ডাকিণী ৪৩তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি: “হ্যালো আদিন। তুমি কি এখন আমার কটেজে আসতে পারবা?”
আদিন: “তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে তো এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি। ”
আমি: “ঠিক আছে। তুমি চলে আসো তাড়াতাড়ি। আমি অপেক্ষায় আছি।”
আধাঘন্টার মধ্যেই ওর ফোর্ডটা চলে এলো। কিন্তু এবার আর ও গাড়িটা সোজা গ্যারেজে রেখে এলো। কুয়োর পাশ দিয়ে গাড়ি চালানোর মতো দুঃস্বাহস দেখালো না।
তবে আমরা কুয়োর পাশ দিয়ে হেটেই কটেজে ঢুকলাম। ও একটা বিশাল লাগেজ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। ভেতরে কি আছে তা দেখার জন্যে আমি প্রচন্ড কৌতুহল অনুভব করলাম।
ও কটেজের সদর দরজার সামনে দাড়িয়ে ল্যাগেজটা খুললো। ল্যাগেজটা যত্তসব উৎকট রিচুয়াল জিনিসপত্রে ঠাসা।
ল্যাগেজটা থেকে ও একটা পুরাতন চামড়ার বই, কতগুলি ছোট মাটির ঘটি, এক প্যাকেট মোমবাতি বের করলো। সদর দরজা খুলাই ছিলো। ও দরজা গলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। আমিও ঢুকছিলাম পেছন পেছন। কিন্তু ও আমায় মানা করে দিলো। “সাঞ্জে। আমি একটু সময় তোমার কটেজে একা থাকপ্তে চাই। যদি তুমি কিছু মনে না করো। ”
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম “ঠিক আছে।”
কিন্তু মনটা খচখচ করতে লাগলো। বুঝতে পারছি না আমার অনুপস্থিতিতে ও ঠিক কি করতে চাইছে আমার কটেজে। আমি বাহিরে একা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষার প্রহর সত্যিই খুব বিরক্তিকর। হঠাৎ মনে হতে লাগলো আদিনকে আমার কটেজে এভাবে একা ঢুকতে দেওয়া উচিৎ হয় নি। মাত্র কদিন হলো আমি ওকে চিনি। ওর সম্পর্কে আমার তেমন ভালো ধারনাও নেই। মাস কয়েক আগেও ও একজন ভবঘুরে ছিলো। নানান উল্টোপাল্টা কাজে ওর জুড়ি মেলা ভার। আমার কটেজে ও যেকোন সময় লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিতে পারে।
এসব যখন ভাবছিলাম তখনই ভেতর থেকে আদিনের ডাক শুনতে পেলাম। “সাঞ্জে, দয়া করে কি একটু ভেতরে আসবে? ”
ইতস্তত পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু আদিন কোথায় গেলো! ওকে তো দেখছি না! আমি হাক ছাড়লাম, “আদিন কোথায় তুমি?”
আদিন: “ড্রয়িং রুমে বসে আছি। তাড়াতাড়ি আসো তো।”
হঠাৎ কি মনে হতেই আমি আমার ফোনটা বের করে ভিডিও তুলতে লাগলাম। ভাল খারাপ যাই ঘটুক না কেন আমি এর ভিডিও ডুকুমেন্ট রাখতে আগ্রহী। আমি ড্রয়িংরুমে যেয়ে দেখি আদিন সোফায় বসে আছে। আমি ড্রয়িং রুমে ঢুকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু দরজার সামনেই ও আমায় হাত তুলে ইশারা করে থামিয়ে দেয়। ড্রয়িংরুমের ভেতরটায় ভাল করে তাকাতে যেয়ে দেখি মেঝেতে, মাটির ঘটির মধ্যে সামান্য পানি রেখে তার উপর একটা মোমবাতি বসানো রয়েছে। ঘটির মধ্যে পানির লেভেল এমন ভাবে রয়েছে যেনো মোমবাতির তিন ভাগের দুভাগ পানিতে ঢুবে থাকে, কিন্তু বাকী একভাগ জ্বলন্ত অংশ সহ পানির উপরে থাকে। এবার আদিন আমার সামনে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দিলো। মোমবাতিটা ঠায় দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই জ্বলতে লাগলো। তারপর ও আমাকে ইশারায় ভেতরে ডাকলো। আমি ভেতরে ঢুকতেই মাটির ঘটিতে রাখা জলে বড় ঢেউ উঠে তা মোমবাতির জ্বলন্ত অংশের উপর দিয়ে বয়ে গেলো। তারপর ঘটিতে একটা ভেজা, নিভে যাওয়া মোমবাতি পড়ে থাকলো। তারপর ও আমায় নিয়ে অন্যকক্ষ গুলিতে ঢুকলো। সবগুলি কক্ষেই ড্রয়িংরুমের মতো মাটির ঘটিতে মোমবাতি জ্বলছিলো। সেগুলিও আমি ঢুকা মাত্র একই ভাবে নিভে গেলো। তারপর আদিন আমায় নিয়ে বেসমেন্টে ঢুকলো। কিন্তু আমরা সেখানে ঢুকে দেখলাম ওখানকার মোমবাতিটা ইতিমধ্যেই নিভে আছে।
তারপর সবশেষে আমরা গেলাম আমার বেডরুমে। সেখানেও বেসমেন্টের দশা। মোমবাতি আগে থেকেই নিভানো! বলা বাহুল্য আমার ভিডিও ক্যামেরা সবই রেকর্ড করছিলো। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে দপ করে বিছানায় বসে পড়লাম। হতাশ কন্ঠে বললাম, “এসব কি হচ্ছে আদিন। আমি আর সইতে পারছিনা। আমি কটেজটা বিক্রি করে দেবো ভাবছি।”
আদিন বলল, “ভাবো তো, তুমি কটেজটা যার কাছে বিক্রি করবে তারও তো একই হাল হবে। তুমি নিজে যা সইতে পারছো না তা কেনো অন্যের ঘাড়ে চাপাবে? এটা মোটেও ঠিক হবে না।”
আমি: “কিন্তু আদিন, আমি এর চেয়ে বেশী আর কি ই বা করতে পারি? ”
আদিন: “নিরাশ হয়ো না সাঞ্জে। আমার কাছে এর সব কিছুরই ব্যাখ্যা আছে। তোমার সহায়তা পেলে আমরা এ সমস্যাটা সমাধান করে ফেলতে পারবো।”
আমি: “কি ব্যাখ্যা আছে? আর সমাধানটাই বা কি? ”
আদিন: “শোন তাহলে। প্রতিটা কক্ষে মোমবাতি জ্বলার মানে হলো এসব কক্ষে কোন প্রেতাত্মার প্রভাব নেই। কিন্তু তুমি প্রবেশ করা মাত্র মোমবাতিগুলি নিভে যেয়ে প্রেতাত্মার প্রভাবের কথা জানান দিয়েছে। ও তোমাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। তুমি মারগারেটের পোষকদেহ হিসেবে কাজ করছো।”
আমি: “কিন্তু বেসমেন্ট আর বেডরুমে তো মোমবাতি জ্বলছিলো না। তুমি কিভাবে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিবে? ”
আদিন: তোমার আন্দাজ মতো এই বেডরুমেই যেহেতু মারগারেটকে ফ্যাসিতে ঝুলানো হয়েছিলো তাই এখানে তার স্বভাবসুলভ প্রভাবই বিদ্যমান। তাই মোমবাতিটা নিভে গিয়েছিলো। কিন্তু বেসমেন্টের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ওটা মারগারেট হতে পারে, কিংবা সেখানে নির্যাতিত অন্য কারো আত্মাও হতে পারে, আবার একটা মামুলি দমকা বাতাসের কারসাজিও হতে পারে। ”
আমি: “ঠিক আছে। বুঝলাম। কিন্তু আমি কিভাবে মারগারেটের বাহক হতে মুক্ত হতে পারি? একটা না একটা উপায় তো নিশ্চয় আছে?”
আদিন: “দেখো সাঞ্জে। রেস্টুরেন্টে তুমি যখন আমাকে মারতে গিয়েছিলে তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে তুমি একটা বাহিক মাত্র। আসলে মারগারেট দৃষ্টির অলখ্যে সকল কলকাঠি নাড়ছে। তাই আজ আসার সময় আমি একটা ব্যবস্থা ঠিক করেই এসেছি।”
আমি অধীর আগ্রহে জিজ্ঞাস করলাম, “তাই আদিন! কি ওটা? ”
আদিন: দেখো সাঞ্জে, আমাদের দেহটা অনেকটা কম্পিউটারের হার্ডওয়ারের মতো। উপযোক্ত পদ্ধতিতে যেমন কম্পিউটারের একটা অপারেটংসিস্টেম পাল্টে অন্য অপারেটিংসিস্টেম ইন্সটল দেওয়া যায় তেমনি উপযুক্ত পদ্ধতিতে আমাদের দেহ হতে একটা আত্মা বের করে অরেকটা আত্মা ভরে দেওয়া যায়। এগুলি উচ্চতর কালো জাদুবিদ্যার বিষয়।”
আমি: ” হা। মারগারেটও তাই চায়। আমার দেহটাকে দখল করে নিতে,,,,”
বলতে বলতে আমার গলাটা ধরে এলো। সত্যিই আমার দেহটাকে আমি অত্যন্ত ভালবাসি। এটাই আমার জীবন্তজগতের অস্তিত্ব। এটা অন্য একজন ব্যবহার করবে তা ভাবতেও আমার কষ্ট হচ্ছে।
আদিন আমায় সান্তনা দিয়ে বলল, “ভেবো না সাঞ্জে। তুমি যেমন আছো তেমনই থাকবে। তবে আমার একটা প্লান আছে। এটা কাজ করতেও পারে আবার নাও করতে পারে।”
আমি: “কি সেটা? ”
আদিন: “আংটি পড়া অবস্থায় তোমাকে অক্ষত দেহে মেরে ফেলবো। এতে তোমার আত্মা পরপারে যাওয়ার বদলে এখানেই আটকে পড়বে। অপরদিকে মারগারেটের জন্যে তো।আর দেহে প্রবেশ করা সহজতর হবে। তারপর ও তোমার দেহে প্রবেশ করা মাত্র আমি আংটিটা খুলে নেবো। তারপর ঠিক আগের মতোই অক্ষত রেখে ওকেও মেরে ফেলবো। এতে ওর আত্মাটা পরপারে চলে যেতে বাধ্য হবে। তারপর তোমার দেহতে তোমার আত্মাকে ফেরৎ আনবো! ”
আমি: “এই প্লানটা ভুলে যাও আদিন। তুমি কখনই আমায় মারতে পারবে না। এটা একটা পাগলের প্লান। তোমার আগের প্রচেষ্টার মতোই এটাও পন্ড হবে। মাঝখান থেকে আমার প্রাণটা গচ্চা যাবে।”
আদিন: “এর থেকে ভালো কোন প্লান কি তোমার মাথায় আছে? প্লীজ। তুমি বিশ্বাস করো আমার প্লানটা কাজ করবে। এই যে আমার হাতে চামড়ার বইটা দেখছো এতে মৃতদেহে আত্মা প্রবেশ করানোর মন্ত্র লেখা আছে। ওটা পড়লেই তুমি তোমার দেহে ফেরত আসবে। আর এই যে দেখ পকেটে করে সায়ানাইড ট্যাবলেট নিয়ে এসেছি। একটা খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়। আমি খুব শীঘ্রই তোমায় জাগিয়ে তুলবো।”
আমি: “না না আদিন। আমি তোমার মতো একটা মাথা মোটা পাগল নই। আমি তোমার মত একটা পাগলের কথায় সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করছি না। আমি আমার দেহ, আমার পরিবার, আমার জীবনকে প্রচন্ড ভালবাসি। আমি তোমার মতো একটা ছন্নছাড়া ভবঘুরে নই। ”
আদিন একটা ট্যাবলেট সামনে বাগিয়ে ধরে এক পা আগে বাড়লো। আমি সভয়ে পিছিয়ে গেলাম। বুঝতে পারছি খেতে না চাইলে ও জোর করে ট্যাবলেটটা মুখে পুরে দেবে। ক্যামারাটা তখনো ওর দিকেই ফোকাস করা ছিলো। ও এগিয়ে আসতে আসতে ঘরের মাঝখানে ঠিক ঝাড়বাতিটার নিচে চলে আসলো। ঠিক যেখানে মারগারেটকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। অমনি ভারী ঝাড়বাতিটা সশব্দে ওর মাথায় আছড়ে পড়লো। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, না আ আ আ আ আ
(চলবে)

ডাকিণী ৪২তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
মনে হচ্ছিলো যেন আমার হাতের নিজস্ব একটা প্রাণ আছে। ওটা নিজে থেকেই কাজ কছে। কপাল গুনে আদিন যথা সময় হাতটা খপ করে ধরে ফেললো নইলে একদম রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেতো।
ও আমার হাতটা ধরে খুটিয়ে খুটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলো। তারপর হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে সবিষ্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলো, “সাঞ্জে, হু আর ইউ? ”
আমি ওর আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে বললাম, ” আমি অত্যন্ত দুঃখিত আদিন। আমার কটেজ খালি হওয়া মাত্র আমি তোমায় আসতে বলবো। শুধু মেহমানটা কে বিদেয় হতে দাও।”
ওর মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটলো। ও বলল, “এইতো ভালো মেয়ের মতো কথা বলছো।”
আমি: “আচ্ছা আদিন, এবার তবে উঠি। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। তুমি কিছু মনে করো না। কেমন? ”
আদিন আমার দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “এখনই উঠবে? তুমি তো কিছুই খেলে না। এতো তাড়া কিসের শুনি? ”
“দুঃখিত, কাজ আছে।” একথা বলেই আমি ঘুরে হাটতে শুরু করলাম। আদিনের দিকে ফিরেও তাকালাম না। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরুতেই মনে পড়লো মনিকাকে কটেজে একা রেখে এসেছি। যতবারই ওকে একা ফেলে এসেছি ততবারই ও একটা না একটা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে দ্রুত পা চালালাম। কটেজে ঢুকে প্রধান ফটকের সামনে থমকে দাঁড়ালাম। সামনেই সেই অভিশপ্ত কুয়ো। একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। তারপর এক দৌড়ে কুয়োটাকে পাশ কাটিয়ে যেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই হেটে গেলাম কটেজের সদর দরজা পর্যন্ত। দরজায় বেল টিপতেই মনিকা উদভ্রান্তের মতো দরজা খুলে বেরিয়ে এসেই আমায় জড়িয়ে ধরলো। ওর উষ্ম আলিঙ্গনে অনুভব করলাম ওর দেহটা কাঁপছে! “কি ব্যাপার মনিকা? কোন সমস্যা হয়েছে।”
ও তোতলাতে তোতলাতে বললো, “তোমার বেসমেন্ট থেকে কে যেন আমায় নাম ধরে ডাকছিলো। এখন আমার খুব ভয় করছে।”
বেসমেন্ট থেকে! বেসমেন্ট তো আলেসের আস্তানা! তবে কি আলেস এখনো যায় নি? তবে কি ও মারগারেটের সাথে জোট বেধেঁছে! আলেস যদি থেকেই থাকে তবে ও হয়তো আমায় সাহায্য করতে পারবে। কেন জানি মনে হলো আলেসই আমায় মারগারেটের হাত থেকে মুক্তির এক মাত্র উপায়। ঠিক করলাম আজ রাতে বেসমেন্টে ঘুমাবো। জীবনের শেষ দুঃস্বপ্নটা দেখার আশায়।
এসব ভাবতে ভাবতে ভয়ার্ত মনিকার পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিয়ে বললাম, “অসব কিছু না ডার্লিং। একা থাকতে যেয়ে তোমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আমি এসে গেছি তো। এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
মনিকা আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ফ্রীজ থেকে দু টুকরা পিজা খেয়ে বেডরুমে ফিরে আসলাম। প্রায় সারাটা দিন আমি বাথরুমে যাই নি। কিন্তু এবার যে যেতেই হবে। এটা আমার কটেজ, মারগারেটকে এখানে থাকতে হলে আমার ভয়ে তটস্থ হয়েই থাকতে হবে। আমি কেন ওকে উল্টো ভয় পাবো? এসব বলে মনকে প্রবোধ দিলাম।
বাথরুমে ঢুকতেই দেখলাম আয়নাটা জোড়া লেগে আছে। আমি এক নজর দেখেই ওটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। তবে বাথরুমে আর কোন উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো না। বাথরুম থেকে বেরুতেই নিজের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো। বালিশ আর বিছানার চাদর নিয়ে চললাম বেসমেন্টের দিকে। আজ রাতটা ওখানেই ঘুমাবো।
বেসমেন্টের দরজা খুলতেই একটা মৃদু কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। কে যেনো বিলাপ করে কাঁদছে। কিন্তু আমি যেই সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম কান্নাটা থেমে গেলো। বেসমেন্টে আলেসের বন্দিশালায় ঢুকে আবারো বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম। মনে মনে শুধু আলেসকে ডাকছি। তারপর গলা চড়িয়ে পোলিশ ভাষায় বললাম “দেখো আলেস। আমি তোমার জন্যে অনেক কষ্ট করেছি। প্রতিদান হিসেবে তুমি আমায় মারগারেটকে তাড়াতে সাহায্য কর। প্লীজ। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ”
অন্ধকারে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু বিষ্ময়কর হলে সত্য, আমি সেরাতে আমি কোন স্বপ্নই দেখি নি। সকালে অনেক দেরীতে ঘুম থেকে উঠলাম। প্রায় দশটা বাজে। এতো লম্বা ঘুম ঘুমিয়ে আমি নিজেই বিষ্মিত! মনিকা হয়তো ইতিমধ্যেই ঘুম থেকে উঠে আমায় খুজতে শুরু করে দিয়েছে। তাড়াহুড়া করে উঠে বেরিয়ে এলাম বেসমেন্ট ছেড়ে। মনিকার অলক্ষেই আমার বেডরুমে ফিরে গেলাম। তারপর বাথরুমে যেয়ে হাত মুখ ধোয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিন্তু ভুলেও আয়নার দিকে তাকালাম না। বাথরুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে গিয়ে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে লাগলাম। তখনই মনিকা আমার পেছনে এসে দাড়ালো। “কি ব্যাপার সাঞ্জে ডার্লিং। আজ এতো দেরীতে ঘুম থেকে উঠলে যে।”
আমি: “আর বলো না ডার্লিং, উইকএন্ডে স্বভাব বিগড়ে যায়। আলস্য পেয়ে বসে। কিছুতেই ঘুমটা ভাঙতে চায় না। ”
কথা বলতে বলতেই খেয়াল হলো ও অসম্ভব সুন্দর করে সেজেছে। একটা উত্তেজক লাল রঙের খোলামেলা জামার সাথে ম্যাচিং লিপস্টিক, নেইলপলিশ আরো কত কি।
আমি: “ওয়াও। মনিকা। তোমায় আজ অসাধারণ লাগছে ডার্লিং।”
মনিকা: “অবশেষে তোমার চোখে পড়লাম তাহলে। হিহিহিহিহি। থ্যাংকস হানি।
আমি: “মোস্ট ওয়েলকাম। কোথাও বেরাতে যাচ্ছ না কি?”
মনিকা: “বারে! আজ রোববার না? আজ যীশুর কাছে প্রার্থনা করতে গীর্জায় যেতে হবে যে।”
প্রার্থনা করতে গেলে এতো সাজ গোজ লাগে! দেখে তো মনে হয় প্রার্থনা করতে নয়, বরং যীশুর সাথে ডেটিং করতে যাচ্ছে। কি আজব ধার্মিকতা!
আমাদের দেশেও এমন অনেক আজব ধার্মিক মেয়ে আছে। শরীরে রঙ বেরঙের ডিজাইন ওয়ালা টাইট বোরকা, মুখে কয়েক কেজি ময়দার মাখামাখি, ঠোটে রক্ত লাল লিপস্টিক। পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে গায়ে কড়া পারফিউম আর পায়ে ঝুনঝুন নুপুর। এদের ধার্মিকতা স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্যে না কি পুরুষের সন্তুষ্টির জন্যে তা আজো আমার কাছে এক অভেদ্য রহস্য।
খানিক ভেবে আমি বললাম, “ঠিক আছে মনিকা। তবে তুমি নাস্তাটা সেরে যাও। ”
মনিকা: “দুঃখিত ডার্লিং। আমি তোমায় ঘুমে রেখেই নাস্তা সেরে নিয়েছি। তোমার আরামের ঘুমটা হারাম করতে চাই নি। ”
আমি: “ওহ আচ্ছা। ভালো করেছো। চল তোমায় এগিয়ে দিয়ে আসি। ”
মনিকা: “এগিয়ে দিয়ে আসতে হবে কেনো? আমি কি কচি খুকি? ”
আমি: “না না। তা বলি নি। গাড়িটা নেই তো। তাই তোমাকে প্রধান ফটকটা পার করে একটা ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে আসবো। এখানকার ট্যাক্সিওয়ালারা তো আর ইংলিশ জানে না। পরে দেখা যাবে তুমি গির্জার কথা বলেছো আর ওরা তোমাকে নাইটক্লাবে নিয়ে গেছে।”
মনিকা: “হিহিহিহিহি। চলো তবে। ”
আসলে আমি চাইছিলাম মনিকাকে কুয়োটা পার করে দিয়ে আসতে। সেদিনের মতো যদি কোন সমস্যা হয় তবে ওকে যেনো আমি সাহায্য করতে পারি। মনিকাও রাজি হয়ে গেছে। ভালই হলো।
নাস্তা সেরে কোন সমস্যা ছাড়াই ওকে কটেজের বাহিরে নিয়ে গিয়ে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আসলাম। কিন্তু কটেজের ভেতরে ফের একা একা ঢুকতে সাহস হলো না। মারগারেট তো এটাই চেয়েছিলো। কটেজে আমায় একা পেয়ে অক্ষত রেখে খুন করবে। মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো। ভয়ে আমার জমে যাওয়ার দশা। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো! আরে! কটেজটা তো এখন ফাঁকাই আছে। এই সুযোগে আদিনকে নিয়ে আসলে কেমন হয়! হয়তো ও ভুত তাড়াতে আবারো ব্যার্থ হবে, কিন্তু ওর উপস্থিতিতে আমার ভয়টা কিছুটা হলেও কমবে।
খানিকক্ষণ ইতস্তত করে শেষমেশ আদিনকে ফোন দিলাম,,,,,,
(চলবে)

ডাকিণী ৪১তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
প্রাণপণে কুয়োর কিনারা আকড়ে ধরে ঝুলে রইলাম। ঠিক নিচেই আমার জন্যে মারগারেট অপেক্ষা করছে। কোন ক্রমে যদি হাত ফসকে ভেতরে পড়ে যাই তো নিশ্চিত মৃত্যু। দু হাতের উপর ভর করে দেহকে উপরে টেনে তুলার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ আকড়ে থাকা হাতের আঙুলের উপর প্রচন্ড চাপ অনুভব করলাম। মনে হলো কে যেনো পা দিয়ে মাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি দাঁতে দাঁত চিপে ব্যাথাটা সহ্য করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু চাপের ফলে আঙুলগুলি অসার হয়ে আসতে লাগলো। বুঝলাম মারগারেট আমায় নিচে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে। ঠিক টখনই ওর বই থেকে মুখস্থ করা অশুভ আত্মা তাড়ানোর মন্ত্রটা মনে পড়ে গেলো। বার কয়েক আওড়াতেই হাতের উপর জেকে বসা প্রচন্ড চাপটা সরে গেলো। এই সুযোগে আমি হাচড়ে পাচড়ে উঠে এলাম মৃত্যুর কিনারা থেকে। তারপর আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালাম না ওখানে। সোজা হেটে প্রধান ফটক ধরে বেরিয়ে গেলাম। আমি এই মনস্তাত্ত্বিক খেলায় বারবার হেরে যাচ্ছি। মারগারেট বরাবর ই আমার ক্রোধের সুযোগ নিয়ে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রচন্ড হতাশাজনক লাগছে ব্যাপারটা। কিন্তু ওই কটেজ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে মনটা অনেকটাই ভালো হয়ে গেলো। মুক্ত বাতাসে রাস্তা ধরে হাঠতে হাঠতে এক সময় পৌছে গেলাম কাঙ্খিত ফাস্টফুড দোকানে। ভেতরে ঢুকে দেখি আদিন এক কোনের টেবিল বুক করে বসে আছে আমার অপেক্ষায়। হাসি মুখে এগিয়ে যেয়ে বললাম, “দুঃখিত। আমি অনেকি দেরী করে ফেলেছি।”
আদিনকে এতে মোটেও সন্তুষ্ট মনে হলো না। ও কোন ভুমিকা না করেই বলল, “সাঞ্জে, এবার সব কিছু খুলে বলো তো। ঠিক কি হচ্ছে ওখানে।”
আমি ওকে প্রথম থেকে শুরু করে সবকিছু একে একে বললাম। লাইব্রেরীতে আলেসের ডায়ারী খুজে পাওয়া, তার সুত্ধরে প্রিস্টের কাছে পৌঁছানো, তারপর প্রিস্টকে মেরে মেয়েগুলিকে মুক্ত করা, তারপর মারগারেটের প্রাদুর্ভাব। শুধু বললাম না যে আংটি পরে থাকার জন্যে মারগারেট সব সময় আমার সাথেই ঘুরে বেরায়। কেন জানি মনে হলো এটা বললে ও হয়তো আমার সাথে ফ্রি হয়ে কথা বলতে চাইবে না।
ও সব শুনে বলল “প্রিস্টকে মেরে তুমি এক দুঃসাহসিক কাজ করেছো সাঞ্জে। এমন অসাধারণ কাজের জন্যে আমি তোমাকে সাধুবাদ জানাই। তবে ঐ রাতে সেই মেয়েগুলির আত্মার সাথে প্রিস্টের চেয়েও ভয়াবহ এক পিশাচীকে তুমি মুক্ত করে দিয়েছো। এর জন্যে তোমাকে ভয়াবহ মূল্য দিতে হতে পারে। ও বারবার তোমায় হত্যা করার চেষ্টায় লিপ্ত আর তুমি প্রায় প্রতিবারই ভাগ্য ও বুদ্ধির জোরে বেঁচে যাচ্ছ। কি হবে যদি একবার ভাগ্য মুখ তুলে না তাকায়? কি হবে যদি আগামীকাল তুমি রাগে অন্ধ হয়ে তোমার বুদ্ধির মাথে খেয়ে বসো। আমি আশা করি তুমি ব্যাপারটা বুঝিতে পারছো। আমি বলতে চাইছি, যদি এভাবে চলতে থাকে তো একবার না একবার তুমি ওর শিকারে পরিণত হবেই।”
এক নিঃশ্বাসে এতগুলি কথা বলে এবার ও ঢকঢক করে পানি গিলতে লাগলো। ও আমার প্রকৃত অবস্থাটা বুঝতে পেরেছে।যতই উৎরে যাই না কেনো একবার না একবার মারগারেটের কাছে নতি শিকার করতেই হবে। আমি ব্যাগ্র কন্ঠে বললাম, “আদিন। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার কি আর কোন উপায় নেই? ”
আদিন হতাশ কণ্ঠে বলল, “আমি ঠিক জানি না। তবে জানার চেষ্টা করবো। সেজন্যে আমাকে আবারো তোমার কটেজে বেরাতে নিয়ে যেতে হবে। ”
আমি চিৎকার করে বললাম, “কক্ষনো না। তুমি এমনিতেই একবার আমার কটেজে গিয়ে প্রাণ হারাতে বসেছিলে। আমি আবার তোমার প্রাণের ঝুকি নিতে চাই না। তাছাড়া তোমার ওসব ফাও লোক দেখানোর ট্রিক্স গুলি আলেসের উপরই কাজ করেনি। মারগারেট তো আলেস থেকেও বেশী ভয়ঙ্কর। ও তো তোমায় পরোয়াই করবে না । স্রেফ এক টিপে মেরে ফেলবে। ”
ও মৃদু হেসে বলল, “আমায় মেরে ফেললে ফেলবে। তাতে তোমার কি? আমার জন্যে কোন কালে তোমার হৃদয়ে কোন দরদ ছিলো না কি? ”
আমি: “দেখ আদিন। আমি ঠাট্টা করছি না । কটেজটা ভয়ানক। আমি কিছুতেই তোমাকে সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো না। ”
আদিন: ” তবে কি আমি ঠাট্টা করছি? তুমি না নিয়ে গেলে আমি চুরি করে হলেও ঐ কটেজে ঢুকবো। ”
আমি: “আমি তোকে পুলিশে দেবো শয়তান।”
আদিন: “ইউ ফাকিং বীচ, আই ডোন্ট কেয়ার।”
আমি: “ইউ মাদার ফাকার। কাম এন্ড ফাক ইউর মম্মা।”
এই সব বাজে কথা বলতে বলতে আমি প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে বুঝিতেও পারলাম না কখন আমার আংটি পরা ডান হাতটা টেবিল থেকে একটা কাঁটা চামচ তুলে নিয়েছে! তারপরই অদৃশ্য কোন একজনের নির্দেশে হাতটা আদিনের গলার দিকে সাঁ করে ছুটে গেলো, কাঁটা চামচটা গেঁথে দিতে।
(চলবে)

ডাকিণী ৪০তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
লাইব্রেরীর হাসিটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলো। আমি কি মারগারেটকে কোন জোকস বলেছি না কি? এখানে এতো হাসার কি হলো? আমি ঝুকে বসে বইটা পড়ছিলাম। হঠাৎ বইটার পাতায় এক ফোটা তাজা রক্ত আবিষ্কার করলাম! ব্যাপার কি! বইয়ে রক্ত এলো কোত্থেকে! অনুভব করলাম নাকের পাশ দিয়ে যেনো একটা পিঁপড়া হেটে যাচ্ছে। নাকে হাত দিতেই কেমন ভেজা ভেজা লাগলো। হাতটা সরিয়ে চোখের সামনে ধরতেই হাতে রক্তের ছোপ লেগে থাকতে দেখলাম। আরে! আমার নাক দিয়ে রক্তের ধারা বইতে শুরু করেছে! হঠাৎ খুব অসুস্থবোধ হলো! মনে হলো চারপাশেসবকিছুই যেনো দুলছে! তারপরেই গলা থেকে একদলা রক্ত, বমি হয়ে বেরিয়ে আসলো। বুঝতে পারছিলাম লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। ভেবেছিলাম ডেস্ক থেকে উঠে হেটে বেরিয়ে যাবো। কিন্তু নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতেই মাথা ঘোরে মেঝেতে পড়ে গেলাম! বুঝলাম একই পদ্ধতিতে ও খানিক আগে মনিকাকেও কাবু করেছিলো। এখন আমার পালা। হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে এগুতে লাগলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে কেউ যেনো আমার শরীরের উপর কয়েক মন ওজনের পাথর চাঁপা দিয়েছে! আমার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কিছুতেই লাইব্রেরীর দরজার ধারে কাছেও যেতে পারছি না। হামাগুড়ি দিয়ে দু এক ফুট এগুতেই জ্ঞান হারালাম।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে ড্রয়িংরুমে কাউচের উপর শুয়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। কি আশ্চর্য! আমায় এখানে কে আনলো! আমি তো লাইব্রেরীতে পড়ে ছিলাম। খুব সম্ভবত মনিকা। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে পড়া আংটিটার দিকে নজর গেলো। এর জন্যেই যতো সমস্যা। ইচ্ছা করলো ওটা খুলে ফেলে দেই। কিন্তু এই আংটি খুলে ফেললেই কি আমি মারগারেটের হাত থেকে মুক্তি পাবো? কই? মনিকা তো আংটি পড়েনি! তাই বলে মারগারেট কি ওকে ছেড়ে দিয়েছে? এই আংটি খুলে ফেললে বরং ওর সুবিধাই হবে। আংটি পরা থাকায় ও আমায় এমন ভাবে মারতে চাইছে যেনো কোন আভ্যন্তরীণ ক্ষত না থাকে। আংটি খুললে ম্যারগারেটের জন্যে আভ্যন্তরীণ ক্ষত থাকা বা না থাকা সমান হয়ে যাবে। ও যখন দেখবে যে কোন ভাবেই আমার দেহে প্রবেশ করতে পারছে না তখন ও খুব সম্ভব আমায় মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিবে। আর তখন যে কোন এক ভাবে আমায় মেরে ফেললেই হলো। এসব ভাবতে ভাবতে আমি উঠে বসলাম।
কাউচে উঠে বসতেই মনিকা দু কাপ কফি হাতে রুমে ঢুকে বলল, “এই নাও। কফিটা খেয়ে নাও। ”
আমি ব্যাস্ত কণ্ঠে বললাম, “মনিকা, আমি সত্যিই দুঃখিত। সকালে আমার ওভাবে কথা বলা উচিৎ হয় নি,,,,”
ও আমায় থাামিয়ে দিয়ে বলল, “ওসব কিছু না ডার্লিং। আগে কফিটা খেয়ে নাও। তারপর সব কথা শুনবো।”
আমি: “ধন্যবাদ ডার্লিং। ”
কফি খাওয়ার পর ও আমার সামনে চেয়ার টেনে বসে বলল, “হা। এবার সব কিছু খুলে বলো। ”
আমি তখনো ওকে সব কিছু খুলে বলতে তৈরি ছিলাম না। ও খুব সম্ভব এই সোমবারেই চলে যাবে। আজ ওকে এসব বলে বিব্রত না করলেই ভালো। আমি ব্যাপারটা চেপে যেয়ে বললাম, “দেখ মনিকা। সকালে আমার মা ফোন দিয়েছিলো। আমাকে পরিবার থেকে বিয়ে করার জন্যে প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে তখন আমার মেজাজটা বিগড়ে যায় ও আমি চিৎকার করে উঠি। তারপর তুমি ভুল সময়ে নক করে বস! আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে তোমার দিকে খেঁকিয়ে উঠি। সকালের এহেন ঘটনার জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত! ”
মনিকা: “ওহ আচ্ছা। কিন্তু তুমি লাইব্রেরীর ব্যাপারটা কিভাবে ব্যাখ্যা করবে? ”
আমি: আসলে লাইব্রেরীতে যে কি হচ্ছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি এ ব্যাপারে কিছু জানা মাত্রই তোমাকে জানাবো।”
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না? না কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো? ”
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম, “তোমার কাছ থেকে লুকানোর কি আছে ডার্লিং। তুমি তো ইতিমধ্যেই আমার সব কিছুই দেখে ফেলেছো।”
ও হেসে বলল, “দেখলে কি হবে? এখনো তো অধরাই রয়ে গেলো।”
ওর কথায় আমরা দুজনই হেসে উঠলাম। তখনই বেডরুম থেকে আমার ফোনটা বেজে উঠলো।
আদিন ফোন করেছে। ধরবো কি ধরবো না খানিক ইতস্তত করে অবশেষে ফোনটা রিসিভ করলাম।
আমি: “হ্যালো আদিন! কেমন আছো? ”
আদিন: “যেমন থাকার কথা। কিন্তু তুমি কেমন? ”
আমি: “ভালো না। সমস্যাগুলি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে ।”
আদিন: “আজ তো উইকএন্ড। ডিনারে চলে আসো ম্যাকডোনাল্ডে। ”
আমি: “বাসায় মেহমান ছিলো যে! ওকে সাথে নিয়ে আসবো? ”
আদিন: “ওকে কি সমস্যার ব্যাপারে সব খুলে বলেছো? ”
আমি: “না। ও দুদিনের জন্যে এসেছে। কি দরকার ওকে এসবে জড়ানোর। ”
আদিন: “তাহলে ওকে সাথে আনার দরকার নেই। তুমি একাই চলে আসো। আমি অপেক্ষা করছি।”
ও আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলো। আমি ভেবেছিলাম মনিকার সাথে ডিনার করে সকালের মনোমালিন্যের ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলবো। কিন্তু আদিন বাধঁ সাধলো! মনিকা দুদিন পরেই চলে যাবে। আজ যদি ওর সাথে ডিনার না করি তো ব্যাপারটা খুবই অসৌজন্যমূলক দেখায়। কিন্তু পাগলা আদিনটা যে কি? কিচ্ছু বুঝতে চাইলো না। সৌজন্যতার খাতিরেই মনিকাকে আবারো মিথ্য বলতে হবে দেখছি।
আমি: “এই মনিকা। একটু আগে আমার একটা ফোন এসেছিলো। আমার এক ক্লোজ ফ্রেন্ড আক্সিডেন্ট করেছে। আমার ওকে দেখতে যেতে হবে। আমি সত্যিই দুঃখিত।”
মনিকা: “ওহ গড! ওকে আমার পক্ষ থেকে সমবেদনা জানাতে ভুলবে না কিন্তু।”
আমি: “হা জানাবো। তবে আমার ফিরতে দেরী হবে। সম্ভবত তোমাকে আজ একাই ডিনার করতে হবে। আমি এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থী। ফ্রিজে সব কিছু আছে। যা পছন্দ হয় খেয়ে নিও। আরেকটা কথা, আমি ফিরে আসার আগে পর্যন্ত দয়া করে ঐ লাইব্রেরীর ধারে কাছেও যেও না।”
মনিকা: “এসব নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি ভালই থাকবো।”
আমি: “নিজের প্রতি খেয়াল রেখো।”
মনিকার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বেডরুমে এসে কাপড় বদলে বেরিয়ে পড়লাম। হেটেই যেতে হবে। গাড়িটাকে খুব মিস করছি। আমি আমার গাড়ির দুর্ঘটনা নিয়ে জুয়া খেলতে চাই নি। তাই আমার গাড়ির কোন বীমাপত্র করাই নি। এই গাড়িটা আমার গচ্চা গেলো।
এসব ভাবতে ভাবতে কুয়োর পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। গাড়িটা খুয়ানোর জন্যে মারগারেটের উপর প্রচন্ড রাগ হলো। রাগে আচ্ছন্ন হয়ে অবচেতন মনে ফের ভাবতে শুরু করলাম, কুয়োয় আরেকটি বার নামা উচিৎ। একটা শক্ত দেখে দড়ি নিয়ে গাড়ির বনেটে বেধে রেখে আসবো। তারপর একটা ক্রেন এনে ওটাকে টেনে তুলবো। মারগারেট। তোমাকে দেখিয়ে দেবো আমার গাড়িটাকে আমি কতটা ভালবাসি।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কুয়োর কাছে চলে গেছি খেয়াল ছিলো না। যখন হুঁশ হলো তখন নিজেকে সেই মৃত্যুগুহার মুখের সামনে ঝুকে দাড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। আবারো মারগারেট আমার ক্রোধ কে ব্যবহার করে আমাকে তার শিকার ক্ষেত্রের খুব কাছে টেনে এনেছে। উপলব্ধি করলাম আমাকে দ্রুত এখান থেকে সরে আসতে হবে। কিন্তু কুয়ো থেকে পেছনে ফিরতেই পা পিছলে কুয়োর দিকে হেলে পড়লাম! কুয়োর নিচ থেকে আবারো সেই শয়তানী হাসিটা শোনা গেলো।
(চলবে)

ডাকিণী ৩৯তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আলেসের অশরীরীর যেমন সর্বউচ্চ প্রভাবযুক্ত স্থান ছিলো বেসমেন্টের বন্দিশালা, তেমনি মারগারেটের অশরীরীর উচ্চ প্রভাবযুক্ত স্থান হলো কুয়োর ভেতর আর তার চারপাশে। শুক্রবার সকালে আমি আর মনিকা অফিসে যাওয়ার পথে কুয়োর কাছাকাছি হতেই মারগারেট মনিকার উপর বান মারে। ও হয়তো চাইছিলো মনিকাকে চিরতরে শেষ করে দিতে। কিন্তু আমি মনিকাকে নিয়ে ওর প্রভাবযুক্ত অঞ্চল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসায় ও সেদিন বেঁচে যায়। তবে ওর সামান্য রক্তবমি হয়। এ ঘটনার পর মারগারেট আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ও মনিকার উপস্থিতিতেই আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
শুক্রবার অফিস থেকে ফিরে আবার যখন বিদ্যুতের কার্ড আনতে যাচ্ছিলাম, মার্গারেট তার প্রথম পদক্ষেপ উঠায়। ও গাড়িটাকে কুয়োয় ফেলে আমাকে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছিলো। বুদ্ধিটা ভালই ছিলো। সীটবেল্ট বাধা থাকায় কুয়োর দেয়ালে গাড়ির ধাক্কায় আমার আভ্যন্তরীণ আঘাতের সম্ভাবনা সর্বনিম্ন ছিলো। আর ডুবে মরলে আমার আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অক্ষতই থাকতো। তারপর সকালে যে যাদুর সাহায্যে ও মনিকাকে বমি করিয়েছিলো সেই একই পদ্ধতিতে আমায় বমি করিয়ে নিলেই দেহটা ওর ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠতো। কিন্তু আমি পড়ন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসলে ওর এত সুন্দর পরিকল্পনাটা ভেস্তে যায়।
তারপর আমি টাবে গোসল করতে ঢুকলে ও আবারো আমাকে খুন করার চেষ্টা করে। ও প্রথমে আয়না ভাঙ্গার শব্দ শুনিয়ে আমার মনযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। তারপর টাবে ফেলে খুন করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু আমি উপস্থিত বুদ্ধি আর দৈহিক শক্তি বলে ট্যাব ফাটিয়ে সেখান থেকে জান্ত বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই।
কটেজের ভেতর খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে মারগারেট আমায় ওর সর্বউচ্চ প্রভাব যুক্ত অঞ্চল তথা কুয়োয় নিয়ে চুবিয়ে মারতে সচেষ্ট হয়। সেরাতে মনিকার খুঁজে আমি যখন কটেজের বাহিরে এসেছিলাম মারগারেট তখন আমার সামনে মনিকার কুয়োয় ঝাপ দেওয়ার মিথ্যা নাটক উপস্থাপন করে। আমিও বোকার মতো কুয়োর কাছে দৌড়ে যাই মনিকাকে বাচাতে। কিন্তু বলাবাহুল্য ওটা মনিকা ছিলো না। মনিকা তখন বাথরুমে ছিলো। মনিকা জানতোও না যে আমি ওকে খুজছি। সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে পর্ণ দেখতে বসে যায়, যখন আমি ওর চিন্তায় উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিলাম। মারগারেট এই সুযোগটা নিতে চাইছিলো। ও আমায় বারবার কুয়োয় ঝাঁপানোর অনুরুধ জানাতে থাকে। কিন্তু ভাষাগত সমস্যার কারণে আমার মনে খটকা লাগে। সুইডিশ মেয়ে মনিকা কখনোই মারগারেটের মতো এতো ভালো পোলিশ বলতে পারতো না। অপরদিকে মারগারেটও মনিকার মতো ইংলিশ বলতে পারতো না। তাই মারগারেট বাধ্য হয়েই তখন আমাকে পোলিশ ভাষায় ডাকছিলো। ওর আশা ছিলো আমি হয়তো ওর ফাঁদে পা দিয়ে বোকার মতো কুয়োয় ঝাপ দিবো। আমি ভাষাগত সমস্যাটা উপেক্ষা করলেও পাগলের মতো কুয়োয় ঝাঁপ দেওয়া থেকে আমি বিরত থাকি। এর পরিবর্তে কটেজে ফিরে আসি দড়ি আর টর্চ আনতে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে মনিকাকে কটেজের ভেতরই পেয়ে যাই। ফলে সেদিন আর কুয়োয় ঢুকা হয় নি।
তারপর সেরাতে আমি ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘুমাতে চলে যাই। আমি ঘুমিয়ে পড়লে মারগারেট আবারো আমার উপর প্রভাব বিস্তার করে। স্বপ্নে আমায় কুয়োয় যেতে ঈঙ্গিত করে। আমিও বোকার মতো ভেবে বসি কুয়োটাই হলো সব রহস্যের মূল চাবিকাঠি। তারপর ঘুম ভাঙলে ও আবারো আমায় খুন করার চেষ্টা করে। তবে এবার গলায় হেডফোনের তার পেঁচিয়ে। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধির জোরে আমি তখন মরতে মরতে বেঁচে যাই। চুলের কাঁটার উপযুক্ত ব্যবহার আমায় সে রাতে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়।
এভাবে সুবিধা করতে না পেরে মারগারেট আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। আজ সকালে উঠেই আমি বাথরুমে যেতে চাইনি। গতরাতে টাবে চুবানি খাওয়ার পর ওখানে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিলো না। সাতসকালে আম্মুর সাথে বিয়ে নিয়ে কথা বলতে বলতে আমার মাথা বিগড়ে গিয়েছিলো। রাগের চোটে কোন কিছু না ভেবেই আমি বাথরুমে ঢুকে পড়ি। মারগারেট একটা সাংঘাতিক আবিষ্কার করে বসে। ও বুঝে যায় রাগলে আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তাই রাগলে ও সহজেই আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ওর সামান্য একটা ইশারাতেই আমি অতি সহজে প্রাণ দিয়ে দেবো।
তারপর ও আয়নার প্রতিবিম্বে আমার কপালে ক্ষত চিহ্নটা দেখিয়ে আমাকে আরো রাগিয়ে তুলে। রাগে আমি চিৎকার করে উঠি ও আয়নাটা ভেঙে ফেলি। এ পদ্ধতিতে ও প্রথম প্রচেষ্টায়ই সাফল্য পেয়ে যায়। বাথরুমে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনে মনিকা ব্যাপারটা দেখতে আসে। কিন্তু রাগে অন্ধ আমি, ওর সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করি। খানিক পরে ওকে কাঁদতে দেখে আমার মধ্যে প্রচন্ড অনুশোচনাবোধ জেগে উঠে। কিন্ত এই অনুশোচনা আমায় শান্ত করার বদলে আমার রাগটাকে আরো উষ্কে দেয়। তারপর মারগারেট আমার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাকে ওর কুয়োতে নিয়ে যায়। সেই মৃত্যুগুহাতে। সেখানে ও আবারো আমাকে চুবিয়ে মারার চেষ্টা করে। কিন্তু আবারো আমি উপস্থিত বুদ্ধির জোরে, গাড়ির ট্রাশ বেলুনকে অবলম্বন করে আমি ভেসে উঠি। তারপর অনেক কষ্টে কুয়োর দেয়াল খুঁড়ে খুঁড়ে খাজ বানিয়ে তা বেয়ে বেরিয়ে আসি। অনেকক্ষণ কুয়োর ঠান্ডা পানিতে থাকার ফলে আমার হাইপো থারমিয়া ও কনকাশন হয়। কিন্তু হাইপোথারমিয়া হলে এক্সাইটেটরী নিউরোট্রান্সমিটার যেমন আসেটাইল কোলিন, এপিনেপ্রিন ইত্যাদি কাজ করা কমিয়ে দেয়। ফলে সহজে রাগ উঠে না। রাগ না উঠলে ও আমাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে না। তাই মারগারেট আমার হাইপোথারমিয়াকে যাদুবলে মনিকার দেহে স্থানান্তরিত করে। তাই কটেজে ফিরে মনিকাকে আমি ঠান্ডা দেহে লাইব্রেরীতে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর মাথা খানিকটা ঠান্ডা হলে আমি লাইব্রেরীর রহস্যটা ধরতে পারি ও বইটা পড়তে আগ্রহী হই। কিন্তু মারগারেট আমায় বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ও লাইব্রেরীর দরজা আটকে দেয়। কিন্তু আমার হাতুড়ির ঘা এর সামনে দরজাটা দাড়াতেই পারে না। এক বাড়িতেই শেষ। কে মেরেছে দেখতে হবে না! সাঞ্জে যে হলো হাতুড়ি মাস্টার থরের আম্মা।
তারপর বইটা পড়ে সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এখন লাইব্রেরীতে বসে বসে দুটো প্রতিজ্ঞা করলাম।
১, সবর্দা রাগ দমন করে রাখবো। কিছুতেই ওই ডাইনীকে আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেবো না।
২, সব সময় ছুরিটা সাথে রাখবো। কোন ভাবে যদি মারগারেট আমাকে অনিবার্য মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয় তো এক টানে নিজের গলাটা কেটে দেবো। প্রয়োজন হলে আমি আত্মহত্যা করবো তবুও আমার দেহে অন্য কাউকে ঢুকতে দেবো না।
লাইব্রেরীর চার দেয়ালের ভেতর থেকে আবারো খিলখিল হাসি শুরু হলো। মনে মনে বললাম হাসো মারগারেট, হাসো। তোমার সকল ষড়যন্ত্র আমার কাছে উন্মোচিত হয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই তোমাকে এখান থেকে বিদায় করার একটা না একটা উপায় বের করেই ফেলবো। তোমাকে প্রিস্টের কাছে ফেরৎ পাঠিয়ে শেষ হাসিটা কিন্তু আমিই হাসবো।
(চলবে)

ডাকিণী ৩৮তম পর্ব

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আংটির বাধন থেকে মুক্ত হয়ে অন্য মেয়েগুলির আত্মা যখন পরপারে পাড়ি দেয় তখন মারগারেট সবার পেছনে পড়ে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই। পুনরায় জীবন্ত জগতে ফিরে আসা। তবে ও প্রিস্টের মতো পুনরুত্থানের জন্য নিজ দেহকে মমি করে রাখে নি। রাখার সুযোগটাও ছিলো। ওর দেহটা তার অজান্তেই কুয়োর নীচে পচে গিয়েছিলো। কুয়োর সেই পঁচা দুর্গন্ধের কথা মনে পড়তেই গা গুলিয়ে উঠলো। নিজের দেহে ফেরার সুযোগটা হারিয়েও ভেঙ্গে পড়েনি। জীবদ্দশায় ও একজন উচ্চমানের ডাইনী ছিলো। মরে গিয়েও ওর সে ক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমেনি। ও সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্য কারো দেহে ফিরে আসতে চাইছিলো। আমার দেহে। ওর আংটিটা পড়ে থাকার কারণে ও আমার পিছু পিছু চলতে থাকে, একটা অদৃশ্য ছায়ার মতো।
বইটাতে আংটির সাহায্যে আটকে পড়া আত্মার পুনরুত্থানের জন্য কতগুলি শর্ত দেওয়া আছে। মারগারেট শুরু থেকেই এসব শর্ত মেনে আসছিলো।
প্রথম শর্ত হলো একটা মৃতদেহ যাতে কোন বাহ্যিক বা আভ্যন্তরিণ ক্ষত থাকবে না।
২য় শর্ত, যে আংটি পরিহিত অবস্থায় আত্মাটা মারা গিয়েছিলো সেই আংটিটা মৃতদেহের হাতে পরানো থাকবে।
এতোক্ষণ আমি শুধু মারগারেটের পরিচয় জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু ওর উদ্ভট আচরণের কারণ আমার কাছে অজানাই থেকে গিয়েছিলো। কিন্তু এই শর্ত দুটো ওর আচরণের রহস্য আমার কাছে উন্মুক্ত করে দিলো।
ঊভয় শর্তানুযায়ী আমিই হলাম ওর উপযুক্ত টার্গেট। আমার একটা নিরোগ দেহ আছে, একই সাথে আংটিটাও মধ্যমায় পরানো রয়েছে। তাই ও আমাকেই বাছাই করেছিলো। ও আমার দেহে ফিরে আসতে চাইছে।
সেই কবরস্থান থেকেই মারগারেট আমাকে অনুসরণ করছিলো। প্রথম দিকে ও আমায় সাহায্য করেছিলো কেবল প্রথম শর্ত পুরণের জন্যেই। সেদিন গির্জা থেকে ফিরার পথে ওরই ইঙ্গিতে ইগনিশন ছাড়াই গাড়িটা স্টার্ট নিয়েছিলো। গাড়িটা তখন স্টার্ট না নিলে আমি হয়তো সেই ছুরি বাগিয়ে ধরা টিনএজ মোটরসাইকেল আরোহীর হাতে ধরা পড়তাম। এতে আমার ছুরিকাহত হওয়া সহ ভয়ানক আভ্যন্তরীণ আঘাতের সম্ভাবনা ছিলো যা আমার দেহকে মারগারেটের প্রত্যাবর্তণের অনুপযোগী করে তুলতো। তারপর আমি ড্রাইভ করতে করতে ঘুমিয়ে গেলে ও নিজে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমায় কটেজে পৌছে দেয়। এতে আমার দেহটা দুর্ঘটনাজনিত আঘাত থেকে রক্ষা পায় ও তার ব্যবহার উপযোগী থাকে। এজন্যেই আমি ওকে গাড়ির ড্যাশবোর্ড মিররে দেখতে পাচ্ছিলাম।
কিন্তু কটেজে ফিরে ও আমায় মেরে ফেলতে চাইছিলো। এমন পদ্ধতিতে যাতে আমার দেহে আঘাতের পরিমান সর্বনিম্ন হয়। কিন্তু সেদিন সকালে মনিকা এসে তার সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দেয়। মনিকার আগমনে মারগারেট খানিকের জন্যে তার প্লান স্থগিত রাখে। ও আমাকে কটেজে একা রেখে মারতে চাইছিলো। কিন্তু মনিকা তার প্রধান বাধা হয়ে উঠে। ও আমায় মারতে চেষ্টা করলে মনিকা হয়তো আমার জন্যে সম্ভাব্য সাহায্য নিয়ে আসতে পারে, এ ধারণা থেকেই ও মনিকাকে ভয় দেখানো শুরু করে। যেনো মনিকা কটেজ ছেড়ে চলে যাও। প্রথম দিন ওকে লাইব্রেরীতে আটকে ফেলাটা একটা সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিলো। কিন্তু আমি মনিকাকে লাইব্রেরীর দরজা সম্পর্কে মিথ্যা বলে আশ্বস্ত করায় ও থেকে যায়। এভাবেই মনিকা এই বিপদে জড়িয়ে পড়ে।
তবে একটা ব্যাপার আমার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। এ ঘটনার পর মনিকা সেদিন অফিসে না যেয়ে কটেজে একা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমিও ওকে ফেলে কটেজে একা ফেলে রেখে অফিসে চলে যাই। স্বভাবতই মারগারেট ও চলে আসে আমার সাথে। কিন্তু আমি অফিসে থাকতেই মিনকা আমায় ফোন দিয়ে দ্রুত ফিরতে অনুরুধ করেছিলো। কটেজে নাকি খুব সমস্যা হচ্ছে। মারগারেট আমার সাথে সাথেই চলছিলো। আমি অফিসে হলে সে ও অফিসেই থাকার কথা। অন্যদিকে আলেসও আংটি থেকে মুক্ত হয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। তবে আমার ও মারগারেটের অবর্তমানে কে সেদিন কটেজে সমস্যা করছিলো? কে মনিকাকে ভয় দেখিয়েছিলো? তবে কি কটেজে তৃতীয় কোন এক অশরীরীর আবির্ভাব হয়েছিলো? কিন্তু কে এই তৃতীয় জন?
যাহোক। সে হিসাব পরে মিলানো যাবে। তারপর স্টার আমাকে অফিস থেকে গ্রেফতার করে তাদের সেইফ হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন স্টার আমাকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখিয়েছিলো। মারগারেট ওটাকে সত্যি ভেবে নেয়। ও ভেবেছিলো ওরা সাক্ষ না দিলে ওরা হয়তো আমায় সত্যি সত্যিই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে। এতে আমার ঘাড় ভেঙ্গে যেয়ে দেহটা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। তাই ইন্টারোগেশন রুমে আমি ঘুমিয়ে পড়লে সে আমার আংটি পরা হাতে নিজের প্রভাব বিস্তার করে, আমার অজান্তেই সাক্ষ্য লিখে দেয়। বুধবার সন্ধায় গির্জার ছাদে আমি ঘুমিয়ে পড়লেও মারগারেট তো আর ঘুমায় নি। প্রিস্টের কবরের মধ্য থেকে সে গির্জার পাশের বিল্ডিং এ ঢুকা আততায়ীকে দেখতে পেয়েছিলো। ও সেই ঘটনার সরল সাক্ষ্য স্টারদের লিখে দেয়। ফলে স্টাররা সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে ছেড়ে দেয় ও আমি কটেজে ফিরে আসি। মারগারেটও আমার সাথেই ফিরে আসে। ইতিমধ্যেই মনিকা হয়তো কৌতুহল বশত লাইব্রেরীতে ফের ঢুকে পড়ে। সেখানে কাকতালীয়ভাবে সে মারগারেটের বইটা খুজে পায় ও পড়তে শুরু করে। কটেজে ফিরতেই মারগারেট ব্যাপারটা টের পেয়ে যায়। বইটা তার দুরভিসন্ধিকে মনিকার কাছে উন্মোচন করে দিতে পারে ভেবে মারগারেট ওকে বইটা পড়তে দিতে চায় নি। আমি যখন কটেজের বিভিন্ন কক্ষে মনিকার খোজে তল্লাসি চালাচ্ছিলাম ও তখন লাইব্রেরীতে মনিকা কে ভয় দেখায়। ভয় পেয়ে মনিকা অজ্ঞান হয়ে যায় ও তার জ্বর চলে আসে। কিন্তু তারপরেও মনিকা কটেজ ছেড়ে চলে যাচ্ছে না দেখে মারগারেট বাধ্য হয়েই ওর ক্ষতি করার সিদ্ধান্ত নেয়।,,,
(চলবে)

ডাকিণী ৩৭তম পর্বঃ খ অংশ

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি সম্ভবত জেনে ফেলেছি কিভাবে ওকে কিভাবে হত্যা করা হয়। আমি গতরাতে আমার বেডরুমের ঝাড়বাতিটার সাথে ওকে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলতে দেখেছি। বেসমেন্টে সেরাতে আলেস আমাকে স্বপ্নে পুরো ব্যাপারটা দেখিয়েছিলো। আমার বেডরুমের ঠিক মাঝখানে আজকের ঝাড়বাতিটার স্থলে সেদিন একটা লোহার আংটা টানানো ছিলো। ছাদে ফাঁসিতে ঝুলানোর পর কুয়ো আর লাইব্রেরীতে শুদ্ধিকরণ শেষে আলেসের দেহটা সেই আংটা উল্টো খানিকক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা হয়। কিন্তু মারগারেটের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। আলেসের মতো ম্যারগারেটের বিচার জনসম্মুখে করা হয়নি। খুব সম্ভবত মারগারেট গীর্জার একজন সেবিকা ছিলো। গীর্জার সেবিকাকে যদি জনসম্মুখে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার জন্যে জনসম্মুখে বিচার করা হতো তবে তা গির্জার মান সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতো। তাই বিচারের বদলে প্রিস্ট ওকে চার দেয়ালের ভেতরে সেই আংটার সাথেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। কিন্তু বুদ্ধিমতী মারগারেট ব্যাপারটা অনুমান করতে পেরে তার আগেই কপালে আংটির ছ্যাকা দিয়ে রাখে। ওর বিশ্বাস ছিলো আটকে থাকা আত্মাটাকে হয়তো কোন একদিন অন্য কারো দেহে ঢুকাতে পারবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। ওর প্রিস্ট ওর আংটিটা ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, সে ওটাকে তার পারলৌকিক যৌনদাসী সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার শুরু করে। আর ওর লাশটা কুয়োতে ফেলে দেয়। তাইতো বদ্ধ কুয়োর জলের উপর ওর এত নিয়ন্ত্রণ।
প্রিস্ট প্রথমে অসহায় মেয়েগুলির জীবদ্দশায় কপালে সেই আংটি দিয়ে ছ্যাকা দিতো। তারপর তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে ফেলতো। অবশেষে কতগুলি বশীকরণ মন্ত্র পড়তে পড়তে তাদের মৃতদেহের সাথে মিলিত হতো। এভাবেই সে সারাটি জীবন ধরে অশরীরী যৌনদাসী সংগ্রহ করে গেছে। বার্ধক্যে মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে এসে প্রিস্ট নিজ দেহটাকে মমি করে রাখার জন্যে তার অনুসারীদের অসিয়ত করে যায়। কারণ সেও মারগারেটের মতোই প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে প্রচন্ড আশাবাদী ছিলো। প্রিস্টের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তার কথা মতো তার দেহটাকে পাইনের আঠায় চুবিয়ে মমি বানিয়ে রাখে। কিন্তু ওরা মিশরীয় মমির মতো দেহের আভ্যন্তরিণ নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেয় নি। প্রকৃতপক্ষে এটা কোন সাধারণ মমি ছিলো না। ওটা একটা আস্ত মমি ছিলো। অন্য মমি গুলির মতো এর আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া হয়নি। ব্যাপারটা আমার সেদিনই বুঝা উচিৎ ছিলো। আমি যখন ওর খোলা মুখে প্রস্রাব করি তখন তার সবটুকুই ওর খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থালীতে গিয়ে পৌছে। কিন্তু মিশরীয় মমির মতো যদি প্রিস্টের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বের করে নিয়ে গলাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হতো তবে সবটুকু প্রস্রাবই মুখ ভরে গড়িয়ে পড়তো। ওরা আস্ত দেহ মমিকরণের এক অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিলো যা ফারাওদের থেকেও আরো উন্নততর। তারপর প্রিস্ট সেই মমিদেহে ফিরে আসার প্রচেষ্টা চালায়। ও সম্ভবত সফল ও হয়। কিন্তু এতে ওর অনুসারীরা প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। ভয়ার্ত অনুসারীরা তাকে ধরে লোহার কফিনে বন্দি করে, তাতে তালা লাগিয়ে আংটি সহই কবরে দাফন করে দেয়। ফলে অন্য মেয়েগুলির আত্মার মতোই মারগারেটও আংটিটার সাথে কফিনে আটকা পড়ে। বদ্ধ কফিনে প্রিস্ট আবারো দম আটকে মারা যায়। কিন্তু মৃত্যুর সময় আংটি পরা থাকায় ওর আত্মাটা পরপারে যাওয়া থেকে রেহাই পায়। তার বদলে ওটা কফিনে আটকে পড়ে অন্য মেয়ে গুলির আত্মার উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সহস্র বছর পর আমি যখন সেই কফিনটা খুলে ফেলি তখন বাতাসের সংস্পর্শে প্রিস্টের দেহটা পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠে। প্রিস্টের আত্মাটা আংটিটাকে অবলম্বন করে আবার ওর দেহে প্রবেশ করে। দেহ ফিরে পেতেই ওর আদিম ক্ষুদাটা উথলে উঠে। ও আমার দিকে হাত বাড়ায়। ও আমায় ভোগ করতে চেয়েছিলো। তবে জীবন্ত নয়, মৃত। জীবনে অসংখ্য মৃতদেহকে ভোগ করতে করতে মৃতদেহ ভোগ করা ওর কাছে একটা নেশা হয়ে উঠেছিলো। সে জীবন্ত নারীদের চেয়ে মৃত নারীকেই ভোগ করে বেশী তৃপ্ত হতো। কারণ মৃতদেহ লাগামহীন ভোগে বাধা দেয় না। তাই সেরাতে কফিনের ভেতর সে প্রথমেই আমায় ভোগের বদলে মারতে উদ্ধত হয়। মৃতদেহের প্রতি এই বিকৃত আসক্তিটা কিছু মানুষের মধ্যে আগেও ছিলো, এখনো আছে। মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে নেক্রোফিলিয়া বলে। অত্যাধুনিক মেডিক্যালগুলির অন্ধকার মর্গের ভেতর ধোপাদুরস্তর পোশাকধারী সাড়ে তিন হাত লম্বা ডিগ্রীওয়ালা অনেক ডাক্তারকেই পাওয়া যাবে যারা শুধু যৌনবিনোদনের জন্যেই মর্গে রাত কাটায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুসারে প্রতি ১২ জন মর্টিশিয়ান ও ফরেন্সিক ডাক্তারের মধ্যে অন্তত একজন নেক্রোফিলিয়ায় আক্রান্ত। যুগ বদলেছে, নতুন প্রযুক্তির পৃথিবী উদ্ভাসিত হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মনের কালিমা এখনো কমেনি। আজো একটু ভালো করে খুঁজলেই আমাদের বর্তমান সমাজে প্রিস্টের মতো আরো অনেক নিকৃষ্ট মানসিকতার লোককেই পাওয়া যাবে। সমাজে এদের সংখ্যাই বেশী। ভালো মানুষের সংখ্যাই বরং এখন হাতে গোনা। এই মুষ্ঠিমেয় ভালোরা নিঃস্বার্থভাবে একাগ্রচিত্তে অসংখ্য খারাপের সাথে লড়ে যাচ্ছে বলেই মানব সমাজ এখনো টিকে আছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম ভালো আর খারাপের এ অসম লড়াইয়ে সাঞ্জে সর্বদাই ভালোদের পক্ষে থাকবে। ভালোর পক্ষে থাকবো, সর্বস্ব দিয়ে হলেও ভালো কাজে সাহায্য করে যাবো। ঠিক যেমন সে রাতে মার্টিনী আমায় সাহায্য করেছিলো। ও ঈঙ্গিতে আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিলো ঠিক কি করতে হবে। তারপর আর যায় কোথা? দিলাম প্রিস্টকে ঘেচাং করে। প্রিস্টের হাত থেকে আংটিটা কেটে পড়তেই মেয়েগুলির আত্মা মুক্ত হয়ে যায়। তারপর মুক্ত আত্মাগুলি একসাথে পরপারে পাড়ি জমায়। কিন্তু একজন থেকে যায়। আংটির মায়ায় ও ছুটতে থাকে আমার পেছন পেছন। মারগারেট। এই বিষ্ময়কর আংটির নির্মাতা।
(চলবে)

ডাকিণী ৩৭তম পর্বঃ ক অংশ

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
প্রথম অধ্যায় নরবলিদান ও আত্মহনন এ ঈশ্বরের জন্যে আত্ম উৎসর্গ, ও বলিদান প্রথার বিশদ বর্ণনা দেওয়া আছে। অধ্যায়ের এক জায়গায় নিজ শিশু বলিদানকে সবচেয়ে মহিমান্বিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘৃণায় মুখ বাঁকালাম। এই নরবলি প্রায় সব ধর্মেই রয়েছে। মায়া সভ্যতায় সনাতন ধর্মে সূর্যগ্রহণের দিন সূর্যদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নরবলি দেওয়া হতো। প্রাচীন রেড ইন্ডিয়ানরা আমেরিকায় বহিরাগত নাবিকদের বলি দিয়ে তাদের মাংস খেত এই ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্যেই। এখনো আধুনিক ভারতে প্রায় প্রতি বছরই কতিপয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী তাদের কন্যা সন্তানকে ঈশ্বরের নামে বলিদান করেন আরেকটা পুত্র সন্তানের আশায়। খৃষ্ট ধর্মের কথা আর নাই বললাম। খৃষ্ট ধর্মের জন্মই হয়েছে ক্রুশে ঝুলিয়ে বলিদানের মাধ্যমে। তাই এ ধর্মের বলিদানের কথা কখনোই বলে শেষ করা যাবে না। প্রাচীন রোমে বড়দিনে যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে মহিমান্বিত করতে হাজার হাজার হাবশী দাসকে ক্রুশে ঝুলিয়ে বলি দেওয়া হতো।
উপলব্ধি করলাম ঈশ্বরের এই একনিষ্ঠ পূজারীরাই ঈশ্বরকে নরখাদক ও শিশুঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর চেয়ে তো নাস্তিকতাই ভালো। নাস্তিকরা ঈশ্বরকে বিশ্বাসই করে না তাই তাদের দ্বারা ঈশ্বরের অপমানিত হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাদের মতে যার অস্তিত্বই নেই তাকে কিভাবে অপমান করবে? ঈশ্বরের অপমান করে অতি ধার্মিকেরাই, নানাবিধ উৎকট ধর্মীয় আচার ব্যবস্থার মাধ্যমে।
দ্বিতীয় অধ্যায় আত্মাবাদ আত্মাবশীকরণ এ পৃথিবীর প্রাণী, মানুষ গাছপালার আত্মার একটা জামিতিক হিসাব দেওয়া আছে। এখানে বলা হয়েছে যদি জীব জন্তু ও মানুষের মোট জীবন্ত আত্মার পরিমান, গাছপালার মোট জীবন্ত আত্মার পরিমানের চেয়ে বেশী হয়ে যায় তবে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এই উক্তিটি অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য মনে হলো। যদিও আত্মিক দিক থেকে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তবুও লেখিকা সেই অন্ধকার আচ্ছন্ন মধ্যযুগেই গাছপালার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার এ উপলব্ধি নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবিদার। তাছাড়া এই অধ্যায়ে অশুভ আত্মার ক্ষতি থেকে বাঁচতে কতগুলি মন্ত্র দেওয়া হয়েছে। ছোট দেখে একটা মন্ত্র আমি মুখস্থ করে নিলাম। বলা তো যায় না। কাজে লাগলেও লাগতে পারে।
তৃতীয় অধ্যায় মৃত্যুপুরী ও প্রত্যাবর্তন এ মৃত্যুর পর প্রাকৃতিক নিয়মে আত্মার পরপারে যাত্রা প্রতিহত করার ৭ টি পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো আমার মধ্যমায় পরা আংটি টা। এই অধ্যায়টা পড়ে এই আংটিটার রহস্য আমার কাছে সম্পূর্ণরূপে উদঘাটিত হলো।
আমি এতো দিন প্রিস্টকেই আংটির মালিক ভেবে ভুল করে এসেছিলাম। কিন্তু আমার আরো আগে বুঝা ঊচিৎ ছিলো যে ওই মাথামোটা সেক্স পাগল প্রিস্টের পক্ষে এমন চমৎকারি আংটি বানানো অসম্ভব। এই আংটিটা বানিয়েছিলো এই বুদ্ধিমতি মহিলাটাই। এই আংটিটা প্রিস্টের যৌনদাসী সংগ্রহের জন্যে বানানো হয়নি। ম্যারগারেট নিজের আত্মাকে সংরক্ষণ করতেই এই আংটিটা বানিয়েছিলো। প্রিস্ট হয়তো পরে কোনভাবে ওটা দখল করে নেয়।
আংটিটা মধ্যমা থেকে খুলে চোখের সামনে ধরলাম। আংটির মাঝখানের ঐ উজ্জ্বল লাল পাথরটা দিনের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠলো! কি অসাধারণ এই আংটির ক্ষমতা। কিন্তু আমার মধ্যমায় আংটির সাদা দাগ পড়ে গেছে। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগলো না। আমার হাতে কেবল আমার বাগদত্তার আংটির দাগ থাকবে, অন্য কারো নয়। মারগারেটের আংটিটা তাই মধ্যমার বদলে কনিষ্ঠায় পড়তে গেলাম। কি আশ্চর্য! ওটা কনিষ্ঠায়ও একদম মাপ মতো আটোসাটো হয়ে বসলো। কিন্তু যে আংটিটা মধ্যমায় আটো সাটো হয়ে বসে সেটার তো কনিষ্ঠায় ঢিলা হওয়ার কথা! কনিষ্ঠা থেকে আংটিটা খুলে এবার বুড়ো আঙুলে পড়লাম। এবারো মাপে মাপে বসলো, একটু টাইট ও না আবার একটু ঢিলাও না। হঠাৎ মনে পড়লো বেসমেন্টের বন্দিশালায় আলেসের দেখানো সেই স্বপ্নের কথা। সেরাতে আমি আলেসের স্থলে ফাঁসিতে ঝুলে মারা গিয়েছিলাম। আমার দেহটাকে কুয়োয় চুবিয়ে লাইব্রেরীতে শুদ্ধ করে প্রিস্টের ভোগের জন্যে এনে দেওয়া হয়েছিলো। আমার অশরীরীর সামনেই ও আমার দেহকে ভোগ করতে শুরু করেছিলো। স্পষ্ট মনে আছে ওর বিশাল দেহের নীচে আমার দেহটা একদম ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো। ও একবার আমার মৃতদেহের হাতটা ওর হাতের মুঠোয় ধরেছিলো। চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যটা মনে করার চেষ্টা করলাম। হা !! মনে পড়েছে। ওর বিশাল হাতের মুঠোয় আমার হাতটা খাঁচায় ঢুকানো টিয়াপাখির মতোই আটকে যায়! ওর হাতটা আমার হাতের থেকে দুই তিন গুন বড় ছিলো। ওর বিশাল হাতে বসানো সেই বড় পরিধির আংটিটাই যখন আমার হাতে উঠে আসে তখন ওটা তার আকৃতি বদলে ছোট হয়ে যায়! এতে খানিকের জন্যে আমার মনে হয় যে, প্রিস্ট আর আমার হাতের আকৃতি আঙুলের আকৃতি বুঝি সমান। কিন্তু হাত দুটো কখনোই সমান ছিলো না। এই আংটির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটা যার হাতেই যায় তার হাতের আকৃতিই ধারণ করে! অসাধারণ!
বইটা পড়ে জানতে পারলাম এই আংটিটা মৃত্যুর সময় যদি কেউ পড়ে থাকে তবে তার আত্মাটা পরপারে যাত্রা না করে ভুখন্ডে মুক্ত হয়ে ঘুরবে। তবে কপালে উত্তপ্ত আংটির ছ্যাকা দেওয়া থাকলে, মৃত্যুর সময় ঐ আংটিটা হাতে পড়ানো না থাকলেও আত্মা পরপারে পাড়ি দিবে না, যদি না সেই আত্মা পাড়ি দিতে একান্ত উদগ্রীব হয়।এবার মার্গারেটের প্রেতের কপালের সেই পোড়া দাগটার রহস্য খুলে গেলো।
আমি যখন আলেস বা মার্টিনীর আত্মাকে দেখেছিলাম তখন তাদের কপালে আংটির ক্ষত চিহ্নটা ছিলো না। কিন্তু গাড়ির আয়নায় বা স্বপ্নে যতবারই মারগারেট আমায় দেখা দিয়েছে ততবারই ওর আত্মার কপালে আংটির ক্ষত চিহ্নটা সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিলো। এর কারণ হলো অন্য মেয়েগুলিকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রিস্টের নির্দেশে জোর করে কপালে ছ্যাকা দেওয়া হয়। কিন্তু মারগারেট নিজেই নিজের কপালে আংটির ছ্যাকা দেয়। বুদ্ধিমান মহিলাটা হয়তো কোনক্রমে টের পেয়ে গিয়েছিলো যে প্রিস্ট ওর কাছ থেকে আংটিটা ছিনিয়ে নিতে চলেছে। তাই ওর এই অদ্ভুত কান্ড। উত্তপ্ত আংটি দিয়ে নিজের কপাল পুড়িয়ে সে তার আত্মার পরপারে যাত্রার পথ রুদ্ধ করে। সত্যি মহিলাটার সাহসের তারিফ করতে হয়। কিন্ত পরবর্তীতে প্রিস্ট আংটিটা দখল করে নেয় আর ওকে হত্যা করে।
(চলবে)

ডাকিণী (৩৬তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
হঠাৎ একটা সময় সেই আত্মা কাঁপানো হাসিটা থেমে গেলো। কুয়োর ভেতরে সুনসান নিরবতা। আমি কুয়োর দেয়ালে ঠেকা দিয়ে কোন রকমে ভেসে ছিলাম। মুখে শক্ত করে কামড়ে ধরে রেখেছি টর্চ লাইটটা। এই অন্ধকারে ওটাই একমাত্র সম্বল। খানিক পরেই নিরবতা ভেঙে কলকলিয়ে উঠা পানির আওয়াজ শুনতে পেলাম। অনেকটা বাথরুমের ফ্লাশ ছাড়লে যেমন শব্দ হয় তেমন। কুয়োর শান্ত জলতলের মাজখানে প্রথমে ছোট্ট একটা ঘুর্ণীর সৃষ্টি হলো। ঘুর্ণীটা ধীরেধীরে বড় হতে হতে কুয়োর পরিধি বরাবর ছড়িয়ে পড়লো। পানির প্রচন্ড স্রোত আমাকে সেই ঘুর্ণীর মাঝখানে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। আমি প্রাণপণে কুয়োর দেয়ালটা আকঁড়ে ধরে শামুকের মতো আটকে থাকতে চাইলাম। কিন্তু হলো না। হাত ফসকে গেলো। আমি ছিটকে যেয়ে পড়লাম সেই ঘুর্ণীর মাঝখানে। তারপরই টুপ করে ডুবে গেলাম।
দেখতে দেখতে বদ্ধ কুয়োর পানিতে ফ্লানেল আকৃতির নিম্নমুখী ঘুর্ণী সৃষ্টি হলো। পানির তোড়ের সাথে না পেরে আমি ওতে ডুবে গেলাম। ঘুর্ণীর মাঝে ডুবতে ডুবতে আমি কুয়োর গহীনে চলে গেলাম, ঠিক গাড়িটার কাছে। টর্চের আলোয় দেখলাম ওটার দরজাটা খুলে হা হয়ে আছে। কিন্তু ভিতরের কঙ্কালটা এখন অদৃশ্য। গাড়ির গায়ের সেই শেওলা আর ব্যাঙের ছাতাও নেই। ঝকঝকে তকতকে আমার স্পিডস্টার। কিন্তু এবারের মতো গাড়ির মায়াটা আমায় ছাড়তে হবে। যে করেই হোক আমায় জলতলে ভেসে উঠতে হবে দম ফুরিয়ে যাবার আগেই। সর্বশক্তিতে সাঁতরাতে লাগলাম, কিন্তু কিছুতেই আমি উপরে যেতে পারছি না। জলের নিম্নমুখী স্রোত বারবার আমায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। তারপরেই একটা তীব্র জলধারা আমায় ঠেলে গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। আমি ভেতরে ঢুকতেই গাড়ির দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেলো। আমি জানালা দিয়ে সাঁতরে বেরুনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু দুপাশের জানালা দিয়ে প্রচন্ড জলস্রোত বইছে। আমি জানালা দুটোর ধারে কাছেও ঘেষতে পারলাম না। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর ক্রোধ আমাকে এই মৃত্যুগহ্বরে নিয়ে এসেছে। বুঝলাম একটু আগে গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে থাকা কঙ্কালটা আমারই ছিলো। এই কুয়োয় ঢুকার পর প্রথম ডুবে আমি ভবিষ্যতটা দেখেছি। আর এখন দেখছি রূঢ় বর্তমান। এই কুয়োয় ডুবে যাওয়া গাড়ির ভেতরে আটকে মরাই আমার কপালে লিখা ছিলো। কপালের লিখন না যায় খণ্ডন। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে খানিকটা নিশ্চিত হলাম।
বুকে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে। তবুও একটু একটু করে শ্বাস ছাড়ছি। জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটা যতটা দেরীতে সম্ভব ছাড়তে চাই। জীবনটা নিষ্ঠুর হলেও এতো তাড়াতাড়ি মরতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু একদিন না একদিন মরতে তো আমাকে হবেই। সেই দিনটা আজই হোক বা কাল। এসব ভাবতে ভাবতেই আমার চোখ গেলো গাড়ির ড্যাশবোর্ডে। ফুলে উঠা ট্রাশ বেলুন (গাড়ি আক্সিডেন্ট হলে যে বেলুন ফুলে উঠে ড্রাইভারের মাথা ড্যাশবোর্ডে ঠুকে যাওয়া থেকে রক্ষা করে) সমগ্র ড্যাশবোর্ড ঢেকে রয়েছে! গতরাতে গাড়িটা কুয়োর দেয়ালে আঘাত করার সময় ট্রাশ বেলুন ফুলেনি। কিন্তু তারপর কুয়োর মধ্যে প্রচন্ড জোরে গাড়িটা আছড়ে পড়ার সময় হয়তো ওটা ফুলে গেছে। ট্রাশ বেলুনে সাধারণত হিলিয়াম গ্যাস থাকে যা বাতাসের থেকেও হালকা। এই ট্রাশ বেলুনটাকে যদি কোনভাবে গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে দিতে পারি তো ওটা সকল স্রোত উপেক্ষা করে সোজা জলতলের দিকে ছুটবে। তখন শুধু ওটা ধরে থাকলেই হলো। ওটাই আমাকে জলতলে নিয়ে যাবে। কটিদেশ হাতড়ে ছুরিটা বের করলাম। তারপর দ্রুত একে একে ট্রাশ বেলুনেকে আটকানোর তিনটা দড়ির বাঁধনই কেটে দিলাম। মুক্ত হয়েই ওটা সাঁ করে গাড়ির ছাদে ভেসে উঠলো। ওদিকে আমার নিশ্বাস দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বাতাসের অভাবে ফুসফুসটা যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নিজের অজান্তেই মুখের মধ্যে ধরা টর্চের উপর তীব্র কামড় পড়লো। প্রাণপণে ঠেলে বেলুনটাকে গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে দিলাম আর ওর একটা দড়ি শক্ত করে ধরে রাখলাম। কপাল ভাল যে এটা কাজ করলো। বেলুনটা আমায় জানালা দিয়ে ছেঁচড়ে বের করে আনলো। তারপর তড়িত বেগে উপরে উঠতে শুরু করলো। সাথে করে আমাকেও নিয়ে চলল। এভাবেই আমি সাক্ষাৎ মৃত্যুকে আবারো ফাঁকি দিলাম। তীব্র স্রোত উপেক্ষা করে জলতলে ভাসার পর অনুধাবন করলাম প্রচেষ্টা ব্যাতিত ভাগ্য বলতে কিছু নেই। মানুষ প্রচেষ্টার মাধম্যেই তার সৌভাগ্য গড়ে নেয়। কেবল ভাগ্যের উপর নির্ভর করে যদি গাড়ির ভেতরে হাল ছেড়ে দিতাম তো এতক্ষণে পরপারেই পৌছে যেতাম।
আমি ভেসে উঠতেই জলের ঘুর্ণী থেমে গেলো। আবার সেই শান্ত বদ্ধ জল। বেলুনটা বাতাসে ভেসে উপরে চলে যেতে চাইছে। কিন্তু আমি ওটা শক্ত করে ধরে রইলাম। কেন যানি মনে হচ্ছিলো, বেলুনটা ছাড়া মাত্রই এই ক্ষুধার্ত কালো জল আবার আমাকে ভেতরে টেনে নিবে। হাতে ধরে রাখা ছুরিটার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকালাম। এই নিয়ে দুবার ওটা আমার জীবন বাঁচালো। ওর হাতলে একটা চুমু খেলাম। হঠাৎ মনে হলো এই ছুরিটাই আমাকে এখান থেকে বের করে নিতে পার। কুয়োর ভেজা দেয়ালটা পরীক্ষা করে দেখলাম! হা। এই দেয়ালে ছুরি চালিয়ে দেয়ালে অনায়াসে ছোট ছোট গর্ত করা যাবে। সেসব গর্তে হাত গুঁজে সহজেই এই খাঁড়া দেয়াল বেয়ে উঠে বেরিয়ে যাবো। চিন্তাটা মাথায় আসতেই কাজে লেগে গেলাম। বুদ্ধিটা কাজ করলো। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বেয়ে উঠতে যেয়ে আমার শরীরের শেষ শক্তিটুকুও নিঃশেষিত হলো। হাঁচড়ে পাঁচড়ে কুয়োর বাহিরে বেরিয়ে আসতেই তীব্র সূর্যালোকে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। সূর্যালোকের তীব্রতা থেকে চোখ বাঁচাতে দুহাতে চোখ ঢাকলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। অসম্ভব ক্লান্তিতে আমি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম। জ্ঞান ফিরলে জেগে দেখি মধ্যান্নের সূর্য ঠিক মাথার উপরে চলে এসেছে। সারাটি সকাল এই কুয়োর পেছনেই কাটিয়ে দিয়েছে? কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি। আমি এখনো জানতে পারিনি কে এই মহিলা, কি তার উদ্দেশ্য! ব্যার্থ মনোরথে আমি আবারো ফিরে চললাম কটেজের দিকে। কটেজে ফিরতেই সেই খনখনে হাসিটা কানে ভেসে এলো। ওটা লাইব্রেরী থেকেই আসছে। দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরীতে। কিন্তু লাইব্রেরী দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। মনিকা কি ভেতরে আটকে আছে? হায় হায়। আমি গলা ফাটিয়ে হাক ছাড়লাম, ” মনিকা। মনিকা ডার্লিং। ভেতরে কি করছো তুমি। প্লীজ আমায় ভেতরে ঢুকতে দাও। সকালের ঘটনাটার জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত। ”
কোন সাড়া নেই। এবার প্রাণপণে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। কিন্তু দরজাটা খুললো না। স্টোররুমের সেই হাতুড়িটার কথা মনে পড়লো। এক দৌড়ে স্টোররুম থেকে ওটা নিয়ে আসলাম। যেই দরজায় একটা ঘা বসাতে যাচ্ছিলাম অমনি ওটা নিজে থেকেই খুলে গেলো। ঐ তো মনিকা লাইব্রেরীর মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছে। মেয়েটার জন্যে হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো।
“মনিকা, এ কি হলো? ডার্লিং! ” দৌড়ে যেয়ে ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে ক্যারোটিক ধমনিতে পালস চেক করলাম। থাকং গড, ও বেঁচে আছে। কিন্তু শ্বাসপ্রশ্বাস খুব ধীরে পড়ছে, আর শরীরটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ঠান্ডা। ও আমার দিকে কেমন যেনো ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকালো। আমি ওকে কোলে তুলে গেস্টরুমে বয়ে নিয়ে চললাম। আদিন ঠিকই বলেছিলো। মনিকাকে এই হউন্টেড কটেজে থাকতে দেওয়া মোটেও উচিৎ হয় নি। আজ এখানে থেকে খানিকটা ভালো হয়ে উঠুক। কাল এক সময় ওকে সবকিছু বুঝিয়ে বলে বিদায় করে দেবো।
গেস্টরুমে এনে ওকে বেডশীট দিয়ে ভাল করে পেঁচিয়ে শুয়ালাম। বেচারি। ঠান্ডায় না জানি কতটা কষ্ট পেয়েছে। হঠাৎ একটা ব্যাপার খেয়াল হলো। মনিকা এই নিয়ে পরপর দুদিন লাইব্রেরীতে যেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আজ সকালে কুয়োতে যা খুঁজতে গিয়েছিলাম ওটা সম্ভবত লাইব্রেরীতেই আছে। মনে পড়লো লাইব্রেরীর সেই অদ্ভুত বইটার কথা। সেদিন বইটা পড়া শুরু করতেই আলার্ম বেজে উঠেছিলো। তাই ওটা পড়া হয় নি। আরে! আশ্চর্য! এই ব্যাপারটা তো আমি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছি। সেদিন সকাল ৬টায় আল্যার্ম বেজে উঠেছিলো। কিন্তু আমার বেডরুমের ঘড়িতে প্রতিদিন সকাল ৮টায় আল্যার্ম দেওয়া আছে। তারমানে সেদিন বইটা পড়া শুরু করতেই নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দু ঘন্টা আগেই আল্যার্ম বেজে গিয়েছিলো? তারমানে অশরীরী কেউ একজন চায় না আমি বইটা পড়ি। কিন্তু কেন? কি আছে ঐ বইতে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল লাইব্রেরীতেই পাওয়া যাবে। দ্রুত পদক্ষেপে লাইব্রেরীর দিকে হাঠা ধরলাম। লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখি দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ! আশ্চর্য! কি গোপনীয়তা এই লাইব্রেরীকে ঘিরে? আমাকে যে জানতেই হবে। এইডসের স্লোগানটা মনে পড়লো, “বাঁচতে হলে জানতে হবে”, আর জানতে হলে ঢুকতে হবে, লাইব্রেরীর ভেতরে। একটু আগে নিয়ে আসা হাতুড়িটা হাতের কাছে পড়ে ছিলো। ওটা তুলে দরজার লক বরাবর দিলাম এক ঘা। লক ভেঙে অর্ধেক ফাঁক হয়ে গেলো। দ্বিতীয়বার হাতুড়ির বাড়ি না দিয়ে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়েই দরজাটা খুলে ফেললাম। সেই কাঙ্খিত বইটা পড়ে আছে টেবিলের মাঝখানে। মলাট উল্টাতেই লেখিকা মারগারেটের স্কেচটা আবার বেরিয়ে এলো। সেদিন চিনতে না পারলেও আজ মহিলাটাকে ভাল করেই চিনতে পারলাম। গোরস্থান থেকে ফিরার সময় একেই আমি দেখেছিলাম , গাড়ির আয়নায় আমার পাশের সীটে বসে থাকতে। এই মহিলাটাই দুঃস্বপ্নে আমায় দেখা দিয়েছিলো। একেই বেডরুমের ঝাড়বাতিটা থেকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলতে দেখেছি। এবার প্রথম পৃষ্টা ও সূচিপত্র উল্টে বইটা পড়তে শুরু করলাম ,
(চলবে)

ডাকিণী (৩৫তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
বাথরুমের আয়নাটা গতরাতে আমার চোখের সামনে ভেঙেছিলো। ওটা ভাঙ্গার শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি উঠতে যেয়েই, আমি টাবে পিছলে পড়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আয়নাটা বেমালুম জোড়া লেগে আছে। দেয়ালে ঠিক আগের মতোই টাঙানো। যেন কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু টাবটা ভাঙ্গাই পড়ে আছে। আমি কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাড়িয়ে থাকলাম। নাহ। আমি ছাড়া কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সন্তুষ্ট চিত্তে বেসিনে মাথা নিচু করে চান্দিতে পানি ঢালতে শুরু করলাম। তারপর কুলি করে, নাক মুখ ধোয়ে আবার আয়নার দিকে তাকালাম। ওমা! আমার কপালের মাঝখানে বিশাল গোলাকার একটা ক্ষত! হলদে পুঁজে ক্ষতটা ভরে উঠেছে। ছিঃ! কি বিশ্রী! আমি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। না আ আ আ আ আ আ,,,,,
খানিকটা ধাতস্থ হলে কপালে হাত বুলালাম। নাহ। মসৃণ অক্ষত চামড়াই অনুভব করলাম। কিন্তু আয়নায় তখনো ক্ষতটা দৃশ্যমান। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেডরুমের কাছেই দুড়ধাড় পদশব্দ শুনতে পেলাম। সম্ভবত মনিকা আমার ভয়ার্ত চিৎকার শুনে দৌড়ে আসছে। আমি তখন নিজের উপরই চুড়ান্ত বিরক্ত। নিজের ক্ষুবটা আয়নার উপর ঝারলাম। শালা আয়নার বাচ্চা। সোপ কেসটা তুলে সোজা আয়নার উপর ছুড়ে ফেললাম। ঝনঝনিয়ে আয়নাটা ভেঙে পড়লো। তখনি বাথরুমের দরজায় দমাদম কিল ঘুষি পড়তে শুরু করলো। বুঝলাম, ওটা মনিকাই। আমি ঠিক আছি কি না তা দেখতে এসেছে। আমি রাগতস্বরে বললাম, “চলে যাও মনিকা। আমি শতভাগ ঠিক আছি। ”
আমি ভেবেছিলাম মনিকা এবার চলে যাবে। কিন্তু এর পরিবর্তে ও ভয়ার্ত কন্ঠে মিনতি করলো, “সাঞ্জে, লাইব্রেরী থেকে কে যেনো আমায় ডাকছিলো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা বুঝি তুমি। কিন্তু যখনই লাইব্রেরীর ভেতরে ঢুকতে যাবো তখনি এদিক থেকে তোমার চিৎকার ভেসে এলো। তাই এখানে দেখতে এলাম কি হচ্ছে। তারপর কাঁচ ভাঙ্গার বিকট শব্দ। ডার্লিং প্লীজ, তুমি আমাকে সত্যি করে বলো তো এখানে এসব কি হচ্ছে? ”
এই সেরেছে। এবার ওকে কি বলবো! স্পষ্টত বুঝতে পারছিলাম এই মেয়েটা তার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পেলে এখান থেকে যাবে না। কিন্তু ওকে দেয়ার মতো কোন উত্তর এই মুহুর্তে আমার কাছে নেই। আমি নিজেও জানি না এখানে ঠিক কি ঘটছে। কি উত্তর দিবো ওকে!
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ও আবার হাঁক ছাড়লো, “সাঞ্জে ডার্লিং। কথা বলছো না কেনো? প্লীজ এমন করো না। আমায় খুলে বলো, কি হচ্ছে এখানে? ”
আমি বাথরুম থেকে হতদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম। রাগে মাথাটা জ্বলছে। মনিকাকে সামনে পেয়েই খেকিয়ে উঠলাম,” এই মেয়ে। তুমি পেয়েছোটা কি এখানে। আমাকে সবকিছুর জন্যে তোমার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে কেন? আমি কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে রাজি না। এতে যদি তোমার পোষায় তো থাকো, আর নইলে চলে যাও।”
মনিকা আমার এই অপ্রত্যাশিত ব্যবহারের জন্যে মোটেও তৈরি ছিলো না। সে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ফোঁপাতে ফোঁপাতে এক ছুটে আমার বেডরুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ও বেরিয়ে যেতেই একটা তীব্র অনুশোচনাবোধ আমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিলো। ওকে এভাবে বলাটা আমার মোটেও ঠিক হয়নি। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হলো। আমিও গেলাম মনিকার পিছু পিছু ওর গেস্টরুমে। গিয়ে দেখি ও বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে কাঁদছে। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হলো। তারপর সেটা সংক্রমিত হলো, কুয়োর ভেতরকার ওই মধ্যবয়সী অশরীরী মহিলাটার উপর। এর জন্যেই আমার মিজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো। এর জন্যেই এখন আমার মেয়েটা কাঁদছে। রাগে গজগজ করতে করতে ছুটলাম স্টোররুমে। সেখানে যেয়ে একটা লম্বা নাইলনের দড়ি, একটা টর্চ লাইট, আর সেই পকেট নাইফটা কুড়িয়ে নিলাম। হাতুড়িটা নেড়ে চেড়ে দেখে আবার রেখে দিলাম। ওটা নিয়ে ডাঙ্গায়ই সোজা হয়ে দাড়াতে কষ্ট হয়, কুয়োর পানিতে ভাসা তো প্রায় অসম্ভব। আমি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আজ, এক্ষুনি আমি ওই রহস্যময় কুয়োটার ভেতর নামছি। ওখানে যেই থাকুক না কেন, ওকে পরপারে পাঠিয়ে তবেই ফিরবো। রাগের ঠেলায় মন থেকে ভয় ডর সম্পূর্ণ উবে গিয়েছিলো। দৃঢ় পদক্ষেপে সোজা এগিয়ে গেলাম কুয়োর দিকে। সেখানে যেয়ে কুয়োর বালতি টানার খুটিতে দড়ির এক প্রান্ত শক্ত করে বেধেঁ অপর প্রান্ত নিচে ঝুলিয়ে দিলাম। তারপর দড়ি বেয়ে নেমে গেলাম অন্ধকার কুয়োটার ভেতরে। যতই নীচে নমছি ,অন্ধকার ততই ঘনিয়ে আসছে। টর্চটা জ্বেলে দিলাম। টর্চের মৃদু আলো কুয়োর অন্ধকারের সাথে একটুও পেরে উঠলো না। বুঝলাম এখানে দিন রাতের পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে। এখানে অন্ধকারের সার্বক্ষণিক ও চিরস্থায়ী রাজত্ব।যতই নিচের দিকে নামছি ততই ভয় বাড়ছে। আমি ভালই ভয় পেতে শুরু করেছি। তারপরই হঠাৎ টর্চের আলোয় জলতল চকচকিয়ে উঠলো। যাক বাবা। আমি তো ভেবেছিলাম এই কুয়োটা পৃথিবীর এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত। দড়ি ছেড়ে পানিতে ঝাপ দিলাম। বদ্ধ, মজা, পঁচা পানি থেকে গাঁ গোলানো গন্ধ উঠলো। কোনমতে নাক মুখ চেপে তা সহ্য করলাম।কুয়োর একপাশের দেয়াল আকড়ে ধরে জলে ভাসতে লাগলাম। হঠাৎ গাড়িটার কথা মনে পড়লো। আরে! ওটাকে তো কোথাও দেখছি না! তবে কি এই সর্বভুক কুয়ো আমার গাড়িটাকে গিলে নিলো? খেয়াল হলো আমি পায়ের নিচে কুয়োর তল পাচ্ছি না! তারমানে ওটা একজন মানুষকে ডুবানোর জন্যে যথেষ্ট গভীর! কিন্ত কত গভীর! কোন গভীরতায় আমার গাড়িটা লুকিয়ে আছে। টর্চটা মুখে কামড়ে ধরে কুয়োর পানিতে ডুব দিলাম। টর্চের মৃদু আভায় প্রায় দশ ফুট গভীরতায় আমার গাড়িটাকে দেখতে পেলাম। গাড়ির ছাদে শেওলা আর ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে! প্রিয় গাড়িটার এ অবস্থা দেখে হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ডুব সাঁতার দিয়ে এগিয়ে গেলাম গাড়িটার দিকে। উইন্ডশীল্ড বরাবর টর্চ মারতেই ড্রাইভিং সীটে একটা মানুষের কঙ্কাল দেখতে পেলাম। ভয়ে আমার আত্মা শুকিয়ে এলো। মনে পড়লো,গতরাতে যদি সময় মতো গাড়ি থেকে বেরুতে না পারতাম তবে আজ ওখানে আমার দেহটা থাকতো। কিন্তু এই দেহটা কোন হতভাগার? এটা আমার গাড়িতে এলো কিভাবে?
সে যাই হোক। আর ভাবতে পারছি না। অনেকক্ষণ পানির নিচে দম আটকে আছি। তাই তাড়াতাড়ি জলতলে উঠে এসে দ্রুত শ্বাস নিলাম। এখানে যা দেখার আমি দেখে নিয়েছি। এবার দড়ি বেয়ে উঠে এই মৃত্যু গহ্বর থেকে বেরুতে হবে। কিন্তু কি আশ্চর্য! দড়ি ধরে টান দিতেই ওটা সম্পূর্ণ খুলে চলে এলো। হায় হায়! আমি উপরে বেয়ে উঠবো কি করে? আমার খুব কাছ থেকেই কে যেনো খনখনিয়ে হেসে উঠলো। সেই ভয়ঙ্কর শয়তানী হাসি। বুঝলাম আমার দুঃস্বপ্নটা এবার সত্তি হতে চলেছে।
(চলবে)