ডাকিণী ৪৯তম পর্ব (ক অংশ)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
আমি দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরীতে। লাইব্রেরীতে যেয়ে দেখি, আলেসের ডায়ারীটা পড়ে আছে টেবিলে, আর এর পৃষ্টাগুলি দমকা বাতাসে একে একে উল্টাচ্ছে! আশ্চর্য! এটা তো আলেসই তাহলে! কিন্তু ও যায় নি কেনো? ডায়ারীর দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই ব্যাপারটা বুঝে গেলাম। আলেস আংটিটা আনতে বলেছিলো তার নিজের মুক্তির জন্যে নয়। তার ভালবাসার মার্টিনীর মুক্তির জন্যে। ও মার্টিনীকে ছাড়া ওপারে যাবে না। প্রকৃতপক্ষে এদের ভালবাসার বাধন এতটা জোরালো যে ওরা একজন অপরজন কে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে নি। তাই মার্টিনীর মুক্তিকেই প্রকারান্তরে আলেস তার নিজের মুক্তির মতোই দেখে আসছিলো। কিন্তু আংটিটা উদ্ধারের পর মার্টিনী সহ অন্য মেয়েদের মুক্তি হলেও আলেসের ইহলৌকিক বন্ধনটা এখনো রয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে ওর আটকে থাকার কারণ ওই আংটিটা নয়, নইলে ও অন্য মেদের সাথেই প্রিস্টের কবরে বন্দি থাকতো, এ কটেজে মুক্ত হয়ে ঘুরতো না। যে জিনিসটা আলেসকে এখাবে বেধেঁ রেখেছে সেটা হলো এই ডায়ারী।
নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়গুলির স্মৃতিযুক্ত এ ডায়ারীটাই ওকে এই বদ্ধ কটেজে হাজার বছর ধরে বন্দি করে রেখেছে। কিন্তু এতোদিন আমি ওর উপস্থিতি টের পাইনি কেন? ওকে আমি এতোদিন খুঁজলাম কিন্তু ও ধরা দিলো না কিন্তু আজ নিজে থেকেই তার উপস্থিতি ঘোষনা দিচ্ছে! ব্যাপারটা কেমন জানি গোলমেলে! মারগারেটের আত্মার প্রভাবেই কি ও নিশ্চুপ হয়ে ছিলো! কিন্তু এতদিন তো জানতাম খারাপ আত্মাগুলি মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে! এখন দেখছি এরা একে ওপরের উপরেও প্রভাব বিস্তার করে! কিন্তু তা কি করে সম্ভব? মনিকা তো ওকে সেই প্রথম থেকেই অনুভব করে আসছে। সেদিন মনিকাকে একা রেখে আমি অফিস গেলে মারগারেট ও চলে আসে আমার সাথে। কারণ আমি নিজের অজান্তেই মারগারেটের বাহন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যেসব জায়গায় যেতাম মারগারেট ও চলে আসতো সাথে সাথে। আমার ও মারগারেটের অনুপস্থিতিতে মনিকা লাইব্রেরীতে আলেসকে অনুভব করে ও ভয় পেয়ে যায়। ভয়ে দিশেহারা হয়ে ও আমায় ফোন দেয়, তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে আসার জন্য। কিন্তু কপাল খারাপ যে সেরাত আমায় স্টারদের সেইফ হাউসেই কাটাতে হয়। শেষরাতে আমি কটেজে ফিরতেই সাথে করে মারগারেটও ফিরে আসে এবং মনিকাকে লাইব্রেরীতে ওর বই পড়তে দেখে ফেলে। তারপর মেয়েটাকে ভয় দেখিয়ে অজ্ঞান করে দেয়। তার কয়েকদিন পরে মনিকা অভিযোগ করেছিলো যে, বেসমেন্ট থেকে কে যেনো ওর নাম ধরে ডাকছে। ওটাও আলেসই ছিলো। বেসমেন্ট থেকে কেবল আলেসই ডাকতে পারে। ওটা ওরই আস্তানা। ওখানে মারগারেটের কোন প্রভাব নেই। সবিশেষে বেসমেন্টে আদিনের মোমবাতিটা নিভে যাওয়ার কারণও এই আলেস। সে মোমবাতি নিভিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলো কিন্তু আমি ও আদিন ব্যাপারটাকে নিছক দমকা বাতাসের কারসাজি ভেবে ভুল করেছিলাম। আমাদের আগেই বুঝা উচিৎ ছিলো যে বদ্ধ বেসমেন্টে দমকা বাতাস কখনোই নিজে থেকে সৃষ্টি হয় না। যদি না অন্য কেউ সেই বদ্ধ বাতাসে ঢেউ না তুলে। আলেস আগেও ছিলো এখনো এই কটেজেই আছে। কেবল এতদিন ও আমায় এড়িয়ে চলছিলো মাত্র। আমার উপস্থিতিতে লাইব্রেরীতে ও নিজেকে নিরব রেখেছিলো, তাছাড়া বেসমেন্টে দুরাত ঘুমালেও ও আমায় কোন দুঃস্বপ্ন দেখায় নি। তবে কি এতোদিন আমার সাথে এমন কিছু ছিলো যা আলেসকে আমার থেকে দুরে সরিয়ে রেখেছিলো? হা, অবশ্যই। ওই আংটি! আলেসের চরম অনিহা থাকা সত্তেও তার কপালে আংটির ছ্যাকা দিয়েছিলো। এরপর থেকে ওই আংটিপরা যে কাউকেই ও প্রিস্ট ভেবে ভয় পায়, ও তাদের থেকে দুরে সরে থাকে। ওই আংটির ভয়েই ও আমায় এড়িয়ে যাচ্ছিলো। এখন আংটিটা আমার হাতে নেই বলেই ও আমায় এখানে টেনে এনেছে। পৃষ্টা উল্টাতে থাকা ডায়ারীটাই আলেসের মুক্তির পথ নির্দেশ করছে। ডায়ারীটাকে পুড়িয়ে দিলেই আলেস মুক্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমাবে। এগিয়ে গিয়ে আলেসের ডায়ারীটা হাতে তুলে নিলাম! এত সুন্দর ডায়ারীটা এভাবে পুড়িয়ে দিতে একটুও ইচ্ছা করছিলো না।
ডায়ারীটা নিয়ে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে কিচেনে চলে এলাম। উদ্দেশ্য ছিলো ওটাকে পুড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু না। ঠিক তখনই আমার কটেজের কলিংবেলটা বেজে উঠে। আশ্চর্য! এই অসময়ে আবার কে এলো! ওদিকে কিচেনের কোণে মনিকার লাশটা পড়ে আছে। যদি আগুন্তুক এটাকে দেখে ফেলে তো আমার কেল্লাফতে। বাকিটা জীবন চোদ্দশিকের ভেতরে পঁচে মরতে হবে। আলেসের ডায়ারীটা স্টোভের পাশে রেখে দ্রুত মনিকার লাশটা টেনে এনে একটা কিচেন রেক এর পেছনে লুকিয়ে ফেললাম। তারপর দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম। আমি এতক্ষণ ঠিক এদেরই ভয় পাচ্ছিলাম। পুলিশ!
একটা ছয় ফুট উঁচু বিশাল দেহী অফিসার আর রুক্ষ চেহারার তার মহিলা ডেপুটি। ওদের দেখে আমি এতটাই ভড়কে গিয়েছিলাম যে ওদের সাথে কথা বলতেও ভুলে যাই। ওরাই প্রথম কথা বলা শুরু করে,
পুলিশ: “সরি ম্যাম, আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করার জন্যে। কিন্তু আমরা সত্যিই দুঃখিত। আমরা আপনার বেডরুমের সীলগালা খুলে দিতে ও আপনার বেডরুম থেকে জব্দ করা মালামাল গুলি ফেরত দিতে এসেছি।”
আমি: “ওহ, আচ্ছা আচ্ছা। ভেতরে আসুন। ”
ওরা প্রায় একঘন্টা সময় নিয়ে বেডরুমটা ভাল করে ফের পরীক্ষা করলো প্রথম দফায় ফেলে যাওয়া কোন সম্ভাব্য সুত্রের আশায়। তারপর বেডরুমে পড়ে থাকা সকল কাঁচের টুকরা সতর্ক হাতে সরালো। মেঝেতে জমাট বাধা আদিনের রক্ত ভাল করে ধুয়ে মুছে সেখানে ডিজইনফেক্টেন্ট ছড়িয়ে দিলো। তারপর একটা লাগেজে করে আমার বেডরুম থেকে জব্দ করা জিনিসপত্র গুলি ফেরত দিয়ে গেলো। ওরা চলে যেতে যেতে বিকাল ৯টা বেজে গেলো। ওরা চলে গেলে আমি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাগ্যিস ওরা মনিকার মৃতদেহটা দেখতে পায়নি। কৌতুহলবশত আমার ফেরৎ পাওয়া মাল গুলি পুলিশের দেওয়া লিস্টের সাথে মিলিয়ে দেখতে লাগলাম! আরে! ওগুলোর মধ্যে তো আদিনের সেই জাদুবিদ্যার বইটা রয়েছে। যেটা ও এনেছিলো মারগারেটের আত্মাকে আমার দেহে প্রবেশ করানোর জন্যে। হঠাৎ আমার চোখের সামনে একটা সরল সমীকরণ মিলে গেলো!
লাইব্রেরীতে আংটির ছ্যাকা খাওয়া আলেসের আত্মা, কিচেনে মনিকার মৃতদেহ, ড্রয়িংরুমের পেডাল ডাস্টবিনে সেই জাদুকরী আংটি, আর আমার বেডরুমে সদ্য ফেরৎ পাওয়া আদিনের জাদুবিদ্যার বই। এগুলি সব একত্রে মিলালেই পাওয়া যাবে মনিকাকে খুনের দায় থেকে মুক্তি।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম মনিকার দেহে আলেসের আত্মাটাকে ঢুকিয়ে দিবো। এতে আমি যেমন খুনের দায় থেকে মুক্তি পাবো, আলেসও নতুন জীবন ফিরে পাবে। খুনের দায় থেকে বাঁচার জন্যে এটাই একমাত্র উপায়। আত্মা প্রতিস্থাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ আমার কটেজের ভেতরই বিভিন্ন কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বেডরুম থেকে বইটা নিয়ে এসে লাইব্রেরীতে রাখলাম। কিচেনে ঢুকে মনিকার দেহটাকেও সন্তর্পণে লাইব্রেরীতে বয়ে এনে টেবিলের উপর শুইয়ে দিলাম। ওর দেহটা তখনো জমাট বাধাই আছে! তবে ইতিমধ্যেই ওটা থেকে অনেকটা বরফ গলে কিচেনের ফ্লোর ভাসিয়ে দিয়েছে। ড্রয়িংরুমের ডাস্টবিনের সব ময়লা হাতড়ে মনিকার কাটা আঙুলটা বের করলাম। আংটিটা ওটার সাথেই লেগে ছিলো। আঙুল থেকে আংটিটা বের করে নিয়ে লাইব্রেরীতে ফিরে এলাম। এবার কাজ শুরু করা যাক।
(চলবে)

ডাকিণী (২৩তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পিঠ দিয়ে কফিনের ডালাটা উপরের দিকে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু ওটা কিছুতেই খুলতে চাইছে না। মনে হয় আটকে গেছে। মনে হচ্ছিলো সব শেষ। আমি আর এখান থেকে বেরুতে পারবো না। আলেসকে ভুল বুঝে আমি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছি। অনুভুতি গুলি কাজ করছে না। এভাবে মরতে হচ্ছে বলে নিজের মধ্যে কোন অনুভুতি বা অনুশোচনা হচ্ছে না। শুধু মরার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছা করছে। আমার আত্মাটার কি হবে? মৃত্যুর পরেও কি আমি এই প্রিস্টের কবল থেকে মুক্তি পাবো না? পরিশ্রম আর উত্তেজনা শেষে অবসাদে দেহটা নেতিয়ে পড়লো প্রিস্টের দেহের উপর। আমার উদোম শরীরে ওর দেহ থেকে আঠা লেগে চটচট করছে। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। শুধু চাইছি মৃত্যুটা যেন দ্রুত ও বেদনাহীন ভাবে হয়।
মাথাটা ঝিমঝিম করছে আর প্রচন্ড ভারী মনে হচ্ছে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে প্রিস্টের আঠালো বুকে মাথাটা এলিয়ে দিলাম। ক্ষাণিকের জন্যে আমার বাগদত্তা অভিকে খুব মনে পড়লো। শৈশবটা একসাথেই কাটিয়েছি আমরা। কৈশরে এসে রঙিন ভালবাসা। প্রায় দশটা বছর ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিলাম আমরা। কিন্তু আমার আম্মুটার সেটা সহ্য হলো না। বিয়ের আয়োজন করে বসলো। ওর সেই চশমা পড়া গোলগোল মায়াবী চোখ, আর প্রশস্ত চওড়া বুকের ছাতি। অনেকদিন হলো ওর বুকে এভাবে মাথা রাখতে পারিনি!
অনুভব করলাম প্রিস্টের হাত দুটো আমার কোমর থেকে নগ্ন পিঠ বেয়ে উপরে উঠে আসছে। মনে হলো যেন পিঠে দুটো শুঁয়োপোকা কিলবিল করছে। ঠিক যেমন সপ্নে দেখেছিলাম। একসময় হাত দুটো ধীরে ধীরে আমার গলার দিকে এগুতে লাগলো। ও সম্ভবত আমায় গলা চিপে মারতে চায়। বাধা দেওয়ার শক্তি বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। আমি শুধু অধীর আগ্রহে জীবনের শেষ পরিণতির জন্যে অপেক্ষা করছি। হতাশায় চোখ দুটো বুজে এলো।
তখনি আমি নিজেকে কফিনে একা আবিষ্কার করলাম। প্রিস্টের দেহটা অদৃশ্য। উজ্জ্বল পরিষ্কার চাঁদনি রাত। আমি একা শুয়ে আছে এই লৌহ কফিনে। ডালাটা উপরে তুলা আছে। হঠাৎ কবরের নামফলকের পাশে এক পরমা সুন্দরি অপরূপাকে দেখতে পেলাম। বাথরুমের আয়নায় প্রথম দর্শনে আলেস যে এক প্রস্থ কাপড় পড়েছিলো, ঠিক তেমনি একটা কাপড় পড়েছে মেয়েটি। আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা হেসে ওর একটা হাত নাড়লো। তারপর সেই হাতের মধ্যমাটা অন্য হাত দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে ফেললো। কি বিদঘুটে কান্ড। তারপর একটা রহস্যময় হাসি দিয়েই সে দৌড়ে চলে গেলো। ও চলে যেতেই মেঘ গুলি চাদকে ঢেকে দিলো। চারিদিক আবার অন্ধকার হয়ে এলো। অনুভব করলাম এ অন্ধকারেই এক জোড়া হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরছে।
নিজেকে আবারো কফিনের ভেতরই আবিষ্কার করলাম, প্রিস্টের সাথেই। ও আমার গলা চিপে ধরেছে। আমার মাথায় দ্রুত কিছু ভাবনা খেলে গেলো। আলেসের কাপড় পড়া সুব্দরী মেয়েটি মার্টিনী না হয়ে যেতেই পারেনা। ওরা জীবদ্দশায় বন্দিশালায় কাপড় শেয়ার করেছিলো। তাই ওদের অশরীরী দুটো একই কাপড়ে আবির্ভাব হয়। ও আমায় একটা বার্তা দিয়ে গেছে। প্রিস্টের বা হাতের মধ্যমায় পরা আংটিটাই ওকে আবার বাঁচিয়ে তুলেছে। ওটাই ওকে এতটা ক্ষমতাবান করেছে। ওর আংটি পরা মধ্যমাটা যদি ভেঙ্গে দিতে পারি তবেই আমার প্রাণ বাচবে। মেয়েগুলির আত্মাও মুক্তি পাবে।
ওর হাতের আঙুল গুলি আমার চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছিনা কোনটা সেই কাঙ্খিত আংটি পরা মধ্যমা। তবে হাতড়ে অনুমান করার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আমার আঙুলের ডগায় সেই আংটির স্পর্ষ পেলাম। শয়তানটা নীচে শুয়ে থেকে, দু হাতের আটটি আঙুল দিয়ে আমার ঘাড় চেপে ধরেছে। আর বুড়ো আঙুল দুটো দিয়ে সরাসরি শ্বাসনালীর উপর চাপ দিচ্ছে। আমার শ্বাস প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। ফুসফুসটা বাতাসের অভাবে যেকোন সময় ফেটে পড়বে। অক্সিজেনের অভাবে সারা শরীরে খিচুনি শুরু হয়েছে। হাত পা গুলি তিরতির করে কাঁপছে। এই সঙীন অবস্থায়, ঘাড়ে বসে যাওয়া ঐ আঙুলটাকে আমি কিছুতেই মুচড়ে ভাঙতে পারবো না।
মনেমনে বলতে চাইলাম দুঃখিত মার্টিনী, তোমার বার্তাটা আমি কাজে লাগাতে পারলাম না, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু গলা দিয়ে শুধুই গড়গড় শব্দ বেরুলো।
(চলবে)

ডাকিণী (১২তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কিছুক্ষণ অন্ধকার থাকার পর আস্তে আস্তে সবকিছুই পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার দেহটা তখনো ঝুলছে আর ঘাড়টা বেঁকে আছে, ঠিক স্বপ্নে দেখা আলেসের লাশের মতো। এখনো ফাঁসিতে ঝুলছি তবে আর দম বন্ধ হয়ে আসছে না। মাথাটা অনেক হালকা মনে হচ্ছে। নিজের দেহের দিকে তাকালাম। দেহটা নিথর হয়ে আছে। তবে একটু আগে হওয়া প্রচন্ড খিঁচুনিতে তালি মারা এক প্রস্থ কাপড়টা নীচে খসে পড়েছে। অজস্র মানুষের সামনে আমার দেহটা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দড়িতে ঝুলেছে। ছিঃ ছিঃ। কি লজ্জা। নিচে জমায়েত মানুষগুলি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে দাত বের করে হাসছে, কেউবা সভয়ে বুকে ক্রুশ আঁকছে। তারপর এরা একে একে যে যার পথে চলে যেতে শুরু করলো। খানিক পরে ঐ চাবুকওয়ালাটা আমার দেহটাকে দড়ি ধরে টেনে ছাদে তুলল। তারপর দেহটাকে একটা কালো কাপড়ে ঢেকে দিলো। যাক। এবার তো কিছুটা পর্দা হলো। আমি সব কিছুই দেখছিলাম। তবে অনেকটা দুর থেকে থ্রিডি টিভি দেখার মতো করে। স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমি জীবন্ত জগৎ থেকে দুরে সরে গেছি। আমিও এখন আলেসের মতোই একটা অশরীরী।
ওরা আমার দেহটা একটা কাপড়ে বেধে ঝুলিয়ে নীচে নিয়ে গেল! আমিও চললাম ওদের সাথে সাথে। হেটে হেটে নয়। অনেকটা বাতাসে ভেসে ভেসে। নীচের প্রাঙ্গণে নিয়ে আমার পায়ে দড়ি বেধে উল্টো করে কুয়ায় চুবিয়ে নিলো। তারপর দেহটাকে টেনে তুলে কাপড়ে মুড়িয়ে পাজঁকোলা করে বয়ে নিয়ে যেতে লাগলো। কটেজে পৌছলে ওরা আমায় লাইব্রেরীর টেবিলে শুইয়ে দিলো। তারপর সবাই আমার দেহটাকে ঘিরে দাড়িয়ে কিসব মন্ত্র পড়তে লাগলো। বড় আজব তো ওদের আচার অনুষ্টান। ওরা যখন দেহটাকে নিয়ে ব্যাস্ত আমি তখন লাইব্রেরীটা ঘুরে দেখায় মন দিলাম। লাইব্রেরীটা ঠিক তেমনি আছে। তবে উঁচু তাক গুলোতে বইয়ের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম! ওরা কি আমার বই চুরি করে ফেলেছে? খানিক পরে ওদের রিচুয়াল শেষ হলো। আমায় লাইব্রেরী থেকে নিয়ে এসে ওরা বেডরুমে প্রবেশ করলো। বেডরুমটা ওরা রাতারাতি বদলে দিয়েছে দেখছি! গত শীতে কিনা সুন্দর ঝাড়বাতিটার যায়গায় একটা বিশ্রী আংটা বেরিয়ে আসছে। ওরা সেই আংটায় দেহটাকে ঝুলালো। রুমের ওপাশ থেকে স্বপ্নে দেখা সেই খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা প্রিস্ট বেরিয়ে এসে আমার দেহে হলি ওয়াটার ছিটিয়ে দিলো। বাহ। শয়তানটা আজ বড়ই অদ্ভুত সাজে সেজেছে। মাথায় কালো অলঙ্কার খচিত বেল্ট, পরনে লাল টকটকে আলখাল্লা। একদম ভাঁড়ের মতো লাগতেছে ওকে। খানিক পরে সে আমাকে আংটা থেকে খুলে পাজঁকোলা করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। যে লোক গুলি আমায় এখানে বয়ে নিয়ে এসেছিলো তারা একে একে চলে যেতে শুরু করলো। বেডরুমে শুধু আমি আর সেই প্রিস্ট রয়ে গেলাম। বুঝলাম আলেসের ডায়ারীর লেখাগুলি সত্যি হতে চলেছে। ও এখন আমার দেহটাকে নিয়ে মেতে উঠবে। উঠুক। আমার কিছু যায় আসে না। আমি এখন আর সেই দেহে নেই। আমি এখন জাগতিক দেহ বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
প্রিস্ট বিছানায় উঠে তার কাপড় খুলতে লাগলো। আমি সত্যিই আর তাকাতে পারছিলাম না। ওকে আমার মৃতদেহকে ভোগের অবারিত স্বাধিনতা দিয়ে আমি বেডরুম থেকে লাইব্রেরীতে চলে আসলাম। আমি শুধু দেখতে চাইছিলাম লাইব্রেরীর ওই তাকে আলেসের ডায়ারীটা আছে কি না। যা ভেবেছিলাম তাই। নেই। ওরা সম্ভবত ওটা নিয়ে গেছে। পাশের বেডরুম থেকে তখন প্রিস্টের যৌন সুখের গোঙ্গানি শুনা যাচ্ছে। কি বিকৃত মস্তিষ্কের এই লোকটা! কেন জানি মনে হল ও স্রষ্টার সৃষ্টি জগতের বাহিরে, এক শয়তানের সৃষ্টি। কিংবা নিজেই একটা ধারি শয়তান। লাইব্রেরীতে আর কাজ নেই। এভাবে ঘরে বসে না থেকে একটু বাহিরে থেকে ঘুরে আসা যাক। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে প্রধান করিডোর ধরে সোজা বেরিয়ে এলাম কটেজের বাহিরে। বাহিরে ততক্ষণে রাত হয়ে এসেছে। চারিদিকেই অন্ধকার। কিন্তু এর চেয়েও বেশী অন্ধকার ঐ আলো ঝলমলে কটেজের ভেতরটায়। এক প্রাগোঐতিহাসিক অন্ধকার যা হাজারো বাতি দিয়েও দুর করা যায় না। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ঐ অভিশপ্ত কটেজ থেকে দুরে সরে যেতে লাগলাম। ঐ তো কটেজের প্রধান ফটক দেখা যাচ্ছে। ওটা দিয়ে আমি এই অভিশপ্ত নরক থেকে বেরিয়ে যাব মুক্ত বিশ্বে। কিন্তু পথিমধ্যে দেখলাম কিছু লোক ফটকের সামনে কুয়োটার পাশে কাঠ জড় করে এক উঁচু ঢিবি তৈরি করেছে! আমি থমকে দাড়িয়ে ওদের দেখতে লাগলাম। একবার পেছনে ফিরে দেখলাম চারজন লোক আমার দেহটাকে একটা খাটিয়ায় শুইয়ে কটেজ থেকে বের করে নিয়ে আসছে। যাহোক। এবার আমার দেহটাও ঐ অভিশপ্ত কটেজের বাহিরে। রাতের মৃদু মন্দ হাওয়ায় আমার দেহের চুল গুলি ঊড়ছিলো। হঠাৎ নিজেকেই অপরূপা হিসেবে আবিষ্কার করলাম। খোদাকে ধন্যবাদ। উনি আমাকে এমন একটা রোগমুক্ত সুন্দর দেহে কিছুদিন বেঁচে থাকতে দিয়েছিলেন। খুব ইচ্ছা করছিলো আবার ঐ দেহে ফিরে যেতে। কিন্তু আমি জানি সেটা আর সম্ভব না। আমি ওটা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি চিরতরে। ওরা খাটিয়াটা আমার পাশ দিয়ে নিয়ে গিয়ে কুয়ার পাশে রাখলো। তারপর আমার দেহকে খাটিয়া থেকে তুলে ঐ কাঠের ঢিবিতে শুইয়ে দিল। বুঝলাম এরা এবার দেহটাকে পুড়িয়ে দিবে। ওদের মধ্যে নেতা গোছের একজন বুকে ক্রুশ একে ঐ ঢিবিতে একটা মশাল ছুড়ে ফেলল। তার দেখাদেখি বাকিরাও আরো কয়েকটা মশাল ছুড়লো। কাঠে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়লো। নিজের দেহটা চোখের সামনে পুড়তে দেখে আমি হাহাকার করে উঠলাম। দাউদাউ আগুনের শিখায় রাতের আধার সরে গিয়ে চারিদিক এক উজ্জ্বল আলোয় ভেসে উঠলো। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আলোটা খানিক সয়ে এলে নিজেকে সেই বেসমেন্টের বন্দিশালায় আবিষ্কার করলাম। অশরীরী নয়, একদম জলজ্যান্ত আমি। দিনের আলো সিড়ির দরজা দিয়ে চুইয়ে ঢুকে অন্ধকারকে হঠিয়ে দিয়েছে। ওহ খোদা! এতক্ষণ তাহলে আমি আরেকটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম! এ স্বপ্নে আলেয়া তার শেষ পরিণতি আমায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার প্রতি সত্যিই মায়া হল। আমি উঠে দাড়ালাম। সেলের দরজাটা এখন খুলাই আছে। আমার তোয়ালেটাও আমার পাশেই পড়ে আছে। ওটা কুড়িতে নিয়ে দেহে জড়ালাম। টলমল পায়ে বেরিয়ে এলাম সেই ভয়াবহ বন্দিশালা থেকে।
(চলবে)

ডাকিণী (১০ম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

(৯ম পর্বের পর থেকে)

নাহ। কটেজের ছাদটা তো একদমই ফাঁকা। গলায় দড়ি দিয়ে কেউ ঝুলছে না। সামান্য একটা স্বপ্নকে নিয়ে আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম। ভাবতেই নিজেকে হাস্যকর মনে হল। খুশি মনে শিস দিতে দিতে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। উহঃ, ঘরের ভেতরটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে! অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেয়ালে সুইচ খুজতে লাগলাম। হঠাৎ কিসে যেন পা বেধে আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। মাথাটা মেঝেতে ঠুকে গেল। অনেকটা নিঃশব্দেই জ্ঞান হারালাম।
যখন চোখ খুললাম তখন নিজেকে পার্শবর্তী খ্রিস্টান সিমেট্রিতে আবিষ্কার করলাম। সারি সারি কবরের নাম ফলক দাড়িয়ে আছে চারপাশে। আমি চারদিকে অপ্রস্তুত হয়ে হেটে হেটে দেখতে লাগলাম কবর গুলি। হঠাৎ একট কবরের নাম ফলকে চোখ আটকে গেল। ওতে লেখা ছিল, “স্যারিয়ান জোসেফ ভেলমন্ড, গীর্জার সম্মান্বিত প্রিস্ট। ১৪২০-১৪৯৮।” কেন জানি মনে হল এটাই সেই নরপশু প্রিস্টের কবর। ওর কবরের কাছে যেয়ে নাম ফলকের উপর খুদাই করা একটা আংটির চিহ্ন। সেই আংটি যা দিয়ে সে ডাকিনীদের কপালে ছ্যাঁকা দিত। এই আংটিকেই আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। যাক, আর কোন সন্দেহ নেই এটাই সেই শয়তানের কবর। একরাশ ঘৃনা হৃদয়ের গভীর থেকে ওর জন্যে উগলে বেরিয়ে এলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম জীবনে যদি কখনো এই শহরের গভর্ণর নির্বাচিত হই তবে আমার প্রথম কাজ হবে এই শয়তানটার কবরের উপর একটা পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা। আইডিয়াটা আমার খুব মনে ধরলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম আশেপাশে কেউ নেই। মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হলো। ভবিষ্যতের পাবলিক টয়লেটের উদ্ধোধন আজকে করে ফেললে কেমন হয়? আজই, এখনই এই শয়তানটার কবরে প্রসাব করে দিলেই তো উদ্ধোধন হয়ে যাবে! যেই ভাবা সেই কাজ। স্কার্টটা নিচে নামিয়ে, দিলাম শয়তানটাকে ভিজিয়ে। প্রস্রাব শেষে অনেক খানি থুথু ও ছিটিয়ে দিলাম ওর কবরে। অতপর লাথি মেরে কবরের নামফলটা মাটিতে ফেলে দিলাম। যাক। এখন অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে। এবার কটেজে ফিরতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেছে। অভিশপ্ত কবরটা ফেলে চলে যাওয়ার জন্যে যখনই উঠে দাড়ালাম, সাথে সাথেই মাটি ফুড়ে একটা হাত এসে আমার পায়ে আঁকড়ে ধরলো। চাঁদনি আলোয় স্পষ্ট দেখলাম ঐ হাতের মধ্যমায় জ্বলজ্বল করছে সেই গনগনে লাল আংটি। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কি অসুরিক শক্তি হাতটায়। আমার এক পা এত শক্ত করে আকড়ে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে ছিঁড়ে নিয়ে যাবে। আমি প্রাণপণে অপর পা দিয়ে অনবরত ওর হাতে লাথি মারতে লাগলাম। কিন্তু ও আমায় কিছুতেই ছাড়লো নাহ। একটু একটু করে কবরের পাশে টেনে নিয়ে গেল। তারপর একটা হেচকা টানে টেনে নিলো একদম কবরের ভেতরে।

কবরের ভেতরটায় নিরেট অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছিলো নাহ। ঐ আংটি পরা হাতটাকে নাহ। তবে এইটুকু জানি ঐ হাতের মালিক এ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আশেপাশে কোথাও বসে আছে। আমাকে চরম শাস্তি দেয়ার জন্যে। হঠাৎ মনে পড়লো আমার পকেটে নেক্সাস ফোনটা আছে। ওটা বের করে ওর স্কিনের আলোয় কিছুটা হলেও ভেতরটা দেখতে পারবো। প্রয়োজন হলে সাহায্যের জন্যে পুলিশে ফোন দেয়া যাবে। পকেট টা হাতড়ে ফোনটা বের করে আনলাম। পাওয়ার বাটনটা টিপে সামনে বাড়িয়ে ধরলাম। আরে! এটাতো সেই কবরের ভেতরটা নয়। এটা আমার কটেজ। পাশেই দেখলাম একটা ফুলের টব ভেঙ্গে পড়ে আছে। বুঝলাম আমার কটেজে প্রবেশের পর এই টবে পা বেধেই আমি উল্টে পরে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। কবরস্থান আর প্রিস্টের কবরের ঘটনাটা নিছক অজ্ঞান অবস্থায় দেখা আরেকটি দুঃস্বপ্ন। আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে উঠে বসলাম। তারপর খেয়াল হলো আমার স্কার্ট সম্পূর্ণ ভিজে গেছে! হায় ঈশ্বর! আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছি! ধ্যাত। মোবাইলের আলোয় সহজেই দেয়ালের সুইচবোর্ড খুজে নিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিলাম। উজ্জ্বল আলোয় চোখ সয়ে এলে যেখানে আমি পড়ে গেছিলাম সেদিকে ফিরে তাকালাম। আমার প্রস্রাবটুকু সেখানে কার্পেটকে ভিজিয়ে একটা গোলাকার চাকতির মতো দাগ তৈরি করেছে। অনেকটা স্বপ্নে দেখা সেই আংটির আকৃতি। কিন্তু এই আংটির রহস্যটা কি? আলেস কি এই আংটির জন্যে এত দিন এখানে পড়ে আছে। সম্ভবত ও চায় যেন আমি আংটিটা এনে দেই। অন্তত উদ্ভট স্বপ্ন গুলি আমাকে সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। একটু আগে ও আমায় দেখিয়ে দিয়েছে আংটিটা কোথায় আছে। খ্রিস্টান কবরস্থানে সেই মৃত প্রিস্টের কবরের ভেতর। চোখ বন্ধ করতেই সেই আংটি পরা হাতের ছবি মনে ভেসে উঠলো, যা স্বপ্নে আমার পা চেপে ধরেছিলো। উহঃ। আমি আর ভাবতে পারছিনা। মাথায় আঘাতের যন্ত্রনা, প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ, সারাদিনের ক্লান্তি সব মিলিয়ে একটা নরকের আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। আমি সব কিছুকেই উপেক্ষা করে, সোজা বাথরুমে গোসল করতে ঢুকলাম।
গোসল করতে করতে হঠাৎ আয়নায় চোখ গেল। আমার প্রতিবিম্ব দেখলাম কপালটা ফুলে একটা আলু গজিয়েছে। বুঝলাম এটা একটু আগে পড়ে যাওয়ার ফল। ইশ। কেন যে মোবাইলের আলো জ্বালানোর কথা প্রথমেই মাথায় এলো নাহ। তাহলে এভাবে অন্ধকারে পড়ে যেতে হত নাহ। এসব যখন ভাবছিলাম তখন হঠাৎ আয়নায় আমার প্রতিবিম্বটা বদলে আলেসের চাহারা ফুটে উঠলো। আসলে ওর উপস্থিতিটা এখন অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। এখন আর ওকে দেখে এখন আর আগের মতো ভয় বা আনন্দ কিছুই হয়। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। খানিক পরে ও আয়না থেকে চলে গেল। কিন্তু আয়নার ধুলোর মাঝে লেখা ফুটলো, “আংটিটা পুড়াও। আমায় মুক্তি দাও।”

আমি লেখাটা মুছে না যাওয়া পর্যন্ত ওটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রকৃতপক্ষে কি চায় আলেস? প্রথমে আমায় ওর ডায়ারী পড়াতে চাইলো। এখন আবার একটা আংটি চাইছে যেটা কবরের ভেতরে প্রিস্টের লাশের হাতে পড়ানো আছে। কি করতে চায় ও সেই আংটি দিয়ে? ঐ আংটি এনে না দিলে ও কি আমার ক্ষতি করবে? আর কি করলে এসব বিদঘুটে স্বপ্ন আমার পিছু ছাড়বে? এ প্রশ্নগুলি আমায় পাগল করে দিচ্ছে। আমি এর সমাধান চাই। আমাকে এর সমাধান করতেই হবে। গোসল সেরে খানিকটা হালকা লাগলো। তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাহিরে আসা মাত্র শুনতে পেলাম একটা মেয়েলী কন্ঠ একটানা আমার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। সাঞ্জে সাঞ্জে সাঞ্জে …… এক অমোঘ আকর্ষণ এ ডাকে। আমি অনেকটা মোহবিষ্টের মতো এগিয়ে গেলাম ঐ ডাকটা লক্ষ্য করে। কিন্তু এটা আগের মতো লাইব্রেরী থেকে আসছে নাহ। এটা আসছে আমার ঠিক পায়ের নীচ থেকে! বেসমেন্ট! আলেস আমাকে সেই বেসমেন্টের বন্দিশালায় ডাকছে? কিন্তু ওখানে তো সম্পূর্ণ অন্ধকার। বেসমেন্টে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগানো হয়নি। আমি সেই ডাক উপেক্ষা করে আবার আমার বেডরুমে ফিরে এসে দু গ্লাস পানি খেলাম। ডাকটা তখনো চলছে। আমার মনের একটা অংশ বলছে বেসমেন্টে নেমে দেখে আসো, আলেস কি জন্যে ডাকছে। হয়তো ও আমায় এমন কিছু দেখাতে চায় যা ওর আত্মার মুক্তিতে সহায়তা করবে। অপর অংশ বলছে আলেস থেকে দুরে থাকো। যাই হোক না কেন ও একটা অশরীরী। ওই অন্ধকার বেসমেন্টে ও আমার যে কোন ধরনের ক্ষতি করতে পারে! কিছুক্ষণ ভাবতে ভাবতে এ দুটো মনের লড়াইয়ে অনুসন্ধিৎসু মনটাই বিজয়ী হল। আমি বেসমেন্টের দরজা খুলে আমার ফোনটায় আলো জ্বেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। সিড়ি ভেঙ্গে যতই নিচে নামছি ডাকটা যেন ততই জোরালো হচ্ছে। একটা সময় সেই এক সারির পাঁচটা সেলের সামনে এসে দাড়ালাম। বুঝতে পারলাম ডাকটা আসছে ডান দিক থেকে ৩ নম্বর সেলের ভেতর থেকে। ভয়ে হৃদপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। সমস্ত মানসিক শক্তি একত্রিত করে আমি ঐ সেলে ফোনের আলো ফেললাম। নাহ। বাকি সেল গুলির মতোই ওটাও সম্পূর্ণ খালি। সেই পুরানো দিনের মতো সেলটায় কোন তালা ঝুলছে নাহ। ভেতরে কোন বন্দিও নেই। তবুও সেল গুলির অবয়বে নিষ্ঠুরতার ছাপ এতটুকু কমে নি। হঠাৎ মনে খেয়াল জাগলো, ভেতরে ঢুকে দেখলে কেমন হয়? আমি বুঝতে চাই কিভাবে আলেস আর মার্টিনী এখানে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাতো। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ৮ ফিট বাই ৮ ফিটের এক বর্গাকার সেল। তিন দিকেই পাথুড়ে দেয়াল। শুধু সামনের দিকটায় শিখ দিয়ে আটকানো। তাতে ৫ ফিট বাই ৩ ফিটের একটা দরজা, কয়েদীদের ভেতরে আনা নেয়ার জন্যে। ভেতরটা সম্পূর্ণ খালি। কোন আসবাবপত্র নেই। এসব যখন ঘুরে ফিরে দেখছিলাম তখনই হঠাৎ সেলের দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল! আমি উন্মাদের মতো দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বশক্তিতে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু তালা না থাকা সত্ত্বেও দরজাটা শক্ত হয়ে আটকে গেছে। হায় হায়। এই শতাব্দী প্রাচীন বন্দিশালায় এখন আমি বন্দি হয়ে পড়েছি! না কি আলেস আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছে! ভয়ের এক ঠান্ডা স্রোত ঘাড় বেয়ে নেমে গেল! আবার মনে পড়লো হাতে ধরে থাকা ফোনটার কথা। আমি পুলিশে মেসেজ দিয়ে আমাকে এখান থেকে উদ্ধারের জন্যে বলতে পারি। কিন্তু ফোনের দিকে তাকাতেই সেই আশা গুড়েবালি হয়ে গেল। ওয়াই ফাই কানেকশন লস্ট দেখাচ্ছে। তার চেয়েও ভয়াবহ কথাটা হল ফোনে মাত্র ৪% চার্জ আছে। একটু পরেই এর স্কিনের আলো বন্ধ হয়ে যাবে। আমি ভয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি। যদিও জানি এ বিশাল শূন্য কটেজে কেউই আমার চিৎকার শুনবে নাহ। সেলের দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে কাঁদ ব্যাথা হয়ে গেছে। তবুও খুলছে নাহ। একসময় চলতে চলতে বার দুয়েক লো ব্যাটারি সিগনাল দিয়ে ফোনটা অফ হয়ে গেল। নিরেট আধার পুরো সেলটা কে গ্রাস করে নিল। অবিশ্বাস্য ভাবে বদ্ধ বেসমেন্টের ভেতরই একটা ঝটকা বাতাস এসে আমার শরীরে পেঁচানো তোয়ালেটা উড়িয়ে নিয়ে গেল। সেলের ভেতর প্রায় সব জায়গা হাতড়েও আমি তোয়ালেটা পেলাম নাহ। আমি এটারই ভয় পাচ্ছিলাম। আলেসের মৃত্যুর শত শত বছর পরে ওর সেলে, ওরই মতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আমি আটকে পড়েছি!

(চলবে)

ডাকিণী (৮ম পর্ব)

2

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি শেষ করে বিড়বিড় করে বললাম, হায় আলেস। এসব বিচারের নামে প্রহসন তোমার জন্মের আগেও মানব সমাজে ছিলো, তোমার মৃত্যুর পরে এখনো টিকে আছে। তোমার আগে সক্রেটিস, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস প্রমুখ এর শিকার হয়েছেন। তোমার পরে, আমেরিকার লুথার কিং, ইতালির মোসলিনী, মার্কো, প্রমুখ। এমনকি এই কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের নামে প্রহসন হয়ে গেছে। মানব সমাজে কোন কালেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, আর কখনো হবেও না। তাই বলে তুমি মরে গিয়েও এই কর্টেজকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে? পরপারে তোমার জন্যে নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। হয়তো ওখানে মার্টিনী তোমার পথ চেয়ে আছে। তুমি যাচ্ছ না কেন? লাইব্রেরীর এক কোন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। দরজায় লেখা ভাসলো, “মুক্তি দাও আমায়।” এবার আমি গলা চড়িয়ে বললাম, কিন্তু কিসের মুক্তি? কার থেকে মুক্তি? প্রত্যুত্তরে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন লেখা বেরুলো।
আলেসের লেখায়,
“বাহ। আজ সকাল হতে না হতেই এক প্রহরী এসে আমায় কতগুলি ফল, পানি, আর রুটি দিলো। প্রথমে এদের এই আকর্ষিক মহানুভবতার কারণ বুঝতে না পারলেও এখন ভালই বুঝতে পারছি। চারদিন পর যখন আমার লাশটা শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হবে তখন সে জীর্ণশীর্ণ দেহ থেকে যথেষ্ট যৌন সুখ নাও পেতে পারে। তাই এই চারদিন আমাকে খাইয়ে দাইয়ে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। আমি গতরাতে আমার ডাকিণী হওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছি। আমার ডাকিণী হওয়ার আসল কারণ হল আমার বাবার ফেলে যাওয়া পারিবারিক সরাইখানাটি। আমাদের সরাইখানাটি শহরের প্রায় তোরণদ্বারে অবস্থিত। শহর থেকে যারাই বেরুয় বা যারাই শহরে নতুন আসে তারা সবাই এই সরাইখানায় রাত কাটাতো। ফলে আমাদের প্রচুর মুনাফা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ওটা আমার মালিকানাধীন ছিলো। এমতাবস্থায় যেহেতু আমার কোন সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিলো নাহ তাই আমি মারা গেলে সরাইখানাটি পরিতাজ্য সম্পত্তি হিসাবে গির্জার অধীনে চলে যাবে। গির্জার প্রিস্ট ও সেবকদের জন্যে অতিরিক্ত আয়ের উৎস খুলবে। তাই শুধু এই সরাইখানাটির মালিকানার জন্যেই আমি আজ এক ভয়ঙ্কর ডাকিণীতে পরিণত হয়েছি। এসব বিচার, ডাকিণী অপবাদ, কেবল লোক দেখানোর নাটক বৈকি আর কিছু নয়। সবই স্পষ্টত ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমি এতে এতটাই জড়িয়ে গেছি যে মৃত্যুর পরেও আমি এ থেকে বেরুতে পারব নাহ। রবিবার প্রার্থনার পর ফাঁসির দড়ি আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে আসবে নাহ। আসবে আমাকে এখানে চিরতরে বেধে রাখতে। চারিদিকে কেবলি অন্ধকার। আমি একা একা এর মধ্যে কেবলই তলিয়ে যাচ্ছি, আরো গহীনে। কপালে দাসত্বের চিহ্ন নিয়ে। ”
পরের পাতায়,
” আজ দুপুরে ওরা আমায় সেই পুকুরে নিয়ে গেছিলো গোছল করাতে। কাল যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। তাই আজ শরীরটাকে একটু ঘসা মাজা করে একে প্রিস্টের যৌন শুদ্ধিকরণের জন্যে তৈরি করে নিতে হবে তো। আমি গোসল করতেই চাইছিলাম নাহ। কিন্তু আমাকে গোসল করানোর জন্যে দুজন বিশালদেহী মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। ওদের সাথে জোরাজোরি করার শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট নেই। তাই বাধ্য হয়েই সুবোধ মেয়ের মতো গোসল করে নিলাম। ওরা আমার সারা দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিষ্কার করে দিলো। ওরা আমার স্তন যৌনি নিতম্বে সবচেয়ে বেশী মনযোগ দিয়ে পরিষ্কার করলো। বুঝলাম এরা প্রফেশনাল। এদের কাজই হল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মেয়েদের দেহকে প্রিস্টের বিকৃত কামনা পুরণের জন্যে তৈরি করা। ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।”
ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৭ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি পড়ার পর মনে হয়েছিল আলেস তবে এভাবেই ধুকেধুকে মরেছিল! আজ পোল্যান্ডে প্রতি বছর ৬০ হাজার টন মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এদেশেরই একটা অকুতোভয় কন্যা একসময় খাবারের অভাবে ধুকেধুকে মরতে হয়েছিলো। নিজের দেশের(বাংলাদেশ) দিকে তাকিয়ে দুঃখ হল। সেই অজ্ঞতা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পোল্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণ নুয়ে পড়ার পরেও আজ উন্নতির শীর্ষে। কিন্তু আমার সুজলা সুফলা শস্য শামলা বাংলাদেশ আজো তৃতীয়বিশ্বের ক্ষুদা আর দারিদ্র পীড়িতদের কাঁতারে। যাহোক, ক্ষানিকের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আলেসের মৃত। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টাতেই আবারো আলেসের লেখা বেড়িয়ে পড়লো।

“আজ সন্ধ্যায় এক রক্ষী দুটো ভূট্টা আর এক মশক পানি নিয়ে এসেছিল। আমি ওর কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে খাবার নেইনি। কেন জানি মনে হল সেই হয়তো আমার মার্টিনীকে খুন করেছে। হয়তো ওর হাতে এখনো মৃত মার্টিনীর রক্ত লেগে আছে। গত রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল। ওর হাত থেকে খাবার নেওয়াটা আমার কাছে সেই স্বপ্নে দেখা মার্টিনীর ঝুলন্ত লাশ থেকে ঝরা রক্ত খাবার মতোই নিকৃষ্ট মনে হলো। আমি শুয়ে থাকলাম। ও কিছুক্ষণ খাবার হাতে দাড়িয়ে থাকল। যখন দেখলো আমি উঠে ওর কাছ থেকে খাবার নিচ্ছি নাহ তখন সে মশক আর ভূট্টা দুটো আমার সেলের ভেতর ছুড়ে ফেলে চলে গেল। মাটিতে পড়ে মশক ফেটে মেঝেতে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। সে পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মেঝে থেকে সবটুকু পানি চুষে খেলাম। আহ পানি…..ঈশ্বরের এক মহিমান্বিত উপহার। পানিটুকু খাওয়ার পর আমি ভূট্টা দুটো কুড়িয়ে খেতে লাগলাম। পানির অভাবে আমার গলাটা এতটাই শুকিয়ে গেছিলো যে ভূট্টার দানাগুলি বারবার আটকে যাচ্ছিলো। খাবার সময় গলায় প্রচন্ড জ্বালাপোড়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিলো যেন জ্বলন্ত কয়লা খাচ্ছি। কিন্তু তবুও পেটের দায়ে না খেয়ে উপায় ছিলো নাহ। একটা ভূট্টা খাওয়ার পর যখন অপরটিতে কামড় বসালাম তখন মনে পড়লো মার্টিনীর কথা। ও থাকলে হয়তো দুজনে ভাগ করে খেতাম। এতে পেট কম ভরলেই মনটা আনন্দে ভরে যেত। বুকের গহীন থেকে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। মনেমনে বললাম আমি আর পারছি না প্রভু।এই নৃসংশতা থেকে এবার আমায় মুক্তি দাও। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চল প্রভু। আজ রাতই যেন আমার এই ঘৃন্য জীবনের শেষ রাত হয়। কিন্তু প্রভু যীশু আমার গতরাতের প্রার্থনা অগ্রাহ্য করলেন। আমি বেঁচে রইলাম আরেকটি দুর্বিষহ দিনের অভিজ্ঞতা গ্রহণের জন্যে। ”

তার পরের পৃষ্টায় আবার লিখেছে,
” আজ সকালে এক প্রহরীর লাথি খেয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গল। অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল শরীর নিয়ে আমি এতটাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে প্রহরীর হাঁকডাঁকে কোন কাজই হয়নি। বাধ্য হয়েই ওকে কষ্ট করে সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আমাকে জাগাতে হয়েছে। আমাকে লাথি মেরে সে তার এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের শোধ নিতে চাইছে। ব্যাথ্যা পেলেও আমি ওকে কিছুই বললাম নাহ। ইদানীং ব্যাথা পেতে পেতে তা মুখবুজে সহ্য করাও শিখে ফেলেছি। শুধু অবাধ্য চোখ দুটো কোন বাধা মানে না। ব্যাথা পেলেই কয়েক ফোঁটা জল ছেড়ে দেয়। প্রহরী আমায় এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তৈরি হয়ে যেতে। আজ নাকি জনসম্মুখে আমার বিচার করা হবে। কাপড় পড়তে গিয়েও আমার মার্টিনীকে মনে পড়ে গেল। এইতো সেদিন আমরা একটা কাপড়কে দুজনে ভাগ করে পড়েছিলাম। আজ তার অনুপস্থিতিতে এ কাপড়ের মালিক আমি একাই। কিন্তু এই একাকীত্বই আমাকে সবচেয়ে বেশী যন্ত্রনা দিচ্ছে। ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের আঘাত বা অন্যকোন নির্যাতন নয়। মানুষের স্মৃতির এক আশ্চর্য ত্রুটি হল দুঃখ ভুলে যাওয়া কিন্তু সুখময় দিনগুলি মনে রাখা। মার্টিনীর সাথে সেই সুখময় দিনগুলির স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। মৃত্যু ব্যাতিত এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ খুলা নেই। কাপড় পরা মাত্র ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে একসময় আমরা একতালা গীর্জার ছাদে পৌছে গেলাম। রক্ষীরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে বেঁধে দিল। পূর্ব দিগন্তে তখন সবে মাত্র গ্রীষ্ম ঝলমলে সূর্যোদয় হয়েছে। তার উষ্ম পরশ আমার ভাঙ্গাচুরা শরীরটাকে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। একজন ঘোষক এসে গ্রামবাসীকে গীর্জা প্রাঙ্গণে একত্রিত হওয়ার আহব্বান জানালো। মানুষজন ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু করলো। তারপর সম্মান্বিত পাদ্রী গীর্জার ছাদে এসে বসলেন। শুরু হল তিন তিনটে খুনের দায়ে অভিযুক্ত ডাকিনী আলেসের বিচার।”
তার পরের পৃষ্টায়,
” মাননীয় পাদ্রী একে একে আমার উপর আনা সকল অভিযোগ উপস্থিত সবাইকে পড়ে শুনালেন! প্রথম অভিযোগ হল আমি নাকি সরাইখানার একক মালিক হওয়ার আশায় আমার বাবাকে অভিশাপ দিয়ে মেরে ফেলেছি। কি অদ্ভুত অভিযোগ। বাবা বেঁচে থাকতে আমি কখনোই সরাইখানায় যেতাম না। আমার ব্যবসাপাতিতে একটুও আগ্রহ ছিলো নাহ। যে জিনিসে আমার আগ্রহই নেই তার একচ্ছত্র মালিকানার জন্যে আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে খুন করব! এটা ভাবা যায়? তাছাড়াও বাবার সম্পত্তি তো তার একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার কপালেই জুটতো। তাকে খুন করে ছিনিয়ে নেবার কোন প্রয়োজনই তো ছিলো না। তবুও আমি পিতৃঘাতী। এটাই কি পৃথিবীর ন্যায়বিচারের উদাহরণ?
তার পরের অভিযোগ, আমি নাকি সামান্য কটা স্বর্নমুদ্রা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যে সরাইখানার এক ঘুমন্ত অতীথিকে খুন করেছি! ঐ মদ্যপ বুড়োটার কাছে স্বর্নমুদ্রা থাকলে তো নিবো। সে যা আয় করে সবই আমার সরাইখানায় মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। ওর কাছে স্বর্নমুদ্রা আছে এমনটা ভাবাও পাগলামি। আর যদি ঘুর্ণাক্ষরে দু একটা স্বর্নমুদ্রা থাকতো এবং আমার সেটার প্রয়োজন হতো তো আমি ওকে দু বোতল মদ দিয়েই তা বাগিয়ে নিতে পারতাম। খামাখা ওকে খুন করতে যেতাম কেন?আমার এই অতিসাধারণ যুক্তি তর্ক গুলি বিচারে গ্রহণ করা হলো নাহ। আমাকে ওই মদ্যপটার খুনি হিসাবেই চিহ্নিত করা হলো।
অতপর ওই অভাগা রক্ষীকে হত্যার অভিযোগ উঠলো। এবং যথারীতি সকল যুক্তিতর্কের উর্ধে উঠে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। অতপর প্রিস্ট এসে সর্বসম্মুখে আমার গালে চড় মারলেন। নিচে গীর্জা প্রাঙ্গণে গণজমায়েতের মাঝে ওনেক শিশুও ছিলো। এতো গুলি লোকের সামনে এভাবে অপমানিত হওয়ার লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হলো। অতঃপর বিচারের রায় ঘোষনা করা হলো। “ডাইনি আলেসকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর গীর্জা প্রাঙ্গণে সর্বসম্মুখে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। ” মৃত্যুদণ্ড শব্দটা আমার কানে যেন মধু বর্ষণ করলো। আর মাত্র চারদিন। এর পরেই আমি এই নির্মম পৃথিবী ছেড়ে আমার স্রষ্টার পাণ পাড়ি জমাবো। শাস্তি ঘোষনার পর প্রিস্ট তার হাতের আংটি খুলে তা আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিলেন। গভীর একটা পোড়া দাগ আংটির উপর মুদ্রিত নকশা সমেত আমার কপালে বসে গেল। এটা সেই চিহ্ন যা দ্বারা একজন ডাইনিকে চিহ্নিত করা হয়। কপালের অসহ্য জ্বালাপোড়া আর মিথ্যা ডাইনি অপবাদের যন্ত্রনায় আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। আমার কান্না দেখে উপস্থিত অনেকেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। অতপর প্রিস্ট সগর্বে গীর্জার ছাদ থেকে নেমে গেলেন। প্রিস্ট চলে যেতেই উপস্থিত জনতা আমার দিকে বৃষ্টির মত পাথর ছুড়তে লাগলো! যারা পাথর ছুড়ছিল তাদের প্রায় সবাইকেই আমি চিনি। তাদের মধ্যে ছিলো জোসেফ আন্টোনিও, সেই মোখপোড়া চাষি। গতবছর ওর ক্ষেতের ফসল আগাম শীতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফসল ফলাতে পারেনি বলে সে বউ বাচ্চা নিয়ে শীতে উপোস করে মরতে বসেছিলো। একরাতে সে আমাদের বাসায় এসে কিছু অর্থকড়ি ভিক্ষা চায়। আমার বাবা ওকে সাফ মানা করে দেন। কিন্তু ওর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে আমি আমার বড়দিনের উপহার কেনার জন্যে জমানো টাকার পুরোটাই তার হাতে তুলে দেই। সেই শীতের রাতে সে আমাকে মা মেরী অবতার বলে কুর্নিশ করেছিল। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের ব্যবধ্যানে আজ রোদ্রউজ্জল গৃষ্মে সে আমাকে ডাইনি বলে পাথর ছুড়ছে! কতই না দ্রুত এই মানুষগুলি বদলে যায়। তারপর চোখ পড়লো রজার বরিসের দিকে। আমার প্রাক্তন প্রেমিক। সেও সবার সাথে তাল মিলিয়ে আমার দিকে সমানে পাথর ছুড়ছে। অথছ কদিন আগেও সে কতনা মধুর কন্ঠে আমার রূপের প্রসংশা করতো। প্রতি বৃহষ্পতিবার সন্ধায় ও আমাদের গোয়ালঘরের পেছনে আমার সাথে মিলিত হবার জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো। আমিও বোকার মতো বাবার চোখকে ফাকি দিয়ে ওর মতো একটা লম্পটের সাথে মিলিত হতাম। ও আমাকে স্বর্গদেবী বলে ডাকতো। এইতো দুমাস আগেও সে তার স্বর্গদেবীকে বিছানায় পাবার জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আজ সেই স্বর্গ দেবীকে নরকের ডাইনি বলে গালি দিচ্ছে আর খুজে খুঁজে বড় পাথরগুলি বের করে ছুড়ে মারছে। ধ্বংস হোক এমন স্বার্থপর লম্পট পুরুষজাতির। ওর দিকে তাকাতেও আমার ঘেন্না হচ্ছে।
গীর্জা প্রাঙ্গণের এক কোণে কতগুলি শিশু কিশোর জড় হয়ে হৈ হোল্লড় করছে আর আমার দিকে পাথর মারছে। কচি অপ্রস্তুত হাতে ছোড়া পাথরগুলির বেশীরভাগই লক্ষভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের মধ্যে আমি আলেক্স রবার্ট উইলসন কে দেখতে পেলাম। ওর মা আমার প্রতিবেশী। ছেলেটা দেখতে খুবই সুন্দর। কচি বয়স ৪-৫ হবে। এইতো সেদিন ওর জন্মের সময় খুব বেশী তুষার ঝড় হয়েছিল। রাস্তায় তুষার জমে আমাদের গ্রামটা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এমন প্রতিকুল পরিবেশে ওর মায়ের যখন প্রসব বেদনা উঠে তখন কোন ধাত্রীকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো নাহ। ওদিকে সে তার মায়ের যৌনিতে উল্টো হয়ে আটকে গেছিলো। ওর বাবা বাড়ি ছিলো নাহ। লোকটা কাঠ কাটতে পার্শ্ববর্তী উইলো জঙ্গলে গিয়েছিলো। ওর মা ঘরে সম্পূর্ণ একা কাতরাচ্ছিলো। সেদিন তার আর্তচিৎকার শুনে আমি ওদের বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম। গরম পানি তৈরি করে, ওর মা কে শুইয়ে আমি নিজের হাতে ছেলেটাকে টেনে বের করেছিলাম। আমার হাত ধরেই ও এই পৃথিবীতে এসেছিলো। কৃতজ্ঞতাবশত তার মা আমার নামের সাথে মিলিয়ে তার নামকরণ করেন আলেক্স। আজ সেও আমার পর হয়ে গেছে! অতপর পাথরের আঘাতের তীব্রতায় আমি এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। রক্ষীরা আমার অজ্ঞান দেহকে বয়ে সেলের ভেতর নিয়ে এলো। জানিনা কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম রাত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই দেখলাম সেলের এক কোনে রক্ষীরা খাবার আর পানি রেখে গেছে। হয়তো জীবনের শেষ চারটে দিন ওরা আমায় অভুক্ত রাখতে চায় না। খেয়ে দেয়ে আমি আবারো লিখতে বসলাম। মৃত্যু প্রতিক্ষায়, জীবনের আতিবাহিত আরেকটি দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনের বর্ণনা।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৬ষ্ঠ পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

মার্টিনির জন্যে আমার হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। স্রষ্টাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতে লাগলো আমার কাছে। এভাবে পুতুলের মতো একটা মেয়েকে অকালে এভাবে নিয়ে গেল কেন? কি দোষ ছিলো তার? একজন বা কয়েকজনের প্রাণ নিলে সে খুনি। কিন্তু একে একে যে সবার প্রাণ যে হরণ করে সেই ঈশ্বর। জগতের কি অমোঘ লীলা! পরের পৃষ্টায় গেলাম,

আলেস লিখেছে,
“কাল রাতে একটুও ঘুমুতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই মার্টিনীর চেহারাটা ভেসে উঠছে! জানি আজ রাতে ওর মৃতদেহটাকে শুদ্ধিকরণের নামে প্রিস্ট ভোগ উৎসবে মেতে উঠবে। আমি যেন ওর আত্মার আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। গীর্জার ঐ উপরের তলায় সে সাহায্যের জন্যে হাহাকার করছে। ওর অতৃপ্ত আত্মাটা হয়তো অসহায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে, নিজের প্রাণহীন দেহটাকে কিভাবে ঐ জানোয়ারটা খুবলে খুবলে খাচ্ছে! ছিঃ। কোন মানুষ তার স্বজাতির মৃতদেহের এমন অমর্যাদা করতে পারে তা আমার জানা ছিলো নাহ। তাও আবার ঈশ্বর গৃহ গীর্জার ভেতরে বসে! হে ঈশ্বর তোমার গজব দিয়ে এই নষ্ট গীর্জাকে ধ্বংস করে দাও। এই শয়তানের আখড়া পুড়িয়ে ছাই করে ফেলো! প্রতিদিনকার মতো আজ সকালেও ওরা খাবার দিয়ে গেছে। চারটে রুটি। কিন্তু আজ আমি কার সাথে ভাগ করে খাব? মার্টিনী তো চলে গেছে। তাই খাবারের পুটলিটা আমি সেলের ফাঁক গলে ওদের উপর ছুড়ে ফেলে দিলাম। আর চিৎকার করে বললাম, তোদের খাবার তোরাই খা। শুধু আমার মার্টিনীকে ফিরিয়ে দে। এক শয়তান রক্ষী ভেঙ্গচি কেটে বলল, “ঐ ডাইনিকে নরকে পাঠানো হয়েছে। শীঘ্রই তোকেও সেখানে পাঠানো হবে।” যদিও আমি খুন না করেও খুনের দায়ে দোষী তবুও জীবনে কখনোই আমার মনে কারো প্রাণনাশের স্পৃহা জাগেনি। কিন্তু আজ প্রচন্ড ইচ্ছা করছিলো ঐ রক্ষীকে মেরে নরকে পাঠিয়ে দেই। একরাশ থুথু ওর মুখে ছিটিয়ে দিলাম। শয়তানটা অপর রক্ষীর হাত থেকে চাবুক নিয়ে আমার সেলে ঢুকে আমাকে খুব পিটালো। নিয়মিত চাবুক খেতে খেতে আমার পিটে পূঁজ হয়ে গেছে। ও যখন এই ক্ষত বিক্ষত পিঠে আবার মারলো তখন মনে হলো প্রতিটা চাবুক যেন পিঠ ভেদ করে হৃদপিন্ডে আঘাত করছে। খুব বেশীক্ষণ এ আঘাত সহ্য করতে হয়নি আমায়। দুচারটা চাবুক খাবার পরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সেলে সম্পূর্ণ একা আবিষ্কার করলাম। একাকীত্ব আর শূন্যতা পুরো হৃদয়কে গ্রাস করলো। এই একাকীত্ব থেকে বাঁচতেই বাইবেলটা নিয়ে লিখতে বসলাম।”

এ পৃষ্ঠাটা পড়ে চোখ বন্ধ করতেই যেন আলেসের ক্ষত বিক্ষত পিঠটা দেখতে পেলাম। ওহ! এই সাহসী মেয়েটা এতকিছু সহ্য করতে পেরেছে শুধু মার্টিনীর অপমান ছাড়া। তাই রক্ষীটা যখন মার্টিনীকে নরকে পাঠানোর কথা বলে তখনই সে সাপের মতো ফুসে উঠেছে। নির্যাতন নিশ্চিত যেনেও এর প্রতিবাদ করেছে! শুধু অনুভব করলাম জেলের অন্ধপ্রকোষ্টে এই দুই নারীর প্রেম অবলীলায় লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের মত প্রেমগাথাঁকে ম্লান করে দেবার যোগ্যতা রাখে।

পরের পৃষ্টায়,
“সেদিনের ঘটনার পর থেকে আজ দুদিন হয়ে গেল, ওরা আমাকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর সপ্তাহ খানেক আগের সেই নোংরা শুদ্ধিকরণের পর থেকেই ওরা আমাকে নগ্ন করে রেখেছে। ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম এগিয়ে আসছে বলে ঠান্ডা থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছি। কিন্তু পিপাসায় বোধ শক্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করেছে। গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি মার্টিনীকে আমার সেলের ভেতর ফাঁসীতে ঝুলানো হয়েছে। ওর ঘাড় ভেঙ্গে ধড়টা বেকায়দা ভাবে ঝুলছে। মৃত্যু যন্ত্রনায় সুন্দর মুখটা হা হয়ে জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে। ওর খোলা মুখ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে আর আমি তৃষ্ণার তাড়নায় মেঝে থেকে সে রক্ত চেটে চেটে খাচ্ছি। উহঃ। কি বীভৎস স্বপ্ন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি অনেক ক্ষণ কেঁদেছিলাম। কিন্তু তৃষ্ণায় সবটুকু পানিই শুকিয়ে গেছে। চোখ থেকে বেরুনোর মত আর কোন পানি অবশিষ্ট ছিলো না। দুপুরের দিকে তৃষ্ণার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে অঞ্জলি ভরে নিজের মুত্র পান করেছি। হলুদ বিস্বাদ তরলটা যেন আমার পিপাসাটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছি, তাড়াতাড়ি খাবার -পানি না পেলে আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত। তাই শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে এখন লিখতেছি। জীবনের শেষ অক্ষরমালা। জীবনের শেষ শব্দ, মার্টিনী।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৫ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

সেদিন অফিসে মন দিতে পারলাম নাহ। ঘুমের ঘোরে একসময় ডেস্কে মাথা ফেলেই কুপোকাত। কপাল ভাল অফিসে আমিই এক্সিকিউটিভ অফিসার। আমার উপরে কেউ নেই। আমার কোন বস থাকলে এতক্ষণে সোজা ঘাড় ধরে অফিস থেকে বের করে দিত। আজ বিকালটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। অফিস যেন শেষ হতেই চাইছে না। অবশেষে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় চলে এলাম। কাপড় ছেড়ে একটা লম্বা শাওয়ার নিলাম। আয়নায় চোখ যেতেই দেখলাম আলেস আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এবার ওকে দেখে মোটেও ভয় পেলাম না। বরং দুষ্টুমি করে চোখ টিপলাম। ও মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। ওকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে মন চাইলো। অঞ্জলিতে পানি নিয়ে আয়নায় ছিটিয়ে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আলেস আয়না থেকে চলে গেছে। শাওয়ার সেরে ডিনার রেঁধে খাবার টেবিলে বসলাম। খাবার টেবিলে আমি একটা প্লেট টেনে নিলাম আরেকটি প্লেট পেতে রাখলাম আলেসের জন্যে। জানি ও খাবার দাবার সহ সকল জাগতিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে তবুও কেন জানি ওকে ছেড়ে খেতে বসতে আমার বিবেকে বাধলো। খাবার শেষে লাইব্রেরীতে ফিরে গেলাম। আলেসের ডায়ারীটা আমার পড়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েই আছে। কাল বিলম্ব না করে পড়া শুরু করলাম।

” গত দুটো দিন কিছুই লিখতে পারিনি। প্রচন্ড জ্বর এসেছিল আমার। শরীরটা সেরাতের ধকল সহ্য করতে পারেনি। আধোঘুম আধোজাগরণেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ যখন হুশ হল তখন দেখলাম মার্টিনী আমাকে ওর কাপড় পড়িয়ে দিয়ে নিজে নগ্ন হয়ে আমার মাথার পাশে বসে আছে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ও হেসে সুপ্রভাত জানালো। নগ্ন মার্টিনীকে তখন আমার ভেনাসের চেয়েও বেশী সুন্দরি মনে হচ্ছিলো। ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, “জ্বর গায়ে নগ্ন থাকা ঠিক না। তাই আমার কাপড়টা খুলে তোমায় পড়িয়ে দিয়েছি। আর আমি তো জানিই তুমি আমাকে কাপড় ছাড়াই বেশী ভালবাস।” ওর কথা শুনে চোখে জল চলে আসলো। একটাই কাপড় আমরা দুজন ভাগ করে পড়তেছি। ও শুধু আমার জন্যে এই শীতেও সারাটি রাত নগ্ন থেকেই কাটিয়ে দিয়েছে! হায় ঈশ্বর! এ তোমার কেমন অসম বন্টন। তুমি মার্টিনীর হৃদয়ে যতটা ভালবাসা দিয়েছো তার এক কানাকড়িও যদি প্রিস্টের হৃদয়ে দিতে তবে আজ আমাদের এতটা কষ্ট পেতে হত না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে মার্টিনীকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। ও যে আমার জীবনের শেষ আশ্রয়। আমার ভেনাস দেবী। আমার স্বর্গের রাণী। আমরা দুজন দুজনাতে হারিয়ে গেলাম। এই মেয়েটা আমাকে স্বর্গসুখে ভাসিয়ে দিল। ওর সান্নিধ্যে এই নরকটা এক স্বর্গউদ্যানে পরিণত হল। মিলন শেষে আমরা দুজন একসাথে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ অনুভব করলাম মার্টিনী আমাকে ঘুমে রেখে উঠে চলে যাচ্ছে। মিটমিট চোখে দেখলাম ও এলোমেলো পা ফেলে উঠে সেলের এক কোণে যেয়ে বমি করলো। বুঝলাম ও অন্তঃসত্ত্বা। প্রিস্টের সন্তান ওর পেটে। দুদিনের ব্যবধানে আমাকেও ওর পরিণতি বহন করতে হবে। আমার পেটে হাত বুলালাম। কিছুই টের পেলাম না। কিন্তু আমি জানি এখানে একটা শুকরছানা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। শুধু একটাই আশা, মৃত্যুই পারে আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিয়ে আমার স্রষ্টার কাছে ফিরিয়ে নিতে। মার্টিনী ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে গভীর মমতা মাখা কন্ঠে বলল, “কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাস করে বাচ্চাটা কার আমি সোজা তোমাকে দেখিয়ে দেব। কি মনে হয়? পারবে তো আমার বাচ্চাটার বাবা হতে?” আমি ওর সুডৌল স্তনে চিমটি কেটে বললাম, যদি তুমি আমায় বিয়ে করে মিসেস আলেস হয়ে যাও তবেই পারব। আমার উত্তর শুনে ও উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। আমিও প্রাণ খুলে হাসলাম। এই বাহ্যিক হাসি ঠাট্টার আড়ালে প্রকৃত সত্যটা আমরা দুজনেই জানি। নিতান্ত ভাগ্যগুণে যদি আমরা এখান থেকে বেরুতেও পারি তবুও আমি আলেসকে বিয়ে করতে পারব নাহ। আমাদের সমাজ দুটো মেয়ের বিয়েকে কখনোই মেনে নিবে নাহ, তারা একে অন্যকে যতই ভালবাসুক না কেন।”
মনেমনে ভাবতে লাগলাম আলেস যদি এখনো বেঁচে থাকতো তবে কতই না খুশি হত। আজ আধুনিক পোল্যান্ড সমকামী বিবাহকে বৈধতা দিয়েছে। ইশ যদি আমি আলেস আর মার্টিনীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারতাম কত না মজা হত! এসব ভাবতে ভাবতেই পরের পৃষ্টায় গেলাম,
” আমার হৃদয়টা আজ ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না মার্টিনী আর নেই। আর কখনোই ও আমাকে ভালবাসবে নাহ। ওর নিষ্পাপ কচি চেহারাটা আর কখনোই আমি দেখতে পাব না! ওর মিষ্টি চুমু যা আমার শত নির্যাতন নিষ্পেষণকে মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিত তা আজ থেকে অতীত হয়ে গেছে। ওর জাদুকরী হাতের স্পর্শ যা আমায় নিমিষেই চরম যৌন সুখে ভাসিয়ে দিত, সে হাত দুটো আজ নিথর হয়ে পড়ে আছে! আজ ভোরে কতিপয় রক্ষী এসে বলল মার্টিনীর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ওকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। ও নির্লিপ্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো আমার দেহটার কি হবে? অপর এক রক্ষী উত্তর দিলো প্রিস্ট তোমার দেহকে পরপর তিন রাত শুদ্ধিকরণ শেষে আগুনে পুড়িয়ে দিবেন। এ গীর্জার নিয়ম অনুসারে বুঝি সকল ডাকিণীদেরই এই নিয়মে সমাহিত করার হয়। একথা শুনে মার্টিনী বাচ্চা মেয়েদের মতো ঢুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমাকে বাঁচাও আলেস। শয়তানটা শুদ্ধিকরণের নামে আমার মৃতদেহের সাথেও সঙ্গম করবে! ঈশ্বরের দোহাই লাগে, আমাকে বাঁচাও।” আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম। আমি বেঁচে থাকতে আমার ভেনাসকে এখান থেকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে নাহ। মনেমনে প্রার্থনা করলাম হে ঈশ্বর আমায় শক্তি দাও, আমায় গ্রহণ কর। মার্টিনীকে নিতে প্রথম রক্ষী সেলে প্রবেশ করা মাত্র আমি ওর উপর হামলে পড়লাম। ও তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। আমি ওর গলায় কামড় বসিয়ে দিলাম। ফিংকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসলো ওর গলা থেকে। এমন সময় আরেকটি রক্ষী আমার মাথার পেছনে বাড়ি মারলো। আঘাতের তীব্রতায় আমার চোখের সামনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে সেলে একা আবিষ্কার করলাম। বুঝলাম মার্টিনীকে ওরা নিয়ে গেছে চিরতরে! হায় ঈশ্বর, তুমি ওকে স্বর্গে যীশুর ঠিক পাশেই স্থান দিও। আমেন।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৪র্থ পর্ব)

1

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

এরপরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

“আজ হঠাৎ এক প্রহরী এসে চিৎকার করে আমাকে গালিগালাজ করতে লাগল। দুদিন আগে আমি যে রক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছিলাম সে নাকি সিমিলিয়ার যুদ্ধে মারা গেছে। স্বভাবতই এর ধরে নিয়েছে আমিই ওকে খুন করেছি। এই নিয়ে তিন তিনটা খুনের দায় আমার গলায় ঝুলছে। হায় ঈশ্বর, এই নির্বোধরাও কি তোমার সৃষ্টি? যুদ্ধে তো মানুষ যায় মারতে আর না হয় মরতে। না হয় ঐ রক্ষীটা মারা গেছে। কিন্তু তুমি তো জানো আমি ওকে খুন করিনি। আমি কাউকেই খুন করিনি। এরা শুধু শুধু আমাকে এখানে ধরে এনেছে। হায় ঈশ্বর। তুমি এর সুষ্ট বিচার কর। তুমি এই পাপীকে ক্ষমা কর। রক্ষীরা বলাবলি করতে লাগলো যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ততই নাকি মঙ্গল। এসব শুনে মার্টিনী খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। ও আমায় জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল। এ মুহূর্তে ওকে আমার কাছে ঈশ্বরের দূত মনে হল। এই অপবাদ, ঘৃনা, লাঞ্চনা, নিগ্রহের মাঝেও কেবল আমাকে ভালবাসতেই যেন ঈশ্বর স্বর্গ থেকে এক অপ্সরী মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ ঈশ্বর। এই পাপীকে দয়া করার জন্যে।”
তার পরের পৃষ্ঠা,
“আজ সন্ধায় ওরা আমাকে শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। সেলের দরজা খুলে ওরা যখন আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন মার্টিনীর সে কি কান্না। আমি তখনো জানতাম না শুদ্ধিকরণ জিনিসটা কি। যাওয়ার সময় আমি যতক্ষণ সম্ভব ওকে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। ও উন্মাদের মতো মাটিতে পড়ে নিজের চুল ছিঁড়ছে আর বিলাপ করছে। একটা সময় সেলের দেয়ালের আড়ালে ও ঢাকা পড়ে গেল। আমি সর্বশক্তিতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “মার্টিনী, আমি তোমায় ভালবাসি।” রক্ষীরা আমাকে নিয়ে একসময় প্রিস্টের কক্ষে পৌছে গেল। গীর্জার উঁচু তলায় সুরম্য কক্ষে, বিলাসবহুল আসনে অধিষ্ঠিত শ্মশ্রুমন্ডিত প্রিস্টকে দেখে আমি অবনত হয়ে সম্মান জানালাম। অতপর উনার পায়ে ধরে বললাম, “ধর্মাবতার, আপনি আমাকে চেনেন। আমি শৈশবে আপনার গীর্জায় দুবছর বিদ্যার্থী ছিলাম। আমার জীবনে এমন কোন রবিবার নেই যেদিন আমি সাপ্তাহিক প্রার্থনায় ফাঁকি দিয়েছি। আমি স্রষ্টার একজন একনিষ্ঠ সেবিকা হিসাবেই জীবনে বেঁচে থাকতে চাই। মা মেরীর কসম আমি ডাকিণী নই।”
প্রিস্ট আমার মাথায় লাথি মেরে বললেন আমি নাকি একজন ছদ্মবেশী ডাকিণী। ধার্মিকতার ছদ্মবেশ নিয়ে আমি নাকি ৩ জন কে খুন করেছি। তাই আমার অবধারিত শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু দন্ডের আগে অবশ্যই আমার দেহটাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে যেন মৃত্যুর পর আমার পাপাত্মা আমার দেহে আর ফেরত আসতে না পারে। প্রিস্টের ইঙ্গিতে দুজন রক্ষী এসে আমার দুহাত শক্ত করে চেপে ধরল। আর প্রিস্ট ছুরি দিয়ে আমার পরিধেয় কাপড় কেটে ফেলে আমাকে উলঙ্গ করে দিল। আমি লজ্জায় অপমানে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচালাম। আমার বিশ্বাস ছিল হয়তো মা মেরী আমার চিৎকার শুনে সাহায্য করতে আসবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে প্রিস্টের বিশাল হাতের চড় খেয়ে আমি লুটিয়ে পড়লাম।”
এ পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমার হাত পা অসার হয়ে আসতে শুরু করলো। অনেকটাই অনুমান করতে পারছিলাম এর পর অসহায় আলেসের উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টালাম।
” ওরা আমাকে পাশের কক্ষের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শেকলের সাথে বেধে দিলো। অতঃপর প্রিস্ট এসে আমার নগ্ন দেহে পানিপড়া ছিটিয়ে দিল।তারপর সে আমার দেহটাকে পুরো রাত জুড়ে চারবার ভোগ করল। আমি সারারাত মা মেরীকে ডেকেছি একটু সাহায্যের জন্যে। কিন্তু উনি আমার ডাক কবুল করেননি। সকালে আমাকে এই বিধ্বস্ত দেহেই সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরা আমাকে গোসলও করতে দেয়নি। আমার দুপায়ের মাঝখানে এতবেশী ব্যাথা করছিল যে আমি হাঁটতে পারছিলাম নাহ। কিন্তু রক্ষীদের নির্দয় চাবুকের আঘাতে টলতে টলতে কোনরকমে আমার সেলে পৌছালাম। সেলে মার্টিনী শুয়ে ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি খানিকটা ইতস্তত করলাম। আমার সারা দেহে রক্ত আর বীর্যের মাখামাখি। এ দেহে ওকে জড়িয়ে ধরলে তার কাপড় নোংরা হয়ে যাবে। কিন্তু ও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল নাহ। একটা সময় আমি ক্লান্ত দেহটা ওর বাহুডোরে এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে আমি আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। দেখলাম গীর্জার প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিশ ছোট্ট আলেসকে নিতে আমার বাবা মা এসেছেন। সাথে করে গরম ভূট্টা ভাজা আর রাইয়ের মন্ড নিয়ে এসেছেন। এসব পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে! তারপর বাবা মায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখলাম মার্টিনী তার কাপড়ের ছোট্ট কোন ছিড়ে একটা রুমাল বানিয়েছে। আর মশক থেকে পানি নিয়ে সে রুমাল ভিজিয়ে আমার দেহের নোংরা রক্ত, বীর্য মুছে দিচ্ছে। ঘৃণায় আমার মুখ বেঁকে গেল। ছিঃ। এটা যদি শুদ্ধিকরণ তবে কালিমালেপন কি? কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বাইবেলটায় লিখতে বসলাম। গতরাতের ঘটনা নিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। এভাবে ভোগ হওয়া হয়তো আমার কপালে লিখা ছিলো। কিন্তু আমার একটাই আফসোস। আমি ঐ প্রিস্টের মতো এক সাক্ষাৎ শয়তানকে ধর্মাবতার ডেকেছি। তার পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছি। এর চেয়ে আমি মরে গেলেই ভাল হতো। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়া শেষে আমার সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছিল! নিঃসন্দেহে আলেস অনেক সাহসী আর মানসিক শক্তি সম্পন্ন ছিল। এতটা নির্যাতনের পরেও সে ভেঙ্গে পড়েনি। স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস অটুট রেখেছিল। কিন্তু ধর্মের ধ্বজা ধারিদের ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা আমাকে বিষ্মিত করে। একেই হয়তো বলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এটাই হল ধর্ম ব্যবসার চরম রূপ। আলেসের মতই সেসব ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি ঘৃণায় নিজের অজান্তেই আমার মুখ কুঁচকে গেল। পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথেই আমার বেডরুমে অ্যালার্ম বেজে ঊঠলো! কি আশ্চর্য! আমি সারাটি রাত লাইব্রেরীতে আলেসের ডায়েরী পড়েই কাটিয়ে দিয়েছি! আলেসকে আমার একাকীত্বের বন্ধু, সুখ দুখের সাথী মনে হল। বিড়বিড় করে বললাম, তোমাকে ভালবাসি আলেস।

যাক। অনেক হয়েছে। এবার উঠে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমি আমার কটেজ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি নাহ। আমি এখানেই থাকব। আলেসের সাথে। আপাতত অফিসে যাচ্ছি। আলেসকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে নাহ। কিন্তু অফিসে যে যেতেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৩য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পরদিন ঘড়ির আলার্ম শুনে ঘুম ভাঙ্গলো। নিজেকে বাথরুমের ফ্লোরে আবিষ্কার করলাম। মাথাটা খানিকটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে জমাট বেধে আছে। টলমল পায়ে উঠে ভয়ে ভয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। এবার সবকিছু ঠিকঠাক। প্রতিবিম্বে আমিই আছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নাস্তা সেরে অফিসে গেলাম। অফিসের সহকর্মীদের কপালের আঘাতের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি। ওরা নিজনিজ কাজেই ব্যস্ত হয়ে গেল। সেদিন অফিস শেষে বাড়ি ফিরে কাপড় চোপড় গোছগাছ করতে শুরু করে দিলাম। আমি আর এ কটেজে থাকব নাহ। আর যাওয়ার আগে আলেসের ডাইরিটাকে পুড়িয়ে দিয়ে যাব। হয়তো এটাই ওর মুক্তির শেষ পথ। আমার ক্লজিটের সকল কাপড় লাগেজে পুরে নিলাম। তারপর লাইব্রেরিতে গেলাম আলেসের ডাইরিটা নিতে। লাইব্রেরীতে ঢুকা মাত্র লাইব্রেরীর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি সভয়ে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই দরজার ঠিক ওপাশ থেকে এক আর্তচিৎকার ভেসে এলো। এবার আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। তারপর সারা বাড়িতে যেন প্রলয় শুরু হল। জিনিসপত্র ভাঙ্গার আওয়াজ, কান্নার বিলাপ, দেয়ালে আঁচড় কাটা, আরো বিভিন্ন রকমের শব্দ। এক সময় আমি অসহ্য হয়ে চিৎকার করে বললাম, “আলেস, তুমি কি আমায় মেরে ফেলতে চাও? ” খানিক পরেই দরজায় লেখা উঠলো, “নাহ, চলে যেও নাহ। আমায় সাহায্য কর বন্ধু। ” অতঃপর দরজা খুলে গেল। আমি দৌড়ে আমার রুমে গেলাম। যেভাবে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনেছিলাম তাতে অনুমান করেছি আমার রুমের কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু রুমে ঢুকে দেখলাম সবকিছুই স্বাভাবিক ও সাজানো গোছানো। তারপর বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলাম। আমি জানিনা আলেস কে। ওর উপর হওয়া নির্যাতন আমাকে ব্যথিত করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আমার কটেজে একটা অশরীরীর উপস্থিতি মেনে নেব। একটা সময় কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। আয়নায় দেখা বিম্বের সেই মেয়েটি আমার পায়ের কাছে পড়ে কাঁদছে। তার মুখ কালো কাপড়ে বাধা। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু মুখে কাপড় থাকার কারণে পারছে নাহ।এক সময় সে তার কটিবস্ত্রের মধ্য থেকে সেই বাইবেলটা বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর ঘুরে চলে গেল। মাঝরাতে স্বপ্নটা দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠে দুগ্লাস পানি খেলাম। তারপর ফ্রিজ থেকে দুটুকরো স্যান্ডুইচ খেয়ে রওনা হলাম লাইব্রেরী পানে। রহস্যের সব জট এখন ঐ বাইবেলের দিকে ইঙ্গিত করছে যাতে লেখা আছে আলেসের ডায়ারী। লাইব্রেরীতে গিয়ে ওটা বের করে আবার আলেসের লেখা পড়তে শুরু করলাম।
“আজ সকালে রক্ষীরা আমাদের খাবারের সাথে সাথে মার্টিনীর জন্যে দুই প্রস্থ কাপড়ও দিয়ে গেল। ও যখন কাপড় পরছিল তখন আমার হৃদয়ে হতাশা মোচড় দিয়ে উঠলো! ওর নিজের কাপড় আছে। এখন থেকে ও হয়তো আমার কোলে ঘুমুতে চাইবে নাহ। কিন্তু পরক্ষণে সে হতাশা উবে গেল। নীল কাপড়ে ওকে রাজকুমারীর মত লাগছে। আমি ওর উপর থেকে চোখ ফিরাতে পারছিলাম নাহ। ব্যাপারটা ওর নজর এড়ালো নাহ। ও মৃদু হেসে জিজ্ঞাস করলো কেমন লাগছে ওকে। আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারলাম, অসাধারণ। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে আজ রাতে আমার কোলেই শুয়ে পড়লো! তবে কি সেও আমাকে ভালবাসে? নাকি এটা নিছক একত্রে ভাল থাকার অভিনয়। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু ও দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। আমার বুকে ও বারবার মুখ ঘসছে। মনে হচ্ছে যেন ভালবাসার শেষ আশ্রয় খুঁজছে। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম। এই মেয়ে দুটো প্রমাণ করে গেছে, ভালবাসা স্থান, কাল, উঁচু নীচু, জাত ভেদ, বর্ণ লীঙ্গ ভেদাভেদ মানে নাহ। ভালবাসা ভালবাসাই। পৃষ্ঠা উল্টে পরের পাতায় গেলাম।
” কাল এক স্বপ্নময় রাত কাটিয়েছি আমি আর মার্টিনী। ওকে এভাবে কাছে পাবো কখনোই কল্পনা করিনি। এই মেয়েটা শুধু দেখতেই সুন্দরি না, বিছানায়ও অসাধারণ। ঈশ্বরের অমায়িক সৃষ্টি। হে স্রষ্টা আমায় ক্ষমা কর । আমার হেন পাপ মোচন কর। কিন্তু আমার পাপের শাস্তি তুমি মার্টিনীকে দিওনা কভু। দরকার হলে ওর মৃত্যুদ্যুতকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও তবুও ওকে এই নরক থেকে উদ্ধার কর প্রভু। আমেন।”
তার পরদিন ও লিখেছে,
“আজ ধরে আনার ৭ দিন পর ওরা আমাকে আর মার্টিনীকে একটা ছোট্ট পুকুরে নিয়ে যায় গোসল করাতে। যাহোক ওরা একদম নির্দয় নয়। পুকুরের উষ্ম প্রস্রবণে গা ডুবিয়ে দিতেই চাবুকের ক্ষতগুলিতে অসহ্য জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল। আমি আর মার্টিনী জল ছিটানোর খেলায় মেতে উঠলাম। কিন্তু বেরসিক রক্ষীদের তা পছন্দ হল নাহ। একটা নেতা গোছের রক্ষী এসে আমার আর মার্টিনীর দিকে পাথর ছুড়ে মারতে লাগল। আমি নীচু হয়ে যাওয়ায় পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা পেলাম কিন্তু বেচারি মার্টিনীর আহত মাথায় আবারো একটা পাথরের আঘাত লাগল! আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। এরা আমার সামনে আমার প্রিয়াকে আঘাত করতে পারে নাহ। আমি ওদের চিৎকার করে অভিশাপ দিলাম যেন সে শীঘ্রই নরকে প্রবেশ করে। আমার অভিশাপ শুনে ঐ রক্ষী সভয়ে পিছিয়ে গেল। ওরা আমাকে ডাইনি ভাবে। তাই আমার অভিশাপকে ভয় পেয়েছে। নিজেকে একটু হলেও ক্ষমতাবান মনে হল। মার্টিনীকে আর আমাকে আবার সেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। প্রভু তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকের এই চমৎকার দিনের জন্যে। ”

এই পৃষ্ঠা পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার লাইব্রেরীর দরজা সশব্দে বন্ধ হল। আর ধুলোর মধ্যে লেখা ফুটলো, আলেস+মার্টিনী। এই প্রথম আমি আলেসের ডায়রি পড়ে হাসলাম। মেয়ে দুটো এত্তসবের মাঝেও প্রেমে পড়েছিল আর জেলখানায় চুটিয়ে প্রেম করছিল। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তখনই খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। আমিও সে হাসিতে যোগ দিলাম। আলেসের প্রতি আমার ভয় ভীতি সবকিছুই কেটে গেল। নিঃসঙ্গ কর্টেজে এমন একজন সঙ্গিনী পাওয়া মন্দ কি? হোক না সে অশরীরী।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা