ডাকিণী (২১তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
বিনা চিৎকারে গার্ডকে লুটিয়ে পড়তে দেখে নিজের আত্মবিশ্বাসটা এভারেস্ট ছাড়িয়ে গেলো। হাহ। একেই বলে মিসেস থর ওরফে সাঞ্জে। গার্ডটা পড়ে যেতেই ওর শক্তিশালী টর্চটাও নিভে গেল। ভালই হল।এখন অন্ধকারকেই আমার বেশী সাচ্ছন্দদায়ক মনে হচ্ছে। কিন্তু ও নড়ছে না কেনো? মরে টরে গেল না কি? উবু হয়ে বসে ওর মাথায় আমার পেন্সিল টর্চের আলো ফেললাম। নাহ। তেমন কিছুই তো হয়নি। এমনকি রক্তও বেরুয় নি। শুধু মাথার পেছনে একটা পেয়ারা গজিয়েছে। তবে আশা করছি খুব শীঘ্রই ওটা ছোটখাটো একটা ফুটবল আকৃতি ধারণ করবে। ও অজ্ঞান থাকতে থাকতেই এবার ওকে বেধে ফেলা যাক। ওর শার্টটা খুলে তার হাতা দিয়ে ওর পা দুটো শক্ত করে বাধলাম। ভেবেছিলাম ওর শার্ট দিয়ে পা বাঁধবো আর নীচের গেঞ্জি দিয়ে হাত। কিন্তু কি আশ্চর্য! লোকটা শার্টের নীচে গেঞ্জি পরেনি! এমন অগোছালো কেবল পুরুষ মানুষই হতে পারে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি ডিউটিতে বেরুনোর সময় ব্রা ছাড়া বেরিয়েছে এমন কোন নারী এই পৃথিবীতে নেই। তবে গেঞ্জি ছাড়াই বেরিয়েছে এমন হাজারো পুরুষ আছে। এই মাত্র আমি এমন একজনের সম্মুখীন হয়েছি। কি স্টুপিড স্বভাব এদের!
অবশেষে বাধ্য হয়েই আমার শার্ট দিয়েই ওর হাত বাধলাম। জেগে উঠে যেন চেঁচামেচি করতে না পারে সেজন্যে আমার পেন্টিটা খুলে ওর মুখে ভরে দিলাম। ও এখনো অজ্ঞানই আছে। এবার ওকে জাগানো যাক। আমি নিশ্চিত হতে চাই ও সত্যি সত্যিই অনড় অক্ষম হয়ে বাধনে ঠিক মতোই আটকা পড়েছে। ও যদি কোনক্রমে ভোরের আগে ছাড়া পায় তবে আমার শশুরবাড়ি যাত্রাটা কারো নাক কেটেই আটকানো যাবে না। হঠাৎ আমার নজর ওর জ্বলন্ত সিগারেটের উপর আটকে গেলো। এতো বৃষ্টির মাঝেও এখনো জ্বলছে। একজন ধোমপায়ীর জ্ঞান ফিরাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেটের চেয়ে কার্যকর কিছু এখনো আবিষ্কার হয় নি। সিগারেটটা কুড়িয়ে নিয়ে ওর নাকের ডগায় ঠেসে ধরলাম। নাকে ছ্যাকা খেতেই ও ধড়মড়িয়ে নড়ে উঠলো। আমার দিকে চোখ পড়তেই ও গো গো করতে শুরু করলো। কাঁদা মাখা আমাকে দেখে ও সম্ভবত শেওড়া গাছের পেত্নী ভেবেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে ওর গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম। ঘটনার আকর্ষিকতায় ও একদম হতভম্ব হয়ে গেছে। এবার আমি স্পষ্ট পোলিশ ভাষায় ওর কানে ফিসফিসিয়ে বললাম, “এই থাপ্পড়টা হল কর্তব্যে ফাঁকি দিয়ে সিগারেট টানার জন্যে।” ও বুঝলো আমি ভুতপ্রেত কিছুই না। ওরই মতো মানুষ। এটা বুঝা মাত্র ও নিজেকে ছাড়ানোয় মন দিলো। দেহটাকে সংকোচিত করে একটা বান মাছের মতোই ঘুরাতে শুরু করলো। আমি হাতুড়িটা হাতের কাছেই রাখলাম। যদি ও ছুটিয়ে ফেলতে পারে তবে আবার এক ঘা বসিয়ে দেব। তবে এবার হাতুড়িকে মুড়ানোর জন্যে আমার শার্টটা থাকছে না। সেটা ইতিমধ্যেই ওর হাতে বাধন হিসেবে শোভা পাচ্ছে। এবার যদি মারি তো একদম আসল হাতুড়ির ঘা টাই পড়বে। এতে ওর অক্কা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। কিন্তু ওর কপালের জোর অনেক বেশী। এতো টানা হেচড়ার পরেও ও বাধন খুলতে পারলো না। এক সময় ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়লো। যাক। অনেক হয়েছে। এবার কাজে ফিরতে হবে। ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বেজে গেছে। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই সূর্যদয় হবে। এই এক ঘন্টার মধ্যেই আমাকে সেই প্রিস্টের দফারফা করে দিতে হবে। গার্ডের নিতম্বে কষে দুটো লাথি বসিয়ে আবার ফিরে গেলাম প্রিস্টের কবরে। এবার আর কোদালের হাতলে ব্রা টা জড়িয়ে নিতে ভুললাম না। এমনিতেই গার্ডকে পিটিয়ে আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তার উপর হাতের ব্যাথাটাও কমে এসেছে। তাই কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে গেলো। পনেরো মিনিটের মধ্যেই কবর খুড়ে প্রিস্টের কফিনটা বের করে ফেললাম। কিন্তু এ কি! কফিনটার এ কি অবস্থা! এটা কোন সাধারণ কাঠের কফিন নয়। আগা গোড়া লোহায় তৈরি। আর সবচে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটা হল কফিনের ডালাটায় একটা বিশাল তালা ঝুলছে! ব্যাপারটা অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে কেন এতো আয়োজন। লোহার কফিনে তালা লাগিয়ে কোন লাশকে কখনোই দাফন করা হয় না। এ পদ্ধতিটা কেবল জীবন্ত দাফনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। তবে কি এই শয়তানটাকে জীবন্তই পুঁতে দেয়া হয়েছিলো? সত্যিই যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে বড্ড অন্যায় করা হয়েছে। এই শয়তানটাকে কমপক্ষে তিনদিন তিনরাত গণধোলাই দিয়ে, পরদিন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে তারপরেই কফিনে ঢুকানো উচিৎ ছিলো। কিন্তু এ তালার চাবি কোথায় পাবো? হঠাৎ মনে পড়লো সাইডব্যাগে একটা হেক্সো ব্লেড থাকতে আমি চাবি খুজতে যাবো কেন? ব্লেডটা দিয়ে তালা কেটে ফেললেই তো হয়। অতপর ব্যাগ থেকে ব্লেডটা নিয়ে এসে তালায় ঘসতে শুরু করলাম। তীক্ষ্ণ একটা কীচ কীচ শব্দ গোরস্থানের নিরবতা ভঙ্গ করলো। একটা সময় ঘট করে তালাটা খুলে পড়লো। একরাশ ভয় এসে আমায় গ্রাস করে নিলো। কফিনের ভেতর জীবন্ত কবর দেয়া শয়তানটা কি এখনো বেঁচে আছে? যদি থাকে তো আমায় দেখে কি হবে ওর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। প্রচন্ড ইচ্ছা করছে এসব ফেলে ছুটে পালিয়ে যাই। কফিনটা না খুললেই কি নয়? কফিনটা খুললে যদি ওটা মুক্ত হয়ে যায় তখন কি হবে? কিন্তু আমি এর শেষ না দেখে ছাড়ছি না। আজ এর একটা বিহিত করেই ছাড়বো।
বৃষ্টিটা হঠাৎ করেই এখন থেমে গেছে। চারিদিকে সুনসান নিরবতা। প্রকৃতিও যেন এক অজানা অঘটন ঘটার প্রতিক্ষায়। আমার কাঁপাকাঁপা হাত দুটো কফিনের ডালাটায় রাখলাম। তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে হঠাৎ ডালাটা হেচকা টানে খুলে ফেললাম।
হায় খোদা, আমি এ কি দেখছি!!! এটা কিভাবে সম্ভব!!! এই লাশটা তো দেখছি একদমই জ্যান্ত ,,
(চলবে)

অশুভ গলির তিন প্রেত­ [শেষ অংশ]

0

cc1e7e9e5fc911df9a61000b2f3ed30f

আমি বললাম, আমি …আমি … আমার নাম সৈয়দ এনামুল হক। আমি … মানে আমি ওয়াহেদের বন্ধু। আমরা একসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালাম।
সেই কালো বেড়ালটাকে কোথাও দেখলামনা। ওটা গেল কোথায় ? আশ্চর্য!
অ। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ আমার মুখে দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, হ। এইবার বুঝলাম। আমার নাম হইল মোশাররফ হোসেন। ওয়াহেদে হইল গিয়াআমার চাচতো ভাইয়ের একমাত্র পোলা।তয় সুবহান ভাইয়ে মইরা গেলে পর আমি তার ফার্মেসিতে বসতাম। পরে ওয়াহেদের বোইনে বিদেশ থন আইসা দুকান বিক্রি কইরা দিল। আমি বুড়া মানুষ। আমি কই যামু বাবা কও। তখন শিউলীর হাতেপায়ে ধইরা প্রতিমাসে একতলা দুইতলা ভাড়া তুইলা ব্যাঙ্কে জমা দিমু এই শর্তে শিউলী আমারে এই বাড়িত থাকতে দিল। কইলাম ভাড়া দিমু। তয় এই বাড়িত ভাড়াইট্টা বেশি দিন থাকে না।
কথাটা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেন? এ বাড়িতে বেশি দিন ভাড়াটে থাকে না কেন?বলতে বলতে আড়চোখে ইত্তেফাক পত্রিকার দিকে তাকালাম। পেপারটা যেখানে গুটিয়ে রেখেছিলাম পেপারটা সেখানে নাই। আশ্চর্য! পেপারটা কোথায় গেল!
বৃদ্ধ যেন আমার প্রশ্ন শুনতে পান নি। কিংবা প্রশ্নের জবাব দিতে চান না। তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে অনেককষ্টে সোফার ওপর বসলেন। তারপর বললেন, আইজ সকালে আমি কিছু মুখে দিয়া জায়নামাজে বসছিলাম। আইজকাল আমার যখন তখন ঘুম পায় বাবা। আমি বাবা জায়নামাজের উপর ঘুমায় পড়ছিলাম । দরজা বন্ধ করতে মনে আছিল না।
চাচা, দরজা তো খোলা ছিল না। বন্ধ ছিল।
বন্ধ ছিল? তয় তুমি ঘরের ভিতরে ঢুকলা কেমনে?
কেন দরজা তো সুরভী …মানে ওয়াহেদের বউই খুলে দিল।
অ বুঝছি। তাইলে তুমিও তারে দেখছ। মাইয়াডারে রাইতবিরাইতে মাঝেমইধ্যে আমিও দেখি বাবা। মাইনষেরে ডাইকা কথাডা কইলে আমারেকয় মিছা কথা কইতাছি। তারা আমারে কয় দূনঈয়ায় নাকি জিনভূত বইলা কিছু নাই । হায় আল্লা, দূনঈয়ায় জিনভূত না থাকলে এই বাড়িত ভাড়াইট্টা থাকে না কি দেইখা?
জিনভূত! কি বলছেন আপনি? আমার কন্ঠস্বর সম্ভবত তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছিল।
বৃদ্ধ ঘোলা চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর কাশতে লাগলেন। কাশির দমকে বৃদ্ধের চোখমুখ কীরকমকুঁচকে যাচ্ছিল। চোখ দুটি বুজে যাচ্ছিল। তখন বৃদ্ধকে অদ্ভূত দেখাচ্ছি। যেন বৃদ্ধ কোনও রহস্যময় যাদুকর। কাশি থামার পর বৃদ্ধ বললেন, তুমি আসল ঘটনা মনে হয় কিছু জান না বাবা।
কি ঘটনা চাচা? আমার কন্ঠস্বর কাঁপছিল। আমি খেয়াল করিনি যে আমি আবার সোফার ওপর বসে পড়েছি।
বৃদ্ধ বললেন, আইচ্ছা, তাইলে তুমি শুন বাবা। আমি বলতেছি। ওয়াহেদে সুরুভিরে বিয়া কইরা ঘরে তুলছিল। বিয়ার পরও সুরুভির চাচতো ভাই শাহনেওয়াজে এই বাড়িত মাঝেমইধ্যে আইত । ওয়াহেদে আর সুরুভির মইদ্যে এই লইয়া দিন রাইত কাইজ্জাকাটি লাইগাই থাকত। মাঝেমইধ্যে ওয়াহেদে রাগ কইরা বাড়িত থেইকা চইলা যাইত। চইলা গিয়া রাইতে থাকত রামপুরায় এক মসজিদে । তারপরও শাহনেওয়াজে মাঝেমইধ্যে আইত চাচতো বোইনের বাসায়। এই দুঃখে ওয়াহেদে একদিন গলায় দড়ি দিয়া মরল।
আমি শিউরে উঠলাম। কি বলছেন আপনি?
হ। আমি ঠিকই কইতাছি বাবা।
বৃদ্ধ ঠিক বললে তাহলে আমি তখন কাকে দেখলাম ?
বৃদ্ধ বলে চলেন, ওয়াহেদের মরণের পর শাহনেওয়াজে এই বাড়িত ঘনঘন আইতে লাগল। এই ঘরেই বইসা দুইজনে মিল্লা গল্পগুজব করত। তয় তাগো কপালে সুখশান্তি বেশিদিন দেয় নাইআল্লায়।
এক রাইতে খুব বৃষ্টি হইল। সুরুভি পাকের ঘরে খিচুরি পাকাইতেছে, শাহনেওয়াজে রাইতে খাইয়া যাইব। কাজের ছেমড়ি সব দেখছে … চুলার থন কেমনে আগুন লাফ দিয়া সুরুভির শাড়িত পড়ল। সুরুভীর চিৎকার না শুইনা শাহনেওয়াজে পাকের ঘরে ছুইটা গেলে আগুন তারেও ধরল। দুজনে পুইড়া কয়লা হইয়া গেল…আগুনে আর কুন ক্ষতি হয় নাই। কাজের ছেমড়ির গায়ে আগুনের টোকাও লাগে নাই।
আমার মাথা কেমন টলছিল। আর ভীষন অবশ লাগছিল। মুখে ঘাম টের পাচ্ছিলাম। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল … তাহলে তখন রিকশায় কে উঠল? আর দরজা-ই বা তখন কে খুলে দিল?
বৃদ্ধকে দেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন মনে হল। ছোট শরীরটা এক পাশে কাত হয়ে গেছে। মুখটা হা হয়ে আছে।অবশ্য তখনও শক্ত করে লাঠিটা ধরে আছেন। দৃশ্যটায় কী ছিল- আমার শরীর কেমন গুলিয়ে উঠল। বৃদ্ধকে ঝাপসা দেখছি। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘরে আতরের গন্ধটা কীরকম তীব্র হয়ে উঠছিল। ওই বৃদ্ধও এই জগতের কিনা কে জানে। এই গলিটাই অশুভ। আমার এই ঘরে থাকা উচিত নয়। আর কিছুক্ষণ এই ঘরে থাকলে ওরা তিনজন ফিরে আসবে। তখন আমার ভীষণ ক্ষতি হয়ে যেতে পারে …বৃদ্ধের কাছ বিদায় নেবার আমার কোনও দায় নেই। এই বৃদ্ধও সম্ভবত এই অশুভ গলির প্রেতলোকের বাশিন্দা।
আমি প্রায় এক লাফেই ঘরের বাইরে চলে এলাম। বাইরে রোদের রং কেমন মরাটে। যেন অস্বচ্ছ কাচের ভিতর দিয়ে আসছে। গলির দু’ধারে পুরনো ফটোগ্রাফের মতন সাদাকালো ঘরবাড়ি। অনেক পুরনো দিনের …
আমি প্রায় দৌড়েই অশুভ গলিটা পেরিয়ে যখন রোদ ঝলমলে গলির মুখে এসে দাঁড়ালাম তখনও আমি ভীষণ কাঁপছিলাম …

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অশুভ গলির তিন প্রেত­ [২য় অংশ]

0

ওয়াহেদ যদি এ দিকেই কোথাও দেড়-দুই কাঠার ওপর নিষ্কন্ঠক জমির খোজ দিতে পারে তো ভালো হয়। হাউজ বিল্ডিংয়ের লোন নিয়ে একটা বাড়ির কাজে হাত দেব। ফ্ল্যাটের এখন যা চড়া দাম। এদিকে নিজের একটা বাড়ির জন্য আমার বউ সঞ্চিতা বড় উতলা হয়ে উঠেছে।

সেই খালি রিকশাটা ওয়াহেদদের বাড়ির সামনে থেমে আছে। রিকশায় একটা মাঝবয়েসি লোক উঠল। মনে হল লোকটা ওয়াহেদদের বাড়ি থেকেই বেড়িয়ে এসেছ । কালো রঙের বেশ থলথলে শরীর। পরনে কালো প্যান্ট আর হলদে রঙের হাফ হাতা শার্ট। ফোলা ফোলা গোলগাল মুখে দাড়ি। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। লোকটাকে কেমন চেনা চেনা লাগল। সহসা চমকে উঠলাম-শাহনেওয়াজ! আশ্চর্য! শাহনেওয়াজ এখানে কেন! তাহলে কি ওয়াহেদ সুরভী কে বিয়ে করেছে। সেই সূত্রে শাহনেওয়াজ এ বাড়িতে আসে। আর ওদের মিটমাট হয়ে গেছে। কই, এসব কথা তো ওয়াহেদ আমাকে কিছু বলল না।

মাথার ভিতরে অনেক এলোমেলো প্রশ্ননিয়ে বারান্দায় উঠে এলাম। পুরনো আমলের রেলিং ঘেরা বারান্দার মেঝেটি লাল রঙের রেডঅক্সাইডের। এই বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে ওয়াহেদের বৃদ্ধ বাবা বসে থাকতেন।ধবধবে ফর্সা ছিল বৃদ্ধের গায়ের রং । খুব কাশতেন। সেই বারান্দা এখন শূন্য। বারান্দার লাল মেঝেতেসাদা অলপনা আঁকা। কার বিয়ের? শিউলির না ওয়াহেদ-এর? শিউলী এখন কোথায়? ওকে ভালো বেসেছিল আমাদের এক সহপাঠী আফসার। শিউলিকে নিয়ে গোপনে কবিতা লিখত আফছার। অবশ্য ওই পর্যন্তই। এটিও আমার ইউনিভারসিটি জীবনে দূর থেকে দেখাএকটি ঘটনা।

কলিংবেলে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একটু পর যে মাঝবয়েসি মহিলাটি দরজা খুলে দিল তাকে দেখামাত্রই চিনতে পারলাম। সুরভী আমাকে দেখেও চিনতে পারল । বলল, এসো, এনামুল । ভিতরে এসো। কন্ঠস্বর কেমন শীতল।

আমি ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকেই কেমন একটা পুরনো গন্ধ পেলাম। ঘরের পরদা ফেলা। অল্প পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছিল। তবে ঘরটা আগের মতোই আছে দেখলাম। বেতের সোফার ওপর লাল মখমলের কাপড় বিছানো। সাদা চুনকাম করা দেয়ালে মাওলানা ভাসানীর একটা ফ্রেমবন্দি সাদাকালো ছবি। উলটো দিকে একটা ক্যালেন্ডার। ১৯৯৩ সাল দেখে চোখ আটকে গেল। কি ব্যাপার? এরা ক্যালেন্ডার বদলায়নি কেন? ঘরের বদ্ধ বাতাসে আগরবাতির মৃদু গন্ধ ভাসছিল।

বস। এনামুল। বলে সুরভী সোফার ওপর বসল। ওর পরনে ছাই ছাই রঙের একটা ছাপা শাড়ি। ক্লালো ব্লাউজ। এত বছর পর আর শরীরের সেই ছিপছিপে গড়ননেই। থাকার কথাও না। বেশ মুটিয়েছে সুরভী। শ্যামলা রংটা মলিন আর শুষ্ক মনে হল। তবে চশমা ছাড়া লাবণ্যহীন মুখটা কেমন অদ্ভূত দেখাচ্ছিল ওকে। মুখটা কেমন রক্তশূন্য ফ্যাকাশে বলে মনেহল।

কেমন আছ বল? সুরভী জিজ্ঞেস করে।

আছি। তোমরা?

আমরা? আমরা আছি একরকম।

একটু আগে আমি শাহনেওয়াজকে দেখলাম। সেই কথা আর বললাম না।বরং বললাম, এদিকে আসছিলাম একটা কাজে। হঠাৎ মনে হল ওয়াহেদের কথা।

ও।

তুমি কি চাকরি বাকরি কিছু করছ?

সুরভী মাথা নেড়ে বলল, আমি? না।

আমি কি করি বা কোথায় থাকি সুরভী সেসব জিজ্ঞেস করল না বলে খানিকটা অবাক হলাম।

হঠাৎ সুরভী বলল, আচ্ছা এনামুল তুমি একটু বস । আমি চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে আসছি । বলে উঠে দাঁড়াল।ওদিকের দরজার কাছে যেতে না যেতেই সুরভী মিলিয়ে গেল। দরজার পর্দা দুলল না। আশ্চর্য তো। চোখের ভুল দেখলাম মনে হল। সমস্ত বাড়ি নিরব হয়ে আছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই।শব্দ যেন ঘনিয়ে ওঠা রহস্যময় তাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। এই ঘরের আলো কিছুটা ম্লান। আর বেশ ঠান্ডা ।

হঠাৎ দেখতে পেলাম নিঃশব্দে একটা বেড়াল এসে ঘরে ঢুকল। মেঝের ওপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কালো রঙের বেড়াল। চোখের মনি দুটি উজ্জ্বল হলুদ। বেড়ালটা একবারও ডাকল না। অচেনা মানুষ দেখে একবার অন্তত ডাকার কথা। অবশ্য আমি বেড়াল বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। ওয়াহেদ এখনও ফিরছে না কেন?

সোফার ওপর খবরের কাগজ পড়ে ছিল। তুলে নিলাম। দৈনিক ইত্তেফাফ। আজকাল এই পত্রিকাটা আগের মতন যত্রতত্র চোখে পড়ে না। পাতা উল্টে তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি খবরে চোখ আটকে গেল। রামপুরার একটি বাড়িতে ভৌতিক কান্ড। রাতের বেলা কীসব যেন দেখা যায়। ভাড়াটে বেশি দিন থাকে না। বাড়িওয়ালা নাকি উলটো ভাড়াটেকে দুষছে …পড়তে পড়তে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসে ।

তুমি কেঠা বাবা?

খনখনে কন্ঠ শুনে আমি চমকে উঠলাম। মুখ তুলে দেখি আমার সামনে লাঠিতে ভর দিয়ে এক থুত্থুরে বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছে। বৃদ্ধ বেশ কুঁজো। চুল-দাড়ি- ভুরু সব পাকা। মাথায় কিস্তি টুপি।পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা রঙের লুঙ্গি। আশ্চর্য! কে ইনি? সুরভী কোথায় গেল?

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অশুভ গলির তিন প্রেত­ [১ম অংশ]

5

 

নন্দীপাড়ার সরু রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। শুক্কুরবার সকাল। মেঘহীন উজ্জ্বল দিন। ঢাকা শহরের এ দিকটা বেশ ঘিঞ্জি। অনেকদিন এদিকটায় আমার আসা হয় নি। নন্দীপাড়ায় এসেছিলাম জমি দেখতে। আমার জমি পছন্দ হয়নি। তাছাড়া নিষ্কন্ঠক বলে মনে হল না। আমি ব্যাঙ্কে চাকরি করি। জাল কাগজপত্র সহজে ধরতে পারি। দালালের সঙ্গে কিছুক্ষণ চোটপাট করে এখন রাগের মাথায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।

হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল- এদিকেই তো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ওয়াহেদরা থাকত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওয়াহেদের সঙ্গেই দু-একবার ওদের নন্দীপাড়ার বাড়িতে এসেছিলাম ।যদিও ওয়াহেদ-এর সঙ্গে বহু বছর যোগাযোগ নেই। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করি তখনও মোবাইল যুগ শুরু হয়নি। এটা এক কারণ। অন্য কারণ হল, আমি এম.এ পাস করেই অনেকটা তাড়াহুড়ো করে বিদেশ চলে গিয়েছিলাম। দীর্ঘকাল প্রবাস জীবন কাটিয়ে এই বছর দশেক হল দেশে ফিরে এসেছি।

আমি ওয়াহেদের খোঁজ নেব ঠিক করলাম। ও যখন এদিকেই থাকে হয়তো সেআমাকে দস্তুরমতো এক টুকরো জমির খোঁজ দিতে পারবে। তাছাড়া ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা করার আরও একটা কারণ আছে। আমাদের সবারই বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। চুলে পাক ধরেছে। হার্টের অসুখ আর ডায়াবেটিস নিত্যসঙ্গী। এই সময়টায় পুরনো বন্ধুবান্ধবের জন্য মন হু হু করে।

সামান্য ঘোরাঘুরির পর ওয়াহেদরা যে গলিতে থাকত সেই গলিটা চিনতে পারলাম। গলির ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই আমার গা কেমন ছমছম করে উঠল। এর কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না। অস্বস্তিকর অনুভূতি এড়াতে একটা সিগারেট ধরালাম। দু’পাশে আস্তর-ওঠা দেয়াল, নোংরা ড্রেন। দোতলা, তিনতলা সব বাড়ির লোহার গেট। ঝাঁপি-ফেলা মুদিদোকান। সিগারেট টানছি। আর হাঁটছি। বাঁ পাশে কচুরিপানা ভরতি একটা পুকুর।বাতাসে পানার গন্ধ ভাসছে। শুক্কুরবারে এমনিতেই ঢাকা শহরটা ঝিম মেরে থাকে। এই গলিতেও এই মুহূর্তে লোকজন তেমন চোখে পড়ল না। রোদটা কেমন মরাটে হয়ে এসেছে। তবে আকাশে মেঘ-টেঘ জমেনি।

ভাবছি ওয়াহেদরা কি এখনও এখানেই থাকে। ও খুব প্রাণবন্ত ছেলে ছিল। সারাক্ষণ বন্ধুদের মাতিয়ে রাখত। এম.এ পড়ার সময় হঠাৎই ওর বাবা মারা যান। তারপর ওয়াহেদ কেমন গুটিয়ে যায়। ভার্সিটি কম আসত। ওর মা বেঁচে ছিলেন না। শিউলি নামে ওয়াহেদের এক বোন ছিল। আমরা ওয়াহেদদের বাসায় গেলে শিউলি পরদার ওপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মারত।ট্রেতে চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে খুব সেজেগুঁজে বসারঘরে আসত। শিউলি বেশ সুন্দরী ছিল দেখতে। ফরসা। ক্লাস নাইন কি টেনে পড়ত সম্ভবত। (ওয়াহেদ রক্ষণশীল ছিল, ও বোনকে চোখে চোখে রাখত) মনে আছে … ওয়াহেদদের বাড়িটা ছিল দোতলা। ওরাঅবশ্য একতলায় থাকত। দোতলা ছিল ভাড়া। আর একটা ফার্মেসি ছিল ওদের। ওর এক আত্মীয় বসত ফার্মেসিতে। তবে বাবা মারা যাওয়ার পর ওয়াহেদকেই ফার্মেসি দেখাশোনা করতে হত।তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সুরভী নামে একটি মেয়ের সঙ্গে ওয়াহেদের ভালোবাসার সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল। তবে সুরভীর চরিত্রে অদ্ভূত এক দ্বৈততা ছিল। বেশ শান্ত, গম্ভীর, চশমা পরা সুরভী পড়ত সমাজকল্যাণ বিভাগে। শ্যামলা রঙের ছিপছিপে সুরভী কথাও বলত কম। সুরভী ছিল রাজশাহীর মেয়ে। ওর এক কাজিন (চাচাতো ভাই) পড়ত লোকপ্রশাসন বিভাগে। কালো স্বাস্থবান, গোলগালচেহারার শাহনেওয়াজ আর সুরভীকে প্রায়ই আমরা ক্যাম্পাসে, টিএসসিতে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। ওয়াহেদ, বরাবরই দেখেছি, শাওনেওয়াজকে একেবারেই সহ্য করতে পারত না। সুরভী নাকি বলত, তুমি অহেতুক শাহনেওয়াজ ভাইকে সন্দেহ কর ওয়াহেদ।

অবশ্য আমি সরাসরি এসব ঘটনায় যুক্ত ছিলাম না। দূর থেকে দেখতাম কেবল; আর পাত্রপাত্রীকে চিনতাম শুধু। আসলে এ রকম কত ঘটনার সাক্ষীছিলাম ইউনিভার্সিটি জীবনে। ওয়াহেদ-সুরভী আর শাহনেওয়াজ-এর ত্রিমূখী দ্বন্দটি ছিল সেরকমই একটি ঘটনা।

ওদের কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত?

কথাটা ভাবতে ভাবতে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি- একটা শাটার-ফেলা একটা সেলুনের সামনে ওয়াহেদ। মাথায় ছোটছোট করে ছাঁটা লালচে শক্ত চুলে পাক ধরেছে মনে হল। লম্বাটে ফরসা মুখে খোচা খোচা পাকা দাড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের পুরু লেন্সের চশমা। পরনে খয়েরি রঙের বার্মিজ লুঙ্গি আর কুঁকচে যাওয়া গোলাপি রঙের শার্ট। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ গোটানো।

ওকে দেখে সিগারেট ফেলে দিলাম। ওয়াহেদ আমাকে দেখেছে। চিনতে চেষ্টা করছে বলে মনে হল। চিনতে পেরে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, এনামুল না?

আমি হাসলাম। হ্যাঁ, দোস্ত। কেমন আছিস?

ওয়াহেদ ফ্যাকাশে হাসল। উত্তর দিলনা। পুরু লেন্সের ফাঁকে ওর চোখ দুটি কেমন ঘোলা দেখালো। ঘোলা খুব শীতল মনে হল। মনে হল চোখ দুটি মার্বেলের তৈরি।

হঠাৎ আমার কেমন শীত করতে থাকে। হঠাৎ বাতাসে আশটে গন্ধ পেলাম। মনে হল কাছেই কোথাও বেড়াল বা ইঁদুর মরে পড়ে থাকবে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি।

বললাম, অনেক দিন পর। তাহলে তোরা এখানেই থাকিস?

ওয়াহেদ মাথা নাড়ল। বলল, বাপদাদার বাড়ি।

চারিদিকে তাকিয়ে বললাম, এ দিকটা এখনও আগের মতেই আছে। তা এখন কি করছিস তুই?

প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল ওয়াহেদ। বলল, আমরা এখনও ওই দোতলা বাড়ির এক তলায় থাকি ।বলে হাত তুলে একটা হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি দেখাল। বাড়ির সামনে প্রাচীর। খয়েরি গেইট। প্রাচীরের ওপাশে পেয়ারা গাছ চোখেপড়ে। বাড়িটা দেখেই চিনতে পারলাম।বেশ পুরনো দোতলা বাড়ি। মনে আছে ওয়াহেদ বলেছিল- ওরা ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী। তবে কুট্টি নয়।

পাশ দিয়ে একটা খালি রিকশা চলে যায়। আতরের গন্ধ ভুরভুর পেলাম। অবাক হলাম। রিকশাওয়ালা কি আতর মাখে নাকি?

এনামুল । ওয়াহেদ খসখসে কন্ঠে বলে।

কি? বল।

দোস্ত। তুই এখন আমার বাড়ি গিয়ে বস। আমি একটু পরেই আসছি।

সে কী! তুই যাবি না? তুইও চল না।

না, না। তুই যা। আমি এখটু পরেই আসছি। বলে হনহন
করে হাঁটতে লাগল ওয়াহেদ।

ভাবলাম ওর হাতে বাজারের ব্যাগ। বাজার-টাজার করতে যাচ্ছে। আমার সামনে কেনাকাটা করতে লজ্জ্বা পাচ্ছে।

আমি হাঁটতে-হাঁটতে ভাবলাম- আশ্চর্য! আমি কি করি বা কোথায় থাকি- সেসব ওয়াহেদ জানতে চাইল না।আর ওর হাতে মোবাইলও নেই দেখলাম। তবে ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [শেষ অংশ]

1

কক্ষের বিশাল জানালা দিয়ে হু হ করে চৈত্ররাতের বাতাস ঢুকলেও আমার ভীষণ গরম লাগছিল। পায়জামা পরে খালি গায়েই ছিলাম। বেশি গরম লাগলে নীচে নেমে দীঘির জলে সাঁতার কেটে আসব বলে ঠিক করলাম।
লিখলাম … প্রাথমিক ভাবে আমার ইনামগড়ের জমিদারবাড়ির এরিয়া প্রায় ছয় একর বলে মনে হয়েছে। অবশ্য কম হতে পারে আবার বেশিও হতে পারে। সবচে উল্লেখযোগ্য যেটা, লেবুবাগানে বৌদ্ধদেবী তারার একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে।মন্দিরটি সন্দেহ নেই পাল আমলের নির্মিত। কাজেই প্রায় হাজার বছরের পুরনো হওয়ার কথা। এটা একটা অনন্য ডিসকভারীই বলা যায়। তবে কিছু প্রশ্ন জাগে …
টাইপ করতে করতে মনে হল আকাশ থেকেফুটফুটে জ্যোস্না ঝরছে। অলিন্দে দাঁড়ালে দেখতে পাব চৈত্রপূর্ণিমার পূর্র্ণযৌবনা চাঁদ আর ঝাউদীঘির টলটলে রূপালি জল । বেশ বুঝতে পারছি যে আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। না হোক। কত রাতই তো আমার বই পড়ে কেটেছে। দূরথেকে হুইশিলের আওয়াজ ভেসে এল। কুউউউ ঝিকঝিক। মাঝরাতের ট্রেন। স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকারের মুখটা মনে পড়ে গেল । ভদ্রলোক যদি জানতেন যে আমি এই মধ্যরাতে জমিদার হেমেন্দু বিকাশরায় চৌধুরীর শয়ন কক্ষে বসে আছি এবং ঝাউদীঘির টলটলে রূপালি জলে উদোম হয়ে সাঁতার কাটার প্ল্যাট আঁটছি …
আমি লিখছিলাম … সেনআমলে সেনরাজাগণ বৌদ্ধদের ওপর প্রচন্ড দমনপীড়ন চালিয়েছিলেন । তাহলে লেবুবাগানের ওই বৌদ্ধমন্দিরটি কি ভাবে আজও ইনট্যাক্ট রয়েছে? এই বিষয়টির গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা কি?
এই পর্যন্ত লিখলাম। আসলে ইতিহাসএবং প্রত্নতত্ত্ব হল অনেকটা গোয়েন্দা কাহিনীর মতো । অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। তখন মাথায় জট পাকিয়ে যায় । সিগারেট টানতে টানতে পায়চারি না করলে আমার আবার মাথার জট খুলে না।
আমি দিনের বেলায় ধূমপান থেকে বিরত থাকি। রাতের হিসেব অবশ্য অন্যরকম। মালবোরোর সাদা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম।
তারপর উঠে অলিন্দে চলে এলাম।
মার্চরাত্রির স্নিগ্নধবল জ্যোস্নায় ভীষন মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ঝাউগাছের পাতা ছুঁয়ে মধুর চৈত্র বাতাস ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।মুহূর্তেই আমি পুরনো ইতিহাসের গূঢ় জিজ্ঞাসার কথা ভুলে গেলাম ।
প্রকৃতির মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম। প্রকৃতি ঘুমিয়ে পড়েছে। কী নির্জন চরাচর! কেবল একটি রাতচরা পাখি কর্কস কন্ঠে ডেকে গেলে সে অটুট নির্জনতা ক্ষণিকেরজন্য ভেঙে পড়ল। তাকিয়ে দেখলাম ঝাউদীঘির রূপালি জলে কাঁপন উঠেছে। মাছ নিশ্চয়ই। আজ যে রুইমাছ খেলাম ওই দীঘিরই বোধহয়। ওসমান গাজী ধরে রেখেছিল। আমি যে আসছি সে তো ওসমান গাজী জানতই ।
ঝাউদীঘির পানি থেকে একটা মাথা ভেসে উঠল।
মানুষের মাথা।
আমার শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে গেল।
মাথাটা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে ঠেকল । তারপর ধীরে ধীরে উঠে এল। জলে ভেজা শরীরের পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এক হাতে একটা কোদাল। অন্য হাতে টুকরি। সে মুখ তুলে দোতলার অলিন্দের দিকে তাকাল। আমি আমূল কেঁপে উঠলাম। আমার হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ল। ঝাউদীঘির মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুর? কিন্তু কিন্তু তা কি করে সম্ভব? ততক্ষণে দীঘির পানিতে আরও অনেক মাথা ভেসে উঠে। আমি কি ভুল দেখছি? আমার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে?
অবচেতন মনে কে যেন তাড়া দিল।
আমি দিগবিদিগ দৌড়ে নীচে চলে এলাম।
অন্ধকারে বেশ ক’বার ঠোক্কর খেলাম। অবশ্য যন্ত্রণা টের পেলাম না। আমার শরীর ভীষন কাঁপছিল।
ওসমান গাজী ! ওসমান গাজী ! আমার মুখে কথা ফুটল না।
ওসমান গাজী টিনসেড থেকে বেড়িয়ে এল। বলল, হজুর জলদি গাড়িতে উঠেন।বলেই এক লাফে জুরীগাড়িতে চড়ে বসল ওসমান গাজী।
আমিও দরজা খুলে ভিতরে বসতে দেরি করলাম না । থরথর করে কাঁপছিলাম। ঘামে শরীর ভিজে গেছে।
জ্যোস্নামাখা লেবুবনের মাঝখান দিকে ঘোড়াগাড়ি ছুটছে।
দু’পাশের লেবুগাছগুলি ভীষন কাঁপছিল। অশুভ আত্মার তপ্ত নিঃশ্বাস টের পাচ্ছিলাম যেন। দেখতে দেখতে জুরীগাড়ি শালজঙ্গলে উঠে এল। ঘোড়া দুটি ভীষণ চিঁ হি চিঁ হি করছে। ওরাও ভয় পেয়েছে। দু’পাশের শালজঙ্গলেওযেন ঝড় উঠেছে। ভয়ানক শনশন আওয়াজ হচ্ছে । গাছগুলি দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। জুরীগাড়ি একবার কী সেরধাক্কায় ভয়ানক কেঁপে উঠল। ওসমান গাজী প্রাণপন চেষ্টা করে তাল সামলালো।
তারপর কখন যেন রেলস্টেশনের সামনে জুরীগাড়িটা থামল ওসমান গাজী ।
নামেন হুজুর। আর কোনও ভয় নাই।
আমি দরজা খুলেই এক লাফে নীচে এলাম।
তারপর ছুটে গেলাম স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে।
স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সিগারেট ফুঁকছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, বুঝেছি। বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। যাক। আধঘন্টা পরেই ঝিকড়গাছার একটি ট্রেন আছে। সেই ট্রেনে আপনাকে তুলে দেব। এখন আমার ঘরে আসুন। কিছু একটা পরে নিন।

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [২য় অংশ]

1

 

সবাই বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী নাকি ঝাউদীঘির জল থেকে কয়েক শ মানুষ ভেসে উঠতে দেখেছিলেন। মানুষগুলির পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি; এক হাতেকোদাল, অন্য হাতে টুকরি।

বলেন কী!

হ্যাঁ। ইনামগড়ের লোকে বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী ঝাউদীঘি থেকে মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুরদের উঠে আসতে দেখেই মারা গেছেন।

কথাটা আমার কেন যেন ঠিক বিশ্বাস হল না। আমি ঠান্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবলাম।

(১) জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। হয়তো হার্ট অ্যাটাক করেছিল। সেই আমলের মানুষ আজকের দিনের মতো এত স্বাস্থসচেতন ছিল কি? আর ডাক্তারি বিদ্যের জোর তো তথইবচ

(২) ঝাউদীঘি থেকে মৃত শ্রমিকদের তো জীবিত উঠে আসার প্রশ্নই আসে না।

(৩) এ দেশের মানুষ ভীষন গল্পপ্রিয়। অনেকে আবার ভালো গল্প-বলিয়ে। স্টেশনমাস্টারটি সেরকমই গুণধর একজন মানুষ । নির্জন স্টেশনের নিঃসঙ্গ মানুষটি আমাকে দেখে গা ছমছমে গল্প ফেদেছেন, সমস্ত প্রতিভা উজার করে দিয়েছেন। গল্পবরং উপভোগ করাই ভালো। তর্ক করে লাভ নেই।
আমি গত তিরিশ বছর পেশাগত কাজে কতপুরনো বাড়িতে কাটিয়েছি। কই, কখনও তো কোনও অশুভ প্রেতাত্মা ভয়াল রূপ ধরে আমার সামনে এল না । বন্ধুরা আমাকে ডাকাবুকো বলে। পরলোকে অবিশ্বাসী বলেও আমার দুর্নামও আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, পরের বছর চৈত্র মাসের গোড়ায় মারা গেলেন জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ট পুত্র জমিদার দিব্যেন্দুপ্রকাশ রায়চৌধুরী। ওই একই ভাবে। গরমে ঘুম আসছিল না। মাঝরাতে অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ ঢলে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
ওহ্ ।
আপনাকে তখন একবার বলেছি সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধর ইন্ডিয়া চলে যায়। এখন নাকি রায়চৌধুরী পরিবারের অনেকেই বিলেতে থাকেন।
আচ্ছা।
স্টেশনের বাইরে খটাখট খটাখট ঘোড়া ক্ষুরের আওয়াজ পেলাম।
স্টেশনমাস্টার সচকিত হয়ে বললেন,আপনার লোক বুঝি এসে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাদিক সাহেব? অমন অশুভ জায়গায় আপনার না গেলে চলে না?
মৃদু হেসে বললাম, উপায় নেই। সরকারি কাজে এসেছি। বলে ভারী সুটকেশটা তুলে নিলাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, ঠিক আছে। অশুভ জায়গায় যখন যাচ্ছেন যান। কিন্ত বলে রাখি, আমি সারারাতই স্টেশনে আছি। তেমন কোনও বিপদ টের পেলেই ছুটে আসবেন ।
কথাটা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
কেয়ার টেকারের নাম ওসমান গাজী। বৃদ্ধই বলা যায় । তবে স্বাস্থ বেশ ভালো। এই বয়েসেও বেশ গাট্টাগোট্টা। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় নীল রঙের মখমলের টুপি। টুপির নীচে পিছনের দিকে চুল যা বেরিয়ে আছে তার সব পাকা। বসন্তের দাগ ভরতি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ফিরোজা রঙের সদরিয়া আর চোস্ত পাজামা পরে ছিল ওসমান গাজী । বৃদ্ধের হাঁটাচলার ভঙ্গি খুবই নিরীহ । কথাবার্তায়ও অত্যন্ত বিনয়ী।
ওসমান গাজী আমার সুটকেশটা ঘোড়াগাড়িতে তুলে দিল। ইনামগড়ের রাস্তায় যে আজও এই একুশ শতকের বাহনটি চলে সেটি জানতাম না। নিছক ছ্যাকড়া গাড়ি হলে না-হয় এক কথা ছিল, এ তো দেখছি রীতিমতো জমিদার আমলের আলিশান জুরীগাড়ি! ভিতরে সবজে রঙের গদিওয়ালা বসার আসন। ওপর থেকে ঝুলছে ছোট ছোট ঘন্টি লাগানো ঝালর। ছোট আয়নাও বসানো রয়েছে দেখলাম। বেশ উপভোগই করলাম উনিশ শতকী বাহনটা।
শালজঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পিচরাস্তা বেঁকে চলে গিয়েছে। শেষবেলায় উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে ছিল। সবে চৈত্রের শুরু। বনে অজস্র শুকনো পাতা। আচমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঘোড়াগাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিতেই একটা ময়ূর চোখে পড়ল । বেশ পুরনো আমলের আবহ। পথটা ধীরে ধীরে সরু হয়ে উঠেছে। দু’পাশে এখন ঘন লেবুবাগান। লেবুবাগানে আলোআধাঁরির খেলা আর কাক-পাখিদের অসহ্য কিচিরমিচির।
লেবুবাগানের মাঝখানে একটা টিনসেড। তারই সামনে ঘোড়াগাড়ি থামল। ঘোড়াগাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি। একতলা টিনসেডের সামনে একচিলতে বারান্দা। খাওয়ার টেবিল। কাঠের একটা বেঞ্চি। ওসমান গাজী বেঞ্চির ওপর আমার সুটকেশটা রেখেঅত্যন্ত বিনীত কন্ঠে বলল- সে এই টিনসেডেই থাকে। আমার থাকার ব্যবস্থাও নাকি সে ওখানেই করেছে।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম রান্নার জায়গা বাদেও ছোট ছোট দুটি ঘর। একটা ঘরের মেঝেতে কোদাল ও টুকরি দেখলাম। হয়তো ওগুলি বাগানে কাজ করার সময় ওসমান গাজীর কাজে লাগে।
লেবুবাগানের ভিতর ছোট্ট একটি পুরনো মন্দিরও চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম।বৌদ্ধদেবী তারার মন্দির। বাংলাদেশে এ ধরনের মন্দির রেয়ার। আমি ঝটপট আমার ক্যানন রিবেল এক্সএসটা বের করলাম। তারপর বিভিন্ন অ্যাঙেলে ছবি তুলে নিলাম।
তখনও যেহেতু দিনের আলো ছিল। আমি জমিদার বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখব ভাবলাম। অল্প একটু ঘুরে যা মনে হল আমার। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দিটা অন্তত ছয় একরের কম হবে না। মূল ভবনের ইমারতগুলি বেশ উঁচু উঁচু । দেখেই বুঝলাম উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।রায়চৌধুরীরা যে জৌলুসপূর্র্ণ জীবনযাপন করত তাও বোঝা গেল। এখন অবশ্য ইমারতগুলি – দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে যা হয়-ইঁদুর, চিকা, চামচিকা, চড়–ই পাখি আর কবুতর দখলে চলে গেছে।
প্রধান প্রবেশপথের বাম পাশে মূলভবনের এলাকার মধ্যেই খোলা জায়গায় একটি কৃষ্ণমন্দির। তারই ডান পাশে মূল ভবনের বহির্বাটি এবং প্রবেশপথ। তারপর বর্গাকার একটি চত্বর। পূর্ব দিকে চত্বরমুখী সমতল ছাদবিশিষ্ট আরও একটি মন্দির। মন্দিরের সামনের অলিন্দ এবং মন্দিরের ছাদটি রয়েছে চারটি স্তম্ভের উপর । মূল বাড়িটি তিনটি প্রধান মহলে বিন্যস্ত। আয়না মহল, রানী মহল এবং ঠাকুরবাড়ির মহল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দলদালানের ইট ক্ষয়ে গেছে।
একতলার কক্ষের দরজা-জানালাগুলিভেঙে পড়েছে । অনেক দরজায় আবার তালা। তালাগুলি ওসমান গাজী কে দিয়ে ভাঙাতে হবে। একতলার একটি কক্ষে বড় বড় ছ’-সাতটি সিন্দুক দেখলাম । সিন্দুকগুলি খুলে দেখতে হবে। ভিতরে যা আছে তার লিষ্ট করতে হবে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [১ম অংশ]

1

স্টেশনমাস্টারের কথায় রীতিমতো চমকে উঠলাম। ইনামগড়ের রায় চৌধুরীদের জমিদার বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত। রাতের বেলা তো দূরের কথা স্থানীয় লোকজন দিনের বেলাও নাকি ওদিকে ঘেঁষে না। আমি খানিকটা বিমূঢ় বোধ করলাম। কারণ একটু পরই আমার রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়ি তে যাওয়ার কথা। আমি স্টেশনমাস্টারের মুখের দিকে তাকালাম। মাঝবয়েসি ভদ্রলোক । শিক্ষিত, ভদ্র চেহারা। এমন মানুষের তো কাউকে মিছিমিছি ভয় দেখানোর কথা না। আমি যদিও অভিশপ্ত ভুতুরে হানাবাড়িতে বিশ্বাস করি না। তাই সদ্য পরিচিত ভদ্রলোকের সামনে ভদ্রতা করেই চুপ করে রইলাম। স্টেশনমাস্টার চা খেতে দিয়েছেন। তাতেই চুমুক দিলাম।
স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকারের মাথায় মস্ত টাক। গায়ের রং যথেষ্ট ফরসাই বলায় যায়। ছোটখাটো গড়ন। পরনের পাজামা-পাঞ্জাবি দেখলেই বোঝা যায় স্টেশনমাস্টারটি অত্যন্ত সাদাসিদে । আধঘন্টা আগে যখন আমি ইনামগড় স্টেশনে নামলাম তখন তিনিনিজে থেকেই আলাপ করতে এলেন। তার ঘরে ডেকে বসালেন। তারপর প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর চা খেতে দিলেন।
আমি যখন ইনামগড় স্টেশনে নেমেছি বেলা তখন তিনটা। ঝকঝকে দিনের আলো ছড়িয়ে ছিল। স্টেশনটি অবশ্য নিজর্নই ছিল। আমি সামান্য অস্বস্তির মধ্যেই পড়ে গিয়েছিলাম। আমার জন্য একজন কেয়ারটেকার অপেক্ষা করার কথা। স্টেশনে সেরকম কাউকে অবশ্য দেখতে পেলাম না।
আমি পুরাতত্ত্বের ওপর কিছু বই লিখেছি। বইগুলি দেশিবিদেশি পুরাতাত্ত্বিক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। দিন কয়েক আগে পুরাতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। আমি যেন সংরক্ষণ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে ইনামগড়ের রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়িটির ওপর একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিই। এ কারণেই আমার আজ ইনামগড়ে আসা।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাতচল্লিশে পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধরেরা ইন্ডিয়া চলে যায়। তারপর থেকেই ইনামগড়ের জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে।
আচ্ছা। বলে আমি চায়ে চুমুক দিলাম। তারপর স্টেশনমাস্টার কে জিজ্ঞেস করলাম, তখন ঝাউদীঘি নিয়ে কি যেন বলবেন বললেন?
স্টেশনমাস্টার ম্লান হেসে বললেন, আমি এই ইনামগড়ে এসে যা শুনেছি তাই আপনাকে বলছি। এখানে এসেই শুনেছি রায়চৌধুরীদের ওই জমিদারবাড়িটি অভিশপ্ত। জানি যে একুশ শতকে এই সব কথা বিশ্বাস করাকঠিন। আর আপনি যখন শিক্ষত মানুষ।
আপনি কখনও গিয়েছেন জমিদারবাড়িতে? আমার প্রত্নবিদের মন প্রশ্নটা করে বসল।
সর্বনাশ! বলেন কী আমি যাব ঐ অলুক্ষে হানাবাড়িতে?
তাহলে তা সবই শোনা কথা?
হ্যাঁ। তা বলতে পারেন। সবই শোনা কথা। স্টেশনমাস্টার যেন সামান্য মিইয়ে গেলেন।
বললাম, বলুন তাহলে শুনি, আপনি কি শুনেছেন। হাতে যখন সময় আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, বলছি, শুনুন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। এ অঞ্চলে খুব খরা হল।মাঠঘাট, খালবিল, নদীনালা সব শুকিয়ে কাঠ। পানির অভাবে ঘরে-ঘরে কান্নার রোল। তৃষ্ণার্ত প্রজারা ভাবল- একটা জলাশয় থাকলে এত দুর্ভোগ ভোগ করতে হত না। কিন্তু কথাটা তারা রগচটা জমিদারের কানে তুলতে সাহসপেল না। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর স্ত্রী চিত্রলেখা দেবী ছিলেন ভারি দয়ালু মহিলা । নিয়মিত ধ্যান-দান করতেন। প্রজাদের সুখদুঃখের খোঁজখবর করতেন। তো, চিত্রলেখা দেবীর কাছেই প্রজারা একটি দীঘি খননের অনুরোধ করে। স্ত্রীর সানুনয় অনুরোধ নাকি জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী উপেক্ষা করতে পারেন নি। জমিদারবাড়ির পিছনে ছিল বিশাল একটি ঝাউবন । সেই ঝাউবনে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী দীঘি খননের জন্য জমি দান করে দিলেন। শত শত মাটি-কাটিয়ে মজুর দিনরাত কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে লাগল, তাতে একটা গভীর খাত তৈরি হল ঠিকই- কিন্তু পানি উঠল না। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী মাটি-কাটিয়ে মজুরদের মাটি কেটে আরও গভীরে যেতে নির্দেশ দিলেন। তারপরও পানি উঠল না দেখে অসন্তুষ্ট জমিদার এক তান্ত্রিক যোগী তলব করে জলশূন্য দীঘির পাড়ে ‘জলধি পূজার’ আয়োজন করলেন । তারপরও পানি উঠল না। হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী মাটি-কাটিয়ে মজুরদের মাটি কেটে আরও গভীরে যেতে নির্দেশ দিলেন। শত শত শ্রমিক খাদের তলায় কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চলেছে। টুকরি করে মাটি ওপরে এনে ফেলছে। হঠাৎ এক বিকেলে পানি উঠে গভীর খাতটা ভরে গেল। মুহূর্তেই সব মজুর তলিয়ে গেল।
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। হতভাগ্য শ্রমিকদের ভাগ্য চিরকালই মন্দ। এদের মধ্যে বিশ্বজুড়ে খনিশ্রমিকদের অবস্থাই সবচে করুন সম্ভবত।
স্টেশনমাস্টারের টেবিলের ওপর একটা মেরুন রঙের পুরাতন ফ্লাক্স। তিনি ফ্লাক্স খুলে কাপে চা ঢাললেন। তারপর সিগারেট ধরালেন। বাতাসে তামাকের গন্ধ ছড়াল । স্টেশনমাস্টারের চেয়ারের ঠিক পিছনেই একটি জানালা। জানালার কাঁটাতারের বেড়ায় রঙনের গুল্ম। বেড়ার ওপাশেশালগাছের ঘন জঙ্গল চোখে পড়ে। অনেক কাক ডাকছিল। রোদের রং ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চৈত্রবেলার নির্জন অপরাহ্ন। স্টেশনটা কেমন সুমসাম করছে।
চায়ের কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বললাম, তারপর কি হল?
একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, ইনামগড়ের মানুষ খরায় অসহ্য বোধ করছিল। দীঘি পানি তে ভরে উঠলে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেল। টলটলে পানির দীঘির চারধারে ঝাউগাছ । তাতে দীঘির নাম লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল- ঝাউদীঘি।
আর মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুররা? ওদের লাশ পাওয়া যায়নি?
না।
না। আশ্চর্য!
স্টেশনমাস্টার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, লাশ হয়তো সেভাবে খোঁজাও হয়নি । সেকালে দরিদ্রশ্রেণির মানুষের মৃত্যু নিয়ে কে অত মাথা ঘামাত বলুন?
হুমম। আমি মাথা নাড়লাম। মনে মনে বললাম … দরিদ্রশ্রেণির অবস্থা এই একুশ শতকেও তো বিশেষ বদলায়নি।
প্রবীণ স্টেশনমাস্টারের মুখ কেমন গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বোঝাই যাচ্ছে ভদ্রলোক এখনি পিলে চমকানো কোনও তথ্য দেবেন। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, তারপর কী হল শুনুন। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর অনিদ্রা রোগ ছিল। মাঝরাতে শয়নকক্ষের বাইরের অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। ভীষন গরম। চৈত্রমাসের শুরু। হঠাৎ তিনি ঢলে পড়ে গেলেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
মারা গেলেন? কি হয়েছিল? আমি ভুঁরু কুঁচকে জিগ্যেস করলাম

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

 

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [শেষ অংশ]

0

 

অফিসঘর পেরিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। অফিঘরের আসবাবপত্র ভীষণ শব্দে ভেঙে ফেলছে। এক দৌড়ে সদর দরজা পেরিয়ে গেলাম। জঙ্গলের ভিতরে প্রাণপন দৌড়াচ্ছি। পিছনে দু’পাশের গাছে দুদ্দার শব্দে । যেন ভয়ানক ঝড় উঠেছে।
তারপর কখন যে তল্লা বাঁশের ঘন বন পেরিয়ে গুহার মুখে এসে পৌছলাম।তবে দৌড়ের গতি কমালাম না। একেবারে মঙ্গল ভট্টারক- এর সামনে এসে থামলাম। ভীষন হাঁপাচ্ছিলাম। মেঝের ওপর বসে পড়লাম। দরদর করে ঘামছিলাম সম্ভত। কান পাতলে নির্জন গুহায় আমার হৃৎস্পন্দন শোনা যাবে।
মঙ্গল ভট্টারক ধ্যানমগ্ন ছিলেন। এখন চোখ খুলে তাকালেন। তারপর প্রসন্নকন্ঠে বললেন, ভীত হইও বৎস। এক্ষণে তুমি নিরাপদ বলয়ে অবস্থান করিতেছ।
আমি কিছু বলতে গেলাম। মঙ্গল ভট্টারক হাত তুললেন। অর্থাৎ সব আমি জানি।
আমার ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল। মঙ্গলভট্টারক কীভাবে যেন টের পেলেন। আমার দিকে একটি কলো রঙের মাটির পাত্র এগিয়ে দিলেন। কি আছে পাত্রে? অত ভাববার সময় নেই। এক চুমুকে শেষ করলাম। মিষ্টি পানীয়।অপরিচিত স্বাদ। তবে মুহূর্তেই আমার সমস্ত শরীর জুড়িয়ে গেল।
গুহার বাইরে বজ্রপাতের প্রচন্ড শব্দ হল। আমি চমকে উঠলাম। মঙ্গল ভট্টারক বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন, বৎস, এক্ষণে আমি তোমার কৌতূহল মিটাইব। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।
আমি শুনতে লাগলাম।
মঙ্গল ভট্টারক বলতে লাগলেন-মানবজগতে আদিকাল হইতেই এক দূরাত্মা সম্প্রদায়ের যোগীগণ ডাকিনীবিদ্যা সাধনা করিত। পক্ষান্তরে পূণ্যাত্মা সম্প্রদায়ের যোগীগণ চৈতন্যময়ী সত্তার সাধনা করিত। যোগীগণ আপন আপন স্বভাব বশত ডাকিনীবিদ্যা কিংবা চৈতন্যময়ী সত্তার সাধনা করিত। তবে আদিকাল হইতেই চৈতন্যময়ী সত্তার সাধকগণ মহেশ্বরের আর্শীবাদ লাভ করিয়া আসিতেছেন। গোপনে ডাকিনীবিদ্যার সাধনা করে এইরূপ দূরাত্মা যোগী কামাখ্যা শক্তিপীঠে দূলর্ভ নয়। প্রাচীন নিগূঢ়শাস্ত্রে লিখিত আছে যে- ডাকিনীবিদ্যার সাধনা সার্থক হইলে কিংবা ব্যর্থকাম হইলে জগতে ঘোর তমসা নামিয়া আসে। তেমনই এক ডাকিনীবিদ্যার সাধক হইলদূরাত্মা জগন্ধর।
দূরাত্মা জগন্ধর? আমি জিজ্ঞেস করি।
হাঁ। দূরাত্মা জগন্ধর। প্রাগজ্যোতিষপুর নিবাসী দূরাত্মা জগন্ধর স্বভাবে খল, ধূর্ত এবং প্রতারক। তাহার গুরু ছিল কামাখ্যা মন্দিদের ঋষি সত্যবর্মন। হা, ঋষি সত্যবর্মনকে আমরা সত্যদ্রষ্ট্রা ঋষি জ্ঞান করিতাম। তিনি অতি উচ্চস্তরের যোগী ছিলেন। ঋষি সত্যবর্মন চৈতন্যময়ী সত্তার সাধক হইলেও ডাকিনীবিদ্যার সম্বন্ধে গভীর বুৎপত্তি অর্জন করিয়াছিলেন। সত্যবর্মন বৃদ্ধ হইয়াছিল। যুবা বয়েসে জগন্ধর ঋষি সত্যবর্মন- এর নিকট হইতে ডাকিনীবিদ্যার গূহ্যজ্ঞান কৌশলে আত্বসাৎ করে এবং সত্যবর্মন কে হত্যা করে। ইহার পর জগন্ধর কামরূপ হইতে আসামের গভীর অরণ্যে পালাইয়া যায় এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে ডাকিনীবিদ্যা সাধনা করিতে থাকে ।কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধনঞ্জয় জগন্ধর- এর উপর অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া উঠিলেন। জগন্ধর এর সাধনা চরিতার্থ হইলে জগতে অশেষ অকল্যাণ সাধিত হইবে এই ভাবিয়া তিনি জগন্ধর কে হত্যার সিদ্ধান্ত লন। এই উদ্দেশ্যে কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধনঞ্জয় অষ্টাদশ সন্ন্যাসীকে মন্ত্রপূত ত্রিশূল প্রদান করিয়া জগন্ধর হত্যার দায়িত্ব অর্পন করে। আমি হইলাম অষ্টাদশ সন্ন্যাসীর একজন।
আমি চমকে উঠে বললাম, আপনি?
হাঁ। আমি। আমি ধ্যানযোগে জগন্ধর- এর অবস্থান জানিতে পারি। জঙ্গলবাড়ির পিছনে ছাঁচি বেতের ঘোর অরণ্যের পশ্চাতে যে পার্বত্যটিলা রহিয়াছে তাহারই এক নিভৃত গুহায় বসিয়া দূরাত্মা জগন্ধর সাধনা করিত।
আশ্চর্য!
ঋষি সত্যবর্মন-এর অভিশাপে জগন্ধর ডাকিনীবিদ্যায় সিদ্ধি লাভ করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। জগন্ধর এখন মূর্তিমান ডাকিনী হইয়া উঠিয়াছে। সে স্ত্রীলোকের মূর্তি ধরিয়া তরুণ যুবকের রক্ত পান। স্ত্রীলোকের মূর্তি করিতে জগন্ধর তোমার স্ত্রীর উপর ভর করিয়াছে।
আমি শিউরে উঠলাম। মনে পড়ল আজ জ্বরথেকে উঠে রামুর দিকে অদ্ভূত দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল পিয়ালী। তারপর রান্নাঘরে রামুর রক্ত খাচ্ছিল।
গুহামুখে ঝড় আর বজ্রপাতের শব্দ ততক্ষণে থেমে গেছে। এবার ক্রদ্ধ বাঘের রাগী গর্জন শোনা গেল। মঙ্গল ভট্টারক সেদিকে একবার তাকালেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। মঙ্গল ভট্টারক আমাকে অভিভূত করে চোখের নিমিষে জটাধারী শিবমূতি ধারণ করলেন। ডানহাতে চকচকে ত্রিশূল। বিদ্যুৎগতিতে ‘রে’ ‘রে’ শব্দে ভয়ঙ্কর চিৎকার করে ত্রিশূল উঁচিয়ে গুহামুখের দিকে ছুটে গেলেন মঙ্গল ভট্টারক । আমিও পিছন পিছন ছুটলাম। গুহামুখে ঝলমলে রোদ। সেই রোদের আলোয় একটা বিশালকায় ডোরাকাটা প্রাণি দেখতে পেলাম । অনেকটা বাঘের মতন দেখতে। তবে আকারে অনেক বড়। প্রায় হাতির সমান। প্রাণিটা মঙ্গল ভট্টারক- এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তার আগেই ক্ষিপ্র গতিদে প্রাণিটাকে লক্ষ করে সুতীক্ষ্ম ত্রিশূল ছুঁড়ে মারলেন মঙ্গল ভট্টারক। ত্রিশূল হলদে ডোরাকাটা প্রাণির দেহে বিদ্ধ হল। মর্মদন্ত চিৎকারে গুহা কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল বনভূমি। প্রাণিটা সশব্দে আছড়ে পড়ল। তারপরই চারধার ঘন ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমি কটূ গন্ধ পেলাম । একটু পর ধোয়া সরে গেলেমঙ্গল ভট্টারক কিংবা কোনও বিশালকায় ডোরাকাটা প্রাণির প্রাণহীন দেহ দেখতে পেলাম না।
দ্রুত জঙ্গলবাড়িতে ফিরে এলাম। রামুর লাশটা তখনও একতলার রান্নাঘরে পড়েছিল। আমার কান্না পেল। কিন্তু, পিয়ালী কে পেলাম না।বুকটা ভীষণ কাঁপছে। দ্রুত দোতলায়উঠে এলাম। পিয়ালী বিছানার ওপর শুয়ে ছিল। ভঙিটা বিধস্ত। যেন অনেক ঝড় বয়ে গেছে। শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। শ্যামলা মুখটা কেমন ফ্যাকাশে। ফিসফিস করে বলল, আমার কি হয়েছে?
ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, কিছু হয়নি।
পিয়ালীর চিকিৎসা দরকার। দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। তারপর আমি আর পিয়ালী নীচে নেমে এলাম। অরুকে দেখলাম সদর দরজার কাছে ।
রুস্তমের পিঠে চড়ে থানচি রওনা হলাম। থানচি পৌছে রামুর লাশ সৎকারের জন্য অরুকে টাকা দেব। আজ রাতটা থানচির রেস্টহাউজে থাকব। কাল সকালে বান্দারবানের বাস ধরব।
এই জীবনে আর জঙ্গলমুখো হচ্ছি না।
টেকনাফ শহরে বাপদাদার ভিটেয় পিয়ালীকে নিয়ে সুখের ঘর বাঁধব

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [১ম অংশ]

0

তল্লাবাঁশের ঘনবনের মাঝখান দিয়ে সরু পাহাড়ি পথ। কিছু দূর হাঁটতেই চাকুয়া কড়াই আর নাগেশ্বর গাছের জঙ্গল পড়ল। সে জঙ্গল পেরুতেই চোখে পড়ল বড় একটি টিলা। টিলার পুবপাশে ছোট একটি গুহা। অরু গতকাল বিকেলে আমাকে বলল যে ওই গুহার ভিতরে নাকি এক সন্ন্যাসী আস্তানা গেড়েছে। কথাটা শুনে আমি মোটেও অবাক হইনি। বান্দারবানের পূর্ব দিকে বার্মার বর্ডার। সেই বর্ডার পর্যন্ত গহীন জঙ্গল আর ছোট ছোট পাহাড়-টিলার অজানা রাজ্য। যাকে বলে- ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ ; আজও এখানে কত যে সাধুসন্ন্যাসী ঘুরে বেড়াচ্ছে। বছর পাঁচেক হল আমি বান্দরবানে আছি। বছর তিনেক আগে একবার আমি গহীন জঙ্গলের ভিতর সাঙ্গু নদীর তীরে একটা বড় হরিণা গাছে নরমন্ডু ঝুলিয়ে তার তলায় এক তান্ত্রিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে বসে থাকতে দেখেছিলাম।

তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর টিলাটি বান্দরবানের গভীর অরণ্যে আমার যেজঙ্গলবাড়িটি রয়েছে- তার বেশ কাছে। কাজেই হেঁটে যাব বলে হাতির পিঠে চড়িনি। শুকনো পাতা মাড়িয়ে হাঁটছি। শেষ বিকেল। চারিদিকে নরমহলদে আলো ছড়িয়ে আছে। বনের বাতাসে লতাপাতার মাদক- মাদক গন্ধ। তবে এ সময়টায় কাকপাখির চিৎকারে কান পাতা দায়। প্রথম প্রথম জঙ্গলে এসে কাকপাখির চিৎকার যন্ত্রণার মতন লাগত। এখন অবশ্য কর্কস কলতান অনেকটাই সহ্য হয়ে গেছে। বেশ নিশ্চিন্তেই হাঁটছি। অরণ্য-প্রকৃতি আমার ভালো লাগে। নইলে এতটা বছর কীভাবে কাটল এই ঘোর জঙ্গলে?
বাঁ পাশে একটা কামদেব গাছ। সেই গাছ থেকে সরসর শব্দে নেমে এল একটাখয়েরি রঙের বুনো খরগোশ। তারপর চোখের পলকে ওদিকের উলু ঘাসের আড়ালে সুড়ৎ করে লুকালো। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে খসখস শব্দে কি যেনএকটা চলে গেল। ডান পাশে একটা বাঁদলহোলা গাছ। তারই ডালে বসেছিলএকটা ছাই রঙের পাহাড়ি বাজ। চোখে পড়ামাত্রই বাজটা উড়াল দিল। বাদামি রঙের উল্টোলেজি একটা বাঁদর বসে আছে একটা উদাল গাছের ডালে । বাঁদরটা আমায় আমায় চেয়ে চেয়ে দেখছিল। তবে মুখ ভেঙচালো কিনা ঠিক বোঝা গেল না। উল্টোলেজিটাকে তেমন বখাটে মনে হলনা।
শুকনো পাতা মাড়িয়ে গুহার সামনে এলাম । গুহার মুখটি বেশ বড়োসরো। আল্লা-খোদার নাম নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বাতাসে কেমন বিদঘুটে গন্ধভাসছিল; ঠিক গন্ধক কিংবা চুনাপাথরের গন্ধ নয়, কেমন চর্বিপোড়া গন্ধ মনে হল। তান্ত্রিক সাধুসন্ন্যাসীর গুহায়এমন বিদঘুটে গন্ধ অস্বাভাবিক কিছু না। চারপাশে আবছা অন্ধকার জমে ছিল। ওপাশে আলো চোখে পড়ল। ধুনির আগুন জ্বলেছিল। তারই সামনেএকজন মাঝবয়েসি জটাধারী সন্ন্যাসী বসে রয়েছেন। ভঙ্গিটা পরিচিত। বজ্রাসন। সন্ন্যাসী চোখ বুজে ধ্যানস্থ ছিলেন। শীর্ণ শরীরটি হাড্ডিসার। মাথার চুলে এন্তার জটা থাকলেও চুল চুড়া করে বাঁধা। তবে চোখ দুটি শান্তই মনে হল যখন চোখ খুলে সন্ন্যাসী তাকালেন। আমাকে কিছুক্ষণ দেখে সামনে বসতে ইঙ্গিত করলেন। আশ্বস্থ হলাম। কেননা, আমায় দেখে সন্ন্যাসী যদি বিরক্ত হতেন তাহলেআসতাম না বলে ঠিক করেছিলাম।
সন্ন্যাসীর সামনে বসলাম।
আমি আর কী বলব। একটু পর সন্ন্যাসীই নিরবতা ভাঙলেন। জানালেন সন্ন্যাসীর নাম- মঙ্গল ভট্টারক। এমন কাটখোট্টা নাম শুনেঅবশ্য অবাক হলাম না। কাপালিক-সন্ন্যাসীগণের নাম এমনই গুরুগম্ভীর হওয়া উচিত। কিন্তু, মঙ্গল ভট্টারক কি কাপালিক? তান্ত্রিক এবং কাপালিকের মধ্যে ঠিক কি পার্থক- আমি সেটি জানি না।
তবে মজার ব্যাপার হল মঙ্গল ভট্টারক কথা বলেন সাধু ভাষায় । আদিবাড়ি সিলেটের জৈন্তারপুরে । (মঙ্গল ভট্টারক পিতৃ প্রদত্ত নামটি অবশ্য বললেন না …) হৃদয়ে বাল্যবয়েস থেকেই চৈতন্যময়ী সত্তার স্বরূপ জানার উদগ্র ইচ্ছা। সুতরাং কিশোর বয়েসে তন্ত্রসাধনার উদ্দেশে আসামের কামরূপ জেলার কামাখ্যা মন্দিরে গমন করেন। কামাখ্যা মন্দিরে সুদীর্ঘ তিরিশ বছর তন্ত্রবিদ্যায় দীক্ষা নিয়েছেন। এখন নির্জন সাধনার উদ্দেশ্যে বান্দরবানের এই দুর্গম অরণ্যে এসেছে।
কথাগুলি শুনে সামান্য উসখুস করি।কারণ সময়টা একুশ শতক। তাই জিজ্ঞেস করলাম, কামাখ্যা মন্দিরেকথা অনেক শুনেছি। তা ওই মন্দির সম্বন্ধে যেসব কথা শুনতে পাই সেসব সত্য নাকি?
মঙ্গল ভট্টারক মাথা দুলিয়ে বললেন, অবশ্যই সত্য। কামাখ্যা মন্দির হইল শক্তিপীঠ।
মনে মনে বললাম, বুঝলাম যে কামাখ্যা মন্দির হল শক্তিপীঠ। কিন্তু তাতে কি প্রমাণ হয় যে কামাখ্যা মন্দির অপ্রাকৃত যাদুবিদ্যারও পীঠস্থান? আমি সন্দেহের সুরে বললাম, কামাখ্যা মন্দিরটা আসামের ঠিক কোথায় বলেন তো?
মঙ্গল ভট্টারক আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী সব দেখতে লাগলেন। আমার অস্বস্তি হতে লাগল। আমি যে সংশয়বাদী তা সম্ভবত তিনি টের পেয়েছেন। আমার চোখের দিকে তাকিয়েমঙ্গল ভট্টারক গম্ভীর কন্ঠে বললেন, শক্তিপীঠ কামাখ্যা মন্দিরহইল প্রাগজ্যোতিষপুরের পশ্চিমে নীলাচল নামক একটি পর্বতের উপরে।
কথাটা মঙ্গল ভট্টারক এমনভাবে বললেন যেন ভারি এক গুপ্তকথা বলেছেন।
তবে মঙ্গল ভট্টারক পুরনো নাম বললেন। ইচ্ছে করেই কিনা কে জানে। প্রাগজ্যোতিষপুর এখন গোহাটি শহর। তিনি প্রাগজ্যোতিষপুর না বলে গোহাটিও বলতে পারতেন। তাতে অবশ্য তন্ত্রবিদ্যার মাহাত্ম ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা ষোলআনা।
জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক কি আছে কামাখ্যা মন্দিরে?
মঙ্গল ভট্টারক এবার খানিকটা প্রগলভ হয়ে উঠলেন যেন। প্রসন্ন কন্ঠে বললেন, শক্তির পীঠস্থানে রহিয়াছে দেবী কামাখ্যার সুপ্রাচীন প্রতিমা। বড় জাগ্রত দেবী কামাখ্যা । তিনখানা প্রাচীনপ্রকোষ্ঠ লইয়া মন্দির গঠিত হইয়াছে। পশ্চিমের আয়তক্ষেত্রকারপ্রকোষ্ঠখানাই বৃহদাকার। সাধারনপূণ্যার্থীগণ পশ্চিমের এই বৃহদাকার প্রকোষ্ঠখানায় বসিয়া দেবী উপাসনা করিয়া থাকে। মধ্যবর্তী প্রকোষ্ঠখানা আকারে চতুস্কোন। ইহাতে শক্তিদেবীর ছোট্ট একখানা প্রতিমা রহিয়াছে। দেওয়ালের পাষানে নারায়ণের এবং অন্যান্য দেব-দেবীর প্রস্তর-চিত্রাবলী অঙ্কিত রহিয়াছে। মধ্যবর্তী প্রকোষ্ঠটিই কামাখ্যাশক্তিপীঠের অতিশয় পবিত্রতম স্থান। প্রকৃতপক্ষে এই পবিত্রতম স্থানটি একটি ভূগর্ভস্থ গুহা। ইহাতে যোনিসদৃশ্য একখানি প্রস্তরখন্ড হইতে প্রবাহিত হইতেছে ঝরনাধারা। প্রত্যেক বৎসর গ্রীষ্মে শক্তিপীঠে অম্বুবাচী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সেই অম্বুবাচীউৎসবে দেবী কামাখ্যার ঋতু উদযাপিত হয়।

চলবে

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুড়ো হুজুর

1

এখন যে ঘটনাটি আমি আপনাদের কাছে শেয়ার করছি সেটি আমাদের নিজ গ্রামের ঘটনা।

গভীর রাত। চারপাশে শুধু সুনসান নিরবতা। কোথাও কোন জন-মানুষের সাড়া শব্দ নেই। আর ঠিক সে সময় শোনা গেল ঘোড়া খুরের সেই টগবগ টগবগ আওয়াজ। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে ঘোড়ায় চড়ে কেউ একজন গ্রামে এসেছে। কিন্তু এতো রাতে কে আসে কেউ তা বুঝতে পারতো না। কিন্তু এক সময় গ্রামের কিছু মানুষ তাকে দেখতে পায়। দেখে লম্বা জুব্বা পড়া মাথায় কালো পাগড়ি বাঁধা আর মুখে লম্বা দাড়িওয়ালা তিনজন লোক। আসে ধূসর রঙ্গের একটি ঘোড়ায় চরে। তখন মানুষের মাঝে পশ্ন জাগে কে তিনি আর কেনই বা এই গভীর রাতে এই গ্রামে আসে। তাকে দেখা যেতো প্রতি বৃহস্পতি বার গভীর রাতে। এবং তাকে দেখেছে এমন লোকের সংখ্যা আমাদের গ্রামে ৫০ এর উপরে হবে। এর মধ্যে আমার কয়েকজন নিকট আত্মীয় ও আছে। আর এমন দুজন অত্মীয়র মুখ থেকে শুনা কথা আপনাদের কাছে শেয়ার করছি।

প্রথম:- আজ থেকে ১৫ বছর আগের কথা। আমার এক বড় ভাই ছিল নাম তার কাশেম। আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তার পাশের ছিলো ছোট্ট একটি কাছারি ঘর। আর সেই ঘরে আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে থাকতো কাশেম ভাই। একদিন গভীর রাতে তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাহিরে গেলেন। রাস্তার ধারে থাকা একটি নারিকেল গাছের পাশে বসে তিনি প্রসাব করতে লাগেন। ঠিক এমন সময় তিনি খেয়াল করেন দূর থেকে ঘোড়ার টগবগ টগবগ আওয়াজ তার কানে ভেসে আসছে। তিনি তখন রাস্তার উপর দাড়িয়ে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এমন সময় লক্ষ্য করলেন ঘোড়ায় চড়ে কেউ একজন এদিকে আসছে। তিনি তখন আবার চুপ করে নারিকেল গাছের পাশে গিয়ে বসে থাকলেন। এক সময় লোকটি ঘোড়ায় চড়ে তার সামনে দিয়ে চলে গেল। পরে তিনি দ্রুত ঘরে চলে আসলেন।সেদিন রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন কেউ একজন তাকে বলছে এই ঘটনা কাউকে না বলার জন্য।কিন্তু পরদিন সকালে এই ঘটনা তিনি সবাইকে বলেন।
দ্বিতীয়:- ২০০৬ সালের ঘটনা। আমাদের গ্রামের এক ছেলে নাম সাহিদ। প্রায় সময় সে গ্রামের দোকানে ক্যারাম খেলে রাত করে বাড়িতে ফিরতো। একদিন চাঁদনী প্রসর গভীর রাতে দোকান থেকে বাড়িতে যাওয়ার পথে সে লক্ষ্য করে মসজিদের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খাম্বাটির মধ্যে একটি ঘোড়া বাঁধা আছে। এতো রাতে এখানে ঘোড়াটিকে বাঁধা দেখে সে কিছুটা অবাক হলেন। মসজিদের একপাশে একটি জানালা খোলা ছিলো। সে তখন সাহস করে মসজিদের ভেতর কি আছে দেখতে চাইলো। দেখে মসজিদের ভেতর সাদা জুব্বা পড়া একজন লোক নামাজ পড়ছে। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ও তাকে স্পর্শ দেখা যাচ্ছে। আর চারদিকটা যেন আলোয় ভরে আছে। যা দেখে সে ভয় পেয়ে গেলো। সে তখন কোন শব্দ না করে জানালার পাশ থেকে এসে বাড়ির দিকে রওনা হল। কিছু দূর যাওয়ার পরে সে পিছনের দিকে তাকালেন। দেখে তার থেকে একটু দূরে জুব্বা পড়া সে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে। সে তখন ভয়ে দৌড় দিয়ে বাড়িতে চলে আসে। তাকে ও রাতে স্বপ্ন দেখালো এই ঘটনা কাউকে না বলতে। কিন্তু সকালে এই ঘটনা সে সবাইকে বলে দেয়।

তবে অবশ্যই গত পাঁচ বছর ধরে কেউ তাকে দেখেছে এমন কথা শুনা যায়নি।

[বি:দ্র:-আজ থেক বহু বছর আগে আমাদের গ্রামে বুড় হুজুর নামের একজন বুজুর্গ আলেম ছিলো। গ্রামে সবাই তাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। আর লোকের মুখে শুনা যায় বুড় হুজুরের সাথে ছিল নুরুল ইসলাম নামের এক জ্বীন। বুড় হুজুর যেদিন মারা যায় সেদিন ছিলো বৃহস্পতি বার দিবাগত রাতে আর তাকে দাপন করা হয় মসজিদের পাশে। এখন তার কবরের উপর উঠেছে মস্ত বড় এক আম গাছ। কেউ ঐ আম গাছের উপর উঠেনা। গ্রামের মানুষের ধারনা ঘোড়ায় চড়ে আসা লোকটি বুড় হুজুর হবে। তবে ভিন্ন মত ও আছে কারো মতে উনি হল বুড় হুজুরের সে জ্বীনটি। যে কিনা আজো বেঁচে আছে পৃথিবীর মাঝে।]

By Shohag Dewan.