সাদা নীলের ভালোবাসা-নুরুন নাহার লিলিয়ান

0

সময়টা তখন মার্চের শেষ সপ্তাহ। জাপান সাগর তার উচ্ছল তরঙ্গ ধীরে ধীরে ভাঁজ করে নিচেছ আকাশ থেকে নেমে আসা সাদা বরফ কন্যার জন্যে। তুলোর মতো নরম তুষাড়ে ছেয়ে গেছে হোক্কাইডো দ্বীপ। সারাক্ষন তুষারশুভ্রতায় সিক্ত হয়ে থাকে মানুষের মন। সকাল থেকে রাত সিটি সাপ্পোরো থেকে চলে শহর পরিষ্কারের কাজ। প্রায় দুই সপ্তাহ হলো লিরিক সাপ্পেরো শহরে এসেছে। প্রথম কয়েকটা দিন জীবন যুদ্ধের জটিলতা আর মনের গভীরের একাকিত্ত টা ভীষন ভাবে ঝেঁকে বসেছিল। কিন্তু হোক্কাইডো দ্বীপের সৌন্দর্যময় প্রকৃতির বিশালতা লিরিকের চোখকে প্রসারিত করে। এই নিরাপদ শহরে লিরিক যেন স্বর্গ খুজেঁ পেল। বরফ ঢাকা পথে হাঁটে আর ভাবে যদি যদি এই পথে কেউ হঠাৎ এসে হাতটা ধরে। কি করবে তখন। আবার মনে মনে লজ্জায় লাল হয়ে উঠে।

এমন করে কখনও বাস সেটশন কখনও পার্কে বসে জীবনের সৌন্দর্য খুজেঁ। এমন কোন এক তুষাড়পাতের সময় বাস সেটশন একাকি নিভৃতে বসে মানুষ দেখছিল। খুব অদ্ভুতভাবে সাদা তুষাড়ের ছোয়াঁ যেন লিরিক কে অন্যরকম করে দেয়। মেইন রোডে দুই একটা গাড়ি ছাড়া সারা শহরে মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম। কিছুটা সময় খুব থমথমে কাটে। মনে হল পেছনে কোন সাইকেলে করে কেউ এলো। লিরিক ঘাড় ঘুরালো না। বেশ কিছু সময় যাওয়ার পর মনে হল কোন গানের সুর পেছন থেকে ভেসে আসছে। এবার সে ঘাড় ঘুরালো আচমকা বুকের ভিতরটা কেপে উঠলো। দুজন জাপানি টিনেজার ছেলে মেয়ে খুব কাছাকাছি বসে আছে। আবার কিছুক্ষণ পর দেখে মেয়েটি জাপানি গান গাইছে। আর ছেলেটি বরফ দিয়ে স্নো ম্যান বানাচ্ছে।

তাদের পরস্পরের সম্বোধন থেকে বুঝা গেল ছেলেটির নাম আওই মানে নীল রং আর মেয়েটির নাম শিরোই মানে সাদা রং। তাদের দুজনের রংয়ের নামে নাম। তাদের খেলা দেখে লিরিকের ভীষন ভাল লাগলো। ছেলেটির তৈরী করা স্নো ম্যানের সামনে মেয়েটি ছবি তুলতে চাইলো। কিন্তু স্নো ম্যানের সামনে দুজন ছবি তুলবে। তাই লিরিক কে বাংলায় অনুরোধ করলো। সে হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর শিরোই নামের মেয়েটি বলল,”তুষাড়পাতের এই সময়টায় আকাশের নীল আর সাদা তুষাড়ের ভাব বিনিময় হয়।

পৃথিবীর সকল প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য শুভক্ষন। আমরা সারাদিন তুষাড়পাতের সাথে খেলবো। বিকাল তিনটায় তুষাড়পাত কমে যাবে। তখন আমরা আত্মহত্যা করবো। ”
লিরিক ভয়ে পেয়ে গেল। আচমকা ভৌতিক আতংকে গায়ের রক্ত হীম হয়ে এলো। বাইরের পুরো চেনা শহর যেন অচেনা অন্ধকারে ঢাকা। তবুও আতংকিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “তোমরা আত্মহত্যা করবে কেন? ”
আওই নামের ছেলেটি বলল,” আমরা দুজন দেরশ বছর আগে এইখানে আত্মহত্যা করেছিলাম।বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবীতে আসি। আবার আত্মহনন করে ফিরে যাই। ”
লিরিক বলল, এমনি ফিরে যাও আত্মহত্যা করতে হবে কেন?
শিরোই বলল,আমরা যে ভাবে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে ছিলাম ঠিক সেভাবেই ফিরতে হবে স্বর্গে। ”
লিরিকের হাত পা কাপছিল।ধর ধর ভঙ্গিতেই জানতে চাইলো, “আত্মহত্যা কেন করেছিল”
শিরোই বলল, ” আমাদের পরিবার দুই জায়গায় বসতি গড়তে যাচিছল। আমরা আমাদের মধ্যের দূরত্ব মেনে নিতে পারছিলাম না। আমাদের ভালবাসাটা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে টিকে থাকুক।কোন বাস্তবতায় যেন না হারায়।”
এরপর কথা বলতে বলতে দুজন দুজনের পেটে ছুড়ি ঢুকিয়ে দিল। মানব দেহের রক্তক্ষরনে সাদা বরফে ঢাকা রাস্তা ভেসে রক্তাক্ত হয়ে উঠলো। তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। লিরিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। তাদের জীবন আছে কিনা বুঝতে যেতেই তারা একসাথে রক্তাক্ত শরীরে দাড়িয়ে গেল। কেমন অদ্ভুতভাবে দুজনে হাত ধরে গান গাইতে গাইতে আর সাইকেল চালাতে চালাতে সামনের ঘন তুষাড়পাতের হাওয়ায় হারিয়ে গেল।

কয়েক মুহুর্তে যেন কতো কিছুই ঘটে গেল। লিরিক দেখলো তার মোবাইলে যে ছবি তুলেছিল তা নেই। সে বুঝতে পারলো তার শরীর অবশ হতে শুরু করেছে। সে মূর্ছা গেল।

“নাগেশ্বরী “-নুরুন নাহার লিলিয়ান

0

নাগেশ্বরী গাছটায় হঠাৎ করেই ফুল নেই। গবেষনাগারের সবাই খুব অবাক। মালী মতিন প্রায় প্রতিদিন গাছটার যত্ন নেয়। দুই মাস হলো চিটাগাং ক্যামিক্যাল গবেষনাগারের নতুন ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিয়েছেন ড.নির্মল কুমার সেন। তার পরিবার ছেলে মেয়ে আর বউ কেউ সাথে নেই। তারা সবাই ঢাকা থাকে। ডিরেক্টরের বিশেষ বাংলোতে তিনি থাকেন।বিশাল চিটাগাং গবেষনাগারে অনেক অনিয়ম। সরকারের এতো সময় কোথায় ঢাকার বাইরে কি হয় না হয় জেনে।

খুব নিরব আর রহস্যময়।প্রথম রাতেই ড.নির্মল বাংলোতে ঘুমাতে পারলেন না। কেমন অস্থিরতা কাজ করছিল। বাংলোর পিছনেই বার্বুচি মানিকের বাসা।প্রতিদিন মালী মতিন নাগলিজ্ঞম, জবা,আর গোলাপ দিয়ে তোরা বানিয়ে বাংলোতে রেখে আসে। এখানে আসার পর ড. নির্মল ক্ষমতা আর লোভের মোহে পড়ে গেল। বিশাল বিরানভূমিতে লোকজন নেই বললেই চলে।এটাতে একটা সুবিধা হলো বেশী আয় রোজগারের অনেক ধরনের পথ আছে। চিটাগাং অসৎ ব্যবসায়ীদের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরী হল। সরকারি অনেক মূল্যবান ক্যামিক্যাল তিনি ব্যবসায়ীদের কাছে পাচার করে দেয়। এই কাজে ব্যবহার করে মালী মতিনকে।

এভাবে আরো কয়েক মাস গেল। দুই তিন দিন হয় রাতে কেমন ভয় ভয় লাগে। কারনটা হয়তো অন্য কিছু হতে পারে। বিশ্বস্ত মালী মতিন কি বিশ্বাস ঘাতকতা করবে নাকি তাকে আরো সাবধান হতে হবে। এই দিকে মালী মতিনের বউ অন্তঃসত্তা। মতিনের ছুটি দরকার। কিন্তু এই সময়টায় ড.নির্মল তাকে ছুটি দিলে গোপন ব্যবসার ক্ষতি হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে মালীকে ছুটি দিল না। অনেক অনুনয় বিনয় অনুরোধ করার পর ও ছুটি পেল না মতিন। ওদিকে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে বউটা মরে গেল।

মালী মতিন বউটাকে খুব ভালবাসতো। প্রচনড আঘাতে মতিন প্রতিবাদী হয়ে উঠলো। যার কারনে সন্ত্রাসীদের সহযোগীতায় দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। সবাই জানলো বউয়ের মৃত্যু যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁসি দিয়েছে। ওই যে নাগেশ্বরী গাছটা সেটা কিন্তু সব দেখেছে।ডিরেক্টর তার পরিবারের সবাইকে চিটাগাং নিয়ে এলেন। বেশ সুন্দর জীবন চলছিল।হঠাৎ একদিন খাগড়াছড়ি ঘুরতে গিয়ে ভয়ংকর দূর্ঘটনায় একমাত্র ছেলের চোখ দুটো হারায়, স্ত্রী চিরদিনের জন্য পরপারে চলে যায়,মেয়েটি মাথায় আঘাত পেয়ে বোবা হয়ে যায়।

সেদিন থেকে শুধু ড.নির্মল নাগেশ্বরী গাছটার নিচে মতিন কে দেখতে পায়। আর কেউ দেখতে না পেলেও ড.নির্মল দেখে দাঁ হাতে মতিন কি কঠিন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।

ঘড়া পর্ব ৪-মারিয়েন ফয়সাল।

0

সবাইকে পরিষ্কারের কাজে লাগিয়ে দিয়েছি।অনেকদিন পর এত বড় দু’টা দাওয়াত, চাল থেকে ক্ষুদ বাছার মত করে ঘর পরিষ্কার করতে হবে।
একটু পরেই আমার ছেলের দেখা পেলাম, কিন্তু ওর তো এখন বাসায় থাকার কথা নয়!
-‘তুমি বাসায় কেন?’
-‘আজ আর বের হব না।’
বুঝ্লাম আরও একবার প্রশ্ন উত্তরের মুখোমুখী হতে হবে।
ও শুধু হাতে নাতে প্রমানের অপেক্ষায় রয়ে গিয়েছে, আর ও জানলেই’ বন্দুকধারী’জেনে যাবে । অবশ্য ওদেরকে তো এক সময় না এক সময় জানাতেই হবে!
‘ঝন ঝন’ শব্দে চারিদিক খান খান হয়ে গেল, তার সাথে মতিবিবির খনখনে গলা, ‘গেল গেল, সব খান খান হয়ে গেল!’ লবি থেকে আওয়াজটা এসেছে। সবার আগে ছেলে দৌঁড়ে গিয়েছে আর মতিবিবিও ভাঙ্গা কোমরে দৌঁড়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে। আমি তৃতীয়।দেখলাম দোউখানু একটু হতভম্ব হয়ে একটা কাচের জার হাতে বসে রয়েছে।
‘আসতে না আসতেই সর্বনাশে লেইগে পড়েছো!’
‘কই! কিছু হয়নি তো মতি আম্মা!’
বুড়ো দামড়া, আমি তোর আম্মা হব কেন! ও তুই মিডামোকে ডাক! কিন্তু ভাঙ্গলি কেন!’
-‘কই কিছু ভাঙ্গে নাই তো!’ দোউখানুর নির্লিপ্ত উত্তর । দোউখানুর হাতে আস্ত একটা জার।
মতিবিবি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।
-‘কিন্তু, ওটা তো ভেইঙ্গে টুকরা হয়ে পড়েছিল মাটিতে!’
আমার ছেলে একদম চুপ।
-‘মতিবিবি, তোমার চোখে মনে হয় ছানি পড়েছে, বয়েস তো কম হল না!’
দোউখানুও সায় দিল।
-‘মিডাম যে কি বুইললেন! এত কম বয়সে ছানি পড়ে নাকি!’
-‘দোউখানু তুমি কাজ কর।’
আমার সাথে সাথে আমার ছেলেও আমার ঘরে চলে এসেছে।
-‘আমি যে দেখলাম,ভাঙ্গা জারটা নিমেশে জোড়া লেগে গেল! ‘ ও আমার দিকে খুব সতর্ক ভাবে তাকিয়ে আছে। আমি নিশ্চুপ!
-‘ওই লোকটা কে আম্মু? মানুষ নয় তাই না?’
-‘ হ্যাঁ ‘
বেশ খুশী হয়েছে মনে হল।
-‘বাবা জানেন? আর হুজুর মামার কি করবে? বাবাকে জানানোর সময় আমাকে ডেকো।’
বুঝ্লাম মজা দেখতে চায়’
-‘আচ্ছা’
রাত দশটায় বন্দুকধারীকে সরাসরি জানালাম যে আমি একজন জ্বীন বাবুর্চি নিয়োগ করেছি যে কিনা আমার পূর্ব পুরুষ বিলকিস বেগমের প্রতি আসক্ত ছিল, এবংশাহজাদী বেগমও তার প্রতি আসক্ত হন।
-‘যার ছবি তোমাদের বাড়ির সিড়িঘরে ঝুলানো আছে?’
বন্দুকধারী যেন কল্পনায় বিলকিস বেগমকে দেখতে চেষ্টা করলেন, এবং তন্ময় হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।মনে হল উনি জ্যান্ত বিলকিস বেগমকেই দেখছেন।
-‘কিন্তু ও তো তোমার প্রতিও আসক্ত হতে পারে, অবশ্য বিলকিস বেগমকে দেখার পর তোমার প্রতি আসক্তির কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’
গম্ভীর ভাবে জানালাম যে দোউখানু আমাকে মাতৃতুল্য ভাবে।
উত্তর এলো, ‘আসলে শাহজাদী বিলকিস বেগমকে দেখার পর অন্যদেরকে মাতৃতুল্য ভাবাটাই স্বাভাবিক। আহা! কি রূপ!’
আমি বললাম, ‘রূপের কথা এখন থাক!’

শ্বেত পাথরের বাড়ি -সালেহা বড়লস্কর

1

সাত সকালে টেলিফোনটা বেজে উঠলো ।। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল । টেলিফোন ধরতেই ফরহাদের গলা ভেসে উঠলো ।

কিরে এখনো ঘুমাচ্ছিস ?
তুই আর ঘুমাতে দিলি কই ?
আরে শোন জব্বর খবর আছে । তাইতো এই সাত সকালে টেলিফোন করেছি । তোকে এক জায়গায় নিয়ে যেতে চাই ।
তুই যেখানে খুশি যা আমাকে একটু ঘুমাতে দে ।
ঠিক আছে আরো এক ঘন্টা সময় দিলাম । তারপর এসে আমার সংগে নাস্তা খাবি । তোর প্রিয় নাস্তা পরোটা মাংস থাকবে । তোর সখের রস মালাই ও থাকবে । আসিস কিন্তু ।
আর নাস্তার লোভ দেখাতে হবে না
তাহলে অবশ্যই আসবি সুমন । দেড় ঘন্টার ভিতরে আসবি ।
নাস্তা খাওয়ার পর ফরহাদ বললো চল এবার ।
কোন চুলায় যেতে হবে ?
তুই চোখ বুঁজে হুন্ডায় আমার পেছনে বসবি । তারপর দেখবি কোথায় যাই ।
হুন্ডা এসে থমলো শহর থেকে কিছু দূরে গাছ গাছালিতে পরিপূর্ণ একটা ধপধপে সাদা বাড়ির সামনে । বাড়িটা দেখেই কেন জানি আমার মনে হল বাড়িটা শ্বেত পাথর দিয়ে তৈরী ।সূর্যের অলোয় অপূর্ব রঙের সমাহারে ঝক ঝকে তক তকে বাড়ি । বাড়ির গেটে এক দারোয়ান বসে ঝিমুচ্ছে ।দারোয়ানের চোখগুলো মনে হচ্ছে রক্তের মত লাল । পরনের কাপড় দেখলে মনে হয় যেন শত বর্ষ আগের কেনা । এ সমস্ত দেখে
আমি ফরহাদকে জিজ্ঞেস করলাম ,এখানে কি করতে এসেছিস ?
আরে ঐ বাড়িটা আমি কিনবো । তোকে দেখাতে নিয়ে এলাম ।
তুই কিনবি ? সেলিনাকে বলেছিস ?
এখন ও বলি নাই ।বিয়ের পর তাকে সারপ্রাইজ দেব । বাড়িটা তাকেই দিয়ে দেব ।
চল ভিতরটা দেখে আসি । দারোয়ানকে গেট খুলতে বল ।
দারোয়ান কিছুক্ষণ আমাদের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে গেট খুলে দিল কিন্তু কোন কথা বললো না ।
ভিতরে ঢুকেই প্রথমে চোখে পড়লো গেটের এক পাশে শিউলি ফুলের গাছ । অন্য পাশে বকুল ফুলের গাছ । মাঝখানে ঝক ঝকে পাকা সিমেন্টের রাস্তা তাও ধপ ধপে সাদা । রাস্তা পার হয়েই বিরাট বারান্দা । তারপর বসবার ঘর । সাজানো ঘোচানো । উপরে তিনটি বেডরুম । সবগুলোই সাজানো ঘুচানো । প্রতিটি বেডে ঝক ঝকে সাদা বেড কভার বিছানো । সুন্দর করে সাজানো প্রতিটি বেডরুম । দেখে মুগ্ধ হলাম । দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । আকাশে রূপালি চাঁদের হাসি বিচ্ছুরিত হল । ধপ ধপে সাদা বাড়িটা স্বর্গীয় শোভায় আলোক বিচ্ছুরিত করতে লাগলো । আমরা দেখে মুগ্ধ হলাম ।
বাড়িটা কিনলো ফরহাদ ।আমার সঙ্গে শর্ত হল ফরহাদের বিয়ের আগ পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে এ বাড়িতে থাকবো । কারণ একা সে নিঃসঙ্গ বোধ করবে ।
বাড়িতে পার হওয়ার পর থেকে বাড়ির ভিতরের ফুলে ফুলে সুশোভিত বাগানে হঠাৎ হঠাৎ মেয়েলি কন্ঠে গান ভেসে আসতো । কখনো কখনো এক দীর্ঘ ঘন কালো কেশী সুন্দরি মহিলার দেখা মিলতো আবার মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যেত । তারপর এলো পূর্ণিমার রাত । সারা রাত ধরে মারামারি আর হট্টগোলের আর কান্নার শব্দ ভেসে আসলো । কারা যেন ফরহাদের আর আমার টুটি টিপে ধরলো । সকালে আমরা দুজনই ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত । আসার আগে দারোয়ানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে একটা কথা সে বললো , বাবু হাম তো দুশ বছর আগ মে মর গিয়া ।পূর্ণিমা রাত মে ডাকাত হাম সব কো কতল কর দিয়া বলেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল

আত্মা -রওনক নূর।

0
প্র‌তি র‌বিবার ছু‌টির দি‌নে সি‌নেমা দেখ‌তে যাওয়া তন্ময়ের অভ্যা‌সে প‌রিনত হ‌য়ে‌ছে। র‌বিবার সকা‌লে বের হ‌য়ে দুপুর পর্যন্ত সি‌নেমা দে‌খে অব‌ন্তির সা‌থে লান্স ক‌রে তারপর বাসায় ফে‌রে। কিন্তু অাজ সে বের হ‌তে পা‌রে‌নি এখনও। বাসায় কোথা থে‌কে একজন মেহমান অাস‌ছে, একজন মে‌য়ে। বোবা মে‌য়েটা, তাই কে সে বোঝা যায়‌নি। বেশ সুন্দরী মে‌য়েটা, রাজকন্যা টাই‌পের চেহারা। অব‌ন্তি‌কে এটা বলা‌তে খুব ক্ষেপ‌ছে। ও হয়ত নি‌জে‌কে পৃ‌থিবীর সব‌থে‌কে সুন্দরী ভা‌বে। তন্ম‌য়েরও খুব রাগ হল অবন্তির উপর। তাই একাই রওনা হল সি‌নেমা দেখ‌তে। অাজ হরর মু‌ভি দেখ‌বে তন্ময়। সি‌নেমা হ‌লে ঢুক‌তেই কেমন জা‌নি গা ছমছম কর‌ছিল তন্ম‌য়ের। একা একা কখনও সে হরর মু‌ভি দে‌খেনি। মু‌ভি দে‌খে তন্ময় খুব অবাক হল। মু‌ভি‌তে যে অাত্মাটা কে দেখাচ্ছে ওই মে‌য়েটাই অাজ সকা‌লে ও‌দের বাসায় অাস‌ছে। তন্ময়ের খুব ভয় হ‌চ্ছিল কারন ওর পা‌শেও কেউ ছিলনা। হঠাৎ সে অনুভব করল পাশ থে‌কে কেউ একজন তার কা‌ধে হাত রাখ‌লো । তাকা‌তেই সে দেখ‌লো সেই মে‌য়ে‌টি তার পা‌শে ব‌সে অা‌ছে। তন্ম‌য়ের গলা শু‌কি‌য়ে অাস‌ছি‌লো। বা‌হি‌রে বের হবার চেষ্টা কর‌তেই মে‌য়েটা তার হাত চে‌পে ধরল। টানাটা‌নি‌তে তন্ম‌য়ের ঘ‌ড়িটা খু‌লে থে‌কে গে‌লো। কোন ম‌তে ছা‌ড়ি‌য়ে মু‌ভি শেষ না ক‌রেই বে‌রি‌য়ে পড়‌লো। কিন্তু বা‌হি‌রে সে কোন রিক্সা দেখ‌তে পে‌লোনা। হাট‌তে শুরু করল। অাজ রাস্তাটাও তার কা‌ছে অ‌চেনা লাগ‌ছে। হাট‌তে হাট‌তে অ‌নেক দুর যাবার পর একটা রিক্সা পে‌লো। রিক্সায় উ‌ঠে রিক্সা চালক‌কে তাড়াতা‌ড়ি চালা‌তে ব‌লে। তন্ম‌য়ের ঘুমঘুম পা‌চ্ছিল, হঠাৎ সে অনুভব করল তার পা‌শে কেউ ব‌সে অা‌ছে। পা‌শে তাকা‌তেই দে‌খে সেই মে‌য়ে‌টি। মে‌য়ে‌টি ব‌লে” ঘ‌ড়িটা নি‌বেনা তন্ময়।” কোনম‌তে রিক্সা থে‌কে নে‌মে দৌড় দেয় তন্ময়। দৌড়া‌তে দৌড়া‌তে একটা বাড়ী‌তে যে‌য়ে নক ক‌রে সে। ‌ ভেতর থে‌কে একজন ম‌হিলা বের হ‌য়ে অা‌সে ঘোমটা দি‌য়ে। ভ‌য়ে তন্ম‌য়ের বুক তখন তৃষ্নায় শু‌খি‌য়ে গে‌ছে। ম‌হিলার কা‌ছে পা‌নি চাওয়ার অা‌গেই ম‌হিলা‌টি তন্ময়‌কে পা‌নি এ‌গি‌য়ে দিল। কোন কিছু না ভে‌বে ঢকঢক ক‌রে পা‌নি খে‌য়ে নিলো সে। ম‌হিলা‌কে গ্লাসটা দি‌তেই ঘোমটা উ‌ঠি‌য়ে ম‌হিলা‌টি ব‌লে “ঘ‌ড়িটা নি‌বে না” । তন্ময় তাকা‌তেই অবাক হল এটা তো সেই মে‌য়ে। কোনম‌তে দৌড় দি‌য়ে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু মে‌য়েটাও ওর পিছ পিছ দৌড়া‌নো শুরু করল। দৌড়া‌তে গি‌য়ে ট্রেন রাস্তার সাম‌নে গে‌লো সে। মে‌য়ে‌টি ধাক্কা দি‌য়ে স‌রি‌য়ে দিল তন্ময়‌কে অার ট্রেন এ‌সে চাপা দিল মে‌য়ে‌টি‌কে। তন্ময় অঙ্গান হ‌য়ে গেল। ‌ চোখ খুল‌তেই তন্ময় অনুভব কর‌লো সে তার বে‌ডে। এখা‌নে কিভা‌বে অাস‌লো কিছুই বুঝ‌তে পার‌লোনা সে। শরী‌রে খুব ব্যাথা ওর। মা চা দি‌তে অাস‌লো। কাল কি হ‌য়ে‌ছি‌লো জান‌তে চাই‌লো তন্ম‌য়ের কা‌ছে। তন্ম‌য়ের বাবা নামায পড়‌তে মস‌জি‌দে যাবার সময় ও‌কে অঙ্গান অবস্হায় পে‌য়ে‌ছে বাসার গে‌টের সাম‌নে। কিছুই বুঝ‌তে পার‌লো না তন্ময়। তা‌কি‌য়ে রই‌লো মা‌য়ের দি‌কে। খুব মাথা ঘুরা‌চ্ছিল অার অ‌স্হির লাগ‌ছি‌লো তন্ম‌য়ের। অব‌ন্তি‌কে খবর দি‌য়ে‌ছে তন্ম‌য়ের মা। হয়ত এখনই এ‌সে যা‌বে। তন্ময় মা‌য়ের কা‌ছে গতকাল যে মে‌য়েটা এ‌সেছিল তার সম্প‌র্কে জান‌তে চাই‌লে মা জানা‌লো সকা‌লেই মে‌য়ে‌টি চ‌লে গে‌ছি‌লো। ভা‌লো লাগ‌ছি‌লোনা তন্ম‌য়ের। অবাক হল সেই ঘ‌ড়িটা নি‌জের হা‌তে দে‌খে। অব‌ন্তি এ‌সে বকবক করতেই অা‌ছে। কেন, কিভা‌বে, কি হল হাজারটা প্রশ্ন। এর ম‌ধ্যে শুরু ক‌রে‌ছে অার এক গল্প। তার গ্রা‌মের এক অা‌ত্মিয় না‌কি ট্রে‌নে চাপা প‌ড়ে‌ছে, হয়ত অাত্মহত্যা ক‌রে‌ছে। ফেসবু‌কে কোন ছে‌লে তার সা‌থে প্রতারনা ক‌রে‌ছে । এত সুন্দর মে‌য়েটা‌কে কেমন বিভৎস লাগ‌ছে। ৫ দিন অা‌গে এ ঘটনা ঘট‌ছে। কিন্তু অব‌ন্তিরা খবর পে‌য়ে‌ছে অাজ। প‌ত্রিকা সা‌থে এ‌নে‌ছে অব‌ন্তি। প‌ত্রিকা‌তে দু‌টি ছ‌বি, এক‌টি ট্রে‌নে কাটা অার এক‌টি অা‌গের। জোর ক‌রে তন্ময়‌কে দেখা‌লো অব‌ন্তি। তন্ময় চম‌কে উঠ‌লো ম‌নে হল হৃদ-স্পন্দন থে‌মে অাস‌ছে। এটাই‌তো সেই মে‌য়ে যে কাল রা‌ত্রে ওর সা‌থে এত কান্ড ঘ‌টি‌য়ে‌ছে। মে‌য়ে‌টির নাম জান‌তে চাই‌লে অব‌ন্তি জানা‌লো নীলা। তন্ময় ল্যাপটব নি‌য়ে ওর ফেসবুব এক্টিভ করল যা সে এক সপ্তাহ অা‌গে ডিএ‌ক্টিভ ক‌রে‌ছি‌লো। “নীল পরী নীলা” ছিল মে‌য়ে‌টির ফেসবুকের নাম। প্র‌তি‌দিন চ্যাট হত মে‌য়ে‌টির সা‌থে। ত‌বে তন্ম‌য়ের স‌ন্দেহ ছি‌লো যে এ‌টি ফেক অাই‌ডি।মে‌য়ে‌টি নি‌জের ছ‌বি ফেসবু‌কে দিতনা। তন্ম‌য়ের জীব‌নে অব‌ন্তি থাকার স্ব‌ত্ত্বেও নীলার সা‌থে ওর প্রেম হয়। গত জন্ম‌দি‌নে নীলা এই ঘ‌ড়ি‌টি দি‌য়ে‌ছিল তন্ময়‌কে। গত সপ্তা‌হে ছ‌বি দেওয়া নি‌য়ে ঝগড়া হওয়ায় ফেসকুক ডিএ‌ক্টিভ ক‌রে তন্ময়। মে‌য়ে‌টি ব‌লে তু‌মি তো অামা‌কে ভা‌লোবা‌সো ত‌বে ছ‌বি দি‌য়ে কি কর‌বে। তন্ম‌য়ের কা‌ছে সম্পর্কটার গুরুত্ব না থাক‌লেও মে‌য়ে‌টির কা‌ছে অ‌নেক বে‌শি ছিল। শত মে‌সেজ জমা হ‌য়ে অা‌ছে ইনব‌ক্সে অার কিছু ছ‌বি। তন্ময় অবাক হ‌য়ে দেখ‌লো সেই মে‌য়ে‌টিই নীলা যে গত কাল তার কা‌ছে এ‌সে‌ছিলো। ত‌বে এটা ছিল নীলার অশরীরী অাত্মা।

জোয়ারানকুসা-নুরুন নাহার লিলিয়ান।

0

 

img_20160720_171445

 

সুপ্রাচীন শহর বিক্রমপুর। চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে অনেক রাজা রানী,জমিদার আর ইংরেজদের জীবনের অজস্র প্রেম ভালবাসা, জয়, পরাজয় নিয়ে গল্প ছড়িয়ে আছে এই শহরের মানুষের মুখে মুখে। প্রচলিত এমনই এক গল্প জোয়ারানকুসা।

বিক্রম পুর শহরে জোয়ারা নামে একটি মেয়ে ছিল। সে মেয়েটি শহরের ইদ্রাকপুর কেল্লার সরকারি বাসভবনে তার পরিবারের সাথে থাকতো। ইদ্রাকপুর কেল্লা তখন বাংলাদেশের প্রাচীন পরিত্যক্ত স্থাপত্য। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের বাংলো হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
সেখানকার সেই মেয়েটি সাধারন মানুষের চোখের সামনে অসাধারন রুপবতী হয়ে বড় হতে থাকে। জোয়ারার আসল নাম জুই। কিন্তু কেন জানি খুব ছোট বয়স থেকে নিজের নাম সে জোয়ারা বলে। তার অদ্ভুত সব আচরনে তার মা বাবা ও অবাক হতো। কেউ কেউ বলে জোয়ারারা এটা দ্বিতীয় জন্ম। অনেক কিছু সে আগেই বলে দিতে পারতো। তাই মা বাবা ও তাকে সব জায়গায় নিতো না।

প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়মে তার মুখ দিয়ে অনির্বায নিয়তির কথা প্রকাশ হয়ে যেতো। কিন্তু সে মেয়ে টির জীবনেও প্রেম এলো
ষোড়শী জোয়ারা প্রেমে নোয়েল নামের কলেজ ছাত্র বদ্ধ উন্মাদ। সব সামাজিক নিয়ম কানুন আর মানুষের দৃষ্টি কে পরোয়া না করে নানা অজুহাতে কেল্লায় গিয়ে দেখা করে। পৃথিবীর সব সত্যিকারের ভালোবাসার ও কিছু অমোঘ নিয়তি থাকে। যে নিয়তি কে কোন প্রেমিক প্রেমিকা অতিক্রম করতে পারেনা।নোয়েলের কাছে জোয়ারা যেন ছিল অদ্ভুত নেশার মতো। প্রায় দিন কেল্লার সামনের সবুজ পানির পুকুরে নিজেদের চেহারার প্রতিচ্ছবি দেখতে ভালবাসতো। আর জোয়ারার গায়ের গন্ধ নিয়ে সে নিশ্বাস নিতো। ষোড়শী কিংবা অষ্টাদশ বয়স কে ঝাপিয়ে সব মানুষের জীবনে কতো প্রেম না উকি মারে। একদিন মনের অজান্তে কিংবা নিয়তির বেড়াজালে পড়ে নোয়েলের জীবনে হঠাৎ অন্য নারীর প্রবেশ হলো। সহ্য করতে পারলো না জোয়ারা। ইদ্রাকপুর কেল্লার ঘরের পাশের পরিত্যক্ত প্রাচীন সুড়ঙ্গ ধরে নামতে নামতে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল। তারপর রহস্যময় সুড়ঙ্গপথে কুকুড়, ঘোড়া, হাতি পাঠানো হল। জোয়ারার যেন পুরনো গল্প হয়ে গেল। এই দিকে হঠাৎ এক দুপুরে সেই সবুজ পানির পুকুরে নোয়েলের লাস ভেসে উঠলো। কেউ জানে না। কিভাবে এই শহর থেকে মানুষের জীবন গল্প হয়ে যায়। তারপর অনেক দিন পর ইদ্রাকপুর কেল্লার পিছনের বাগানে ঘাসের মতো কোন গাছ। নিজে নিজেই বেড়ে উঠছে।

তারপর একদিন কেল্লা সংস্কারের কাজে সরকারী গবেষক দল গেলেন। সেই ঘাসের মতো গাছ গুলোর নাম জানালেন সুগন্ধি গাছ জোয়ারানকুসা। এই দিকে হারিয়ে যাওয়া জোয়ারা বাবা বিস্মিত হলেন ভেবে তার সে মেয়েটি নিজেকে জোয়ারা বলতো। যতদিন সে চাকরীর কারনে কেল্লায় ছিলেন ততোদিন গাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে অশ্রু ফেলতেন। আর সবুজ পানির পুকুর সব সময়ের জন্য একেবারে নিসঙগ হয়ে গেলো। একটা জীবন্ত ভালোবাসার ছায়া বুকে নির্বাক ইতিহাসের গল্প হয়ে রইলো।