“অসম প্রেম” পর্ব১ -আয়েশা সুলতানা

0

 

“অসম প্রেম” পর্ব-১
——–আয়েশা সুলতানা

জেবা বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তার বান্ধবী প্রীতির জন্য। প্রায় আধঘণ্টার উপরে হয়ে গেসে। জেবার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, মনে মনে ভাবছে “প্রীতিটার কোন কমনসেন্স নাই” কেউ এত দেরি করে? একা একা কতক্ষণ দাঁড়ানো যায়,, এই ভেবে জেবা বিলের উত্তরদিকে হাটতে শুরু করে, আর ভাবে ওদিকটায় মা কখনো যেতে দেয় না, সবসময় নিষেধ করে, কি আছে ওদিকে?
জেবার মা জোবায়দা খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে আর যথেষ্ট গুনীও বটে.. আর বাবা ও বা কম কিসে? ছোট একটা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করলেও বাবা খুবই ব্যক্তিত্ত্বসম্পন্ন মানুষ।
জেবার বাবা আশিকুর রহমান পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক হলেও তিনি এলাকায় খুবই সম্মানিত,, এলাকার যেকোন বিপদে আপদে সকলে তার কাছ থেকেই পরামর্শ নেয়,, জেবার বাবার সামান্য আয়ের ছোট সংসারে তার আরো ছোট দুই বোন জুই ও মনি, আর বড়ভাই রাশেদ, ছোট সুখী পরিবার… ভাবতে ভাবতে জেবা অনেক দূর চলে আসে, হঠাৎ কারো ডাক শুনতে পায় জেবা,,, থমকে দাঁড়ায়,, চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে সন্ধ্যা নেমে এসেছে,, জেবা ভয় পায়…. গাঁ ছমছম করে উঠে,,,,, অন্যরকম শিহরণ বেয়ে যায় জেবার সারা শরীরে…. আর এর মধ্যেই জেবা বুঝতে পারে বাম কাঁধে কারো শীতল স্পর্শ.

জেবা শিউরে উঠে………..
মনে মনে নিজেকে প্রচন্ড বিদ্রুপ করে এই ভেবে যে মায়ের নিষেধ শর্তেও কেন এলো এদিকটায়…

জেবা এই জেবা এখানে কেন এসেছিস, বারবার বলি এদিকে আসবি না, এত বড় হয়েছিস বোধবুদ্ধি কবে হবে তোর?? আরেকটু হলেই তো বাঁশের কোনাটা চোখে ঢুকতো, কি হতো তখন?? কড়া সুরের কথা গুলো শুনেই জেবা পিছনে ফিরে মাকে সজোড়ে জড়িয়ে ধরে ফোফাতে থাকে,,,,
জোবায়দা বুঝতে পারে যে জেবা খুব ভয় পেয়েছে, মৃদু কণ্ঠে এবার তিনি জেবাকে বললো চল..
জেবা দেখলো মায়ের সাথে প্রীতিও আছে।। তখন ও বুঝলো প্রীতি ওকে না পেয়ে বাড়িতে যায়, আর মা সহ ওকে খুজতে বের হয়…
জেবা বুঝতেই পারে না কেন এ জায়গার প্রতি ও এত টান অনুভব করে……
আর আজ তো আরেকটু হলে বাঁশঝাড়ের ভিতরই চলে যেতো…

জেবা যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিল তার থেকে আর মাত্র দু’কদম এগুলেই বিশাল বাঁশঝাড়,, ওটার পিছনে আবার ঘন জঙল,, গ্রামের এপাশে লোকালয় নেই বললেই চলে, শুনশান জায়গা, একটা পাতা পড়ার শব্দ ও খুব ভয়ঙ্কর হয়,,, এ যেন এক অন্য জগৎ….

গ্রামে অবশ্য বিভিন্ন কাহিনি ও প্রচলিত আছে এ বাঁশঝাড় নিয়ে,, যারাই জানতে চাইতো বাঁশঝাড়ের ওপাশে কি আছে তাদের সবার নাকি লাশ পাওয়া যেতো বাঁশে ঝুলন্ত অবস্থায়,,,,,,

তবে জেবার ১৮ বছর বয়সের মধ্যে ও কখনো দেখে নি এদিকে কাউকে আসতে…

আসার পথে জেবা মাকে জিজ্ঞাস করলো মা কেন নিষেধ করো??? কেন এদিকে আসা যাবে না??? প্লিজ মা বলো…..সবসময় এড়িয়ে যাও কেন এপ্রশ্নটা??? মা এ জায়গাটা কেন আমার এত ভাল লাগে? কেন আমি ওখান থেকে মনমুগ্ধ করা ফুলের সুগন্ধ পাই?? না জানি সে ফুল দেখতে কত সুন্দর……
মা বলো না প্লিজজজ…
এতক্ষন জোবায়দা চুপ করে হেটে চলেছে, এবার বললো কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি পা চালা… জেবা দেখলো ওরা বাড়ির পথ পেরিয়ে আরো সামনে চলে এসেছে, জানতে চাইলো ওরা কোথায় যাচ্ছে?? জোবায়দা কিছু বলল না, প্রায় ১কিলো হেটে ওরা এলো জেবার বাবার মাদ্রাসার কাছে।।।

আশিকুর রহমান স্ত্রী ও কন্যাকে দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন,,, তারপর স্ত্রীর কাছে বিস্তারিত শুনে তাড়াহুড়ো করে চলে যান মাদ্রাসার বড় হুজুরের কাছে….হুজুরকে বিস্তারিত খুলে বলেন…
তিনি সব শুনে একটু পানি ও কিছু খেজুর দিয়ে বলেন এগুলা শিখানো পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে,,,,,
এরপর তারা বাড়ি ফিরে এলো…

রাস্তায় থাকা অবস্থায়ই জেবার খুব শারিরিক অস্বস্তি লাগছিলো… কেমন যেন হাত পা ভেঙে আসছিলো…হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো….

বাড়ি পৌছে আর স্থির থাকতে পারলো না…উঠোনেই ধাম করে পড়ে গেলো…. জোবায়দা ওকে ধরে দেখলো যে ওর গায়ে প্রচন্ড জ্বর…..

জেবাকে ঘরে নিয়ে আসলো বাবা মা দুজন মিলে,আর জোবায়দা দেরি না করে তাড়াতাড়ি চুলায় পানি দিল, পানি গরম হলে বড় হুজুরের দেয়া পানি গরম পানিতে মিশিয়ে জেবাকে গোসল করিয়ে দিল।।

কিছুক্ষন পর জেবার হুশ ফিরলো,, মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “মা কি হয়েছে? ”
জোবায়দা কিছু না বলে জেবাকে একটা খেজুর দিয়ে বললো এটা খেয়ে নে,, জেবা বুঝতে পারলো মায়ের মেজাজ ভাল না,, তাই কিছু না বলে চুপচাপ খেয়ে শুয়ে পড়লো……

সকালে অনেক বেলায় জেবার ঘুম ভাঙলো.. বিছানা থেকে উঠতে যাবে তখনই জেবা টের পেল তার সারা শরীর প্রচন্ড ব্যাথা…
ওর মনে হচ্ছিল যেন কেউ ওকে বেধড়ক মেরেছে।।খুব কষ্ট হচ্ছিল ওর উঠতে..জোবায়দা এসে ওকে ধরে বসালো,সাথে বাবা ও এসে বসলো….

বাবাকে দেখে জেবা বিস্মিত হলো,এসময় বাবা বাড়ি থাকেন না।।মাদ্রাসায় চলে যান,আর ফিরেন আবার সেই রাত ১০টা নাগাদ।
আশিকুর রহমান জেবাকে উদ্দেশ্য করে বললো “দেখ মা তুই বড় হয়েছিস, এখন তোকে সবকিছু বলে বুঝানো সম্ভব না, নিজ থেকে কিছু বিষয় বুঝে নিতে চেষ্টা কর, আর কখনো ঐদিকটায় যাবি না…. মনে রাখবি আর যেন বলতে না হয় ” বাবার গাম্ভীর্য দেখে জেবা ভয় পায়, আর আরো বেশি কৌতুহলী হয়ে উঠে….

কি আছে ওখানে? কেন যাবে না? জায়গাটা দেখতে কত সুন্দর আর নিরব, ছোটবেলা থেকেই নিরবতা জেবার খুব পছন্দের।।
বাবা চলে গেলে জেবা মাকে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করে, “মা বলো না কেন??? কেন আমার প্রশ্নের উত্তর দাও না???

এবার জোবায়দার চোখে পানি চলে আসলো, জেবার কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল।
জেবা প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবে কেন এমন হচ্ছে?? মায়ের মুখের দিকে তাকালে জেবার খুব মায়া হয়, মা কখনো কিছু বলে না কিন্তু কষ্ট পেলে মুখ লুকিয়ে কান্না করে , ভাবতে ভাবতে জেবা আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

জেবা চোখ খুলে দেখতে পেল অপুর্ব দুটি চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে, জেবা নেশাগ্রস্থের মত সে চোখের দিকে তাকিয়ে আছে,, কারো চোখ এত সুন্দর হতে পারে, এত মোহনীয় হতে পারে জেবা চিন্তাও করতে পারছে না।।।মনে হচ্ছে এ চোখে পৃথিবীর সমস্ত ভালবাসা লুকিয়ে আছে… আর জেবা সে চোখের মায়ায় বন্দি.

হঠাৎ জেবা বুঝলো কেউ একজন তাকে খুব জোরে জোরে ডাকছে…. (চলবে..)

করিডোর- পর্ব১-নুরুন নাহার লিলিয়ান।

0

হরর গল্প পর্ব১ – করিডোর:

মাস কয়েক হবে আমরা সরকারী বাসায় উঠেছি।ছিমছিম পাচঁ তলা বিল্ডিংয়ের তিন তলায় আমাদের ফ্লাট। আমার আবার সব জায়গাই ভাল লাগে। বিয়ের পর দেশে বিদেশে স্বামীর সাথে কতো বিচিত্র রকম জায়গায় বসবাস করেছি। চেষ্টা করেছি আশে পাশের মানুষ আর সব কিছুর সাথে মানিয়ে চলতে। তাই প্রথমে চেষ্টা থাকে বসবাসের জায়গাটাকে ভালোবাসা। সেটা যে রকমই হোক।বর ভদ্র লোক বাসায় কম থাকে। বেশির ভাগ সময় ল্যাবেই কাটিয়ে দেয়। বিয়ের আগে মজা করে বলেছিলেন আমার সাথে বিয়ে হলে আমি কিছু দিতে না পারলেও লেখার জন্য অনেক অভিজ্ঞতা আর উপকরন পাবেন।একজন লেখকের জন্য যা সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সত্যিই টের পেলাম বিয়ের দিন থেকেই। অনেক বৈচিত্র্যময় উন্থান পতনের ইতিহাস থাকে গবেষকদের জীবনে। শুনেছি এই বাসার আগের লোকের অফিশিয়াল কারনে অন্য কোথাও বদলি হয়েছে। এরপর দশ মাস কেউ ছিল না।
বাসাটায় আসার পর থেকে কিছু এলোমেলো বিষয় মস্তিষ্ক কে একবার হলেও নাড়া দিয়ে যায়। প্রায়ই বাসার অনেক জিনিস হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজির পর ও পাওয়া যায় না। তারপর অনেক দিন পর দেখা যায় ঠিক আগের জায়গায় আছে। সেদিনও হাত ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সতের দিন পর সেই একই জাগায় পেলাম। মনেহয় অদৃশ্য ভাবে কেউ আমার সাথে খেলা করে। লুকোচুরি খেলা। আমাদের সবার মধ্যে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ভীষন ভাবে কিছু সময়ে সচেতন থাকে। আমার ড্রয়িংরুম আর বেড রুম থেকে ভিতরের বেড রুমে যেতে একটা ছোট করিডোর আছে। মাঝে মাঝেই লাইট টা জ্বলে না। আবার নিজ থেকেই জ্বলে।ভাবি বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা। আসলে সমস্যা হয়তো অন্য কোথাও। ভর দুপুর কিংবা মধ্যরাতে নিস্তব্ধ বাসায় বুঝা যায় ভারী পর্দা গুলো যখন নড়তে থাকে। আমি গভীর ভাবে অনুভব করি কেউ হেটে যায়।ধীর পায়ে হেটে যায়।যে সব কিছু দেখছে। আমার স্বামী প্রায়ই বিরক্ত হয়ে বলে ছন্দা তোমার মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে.

আমাকে নিয়ে মশিউলের এমন খামখেয়ালি ভাবনা চরম বিরক্ত করে।আমি বিরক্ত হলেও আমার নিজস্ব সব ভাবনা তার কাছে প্রকাশ ও করিনা । সব কিছু বুঝার ক্ষমতা সবার নেই। প্রকৃতির রহস্যময়তা কিংবা ভয়ংকর ব্যাখ্যাহীন বিষয় গুলো বুঝতে হলে খুব স্পর্শকাতর হৃদয় থাকতে হয়।চিন্তা গুলো খুব সচেতন রাখতে হয়। বিজ্ঞান এবং ধর্ম সব সময়ই তাদের সমান্তরাল নীতিতে এক। কিন্ত তা অনুভব কি সবাই সমান্তরাল ভাবে করতে পারে? এই তো সেদিন সন্ধ্যে রাত। আমি ছোট খাটো শপিং করে দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকলাম। হঠাৎই ব্যাখ্যাহীন ভাবে আমার পুরো শরীর হীমশীতল হয়ে উঠলো। একটু ভয় ভয় আতংক আমার সমস্ত অস্তিত্বতে ছড়িয়ে গেল। মনে হচ্ছিল বরফ জমাট শরীরটা আমি নাড়াচাড়া করতে পারছিলাম না।

সপ্তাহে দুই তিন দিন নিয়ম করে আমরা বাইরে ডিনার করি। আর সেই সাথে বাসার প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করা। খুব সচেতনতা নিয়ে আমি সামনের ড্রয়িংরুম এবং বেড রুমটাকে কেয়ারফুলি দেখে নিলাম।হঠাৎ আমার ঢেকুর নামল।বুকের ভিতর আটকে থাকা খাবার গুলো পাকস্থলীতে পৌছালো। নিজের ভিতরের এমন বৈজ্ঞানিক ব্যাখাযোগ্য শব্দেও আমি আঁতকে উঠি। তারপর বুঝার জন্য কিছুটা সময় নিলাম। বাইরে বের হওয়ার সময় সব রুমের লাইট বন্ধ করলেও মাঝখানের করিডোরের লাইট শুধু অন করে বের হই।

সব সময় যে এমনটা হয় তা নয়।এই যান্ত্রিক ইট পাথরের ঢাকা শহরে আমাদের ক্যাম্পাসটা সবুজের সমারোহে নান্দনিক আবহাওয়া রাখে। তারপরও দরজা জানালা গ্রীলের ফাঁক ফোকর দিয়ে প্রবেশ করে ফ্লোরে ধুলার কার্পেট বিছায়। বেশ কিছুটা সময় আমি নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। তবুও নিজের ভিতরের ধুক ধুক শব্দটা কে সুইচ অফ করতে চেষ্টা করলাম। এক গ্লাস পানি খেয়ে সোফায় শান্ত হয়ে বসলাম। তারপর অনুভব করলাম সবই হয়তো মনের ভুল। এই তথ্য প্রযুক্তি আর আলোঝলকানি যুগে সেই অন্ধকার ইতিহাস ভূত প্রেতের কথা ভাবা সত্যি হাস্যকর। তারপরও কেন এমন হয়। লোক লোকালয়ের এই নাগরিক জীবনে ভূত প্রেত বা অদৃশ্য অশরীরীর অস্তিত্ব টিকে থাকাও কঠিন।

আমি সব ভাবনা বাদ দিয়ে ফ্রেস হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। ড্রয়িংরুমের সাথে আমার বাসায় একটা কমন বেসিন আছে। টিভিটা অন করে আমি চোখে মুখে পানি দিতে গেলাম। কয়েক ঝাপটা মুখে পানি দেওয়ার পর বিষয়টা চোখে পড়ল। বেড রুম আর ড্রয়িংরুমের মাঝখানের পথ দিয়ে করিডোরের যে পথটা টয়লেটের দিকে গেছে সেখানে।হালকা ধুলাময় ফ্লোরে তিনটা বড় বড় অস্পষ্ট পায়ের ছাপ। আমার বুকের ভিতরটা কেমন মুচরে উঠলো……(চলবে)

ডাকিণী ৩৭তম পর্বঃ খ অংশ

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি সম্ভবত জেনে ফেলেছি কিভাবে ওকে কিভাবে হত্যা করা হয়। আমি গতরাতে আমার বেডরুমের ঝাড়বাতিটার সাথে ওকে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলতে দেখেছি। বেসমেন্টে সেরাতে আলেস আমাকে স্বপ্নে পুরো ব্যাপারটা দেখিয়েছিলো। আমার বেডরুমের ঠিক মাঝখানে আজকের ঝাড়বাতিটার স্থলে সেদিন একটা লোহার আংটা টানানো ছিলো। ছাদে ফাঁসিতে ঝুলানোর পর কুয়ো আর লাইব্রেরীতে শুদ্ধিকরণ শেষে আলেসের দেহটা সেই আংটা উল্টো খানিকক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা হয়। কিন্তু মারগারেটের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। আলেসের মতো ম্যারগারেটের বিচার জনসম্মুখে করা হয়নি। খুব সম্ভবত মারগারেট গীর্জার একজন সেবিকা ছিলো। গীর্জার সেবিকাকে যদি জনসম্মুখে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার জন্যে জনসম্মুখে বিচার করা হতো তবে তা গির্জার মান সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতো। তাই বিচারের বদলে প্রিস্ট ওকে চার দেয়ালের ভেতরে সেই আংটার সাথেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। কিন্তু বুদ্ধিমতী মারগারেট ব্যাপারটা অনুমান করতে পেরে তার আগেই কপালে আংটির ছ্যাকা দিয়ে রাখে। ওর বিশ্বাস ছিলো আটকে থাকা আত্মাটাকে হয়তো কোন একদিন অন্য কারো দেহে ঢুকাতে পারবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। ওর প্রিস্ট ওর আংটিটা ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, সে ওটাকে তার পারলৌকিক যৌনদাসী সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার শুরু করে। আর ওর লাশটা কুয়োতে ফেলে দেয়। তাইতো বদ্ধ কুয়োর জলের উপর ওর এত নিয়ন্ত্রণ।
প্রিস্ট প্রথমে অসহায় মেয়েগুলির জীবদ্দশায় কপালে সেই আংটি দিয়ে ছ্যাকা দিতো। তারপর তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে ফেলতো। অবশেষে কতগুলি বশীকরণ মন্ত্র পড়তে পড়তে তাদের মৃতদেহের সাথে মিলিত হতো। এভাবেই সে সারাটি জীবন ধরে অশরীরী যৌনদাসী সংগ্রহ করে গেছে। বার্ধক্যে মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে এসে প্রিস্ট নিজ দেহটাকে মমি করে রাখার জন্যে তার অনুসারীদের অসিয়ত করে যায়। কারণ সেও মারগারেটের মতোই প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে প্রচন্ড আশাবাদী ছিলো। প্রিস্টের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তার কথা মতো তার দেহটাকে পাইনের আঠায় চুবিয়ে মমি বানিয়ে রাখে। কিন্তু ওরা মিশরীয় মমির মতো দেহের আভ্যন্তরিণ নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেয় নি। প্রকৃতপক্ষে এটা কোন সাধারণ মমি ছিলো না। ওটা একটা আস্ত মমি ছিলো। অন্য মমি গুলির মতো এর আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া হয়নি। ব্যাপারটা আমার সেদিনই বুঝা উচিৎ ছিলো। আমি যখন ওর খোলা মুখে প্রস্রাব করি তখন তার সবটুকুই ওর খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থালীতে গিয়ে পৌছে। কিন্তু মিশরীয় মমির মতো যদি প্রিস্টের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বের করে নিয়ে গলাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হতো তবে সবটুকু প্রস্রাবই মুখ ভরে গড়িয়ে পড়তো। ওরা আস্ত দেহ মমিকরণের এক অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিলো যা ফারাওদের থেকেও আরো উন্নততর। তারপর প্রিস্ট সেই মমিদেহে ফিরে আসার প্রচেষ্টা চালায়। ও সম্ভবত সফল ও হয়। কিন্তু এতে ওর অনুসারীরা প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। ভয়ার্ত অনুসারীরা তাকে ধরে লোহার কফিনে বন্দি করে, তাতে তালা লাগিয়ে আংটি সহই কবরে দাফন করে দেয়। ফলে অন্য মেয়েগুলির আত্মার মতোই মারগারেটও আংটিটার সাথে কফিনে আটকা পড়ে। বদ্ধ কফিনে প্রিস্ট আবারো দম আটকে মারা যায়। কিন্তু মৃত্যুর সময় আংটি পরা থাকায় ওর আত্মাটা পরপারে যাওয়া থেকে রেহাই পায়। তার বদলে ওটা কফিনে আটকে পড়ে অন্য মেয়ে গুলির আত্মার উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সহস্র বছর পর আমি যখন সেই কফিনটা খুলে ফেলি তখন বাতাসের সংস্পর্শে প্রিস্টের দেহটা পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠে। প্রিস্টের আত্মাটা আংটিটাকে অবলম্বন করে আবার ওর দেহে প্রবেশ করে। দেহ ফিরে পেতেই ওর আদিম ক্ষুদাটা উথলে উঠে। ও আমার দিকে হাত বাড়ায়। ও আমায় ভোগ করতে চেয়েছিলো। তবে জীবন্ত নয়, মৃত। জীবনে অসংখ্য মৃতদেহকে ভোগ করতে করতে মৃতদেহ ভোগ করা ওর কাছে একটা নেশা হয়ে উঠেছিলো। সে জীবন্ত নারীদের চেয়ে মৃত নারীকেই ভোগ করে বেশী তৃপ্ত হতো। কারণ মৃতদেহ লাগামহীন ভোগে বাধা দেয় না। তাই সেরাতে কফিনের ভেতর সে প্রথমেই আমায় ভোগের বদলে মারতে উদ্ধত হয়। মৃতদেহের প্রতি এই বিকৃত আসক্তিটা কিছু মানুষের মধ্যে আগেও ছিলো, এখনো আছে। মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে নেক্রোফিলিয়া বলে। অত্যাধুনিক মেডিক্যালগুলির অন্ধকার মর্গের ভেতর ধোপাদুরস্তর পোশাকধারী সাড়ে তিন হাত লম্বা ডিগ্রীওয়ালা অনেক ডাক্তারকেই পাওয়া যাবে যারা শুধু যৌনবিনোদনের জন্যেই মর্গে রাত কাটায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুসারে প্রতি ১২ জন মর্টিশিয়ান ও ফরেন্সিক ডাক্তারের মধ্যে অন্তত একজন নেক্রোফিলিয়ায় আক্রান্ত। যুগ বদলেছে, নতুন প্রযুক্তির পৃথিবী উদ্ভাসিত হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মনের কালিমা এখনো কমেনি। আজো একটু ভালো করে খুঁজলেই আমাদের বর্তমান সমাজে প্রিস্টের মতো আরো অনেক নিকৃষ্ট মানসিকতার লোককেই পাওয়া যাবে। সমাজে এদের সংখ্যাই বেশী। ভালো মানুষের সংখ্যাই বরং এখন হাতে গোনা। এই মুষ্ঠিমেয় ভালোরা নিঃস্বার্থভাবে একাগ্রচিত্তে অসংখ্য খারাপের সাথে লড়ে যাচ্ছে বলেই মানব সমাজ এখনো টিকে আছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম ভালো আর খারাপের এ অসম লড়াইয়ে সাঞ্জে সর্বদাই ভালোদের পক্ষে থাকবে। ভালোর পক্ষে থাকবো, সর্বস্ব দিয়ে হলেও ভালো কাজে সাহায্য করে যাবো। ঠিক যেমন সে রাতে মার্টিনী আমায় সাহায্য করেছিলো। ও ঈঙ্গিতে আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিলো ঠিক কি করতে হবে। তারপর আর যায় কোথা? দিলাম প্রিস্টকে ঘেচাং করে। প্রিস্টের হাত থেকে আংটিটা কেটে পড়তেই মেয়েগুলির আত্মা মুক্ত হয়ে যায়। তারপর মুক্ত আত্মাগুলি একসাথে পরপারে পাড়ি জমায়। কিন্তু একজন থেকে যায়। আংটির মায়ায় ও ছুটতে থাকে আমার পেছন পেছন। মারগারেট। এই বিষ্ময়কর আংটির নির্মাতা।
(চলবে)

ডাকিণী (১৭তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
গীর্জার নীচতলায় কাউকে না পেয়ে আমি ভেবেছিলাম হয়তো এখানে কেউ নেই। তাই দ্বিতীয় তলা চেক না করেই সিঁড়ি ভেঙ্গে সোজা ছাদের দিকে রওনা হই। হঠাৎ পেছনে বলে উঠে “এসো তনয়া। আমি তোমার জন্যেই অপক্ষা করছিলাম। একদম পিলে চমকে উঠেছিলো। নিজের অজান্তেই সারেন্ডারের ভঙ্গিতে দু হাত মাথার উপর উঠে গিয়েছিলো। ঘাড় ফিরিয়ে বুড়ো পাদ্রিটা লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত নিচে নামালাম। খানিকের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আমি হয়তো ধরা পরে গেছি। এখন আর ভয়ের কিছুই নেই। এই হাড় জীর্ণ বুড়োটা আমার কিছুই করতে পারবে না। একটা ধাক্কা দিলেই পড়ে অক্কা পাবে। তবুও আমি সৌজন্যতা দেখিয়ে ওকে হাত জোড় করে বাউ করলাম। তারপর গৎবাঁধা বুলি আওড়ালাম,” ফাদার, আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি। আমি এর থেকে মুক্তি চাই। আপনি আমার জন্যে যীশুর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করুন। নইলে যে আমাকে আজীবন নরকে জলতে হবে।”
আমার কথাবার্তায় ফাদারকে অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হল। হয়তো লোকটার এসব দেখতে দেখতে অভ্যেস হয়ে গেছে। খৃষ্টানরা ব্যাক্তিজীবনে কোন অপরাধ করলে গীর্জায় এসে পাদ্রীর কাছে সব খুলে বলে। অতপর পাদ্রী নাকি ওদের পক্ষ হতে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই রীতিকে ওরা কনফেশন বলে। ক্ষমা হয়ে গেলে ওরা খুশি মনে গীর্জায় সামর্থ অনুযায়ী ডোনেশন করে। এই ডোনেশনের টাকায়ই বর্তমানে গীর্জাগুলি চলে। কিন্তু গীর্জার অতীত এতটা করুন ছিলো না। একটা সময় ছিলো যখন গীর্জাগুলি মানুষের দয়া দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর না করে তার প্রয়োজনীয় সম্পদটা ছিনিয়ে নিতো। আলেসের ডায়ারীতে তৎকালিক গীর্জা কর্তৃক তার পারিবারিক সরাইখানা দখলই তার প্রমাণ। কিন্তু কালের আবর্তে সেই গীর্জা এখন পাহাড়ী সিংহ থেকে ঘরোয়া বিড়ালে পরিণত হয়েছে। আগে জোর করে ছিনিয়ে নিতো, আর এখন দিলে খায়- না দিলে উপোস করে।
“তুমি ভুল সময়ে এসেছো বাছা।”
পাদ্রীর কথা শুনে আমি ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরলাম।
আমি বিনীত কন্ঠে বললাম, “আমি দুঃখিত ফাদার, কি বলেছেন শুনতে পাইনি।”
বুড়োটা আবার বলল, “তুমি ভুল সময়ে এসেছো। আজ বুধবার। এখানে কনফেশন হয় শনিবার ও রবিবার বিকাল ৯টায়।”
আমি তটস্থ কণ্ঠে বললাম, “আমি দুঃখিত ফাদার। উইকএন্ডে আমায় কাজে যেতে হয়। আপনি যদি কাল সন্ধায় আমায় একটু সুযোগ দিতেন তো আমার বড্ড উপকার হতো।”
বুড়ো রাজি হয়ে গেল।
আমি আবার বললাম, “কাল বিকাল ১০টায় আমি আবার আসবো ফাদার। এখন আমায় একটা কাজে যেতে হবে। তবে যাওয়ার আগে এই গীর্জাটা একটু ঘোরে ফিরে দেখতে চাই। আপনার আপত্তি নেইতো? ”
বুড়োটা মাথা নেড়ে, দুইতলায় নিজের কক্ষে যেয়ে খিল দিলো। ওর ভাবভঙ্গী দেখে মনে হলো না ও কিছু আঁচ করতে পেরেছে। ও চলে যেতেই আমি এক দৌড়ে গীর্জার ছাদে উঠে গেলাম। বাহ। ছাদটা যেন আমারই জন্যে বানানো হয়েছে। ছাদের তিনদিকে রেলিং থাকিলেও সিমেট্রির পাশটায় রেলিং নেই, একদম খোলা। শীতে ছাদে তুষার জমলে এই দিকেই ঠেলে নিচে ফেলা হয়। এদিকে দড়ি ফেলে সহজেই উঠানামা করা যাবে।
আজ এখানকার কাজ শেষ। এখন বাড়ি ফেরার পালা। কাল সব জিনিসপত্র নিয়ে আবার এখানে চলে আসবো। কাল রাতের মধ্যেই কাজটা শেষ করতে হবে। যে করেই হোক। গীর্জার প্রাঙ্গণ ছেড়ে আবার সেই সিমেট্রিতে ঢুকে পড়লাম। আগের মতো এদিক ওদিক না ঘুরে এবার প্রিস্টের কবরটা খুজে বের করলাম। ঠিক যেমনটা স্বপ্নে দেখেছিলাম তেমনি আছে। কবরের ফলকে সেই আংটির চিহ্ন। অনেক কষ্টে প্রস্রাবের বেগটা থামালাম। মনে মনে বললাম, এখন না। কাল তোমায় খুঁড়ে তোলে তারপর ভেজাব। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লো। ছায়াগুলি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যাস্ত নামবে। আলোছায়া ময় ভৌতিক পরিবেশে মনের মধ্যে এক উদ্ভট প্রশ্ন জাগলো। আচ্ছা, এই গোরস্থানে শুয়ে থাকা সবাইকি মৃত? নাকি দু একজন কবরের মধ্যে আধবোজা চোখে শুয়ে আছে, আধার নামার প্রতিক্ষায়। ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠলো। কাল রাতে আমাকে এখানেই আসতে হবে। একাকী,,,,, নাহ। এসব নিয়ে আর ভাবা চলবে না। যত ভাববো ততই ভয় বাড়বে। তারচেয়ে দিনের আলো থাকতে থাকতেই এখান থেকে বেরিয়ে পড়া যাক। বাড়ি ফেরার জন্যে ঘুরে দাড়াতেই ধপাস করে প্রিস্টের কবরের পাশেই আছড়ে পড়লাম । পড়িমরি করে উঠতে যেয়ে অনুভব করলাম বা পা টা কে যেন টেনে ধরেছে। হৃদপিণ্ডটা ধড়াস করে উঠলো। তবে কি কটেজে দেখা সেই ভয়াবহ স্বপ্নটা সত্যি হতে চলেছে!
(চলবে)

ডাকিণী (১৩তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
হায় খোদা। এসব আমার সাথে কি শুরু হলো আমার কটেজে! আলেস মেয়েটার আত্মা আমার সাথে এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছে।গতরাতে ও আমায় বেসমেন্টে আটকে রেখেছিলো। সারাটি রাত আমার এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে কেটেছে। সকালে যখন বেসমেন্ট ছেড়ে বেরুলাম তখন নিজেকে নিঃশেষিত মনে হল। পরপর দুরাতের দুঃস্বপ্ন আমায় এতটুকু শান্তিতে ঘুমাতে দেয়নি! ঘুমে চোখ দুটো বুজে আসছে। কিন্তু এখন আমাকে অফিসে যেতে হবে! আরেকটি কর্মময় দিন সামনে। বাথরুমে ঢুকে যতটা সম্ভব আয়নার দিকে না তাকিয়েই কাজ সারলাম। তারপর কাপড় পড়ে বেরিয়ে পড়লাম এই ভয়ানক কটেজ থেকে। আজ আরেকটি রোদ্রউজ্জল দিন। দিনের উষ্মতা আমার মন থেকে গত রাতের স্মৃতিগুলি মুছে যেতে সাহায্য করলো। হেটে গ্যারাজে গিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দিলাম। ড্রাইভ করে প্রধান ফটকের কাছাকাছি যেতেই চোখ পড়লো বাতিল কুয়োটার দিকে। এখানেই গতরাতে আমার মৃতদেহকে পুড়াতে দেখেছিলাম। ঘাড় বেয়ে একটা শীতল রক্তের ধারা নীচে নেমে গেল। তবে সেদিন আর খারাপ কিছু ঘটলো না। কোন অঘটন ছাড়াই সেদিন কটেজটা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি এটা ভেবে একটু শান্তি পাচ্ছিলাম। যদিও জানি দিনের শেষে আমাকে এখানেই ফিরতে হবে। আরেকটা ভয়াবহ রাতের জন্যে।
সেদিন অফিসে খুব খারাপ দিন গেল। একজন অধস্তন কর্মচারীর সাথে রাগারাগি করলাম। ফোন আসলে বারবার চমকে উঠছিলাম। ডেস্কে রাখা কলম পেন্সিল খুজে পাচ্ছিলাম না। একটা সময় ডেস্কে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অফিস থেকে বাসায় ফেরার আগে ভাবলাম একবার ইমেল গুলি চেক করে নেই। আজ শুক্রবার। আগামী দুদিন উইকেন্ড তাই অফিসে আসবো না। যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ ইমেল থেকে থাকে তো তার রিপ্লাই দিতে দুদিনের বেশী দেরি হয়ে যেতে পারে। মেইল বক্স খুলতেই একটা ইমেইলে চোখ আটকে গেল! প্রেরক, আদিন আদিজু। একটা জিপসি টাইপের ছেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডে হিটলার প্রায় দুই লক্ষ ঈহুদিকে হত্যা করে। সে সময় অধিকাংশ ইহুদিই হয় মারা যায় নয়তো দেশ ছেড়ে পালায়। তারপরেও মুষ্ঠিমেয় কতগুলি ইহুদি পরিবার পোল্যান্ডে টিকে থাকতে পেরেছিলো। সেসব ভাগ্যবান পরিবার গুলির মধ্যে একটা হলো আদিনের পরিবার। ছেলেটার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় MSN এ প্রায় চার মাস আগে। তারপর কদিন ইয়াহুতে কথা হয়েছিলো। ওর সাথে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম সে একজন ভবঘুরে ইহুদি ও স্বপ্রনোদিত পার্টটাইম প্যারানরমাল আক্টিভিটি ইন্সপেক্টর! একজন মুসলমান হিসাবে একজন ইহুদির প্রতি আমার একটা বাজে মনোভাব ছিলো। সে একে তো ইহুদি তার উপর আবার ভবঘুরে! তাই আমি ওকে ইগনোর করতে শুরু করি। ওর ইমেইলের রিপ্লাই দিতাম না, ওর ইয়াহু কল রিসিভ করতাম না। একটা সময় সেও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমার লেজ ছেড়ে সটকে পড়ে। আজ ও মেইল করে জানিয়েছে দুসপ্তাহের মধ্যে ও বিয়ে করতে যাচ্ছে। এখন সে ভবঘুরে নয়। একটা ইলেক্ট্রিক্যাল কোম্পানিতে চাকুরী করছে। আমাকে ওর বিয়েতে যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আসল কথা হলো সে আমায় মনে মনে পছন্দ করতো। কিন্তু আমার প্রত্যাখ্যান তার ব্যক্তিত্বে আঘাত হানে। তাই তার বিয়েতে আমায় নিমন্ত্রণ জানিয়ে সে তার বদলা নিতে চাইছে। বেচারা আদিন। ওকে কখনোই বলা হয়নি যে আমি এঙ্গেইজড, খুব শীঘ্রই বিয়ের পিড়িতে বসতে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে পড়লো ভৌতিক ব্যাপার স্যাপারে ওর অনেক অভিজ্ঞতা আছে। ওকে আলেসের ব্যাপারটা খুলে বলা যেতে পারে। কিন্তু ওকে আমায় বিশ্বাস করবে? বিশ্বাস করলেও ও কি পারবে আলেসকে আমার কটেজ থেকে সরাতে? আচ্ছা। একবার বলেই দেখা যাক। ওর প্রফাইল ঘেটে ওর ফোন নম্বর বের করে ফোন দিলাম।
হ্যালো আদিন। কংগ্রেটুলেশন। যাক বাবা। অবশেষে তুমি স্থির হয়ে সংসারব্রত পালনে মন দিয়েছো। আমিতো ভেবেছিলাম এই পাগলা ঘোড়াকে আটকায় এমন কোন b***h এ জগতে জন্মায়নি।
ও মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানালো।
এবার আমি সরাসরি টু দি পয়েন্ট চলে আসলাম। আদিন। তুমি কি আজ আমার সাথে ডিনার করবে? আজ আমি তোমাকে খাওয়াতে চাই।
ও বলল, আমি যা খেতে চাই তুমি তো তা দিবে না।
বুঝলাম ও যৌনতার দিকে ইঙ্গিত করছে। হাহ। ছেলেদের এক চিরায়ত দুর্বলতা, অবারিত যৌন পিপাসা।
আমি ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ইগনোর করে ব্যস্ত কণ্ঠে বললাম, শোন আদিন, আমার নতুন কটেজে ভৌতিক কাণ্ডকারখানা চলতেছে। তুমি কি এটা থামাতে আমায় সাহায্য করবে?
ও রাজি হয়ে গেল। আমরা ঠিক করলাম অফিস শেষে আজ বিকাল ৬টায় আমরা “জিনেটস্কি হুইস্কি ” রেস্তোরায় এক সাথে ডিনার করব।
আমার অফিস শেষ হয় বিকাল ৫টায়। অফিসের পর প্রায় একটা ঘন্টা আমি বাল্টিসের সৈকতের ধার দিয়ে গাড়ি চালিয়েই কাটিয়ে দিলাম। তারপর ৬টা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগেই আগেই আমি রেস্তোরাঁয় হাজির হলাম। আদিন তখনো আসে নি। ওর সাথে এই প্রথম আমার সরাসরি সাক্ষাৎ। এর আগে ইয়াহুতে ভিডিও চ্যাটে ওকে চার মাস আগে শেষ দেখেছিলাম। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল আর মাথা বাজপাখির বাসা। ওর আগের চেহারাটা যখন আমি কল্পনা করছি তখন এক সুট পরা ক্লিন শেইভড জেন্টুলম্যান আমার সামনের চেয়ারে এসে বসলো। আমি খেঁকিয়ে উঠে বললাম, এই যে মিস্টার, এই ডেস্কে আমি বসেছি আর আমার সাথে একজন দেখা করতে আসছে যার জন্যেই এই সিটটা রিজার্ভড। আপনি অন্য কোথাও বসুন। লোকটা তো উঠলোই না তার উপর আবার হো হো করে হাসতে শুরু করলো। দেখতে জেন্টল হলেও আচরণে কি অসভ্য রে বাবা! কিন্তু ওর চোখ দুটো খুব চেনা চেনা মনে হলো। আরে! এতো আদিন। দাড়িগোঁফের জঙ্গল ছাড়া আদিন। সে আগাগোড়া বদলে গেছে! আলেসের ডায়ারীর একটা লাইন মনে পড়লো, “কত দ্রুতই না মানুষ বদলে যায়।”
আমিই খাবার অর্ডার করলাম। খেতে খেতে আমি ওকে সবকিছুই খুলে বললাম। ও বলল সে আজ চেষ্টা করে দেখবে। ও প্রথমে আমার কটেজ সম্পর্কে জানতে চাইলো। আমি ওকে বিস্তারিত বললাম। একতলা কটেজটায় মোট দশটা রুম। তিনটা বেডরুম, প্রত্যেকটার সাথে সংযুক্ত বাথরুম, একটা কিচেন, একটা ডায়ানিং, একটা ড্রয়িং, দুটো স্টোর রুম, আর দুটো গেস্ট রুম। এটা একটি মধ্যযুগের পরিত্যাক্ত গির্জা। এর বেসমেন্টে একটা পাঁচ সেল বিশিষ্ট বন্দিশালা আছে। ওটারই কোন একটায় আলেসকে আটকে রাখা হয়েছিলো। সম্ভবত ডানদিকের তিন নম্বর সেলটায়। গতরাতে আমিও ওখানে আটকে পড়েছিলাম। সারারাত বিদঘুটে স্বপ্ন দেখে কাটিয়েছি। আমি দেখলাম, ,,,,,,,
আদিন আমার কথাগুলি হাঁ করে গিলতে থাকলো। সবটুকু শুনে ও বলল এখন খেয়ে তার বাড়ি গিয়ে কিছু ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে আসতে চায়। ও মনে করে আলেসকে তাড়ানো খুব একটা সহজ নয় তবে অসম্ভব ও নয়। খাবার শেষে ও জোর করে ডিনারের বিল মিটিয়ে দিলো। তারপর আমরা যার যার গাড়িতে উঠে, দুজন দুদিকে রওনা হলাম। আমি কটেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়িটা পার্ক করে ভেতরে বসে রইলাম। একা একা কটেজটায় ঢুকতে সাহসে কুলাচ্ছিলো না। যতই চেষ্টা করছি আলেসকে ভয় না পেতে ততই সে আমার মনে ভয়ের সঞ্চার করছে। গাড়িতে একটা হিপ হপ গান ছেড়ে আদিনের আগমনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষার প্রহরটা বড্ড বিরক্তিকর। একটা সময় গাড়ির সিটে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙ্গলো আদিনের গাড়ির হর্ণের শব্দে। যাক বাবা। ও চলে এসেছে। এবার হয়তো ও আলেসকে মুক্তি দিয়ে আমার কটেজটাকে আবার নিরাপদ করে তুলবে। দুটো গাড়ি নিয়ে একসাথেই ভেতরে প্রবেশ করলাম। গ্যারেজে গাড়ি পার্ক না করে আমরা ড্রাইভ করে সোজা বাড়িটার সামনে চলে এলাম। সদর দরজার সামনে গাড়ি দুটো রেখে আমরা নেমে পড়লাম। আমার সেই পুরানো ভয়ভয় অনুভূতিটা আবার ফিরে এলো। মনে হলো আজ অশুভ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। দরজাটা খুলার আগে আমি ভয়ার্ত চোখে আদিনের দিকে তাকালাম। ও গাড়ি থেকে কতগুলি বিশাল ইহুদি ধর্মীয় বই, কতগুলি মোমবাতি, এক ব্যাগ ভর্তী শুকনো পাতা, এক বোতল পানি আরো কি সব যেন গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসলো। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই আমি ওর চোখে নির্ভরশীলত খুজলাম। কিন্তু আমি যা খুজছিলাম তা ওর চোখে ছিলো না। ওর চোখে ছিলো অনিশ্চয়তা আর কৌতুহ তবে কনফিডেন্সের বড়ই অভাব সেখানে। দরজা খুলে আমরা আবারো সেই অভিশপ্ত কটেজে ঢুকে পড়লাম। আদিন প্রতিটা কক্ষে ঢুকে ওর ধর্মীয় বই থেকে হিব্রু ভাষায় কি যেন পড়লো। তারপর প্রতিটা কক্ষের মেঝের মাঝখানে কিছুটা শুকনো পাতা ছড়িয়ে তার উপর একটি করে ধর্মীয় বইটা রাখলো। তারপর সে বইগুলির পাশে একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলো। কাজ শেষে ওকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হল। এবার ও আমার দিকে ফিরে বলল কাজ শেষ। মোমবাতিটা পোড়া শেষ হলেই এসব কক্ষে যদি কোন অশরীরী থেকে থাকে তবে তা চলে যেতে বাধ্য হবে। আমি কেন জানি ওর কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছিলাম না। তবুও মৃদু হেসে ওকে ধন্যবাদ জানালাম। আমি ওকে কিছু কোল্ড ড্রিংক্স সাধলাম। এত কিছু করার পর ওর গলাটা হয়তো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ও হুইস্কি খেতে চাইলো। আমি ওকে বিনীত ভাবে বললাম আমি মদ খাইনা। তাই কটেজে কোন হুইস্কি নেই। ওকে অনেকটাই হতাশ দেখালো। বুঝলাম ওর আগের সব অভ্যাস পরিবর্তন হলেও ও এখনো মদটা ছাড়তে পারেনি। ও আর কিছু না খেয়েই বেরিয়ে পড়লো। ও গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাবার সময় আমি হাত নেড়ে ওকে বিদায় জানালাম। গোধূলির আধাঁরে ও গাড়ি ছুটিয়ে ধীরে ধীরে দুরে সরে যেতে লাগলো। অভিশপ্ত কটেজটায় আমি একা পড়ে রইলাম আরেকটা রাতের জন্যে। সত্যিই কি একা? নাকি এক ঝুড়ি দুঃস্বপ্ন নিয়ে আমায় সঙ্গ দেয়ার জন্যে আলেস ও সাথে আছে?
(চলবে)

ডাকিণী (১১তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
(১০ম পর্বের পর থেকে)
ভয়ে চিৎকার এক সময় মনে হল গলা ফেটে রক্ত বেরুবে। নাহ। এভাবে মাথা গরম করলে এখান থেকে বেরুনো যাবে না। আলেসের মতো সারা জীবনের জন্যে এখানে আটকে পড়বো। মায়ের উপদেশগুলি মনে পড়লো। বিপদে মাথা ঠান্ডা না রাখলে ঘাড়ের উপর মাথাটা আস্ত থাকবে না। ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম। একটা সময় ভয়, উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে এলো। স্থির হয়ে ভাবতে শুরু করলাম। কয়েকটা গুরুতর ভুলের কারণে আমি এখানে আটকে গেছি। প্রথম ভুল হলো আলেসকে বিশ্বাস করা। ওকে বন্ধু ভাবা। একটা অশান্ত আত্মা কখনোই কারো বন্ধু হতে পারে না। আমার কোনভাবেই আলেসের ডাকে সাড়া দেয়া উচিৎ হয়নি। ওর ডায়ারী মতে একাকীত্বই ওকে ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের থেকেও বেশী কষ্ট দেয়। তবে কি ও আমাকে মেরে ওর মতোই অশরীরী বানিয়ে নিবে, কেবল ওকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে! মনে পড়লো একবার টিভিতে একটা রিয়ালিটি হরর শো তে এক প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর বলেছিলো যে ভয় হলো কালো-আত্মার প্রধান অস্ত্র। ওদের নাকি আকার আকৃতি, স্থিতি-জড়তা নেই। তাই ওরা কাউকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারে না। কিন্তু ওরা শিকারকে ভয় দেখাতে থাকে যতক্ষণ না ভিক্টিম অতিরিক্ত ভয়ে হার্ট আটাক বা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার মতো আত্মঘাতী কিছু একটা করে বসে। ওদের ভয় না পেলেই ওদের হাতে মৃত্যুর আশংকা বুঝি ৯৯ ভাগ কমে যায়। আমি কখনোই টিভিতে দেখানো উদ্ভট কোন কিছু বিশ্বাস করি না। তবে এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে বিশ্বাস না করে উপায় নেই। মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলাম আজ যদি এখানে মরতেই হয় তো ভয়হীন ভাবে নিজের আত্মসম্মান নিয়েই মরবো। আলেসের ভয়ে ভীত হয়ে হার্ট ফেইল করে মরবো। চিৎকার করে বললাম, “আলেস। তুমি হয়তো আমায় মেরে ফেলতে পারবে কিন্তু ভয় দেখাতে পারবে না।” বদ্ধ বন্দিশালায় আমার চিৎকার প্রতিধ্বনি তুললো।
ভয় তাড়ানোর জন্যে মেঝেতে বসে বসে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলাম। কখন যে চোখ জুড়িয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। যখন চোখ খুললাম তখন দেখলাম সিড়ির খোলা মুখ দিয়ে চুইয়ে দিনের আলো ঢুকছে! আমি কালকের ভয়ঙ্কর রাতটা উৎরে গেছি। ওয়াও! আমি এখনো বেঁচে আছি! কিন্তু রাতে কিসে আমার সেলের দরজা আটকেছিলো! ভাবতেই উঠে গিয়ে সেলের দরজাটা পরীক্ষা করলাম! আশ্চর্য! দরজায় বাহিরে থেকে একটা বিশাল তালা ঝুলছে! তারমানে গতরাতে যখন আমি যখন সেলে প্রবেশ করি তখনই কেউ একজন আমাকে বাহিরে তালা মেরে আটকে দেয়! কিন্তু কে সেটা! আলেস? মনে হয় না। লাইব্রেরীতে বেশ কয়েকবারই আলেস আমায় ভেতরে রেখে দরজা আটকে দিয়েছিলো। কিন্তু তখন তো ওর তালার প্রয়োজন হয় নি! কিন্তু এখন দরজায় তালা ঝুলানো কেন! অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেলো এটা কোন মানুষের কাজ! আশেপাশে মানুষ থাকতে পারে ভাবতেই নিজের কাপড় চোপড় নিয়ে সচেতন হয়ে উঠলাম। মনে পড়ে গতরাতে গোসল শেষে একটা তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়েছিলাম আমি। কিন্ত ওটা এখানে আটকে পড়ার পর একটা শক্তিশালী দমকা হাওয়ায় উড়ে যায়। কিন্তু ওটা এখন কোথায়? চারিদিকে খুঁজাখুঁজি করেও আমি সেই সাদা তোয়ালেটা খুজে পেলাম না। তবে সেলের কোনে বাদামি রঙের তালি মারা ছেড়া এক প্রস্থ কাপড় পেলাম। অগত্যা সেটাই জড়িয়ে নিলাম দেহে। তখনই আমি কতগুলি ভারী পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। ওরা সিড়ি ভেঙ্গে এদিকেই এগিয়ে আসছে! নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলাম কারা ওরা? কি চায় ওরা আমার কাছে? কিন্তু উত্তরটা আমার জানা নেই।
কারাগারের শিকের ওপাশে বিচিত্র বেশভূষার কতজন বিশালদেহী পুরুষ এসে উপস্থিত হল। আশ্চর্য ব্যাপার হল ওদের সবার দেহ ভারী বর্মাবৃত, আর হাতে বেঢপ লম্বা তরোয়াল। তবে এদের মধ্যে একজনের হাতে তরোয়ালের বদলে ঝিলিক দিচ্ছে লকলকে সাপের চামরার চাবুক! এই বন্দুকের যুগে এদের এহেন অস্ত্র সস্ত্র দেখে আমার নিতান্তই হাসি পেল। মনে মনে ভাবলাম ইশ, আমার ডেজার্ট ঈগলটা (আমার লাইসেন্স করা পিস্তল) এখন যদি হাতের কাছে থাকতো তো সবকটার পায়েই একটা করে বিচি ঢুকিয়ে দিতাম। আমাকে সারারাত এখানে আটকে রাখার জন্যে এটাই হতো ওদের উচিৎ শিক্ষা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। পিস্তলটা আমি আমার বেডরুমে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে ফেলে এসেছি। ওদের তিনজনের মধ্যে তলোয়ারওয়ালা দুজন বাহিরে দাড়িয়ে রইলো। আর চাবুকওয়ালাটা আমার সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। তারপর সোজা আমার দিকে এগিয়ে এসেই সপাৎসপাৎ দু ঘা বসিয়ে দিলো। আমার শরীরে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে। কোথায় মেরেছে জানি না কিন্তু সারাটা শরীর জ্বলতেছে। আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাড়ালাম। লোকটা আমার চুল ধরে টানতে টানতে সেল থেকে বের করে সিড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যেতে লাগলো। ওদের এহেন ব্যবহারে আমি চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলাম। মহিলাদের প্রতি এতটুকু মর্যাদাবোধ বা সৌজন্য এদের মধ্যে নেই। সিড়ি বেয়ে যতই উপরে উঠছি ততই একদল মানুষের সম্মেলিত শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। ওরা আমায় কটেজের কাঠের সিড়ি ধরে একদম ছাদে নিয়ে গেল। ছাদে গিয়ে দেখলাম এক ঝাক মানুষ নিচে জড়ো হয়েছে! আমার কটেজে এরা ঢুকলো কি করে! আমি যখন বিষ্ময়ে উপস্থিত জনতাকে দেখছিলাম তখনই চাবুকওয়ালাটা এসে আমার হাত দুটো পিছ মোড়া করে বেধে দিলো। কি হচ্ছে এসব! বিষ্ময় আর ভয়ে নুয়ে পরার উপক্রম। এবার দু তলোয়ারওয়ালা আমার দুপাশে এসে, দু কাঁধ শক্ত করে ধরলো। এত শক্ত যে মনে হলো শোল্ডার জয়েন্ট গুঁড়ো হয়ে যাবে। ওদিকে চাবুকওয়ালাটা ছাদে একটা খাম্বার সাথে বাধা দড়ি এনে আমার গলায় ফাঁস পড়িয়ে দিলো। হায় খোদা! এরা কি আমায় ফাঁসি দিতে চলেছে? তলোয়ারওয়ালা দুজন আমার কাঁধ ধরে ঠেলতে ঠেলতে ছাদের কিনারায় নিয়ে গেল। উপস্থিত জনতা প্রবল হর্সধ্বনি দিয়ে আমার আসন্ন মৃত্যুকে স্বাগত জানালো। আমি মা কে শেষবার দেখার জন্যে হৃদয়ে এক প্রবল আকুতি অনুভব করলাম। জীবনে কতই না দুঃখ দিয়েছি মাকে। মা আমাকে যে কাজটাই নিষেধ করতো সেটাই আমি প্রথমে করতাম। মায়ের অবাধ্য হওয়াটাই আমার কাছে একটা থ্রিল ছিলো। কিন্তু তবুও মা একটু রাগ করলেও পরক্ষণেই খুকি বলে আমায় জড়িয়ে ধরতো। মায়ের মিষ্টি চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ একজন আমায় ছাদের উপর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলেছে। কিন্তু একদম মাটিতে আছড়ে পরার বদলে আমার গলায় পড়ানো দড়িটিতে আমি ঝুলতে লাগলাম! হায় খোদা! এরা আমায় ফাঁসি দিয়ে দিচ্ছে! আমি মারা যাচ্ছি! বাতাসের অভাবে ফুসফুসটা যেন ফেটে যাবে! হৃদপিণ্ডটা ধীরেধীরে থেমে আসছে। অনুভব করলাম সারা শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়েছে। ব্যাথার অনুভুতিগুলি আস্তে আস্তে ভোঁতা হয়ে এলো। নিঃসীম কালো আধার চোখ দুটোকে ঢেকে দিলো।
(চলবে)

ঘড়া পর্ব ৫-মারিয়েন ফয়সাল।

0

ফৌজির অন্য মহিলার রূপের প্রশংসায়, বুকের ভিতর তীক্ষ্ণ একটা অনুভূতি হল, তবে টাকার চিন্তায় অভিমানকে দূরে সরিয়ে রাখলাম।
আলমারি দুই তিন বার ঘাটা ঘাটি করে সর্ব সাকুল্যে মাত্র তিন লক্ষ জোগাড় করতে পেরেছি । নাহ, ফৌজির কাছে চাইতেই হবে মনে হচ্ছে । গোল গোল চোখ গুলোকে বাঘের মত আরও গোল করে তাকিয়ে থাকবে প্রথমে, তারপর দিয়ে দেবে। আমি না হয় আমার বাবার বাড়ি থেকে শাহজাদী বিলকিস বেগমের পেইন্টিংটা এনে ডাইনিংহলে ঝুলিয়ে দেব। ফৌজি আর দোউখানুর চক্ষু তুষ্টিও হবে আর আমার টাকার জোগাড়। সাময়িক ভাবে সমস্যার সমাধান হলেও, একটু ভয় ভয় লাগছে আমার । যদি না দেয়!
ছেলের ঘর থেকে কথা বার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে । দরজাটা খুলে একটু গলা বাড়িয়ে দিলাম। আমারই তো ছেলে! পেতিয়ে বসে দোউখানুর সাথে গল্প করছে ।
-‘Mom,Doukhanu is very smart!’
-‘কেমন স্মার্ট? ‘
-‘আমি ওকে ইন্টার্নেট চালাতে শিখিয়ে ফেলেছি । একটা ফেসবুক এ্যাকাউন্টও খুলে দিয়েছি, ও তোমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে । তারপর আমার এ্যাকাউন্ট থেকে তোমার ফ্রেন্ড লিস্টে গিয়েছে । জেসিনা ফারহান, ফারিয়া শামিমকে খুব পছন্দ হয়েছে, ওনাদের চুল নাকি খুব সুন্দর । আমি অবশ্য ওনাদের ভালো করে দেখিনি । ‘
চোখগুলোর সামনে হাত দু’টো পেতে রেখেছি ।
-‘কেন দেখনি? ‘
-‘মম, তোমার বন্ধু, ওরা আমার ‘মাতৃতুল্য ‘ । ফিক করে হেসে ফেলল ।
নাহ, চোখ গুলোকে আর বোধ হয় ধরে রাখতে পারব না। কোটর ছেড়ে টুপ টুপ করে বেরিয়ে পড়ে যদি মাটিতে পড়ে যায় তাহলেই গেল সব!
এদিকে দোউখানু যেন কিছু বলার জন্য আকু পাকু করছে ।
চোখ দু’টোর জলান্জলি যাতে না হয় , তার জন্য চোখের সামনে হাত দু’টো শক্ত করে পেতে রেখেই দোউখানুকে প্রশ্ন করলাম, ‘ কিছু বলবে দোউখানু? ‘
– ‘ মম আম্মা, আমি জেসিনা ফারহানের বাসায় গিয়ে ওনাকে আড়াল থেকে দেখে এসেছি । আহা! কি তার চুলের রূপ! আড়াল থেকে দেখলাম, উনি ফ্রিজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন ইন্টার্নেটে । তারপর আমি গেলাম ফারিয়া. এস.শামিমের বাসায় । ওনার মনে হয় অনেক জ্বর, চুল গুলো উঁচু করে বাঁধা; জ্বরে উনি রক্ত চক্ষু মা চণ্ডীর রূপ ধরে বসে রয়েছেন । তাও খুব সুন্দর! জ্বর বেশী কিনা জানার জন্য ভুলে ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি মাত্র, অমনি মার মুখী হয়ে এমন কড়া কথা বললেন … আমি দৌঁড়ে পালিয়ে এসেছি! ‘
– ‘ বল,গালি দিয়েছেন।তা কি বললেন?’
-‘না,না , আমি ওসব বলতে পারব না মম ম্যাডাম।
ফারজানা রহমানকে দেখে আসলাম, বড়ই নেক রমনী! কণ্ঠস্বর প্রায় শোনাই যায় না । রেশমী সাবেরের কাছেও গিয়েছিলাম, একটু সময় লেগেছে এই যা । সারা দিন ওনাকে অনেক কাজ করতে হয়! গৃহিনী হিসেবে উনি অতুলনীয়! ভেবেছিলাম একটু সাহায্য করে আসব, কিন্তু আগামিকাল তো আবার বিশ্ব ভ্রমণে বের হব, তাই চলে এলাম! ‘
যাক! তাহলে, এই কয়েকজনকেই রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। নিশ্চিন্ত হলাম।
-‘ব্যাস,এই কয়েক জন তো? নাকি.…’
-‘না মম আম্মু, আবিদ ভাই আরও কয়েকজনকে সাজেস্ট করেছেন, ওনার পছন্দ অনুযায়ী!
‘ -‘মম , তোমার এত ছোট ছোট বন্ধু, চোখ ফেরাতে একটু কষ্ট হয় । তারপরও বেশি তাকাইনি। সবই তোমার শিক্ষার গুণ! ‘
বলা বাহুল্য আমার পুত্র সন্তান আবিদের বয়স খুব বেশি না, মাত্র চব্বিশ।
-‘ হ্যাঁ বাবা, আমার শিক্ষার গুণ, আর তুমি তোমার বাবার জেরক্স, বার্থ সার্টিফিকেট লাগবে না! ‘
আবিদের ঘর থেকে বেরিয়ে, সোজা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছি এখন আমি! আধা ঘন্টা পর বের হব ভাবছি ।

Comment

শেষ রাত- নুরুন নাহার লিলিয়ান।

1

দুই একদিনের ট্যুর। কিছু ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট করতে হবে। নিজের মতো থাকার জন্য সে সব সময় গেস্ট হাউজ অথবা ভাল কোন হোটেল। বিচিত্র রকমের মানুষ। আত্মিয় স্বজন কিংবা বন্ধুদের বাসা। কোথাও রাত্রি যাপন তার পছন্দ নয়।নিজের বাসা তো ভাড়া দেওয়া। বছরের বেশীর ভাগ সময় তাকে এদেশ ওদেশ ঘুরতে হয় গবেষনার প্রয়োজনে।

দিঠি তার বর নাগিবের অদ্ভুত সব একরোখা আচরনে ক্লান্ত হয়ে উঠে। বন্ধু আত্মিয় সবার কাছে তার এই অদ্ভুত আচরনের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। এবার ও বরের সাথে ঝগড়া করতে করতে চিটাগাং থেকে ঢাকা এলো।
বরাবরের মতো ঢাকা বিসিএসআইআর গবেষনাগারের গেস্ট হাউজ। এই গেস্ট হাউজের কেয়ার টেকারের নাম নবাব। এই ছেলেটির আপ্যায়নে নবাবি সটাইল আছে। একবার কোন খাবার যদি বলা হয় ভাল লেগেছে সে সেটারই বারবার আয়োজন করবে। যখন দিঠি প্রথম বার এই গেস্ট হাউজে এলো তখন পাশের রুমে থাকা সাদা চুল ওয়ালী অবসর প্রাপ্ত মহিলা বিজ্ঞানীর সাথে ভাব হল।

ঠিক এবারও সে মহিলা এসেছে গাজী পুর থেকে। দিঠি মনে মনে ভাবলো সে থাকাতে গল্প করা যাবে। তিন তলা গেস্ট হাউজের ডান দিকে খুব সুন্দর কৃষ্ণচূড়া গাছের সাথে অদ্ভুত একটা সুপারি গাছ। এই জায়গাটায় বসলে মনটা বাতাসে হাল্কা হয়ে যায়। জীবন থেকে জীবনের হারিয়ে যাওয়া অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। লং জার্নির ক্লান্তিতে আর তার সাথে এ রাতে কথা হলো না। তারাতারি ঘুমিয়ে পড়াতে শেষ রাতে ফজরের আযানে ঘুম ভেঙে গেল।

দিঠির কিছু ভাল লাগছিল না। দরজা খুলে বারান্দায় গেল। সেই সুপারি গাছের সামনে চেয়ার নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে সাদা চুলের বৃদ্ধা। দিঠি ঘুম চোখে এগিয়ে যাওয়াতে সে মনে হলো রেগে দাড়িয়ে গেল। তার শরীর থর থর করে কাপছে। ডেঙ্গু জ্বরের কারনে যেমন চোখ হয় রক্তিম।

ঠিক তেমন নয় বরাবর দাড়ানো অবস্থায় দেখলো ঘন রক্ত দু চোখ দিয়ে গড়িয়ে নামছে। দিঠির হাত পা অবশ হয়ে গেল। কি করবে বুঝতে পারলো না। শেষ রাতের গল্প টা ভিষন ভয়ংকর হয়ে উঠলো। সে কঠিন কণ্ঠে বলল, “আপনি ভিতরে যান।”
দিঠি হাপাতে হাপাতে রুমে ফিরে এলো। দেখলো বরের পিঠ জুরে শুধু আচরের লাল দাগ। দিঠি ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করাতে ঘুমের মধ্যেই বর বলল,ঘুমের মধ্যে হয়তো আমি নিজের পিঠ নিজেই আচরেছি। কাল নখ কাটতে হবে। দিঠির ভিতর থেকে ভয় যেন নামছে না। ফজরের নামাজ পড়ে আয়তুল কুরসী পড়ে নিজেকে এবং ঘুমন্ত নাগিব কে ফু দিল। সকালে নবাবকে সে মহিলার কথা জিজ্ঞেস করাতে জানালো সে গাজীপুর চলে গেছে।
দিঠির আর জিজ্ঞেস করা হলো না শেষ রাতের গল্প করতে সেই এসেছিল নাকি।

দিঠি জানে সায়েন্টিস্ট বরের কাছে আধি ভৌতিক যন্ত্রনার গল্প শেষ রাতের গল্পের মতোই। ভোরের আলোর সাথে সব ফুরিয়ে যায়।
তখন থেকেই দিঠির গায়ে প্রচণ্ড জর। চোখের সামনে থেকে সাদার চুলের বৃদ্ধার রক্তিম চোখ দুটো স্থির হয়ে রইলো। ট্রেন চলছে চিটাগাংয়ের পথে। দিঠি টের পেল এসি থাকার পরও জামার ভিতর দিয়ে ঘাম টপ টপ করে পড়ছে।

“নাগেশ্বরী “-নুরুন নাহার লিলিয়ান

0

নাগেশ্বরী গাছটায় হঠাৎ করেই ফুল নেই। গবেষনাগারের সবাই খুব অবাক। মালী মতিন প্রায় প্রতিদিন গাছটার যত্ন নেয়। দুই মাস হলো চিটাগাং ক্যামিক্যাল গবেষনাগারের নতুন ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিয়েছেন ড.নির্মল কুমার সেন। তার পরিবার ছেলে মেয়ে আর বউ কেউ সাথে নেই। তারা সবাই ঢাকা থাকে। ডিরেক্টরের বিশেষ বাংলোতে তিনি থাকেন।বিশাল চিটাগাং গবেষনাগারে অনেক অনিয়ম। সরকারের এতো সময় কোথায় ঢাকার বাইরে কি হয় না হয় জেনে।

খুব নিরব আর রহস্যময়।প্রথম রাতেই ড.নির্মল বাংলোতে ঘুমাতে পারলেন না। কেমন অস্থিরতা কাজ করছিল। বাংলোর পিছনেই বার্বুচি মানিকের বাসা।প্রতিদিন মালী মতিন নাগলিজ্ঞম, জবা,আর গোলাপ দিয়ে তোরা বানিয়ে বাংলোতে রেখে আসে। এখানে আসার পর ড. নির্মল ক্ষমতা আর লোভের মোহে পড়ে গেল। বিশাল বিরানভূমিতে লোকজন নেই বললেই চলে।এটাতে একটা সুবিধা হলো বেশী আয় রোজগারের অনেক ধরনের পথ আছে। চিটাগাং অসৎ ব্যবসায়ীদের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরী হল। সরকারি অনেক মূল্যবান ক্যামিক্যাল তিনি ব্যবসায়ীদের কাছে পাচার করে দেয়। এই কাজে ব্যবহার করে মালী মতিনকে।

এভাবে আরো কয়েক মাস গেল। দুই তিন দিন হয় রাতে কেমন ভয় ভয় লাগে। কারনটা হয়তো অন্য কিছু হতে পারে। বিশ্বস্ত মালী মতিন কি বিশ্বাস ঘাতকতা করবে নাকি তাকে আরো সাবধান হতে হবে। এই দিকে মালী মতিনের বউ অন্তঃসত্তা। মতিনের ছুটি দরকার। কিন্তু এই সময়টায় ড.নির্মল তাকে ছুটি দিলে গোপন ব্যবসার ক্ষতি হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মালীকে ছুটি দিল না। অনেক অনুনয় বিনয় অনুরোধ করার পর ও ছুটি পেল না মতিন। ওদিকে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে বউটা মরে গেল।

মালী মতিন বউটাকে খুব ভালবাসতো। প্রচনড আঘাতে মতিন প্রতিবাদী হয়ে উঠলো। যার কারনে সন্ত্রাসীদের সহযোগীতায় দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। সবাই জানলো বউয়ের মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁসি দিয়েছে। ওই যে নাগেশ্বরী গাছটা সেটা কিন্তু সব দেখেছে।ডিরেক্টর তার পরিবারের সবাইকে চিটাগাং নিয়ে এলেন। বেশ সুন্দর জীবন চলছিল।হঠাৎ একদিন খাগড়াছড়ি ঘুরতে গিয়ে ভয়ংকর দূর্ঘটনায় একমাত্র ছেলের চোখ দুটো হারায়, স্ত্রী চিরদিনের জন্য পরপারে চলে যায়,মেয়েটি মাথায় আঘাত পেয়ে বোবা হয়ে যায়।

সেদিন থেকে শুধু ড.নির্মল নাগেশ্বরী গাছটার নিচে মতিন কে দেখতে পায়। আর কেউ দেখতে না পেলেও ড.নির্মল দেখে দাঁ হাতে মতিন কি কঠিন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

শ্বেত পাথরের বাড়ি -সালেহা বড়লস্কর

1

সাত সকালে টেলিফোনটা বেজে উঠলো ।। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল । টেলিফোন ধরতেই ফরহাদের গলা ভেসে উঠলো ।

কিরে এখনো ঘুমাচ্ছিস ?
তুই আর ঘুমাতে দিলি কই ?
আরে শোন জব্বর খবর আছে । তাইতো এই সাত সকালে টেলিফোন করেছি । তোকে এক জায়গায় নিয়ে যেতে চাই ।
তুই যেখানে খুশি যা আমাকে একটু ঘুমাতে দে ।
ঠিক আছে আরো এক ঘন্টা সময় দিলাম । তারপর এসে আমার সংগে নাস্তা খাবি । তোর প্রিয় নাস্তা পরোটা মাংস থাকবে । তোর সখের রস মালাই ও থাকবে । আসিস কিন্তু ।
আর নাস্তার লোভ দেখাতে হবে না
তাহলে অবশ্যই আসবি সুমন । দেড় ঘন্টার ভিতরে আসবি ।
নাস্তা খাওয়ার পর ফরহাদ বললো চল এবার ।
কোন চুলায় যেতে হবে ?
তুই চোখ বুঁজে হুন্ডায় আমার পেছনে বসবি । তারপর দেখবি কোথায় যাই ।
হুন্ডা এসে থমলো শহর থেকে কিছু দূরে গাছ গাছালিতে পরিপূর্ণ একটা ধপধপে সাদা বাড়ির সামনে । বাড়িটা দেখেই কেন জানি আমার মনে হল বাড়িটা শ্বেত পাথর দিয়ে তৈরী ।সূর্যের অলোয় অপূর্ব রঙের সমাহারে ঝক ঝকে তক তকে বাড়ি । বাড়ির গেটে এক দারোয়ান বসে ঝিমুচ্ছে ।দারোয়ানের চোখগুলো মনে হচ্ছে রক্তের মত লাল । পরনের কাপড় দেখলে মনে হয় যেন শত বর্ষ আগের কেনা । এ সমস্ত দেখে
আমি ফরহাদকে জিজ্ঞেস করলাম ,এখানে কি করতে এসেছিস ?
আরে ঐ বাড়িটা আমি কিনবো । তোকে দেখাতে নিয়ে এলাম ।
তুই কিনবি ? সেলিনাকে বলেছিস ?
এখন ও বলি নাই ।বিয়ের পর তাকে সারপ্রাইজ দেব । বাড়িটা তাকেই দিয়ে দেব ।
চল ভিতরটা দেখে আসি । দারোয়ানকে গেট খুলতে বল ।
দারোয়ান কিছুক্ষণ আমাদের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে গেট খুলে দিল কিন্তু কোন কথা বললো না ।
ভিতরে ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়লো গেটের এক পাশে শিউলি ফুলের গাছ । অন্য পাশে বকুল ফুলের গাছ । মাঝখানে ঝক ঝকে পাকা সিমেন্টের রাস্তা তাও ধপ ধপে সাদা । রাস্তা পার হয়েই বিরাট বারান্দা । তারপর বসবার ঘর । সাজানো ঘোচানো । উপরে তিনটি বেডরুম । সবগুলোই সাজানো ঘুচানো । প্রতিটি বেডে ঝক ঝকে সাদা বেড কভার বিছানো । সুন্দর করে সাজানো প্রতিটি বেডরুম । দেখে মুগ্ধ হলাম । দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । আকাশে রূপালি চাঁদের হাসি বিচ্ছুরিত হল । ধপ ধপে সাদা বাড়িটা স্বর্গীয় শোভায় আলোক বিচ্ছুরিত করতে লাগলো । আমরা দেখে মুগ্ধ হলাম ।
বাড়িটা কিনলো ফরহাদ ।আমার সঙ্গে শর্ত হল ফরহাদের বিয়ের আগ পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে এ বাড়িতে থাকবো । কারণ একা সে নিঃসঙ্গ বোধ করবে ।
বাড়িতে পার হওয়ার পর থেকে বাড়ির ভিতরের ফুলে ফুলে সুশোভিত বাগানে হঠাৎ হঠাৎ মেয়েলি কন্ঠে গান ভেসে আসতো । কখনো কখনো এক দীর্ঘ ঘন কালো কেশী সুন্দরি মহিলার দেখা মিলতো আবার মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যেত । তারপর এলো পূর্ণিমার রাত । সারা রাত ধরে মারামারি আর হট্টগোলের আর কান্নার শব্দ ভেসে আসলো । কারা যেন ফরহাদের আর আমার টুটি টিপে ধরলো । সকালে আমরা দুজনই ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত । আসার আগে দারোয়ানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে একটা কথা সে বললো , বাবু হাম তো দুশ বছর আগ মে মর গিয়া ।পূর্ণিমা রাত মে ডাকাত হাম সব কো কতল কর দিয়া বলেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল