ভয়ংকর ভুতুরে ছবি

1

দুর্বল মনের মানুষ দয়া করে এ ছবি গুলো দেখবেন না, যে কোন সময় হার্ট এটাক হতে পারে । 😉

যারা ভুতকে ভয় পায় না তাদের জন্য এই ছবির প্রদর্শণী । যার যে ছবি টা ভালো লাগে, কমেন্টস এ লিখুন, আর কোন ছবি টা দেখে সব চাইতে বেশি ভয় পেয়ছেন তা লিখতে ভুলবেন না যেন । তো দেখতে থাকুন সব ভয়ংকর ভুতুরে ছবি ।

বি:দ্র: ভয় না পেলেও দয়া করে জানাবেন !

“প্রতিটি ছবিই চলমান(এনিমেটেট .জিআইএফ ফরমেটে) তাই ছবিতে ক্লিক করে দেখলে ভালো করে দেখতে পারবেন । যেকোন ছবিতে ক্লিক করলে তা বড় আকারে প্রদর্শিত হবে আর পরবর্তী ছবি দেখার জন্য শুধু বর্তমান ছবির উপর ক্লিক করলেই হবে ।”

ভুত পোষা

0

এ লেখাটি আমি ক্লাস এইট-এ পড়াকালীন সময়ে লিখে ছিলাম । কিন্তু কোথাও প্রকাশ করিনি । “ভুতের-ব্লগ”-এ এটি প্রথম প্রকাশিত হল আর লেখাটি আমি ভুতের ব্লগের পরিবারবর্গ কে উৎসর্গ করলাম ।
———————————————————————-
১.
তখন আমি ক্লাস ফাইভ এ পরতাম । আমাদের গ্রামের বাড়ির এক স্কুলে । স্কুলটি ছিল জমিদার আমলের, যার কারণে ক্লাসগুলোতে অনেক ফাঁকি দেওয়া যেত । যেমন নাম কল করার পর কেউ কেউ ভাঙ্গা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেত । তাদের প্রধান ছিল শান্ত । নামে শান্ত হলেও আসলে সে কিন্তু শান্ত ছিল না, তাই ড্রিল টিচার প্রায়ই তাকে শাস্তি দিতেন আর ডাকতেন অশান্ত বলে । তাকে ভয় পেত না এরকম বুকের পাটা আমাদের কারও ছিল না, তাই পালিয়ে গেলেও কেউ ভয়ে বলত না ।
একদিন সে ক্লাসের সবাইকে বলল, আমি তোমাদের ভুতের বাচ্চা দেখাব । আমরা তো সবাই হেসেই খুন, ভুতের বাচ্চা হা…..হা…..হা… ; ক্লাসের সবাই হাসছে কিন্তু আমার হাসিটা মনে হয় একটু বেশি শব্দে হয়ে গিয়েছিল, তাই আর কাউকে লক্ষ্য না করে, শান্ত আমাকে ধমকের সুরে বলল, দেখ হাসবি না বলছি, এমন ঠেঙ্গানি দেব না যে নিজের নাম ভুলে যাবি । আমি আমার হাসি থামাতে না থামাতেই ক্লাসে টিচার চলে এলেন ।
এক এক করে যখন শেষ ঘণ্টা এলো তখন খবর পাওয়া গেল আমাদের শেষ ঘণ্টায় অন্য স্যার আসছেন । কারণটা অবশ্য জানা যায়নি । এমন সময় এলেন শফিক স্যার, তিনি যেমন মেজাজি তেমনি কড়া । তিনি বললেন আমি তোমাদের একটি অনুচ্ছেদ লিখতে দেব । আমরা তো পড়লাম মহা মুশকিলে, তিনি আবার কারো কথা শুনবেন না । কিছুক্ষণ পর তিনি লিখতে দিলেন “শিমুল গাছের প্রয়োজনীয়তা”।                                                                          আমরা    তো  অবাক হঠাৎ করে শিমুল গাছ  নিয়ে লেখা চাট্টিখানি কথা নয় । তাও আবার প্রয়োজনীয়তা । ক্লাসের ছাত্র হিসেবে আমি ছিলাম মধ্যম, তাই পাশের জনেরটা না দেখে উপায় ছিল না । দেখছি আর লিখছি, লিখছি আর দেখছি । এমন সময় পেছন থেকে স্যার আমার কানটা টেনে ধরলেন, আর রাগে গরগর করতে লাগলেন । তারপর অনেক চেষ্টা করেও বাঁচতে পারলাম না । স্যার তার বেত দিয়ে ধমাধম কয়েকটা বেত্রাঘাত করলেন । এরপর সারা ক্লাসে কান ধরে দাড়িয়ে থাকতে হল ।

ছুটি হয়ে গেলে সবাই হৈ হুল্লোড় করতে লাগল কিন্তু আমার মনটা খারাপ । আমার মনের অবস্থা দেখে শান্ত বলল চল্ তোকে ভুতের বাচ্চা কিনে দেব । তুই ইচ্ছা করলে বাড়িতে পুষতে পারবি, যা হুকুম দিবি তাই করে দেবে । আমি বললাম, তোর কি মথা খারাপ হয়েছে, এটা কি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ যে,যা চাইব তা-ই পাব । শান্ত উত্তর দিল, কেন তোর বিশ্বাস হচ্ছে না? চল্ আমার সাথে । সে আমাকে এক প্রকার জোড় করেই নিয়ে গেল ।
যেতে যেতে এসে থামল আমাদের গ্রামের পুরনো এক মন্দিরে । এখানে নাকি আজ ভুতের মেলা হবে আর অনেক বাচ্চা ভুত এতে অংশ নিবে, ঠিক “নতুন কুড়ি” অনুষ্ঠানের মত এবং এ মেলা থেকে অনেক বাচ্চা ভুত হারিয়ে যাবে । আমরা সেই বাচ্চা ভুতদের একটি কীডন্যাফ করবো, বুঝলি? শান্ত বলল । আমি বললাম, না, বুঝি নাই । শান্ত উত্তর দিল, থাক তোর ওসব বুঝে কাজ নেই, এখন যা বলি তাই কর
-কি করব?
-আমার ব্যাগটা রাখ আর তুই এখানে দাড়িয়ে থাক । আমি যাব আর আসব ।
শান্ত আমাকে মন্দিরের বাইরের রাস্তায় দাড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল ।

২.
প্রায় আধ ঘণ্টা হয়ে এলো তাও শান্ত ফিরছে না । কারণটা কি? নিজের চোখে দেখার জন্য মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়লাম । অনেক পুরনো মন্দির, কেউ বোধ হয় এখানে আর আসে না । কিন্তু ভিতর থেকে ধুয়ার কুণ্ডলী বের হচ্ছে । ভিতরের এক কুঠুরি থেকে শব্দ আসছে গরর…র…র..হুশ…হুশ….যা…যা….ঢুক….ঢুক………. ভিতরে ঢুক । শব্দ শুনে কুঠুরিটা চিনতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কিন্তু ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাচ্ছিল । কুঠুরিতে ঢুকতেই শান্ত আমাকে ইশারায় ওর মত চন্দ্রাসনে বসতে বলল । আমি তাই করলাম । দেখি ২ হাত লম্বা দাড়িওয়ালা আলখেল্লা পরা এক জন বুড়ো আমার সামনে বসে আছেন । তার সামনে একটি কৌটা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে । আমি বললাম, আচ্ছা এখানে না “নতুন কুড়ি” হওয়ার কথা, ভুতের মেলা, বাচ্চা কিছু-ইতো দেখতে পাচ্ছি না । শান্ত ফিসফিসিয়ে বলল, হিস…সসস, একদম চুপ, পরে কথা হবে, দেখছিস না সাধু বাবা ধ্যানে বসেছেন ।
-আমি বললাম, কোথায়? তাকে তো আমি দিব্যি ঝিমুতে দেখছি ।
-শান্ত অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ধ্যাৎ কি যে করিস না ধ্যানে বসেই ভুতের বাচ্চা কীডন্যাফ করতে হয় । কেন তুই জানিস না? তুই এভাবে ডিস্টার্ব করলে ভুতের বাচ্চা তো দূরে থাকুক পরে আমরাই ভুত হয়ে ফিরব ।
সাধু বাবা এবার মুখ খুললেন, চোপ বেত্তমিজ, না লায়েক, তোদের জন্য হাত ফসকে একটা বেরিয়ে গেল, দুটো ধরেছিলাম । এই নে, হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছি, শিশি এনেছিস?
শান্ত বলল, জ্বি না, শিশি আনি নাই । মনে হল সাধু বাবা খুবই বিরক্ত হলেন, রাগান্বিত স্বরে তিনি বললেন, ভুত কিনতে আসছিস আর শিশি আনিস নাই মানে? এখন তোর মুখের মইধ্যে নিবি, বেয়াকুব? আমি বললাম, না ভুতবাবা ও মুখে নিতে রাজি হবে না কারণ, শুনছি ভুতেরা পেছাব করে দেয়, যদি মুখে নিলে ওর মুখে..মানে, বলছিলাম আমার কাছে পানির ফ্লাক্স আছে । শান্ত আমার কথায় প্রথমে রাগ করলেও পরে পানির ফ্লাক্স এর কথা শুনে রাগ দমে নিল । সাধু বাবা উত্তর দিলেন, ঠিক আছে পানির ফ্লাক্স দে, আপাতত এটাতেই রাখ আর আমি ভুতবাবা না, আমি সাধু বাবা । সাধুবাবা পানির ফ্লাক্স এ ভুতের বাচ্চাটা রাখলেন আর বললেন, এবার আমার মওকাটা দে, একশত পাঁচ টাকা চাইর আনা পাঁচ পাই আর শোন এটা হচ্ছে মেছো ভুতের বাচ্চা । তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজ, এর এক চোখ কানা তাই সবাই একে কানাভুত বলে ডাকে । সকাল বিকাল পুকুরে বা নদীতে চুবিয়ে রাখলে এটা আপনা থেকেই মাছ ধরে খেতে পারবে । তবে আধ ঘণ্টার বেশি চুবিয়ে রাখলে এটা মাছ মানে মাছভুত হয়ে যাবে ।
শান্ত তার পকেট থেকে ৭০ টাকা বের করল । তার কাছে আর নেই তার মানে বাকিটা আমাকে দিতে হবে । কিন্তু চার আনা পাঁচ পাই কোথায় পাব । সাথে তো নেই, এদিকে সাধু বাবা বেকে বসলেন । অবশেষে ১৭০ টাকা দিয়ে তবে মুক্তি । বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় আটটা বাজতে চলল । শান্ত কানাভুত টাকে আমার কাছে দিয়ে বলল, দেখ তুই তো জানিস আমার বাবা ট্রাক চালায় তার মাথা সব সময় ঠিক থাকে না । মা মারা যাবার পর থেকে এমনটা হল । এটাকে মানে কানাভুতটাকে তুই যত্ন করে রাখিস । কথা শেষ হতে না হতে আমার বাড়ির গেটের সামনে এসে হাজির হলাম । শান্ত বিদায় নিয়ে চলে গেল । আমিও ভিতরে ঢুকলাম । ভিতরে ঢুকতেই ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল, ভাইয়া এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আজ তোমাকে দিয়ে.. কথা শেষ না হতেই বাঘের হুংকার, মানে আমার বাবা, কিরে স্কুল ছুটির পর এ তিন ঘণ্টা কোথায় ছিলি? তোকে দিয়ে আজ ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়াবো । মামা সামনেই ছিলেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন । তিনি বললেন, দুলাভাই ঘুড়ি বানানোর কাজটা না হয় আমিই করি । আপনি বরং ফ্লাশ লাইটের ব্যবস্থা করেন ।
-দেখ জালাল সব সময় ইয়ার্কি ভাল লাগে না, ছেলেটা যদি বদমায়েশ হয়ে যায় তখন আমার মুখে চুন কালি পড়বে সেটা কি তুমি চাও ?
-আহা দুলা ভাই চটছেন কেন? আপনি যান আমি সব দেখছি ।
এমন সময় এলেন মা, তিনি জালাল মামার কাছে আমাকে দিয়ে বাবাকে টেনে নিয়ে গেলেন ।
কিরে এতক্ষণ কোথায় ছিলি? পড়িস ক্লাস ফাইভে আর এ বয়সেই সেয়ানা হয়ে গেছিস, সিগারেট ধরেছিস নাকি? আফিম? অবশ্য গাঁজাও আজকাল খুব জনপ্রিয় । আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মামা আমাকে থামিয়ে বললেন, যা টেবিলে ভাত রাখা আছে খেয়ে শুতে যা, কাল সকালে তোর সাথে কথা বলব ।

৩.
আমি কথা না বলে ভাত খেয়ে গেলাম বিছানায়, গিয়ে দেখি কে যেন আমার ব্যাগ খুলেছে । আমি ভীত গলায় কানাভুতকে ডাকলাম । কানাভুত… ও কানাভুত.., সাথে সাথে উত্তর এল, কিরে তুই তো আস্ত একটা গাড়ল, আমাকে এর ভিতর বন্দি করে রেখেছিস আবার ব্যাগটাও বন্ধ করে রেখেছিস, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাই বের হয়েছি । আমি বললাম ঠিক আছে আমার ভুল হয়েছে কিন্তু তুমি আমাকে তুই তুই করে বলছ কেন? আমি তো তোমার বন্ধু না, তাছাড়া ..
-তাছাড়া কি?
-তাছাড়া তোমরা হচ্ছ ভুত জাতি আর আমরা মানুষ ।
মুচকি হাসির শব্দ হল এবং কানাভুত বলল, তাতে কি হয়েছে, আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি তুইও ক্লাস ফাইভে পড়িস । একই ক্লাসে পড়লে কি বন্ধু হওয়া যায় না? কিন্তু তার আগে তুই বল আমাকে কেন বন্দি করে এনেছিস ? অবশ্য তিন কুলে আমার কেউ নাই, বাবা মা ভাই বোন সবাইকে কাচু মুন্সি তাবিজ করে মেরে ফেলেছে । এবার নতুন কুড়ি মানে ভুতের নতুন কুড়িতে বাদাম আর পানি বেচতে এসেছিলাম কিন্তু শয়তান কাচু মুন্সি আমাকে ধরে এই পানির বোতলে আটকে দিয়েছে । এখন তুই-ই বল এটা কি ঠিক হল? আমি বিরক্ত ভরে বললাম, না ঠিক হয় নাই, কিন্তু তুমি আমাকে তুই তুই করে বলছ কেন? ঘনিষ্ঠতা ছাড়া কেউ তুই তুকারি করলে আমার ভালো লাগে না, অনেক রাগ হয় ।

একবার আমাদের হেডস্যার আমাকে তুই করে বলেছিল বলে আমি দুদিন স্কুলে যাইনি, পরে অবশ্য বাবা হেডস্যার কে সব খুলে বলেছিলেন, তারপর থেকে হেডস্যার আমাকে তুমি করে বলেন । অথচ সামান্য একটা পুচকে ভুতের বাচ্চা কিনা আমাকে তুই করে বলছে । যাক কি আর করা ভুতের বাচ্চা বলে কথা । সহসা কানাভুত বলল, কিরে কোন কথা বলছিস না যে? তোর কি শরীর খারাপ নাকি আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না? চল আজ থেকে আমরা দুজনে বন্ধু হয়ে যাই । আমি উত্তর দিলাম, তুই করে বললে আমার ভালো লাগে না, বন্ধু হব তবে.. ; ভুতের বাচ্চা বলল, তবে কি? তোকে তুই করে বলব না, এইতো? ঠিক আছে যা আজ থেকে তোকে আর তুই করে বলব না । এখন এক কাজ কর আমাকে এই বোতলের ভিতর থেকে বের করে দে । আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম কেন..কেন?
-কেন আবার বাইরে বের হব । তোর সাথে খেলব, একই বিছানায় ঘুমাব, একসাথে খাব, স্কুলে যাব, আরও শুনবি?
-না..না..থাক আর শুনতে হবে না । কিন্তু তুমি যদি মুক্ত হয়ে চলে যাও আর না আসো । ধমকের সুরে কানাভুত বলল, কিযে বলিস, ভুত পুষতে এনেছিস আর এটা জানিস না যে ভুতেরা সমাজ ছেড়ে এলে আর সমাজে যেতে পারে না, তাছাড়া আমি আর তুই তো বন্ধু, বন্ধুকে ছেড়ে কি কখনও যাওয়া যায়, বল?
ঠিক এমন সময় আম্মা ও ঘর থেকে বললেন, কিরে কার সাথে কথা বলছিস । আমি তাড়াতাড়ি বাতি নিভিয়ে দিলাম কিন্তু ঘুম আসছে না । কারণ গল্পের ভুত নয়, বাস্তব ভুত আমার সাথে বাস করছে । হঠাৎ নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম, গরর…ররর…র.. হুস…স.. , নাক ডাকার শব্দ শুনে কিছুটা অবাক হলাম কারণ আমাদের বাড়িতে কেউ নাক ডাকে না । তখন বুঝতে পারলাম এটা কানাভুতের নাক ডাকার শব্দ । পরদিন ভুতের বাচ্চাকে মানে কানাভুতকে নিয়ে কি কি করব তা চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা আর টের পাইনি । অবশ্য ঘুমিয়ে গেলে টের পাওয়া যায় না কি ভাবে ঘুম এল । একদিন বিছানায় শুয়েছি রাত ১০:৩০ মিনিট বাজছে, হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা হল মানুষ কি ভাবে ঘুমায়, ঘুম কিভাবে আসে, কেন ঘুম আসে, কখন আসে দেখতে কি রকম ইত্যাদি, ইত্যাদি । কিন্তু ১০:৩০ থেকে ১২:০০ বাজতে চলল, ঘুম আর আসে না । তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা আর টের পাইনি ।

৪.
সকালে দেখি পানির ফ্লাক্স নেই । কোথায় গেল পানির ফ্লাক্স, খুঁজেও পেলাম না, মা কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন অঞ্জনা ধুতে নিয়ে গেছে । অঞ্জনা হচ্ছে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার মানে কাজের মেয়ে । কাজের মেয়ে বলা আমাদের বাসায় নিষেধ, এটা আমার বাবার হুকুম, তাই আমি কারও সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলি ও হচ্ছে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার । অদ্ভুত তার কাণ্ড কারখানা, একদিন তাকে কফি বানাতে বলায় সে কফি বানিয়ে তা ছাকনি দিয়ে ছাঁকছে কিন্তু কোন কফি দানা পাচ্ছে না বলে সেই খানেই মাথায় হাত দিয়ে বসে সূরা ইয়াসিন পড়ছে । প্রথম প্রথম যখন সে আমাদের বাড়িতে এসেছিল, একদিন সকাল বেলার ঘটনা, বারান্দায় একশ পাওয়ার এর বাতিকে সে ফু দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করছে, নিভছে না বলে তাকে খুবই উৎকণ্ঠা মনে হল, আমাকে দেখে বলল, ভাইজান কুফি ডা মানে হারিকেন ডা নিভাইতে পারলাম না, অনেক বার ফু দিছি কিন্তু নিভে না, এহন কি লতে ধইরা টান দিমু? তার কথা শুনে আমি তো ‘থ’ হয়ে গেলাম কারণ লত বলতে সে বিদ্যুতের তার কে বোঝাচ্ছে । যাক্ এসব কথা কিন্তু চিন্তা হচ্ছে এখন আবার আমার পানির ফ্লাক্স মানে কানাভুত নিয়ে না জানি কি করছে । অঞ্জনা..এই অঞ্জনা..তুমি কি আমার পানির ফ্লাক্স ধরেছ? আমি জিজ্ঞেস করলাম । অঞ্জনা বলল, জ্বে ভাইজান, আম্মাজান কইল আইজ আফনের স্কুল বন্ধ তাই ধুইয়া দিতে ।
-কিন্তু কোথায় পানির ফ্লাক্স?
-জ্বে, ছাদে শুকাইতে দিছি ।
অঞ্জনা বসে বসে চিরুনি দিয়ে উকুন আনছে আর কটাস কটাস করে মারছে । দেখে আমার ঘেন্না লাগছে । মনে হয় যেন তার মাথা একটা উকুন সমুদ্র । তা থেকে হাজার বিলিয়ন উকুন মারলেও কমবে না । আচ্ছা একটা পরিসংখ্যান করলে কেমন হয়, যদি একজন মানুষের মাথায় ১০০টি উকুন থাকে তাহলে প্রতিদিন দশটা করে মারলে দশদিনে তা শেষ হবার কথা কিন্তু বাকি ৯০ টা হতে দৈনিক গড়ে ১০০০ টা ছোট উকুন মানে বেবী উকুন জন্ম নিচ্ছে, কাজেই যা করতে হবে তা হল সমূলে ধ্বংস করতে হবে । অর্থাৎ মাথার চুল ফেলে দিতে হবে বা উকুন নাশক শ্যাম্পু দিতে হবে । কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে কানাভুত কে নিয়ে, নিশ্চয়ই সে ছাড়া পেয়ে উড়ে গেছে । হঠাৎ কানে কানে কে যেন বলল, কি রে কি ভাবছিস, আমি চলে যাইনি । আমি বললাম, কিন্তু তুমি তো চলে যেতে পারতে ।
-পারতাম কিন্তু যাইনি, কারণ শত হলেও তুই আমার বন্ধু । চল আমরা বাইরে থেকে ঘুরে আসি ।
-কিন্তু মা যদি বকা দেয়, এই সাত সকাল বেলা বাইরে বের হলে ।
-বকা দিবে না, চল্ ।
তারপর দুজনে মানে আমি ও কানাভুত গ্রামের এক পুরনো রাজ বাড়িতে ঘুরতে গেলাম । অনেক পুরনো প্রায় দুশো বছর আগের । কানাভুতের সাথে রাজ বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে অনেক কথা হল, কানাভুত হঠাৎ বলল, জানিস এই রাজ বাড়িটা আমাদের ছিল ।
আমি স্তম্ভিত গলায় বললাম, কিভাবে? কানাভুত অনেক উৎসাহ নিয়ে বলল, কিভাবে? শুনবি? আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই শুনবো ।
-এই বাড়ির মোট সদস্য ছিল বারোজন তাদের মধ্যে আমার চারজন চাচা-চাচীও ছিলেন । আমি ছিলাম আমার বাবা মা’র ছোট ছেলে, দাদা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন । দাদার নাম ছিল শায়েব উদ্দিন খান আর বাবা’র নাম ছিল নওয়াব উদ্দিন খান । চাচারা ধন সম্পত্তির লোভে আমাকে এবং আমার বাবা মা’কে বিষ খাইয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল । সেখানে আমাদের লাশ শেয়াল কুকুর আর শকুনেরা খুবলে খুবলে খেয়েছে । তারপর আমরা ভুত হয়ে গেছি এবং প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মানুষদের শান্তিতে থাকতে দেব না ।

-মানুষ কি মরলে ভুত হয়ে যায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম ।
-না, সব সময় হয় না । যখন তার আত্মা অতৃপ্ত থাকে এবং তাকে কবর দেয়া হয় না, তখন সে ভুত হয়ে যায় ।
ভয়ে আমার বুক ধুক্ ধুক্ করছে । আমি তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম, তার পর কি হল?
-তারপর, এইতো কদিন আগে আমার বাবা মা’কে কাচু মুন্সি তাবিজ করে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে । অবশ্য আমরা আমাদের চাচার বংশধরদের কাউকেই বাঁচতে দেইনি ।
-কিন্তু তুমি তো এখন ক্লাস ফাইভে পড়, এসব ভুতুরে ঝামেলায় যাওয়া কি ঠিক?
-না, ঠিক না । তবে …
-তবে কি?
-থাক না এসব কথা । আসল কথাইতো তোকে বলা হল না । আজ তোদের বাড়িতে সমরেশ বাবু আসবেন তোর নামে নালিশ করতে ।
-সমরেশ বাবু মানে আমাদের অংক স্যার । কিন্তু উনি আমার নামে নালিশ করবেন কেন?
-কারণ, তুই এবার অংকে ডাব্বা মেরেছিস ।
-কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে ডাব্বা মারিনি । পড়তে তো ভালো-ই লাগে, মুখস্থও হয় কিন্তু পরীক্ষার হলে গেলে সব ভুলে যাই ।
-হুম্ বুঝতে পেরেছি, চল্ বাড়িতে যাই । বাড়ি গিয়ে একটা উপায় বের করতে হবে ।

৫.
ড্রয়িংরুমে সমরেশ স্যার, বাবা, মামা, আমি ও কানাভুত । সমরেশ স্যার কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে, দেখুন জালাল সাহেব পড়ালেখা ছাড়া আমাদের দেশে কোনো গতি নাই । সবাইকে শিক্ষিত করার জন্য সরকার কত কিছু করছে আর আপনার ভাগনে অংকে ডাবল জিরো পেয়েছে । আমি মাথা নিচু করে কানাভুতের সাথে কথা বলছিলাম । কানাভুত তুমি আমাকে বাঁচাও । হঠাৎ বাবা হুংকার দিলেন, কি রে, সমরেশ স্যার এটা কি বলছেন? মাথা নিচু কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল, অংকে নাকি ডাবল জিরো পেয়েছিস? আমি ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, হঠাৎ সমরেশ স্যার এর কথাবার্তা কেমন যেন বদলে গেল । সমরেশ বাবু বললেন, আহা থাক্ না, এত ধমকা-ধমকির কি আছে, এবার ভালো নাম্বার পায়নি পরের বার পাবে । টমাস আলভা এডিসন বলেছেন, শুধু কয়েকটা পরীক্ষার খাতা কারও ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না । তাছাড়া আইনস্টাইন, নিউটন, সবাই অংকে ফেল করেছিল । বাস্তব জীবনে তারা ভালো ছাত্র ছিল না ।
জালাল মামা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন এবার তিনি বললেন, তার মানে বলতে চাচ্ছেন ও বড় হলে নিউটন, আইনস্টাইন হবে?
সমরেশ বাবু পরিস্থিতি সামলে উত্তর দিলেন, না ঠিক তা না, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি ওকে অংকটা পড়াতে চাই । অংকে কিভাবে ভালো রেজাল্ট করতে হয় তা আমি জানি । সমরেশ বাবু একটা শয়তানি হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন, যার অর্থ হাড্ডি আর মাংস আলাদা, হাড্ডি গার্জিয়ানের আর মাংস আমার । আমি বুঝতে পারলাম কপালে শনি লেগেছে । সমরেশ স্যার অনেক স্টুডেন্টকে মেরে অজ্ঞান করার রেকর্ড আছে তার । ছাত্রছাত্রীদের মেরে উনি একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পান । তবে সব স্যার এক রকম না, এক্ষেত্রে ফয়সাল স্যার অনেক সহজ সরল আর ছাত্রছাত্রীদের অনেক যত্ন করে পড়ান । উনার কথা হচ্ছে স্টুডেন্টদের মারধর করা হচ্ছে মধ্যযুগের বর্বর কায়দা । এটা আধুনিক যুগ, এ যুগের ছাত্রছাত্রীরা শিখবে খেলার ছলে । যাই হোক সমরেশ স্যার চলে গেছেন, কাল থেকে উনি পড়াবেন । মনে হচ্ছে উনি স্কুল ছুটির পরপরই চলে আসবেন মানে বিকালে ঘুরতে যাওয়া বা খেলাধুলা বন্ধ । শুনে খুবই মন খারাপ হল । রাতের খাবার খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম কি করা যায়? এমন সময় কানাভুত বলল, কি রে, কি ভাবছিস? কাল থেকে খেলা বন্ধ এটা নিয়ে চিন্তা করছিস, তাই না?
-হ্যাঁ, তাই নিয়ে ভাবছি ।
-ভাবার কিছু নাই, আমি সমরেশ স্যার কে এমন ভয় দেখাব যে ভয়ে প্যান্টে হিসু করে দিবে । উনার ব্যবস্থা আমি করছি বলে কানাভুত কোথায় যেন চলে গেল । কানাভুত.. ও.. কানাভুত.., বার কয়েক ডেকেও কোনও সাড়া পেলাম না ।
পরদিন স্কুলে আর সমরেশ স্যার কে দেখা গেল না । বিকালে খবর এল স্যার এর জ্বর হয়েছে । তাই উনি আসতে পারবেন না । মনে হচ্ছে কানাভুত কিছু একটা করেছে, হয়তো ভয় দেখিয়েছে । পরীক্ষায় পাশ করার জন্য একবার তাবিজ এনে দিল কানাভুত । এরপর থেকে সব বিষয়ে ভাল রেজাল্ট হতে থাকল । রোল নং ৬০ থেকে সোজা ৭ হয়ে গেল । বাড়ির সবাই হতবাক । কিভাবে এত ভাল রেজাল্ট হল । জালাল মামা একদিন জিজ্ঞেস করলেন, কিরে স্যার ছাড়া এত ভালো রেজাল্ট করলি কিভাবে? আমি উত্তর দিলাম, এমনি । মামা বললেন, এমনি না, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে । আমি মুখ ফসকে বলে ফেললাম, কানাভুত একটা তাবিজ এনে দিয়েছে । এটা শুনে জালাল মামা খুবই বিরক্ত হলেন, কারণ উনি একজন বিজ্ঞানী মানুষ । উনার নিজস্ব ল্যাব আছে । ভুত বিষয়ে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নাই তাই উনি ভুত বিশ্বাস করেন না । উনি বললেন, তোর মানুষিক সমস্যা হচ্ছে, এটাকে বলে হ্যালুসিনেশন, তুই অদ্ভুত কিছু দেখছিস বা শুনতে পাচ্ছিস, এটা তোর উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র । অথবা সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে । আমি বললাম, না মামা,আমি সত্যি-ই ভুতের সাথে কথা বলেছি, ওর নাম কানাভুত, এক চোখ কানা তাই কানাভুত, যেমন কানা বগির ছা-এর একচোখ কানা ঠিক তেমন । ও অনেক ভালো ভুত, ওকে আমি পোষার জন্য এনেছি । মামা বিরক্ত হয়ে বলল, কি যাতা বকছিস, পোষার জন্য এনেছিস মানে?
-মানে ভুত পোষা, বাসায় এনে কোন ভুতকে পুষে রাখা । যদি বুনো ভুত হয় তাহলে পোষ মানবে না আর যদি গৃহপালিত ভুত হয় তাহলে পোষা যাবে । এটা গৃহপালিত ভুত ।
-মামা অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিলেন, আরে বোকা ভুত বলতে কিছু নাই । এই গুলা ফালতু কথা । কোথায় তোর ভুত ওকে ডাক, দুচারটে কথা বলি । হা….হা…. এগুলি অবাস্তব বিষয় ।
আমি অনেক চেষ্টা করেও মামার সাথে সামনা সামনি পরিচয় করিয়ে দিতে পারিনি । কানাভুত মামার সাথে কথা বলতে রাজি না, কারণ যারা ভুত বিশ্বাস করে না তাদের সাথে কানাভুতের কথা বলতে ভালো লাগে না । মনটা অপমানে আর রাগে গজগজ করতে লাগল । কানাভুতের উপর ভীষণ রাগ হল । মামা আমার অবস্থা দেখে বললেন, ঠিক আছে তুই যদি এমন কোন অস্বাভাবিক কাজ করে দিতে পারিস তাহলে ভাববো কানাভুত সত্যিই আছে । আমি বললাম, কি কাজ করতে হবে, বল?
-ধর আমি নদীতে যাব কালকে, আমার হাতের ঘড়িটা নদীতে ফেলে দেব, যদি কানাভুত সেটা পানির নীচ থেকে তুলে আনতে পারে, তাহলে আমি বিশ্বাস করব যে ভুত বলতে সত্যিই কিছু আছে ।
আমি বললাম ঠিক আছে । আগামীকাল তোমাকে আমি প্রমাণ দেব যে কানাভুত সত্যিই আছে । রাতে ফিসফিসিয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা মা’র কাছে ধরা খেয়ে গেলাম । আমি ভুতের সাথে কথা বলি, বাবা জালাল মামাকে বললেন, ওর কি কোন সমস্যা হচ্ছে নাকি? জালাল মামা উত্তর দিলেন, আমি সব দেখছি, মনে হচ্ছে ওর সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে তবে ঘাবড়ানোর কিছু নাই । আমার কাছে এর ঔষধ আছে, তাছাড়া আমার এক বন্ধুর বাবা মানসিক রোগের ডাক্তার ।

৬.
পরদিন বিকালে নদীতে মামা ও আমি আর কানাভুত । কানাভুত অদৃশ্য বলে তাকে দেখা যাচ্ছে না । ভুতেরা বায়বীয় পদার্থের তৈরি, হ্যালোজেন জাতীয় গ্যাস তাই ভেসে থাকতে পারে । অনেকটা টিউব লাইটের ভিতরের গ্যাসের মত আয়নাইজড হলে উজ্জ্বল সাদা দেখায় তবে ভুতের ক্ষেত্রে নীলাভ সাদা দেখায় । চাঁদনি রাতে খুব খেয়াল করলে ভুতদের অবয়ব দেখা যায় কারণ তখন তারা চাঁদের আলো খেয়ে আয়নাইজড থাকে । অবশ্য এ সব ধারনা সম্পূর্ণ আমার নিজের থেকে । ভুত নিয়ে ছোট থেকে অনেক গবেষণা করতে করতে আমি এ ধারনায় উপনীত হয়েছি যে ভুত আছে, হতে পারে তারা এলিয়েন অথবা প্রেতাত্মা ।
যাই হোক, কানাভুতের কথা আমি শুনতে পাচ্ছি কিন্তু জালাল মামা শুনতে পাচ্ছেন না, কে জানে হয়তো না শোনার ভান করে আছেন । অনেকটা আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকদের মত, যখন কোন সাধারণ মানুষের সমস্যা হয় তখন তারা কানে শোনে না । হয়ত জালাল মামা বিজ্ঞানী মানুষ তাই শুধু কানে শুনে বা চোখে দেখে উনি ভুত বিশ্বাস করছেন না । উনি ওনার হাতের ঘড়ি টা পানিতে ছুড়ে ফেলে দিলেন, ঝপাং করে একটা শব্দ হল, তারপর ঘড়িটা পানিতে তলিয়ে গেল । আমার দিকে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, হে…হে…..এই বার আমার হাত ঘড়িটা ফেরত আনতে বল তোর কানাভুতকে, দেখি বেটা পারে কিনা ।
কিছুক্ষণ পর আমি আমার প্যান্টের ভিতর থেকে একটা ঘড়ি বের করে মামার হাতে দিলাম, এই যে তোমার ঘড়ি । মামা আমার হাতে তার ঘড়ি দেখে খুবই অবাক । তার মুখ শুকিয়ে গেল । তিনি ঘড়িটা নিয়ে সোজা বাসায় চলে এলেন, কোন কথা বললেন না । মনে হচ্ছে তার এখন বিশ্বাস হয়েছে । কিন্তু উনি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না । এরপর ঐ দিন রাতেই উনার শরীরে জ্বর এলো । উনি অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে গেলেন । আমাকে ডেকে পাঠালেন তার রুমে । আমি উনার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম । মামা জিজ্ঞেস করলেন, তোর কি ধারনা ভুত সত্যিই আছে? আমি উত্তর দিলাম, জ্বি, অবশ্যই । ভুত আছে । অবশ্যই আছে । উনার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে থাকল । ভাবলাম উনাকে সত্যি কথা টা বলি । নইলে উনি ধীরে ধীরে মারাও যেতে পারেন । তাই ৩/৪ দিন পর ওনার রুমে ডুকে বললাম, মামা, আমি তোমার সাথে মিথ্যা বলেছি । তোমার হাত ঘড়ি পানি থেকে তুলে আনা হয়নি । এটা বাবার ঘড়ি । জালাল মামা ও বাবা একই রকম ঘড়ি পড়তেন, মা কিনে দিয়েছিল । শুনে জালাল মামা পরক্ষণেই অনেক উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন, হ্যাঁ তাই তো, এখন মনে পড়েছে, তুই যখন ঘড়িটা দিয়েছিলি তখন ওটা শুকনো ছিল । যদি পানির নীচে থেকে তুলে আনে তাহলে তো ওটা ভেজা থাকার কথা । আমি বললাম, কিন্তু মামা কানাভুত সত্যিই আছে, ও বলেছে ও তোমার সাথে কথা বলবে । তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনলে তার কথা শুনতে পাবে ।
কানাভুতের সাথে মামার পরিচয় করিয়ে দিলাম । উনি এখন কানাভুতের ভক্ত । তবে উনার ধারনা উনি আমার মত মানুষিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাই ভুতের সাথে কথা বলছেন । কানাভুত ওনাকেও একটা তাবিজ এনে দিয়েছে যাতে উনি বি,সি,এস ক্যাডার হতে পারেন । ১ বছর পর উনি বি,সি,এস ক্যাডার হয়ে ট্রেনিং শেষে আমাদের সাথে ও কানাভুতের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন । ওনার কথা হল, যদি কারো কোন সমস্যা না হয় তাহলে ভুত বিশ্বাসটা বিশেষত খারাপ না । ভুতের উপর বিশ্বাস যদি কারো পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করে তোলে তাহলে সেই ভুতের সাথে কথাও বলা যেতে পারে ।
আমি ক্লাস সিক্সে উঠেছি আমার রোল নং এখন ১ ; পড়ালেখায় ব্যস্ত আমি এখন আর ভুতের সাথে কথা বলার সময় পাই না । কানাভুতের দায়িত্ব শেষ, তাই হয়ত সে চলে গেছে অচেনা কোন দেশে । হয়ত ছোট বেলার সেই ভুত আর ফিরে আসবে না কিন্তু ভুতের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝে যে দূরত্ব তা আরও কমিয়ে দিয়ে গেছে, যা আজও বর্তমান ।

ভুতুরে রাস্তা (ছবিসহ)

5

এই ছবিটি কোন ভূতুড়ে এলাকার নয়, নয় কোন পরাবাস্তব জগতের ছবি। কিন্ত অন্ধকার এই সরণী ধরে আপনি যখন এগিয়ে যাবেন তখন আপনি হয়তো সেটাই মনে করবেন! দুপাশের গাছের দাঁড়ানো সারির বুক ছিঁড়ে যে সড়কটি চলে গেছে তাঁর নাম Bregagh Road। আয়ারল্যান্ডের Armoy শহরের কাছের এই সড়ককে গত ৩০০ বছর ধরে পাহারা দিচ্ছে এর দুপাশে দাঁড়ানো বীচ (Beech) বৃক্ষ গুলি। তীব্র বাতাসে এই গাছগুলির ডালপালা যখন নড়েচড়ে উঠে তখন এখানে ভেসে উঠে আলোআঁধারির এক আধিভৌতিক খেলা।

 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই বীচ বৃক্ষ গুলি এখানে লাগিয়েছিলেন বিখ্যাত স্টুয়ার্ট পরিবার , তখন এই সড়কটি ছিল তাদের নিবাস Gracehill House এর প্রবেশ পথ। বর্তমানে এই বাড়িটি গলফ ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তখন তাঁরা কি ভাবতে পেরেছিলেন দুই শতাব্দী পরে এই গাছ গুলো পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত হয়ে যাবে এবং ফটোগ্রাফারদের কাছে হয়ে উঠবে তুমুল জনপ্রিয়?

 

কিংবদন্তী অনুযায়ী এই সড়কে রাতের বেলায় অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা সম্পন্ন সাদা গাউন পরিহিত এক রমণীকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। নিশ্চুপ এই রমণী একাকী পথ ধরে হেঁটে চলে, একটা সময় শেষ গাছটির ভিতরে ঢুকে পড়ে। অনেকের ভাষ্য মতে এই রমণীটি কাছাকাছি কোন বাড়ির দাসী ছিল , যে শত বছর আগে তার মালিকের অত্যাচারে মারা গিয়েছিলেন।

আবার অনেকের মতে মহিলাটি একটি প্রেতাত্মা যাকে নিকটস্থ এক জায়গায় কবর দেয়া হয়েছিলো। হ্যালোইন রাত্রির সময় ঐ মহিলার সাথে যোগ দেয় আরও কিছু প্রেতাত্মা যাদেরকে তাঁর পাশে কবরস্থ করা হয়েছিল এবং মারা গিয়েছিল তাঁর মত অত্যাচারিত হয়ে । সত্যিই ভুতুরে ব্যাপার ।

জনৈক ভুত বাবার সাক্ষাতকার

7

ভুতের ব্যাপারে আমার বরাবরই একটা সন্দেহ ছিল “ভুত আছে বা নেই” , বিশেষ কৌতুহলের কারণে তাই বার বার ভুত বিষয়ে লিখেছি । আসলে ভুত নেই বিষয়ে যেমন হাজারটা প্রমান দেয়া যায় একইভাবে ভুত আছে এ ব্যাপারে হাজারটা প্রমান দেয়া যাবে । আমার দাদার বাড়ী গাজীপুরের পূর্বাচলে যা এখন ঢাকার পূর্বাচল টাউন নামে পরিচিত । বছরে দুই একবারের বেশি যাওয়া হয় না । যারা পূর্বাচল টাউনে কখনও গিয়েছেন তারা জানেন সবাই যেভাবে বলে সেরকম উন্নত নয় এ এলাকা । এখানে এখনও অনেক গ্রাম আছে যেখানে অনেক ভুত বা জ্বিন বাস করে । এখনও অনেক প্রেতসাধক আছে যারা চোখের নিমিষে আপনাকে কোনও অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে সক্ষম । এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল আমার সাথে গতবছর গ্রীষ্মের সময় ।

প্রচন্ড গরমে উঠোনের এক পাশে সবাইকে নিয়ে গাছের নীচে বসে গল্প করছিলাম, চাচা চাচী, চাচাতো ভাই-বোন ও আমি । দাদা-দাদী মারা গেছেন প্রায় ১৫ বছর এর উপর হয়েছে । হঠাৎ গ্রামের এক মধ্যবয়েসী লোক উঠোনের এক পাশে দাড়িয়ে চাচাকে সালাম দেয় । উনার নাম সুশীলবাবু । পেশায় একজন মাছ ব্যাবসায়ী । চাচা ওনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন । সুশীলবাবু মাছের ব্যাবসা করেন কিন্তু নিরামিষভোজী, ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যজনক । গ্রামে ওনার আরেকটা পরিচয় আছে “প্রেতসাধক”, তবে ভয়ে কেউ সামনাসামনি এ কথা বলে না । লোকটার সাথে অনেক বিষয়ে কথা হল, এক পর্যায়ে আমি ভুত বিষয়ে জানতে চাইলে সে উত্তর না দিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে উঠে পড়ে, বলে “যাই অনেক কাজ ফেলে এসেছি” ; তার এরকম আচড়ন আমার কৌতুহল আরো বাড়িয়ে দিল । বললাম “আজকে চলে যাচ্ছেন ঠিক আছে কিন্তু কালকে আবার আসবেন, আপনার সাথে আমার কথা আছে” ; তার মুখে কোনো উত্তর শোনা গেলনা । শুধু মৃদু হাসলেন । তার হাসির অর্থ বুঝতে পারলাম না, তিনি আসবেন নাকি আসবেন না ।

পরদিন সুশীলবাবুকে আর দেখা গেল না, আমি বেশিদিন থাকবো না তাই কৌতুহল মেটানোর জন্য আমি নিজেই তার বাসায় হাজির হলাম ।সুশীল বাবু প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে বুঝতে পারলাম তিনি খুশি হয়েছেন আমি আসাতে । ওনাকে ভুত বিষয়ে আবারও একই প্রশ্ন করলাম “আপনি কি আমাকে ভুতের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন?” সুশীলবাবু আবারও হাসলেন, তার হাসির রহস্য আমি বুঝতে পারলাম না । তাই বিরক্ত হয়ে বললাম, “দেখুন, না পারলে তো লজ্জার কিছু নাই, হাসির মানে কি?” সুবললেন “আপনার কথা শুনে হাসলাম, কারণ, মনে হচ্ছে গাছে পাকা আম ঝুলে আছে আর আপনি বলছেন আমটা পেরে দিতে । যদি সত্যি আপনার আগ্রহ থাকে তাহলে আমাকে ২ ঘন্টা সময় দিতে হবে আর মিষ্টি, দই, পান-সুপারি, জ্যান্ত মুরগী একটা অথবা মুরগীর পরিবর্তে দুইটা জ্যান্ত কবুতর বলি দিতে হবে ভুতবাবার সামনে”
-এত কিছু কেন” আমি জিজ্বেস করলাম ।
-ওনারা মেহমান । আমার বাসায় আসলে ওনাদের সমাদর না করলে পরের বার ডাকলেও আর আসবে না, তাই ।
যাই হোক আমাকে আজ ভুতের সাথে সাক্ষাৎ নিতেই হবে । বাজার থেকে সব কিছু কিনে দিলাম সুশীলবাবুকে । যথারীতি ৩ ঘন্টা পর সন্ধ্যায় সুশীলবাবুর বাসায় আমি ও আমার এক চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে হাজির হলাম । সাথে কলম ও ডায়েরী, ভুত বাবার সাক্ষাৎ নেয়ার জন্য । সুশীলবাবু ধ্যানে বসে অনেক মন্ত্র পড়লেন, প্রায় ১ ঘন্টা মত হবে । ১ ঘন্টা পর ঘরের সব আলো নিভে গেল । ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল । সুশীলবাবু একটা মোমবাতিতে আগুন ধরিয়ে আমাদের সামনে রাখলেন । এক পাশে আমি, আমার চাচাতো ভাই অন্য পাশে সুশীলবাবু ও জনৈক ভুতবাবা । ভুতবাবাকে অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । তবে সুঠাম দেহের লম্বা বাবরি চুলের একজন ঠিক বোঝা যাচ্ছে । লম্বা লম্বা হাত পা, ভরাট কন্ঠে ভুতবাবা জিজ্বেস করলেন “আমাকে ডেকেছিস কেন?” আমি বললাম, “জ্বি আপনার একটা ছোট সাক্ষাতকার নেয়ার জন্যে, যদি বেয়াদবি না হয়, খুব বেশিক্ষণ লাগবে না । ভুতবাবা মনে হল ফিসফিস করে সুশীলবাবুর কানে কানে কি যেন বলছেন । সুশীলবাবু বললেন “ঠিক আছে বাবাজী বেশিক্ষণ সময় দিতে পারবেন না , উনার একটা প্রোগ্রাম আছে” ; আমি বললাম “না বেশিক্ষণ লাগবে না এই ধরেন ২০ কি ২৫ মিনিট, আমি আগে থেকেই প্রশ্ন লিখে এনেছি” ।

আমি আমার সাক্ষাতকার নেয়া শুরু করলাম । পাঠকের সুবিধার্তে সাক্ষাতকারটি হুবুহু তুলে ধরা হলঃ

জনৈক ভুতবাবার সাক্ষাতকার
সাক্ষাৎ গ্রহনকারী: সাকি বিল্লাহ্
সার্বিক সহযোগীতা ও ভুতবাবার সাথে সাক্ষাতের জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ: সুশীলবাবুকে ।
-আপনাকে আমরা কি বলে ডাকবো?
-আমাকে তোমরা ভুতবাবা বলে বা বাবাজী বলে ডাকতে পারো ।
-আমরা কি আপনাকে সালাম দিব নাকি নমষ্কার দিব?
-ভুতদের আসলে কোন ধর্ম নাই, দুনিয়ার সব ভুত পরস্পর ভাই ভাই । তবে মানুষের যেহেতু ধর্ম আছে তাই যার যে ধর্ম সেই অনুযায়ী ডাকতে পারো । যেমন হিন্দু হলে নমস্কার, মুসলমান হলে সালাম দিতে পারো ।
-আসসালামু ওয়া আলাইকুম
-ওয়া আলাইকুম আসসালাম
-আপনার সম্পূর্ণ নাম কি ?
-হা—হা—-, ভুতদের কোনো নাম থাকে না, আমাদের বিভিন্ন জাত রয়েছে, যেমন মেছো ভুত, সরষে ভুত, কানা ভুত, মাথাকাটা ভুত, শাকচুন্নী ভুত, পেত্নী ভুত । তবে আমরা নামের জন্য ভুত প্রোটোকল ব্যাবহার করি, যেমন ধরো, ছোটভুত, মাঝারিভুত, বড়ভুত, আবার নীলভুত, লালভুত, কালো বা সাদাভুত, সব কিছু হিসেব করে আমাদের একটা ইউনিক আইডি দেয়া হয় । যেমন ধরো আমার আইডিঃ ভুতভুতং-সাদা-মাঝারি-গ-০১৭০ এটা আমাদের ভুত কল্যাণ সংস্থা থেকে দিয়ে দেয় ।
-খুবই সুন্দর নিয়ম । নামেই সব কিছু বোঝা যাচ্ছে ।
-হ্যাঁ । আমাদের বিশ্বকবি “ভুতকবিং-বড়-সাদা-র-০১৯০” তাই বলেছেন, “বৃক্ষ তোমার ফল কি নামে পরিচয়”
-কথাটা মনে হচ্ছে রবি ঠাকুরের কিন্তু কেমন একটু উল্টো পাল্টা লাগছে ।
-কথাতো উল্টোপাল্টা লাগবেই কারন এটা ওনারই লেখা বানী । কিন্তু উনি মরে ভুত হওয়ার পর ওনার নাম দেয়া হয়েছে “ভুতকবিং-বড়-সাদা-র-০১৯০” আর উনি ভুত হওয়ার পর থেকে কবিতা ও বাণীতে কিছু পরিবর্তন এনেছেন ।
-হুম্ । যাই হোক আপনার মাতাপিতার পরিচয়?
-মাতা ভুত হয়েছেন গত বছর কিন্তু পিতা এখনও জীবিত তাই ভুত হওয়ার ১নং শর্ত উনি এখনও পূরণ করতে পারেননি । তাছাড়া ভুত হওয়ার বেশ কিছু শর্ত আছে । এগুলো মানতে পারলে ভুত হওয়া যায় ।
-শর্তগুলো কি ব্যাখ্যা করা যাবে, দেশ ও জাতির ভবিষ্যত ভুতদের কথা চিন্তা করে ?
-আলবৎ যায় । আমাদের সংখ্যা বাড়াতে আমি যেকোন কাজ করত আগ্রহী । প্রধান প্রধান শর্তগুলো হচ্ছে একজন ভুত হতে হলেঃ
১/ যেকোনো মারাত্বক দুর্ঘটনায় মৃত হতে হবে মানে স্পট ডেথ ।
২/ হত্যা, গুমখুন হলে তার ১ বছর পর প্রাথমিক ভুত হিসেবে আবেদন করতে পারবে ।
৩/ নিবন্ধিত ভর্তি ফরম পূরণ করে ভুত সংগঠনের সদস্য হতে হবে ।
৪/ কমপক্ষে ১৫-২০ জন মানুষকে ভয় দেখাইয়া প্যান্টে বা কাপড়ে ইয়ে সারাইতে পারিলে ।
৫/ ভুতের ব্লগের নিয়মিত পাঠক হিসেবে পুরস্কৃত হইলে ।
ইত্যাদি..ইত্যাদি…..
-শর্তগুলো মানা খুবই কঠিন ব্যাপার । যাই হোক আপনার প্রিয় ফল?
-মাকালফল ।
-প্রিয় ফুল?
-সরষেফুল
-প্রিয় খাবার?
-চাঁদের আলোর সাথে কাঁচা ইলিশ মাছ ।
-প্রিয় রং?
-কালো, নিকষ কলো [হে…হে….]
-হাসলেন যে, কারন কি?
-হে…..হে… কালো ঘুট ঘুটে অন্ধকারেইতো মানুষদের বেশি ভয় দেখানো যায়, তাই ।
-হুম্–, প্রিয় ব্যক্তিত্ব?
-ঠাকুমা ।
-যদি কিছু মনে না করেন, ঠাকুমা আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব কেন?
-কারন উনিই প্রথম আমাদের নিয়ে গল্প লিখেছেন “ঠাকুমার ঝুলি” ।
-বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভুতের সংখ্যা কত?
-এটা বলা খুবই কঠিন কারন প্রতিদিন যে হারে মানুষ গুমখন হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে তাতে সংখ্যা বেড়েই চলছে । তবে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে, ….হুম….ভুতভুতং…ভুতভুতং….প্রায় ৫১৯৮১৮২০ জন ভুত রয়েছেন ।
-খুবই ভয়ের কথা । এভাবে ভুত বাড়তে থাকলে এক সময় বাংলাদেশে শুধু ভুতেরা বাস করবে আর মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
-তোমার আরো প্রশ্ন থাকলে করতে পারো । আমার তাড়া আছে । ভুত কল্যাণ সমিতির একটা অনুষ্ঠান আছে “ভুতনৃত্য” বেলী ড্যান্স, শেওড়া গাছের মগডালে । আমাকে সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে ওরা ইনভাইট করেছে ।
-আমি আপনাকে আর বেশিক্ষণ ধরে রাখবো না । শেষ দু-তিনটে প্রশ্ন, আপনাদের মানে ভুতদের দিনের বেলায় দেখা যায় না কেন?
-দিনের বেলায় আমরা ঘুমাই আর রাতের বেলায় কাজ করি কারন আমরা নিশাচর প্রাণী, তবে কিছু কিছু ভুত আছে যারা ওভার টাইম মানে দিনের বেলাতেও কাজ করে ।
-বুঝতে পেরেছি । আচ্ছা মানুষদের ভয় দেখিয়ে আপনাদের কি লাভ? মানুষ ও ভুত কি বন্ধু হতে পারে না?
-(উত্তেজিত হয়ে) না-আলবত না, ভুত ও মানুষ কখনও বন্ধু হতে দেয়া যায় না । তবে ইদানিং কিছু বাজে ভুত, যারা ভুত নামের কলঙ্ক, মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব করছে যা কিনা ভুত এর অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরুপ, এটা ঠিক না । ভেবে দেখো মানুষই আমাদের ভুত বানিয়েছে, তারপর আবার কিছু কিছু সন্নাসী ও কবিরাজগণ আমাদের বোতলে ভরে রাখতেও দিধা করে না । সেই মানুষ তো আমাদের বন্ধু হতে পারে না । আমি যাচ্ছি অন্য একদিন হয়ত দেখা হবে । বিদায় বৎস ।
মনে হল ভুতবাবা খুবই রাগ করেছেন এ ধরনের প্রশ্ন করাতে । তিনি তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন, মোমবাতি নিভে গেল । সুশীলবাবু এবার হ্যারিকেন জ্বালালেন । বাইরে বৃষ্টি হবে হয়ত । চারদিকে নিঝুম অন্ধকার । বাড়ীতে চলে আসছি, রাস্তা এগিয়ে দিচ্ছেন সুশীলবাবু, তার হাতে হ্যারিকেন । বাড়ীর প্রায় কাছাকছি চলে এসেছি, সামনে পুকুরপাড়ের উল্টো দিকে একটা শেওড়া গাছ চোখে পড়ল । হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানিতে এক ঝলক আলোয় মনে হল শেওড়া গাছের মগডালে একঝাক ভুত নৃত্য করছে, বেলী ড্যান্স, চারদিকে অনেক ভুতেরা বসে তা দেখছে আর মধ্যিখানে বসে আছেন প্রধান অতিথি জনাব ভুতবাবা ।

ভুতংগম (পর্ব ০২)

7

আজ ৬ মাস হয়েছে পত্রিকা অফিসে আর যাইনি । সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পিয়ন দরজার নীচ দিয়ে দুটি চিঠি দিয়ে গেছে । একটিতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” প্রাপকে আমার নাম, ঠিকানা, কিন্তু প্রেরকের কোনো ঠিকানা দেয়া নেই । খুবই অবাক ব্যাপার । অন্যটা এসেছে “সূর্যের দিন” পত্রিকা অফিস থেকে । জরুরী যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে । প্রেরক, সম্পাদক সাহেব, “সূর্যের দিন” পত্রিকা । চিঠি দুইটি টেবিলের উপর রেখে বাথরুমে ঢুকে গেলাম ফ্রেশ হয়ে সোজা নাস্তার টেবিলে, বাবা নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছেন তাই আর দেরী করলাম না । “তোমার পড়ালেখার কি খবর?” বাবা নাস্তা করতে করতে জিঞ্জেস করলেন । আমি উত্তর দিলাম “জ্বি ভালো, দুদিন ছুটি আছে তাই ভাবছি, নানুকে দেখে আসবো”, বাবা কোনো কথা বললেন না । শুধু আ্ওয়াজ করলেন “হুম” ।

নাস্তা সেরে ঠিক করলাম নানুকে দেখতে যাওয়ার আগে পত্রিকা অফিস হয়ে যাবো । সাথে কিছু টাকা, ব্যাগ, টর্চলাইট, সেভিং এর সরঞ্জাম, মোবাইল চার্জার, প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম । সেবার শ্যামপুরে যাওয়ার সময় অনেক কিছুই সাথে ছিল না । তাই এবার মনে করে প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম মগবাজার পত্রিকা অফিসের উদ্দেশ্যে । পত্রিকার সম্পাদক সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত আমার উপর, আমি দীর্ঘদিন কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখিনি । তবে আমার ফিচার শ্যামপুরের সেই ঘটনা নাকি ওনার কাছে খুব ভালো লেগেছে তাই তিনি আবার আমাকে ডেকেছেন । বিশেষত আমার বেতন খুব সামান্য তবে ফিচার জমা দেয়ার পর এককালীন বিশেষ একটা সম্মাননা ভাতা দেয়া হয় । আমার মনে হল আসলে আমার লেখা নয়, অদ্ভুদ ভুতুরে কোন সংবাদ সংগ্রহের জন্য উনি আমাকে ডেকেছেন । আমি জানি আমি ছাড়া আর কেউ এ ধরনের সংবাদ বা ফিচার সংগ্রহের জন্য রাজি হবে না । একবার ভাবলাম চাকুরীটা ছেড়ে দেই কিন্তু সম্পাদক সাহেব বিশেষত আমার উপর আশা করে আছেন তাই তাকে আর নিরাশ করলাম না । বললাম “নানুর বাসায় যাচ্ছি নরসিংদীতে, সেখানে কালীমন্দিরের কাছে শ্বশানঘাটে নাকি ভুতুরে সব ঘটনা ঘটে, যদি সময় পাই একবার যাব, অদ্ভুত ফিচারের জন্য”  শুনে সম্পাদক সাহেব খুব খুশি হলেন বিদায় জানিয়ে প্রথমে বাসে পরে ট্রেনে ঘোড়াশাল পৌঁছলাম । সেখান থেকে অটোরিক্সায় সোজা নানুর বাড়িতে । নানু অনেক খুশি হলেন, দুদিন থাকবো শুনে । বাজার করার মতো কেউ নেই, তাই পাশের বাড়ির এক আত্মীয় সম্পর্কে মামা হয়, তাকে নিয়ে বাজারে গেলাম । তার নাম মোবারক, বয়সে আমার সমান হবে । নানু কে না বলে আমি মোবারক মামাকে সাথে নিয়ে রিকসায় বাজারে চলে এলাম । যাবার সময় অনেক ব্যাপারে মোবারক মামার সাথে কথা হল । কালীমন্দির, শ্বশানঘাট ও বাশঁ ঝাড়ের নীচে কবরস্থান নিয়েও অনেক কথা হল । রীতিমত গাঁ শিউরে উঠে সে গল্প শুনে । কিন্তু আমি প্রমানে বিশ্বাসী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এগুলো মানুষের ভ্রান্ত ধারনা । গল্প করতে করতে আবার রিকসা নিয়ে বাজার করে নানুর বাড়িতে চলে এলাম । তখন সবেমাত্র দুপুর ১২টা বেঁজেছে । মোবারক মামাকে বললাম আমি এখানে কেনো এসেছি । শুনে উনি হাসলেন । বললেন অহেতুক ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কি ? বেড়াতে এসেছেন, কয়েকদিন আনন্দ করে যান ।

দুপুরে খাওয়ার সময় উনাকে আর খুঁজে পেলাম না । কিছুক্ষণ পর মোবারক মামা হাজির, আমি ওনাকে আমার চিঠিটা দেখালাম যেটাতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” সে চিঠিটা দেখে “থ” হয়ে গেল, এই লেখাটা তো মনে হয় কোথাও দেখেছি । ওনার ধারনা এ লেখাটা উনি কোনো একটা কবরের উপর ফলকে দেখেছেন, তবে কোন কবরে তা আর এখন মনে করতে পারছেন না । কিন্তু কবরস্থানের নামটা তার নাম মনে আছে । আমি কিছুটা ভয় পেলাম কারণ এ ধরনের চিঠি আমাকে কোন মৃত মানুষের কবর থেকে পাঠিয়েছে তা ভেবে । তবে তা সামলে নিয়ে মোবারক মামাকে বললাম “মামা যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কাল সকালে বা বিকেলে ওই কবরস্থানে একটু ঘুরে দেখতে চাই” , তিনি কিছুটা বিমর্ষভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনার কি মাথা খারাপ, ওখানে কেউ যায় নাকি? এখন তো মানুষ কবর দিতেও ওখানে যায় না, তবে যদি দিনের বেলাতে মানে সকালে যান তাহলে সাথে যেতে পারি” , আমি তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে পরের দিন সকালে যাব মনস্থির করলাম ।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম মোবারক মামার জন্য । নানুকে শুধু বললাম ঘুরতে যাচ্ছি, বিকেলেই চলে আসবো । নানু কিছু বললেন না, শুধু বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস্ । মোবারক অনেক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হল । বললাম এতক্ষণ দেরী হল কেন? ।, সে বলল, ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে তাই । নানুকে বিদায় জানানোর সময় মোবারককে বললাম ভিতরে যেতে, নানুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য । সে বলল “উনি মুরুব্বী মানুষ আমাকে নাও চিনতে পারেন, অনেকদিন দেখেন নাতো আর অহেতুক দেরী করে লাভ কি, আমাদের আগে আগে ফিরতে হবে” , আমি আগেও লক্ষ্য করেছি মোবারক মামা নানুর সামনে যেতে চান না । কেন চান না বুঝতে পারলাম অনেক পরে । যাই হোক ঘর থেকে বের হলাম, দুপুরে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার নিয়ে ব্যাগে রাখলাম, সাথে দুই লিটারের এক বোতল মিনারেল ওয়াটার । মোবারক মামাকে জিঞ্জেস করলাম রিকসা নিতে হবে কিনা ? মনে হল তিনি আমার কথায় বেশ মজা পেয়েছেন । তাই বঁত্রিশ দাঁত বের করে হাসছেন, বললেন “আপনার কি ধারনা পরিত্যক্ত একটা কবরস্থানে রিকসা বা গাড়ী যাওয়ার মনোরম রাস্তা থাকবে, হা…হা….হা..” , আমি কিছুটা বিব্রত হলাম, বললাম “ঠিক আছে চলেন যেভাবে যাওয়া যায়, যদি হেটে যেতে হয় তাহলে আমার কোন সমস্যা নেই” ।

আমরা হাটতে থাকলাম । আমার শরীর ক্লান্ত আর ঘামে ভিজে চুপসে গেছে সারা শরীর আর জামাকাপড়, তবুও হাটছি আর হাটছি । মোবারক এ গ্রামেরই ছেলে তাই হয়তো তার শরীর কোন ঘাম নেই । সে দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে পথ চিনিয়ে চিনিয়ে । প্রায় দু ঘন্টামত হাটার পর জন-মানবহীন নীর্জন এক জঙ্গলে এসে পৌঁছলাম । বড় বড় গাছ আর লতাগুল্ম দিয়ে ঘেরা । সূর্যের আলো এখানে ঝিমিয়ে পড়েছে কিন্তু বেলা বাঁজে ১টা মাত্র । দিক ঠিক করা যাচ্ছে না তবে মোবারক মামার মনে হচ্ছে দিক ঠিক করতে কোন সমস্যা হচ্ছে না । আমি কিছুটা সাহস পেলাম এই ভেবে যে আমি একা নই, মোবারক মামা সাথে আছেন । আরো প্রায় ১ ঘন্টা হাটার পর একটা বিশাল বাঁশঝাড়ের সামনে এসে পৌঁছলাম । আমি দেখলাম এটাকে আসলে আগে বাঁশবাগান বলা হলেও এখন তা বাঁশঝাড় বা বাঁশের জঙ্গলে পরিনত হয়েছে । যে কেউ এখানে একা থাকলে ভয়ে তার অঞ্জান হওয়ার মত অবস্থা হবে । চারদিক ঘন লতাগুল্ম আর বাঁশের ঝোপঝাড় ।

মোবারক মামা আমাকে বললেন “এটাই সেই কবরস্থান এখানে অনেকগুলো কবর আছে তবে কোথায় যে আপনার সেই কথাটা লেখা আছে তা আমি বলতে পারবো না, আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে”  আমি আশাহতের মত চারদিকে তাকালাম কারন এখানে কোন কবরই ভালোমত বোঝা যাচ্ছে না । ঝোপঝাড়ের কারনে সব ঢেকে গেছে । কিছুক্ষন পর মনে হল আমার পায়ের নীচে একটা কবর, আমি একটা কবরের উপর দাড়িয়ে আছি । ভয়ে আমার সারা শরীরে শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল । সরে গিয়ে পাশে দাড়ালাম । দুপুর প্রায় আড়াইটা বাজে, ক্ষিদে পেয়েছে তাই ব্যাগ খুলে খাবার বের করলাম মোবারক মামাকে বললাম “আগে খেয়ে নিই, পরে কাজে নামব” , মনে হল তিনি আমার কথায় গুরু্ত্ব দিচ্ছেন না । অন্য দিকে বিমর্ষভাবে তাকিয়ে আছেন । কিছুক্ষণ পর আবার আমি বললাম । মোবারক মামা এবার শুনতে পেলেন, উত্তর দিলেন “আমার ক্ষিদে নেই” , আপনি খেয়ে নিন আমি একটু আসছি, বলে তিনি ঝোপের ভিতর চলে গেলেন । আমি খাওয়া সেরে অনেক্ষণ তাকে খুঁজলাম । নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকলাম । ভাবলাম হয়ত সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে । চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, এখন প্রায় বেলা ৫টা বাঁজছে । সূর্য হেলে পড়াতে বাঁশঝাড়ের ভিতরে অন্ধকার নেমে এসেছে । আমি আমার টর্চলাইটটা বের করলাম ব্যাগ থেকে । অনেক খুঁজেও মোবারক মামাকে পেলাম না । তাই ঠিক করলাম বাড়ি ফিরে আসব, হাতে একটা মার্কার পেন আর একটা টর্চলাইট । মার্কার পেন দিয়ে বাশ কিংবা গাছে দাগ টেনে চিহ্ন দিচ্ছিলাম আর সামনে এগুচ্ছিলাম কিন্তু অন্ধকারে কিছুই ভালো দেখা যাচ্ছে না । চারদিক এখন ঘোর অন্ধকার তাই কিছুক্ষণ পরপর টর্চলাইট জ্বালাতে হচ্ছে । একটানা জ্বালালে ব্যাটারী শেষ হয়ে যেতে পারে । এভাবে এগুতে থাকলাম প্রায় আধঘন্টা । হঠাত পা ফসকে একটা গর্তে পড়ে গেলাম । চার দিক সমান ভাবে কাটা, চার দেয়ালে আমি আটকা পড়েছি, আমার আর বুঝতে বাকি রইল না আমি একটা কবরের ভিতরে আটকে গেছি …(চলমান..)
ভুতংগম-পর্ব-০২-বাকি-অংশ
ভূতংগম(পর্ব ১)

ভুতংগম (পর্ব ০১)

4

“হরিপ্রসাদের বাড়ি যাব, বলতে পারেন কোথায় ?” লোকটাকে প্রশ্ন করা বোধ হয় আমার উচিত হয়নি । আমার চেহারার দিকে অপলক দৃস্টি তার, মনে হচ্ছে চোখের মনি দপদপ করে জ্বলছে । যেন আমার ভাষা কোন ভিনগ্রহের এলিয়েনের ভাষা, বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে । আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম সেই একই প্রশ্ন “হরিপ্রসাদের বাড়ি যাব, রাস্তাটি কি এই দিকে? নাকি ঐদিকে?” আমি অংগুলি নির্দেশ করলাম ।শেষ ট্রেনটি স্টেশন থেকে ছেড়ে চলে গেল । এখন চারদিকে শুনশান নীরবতা । গাছের পাতা পরার শব্দ বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, চারদিক অন্ধকার অমাবস্যায় ঢেকে গেছে । বিদ্যুৎ নেই, কিছুক্ষণ আগেও দুজন গার্ড ছিল, এখন আর দেখা যাচ্ছে না, তারাও চলে গেছে কোথাও । উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম কিছুই বোঝা যাচ্ছে না । মনে কিছুটা ভয় ও সংশয় দেখা দিল, লোকটা কি তাহলে বোবা, নাকি কানে খাটো, নাকি পাগল । হবে হয়ত কোন একটা, না হলে কথার উত্তর দিচ্ছে না কেন, ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । কিছুক্ষণ পর আমাকে প্রায় অবাক করে দিয়ে লোকটা উত্তর দিল, “হরিপ্রসাদ কে আপনার কি দরকার?”

: আছে, দরকার না হলে কি এখানে আসা । তা আপনি কি ওনার কাছে একটু নিয়ে যেতে পারবেন ?
:পারব বৈকি, অবশ্যই পারবো, অবশ্যই পারবো ।
এই বলে লোকটা দাড়িয়ে বলল ঐ যে দেখছেন পাকুড় গাছটা, ঐখানের সবচাইতে বড় ডালটায় উনি থাকেন । তবে আমি কিন্তু কাছে যেতে পারব না । লোকটার শরীর থেকে গাঁজার উৎকট গন্ধ আসছিল । নেশার ঘোরে আবোল তাবোল বকছে বোধ হয় । নিরর্থক দাড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না । আমাকে ভুলে গেলে চলবে না আমি একজন সাংবাদিক । অদ্ভুত ফিচারের জন্যই এ শ্যামপুর গ্রামে আসা । কিন্তু চারদিকের নীস্তব্ধতা ও ভুতুরে পরিবেশ সে আশাকে নিরাশা করবে তা হতে দেয়া যায় না । ভয়ের কাছে হার মানবো সে রকম ছেলে আমি নই । অনেক সাহস করে অন্ধকার রাস্তা ধরে হাটা শুরু করলাম ।

রাস্তার দুধারে ঝোঁপঝাড়ে ছেয়ে গেছে । দুপাশে ঘন জঙ্গল, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে । জোনাকিরা শুধু মিটিমিটি জ্বলছে । আমি নিঃশব্দে হাটার চেষ্টা করলাম কিন্তু পায়ের নীচে খড়খড়ে শুকনো পাতার কচকচ শব্দ হতে লাগল । ক্রমেই মনের গহীনে ভয় দানা বেঁধে উঠল । ঝিঁঝিঁ পোকা থেমে থেমে ডেকে যাচ্ছে কানের কাছে ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হচ্ছে । ভয়ে পা দুটি চলছে না, মনে হচ্ছে হাজারো মন পাথর বেঁধে রাখা হয়েছে পায়ে । হঠাৎ সম্পূর্ণ নীস্তব্ধতা ভেঙে, কে যেন ডাকল, “কে?, কে ওখানে? কে যাচ্ছে? ” , আমি নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে বললাম, “জ্বি, আমি ঢাকার ‘সূর্যের দিন পত্রিকা’ অফিস থেকে এসেছি, আমি একজন সাংবাদিক”, ভয়ে আমার বুক কাঁপছে । কাছে আসতে আসতে লোকটা বলল “বাবা তুমি এতরাতে একা একা কি করছো? আমি এখানকার চৌকিদার, কোথায় যাবে বল, আমি পৌঁছে দিয়ে আসি, যদি কিছু মনে না কর তাহলে আজ রাতটা আমার বাসায় থাকতে পারো । আমি অবশ্য একা মানুষ, তোমার ভয় লাগতে পারে ।” লোকটার কথায় আমার আত্মসম্মানে ঘা লাগল, আমি বললাম, “জ্বি আমি থাকতে পারবো আমার ভয় লাগবে না আর কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, আপনাকে দেখে মনে অনেকটা সাহস পাচ্ছি ।”
লোকটা পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল । অদ্ভুত তার হাটার ভঙ্গি । মনে হচ্ছে ক্রমশই সে মাটি থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে, আবার মাটিতে নামছে । হাটতে হাটতে লোকটা প্রশ্ন করল, “আপনি যেন কোন পত্রিকা থেকে এসেছেন বললেন?”
: জ্বি আমি ত্রৈমাসিক পত্রিকা “সূর্যের দিন” থেকে এসেছি । নতুন পত্রিকা তো আপনি বোধ হয় চিনবেন না ।
:না না, চেনাইতো লাগছে । তা কি জন্য এসেছেন যেন? আমি আবার কোন কিছু মনে রাখতে পারি না ।
:অদ্ভুত কোন ফিচারের জন্য । আপনার কি মনে হয়, আমি এখানে কোন অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পাবো?
:অদ্ভুত কোন জিনিস মানে অলৌকিক কিছু ?
: হ্যাঁ অবাস্তব কিছু, যা সাধারণত ঘটে না ।
: কি জানি পাবেন হয়তো । তবে আমার তাতে মাথা ব্যথা নেই । সারারাত পাহারা দেয়াই আমার কাজ । অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামাই না ।

কথা বলতে বলতে চৌকিদার লোকটা ঝোপঝাড় ছেড়ে ঘন জঙ্গলের দিকে যেতে লাগলেন । অন্ধকারে তাকে অনুসরণ করতে কষ্ট হচ্ছিল। গহীন জঙ্গলের মাটি কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতে থাকে । আমার পা কাঁদায় পুরো মাখামাখি অবস্থা । হাটতে বেগ পেতে হচ্ছে , কিন্তু চৌ্কিদার লোকটা দিব্যি হেটে সামনে চলে যাচ্ছে, কোন প্রকার সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয় না । অনেক দূর হাটার পর বিশাল এক বটগাছের সামনে চলে এল সে, আমাকে বলল, “এটাই আমার বাড়ি”।, আমি কোথাও কোন ঘরবাড়ির চিহ্ন দেখতে পেলাম না । তারপর সে বলল, “চলুন আমার বাড়িতে”  এ পর্যায়ে লোকটার আকার ক্রমশই বড় হতে লাগল, এক পর্যায়ে সে আমার বাঁ হাতটা শক্ত করে ধরে হ্যাচকা টানে একেবারে গাছের মগডালে নিয়ে গেল । আমার পায়ের নীচে এক ধরনের শীতল স্রোত বয়ে গেল । লোকটার চোখগুলো ঝুলে পড়েছে, দাঁত গুলো ক্রমশই বড় হচ্ছে, জ্বিভ দিয়ে টসটস জল পড়ছে, আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে লোকটা আসলে ভুত । আমি প্রানপন চেষ্টা করছি বাঁ হতটা ছাড়ানোর জন্য । ক্রমশই লোকটার জ্বিভ বড় হতে লাগল এবং এক সময়ে তার জিভ দিয়ে আমাকে পেঁচিয়ে ফেলল । বিশাল মুখে পুরে ফেলার মত অবস্থা যখন, ঠিক তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল । আমি অনেক কষ্টে পকেটে হাত ঢোকালাম, যদি কিছু পাওয়া যায় তাহলে অন্তত শেষ চেষ্টা করা যাবে । পকেট হাতরে আমার শখের একটি কলম পাওয়া গেল । কলমটা আমাকে একজন গিফট্ দিয়েছিল । আটশাট অবস্থায় কলমটার ক্যাপ পকেটেই ছিল । আমি কলমের সুচাঁলো দিকটা দিয়ে দ্রুত লোকটার মানে ভুতটার বাঁ চোখে একটা ঘা বসিয়ে দিলাম, আর অমনি সে আমাকে ছেড়ে দিল, আমি নীচে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম । জ্ঞান ফেরার পর দেখি, আমি শ্যামপুর সরকারী হাসপতালে । ডাক্তার আমাকে বললেন সুরুজ নামে এক গ্রামবাসী আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন, সে বাইরে অপেক্ষা করছে । সুরুজ ও গ্রামবাসীদের ধারনা আমাকে ভুতে ধরে ছিল আর সে ভুত টা হচ্ছে এ গ্রামের মৃত এক চৌকিদার এর আত্মা, যে এখনো সবাইকে ভয় দেখায়, ভুত হিসেবে সবার কাছে আবির্ভুত হয় । কিন্তু ডাক্তার এর ধারনা আমি বিশেষত ভয় পেয়ে হ্যালুসিনেশন বা ইলুশন এ আক্রান্ত হয়েছিলাম ।একদিকে ডাক্তার অন্যদিকে গ্রামের সব মানুষ, কার কথা বিশ্বাস করবো বুঝতে পারছি না । গ্রামের এতগুলো মানুষের তো আর একসাথে হ্যালুসিনেশন হতে পারে না । তাই দেরী না করে বাইরে বের হয়ে এলাম, দেখলাম যে লোকটা রাতে ট্রেন প্লাটফর্ম এ বসে ঝিমুচ্ছিলো সেই লোকটাই আসলে সুরুজ । তাকে ধন্যবাদ দিলাম আর বেশি কিছু বললাম না ।শুধু জিজ্ঞেস করলাম ঢাকা যাওয়ার ট্রেন কয়টায়, তারপর সে দিনই ঢাকার ট্রেনে বাড়িতে এসে পড়ি । এরপর অনেক দিন আর পত্রিকা অফিসে যাওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা এখনও আমার কাছে পরিষ্কার নয়, আসলেই কি হ্যালুসিনেশন ছিল নাকি সত্যিকারের ভুত ??…………………