ঘড়া পর্ব ৫-মারিয়েন ফয়সাল।

0

ফৌজির অন্য মহিলার রূপের প্রশংসায়, বুকের ভিতর তীক্ষ্ণ একটা অনুভূতি হল, তবে টাকার চিন্তায় অভিমানকে দূরে সরিয়ে রাখলাম।
আলমারি দুই তিন বার ঘাটা ঘাটি করে সর্ব সাকুল্যে মাত্র তিন লক্ষ জোগাড় করতে পেরেছি । নাহ, ফৌজির কাছে চাইতেই হবে মনে হচ্ছে । গোল গোল চোখ গুলোকে বাঘের মত আরও গোল করে তাকিয়ে থাকবে প্রথমে, তারপর দিয়ে দেবে। আমি না হয় আমার বাবার বাড়ি থেকে শাহজাদী বিলকিস বেগমের পেইন্টিংটা এনে ডাইনিংহলে ঝুলিয়ে দেব। ফৌজি আর দোউখানুর চক্ষু তুষ্টিও হবে আর আমার টাকার জোগাড়। সাময়িক ভাবে সমস্যার সমাধান হলেও, একটু ভয় ভয় লাগছে আমার । যদি না দেয়!
ছেলের ঘর থেকে কথা বার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে । দরজাটা খুলে একটু গলা বাড়িয়ে দিলাম। আমারই তো ছেলে! পেতিয়ে বসে দোউখানুর সাথে গল্প করছে ।
-‘Mom,Doukhanu is very smart!’
-‘কেমন স্মার্ট? ‘
-‘আমি ওকে ইন্টার্নেট চালাতে শিখিয়ে ফেলেছি । একটা ফেসবুক এ্যাকাউন্টও খুলে দিয়েছি, ও তোমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে । তারপর আমার এ্যাকাউন্ট থেকে তোমার ফ্রেন্ড লিস্টে গিয়েছে । জেসিনা ফারহান, ফারিয়া শামিমকে খুব পছন্দ হয়েছে, ওনাদের চুল নাকি খুব সুন্দর । আমি অবশ্য ওনাদের ভালো করে দেখিনি । ‘
চোখগুলোর সামনে হাত দু’টো পেতে রেখেছি ।
-‘কেন দেখনি? ‘
-‘মম, তোমার বন্ধু, ওরা আমার ‘মাতৃতুল্য ‘ । ফিক করে হেসে ফেলল ।
নাহ, চোখ গুলোকে আর বোধ হয় ধরে রাখতে পারব না। কোটর ছেড়ে টুপ টুপ করে বেরিয়ে পড়ে যদি মাটিতে পড়ে যায় তাহলেই গেল সব!
এদিকে দোউখানু যেন কিছু বলার জন্য আকু পাকু করছে ।
চোখ দু’টোর জলান্জলি যাতে না হয় , তার জন্য চোখের সামনে হাত দু’টো শক্ত করে পেতে রেখেই দোউখানুকে প্রশ্ন করলাম, ‘ কিছু বলবে দোউখানু? ‘
– ‘ মম আম্মা, আমি জেসিনা ফারহানের বাসায় গিয়ে ওনাকে আড়াল থেকে দেখে এসেছি । আহা! কি তার চুলের রূপ! আড়াল থেকে দেখলাম, উনি ফ্রিজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন ইন্টার্নেটে । তারপর আমি গেলাম ফারিয়া. এস.শামিমের বাসায় । ওনার মনে হয় অনেক জ্বর, চুল গুলো উঁচু করে বাঁধা; জ্বরে উনি রক্ত চক্ষু মা চণ্ডীর রূপ ধরে বসে রয়েছেন । তাও খুব সুন্দর! জ্বর বেশী কিনা জানার জন্য ভুলে ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি মাত্র, অমনি মার মুখী হয়ে এমন কড়া কথা বললেন … আমি দৌঁড়ে পালিয়ে এসেছি! ‘
– ‘ বল,গালি দিয়েছেন।তা কি বললেন?’
-‘না,না , আমি ওসব বলতে পারব না মম ম্যাডাম।
ফারজানা রহমানকে দেখে আসলাম, বড়ই নেক রমনী! কণ্ঠস্বর প্রায় শোনাই যায় না । রেশমী সাবেরের কাছেও গিয়েছিলাম, একটু সময় লেগেছে এই যা । সারা দিন ওনাকে অনেক কাজ করতে হয়! গৃহিনী হিসেবে উনি অতুলনীয়! ভেবেছিলাম একটু সাহায্য করে আসব, কিন্তু আগামিকাল তো আবার বিশ্ব ভ্রমণে বের হব, তাই চলে এলাম! ‘
যাক! তাহলে, এই কয়েকজনকেই রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। নিশ্চিন্ত হলাম।
-‘ব্যাস,এই কয়েক জন তো? নাকি.…’
-‘না মম আম্মু, আবিদ ভাই আরও কয়েকজনকে সাজেস্ট করেছেন, ওনার পছন্দ অনুযায়ী!
‘ -‘মম , তোমার এত ছোট ছোট বন্ধু, চোখ ফেরাতে একটু কষ্ট হয় । তারপরও বেশি তাকাইনি। সবই তোমার শিক্ষার গুণ! ‘
বলা বাহুল্য আমার পুত্র সন্তান আবিদের বয়স খুব বেশি না, মাত্র চব্বিশ।
-‘ হ্যাঁ বাবা, আমার শিক্ষার গুণ, আর তুমি তোমার বাবার জেরক্স, বার্থ সার্টিফিকেট লাগবে না! ‘
আবিদের ঘর থেকে বেরিয়ে, সোজা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছি এখন আমি! আধা ঘন্টা পর বের হব ভাবছি ।

Comment

শেষ রাত- নুরুন নাহার লিলিয়ান।

1

দুই একদিনের ট্যুর। কিছু ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট করতে হবে। নিজের মতো থাকার জন্য সে সব সময় গেস্ট হাউজ অথবা ভাল কোন হোটেল। বিচিত্র রকমের মানুষ। আত্মিয় স্বজন কিংবা বন্ধুদের বাসা। কোথাও রাত্রি যাপন তার পছন্দ নয়।নিজের বাসা তো ভাড়া দেওয়া। বছরের বেশীর ভাগ সময় তাকে এদেশ ওদেশ ঘুরতে হয় গবেষনার প্রয়োজনে।

দিঠি তার বর নাগিবের অদ্ভুত সব একরোখা আচরনে ক্লান্ত হয়ে উঠে। বন্ধু আত্মিয় সবার কাছে তার এই অদ্ভুত আচরনের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। এবার ও বরের সাথে ঝগড়া করতে করতে চিটাগাং থেকে ঢাকা এলো।
বরাবরের মতো ঢাকা বিসিএসআইআর গবেষনাগারের গেস্ট হাউজ। এই গেস্ট হাউজের কেয়ার টেকারের নাম নবাব। এই ছেলেটির আপ্যায়নে নবাবি সটাইল আছে। একবার কোন খাবার যদি বলা হয় ভাল লেগেছে সে সেটারই বারবার আয়োজন করবে। যখন দিঠি প্রথম বার এই গেস্ট হাউজে এলো তখন পাশের রুমে থাকা সাদা চুল ওয়ালী অবসর প্রাপ্ত মহিলা বিজ্ঞানীর সাথে ভাব হল।

ঠিক এবারও সে মহিলা এসেছে গাজী পুর থেকে। দিঠি মনে মনে ভাবলো সে থাকাতে গল্প করা যাবে। তিন তলা গেস্ট হাউজের ডান দিকে খুব সুন্দর কৃষ্ণচূড়া গাছের সাথে অদ্ভুত একটা সুপারি গাছ। এই জায়গাটায় বসলে মনটা বাতাসে হাল্কা হয়ে যায়। জীবন থেকে জীবনের হারিয়ে যাওয়া অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। লং জার্নির ক্লান্তিতে আর তার সাথে এ রাতে কথা হলো না। তারাতারি ঘুমিয়ে পড়াতে শেষ রাতে ফজরের আযানে ঘুম ভেঙে গেল।

দিঠির কিছু ভাল লাগছিল না। দরজা খুলে বারান্দায় গেল। সেই সুপারি গাছের সামনে চেয়ার নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে সাদা চুলের বৃদ্ধা। দিঠি ঘুম চোখে এগিয়ে যাওয়াতে সে মনে হলো রেগে দাড়িয়ে গেল। তার শরীর থর থর করে কাপছে। ডেঙ্গু জ্বরের কারনে যেমন চোখ হয় রক্তিম।

ঠিক তেমন নয় বরাবর দাড়ানো অবস্থায় দেখলো ঘন রক্ত দু চোখ দিয়ে গড়িয়ে নামছে। দিঠির হাত পা অবশ হয়ে গেল। কি করবে বুঝতে পারলো না। শেষ রাতের গল্প টা ভিষন ভয়ংকর হয়ে উঠলো। সে কঠিন কণ্ঠে বলল, “আপনি ভিতরে যান।”
দিঠি হাপাতে হাপাতে রুমে ফিরে এলো। দেখলো বরের পিঠ জুরে শুধু আচরের লাল দাগ। দিঠি ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করাতে ঘুমের মধ্যেই বর বলল,ঘুমের মধ্যে হয়তো আমি নিজের পিঠ নিজেই আচরেছি। কাল নখ কাটতে হবে। দিঠির ভিতর থেকে ভয় যেন নামছে না। ফজরের নামাজ পড়ে আয়তুল কুরসী পড়ে নিজেকে এবং ঘুমন্ত নাগিব কে ফু দিল। সকালে নবাবকে সে মহিলার কথা জিজ্ঞেস করাতে জানালো সে গাজীপুর চলে গেছে।
দিঠির আর জিজ্ঞেস করা হলো না শেষ রাতের গল্প করতে সেই এসেছিল নাকি।

দিঠি জানে সায়েন্টিস্ট বরের কাছে আধি ভৌতিক যন্ত্রনার গল্প শেষ রাতের গল্পের মতোই। ভোরের আলোর সাথে সব ফুরিয়ে যায়।
তখন থেকেই দিঠির গায়ে প্রচণ্ড জর। চোখের সামনে থেকে সাদার চুলের বৃদ্ধার রক্তিম চোখ দুটো স্থির হয়ে রইলো। ট্রেন চলছে চিটাগাংয়ের পথে। দিঠি টের পেল এসি থাকার পরও জামার ভিতর দিয়ে ঘাম টপ টপ করে পড়ছে।

নিশিডাক – রুমানা আখতার

0

রুমী !
কেযেন ফিসফিস করে ডাকলো কানের কাছে মুখ এনে ।কি গভীর প্রেমের ডাক !! আলতো করে ঘাড়ে একটা চুমু এঁকে দিল । চমকে ঘুম ভাঙ্গলো রুমীর । শোয়ার আগে ঘরের সব বাতি বন্ধ করেই শুয়েছিল । তখন ঘর ছিল অন্ধকার । কিন্তু এখন ঘরটা যেন ভেসে যাচ্ছে আলোর বন্যায় !! মস্ত এক চাঁদ রুপালী আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে মিটিমিটি হাসছে যেন ওর দিকেই চেয়ে ।অভিভূত রুমী জানালার দিকে এগিয়ে গেল ধীরে ধীরে ।

কিন্তু ডাকটা !! কে ডাকলো ওকে অমন করে ? ঘাড়ের পাশে আঁকা আদরের স্পর্শটা যেন এখনো অনুভব করা যাচ্ছে ।

রুমী । ওই আবার !! চমকে এদিক ওদিক তাকালো ।নাহ্ কেউ তো নেই ঘরে !! জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালো নিচের দিকে ।ওই তো , ওখানে কাকে দেখা যায় ? হঠাৎ ঘুরে চাইলো ।ওর চোখে চোখ পড়তেই মুচকি একটু হাসলো ।হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো ।

ঘোর ঘোর , কি এক আশ্চর্য ঘোরে পেয়েছে রুমিকে !! পরনে যে শুধু পাতলা রাতের পোষাক সেই হুঁশও নেই ওর । দরজাটা খুলে বের হয়ে এল ।ওইতো সে, ডাকছে ওকে !! পিছু পিছু হেঁটে যাচ্ছে রুমী , কোথায় সে জানে না । জানতে চায়ও না ।শুধু যেতে হবে এটুকুই জানে ।

হাঁটছে তো হাঁটছেই । জলা জঙ্গল পাথর কিছুই মানছে না ।কাঁটা গাছে লেগে ছিড়ে যাচ্ছে পরনের পোষাক । পাথরে চোট খেয়ে রক্ত ঝরছে পা থেকে ।তবু হুঁশ নেই ।যেতেই হবে ওকে ।

ওই তো আবার ঘুরে তাকালো ওর দিকে , হাসলো মায়াভরা হাসি !! শুধু ওই হাসি আর মাত্র একবার দেখার জন্য বুঝিবা অনন্তকাল হাঁটা যায় !!

হঠাৎই থামলো , হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো। সেই ডাকে সাড়া দেবে না সাধ্য কি রুমির !!পাশে যেয়ে দাঁড়াতেই হাত ইশারায় দেখাল -” দেখো কি সুন্দর ” ।রুমী দেখলোএক অতলান্ত খাদের কিনারায় দাড়িয়ে ওরা । মাথার ওপর চাঁদের আলোর বন্যা কিন্তু তার স্পর্শ পায়নি খাদের বেশিরভাগ অংশ । তলায় শুধু নিরেট আঁধার !!

দুহাতে জড়িয়ে ধরলো সে ।কানের কাছে মুখ রেখে বল্ল -“ওখানে , ওই অন্ধকারে লুকিয়ে আছে সুখ । যেতে চাও ওখানে ? আমার সাথে ? “বিবশ রুমী শুধু মাথাই নাড়তে পারলো – চায় ।নিজের দিকে ঘুড়ালো রুমীকে । ঠোঁটে চুমু খেল গভীরভাবে ।”চলো ” বলে ওর হাত ধরে টান দিলো।

তারপর কি সুন্দর পাখির মত ভেসে ভেসে নেমে চল্ল ওরা দুজনে !! কোথায় কতদুরে জানা নেই ।কি সুখ !! কি সুখ !!

পরেরদিন অনেক খোঁজাখুঁজির পর রুমীর মরদেহ পাওয়া গেল খাদের তলায় । অত উপর থেকে পরে মাথার পেছনটা থেঁতলে গেছে একেবারে ।শরীরের হাড়গোড়ও সব ভাঙ্গা । কিন্তু কি আশ্চর্য , ওর মুখে গভীর তৃপ্তির হাসি !!