মানুষখেকো দানব [শেষ অংশ]

2

আসসালামু ওয়ালাইকুম। সবাই সালামের জবাব দিলাম।সবার চোখে-মুখে উৎকন্ঠা স্পষ্ট। আমি একটু আগ বাড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার বলুনতো। সবচেয়ে বৃদ্ধ যে লোকটা সে বলল “মৃত ব্যাক্তিটি হলো এই এলাকার জামাই।শশুর বাড়ীতে এসেছিল। সাপের কামড়ে সন্ধায় মৃত্যু হয়েছে। এখন ঐ পাড়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে দাফনের জন্য।” সবার জড়তা মনে হয় একটু কাটল।

-বাবা নৌকা নাই

-না চাচা দেখি না তো

-ঠিক আছে তাহলে আপনারা এইখানে লাশের পাশে দাড়ান আমরা গিয়ে নৌকা নিয়ে আসছি।

এইটা কি কয়? মাথাটা আবার ঝিনঝিন করে উঠল। একটু সন্দেহও লাগছিল। শেষে আমি বললাম আপনারা চারজন এবং আমরা চারজন মিলে গিয়ে নৌকা নিয়ে আসব। আর বাকি সবাই এখানে থাকুক।চাচা মনে হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারল। চাচার মুখে যে হাসিটা দেখলাম সেই হাসির রহস্য হাজার রকমের হতে পারে।

আমরা আটজন মিলে রওনা হলাম। নদীর পাড়ে ধরে হাটছি। সাথে দুইটি হারিকেন। চাচা মনে হয় মাঝির বাড়ি চিনে।সেই দেখলাম চিনিয়ে চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটা জায়গায় এসে চাচা থামল। টর্চলাইট মেরে দেখলাম ঘাটে ঐ বিশাল নৌকাটা বাধা আছে। জায়গাটা অনেক অন্ধকার। নদীরপাড়ের উপরে বাড়ি ঘরও আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুপুরী। কিছুটা ভয় ভয় লাগছে। একটা প্যাচা উড়ে গেল।পানিতে কিছু পড়ার শব্দ। ঐ হাইল্যা… হাইল্যারে…….. বুঝতে পারলাম মাঝির নাম হালিম। কোন সারাশব্দ নাই। চাচা রাগে বলতে লাগল সবাই কি মইরা ভূত হয়ে গেছে। শেষে আমরাই নৌকা নিয়ে আসলাম।

অনেক বড় নৌকা। নৌকার ছাদ নেই। উপরে কাঠ দিয়ে মেঝে করা হয়েছে। তবে মাঝখানে চার হাতের মত জায়গা ফাকা। পানি সেচের সুবিধার জন্য এটা করা হয়। আমরা এই ফাকের এক পাশে বসলাম। অন্য পাশে ওরা। আমি নৌকার শেষ মাথায় বসলাম। নৌকা যখন ছাড়বে, ঠিক তখনি কাশবনের ভিতর থেকে একটা আওয়াজ আসল।

-বাবারা আমারে একটু নিয়া যাও।

টর্চ লাইট মেরে দেখি এক বৃদ্ধলোক। ভাবলাম এতরাত্রে আমরা নিয়া না গেলে বেচারা কিভাবে পার হবে? তাই আমিই সবাইকে অনুরোধ করলাম নেওয়ার জন্য। নৌকাটি ভাসিয়ে লোকটি লাফ দিয়ে নৌকায় উঠল। নৌকাটি দোলনার মত দোল খেতে লাগল। আমার কাছে মনে হলো সবাই নৌকায় উঠার পর নৌকাটি যতটুকু ডুবল ঐ লোকটি উঠার পর আরও বেশী ডুবল। লোকটি লাশের ঠিক পায়ের কাছে বসল। নৌকা চলতে লাগল।

খুব বেশী বড় নদী না। কিছুটা স্রোতআছে। মনের ভিতর অজানা আশংকটা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করছি ততই মনে পড়ছে। এই হালকা চাদনী রাতে কাশবনের উপরে কুয়াশার ধোয়া যে মায়াবী জাল সৃষ্টি করেছে তা আলিফ লায়লার কথা মনে করিয়ে দিল। ভয় কাটানোর জন্য মনে মনে গানগাওয়ার চেষ্টা করলাম। জোর করেই কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে যেতে চাইলাম। দূরে ভেসে যাওয়া কলাগাছরুপী লাশগুলোকে একমনে দেখছিলাম।

হঠাৎ যে নৌকা চালাচ্ছিল তার বিকট চিৎকার। কেউ একজন পানিতে ঝাপিয়ে পড়ার শব্দ। আমি ঘুরে তাকাতে তাকাতেই সমস্ত নৌকাটা দুলে উঠল যেন কোন নীলদড়িয়ায় নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়েছে। সবাই লাফিয়ে পানিতে পড়ছে। মামা চিৎকার করে পানিতে লাফ দেওয়ার জন্য বলছে। আমি উঠে দাড়ালাম। নৌকার শেষমাথায় টর্চলাইট মেরে দেখি বৃদ্ধটি লাশের একটি পা ধরে পা’র মাংস খাচ্ছে। পায়ের হারটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বৃদ্ধটির মুখে আলোপড়তেই আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।চোখ থেকে নীলআলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মুখে রক্তের দাগের মত এ্যাবরো-থেবরো মাংস লেপটানো। বিবৎস দৃশ্য। খুব বমি আসতে লাগল। আমি জোড়করে চেষ্টা করছি সবকিছু আটকিয়ে রাখতে। তীরের দিকে তাকালাম। বুঝতে পারছি এতটুকু সাতার দিয়ে পার হওয়া আমার পক্ষে সম্ভবনা। সবাইকে দেখলাম চিৎকার করছে আর দৌড়াচ্ছে। আমি বৃদ্ধের দিকে টর্চলাইট মেরে দাড়িয়ে রইলাম। বৃদ্ধটি আমার দিকে তাকালো…… উঠে দাড়ালো….. ঝপাৎ।

যতক্ষণ পারলাম সাতার কাটতেই থাকলাম। শেষে মাটি হাটুতে বাজল। বুঝতে পারলাম তীরে এসে পৌছেছি। দৌড় লাগালাম। চিৎকার অনুসরণ করে কাশবনের ভিতর দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। হাজার-হাজার মানুষের চিৎকার। চারদিকে মশাল আর মশাল। কেউ কেউ ডাকাত ডাকাত করেও চিল্লাচ্ছে। কাশবনের ঐ পাশেই একটা বাড়ী আছে সেখানে সবাই পরে রইলো। আমিও গিয়ে ঐ খানে শুয়ে পড়লাম। চারদিকে মানুষ ঘিরে ধরেছে। কেউ কেউ আমার কাছে ঘটনা জানতে চাইলো…. আমার মুখ দিয়ে কোনকথা বের হচ্ছিলনা। এর মাঝে একজন সবাইকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিল। সবার মাথায় পানি ঢালার ব্যাবস্থাকরতেবলল। মামার হুশ হওয়ার পর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল- ভাইগ্না বাইচ্যা আছ? আপা আমারে মাইরাই ফালতো। একে একে সবাই হুশ হলো। আমিসব ঘটনা খুলে বললাম। এর মাঝে দেখিশরীফের আব্বাও লোক নিয়ে হাজির। কেউ কেউ নদীর পাড়ে যাওয়ার সাহস দেখালো। শেষে আমি সবাইকে নিয়া নদীর পাড়ে গেলাম। নৌকা নাই। আমরা স্রোতের অনুকুলে হেটে যাচ্ছি। সবাই চিৎকার করে উঠল এই যে নৌকা। দেখলাম শুধু কংকালটা আছে। এর মাঝে একজন বলল দেখিতো মাটিতে রাক্ষসটার পায়ের দাগ আছে কিনা? আমরা নদীর পাড়ে কোন পায়ের দাগও পাইনি।

শেষে ঐ কংকালটিই মাটি দেওয়া হলো।

সমাপ্ত

মানুষখেকো দানব [১ম অংশ]

0

এস.এস.সি পরিক্ষা শেষ। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না? একদিন আম্মা বলল চল সইয়ের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসি। আমি, আম্মা, বদরুল, হাদীমামা সবাই মিলে কিশোরগন্জের পাকুন্দিয়া আম্মার সইয়ের বাড়ী বেড়াতে গেলাম।হৈ হৈ রৈ রৈ করে দিনগুলো খুব ভালই কাটছে। এর মাঝে একদিন ঐ এলাকায় মাইকে প্রচার হচ্ছে যাত্রা হবে।আমরা খুবই উৎফুল্ল। রাত্রে আমি, মামা, নয়ন ভাই, স্বপন, শরিফ, আরও তিনজন মিলে রওনা হলাম। মোটামুটি তিন কি.মি. রাস্তা। তার মাঝে নাকি আবার নদী পার হইতে হয়।

প্রচন্ড শীত। খোলা গলায় গান ছেড়ে নদীর পাড় দিয়ে চলছি। পাশের ঘন কাশবনের ফাক দিয়ে মাঝে মাঝে একজোড়া…দুই জোড়া চোখ এসে উকি দেয়। উকি দিয়েই শেয়াল গুলো পাশের ঝোপে হারিয়ে যায়। মামা বলল শেয়ালেরা রাত্রে নদীর পাড়ে আসে কাকড়া খাওয়ার জন্য।

আমরা মূল নদীরঘাটে এসে পৌছালাম। দেখি মাঝি নাই কিন্তু নৌকা আছে। আমরা মাঝিকে ডাকাডাকি করতে লাগলেকিছুক্ষণ পর মাঝিকে দেখলাম কাশবনথেকে বেড়িয়ে আসল। কিছুটা অপৃকতস্থ কি লেগেছিল? মনে নাই। নদী পার হলাম। আরও এক কিলোমিটার।

এবার কিন্তু সোজা কাশবনের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। ছোট একটা রাস্তা। বোঝাই যাচ্ছে এটা একটা কাশবনই ছিল। মানুষ হাটতে হাটতে কিছুটা রাস্তা হয়েছে। হালকা চাদনী। দুইধারের কাশের জন্য দুইপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। শুধু সামনে আর পিছনে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সামনে আর পিছনের দুইপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। কেননা চাদের আলো এত নিচে এসে পৌছাচ্ছেনা। আমরা সবাই হাটছি তো হাটছিই। কুয়াশা পরে দুইপাশের কাশগুলো কিছুটা নুয়ে পড়েছে। ফলে হাটার সময় আমাদের মুখে এসে লাগছে। খুবই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার।

অনেকক্ষণ যাবৎ আমি একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে কিছুক্ষণ পর পরই কাশবনের ভিতর একটা শব্দ হচ্ছে। শেষবার যখন শব্দটা শুনলাম তখন আমার মনে হলো কিছু একটা আমাদের সাথে সাথে চলছে। আর কিছুক্ষণ পরপর শব্দটা শুনিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছে বুঝলাম না। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর একই শব্দটা শোনা যাচ্ছে। বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে করে সামনে যাওয়ার যে শব্দটা ঠিক সেই রকম। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম।তবে কারও কাছে কিছু বললাম না।সোজা সামনে হাটছি।

থেকে থেকে শব্দটা আমি ঠিকই শুনতে পাচ্ছি। একটা জিনিস খুব অদ্ভুত লাগছিল যে সবাই কেমন জানি নির্বিকার, কেউ কি কিছু শুনতে পাচ্ছেনা। তাহলে আমি কি কোন হ্যালুসুনেশনে আছি। মানুষের চেচামেচি শোনা যাচ্ছে। আমি আর মামা ছাড়া আর বাকি সবাই দেখি দৌড় দিল। আমরাও পিছনে পিছনে দৌড় লাগালাম।

মোটামুটি সামনেই বসলাম। সবাই চিৎকার-চেচামেচি করছে। দুইঘন্টা……… এরমাঝে আয়োজকদের একজন এসে বলে গেল চুপ করার জন্য এখনি নাকি যাত্রা শুরু হবে। ৫-১০ সেকেন্ট চুপ ছিল আবার চিল্লা-চিল্লি। এবার স্থানীয় চেয়ারম্যানের অনুরোধ। সবাই চুপ।

নুপুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল। নাচ শুরু হবে মনে হচ্ছে।সে কি নাচ……..নাচেরতালে­ তালে দর্শকরা সবাই উন্মাতাল। মামার দিকে তাকিয়ে দেখি বসে বসে লাফাচ্ছে। মামা আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা লজ্জা পেল। কেউ কেউ টাকাও ছুড়ে মারছে। নৃত্যশিল্পী টাকা কুড়িয়ে ব্লাউজের ফাক দিয়ে বুকে রাখছে আর গা থেকে ধীরে ধীরে কাপড় খুলে ফেলছে। মামাকে দেখি বসা থেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে লাফাচ্ছে। এদিকে দর্শক সারি থেকে কে জানি কাগজ দিয়ে বল বানিয়ে নৃত্যশিল্পীর গায়ে মারল। শিল্পী কিছুটা বিব্রত বোঝাই যাচ্ছে।

আয়োজককারীদের মধ্য থেকে একজন এসে অনুরোধ করে যাচ্ছে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। অহেতুক জামেলা কার সহ্য হয়? কেউ একজন ঐ আয়োজককারীর গায়ে জুতা ছুড়ে মারল। সেচ্ছাসেবক দলের আট-দশজন মিলে একটা লোককে সনাক্ত করে মাইর শুরু করল। সাথে সাথে দর্শকরাও ঝাপিয়ে পড়ল। মুহুর্তের মাঝেই হাজার হাজার মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। শরীফ, স্বপন বলল মামা দৌড় দেন….বিরাট মাইর লাগব…….এই এলাকা খুব খারাপ।

আমরা দৌড় লাগালাম।

শরীফ, স্বপনরা সামনে দিয়া আমরা পিছনে। দৌড়াচ্ছিতো… দৌড়াচ্ছিতো… পিছন দিয়া ধর ধর….জইল্যারে ছাড়িসনা………মজিত্যা কই?এরকম হাজারও চিৎকার কানে ভেসেআসছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি হাজারও মানুষ দ্বিক-বেদ্বিক হয়ে দৌড়াচ্ছে। আমরা তখন রাস্তাছেড়ে কাশবনের ভিতর দিয়া হামাগুড়ি দিয়েদিয়ে আগাচ্ছি। মামার জুতা ছিড়ে গেছে। বেচারা ঐ জায়গায় বসে জুতার জন্য শোক করা শুরু করল। মামা আবার ভীষন কৃপণতো। আমরা মামাকে ধরে টেনে হিচড়ে ভিতরে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে ধর ধর আওয়াজটাও স্তিমিত হয়ে আসছে।

আমরা নদীরপাড়ে এসে দাড়ালাম। হালকা চাদনি। ঘাটে কেউ নেই। সহজেয় বুঝতে পারলাম ভয়ে কেউ এদিকটায় আসেনি। শরিফ বলল এখানে দাড়ানো মোটেও নিরাপদ নয়। যে কোন ভাবেই নদীপাড় হতে হবে। আমি আবার সাতার জানিনা। মামা বলল ভাগ্নে তুমি আমার কাদে উঠ। আমি রাজি হলামনা। আমি সারাজীবন সব জায়গায় মাতব্বরি করতাম শুধু পানি ছাড়া। কেননা হাজার চেষ্টা করেও যে সাতারটা শিকতে পারলামনা। আমার সবসময় ভয় বেশী পানিতে গেলে নিচ দিয়ে যদি কেউ টান দেয়। সবাই আমাকে অনেক বুঝানোর পরও রাজি হলামনা। সবাই নদীর পাড়ে দাড়িয়ে আছি। একটা অজানা আতংক সবার ভিতরে কাজ করছে।

আল্লাহু… আল্লাহু…   সবাই একটু ছড়ানো – ছিটানো থাকলেও দেখলাম মুহুর্ত্তের মাঝে একসাথে জড়ো হয়েগেল। শব্দটার উৎপত্তি বুঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এর মাঝে শুনলাম ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…. কাশবনের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে সে দিকে একটা ক্ষীণ আলোররেখা কাশবনের উপরদিয়ে দেখা যাচ্ছে। আমরা সবাই সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। আলোর তীব্রতা এবং শব্দের তীব্রতা বেড়েই চলছে।

সবাই একদৃষ্টিতে ঐ দিকে তাকিয়ে আছি। দেখি দুইজন মানুষ ঐ কাশবনের পথ দিয়ে বের হয়ে আসছে। দুইজনের হাতে দুইটি হারিকেন। পিছনে চারজনে কাদে করে একটি খাটিয়া নিয়ে আসলো। সাদা কাপড়ে ঢাকা। বুঝলাম কোন লাশ নিয়ে এসেছে। তার পিছনে আরও দুইজন হারিকেন হাতে। অবাক হয়ে গেলাম।

রক্তমাখা কাটা হাত

2

Bloody_Hands_by_kinmizu

আমি ভেবেছিলাম আজকে সন্ধ্যার মধ্যেই ক্লাসের পড়া শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাব। রোজ রোজ রাত জাগতে ভাল লাগেনা। তাছাড়া আম্মু ঢাকার বাইরে গেছেন অফিসের কাজে। আম্মুর অনুপস্থিতিতে লক্ষী মেয়ে হয়ে চলাটা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু কিভাবে কি হল জানিনা,সারা বিকেল ফেসবুকে গুঁতাগুতি করে যখন পড়ার বই খুললাম তখন বাজে রাত দশটা।

গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পড়তে বসেছি,এমন সময় হঠাৎ করে একটা কাক “কা-কা” করে কেমন যেন আর্তচিৎকার করে উঠল। আমি খুব-ই অবাক হলাম। রাতের বেলা কাক ডাকে,তাও আবার এরকম আর্তচিৎকার করে—সেটা এই প্রথম শুনলাম। যাইহোক,ব্যাপারটাকে বেশি পাত্তানা দিয়ে আমি পড়া শুরু করলাম। মাঝে দুই-এক বার কাক ডেকে আমার পড়ার মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করছিল,কিন্তু গুরুত্ব দেইনি। পড়া শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকালাম। এখন ঘুমানো যায়। আড়াইটা বাজে প্রায়। আব্বু মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে। প্রচুর ক্ষুধা লেগেছে। আমি পা টিপে টিপে ডাইনিং রুমের দিকে গেলাম। যদি মুড়ি-টুড়ি কিছু বাসায় থাকে তাহলে উদরপূর্তি করা যাবে! ডাইনিং রুমের টেবিলের উপর রাখা টিনটাতে একটা ঝাঁকি দিলাম। ঠন ঠন করে টিনের মধ্যে শব্দ হল। যতটা জোরে হওয়া উচিত,তার থেকে অনেক জোরে। আমি একটু চমকে ঊঠলাম।টিনটা খুলে দেখলাম ফাঁকা। আশ্চর্য তো! এত জোরে শব্দ হ্‌ওয়ার কারণ কি? আমার কেমন যেন ভয় ভয় লাগল। গা ছম-ছমে একটা ভয়।

যেভাবে পা টিপে টিপে ডাইনিং রুমে গেছিলাম,সেভাবেই আমার নিজের রুমে ফিরে আসলাম। নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর ডিপ ডিপ করে শব্দ হতে লাগল। আমার ঘরটা আজকে অন্যরকম লাগছে। অনেক বেশি ঠান্ডা আর নীরব। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। চারপাশটা কেমন যেন নিকষ কালো হয়ে আছে। অন্যদিন সাধারণত আশেপাশের ফ্ল্যাটগুলোতে অনেক রাত পর্যন্ত আলো জ্বলে। আজকে সেই আলোর চিহ্নমাত্র নেই। এরকম তো কখনো হ্‌ওয়ার কথা না। ভাল করে আবার বাইরে তাকাতেই দেখি শোঁ শোঁ করে একটা শব্দ হচ্ছে। ঝড় হচ্ছে নাকি?বুঝতে পারছিনা। ঝড় হলে বাতাস থাকার কথা। কিন্তু বাইরে বাতাস নেই। শুধু শব্দ। শব্দটা তীব্র হচ্ছে ক্রমাগত। আমি আর বেশি কিছু চিন্তা না করে লাইট অফ করে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়ে গেলে দুনিয়ার সব ভয় ঠান্ডা। বিছানায় শুয়ে পড়ার পর দেখি আর ঘুম আসেনা। চুপ করে শুয়ে আছি আর কি সব যেন আগামাথাহীন ভাবে ভাবছি। এমন সময় খাটের নীচ থেকে হঠাৎ হিসহিস শব্দভেসে এল! আতঙ্কে আমি একেবারে জমেগেলাম। খাটের নীচে উঁকি দেওয়ার চিন্তাটা মাথায় এসেই আবার মিলিয়ে গেল। এই মুহূর্তে খাটের নীচে উঁকি দেওয়ার মানেই নেই। তারচেয়ে ঘুমিয়ে যাওয়াই উত্তম। আমি চোখ বন্ধ করলাম।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানিনা,ভয়ংকর গোঙ্গানির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি নিথর হয়ে শুয়ে গোঙ্গানিটার উৎস খোজার চেষ্টা করছি। একবার মনে হচ্ছে খাটের নীচ থেকে শব্দ আসছে,আর একবার মনে হচ্ছে ড্রেসিং টেবিলের কাছ থেকে। এখন যে রাত কয়টা বাজে সেটাও বুঝতে পারছিনা। বাথরুমে যাওয়া দরকার। কিন্তু ভয়ে বিছানা থেকে ঊঠতে ইচ্ছা করছেনা। ভূত-প্রেতে আমার তেমন বিশ্বাস নেই—আমি আসলে ভাবছি,খাটের নীচে চোর-টোর লুকিয়ে আছে কিনা! গোঙ্গানির শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আব্বু পাশের রুমে ঘুমাচ্ছে। একবার ভাবলাম আব্বুকেঘুম থেকে ডেকে তুলি। কিন্তু পরে মনে হল সেটা ঠিক হবেনা। এমনিতেই আব্বুর ব্লাড প্রেসার বেশি থাকে সবসময়। আর তাছাড়া আমি তো ভয়ে বিছানা থেকে নামতেই পারছিনা!

হঠাৎ হাতের মধ্যে কিসের যেন স্পর্শ পেলাম,ধাতব কিছু। জোরে চিৎকার দিতে যাব,এমন সময় বুঝতে পারলাম আমার মোবাইলটা নিয়ে শুয়েছি। ধড়ে প্রাণ ফিরে এল যেন। সাথে সাথে বাটন টিপে মোবাইলের টর্চটা জ্বালালাম। টর্চ দিয়ে দেয়ালে টাঙ্গানো ঘড়িটার দিকে আলো ফেললাম। ঘড়িতে দুইটা চল্লিশ বাজে। এতক্ষণে মাত্র দশ মিনিট পার হয়েছে। আমি মাত্র দশ মিনিট আগে শুয়েছি! সব কিছু কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগে আমার। আমি খুব সাবধানে টর্চের আলো মেঝের দিকে নিলাম। মেঝেতে রক্ত! মেঝেতে জমাট বেঁধে আছে রক্ত!

আমি কান্ডজ্ঞানহীন ভাবে বিছানা থেকে উঠে ছুটে গিয়ে রুমের দরজার নবে হাত রাখলাম। প্রচন্ড শক্তি দিয়ে নব ঘুরিয়েও দরজা খুলতে পারছিনা। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে,ঘুমানোর আগে আমি দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়েছি। বিড়বিড় করে সূরা পড়তে পড়তে নিজেকে প্রবোধ দিলাম আসলে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আমি যা ভাবছি,শুনছি, দেখছি সব মিথ্যা। মনে হয় বেশি বেশি হরর মুভি দেখার ফল। আমি চিৎকার করে আব্বুকে ডাকতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হলনা।

ঘরের ভেতর জান্তব গোঙ্গানি বেড়েই চলেছে। সাথে কান ফাটানো শোঁ শোঁ শব্দ। আমি কোন কিছু চিন্তা না করেই ঘরের সাথে লাগানো বাথরুমে ঢুকে পড়লাম। বাথরুমের লাইট অন করেই দেখি আমার পায়ের পাতা রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে! আমি নিজেই বুঝতে পারছিনা আমার জ্ঞান আছে কি নাই? হঠাৎ চোখে পড়ল বাথরুমের এক কোণে বাক্সে রাখা ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ার জন্য কেনা bones গুলোর দিকে। এক কাজিনকে দেব দেখে সেগুলো আর বিক্রি করা হয়নি। কেমন জীবন্ত হয়ে আছে হাড্ডিগুলো! মনে হচ্ছে এক একটা bones জোড়া লেগে কঙ্কাল হয়ে এক্ষুণি ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার উপর! আমি যথাসম্ভব চিৎকার করে বাথরুম থেকে বের হয়ে আছড়ে পড়লাম লক হয়ে যাওয়া রুমের দরজার উপর! আব্বুউউউউউ বলে চিৎকার ঢেকে গেল জান্তব অট্টহাসিতে!

পিছনে ঘুরে দেখি ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ার সুবিধার জন্য সবগুলো হাতের আঙ্গুল জোড়া লাগিয়ে বাঁধানো কঙ্কালের হাত ভেসে আসছে আমার দিকে। কব্জির কাছ থেকে নাই হয়ে যাওয়া অংশটুকু থেকে টপটপ করে ঝরছে রক্ত। আমি আরেকবার চিৎকার দেওয়ার আগেই আমার কন্ঠরোধ করে ধরল কঙ্কালের কাটা হাত।

রাতের বেলা যে কেউ মেয়েটাকে এক নজর দেখলে ভাববে মেয়েটা ভুল করে মেঝেতেই ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু ভোরের আলো যখন মেয়েটার মুখে এসে পড়বে,তখন সবাই দেখবে মৃতা মেয়েটার ঠান্ডা গলার কাছে কালসিটে পড়া,সেখানে রয়েছে সরু একটা হাতের ছাপ!

সমাপ্ত

অশুভ গলির তিন প্রেত­ [১ম অংশ]

5

 

নন্দীপাড়ার সরু রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। শুক্কুরবার সকাল। মেঘহীন উজ্জ্বল দিন। ঢাকা শহরের এ দিকটা বেশ ঘিঞ্জি। অনেকদিন এদিকটায় আমার আসা হয় নি। নন্দীপাড়ায় এসেছিলাম জমি দেখতে। আমার জমি পছন্দ হয়নি। তাছাড়া নিষ্কন্ঠক বলে মনে হল না। আমি ব্যাঙ্কে চাকরি করি। জাল কাগজপত্র সহজে ধরতে পারি। দালালের সঙ্গে কিছুক্ষণ চোটপাট করে এখন রাগের মাথায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।

হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল- এদিকেই তো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ওয়াহেদরা থাকত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওয়াহেদের সঙ্গেই দু-একবার ওদের নন্দীপাড়ার বাড়িতে এসেছিলাম ।যদিও ওয়াহেদ-এর সঙ্গে বহু বছর যোগাযোগ নেই। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করি তখনও মোবাইল যুগ শুরু হয়নি। এটা এক কারণ। অন্য কারণ হল, আমি এম.এ পাস করেই অনেকটা তাড়াহুড়ো করে বিদেশ চলে গিয়েছিলাম। দীর্ঘকাল প্রবাস জীবন কাটিয়ে এই বছর দশেক হল দেশে ফিরে এসেছি।

আমি ওয়াহেদের খোঁজ নেব ঠিক করলাম। ও যখন এদিকেই থাকে হয়তো সেআমাকে দস্তুরমতো এক টুকরো জমির খোঁজ দিতে পারবে। তাছাড়া ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা করার আরও একটা কারণ আছে। আমাদের সবারই বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। চুলে পাক ধরেছে। হার্টের অসুখ আর ডায়াবেটিস নিত্যসঙ্গী। এই সময়টায় পুরনো বন্ধুবান্ধবের জন্য মন হু হু করে।

সামান্য ঘোরাঘুরির পর ওয়াহেদরা যে গলিতে থাকত সেই গলিটা চিনতে পারলাম। গলির ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই আমার গা কেমন ছমছম করে উঠল। এর কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না। অস্বস্তিকর অনুভূতি এড়াতে একটা সিগারেট ধরালাম। দু’পাশে আস্তর-ওঠা দেয়াল, নোংরা ড্রেন। দোতলা, তিনতলা সব বাড়ির লোহার গেট। ঝাঁপি-ফেলা মুদিদোকান। সিগারেট টানছি। আর হাঁটছি। বাঁ পাশে কচুরিপানা ভরতি একটা পুকুর।বাতাসে পানার গন্ধ ভাসছে। শুক্কুরবারে এমনিতেই ঢাকা শহরটা ঝিম মেরে থাকে। এই গলিতেও এই মুহূর্তে লোকজন তেমন চোখে পড়ল না। রোদটা কেমন মরাটে হয়ে এসেছে। তবে আকাশে মেঘ-টেঘ জমেনি।

ভাবছি ওয়াহেদরা কি এখনও এখানেই থাকে। ও খুব প্রাণবন্ত ছেলে ছিল। সারাক্ষণ বন্ধুদের মাতিয়ে রাখত। এম.এ পড়ার সময় হঠাৎই ওর বাবা মারা যান। তারপর ওয়াহেদ কেমন গুটিয়ে যায়। ভার্সিটি কম আসত। ওর মা বেঁচে ছিলেন না। শিউলি নামে ওয়াহেদের এক বোন ছিল। আমরা ওয়াহেদদের বাসায় গেলে শিউলি পরদার ওপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মারত।ট্রেতে চা আর পাপড় ভাজা নিয়ে খুব সেজেগুঁজে বসারঘরে আসত। শিউলি বেশ সুন্দরী ছিল দেখতে। ফরসা। ক্লাস নাইন কি টেনে পড়ত সম্ভবত। (ওয়াহেদ রক্ষণশীল ছিল, ও বোনকে চোখে চোখে রাখত) মনে আছে … ওয়াহেদদের বাড়িটা ছিল দোতলা। ওরাঅবশ্য একতলায় থাকত। দোতলা ছিল ভাড়া। আর একটা ফার্মেসি ছিল ওদের। ওর এক আত্মীয় বসত ফার্মেসিতে। তবে বাবা মারা যাওয়ার পর ওয়াহেদকেই ফার্মেসি দেখাশোনা করতে হত।তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সুরভী নামে একটি মেয়ের সঙ্গে ওয়াহেদের ভালোবাসার সর্ম্পক গড়ে উঠেছিল। তবে সুরভীর চরিত্রে অদ্ভূত এক দ্বৈততা ছিল। বেশ শান্ত, গম্ভীর, চশমা পরা সুরভী পড়ত সমাজকল্যাণ বিভাগে। শ্যামলা রঙের ছিপছিপে সুরভী কথাও বলত কম। সুরভী ছিল রাজশাহীর মেয়ে। ওর এক কাজিন (চাচাতো ভাই) পড়ত লোকপ্রশাসন বিভাগে। কালো স্বাস্থবান, গোলগালচেহারার শাহনেওয়াজ আর সুরভীকে প্রায়ই আমরা ক্যাম্পাসে, টিএসসিতে একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। ওয়াহেদ, বরাবরই দেখেছি, শাওনেওয়াজকে একেবারেই সহ্য করতে পারত না। সুরভী নাকি বলত, তুমি অহেতুক শাহনেওয়াজ ভাইকে সন্দেহ কর ওয়াহেদ।

অবশ্য আমি সরাসরি এসব ঘটনায় যুক্ত ছিলাম না। দূর থেকে দেখতাম কেবল; আর পাত্রপাত্রীকে চিনতাম শুধু। আসলে এ রকম কত ঘটনার সাক্ষীছিলাম ইউনিভার্সিটি জীবনে। ওয়াহেদ-সুরভী আর শাহনেওয়াজ-এর ত্রিমূখী দ্বন্দটি ছিল সেরকমই একটি ঘটনা।

ওদের কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত?

কথাটা ভাবতে ভাবতে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি- একটা শাটার-ফেলা একটা সেলুনের সামনে ওয়াহেদ। মাথায় ছোটছোট করে ছাঁটা লালচে শক্ত চুলে পাক ধরেছে মনে হল। লম্বাটে ফরসা মুখে খোচা খোচা পাকা দাড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের পুরু লেন্সের চশমা। পরনে খয়েরি রঙের বার্মিজ লুঙ্গি আর কুঁকচে যাওয়া গোলাপি রঙের শার্ট। পায়ে রাবারের স্যান্ডেল। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ গোটানো।

ওকে দেখে সিগারেট ফেলে দিলাম। ওয়াহেদ আমাকে দেখেছে। চিনতে চেষ্টা করছে বলে মনে হল। চিনতে পেরে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, এনামুল না?

আমি হাসলাম। হ্যাঁ, দোস্ত। কেমন আছিস?

ওয়াহেদ ফ্যাকাশে হাসল। উত্তর দিলনা। পুরু লেন্সের ফাঁকে ওর চোখ দুটি কেমন ঘোলা দেখালো। ঘোলা খুব শীতল মনে হল। মনে হল চোখ দুটি মার্বেলের তৈরি।

হঠাৎ আমার কেমন শীত করতে থাকে। হঠাৎ বাতাসে আশটে গন্ধ পেলাম। মনে হল কাছেই কোথাও বেড়াল বা ইঁদুর মরে পড়ে থাকবে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি।

বললাম, অনেক দিন পর। তাহলে তোরা এখানেই থাকিস?

ওয়াহেদ মাথা নাড়ল। বলল, বাপদাদার বাড়ি।

চারিদিকে তাকিয়ে বললাম, এ দিকটা এখনও আগের মতেই আছে। তা এখন কি করছিস তুই?

প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল ওয়াহেদ। বলল, আমরা এখনও ওই দোতলা বাড়ির এক তলায় থাকি ।বলে হাত তুলে একটা হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি দেখাল। বাড়ির সামনে প্রাচীর। খয়েরি গেইট। প্রাচীরের ওপাশে পেয়ারা গাছ চোখেপড়ে। বাড়িটা দেখেই চিনতে পারলাম।বেশ পুরনো দোতলা বাড়ি। মনে আছে ওয়াহেদ বলেছিল- ওরা ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী। তবে কুট্টি নয়।

পাশ দিয়ে একটা খালি রিকশা চলে যায়। আতরের গন্ধ ভুরভুর পেলাম। অবাক হলাম। রিকশাওয়ালা কি আতর মাখে নাকি?

এনামুল । ওয়াহেদ খসখসে কন্ঠে বলে।

কি? বল।

দোস্ত। তুই এখন আমার বাড়ি গিয়ে বস। আমি একটু পরেই আসছি।

সে কী! তুই যাবি না? তুইও চল না।

না, না। তুই যা। আমি এখটু পরেই আসছি। বলে হনহন
করে হাঁটতে লাগল ওয়াহেদ।

ভাবলাম ওর হাতে বাজারের ব্যাগ। বাজার-টাজার করতে যাচ্ছে। আমার সামনে কেনাকাটা করতে লজ্জ্বা পাচ্ছে।

আমি হাঁটতে-হাঁটতে ভাবলাম- আশ্চর্য! আমি কি করি বা কোথায় থাকি- সেসব ওয়াহেদ জানতে চাইল না।আর ওর হাতে মোবাইলও নেই দেখলাম। তবে ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [২য় অংশ]

1

 

সবাই বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী নাকি ঝাউদীঘির জল থেকে কয়েক শ মানুষ ভেসে উঠতে দেখেছিলেন। মানুষগুলির পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি; এক হাতেকোদাল, অন্য হাতে টুকরি।

বলেন কী!

হ্যাঁ। ইনামগড়ের লোকে বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী ঝাউদীঘি থেকে মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুরদের উঠে আসতে দেখেই মারা গেছেন।

কথাটা আমার কেন যেন ঠিক বিশ্বাস হল না। আমি ঠান্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবলাম।

(১) জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। হয়তো হার্ট অ্যাটাক করেছিল। সেই আমলের মানুষ আজকের দিনের মতো এত স্বাস্থসচেতন ছিল কি? আর ডাক্তারি বিদ্যের জোর তো তথইবচ

(২) ঝাউদীঘি থেকে মৃত শ্রমিকদের তো জীবিত উঠে আসার প্রশ্নই আসে না।

(৩) এ দেশের মানুষ ভীষন গল্পপ্রিয়। অনেকে আবার ভালো গল্প-বলিয়ে। স্টেশনমাস্টারটি সেরকমই গুণধর একজন মানুষ । নির্জন স্টেশনের নিঃসঙ্গ মানুষটি আমাকে দেখে গা ছমছমে গল্প ফেদেছেন, সমস্ত প্রতিভা উজার করে দিয়েছেন। গল্পবরং উপভোগ করাই ভালো। তর্ক করে লাভ নেই।
আমি গত তিরিশ বছর পেশাগত কাজে কতপুরনো বাড়িতে কাটিয়েছি। কই, কখনও তো কোনও অশুভ প্রেতাত্মা ভয়াল রূপ ধরে আমার সামনে এল না । বন্ধুরা আমাকে ডাকাবুকো বলে। পরলোকে অবিশ্বাসী বলেও আমার দুর্নামও আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, পরের বছর চৈত্র মাসের গোড়ায় মারা গেলেন জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ট পুত্র জমিদার দিব্যেন্দুপ্রকাশ রায়চৌধুরী। ওই একই ভাবে। গরমে ঘুম আসছিল না। মাঝরাতে অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ ঢলে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
ওহ্ ।
আপনাকে তখন একবার বলেছি সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধর ইন্ডিয়া চলে যায়। এখন নাকি রায়চৌধুরী পরিবারের অনেকেই বিলেতে থাকেন।
আচ্ছা।
স্টেশনের বাইরে খটাখট খটাখট ঘোড়া ক্ষুরের আওয়াজ পেলাম।
স্টেশনমাস্টার সচকিত হয়ে বললেন,আপনার লোক বুঝি এসে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাদিক সাহেব? অমন অশুভ জায়গায় আপনার না গেলে চলে না?
মৃদু হেসে বললাম, উপায় নেই। সরকারি কাজে এসেছি। বলে ভারী সুটকেশটা তুলে নিলাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, ঠিক আছে। অশুভ জায়গায় যখন যাচ্ছেন যান। কিন্ত বলে রাখি, আমি সারারাতই স্টেশনে আছি। তেমন কোনও বিপদ টের পেলেই ছুটে আসবেন ।
কথাটা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
কেয়ার টেকারের নাম ওসমান গাজী। বৃদ্ধই বলা যায় । তবে স্বাস্থ বেশ ভালো। এই বয়েসেও বেশ গাট্টাগোট্টা। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় নীল রঙের মখমলের টুপি। টুপির নীচে পিছনের দিকে চুল যা বেরিয়ে আছে তার সব পাকা। বসন্তের দাগ ভরতি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ফিরোজা রঙের সদরিয়া আর চোস্ত পাজামা পরে ছিল ওসমান গাজী । বৃদ্ধের হাঁটাচলার ভঙ্গি খুবই নিরীহ । কথাবার্তায়ও অত্যন্ত বিনয়ী।
ওসমান গাজী আমার সুটকেশটা ঘোড়াগাড়িতে তুলে দিল। ইনামগড়ের রাস্তায় যে আজও এই একুশ শতকের বাহনটি চলে সেটি জানতাম না। নিছক ছ্যাকড়া গাড়ি হলে না-হয় এক কথা ছিল, এ তো দেখছি রীতিমতো জমিদার আমলের আলিশান জুরীগাড়ি! ভিতরে সবজে রঙের গদিওয়ালা বসার আসন। ওপর থেকে ঝুলছে ছোট ছোট ঘন্টি লাগানো ঝালর। ছোট আয়নাও বসানো রয়েছে দেখলাম। বেশ উপভোগই করলাম উনিশ শতকী বাহনটা।
শালজঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পিচরাস্তা বেঁকে চলে গিয়েছে। শেষবেলায় উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে ছিল। সবে চৈত্রের শুরু। বনে অজস্র শুকনো পাতা। আচমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঘোড়াগাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিতেই একটা ময়ূর চোখে পড়ল । বেশ পুরনো আমলের আবহ। পথটা ধীরে ধীরে সরু হয়ে উঠেছে। দু’পাশে এখন ঘন লেবুবাগান। লেবুবাগানে আলোআধাঁরির খেলা আর কাক-পাখিদের অসহ্য কিচিরমিচির।
লেবুবাগানের মাঝখানে একটা টিনসেড। তারই সামনে ঘোড়াগাড়ি থামল। ঘোড়াগাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি। একতলা টিনসেডের সামনে একচিলতে বারান্দা। খাওয়ার টেবিল। কাঠের একটা বেঞ্চি। ওসমান গাজী বেঞ্চির ওপর আমার সুটকেশটা রেখেঅত্যন্ত বিনীত কন্ঠে বলল- সে এই টিনসেডেই থাকে। আমার থাকার ব্যবস্থাও নাকি সে ওখানেই করেছে।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম রান্নার জায়গা বাদেও ছোট ছোট দুটি ঘর। একটা ঘরের মেঝেতে কোদাল ও টুকরি দেখলাম। হয়তো ওগুলি বাগানে কাজ করার সময় ওসমান গাজীর কাজে লাগে।
লেবুবাগানের ভিতর ছোট্ট একটি পুরনো মন্দিরও চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম।বৌদ্ধদেবী তারার মন্দির। বাংলাদেশে এ ধরনের মন্দির রেয়ার। আমি ঝটপট আমার ক্যানন রিবেল এক্সএসটা বের করলাম। তারপর বিভিন্ন অ্যাঙেলে ছবি তুলে নিলাম।
তখনও যেহেতু দিনের আলো ছিল। আমি জমিদার বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখব ভাবলাম। অল্প একটু ঘুরে যা মনে হল আমার। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দিটা অন্তত ছয় একরের কম হবে না। মূল ভবনের ইমারতগুলি বেশ উঁচু উঁচু । দেখেই বুঝলাম উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।রায়চৌধুরীরা যে জৌলুসপূর্র্ণ জীবনযাপন করত তাও বোঝা গেল। এখন অবশ্য ইমারতগুলি – দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে যা হয়-ইঁদুর, চিকা, চামচিকা, চড়–ই পাখি আর কবুতর দখলে চলে গেছে।
প্রধান প্রবেশপথের বাম পাশে মূলভবনের এলাকার মধ্যেই খোলা জায়গায় একটি কৃষ্ণমন্দির। তারই ডান পাশে মূল ভবনের বহির্বাটি এবং প্রবেশপথ। তারপর বর্গাকার একটি চত্বর। পূর্ব দিকে চত্বরমুখী সমতল ছাদবিশিষ্ট আরও একটি মন্দির। মন্দিরের সামনের অলিন্দ এবং মন্দিরের ছাদটি রয়েছে চারটি স্তম্ভের উপর । মূল বাড়িটি তিনটি প্রধান মহলে বিন্যস্ত। আয়না মহল, রানী মহল এবং ঠাকুরবাড়ির মহল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দলদালানের ইট ক্ষয়ে গেছে।
একতলার কক্ষের দরজা-জানালাগুলিভেঙে পড়েছে । অনেক দরজায় আবার তালা। তালাগুলি ওসমান গাজী কে দিয়ে ভাঙাতে হবে। একতলার একটি কক্ষে বড় বড় ছ’-সাতটি সিন্দুক দেখলাম । সিন্দুকগুলি খুলে দেখতে হবে। ভিতরে যা আছে তার লিষ্ট করতে হবে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [১ম অংশ]

1

স্টেশনমাস্টারের কথায় রীতিমতো চমকে উঠলাম। ইনামগড়ের রায় চৌধুরীদের জমিদার বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত। রাতের বেলা তো দূরের কথা স্থানীয় লোকজন দিনের বেলাও নাকি ওদিকে ঘেঁষে না। আমি খানিকটা বিমূঢ় বোধ করলাম। কারণ একটু পরই আমার রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়ি তে যাওয়ার কথা। আমি স্টেশনমাস্টারের মুখের দিকে তাকালাম। মাঝবয়েসি ভদ্রলোক । শিক্ষিত, ভদ্র চেহারা। এমন মানুষের তো কাউকে মিছিমিছি ভয় দেখানোর কথা না। আমি যদিও অভিশপ্ত ভুতুরে হানাবাড়িতে বিশ্বাস করি না। তাই সদ্য পরিচিত ভদ্রলোকের সামনে ভদ্রতা করেই চুপ করে রইলাম। স্টেশনমাস্টার চা খেতে দিয়েছেন। তাতেই চুমুক দিলাম।
স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকারের মাথায় মস্ত টাক। গায়ের রং যথেষ্ট ফরসাই বলায় যায়। ছোটখাটো গড়ন। পরনের পাজামা-পাঞ্জাবি দেখলেই বোঝা যায় স্টেশনমাস্টারটি অত্যন্ত সাদাসিদে । আধঘন্টা আগে যখন আমি ইনামগড় স্টেশনে নামলাম তখন তিনিনিজে থেকেই আলাপ করতে এলেন। তার ঘরে ডেকে বসালেন। তারপর প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর চা খেতে দিলেন।
আমি যখন ইনামগড় স্টেশনে নেমেছি বেলা তখন তিনটা। ঝকঝকে দিনের আলো ছড়িয়ে ছিল। স্টেশনটি অবশ্য নিজর্নই ছিল। আমি সামান্য অস্বস্তির মধ্যেই পড়ে গিয়েছিলাম। আমার জন্য একজন কেয়ারটেকার অপেক্ষা করার কথা। স্টেশনে সেরকম কাউকে অবশ্য দেখতে পেলাম না।
আমি পুরাতত্ত্বের ওপর কিছু বই লিখেছি। বইগুলি দেশিবিদেশি পুরাতাত্ত্বিক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। দিন কয়েক আগে পুরাতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। আমি যেন সংরক্ষণ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে ইনামগড়ের রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়িটির ওপর একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিই। এ কারণেই আমার আজ ইনামগড়ে আসা।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাতচল্লিশে পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধরেরা ইন্ডিয়া চলে যায়। তারপর থেকেই ইনামগড়ের জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে।
আচ্ছা। বলে আমি চায়ে চুমুক দিলাম। তারপর স্টেশনমাস্টার কে জিজ্ঞেস করলাম, তখন ঝাউদীঘি নিয়ে কি যেন বলবেন বললেন?
স্টেশনমাস্টার ম্লান হেসে বললেন, আমি এই ইনামগড়ে এসে যা শুনেছি তাই আপনাকে বলছি। এখানে এসেই শুনেছি রায়চৌধুরীদের ওই জমিদারবাড়িটি অভিশপ্ত। জানি যে একুশ শতকে এই সব কথা বিশ্বাস করাকঠিন। আর আপনি যখন শিক্ষত মানুষ।
আপনি কখনও গিয়েছেন জমিদারবাড়িতে? আমার প্রত্নবিদের মন প্রশ্নটা করে বসল।
সর্বনাশ! বলেন কী আমি যাব ঐ অলুক্ষে হানাবাড়িতে?
তাহলে তা সবই শোনা কথা?
হ্যাঁ। তা বলতে পারেন। সবই শোনা কথা। স্টেশনমাস্টার যেন সামান্য মিইয়ে গেলেন।
বললাম, বলুন তাহলে শুনি, আপনি কি শুনেছেন। হাতে যখন সময় আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, বলছি, শুনুন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। এ অঞ্চলে খুব খরা হল।মাঠঘাট, খালবিল, নদীনালা সব শুকিয়ে কাঠ। পানির অভাবে ঘরে-ঘরে কান্নার রোল। তৃষ্ণার্ত প্রজারা ভাবল- একটা জলাশয় থাকলে এত দুর্ভোগ ভোগ করতে হত না। কিন্তু কথাটা তারা রগচটা জমিদারের কানে তুলতে সাহসপেল না। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর স্ত্রী চিত্রলেখা দেবী ছিলেন ভারি দয়ালু মহিলা । নিয়মিত ধ্যান-দান করতেন। প্রজাদের সুখদুঃখের খোঁজখবর করতেন। তো, চিত্রলেখা দেবীর কাছেই প্রজারা একটি দীঘি খননের অনুরোধ করে। স্ত্রীর সানুনয় অনুরোধ নাকি জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী উপেক্ষা করতে পারেন নি। জমিদারবাড়ির পিছনে ছিল বিশাল একটি ঝাউবন । সেই ঝাউবনে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী দীঘি খননের জন্য জমি দান করে দিলেন। শত শত মাটি-কাটিয়ে মজুর দিনরাত কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে লাগল, তাতে একটা গভীর খাত তৈরি হল ঠিকই- কিন্তু পানি উঠল না। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী মাটি-কাটিয়ে মজুরদের মাটি কেটে আরও গভীরে যেতে নির্দেশ দিলেন। তারপরও পানি উঠল না দেখে অসন্তুষ্ট জমিদার এক তান্ত্রিক যোগী তলব করে জলশূন্য দীঘির পাড়ে ‘জলধি পূজার’ আয়োজন করলেন । তারপরও পানি উঠল না। হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী মাটি-কাটিয়ে মজুরদের মাটি কেটে আরও গভীরে যেতে নির্দেশ দিলেন। শত শত শ্রমিক খাদের তলায় কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চলেছে। টুকরি করে মাটি ওপরে এনে ফেলছে। হঠাৎ এক বিকেলে পানি উঠে গভীর খাতটা ভরে গেল। মুহূর্তেই সব মজুর তলিয়ে গেল।
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। হতভাগ্য শ্রমিকদের ভাগ্য চিরকালই মন্দ। এদের মধ্যে বিশ্বজুড়ে খনিশ্রমিকদের অবস্থাই সবচে করুন সম্ভবত।
স্টেশনমাস্টারের টেবিলের ওপর একটা মেরুন রঙের পুরাতন ফ্লাক্স। তিনি ফ্লাক্স খুলে কাপে চা ঢাললেন। তারপর সিগারেট ধরালেন। বাতাসে তামাকের গন্ধ ছড়াল । স্টেশনমাস্টারের চেয়ারের ঠিক পিছনেই একটি জানালা। জানালার কাঁটাতারের বেড়ায় রঙনের গুল্ম। বেড়ার ওপাশেশালগাছের ঘন জঙ্গল চোখে পড়ে। অনেক কাক ডাকছিল। রোদের রং ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চৈত্রবেলার নির্জন অপরাহ্ন। স্টেশনটা কেমন সুমসাম করছে।
চায়ের কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বললাম, তারপর কি হল?
একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, ইনামগড়ের মানুষ খরায় অসহ্য বোধ করছিল। দীঘি পানি তে ভরে উঠলে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেল। টলটলে পানির দীঘির চারধারে ঝাউগাছ । তাতে দীঘির নাম লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল- ঝাউদীঘি।
আর মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুররা? ওদের লাশ পাওয়া যায়নি?
না।
না। আশ্চর্য!
স্টেশনমাস্টার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, লাশ হয়তো সেভাবে খোঁজাও হয়নি । সেকালে দরিদ্রশ্রেণির মানুষের মৃত্যু নিয়ে কে অত মাথা ঘামাত বলুন?
হুমম। আমি মাথা নাড়লাম। মনে মনে বললাম … দরিদ্রশ্রেণির অবস্থা এই একুশ শতকেও তো বিশেষ বদলায়নি।
প্রবীণ স্টেশনমাস্টারের মুখ কেমন গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বোঝাই যাচ্ছে ভদ্রলোক এখনি পিলে চমকানো কোনও তথ্য দেবেন। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, তারপর কী হল শুনুন। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর অনিদ্রা রোগ ছিল। মাঝরাতে শয়নকক্ষের বাইরের অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। ভীষন গরম। চৈত্রমাসের শুরু। হঠাৎ তিনি ঢলে পড়ে গেলেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
মারা গেলেন? কি হয়েছিল? আমি ভুঁরু কুঁচকে জিগ্যেস করলাম

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

 

পান খাওয়া সাদা বুড়ি

1

আব্বা WAPDA তে চাকুরী করতেন। সেই জন্য ওনার পোস্টিং হতো কয়েক বছর পর পর দেশের বিভিন্ন শহরে। আমি তখন ক্লাস ২ তে পরি। এবার আব্বা বগুড়া তে পোস্টিং পেয়েছেন। নতুন স্কুল, নতুন জায়গা, নতুন বন্ধু সব কিছুই এলো মেলো। গোছাতে সময় লাগবে। স্কুলটা কিন্তু WAPDA এর ভেতর ছিলনা,আমাদের যেতে হতো প্রায় ১ KM হেটে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর স্কুল এ। স্কুল এর বন্ধুরা বলতো তোমাদের কলোনিতে ভূত আছে। বিশ্বাস করতাম ছোটো ছিলাম বলে।

রাতের বেলায় ঘুমানোর সময় তাই বড় ভাইকে ধরে ঘুমাতাম। সেদিন যে খাটে শুয়েছি পা বরাবর অনেক বড় জানালা। গরম বেশি থাকাতে জানালাটা খুলেই ঘুমিয়েছি দুভাই। আমার বড় ভাই সব সময় আমাকে ঘুমানোর আগে দোয়া পরিয়ে ঘুম পারাত, কিন্তু সেদিন আমি দোয়া না পরেই ঘুমিয়ে গেছি। মাঝ রাত্রে স্বপ্নে দেখলাম এক সাদা কাপড় পড়া বুড়ি পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে। তার হাসি দেখে পিলে চমকে যাওয়ার মত অবস্থা সেই ঘুমের মধ্যেই। স্বপ্নের মধ্যেই দেখলাম মা আমাকে তুলে ছুঁড়ে দিল ঐ বুড়ির দিকে আর বুড়িটা আমাকে নিয়ে চলে যাওয়া মুহূর্তে মা আমাকে আবার ছিনিয়ে নিচ্ছে ঐ বুড়ির কাছ থেকে। মা আমাকে শক্ত করে ধরে আছে আর বুড়িটা মায়ের কাছে থেকে আবার আমাকে নিয়ে নেয়ার জন্য হাত বাড়াচ্ছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে মা আমাকে আবার তার কাছে ছুঁড়ে দিল এবং বুড়িটি আমাকে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আবার মা আমাকে ছিনিয়ে নিল তার কাছ থেকে। এভাবে চলল কিসুক্ষন এবং আমি জোরে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম। বাসার সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলো আমাকে নিয়ে, আমি জানালা থেকে দূরে সরে আসার অনেক চেষ্টা করতে লাগলাম, মা যখন আসলো তখন তাকে এমন জোরে ধরেছি যে আমাকে ছুটানর জন্য আব্বা আর ভাই দুই জন শক্তিশালী মানুশ এর প্রয়োজন হয়েছিল। আর আমি বারবার বলছিলাম আমাকে দিয়ে দিওনা ঐ বুড়ির কাছে। মা আমাকে আয়াতুল কুরসি পরে বুকে ফুঁক দিলেন এবং ঐ রাত্রের জন্য আমরা সবাই এক ঘরে ঘুমালাম। কারন জানলাম যে বড় ভাইও ভয় পেয়েছেন আমার চিৎকারে।

পরের দিন মসজিদের হুজুর কয়েক আয়াত পরে বুকে ফুঁ দিলেন আমার জন্য। এর পর থেকে প্রায় রাত্রেই গোঙাতাম আর ঘুম ভেঙ্গে যেত ভাই এর ডাকে। এত গেল স্বপ্নে দেখা সাদা বুড়ি। এই বুড়িকে আমি বাস্তবে দেখেছি ৬ বছর পর। আসছি শেই ঘটনায়। আল্লাহ্‌ বলেছেন, “অয়ামা খালাক্তুল জিন্নাহ অয়াল ইনসা ইল্লা লিয়াবুদুন”—“আমি জিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি”।

মানুষের মদ্ধে যেমন ভালো খারাপ আছে তেমনি ওদের মদ্ধে ও ভালো খারাপ আছে। মানুষ এক প্রজাতি হয়ে যেমন অন্য প্রজাতির ক্ষতি করে তেমনি জিনরাও অন্য প্রজাতির (মানুষ সহ) ক্ষতি করে। তাই খারাপ জীন আছে এটা বিশ্বাস করলে দোষের কিছু হবেনা। আর ভুতের কথা বলছেন? এরাও জীন, কেও ভালো আবার কেউবা খারাপ। ভুত শব্দটা আমরা আমাদের কথিত বাংলা ভাষায় ব্যাবহার করে থাকি।

আমি তখন ক্লাস এইট এ পড়ি। গ্রামে নতুন বাড়ি কেনা হয়েছে মুনশিগঞ্জের শ্রীনগর থানার হাঁসারা গ্রামে। ভাই চলে গেছেন বিদেশে চাকরির খাতিরে তাই বাড়ির বড় ছেলে বলতে আমি। জিবনে কখনো গ্রামে থাকিনি নানির বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ছাড়া, তার উপর ইলেক্ট্রিসিটি অথবা ভাল রাস্তাঘাট ছিলনা ঐ সময়। ভুতের ভয়ের চাইতে বিষাক্ত শাপের ভয় বেশি ছিল ঐ বয়সে। বাড়ির পাশেই একটা মাঝারি ধরনের বট গাছ, তার পর বড় বড় কতগুলো দিঘি, এগুলর বা দিকে আছে একটা অনেক বড় খালি বাড়ি। বাড়িটাতে অনেক বড় বড় আম গাছ আর করই গাছ। সামনে আসে একটা ভয়ঙ্কর রকমের ভাঙ্গা জমিদার বাড়ি নাম সেনের বাড়ি, অনেক বড় এলাকা জুড়ে ছিল এই বাড়িটি। হাজার রকমের বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা। ভেতরে ঢুকলে সূর্যের আলো চোখে পরেনা। তার ২০০ গজ দুরেই আমাদের স্কুল। মুনশিগঞ্জের সবচেয়ে পুরনো স্কুল। বাজারে যাওয়ার সময় আমি এই দিক দিয়ে না যাওয়ার চেষ্টা করতাম আর যদি জেতাম তবে মানুষ থাকত। অন্য দিক দিয়ে বাজারে গেলে সোজা রাস্তা। বর্ষার সময় এই রাস্তাটা দুবে যেত তাই বাধ্য হয়েই আমাকে এই রাস্তা দিয়ে প্রাইভেট পরতে যেতে হত বিকাল বেলায় সেই ভাঙ্গা বাড়ির সামনে দিয়ে আর ফিরতে হত সন্ধ্যার সময় কখনো কখনো রাত ১০ টার পর।

এখন বর্ষাকাল তাই আমাকে বিকাল বেলায় কাজের ছেলে করিম নৌকায় করে স্যারদের এলাকায় দিয়ে গেল। জায়গাটার নাম পালের বাড়ি। করিম বয়সে আমার চাইতে বছর ২ এর ছোট হবে, দুজনেই নৌকা বাইতে খুব পছন্দ করতাম, তাই আমাকে হেটে যেতে হলনা। ও বাড়িতে চলে গেল আর আমি গেলাম স্যার এর বাসায় পরতে। পরালেখায় মোটামুটি ছিলাম তাই ক্লাস ৮ এর বৃত্তির জন্য খুব প্রস্তুতি চলছিল। পরতে পরতে রাত সাড়ে ১০ টা বেজে গেল। স্যার বলল যেতে পারবি বাড়িতে না দিয়ে আসতে হবে? প্রেস্টিজে লেগে গেল যদি ও ভয় পাচ্ছিলাম, বললাম স্যার কি যে বলেন না। কাল দেখা হবে স্কুলে বলে আমায় যেতে বললেন। আমার হাতে একটা কলমের সাইজ এর মত একটা টর্চ ভাই পাঠিয়েছে বিদেশ থেকে। কিন্তু এটার একটা সমস্যা হল ৫ থেকে ৬ সেকেন্ড পর বন্ধ করতে হয় কিচুক্ষনের জন্য। যেহেতু করিম আসবেনা এত রাতে তাই আমাকে হেটে যেতে হবে সেই ভাঙ্গা বাড়ি দিয়ে।

আয়াতুল কুরসি পরে বুক এ ফুঁ দিয়ে হাটা শুরু করলাম। মহাসড়ক দিয়ে ১৫ মিনিট হাটার পর ডানদিকে বাক নিতে যাওয়ার সময় আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালাম কারন সামনে দেখি একলোক যাচ্ছেন আমার রাস্তা বরাবর। তার পিছু নিলাম। ৩ মিনিট পর সেই ভাঙ্গা সেনের বাড়ি। আমি এটাকে এড়িয়ে অন্য দিক দিয়ে গেলে আমাদের স্কুল দিয়ে যেতে পারি কিন্তু গেলাম না কারন আমার সাথে ঐ ব্যাক্তি আছেন। মজার ব্যাপার হল এতক্ষনের জন্য আমি একবার ও তাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি উনি কেমন আছেন বা কোথা থেকে এলেন। আর তাছাড়া এলাকায় নতুন বলে অনেকে আমাকে ঠিক মত চিনেও না, আমিও অনেক কম চিনি। চুপচাপ তাকে ফলো করে সেনের বাড়ি যেটা এখন শবাই বলে সেনের বাগে ঢুঁকে গেলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর ঐ ব্যাক্তি আমার সামনে থেকে একটু দূরে কোথায় গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার পেন্সিল টর্চ দিয়ে খোঁজার চেষ্টা বৃথা কারন উনি কথাও নেই। ডাকলাম কিন্তু অনেক বাদুড়ের শব্দ ফিরে এল। টর্চটা জালিয়ে আর বন্ধ করলাম না। দিলাম দৌড়। এক দৌড়ে বাড়ি পার হয়ে এলাম এবং সামনে গ্রাম্য পোষ্টঅফিস। সেখান থেকে একটা বাঁশের পুল প্রায় দেড়শ গজের মত লম্বা হবে ওপাড়ের এক বন্ধুর বাড়ি আলামিন দের বাড়িতে সংযুক্ত। আমাকে বাড়ি পৌছতে হলে এ পুল বা সাকো পার হতেই হবে। আয়াতুল কুরসি পরছি আর আল্লাহ, আল্লাহ্‌ করছি। সাঁকোর মাঝ খানে এসে হঠাত আমার চোখ যায় ডান দিকে সেই খালি বাড়িটার দিকে। আমার জান বের হয়ে যাওয়ার মত অবস্তা। দেখলাম একটা অনেক বড় আম গাছের নিচে সেই সাদা বুড়িটা পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে নাচানাচি করছে আর আমাকে ডাকছে হাত দিয়ে ওখানে যেতে। তার হাসি দেখেত আমার হার্টবিট আর বেড়ে গেল। আমি এখন না পারি আলামিনদের বাড়ি যেতে না পারি সেনের ভাঙ্গা বাড়ি পথ দিয়ে স্যার এর বাসায় ফিরে যেতে। অগত্যা আল্লাহ নাম করে সাঁকো শক্ত করে ধরে পাড়ি দিচ্ছি খুব সাবধানে। তারাতারি যেতে পারছিনা কারন একেত ভয় তার উপর গ্রামের সাঁকোতে নতুন নতুন চরার অভিজ্ঞতা। যতই আলামিন্দের বাড়ির কাছে যাচ্ছি বুড়ির গলার শব্দ শুন্তে পাচ্ছি। কি? আমায় চিনতে পারছিস? আমি এসেছিলাম তোকে নিতে, তোর মা দেয় নি। আজ কে আটকাবে? বন্ধুরা, তার চেহারা দেখতে আমাদের বুড়ো নানি দাদিদের মতই দেখতে। কিন্তু লম্বায় প্রায় ২০ ফুট এর মত হবে। বুড়ির তামশা মনে হয় আর বেড়ে গেল। এখন চাঁদের আলোয় তাকে আর পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বুড়ি নাচছে আর আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমাকে বলছে তোকে আজ এই গাছের নিচে পুঁতে রাখব। আমি চার কুল পরে বুকে ফুঁ দিয়ে ওর দিকেও তাক করে ফুঁ দিলাম। এখন আমি আলামিন্দের বাড়ির নামায় এসে পরেছি। আমি দৌড় দিলাম না। তাকিয়েই ছিলাম ঐ বুড়ির দিকে। হঠাত সেই বুড়িটা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আর দেখতে পেলাম না। আমি আর দেরি না করে বাড়ির দিকে রউনা হলাম। দিঘি পার হয়ে বট গাছ আসল। আমি আগে থেকেই করিমকে ডাকলাম নৌকা নিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে বট গাছের কাছ থেকে। করিম ঘুমিয়ে পরেছিল। গ্রামের সবাই ঘুমে। মা করিমকে ডাকছে উঠোন থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি বট গাছের ওখানে দারিয়ে থেকে। বট গাছের ডাল পালা ভেঙ্গে যাওয়ার মত অবস্থা। আমি মাকে জোরে বললাম আমার ভয় লাগে করিম কে তারতারি পাঠাও। মা বলল, “ভয় পাবিনা আমি দারিয়ে আছি এই পারে”।

করিম ঘুম থেকে উঠলো ঠিকই কিন্তু ওর ও ভয় লাগে। ও আগে নিশ্চিত হয়ে নিল আমার নাম ধরে ডেকে যে এটা আমি কিনা। মা চলে গেল তার ঘরে আর করিম আশ্ছে নৌকা নিয়ে কচুরিপানা সরিয়ে আছতে আছতে। গাছ থেকে ফিশ ফিশ শব্দ করে কে জেন বলল তোর মা তোকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বেচে গেলি আজ।

বাড়ি আসলাম মাকে কিছু বললাম না। পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখব কি সেটা। কিন্তু পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় আমি ভুলে গেলাম সম্পূর্ণ রূপে। জানিনা এত বড় ঘটনাটা কিভাবে একটা মানুষ ভুলতে পারে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন কিরে বাড়ি ফিরতে সমস্যা হয়নিত? আমার মনে পরে গেল সেই ঘটনা। আমি বললাম না স্যার কোনও সমস্যা হয়নি। স্কুল ছুটির পর বাড়িতে ফেরার সময় সেই গাছটির দিকে তাকালাম। কিছুই দেখলাম না। দেখার কথাও না। কারন আমার সাথে স্কুল বন্ধুরাও ছিল। আমাকে প্রাইভেট পড়ার ছলে এই যন্ত্রণা আর দুর্ভগ আর ৩ দিন সইতে হয়েছিল, তারপর এই বুড়িকে আর দেখিনি। দরুদ, কোরানের আয়াত আর নতুন আয়ত্ত করা সাহস আমাকে শিখিয়েছিল ঐ রকম পরিবেশে কিভাবে চলতে হয়। এখন আমি ইউকে তে থাকি। আমার বাসার পাশের কবরস্থান। এখানে ও আমি অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিশ দেখি সেটা নাহয় আরেকদিন বলব? ভালো থাকবেন। যে যে ধর্মই পালন করেননা কেন। সৃষ্টিকর্তা কে সব সময় মনে রাখবেন। উনি আপনাকে, আমাকে সবসময় রক্ষা করবেন।

শেয়ার করেছেনঃ Aminul Islam

গর্জনিয়ার উড়ন্ত লামা ও অলৌকিক নীলশঙ্খ – শেষ পর্ব

0

শান্তা বলল, আমি তোমাকে এর  আগে কোথায় দেখেছি। কোথায়? আমার কন্ঠস্বর কেঁপে উঠল। আমাকে তো ওর দেখার কথা নয়। উত্তর না-দিয়ে শান্তা জিগ্যেস করল, আমাকে কি তুমি এর আগে কোথাও দেখেছ? না। সত্যি করে বল? শান্তার কন্ঠস্বর এই মুহূর্তে বুড়িদের মতো কেমন খনখনে শোনাচ্ছে।

আমি কি বলব? আমি কি শান্তাকে বলব যে রোমেলের বাসায় তোমার ছবি দেখেছি? তুমি আসলে মৃত। রামুর কাছেই কোথাও অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছ। এসব কথা কি বলা যায়? আমরা হাঁটতে- হাঁটতে লনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, ঠিক সেখানেই একটি কফি গাছ। টিলাটি এখানে ঢালু হয়ে অন্তত তিনশ ফুট নীচে নেমে গেছে। ধবল জোছনায় টিলার ঢালে শাল গাছ, কলা গাছ, কাঁঠাল গাছ এমন কী নীচের রাস্তাও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে মঠের চূড়াও চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আমার কেন যেন মনে হল শান্তা আমাকে ইচ্ছে করে টিলার কিনারে নিয়ে এসেছে। কেন? শান্তার উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা গেল না। তবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। ওর চোখে মনি দুটি ফসফরাসের মতন জ্বলজ্বল করছে। জ্বলজ্বলে চোখে বারবার আমার ডান বাহুর দিকে তাকাচ্ছে। যেখানে  এথিন লামা ছোট্ট নীল শঙ্খ বেধে দিয়েছে। মনে হল ওই নীলশঙ্খের ওপর শান্তার আক্রোশ। শান্তা বলল, তোমার ডান বাহুতে কি একটা নীল রঙের শঙ্খ বাঁধা আছে?

হ্যাঁ। আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুমি জানলে কি করে? খসখসে কন্ঠে শান্তা বলল, আমি জানি। তুমি এখন ওই  নীলশঙ্খটা বাহু থেকে খুলে নীচে ফেলে দাও। নীলশঙ্খ ফেলে দেব? কেন? আমার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। শান্তা ধমকের সুরে বলল, ওসব মাদুলিতে কাজ হয় না। তারপর কন্ঠস্বর নরম করে বলল। তা ছাড়া আমি তোমাকে আজ রাতে আশ্চর্য এক দেশে নিয়ে যাব । যেখানে দিনও হয় না রাতও হয় না …  শান্তার কথা শেষ হল না … কফি গাছের ওপাশ থেকে কে যেন বেরিয়ে এল। খসখসে কন্ঠে বলল, কেমন আছ? কে? আমি চমকে উঠলাম। আমি … আমি এথিন লামা। ওহ্ । আপনি?

কিন্তু এথিন লামা এখানে এল কী ভাবে? উড়ে আসেনি তো। তবে এথিন লামাকে দেখে শান্তা যে ভয় পেয়েছে তা ঠিকই বুঝতে পারলাম। শান্তার মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। আমার দিকে ফিসফিস করে বলল, চল, এখান থেকে চলে যাই। ওই লোকটা ভালো না। আমি কতকটা রুক্ষ কন্ঠে বললাম, তুমি যাও । আমি আসছি। শান্তা দ্রুত হাঁটতে থাকে। পিছন দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। আমি মুখ ফিরিয়ে কফি গাছের দিকে তাকিয়ে দেখি ওখানে এথিন লামা নেই। যেন এথিন লামা আসেনি। গভীর বিস্ময় নিয়ে বাংলোয় ফিরে এলাম। রাতে খাওয়া তেমন   জমল না। খরগোশের মাংস রাবারের মতো ঠেকল। ছোট খালু সেনাবাহিনীতে থাকার সময় বান্দরবানের গভীর অরণ্যে অজগর শিকারের কাহিনী বলছেন। শান্তা মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে। তেমন কিছু খেল না শান্তা। আমি কিচেনে এলাম। মং ছিং প্লেট-গ্লাস ধুচ্ছিল। মিলি খালা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে দুধ ভরতি সসপ্যান। মিলি খালাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, শান্তার মা তোমার ঠিক কি রকম বান্ধবী হয় বল তো ? মিলি খালা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল, কেন রে? হঠাৎ? এমনি । বল না। ছোট খালা বলল, শান্তার মা সাবিহার সঙ্গে কলেজে পড়েছি। তারপর  ওর বিয়ে হয়ে গেল। মাঝে- মাঝে টেলিফোনে যোগাযোগ ছিল। এই। অনেক দিন দেখাসাক্ষাৎ হয় না, না? আমি জিগ্যেস করি। হ্যাঁ। তুই জানলি কি করে? মিলি খালাকে অবাক মনে হল। তার পর মিলি খালা বলল, সকালে আমার কিন্তু খটকা লাগল আবীর । কি? আজ সকালে শান্তা যখন এল। তখন বললাম, বাড়ি চিনলে কি করে? শান্তা এড়িয়ে গেল। বলল, ওর এক মামা টিলার নীচে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। ভদ্রলোক ওপরে উঠে এলেন না বলে কেমন খটকা লাগল। শান্তার সঙ্গে কোনও ব্যাগট্যাগও ছিল না। হুমম। আমি শরীরে শিরশিরানি আর কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ নিয়ে দোতলায় উঠে এলাম। তার আগে মিলি খালার লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিয়ে এলাম। দোতলার সিঁড়ির পরে ছোট করিডোর। অল্প পাওয়ারের নীল আলো জ্বলে ছিল। ডান পাশের প্রথম ঘরটি আমার। ঘরটা ছোট। তবে গরাদহীন জানালাটা বেশ বড়। বিছানায় শুয়ে এ.আর আরভিং –এর লেখা ‘টিবেটান মিষ্ট্রি অভ ফ্লাইং লামা’ বইটি পড়ছি। মন বসছে না। কেবল শান্তার মুখটা ভাসছিল। রোমেল বলল, গত বছর শান্তারা সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রামুর কাছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। মিলি খালা বললেন, শান্তাকে আজ সকালে ওর এক মামা দিয়ে গেলেন। ঠিক কোথায় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল? শান্তা যদি অ্যাক্সিডেন্টে মারাই যায় তাহলে শান্তা এলই-বা কেন? কী ভাবে এল? মৃত্যুর পরও কি বেঁচে থাকা সম্ভব? এসব চিন্তা সরিয়ে বই পড়ার চেষ্টা করি। ‘টিবেটান মিষ্ট্রি অভ ফ্লাইং লামা’বইটি মিলি খালার লাইব্রেরি থেকে এনেছি। লামারা উড়তে পারে কি না সেটাই জানতে ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ নেভির সদস্য এ.আর আরভিং তিব্বতে গিয়েছিলেন। বইতে সে অভিজ্ঞতাই বর্ণনা করেছেন এ. আর আরভিং। তিনি নাকি লামাদের উড়তে দেখেছেন। কিন্তু কথাটা কতটুকু সত্যি? এথিন লামাও কি উড়তে পারে? মং ছিং নাকি এথিন লামাকে উড়তে দেখেছে।

ঘুম আসছিল না। ঘর অন্ধকার। ঘরে রিডিং ল্যাম্পের আলো। সে আলোয় হঠাৎ দেখি দরজার কাছে শান্তা দাঁড়িয়ে।  দরজা তো বন্ধ ছিল। ও এল কি করে? শান্তার পরনে সাদা নাইটি। আমি আতঙ্ক সিদে হয়ে বসি। হাত থেকে বই খসে যায়। শান্তা খনখনে কন্ঠে বলল, তখন তুমি  কিচেনে মিলি খালাকে বললে আমাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে ? আমি চমকে উঠলাম। ও জানল কি করে? কিচেনে মং ছিং ছাড়া অন্য কেউ ছিল না । মুহূর্তেই আমি এক লাফে জানালার কাছে চলে আসি। গরাদহীন জানালাটা খোলা। জানালার ওপাশে একটি গালিচা। শূন্যে ভাসছে। গালিচার ওপরে দাঁড়িয়ে এথিন লামা। আমি বিস্মিত হব কী- পরক্ষণেই নিজেকে গালিচার ওপর আবিস্কার করলাম। গালিচা খানিকটা সরে অনেকখানি ওপরে উঠে এল। ঠিক লনের ওপর। জোছনার আলোয় লন আলোকিত। যেন দিন। নীচে তাকিয়ে দেখি জানালা দিয়ে অনেকখানি কয়লার গুঁড়া ছিটকে বেরিয়ে এসে ঘূর্নির আকার ধারণ করল। গালিচা দুলছিল। কয়লার গুঁড়া নারীমূর্তি ধারণ করে গালিচা ঘিরে আকাশে ঘুরপাক খেতে লাগল। আর রক্ত হিম করা খল খল হাসি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ।এথিন লামা চারপাশে নীল রশ্মি ছুঁড়ে মারতে লাগল। কালো নারীমূর্তি শূন্যে মিলিয়ে গেল। নীচে তাকিয়ে দেখি লনে ছোট খালু, মিলি খালা আর মং ছিং এসে দাঁড়িয়েছে । মিলি খালা চিৎকার করে কী যেন বলছে।

এথিন লামা ধীরে ধীরে গালিচা নামিয়ে আনল। গালিচা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। তোর কোনও ক্ষতি হয়নি তে? বলে মিলি খালা আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি লজ্জ্বা পেলাম। আমি তো আর ছোটটি তো নই। মং ছিং ঝুঁকে এথিন লামাকে প্রণাম করল। হাজার হলেও গুরু। ছোট খালু বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। লামাদের শূন্যে ওড়ার দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়েছেন। এথিন লামা হাসছিল। বলল, কদিন আগে মঠে বসে ধ্যান করার সময় জেনেছিলাম এমনই এক ঘটনা ঘটবে। তাই রামুতে বাসে উঠে এর পাশে বসি। বলে আমাকে দেখাল। আমার মনে পড়ল এথিন লামা আমার বাহুতে ছোট নীলশঙ্খ বেঁধে দিয়েছিল। বাহু স্পর্শ করে নীলশঙ্খটা ঠিক জায়গায় আছে বলে নিশ্চিন্ত হলাম। শঙ্খটি এথিন লামা তিববতের মানস সরোবরের পাড়ে কুড়িয়ে পেয়েছিল।ওটাই তো আমাকে ডাকিনী শান্তার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। আবার যে ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব না কে বলতে পারে।

 

সমাপ্ত

তিনি (???!!!) দূর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচালেন যেভাবে. . . . . . .(ভৌতিক কাহীনি)১ম পর্ব

0

কয়েকদিন থেকে নানা ব্যস্ততার কারনে ঘটনাটি শেয়ার করতে পারিনি । তো যাই হোক, আমার বাড়ী থেকে দক্ষিনপূর্ব কোণে কালসারডাড়া নামক একটি স্থানে মাঝে মধ্যে যেতে হয় আমার ব্যবসায়িক কারনে । আমার বাড়ী থেকে ঐ যায়গার দূরত্ব মাত্র ১০ কিঃমিঃ । আমি অবশ্য বাইকটা নিয়েই চলাচল করি সেখানে । কয়েকদিন আগেও গিয়েছিলাম সেই যায়গায় । নানা কাজ সেরে সেদিন বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত শোয়া এগারোটা বেজে গেল । মনের মধ্যে খানিকটা ভয় কাজ করছিল । একঃ চোর ডাকাতের দুইঃ জ্বিন ভূতের । ঐ যায়গায় যাওয়ার পথে অনেক পুরাতন কবরস্থান সংলগ্ন একটি ঈদগাহ মাঠ পড়ে । অবশ্য এই ঈদগাহ মাঠ ও কবরস্থানের আশে পাশে কোন জনবসতি নেই । বিশাল বিস্তীর্ন পাথারের মাঝে এটি অবস্থিত । এ যায়গাটি নিয়ে নানা কল্প কাহীনিও ছড়িয়ে আছে মানুষের মাঝে । এখানে নাকি অনেকেই অনেক ভৌতিক ঘটনার সম্মুখিন হয়েছেন । সন্ধ্যার পর তাই এই রাস্তা দিয়ে মানুষের চলাচল কম । চলাচল করলেও দলবেধে বা সাথী ছাড়া কেউ করেনা । যদিও আমি এগুলোকে তেমন একটা গুরুত্ব দেইনা । হয়তঃ আপনারা মনে করছেন আমি খুব সাহসী, আসলে তা নয় একটু একটু ভয়ও কিন্তু করি । বাড়ী ফিরছিলাম একা একাই । ঘড়ির কাঁটা রাত ১১:১৫ যথারীতি ৫০-৬০ কিঃমিঃ বেগে ড্রাইভ করছি । জনমানবহীন রাস্তা, চলছি আমি একা, রাস্তার দু ধারে লাগানো মেহগনি গাছের সারি । রাতের বেলা এমন রাস্তা দিয়ে যেতে ধরলে কার না গাঁ ছমছম করে ।
যখন ভৌতিক যায়গা থেকে মাত্র ১ কিঃমি দূরে ঠিক তখনই আমার শরীরটা অজানা এক ভয়ে শিউরে উঠলো । যায়গাটি তাড়াতাড়ি পার হওয়ার জন্য বাইকের গতি বাড়ালাম । প্রায় ৮০ কিঃমিঃ বেগে চলছে , মিটারে লক্ষ্য করলাম । এখন আমি যায়গাটির ঠিক ১৫-২০ গজ দূরে । কলিজাটা আরেকবার মোচড় দিয়ে উঠলো । কবরস্থান ক্রস করছি ঠিক এমন সময় কোন কারন ছাড়াই গাড়ীর হেডলাইট অফ হয়ে গেল ।

বোবায় ধরা

2

আপনি হয়তো ঘুমাচ্ছেন । ঘুমানোর একটা সময় হঠাত্ আপনি অনুভব করলেন আপনার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । শ্বাস নিতে পারছেন না । মনে হচ্ছে যেন ভারী কিছু একটা আপনার বুকের উপর বসে আছে । গলায় হাতের স্পর্শ পেলেন । আপনি সবই বুঝতে পারছেন , কিন্তু আপনা সারা শরীর অবশ হয়ে আছে। ঘাম দিয়ে আপনার ঘুম ভাঙলো । আর তখনই আবিষ্কার করলেন অদ্ভূত দর্শন কিছু একটা আপনার বুকের উপর বসে আপনার গলা চেপে ধরে আছে । কেমন লাগবে তখন আপনার ??

এই ধরনের অবস্থাকে আমরা সাধারণত ” বোবায় ধরা ” বলে থাকি । অনেকে এটা ” বোবা জ্বীন ” ধরাও বলে থাকে । মেডিকেল সাইন্সের দিক থেকে বিচার করতে গেলে বোবায় ধরা অবস্থার ১০১ টা কারণ দেখানো যাবে । কিন্তু আমরা সাইন্স দিয়ে এই বোবায় ধরা বিষয় কে ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছিনা । চলুন বোবায় ধরার অজানা বিষয় এবং ঘটনা গুলো জানা যাক ভৌতিক এবং অবৈজ্ঞানিক বিচারে ।

এক লোককে প্রায়ই বোবায় ধরতো । বোবায় ধরা অবস্থায় তিনি একটা স্বপ্নই দেখতেন । তিনি দেখতেন যে , একটা বিদঘুটে বৃদ্ধা মহিলা , যার সাদা চুল , সারা মুখ আগুনে ঝলসানো , তার বিছানার পাশে বসে রয়েছে । এক পর্যায়ে বৃদ্ধা চলে যেত এবং যাওয়ার আগে লোকটার মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিত । লোকটার ঘুম সাথে সাথেই ভেঙে যেত এবং তিনি তার মুখে থুতু আবিষ্কার করতেন !!

আরেক লোক কে একবার বোবায় ধরেছিলো । তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন যে , তিনি খোলা মাঠে শুয়ে আছেন। আকাশ দিকে মুখ করে । হঠাত্ তিনি আকাশের দিকে উঠতে শুরু করলেন। একটু উঠার পর তার ঘুম ভেঙে যায় । আর তখনি তিনি বিছানা থেকে নিজেকে প্রায় ছয় ফুট উপরে দেখতে পান । তারপর সশব্দে তিনি তার বিছানায় আছড়ে পড়লেন !!

এক মহিলার স্বামীকে প্রতিদিনই বোবায় ধরে । বোবায় ধরার পর স্বামী ছটফট করা শুরু করলে মহিলা তাকে হাত ধাক্কা দেন । এরপর স্বামী স্বাভাবিক ভাবে ঘুমাতে পারেন । এক রাতে মহিলা তার স্বামীর গোঙানির শব্দ শুনতে পেলেন । মহিলা না তাকিয়েই স্বামীকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেন । তারপরেও স্বামীর গোঙানি থামছিল না । মহিলা উঠে বসলেন । স্বামীর দিকে তাকালেন । তাকিয়েই মহিলার ভয়ে একটা হার্টবিট মিস হলো ! তিনি দেথলেন , তার স্বামী গভীর ঘুমে অচেতন । গলা দিয়ে গোঙানি বের হচ্ছে । আর তার বুকের উপরে আনুমানিক ৪ বছরের কালো কুচকুচে রঙের একটা বাচ্চা বসে গলা টিপে ধরে রেখেছে ! মহিলার সাথে বাচ্চাটার কয়েক সেকেন্ডের চোখাচোখি হল । কি ভয়ংকর সে চাহনি ! তারপর পরই বাচ্চাটা লাফ দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে চলে গেল ।

অনেকেই বোবায় ধরা অবস্থায় এমন কিছু দেখে থাকেন অথবা আভাস পান , যার সাথে ভবিষ্যত্ এর কিছু কিছু ঘটনা মিলে যায় । বোবায় ধরা যেহেতু ঘুমের সাথে সর্ম্পকিত , তাই এই ঘুম জগতে এমন সব বিষয় ঘটে থাকে যা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়না । মানুষ ঘুমের মাধ্যমেই ভবিষ্যতের আভাস পেয়ে থাকে , জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে , এমনকি মৃত্যুর কাছাকাছি পর্যায়ে যেতে পারে যেটাকে ” নেয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স ” অথবা ” আফটার লাইফ ” বলে । এ বিষয়ে অন্য কোন সময় আলোচনা করা যাবে।

আল্লাহ মানুষকে সমস্যা যেমন দিয়েছেন , তেমনি সমাধানের ব্যবস্থা করেও দিয়েছেন ।

ঘুমাতে যাবার আগে ৩বার সূরা ফাতিহা , ৩ বার সূরা ইখলাছ এবং ৩ বার দরুদ শরীফ অথবা আয়াতুল কুরসী পড়লে বোবায় ধরার সম্ভাবনা থাকবেনা , দুঃস্বপ্ন দেখার মাত্রা কমে যাবে । অনেকেই বুকে আরবীতে “উমার” ( আঈন , মিম , রা ) লিখে ঘুমান । সেটা করলেও হয়তো ঘুমের ভিতর উল্টাপাল্টা কিছু হয়না । তবে সূরা পড়াই সবচেয়ে ভালো । বোবায় ধরার ব্যাপারটা যদি অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায় তো কোন বিজ্ঞ হুজুরের পরামর্শ মোতাবেক তাবিজ ব্যবহার করা যেতে পারে ।

 

একটু পর হয়তো আপনি ঘুমাতে যাবেন । আপনি কি চান ঘুমের মধ্যে কালো কিছু একটা আপনার বুকের উপর বসে গলা চেপে ধরুক ?? ঘুমের মধ্যে আমাদের ইচ্ছার প্রাধান্যই বা কতটুকু থাকে ??