও বোকার মতো কুয়োর কাছে দৌড়ে যাই মনিকাকে বাচাতে। কিন্তু বলাবাহুল্য ওটা মনিকা ছিলো না। মনিকা তখন বাথরুমে ছিলো। মনিকা জানতোও না যে আমি ওকে খুজছি। সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে পর্ণ দেখতে বসে যায়, যখন আমি ওর চিন্তায় উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিলাম। মারগারেট এই সুযোগটা নিতে চাইছিলো। ও আমায় বারবার কুয়োয় ঝাঁপানোর অনুরুধ জানাতে থাকে। কিন্তু ভাষাগত সমস্যার কারণে আমার মনে খটকা লাগে। সুইডিশ মেয়ে মনিকা কখনোই মারগারেটের মতো এতো ভালো পোলিশ বলতে পারতো না। অপরদিকে মারগারেটও মনিকার মতো ইংলিশ বলতে পারতো না। তাই মারগারেট বাধ্য হয়েই তখন আমাকে পোলিশ ভাষায় ডাকছিলো। ওর আশা ছিলো আমি হয়তো ওর ফাঁদে পা দিয়ে বোকার মতো কুয়োয় ঝাপ দিবো। আমি ভাষাগত সমস্যাটা উপেক্ষা করলেও পাগলের মতো কুয়োয় ঝাঁপ দেওয়া থেকে আমি বিরত থাকি। এর পরিবর্তে কটেজে ফিরে আসি দড়ি আর টর্চ আনতে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে মনিকাকে কটেজের ভেতরই পেয়ে যাই। ফলে সেদিন আর কুয়োয় ঢুকা হয় নি।
তারপর সেরাতে আমি ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘুমাতে চলে যাই। আমি ঘুমিয়ে পড়লে মারগারেট আবারো আমার উপর প্রভাব বিস্তার করে। স্বপ্নে আমায় কুয়োয় যেতে ঈঙ্গিত করে। আমিও বোকার মতো ভেবে বসি কুয়োটাই হলো সব রহস্যের মূল চাবিকাঠি। তারপর ঘুম ভাঙলে ও আবারো আমায় খুন করার চেষ্টা করে। তবে এবার গলায় হেডফোনের তার পেঁচিয়ে। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধির জোরে আমি তখন মরতে মরতে বেঁচে যাই। চুলের কাঁটার উপযুক্ত ব্যবহার আমায় সে রাতে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়।
এভাবে সুবিধা করতে না পেরে মারগারেট আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। আজ সকালে উঠেই আমি বাথরুমে যেতে চাইনি। গতরাতে টাবে চুবানি খাওয়ার পর ওখানে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিলো না। সাতসকালে আম্মুর সাথে বিয়ে নিয়ে কথা বলতে বলতে আমার মাথা বিগড়ে গিয়েছিলো। রাগের চোটে কোন কিছু না ভেবেই আমি বাথরুমে ঢুকে পড়ি। মারগারেট একটা সাংঘাতিক আবিষ্কার করে বসে। ও বুঝে যায় রাগলে আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তাই রাগলে ও সহজেই আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ওর সামান্য একটা ইশারাতেই আমি অতি সহজে প্রাণ দিয়ে দেবো।
তারপর ও আয়নার প্রতিবিম্বে আমার কপালে ক্ষত চিহ্নটা দেখিয়ে আমাকে আরো রাগিয়ে তুলে। রাগে আমি চিৎকার করে উঠি ও আয়নাটা ভেঙে ফেলি। এ পদ্ধতিতে ও প্রথম প্রচেষ্টায়ই সাফল্য পেয়ে যায়। বাথরুমে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনে মনিকা ব্যাপারটা দেখতে আসে। কিন্তু রাগে অন্ধ আমি, ওর সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করি। খানিক পরে ওকে কাঁদতে দেখে আমার মধ্যে প্রচন্ড অনুশোচনাবোধ জেগে উঠে। কিন্ত এই অনুশোচনা আমায় শান্ত করার বদলে আমার রাগটাকে আরো উষ্কে দেয়। তারপর মারগারেট আমার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাকে ওর কুয়োতে নিয়ে যায়। সেই মৃত্যুগুহাতে। সেখানে ও আবারো আমাকে চুবিয়ে মারার চেষ্টা করে। কিন্তু আবারো আমি উপস্থিত বুদ্ধির জোরে, গাড়ির ট্রাশ বেলুনকে অবলম্বন করে আমি ভেসে উঠি। তারপর অনেক কষ্টে কুয়োর দেয়াল খুঁড়ে খুঁড়ে খাজ বানিয়ে তা বেয়ে বেরিয়ে আসি। অনেকক্ষণ কুয়োর ঠান্ডা পানিতে থাকার ফলে আমার হাইপো থারমিয়া ও কনকাশন হয়। কিন্তু হাইপোথারমিয়া হলে এক্সাইটেটরী নিউরোট্রান্সমিটার যেমন আসেটাইল কোলিন, এপিনেপ্রিন ইত্যাদি কাজ করা কমিয়ে দেয়। ফলে সহজে রাগ উঠে না। রাগ না উঠলে ও আমাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে না। তাই মারগারেট আমার হাইপোথারমিয়াকে যাদুবলে মনিকার দেহে স্থানান্তরিত করে। তাই কটেজে ফিরে মনিকাকে আমি ঠান্ডা দেহে লাইব্রেরীতে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর মাথা খানিকটা ঠান্ডা হলে আমি লাইব্রেরীর রহস্যটা ধরতে পারি ও বইটা পড়তে আগ্রহী হই। কিন্তু মারগারেট আমায় বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ও লাইব্রেরীর দরজা আটকে দেয়। কিন্তু আমার হাতুড়ির ঘা এর সামনে দরজাটা দাড়াতেই পারে না। এক বাড়িতেই শেষ। কে মেরেছে দেখতে হবে না! সাঞ্জে যে হলো হাতুড়ি মাস্টার থরের আম্মা।
তারপর বইটা পড়ে সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এখন লাইব্রেরীতে বসে বসে দুটো প্রতিজ্ঞা করলাম।
১, সবর্দা রাগ দমন করে রাখবো। কিছুতেই ওই ডাইনীকে আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেবো না।
২, সব সময় ছুরিটা সাথে রাখবো। কোন ভাবে যদি মারগারেট আমাকে অনিবার্য মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয় তো এক টানে নিজের গলাটা কেটে দেবো। প্রয়োজন হলে আমি আত্মহত্যা করবো তবুও আমার দেহে অন্য কাউকে ঢুকতে দেবো না।
লাইব্রেরীর চার দেয়ালের ভেতর থেকে আবারো খিলখিল হাসি শুরু হলো। মনে মনে বললাম হাসো মারগারেট, হাসো। তোমার সকল ষড়যন্ত্র আমার কাছে উন্মোচিত হয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই তোমাকে এখান থেকে বিদায় করার একটা না একটা উপায় বের করেই ফেলবো। তোমাকে প্রিস্টের কাছে ফেরৎ পাঠিয়ে শেষ হাসিটা কিন্তু আমিই হাসবো।
(চলবে)

ডাকিণী ৩৮তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আংটির বাধন থেকে মুক্ত হয়ে অন্য মেয়েগুলির আত্মা যখন পরপারে পাড়ি দেয় তখন মারগারেট সবার পেছনে পড়ে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই। পুনরায় জীবন্ত জগতে ফিরে আসা। তবে ও প্রিস্টের মতো পুনরুত্থানের জন্য নিজ দেহকে মমি করে রাখে নি। রাখার সুযোগটাও ছিলো। ওর দেহটা তার অজান্তেই কুয়োর নীচে পচে গিয়েছিলো। কুয়োর সেই পঁচা দুর্গন্ধের কথা মনে পড়তেই গা গুলিয়ে উঠলো। নিজের দেহে ফেরার সুযোগটা হারিয়েও ভেঙ্গে পড়েনি। জীবদ্দশায় ও একজন উচ্চমানের ডাইনী ছিলো। মরে গিয়েও ওর সে ক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমেনি। ও সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্য কারো দেহে ফিরে আসতে চাইছিলো। আমার দেহে। ওর আংটিটা পড়ে থাকার কারণে ও আমার পিছু পিছু চলতে থাকে, একটা অদৃশ্য ছায়ার মতো।
বইটাতে আংটির সাহায্যে আটকে পড়া আত্মার পুনরুত্থানের জন্য কতগুলি শর্ত দেওয়া আছে। মারগারেট শুরু থেকেই এসব শর্ত মেনে আসছিলো।
প্রথম শর্ত হলো একটা মৃতদেহ যাতে কোন বাহ্যিক বা আভ্যন্তরিণ ক্ষত থাকবে না।
২য় শর্ত, যে আংটি পরিহিত অবস্থায় আত্মাটা মারা গিয়েছিলো সেই আংটিটা মৃতদেহের হাতে পরানো থাকবে।
এতোক্ষণ আমি শুধু মারগারেটের পরিচয় জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু ওর উদ্ভট আচরণের কারণ আমার কাছে অজানাই থেকে গিয়েছিলো। কিন্তু এই শর্ত দুটো ওর আচরণের রহস্য আমার কাছে উন্মুক্ত করে দিলো।
ঊভয় শর্তানুযায়ী আমিই হলাম ওর উপযুক্ত টার্গেট। আমার একটা নিরোগ দেহ আছে, একই সাথে আংটিটাও মধ্যমায় পরানো রয়েছে। তাই ও আমাকেই বাছাই করেছিলো। ও আমার দেহে ফিরে আসতে চাইছে।
সেই কবরস্থান থেকেই মারগারেট আমাকে অনুসরণ করছিলো। প্রথম দিকে ও আমায় সাহায্য করেছিলো কেবল প্রথম শর্ত পুরণের জন্যেই। সেদিন গির্জা থেকে ফিরার পথে ওরই ইঙ্গিতে ইগনিশন ছাড়াই গাড়িটা স্টার্ট নিয়েছিলো। গাড়িটা তখন স্টার্ট না নিলে আমি হয়তো সেই ছুরি বাগিয়ে ধরা টিনএজ মোটরসাইকেল আরোহীর হাতে ধরা পড়তাম। এতে আমার ছুরিকাহত হওয়া সহ ভয়ানক আভ্যন্তরীণ আঘাতের সম্ভাবনা ছিলো যা আমার দেহকে মারগারেটের প্রত্যাবর্তণের অনুপযোগী করে তুলতো। তারপর আমি ড্রাইভ করতে করতে ঘুমিয়ে গেলে ও নিজে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমায় কটেজে পৌছে দেয়। এতে আমার দেহটা দুর্ঘটনাজনিত আঘাত থেকে রক্ষা পায় ও তার ব্যবহার উপযোগী থাকে। এজন্যেই আমি ওকে গাড়ির ড্যাশবোর্ড মিররে দেখতে পাচ্ছিলাম।
কিন্তু কটেজে ফিরে ও আমায় মেরে ফেলতে চাইছিলো। এমন পদ্ধতিতে যাতে আমার দেহে আঘাতের পরিমান সর্বনিম্ন হয়। কিন্তু সেদিন সকালে মনিকা এসে তার সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়। মনিকার আগমনে মারগারেট খানিকের জন্যে তার প্লান স্থগিত রাখে। ও আমাকে কটেজে একা রেখে মারতে চাইছিলো। কিন্তু মনিকা তার প্রধান বাধা হয়ে উঠে। ও আমায় মারতে চেষ্টা করলে মনিকা হয়তো আমার জন্যে সম্ভাব্য সাহায্য নিয়ে আসতে পারে, এ ধারণা থেকেই ও মনিকাকে ভয় দেখানো শুরু করে। যেনো মনিকা কটেজ ছেড়ে চলে যাও। প্রথম দিন ওকে লাইব্রেরীতে আটকে ফেলাটা একটা সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিলো। কিন্তু আমি মনিকাকে লাইব্রেরীর দরজা সম্পর্কে মিথ্যা বলে আশ্বস্ত করায় ও থেকে যায়। এভাবেই মনিকা এই বিপদে জড়িয়ে পড়ে।
তবে একটা ব্যাপার আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। এ ঘটনার পর মনিকা সেদিন অফিসে না যেয়ে কটেজে একা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমিও ওকে ফেলে কটেজে একা ফেলে রেখে অফিসে চলে যাই। স্বভাবতই মারগারেট ও চলে আসে আমার সাথে। কিন্তু আমি অফিসে থাকতেই মিনকা আমায় ফোন দিয়ে দ্রুত ফিরতে অনুরুধ করেছিলো। কটেজে নাকি খুব সমস্যা হচ্ছে। মারগারেট আমার সাথে সাথেই চলছিলো। আমি অফিসে হলে সে ও অফিসেই থাকার কথা। অন্যদিকে আলেসও আংটি থেকে মুক্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। তবে আমার ও মারগারেটের অবর্তমানে কে সেদিন কটেজে সমস্যা করছিলো? কে মনিকাকে ভয় দেখিয়েছিলো? তবে কি কটেজে তৃতীয় কোন এক অশরীরীর আবির্ভাব হয়েছিলো? কিন্তু কে এই তৃতীয় জন?
যাহোক। সে হিসাব পরে মিলানো যাবে। তারপর স্টার আমাকে অফিস থেকে গ্রেফতার করে তাদের সেইফ হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন স্টার আমাকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়েছিলো। মারগারেট ওটাকে সত্যি ভেবে নেয়। ও ভেবেছিলো ওরা সাক্ষ না দিলে ওরা হয়তো আমায় সত্যি সত্যিই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে। এতে আমার ঘাড় ভেঙ্গে যেয়ে দেহটা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। তাই ইন্টারোগেশন রুমে আমি ঘুমিয়ে পড়লে সে আমার আংটি পরা হাতে নিজের প্রভাব বিস্তার করে, আমার অজান্তেই সাক্ষ্য লিখে দেয়। বুধবার সন্ধায় গির্জার ছাদে আমি ঘুমিয়ে পড়লেও মারগারেট তো আর ঘুমায় নি। প্রিস্টের কবরের মধ্য থেকে সে গির্জার পাশের বিল্ডিং এ ঢুকা আততায়ীকে দেখতে পেয়েছিলো। ও সেই ঘটনার সরল সাক্ষ্য স্টারদের লিখে দেয়। ফলে স্টাররা সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ছেড়ে দেয় ও আমি কটেজে ফিরে আসি। মারগারেটও আমার সাথেই ফিরে আসে। ইতিমধ্যেই মনিকা হয়তো কৌতুহল বশত লাইব্রেরীতে ফের ঢুকে পড়ে। সেখানে কাকতালীয়ভাবে সে মারগারেটের বইটা খুজে পায় ও পড়তে শুরু করে। কটেজে ফিরতেই মারগারেট ব্যাপারটা টের পেয়ে যায়। বইটা তার দুরভিসন্ধিকে মনিকার কাছে উন্মোচন করে দিতে পারে ভেবে মারগারেট ওকে বইটা পড়তে দিতে চায় নি। আমি যখন কটেজের বিভিন্ন কক্ষে মনিকার খোজে তল্লাসি চালাচ্ছিলাম ও তখন লাইব্রেরীতে মনিকা কে ভয় দেখায়। ভয় পেয়ে মনিকা অজ্ঞান হয়ে যায় ও তার জ্বর চলে আসে। কিন্তু তারপরেও মনিকা কটেজ ছেড়ে চলে যাচ্ছে না দেখে মারগারেট বাধ্য হয়েই ওর ক্ষতি করার সিদ্ধান্ত নেয়।,,,
(চলবে)

ডাকিণী (১৭তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
গীর্জার নীচতলায় কাউকে না পেয়ে আমি ভেবেছিলাম হয়তো এখানে কেউ নেই। তাই দ্বিতীয় তলা চেক না করেই সিঁড়ি ভেঙ্গে সোজা ছাদের দিকে রওনা হই। হঠাৎ পেছনে বলে উঠে “এসো তনয়া। আমি তোমার জন্যেই অপক্ষা করছিলাম। একদম পিলে চমকে উঠেছিলো। নিজের অজান্তেই সারেন্ডারের ভঙ্গিতে দু হাত মাথার উপর উঠে গিয়েছিলো। ঘাড় ফিরিয়ে বুড়ো পাদ্রিটা লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত নিচে নামালাম। খানিকের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আমি হয়তো ধরা পরে গেছি। এখন আর ভয়ের কিছুই নেই। এই হাড় জীর্ণ বুড়োটা আমার কিছুই করতে পারবে না। একটা ধাক্কা দিলেই পড়ে অক্কা পাবে। তবুও আমি সৌজন্যতা দেখিয়ে ওকে হাত জোড় করে বাউ করলাম। তারপর গৎবাঁধা বুলি আওড়ালাম,” ফাদার, আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি। আমি এর থেকে মুক্তি চাই। আপনি আমার জন্যে যীশুর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করুন। নইলে যে আমাকে আজীবন নরকে জলতে হবে।”
আমার কথাবার্তায় ফাদারকে অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হল। হয়তো লোকটার এসব দেখতে দেখতে অভ্যেস হয়ে গেছে। খৃষ্টানরা ব্যাক্তিজীবনে কোন অপরাধ করলে গীর্জায় এসে পাদ্রীর কাছে সব খুলে বলে। অতপর পাদ্রী নাকি ওদের পক্ষ হতে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই রীতিকে ওরা কনফেশন বলে। ক্ষমা হয়ে গেলে ওরা খুশি মনে গীর্জায় সামর্থ অনুযায়ী ডোনেশন করে। এই ডোনেশনের টাকায়ই বর্তমানে গীর্জাগুলি চলে। কিন্তু গীর্জার অতীত এতটা করুন ছিলো না। একটা সময় ছিলো যখন গীর্জাগুলি মানুষের দয়া দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর না করে তার প্রয়োজনীয় সম্পদটা ছিনিয়ে নিতো। আলেসের ডায়ারীতে তৎকালিক গীর্জা কর্তৃক তার পারিবারিক সরাইখানা দখলই তার প্রমাণ। কিন্তু কালের আবর্তে সেই গীর্জা এখন পাহাড়ী সিংহ থেকে ঘরোয়া বিড়ালে পরিণত হয়েছে। আগে জোর করে ছিনিয়ে নিতো, আর এখন দিলে খায়- না দিলে উপোস করে।
“তুমি ভুল সময়ে এসেছো বাছা।”
পাদ্রীর কথা শুনে আমি ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরলাম।
আমি বিনীত কন্ঠে বললাম, “আমি দুঃখিত ফাদার, কি বলেছেন শুনতে পাইনি।”
বুড়োটা আবার বলল, “তুমি ভুল সময়ে এসেছো। আজ বুধবার। এখানে কনফেশন হয় শনিবার ও রবিবার বিকাল ৯টায়।”
আমি তটস্থ কণ্ঠে বললাম, “আমি দুঃখিত ফাদার। উইকএন্ডে আমায় কাজে যেতে হয়। আপনি যদি কাল সন্ধায় আমায় একটু সুযোগ দিতেন তো আমার বড্ড উপকার হতো।”
বুড়ো রাজি হয়ে গেল।
আমি আবার বললাম, “কাল বিকাল ১০টায় আমি আবার আসবো ফাদার। এখন আমায় একটা কাজে যেতে হবে। তবে যাওয়ার আগে এই গীর্জাটা একটু ঘোরে ফিরে দেখতে চাই। আপনার আপত্তি নেইতো? ”
বুড়োটা মাথা নেড়ে, দুইতলায় নিজের কক্ষে যেয়ে খিল দিলো। ওর ভাবভঙ্গী দেখে মনে হলো না ও কিছু আঁচ করতে পেরেছে। ও চলে যেতেই আমি এক দৌড়ে গীর্জার ছাদে উঠে গেলাম। বাহ। ছাদটা যেন আমারই জন্যে বানানো হয়েছে। ছাদের তিনদিকে রেলিং থাকিলেও সিমেট্রির পাশটায় রেলিং নেই, একদম খোলা। শীতে ছাদে তুষার জমলে এই দিকেই ঠেলে নিচে ফেলা হয়। এদিকে দড়ি ফেলে সহজেই উঠানামা করা যাবে।
আজ এখানকার কাজ শেষ। এখন বাড়ি ফেরার পালা। কাল সব জিনিসপত্র নিয়ে আবার এখানে চলে আসবো। কাল রাতের মধ্যেই কাজটা শেষ করতে হবে। যে করেই হোক। গীর্জার প্রাঙ্গণ ছেড়ে আবার সেই সিমেট্রিতে ঢুকে পড়লাম। আগের মতো এদিক ওদিক না ঘুরে এবার প্রিস্টের কবরটা খুজে বের করলাম। ঠিক যেমনটা স্বপ্নে দেখেছিলাম তেমনি আছে। কবরের ফলকে সেই আংটির চিহ্ন। অনেক কষ্টে প্রস্রাবের বেগটা থামালাম। মনে মনে বললাম, এখন না। কাল তোমায় খুঁড়ে তোলে তারপর ভেজাব। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লো। ছায়াগুলি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যাস্ত নামবে। আলোছায়া ময় ভৌতিক পরিবেশে মনের মধ্যে এক উদ্ভট প্রশ্ন জাগলো। আচ্ছা, এই গোরস্থানে শুয়ে থাকা সবাইকি মৃত? নাকি দু একজন কবরের মধ্যে আধবোজা চোখে শুয়ে আছে, আধার নামার প্রতিক্ষায়। ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠলো। কাল রাতে আমাকে এখানেই আসতে হবে। একাকী,,,,, নাহ। এসব নিয়ে আর ভাবা চলবে না। যত ভাববো ততই ভয় বাড়বে। তারচেয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতেই এখান থেকে বেরিয়ে পড়া যাক। বাড়ি ফেরার জন্যে ঘুরে দাড়াতেই ধপাস করে প্রিস্টের কবরের পাশেই আছড়ে পড়লাম । পড়িমরি করে উঠতে যেয়ে অনুভব করলাম বা পা টা কে যেন টেনে ধরেছে। হৃদপিণ্ডটা ধড়াস করে উঠলো। তবে কি কটেজে দেখা সেই ভয়াবহ স্বপ্নটা সত্যি হতে চলেছে!
(চলবে)

ডাকিণী (১১তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
(১০ম পর্বের পর থেকে)
ভয়ে চিৎকার এক সময় মনে হল গলা ফেটে রক্ত বেরুবে। নাহ। এভাবে মাথা গরম করলে এখান থেকে বেরুনো যাবে না। আলেসের মতো সারা জীবনের জন্যে এখানে আটকে পড়বো। মায়ের উপদেশগুলি মনে পড়লো। বিপদে মাথা ঠান্ডা না রাখলে ঘাড়ের উপর মাথাটা আস্ত থাকবে না। ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম। একটা সময় ভয়, উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে এলো। স্থির হয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কয়েকটা গুরুতর ভুলের কারণে আমি এখানে আটকে গেছি। প্রথম ভুল হলো আলেসকে বিশ্বাস করা। ওকে বন্ধু ভাবা। একটা অশান্ত আত্মা কখনোই কারো বন্ধু হতে পারে না। আমার কোনভাবেই আলেসের ডাকে সাড়া দেয়া উচিৎ হয়নি। ওর ডায়ারী মতে একাকীত্বই ওকে ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের থেকেও বেশী কষ্ট দেয়। তবে কি ও আমাকে মেরে ওর মতোই অশরীরী বানিয়ে নিবে, কেবল ওকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে! মনে পড়লো একবার টিভিতে একটা রিয়ালিটি হরর শো তে এক প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বলেছিলো যে ভয় হলো কালো-আত্মার প্রধান অস্ত্র। ওদের নাকি আকার আকৃতি, স্থিতি-জড়তা নেই। তাই ওরা কাউকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে না। কিন্তু ওরা শিকারকে ভয় দেখাতে থাকে যতক্ষণ না ভিক্টিম অতিরিক্ত ভয়ে হার্ট আটাক বা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার মতো আত্মঘাতী কিছু একটা করে বসে। ওদের ভয় না পেলেই ওদের হাতে মৃত্যুর আশংকা বুঝি ৯৯ ভাগ কমে যায়। আমি কখনোই টিভিতে দেখানো উদ্ভট কোন কিছু বিশ্বাস করি না। তবে এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে বিশ্বাস না করে উপায় নেই। মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলাম আজ যদি এখানে মরতেই হয় তো ভয়হীন ভাবে নিজের আত্মসম্মান নিয়েই মরবো। আলেসের ভয়ে ভীত হয়ে হার্ট ফেইল করে মরবো। চিৎকার করে বললাম, “আলেস। তুমি হয়তো আমায় মেরে ফেলতে পারবে কিন্তু ভয় দেখাতে পারবে না।” বদ্ধ বন্দিশালায় আমার চিৎকার প্রতিধ্বনি তুললো।
ভয় তাড়ানোর জন্যে মেঝেতে বসে বসে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলাম। কখন যে চোখ জুড়িয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। যখন চোখ খুললাম তখন দেখলাম সিড়ির খোলা মুখ দিয়ে চুইয়ে দিনের আলো ঢুকছে! আমি কালকের ভয়ঙ্কর রাতটা উৎরে গেছি। ওয়াও! আমি এখনো বেঁচে আছি! কিন্তু রাতে কিসে আমার সেলের দরজা আটকেছিলো! ভাবতেই উঠে গিয়ে সেলের দরজাটা পরীক্ষা করলাম! আশ্চর্য! দরজায় বাহিরে থেকে একটা বিশাল তালা ঝুলছে! তারমানে গতরাতে যখন আমি যখন সেলে প্রবেশ করি তখনই কেউ একজন আমাকে বাহিরে তালা মেরে আটকে দেয়! কিন্তু কে সেটা! আলেস? মনে হয় না। লাইব্রেরীতে বেশ কয়েকবারই আলেস আমায় ভেতরে রেখে দরজা আটকে দিয়েছিলো। কিন্তু তখন তো ওর তালার প্রয়োজন হয় নি! কিন্তু এখন দরজায় তালা ঝুলানো কেন! অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেলো এটা কোন মানুষের কাজ! আশেপাশে মানুষ থাকতে পারে ভাবতেই নিজের কাপড় চোপড় নিয়ে সচেতন হয়ে উঠলাম। মনে পড়ে গতরাতে গোসল শেষে একটা তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়েছিলাম আমি। কিন্ত ওটা এখানে আটকে পড়ার পর একটা শক্তিশালী দমকা হাওয়ায় উড়ে যায়। কিন্তু ওটা এখন কোথায়? চারিদিকে খুঁজাখুঁজি করেও আমি সেই সাদা তোয়ালেটা খুজে পেলাম না। তবে সেলের কোনে বাদামি রঙের তালি মারা ছেড়া এক প্রস্থ কাপড় পেলাম। অগত্যা সেটাই জড়িয়ে নিলাম দেহে। তখনই আমি কতগুলি ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। ওরা সিড়ি ভেঙ্গে এদিকেই এগিয়ে আসছে! নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলাম কারা ওরা? কি চায় ওরা আমার কাছে? কিন্তু উত্তরটা আমার জানা নেই।
কারাগারের শিকের ওপাশে বিচিত্র বেশভূষার কতজন বিশালদেহী পুরুষ এসে উপস্থিত হল। আশ্চর্য ব্যাপার হল ওদের সবার দেহ ভারী বর্মাবৃত, আর হাতে বেঢপ লম্বা তরোয়াল। তবে এদের মধ্যে একজনের হাতে তরোয়ালের বদলে ঝিলিক দিচ্ছে লকলকে সাপের চামরার চাবুক! এই বন্দুকের যুগে এদের এহেন অস্ত্র সস্ত্র দেখে আমার নিতান্তই হাসি পেল। মনে মনে ভাবলাম ইশ, আমার ডেজার্ট ঈগলটা (আমার লাইসেন্স করা পিস্তল) এখন যদি হাতের কাছে থাকতো তো সবকটার পায়েই একটা করে বিচি ঢুকিয়ে দিতাম। আমাকে সারারাত এখানে আটকে রাখার জন্যে এটাই হতো ওদের উচিৎ শিক্ষা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। পিস্তলটা আমি আমার বেডরুমে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে ফেলে এসেছি। ওদের তিনজনের মধ্যে তলোয়ারওয়ালা দুজন বাহিরে দাড়িয়ে রইলো। আর চাবুকওয়ালাটা আমার সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। তারপর সোজা আমার দিকে এগিয়ে এসেই সপাৎসপাৎ দু ঘা বসিয়ে দিলো। আমার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। কোথায় মেরেছে জানি না কিন্তু সারাটা শরীর জ্বলতেছে। আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাড়ালাম। লোকটা আমার চুল ধরে টানতে টানতে সেল থেকে বের করে সিড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যেতে লাগলো। ওদের এহেন ব্যবহারে আমি চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম। মহিলাদের প্রতি এতটুকু মর্যাদাবোধ বা সৌজন্য এদের মধ্যে নেই। সিড়ি বেয়ে যতই উপরে উঠছি ততই একদল মানুষের সম্মেলিত শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। ওরা আমায় কটেজের কাঠের সিড়ি ধরে একদম ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে গিয়ে দেখলাম এক ঝাক মানুষ নিচে জড়ো হয়েছে! আমার কটেজে এরা ঢুকলো কি করে! আমি যখন বিষ্ময়ে উপস্থিত জনতাকে দেখছিলাম তখনই চাবুকওয়ালাটা এসে আমার হাত দুটো পিছ মোড়া করে বেধে দিলো। কি হচ্ছে এসব! বিষ্ময় আর ভয়ে নুয়ে পরার উপক্রম। এবার দু তলোয়ারওয়ালা আমার দুপাশে এসে, দু কাঁধ শক্ত করে ধরলো। এত শক্ত যে মনে হলো শোল্ডার জয়েন্ট গুঁড়ো হয়ে যাবে। ওদিকে চাবুকওয়ালাটা ছাদে একটা খাম্বার সাথে বাধা দড়ি এনে আমার গলায় ফাঁস পড়িয়ে দিলো। হায় খোদা! এরা কি আমায় ফাঁসি দিতে চলেছে? তলোয়ারওয়ালা দুজন আমার কাঁধ ধরে ঠেলতে ঠেলতে ছাদের কিনারায় নিয়ে গেল। উপস্থিত জনতা প্রবল হর্সধ্বনি দিয়ে আমার আসন্ন মৃত্যুকে স্বাগত জানালো। আমি মা কে শেষবার দেখার জন্যে হৃদয়ে এক প্রবল আকুতি অনুভব করলাম। জীবনে কতই না দুঃখ দিয়েছি মাকে। মা আমাকে যে কাজটাই নিষেধ করতো সেটাই আমি প্রথমে করতাম। মায়ের অবাধ্য হওয়াটাই আমার কাছে একটা থ্রিল ছিলো। কিন্তু তবুও মা একটু রাগ করলেও পরক্ষণেই খুকি বলে আমায় জড়িয়ে ধরতো। মায়ের মিষ্টি চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ একজন আমায় ছাদের উপর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলেছে। কিন্তু একদম মাটিতে আছড়ে পরার বদলে আমার গলায় পড়ানো দড়িটিতে আমি ঝুলতে লাগলাম! হায় খোদা! এরা আমায় ফাঁসি দিয়ে দিচ্ছে! আমি মারা যাচ্ছি! বাতাসের অভাবে ফুসফুসটা যেন ফেটে যাবে! হৃদপিণ্ডটা ধীরেধীরে থেমে আসছে। অনুভব করলাম সারা শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়েছে। ব্যাথার অনুভুতিগুলি আস্তে আস্তে ভোঁতা হয়ে এলো। নিঃসীম কালো আধার চোখ দুটোকে ঢেকে দিলো।
(চলবে)

ডাকিণী (৮ম পর্ব)

2

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি শেষ করে বিড়বিড় করে বললাম, হায় আলেস। এসব বিচারের নামে প্রহসন তোমার জন্মের আগেও মানব সমাজে ছিলো, তোমার মৃত্যুর পরে এখনো টিকে আছে। তোমার আগে সক্রেটিস, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস প্রমুখ এর শিকার হয়েছেন। তোমার পরে, আমেরিকার লুথার কিং, ইতালির মোসলিনী, মার্কো, প্রমুখ। এমনকি এই কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের নামে প্রহসন হয়ে গেছে। মানব সমাজে কোন কালেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, আর কখনো হবেও না। তাই বলে তুমি মরে গিয়েও এই কর্টেজকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে? পরপারে তোমার জন্যে নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। হয়তো ওখানে মার্টিনী তোমার পথ চেয়ে আছে। তুমি যাচ্ছ না কেন? লাইব্রেরীর এক কোন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। দরজায় লেখা ভাসলো, “মুক্তি দাও আমায়।” এবার আমি গলা চড়িয়ে বললাম, কিন্তু কিসের মুক্তি? কার থেকে মুক্তি? প্রত্যুত্তরে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন লেখা বেরুলো।
আলেসের লেখায়,
“বাহ। আজ সকাল হতে না হতেই এক প্রহরী এসে আমায় কতগুলি ফল, পানি, আর রুটি দিলো। প্রথমে এদের এই আকর্ষিক মহানুভবতার কারণ বুঝতে না পারলেও এখন ভালই বুঝতে পারছি। চারদিন পর যখন আমার লাশটা শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হবে তখন সে জীর্ণশীর্ণ দেহ থেকে যথেষ্ট যৌন সুখ নাও পেতে পারে। তাই এই চারদিন আমাকে খাইয়ে দাইয়ে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। আমি গতরাতে আমার ডাকিণী হওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছি। আমার ডাকিণী হওয়ার আসল কারণ হল আমার বাবার ফেলে যাওয়া পারিবারিক সরাইখানাটি। আমাদের সরাইখানাটি শহরের প্রায় তোরণদ্বারে অবস্থিত। শহর থেকে যারাই বেরুয় বা যারাই শহরে নতুন আসে তারা সবাই এই সরাইখানায় রাত কাটাতো। ফলে আমাদের প্রচুর মুনাফা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ওটা আমার মালিকানাধীন ছিলো। এমতাবস্থায় যেহেতু আমার কোন সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিলো নাহ তাই আমি মারা গেলে সরাইখানাটি পরিতাজ্য সম্পত্তি হিসাবে গির্জার অধীনে চলে যাবে। গির্জার প্রিস্ট ও সেবকদের জন্যে অতিরিক্ত আয়ের উৎস খুলবে। তাই শুধু এই সরাইখানাটির মালিকানার জন্যেই আমি আজ এক ভয়ঙ্কর ডাকিণীতে পরিণত হয়েছি। এসব বিচার, ডাকিণী অপবাদ, কেবল লোক দেখানোর নাটক বৈকি আর কিছু নয়। সবই স্পষ্টত ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমি এতে এতটাই জড়িয়ে গেছি যে মৃত্যুর পরেও আমি এ থেকে বেরুতে পারব নাহ। রবিবার প্রার্থনার পর ফাঁসির দড়ি আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে আসবে নাহ। আসবে আমাকে এখানে চিরতরে বেধে রাখতে। চারিদিকে কেবলি অন্ধকার। আমি একা একা এর মধ্যে কেবলই তলিয়ে যাচ্ছি, আরো গহীনে। কপালে দাসত্বের চিহ্ন নিয়ে। ”
পরের পাতায়,
” আজ দুপুরে ওরা আমায় সেই পুকুরে নিয়ে গেছিলো গোছল করাতে। কাল যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। তাই আজ শরীরটাকে একটু ঘসা মাজা করে একে প্রিস্টের যৌন শুদ্ধিকরণের জন্যে তৈরি করে নিতে হবে তো। আমি গোসল করতেই চাইছিলাম নাহ। কিন্তু আমাকে গোসল করানোর জন্যে দুজন বিশালদেহী মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। ওদের সাথে জোরাজোরি করার শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট নেই। তাই বাধ্য হয়েই সুবোধ মেয়ের মতো গোসল করে নিলাম। ওরা আমার সারা দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিষ্কার করে দিলো। ওরা আমার স্তন যৌনি নিতম্বে সবচেয়ে বেশী মনযোগ দিয়ে পরিষ্কার করলো। বুঝলাম এরা প্রফেশনাল। এদের কাজই হল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মেয়েদের দেহকে প্রিস্টের বিকৃত কামনা পুরণের জন্যে তৈরি করা। ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।”
ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা