ডাকিণী (২৫তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কাজ শেষে ওর কফিনের ডালাটা নামিয়ে দিলাম চিরজীবনের জন্যে। আরো সহস্র বৎসর পর হয়তো কেউ একজন একে খুলে আমারই মতো বিষ্ময়ে নির্বাক হয়ে যাবে! তখন ওরা কল্পনাও করতে পারবে না একে মারতে আমার কতটা কষ্ট হয়েছিলো। তবে ইদানীং যে হারে ডেভেলপার কম্পানি গুলি কাজ শুরু করেছে, তাতে সহস্র বৎসর দুরে থাক, আগামী দুমাসের মধ্যেই এখানে হয়তো একটা বিল্ডিং উঠে যেতে পারে।
ধ্যাত। এসব আজেবাজে ভাবনায় সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। সূর্য উঠেগেছে। তড়িঘড়ি করে এখান থেকে বেরুতে হবে। নইলে গার্ডরা ধরে ফেলবে। এই অর্ধনগ্ন অবস্থায় গোরুস্থানে ধরা পড়লে আমার দেয়ার মতো কোন কৈফিয়তই থাকবে না। হায় খোদা! আমি তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একটা গার্ডকে তো আমি কাল রাতেই সাইজ করে দিয়েছি। ও কি এখনো বাধা আছে ঠিক মতো, না কি ছাড়া পেয়ে তার সঙ্গী সাথিদের নিয়ে আসছে। এখন এসব দেখার সময় নেই। প্রিস্টের কবরে মাটি ভরাট করতে হবে। তারপর সবার নজর এড়িয়ে আলগোছে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। দ্রুত কোদাল হাতে কাজে নেমে পড়লাম। কোদালের হাতলে পেঁচানো ব্রা টা কাল রাতে কোপানোর সময়ই ঘর্ষণে ছিড়ে গেছে। নগ্ন হাতলের ঘর্ষণ শুধু দাঁতে দাত চেপে হজম করলাম। তবে কবর খুড়ার চেয়ে কবর ভরাট করা অনেক সহজ। স্তুপ করা আলগা মাটিটা কেবল টেনে গর্তে ফেলে দিলেই হয়। যে কবর খুঁড়তে রাতে দু ঘন্টার ও বেশী সময় লেগেছিলো তা আজ সকালে মাত্র দশ মিনিটে ভরে ফেললাম। সমস্ত জিনিসপত্র একে একে কুড়িয়ে ফের সাইড ব্যাগে ভরলাম। এখানে কাজ শেষ। এবার ফেরা যাক। ফেরার আগে কাল রাতের সুখি গার্ডটা কে একবার দেখতে হবে। দেখা হলে ওর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবো। ও ক্ষমা করুক আর না করুক শুধু আমার নামে মামলা না করিলেই হলো। পোল্যান্ডের আইন খুবই কড়া। এখানে সিকিউরিটির লোকজনের গায়ে হাত তুললে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বউচ্চ ২৫ বছরের জেল হওয়ার বিধান রয়েছে। বাঘ ছুলে আঠারো ঘা, আর পুলিশ ছুলে জেলের রুটি খা। তাই বাঘ বা পুলিশ, এদের কারো গায়েই হাত তোলা ঠিক না।
ওকে যে গাছের নিচে বেধেঁ রেখেছিলাম তার কাছে পৌছতেই আমার আত্মাটা শুকিয়ে গেলো। ওখানে কেউ নেই। শুধু আমার ছেড়া শার্ট আর পেন্টি পড়ে আছে। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। সাথে অন্তত দুই প্রস্থ দড়ি রাখা উচিৎ ছিলো। একমাত্র যে দড়িটা এনেছিলাম সেটা এখনো গীর্জার ছাদে ঝলছে। আর একটা দড়ি থাকলেই হাঁদাটা কে বাধতে এতো বেগ পেতে হতো না। আরো বড় ভুল হয়েছে বাধতে যেয়ে। আমার শার্ট দিয়ে না বেধে ওর প্যান্ট দিয়ে বাধলেই ভালো হতো। আসলে রাতের আধারে ওর প্যান্টের ব্যাল্ট খুলার ঝামেলায় যেতে চাইনি। তাই বলে পুরুষের প্যান্টের ব্যাল্ট খুলতে আমি একটুও অনভিজ্ঞ নই। অভির বেল্ট তো আমি চোখ বন্ধ করে খুলতে পারি। কিন্তু এটা একটা গার্ডের বেল্ট। পোল্যান্ডে সিকিউরিটির লোকেরা যোগাযোগের জন্যে বাংলাদেশী পুলিশদের মতো ইয়া বড়বড় ওয়াকিটকি ব্যবহার করে না। ওদের বেল্টেই ক্ষুদে ট্রান্সমিটার লাগানো থাকে। নিকষ আধারে বেল্ট হাতড়ানোর সময় ভুল করে যদি ঐ ট্রান্সমিটারের বাটনে একটা টিপ পড়ে ওটা সচল হয়ে যেতো তাহলেই খেল খতম ছিলো। যা হবার ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এবার এখান থেকে যাওয়া যাক।
যখনই উঠতে যাচ্ছিলাম তখন এক ঝাঁক গার্ডের হুইসেলের শব্দে আমু আৎকে উঠলাম। এই যাহ। তীরে এসে আজ তরী ডুবলো। গার্ডগুলি দেখছি এদিকেই আসছে। সিমেট্রির প্রধান ফটক থেকে সোজা সেই গাছটা বরাবর। তবে এখনো ওরা আমাকে দেখে ফেলার মতো এতটা কাছে নয়। এক দৌড়ে আমি গাছটার নিচে থেকে আমার ব্রা আর পেন্টিটা কুড়িয়ে আনলাম। আমি কোন সুত্র ফেলে যেতে চাই না। তারপর এক দৌড়ে আরেকটি কবরের নাম ফলকের নিচে গাঁ ঢাকা দিলাম।
গার্ড গুলিও হাবাগোবার মতোপ্রধান ফটক ছেড়ে সবাই এক সাথে এসে সেই গাছটার নীচে ভিড় করলো। ওরা জানতেও পারলো না ওদের গাফেলতির সুযোগ নিয়ে আমি সেই কখন গোরস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছি। সিমেট্রি থেকে বেরিয়েই একটা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হলাম। আমার গাড়িটা সিমেট্রির পশ্চাৎ গেটে গীর্জা প্রাঙ্গণে পার্ক করেছিলাম। কিন্তু বেরিয়েছি প্রধান ফটক দিয়ে। তারমানে আমাকে এই অর্ধনগ্ন অবস্থায়ই প্রায় দু ব্লক ঘুরে আমার গাড়িটার কাছে পৌছতে হবে! এতো ভোরে রাস্তায় কাউকে দেখছি না। মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি সাঁ করে ছুটে চলে যাচ্ছে। হায় খোদা। আর একটু সাহায্য কর। একবার শুধু গাড়ির নাগালটা পেলেই হলো। ড্রাইভ করে সোজা কটেজে চলে যাবো।
ইতস্তত ভাবে ফুটপাত ধরে পা বাড়ালাম। প্রায় অর্ধেকটা পথ কোন বাধা ছাড়াই পেরিয়ে এসেছিলাম। ঐ তো গির্জার ছাদটা দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছা করছিলো দৌড়ে ছুটে যাই সেখানে। সেদিকে আরো দ্রুত পা চালালাম। কিন্তু কোত্থেকে যে চারটে মটোর সাইকেলে করে কতগুলি টিনএজ ছেলে পেলে এসে উদয় হল। ওরা আমায় ঘিরে বাইকে চড়ে চক্কর দিতে লাগলো। টিনএজ বয়সে যৌনাকাঙ্ক্ষা চরমে পৌছে। আমি নিজেও এই বয়সটা পেরিয়ে এসেছি। রাস্তায় এক অর্ধনগ্ন মেয়েকে দেখে এদের আকৃষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু এই স্বাভাবিক আচরণটাই আজ আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারো সাথেই সময় কাটানোর ইচ্ছা বা ধৈর্য আমার নেই। একটা পরিশ্রান্ত রাতের পর আমায় কটেজে ফিরে একটা ভালো ঘুম দিতে হবে। ওরা আমায় ঘিরে ফুটপাতের চারদিকে চক্রাকারে ঘুরছে আর আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করছে। এদের মধ্যে থেকে যদি একটা বাইকওয়ালা কে মাটিতে ফেলতে পারি তবে এই চক্রে একটা ছিদ্র সৃষ্টি হবে। সেই ছিদ্র গলে বেরিয়েই আমাকে গীর্জার দিকে দৌড়াতে হবে। আশাকরি ওরা খানিকক্ষণ তাদের পড়ে যাওয়া সাথিদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকবে। আশাকরি সেই সময়টুকুর সধ্য ব্যবহার করে আমি গীর্জার ভেতর গাড়ির কাছে পৌছে যাব। একবার গাড়িটা স্টার্ট দিতে পারলেই হলো। এদের সামনে দিয়েই বীরের মতো বেরিয়ে যাওয়া যাবে। যে ই লাগতে আসবে তাকেই পিষে চ্যাপটা বানিয়ে ফেলবো।
একটা নীল বাইককে প্রথমে টার্গেট করলাম। ওতে মাত্র একজন আরোহী। তাই ঘুর্ণয়মান বাইকগুলির মধ্যে একে ফেলাই সবচেয়ে সহজ হবে। পাঁক খেতে খেতে এরা ধীরে ধীরে চক্রের পরিধি কমিয়ে আনছে। নীল বাইকটার উপর আমি সার্বক্ষণিক চোখ রাখছি। ওটা আমার প্রায় নাগালের মধ্যেই। হঠাৎ এক পা সামনে এগিয়ে ওটার হ্যান্ডেল ধরে দিলাম এক হেচকা টান। আরোহী বাইক সহ উল্টে মাটিতে পড়ে গেলো।
আমার কপাল ভালই বলতে হবে। পড়ে যাওয়া বাইকে বেধেঁ আরেকটি বাইক হুমড়ি খেলো। কিন্তু অন্য দুটো বাইক এখনো আমাকে ঘিরে ঘুরেই যাচ্ছে। পড়ে যাওয়া বন্ধুদের প্রতি ওদের কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। কিন্তু ও দুটোর মধ্যে বেশ খানিকটা ফাঁকা যায়গা রয়েছে। ঐ ফাঁকা যায়গাটা লক্ষ করেই আমি ঝাঁপ দিলাম।
রাস্তার উপর ডিগবাজি খেয়ে খানিকটা গড়িয়ে গেলাম। দু কুনুইয়ের বেশ কয়েকটা জায়গায় চামড়া ছিলে গেলো। আমি সব কিছু উপেক্ষা করে উঠে দাড়িয়ে দিলাম এক ভোঁ দৌড়। আমার ধারণা ভুল ছিলো। ছেলে গুলি আহত বন্ধুদের জন্যে সময় নষ্ট করে নি। বরং তাতক্ষণাত আমাকে গালি দিতে দিতে পিছু ধাওয়া করলো। বাইকের শব্দটা ক্রমেই নিকটতর হচ্ছে। আমি ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকালাম না। শুধু রুদ্ধশ্বাসে গীর্জাপাণে দৌড়,,,,,,,
(চলবে)

ডাকিণী (২২তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কফিনটা খুলে একদম বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। মধ্যযুগে কবর দেয়া কারো লাশ এতটা জীবন্ত হতে পারে। মনে হচ্ছে যেন সদ্যমৃত বা ঘুমিয়ে থাকা একটা জান্ত দেহ! মুখের অবয়ব, মুখভঙ্গি, উন্নত নাসিকা, খাড়া খাড়া কান! তবে কি আমি ভুল কবর খুঁড়েছি? কিন্তু তা হতে যাবে কেন? কফিনটা তো একটা মধ্যযুগীয় লোহার কফিন। এখনকার কফিনগুলি সাধারণত উন্নত প্লাস্টিক বা কাঠ দ্বারা তৈরি। তার উপর তালাটা আমি নিজের হাতেই খুলেছি। কেউ যে আমার আগে লাশ বদলে দেবে তার সম্ভাবনাও নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো লাশটার হাতে এখনো সেই আংটিটা চকচক করছে! কিন্তু লাশটা একদমই অক্ষত। আমি স্তম্ভিত হয়ে ভাবছিলাম এই লাশটা কি ভাম্পায়ারের মতোই রাতে জেগে উঠে জ্যান্ত মানুষের রক্ত খায়? সেজন্যেই হয়তো এখনো পচন ধরেনি। ওটা কি এখন ক্ষুধার্ত! এবার কি আমাকে খেতে আসবে?
আরে ধ্যাত। আমি এখানে লাশ নিয়ে গবেষণা করতে আসি নি। হয়তো প্রিস্ট এতো বড় শয়তান হয়ে গিয়েছিলো যে শবখোর পোকাদেরও ওকে খেতে অরুচি ধরে গেছে। সে যাই হোক। এখানে ওকে নিয়ে আমার কোন কাজ নেই। শুধু ওর আংটিটা আমার প্রয়োজন। আংটিটা ওর হাত থেকে ভালয় ভালয় খুলে নিতে পারলেই, ওটা নিয়ে দে চম্পট। কিন্তু ও যদি বাধা দেয়? হাতুড়িটা তো আছেই। মেরে ঘিলু বের করে দেবো। এক হাতে হাতুড়িটা বাগিয়ে ধরে অন্য হাতটা ওর আংটি পরা হাতে রাখলাম। ঠান্ডা আঠালো একটা অনুভুতি হলো। লাশ ঠান্ডা হতেই পারে কিন্তু আঠালো হবে কেনো? হাত তুলে একটু পিছিয়ে গেলাম। অনুভব করলাম হাতে একটা চটচটে আঠালো পদার্থ লেগে আছে! ঘেন্নায় আমার গা রি রি করে উঠলো। সম্ভবত ওর পঁচা গলা চামড়া আঠালো হয়ে আমার হাতে উঠে এসেছে। একটু ইতস্তত করে হাতটা নাকের কাছে নিলাম। আমি মধ্যযুগীয় একটা মৃতদেহের পঁচা দেহজ তরলের একটা উৎকট দুর্গন্ধ আশা করেছিলাম। কিন্তু এর বদলে পাইন গাছের আঠার মতো গন্ধ পেলাম। আশ্চর্য! ব্যাপারটা নিশ্চিত হতে পেন্সিল টর্চটা জ্বালিয়ে আমার হাতটা পরিক্ষা করলাম। আরে! এটাতো পাইন গাছের আঠা ই। আমি আলোটা লাশের মুখে ফেলে ভাল করে ঝুকে দেখলাম। এবার আমার কাছে প্রিস্টের জ্যান্ত লাশের রহস্য উন্মোচিত হলো।
প্রাচীন মিশরীয় ফারাও রা নিজেদের দেহকে সংরক্ষিত করে রাখতো মমি হিসেবে। ওদের বিশ্বাস ছিলো মৃত্যুর পর ওদের আত্মা সে দেহে আবার ফেরত আসবে। এই শয়তানটাও সে বিশ্বাস ধারণ করে নিজের দেহকে সংরক্ষণ করিয়েছিলো। কিন্তু মিসরের মতো ততকালীন ইউরোপে মোমি করার জন্যে যথেষ্ট মোম ছিলো না। সম্ভবত সেজন্যেই ওর দেহটাকে পাইনের আঠা দ্বারা মমি করা হয়েছিলো। মমি করা দেহে যেকোন সময় আত্মা ফেরত আসতে পারে। প্রিস্ট যেকোন সময় কবরের মধ্যেই জেগে উঠে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে, এমন বিশ্বাস থেকেই ওর দেহটাকে লোহার কফিনে পুরে তালা দিয়ে আটকে দেয়া হয়। প্রিস্টের অনুসারীরা হয়তো ভাবতেই পারেনি সহস্রাব্দ পরে একটা মেয়ে এসে সেই তালা ভাঙবে। নইলে হয়তো আরো শক্ত কিছু দিয়ে কফিনটা বন্ধ করতো। সেসব বোকা লোকগুলির কথা ভেবে বেশ হাসি পেলো।
বেশ তো। এবার ওর আংটিটা বের করে নেয়া যাক। কাঁপাকাঁপা হাতে ওর বা হাতের মধ্যমায় পরানো আংটিটা ধরে টান দিলাম। উহঃ। খুলছে না। সম্ভবত পাইনের আঠায় ভালভাবেই আটকে গেছে। অপর হাত থেকে হাতুড়িটা ফেলে এবার দুহাত দিয়েই আংটিটা খুলার চেষ্টা করলাম। এখনো খুলছে নাহ! এক হাত দিয়ে প্রিস্টের কব্জি চেপে ধরে অন্য হাতে আংটিটা ধরে সর্বশক্তিতে টানছি। আংটিটা নিয়ে বেশী ব্যাস্ত থাকায় কখন যে প্রিস্টের মাথাটা ঘুরে আমার দিকে স্থির হয়েছে আমি তা খেয়ালই করিনি।
হঠাৎ ওর আংটা পরা হাত আমার ডান হাতটা সজোরে চেপে ধরলো। হায় খোদা। আমার হৃদপিণ্ডটা এবার থেমে যাওয়ার উপক্রম। মাথাটা ভনভন করে ঘুরতে শুরু করেছে। এ কি হচ্ছে আমার সাথে! আমি আবার কোন স্বপ্ন দেখছি নাতো। আমি বা হাত দিয়ে হাতড়ে হাতুড়িটার খোজ করতে লাগলাম। কিন্তু আমি তো ইতিমধ্যেই ওটাকে ফেলে দিয়েছি। এখন তো ওটাকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হল ওটা আমার বা হাতের নাগালের বাহিরে!
প্রিস্টের লাশটা আমার ডান হাতটা শক্ত করে চেপে আছে। আমাকে ওর দিকে টেনেও নিচ্ছে না আবার ছেড়েও দিচ্ছে না। আমি যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করছি ও ততই শক্ত করে আকড়ে আছে। তখনই হঠাৎ মনে পড়লো গতরাতে বেসমেন্টে দেখা স্বপ্নের কথা। সেখানে কিলবিল করতে থাকা শুঁয়োপোকাটার মাধ্যমে আলেস আমায় বুঝাতে চাইছিলো প্রিস্টের দেহটা এখনো জীবন্ত। আর আমি কি না সেটাকে স্রেফ ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ভেবে ভুল করেছি। স্বপ্নে আমি যখনই শুঁয়োপোকাটার কবরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম তখনই হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। যদিও তখনো ভোর হতে ঘন্টা খানেক বাকী ছিলো। বাকিটা রাত আমি আর কোন স্বপ্নই দেখিনি। এটা একটা সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিলো। আলেস বলতে চাইছিলো যে, আর যা ই কর না কেন, কখনই প্রিস্টের কবরে নেমো না। আমি সেই সতর্কবার্তাটাও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছি। এমন কিছু হতে পারে তা আমার কল্পনায় ও আসে নি।
আমি যখন আমার অমার্জনীয় ভুল গুলির জন্যে অনুতাপ করছিলাম ঠিক তখনই শয়তানটা আমার হাত ধরে হেচকা টান দিলো। আমি তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে, কফিনের মধ্যে, ওর লাশের উপরই উপুর হয়ে পড়লাম। এবার ওর মুখটা আমি খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ওখানে একটা আকর্ণ বিস্তৃত, বিকৃত হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। পিলে চমকে উঠলাম। ভয়ে আমার গলাটা শুকিয়ে কাঠ। সর্বউচ্চ চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে কোন চিৎকার বের করতে পারলাম না। প্রিস্টের আংটি পরা হাতটা এবার আমার হাতকে ছেড়ে দিয়ে আমার কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো। আর অপর হাত দিয়ে কফিনের উপরের ডালাটা বন্ধ করে দিলো। ঠিক তখনই আমি গলা ফাঁটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। কিন্তু ততক্ষণে এ চিৎকারটা নিষ্ফল হয়ে গেছে। ডালা বন্ধ কফিনের ভেতর থেকে আমার চিৎকার কখনই বাহিরের গার্ডদের কানে পৌছবে না।
হায় খোদা! এটা কি হলো! উদোম গায়ে আমি আটকা পড়েছি এক অর্ধমৃত মধ্যযুগীয় রেপিস্টের কফিনে। মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে। এখন ও যদি আমায় মেরে ফেলে তবে আমার আত্মাটা কি বাকিটা সময় প্রিস্টের যৌনদাসী হয়েই থাকবে? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই কফিনের ভেতর চারপাশ থেকে অসংখ্য নারীকণ্ঠের আর্তনাদ, বিলাপ, আর ক্রন্দন ধ্বনি ভেসে আসতে লাগলো। উহঃ। কি অসহ্য। কান ফেটে যাবে মনে হচ্ছে।
(চলবে)

ডাকিণী (১৮তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি ভেবেছিলাম একটা আংটি পড়া হাত আমার পা চেপে ধরেছে। এবার একটু একটু করে কবরের কাছে টেনে নিয়েই ঝপাং করে ভেতরে ঢুকিয়ে নেবে। মাটিতে পড়ে গিয়ে একটা গাছের শেকড়কে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। যেন প্রিস্ট আমায় টেনে নিয়ে যেতে না পারে। তবে অনেক্ষণ ধরে পায়ে টান না পড়ায় শেষে ঘাড় ঘুড়িয়ে আটকে যাওয়া পায়ের দিকে নজর দিলাম। নাহ। ওটা কোন মানুষের হাত নয়। একগুচ্ছ বুনো লতায় পা টা আটকে আছে। পা ছাড়াতে যেয়ে বুঝলাম ওটা কাঁটাওয়ালা লতা। পায়ের চামড়া মাংস সব ছিড়ে নিচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম। এই কবরস্থানটা দিনের বেলায়ই এতটা ভয়ঙ্কর। রাতে না জানি আরো কত কি! সিমেট্রির প্রধান ফটক দিয়ে বেরুবার সময় আবার গার্ড দুটোকে দেখলাম। ঠায় দাড়িয়ে আছে। কাল আমায় এদের চোখকেও ফাঁকি দিতে হবে। কি হবে ওরা যদি আমায় কবর খুড়তে দেখে ফেলে? চোখের সামনে শ্বশুরবাড়ি (কারাগারের) চিত্রটা ভেসে উঠলো।
বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সূর্য ডুবে গেলো। ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে এগারোটা বাজে। পোল্যান্ডে গ্রীষ্মে ২০ ঘন্টা দিন আর মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘন্টা রাত। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে কাজ সারতে হলে আমাকে এই চার ঘন্টার মধ্যেই শেষ করতে হবে। বুঝতে পারছি কাল অনেকটা বাঁচা মরার লড়াই হতে চলেছে। আমাকে এতে জিততেই হবে। আলেস সহ আরো শখানেক মেয়ের মুক্তিটা যে আমার হাতেই ঝুলছে।
বাড়ি ফেরে ডিনার সারলাম। কিছুতেই মাথা থেকে আগামীকালের দুশ্চিন্তা সরাতে পারছিলাম না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। সামনে একটা নির্ঘুম রাত অপেক্ষা করছে। ড্রয়িংরুমের ঘড়ি থেকে রাত বারোটার ঘন্টা বেজে উঠলো, ঢং ঢং। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাতে বেসমেন্টে ঘুমাবো। কটেজের বাকী সব ঘরের তুলনায় ওখানেই আলেসের প্রভাব সবচেয়ে বেশী। শেষ মুহুর্তে ও যদি কোন বার্তা দিতে চায় তবে যেন সহজেই স্বপ্নে দেখিয়ে দিতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটাই স্বেচ্ছায় দুঃস্বপ্ন দেখার মতো। তবে আজ রাতের দুঃস্বপ্নটাই হয়তো কাল রাতে আমার প্রাণ বাঁচাতে পারে। একটা ফোন, বালিশ, বেডশীট আর আলেসের ডায়ারীটা সাথে নিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে বেসমেন্টে চলে গেলাম। সেই পরিচিত সেলে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করলাম। বেডশীটটা বিছিয়ে তার উপরে বালিশ রেখে শুয়ে পড়লাম। আমি জানি আজ স্বপ্নে আলেসকে দেখবই। অন্তত কালকের ভয়াবহ অভিযানের সাফল্য কামনা করতে আজ রাতে সে আসবেই। ফোনের আলোটা নিভিয়ে দিলাম। রাজ্যের ক্লান্তি আর নিরেট আধারে মুহুর্তেই ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম।
তার কিছুক্ষণ পরেই নিজেকে ঐ গীর্জার ছাদে আবিষ্কার করলাম। হাতে একটা কালো ব্যাগ ধরা। ওতে কুদাল, শাবল, এক বাণ্ডিল নাইলনের দড়ি, একটা বিশাল হাতুড়ি, একটা হেক্সো ব্লেড আছে। পকেট হাতড়ে একটা পেন্সিল টর্চ, একটা পকেট নাইফ, একটা লাইটার আর গাড়ির চাবি পেলাম। বেশ তো। এবার তাহলে যাওয়া যাক।
ব্যাগ থেকে দড়ি বের করে ক্রুশের সাথে ভাল করে বাধলাম। দড়ির অপর প্রান্ত ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দিলাম নিচে।তারপর রাত বারোটার ঘন্টা বাজতেই ব্যাগটা ছুড়ে ফেললাম সিমেট্রির দেয়ালের ভেতর। ওটা নিচের অন্ধকারে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেলো। তারপর দড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম সিমেট্রির ভেতরে। ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম আমার সামনে একটা নতুন কবর খুড়া। পেন্সিল টর্চের আলো ফেলতেই ওর ভেতরটা নজরে পড়লো। একটা মানুষের মতো আকারের বড় শুঁয়োপোকা ওতে কিলবিল করছে। ওর মাথায় দুই শুঁড়ের মাঝখানে আছে ঐ আংটিটা। আমি মরিয়া হয়ে পকেট থেকে নাইফ টা খুলে বাগিয়ে ধরে সেই কবরে ঝাপ দিলাম। সাথে সাথেই স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলো। হাতড়ে ফোনটা বের করে আলো জ্বালালাম। স্কিনে দেখলাম রাত দুটো বাজে। ঘুম ভাঙ্গার পর কেন জানি মনে হলো আলেস আমার পরিকল্পনাটা পছন্দ করেছে। না হলে ও এমন স্বপ্ন দেখাবে কেন? তবে ও প্রিস্টকে এতটাই ঘৃনা করে যে ওর লাশটার স্থলে একটা শুঁয়োপোকা দেখিয়েছে। আমি খুশি মনে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। সেরাতে আর কোন স্বপ্ন দেখিনি।
পরদিন সকালে উঠে প্রথমেই বেসমেন্ট থেকে স্টোররুমে গেলাম। একটু ঘাটাঘাটি করতেই একটা শাবল, কোদাল হেক্সো ব্লেড পেয়ে গেলাম। আর হাতুড়িটা সম্ভবত গ্যারাজে আছে। বেডরুমের খাটের নীচ থেকে কালো সাইড ল্যাগেজটা বের করে ওতে যা যা প্রয়োজনীয় সবই ভরলাম। তারপর ওটা গ্যারাজে নিয়ে গড়ির বুটে ঢুকিয়ে দিলাম। আজ আর অফিস শেষে বাসায় ফিরবো নাহ। সোজা কাজে লেগে পড়বো। গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে কটেজ থেকে বেরিয়ে আসলাম। তখন একবার রিয়ারভিউ মিররে চোখ গেলো। দেখলাম গাড়ির পেছনে আলেস হাসি মুখে কুয়োটার পাশে দাড়িয়ে আছে। আমি যদি আজ আংটিটা নিয়ে আসতে পারি তবে এটাই আলেসের সাথে আমার শেষ দেখা। এরপর ও হয়তো পরপারে চলে যাবে। কিন্তু কি হবে যদি আমি এই কটেজে আর না ফিরি? এই ভাবনাটাকে আমি দুরে সরিয়ে রাখতে চাই। তাই গাড়িতে ফুল ভলিউমে গান ছেড়ে এক্সেলারেটরে পা দাবিয়ে দিলাম। গাড়িটা ছুটে চলল অফিসের পথে।
(চলবে)

ডাকিণী (১৬তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
পরদিন অফিস শেষে আমি নিকটস্থ সিমেট্রিতে যাই। শতাব্দী প্রাচীন এক বিশাল গোরস্তান। হাজার হাজার মানুষ জীবনের কোলাহল শেষে এখানে প্রশান্তির ঘুমে মগ্ন। সিমেট্রির প্রধান ফটকে একটা পুলিশ বক্স। ঢুকার সময় জানালার পাশে দুজন গার্ডের রুক্ষ চেহারা দেখতে পেলাম। সিমেট্রির প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে ওপাশের দ্বিতীয় ফটক দিয়ে বেরুলেই নতুন গির্জা। অবশ্য সিমেট্রির ভেতর দিয়ে না গিয়েও ৪/৯D হাইওয়ের পাশের ছোট গলি দিয়ে সরাসরি গীর্জায় ঢুকা যায়। ওপাশের ফটকেও একজন গার্ডের দেখা পেলাম। আমার তখন হতাশায় মুষড়ে পড়ার অবস্থা। উঁচু দেয়ালে ঘেরা সিমেট্রির দুই ফটকেই পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদের চোখ এড়িয়ে প্রিস্টের কবর খুড়ার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যেমন শাবল, কোদাল এগুলি ভেতরে নেয়া যাবে না। আরো হতাশাজনক ব্যাপার হল পাহারাদার শুধু গেইটেই মোতায়ন করা নয়। প্রায় আধাঘণ্টা পরপর একজন করে গার্ড ভেতরে ঢুকে চক্কর দিয়ে যাচ্ছে। দুজন গার্ড ভেতরে যাওয়া আসার মধ্যে মাত্র আধাঘন্টা ব্যবধান। কোনক্রমে যদি জিনিসপত্র ভেতরে নিতেও পারি তবুও কবর খুড়ার সময় এর নজরে এড়ানো সম্ভব নয়।
হঠাৎ গীর্জার দিকে নজর গেল। মনে পড়লো আলেসের ডায়ারীতে সে গীর্জাকে সাক্ষাৎ নরকের সাথে তুলনা করেছিলো। মনে পড়লে উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনামলে এদেশীয় দরিদ্র চাষীদের গীর্জায় এনে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হতো। যারা ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করতো তাদের সহায় সম্পত্তি জাল দলিল করে দখল করে নেয়া হতো। মনে পড়লো স্কুলে পড়া সেই “সৌদামিনীর মালো” গল্পটি। বৃটিশদের পা চাটা ঐতিহাসিকরা নীলকরদের বিরুদ্ধে সৌচ্চার হলেও এই গীর্জা ব্যাপারে একদম নিশ্চুপ। কারণ তখন বৃটেনের কারখানায় অপেক্ষাকৃত সস্তায় কৃত্রিম নীল রঙ তৈরি শুরু হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ভোক্তাদের নিকট কৃত্রিম নীলের চেয়ে উপমহাদেশে উৎপাদিত প্রাকৃতিক নীলই বেশী সমাদৃত ছিলো। ফলে নীল কারখানাগুলি ক্রমাগত লোকসান দিতে শুরু করে। তখন বৃটিশ বেনিয়ারা এদেশীয় নব্য সভ্য শিক্ষিতদের ব্যবহার করে। তারা তাদের শেতাঙ্গ প্রভুদের নির্দেশেই নীলকরদের অত্যাচার সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলে। সারা উপমহাদেশের মানুষ জেনে যায় নীল কুঠোরির অত্যাচারের কথা। অতপর ঘটে নীল বিদ্রোহ। মানবাধিকারের দোহাই তুলে নীল চাষ বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর বাঙ্গালি যখন নীলবিদ্রোহ সফলের আনন্দে বিভোর তখন কৃত্রিম নীল বিক্রির টাকায় ইংরেজরা মদের আসর জমায়। উপমহাদেশে তখনকার গীর্জা গুলি নীলকুঠি থেকে কোন অংশেই কম ছিলো না। তবে ইংরেজ প্রভুদের অনুমতি না থাকায় গীর্জার নির্যাতনের দৃশ্য তৎকালীন সাহিত্যিকরা সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যান। জাতির বিবেক তথা সাহিত্যিকরা তখন যদি প্রভুভক্তির চেয়ে দেশপ্রেমকে বড় ভেবে, গীর্জার নির্যাতনটা তাদের সাহিত্যে তুলে ধরতেন তবে আজ আমার দেশে একটাও গীর্জারূপী নরকের দোয়ার থাকতো না। নীলকুঠির মতোই সেগুলিও বিলীন হয়ে যেত।
গীর্জার ছাদের উপরে একজোড়া কাকের কর্কশ চিৎকার আমায় ইতিহাস থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। গীর্জার ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো এই নরকের দ্বারই আমায় সিমেট্রির ভেতরে জিনিসপত্র নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। গীর্জাটা সিমেট্রির একদম ঘাড় ঘেসে দাঁড়ানো। কোনভাবে যদি আমি গীর্জার ছাদে হাতুড়ি শাবল কোদাল ইত্যাদি তুলতে পারি তো ওখান থেকে সেগুলি ছুড়ে দিলেই তা সিমেট্রির দেয়ালের ভেতরে গিয়ে পড়বে। তারপর নিচে গিয়ে, সিমেট্রিতে ঢুকে সেগুলি কুড়িয়ে নিলেই হলো। আর হাতে শাবল থাকা অবস্থায় একজন গার্ডকে আমি সহজেই কাবু করতে পারবো। শুধু লক্ষ রাখতে হবে যেন কাজটা নিঃশব্দে করা হয়। আর্তনাদ করার আগেই গার্ডকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে দিতে হবে। এতে হাতে প্রায় একঘণ্টার মতো সময় পাওয়া যাবে। এই এক ঘন্টার মধ্যেই আমাকে কবর খুঁড়ে প্রিস্টের লাশের হাত থেকে আংটি বের করে, আবার ওটাকে মাটিচাপা দিতে হবে। স্পষ্টতই বুঝতে পারলাম এ কাজটা দিনের আলোয় অসম্ভব। রাতের আধারে গা ঢাকা দিয়েই কাজটা সারতে হবে। ব্যাপারটা ভাবতেই ভয়ে গা ছমছম করে উঠলো।
একবার গীর্জায় ঢুকা প্রয়োজন। ওখানে প্রাহারার ব্যবস্থাটা একবার দেখতে হবে। তবে আশাকরি এতটা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে না। সিমেট্রির পেছনের ফটক গলে গীর্জা প্রাঙ্গণে পা রাখলাম।
গীর্জাটা একদম খালি। ছাদে একটা বিশাল ক্রুশ দাড়িয়ে। তার নীচে একটা বিশাল পেণ্ডোলিয়াম ঘড়ি। বাহ। আমার কাজের জন্যে একদম আদর্শ। জিনিসপত্র সব ক্রুশের নীচে লুকিয়ে রাখবো আর ঘড়িটা যখন প্রতি ঘন্টায় ঢং ঢং করে বেজে ঊঠবে তখন সেগুলি ছাদ থেকে সিমেট্রির ভেতরে ফেলে দেব। এতে ওগুলির পতনের শব্দ ঘড়ির ঘন্টার শব্দে ঢাকা পড়বে। তারপর ক্রুশের সাথে দড়ি বেধে সেটা সিমেট্রির দেয়ালের ভেতর ছুড়ে দেব। সেই দড়ি বেয়ে, অন্ধকারের আড়াল নিয়ে, গার্ডের অলক্ষে, সিমেট্রিতে ঢুকে পড়বো। আপন মনে শীষ দিলাম। মাঝে মধ্যে নিজের বুদ্ধি দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। হি হি হি। কিন্তু এখনই এতটা নিশ্চিত হওয়া উচিৎ হবে না। গীর্জার ভেতরে ঢুকে দেখতে হবে কেউ আছে কি না। খৃষ্টানরা তো আবার সাপ্তাহিক ধার্মিক। সারা সপ্তাহ মদ গিলে রোববার গীর্জায় গিয়ে যিশুর কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেবে। কি আজব সিস্টেম এদের। আজ বুধবার। তাই আমি সম্ভবত আজ গীর্জাটা ফাঁকাই পাচ্ছি। তবুও সাবধানের মার নেই। দোতলার জানালায় আমি যেন একটা ছায়াকে সরে যেতে দেখলাম। এবার একটু অভিনয় করতে হবে। ছাদে দাঁড়ানো ক্রুশটার দিকে খানিকক্ষণ একাগ্রচিত্তে তাকিয়ে থেকে বুকে পরপর তিনবার ক্রুশ আকলাম। আশা করি অভিনয়টা নিখুঁত হচ্ছে। দোতলার জানালা থেকে কেউ যদি আমায় অনুসরণ করেও থাকে তবে ওর যেন মনে হয় আমি এক ধর্মপ্রাণ খৃষ্টান। ভাবলেশহীন চেহারায় স্থির পদক্ষেপে এগিয়ে গেলাম গীর্জার ফটকের দিকে। দরজা খুলে ঢুকে পড়লাম সাক্ষাৎ নরকের ভেতর। গলাটা উঁচু করে পোলিশ ভাষায় হাক ছাড়লাম, ভেতরে কি কেউ আছেন? প্রত্যুত্তরে একটা ইঁদুর মেঝে দিয়ে দৌড়ে গেল। আবার হাক ছাড়লাম কিন্তু কোন উত্তরই পেলাম না। গীর্জার প্রার্থনা ঘর, কনফেশন রুম, বাথরুম সবখানে ঢু মারলাম। কেউ নেই দেখে পা টিপেটিপে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম। শুন্য গীর্জায় নিজেকে একা পেয়ে একটা অজানা ভয় মনের ভেতর দানা বাধলো। আমি তখনো জানতাম না আমি এখানে একা নই। উপরের তলায় কেউ একজন আমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
(চলবে)

ডাকিণী (১৪তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আদিন ড্রাইভওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো মসৃণ গতিতে। ওর গাড়িটা যেই প্রধান ফটকের সামনে কুয়োর নিকটবর্তী হলো অমনি রাস্তা থেকে ছিটকে সোজা কুয়ার দেয়ালে ধাক্কা খেলো! হায় খোদা! ও আক্সিডেন্ট করেছে! দৌড়ে ওর গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি ওর মাথাটা স্টিয়ারিং হুইলের উপর ঝুলে আছে। আমি বার দুয়েক ডেকে কোন সাড়া পেলাম না। ওকে অনেক কষ্টে টেনে গাড়ি থেকে বের করে মাটিতে শুইয়ে দিলাম। যাক বাবা। বেঁচে আছে। শ্বাস নিচ্ছে। তবে মাথা থেকে তখনো ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি পুলিশে ফোন দিলাম। পুলিশ আসার আগেই ওর জ্ঞান ফিরলো। আমি ওর শার্ট খুলে মাথাটার ক্ষতটা পেঁচিয়ে দিলাম। রক্তক্ষরণ ততক্ষণে প্রায় থেমে গেছে। তবে কিছুটা রক্ত এখনো চুইয়ে পড়ছে মাথা থেকে। ও চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো। কেমন নিষ্প্রাণ সেই চাউনি। ওর চোখের দিকে তাকিয়েই আমি বললাম কি ব্যাপার আদিন? জীবনে প্রথম গাড়ি চালাচ্ছিলে নাকি? এরকম সোজা রাস্তায় কেউ এমন আক্সিডেন্ট করে। ও বিড়বিড় করে বলল, “ওর আংটি প্রয়োজন। সেই আংটি।” এইটুকু বলেই সে আবার জ্ঞান হারালো। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছে। ওরা আদিনকে আম্বুল্যান্সে করে নিয়ে গেল। আমি ওদের যাত্রাপথে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। যতক্ষণ না গাড়িগুলি বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। ওরা চলে যেতেই নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হতে লাগলো। দুদিন পর ছেলেটার বিয়ে ছিলো। এ ঝামেলায় ওকে না জড়ালেও তো চলতো। ওর জীবনকে আমিই সংকটে ফেলে দিলাম।
আদিনকে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে এসেছিলো। এবার আমার কটেজে ফিরতে হবে। মনটা সায় না দিলেও আমি নিরুপায়। কটেজে ঢুকতেই লাইব্রেরীতে দাউদাউ লেলিহান শিখা দেখতে পেলাম। দৌড়ে যেয়ে লাইব্রেরীর দরজা খুলতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। লাইব্রেরীর মেঝেতে রাখা আদিনের ধর্মগ্রন্থে আগুন লেগে গেছে। পাশেই জ্বালানো মোমবাতিটা নিভে আছে। লাইব্রেরীতে এতগুলি বই পুস্তক রয়েছে। এসবে আগুন লাগলে আর থামানো যাবে না। তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু একটা করতে হবে। লাইব্রেরী থেকে এক দৌড়ে আমার রুমে চলে এলাম। উদ্দেশ্য ছিলো বাথরুম থেকে পানি নিয়ে লাইব্রেরীতে জ্বলন্ত ইহুদি ধর্মীয় পুস্তকে ঢালবো। কিন্তু রুমে ঢুকতেই দেখলাম এখানকার মেঝেতে রাখা বইটিও সমানে পুড়ছে। তবে কি বাড়ির প্রতি কক্ষের মেঝেতে রাখা সবগুলি বই পুড়তে শুরু করেছে! এ যেন অনেকটা “সর্বাঙ্গে ব্যাথা-পানি দিবো কোথা” পরিস্থিতি। এই বইগুলি থেকে সারাটা কটেজে আগুন ছড়িয়ে পড়তে খুব একটা বেশী সময় লাগবে না। তার আগেই আমাকে এই কটেজ ছেড়ে বেরুতে হবে। যেই আমি ঘুরে চলে যেতে শুরু করলাম তখনই আগুনটা দপ করে নিভে গেলো। পেছনে ফিরে তাকালাম। মেঝেতে শুধু বইটার ছাই অবশিষ্ট রয়েছে। আমি দৌড়ে লাইব্রেরীতে গিয়েও দেখলাম একই অবস্থা। আগুন নিভে গেছে। তারপর ডায়নিং রুমে গেলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য। এখানকার বইটা অক্ষত আছে এবং মোমবাতিটাও জ্বলছে। কটেজের সবগুলি কক্ষই আমি চেক করলাম। বেসমেন্ট, আমার বেডরুম আর লাইব্রেরী বাদে বাকী সব কক্ষেই বইগুলি অক্ষত অবস্থায় আছে আর পাশেই মোমবাতি জ্বলতেছে। হঠাৎ আলেসের ব্যাপারটা ধরে ফেললাম। গতরাতে ও আমায় বেসমেন্টে নিয়ে গিয়ে সেরাতে দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছিলো। সেই স্বপ্নে আলেসের জায়গায় আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলাম। ওর মৃত্যুদণ্ডের পর ওর দেহটাকে প্রথমে প্রধান ফটকের পাশের কুয়োতে চুবানো হয়, তারপর লাইব্রেরীর টেবিলে শুয়ানো হয়। অতঃপর তৎকালিক প্রিস্টের কক্ষ তথা আমার বেডরুম ধর্ষণ করা হয়। ওর লাশটা যেসব জায়গায় নেয়া হয়েছিলো ওর আত্মার প্রভাব সেই সব জায়গাতেই সীমাবদ্ধ। তাইতো কুয়োর পাশ দিয়ে ড্রাইভ করে যাওয়ার সময় আজ আদিনের আক্সিডেন্ট হয়েছে। বাড়িতে অন্যসব কক্ষের বইগুলি অক্ষত থাকলেও লাইব্রেরী আর আমার বেডরুমের বই দুটো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনুভব করলাম আমাকে দেখানো স্বপ্ন গুলি নিছক ভয় দেখানোর জন্যেই নয়। আলেসের ডায়ারীর প্রতিটা পাতা, রাতে দেখা প্রতিটা স্বপ্ন আলেসের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট বার্তা বহন করছিলো। কিন্তু ভয়ে আমার চিন্তাশক্তি লোপ পাওয়ায় আমি সেগুলির মর্ম উদ্ধার করতে পারিনি। সেরাতে আমি আলেসের ডায়ারীটা আবার পড়লাম। সাথে সাথে ওর দেখানো স্বপ্ন গুলি নিয়েও চিন্তা করলাম। ধীরেধীরে সবকিছুই দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে গেল।
(চলবে)

ডাকিণী (১৩তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
হায় খোদা। এসব আমার সাথে কি শুরু হলো আমার কটেজে! আলেস মেয়েটার আত্মা আমার সাথে এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছে।গতরাতে ও আমায় বেসমেন্টে আটকে রেখেছিলো। সারাটি রাত আমার এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে কেটেছে। সকালে যখন বেসমেন্ট ছেড়ে বেরুলাম তখন নিজেকে নিঃশেষিত মনে হল। পরপর দুরাতের দুঃস্বপ্ন আমায় এতটুকু শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি! ঘুমে চোখ দুটো বুজে আসছে। কিন্তু এখন আমাকে অফিসে যেতে হবে! আরেকটি কর্মময় দিন সামনে। বাথরুমে ঢুকে যতটা সম্ভব আয়নার দিকে না তাকিয়েই কাজ সারলাম। তারপর কাপড় পড়ে বেরিয়ে পড়লাম এই ভয়ানক কটেজ থেকে। আজ আরেকটি রোদ্রউজ্জল দিন। দিনের উষ্মতা আমার মন থেকে গত রাতের স্মৃতিগুলি মুছে যেতে সাহায্য করলো। হেটে গ্যারাজে গিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দিলাম। ড্রাইভ করে প্রধান ফটকের কাছাকাছি যেতেই চোখ পড়লো বাতিল কুয়োটার দিকে। এখানেই গতরাতে আমার মৃতদেহকে পুড়াতে দেখেছিলাম। ঘাড় বেয়ে একটা শীতল রক্তের ধারা নীচে নেমে গেল। তবে সেদিন আর খারাপ কিছু ঘটলো না। কোন অঘটন ছাড়াই সেদিন কটেজটা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি এটা ভেবে একটু শান্তি পাচ্ছিলাম। যদিও জানি দিনের শেষে আমাকে এখানেই ফিরতে হবে। আরেকটা ভয়াবহ রাতের জন্যে।
সেদিন অফিসে খুব খারাপ দিন গেল। একজন অধস্তন কর্মচারীর সাথে রাগারাগি করলাম। ফোন আসলে বারবার চমকে উঠছিলাম। ডেস্কে রাখা কলম পেন্সিল খুজে পাচ্ছিলাম না। একটা সময় ডেস্কে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অফিস থেকে বাসায় ফেরার আগে ভাবলাম একবার ইমেল গুলি চেক করে নেই। আজ শুক্রবার। আগামী দুদিন উইকেন্ড তাই অফিসে আসবো না। যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ ইমেল থেকে থাকে তো তার রিপ্লাই দিতে দুদিনের বেশী দেরি হয়ে যেতে পারে। মেইল বক্স খুলতেই একটা ইমেইলে চোখ আটকে গেল! প্রেরক, আদিন আদিজু। একটা জিপসি টাইপের ছেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডে হিটলার প্রায় দুই লক্ষ ঈহুদিকে হত্যা করে। সে সময় অধিকাংশ ইহুদিই হয় মারা যায় নয়তো দেশ ছেড়ে পালায়। তারপরেও মুষ্ঠিমেয় কতগুলি ইহুদি পরিবার পোল্যান্ডে টিকে থাকতে পেরেছিলো। সেসব ভাগ্যবান পরিবার গুলির মধ্যে একটা হলো আদিনের পরিবার। ছেলেটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় MSN এ প্রায় চার মাস আগে। তারপর কদিন ইয়াহুতে কথা হয়েছিলো। ওর সাথে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম সে একজন ভবঘুরে ইহুদি ও স্বপ্রনোদিত পার্টটাইম প্যারানরমাল আক্টিভিটি ইন্সপেক্টর! একজন মুসলমান হিসাবে একজন ইহুদির প্রতি আমার একটা বাজে মনোভাব ছিলো। সে একে তো ইহুদি তার উপর আবার ভবঘুরে! তাই আমি ওকে ইগনোর করতে শুরু করি। ওর ইমেইলের রিপ্লাই দিতাম না, ওর ইয়াহু কল রিসিভ করতাম না। একটা সময় সেও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমার লেজ ছেড়ে সটকে পড়ে। আজ ও মেইল করে জানিয়েছে দুসপ্তাহের মধ্যে ও বিয়ে করতে যাচ্ছে। এখন সে ভবঘুরে নয়। একটা ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানিতে চাকুরী করছে। আমাকে ওর বিয়েতে যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আসল কথা হলো সে আমায় মনে মনে পছন্দ করতো। কিন্তু আমার প্রত্যাখ্যান তার ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে। তাই তার বিয়েতে আমায় নিমন্ত্রণ জানিয়ে সে তার বদলা নিতে চাইছে। বেচারা আদিন। ওকে কখনোই বলা হয়নি যে আমি এঙ্গেইজড, খুব শীঘ্রই বিয়ের পিড়িতে বসতে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে পড়লো ভৌতিক ব্যাপার স্যাপারে ওর অনেক অভিজ্ঞতা আছে। ওকে আলেসের ব্যাপারটা খুলে বলা যেতে পারে। কিন্তু ওকে আমায় বিশ্বাস করবে? বিশ্বাস করলেও ও কি পারবে আলেসকে আমার কটেজ থেকে সরাতে? আচ্ছা। একবার বলেই দেখা যাক। ওর প্রফাইল ঘেটে ওর ফোন নম্বর বের করে ফোন দিলাম।
হ্যালো আদিন। কংগ্রেটুলেশন। যাক বাবা। অবশেষে তুমি স্থির হয়ে সংসারব্রত পালনে মন দিয়েছো। আমিতো ভেবেছিলাম এই পাগলা ঘোড়াকে আটকায় এমন কোন b***h এ জগতে জন্মায়নি।
ও মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানালো।
এবার আমি সরাসরি টু দি পয়েন্ট চলে আসলাম। আদিন। তুমি কি আজ আমার সাথে ডিনার করবে? আজ আমি তোমাকে খাওয়াতে চাই।
ও বলল, আমি যা খেতে চাই তুমি তো তা দিবে না।
বুঝলাম ও যৌনতার দিকে ইঙ্গিত করছে। হাহ। ছেলেদের এক চিরায়ত দুর্বলতা, অবারিত যৌন পিপাসা।
আমি ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ইগনোর করে ব্যস্ত কণ্ঠে বললাম, শোন আদিন, আমার নতুন কটেজে ভৌতিক কাণ্ডকারখানা চলতেছে। তুমি কি এটা থামাতে আমায় সাহায্য করবে?
ও রাজি হয়ে গেল। আমরা ঠিক করলাম অফিস শেষে আজ বিকাল ৬টায় আমরা “জিনেটস্কি হুইস্কি ” রেস্তোরায় এক সাথে ডিনার করব।
আমার অফিস শেষ হয় বিকাল ৫টায়। অফিসের পর প্রায় একটা ঘন্টা আমি বাল্টিসের সৈকতের ধার দিয়ে গাড়ি চালিয়েই কাটিয়ে দিলাম। তারপর ৬টা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগেই আগেই আমি রেস্তোরাঁয় হাজির হলাম। আদিন তখনো আসে নি। ওর সাথে এই প্রথম আমার সরাসরি সাক্ষাৎ। এর আগে ইয়াহুতে ভিডিও চ্যাটে ওকে চার মাস আগে শেষ দেখেছিলাম। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল আর মাথা বাজপাখির বাসা। ওর আগের চেহারাটা যখন আমি কল্পনা করছি তখন এক সুট পরা ক্লিন শেইভড জেন্টুলম্যান আমার সামনের চেয়ারে এসে বসলো। আমি খেঁকিয়ে উঠে বললাম, এই যে মিস্টার, এই ডেস্কে আমি বসেছি আর আমার সাথে একজন দেখা করতে আসছে যার জন্যেই এই সিটটা রিজার্ভড। আপনি অন্য কোথাও বসুন। লোকটা তো উঠলোই না তার উপর আবার হো হো করে হাসতে শুরু করলো। দেখতে জেন্টল হলেও আচরণে কি অসভ্য রে বাবা! কিন্তু ওর চোখ দুটো খুব চেনা চেনা মনে হলো। আরে! এতো আদিন। দাড়িগোঁফের জঙ্গল ছাড়া আদিন। সে আগাগোড়া বদলে গেছে! আলেসের ডায়ারীর একটা লাইন মনে পড়লো, “কত দ্রুতই না মানুষ বদলে যায়।”
আমিই খাবার অর্ডার করলাম। খেতে খেতে আমি ওকে সবকিছুই খুলে বললাম। ও বলল সে আজ চেষ্টা করে দেখবে। ও প্রথমে আমার কটেজ সম্পর্কে জানতে চাইলো। আমি ওকে বিস্তারিত বললাম। একতলা কটেজটায় মোট দশটা রুম। তিনটা বেডরুম, প্রত্যেকটার সাথে সংযুক্ত বাথরুম, একটা কিচেন, একটা ডায়ানিং, একটা ড্রয়িং, দুটো স্টোর রুম, আর দুটো গেস্ট রুম। এটা একটি মধ্যযুগের পরিত্যাক্ত গির্জা। এর বেসমেন্টে একটা পাঁচ সেল বিশিষ্ট বন্দিশালা আছে। ওটারই কোন একটায় আলেসকে আটকে রাখা হয়েছিলো। সম্ভবত ডানদিকের তিন নম্বর সেলটায়। গতরাতে আমিও ওখানে আটকে পড়েছিলাম। সারারাত বিদঘুটে স্বপ্ন দেখে কাটিয়েছি। আমি দেখলাম, ,,,,,,,
আদিন আমার কথাগুলি হাঁ করে গিলতে থাকলো। সবটুকু শুনে ও বলল এখন খেয়ে তার বাড়ি গিয়ে কিছু ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে আসতে চায়। ও মনে করে আলেসকে তাড়ানো খুব একটা সহজ নয় তবে অসম্ভব ও নয়। খাবার শেষে ও জোর করে ডিনারের বিল মিটিয়ে দিলো। তারপর আমরা যার যার গাড়িতে উঠে, দুজন দুদিকে রওনা হলাম। আমি কটেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়িটা পার্ক করে ভেতরে বসে রইলাম। একা একা কটেজটায় ঢুকতে সাহসে কুলাচ্ছিলো না। যতই চেষ্টা করছি আলেসকে ভয় না পেতে ততই সে আমার মনে ভয়ের সঞ্চার করছে। গাড়িতে একটা হিপ হপ গান ছেড়ে আদিনের আগমনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষার প্রহরটা বড্ড বিরক্তিকর। একটা সময় গাড়ির সিটে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙ্গলো আদিনের গাড়ির হর্ণের শব্দে। যাক বাবা। ও চলে এসেছে। এবার হয়তো ও আলেসকে মুক্তি দিয়ে আমার কটেজটাকে আবার নিরাপদ করে তুলবে। দুটো গাড়ি নিয়ে একসাথেই ভেতরে প্রবেশ করলাম। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক না করে আমরা ড্রাইভ করে সোজা বাড়িটার সামনে চলে এলাম। সদর দরজার সামনে গাড়ি দুটো রেখে আমরা নেমে পড়লাম। আমার সেই পুরানো ভয়ভয় অনুভূতিটা আবার ফিরে এলো। মনে হলো আজ অশুভ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। দরজাটা খুলার আগে আমি ভয়ার্ত চোখে আদিনের দিকে তাকালাম। ও গাড়ি থেকে কতগুলি বিশাল ইহুদি ধর্মীয় বই, কতগুলি মোমবাতি, এক ব্যাগ ভর্তী শুকনো পাতা, এক বোতল পানি আরো কি সব যেন গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসলো। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই আমি ওর চোখে নির্ভরশীলত খুজলাম। কিন্তু আমি যা খুজছিলাম তা ওর চোখে ছিলো না। ওর চোখে ছিলো অনিশ্চয়তা আর কৌতুহ তবে কনফিডেন্সের বড়ই অভাব সেখানে। দরজা খুলে আমরা আবারো সেই অভিশপ্ত কটেজে ঢুকে পড়লাম। আদিন প্রতিটা কক্ষে ঢুকে ওর ধর্মীয় বই থেকে হিব্রু ভাষায় কি যেন পড়লো। তারপর প্রতিটা কক্ষের মেঝের মাঝখানে কিছুটা শুকনো পাতা ছড়িয়ে তার উপর একটি করে ধর্মীয় বইটা রাখলো। তারপর সে বইগুলির পাশে একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলো। কাজ শেষে ওকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হল। এবার ও আমার দিকে ফিরে বলল কাজ শেষ। মোমবাতিটা পোড়া শেষ হলেই এসব কক্ষে যদি কোন অশরীরী থেকে থাকে তবে তা চলে যেতে বাধ্য হবে। আমি কেন জানি ওর কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছিলাম না। তবুও মৃদু হেসে ওকে ধন্যবাদ জানালাম। আমি ওকে কিছু কোল্ড ড্রিংক্স সাধলাম। এত কিছু করার পর ওর গলাটা হয়তো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ও হুইস্কি খেতে চাইলো। আমি ওকে বিনীত ভাবে বললাম আমি মদ খাইনা। তাই কটেজে কোন হুইস্কি নেই। ওকে অনেকটাই হতাশ দেখালো। বুঝলাম ওর আগের সব অভ্যাস পরিবর্তন হলেও ও এখনো মদটা ছাড়তে পারেনি। ও আর কিছু না খেয়েই বেরিয়ে পড়লো। ও গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাবার সময় আমি হাত নেড়ে ওকে বিদায় জানালাম। গোধূলির আধাঁরে ও গাড়ি ছুটিয়ে ধীরে ধীরে দুরে সরে যেতে লাগলো। অভিশপ্ত কটেজটায় আমি একা পড়ে রইলাম আরেকটা রাতের জন্যে। সত্যিই কি একা? নাকি এক ঝুড়ি দুঃস্বপ্ন নিয়ে আমায় সঙ্গ দেয়ার জন্যে আলেস ও সাথে আছে?
(চলবে)

ডাকিণী (১২তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কিছুক্ষণ অন্ধকার থাকার পর আস্তে আস্তে সবকিছুই পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার দেহটা তখনো ঝুলছে আর ঘাড়টা বেঁকে আছে, ঠিক স্বপ্নে দেখা আলেসের লাশের মতো। এখনো ফাঁসিতে ঝুলছি তবে আর দম বন্ধ হয়ে আসছে না। মাথাটা অনেক হালকা মনে হচ্ছে। নিজের দেহের দিকে তাকালাম। দেহটা নিথর হয়ে আছে। তবে একটু আগে হওয়া প্রচন্ড খিঁচুনিতে তালি মারা এক প্রস্থ কাপড়টা নীচে খসে পড়েছে। অজস্র মানুষের সামনে আমার দেহটা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দড়িতে ঝুলেছে। ছিঃ ছিঃ। কি লজ্জা। নিচে জমায়েত মানুষগুলি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে দাত বের করে হাসছে, কেউবা সভয়ে বুকে ক্রুশ আঁকছে। তারপর এরা একে একে যে যার পথে চলে যেতে শুরু করলো। খানিক পরে ঐ চাবুকওয়ালাটা আমার দেহটাকে দড়ি ধরে টেনে ছাদে তুলল। তারপর দেহটাকে একটা কালো কাপড়ে ঢেকে দিলো। যাক। এবার তো কিছুটা পর্দা হলো। আমি সব কিছুই দেখছিলাম। তবে অনেকটা দুর থেকে থ্রিডি টিভি দেখার মতো করে। স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমি জীবন্ত জগৎ থেকে দুরে সরে গেছি। আমিও এখন আলেসের মতোই একটা অশরীরী।
ওরা আমার দেহটা একটা কাপড়ে বেধে ঝুলিয়ে নীচে নিয়ে গেল! আমিও চললাম ওদের সাথে সাথে। হেটে হেটে নয়। অনেকটা বাতাসে ভেসে ভেসে। নীচের প্রাঙ্গণে নিয়ে আমার পায়ে দড়ি বেধে উল্টো করে কুয়ায় চুবিয়ে নিলো। তারপর দেহটাকে টেনে তুলে কাপড়ে মুড়িয়ে পাজঁকোলা করে বয়ে নিয়ে যেতে লাগলো। কটেজে পৌছলে ওরা আমায় লাইব্রেরীর টেবিলে শুইয়ে দিলো। তারপর সবাই আমার দেহটাকে ঘিরে দাড়িয়ে কিসব মন্ত্র পড়তে লাগলো। বড় আজব তো ওদের আচার অনুষ্টান। ওরা যখন দেহটাকে নিয়ে ব্যাস্ত আমি তখন লাইব্রেরীটা ঘুরে দেখায় মন দিলাম। লাইব্রেরীটা ঠিক তেমনি আছে। তবে উঁচু তাক গুলোতে বইয়ের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম! ওরা কি আমার বই চুরি করে ফেলেছে? খানিক পরে ওদের রিচুয়াল শেষ হলো। আমায় লাইব্রেরী থেকে নিয়ে এসে ওরা বেডরুমে প্রবেশ করলো। বেডরুমটা ওরা রাতারাতি বদলে দিয়েছে দেখছি! গত শীতে কিনা সুন্দর ঝাড়বাতিটার যায়গায় একটা বিশ্রী আংটা বেরিয়ে আসছে। ওরা সেই আংটায় দেহটাকে ঝুলালো। রুমের ওপাশ থেকে স্বপ্নে দেখা সেই খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা প্রিস্ট বেরিয়ে এসে আমার দেহে হলি ওয়াটার ছিটিয়ে দিলো। বাহ। শয়তানটা আজ বড়ই অদ্ভুত সাজে সেজেছে। মাথায় কালো অলঙ্কার খচিত বেল্ট, পরনে লাল টকটকে আলখাল্লা। একদম ভাঁড়ের মতো লাগতেছে ওকে। খানিক পরে সে আমাকে আংটা থেকে খুলে পাজঁকোলা করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। যে লোক গুলি আমায় এখানে বয়ে নিয়ে এসেছিলো তারা একে একে চলে যেতে শুরু করলো। বেডরুমে শুধু আমি আর সেই প্রিস্ট রয়ে গেলাম। বুঝলাম আলেসের ডায়ারীর লেখাগুলি সত্যি হতে চলেছে। ও এখন আমার দেহটাকে নিয়ে মেতে উঠবে। উঠুক। আমার কিছু যায় আসে না। আমি এখন আর সেই দেহে নেই। আমি এখন জাগতিক দেহ বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
প্রিস্ট বিছানায় উঠে তার কাপড় খুলতে লাগলো। আমি সত্যিই আর তাকাতে পারছিলাম না। ওকে আমার মৃতদেহকে ভোগের অবারিত স্বাধিনতা দিয়ে আমি বেডরুম থেকে লাইব্রেরীতে চলে আসলাম। আমি শুধু দেখতে চাইছিলাম লাইব্রেরীর ওই তাকে আলেসের ডায়ারীটা আছে কি না। যা ভেবেছিলাম তাই। নেই। ওরা সম্ভবত ওটা নিয়ে গেছে। পাশের বেডরুম থেকে তখন প্রিস্টের যৌন সুখের গোঙ্গানি শুনা যাচ্ছে। কি বিকৃত মস্তিষ্কের এই লোকটা! কেন জানি মনে হল ও স্রষ্টার সৃষ্টি জগতের বাহিরে, এক শয়তানের সৃষ্টি। কিংবা নিজেই একটা ধারি শয়তান। লাইব্রেরীতে আর কাজ নেই। এভাবে ঘরে বসে না থেকে একটু বাহিরে থেকে ঘুরে আসা যাক। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে প্রধান করিডোর ধরে সোজা বেরিয়ে এলাম কটেজের বাহিরে। বাহিরে ততক্ষণে রাত হয়ে এসেছে। চারিদিকেই অন্ধকার। কিন্তু এর চেয়েও বেশী অন্ধকার ঐ আলো ঝলমলে কটেজের ভেতরটায়। এক প্রাগোঐতিহাসিক অন্ধকার যা হাজারো বাতি দিয়েও দুর করা যায় না। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ঐ অভিশপ্ত কটেজ থেকে দুরে সরে যেতে লাগলাম। ঐ তো কটেজের প্রধান ফটক দেখা যাচ্ছে। ওটা দিয়ে আমি এই অভিশপ্ত নরক থেকে বেরিয়ে যাব মুক্ত বিশ্বে। কিন্তু পথিমধ্যে দেখলাম কিছু লোক ফটকের সামনে কুয়োটার পাশে কাঠ জড় করে এক উঁচু ঢিবি তৈরি করেছে! আমি থমকে দাড়িয়ে ওদের দেখতে লাগলাম। একবার পেছনে ফিরে দেখলাম চারজন লোক আমার দেহটাকে একটা খাটিয়ায় শুইয়ে কটেজ থেকে বের করে নিয়ে আসছে। যাহোক। এবার আমার দেহটাও ঐ অভিশপ্ত কটেজের বাহিরে। রাতের মৃদু মন্দ হাওয়ায় আমার দেহের চুল গুলি ঊড়ছিলো। হঠাৎ নিজেকেই অপরূপা হিসেবে আবিষ্কার করলাম। খোদাকে ধন্যবাদ। উনি আমাকে এমন একটা রোগমুক্ত সুন্দর দেহে কিছুদিন বেঁচে থাকতে দিয়েছিলেন। খুব ইচ্ছা করছিলো আবার ঐ দেহে ফিরে যেতে। কিন্তু আমি জানি সেটা আর সম্ভব না। আমি ওটা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি চিরতরে। ওরা খাটিয়াটা আমার পাশ দিয়ে নিয়ে গিয়ে কুয়ার পাশে রাখলো। তারপর আমার দেহকে খাটিয়া থেকে তুলে ঐ কাঠের ঢিবিতে শুইয়ে দিল। বুঝলাম এরা এবার দেহটাকে পুড়িয়ে দিবে। ওদের মধ্যে নেতা গোছের একজন বুকে ক্রুশ একে ঐ ঢিবিতে একটা মশাল ছুড়ে ফেলল। তার দেখাদেখি বাকিরাও আরো কয়েকটা মশাল ছুড়লো। কাঠে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়লো। নিজের দেহটা চোখের সামনে পুড়তে দেখে আমি হাহাকার করে উঠলাম। দাউদাউ আগুনের শিখায় রাতের আধার সরে গিয়ে চারিদিক এক উজ্জ্বল আলোয় ভেসে উঠলো। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। আলোটা খানিক সয়ে এলে নিজেকে সেই বেসমেন্টের বন্দিশালায় আবিষ্কার করলাম। অশরীরী নয়, একদম জলজ্যান্ত আমি। দিনের আলো সিড়ির দরজা দিয়ে চুইয়ে ঢুকে অন্ধকারকে হঠিয়ে দিয়েছে। ওহ খোদা! এতক্ষণ তাহলে আমি আরেকটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম! এ স্বপ্নে আলেয়া তার শেষ পরিণতি আমায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার প্রতি সত্যিই মায়া হল। আমি উঠে দাড়ালাম। সেলের দরজাটা এখন খুলাই আছে। আমার তোয়ালেটাও আমার পাশেই পড়ে আছে। ওটা কুড়িতে নিয়ে দেহে জড়ালাম। টলমল পায়ে বেরিয়ে এলাম সেই ভয়াবহ বন্দিশালা থেকে।
(চলবে)

ডাকিণী (১১তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
(১০ম পর্বের পর থেকে)
ভয়ে চিৎকার এক সময় মনে হল গলা ফেটে রক্ত বেরুবে। নাহ। এভাবে মাথা গরম করলে এখান থেকে বেরুনো যাবে না। আলেসের মতো সারা জীবনের জন্যে এখানে আটকে পড়বো। মায়ের উপদেশগুলি মনে পড়লো। বিপদে মাথা ঠান্ডা না রাখলে ঘাড়ের উপর মাথাটা আস্ত থাকবে না। ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম। একটা সময় ভয়, উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে এলো। স্থির হয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কয়েকটা গুরুতর ভুলের কারণে আমি এখানে আটকে গেছি। প্রথম ভুল হলো আলেসকে বিশ্বাস করা। ওকে বন্ধু ভাবা। একটা অশান্ত আত্মা কখনোই কারো বন্ধু হতে পারে না। আমার কোনভাবেই আলেসের ডাকে সাড়া দেয়া উচিৎ হয়নি। ওর ডায়ারী মতে একাকীত্বই ওকে ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের থেকেও বেশী কষ্ট দেয়। তবে কি ও আমাকে মেরে ওর মতোই অশরীরী বানিয়ে নিবে, কেবল ওকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে! মনে পড়লো একবার টিভিতে একটা রিয়ালিটি হরর শো তে এক প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বলেছিলো যে ভয় হলো কালো-আত্মার প্রধান অস্ত্র। ওদের নাকি আকার আকৃতি, স্থিতি-জড়তা নেই। তাই ওরা কাউকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে না। কিন্তু ওরা শিকারকে ভয় দেখাতে থাকে যতক্ষণ না ভিক্টিম অতিরিক্ত ভয়ে হার্ট আটাক বা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার মতো আত্মঘাতী কিছু একটা করে বসে। ওদের ভয় না পেলেই ওদের হাতে মৃত্যুর আশংকা বুঝি ৯৯ ভাগ কমে যায়। আমি কখনোই টিভিতে দেখানো উদ্ভট কোন কিছু বিশ্বাস করি না। তবে এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে বিশ্বাস না করে উপায় নেই। মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলাম আজ যদি এখানে মরতেই হয় তো ভয়হীন ভাবে নিজের আত্মসম্মান নিয়েই মরবো। আলেসের ভয়ে ভীত হয়ে হার্ট ফেইল করে মরবো। চিৎকার করে বললাম, “আলেস। তুমি হয়তো আমায় মেরে ফেলতে পারবে কিন্তু ভয় দেখাতে পারবে না।” বদ্ধ বন্দিশালায় আমার চিৎকার প্রতিধ্বনি তুললো।
ভয় তাড়ানোর জন্যে মেঝেতে বসে বসে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলাম। কখন যে চোখ জুড়িয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। যখন চোখ খুললাম তখন দেখলাম সিড়ির খোলা মুখ দিয়ে চুইয়ে দিনের আলো ঢুকছে! আমি কালকের ভয়ঙ্কর রাতটা উৎরে গেছি। ওয়াও! আমি এখনো বেঁচে আছি! কিন্তু রাতে কিসে আমার সেলের দরজা আটকেছিলো! ভাবতেই উঠে গিয়ে সেলের দরজাটা পরীক্ষা করলাম! আশ্চর্য! দরজায় বাহিরে থেকে একটা বিশাল তালা ঝুলছে! তারমানে গতরাতে যখন আমি যখন সেলে প্রবেশ করি তখনই কেউ একজন আমাকে বাহিরে তালা মেরে আটকে দেয়! কিন্তু কে সেটা! আলেস? মনে হয় না। লাইব্রেরীতে বেশ কয়েকবারই আলেস আমায় ভেতরে রেখে দরজা আটকে দিয়েছিলো। কিন্তু তখন তো ওর তালার প্রয়োজন হয় নি! কিন্তু এখন দরজায় তালা ঝুলানো কেন! অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেলো এটা কোন মানুষের কাজ! আশেপাশে মানুষ থাকতে পারে ভাবতেই নিজের কাপড় চোপড় নিয়ে সচেতন হয়ে উঠলাম। মনে পড়ে গতরাতে গোসল শেষে একটা তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়েছিলাম আমি। কিন্ত ওটা এখানে আটকে পড়ার পর একটা শক্তিশালী দমকা হাওয়ায় উড়ে যায়। কিন্তু ওটা এখন কোথায়? চারিদিকে খুঁজাখুঁজি করেও আমি সেই সাদা তোয়ালেটা খুজে পেলাম না। তবে সেলের কোনে বাদামি রঙের তালি মারা ছেড়া এক প্রস্থ কাপড় পেলাম। অগত্যা সেটাই জড়িয়ে নিলাম দেহে। তখনই আমি কতগুলি ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। ওরা সিড়ি ভেঙ্গে এদিকেই এগিয়ে আসছে! নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলাম কারা ওরা? কি চায় ওরা আমার কাছে? কিন্তু উত্তরটা আমার জানা নেই।
কারাগারের শিকের ওপাশে বিচিত্র বেশভূষার কতজন বিশালদেহী পুরুষ এসে উপস্থিত হল। আশ্চর্য ব্যাপার হল ওদের সবার দেহ ভারী বর্মাবৃত, আর হাতে বেঢপ লম্বা তরোয়াল। তবে এদের মধ্যে একজনের হাতে তরোয়ালের বদলে ঝিলিক দিচ্ছে লকলকে সাপের চামরার চাবুক! এই বন্দুকের যুগে এদের এহেন অস্ত্র সস্ত্র দেখে আমার নিতান্তই হাসি পেল। মনে মনে ভাবলাম ইশ, আমার ডেজার্ট ঈগলটা (আমার লাইসেন্স করা পিস্তল) এখন যদি হাতের কাছে থাকতো তো সবকটার পায়েই একটা করে বিচি ঢুকিয়ে দিতাম। আমাকে সারারাত এখানে আটকে রাখার জন্যে এটাই হতো ওদের উচিৎ শিক্ষা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। পিস্তলটা আমি আমার বেডরুমে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে ফেলে এসেছি। ওদের তিনজনের মধ্যে তলোয়ারওয়ালা দুজন বাহিরে দাড়িয়ে রইলো। আর চাবুকওয়ালাটা আমার সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। তারপর সোজা আমার দিকে এগিয়ে এসেই সপাৎসপাৎ দু ঘা বসিয়ে দিলো। আমার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। কোথায় মেরেছে জানি না কিন্তু সারাটা শরীর জ্বলতেছে। আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাড়ালাম। লোকটা আমার চুল ধরে টানতে টানতে সেল থেকে বের করে সিড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যেতে লাগলো। ওদের এহেন ব্যবহারে আমি চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম। মহিলাদের প্রতি এতটুকু মর্যাদাবোধ বা সৌজন্য এদের মধ্যে নেই। সিড়ি বেয়ে যতই উপরে উঠছি ততই একদল মানুষের সম্মেলিত শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। ওরা আমায় কটেজের কাঠের সিড়ি ধরে একদম ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে গিয়ে দেখলাম এক ঝাক মানুষ নিচে জড়ো হয়েছে! আমার কটেজে এরা ঢুকলো কি করে! আমি যখন বিষ্ময়ে উপস্থিত জনতাকে দেখছিলাম তখনই চাবুকওয়ালাটা এসে আমার হাত দুটো পিছ মোড়া করে বেধে দিলো। কি হচ্ছে এসব! বিষ্ময় আর ভয়ে নুয়ে পরার উপক্রম। এবার দু তলোয়ারওয়ালা আমার দুপাশে এসে, দু কাঁধ শক্ত করে ধরলো। এত শক্ত যে মনে হলো শোল্ডার জয়েন্ট গুঁড়ো হয়ে যাবে। ওদিকে চাবুকওয়ালাটা ছাদে একটা খাম্বার সাথে বাধা দড়ি এনে আমার গলায় ফাঁস পড়িয়ে দিলো। হায় খোদা! এরা কি আমায় ফাঁসি দিতে চলেছে? তলোয়ারওয়ালা দুজন আমার কাঁধ ধরে ঠেলতে ঠেলতে ছাদের কিনারায় নিয়ে গেল। উপস্থিত জনতা প্রবল হর্সধ্বনি দিয়ে আমার আসন্ন মৃত্যুকে স্বাগত জানালো। আমি মা কে শেষবার দেখার জন্যে হৃদয়ে এক প্রবল আকুতি অনুভব করলাম। জীবনে কতই না দুঃখ দিয়েছি মাকে। মা আমাকে যে কাজটাই নিষেধ করতো সেটাই আমি প্রথমে করতাম। মায়ের অবাধ্য হওয়াটাই আমার কাছে একটা থ্রিল ছিলো। কিন্তু তবুও মা একটু রাগ করলেও পরক্ষণেই খুকি বলে আমায় জড়িয়ে ধরতো। মায়ের মিষ্টি চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ একজন আমায় ছাদের উপর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলেছে। কিন্তু একদম মাটিতে আছড়ে পরার বদলে আমার গলায় পড়ানো দড়িটিতে আমি ঝুলতে লাগলাম! হায় খোদা! এরা আমায় ফাঁসি দিয়ে দিচ্ছে! আমি মারা যাচ্ছি! বাতাসের অভাবে ফুসফুসটা যেন ফেটে যাবে! হৃদপিণ্ডটা ধীরেধীরে থেমে আসছে। অনুভব করলাম সারা শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়েছে। ব্যাথার অনুভুতিগুলি আস্তে আস্তে ভোঁতা হয়ে এলো। নিঃসীম কালো আধার চোখ দুটোকে ঢেকে দিলো।
(চলবে)

ডাকিণী (১০ম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

(৯ম পর্বের পর থেকে)

নাহ। কটেজের ছাদটা তো একদমই ফাঁকা। গলায় দড়ি দিয়ে কেউ ঝুলছে না। সামান্য একটা স্বপ্নকে নিয়ে আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম। ভাবতেই নিজেকে হাস্যকর মনে হল। খুশি মনে শিস দিতে দিতে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। উহঃ, ঘরের ভেতরটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে! অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দেয়ালে সুইচ খুজতে লাগলাম। হঠাৎ কিসে যেন পা বেধে আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। মাথাটা মেঝেতে ঠুকে গেল। অনেকটা নিঃশব্দেই জ্ঞান হারালাম।
যখন চোখ খুললাম তখন নিজেকে পার্শবর্তী খ্রিস্টান সিমেট্রিতে আবিষ্কার করলাম। সারি সারি কবরের নাম ফলক দাড়িয়ে আছে চারপাশে। আমি চারদিকে অপ্রস্তুত হয়ে হেটে হেটে দেখতে লাগলাম কবর গুলি। হঠাৎ একট কবরের নাম ফলকে চোখ আটকে গেল। ওতে লেখা ছিল, “স্যারিয়ান জোসেফ ভেলমন্ড, গীর্জার সম্মান্বিত প্রিস্ট। ১৪২০-১৪৯৮।” কেন জানি মনে হল এটাই সেই নরপশু প্রিস্টের কবর। ওর কবরের কাছে যেয়ে নাম ফলকের উপর খুদাই করা একটা আংটির চিহ্ন। সেই আংটি যা দিয়ে সে ডাকিনীদের কপালে ছ্যাঁকা দিত। এই আংটিকেই আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। যাক, আর কোন সন্দেহ নেই এটাই সেই শয়তানের কবর। একরাশ ঘৃনা হৃদয়ের গভীর থেকে ওর জন্যে উগলে বেরিয়ে এলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম জীবনে যদি কখনো এই শহরের গভর্ণর নির্বাচিত হই তবে আমার প্রথম কাজ হবে এই শয়তানটার কবরের উপর একটা পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা। আইডিয়াটা আমার খুব মনে ধরলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম আশেপাশে কেউ নেই। মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধির উদয় হলো। ভবিষ্যতের পাবলিক টয়লেটের উদ্ধোধন আজকে করে ফেললে কেমন হয়? আজই, এখনই এই শয়তানটার কবরে প্রসাব করে দিলেই তো উদ্ধোধন হয়ে যাবে! যেই ভাবা সেই কাজ। স্কার্টটা নিচে নামিয়ে, দিলাম শয়তানটাকে ভিজিয়ে। প্রস্রাব শেষে অনেক খানি থুথু ও ছিটিয়ে দিলাম ওর কবরে। অতপর লাথি মেরে কবরের নামফলটা মাটিতে ফেলে দিলাম। যাক। এখন অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে। এবার কটেজে ফিরতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেছে। অভিশপ্ত কবরটা ফেলে চলে যাওয়ার জন্যে যখনই উঠে দাড়ালাম, সাথে সাথেই মাটি ফুড়ে একটা হাত এসে আমার পায়ে আঁকড়ে ধরলো। চাঁদনি আলোয় স্পষ্ট দেখলাম ঐ হাতের মধ্যমায় জ্বলজ্বল করছে সেই গনগনে লাল আংটি। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কি অসুরিক শক্তি হাতটায়। আমার এক পা এত শক্ত করে আকড়ে ধরেছে যেন মনে হচ্ছে ছিঁড়ে নিয়ে যাবে। আমি প্রাণপণে অপর পা দিয়ে অনবরত ওর হাতে লাথি মারতে লাগলাম। কিন্তু ও আমায় কিছুতেই ছাড়লো নাহ। একটু একটু করে কবরের পাশে টেনে নিয়ে গেল। তারপর একটা হেচকা টানে টেনে নিলো একদম কবরের ভেতরে।

কবরের ভেতরটায় নিরেট অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছিলো নাহ। ঐ আংটি পরা হাতটাকে নাহ। তবে এইটুকু জানি ঐ হাতের মালিক এ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আশেপাশে কোথাও বসে আছে। আমাকে চরম শাস্তি দেয়ার জন্যে। হঠাৎ মনে পড়লো আমার পকেটে নেক্সাস ফোনটা আছে। ওটা বের করে ওর স্কিনের আলোয় কিছুটা হলেও ভেতরটা দেখতে পারবো। প্রয়োজন হলে সাহায্যের জন্যে পুলিশে ফোন দেয়া যাবে। পকেট টা হাতড়ে ফোনটা বের করে আনলাম। পাওয়ার বাটনটা টিপে সামনে বাড়িয়ে ধরলাম। আরে! এটাতো সেই কবরের ভেতরটা নয়। এটা আমার কটেজ। পাশেই দেখলাম একটা ফুলের টব ভেঙ্গে পড়ে আছে। বুঝলাম আমার কটেজে প্রবেশের পর এই টবে পা বেধেই আমি উল্টে পরে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। কবরস্থান আর প্রিস্টের কবরের ঘটনাটা নিছক অজ্ঞান অবস্থায় দেখা আরেকটি দুঃস্বপ্ন। আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে উঠে বসলাম। তারপর খেয়াল হলো আমার স্কার্ট সম্পূর্ণ ভিজে গেছে! হায় ঈশ্বর! আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছি! ধ্যাত। মোবাইলের আলোয় সহজেই দেয়ালের সুইচবোর্ড খুজে নিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিলাম। উজ্জ্বল আলোয় চোখ সয়ে এলে যেখানে আমি পড়ে গেছিলাম সেদিকে ফিরে তাকালাম। আমার প্রস্রাবটুকু সেখানে কার্পেটকে ভিজিয়ে একটা গোলাকার চাকতির মতো দাগ তৈরি করেছে। অনেকটা স্বপ্নে দেখা সেই আংটির আকৃতি। কিন্তু এই আংটির রহস্যটা কি? আলেস কি এই আংটির জন্যে এত দিন এখানে পড়ে আছে। সম্ভবত ও চায় যেন আমি আংটিটা এনে দেই। অন্তত উদ্ভট স্বপ্ন গুলি আমাকে সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। একটু আগে ও আমায় দেখিয়ে দিয়েছে আংটিটা কোথায় আছে। খ্রিস্টান কবরস্থানে সেই মৃত প্রিস্টের কবরের ভেতর। চোখ বন্ধ করতেই সেই আংটি পরা হাতের ছবি মনে ভেসে উঠলো, যা স্বপ্নে আমার পা চেপে ধরেছিলো। উহঃ। আমি আর ভাবতে পারছিনা। মাথায় আঘাতের যন্ত্রনা, প্রস্রাবের উৎকট গন্ধ, সারাদিনের ক্লান্তি সব মিলিয়ে একটা নরকের আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। আমি সব কিছুকেই উপেক্ষা করে, সোজা বাথরুমে গোসল করতে ঢুকলাম।
গোসল করতে করতে হঠাৎ আয়নায় চোখ গেল। আমার প্রতিবিম্ব দেখলাম কপালটা ফুলে একটা আলু গজিয়েছে। বুঝলাম এটা একটু আগে পড়ে যাওয়ার ফল। ইশ। কেন যে মোবাইলের আলো জ্বালানোর কথা প্রথমেই মাথায় এলো নাহ। তাহলে এভাবে অন্ধকারে পড়ে যেতে হত নাহ। এসব যখন ভাবছিলাম তখন হঠাৎ আয়নায় আমার প্রতিবিম্বটা বদলে আলেসের চাহারা ফুটে উঠলো। আসলে ওর উপস্থিতিটা এখন অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। এখন আর ওকে দেখে এখন আর আগের মতো ভয় বা আনন্দ কিছুই হয়। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। খানিক পরে ও আয়না থেকে চলে গেল। কিন্তু আয়নার ধুলোর মাঝে লেখা ফুটলো, “আংটিটা পুড়াও। আমায় মুক্তি দাও।”

আমি লেখাটা মুছে না যাওয়া পর্যন্ত ওটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রকৃতপক্ষে কি চায় আলেস? প্রথমে আমায় ওর ডায়ারী পড়াতে চাইলো। এখন আবার একটা আংটি চাইছে যেটা কবরের ভেতরে প্রিস্টের লাশের হাতে পড়ানো আছে। কি করতে চায় ও সেই আংটি দিয়ে? ঐ আংটি এনে না দিলে ও কি আমার ক্ষতি করবে? আর কি করলে এসব বিদঘুটে স্বপ্ন আমার পিছু ছাড়বে? এ প্রশ্নগুলি আমায় পাগল করে দিচ্ছে। আমি এর সমাধান চাই। আমাকে এর সমাধান করতেই হবে। গোসল সেরে খানিকটা হালকা লাগলো। তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাহিরে আসা মাত্র শুনতে পেলাম একটা মেয়েলী কন্ঠ একটানা আমার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছে। সাঞ্জে সাঞ্জে সাঞ্জে …… এক অমোঘ আকর্ষণ এ ডাকে। আমি অনেকটা মোহবিষ্টের মতো এগিয়ে গেলাম ঐ ডাকটা লক্ষ্য করে। কিন্তু এটা আগের মতো লাইব্রেরী থেকে আসছে নাহ। এটা আসছে আমার ঠিক পায়ের নীচ থেকে! বেসমেন্ট! আলেস আমাকে সেই বেসমেন্টের বন্দিশালায় ডাকছে? কিন্তু ওখানে তো সম্পূর্ণ অন্ধকার। বেসমেন্টে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগানো হয়নি। আমি সেই ডাক উপেক্ষা করে আবার আমার বেডরুমে ফিরে এসে দু গ্লাস পানি খেলাম। ডাকটা তখনো চলছে। আমার মনের একটা অংশ বলছে বেসমেন্টে নেমে দেখে আসো, আলেস কি জন্যে ডাকছে। হয়তো ও আমায় এমন কিছু দেখাতে চায় যা ওর আত্মার মুক্তিতে সহায়তা করবে। অপর অংশ বলছে আলেস থেকে দুরে থাকো। যাই হোক না কেন ও একটা অশরীরী। ওই অন্ধকার বেসমেন্টে ও আমার যে কোন ধরনের ক্ষতি করতে পারে! কিছুক্ষণ ভাবতে ভাবতে এ দুটো মনের লড়াইয়ে অনুসন্ধিৎসু মনটাই বিজয়ী হল। আমি বেসমেন্টের দরজা খুলে আমার ফোনটায় আলো জ্বেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। সিড়ি ভেঙ্গে যতই নিচে নামছি ডাকটা যেন ততই জোরালো হচ্ছে। একটা সময় সেই এক সারির পাঁচটা সেলের সামনে এসে দাড়ালাম। বুঝতে পারলাম ডাকটা আসছে ডান দিক থেকে ৩ নম্বর সেলের ভেতর থেকে। ভয়ে হৃদপিণ্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসেছে। সমস্ত মানসিক শক্তি একত্রিত করে আমি ঐ সেলে ফোনের আলো ফেললাম। নাহ। বাকি সেল গুলির মতোই ওটাও সম্পূর্ণ খালি। সেই পুরানো দিনের মতো সেলটায় কোন তালা ঝুলছে নাহ। ভেতরে কোন বন্দিও নেই। তবুও সেল গুলির অবয়বে নিষ্ঠুরতার ছাপ এতটুকু কমে নি। হঠাৎ মনে খেয়াল জাগলো, ভেতরে ঢুকে দেখলে কেমন হয়? আমি বুঝতে চাই কিভাবে আলেস আর মার্টিনী এখানে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাতো। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ৮ ফিট বাই ৮ ফিটের এক বর্গাকার সেল। তিন দিকেই পাথুড়ে দেয়াল। শুধু সামনের দিকটায় শিখ দিয়ে আটকানো। তাতে ৫ ফিট বাই ৩ ফিটের একটা দরজা, কয়েদীদের ভেতরে আনা নেয়ার জন্যে। ভেতরটা সম্পূর্ণ খালি। কোন আসবাবপত্র নেই। এসব যখন ঘুরে ফিরে দেখছিলাম তখনই হঠাৎ সেলের দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল! আমি উন্মাদের মতো দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বশক্তিতে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু তালা না থাকা সত্ত্বেও দরজাটা শক্ত হয়ে আটকে গেছে। হায় হায়। এই শতাব্দী প্রাচীন বন্দিশালায় এখন আমি বন্দি হয়ে পড়েছি! না কি আলেস আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছে! ভয়ের এক ঠান্ডা স্রোত ঘাড় বেয়ে নেমে গেল! আবার মনে পড়লো হাতে ধরে থাকা ফোনটার কথা। আমি পুলিশে মেসেজ দিয়ে আমাকে এখান থেকে উদ্ধারের জন্যে বলতে পারি। কিন্তু ফোনের দিকে তাকাতেই সেই আশা গুড়েবালি হয়ে গেল। ওয়াই ফাই কানেকশন লস্ট দেখাচ্ছে। তার চেয়েও ভয়াবহ কথাটা হল ফোনে মাত্র ৪% চার্জ আছে। একটু পরেই এর স্কিনের আলো বন্ধ হয়ে যাবে। আমি ভয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি। যদিও জানি এ বিশাল শূন্য কটেজে কেউই আমার চিৎকার শুনবে নাহ। সেলের দরজায় ধাক্কাতে ধাক্কাতে কাঁদ ব্যাথা হয়ে গেছে। তবুও খুলছে নাহ। একসময় চলতে চলতে বার দুয়েক লো ব্যাটারি সিগনাল দিয়ে ফোনটা অফ হয়ে গেল। নিরেট আধার পুরো সেলটা কে গ্রাস করে নিল। অবিশ্বাস্য ভাবে বদ্ধ বেসমেন্টের ভেতরই একটা ঝটকা বাতাস এসে আমার শরীরে পেঁচানো তোয়ালেটা উড়িয়ে নিয়ে গেল। সেলের ভেতর প্রায় সব জায়গা হাতড়েও আমি তোয়ালেটা পেলাম নাহ। আমি এটারই ভয় পাচ্ছিলাম। আলেসের মৃত্যুর শত শত বছর পরে ওর সেলে, ওরই মতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় আমি আটকে পড়েছি!

(চলবে)

ডাকিণী (৯ম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

(৮ম পর্বের পর থেকে)

সেরাতে তিনটে বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি। প্রথমে দেখলাম আমি অফিস শেষে গাড়িতে করে প্রতিদিনের মতোই আমার কর্টেজে ফিরছি। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক করে হেঁটেহেঁটে কর্টেজের দিকে আসছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আমার কটেজের ছাদ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে বাথরুমের আয়নায় দেখা সেই মেয়েটা ঝুলে আছে। তার ঘাড় ভেঙ্গে একপাশে বেঁকে আছে। হা করা মুখটা আমার দিকেই ফেরানো। নিষ্প্রাণ চোখ দুটো আমারই দিকে অপলক চেয়ে আছে। হায় হায়! আমার কটেজে একটা মরা লাশ ঝুলছে! আমি ভাবতে শুরু করলাম এটা কে নিয়ে কি করা যায়। পুলিশে ফোন দিবো না কি বিশাল কটেজের কোথাও গর্ত করে পুঁতে দিবো। কিছুই বুঝতে পারছিলাম নাহ। তখনই লাশটা আমার দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত হাসি দেয় এতে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। ওর চোখ দুটো যেন জ্বলছিলো! আমি ভয় পেয়ে কটেজ থেকে দৌড়ে পালাতে শুরু করি। দৌড়াতে দৌড়াতে যখনই কুয়ার পাশ দিয়ে প্রধান ফটকের কাছে চলে আসি তখনই আমার পথ রোধ করে একটা অগ্নিকুণ্ড প্রজ্জলিত হয়। আমি বিষ্ময়ে দু পা পিছিয়ে আসে। অগ্নিকোণ্ডে সুষ্পষ্ট দেখলাম একটা লাশ পোড়ানো হচ্ছে। আমি বাংলাদেশে থাকতে বেশ কয়েকবার শশ্মান ঘাটে লাশ পুড়াতে দেখেছি। তাই ব্যাপারটা এতটা ভয়াবহ লাগল নাহ। কিন্তু লাশটা কার? মনে কৌতুহল নিয়ে আমি অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি গেলাম। কাছে যেতেই পুড়তে থাকা লাশটা হঠাৎ দাড়িয়ে গেল। লাশটার ঘাড়টা ছিলো পেছনের দিকে বাঁকানো! বুঝতে বাকি রইল না এটা সেই মেয়েটার লাশ যাকে আমি খানিক আগে আমার কটেজের ছাদে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখেছি। ভয়ে আমি জমে কাঠ হয়ে গেলাম। পা দুটোর সাথে যেন কয়েক মন ওজনের পাথর আটকে দেয়া হয়েছে! একসময় পুড়তে থাকা লাশটা চিৎকার করে উঠলো! লাশটার আর্তচিৎকারে আমি হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেলাম। বুঝলাম আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে। তাই ঘুরেই কটেজের দিকে ফিরে দৌড় দিলাম। কিছুদূর যেতেই কতগুলি হাত আমায় ঝাপটে ধরলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম কতগুলি কালো আলখাল্লা পরিহিত লোক আমাকে ধরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি এই ছোটাছোটিতে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে ওদের বাঁধা দিতে পারলাম নাহ। ওরা সিঁড়ি বেয়ে আমায় কটেজের ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে পৌছতেই ওরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে হাত পা বেধে দিলো। আমি কটেজের ছাদ থেকে মাটির দিকে মুখ করে ঝুলছি। নীচে আমি একদল অপেক্ষমান জনতাকে দেখতে পেলাম, কিন্তু এদের কাউকেই আমি চিনি নাহ। অতপর আমি শুনলাম কে যেন চেঁচিয়ে বলছে “তিন তিনজন মানুষ খুনের অপরাধে তোমাকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। অতপর এক বিশ্রী চেহারার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা, সাদা আলখাল্লা পরিহিত এক মাঝ বয়সী লোক এসে আমায় কষে থাপ্পড় মারলো! আমি ব্যাথায় কেঁদে ফেললাম। চারপাশে তখন হাসির রোল উঠলো। তারপর দেখলাম লোকটা তার হাতের কড়ে আঙ্গুল থেকে বিচিত্র নকশা খচিত আংটি খলে নিয়ে একটা ধাতব শিকে ঝুলিয়ে জ্বলন্ত গনগনে কয়লার উপর বসিয়ে গরম করতে লাগলো। আলেসের ডায়ারীটা পড়া থাকায় আমি বুঝতে পারলাম এখন কি হতে যাচ্ছে। ওই লোকটা আংটি গরম করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিতে যাচ্ছে। আতংকে আমার হাত পা অসার হয়ে আসলো। দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে আমি হাত পায়েবাঁধন খুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যতই চেষ্টা করছি দড়ির বাঁধন গুলি যেন মাংস কেটে আরো গভীরে বসে যাচ্ছে। এরই মধ্যে উত্তপ্ত আংটি টকটকে লাল হয়ে গেছে। লোকটা আংটা দিয়ে সেটা ধরে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সবকিছুই যেন স্লোমোশনে হচ্ছিলো। যেন অনন্তকাল লাগলো লোকটার দশ কদম হেটে আমার কাছে পোঁছাতে। অতঃপর লোকটা গরম আংটিটা বাগিয়ে ধরলো আমার কপাল বরাবর। ওটা ধীরেধীরে এগিয়ে আসছে, আরো কাছে! আমি যতটা সম্ভব মাথাটা পেছনে হেলিয়ে ওটার কাছ থেকে যতটা সম্ভব দুরে সরে যেতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু লোকটা শেষ পর্যন্ত আমার নাগাল পেয়ে গেলো। উত্তপ্ত আংটিটা ও ঠেসে ধরলো আমার কপালে। আমি এতদিন জানতাম মানুষের স্বপ্নের কোন রং থাকে নাহ। স্বপ্নে মানুষ স্পর্ষ, ব্যাথা অনুভব করে নাহ। কিন্তু গতরাতের স্বপ্নে আমি গনগনে কয়লার টকটকে লাল রঙ দেখেছি। তারপর লোকটা যখন ওটা আমার কপালে ঠেসে ধরলো তখন মনে হলো আমার কপালে একটা বুলেট ঢুকছে। এটা যেন আমার কপাল পুড়িয়ে হাড় ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে! এত্ত বেশী যন্ত্রনা হচ্ছিলো যে আমি ঘুমের মাঝে চিৎকার করে উঠে বসলাম। যাক বাবা। একটা ভয়াবহ স্বপ্ন থেকে বাঁচা গেলো। আজ ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেছে! আজ অফিসে যে কি হবে। লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠেই তৈরি হয়ে অফিসপাণে ছুটলাম। তাড়াহুড়োয় নাস্তা করতে ভুলে গেলাম। অফিসে পৌছাতে পৌছাতে আধা ঘন্টা দেরি হয়ে গেল। যে অফিসের প্রধান নির্বাহীই অফিসে আসতে আধাঘণ্টা দেরি করে সে অফিসের ভবিষ্যৎ তো শুধুই অন্ধকার। সবার সামনে দিয়ে মাথা নিচু করে হাটতে হাটতে নিজের অফিসে গিয়ে বসলাম। আমি এসব আর সইতে পারছি নাহ। আলেসের ব্যাপারটা একটা এসপারওসপার করতেই হবে আমাকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এসব উদ্ভট স্বপ্ন গুলির পেছনে নিঃসন্দেহে ওর হাত আছে। কিন্তু আমাকে এসব দেখিয়ে ওর লাভটা কি? প্রকৃতপক্ষে ও কি চায় আমার কাছ থেকে? ও কি সত্যিই বন্ধুপ্রতিম? নাকি বন্ধুত্বের নাম ভাঙ্গিয়ে ও আমার উপর ভর করে এই জীবন্ত জগতে ফিরে আসতে চায়? আমি কিছুই জানি না। এতগুলো প্রশ্ন মাথায় নিয়ে আমি কিছুতেই অফিসে মনযোগ দিতে পারলাম না।
আজ অফিসের সময়টা যেন খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল। অফিস ছেড়ে আমার কর্টেজে ফিরতে কেমন জানি ভয়ভয় করছে। কেন জানি মনে হচ্ছে আমি ওখানে নিরাপদ না। ওখানে আজ রাতে বাজে কিছু হতে চলেছে। গতরাতের ভয়াবহ স্বপ্নটা যেন তারই আগামবার্তা বহন করছিলো।
আজ বাহিরে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম। সাধারণত আমি বাহিরে খাই না। তবে আজ অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না বলে এভাবে খানিকটা অতিরিক্ত সময় বাহিরে কাটালাম। অতঃপর নিজের মনকে অনেক কিছু বলে প্রবোধ দিয়ে কটেজের পথ ধরলাম। ফিরতে ফিরতে সূর্যাস্ত হয়ে গেল। গুধুলির আধারে কটেজটা সেই অভিশপ্ত গীর্জার অবয়ব ধারণ করলো। মনের মধ্যে চাপা দেওয়া ভয়টা আবার ফিরে এলো। গ্যারেজে গাড়িটা পার্ক করে কটেজের দিকে হাটা শুরু করলাম। হাটতে হাটতে হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগলো কি হবে যদি গতরাতের স্বপ্নটা এখন সত্যি হয়ে যায়? যদি ওখানে গিয়ে দেখি ছাদ থেকে একটা মরা লাশ ফাঁসিতে ঝুলছে! কটেজের ছাদের দিকে তাকালাম। এতদুর থেকে গুধুলির অধাঁরে কিছুই দেখতে পারলাম না। সত্যি সত্যিই ঝুলছে কি না তা নিশ্চিত হতে আমাকে কটেজের আরো কাছে যেতে হবে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা হাতুড়ি পিটাচ্ছে। আমি এলো মেলো পদক্ষেপে কাপাঁ কাপাঁ পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি সেই অভিশপ্ত কটেজটার দিকে।