ডাকিণী (৩২তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
প্রায় মরতেই বসেছিলাম সেদিন। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। টাবের তলে পানি নিষ্কাশনের পাইপ টা আমি খানিক আগেই প্লাগ দিয়ে নিজ হাতে আটকেছিলাম। কোনভাবে যদি প্লাগটা খুলতে পারি তবে পানিটুকু দ্রুত বেরিয়ে যাবে আর আজকের মতো প্রাণটা রক্ষা পাবে। দুপায়ের পাতা দিয়ে প্লাগটা আকড়ে ধরলাম। তারপর এক মোচড়েই খুলে ফেললাম। প্লাগ খুলতেই হুরমুড়িয়ে টাবের পানিটুকু বেরিয়ে যেতে শুরু করলো। কিন্তু টাবের পানি যে হারে নিষ্কাশন হচ্ছে তার থেকেও দ্রুতগতিতে আমার দেহের অক্সিজেন নিঃশেষিত হচ্ছে। টাবের পানি নিষ্কাশনের জন্যে আমি অপেক্ষা করিতে পারবো না। বেঁচে থাকতে হলে তার আগেই আমাকে শ্বাস নিতে হবে। প্রথমে দু পা গুটিয়ে বুকের কাছে নিয়ে আসলাম। অনেকটা মায়ের পেটে শিশুরা যেমন থাকে ঠিক তেমন। তারপর দেহের সকল শক্তি একত্রিত করে টাবের দেয়ালে লাথি মারলাম। এবার কাজ হলো। গোটা টাবটাই এবার সশব্দে ভেঙে পড়লো। টাবে জমানো পানিটুকু বাথরুমের মেঝেতে প্লাবনের সৃষ্টি করলো। পানি সরে যেতেই হাঁ করে শ্বাস নিয়ে ফুসফুসটাকে সচল করলাম। যাক বাবা। আজকের মতো বেঁচে গেছি। আর বাঁচবোই না কেনো? কত শক্তিশালী প্রিস্টকেই প্রস্রাব খাইয়ে দিয়ে এসেছি। আর এটাতো পুঁচকে আলেস। ওকে তো তুষের মতো উড়িয়ে দিবো। দাঁতে দাঁত চেপে আলেসকে একটা গালি দিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তখনই বাথরুমের দরজাটায় খটখট আওয়াজ হলো! কি ব্যাপার? নক করলো কে?
ওপাস থেকে মনিকার ভয়ার্ত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। “সাঞ্জে, সাঞ্জে ডার্লিং তুমি ঠিক আছো তো। ভেতরে এতো শব্দ কিসের?”
এই সেরেছে। মনিকা বাথটাব ভাঙ্গার শব্দে জেগে উঠে চলে এসেছে। এখন ওকে ভাঙ্গা টাবটার ব্যাপারে কি কৈফিয়ত দিবো? সত্যিটা লোকানো প্রায় অসম্ভব। আজ হোক কাল হোক সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়ই। মনিকা এখানে আশার পর থেকেই আমি ওকে মিথ্যা বলে আসছি। লাইব্রেরীর দরজা আটকানো নিয়ে মিথ্যা, কুয়োর অভ্যন্তরীণ অশরীরী ডাকটা নিয়ে মিথ্যা, গাড়ি আক্সিডেন্ট নিয়ে মিথ্যা। এখন এই টাব ফাটানো নিয়েও একটা মিথ্যা বলতে হবে। এভাবে যদি মিথ্যার রেলগাড়িটা চলতেই থাকে তো খুব শীঘ্রই আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাবো।
বাথরুমের দরজায় দড়াম দড়াম আওয়াজ আমার ভাবনার ইতি টানলো। মনিকা আমার সাড়া না পেয়ে এবার দরজা ভাঙতে উদ্ধত হয়েছে। এই মেয়েটাকে শীঘ্রই থামাতে হবে। এবার আমি হাক ছাড়লাম, “মনিকা, আরে মনিকা, কি করছো? লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছো না কি? আমি ঠিক আছি। শুধু একবার পা পিছলে বাথরুমে পড়ে গেছিলাম এই যাহ।”
মনিকা আবার প্রশ্ন ছুড়লো, “ডার্লিং, তুমি নিশ্চিত যে তুমি ঠিক আছো? তোমার কোন সাহায্য লাগলে আমায় নিসংকোচে বলতে পারো।”
ওর গলা শুনে মনে হলো ও আমার সান্তনা বাণীতে একটুও আশ্বস্ত হতে পারিনি। বরং আরো ভয় পেয়েছে। এবার আমি ওকে ধমকের সুরে বললাম,”উহঃ মনিকা। আমি ঠিক আছি। গেস্টরুমে যেয়ে অপেক্ষা করো। আমি আসছি। খানিক নিশ্চুপ থাকার পর ওকে শ্লথ পদক্ষেপে চলে যেতে শুনলাম। ও চলে যেতেই আমি উদুল গায়েই হুরমুড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। আবারো মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছি। আমিই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ। নইলে মৃত্যুকে এতোবার, এতো কাছ থেকে ধোকা দিতে পারতাম না। ক্লজিট থেকে নতুন তোয়ালে বের করে গাঁ মুছলাম। বাথরেমে রাক এর উপর রাখা নিত্য ব্যাবহারের তোয়ালেটা আনতে যাওয়ার মতো সাহসটুকুও সেই মুহুর্তে আমার ছিলো না। বিছানায় বসেই কাপড় পড়লাম। সাদা টিশার্ট আর একটা সাদা থ্রি কোয়ার্টার। শুনেছি সাদা বস্তু অপশক্তিকে দুরে রাখতে সাহায্য করে। সেই ধারণা থেকেই এগুলি পড়া। এরপর মনিকার সাথে দেখা করতে গেস্টরুমের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু গেস্টরুমে যেয়ে ওকে পেলাম না। কি আশ্চর্য! ও গেলো কোথায়? ও কি লাইব্রেরিতে গিয়ে সেই উদ্ভট বই টা পড়তে শুরু করেছে? দৌড়ে আবার লাইব্রেরীতে এলাম। লাইব্রেরীটাও ফাঁকা। মেয়েটা তবে গেলো কোথায়? হঠাৎ খেয়াল হলো কুয়োর ওদিক থেকে একটানা সাঞ্জে সাঞ্জে ডাকটা থেমে গেছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। আজ সকালে কুয়ো থেকে মনিকাকে ডাকছিলো, সাথে সাথেই ওর রক্তবমি শুরু হয়েছিলো। সন্ধায় আমার নাম ধরে ডাকলো, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বাথটাবে ডুবে মরতে বসেছিলাম। ওই ভয়াল ডাকটা তবে অশুভ কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে! আর ডাকটার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, যাকে ডাকে কেবল সেই শুনতে পায়। এই ডাকটা আমি আর মনিকা দুজনে শুনলেও কখনোই এক সাথে শুনি নি। আরে! এই ব্যাপারটা তো আমার মাথায় আসে নি! সকালে ডাকটা মনিকা শুনতে পেলেও আমি শুনি নি। সন্ধায় আমি শুনলাম কিন্তু মনিকা টের পেলো না। এখন ডাকটা আমি আর শুনতে পাচ্ছি না। তার মানে এখন মনিকা ওটা শুনতে পাচ্ছে? হায় হায়! ও কি তবে সেই মরণ ডাকে সাড়া দিয়ে কুয়োটার দিকে হাটা ধরেছে?
কটেজ ছেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। আসার সময় সদর দরজাটা খুলা দেখে আর সন্দেহ রইলো না যে মনিকা এখন কুয়োর দিকেই যাচ্ছে। রাতের চাঁদনি আভায় কুয়োর ভাঙা দেয়ালের সামনে একটা নারী মুর্তিকে ঝুকে থাকতে দেখলাম। হায় খোদা! ও কি কুয়োয় ঝাপ দিতে যাচ্ছে। প্রাণপণে সেদিকে ছুটতে ছুটতে চেঁচালাম, “না না, মনিকা, দাড়াও। সরে এসো ওখান থেকে। প্লীজ। আমার কথা শুনো।” কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছায়ামূর্তিটা আমার চোখের সামনেই কুয়োর ভেতরে ঝাপ দিলো।
(চলবে)

ডাকিণী (২৯তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
ওরা আমায় বের করে নিয়ে গাড়িতে তুলল। কপাল ভালো যে সৌজন্যতাবশত ওরা আমায় হাতকড়া পড়ায় নি। নইলে অফিসের অধস্তন কর্মচারীদের সামনেই আমার দু কান কাটা যেতো। আমায় নিয়ে ওদের কালো মার্সিডিজটা যাত্রা শুরু করল। আমার চোখ তখন ঘুমে বুজে আসছে। আমি এক অফিসারের কাধেই মাথা ফেলে ঘুমিয়ে পড়লাম।
যায়গা মতো পৌছে ওরা আমায় ডেকে তুলল। “মিস সাঞ্জে, উঠুন। আমাদের এবার যেতে হবে! ”
ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। ওদের সাথে কোন বাকবিতণ্ডা ছাড়াই গাড়ি থেকে নেমে সুবোধ মেয়ের মতো ওদের অনুসরণ করতে লাগলাম।ওরা আমায় নিয়ে একটা সাদা রঙের সেইফ হাউসে ঢুকলো। তারপর আমায় একটা ভুগর্ভস্থ কক্ষে ঢুকিয়ে বলল, “মিস সাঞ্জে, আপনি বিশ্রাম নিন। আমাদের লোক বাহিরেই থাকবে। কোন কিছু প্রয়োজন পড়লে ডাকতে বিব্রত বোধ করবেন না।”
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, “আমি এখান থেকে কবে বাড়ি ফিরতে পারবো অফিসার? ”
অফিসার ঘুরে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “আজ রাতের ভেতরে আপনি সাক্ষ তৈরি করে দিতে পারলে সম্ভবত কাল সকালেই আপনি বাড়ি ফিরবেন। এখন এসব নিয়ে টেনশন না করে আপনি বিশ্রাম করুন। রাতে আবার দেখা হবে”
আমি চুপ করে থেকে অফিসারের চলে যাওয়া দেখলাম। কি আশ্চর্য! আমি ভাবছিলাম আমায় পুলিশ আস্যাল্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে। কিন্তু এখন দেখছি এরা আমার কাছ থেকে অন্যকিছু চাইছে! সাক্ষি! আমাকে আজ রাতে সাক্ষি দিতে হবে। কিন্তু কিসের সাক্ষি? এত কিছু ভাবতে পারছি না। কক্ষটিতে একটা সুন্দর বিছানা পাতা আছে। একটা নির্ঘুম রাতের পর একজন মানুষ কেবল বিছানার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেই ভাবতে পারে। সাক্ষি টাক্ষি ও গুলো নিয়ে নয়। দেহটাকে ছুড়ে দিলাম বিছানার উপর। মুহুর্তেই তলিয়ে গেলাম অতল ঘুমে। ঘুমের মধ্যেই আমি স্বপ্ন দেখলাম। অসংখ্য প্রজাপতি আকাশে উড়ছে। কি সুন্দর এদের ডানার কারুকার্য। এতগুলি দুঃস্বপ্নের পর এটাই ছিলো আমার প্রথম সুখময় স্বপ্নের স্মৃতি। নিজেকে একটা প্রজাপতি মনে হচ্ছিলো। পিঠে যেনো নতুন করে পাখা গজিয়েছে। উড়েউড়ে ভেসে চলছি এক ফুল থেকে অন্য ফুলে। তারপর দরজার খটখট কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। একজন অফিসার এসে আমায় বলল, “ঘুম ভাঙ্গানোর জন্যে অত্যন্ত দুঃখিত মিস সাঞ্জে। তবে এখন আপনার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এসেছে। অনুগ্রহ করে আমার সাথে চলুন।” মুখে দুঃখিত বললেও ওর কথায় দুঃখের কোন লেশমাত্র ছিলো না। বিছানা ছেড়ে উঠে কাপড় ঠিক করে ওর পেছন পেছন চলতে শুরু করলাম।
ও আমায় গ্রাউন্ড লেভেলে একটা কক্ষে নিয় ঢুকলো।
সেখানে দুজন ইনভেস্টিগেটর ও একজন আপ্রণ পড়া ডাক্তার আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলো। আমি ঢুকতেই ওরা আমায় একটা চেয়ারে বসিয়ে তার হাতলের সাথে হাত বেধেঁ দিলো। তারপর একজন ইনভেস্টিগেটর শুরু করলো,
“দেখুন মিস সাঞ্জে, আমরা জানি কাল রাতে আপনি কি করছিলেন। আপনার এহেন কর্মকাণ্ডের কারণে আপনার উপর একাধিক মামলা দায়ের করা যায়। কিন্তু আমরা হয়তো এ ব্যাপারটা চেপে যেতে পারি যদি আপনি আমাদের আরেকটি ব্যাপারে সাহায্য করেন।”
আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম, “দেখুন মিঃ অফিসার, আপনি কি বলছেন আমি তা কিছুই বুঝতে পারছি না। অনুগ্রহ করে কথার মার প্যাঁচ বাদ দিয়ে যা বলবেন সোজাসুজি বলুন।”
ঐ লোকটা বলল, “কাল রাতে আপনি গীর্জায় গিয়েছিলেন, সেখানে ফাদারের কাছে ফালতু কনফেশন করেছেন, তারপর রাতে গির্জার ছাদে উঠে সেখান থেকে দড়ি বেয়ে সিমেট্রিতে ঢুকেন। গীর্জার ছাদ থেকে আপনার হাতের ছাপ সম্পন্ন দড়িটা আমরা উদ্ধার করেছি। গীর্জার পাদদেশে সিমেট্রির ভেতরে আপনার ঘড়িটা পাওয়া গেছে। আমরা রোলেক্স ওয়াচ স্টোরে এর ব্যাচ নাম্বার মিলিয়ে দেখেছি। ওটা আপনিই কিনেছিলেন। তার উপর একজন আহত গার্ডের গালে আপনার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। সর্বপরি আপনার উপর গীর্জায় অনধিকার প্রবেশ, সন্ধার পর সিমেট্রিতে অনধিকার প্রবেশ, আট্যাম্পট টু মার্ডার আ সিকুরিটি গার্ড এ তিনটা অভিযোগ সহজেই দায়ের করা যায়। আর আমরা চাইলে আপনার উপর, কিলিং এন্ড হাইডিং মাল্টিপল ডেড বডি এর চার্জ আনতে পারি যার ফলে আপনার মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। ”
এক নিঃশ্বাসে এতগুলি কথা বলে লোকটা এবার শ্বাস নেওয়ার জন্যে থামলো। বুঝলাম এরা আমায় মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাই দৃঢ় কন্ঠে বললাম, “মিঃ অফিসার, আপনি কারো উপর মিথ্যা চার্জ আরোপ করতে পারেন না। আপনাদের কাজ হল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, তা ভঙ্গ করা নয়।”
এবার লোকটা ধমকের সুরে বলল, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের কাজ। আমাদের দেখে কি আপনার পুলিশ মনে হয়? আমরা স্টারস। বৃহত্তর প্রয়োজনে আমরা যে কোন কঠর পদক্ষেপ নিতে পিছ পা হবো না। তবে আমরা ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভাবে চেপে যেতে রাজি আছি। যদি আপনি আমাদের সাহায্য করেন।”
আমি মুখ বাকিঁয়ে জিজ্ঞাস করলাম, “কি ধরনের সাহায্য? আপনাদের সাহায্য করার জন্যে আমি মুখিয়ে আছি।”
ঐ লোকটা বলল, “কাল রাতে আপনি ঠিক কি করতে বেরিয়েছিলেন? গোরস্তানে আডভেঞ্চার? ”
আমি বললাম, “আসলে আমি আমার এক বান্ধবী মনিকার সাথে বাজি ধরেছিলাম যে গোরস্তানে একরাত কাটিয়ে এসে নিজেকে সুপার হিরোইন প্রমাণ করবো। এটাই ওখানে যাওয়ার একমাত্র কারণ। আর রাতের আধারে সেখানে গার্ডকে দেখে চমকে উঠেছিলাম। সন অফ আ বি* টা এমন ভাবে রেইনকোট চাপিয়েছিলো যে দেখে ভয় পেয়ে গেছিলাম। শুধু ভয় পেয়েই আমি ওকে আঘাত করেছি, এর পেছনে আর কোন উদ্দেশ্য ছিলো না। প্লীজ আমাকে এ দুর্ঘটনায় ফাসাবেন না।”
এবার আপর ইনভেস্টিগেটর কথার খেই ধরলো,” দেখুন মিস সাঞ্জে।গতকাল রাতে আনুমানিক ১১-১২টার দিকে গির্জার ঠিক পাশের বিল্ডিং এ তিন তলায় একটা জোড়া খুন হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস গির্জার ছাদ থেকে আপনি তা স্পষ্টত দর্শন করেছেন। আপনি সমগ্র ব্যাপারটা বিস্তারিতভাবে আমাদের লিখে দিন। আমরা আপনাকে ছেড়ে দেবো।”
হায় খোদা। ঐ সময়টাতে তো আমি গির্জার ছাদে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।সাংঘাতিক ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু একথা ওদের সামনে বলা যাবে না। ওরা বিগড়ে যেতে পারে। তাই গোঁয়ারের মতো ওদের দিকে খেঁকিয়ে উঠে বললাম, “যদি আমি এ ব্যাপারে সাহায্য না করি তো আপনারা কি করবেন?”
এবার আগের ইনভেস্টিগেটর অত্যন্ত রুক্ষ গলায় বলল, আপনাকে সাহায্য করতেই হবে ম্যাম। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়। আপনি সাহায্য না করলে আমরা লাই ডিটেক্টর & ট্রুথ টেলিং ড্রাগ ব্যাবহার করতে বাধ্য হবো। তবে সেক্ষেত্রে আপনার উপর গতরাতের আডভেঞ্চারের জন্যে চার্জ দায়ের করা হবে। এতে আপনার মৃত্যুদণ্ড না হোক অন্তত নুন্যতম দশ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী।”
দাঁতে দাঁত চিপে মনেমনে বললাম শালা শয়তান।
এবার ওপর ইনভেস্টিগেটর বলল, “মিস সাঞ্জে। আমরা আপনার হাত মুক্ত করে দিচ্ছি। সাথেসাথে কিছু কাগজ ও একটা কলমও দিয়ে যাচ্ছি। আমরা ঠিক এক ঘন্টা পরেই ফিরবো। সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনি এই সময়ের ভেতরই আপনার সাক্ষ্য আমাদের কাছে লিখিত আকারে জমা দেন। অন্যথায় আপনার জন্যে তা নিতান্তই অমঙ্গলকর হবে।”
ওরা আমায় ফেলে যাওয়ার প্রায় আধা ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। ভেবেছিলাম কিছু একটা বানিয়ে লিখে দেবো। কিন্তু এখন কিচ্ছু মাথায় আসছে না। অগত্যা ডেস্কে মাথা ফেলে আবারো ঘুমিয়ে পড়লাম। তখন কেবল ঘুমই আমায় এমন দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারতো। কিছুক্ষণের মধ্যেই খসখস শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। জেগে দেখি আমার আংটি পরা হাতটা আমার অজান্তেই প্রায় চার পাতা সাক্ষ্য লিখে ফেলেছে! খুবই বিষ্ময়কর লাগলো ব্যাপারটা! আমার হাত, আমার হস্তাক্ষর, পোলিশ বর্ণ, কিন্তু আমি লেখিকা নই! আমি কাগজগুলি উল্টে দেখতে লাগলাম কি লিখেছে।
কাগজে লিখা ছিলো, “রাত ১১:২০ এ একজন মুখোশ পরিহিত লোক পাশের বাড়িতে ঢুকলো। তার বা হাতে একটা পিস্তল আর ডান হাতে একটা মাচুটি ছিলো। সে বিল্ডিং বেয়ে দড়াবাজিকরের ন্যায় উঠে পড়লো। তারপর তিনতলার জানালা গলে ভেতরে ঢুকলো।,,,,,”
এইটুকু পড়ার পরেই কক্ষে সেই দুই ইনভেস্টিগেটর প্রবেশ করলো। আমার হাত থেকে সাক্ষ্যটা নিয়ে ওরা উল্টে পাল্টে পড়লো। পড়ার পর ওদের অনেকটাই সন্তুষ্ট মনে হলো। তারপর ওরা সাক্ষ্যটা নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। বিশ মিনিট পরেই ওরা আবার কক্ষে প্রবেশ করলো।
এবার আগের ইনভেস্টিগেটরটাই নরম সুরে বলল, “আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ মিস সাঞ্জে। আপনার সাক্ষ্য আমাদের অনেক কাজে লাগবে। এবার চলুন আপনাকে আপনার বাড়ি পৌছে দিয়ে আসি।”
যাক বাবা। অনেক বড় সমস্যা থেকে আজ পরিত্রাণ পেলাম। বাহিরে মুক্ত বাতাসে বেরুতেই খুশিতে প্রাণটা ভরে গেলো। আহ মুক্তি। কি অসাধারণ এর স্বাদ।
রাত প্রায় আড়াইটার দিকে স্টার এর একটা গাড়ি আমায় কটেজের ফটকের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো। কটেজে ঢুকতেই মনে পড়লো গতিকাল বিকালে মনিকা আমায় তাড়াতাড়ি কটেজে ফেরার জন্যে ফোনে অনুরুধ করেছিলো। ওর ভাষ্য মতে কটেজে নাকি প্রচন্ড সমস্যা হচ্ছে। স্টারদের সাথে চলে আসার কারণে আমার কটেজে ফিরতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। তার উপর আমি আমার ফোন ও গাড়িটা অফিসেই ফেলে রেখে এসেছি। যদি ভেতরে ওর কোন সমস্যা হয়ে থাকে তো আমি বাহিরের সাহায্যের জন্যে কারো কাছে ফোনও করতে পারবো না!
আচ্ছা, ভেতরে ঢুকে ওকে কোন অবস্থায় দেখতে পাবো? জীবন্ত না মৃত! আজ সারাটি দিন আসলেই কি ঘটেছিলো আমার কটেজে! মনিকার সাথে দিনে যা ঘটেছে আজ রাতে কি তা আমার সাথেও ঘটবে! এসবের উত্তর কেবল মনিকাই দিতে পারে। দৌড়ে গেলাম কটেজের দরজার সামনে। ওখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কলিংবেলটা টিপলাম তারপর হাক ছাড়লাম, “মনিকা, মনিকা, দরজা খুলো ডার্লিং। দেখো আমি ফিরে এসেছি।”
কোন সাড়া মিলল না। আমার কাছে দরজার একটা ডুপ্লিকেট চাবি ছিলো। ভেবেছিলাম ওটা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকবো। কিন্তু একটু ধাক্কা লাগতেই দরজাটা হাঁ হয়ে খুলে গেলো! খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রাণপণে হাক ছাড়লাম, মনিকা, মনিকা। কোথায় তুমি ডার্লিং?
কোন সাড়া নেই। কটেজের পীনপত্ন নিরবতায় আমার ডাক কেবল প্রতিধ্বনি তুলল। কি যে হলো মেয়েটার! ,,,
(চলবে)

ডাকিণী (২৮তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
লাইব্রেরীতে যেয়ে দেখলাদরজাটা খুলাই আছে। কিন্তু মনিকা মাটিতে পড়ে আছে। কি ব্যাপার মনিকা। কোন সমস্যা হয়েছে? ও জবাব দিলোনা। শুধু কাঁপাকাঁপা হাত তুলে দরজার দিকে ইঙ্গিত করলো। বুঝলাম ও ভয় পেয়েছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সিতে দিতে বললাম, ওই দরজার তালায় একটু সমস্যা আছে। বন্ধ হলে খুলতে চায় না। আমি চাচ্ছিলাম না আলেসের ব্যাপারটা ওর কাছে খুলে বলতে। ও এখানে দুদিনের অতীথি। ওকে এসবে জড়িয়ে কি লাভ।
ও খানিক হেসে মাথা নেড়ে ও বলল “যাক তবে। এই কথা! কিন্তু আজই মিস্ত্রি ডেকে ওটা সারিয়ে নিও ডার্লিং। ”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলাম। ও কিছুই টের পায়নি।
ও কাপাকাপা হাতে নাস্তা খেলো। খেয়েই বলল ও আজ অফিসে যাবে না। ওর নাকি শরীর খারাপ লাগছে। ভালোই তো। থাক তবে আজ এখানে। আমি ওকে গেস্ট রুম দেখিয়ে দিয়ে নিজের রুমে ফিরে এলাম। এতোক্ষণ শুধু একটা তোয়ালে পরেই ছিলাম। এবার কাপড় পড়ে অফিসে যেতে হবে। সময় ঘনিয়ে এসেছে। ক্লজিট থেকে এক সেট কাপড় বের করে বাথরুমে গেলাম কাপড় বদলাতে। কিন্তু একি! বাথরুমের আয়নাটা ভেঙে গেছে দেখছি! কিন্তু কে ভাঙলো! আলেস কি এটা ভেঙে আয়নার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে! এসব ভাবার সময় নেই। তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে বেরিয়ে গেলাম অফিসের উদ্দেশ্য। মনিকা একা রয়ে গেল অভিশপ্ত কটেজে। ওর জন্যে মনটা খচখচ করছিলো। ওর যদি কিছু হয়ে যায়। ক্লান্তিতে আমি কিছুই চিন্তা করতে পারছিলাম না। শুধু গাড়িটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম অফিসপাণে।
অফিসে পৌছতেই কেমন ফুরফুরে লাগলো। নিজের অফিসে ফিরে ডেস্কের নীচে টেপ দিয়ে আটকানো আমার সেই নোটটা পেয়ে গেলাম। নতুন সিইও কে স্বাগতম! নতুন সিইও! ফাক দি নিউ সিইও। আমিই এখানের বস, এবং আমার রিটায়ার্ডের সময় এখনো হয় নি। আগামী ২০ বছরের মধ্যে এই ব্রাঞ্চে কোন নতুন সিইও আসবে না আশা করি। নিজ হাতে ওই নোটটাকে ছিড়ে কুটিকুটি করলাম। তারপর অফিসের কাজে ডুবে গেলাম।
সারাদিন শেষে ৪টার দিকে মনিকার ফোন এলো। সে উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করে বলছে, “সাঞ্জে তাড়াতাড়ি কটেজে ফিরো। এখানে একটা সমস্যা হয়েছে। প্লীজ জলদি কর।”
কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠলো! বলে কি! কটেজে কি নতুন করে ভৌতিকতা শুরু হলো? আলেস কি কটেজে এখনো আটকে আছে? থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করছে না কেন? ও কি আমায় এড়িয়ে চলছে? নাকি কটেজে নতুন কোন অশরীরীর আবির্ভাব হয়েছে? মাথায় কিছুই ঢুকছে না। একটা ঘুম দিয়ে মাথাটা ফ্রেশ করে নিলে হয়তো কাজ করতো।
এসব যখন ভাবছিলাম তখন আমার ডেস্ক আটেন্ডেন্ট ডুবাইনো বিনা অনুমতিতেই হতদন্ত হয়ে আমার কক্ষে ঢুকলো। কি ব্যাপার ডুবাইন? কোন সমস্যা?
“ম্যাডাম, কিছু স্টার(STAR=Special Team of Action & Rescue=পোলিশ গোয়েন্দা সংস্থা) এসেছে। ওরা আপনার সাথে কথা বলতে চায়।
আমি ধরা পড়ে গেছি। ওরা সম্ভবত গতরাতের ব্যাপারে কথা বলতে চায়। গার্ডকে পেটানোর জন্যে হয়তো আমায় ধরে নিয়ে যাবে। পোলিশ সিকুরিটি আর বাংলাদেশী নেড়ি কুকুরের খুব সামঞ্জস্য রয়েছে। দুটোই গন্ধ শুকেশুকে পাতাল খুড়ে বের করে আনতে পারে।
ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে দুজন বিশালদেহী গোয়েন্দা ঠাস করে দরজা খুলে আমার অফিসে ঢুকলে। ইচ্ছা করছিলো থাপড়ে ওদের ভদ্রতা শিখিয়ে দেই। আমি ওদের বসতেও বললাম না। ওদের চোখের দিকে না তাকিয়েই বললাম, “আমি আপনাদের এখানে আশা করিনি স্টারস। তবুও আপনাদের সাহায্য করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো।”
ওদের একজন বলল, “মিস সাঞ্জে, আপনাকে আমাদের সাথে একটু ঘুরতে যেতে হবে। ”
আমি দৃঢ় কন্ঠে বললাম, “দুঃখিত অফিসারস। আমার উপর দিয়ে আজ অনেক ধকল গেছে। এখন আমি টায়ার্ড। বাড়ি ফিরে ঘুমাতে হবে।”
ওরা বলল,”অসুবিধা নেই মিস সাঞ্জে। আমরা আপনার বিশ্রামের ব্যবস্থা করব। তবুও আপনাকে আমাদের সাথে আসতেই হবে। আমরা আপনার ঘড়িটা খুজে পেয়েছি। ওটা তার যোগ্য মালিকের কাছে ফেরৎ দিতে চাই।”
এই সেরেছে। কাল গোরস্থানে সম্ভবত আমার ঘড়িটা ফেলে এসেছি। খেল খতম। ধরা পড়ে গেছি। তবুও ঠাট বজায় রেখে বললাম,”আপনাদের কাছে কি গ্রেফতারী পরোয়ানা আছে? আমায় নিয়ে যেতে হলে আপনাদের ওটা দেখাতে হবে।”
ওরা বলল, “রিলাক্স মিস সাঞ্জে। আমরা এখানে কোন এরেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে আসিনি। তবে আপনি চাইলে দশ মিনিটের ভেতর ওটা এনে হাজির করতে পারি। তবে সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনি আমদের কর্তব্য পালনে সহায়তা করেন।”
বুঝলাম এদের বাধা দিয়ে লাভ নেই। এরা আমায় নিয়ে যাবেই। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, “ঠিক আছে তবে, চলুন যাওয়া যাক। ”
(চলবে)

ডাকিণী (২৭তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
শূন্য কটেজে আমি একা একাই স্নান করলাম। সারাটি সময় আমি শুধু আয়নার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু ও এলো না। গোসল করে কবরস্থানের কাঁদামাটি ছাড়াতেই মনটা কিছুটা ভাল হলো। উপলব্ধি করলাম জীবনে কেউই স্থায়ি হয় না। সবারই কেই এক সময় চলে যেতে হয়। এটাকে মেনেই তো জীবন।মনেমনে পরপারে আলেস মার্টিনীর সুখী জীবন কামনা করলাম।
গোসলে শেষে যেই না তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছি তখনই কলিংবেলটা বেজে উঠলো। ধ্যাত। এই অসময়ে আবার কে এলো? বিরক্তি তখন চরমে। বিড়বিড় করে গালি দিতে দিতে দরজা খুললাম। আরে! এতো মনিকা! মনিকা শেরল্ড। ডেভরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা পরিদর্শক। ওর কাজই হলো ইউরোপের যেসব দেশে ডেভরনের শাখা রয়েছে সেগুলি ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করা, আর অব্যাবস্থাপনা সমুহকে খুজে বের করে মিউনিখের হেড অফিসে রিপোর্ট করা।এই সময়ে ওকে আমি একটু ও আশা করি নি। ও এসেই খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ও বলল, “সাঞ্জে ডিয়ার। এতোদিন পর আবার তোমার সাথে দেখা। শুনলাম তুমি নতুন বাড়ি কিনেছো। তাই হোটেল ছেড়ে সোজা তোমার ওখানেই চলে এলাম। তাড়িয়ে দিবে না তো?”
নিত্যান্ত সৌজন্যতার খাতিরেই আমি ওকে ভেতরে নিয়ে আসলাম। আরে মনিকা ডার্লিং। তুমি কি যে বল না। একা একা কটেজে বিরক্তি ধরে গিয়েছিলো। তুমি আসায় বরং প্রাণে বাচলাম। তুমি একটু বসো, আমি মাত্র কিচেন থেকে নাস্তা নিয়ে আসছি। নাস্তা খেয়েই দুজন এক সাথে অফিসে যাবো। তুমি একটু অপেক্ষা কর।
যাহ সেরেছে।ভেবেছিলাম গোছল শেষে ঘন্টা খানেক একটা ঘুম দেবো। মনিকা আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। কিচেনে নাস্তা বানাতে বানাতে ওর সাথে আমার প্রথম দেখাটা মনে পড়ে গেলো। আমাদের প্রথম দিনটা প্রচন্ড অসৌজন্যমূলক ছিলো। সেদিন ছিলো সোমবার। প্রতি সোমবারই আমরা অফিসের একটু তাড়াতাড়ি গোছিয়ে ফেলে, ৪:৩০টা থেকে ৫:০০টা পর্যন্ত কনফারেন্স রুমে বসে আড্ডা দেই। কার উইকএন্ড কেমন কাটলো এটাই থাকে আড্ডার প্রধান বিষয়বস্তু। এই আড্ডায় অফিসের দারোয়ান থেকে ধরে সিইও সবাই অংশ নেয়। পদাধিকার বলে আমিই এর সভাপতি থাকি। হিহিহিহি।
তো সেদিন মার্কো কথা শুরু করেছিলো। “এই উইকএন্ডে বউকে নিয়ে ওয়ারশো গিয়েছিলাম ভাইয়ের বাড়ি। কি যে বলব গায়েজ, ওখানে এত্ত ছোট ছোট আপার্টমেন্ট যে আমার বউ ঠিক মতো পা ছড়িয়ে শুতেই পারে নি। সেক্স করা তো দুরেই থাক। সেক্স ছাড়া আমার উইকেন্ডটা একদম মাটি হয়ে গেলো।”
আড্ডায় আমি সেক্সুয়াল কিছু নিয়ে কথা উঠতে দিতে চাইছিলাম না। তাই ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, “এই সেক্স ছাড়া তোমার মাথায় কি আর কিছু নেই মার্কো? সেক্স করতে না পারলেও তো তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে পেরেছো। ওটা নিয়েই তোমার তো খুশি হওয়া উচিৎ।”
পাশেই বসা ছিলো ফিনিশ সুন্দরি সুজানা লুইজি। ও আমাদের অফিসের আক্যাউন্টেন্ট। সে মনেমনে মার্কো কে পছন্দ করতো তবে ওর বউ থাকায় খুব একটা সুবিধা করতে পারে নি। মার্কোর কথা শুনে সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো, “কি রে মার্কো? তোর বউ হাতি না কি রে? আস্ত একটা আপার্টমেন্টেও ধরে না! ”
এবার ওর কথার খেই ধরলো আমাদের অফিসের সাক্ষাৎ গোপালভাঁড় জোভিন এভিকোভিচ। ও আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আর বলবেন না ম্যাড্যাম। দুবছর আগে আমি আর মার্কো গ্রীষ্মের ছুটিতে আফ্রিকার একটা গেইম রিজার্ভে গিয়েছিলাম। ওখানে অসংখ্য জীবজন্তুর মাঝে মার্কোর একটা হাতিকে পছন্দ হয়ে গেলো। আর যায় কোথা? আফ্রিকা থেকে বিয়ে করে সোজা পোল্যান্ডে নিয়ে এলো।”
জোভিনের কথায় সারা কনফারেন্স রুমে হাসির রোল উঠলো। মার্কো খেপে গিয়ে মুঠো পাকিয়ে জোভিনকে ঘুসি দেখালো। এমন হৈ হোল্লড় সময় কনফারেন্স কক্ষে মনিকা প্রবেশ করে। এসেই বলে উঠে, “আমি কান্ট্রি ইন্সপেক্টর মনিকা শেরল্ড। আপনারা এখানে অফিস ফাঁকি দিয়ে কি করছেন তা দেখতে এসেছি। আপনারা সবাই যার যার কক্ষে ফেরৎ যান। নতুবা আমি মিউনিখে এটা নিয়ে রিপোর্ট করতে বাধ্য হবো।”
ও তার এখতিয়ার থেকে বেশী কিছু বলে ফেলেছে। ওর কাজ হলো পরিদর্শন আর রিপোর্ট। ও কখনই কোন অফিসের কর্মচারীকে নিজ কক্ষে ফেরৎ যাওয়ার আদেশ দিতে পারে না। আমি এখানকার সিইও। এখানে কেবল আমার আদেশই চলবে। ওর এহেন ব্যবহার সেদিন আমার আত্মসম্মানে প্রচন্ড আঘাত করে। আমার অফিসে দাঁড়িয়ে, আমার সামনে, আমার কর্মচারীদের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা ওকে কে দিয়েছে? আমার প্রচন্ড ইচ্ছা হচ্ছিলো ওর টুটি চেপে ধরি। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “মিসেস মনিকা। আপনি মিউনিখে যা ইচ্ছা রিপোর্ট করতে পারেন। আপনার সে এখতিয়ার আছে। তবে এটা আমার অফিস। এখানে যে কাউওকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া স্বীকৃত অধিকার আমার আছে। এই মুহুর্ত আপনি এখান থেকে বেরিয়ে যান, নতুবা আমার সিকিউরিটি আপনাকে বের করে দিতে বাধ্য হবে।”
আমার ইঙ্গিত পেয়েই অফিসের বিশালদেহী মেক্সিকান দারোয়ান আলবার্তো মনিকার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। ওর ভাব ভঙ্গিতে মনে হলো মনিকাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্যে তার আর তর সইছে না। চরম অপমানিত হয়ে মনিকা সেদিন অফিস থেকে গটগট করে বেরিয়ে গিয়েছিলো।
সেদিনের ঘটনাটা অনেক দুর পর্যন্ত গড়াতে পারতো। কিন্তু অফিস শেষে আমি আর মনিকা একসাথে ডিনার করে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলি। ডিনার করতে করতে ও নিজের সম্পর্কে বিস্তারিত বলে। ওর একটা স্বামী আর দুটো সন্তান ছিলো। ওর চার বছরের সংসার জীবন একটা ঝড়ে ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়। একদিন সে বাড়ি ছেড়ে দুদিনের জন্যে ওর মায়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো। কিন্তু ওর মা কে বাড়িতে না পেয়ে পরদিনই ফিরে আসে। ওর স্বামী জানতো না যে ও তাড়াতাড়ি ফিরছে। সেদিন সন্ধায় ও বাড়ি ফিরে ওর স্বামীকে আরেকটি মেয়ের সাথে বিছানায় আবিষ্কার করে। সেদিনই সে তার একটা সন্তানকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু দুবছর আগে সেই সন্তানটাও মারা যায়। ও যখন স্কুল শেষে হেটে বাড়ি ফিরছিলো তখন এক মধ্যপ ড্রাইভার ওর উপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দেয়। ও ঘটনাস্থলেই মারা যায়। কথাগুলি বলার সময় ওর চোখ দিয়ে অঝরধারায় পানি পড়ছিলো। আহ বেচারি। সেই আক্সিডেন্ট ওর জীবনটাকে একদম এলোমেলো করে দেয়। এসব দুঃখ ভুলে থাকতেই ও মদ আর বহুগামিতায় ডুবে যায়। প্রতি সপ্তাহান্তেই ওর দু বোতল শ্যাম্পেইন আর অন্তত একজন নতুন পুরুষসঙ্গীর প্রয়োজন হয়। ও একজনের সাথে একরাতের বেশী দুরাত কাটায় না। এতে সম্পর্ক গভীরে পৌছে না, তাই বিচ্ছেদের কষ্ট পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না।
ও পাশ্চাত্যের উদ্দাম যৌনতার এক মর্মান্তিক শিকার। আজ ইউরোপে যৌন স্বাধিনতার নামে উদ্দাম যৌনতার বিষবাষ্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যৌন স্বাধিনতা আর উদ্দাম যৌনতা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। যৌন স্বাধিনতা হল একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের একান্ত ব্যাক্তিস্বাধিনতা। এই স্বাধিনতা নিশ্চিত করে যে সে দ্বৈত সম্মতিক্রমে তার ভালবাসার মানুষটির সাথে মিলিত হতে পারবে কোন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। অপর দিকে উদ্দাম যৌনতা হল চোখের সামনে যাকে পাওয়া যায় তার সাথেই মিলন। যৌনতা মানুষের শ্রেষ্ঠ উপাসনা হলেও, উদ্দাম যৌনতা নিঃসন্দেহে একটা পাপাচার। এই পাপাচারে সমগ্র ইউরোপ আজ ছেয়ে গেছে। মনিকার পরিবারের মতোই আরো অনেকগুলি সুখি পরিবার এই পাপাচারের শাস্তি সরূপ আজ ভেঙ্গে যাচ্ছে। এখানে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ আজ তলানিতে ঠেকেছে। গতিশীল সামাজপরিবর্তনের ধারা এখানে স্থিমিত হয়ে গেছে। সমগ্র ইউরোপীয় সমাজ ব্যাবস্থা যেন পচনধরা একটা বিশাল মৃত তিমি। এর গা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বেরুলেও এর মৃত চোখ দুটো এখনো উজ্জল। বাহ্যিক এই উজ্জ্বলাতায় মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়ান যুবসমাজ আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এরাই যদি কাছে যেয়ে এর গন্ধ শুকতো তবে এর থেকে পালিয়ে বাচার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠতো। ইউরোপের এই দুষিত বাতাস ইন্ডিয়া হয়ে আমার সোনার বাংলাতে ও প্রবেশ করতেছে। ভয় হয় হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশও উদ্দাম যৌনতায় আক্রান্ত হবে। হায় খোদা আমার দেশ ও সমাজকে এই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত রেখো।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নাস্তা হয়ে এসেছে বুঝতে পারিনি। ওভেনের ওয়ার্নিং বেল পড়তেই আমার হুশ হলো। তাড়াতাড়ি খাবার গুলি বের করে ডায়ানিং টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম। তারপর ড্রয়িং রুমে বসা মনিকার উদ্দেশ্যে হাক ছাড়লাম, “মনিকা, নাস্তা তৈরি। তাড়াতাড়ি খেতে আসো।” কিন্তু ও সাড়া দিলো না। আবার ওর নাম ধরে ডাকলাম। কোন সাড়া নেই। কি আশ্চর্য! মেয়েটা ডায়ানিং রুমে চুপচাপ বসে কি করছে? এগিয়ে গেলাম দেখার জন্যে! কিন্তু, হায় ডায়ানিং রুম তো খালি। ও সেখানে নেই! তখনই লাইব্রেরী থেকে ওর চিৎকার শুনলাম। “বাচাও, বাচাও। আমাকে দরজা আটকে ফেলেছে। সাঞ্জে বাচাও।” আমার হৃদপিণ্ডটা ধড়াক করে উঠলো! লাইব্রেরীর দরজার উপর আলেসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবে কি ও পরপারে যায় নি? এসব ভাবতে ভাবতেই আমি লাইব্রেরীর দিকে দোড় তুললাম। ,,,
(চলবে)

ডাকিণী (২৬তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
হাপাতে হাপাতে গীর্জার গেট গলে ভেতরে ঢুকলাম। এতো বড় একটা সাইড ব্যাগ নিয়ে দৌড়ানো সত্যিই কষ্টকর। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে ছেলে দুটো গীর্জার গেটের সামনে বাইক থামিয়ে খানিকক্ষণ ইতস্তত করলো। এই সুযোগে আমিও গাড়ির কাছাকাছি পৌছে গেলাম। খানিক পরেই ওরা সব ধিদ্ধা ঝেড়ে ফেলে বাইক চালিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো। ওরা হয়তো ভাবছে বৃহষ্পতিবার বলে গীর্জাটা ফাঁকাই থাকবে। ফাঁকা গীর্জায় আমাকে ইচ্ছামত ভোগ করতে পারবে। কিন্তু ওদের সে আশায় গুড়েবালি। আমি ইতিমধ্যেই গাড়িতে উঠে বসেছি। গাড়িটাকে এতটা আপন আর কখনো মনে হয় নি। আমার অপেল, আমার লক্ষি স্পিডস্টার। পকেট থেকে চাবি বের করেই ইগনিশনে ঢুকিয়ে মোচড় দিলাম। গাড়িটা একটু কেশেই আবার বন্ধ হয়ে গেলো। আবার মোচড় দিলাম। কিন্তু এবারো স্টার্ট নিলো না। এসব কি হচ্ছে! আমার গাড়িটা কখনোই আমার সাথে এমনটা করেনি। দু বছর ধরে ব্যবহার করছি। প্রতিদিনই এক কিক এ স্টার্ট হয়! কিন্তু আজকে! আজকে যখন সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন তখনই স্টার্ট ফেল করছে! ছেলে দুটো গাড়ি থেকে মাত্র দশ ফিট ব্যবধানে আছে। এদের একজনের হাতে একটা বড় ছোরা সূর্যালোকে ঝিকমিক করছে। আমি শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে আবারো চাবিটা মোচড় দিতে চাইলাম। অনেকটা পথ দৌড়ে আসায় আমার শরীরটা তখনো কাঁপছিল। তাই মোচড় দেয়ার সময় তাড়াহুড়োয় চাবিটা বেরিয়ে এসে হাত থেকে পড়ে গেলো। আমি মরিয়া হয়ে গাড়ির মেঝেতে চাবির খুজে হাতড়াচ্ছিলাম। তখনই কোন এক জাদু বলে গাড়িটা ইগনিশন ছাড়াই নিজে থেকেই স্টার্ট নিলো। ব্যাপারটা নিয়ে তখন এতো কিছু ভাবি নি। ভাবলে পরে হয়তোটা ঝামেলায় পড়তে হতো না। গাড়ি স্টার্ট নিতেই আমি খুশি মনে স্টিয়ারিং হুইল ধরলাম। প্রথম গিয়ার ফেলে আক্সেলারেটরে পা মেঝে পর্যন্ত দাবিয়ে দিলাম। গাড়িটা লাফিয়ে আগে বাড়লো। গাড়ির নাকের গোঁতো খেয়ে একটা মটরসাইকেল আরোহী ছিটকে দশ হাত দুরে গিয়ে পড়লো। অপরজন সংঘর্ষ এড়াতে হেচকা টানে বাইকের নাক ঘুরালো। কিন্তু এতেই ওর কাল হলো। বাইকটা তাল সামলাতে না পেরে শূন্যে ডিগবাজী খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো। নিজেকে তখন জেমস বন্ডের মা মনে হচ্ছিলো। খালি হাতেই একপাল ছেলে পেলে কে কেমন শায়েস্তা করলাম! বিড়বিড় করে নিজেই নিজেকে বললাম, “সাঞ্জে দ্য গ্রেট।”
গীর্জার গেটের কাছে এসে গাড়িটা একটু থামিয়ে, জানলা দিয়ে মুখ বের করে ছেলে দুটোকে দেখলাম। একজন চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, সম্ভবত অজ্ঞান। অপরজন উঠে বসেছে, আর আমার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি চিৎকার করে ওদের উদ্দেশ্যে বললাম, “ফাক ইয়ো বেবিজ।” ওরা পোলিশ হলেও আশাকরি এইটুকু ইংরেজির মানে ওরা ঠিকই বুঝতে পারবে। আপন মনে হাসতে হাসতে গাড়ি ছুটালাম। হঠাৎ চোখ গেলো ড্যাশবোর্ড মিররের দিকে। মিররে দেখলাম আমার পাশের সিটেই একজন মধ্য বয়ষ্কা মহিলা বসে আছে। তার কপালে একটা বিশাল গোলাকার পোড়া দাগ! তবে ওটা ঘাড় ঘুরাতেই আবার মিলিয়ে গেলো। এ ব্যাপারটা সম্পূর্ণটাই আমার কল্পনা হতে পারে। প্রিস্ট এখন প্রকৃতপক্ষেই মৃত। কপালে আংটির ছ্যাকা খাওয়া সকল মেয়েরাই এখন মুক্ত। কাল রাতের সেই অদ্ভুত বজ্রপাতের সাথে সাথে আমি ওদের চলে যেতে দেখেছি। তাই গাড়ির পাশের সিটে কোন মেয়ের আত্মা উপস্থিত থাকা একেবারেই অযৌক্তিক। আমার অতিশিঘ্রই কটেজে ফিরা দরকার। পরিশ্রান্ত মস্তিষ্কে এসব ঊল্টাপাল্টা দেখে দেখে গাড়ি চালালে আক্সিডেন্টের সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ। হঠাৎ অনুভব করলাম স্টিয়ারিং হুলটা নিজে থেকেই ঘুরতে শুরু করেছে। আমি জানি না ওটা কিসের প্রভাবে। তবে একজন নির্ভরযোগ্য কো-ড্রাইভার পেয়ে আমি গাড়ি চালানোর দ্বায়িত্বে গাফেলতি শুরু করলাম। সারারাতের পরিশ্রম শেষে কটেজে ফিরার তর সইছিলো না। তাই চলন্ত গাড়িতেই স্টিয়ারিং হুইলে মাথা ফেলে ঘুমিয়ে পড়লাম.
ঘুম থেকে জেগে দেখি আমার গাড়িটা কটেজের ফটকের সামনেই দাড়িয়ে আছে। এতকিছুর পর ঘরে ফিরতে পেরে মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। মনে হচ্ছে যেন বিশ্ব জয় করে এসেছি। গেট খুলে ভেতরে ঢুকে, গ্যারেজে গাড়িটা পার্ক করলাম। তারপর হেটে হেটে কুয়োটার পাশে এসে দাড়ালাম। কুয়োর সামনে দাড়িয়ে, নীচের দিকে মুখ করে হাঁক ছাড়লাম, “আলেস, আমি ফিরে এসেছি আলেস। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? এখনো কি আছো এখানে?”
একই প্রশ্ন আমি লাইব্রেরী, বেডরুম, এমনকি বেসমেন্টে গিয়েও করলাম। কিন্তু কোন সাড়া পেলাম না। বাথরুমের আয়নাটা খালি। কটেজটা জুড়ে এক অনাকাঙ্খিত শূন্যতা। ও সম্ভবত চলে গেছে না ফেরার দেশে। মেয়েরা স্বার্থপর হয় জানতাম। কিন্তু তাই বলে এতটা হবে তা আশা করিনি। আমি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কি এমন ক্ষতি হতো? আলেস আমাকে বিদায় জানানোর সুযোগটাও দিলো না। ভাবতেই চোখ বেয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।
(চলবে)

ডাকিণী (২৫তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কাজ শেষে ওর কফিনের ডালাটা নামিয়ে দিলাম চিরজীবনের জন্যে। আরো সহস্র বৎসর পর হয়তো কেউ একজন একে খুলে আমারই মতো বিষ্ময়ে নির্বাক হয়ে যাবে! তখন ওরা কল্পনাও করতে পারবে না একে মারতে আমার কতটা কষ্ট হয়েছিলো। তবে ইদানীং যে হারে ডেভেলপার কম্পানি গুলি কাজ শুরু করেছে, তাতে সহস্র বৎসর দুরে থাক, আগামী দুমাসের মধ্যেই এখানে হয়তো একটা বিল্ডিং উঠে যেতে পারে।
ধ্যাত। এসব আজেবাজে ভাবনায় সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। সূর্য উঠেগেছে। তড়িঘড়ি করে এখান থেকে বেরুতে হবে। নইলে গার্ডরা ধরে ফেলবে। এই অর্ধনগ্ন অবস্থায় গোরুস্থানে ধরা পড়লে আমার দেয়ার মতো কোন কৈফিয়তই থাকবে না। হায় খোদা! আমি তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একটা গার্ডকে তো আমি কাল রাতেই সাইজ করে দিয়েছি। ও কি এখনো বাধা আছে ঠিক মতো, না কি ছাড়া পেয়ে তার সঙ্গী সাথিদের নিয়ে আসছে। এখন এসব দেখার সময় নেই। প্রিস্টের কবরে মাটি ভরাট করতে হবে। তারপর সবার নজর এড়িয়ে আলগোছে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। দ্রুত কোদাল হাতে কাজে নেমে পড়লাম। কোদালের হাতলে পেঁচানো ব্রা টা কাল রাতে কোপানোর সময়ই ঘর্ষণে ছিড়ে গেছে। নগ্ন হাতলের ঘর্ষণ শুধু দাঁতে দাত চেপে হজম করলাম। তবে কবর খুড়ার চেয়ে কবর ভরাট করা অনেক সহজ। স্তুপ করা আলগা মাটিটা কেবল টেনে গর্তে ফেলে দিলেই হয়। যে কবর খুঁড়তে রাতে দু ঘন্টার ও বেশী সময় লেগেছিলো তা আজ সকালে মাত্র দশ মিনিটে ভরে ফেললাম। সমস্ত জিনিসপত্র একে একে কুড়িয়ে ফের সাইড ব্যাগে ভরলাম। এখানে কাজ শেষ। এবার ফেরা যাক। ফেরার আগে কাল রাতের সুখি গার্ডটা কে একবার দেখতে হবে। দেখা হলে ওর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবো। ও ক্ষমা করুক আর না করুক শুধু আমার নামে মামলা না করিলেই হলো। পোল্যান্ডের আইন খুবই কড়া। এখানে সিকিউরিটির লোকজনের গায়ে হাত তুললে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বউচ্চ ২৫ বছরের জেল হওয়ার বিধান রয়েছে। বাঘ ছুলে আঠারো ঘা, আর পুলিশ ছুলে জেলের রুটি খা। তাই বাঘ বা পুলিশ, এদের কারো গায়েই হাত তোলা ঠিক না।
ওকে যে গাছের নিচে বেধেঁ রেখেছিলাম তার কাছে পৌছতেই আমার আত্মাটা শুকিয়ে গেলো। ওখানে কেউ নেই। শুধু আমার ছেড়া শার্ট আর পেন্টি পড়ে আছে। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। সাথে অন্তত দুই প্রস্থ দড়ি রাখা উচিৎ ছিলো। একমাত্র যে দড়িটা এনেছিলাম সেটা এখনো গীর্জার ছাদে ঝলছে। আর একটা দড়ি থাকলেই হাঁদাটা কে বাধতে এতো বেগ পেতে হতো না। আরো বড় ভুল হয়েছে বাধতে যেয়ে। আমার শার্ট দিয়ে না বেধে ওর প্যান্ট দিয়ে বাধলেই ভালো হতো। আসলে রাতের আধারে ওর প্যান্টের ব্যাল্ট খুলার ঝামেলায় যেতে চাইনি। তাই বলে পুরুষের প্যান্টের ব্যাল্ট খুলতে আমি একটুও অনভিজ্ঞ নই। অভির বেল্ট তো আমি চোখ বন্ধ করে খুলতে পারি। কিন্তু এটা একটা গার্ডের বেল্ট। পোল্যান্ডে সিকিউরিটির লোকেরা যোগাযোগের জন্যে বাংলাদেশী পুলিশদের মতো ইয়া বড়বড় ওয়াকিটকি ব্যবহার করে না। ওদের বেল্টেই ক্ষুদে ট্রান্সমিটার লাগানো থাকে। নিকষ আধারে বেল্ট হাতড়ানোর সময় ভুল করে যদি ঐ ট্রান্সমিটারের বাটনে একটা টিপ পড়ে ওটা সচল হয়ে যেতো তাহলেই খেল খতম ছিলো। যা হবার ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এবার এখান থেকে যাওয়া যাক।
যখনই উঠতে যাচ্ছিলাম তখন এক ঝাঁক গার্ডের হুইসেলের শব্দে আমু আৎকে উঠলাম। এই যাহ। তীরে এসে আজ তরী ডুবলো। গার্ডগুলি দেখছি এদিকেই আসছে। সিমেট্রির প্রধান ফটক থেকে সোজা সেই গাছটা বরাবর। তবে এখনো ওরা আমাকে দেখে ফেলার মতো এতটা কাছে নয়। এক দৌড়ে আমি গাছটার নিচে থেকে আমার ব্রা আর পেন্টিটা কুড়িয়ে আনলাম। আমি কোন সুত্র ফেলে যেতে চাই না। তারপর এক দৌড়ে আরেকটি কবরের নাম ফলকের নিচে গাঁ ঢাকা দিলাম।
গার্ড গুলিও হাবাগোবার মতোপ্রধান ফটক ছেড়ে সবাই এক সাথে এসে সেই গাছটার নীচে ভিড় করলো। ওরা জানতেও পারলো না ওদের গাফেলতির সুযোগ নিয়ে আমি সেই কখন গোরস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছি। সিমেট্রি থেকে বেরিয়েই একটা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হলাম। আমার গাড়িটা সিমেট্রির পশ্চাৎ গেটে গীর্জা প্রাঙ্গণে পার্ক করেছিলাম। কিন্তু বেরিয়েছি প্রধান ফটক দিয়ে। তারমানে আমাকে এই অর্ধনগ্ন অবস্থায়ই প্রায় দু ব্লক ঘুরে আমার গাড়িটার কাছে পৌছতে হবে! এতো ভোরে রাস্তায় কাউকে দেখছি না। মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি সাঁ করে ছুটে চলে যাচ্ছে। হায় খোদা। আর একটু সাহায্য কর। একবার শুধু গাড়ির নাগালটা পেলেই হলো। ড্রাইভ করে সোজা কটেজে চলে যাবো।
ইতস্তত ভাবে ফুটপাত ধরে পা বাড়ালাম। প্রায় অর্ধেকটা পথ কোন বাধা ছাড়াই পেরিয়ে এসেছিলাম। ঐ তো গির্জার ছাদটা দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছা করছিলো দৌড়ে ছুটে যাই সেখানে। সেদিকে আরো দ্রুত পা চালালাম। কিন্তু কোত্থেকে যে চারটে মটোর সাইকেলে করে কতগুলি টিনএজ ছেলে পেলে এসে উদয় হল। ওরা আমায় ঘিরে বাইকে চড়ে চক্কর দিতে লাগলো। টিনএজ বয়সে যৌনাকাঙ্ক্ষা চরমে পৌছে। আমি নিজেও এই বয়সটা পেরিয়ে এসেছি। রাস্তায় এক অর্ধনগ্ন মেয়েকে দেখে এদের আকৃষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু এই স্বাভাবিক আচরণটাই আজ আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারো সাথেই সময় কাটানোর ইচ্ছা বা ধৈর্য আমার নেই। একটা পরিশ্রান্ত রাতের পর আমায় কটেজে ফিরে একটা ভালো ঘুম দিতে হবে। ওরা আমায় ঘিরে ফুটপাতের চারদিকে চক্রাকারে ঘুরছে আর আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করছে। এদের মধ্যে থেকে যদি একটা বাইকওয়ালা কে মাটিতে ফেলতে পারি তবে এই চক্রে একটা ছিদ্র সৃষ্টি হবে। সেই ছিদ্র গলে বেরিয়েই আমাকে গীর্জার দিকে দৌড়াতে হবে। আশাকরি ওরা খানিকক্ষণ তাদের পড়ে যাওয়া সাথিদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকবে। আশাকরি সেই সময়টুকুর সধ্য ব্যবহার করে আমি গীর্জার ভেতর গাড়ির কাছে পৌছে যাব। একবার গাড়িটা স্টার্ট দিতে পারলেই হলো। এদের সামনে দিয়েই বীরের মতো বেরিয়ে যাওয়া যাবে। যে ই লাগতে আসবে তাকেই পিষে চ্যাপটা বানিয়ে ফেলবো।
একটা নীল বাইককে প্রথমে টার্গেট করলাম। ওতে মাত্র একজন আরোহী। তাই ঘুর্ণয়মান বাইকগুলির মধ্যে একে ফেলাই সবচেয়ে সহজ হবে। পাঁক খেতে খেতে এরা ধীরে ধীরে চক্রের পরিধি কমিয়ে আনছে। নীল বাইকটার উপর আমি সার্বক্ষণিক চোখ রাখছি। ওটা আমার প্রায় নাগালের মধ্যেই। হঠাৎ এক পা সামনে এগিয়ে ওটার হ্যান্ডেল ধরে দিলাম এক হেচকা টান। আরোহী বাইক সহ উল্টে মাটিতে পড়ে গেলো।
আমার কপাল ভালই বলতে হবে। পড়ে যাওয়া বাইকে বেধেঁ আরেকটি বাইক হুমড়ি খেলো। কিন্তু অন্য দুটো বাইক এখনো আমাকে ঘিরে ঘুরেই যাচ্ছে। পড়ে যাওয়া বন্ধুদের প্রতি ওদের কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। কিন্তু ও দুটোর মধ্যে বেশ খানিকটা ফাঁকা যায়গা রয়েছে। ঐ ফাঁকা যায়গাটা লক্ষ করেই আমি ঝাঁপ দিলাম।
রাস্তার উপর ডিগবাজি খেয়ে খানিকটা গড়িয়ে গেলাম। দু কুনুইয়ের বেশ কয়েকটা জায়গায় চামড়া ছিলে গেলো। আমি সব কিছু উপেক্ষা করে উঠে দাড়িয়ে দিলাম এক ভোঁ দৌড়। আমার ধারণা ভুল ছিলো। ছেলে গুলি আহত বন্ধুদের জন্যে সময় নষ্ট করে নি। বরং তাতক্ষণাত আমাকে গালি দিতে দিতে পিছু ধাওয়া করলো। বাইকের শব্দটা ক্রমেই নিকটতর হচ্ছে। আমি ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকালাম না। শুধু রুদ্ধশ্বাসে গীর্জাপাণে দৌড়,,,,,,,
(চলবে)

ডাকিণী (২৪তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি একদম হাল ছেড়ে দিয়ে মারা পড়তে বসেছিলাম। একে তো লোহার কফিনের ভেতর অক্সিজেনের সল্পতা তার উপর গলা চেপে ধরা প্রিস্টের পুরুষ্ট হাত। বাঁচার কোন আশাই দেখছিলাম না। তখনই হঠাৎ মনে পড়লো, আমি যে স্কার্টটা পরেছি তার বেল্টের পকেটে একটা সুইস পকেট নাইফ আছে। প্রিস্টের আঙুল ওটা দিয়ে এক পোঁচে কেটে দেয়া যাবে। এটা আঙুল টেনে ছেড়ার থেকে অনেক সহজ হবে। বুঝতে পারছিলাম আমার সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। আর সর্বউচ্চ ত্রিশ সেকেন্ড এভাবে শ্বাস না নিয়ে টিকে থাকতে পারবো। তারপরই সব শেষ। সমস্ত মনযোগ একত্রিত করে নিজের কটিদেশ হাতড়ে ছুরিটা বের করে নিয়ে এলাম। ছুরির ফলাটার ফোল্ড খুলতেই যেন সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত হল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। হাত যেভাবে কাঁপছে তাতে প্রিস্টের আঙুল কাটতে যেয়ে হয়তো নিজের ঘাড়ের শিরাটাই কেটে দেবো, কিংবা ছুরির ফলাটা আমার শিরদাঁড়ায় গেঁথে যাবে। উহঃ। আমি এতো কিছু ভাবতে পারছিনা। শুধু একটা কথাই মনে আসছে। যে করেই হোক শয়তানটাকে শেষ করতে হবে। এতে যদি ওর সাথে আমাকেও মরতে হয় তাতেও আমার কোন আপত্তি নেই।
আমার ঘাড়ে আকড়ে থাকা সেই মধ্যমাটাকে ঠাওরে চোখ বন্ধ করে দিলাম এক টান। হঠাৎ আমার গলায় চাপ কমে গেল। চেপে ধরা হাত দুটো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এতক্ষণ পর শ্বাস নিতে পেরে মুখ হা করে পৃথিবীর সবটুকু বাতাস বুকে ভরে নিতে চাইলাম। ঠিক তখনই ধা করে কফিনের ডালা খুলে গেলো। আমার নীচে প্রিস্টের দেহে যেন খিচুনি শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক শুদ্ধ বাতাস আমার বুকটা ভরিয়ে দিলো। আমার চারদিকে বাতাসে ঘুর্ণী অনুভব করলাম। সমগ্র কফিনটা ঘিরেই যেন একটা ঘুর্ণীঝড় জন্ম নিয়েছে! তারপরই একটা বিষ্ময়কর বজ্রপাত! কিন্তু প্রাকৃতিক বজ্রপাতের সাথে এর তফাৎ হলো, সাধারণ বজ্রপাত গুলি আকাশ থেকে মাটিতে আঘাত হানে। কিন্তু এ বজ্র কফিনে পড়ে থাকা আংটি থেকে উৎপন্ন হয়ে সোজা আকাশে হারিয়ে গেলো। সাথে সাথেই প্রিস্টের দেহটা একদম নিথর হয়ে গেলো। ও সম্ভবত এই মাত্র নরকে পাড়ি জমিয়েছে। ওর উচিৎ সাজার ভার আমি স্রষ্টার হাতেই ছেড়ে দিলাম। ওদিকে আমার ঘাড়ের একপাশে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছিলাম! হাত দিয়েই বুঝতে পারলাম ওখান থেকে গলগলিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। তবে এটা নিশ্চিত আমার গলার শিরাটা কাটা পড়েনি। ওটা কাটলে গলগলিয়ে নয় বরং ফিংকি দিয়ে রক্ত পড়তো। তবুও নিজেকে খুব ক্লান্ত লাগছে। শ্বাসপ্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলেও মাথাটা এখনো ঘুরছে। বার দুয়েক কফিন থেকে উঠার চেষ্টা করতেই জ্ঞান হারিয়ে ওটার ভেতরেই পড়ে গেলাম।
ভোরের নতুন সূর্যালোক আমার চোখ ধাঁদিয়ে দিলো। জ্ঞান ফিরতেই কফিনের ভেতর থেকে উঠে বসলাম। ঘাড়ে এখনো ব্যাথা করছে। সেখানে হাত দিতেই জমাট বাধা রক্তপিণ্ডের উপস্থিতি টের পেলাম। প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও ধিরে ধিরে গতরাতের সবকিছুই মনে পড়লো। আমার নিচেই সেই শয়তানের নিথর দেহটা পড়ে আছে। তার পাশেই আংটি পরা মধ্যমাটা সহ আরো দুটো বিচ্ছিন্ন আঙুল। মধ্যমাটা তুলে নিয়ে ভাল করে নেড়ে চেড়ে দেখলাম। তারপর আস্তে করে টান দিতেই আংটিটা সেখান থেকে বেরিয়ে এলো। এই ছোট্ট একটা আংটি কি অসাধারণ খেল দেখালো। আজরাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি হিসেবে ওটা চিরকাল আমার কাছেই থাকবে। ওটা আমার মধ্যমায় পড়লাম। বাহ! বেশ সুন্দর ফিট হয়েছে তো! আমার আর প্রিস্টের মধ্যমার আকার প্রায় সমানই তো দেখছি। আংটিটা তাই আমাদের দুজনের হাতেই সমানভাবে ফিট হয়েছে। আমার হাতে ওর মৃত্যু লেখা ছিলো বলেই হয়তো আমাদের দুজনের আঙুলের মাপ এক। কথাটা মনে আসতেই আবারো তাকালাম প্রিস্টের মুখের দিকে। শুধু নিশ্চিত হতে চাইছিলাম যে ও সত্যিই মারা গেছে। দেখলাম ওর মুখটা হা হয়ে আছে। সেই মুখ দিয়ে কালসেটে দাঁত গুলি ভয়ানক ভাবে বাহিরে বেরিয়ে আছে। চেহারায় মৃত্যু যন্ত্রনার সুস্পষ্ট ছাপ। অবশেষে ও নরকে পৌছলো তাহলে।
আমার মুখের দুষ্ট হাসিটা আরো চওড়া হলো। এবার সময় এসেছে ওকে ভেজানোর। বাহ। কি সুন্দর মুখটা হাঁ করে আছে। যেন আমারই প্রতীক্ষায়। প্রথমে চারপাশটা একবার ভাল করে দেখে নিলাম। কেউ নেই দেখে প্রিস্টের বুকের উপর পা ছড়িয়ে বসে স্কার্টটা কোমরের উপর টেনে তুললাম। তারপর শিশিশিশিশিশিশি,,,,,,,,,, একদম ওর হা করা মুখের মধ্যে। জীবনে আমি হাজার বার প্রস্রাব করেছি। কিন্তু কখনই এতটা তৃপ্তি পাই নি। আ আ আ আ আ আ আ আহহহহহহহহহহহহহ। কি প্রশান্তি,,,,,,,,,,
(চলবে)

ডাকিণী (২৩তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পিঠ দিয়ে কফিনের ডালাটা উপরের দিকে ঠেলতে লাগলাম। কিন্তু ওটা কিছুতেই খুলতে চাইছে না। মনে হয় আটকে গেছে। মনে হচ্ছিলো সব শেষ। আমি আর এখান থেকে বেরুতে পারবো না। আলেসকে ভুল বুঝে আমি নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছি। অনুভুতি গুলি কাজ করছে না। এভাবে মরতে হচ্ছে বলে নিজের মধ্যে কোন অনুভুতি বা অনুশোচনা হচ্ছে না। শুধু মরার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে ইচ্ছা করছে। আমার আত্মাটার কি হবে? মৃত্যুর পরেও কি আমি এই প্রিস্টের কবল থেকে মুক্তি পাবো না? পরিশ্রম আর উত্তেজনা শেষে অবসাদে দেহটা নেতিয়ে পড়লো প্রিস্টের দেহের উপর। আমার উদোম শরীরে ওর দেহ থেকে আঠা লেগে চটচট করছে। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। শুধু চাইছি মৃত্যুটা যেন দ্রুত ও বেদনাহীন ভাবে হয়।
মাথাটা ঝিমঝিম করছে আর প্রচন্ড ভারী মনে হচ্ছে। অবশেষে নিরুপায় হয়ে প্রিস্টের আঠালো বুকে মাথাটা এলিয়ে দিলাম। ক্ষাণিকের জন্যে আমার বাগদত্তা অভিকে খুব মনে পড়লো। শৈশবটা একসাথেই কাটিয়েছি আমরা। কৈশরে এসে রঙিন ভালবাসা। প্রায় দশটা বছর ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিলাম আমরা। কিন্তু আমার আম্মুটার সেটা সহ্য হলো না। বিয়ের আয়োজন করে বসলো। ওর সেই চশমা পড়া গোলগোল মায়াবী চোখ, আর প্রশস্ত চওড়া বুকের ছাতি। অনেকদিন হলো ওর বুকে এভাবে মাথা রাখতে পারিনি!
অনুভব করলাম প্রিস্টের হাত দুটো আমার কোমর থেকে নগ্ন পিঠ বেয়ে উপরে উঠে আসছে। মনে হলো যেন পিঠে দুটো শুঁয়োপোকা কিলবিল করছে। ঠিক যেমন সপ্নে দেখেছিলাম। একসময় হাত দুটো ধীরে ধীরে আমার গলার দিকে এগুতে লাগলো। ও সম্ভবত আমায় গলা চিপে মারতে চায়। বাধা দেওয়ার শক্তি বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। আমি শুধু অধীর আগ্রহে জীবনের শেষ পরিণতির জন্যে অপেক্ষা করছি। হতাশায় চোখ দুটো বুজে এলো।
তখনি আমি নিজেকে কফিনে একা আবিষ্কার করলাম। প্রিস্টের দেহটা অদৃশ্য। উজ্জ্বল পরিষ্কার চাঁদনি রাত। আমি একা শুয়ে আছে এই লৌহ কফিনে। ডালাটা উপরে তুলা আছে। হঠাৎ কবরের নামফলকের পাশে এক পরমা সুন্দরি অপরূপাকে দেখতে পেলাম। বাথরুমের আয়নায় প্রথম দর্শনে আলেস যে এক প্রস্থ কাপড় পড়েছিলো, ঠিক তেমনি একটা কাপড় পড়েছে মেয়েটি। আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা হেসে ওর একটা হাত নাড়লো। তারপর সেই হাতের মধ্যমাটা অন্য হাত দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে ফেললো। কি বিদঘুটে কান্ড। তারপর একটা রহস্যময় হাসি দিয়েই সে দৌড়ে চলে গেলো। ও চলে যেতেই মেঘ গুলি চাদকে ঢেকে দিলো। চারিদিক আবার অন্ধকার হয়ে এলো। অনুভব করলাম এ অন্ধকারেই এক জোড়া হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরছে।
নিজেকে আবারো কফিনের ভেতরই আবিষ্কার করলাম, প্রিস্টের সাথেই। ও আমার গলা চিপে ধরেছে। আমার মাথায় দ্রুত কিছু ভাবনা খেলে গেলো। আলেসের কাপড় পড়া সুব্দরী মেয়েটি মার্টিনী না হয়ে যেতেই পারেনা। ওরা জীবদ্দশায় বন্দিশালায় কাপড় শেয়ার করেছিলো। তাই ওদের অশরীরী দুটো একই কাপড়ে আবির্ভাব হয়। ও আমায় একটা বার্তা দিয়ে গেছে। প্রিস্টের বা হাতের মধ্যমায় পরা আংটিটাই ওকে আবার বাঁচিয়ে তুলেছে। ওটাই ওকে এতটা ক্ষমতাবান করেছে। ওর আংটি পরা মধ্যমাটা যদি ভেঙ্গে দিতে পারি তবেই আমার প্রাণ বাচবে। মেয়েগুলির আত্মাও মুক্তি পাবে।
ওর হাতের আঙুল গুলি আমার চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারছিনা কোনটা সেই কাঙ্খিত আংটি পরা মধ্যমা। তবে হাতড়ে অনুমান করার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আমার আঙুলের ডগায় সেই আংটির স্পর্ষ পেলাম। শয়তানটা নীচে শুয়ে থেকে, দু হাতের আটটি আঙুল দিয়ে আমার ঘাড় চেপে ধরেছে। আর বুড়ো আঙুল দুটো দিয়ে সরাসরি শ্বাসনালীর উপর চাপ দিচ্ছে। আমার শ্বাস প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। ফুসফুসটা বাতাসের অভাবে যেকোন সময় ফেটে পড়বে। অক্সিজেনের অভাবে সারা শরীরে খিচুনি শুরু হয়েছে। হাত পা গুলি তিরতির করে কাঁপছে। এই সঙীন অবস্থায়, ঘাড়ে বসে যাওয়া ঐ আঙুলটাকে আমি কিছুতেই মুচড়ে ভাঙতে পারবো না।
মনেমনে বলতে চাইলাম দুঃখিত মার্টিনী, তোমার বার্তাটা আমি কাজে লাগাতে পারলাম না, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু গলা দিয়ে শুধুই গড়গড় শব্দ বেরুলো।
(চলবে)

ডাকিণী (২২তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কফিনটা খুলে একদম বিশ্বাস করতে পারছিলামনা। মধ্যযুগে কবর দেয়া কারো লাশ এতটা জীবন্ত হতে পারে। মনে হচ্ছে যেন সদ্যমৃত বা ঘুমিয়ে থাকা একটা জান্ত দেহ! মুখের অবয়ব, মুখভঙ্গি, উন্নত নাসিকা, খাড়া খাড়া কান! তবে কি আমি ভুল কবর খুঁড়েছি? কিন্তু তা হতে যাবে কেন? কফিনটা তো একটা মধ্যযুগীয় লোহার কফিন। এখনকার কফিনগুলি সাধারণত উন্নত প্লাস্টিক বা কাঠ দ্বারা তৈরি। তার উপর তালাটা আমি নিজের হাতেই খুলেছি। কেউ যে আমার আগে লাশ বদলে দেবে তার সম্ভাবনাও নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো লাশটার হাতে এখনো সেই আংটিটা চকচক করছে! কিন্তু লাশটা একদমই অক্ষত। আমি স্তম্ভিত হয়ে ভাবছিলাম এই লাশটা কি ভাম্পায়ারের মতোই রাতে জেগে উঠে জ্যান্ত মানুষের রক্ত খায়? সেজন্যেই হয়তো এখনো পচন ধরেনি। ওটা কি এখন ক্ষুধার্ত! এবার কি আমাকে খেতে আসবে?
আরে ধ্যাত। আমি এখানে লাশ নিয়ে গবেষণা করতে আসি নি। হয়তো প্রিস্ট এতো বড় শয়তান হয়ে গিয়েছিলো যে শবখোর পোকাদেরও ওকে খেতে অরুচি ধরে গেছে। সে যাই হোক। এখানে ওকে নিয়ে আমার কোন কাজ নেই। শুধু ওর আংটিটা আমার প্রয়োজন। আংটিটা ওর হাত থেকে ভালয় ভালয় খুলে নিতে পারলেই, ওটা নিয়ে দে চম্পট। কিন্তু ও যদি বাধা দেয়? হাতুড়িটা তো আছেই। মেরে ঘিলু বের করে দেবো। এক হাতে হাতুড়িটা বাগিয়ে ধরে অন্য হাতটা ওর আংটি পরা হাতে রাখলাম। ঠান্ডা আঠালো একটা অনুভুতি হলো। লাশ ঠান্ডা হতেই পারে কিন্তু আঠালো হবে কেনো? হাত তুলে একটু পিছিয়ে গেলাম। অনুভব করলাম হাতে একটা চটচটে আঠালো পদার্থ লেগে আছে! ঘেন্নায় আমার গা রি রি করে উঠলো। সম্ভবত ওর পঁচা গলা চামড়া আঠালো হয়ে আমার হাতে উঠে এসেছে। একটু ইতস্তত করে হাতটা নাকের কাছে নিলাম। আমি মধ্যযুগীয় একটা মৃতদেহের পঁচা দেহজ তরলের একটা উৎকট দুর্গন্ধ আশা করেছিলাম। কিন্তু এর বদলে পাইন গাছের আঠার মতো গন্ধ পেলাম। আশ্চর্য! ব্যাপারটা নিশ্চিত হতে পেন্সিল টর্চটা জ্বালিয়ে আমার হাতটা পরিক্ষা করলাম। আরে! এটাতো পাইন গাছের আঠা ই। আমি আলোটা লাশের মুখে ফেলে ভাল করে ঝুকে দেখলাম। এবার আমার কাছে প্রিস্টের জ্যান্ত লাশের রহস্য উন্মোচিত হলো।
প্রাচীন মিশরীয় ফারাও রা নিজেদের দেহকে সংরক্ষিত করে রাখতো মমি হিসেবে। ওদের বিশ্বাস ছিলো মৃত্যুর পর ওদের আত্মা সে দেহে আবার ফেরত আসবে। এই শয়তানটাও সে বিশ্বাস ধারণ করে নিজের দেহকে সংরক্ষণ করিয়েছিলো। কিন্তু মিসরের মতো ততকালীন ইউরোপে মোমি করার জন্যে যথেষ্ট মোম ছিলো না। সম্ভবত সেজন্যেই ওর দেহটাকে পাইনের আঠা দ্বারা মমি করা হয়েছিলো। মমি করা দেহে যেকোন সময় আত্মা ফেরত আসতে পারে। প্রিস্ট যেকোন সময় কবরের মধ্যেই জেগে উঠে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারে, এমন বিশ্বাস থেকেই ওর দেহটাকে লোহার কফিনে পুরে তালা দিয়ে আটকে দেয়া হয়। প্রিস্টের অনুসারীরা হয়তো ভাবতেই পারেনি সহস্রাব্দ পরে একটা মেয়ে এসে সেই তালা ভাঙবে। নইলে হয়তো আরো শক্ত কিছু দিয়ে কফিনটা বন্ধ করতো। সেসব বোকা লোকগুলির কথা ভেবে বেশ হাসি পেলো।
বেশ তো। এবার ওর আংটিটা বের করে নেয়া যাক। কাঁপাকাঁপা হাতে ওর বা হাতের মধ্যমায় পরানো আংটিটা ধরে টান দিলাম। উহঃ। খুলছে না। সম্ভবত পাইনের আঠায় ভালভাবেই আটকে গেছে। অপর হাত থেকে হাতুড়িটা ফেলে এবার দুহাত দিয়েই আংটিটা খুলার চেষ্টা করলাম। এখনো খুলছে নাহ! এক হাত দিয়ে প্রিস্টের কব্জি চেপে ধরে অন্য হাতে আংটিটা ধরে সর্বশক্তিতে টানছি। আংটিটা নিয়ে বেশী ব্যাস্ত থাকায় কখন যে প্রিস্টের মাথাটা ঘুরে আমার দিকে স্থির হয়েছে আমি তা খেয়ালই করিনি।
হঠাৎ ওর আংটা পরা হাত আমার ডান হাতটা সজোরে চেপে ধরলো। হায় খোদা। আমার হৃদপিণ্ডটা এবার থেমে যাওয়ার উপক্রম। মাথাটা ভনভন করে ঘুরতে শুরু করেছে। এ কি হচ্ছে আমার সাথে! আমি আবার কোন স্বপ্ন দেখছি নাতো। আমি বা হাত দিয়ে হাতড়ে হাতুড়িটার খোজ করতে লাগলাম। কিন্তু আমি তো ইতিমধ্যেই ওটাকে ফেলে দিয়েছি। এখন তো ওটাকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হল ওটা আমার বা হাতের নাগালের বাহিরে!
প্রিস্টের লাশটা আমার ডান হাতটা শক্ত করে চেপে আছে। আমাকে ওর দিকে টেনেও নিচ্ছে না আবার ছেড়েও দিচ্ছে না। আমি যতই ছাড়ানোর চেষ্টা করছি ও ততই শক্ত করে আকড়ে আছে। তখনই হঠাৎ মনে পড়লো গতরাতে বেসমেন্টে দেখা স্বপ্নের কথা। সেখানে কিলবিল করতে থাকা শুঁয়োপোকাটার মাধ্যমে আলেস আমায় বুঝাতে চাইছিলো প্রিস্টের দেহটা এখনো জীবন্ত। আর আমি কি না সেটাকে স্রেফ ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ভেবে ভুল করেছি। স্বপ্নে আমি যখনই শুঁয়োপোকাটার কবরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম তখনই হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। যদিও তখনো ভোর হতে ঘন্টা খানেক বাকী ছিলো। বাকিটা রাত আমি আর কোন স্বপ্নই দেখিনি। এটা একটা সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিলো। আলেস বলতে চাইছিলো যে, আর যা ই কর না কেন, কখনই প্রিস্টের কবরে নেমো না। আমি সেই সতর্কবার্তাটাও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছি। এমন কিছু হতে পারে তা আমার কল্পনায় ও আসে নি।
আমি যখন আমার অমার্জনীয় ভুল গুলির জন্যে অনুতাপ করছিলাম ঠিক তখনই শয়তানটা আমার হাত ধরে হেচকা টান দিলো। আমি তাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে, কফিনের মধ্যে, ওর লাশের উপরই উপুর হয়ে পড়লাম। এবার ওর মুখটা আমি খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ওখানে একটা আকর্ণ বিস্তৃত, বিকৃত হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। পিলে চমকে উঠলাম। ভয়ে আমার গলাটা শুকিয়ে কাঠ। সর্বউচ্চ চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে কোন চিৎকার বের করতে পারলাম না। প্রিস্টের আংটি পরা হাতটা এবার আমার হাতকে ছেড়ে দিয়ে আমার কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো। আর অপর হাত দিয়ে কফিনের উপরের ডালাটা বন্ধ করে দিলো। ঠিক তখনই আমি গলা ফাঁটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। কিন্তু ততক্ষণে এ চিৎকারটা নিষ্ফল হয়ে গেছে। ডালা বন্ধ কফিনের ভেতর থেকে আমার চিৎকার কখনই বাহিরের গার্ডদের কানে পৌছবে না।
হায় খোদা! এটা কি হলো! উদোম গায়ে আমি আটকা পড়েছি এক অর্ধমৃত মধ্যযুগীয় রেপিস্টের কফিনে। মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে। এখন ও যদি আমায় মেরে ফেলে তবে আমার আত্মাটা কি বাকিটা সময় প্রিস্টের যৌনদাসী হয়েই থাকবে? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই কফিনের ভেতর চারপাশ থেকে অসংখ্য নারীকণ্ঠের আর্তনাদ, বিলাপ, আর ক্রন্দন ধ্বনি ভেসে আসতে লাগলো। উহঃ। কি অসহ্য। কান ফেটে যাবে মনে হচ্ছে।
(চলবে)

ডাকিণী (২১তম পর্ব)

0

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
বিনা চিৎকারে গার্ডকে লুটিয়ে পড়তে দেখে নিজের আত্মবিশ্বাসটা এভারেস্ট ছাড়িয়ে গেলো। হাহ। একেই বলে মিসেস থর ওরফে সাঞ্জে। গার্ডটা পড়ে যেতেই ওর শক্তিশালী টর্চটাও নিভে গেল। ভালই হল।এখন অন্ধকারকেই আমার বেশী সাচ্ছন্দদায়ক মনে হচ্ছে। কিন্তু ও নড়ছে না কেনো? মরে টরে গেল না কি? উবু হয়ে বসে ওর মাথায় আমার পেন্সিল টর্চের আলো ফেললাম। নাহ। তেমন কিছুই তো হয়নি। এমনকি রক্তও বেরুয় নি। শুধু মাথার পেছনে একটা পেয়ারা গজিয়েছে। তবে আশা করছি খুব শীঘ্রই ওটা ছোটখাটো একটা ফুটবল আকৃতি ধারণ করবে। ও অজ্ঞান থাকতে থাকতেই এবার ওকে বেধে ফেলা যাক। ওর শার্টটা খুলে তার হাতা দিয়ে ওর পা দুটো শক্ত করে বাধলাম। ভেবেছিলাম ওর শার্ট দিয়ে পা বাঁধবো আর নীচের গেঞ্জি দিয়ে হাত। কিন্তু কি আশ্চর্য! লোকটা শার্টের নীচে গেঞ্জি পরেনি! এমন অগোছালো কেবল পুরুষ মানুষই হতে পারে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি ডিউটিতে বেরুনোর সময় ব্রা ছাড়া বেরিয়েছে এমন কোন নারী এই পৃথিবীতে নেই। তবে গেঞ্জি ছাড়াই বেরিয়েছে এমন হাজারো পুরুষ আছে। এই মাত্র আমি এমন একজনের সম্মুখীন হয়েছি। কি স্টুপিড স্বভাব এদের!
অবশেষে বাধ্য হয়েই আমার শার্ট দিয়েই ওর হাত বাধলাম। জেগে উঠে যেন চেঁচামেচি করতে না পারে সেজন্যে আমার পেন্টিটা খুলে ওর মুখে ভরে দিলাম। ও এখনো অজ্ঞানই আছে। এবার ওকে জাগানো যাক। আমি নিশ্চিত হতে চাই ও সত্যি সত্যিই অনড় অক্ষম হয়ে বাধনে ঠিক মতোই আটকা পড়েছে। ও যদি কোনক্রমে ভোরের আগে ছাড়া পায় তবে আমার শশুরবাড়ি যাত্রাটা কারো নাক কেটেই আটকানো যাবে না। হঠাৎ আমার নজর ওর জ্বলন্ত সিগারেটের উপর আটকে গেলো। এতো বৃষ্টির মাঝেও এখনো জ্বলছে। একজন ধোমপায়ীর জ্ঞান ফিরাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেটের চেয়ে কার্যকর কিছু এখনো আবিষ্কার হয় নি। সিগারেটটা কুড়িয়ে নিয়ে ওর নাকের ডগায় ঠেসে ধরলাম। নাকে ছ্যাকা খেতেই ও ধড়মড়িয়ে নড়ে উঠলো। আমার দিকে চোখ পড়তেই ও গো গো করতে শুরু করলো। কাঁদা মাখা আমাকে দেখে ও সম্ভবত শেওড়া গাছের পেত্নী ভেবেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে ওর গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম। ঘটনার আকর্ষিকতায় ও একদম হতভম্ব হয়ে গেছে। এবার আমি স্পষ্ট পোলিশ ভাষায় ওর কানে ফিসফিসিয়ে বললাম, “এই থাপ্পড়টা হল কর্তব্যে ফাঁকি দিয়ে সিগারেট টানার জন্যে।” ও বুঝলো আমি ভুতপ্রেত কিছুই না। ওরই মতো মানুষ। এটা বুঝা মাত্র ও নিজেকে ছাড়ানোয় মন দিলো। দেহটাকে সংকোচিত করে একটা বান মাছের মতোই ঘুরাতে শুরু করলো। আমি হাতুড়িটা হাতের কাছেই রাখলাম। যদি ও ছুটিয়ে ফেলতে পারে তবে আবার এক ঘা বসিয়ে দেব। তবে এবার হাতুড়িকে মুড়ানোর জন্যে আমার শার্টটা থাকছে না। সেটা ইতিমধ্যেই ওর হাতে বাধন হিসেবে শোভা পাচ্ছে। এবার যদি মারি তো একদম আসল হাতুড়ির ঘা টাই পড়বে। এতে ওর অক্কা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। কিন্তু ওর কপালের জোর অনেক বেশী। এতো টানা হেচড়ার পরেও ও বাধন খুলতে পারলো না। এক সময় ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়লো। যাক। অনেক হয়েছে। এবার কাজে ফিরতে হবে। ঘড়িতে প্রায় আড়াইটা বেজে গেছে। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই সূর্যদয় হবে। এই এক ঘন্টার মধ্যেই আমাকে সেই প্রিস্টের দফারফা করে দিতে হবে। গার্ডের নিতম্বে কষে দুটো লাথি বসিয়ে আবার ফিরে গেলাম প্রিস্টের কবরে। এবার আর কোদালের হাতলে ব্রা টা জড়িয়ে নিতে ভুললাম না। এমনিতেই গার্ডকে পিটিয়ে আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে তার উপর হাতের ব্যাথাটাও কমে এসেছে। তাই কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে গেলো। পনেরো মিনিটের মধ্যেই কবর খুড়ে প্রিস্টের কফিনটা বের করে ফেললাম। কিন্তু এ কি! কফিনটার এ কি অবস্থা! এটা কোন সাধারণ কাঠের কফিন নয়। আগা গোড়া লোহায় তৈরি। আর সবচে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটা হল কফিনের ডালাটায় একটা বিশাল তালা ঝুলছে! ব্যাপারটা অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে কেন এতো আয়োজন। লোহার কফিনে তালা লাগিয়ে কোন লাশকে কখনোই দাফন করা হয় না। এ পদ্ধতিটা কেবল জীবন্ত দাফনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। তবে কি এই শয়তানটাকে জীবন্তই পুঁতে দেয়া হয়েছিলো? সত্যিই যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে বড্ড অন্যায় করা হয়েছে। এই শয়তানটাকে কমপক্ষে তিনদিন তিনরাত গণধোলাই দিয়ে, পরদিন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে তারপরেই কফিনে ঢুকানো উচিৎ ছিলো। কিন্তু এ তালার চাবি কোথায় পাবো? হঠাৎ মনে পড়লো সাইডব্যাগে একটা হেক্সো ব্লেড থাকতে আমি চাবি খুজতে যাবো কেন? ব্লেডটা দিয়ে তালা কেটে ফেললেই তো হয়। অতপর ব্যাগ থেকে ব্লেডটা নিয়ে এসে তালায় ঘসতে শুরু করলাম। তীক্ষ্ণ একটা কীচ কীচ শব্দ গোরস্থানের নিরবতা ভঙ্গ করলো। একটা সময় ঘট করে তালাটা খুলে পড়লো। একরাশ ভয় এসে আমায় গ্রাস করে নিলো। কফিনের ভেতর জীবন্ত কবর দেয়া শয়তানটা কি এখনো বেঁচে আছে? যদি থাকে তো আমায় দেখে কি হবে ওর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। প্রচন্ড ইচ্ছা করছে এসব ফেলে ছুটে পালিয়ে যাই। কফিনটা না খুললেই কি নয়? কফিনটা খুললে যদি ওটা মুক্ত হয়ে যায় তখন কি হবে? কিন্তু আমি এর শেষ না দেখে ছাড়ছি না। আজ এর একটা বিহিত করেই ছাড়বো।
বৃষ্টিটা হঠাৎ করেই এখন থেমে গেছে। চারিদিকে সুনসান নিরবতা। প্রকৃতিও যেন এক অজানা অঘটন ঘটার প্রতিক্ষায়। আমার কাঁপাকাঁপা হাত দুটো কফিনের ডালাটায় রাখলাম। তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে হঠাৎ ডালাটা হেচকা টানে খুলে ফেললাম।
হায় খোদা, আমি এ কি দেখছি!!! এটা কিভাবে সম্ভব!!! এই লাশটা তো দেখছি একদমই জ্যান্ত ,,
(চলবে)