ডাকিণী (২৩তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পিঠ দিয়ে কফিনের ডালাটা উপরের দিকে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু ওটা কিছুতেই খুলতে চাইছে না। মনে হয় আটকে গেছে। মনে হচ্ছিলো সব শেষ। আমি আর এখান থেকে বেরুতে পারবো না। আলেসকে ভুল বুঝে আমি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছি। অনুভুতি গুলি কাজ করছে না। এভাবে মরতে হচ্ছে বলে নিজের মধ্যে কোন অনুভুতি বা অনুশোচনা হচ্ছে না। শুধু মরার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছা করছে। আমার আত্মাটার কি হবে? মৃত্যুর পরেও কি আমি এই প্রিস্টের কবল থেকে মুক্তি পাবো না? পরিশ্রম আর উত্তেজনা শেষে অবসাদে দেহটা নেতিয়ে পড়লো প্রিস্টের দেহের উপর। আমার উদোম শরীরে ওর দেহ থেকে আঠা লেগে চটচট করছে। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। শুধু চাইছি মৃত্যুটা যেন দ্রুত ও বেদনাহীন ভাবে হয়।
মাথাটা ঝিমঝিম করছে আর প্রচন্ড ভারী মনে হচ্ছে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে প্রিস্টের আঠালো বুকে মাথাটা এলিয়ে দিলাম। ক্ষাণিকের জন্যে আমার বাগদত্তা অভিকে খুব মনে পড়লো। শৈশবটা একসাথেই কাটিয়েছি আমরা। কৈশরে এসে রঙিন ভালবাসা। প্রায় দশটা বছর ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিলাম আমরা। কিন্তু আমার আম্মুটার সেটা সহ্য হলো না। বিয়ের আয়োজন করে বসলো। ওর সেই চশমা পড়া গোলগোল মায়াবী চোখ, আর প্রশস্ত চওড়া বুকের ছাতি। অনেকদিন হলো ওর বুকে এভাবে মাথা রাখতে পারিনি!
অনুভব করলাম প্রিস্টের হাত দুটো আমার কোমর থেকে নগ্ন পিঠ বেয়ে উপরে উঠে আসছে। মনে হলো যেন পিঠে দুটো শুঁয়োপোকা কিলবিল করছে। ঠিক যেমন সপ্নে দেখেছিলাম। একসময় হাত দুটো ধীরে ধীরে আমার গলার দিকে এগুতে লাগলো। ও সম্ভবত আমায় গলা চিপে মারতে চায়। বাধা দেওয়ার শক্তি বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। আমি শুধু অধীর আগ্রহে জীবনের শেষ পরিণতির জন্যে অপেক্ষা করছি। হতাশায় চোখ দুটো বুজে এলো।
তখনি আমি নিজেকে কফিনে একা আবিষ্কার করলাম। প্রিস্টের দেহটা অদৃশ্য। উজ্জ্বল পরিষ্কার চাঁদনি রাত। আমি একা শুয়ে আছে এই লৌহ কফিনে। ডালাটা উপরে তুলা আছে। হঠাৎ কবরের নামফলকের পাশে এক পরমা সুন্দরি অপরূপাকে দেখতে পেলাম। বাথরুমের আয়নায় প্রথম দর্শনে আলেস যে এক প্রস্থ কাপড় পড়েছিলো, ঠিক তেমনি একটা কাপড় পড়েছে মেয়েটি। আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা হেসে ওর একটা হাত নাড়লো। তারপর সেই হাতের মধ্যমাটা অন্য হাত দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে ফেললো। কি বিদঘুটে কান্ড। তারপর একটা রহস্যময় হাসি দিয়েই সে দৌড়ে চলে গেলো। ও চলে যেতেই মেঘ গুলি চাদকে ঢেকে দিলো। চারিদিক আবার অন্ধকার হয়ে এলো। অনুভব করলাম এ অন্ধকারেই এক জোড়া হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরছে।
নিজেকে আবারো কফিনের ভেতরই আবিষ্কার করলাম, প্রিস্টের সাথেই। ও আমার গলা চিপে ধরেছে। আমার মাথায় দ্রুত কিছু ভাবনা খেলে গেলো। আলেসের কাপড় পড়া সুব্দরী মেয়েটি মার্টিনী না হয়ে যেতেই পারেনা। ওরা জীবদ্দশায় বন্দিশালায় কাপড় শেয়ার করেছিলো। তাই ওদের অশরীরী দুটো একই কাপড়ে আবির্ভাব হয়। ও আমায় একটা বার্তা দিয়ে গেছে। প্রিস্টের বা হাতের মধ্যমায় পরা আংটিটাই ওকে আবার বাঁচিয়ে তুলেছে। ওটাই ওকে এতটা ক্ষমতাবান করেছে। ওর আংটি পরা মধ্যমাটা যদি ভেঙ্গে দিতে পারি তবেই আমার প্রাণ বাচবে। মেয়েগুলির আত্মাও মুক্তি পাবে।
ওর হাতের আঙুল গুলি আমার চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছিনা কোনটা সেই কাঙ্খিত আংটি পরা মধ্যমা। তবে হাতড়ে অনুমান করার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আমার আঙুলের ডগায় সেই আংটির স্পর্ষ পেলাম। শয়তানটা নীচে শুয়ে থেকে, দু হাতের আটটি আঙুল দিয়ে আমার ঘাড় চেপে ধরেছে। আর বুড়ো আঙুল দুটো দিয়ে সরাসরি শ্বাসনালীর উপর চাপ দিচ্ছে। আমার শ্বাস প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। ফুসফুসটা বাতাসের অভাবে যেকোন সময় ফেটে পড়বে। অক্সিজেনের অভাবে সারা শরীরে খিচুনি শুরু হয়েছে। হাত পা গুলি তিরতির করে কাঁপছে। এই সঙীন অবস্থায়, ঘাড়ে বসে যাওয়া ঐ আঙুলটাকে আমি কিছুতেই মুচড়ে ভাঙতে পারবো না।
মনেমনে বলতে চাইলাম দুঃখিত মার্টিনী, তোমার বার্তাটা আমি কাজে লাগাতে পারলাম না, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু গলা দিয়ে শুধুই গড়গড় শব্দ বেরুলো।
(চলবে)

আমার প্রিয় সব ভৌতিক মুভি(পর্ব-১)

3

শিরোনাম দেখেই বুঝতে পারছেন আমার এইবারের পোস্ট সেই সকল ভৌতিক মুভি নিয়ে যেগুলো আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। এই পোস্টটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট যেখানে প্রতি পর্বে আমি একটি করে হরর মুভি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বর্ননা, তার রিভিউ, আই এম ডি বি রেটিং নিয়ে আলোচনা করব।

দ্যা এক্সরসিস্ট

আমার ব্যক্তিগত হরর মুভির তালিকায় যে মুভিটি সর্ব প্রথম স্থানটি দখল করে আছে তা হচ্ছে উইলিয়াম ফ্রায়েড কিং পরিচালিত বিখ্যাত মুভি দ্যা এক্সরসিস্ট। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি শুধু দর্শক হৃদয় ই জয় করেনি, জয় করেছিল গোটা চলচ্চিত্র সমালোচকের হৃদয়। মুভিটিইর আই এম ডি বি রেটিং ৮.১; মোট দু-টি ক্যাটাগরিতে অস্কার সহ ছবিটি জিতে নিয়েছিলো মোট ২৯ টি পুরস্কার।

এই মুভিটি উইলিয়াম পিটার ব্ল্যাটি রচিত দ্যা এক্সরসিস্ট

    নামেরই একটি উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী করা হয়েছিল যেটি ১৯৪৯ সালে একজন আমেরিকান রোনাল্ড ডো এর সাথে ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রানিত ছিলো।

ছবির প্লট শুরু হয় উত্তর ইরাকে যেখানে প্রিস্ট এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ ফাদার মেরিন পূরাকীর্তি খনন করতে গিয়ে চিহ্ন সম্বলিতি একটি পাথর খন্ড পান যেই চিহ্নটি ছিলো পাযুযু নামের এক অপশক্তির যেটিকে তিনি বহু আগে পরাজিত করেছিলেন। পরে ফাদার মেরিন বুঝতে পারেন যে সেই শক্তি টি
প্রতিশোধ নিতে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে।

অন্যদিকে আমেরিকায় ওয়াশিংটন ডি সি তে আর একজন প্রিস্ট ফাদার ডেমিয়েন যিনি অনেক চেষ্টার পরও তার অসুস্থ মা’কে বাচাতে ব্যার্থ হয়ে ঈশ্বরে বিশ্বাস হারাণ।
এদিকে ক্রিস্টিন ম্যাকনিল নামক একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রি তার মেয়ে রিগান এর আকস্মিক অসুস্থতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পরেন যখন সকল ডাক্তার তার রোগ ধরতে ব্যর্থ হন। কিন্তু ম্যাকলিন বুঝতে পারেন যে তার মেয়ে কোনো অশুভ সত্ত্বা দ্বারা আক্রান্ত। তাই তিনি ফাদার ডেমিয়েন এর স্মরণাপন্ন হন। ফাদার ডেমিয়েন ফাদার মেরিনকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করলে ফাদার মেরিন বুঝতে পারেন যে এটি সেই পাযুযু যা প্রতিশোধ নিতে রিগানের দেহে আশ্রয় নিয়েছে। অবশেষে ফাদার মেরিন এবং ফাদার ডেমিয়েন একত্রিত হয়ে সেই ভয়ংকর অশুভ শক্তিকে দূর করার নিয়ম রীতি শুরু করেন যাকে এক্সরসিসম বলে এবং শেষ পর্যন্ত কি ঘটে তা দেখার জন্য সবাইকে অসাধারণ এই মুভি টি দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

ছবিটিতে অভিনয় করেছেন জ্যাসন মিলনার, লি জে কব, এলেন বার্স্টিন, লিন্ডা ব্লেয়ার এর মত অসাধারণ অভিনেতা অভিনেত্রী।

 

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [২য় অংশ]

1

 

সবাই বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী নাকি ঝাউদীঘির জল থেকে কয়েক শ মানুষ ভেসে উঠতে দেখেছিলেন। মানুষগুলির পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি; এক হাতেকোদাল, অন্য হাতে টুকরি।

বলেন কী!

হ্যাঁ। ইনামগড়ের লোকে বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী ঝাউদীঘি থেকে মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুরদের উঠে আসতে দেখেই মারা গেছেন।

কথাটা আমার কেন যেন ঠিক বিশ্বাস হল না। আমি ঠান্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবলাম।

(১) জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। হয়তো হার্ট অ্যাটাক করেছিল। সেই আমলের মানুষ আজকের দিনের মতো এত স্বাস্থসচেতন ছিল কি? আর ডাক্তারি বিদ্যের জোর তো তথইবচ

(২) ঝাউদীঘি থেকে মৃত শ্রমিকদের তো জীবিত উঠে আসার প্রশ্নই আসে না।

(৩) এ দেশের মানুষ ভীষন গল্পপ্রিয়। অনেকে আবার ভালো গল্প-বলিয়ে। স্টেশনমাস্টারটি সেরকমই গুণধর একজন মানুষ । নির্জন স্টেশনের নিঃসঙ্গ মানুষটি আমাকে দেখে গা ছমছমে গল্প ফেদেছেন, সমস্ত প্রতিভা উজার করে দিয়েছেন। গল্পবরং উপভোগ করাই ভালো। তর্ক করে লাভ নেই।
আমি গত তিরিশ বছর পেশাগত কাজে কতপুরনো বাড়িতে কাটিয়েছি। কই, কখনও তো কোনও অশুভ প্রেতাত্মা ভয়াল রূপ ধরে আমার সামনে এল না । বন্ধুরা আমাকে ডাকাবুকো বলে। পরলোকে অবিশ্বাসী বলেও আমার দুর্নামও আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, পরের বছর চৈত্র মাসের গোড়ায় মারা গেলেন জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ট পুত্র জমিদার দিব্যেন্দুপ্রকাশ রায়চৌধুরী। ওই একই ভাবে। গরমে ঘুম আসছিল না। মাঝরাতে অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ ঢলে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
ওহ্ ।
আপনাকে তখন একবার বলেছি সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধর ইন্ডিয়া চলে যায়। এখন নাকি রায়চৌধুরী পরিবারের অনেকেই বিলেতে থাকেন।
আচ্ছা।
স্টেশনের বাইরে খটাখট খটাখট ঘোড়া ক্ষুরের আওয়াজ পেলাম।
স্টেশনমাস্টার সচকিত হয়ে বললেন,আপনার লোক বুঝি এসে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাদিক সাহেব? অমন অশুভ জায়গায় আপনার না গেলে চলে না?
মৃদু হেসে বললাম, উপায় নেই। সরকারি কাজে এসেছি। বলে ভারী সুটকেশটা তুলে নিলাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, ঠিক আছে। অশুভ জায়গায় যখন যাচ্ছেন যান। কিন্ত বলে রাখি, আমি সারারাতই স্টেশনে আছি। তেমন কোনও বিপদ টের পেলেই ছুটে আসবেন ।
কথাটা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
কেয়ার টেকারের নাম ওসমান গাজী। বৃদ্ধই বলা যায় । তবে স্বাস্থ বেশ ভালো। এই বয়েসেও বেশ গাট্টাগোট্টা। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় নীল রঙের মখমলের টুপি। টুপির নীচে পিছনের দিকে চুল যা বেরিয়ে আছে তার সব পাকা। বসন্তের দাগ ভরতি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ফিরোজা রঙের সদরিয়া আর চোস্ত পাজামা পরে ছিল ওসমান গাজী । বৃদ্ধের হাঁটাচলার ভঙ্গি খুবই নিরীহ । কথাবার্তায়ও অত্যন্ত বিনয়ী।
ওসমান গাজী আমার সুটকেশটা ঘোড়াগাড়িতে তুলে দিল। ইনামগড়ের রাস্তায় যে আজও এই একুশ শতকের বাহনটি চলে সেটি জানতাম না। নিছক ছ্যাকড়া গাড়ি হলে না-হয় এক কথা ছিল, এ তো দেখছি রীতিমতো জমিদার আমলের আলিশান জুরীগাড়ি! ভিতরে সবজে রঙের গদিওয়ালা বসার আসন। ওপর থেকে ঝুলছে ছোট ছোট ঘন্টি লাগানো ঝালর। ছোট আয়নাও বসানো রয়েছে দেখলাম। বেশ উপভোগই করলাম উনিশ শতকী বাহনটা।
শালজঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পিচরাস্তা বেঁকে চলে গিয়েছে। শেষবেলায় উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে ছিল। সবে চৈত্রের শুরু। বনে অজস্র শুকনো পাতা। আচমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঘোড়াগাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিতেই একটা ময়ূর চোখে পড়ল । বেশ পুরনো আমলের আবহ। পথটা ধীরে ধীরে সরু হয়ে উঠেছে। দু’পাশে এখন ঘন লেবুবাগান। লেবুবাগানে আলোআধাঁরির খেলা আর কাক-পাখিদের অসহ্য কিচিরমিচির।
লেবুবাগানের মাঝখানে একটা টিনসেড। তারই সামনে ঘোড়াগাড়ি থামল। ঘোড়াগাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি। একতলা টিনসেডের সামনে একচিলতে বারান্দা। খাওয়ার টেবিল। কাঠের একটা বেঞ্চি। ওসমান গাজী বেঞ্চির ওপর আমার সুটকেশটা রেখেঅত্যন্ত বিনীত কন্ঠে বলল- সে এই টিনসেডেই থাকে। আমার থাকার ব্যবস্থাও নাকি সে ওখানেই করেছে।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম রান্নার জায়গা বাদেও ছোট ছোট দুটি ঘর। একটা ঘরের মেঝেতে কোদাল ও টুকরি দেখলাম। হয়তো ওগুলি বাগানে কাজ করার সময় ওসমান গাজীর কাজে লাগে।
লেবুবাগানের ভিতর ছোট্ট একটি পুরনো মন্দিরও চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম।বৌদ্ধদেবী তারার মন্দির। বাংলাদেশে এ ধরনের মন্দির রেয়ার। আমি ঝটপট আমার ক্যানন রিবেল এক্সএসটা বের করলাম। তারপর বিভিন্ন অ্যাঙেলে ছবি তুলে নিলাম।
তখনও যেহেতু দিনের আলো ছিল। আমি জমিদার বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখব ভাবলাম। অল্প একটু ঘুরে যা মনে হল আমার। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দিটা অন্তত ছয় একরের কম হবে না। মূল ভবনের ইমারতগুলি বেশ উঁচু উঁচু । দেখেই বুঝলাম উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।রায়চৌধুরীরা যে জৌলুসপূর্র্ণ জীবনযাপন করত তাও বোঝা গেল। এখন অবশ্য ইমারতগুলি – দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে যা হয়-ইঁদুর, চিকা, চামচিকা, চড়–ই পাখি আর কবুতর দখলে চলে গেছে।
প্রধান প্রবেশপথের বাম পাশে মূলভবনের এলাকার মধ্যেই খোলা জায়গায় একটি কৃষ্ণমন্দির। তারই ডান পাশে মূল ভবনের বহির্বাটি এবং প্রবেশপথ। তারপর বর্গাকার একটি চত্বর। পূর্ব দিকে চত্বরমুখী সমতল ছাদবিশিষ্ট আরও একটি মন্দির। মন্দিরের সামনের অলিন্দ এবং মন্দিরের ছাদটি রয়েছে চারটি স্তম্ভের উপর । মূল বাড়িটি তিনটি প্রধান মহলে বিন্যস্ত। আয়না মহল, রানী মহল এবং ঠাকুরবাড়ির মহল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দলদালানের ইট ক্ষয়ে গেছে।
একতলার কক্ষের দরজা-জানালাগুলিভেঙে পড়েছে । অনেক দরজায় আবার তালা। তালাগুলি ওসমান গাজী কে দিয়ে ভাঙাতে হবে। একতলার একটি কক্ষে বড় বড় ছ’-সাতটি সিন্দুক দেখলাম । সিন্দুকগুলি খুলে দেখতে হবে। ভিতরে যা আছে তার লিষ্ট করতে হবে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [শেষ অংশ]

0

 

অফিসঘর পেরিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। অফিঘরের আসবাবপত্র ভীষণ শব্দে ভেঙে ফেলছে। এক দৌড়ে সদর দরজা পেরিয়ে গেলাম। জঙ্গলের ভিতরে প্রাণপন দৌড়াচ্ছি। পিছনে দু’পাশের গাছে দুদ্দার শব্দে । যেন ভয়ানক ঝড় উঠেছে।
তারপর কখন যে তল্লা বাঁশের ঘন বন পেরিয়ে গুহার মুখে এসে পৌছলাম।তবে দৌড়ের গতি কমালাম না। একেবারে মঙ্গল ভট্টারক- এর সামনে এসে থামলাম। ভীষন হাঁপাচ্ছিলাম। মেঝের ওপর বসে পড়লাম। দরদর করে ঘামছিলাম সম্ভত। কান পাতলে নির্জন গুহায় আমার হৃৎস্পন্দন শোনা যাবে।
মঙ্গল ভট্টারক ধ্যানমগ্ন ছিলেন। এখন চোখ খুলে তাকালেন। তারপর প্রসন্নকন্ঠে বললেন, ভীত হইও বৎস। এক্ষণে তুমি নিরাপদ বলয়ে অবস্থান করিতেছ।
আমি কিছু বলতে গেলাম। মঙ্গল ভট্টারক হাত তুললেন। অর্থাৎ সব আমি জানি।
আমার ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল। মঙ্গলভট্টারক কীভাবে যেন টের পেলেন। আমার দিকে একটি কলো রঙের মাটির পাত্র এগিয়ে দিলেন। কি আছে পাত্রে? অত ভাববার সময় নেই। এক চুমুকে শেষ করলাম। মিষ্টি পানীয়।অপরিচিত স্বাদ। তবে মুহূর্তেই আমার সমস্ত শরীর জুড়িয়ে গেল।
গুহার বাইরে বজ্রপাতের প্রচন্ড শব্দ হল। আমি চমকে উঠলাম। মঙ্গল ভট্টারক বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন, বৎস, এক্ষণে আমি তোমার কৌতূহল মিটাইব। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।
আমি শুনতে লাগলাম।
মঙ্গল ভট্টারক বলতে লাগলেন-মানবজগতে আদিকাল হইতেই এক দূরাত্মা সম্প্রদায়ের যোগীগণ ডাকিনীবিদ্যা সাধনা করিত। পক্ষান্তরে পূণ্যাত্মা সম্প্রদায়ের যোগীগণ চৈতন্যময়ী সত্তার সাধনা করিত। যোগীগণ আপন আপন স্বভাব বশত ডাকিনীবিদ্যা কিংবা চৈতন্যময়ী সত্তার সাধনা করিত। তবে আদিকাল হইতেই চৈতন্যময়ী সত্তার সাধকগণ মহেশ্বরের আর্শীবাদ লাভ করিয়া আসিতেছেন। গোপনে ডাকিনীবিদ্যার সাধনা করে এইরূপ দূরাত্মা যোগী কামাখ্যা শক্তিপীঠে দূলর্ভ নয়। প্রাচীন নিগূঢ়শাস্ত্রে লিখিত আছে যে- ডাকিনীবিদ্যার সাধনা সার্থক হইলে কিংবা ব্যর্থকাম হইলে জগতে ঘোর তমসা নামিয়া আসে। তেমনই এক ডাকিনীবিদ্যার সাধক হইলদূরাত্মা জগন্ধর।
দূরাত্মা জগন্ধর? আমি জিজ্ঞেস করি।
হাঁ। দূরাত্মা জগন্ধর। প্রাগজ্যোতিষপুর নিবাসী দূরাত্মা জগন্ধর স্বভাবে খল, ধূর্ত এবং প্রতারক। তাহার গুরু ছিল কামাখ্যা মন্দিদের ঋষি সত্যবর্মন। হা, ঋষি সত্যবর্মনকে আমরা সত্যদ্রষ্ট্রা ঋষি জ্ঞান করিতাম। তিনি অতি উচ্চস্তরের যোগী ছিলেন। ঋষি সত্যবর্মন চৈতন্যময়ী সত্তার সাধক হইলেও ডাকিনীবিদ্যার সম্বন্ধে গভীর বুৎপত্তি অর্জন করিয়াছিলেন। সত্যবর্মন বৃদ্ধ হইয়াছিল। যুবা বয়েসে জগন্ধর ঋষি সত্যবর্মন- এর নিকট হইতে ডাকিনীবিদ্যার গূহ্যজ্ঞান কৌশলে আত্বসাৎ করে এবং সত্যবর্মন কে হত্যা করে। ইহার পর জগন্ধর কামরূপ হইতে আসামের গভীর অরণ্যে পালাইয়া যায় এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে ডাকিনীবিদ্যা সাধনা করিতে থাকে ।কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধনঞ্জয় জগন্ধর- এর উপর অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া উঠিলেন। জগন্ধর এর সাধনা চরিতার্থ হইলে জগতে অশেষ অকল্যাণ সাধিত হইবে এই ভাবিয়া তিনি জগন্ধর কে হত্যার সিদ্ধান্ত লন। এই উদ্দেশ্যে কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধনঞ্জয় অষ্টাদশ সন্ন্যাসীকে মন্ত্রপূত ত্রিশূল প্রদান করিয়া জগন্ধর হত্যার দায়িত্ব অর্পন করে। আমি হইলাম অষ্টাদশ সন্ন্যাসীর একজন।
আমি চমকে উঠে বললাম, আপনি?
হাঁ। আমি। আমি ধ্যানযোগে জগন্ধর- এর অবস্থান জানিতে পারি। জঙ্গলবাড়ির পিছনে ছাঁচি বেতের ঘোর অরণ্যের পশ্চাতে যে পার্বত্যটিলা রহিয়াছে তাহারই এক নিভৃত গুহায় বসিয়া দূরাত্মা জগন্ধর সাধনা করিত।
আশ্চর্য!
ঋষি সত্যবর্মন-এর অভিশাপে জগন্ধর ডাকিনীবিদ্যায় সিদ্ধি লাভ করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। জগন্ধর এখন মূর্তিমান ডাকিনী হইয়া উঠিয়াছে। সে স্ত্রীলোকের মূর্তি ধরিয়া তরুণ যুবকের রক্ত পান। স্ত্রীলোকের মূর্তি করিতে জগন্ধর তোমার স্ত্রীর উপর ভর করিয়াছে।
আমি শিউরে উঠলাম। মনে পড়ল আজ জ্বরথেকে উঠে রামুর দিকে অদ্ভূত দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল পিয়ালী। তারপর রান্নাঘরে রামুর রক্ত খাচ্ছিল।
গুহামুখে ঝড় আর বজ্রপাতের শব্দ ততক্ষণে থেমে গেছে। এবার ক্রদ্ধ বাঘের রাগী গর্জন শোনা গেল। মঙ্গল ভট্টারক সেদিকে একবার তাকালেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। মঙ্গল ভট্টারক আমাকে অভিভূত করে চোখের নিমিষে জটাধারী শিবমূতি ধারণ করলেন। ডানহাতে চকচকে ত্রিশূল। বিদ্যুৎগতিতে ‘রে’ ‘রে’ শব্দে ভয়ঙ্কর চিৎকার করে ত্রিশূল উঁচিয়ে গুহামুখের দিকে ছুটে গেলেন মঙ্গল ভট্টারক । আমিও পিছন পিছন ছুটলাম। গুহামুখে ঝলমলে রোদ। সেই রোদের আলোয় একটা বিশালকায় ডোরাকাটা প্রাণি দেখতে পেলাম । অনেকটা বাঘের মতন দেখতে। তবে আকারে অনেক বড়। প্রায় হাতির সমান। প্রাণিটা মঙ্গল ভট্টারক- এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তার আগেই ক্ষিপ্র গতিদে প্রাণিটাকে লক্ষ করে সুতীক্ষ্ম ত্রিশূল ছুঁড়ে মারলেন মঙ্গল ভট্টারক। ত্রিশূল হলদে ডোরাকাটা প্রাণির দেহে বিদ্ধ হল। মর্মদন্ত চিৎকারে গুহা কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল বনভূমি। প্রাণিটা সশব্দে আছড়ে পড়ল। তারপরই চারধার ঘন ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমি কটূ গন্ধ পেলাম । একটু পর ধোয়া সরে গেলেমঙ্গল ভট্টারক কিংবা কোনও বিশালকায় ডোরাকাটা প্রাণির প্রাণহীন দেহ দেখতে পেলাম না।
দ্রুত জঙ্গলবাড়িতে ফিরে এলাম। রামুর লাশটা তখনও একতলার রান্নাঘরে পড়েছিল। আমার কান্না পেল। কিন্তু, পিয়ালী কে পেলাম না।বুকটা ভীষণ কাঁপছে। দ্রুত দোতলায়উঠে এলাম। পিয়ালী বিছানার ওপর শুয়ে ছিল। ভঙিটা বিধস্ত। যেন অনেক ঝড় বয়ে গেছে। শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। শ্যামলা মুখটা কেমন ফ্যাকাশে। ফিসফিস করে বলল, আমার কি হয়েছে?
ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, কিছু হয়নি।
পিয়ালীর চিকিৎসা দরকার। দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। তারপর আমি আর পিয়ালী নীচে নেমে এলাম। অরুকে দেখলাম সদর দরজার কাছে ।
রুস্তমের পিঠে চড়ে থানচি রওনা হলাম। থানচি পৌছে রামুর লাশ সৎকারের জন্য অরুকে টাকা দেব। আজ রাতটা থানচির রেস্টহাউজে থাকব। কাল সকালে বান্দারবানের বাস ধরব।
এই জীবনে আর জঙ্গলমুখো হচ্ছি না।
টেকনাফ শহরে বাপদাদার ভিটেয় পিয়ালীকে নিয়ে সুখের ঘর বাঁধব

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [৩য় অংশ]

0

জঙ্গলবাড়ি পৌছতে-পৌছতে আমার নববধূকে দূর্গমপথের যে ধকল সইতে হল তা জঙ্গলের আদিম সৌন্দর্য দেখে পুষিয়ে নিল মনে হয়।মুগ্ধ হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। জঙ্গলবাড়ি দেখেও পিয়ালী মুগ্ধ হল।আমিও পিয়ালীর স্নিগ্ধ-মধুর সান্নিধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম।তাছাড়া পিয়ালীর রান্নার হাত চমৎকার। ঠিক আমার মায়ের হাতের রান্নার মত।স্থানীয় আদিবাসী রান্না আমার ভালো লাগে।তবে সব সময় না। রামুর রান্নায় রয়েছে আদিবাসী ছেঁওয়া। তা ছাড়া পিয়ালী ফল-ফুল গাছ পছন্দ করে।নাগেশ্বর গাছের ফুল দিয়ে মিষ্টি পারফিউম তৈরি করে আমায় তাক লাগিয়ে দিল। তবে পিয়ালী কথা কম বলে।অবশ্য হাতির পিঠে চড়ে বেড়ানোর সময় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
যেমনটা আশঙ্কা করেছিলাম। সেটা অমূলক করে দিয়ে রামুর সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে নিল পিয়ালী। এই সমঝোতার ভিত্তি হয়ে উঠল রান্না। পিয়ালী রামুর কাছে আদিবাসী রান্না শিখছে, আর রামু পিয়ালীর কাছে শিখছে বাঙালি রান্না ।নির্জন অরণ্যে আমার সংসার গভীর সুখশান্তিতে ভরে উঠেছে। এই অভাবনীয় সুখশান্তির জন্য সর্বশক্তিমানের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা জানালাম।তবে সে সুখ যেন মঙ্গল ভট্টারক- এর অশুভ ভবিষ্যৎবাণী সত্য করে দিতেই বেশি দিন রইল না।
একদিন সকালবেলা। দোতলার পিছনের দিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।ভাদ্র মাস। আকাশের রং গভীর নীল।শুভ্র মেঘখন্ড ভেসে বেড়াচ্ছিল।নীল আকাশের নীচে বনতলে শরতের ঝরঝরে সাদা রোদ ছড়িয়ে ছিল। কাঞ্জল গাছে ফুল ফুটেছে। কাঞ্জল ফুলের রং হলদে সবুজ। মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম। ছাঁচি বেতে জঙ্গলটা রোদের বন্যায় ভেসে যাচ্ছিল। বিসোয়াল ঝোঁপের ওপর উড়ে এসে বসল একটা সবজে ধূসর রঙের পাহাড়ি তিতির। লতানে বিসোয়াল ঝোঁপের পাশেই একটা চিকড়াসী গাছে। তার তলায় রুস্তম দাঁড়িয়ে। চিকড়াসী গাছের পাশেই অরু-র চালাঘর।
পায়েলী আমার পাশে এসে দাঁড়াল। নীল রঙের শাড়ি পরেছিল। সাদা ব্লাউজ। গোছল সেরে এসেছে।ছড়ানো চুল ভিজে। লাক্স সাবানের গন্ধ পাচ্ছিলাম। পায়েলীকে কি সুন্দর যে লাগছিল। সাধারণ এই সময়ে আমি পিয়ালীর চুলে মুখ গুঁজে গন্ধ নিই। আজ ওর ভিজে চুলের গন্ধ নিতে যাব- হাত তুলে রোদ ঝলমলে ছাঁচি বেতে জঙ্গলটা দেখিয়ে পিয়ালী বলল, ওই জায়গাটা ভালো না।
আমি অবাক হলাম। বিস্ময়ের ধাক্কায়কাটিয়ে উঠে বললাম, জায়গাটা ভালো না মানে?
রুক্ষ কন্ঠে পিয়ালী বলল, আমি অত মানে-টানে জানি না। আমার মনে হয় তাই বললাম। আশ্চর্য! পিয়ালীর এত মধুর স্বভাব। কখনও মাথাব্যথা হলেও আমার সঙ্গে হেসে কথা বলে। আজকি হল ওর?
যাগ গে। আমার অত ভাবার সময় নেই এখন। জরুরি কাজে আমাকে বাইরে বেরুতে হবে।
তবে আমার যাওয়া হল না। কেননা ক্ষানিক বাদে পিয়ালীর ভীষণ জ্বর এল। জ্বর ধাপে ধাপে বাড়তে লাগল। আমি চিন্তিত হয়ে উঠলাম। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন এইসব বিরান জঙ্গলে অসুখ- বিসুখ হলেই সর্বনাশ। সহজে ডাক্তার-বৈদ্য পাওয়া যায় না। তবে সব সময় হাতের কাছে কিছু জরুরি অষুধ রাখি। রামু -অরুরা দেখিছি অসুস্থ হলে কীসব পাহাড়ি লতাপাতা চিবিয়ে খায়। দিব্যি সেরেও ওঠে। আমার আবার ওসব জঙ্গুলে ট্রিটমেন্টে বিশ্বাস কম।
পিয়ালীকে দুটো প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলাম। ঠিক করলাম বিকেলের মধ্যে জ্বর না সারলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করব। আমি ভারি উদ্বিগ্ন বোধ করলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। রামু পিয়ালীরমাথার কাছে বসে জলপট্টি দিচ্ছে। রামুর মুখ কালো। আমার দেরি অরুও দোতলায় উঠে এসেছে। দরজার কাছে মাটিতে বসে আছে।
আশ্চর্য! ঘন্টা খানেকের মধ্যে পিয়ালীর জ্বর একেবারে সেরে গেল। তবে পিয়ালীর কথাবার্তা আর আচরণ কেমন বদলে গেছে বলে মনে হল। চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। ভাবলাম জ্বরের জন্য এমন উদভ্রান্ত দেখাচ্ছে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। রামুর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল পিয়ালী। এই তাকানোটা আমার কাছে অসহ্য ঠেকল । আজ আমার এক উর্ধ্বতন ফরেষ্ট অফিসারের সঙ্গে জরুরি মিটিং ছিল।পিয়ালীকে রামুর জিম্মায় রেখে নীচে নেমে এলাম।
মিটিং সেরে জঙ্গলবাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়াল।
দূর থেকে দেখলাম সদর দরজা হা করে খোলা। কি ব্যাপার? হাতির পিঠ থেকে নামার সময় রামুর ওপর রাগ হল আমার। কতবার ওকে বলেছি সদর দরজা বন্ধ রাখতে। নইলে বুনো শুয়োর ঢুকে পড়তে পারে। সময় কাটানোর জন্য শখ করে শশা আর কলাচাষ শুরু করেছি। বুনো শুয়োরের দল মিছেমিছিশশা আর কলার চারাগুলো উপড়ে ফেলবে।
অরু আমায় সদর দরজার কাছে নামিয়ে দিল। তারপর রুস্তমকে গোছল করাতে ঝর্নার দিকে চলে গেল ।
পিয়ালীর আবার জ্বর আসেনি তে। ভাবতে ভাবতে আমি চাতাল পেরিয়ে একতলার বারান্দায় উঠে এলাম। বারান্দার ওপাশে ঘরটাই অফিসঘর। অফিসঘরে একটা সিন্ধুক, আলমারী আর চেয়ার- টেবিল আছে। অফিসঘর পেরোলে ছোট একটা করিডোর। করিডোরের শেষ মাথায় সিঁড়ি। সিঁড়ির বাঁ পাশে রান্নাঘর। রামুর এখন রান্নাঘরেই থাকার কথা।
রান্নাঘরে ঢুকতে যাব-সামলে নিলাম। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভয়ানক চমকে উঠলাম। রান্নাঘরের বড় জানালা দিয়ে রোদ ঢুকেছে । মেঝের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে রামু । পিয়ালী রামুর ঘাড়ের কাছে উবু হয়ে বসে আছে। আমার মাথায়রক্ত চড়ে গেল। এ কী! পিয়ালী রামুর ঘাড়ের কাছে উবু হয়ে বসে কি করছে? পিয়ালী কি করছে প্রথমে বুঝতে পারি নি।বুঝতে পারার পর আমার মাথা বো করে চক্কর দিয়ে উঠল। আমি ভীষণ শিউরে উঠলাম।কিন্তু … কিন্তু পিয়ালী … রামুর ঘাড় কামড়ে আছে কেন?রক্ত খাচ্ছে কি? তাই তো মনে হল।কিন্তু …কিন্তু পিয়ালী রামুর রক্ত খাচ্ছে কেন?কিছুই তো বুঝতে পারছি না।ভাবতেও পারছি না।পিয়ালী হঠাৎ মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল।ওর ঠোটের কিনার থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছিল। চোখের দৃষ্টিতে আদিম হিংস্রতা। কাঁধের দু’পাশে চুল অবিন্যস্ত। আমাকে দেখে পিয়ালী হাসল। কী কুৎসিত হাসি!আমার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল।যেন জঙ্গলবাড়িতে ভূমিকম্প হচ্ছে।
অবচেতন মনে টের পেলাম আমার পালানো উচিত।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। করিডোরে দৌড়াচ্ছি।পা দুটো অবশ মনে হল।মাথার ভিতরে শীতল হিমস্রোত বইছে।পিছনে মনে হল পিছনে কিছু ভয়ঙ্কর শব্দে বিস্ফোরিত হল।রান্নাঘরের দরজা ভেঙে গেছে মনে হল।অবশ্য আমিপিছনে ফিরে তাকালাম না। যে করেই হোক মঙ্গল ভট্টারক এর গুহায় পৌছতে হবে।কিন্তু … কিন্তু তিনি কি এখনও গুহায় আছেন ?

চলবে

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুড়ো হুজুর

1

এখন যে ঘটনাটি আমি আপনাদের কাছে শেয়ার করছি সেটি আমাদের নিজ গ্রামের ঘটনা।

গভীর রাত। চারপাশে শুধু সুনসান নিরবতা। কোথাও কোন জন-মানুষের সাড়া শব্দ নেই। আর ঠিক সে সময় শোনা গেল ঘোড়া খুরের সেই টগবগ টগবগ আওয়াজ। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে ঘোড়ায় চড়ে কেউ একজন গ্রামে এসেছে। কিন্তু এতো রাতে কে আসে কেউ তা বুঝতে পারতো না। কিন্তু এক সময় গ্রামের কিছু মানুষ তাকে দেখতে পায়। দেখে লম্বা জুব্বা পড়া মাথায় কালো পাগড়ি বাঁধা আর মুখে লম্বা দাড়িওয়ালা তিনজন লোক। আসে ধূসর রঙ্গের একটি ঘোড়ায় চরে। তখন মানুষের মাঝে পশ্ন জাগে কে তিনি আর কেনই বা এই গভীর রাতে এই গ্রামে আসে। তাকে দেখা যেতো প্রতি বৃহস্পতি বার গভীর রাতে। এবং তাকে দেখেছে এমন লোকের সংখ্যা আমাদের গ্রামে ৫০ এর উপরে হবে। এর মধ্যে আমার কয়েকজন নিকট আত্মীয় ও আছে। আর এমন দুজন অত্মীয়র মুখ থেকে শুনা কথা আপনাদের কাছে শেয়ার করছি।

প্রথম:- আজ থেকে ১৫ বছর আগের কথা। আমার এক বড় ভাই ছিল নাম তার কাশেম। আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তার পাশের ছিলো ছোট্ট একটি কাছারি ঘর। আর সেই ঘরে আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে থাকতো কাশেম ভাই। একদিন গভীর রাতে তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাহিরে গেলেন। রাস্তার ধারে থাকা একটি নারিকেল গাছের পাশে বসে তিনি প্রসাব করতে লাগেন। ঠিক এমন সময় তিনি খেয়াল করেন দূর থেকে ঘোড়ার টগবগ টগবগ আওয়াজ তার কানে ভেসে আসছে। তিনি তখন রাস্তার উপর দাড়িয়ে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এমন সময় লক্ষ্য করলেন ঘোড়ায় চড়ে কেউ একজন এদিকে আসছে। তিনি তখন আবার চুপ করে নারিকেল গাছের পাশে গিয়ে বসে থাকলেন। এক সময় লোকটি ঘোড়ায় চড়ে তার সামনে দিয়ে চলে গেল। পরে তিনি দ্রুত ঘরে চলে আসলেন।সেদিন রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন কেউ একজন তাকে বলছে এই ঘটনা কাউকে না বলার জন্য।কিন্তু পরদিন সকালে এই ঘটনা তিনি সবাইকে বলেন।
দ্বিতীয়:- ২০০৬ সালের ঘটনা। আমাদের গ্রামের এক ছেলে নাম সাহিদ। প্রায় সময় সে গ্রামের দোকানে ক্যারাম খেলে রাত করে বাড়িতে ফিরতো। একদিন চাঁদনী প্রসর গভীর রাতে দোকান থেকে বাড়িতে যাওয়ার পথে সে লক্ষ্য করে মসজিদের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খাম্বাটির মধ্যে একটি ঘোড়া বাঁধা আছে। এতো রাতে এখানে ঘোড়াটিকে বাঁধা দেখে সে কিছুটা অবাক হলেন। মসজিদের একপাশে একটি জানালা খোলা ছিলো। সে তখন সাহস করে মসজিদের ভেতর কি আছে দেখতে চাইলো। দেখে মসজিদের ভেতর সাদা জুব্বা পড়া একজন লোক নামাজ পড়ছে। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ও তাকে স্পর্শ দেখা যাচ্ছে। আর চারদিকটা যেন আলোয় ভরে আছে। যা দেখে সে ভয় পেয়ে গেলো। সে তখন কোন শব্দ না করে জানালার পাশ থেকে এসে বাড়ির দিকে রওনা হল। কিছু দূর যাওয়ার পরে সে পিছনের দিকে তাকালেন। দেখে তার থেকে একটু দূরে জুব্বা পড়া সে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে। সে তখন ভয়ে দৌড় দিয়ে বাড়িতে চলে আসে। তাকে ও রাতে স্বপ্ন দেখালো এই ঘটনা কাউকে না বলতে। কিন্তু সকালে এই ঘটনা সে সবাইকে বলে দেয়।

তবে অবশ্যই গত পাঁচ বছর ধরে কেউ তাকে দেখেছে এমন কথা শুনা যায়নি।

[বি:দ্র:-আজ থেক বহু বছর আগে আমাদের গ্রামে বুড় হুজুর নামের একজন বুজুর্গ আলেম ছিলো। গ্রামে সবাই তাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। আর লোকের মুখে শুনা যায় বুড় হুজুরের সাথে ছিল নুরুল ইসলাম নামের এক জ্বীন। বুড় হুজুর যেদিন মারা যায় সেদিন ছিলো বৃহস্পতি বার দিবাগত রাতে আর তাকে দাপন করা হয় মসজিদের পাশে। এখন তার কবরের উপর উঠেছে মস্ত বড় এক আম গাছ। কেউ ঐ আম গাছের উপর উঠেনা। গ্রামের মানুষের ধারনা ঘোড়ায় চড়ে আসা লোকটি বুড় হুজুর হবে। তবে ভিন্ন মত ও আছে কারো মতে উনি হল বুড় হুজুরের সে জ্বীনটি। যে কিনা আজো বেঁচে আছে পৃথিবীর মাঝে।]

By Shohag Dewan.

শবসাধকের কাল্ট – ১ম পর্ব

0

জ্যোস্নার আবছা আলোয় দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক (নাকি শব?) বেরিয়ে এল। আশ্চর্য! কে লোকটা? এতরাতে কি করছিল মর্গে?এখন প্রায় শেষরাত। জানলার পাশে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম। অনেক দূরে কুকুর ডাকছিল। হঠাৎ মর্গের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। ভালো করে লোকটাকে দেখাও গেল না। চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল কলাঝোপের আড়ালে। চোখের ভুল? লাশকাটা ঘরটা অবশ্য বেশ দূরে। চারতলা সরকারি কোয়ার্টারের জানালার পাশ থেকে দেখছি। রাতজাগার ফলে হয়তো আমি চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখছি। বছর খানেক ধরে ইনসমনিয়ায় ভুগছি। রাতে ভালো ঘুমও হয় না। বই পড়ে, মুভি দেখে, ঘরে পায়চারী করে কিংবা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে, সিগারেট টেনে রাত কাটে। আবছা অন্ধকারে টেবিলের কাছে এলাম। এলজিটা তুলে দেখলাম: দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। ইশতিয়াক বিছানার ওপর হাত পা ছড়িয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে। ঘরে বেনসনের গন্ধ ভাসছিল। শালা চেইন স্মোকার। আজই ঢাকা থেকে এসেছে। কালই চলে যাবে। ইশতিয়াক আমার ছেলেবেলার বন্ধু। চারুকলা থেকে পাস করেছে। খুবই আমুদে আর অস্থির। চাকরি- বাকরিতে মন বসে না। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। মুভি পাগল। আমার জন্য ৬/৭টা ডিভিডি এনেছে। আজ রাত জেগে ল্যাপটপে একটা মুভি দেখছিলাম। নেকক্রোমানটি। পুরনো দিনের জার্মান হরর ছবি।শসম্ভোগ বা নেক্রোফিলিয়ার ব্যাপারটার জন্য ছবিটা বিতর্কিত। যদিও‘কাল্ট ফিলিম’- এর মর্যাদা পেয়েছে নেকক্রোমানটি। আমি নির্জনতাপ্রিয় মুখচোরা মানুষ। ডাক্তারি করি জেলা সদরে সরকারি হাসপাতালে। নির্জন এই শহরটাও আমার বেশ ভালো লেগে। বড়োখেবড়ো হলেও ছিমছাম নির্জন পথঘাট। ঘুমন্ত দোকানপাট, ঘরবাড়ি। লাল রঙের নিঝঝুম রেলস্টেশন। শীতল সর্পিল রেললাইন। হলুদ-হলুদ সরকারি কোয়ার্টারস। প্রাচীন মন্দির। অ-দূষিত বাতাস।…মর্গটা আমার কোয়ার্টারের পিছনেই। হাসপাতালে আসতে যেতে চোখে পড়ে। একতলা হলুদ দালান। সামনে বড় সিমেন্ট বাঁধানো একটি চাতাল। চারপাশে ঘন গাছপালা। পচা পাতাভরা পুকুর। শ্যাওলাধরা দেয়াল। নাড়িকেল গাছ। তারপর রেললাইন। নিরিবিলি এই মফস্বল শহরে দিনগুলি বেশ কেটে যাচ্ছে। রোজ দু’বেলা হাসপাতালে যাই, রোগী দেখি। ধৈর্যশীল চিকিৎসক হিসেবে সামান্য নামও ছড়িয়েছে। স্থানীয় লোকজন শ্রদ্ধভক্তি করে। মাঝেমধ্যে ইশতিয়াক-এর মতন দু- একজন বন্ধুও আসে বেড়াতে। দু- একদিন থেকে চলে যায়। আমার একজন পিয়ন আছে। নাম মুখতার। মধ্যবয়েসি লোক। মিশমিশে কালো থলথলে শরীর। মুখতারকে শার্ট- প্যান্টে একেবারেই মানায় না। মাথাটা মুড়িয়ে রাখে। মাথার তালুও কালো। সেই কালো তালুর মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল। কানে ছোট্ট একটা পিতলের রিং। মুখতার সন্ন্যাস নিয়েছে কিনা বোঝা গেল না। কথা কম বলে। তবে কথাবার্তায় অনেকবারই অসংলগ্নতা টের পেয়েছি। তবে মুখতার-এর রান্নার হাত ভালো। আর বেশ বিশ্বস্ত। রাতে অবশ্য চোখ লাল থাকে তার । নেশাটেশা করে মনে হল। বাজার সদাই মুখতারই করে। মাছমাংস খায় না দেখি। মুখতার মনে হয় গৃহীসন্ন্যাসী। সকালবেলা ইশতিয়াক কে বিদায় দিতে রেলস্টেশনে এসেছি। ইশতিয়াক বেশ রোম্যান্টিক জীবন কাটাচ্ছে। ট্রেন পেলে বাসে চড়বে না। ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে রেলস্টেশন বাইরে চলে এসেছি। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। দেখলাম একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে জিন্নাত আলী দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখেই সালাম দিল। লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সে। থাকে পিছনের রেলওয়ে কলোনিতে । জিন্নাত আলী বিপত্নীক। একটি মেয়ে বাবার সংসারে থাকে । মধ্যবয়েসি মেয়ের নাম মুমতাজ। মুমতাজ রক্তশূন্যতায় ভুগছিল। মাস কয়েক আগে অবস্থা কাহিল হলে ওরই ট্রিটমেন্ট করতে গিয়েছিলাম। আমি সাধারণত স্থানীয় গরিব লোকদের কাছ থেকে ফি- টি নিইনা। জিন্নাত আলী সেটা মন
ে রেখেছে। মাঝেমধ্যে দেখা হলে সালাম দেয়। জিন্নাত আলী বলল, রিকশা নিবেন স্যার? ডাইকা দিমু? না, না। আমি হেঁটেই যাব। বিসটি ছার। অসুবিধে নেই। বলে হাঁটতে থাকি। স্টেশন থেকে আমার কোয়ার্টারটা কাছেই। বড় রাস্তায় খানিক হেঁটে বাঁয়ে মোড় নিলে কালিবাড়ির গলি। সে গলি পেরিয়ে মর্গের পিছন দিয়ে মিনিট দশকের পথ । কালিবাড়ির গলিটা বেশ সরু। গলিতে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ঝিরঝির বৃষ্টিটা থেমে রোদ উঠল। গলির বাঁ পাশে একটা কালো রঙের লোহার গেইটের সামনে দেখলাম গফুর আসকারী সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোক আমার মোটামুটি পরিচিত। ধ্যাপক। এখন অবশ্য রিটায়ার করেছেন। লোকটা বেশ অদ্ভূত। বয়স ষাটের কাছাকাছি।মাথায় টাক-টাক নেই; একমাথা ধবধবে চুল। চোখে পুরু লেন্সের কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচ বেশ ধূসর। বৃদ্ধ বেশ লম্বা আর ফরসা। স্বাস্থও ভালো। তবে মুখ কেমন ফ্যাকাশে। অ্যানিমিক মনে হয়। ভদ্রলোক আমাকে দেখে কেন যেন গেইটের ভিতরে ঢুকে যেতে চাইলেন। তার আগেই আমি সালাম দিয়ে বললাম, কেমন আছেন? গফুর আসকারী মুহূর্তেই ভোল পালটে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললেন, আরে ইয়াংম্যান যে। খবর কী? ভালো । বললাম। বলে হাসলাম। গফুর আসকারী গেইটটা খুলে বললেন, এসো এসো। বাসায় এসো। এক কাপ চা খেয়ে যও। গেইটের ওধারে ছোট্ট শ্রীহীন বাগান। বাগান মানে পেঁপে, শুপারি আর এঁটে কলার অযত্ন লালিত ঝোপ। গফুর আসকারী বিপত্নীক এবং নিঃসন্তান। দেখাশোনার জন্য আবদুর রহমান নামে একটা লোক আছে। মাস ঝয়েক আগে তারই অসুখ হয়েছিল। আমিই তখন টিট্রমেন্ট করেছিলাম। তখনই গফুর আসকারীর সঙ্গে পরিচয়। কলাঝোপের মাঝখান দিয়ে সরু পথ। তারপর একতলা লালটালির ছাদের বাংলোবাড়ি। ছোট্ট লাল মেঝের বারান্দা। বসার ঘরে সোফা কিংবা আসবাবপত্রের বদলে শ্রীহীন কাঠের তিনটে চেয়ার আর চার- পাঁচটা আলমারী। আলমারী ভর্তি বাংলা- ইংরেজি বই। গফুর আসকারী অধ্যাপনা করেছেন দর্শনশাস্ত্রে । বইয়ের এরকম কালেকশন থাকাই স্বাভাবিক। গফুর আসকারী বললেন, তুমি ঐ চেয়ারে বস। আমি একটা চেয়ারে বসতে যাব গফুর আসকারী বললেন, না, না। ডানপাশেরটায় বস । হ্যাঁ। ঠিক আছে। বস। আমি চা করে আনি। হাসি চেপে বৃদ্ধের দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম, চা আপনি বানাবেন? কেন?আবদুর রহমান কি বাসায় নাই? বৃদ্ধ বললেন, আর বলো না ডাক্তার। দেশে যাব বলে দু’দিনের ছুটি নিয়ে ছেলেটা সেই যে গেল। প্রায় দু সপ্তাহ হল-এখনও ফিরে এল না। দেখ দেকি কী কান্ড। বৃদ্ধের ফরসা মুখে অবশ্য বিরক্তির কোনও চিহ্ন দেখতে পেলাম না। ফিরে এল না? আশ্চর্য! কেন? কি ভাবে বলি বল? যাক, সে ছেলে চুলায় যাক। তুমি বস। চলে যেও না। আমি এখুনি চা তৈরি করে নিয়ে আসি। বৃদ্ধ ভিতরে চলে গেলেন। বসার ঘরে ঢুকেই কেমন পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম। ইঁদুর বিড়াল মরে পচে গেলে যে রকম গন্ধ ছড়ায়। ঠিক সেই রকম। গন্ধের উৎস বোঝা গেল না। বাগানে কিছু মরে পড়ে থাকতে পারে। বুড়োর খেয়াল নেই। ছন্নছাড়া লোকের ছন্নছাড়া সংসার। বইয়ের আলমারীতে একটা বইয়ের ওপর চোখ আটকে গেল। গ্যাবরিয়েলি উইটকপ-এর দি নেকক্রোফিলিয়াক ; একেই বলে কোইন্সিডেন্স। গতরাত্রেই নেকক্রোমানটি ছবিটা দেখছিলাম। শবদেহের প্রতি এক ধরনের যৌন আকর্ষনকে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় বলা হয়নেকক্রোফিলিয়া । এই যৌন আকর্ষনকে আমেরিকান সাইক্রিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন- এর ডাগায়নোস্টিক অ্যান্ড স্ট্রাটেস্টিটিকাল ম্যানুয়ালপ্যারাফিলিয়া বর্গের অন্তর্ভূক্ত করেছে। প্যারাফিলিয়া শব্দটি গ্রিক । এর অর্থ প্রেম। তবে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় শব্দটির মানে স্বাভাবিক উপায়ের বদলে অস্বাভাবিক বিষয়ে বা পরিস্থিতিতে যৌনবোধ জাগ্রত হওয়া। এতে ব্যক্তির আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে । মনে পড়ল কাল অনেক রাতে দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল।শবদেহের প্রতি এক ধরনের য
ৌন আকর্ষনকে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় বলা হয় নেকক্রোফিলিয়া । কেউ লাশকাটা ঘরে ওই কাজটা করে না তো? অবশ্য এমনটা ভাবার কোনওই কারণ নেই। গফুর আসকারী এক কাপ চা নিয়ে ফিরলেন। কাপ নিতে বললাম, আপনার চা কই? লাজুককন্ঠে বৃদ্ধ বললেন, চা আমি রান্নাঘরে বসেই খেয়ে এসেছি। বলেই ধপ করে কাঠের চেয়ারের ওপর বসলেন। অরেকটু হলেই উলটে পড়তেন। আগেই লক্ষ্য করেছি গফুর আসকারী বেশ মজার মানুষ । লেবু চা । চুমুক দিয়ে বোঝা গেল চিনির বদলে গুড় দিয়েছেন। আরও বোঝা গেল দর্শনের এই অধ্যাপকটি বেশ উদ্ভট আর উৎকেন্দ্রীক মানুষ। বৃদ্ধকে দেখে বরাবারই আমার বেশ খানিকটা খাপছাড়া আর উদভ্রান্ত মনে হয়েছে। চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, কাল রাত্রে অদ্ভূত এক দৃশ্য দেখলাম। কি বল তো শুনি? বৃদ্ধ ঝুঁকে পড়লেন। দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল।তখন অনেক রাত। এই ধরুন শেষ রাত। হুমম। তো? গফুর আসকারী সাহেব স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। চশমার কাঁচে কুয়াশা জমে আছে। বড় বড় দুটি কর্নিয়া দেখা যায়। তবে কাঁচ এত ঘোলা হওয়ায় তিনি দেখছেন কীভাবে তা ঠিক ভেবে পেলাম না। বললাম, না, মানে… নেক্রোফিলিয়াক কেউ হতে পারে কি? এই নিয়ে তো আপনি বেশ পড়াশোনা করেছেন দেখলাম। বলে চায়ে চুমুক দিলাম। গফুর আসকারী যতই পাগলাটে লোক হোক, চায়ের স্বাদ দারুন হয়েছে। যাওয়ার সময় রেসিপিটা জেনে নিতে হবে। বৃদ্ধ বললেন, হুমম হতে পারে। তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমন প্রবণতা অতি সাধারণ মানুষের ভিতরেও সুপ্ত থাকতে পারে। শোন একটা ঘটনা বলি। তখন আমি সোহাগপুর কলেজে পড়াই। সেই সময়টায় আমি তন্ত্র, শবসাধনা এসব নিয়ে খুব পড়াশোনা করছিলাম। বয়স কম । জানে সাহস ছিল। রাতবিরেতে শ্মশানে-গোরস্থা নে ঘুরে বেড়াতাম। ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। আমি আতকে উঠে বললাম, বলেন কী! হ্যাঁ। আমি একটা বিষয়ে আগ্রহ বোধ করলে তার শেষ দেখেই তবে ছাড়ি, বুঝলে। বুঝলাম। তা আপনি শ্মশানে- কবরস্থানে মাঝরাতে ঘাপটি মেরে বসে থাকতেন কেন? বলে ছোট্ট চুমুকে চাটুকু শেষ করে কাপটা সামনের বেতের টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। বৃদ্ধ বললেন, হাতেনাতে শবসাধকদের ধরব বলে। ধরতে পেরেছেন কখনও? আমার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগার। হুমম। একবার ধরেছি। তখন আমি সৈয়দনগর মহিলা কলেজে বদলি হয়েছি। শহরের উপকন্ঠে নদীর ধারে কবরখানা। এক মধ্যরাত্রে একটা বহেড়া গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছি। দেখি গুটিশুটি পায়ে কে যেন এসে কবরের মাটি খুঁড়তে লাগল। গিয়ে জাপটে ধরলাম। কে সে? আবদুর রহমান। আবদুর রহমান! ঠিক আছে, ধরলেন। তারপর? আমার কৌতূহল চরমে উঠেছে। ধরার পর কতক্ষণ চলল ধস্তাধস্তি। আবদুর রহমান-এর বয়স তখন এই আঠারো কি উনিশ। টেনে- হিচঁড়ে ঘরে নিয়ে এলাম। কিছুতেই বলবে না কবরখানায় কেন গিয়েছিল। সে যা হোক। ওকে ধীরে ধীরে থেরাপি দিয়ে সুস্থ করে তুললাম। এখন ও সুস্থ। তবে আবার কেন পালাল ঠিক বুঝতে পারছি না। পালিয়েছে মানে? প্রায়ই তো পালায়। পাজী, নচ্ছাড় ছেলে একটা। বলতে বলতে গফুর আসকারী হাই তুললেন । বললেন, আমার এখন ঘুম পাচ্ছে ডাক্তার। তুমি না হয় চুপটি করে বস। আমি ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিই। না। না। আমি ঘুমান। আমি এখন যাই। পরে সময় করে একদিন আসব। আর একটা কথা। ইয়ে …মানে… আপনি কি বইটই ধার দেন? বই? না,না। আমি ওই কাজটি কক্ষনো করি না। তুমি বরং অন্যকিছু ধার নাও। এই ফুলদানীটা ধার নেবে? ফুলদানী? না থাক। আমি বরং এখন যাই। বই যখন ধার দেন না। তখন গুড় দেওয়া লেবু চায়ের রেসিপিও বলবেন না। বাগান পেরিয়ে গলিতে বেরিয়ে মনে মনে হাসলাম। কিন্তু আমার হাসা উচিত নয়। আমি ডাক্তার। গফুর আসকারী এমনিতে ভালো মানুষ তবে ঐ একটু …। মর্গের পিছন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি। আবদুর রহমান পালিয়ে গেল কেন? সে গোরস্থানে কবর খুঁড়ত? কেন? কথাটা বৃদ্ধ এড়িয়ে গেলেন। কেন? বসার ঘরে পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম
। কেন? গফুর আসকারীর পাগলামী কোনও কারণে চরমে পৌঁছে যায়নি তো? রহস্য ঘনীভূত হয়ে উঠল।রহস্য যখন ঘনীভূত হয়ে উঠলই … তখন কাউকে না কাউকে তো সন্দেহ করতেই হয়।

১ম পর্ব সমাপ্ত

by ইমন জুবায়ের

নকশা – শেষ পর্ব

1

রুমাকে প্রায়ই একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে ভাবতাম। কিন্তু সে এত অল্প সময়ের জন্য আসত যে আর জিজ্ঞেস করা হত না। একদিন জিজ্ঞেস করে ফেললাম,
-‘আচ্ছা তুই যাদের জন্য চলে গেলি, তাদের কিছু করতে ইচ্ছা হয় না?’
-‘ ইচ্ছা ত হয়। কিন্তু উপায় নাই’
-‘কেন?’
-‘আমরা ত নিজ থেকে কিছু করতে পারি না। সাবজেক্ট কে দিয়ে করাই।’
-‘আমি যদি করি?’
-‘তুই পারবি না। তুই হাবলু’
-‘ না পারব। বল কি করতে হবে’
-‘ না বলব না’
এরপর থেকে রুমার জন্য আমার খুব মায়া হত। আমি ঠিক করলাম রুমার জন্য একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু কিভাবে করব তা কিছুতেই মাথায় আসছিল না। আমাকে যা করতে হবে তা তিনজনের সাথে করতে হবে। তিনজনকে একসাথে পাব কি করে? ভাবতে শুরু করলাম। মাথায় একটা প্ল্যান আসল । কিন্তু সেটা বেশ কঠিন। আমি একদিন হারুন স্যারের বাসায় গেলাম। স্যারের সাথে আমার যোগাযোগ সব সময়ই ছিল। শুনে হয়ত অবাক লাগবে যে আমি জার্মানী থেকে ফিরে আসার পর তিনি তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। স্যারকে বললাম আমাদের গ্রামে একটা ফার্মহাউজ এর ডিজাইন করেছি। কন্সট্রাকশান কাজ দেখতে যদি স্যার দয়া করে আমার সাথে গ্রামে গিয়ে একরাত থাকতেন তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। স্যার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। পরদিন সকালে একটা মাইক্রো বাসে আমি, হারুন স্যার, রশিদ স্যার, মোস্তাক স্যার আর ফিরোজ স্যার আমাদের গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দুপুর নাগাদ কন্সট্রাকশান সাইটে পৌছলাম। দোতলা ফার্মহাউজের সব কলাম আর বিম তোলা শেষ। এখন শুধু পার্টিশান ওয়াল আর ফ্লোর ঢালাই এর কাজ বাকি। সিড়ির ঢালাই তখনও শেষ হয়নি। একজন রাজমিস্ত্রী কে বলা আছে সে যেন সময় মত কাঁচা সিড়ির উপর ভুল করে একটা বালুর বস্তা ফেলে। আমরা পাঁচজন দোতলার সিড়ির নিচে গিয়ে দাড়ালাম। স্যারকে কিছুক্ষন ডিজাইন বোঝানোর পর আমি মোস্তাক স্যারের সাথে সিগারেট খাবার জন্য একটু দূরে যেতেই সিড়িটা তাদের তিনজনের উপর ধসে পড়ল। হারুন স্যারের মাথা থ্যাঁতলে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মারা গেলেন। রশিদ স্যার আর ফিরোজ স্যার হাসপাতাল পর্যন্ত পৌছতে পারলেন কিন্তু বাঁচলেন না। আমার পরিকল্পনা একশভাগ সফল হল। মোস্তাক স্যার কে সময় মত জায়গা থেকে সরাতে পেরেছিলাম, তাই কোন অঘটন ঘটেনি। এর প্রায় তিন বছর পর একদিন সকালে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের দু’জন সদস্য আমার বাসায় এলেন। তাদের সাথে সেই রাজমিস্ত্রীটিও ছিল। সিনথিয়া প্রায়ই আমার কাছ থেকে বিশ্বস্ত আর ভদ্রগোচের মিস্ত্রীদের ঠিকানা চাইত। কারন মহিলা আর্কিটেক্টের কথা নাকি তাঁরা সহজে শুনতে চায় ন। আর তাকে এই মিস্ত্রীটির ঠিকানা দিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছিলাম। রুমার ডিজাইন করা সবচেয়ে বড় নক্শাটি এখন আমার ঘরের আলমাড়িতে পড়ে আছে। নক্শাটি বাস্তবে দেখে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না তা আমি জানতাম। তাই খারাপ লাগছেনা।
তবে আমি এই নক্শাটি এমন কারও হাতে তুলে দিব যেন সে অথবা তাঁর নিকট কোন উত্তরসূরী খুব কম সময়ের মধ্যে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পাতাল পথে চলে যেতে পারে। আমার এমন কাউকে খুঁজ়ে বের করতে হবে যার স্নায়বিক চাপ দূর্বল নয়। সে যেন আমায় দেখে ততটা ভয় না পায় যতটা আমি পেতাম রুমা কে দেখে। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি একটা প্লাটফর্মের উপর। আমার চারপাশ উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। আমার পরনে সাদা কালো ডোরাকাটা পোশাক। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে, কারন এরকম কালো কাপড়ে ঢাকা তিনজন মানুষকে আমি সরিয়ে ফেলতে পেরেছি, যাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে থাকার কোন অধিকার নেই। রুমা অনেক্ষন ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমিও অধীর আগ্রহে তার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।

সমাপ্ত

-by জোবায়ের বিন ইসলাম

আমার বন্ধু রিয়ান-পর্ব-১

0

রিয়ানকে দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই প্রথম রিয়ান আমাকে না জানিয়ে কোথায় যে ডুব মেরেছে বুঝতে পারছি না। সেবার বাড়ি থেকে পালিয়ে ও যে বান্দরবান গিয়েছিলো তা একমাত্র আমিই জানতাম। আমাদের ক্লাসমেট শান্তা আর সজীবের রিলেশনের ব্যাপারটা ওদের বাসায় জানিয়ে একটা ঝামেলার সৃষ্টি করেছিলো রিয়ান,সেটাও একমাত্র আমিই জানতাম। আর সেই রিয়ান দুদিন ধরে কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় যে গেছে আল্লাহ মালুম। রাগ লাগছে আমার আবার সাথে সাথে দুশ্চিন্তাও হচ্ছে ওর জন্য। কোন ঝামেলায় পড়ে নাই তো ও। আর যদি কোথাও যেয়েই থাকে তাহলে আমাকে বললো না কেন?

কি এমন জরুরী কাজ পড়লো ?? মাঝে মাঝেই রিয়ান এমন হাওয়া হয়ে যায় তাই ওর বাবা মা তেমন দুশ্চিন্তা করছেন না ; কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কোথাও কোন বড় অঘটন ঘটেছে। ওকে মোবাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। কোন পজেটিভ নিউজ পাবো না জেনেও রিয়ানের আম্মাকে ফোন করলাম।

-অ্যান্টি রিয়ানের কোন খোজ পেলেন?

-না বাবা। জানোই তো ও বরাবরই এমন করে। দেখো ঠিকই ৪-৫দিন পর এসে হাজির হবে।

-জ্বি অ্যান্টি,তাই হবে হ্য়ত। ঠিক আছে রাখি।

অ্যান্টিকে বলতেও পারলাম না যে অন্যবারের মত নিশ্চিত মনে বসে থাকতে পারছি না আমি। কারণ এবার যে রিয়ান আমাকেই কিছু বলে যায় নাই। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছি শেষ কখন,কি কথা বললাম রিয়ানের সাথে। হ্যা মনে পড়েছে,রিয়ান সেদিন রাতে রাস্তা দিয়ে হাটছিলো যথারীতি অন্যান্য দিনের মত। রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা ওর শখ। হাটতে হাটতে আমাকে ফোন করেছিলো,কথা বলছিলাম দুজন।

হঠাৎ রিয়ান “পরে ফোন দিচ্ছি” বলেই কলটা কেটে দিলো। ব্যস এইটুকুই। তারপর থেকেই ওকে ফোনে আর পাওয়া যাচ্ছে না। ধ্যাত কারেন্ট চলে গেলো। মোমবাতি জ্বালিয়ে ড্রইংরুমে এসে বসলাম। আব্বা আম্মা গেছেন ছোটমামার বাসায়। কখন আসবেন ঠিক নেই। ওহ এত গরম লাগছে কেন আমার। এখন তো শীতকাল!! যদিও শীতের মাত্রাটা কম,কিন্তু গরম লাগার কথা না।ভাপসা গরমের সাথে পোড়া পোড়া গন্ধও পাচ্ছি। মনে হচ্ছে বাথটাবে বসে থাকি। দরজায় নক করার আওয়াজে চিন্তায় ছেদ ঘটলো। কিন্তু কলিং বেল না বাজিয়ে দরজায় নক করছে কোন বেকুব। একটু বিরক্তি নিয়েই দরজা খুললাম। রিয়ান দাড়িয়ে বাইরে!! কোন কথা না শুনে গালাগাল শুরু করলাম ওকে। “কোথায় ছিলি? আর কাউকে নাহোক আমাকে তো বলে যেতে পারতি। কারো কেয়ার তো তুই কখোনোই করিস নাই,ভাবতাম আমার জন্য একটু হলেও দরদ আছে তোর। কিন্তু না,আমাকেও অপ্রয়োজনীয় মনে করিস তুই। এখন আর চুপ করে দাড়িয়ে না থেকে ভিতরে এসে বোস। বলে আমিই আগে ঘরে ঢুকলাম। সোফায় বসতে যেয়ে দেখলাম রিয়ান ঘরে ঢোকেনি। দরজায় তাকিয়ে দেখলাম সেখানে কেউ নাই। আরে একটু আগেও তো রিয়ান ছিলো এখানে। ভীষণ রাগ লাগলো আমার। রিয়ান কি শুরু করেছে এসব। “দরজা খুলে রেখেছিস কেন?” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাবা বললেন।“না মানে…” বলতে যেয়েও চেপে গেলাম। বাবা মা পছন্দ করেন না,আমি রিয়ানের সাথে মিশি। কারন রিয়ান আগে ড্রাগ এডিক্ট ছিলো কিন্তু এখন ও পুরাপুরি সুস্থ, কিন্তু সেকথা বাবা মাকে কে বোঝাবে? চুপচাপ নিজের ঘরে চলে আসলাম। তাহলে কি বাবা মা কে দেখেই রিয়ান চলে গেল। বাবা মা থাকলে ও বাসায় আসে না।ও জানে বাবা মা চান না আমি ওর সাথে মিশি। রাগ কিছুটা কমে গেল আমার। কিন্তু রিয়ান এত চুপচাপ ছিলো কেন? ৫ মিনিট ধরে আমি এতগুলো কথা বললাম্, ও না উত্তর দিলো না নিজে থেকে কিছু বললো। তবুও আশ্বস্ত হলাম এটা চিন্তা করে ও ফিরে তো এসেছে। খুশী হলাম অনেক্,রিয়ান কে ছাড়া আমিও যে অচল। রাতের খাবার খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম। অনেক সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। নাস্তা খেয়ে ভার্সিটিতে যাবো বলে ফোন দিলাম রিয়ানকে। ফোন বন্ধ। ফাজিলটা নিশ্চই ফোনে চার্জ দেয়নি। আন্টির মোবাইলে ফোন করলাম। আমি হ্যালো বলতেই আন্টি বললেনঃ “ কি বাবা রিয়ানের কোন খোজঁ পেলে?”

আন্টির কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম। রিয়ান কি তবে বাসায় যায়নি? কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলাম। রিয়ান কি শুরু করেছে এগুলো? কাল রাতে দেখা হলো আমার সাথে ,এখন আবার লাপাত্ত্বা। এই ছেলের কপালে যে কি আছে আল্লাহ জানে। এতই বেশি রাগ লাগছে আমার যে মনে হচ্ছে রিয়ানের সাথে যোগাযোগ করাই বন্ধ করে দেই। আর ওকে ফোন দিবো না ডিসাইড করলাম। একাই রওনা দিলাম ভার্সিটির দিকে। সন্ধায় বাসায় ফিরে শুনলাম বাবা দেশের বাড়িতে যাবেন বলে ঠিক করছেন। আমরাও যাবো সাথে,৫ দিন পর ঢাকায় ফিরবো। আমার ঢাকার বাইরে যেতে ভালো লাগে না কিন্তু বাবার উপর কথা বলার সাহস আমার নেই। পরদিন অনেক সকালে আমরা রওনা হলাম বাগেরহাটের পথে। পৌছালাম বিকাল ৩টায়। খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই ঘুরতে বের হলাম। ছোট্ট একটি মফস্বল শহর বাগেরহাট কিন্তু খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। রাস্তা ঘাট চিনি না কিন্তু তবুও হাটতেই থাকলাম। দড়াটানা নদীর তীরে যেতেই এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে গেলো। চুপচাপ এক গাছের নিচে বসেই সারাবিকেল পার করে দিলাম। শেষ বিকেলের লালচে কালো আভাটুকুও মিলিয়ে গেলো নদীতে তবুও বসে রইলাম মনোমুগ্ধের মত। ঠান্ডা বাতাসে গায়ে রীতিমত কাঁপন ধরে গেলো।সকাল থেকে এত ব্যস্ত ছিলাম যে রিয়ানের ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। এখন মনে পড়ে গেল। নতুন করে ভাবনাগুলো এসে একসাথে ঘিরে ধরলো আমায়। খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো আমার;অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে উঠে দাড়ালাম। ওহ! হঠাৎ করে এত গরম লাগছে কেন? এত গরমে মানুষ জামা কাপড় পড়ে থাকে কিভাবে;আমি আবার পড়েছি ফুল স্লীভ টি-শার্ট। মনে হলো একটানে শার্ট খুলে ফেলি।চুপচাপ হাটতে থাকলাম।একটু সামনে হেটে আসতেই মনে হলো দূরে কেউ গাছের নিচে কেউ বসে আছে। যে কেউ বসে থাকতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমার কেন জানি ভীষন অস্বস্তি লাগতে লাগলো।কারণ যে বসে আছে তার বসার গড়ন আমার খুব পরিচিত,তার চুলগুলোও লম্বা;ঠিক যেন রিয়ানের মত। ওটা রিয়ান না তো ?? মনে হলো সেও আমাকে দেখছে। হাটতে হাটতে ছেলেটির কাছে চলে আসলাম আমি। যা ভেবেছি ঠিক তাই।রিয়ানই!! কিন্তু ও এখানে কি করছে? আমি বেশ রাগান্বিত হয়েই ডাকলাম “রিয়ান!” রিয়ান খুব আস্তে,খুবই আস্তে উচ্চারণ করলো “স্বাধীন আমাকে সাহায্য কর” আমি অবাক হয়ে গেলাম ওর গলার স্বর শুনে।রিয়ানের ভয়েজ তো এমন কখনোই ছিলো না।এতই আস্তে এবং ফ্যাসফ্যাসে গলা যে ও কি বললো তা বুঝতে আমার কিছুটা সময় লাগলো।কি বলবো ঐ মূহর্তে ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ আমার কাঁধে হাত রাখলো। ফিরে দেখি একটা লোক। আমাকে তাকাতে দেখে জিজ্ঞেস করলো “ভাই কি শহরে নতুন?” “না,আমার দাদাবাড়ি এখানে। কিন্তু আমরা ঢাকায় থাকি” “তাইলে ভাইজান একটা কথা কই,এই জায়গা খুব একটা সুবিধার না।বাড়িত যান,এইখানে খাড়াবার দরকার কি ? শীতের রাইত, লোকজন কম,কি হয় কওয়া যায় না।” এটুকু লোকটা হাটা শুরু করলো। রিয়ানের দিকে ঘুরতেই দেখি ও নেই। নদীর পাড়ে যতটুকু চোখ যায় দেখি শুধু লোকটি হেটে যাচ্ছে আর আমি দাড়িয়ে আছি।হাওয়ার মিলিয়ে যাওয়ার মত এত তাড়াতাড়ি রিয়ান গেলো কোথায় ?? একটু একটু ভয় লাগলো আমার। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম রিয়ান আমাকে কিছু বলতে চায়;বলার জন্যই আসে আমার কাছে কিন্তু সামনে থাকলে চলে যায়।রিয়ান জানলোই বা কিভাবে আমি এখন বাগেরহাটে।আগে তো ও কখনো আসে নাই এদিকে!!ও জানতো আমার দাদাবাড়ি বাগেরহাটে,কিন্তু ঠিক এখানে আসলেই যে আমাকে এখন পাওয়া যাবে তা তো রিয়ানের জানার কথা না!! খাপে খাপ মিলাতে পারলাম না আমি। মাথা ঘুরতে লাগলো;বাড়ির দিকে রওনা হলাম আমি।এত ঠান্ডা লাগছে যে গরম কাপড় পড়ে বের হলাম না কেন ভাবছি। একটা কথা খেয়াল করা মাত্রই আমার গাঁ শিরশির করে উঠলো। ঢাকায় আমার বাসায় যেদিন রিয়ান এসেছিলো ঔদিন ঠান্ডার মাঝেও অস্বাভাবিক গরম লেগেছিলো আমার এ
বং আজও লাগলো। রিয়ান চলে যাবার পর আবার ঠান্ডা লাগা শুরু করলো!!এমন কেন হলো? রিয়ান কি তবে অশরীরী কিছু একটা??আর কিছু ভাবতে পারলাম না ঠান্ডার মধ্যে ভয়ে শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো।

 

রোদেঁশী

১ম পর্ব সমাপ্ত

নকশা – ১ম পর্ব

0

তখন আমার ফাইনাল ইয়ারের থিসিস চলছিল। থিসিসের টপিক হিসেবে পুরান ঢাকার একটি জনবহুল অংশকে বেছে নিয়েছিলাম। আমার কাজ ছিল সেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটিকে কিভাবে ঝুঁকিমুক্ত করে সেখানকার বাড়িগুলা কে বসবাসের আরও উপযোগী করে তোলা যায় তার ডিজাইন করা। সহজ ইংরেজীতে যাকে বলে ‘রিহ্যাবিলেশান অফ বিল্ডিংস’ থিসিসের  জন্য  প্রায়  সব  ইউনিভার্সিটিই  স্টুডেন্টদের ছয় মাস সময় দিয়ে থাকে। ছয় মাসের মধ্যে চার মাস প্রায় শেষ। আর মাত্র দু’মাস বাকি। অথচ আমার কাজ তেমন এগোয়নি। এমাসের মধ্যে যদি রিসার্চ শেষ না হয় তাহলে আমি বিপদে পড়ে যাব। কারন ফাইনাল ড্রইং আর মডেলের জন্য কমপক্ষে দেড় মাস প্রয়োজন। শুধু আমার নয়, সবারই নূন্যতম এই সময়টুকু দরকার হয় ডিজাইন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবার জন্য। একে ত সময় নেই, তার উপর মাথায় স্কলারশিপের চাপ। যদি প্রথম তিনজনের মাঝে না আসতে পারি তাহলে কমনওয়েল্থ স্কলারশিপ নিয়ে আর বিলেত যাওয়া হবেনা। আর স্কলারপ ছাড়া আমার পক্ষে নিজের টাকায় মাস্টার্স করা সম্ভব না। রাত সোয়া তিনটা। কম্পিউটারে বসে কিছু ড্রইং ড্রাফ্ট করছিলাম। পরদিন সকালে স্যারকে দেখাতে হবে। স্যার এই ড্রাফ্ট টা এপ্রুভ করলেই ফাইনাল ড্রইং এর কাজ শুরু করে দিব। ড্রইং করতে করতে হঠাত ঝিমুনির মত চলে এসেছিল। হঠাত শুনতে পেলাম কে যেন আমাকে অষ্পষ্টভাবে ডাকছে ‘হিমেল এই হিমেল’ বলে। বেশ চমকে গেলাম। বাসার সবাই ঘুমাচ্ছে। শুধু আমার ঘরে বাতি জ্বলছে। তাই কিছুক্ষন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপচাপ বসে থাকার পর ভয় চলে গেল। বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা ঘুমের মধ্যে ঘটেছে অথবা মনের ভুল ছিল। তাছাড়া আমি ত স্পষ্ট কিছু শুনিনি। আজকের মত ড্রইং এখানেই শেষ ভেবে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাব ঠিক সেই মুহূর্তে স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা নারী কন্ঠ ফিসফিস করে বলছে ‘হিমেল যেয়োনা দাঁড়াও……কথা আছে তোমার সাথে। ভয় পেয়োনা লক্ষীটি’একথা শুনার পর আমার আর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াবার মত সাহ