গেস্ট হাউজ-নুরুন নাহার লিলিয়ান।

0

 

unnamed

 

এইতো কয়েক মাস আগের কথা। অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর প্রচনড নিসঙগতা নিয়ে সাকিয়া গেস্ট হাউজের সামনের করিডোরে বসে ছিল। চারপাশের পরিবেশের মানুষের মন মানসিকতা,তাদের অসহযোগীতা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতা হতাশ করে তুলে ছিল। অর্থহীন জীবনটা নিয়ে প্রতিদিন মনের বিরুদ্ধে গিয়ে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে দম বন্ধ হয়ে যাচিছল। তখন শুধু জীবনের বাস্তবতা ভুলে থাকতে সাকিয়া বই পড়তো। আর অতীতের কিছু সুখ স্মৃতি মনে করে সময় কাটাতো।

সেদিন হঠাৎ দুপুরে দুটো বাচচা মেয়ে গেস্ট হাউজের করিডোরের সামনে দিয়ে যাচিছল। একটি বাচচা সাকিয়া কে দেখে অবাক আর ভয় পেয়ে গেল। কাদতেঁ কাদতেঁ বলল, তুমি ভূত। এই গেস্ট হাউজে আগে একটা ভূত আনটি ছিল। সে ফাসি দিয়ে মরে গেছে। সাকিয়া একটু ভয় পেল। আবার একটু অপ্রস্তুত হল। তবে কেউ কোন সঠিক উত্তর দিল না। কেয়ার টেকার আর আশেপাশের মানুষ ঘটনাটা এড়িয়ে গেল। একটা কথা আছে প্রকৃতির কাছ থেকে কোন কিছু হারায় না। মানুষ যাই করুক প্রকৃতি নিরব সাক্ষী । তারপর আরো কয়েক মাস। সাকিয়ার দুই একজন বন্ধু হল। তাছাড়া ফেসবুক আর পুরনো বান্ধবীদের সাথে মোবাইলে যোগাযোগটা আছে।

একদিন ইলেকট্রিক কেটলিতে চায়ের পানি দিল। তখন ঠিক দুপুরের পরের ঘটনা। প্রায় তিনটার দিক। বাইরের মানুষের আওয়াজ পাওয়া যায় না। মনে হল পাশের রুম থেকে কেউ বের হল। সাকিয়া দরজা খুলল। কাউকে দেখলো না। একটা কাপ ময়লা থাকায় অন্যকাপে চা নিল। চা নিতে নিতে মনে হল কেউ টয়লেট থেকে বের হল। দেখল কেউ নেই। তারপর এসে নিজের চা খেতে লাগল। মনে হল সে মনে মনে অনেক আগের স্মৃতিতে চলে গেছে।

এই সময় তারপাশে বসা এক বান্ধবী তাকে ঘারে ধাককা দিয়ে বলল,আরে গাধা নিঃসঙগতায় পড়ে সবাই কে যে সুখের আর সাফল্যের কথা বলছিস। তোর সামনে আর পাশে বসা ভয়ংকর শয়তানটা। তুই যখন সুখে গদগদ করিস তখন তোর কপাল টান টান করে। মুখ ভেংচি দেয়। তোকে সহ্য করতে পারে না। তুই প্রতিনিয়ত শত্রুর কাছে সুখ রাখতে দিস। সাবধান। আমরা মানুষ খুব কাছের মানুষরাই কাছের মানুষের ক্ষতি করি। ভাল থাকা সহ্য করতে পারিনা। তৃতীয় চোখ আর ইন্দ্রিয় ক্ষমতা সব বুঝে ফেলে।

সাকিয়ার ঘোর কাটলো। মনে হলো কেউ তার সাথে কথা বলছিল । আবার নিজেকেই বুঝাল। হয়তো মনের ভুল। কিন্তু বুকটা দুক করে উঠলো আরেকটা চায়ের কাপে অবশিষ্ট চা দেখে। টি ব্যাগটা এমন করে রাখা মনে হল এই মাত্র কেউ চা খেয়ে রেখেছে। সাকিয়া আর কিছুই ভাবতে পারলো না।

মনে হল সামনের কাছে বসা বন্ধুর মনটা হঠাৎ শত্রুতায় ভরে উঠতে পারে। বাস্তবতা খুব কঠিন। মানুষের ভিতরের অন্য কাউকে বুঝাও কঠিন। শূন্য দৃষ্টি নিয়ে সাকিয়া বিকেলের আকাশের গভীর নীলের দিকে তাকায়।

“ঘড়া”পর্ব ৩-মারিয়েন ফয়সল।

0

 

images-3

 

আজিজ তো আবার মৌলবি মানুষ! জ্বিন আর মানুষের তফাৎ বুঝতে পারলে তো হয়েই গেল! নিজেই জ্বিন তাড়ানোর ব্যবস্থা করে ফেলবে, আর যদি আমার ছেলের ‘জ্বিন হুজুর্ִ মামা ‘এসে হাজির হন তাহলে তো দোউখানু ঘড়া বন্দী হবে! নাহ ওনাকে এই সাত দিনের মধ্যে আসতে দেওয়া চলবে না।দাওয়াতের লিস্ট থেকে উনি বাদ । তাই বা কি করে হয়! দাওয়াত তো ওনাকে দিতেই হবে। কি জানি এর মধ্যেই উনি জেনে গেলেন কিনা… । আজিজকে না হয় সামাল দিয়ে ফেলবো … কিন্তু ‘জ্বিন হুজুর মামা?!
এই মূহুর্তে মতিবিবিকে আমার আর সহ্য হচ্ছে না ।সমস্যাগুলো মাথায় কিলবিল করছে।
-‘মতিবিবি,তুমি দেখ গিয়ে তোমার নতুন এ্যাসিস্টান্ট কি করছে।’
-‘কিন্তু মিডাম,আমি একটা কড়াই খুঁজে পাচ্ছি না…’
-‘ওটা কাল রাতে রিনি নিয়ে গিয়েছে,বলেছে কড়াইয়ের বাচ্ছা সহ ফেরত দেবে।এখন যাও তো!’
-‘আর দিয়েছে…’

হঠাৎ রান্নাঘরের দিক থেকে ‘ধপাশ’ একটা আওয়াজ হল আর দোউখানু নিমেশে আমার সামনে হাজির।
-‘উনি তো অচেতন হয়ে পড়ে আছেন…’
-‘কে অচেতন হয়েছে?’
-‘ওই মতিবিবি …’
-‘কেন? ‘
-‘মনে হয় আমি সব কাজ করে ফেলেছি তাই…’
-‘কি কি করেছো তুমি? ‘
-‘ষোল পদের ব্যাঞ্জণ, আর দুই পদের অন্ন। আমাকে মাফ করে দিন ‘সন্দেশ মিডাম ‘। আমি ওনাকে বেহুশ করিনি, ওনার হাঁসি দেখলে আমারই বেহুশ হতে ইচ্ছে করে। তাই তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে সরে পড়তে চেয়েছিলাম…’
‘মিডাম বল তাহলেই চলবে।’
-‘পানি ঢেলে এসেছি, একটু পরেই হুশ ফিরে আসবে ওনার।’
-‘ঠিক আছে, রান্নাঘরে থেকে খাবার নিয়ে চিলেকোঠায় চলে যাও। দুই ঘন্টা পরে আমার সাথে দেখা কর।দাওয়াতের বাজারের ফর্দ তৈরী করতে হবে।
নাহ,পরিকল্পনা করে কোন লাভ নেই,আমার ফৌজি স্বামীর মত তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে…
দোউখানুকে দুই ঘন্টা পর ঘরের দরজায় উঁকি ঝুঁকি দিতে দেখলাম। নির্দেশ অনুযায়ী চলে এসেছে। বেশ হাসি খুশী দেখাচ্ছে দোউখানুকে। ভিতরে ডাকলাম ওকে।
-‘বেশ হাসি খুশী দেখাচ্ছে তোমাকে দোউখানু?’
-‘জি মিডাম আম্মা,সবার সাথে পরিচয় হল। আপনার দোকানে যারা সেলাইয়ের কাজ করে ওদের সবার সাথে । রহিমা বলেছে কোনো সমস্যা হলে সে দেখিয়ে দেবে।
-‘হু,শুধু মেয়েদের সাথেই দেখা হয়েছে তাই না?’
‘জি মিডাম আম্মু।’
-‘বিপদ কাটে নাই দোউখানু, আরও দু’জন বাকি আছে এখনও। না,ভুল বললাম, অনেকেই বাকি আছে… । তৈরী থেকো।’
-‘জি মিডাম আম্মা।’
-‘আম্মা শব্দটা যোগ না করলেই কি নয়?’
-জি আম্মা, আর হবে না।’
-‘এখন বল, দাওয়াতের জন্য কি কি রান্না করবে? মনে রেখ, পর পর দুইটা দাওয়াত।’
-নও রতন পোলাউ, কমলা পোলাউ, গরুর শাহী রেজালা, পাসিন্দা কাবাব,পাকা রুইয়ের কালিয়া , কই মাছের গঙ্গা যমুনা, ঝলসানো খাসীর রান, ফুলকপির আচার, মটরশুটি দিয়ে বাঁধাকপির ডালনা,পৃথিবীর সব রকম আঙুর জাতীয় ফল দিয়ে ফলের সালাদ, সব রকমের বাদাম দিয়ে ঘন ক্ষীর। ওহ! মুড়ো ঘন্টও হবে! আমার ‘হতে পারত শাশুড়ী আম্মা সন্দেশজাদী’ খুব ভালো বানাতেন ওটা। আমি দেখে দেখে শিখে নিয়েছিলাম। আরও আছে, খাটি জাফরান আর বাদাম দিয়ে শরবত।’
অক্ষি বলয়্গুলোতে চোখে দুটোকে আর ধরে রাখতে পারছি না, ওরা বোধ হয় এবার টুপ টুপ করে ঝরে পড়বে! দুর্বল হার্টের দ্রুত লয় শুনতে শুনতে অনিচ্ছা সত্যেও রাজী হলাম।
-‘কিন্তু মিডাম, চালগুলো একদম খাঁটি বাসমতি হতে হবে, শুধু ঘাস খেয়েছে এরকম গরু আর খাসী হতে হবে, গরুর দুধ ও ঘী ‘শুধু ঘাস খায়’ এরকম গরুর হতে হবে। আনাজগুলো সব গোবর সার দেওয়া জমির হতে হবে। আজকে রান্না করতে গিয়ে দেখলাম, কোনো কিছুই খাঁটি নয়। আর মশলা নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত। ওগুলো আমি জোগাড় করব। আপনি বাকি সব কিছু এনে দিন।’
তাড়াতাড়ি চোখের ঠিক নিচে হাত দুটো পেতে ধরলাম , চোখগুলো বেরিয়ে পড়লে যাতে সময় মত ধরে ফেলতে পারি।
হাউ মাউ কান্না, আর দুড় দাড় দৌড়ের শব্দে চমকে উঠলাম। মতিবিবি আড়ি পেতেছিল, মরা কান্না কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে চলে গেল।
-‘উনি বোধ হয় আবার অচেতন হলেন!’
দোউখানুর দিকে অগ্নি দৃষ্টি হানলাম!
-‘কিন্তু এসব আমি জোগাড় করব কি করে দোউখানু! এসব তো এখন আর পাওয়া যায় না, আর পেলেও অনেক টাকার প্রয়োজন!’
-‘আমি কোহেকাফের সাথে কথা বলেছি, ওখানকার বাবুর্চি সম্প্রদায় বলেছে, সব জোগাড় করে দেবে। টাকা দিলে সব পাওয়া যাবে, যদিও কোহেকাফে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন রয়েছে । আপনি টাকায় দাম শোধ করবেন, আর ওরা এখান থেকে সেই পরিমান স্বর্ণ কিনে কোহেকাফের ব্যাবসায়ীদের দেবে । ফল, বাদাম, মশলা আমি জোগাড় করব, গোটা পৃথিবী একবার চক্কর দিলেই হবে, তবে, কমলা আর মধু কিনতে হবে অস্ট্রেলিয়া থেকে, যদিও তুর্কীদের দেশের মধু সব চাইতে ভালো । জাফরান না হয় ইরান থেকেই নিয়ে আসব।আর আঙুর জাতীয় ফল রাশিয়ার বনে জঙ্গলে পাওয়া যাবে ।ওই কমলা, মধু আর জাফরানটাই কিনতে হবে!’
-‘নও রতনের বাদামগুলো?’
-‘ও নিয়ে ভাববেন না, কোহেকাফের ওরা জোগাড় করে দেবে ।’
‘কত টাকা লাগবে?’

-‘মিডাম আম্মু, আমি তো এখনকার টাকার হিসেব বুঝি না, ওরা বলেছে সাত লক্ষ লাগবে।’
-‘কিন্তু, তুমি যে সেদিন আমার সাথে বেতন নিয়ে দামদস্তুর করলে?’
-‘ওহ, আপনি বললেন সাত হাজার, আর আমি তাই বললাম দশ হাজার, বেতন সব সময় বাড়িয়ে চাইতে হয়.… । তবে টাকা দিয়ে আমি কি করব… আপনি আমার মাতৃতুল্য…’
ভেবেছিলাম, দুই লক্ষে কাজ হয়ে যাবে, কিন্তু আরও পাঁচ লক্ষ লাগবে… পানি খেতে ইচ্ছে হল!
কিন্তু উপায় নেই… নিজের ফাঁদে নিজেই পা দিয়েছি!
-‘কিন্তু মা মনি,রান্নার সময় মতিবিবির থাকা চলবে না। প্রথমত ওনার চুল বড়ই দৃষ্টিকাড়া, আর উনি আমার কাজের ধরণ দেখলে আবারও অচেতন হয়ে পড়বেন । ‘
-‘মা মনি?? এটা আবার কখন শিখলে?’

-‘ওই যে রহিমার সাথে বসে একটু টেলিভিশন দেখেছিলাম।’
নাহ! এরা আমার ব্যাবসা লাটে তুলবে!
যাই হোক, এখন এসব ভাবার সময় নেই, অনেক বড় বড় ঝড় সামাল দেওয়া বাকি আছে…
-‘আপনি চিন্তা করবেন না মামনি মিডাম, ওনার সেলাইয়ের কাজ আমি করে দিয়েছি…’
মতি সমস্যা ভুলে, রহিমা সমস্যা সমাধান জরুরী হয়ে পড়েছে!
-‘দোউখানু, তুমি কি জান, রহিমার স্বামী অতিমাত্রায় সন্দেহবাতিক? একটু সাবধানে থেক। তুমি নিঃশ্চয় চাও না রহিমা বকা খাক?
কিন্তু, মতিবিবিকে কিভাবে রান্নার সময় সরিয়ে রাখবে? এটা একেবারেই অসম্ভব। তুমি তার এসিস্ট্যান্ট।’
-‘স্সন্দেশ আম্মু, আপনি অনুমতি দিলে ওনার কোমরের ব্যাথা একটু বাড়িয়ে দিতে পারি।
দু’জোড়া চোখ একটু হলেও ঝিকিয়ে উঠল, বললাম, ‘দেখ,পানিটা অল্পই ফেল, আর লক্ষ্য রেখ যেন বেশি বাথ্যা না পায়। পরের দাওয়াতের সময় অন্য ব্যবস্থা করা যাবে। এখন জোগাড় যন্ত্রে লেগে যাও।’
দোউখানু জানালো যে ও কাল সকালে বিশ্ব ভ্রমণে বের হবে আর আমি ৫ লক্ষের চিন্তায় বাতিব্যাস্ত হলাম। পাঁচ লক্ষ জোগাড়ের চিন্তায় খাতা কলম নিয়ে হিসেবে বসেছি।

“মোবাইল টোন”-নুরুন নাহার লিলিয়ান।

0

images-1

 

হোক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয় থেকেও বিদেশি গবেষক এবং ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা আছে। ইরাকার জাপানি প্রফেসর বাসার আবেদন করার জন্য একটা ফরম হাতে দিল। আর কিভাবে ফরম পূরন করতে হবে তা শিখিয়ে দিল। ল্যাব থেকে বেশি দূরে নয়। সেই আবাসন এলাকা বাংলাদেশীদের কাছে সোয়েন বলে পরিচিত। ইরাকার স্বামী জাপান আসতে আরো দুই মাস লাগবে। এর মধ্যে বিশ্ব বিদ্যালয়ের বাসাটা পেয়ে গেলে ইরাকার জন্য খুব ভাল হয়। বিশ্ব বিদ্যালয়ের এই বাসা গুলো দুই ধরনের । কাপল বাসা এবং ফ্যামিলি বাসা। ইরাকার যেহেতু সন্তান নেই তাই স্বামী নিয়ে কাপল বাসাতেই উঠতে হবে।খুব নিভৃত সবুজ ঘেরা অরন্যের মাঝে ইট পাথরে গড়া মানব বসতি। সোয়েনে সব বিশ্ব বিদ্যালয়ের গবেষক আর ছাত্র ছাত্রী।

ইরাকার আরো দুজন বিদেশি ল্যাব ম্যাট ও সোয়েনের বাসায় উঠেছে। ভারতের গীতিকা আর চীনের ইউয়ান। তাদের সাথে খুব অল্প সময়ের মধ্যে খুব ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়েছে ।ভিসা জটিলতার কারনে ইরাকার স্বামীর জাপান আসতে আরো এক মাস লাগবে। মাঝে মাঝে যখন একা অনুভব করে তখন সোয়োনের দুতলা বাসার বারান্দায় বসে ইরাকা পাহাড় থেকে তুষাড় নামার দৃশ্য দেখে আপ্লুত হয়। গভীর অরন্যের এই দ্বীপ শহরে ইরাকা নিজের জীবনের ছন্দ খুঁজে। একঘেয়েমি প্রবাস জীবনের নানা টানাপোড়েনে যখন মন ভীষন ক্লান্ত তখন বান্ধবী ইউয়ান এবং গীতিকা যেন প্রতিদিনের জীবনে একটু বাড়তি আয়োজন। ল্যাব থেকে যে যার মতো সময়ে বাসায় ফিরলেও হীম শীতল সন্ধ্যায় এক কাপ কফি এক সাথে পান করা যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে।

পাহাড় আর সমুদ্রের আবাহনে বেড়ে উঠা নি:সঙ্গ হোক্কাইডো দ্বীপটা যেন নিরন্তর প্রশ্নবোধক উপাখ্যান। কি কোন অনুক্ত বেদনার কান্নায় এই দ্বীপের আকাশটা আজ ভারী হয়ে আছে। এখানকার প্রকৃতি মুহুর্তে নানা রং পাল্টায়। স্বামী কাছে না থাকলেও ইউয়ান আর গীতিকাকে নিয়ে প্রাত্যহিক জীবন ভালোই কেটে যাচিছল। এপ্রিল মাস। চারিদিকে শীতের আর তুষাড়ের স্বার্থপর বিচরন। চাইনিজ বান্ধবী ইউয়ান এজমা রোগে আক্রান্ত। শীতের সময়টা তার প্রচন্ড কষ্টে কাটে। প্রায়ই ল্যাবে শ্বাস কষ্ট উঠলে তার মৃত্যু প্রায় অবস্থা হয়ে যায়। গীতিকা পাশের বিল্ডিংয়ে থাকলেও ইউয়ান আরো দুই বিল্ডিং পিছনে থাকে। যে বিল্ডিংটার পিছনে গবেষনাগারের গভীর বাগান।

দিনে বেলায়ও ভয় লাগে।গীতিকার সাথে যোগাযোগটা বেশী থাকলেও ইউয়ানের সাথে তুলনামূলক কম হয়। সন্ধ্যা থেকে বাইরে প্রচন্ড তুষাড়পাত। সেই সাথে ঘূর্ণি বাতাস। চারিদিকের পরিবেশটা কেমন গুমোট ভাব। আবহাওয়া খারাপ থাকায় প্রতিদিনের মতো ইরাকার বাসায় কফি খাওয়ার পর যে যার রুমে চলে যায়। দেশে স্বামীর সাথে কথা বলার পর সে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। ঠিক ভোর রাতের ঘটনা। বেশ অনেকক্ষন মোবাইল বেজেই যাচেছ। ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলে দেখে গীতিকা কল করেছে। ফোনটা রিসিভ করতেই যেন গীতিকা কান্না শুরু করে।
তারপর বলে, “ইউয়ান আর নেই। তুমি তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসো। ”
ইরাকা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই হম্বিতম্বি হয়ে দৌড়ে নিচে নামে। ইউয়ানের রুমে গিয়ে কলিংবেল বাজালেই ইউয়ান ঘুম চোখে বিরক্ত ভংগিতে বেড়িয়ে আসে। মৃত ইউয়ান কে জীবিত দেখে ইরাকার বুকের ভিতরটা আৎকে উঠলো। প্রচন্ড ভয়ে কুকড়ে গেল । সমস্ত শরীর হীম হয়ে গেল। হাত পা ধর ধর করে কাপতে থাকলো । ইউয়ান কে ঠিক বুঝাতে পারছিল না মোবাইল টোনের কথা। তাই গীতিকাকে মোবাইল করে।তুষাড়পাতের কারনে বাইরের তুষাড় স্তুপে অন্যরকম পরিবেশ হয়ে আছে। কিছুক্ষনের মধ্যে গীতিকাও এলো।

এর মধ্যে পুরো ব্যাপারটা পরিস্কার হলো যে গীতিকা মোবাইল করেনি। ইরাকার মোবাইল চেক করে দেখা গেল আবহাওয়া পূর্বাভাস দিতে কয়েকবার সিটি সাপ্পোরো থেকে এলার্ট কল এসেছে।ইরাকা কিছুতেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলো না। কিংবা বিশ্বাস করাতে পারলো। মুহুর্তে ইরাকা মূর্ছা গেল।একটা গভীর বিশ্বাসের রহস্যময় দ্বন্দ্ব মনের কোথাও দাগ কেটে দিল।ইউয়ান আর গীতিকা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। কি করবে বুঝতে পারে না। বাইরে তাকিয়ে দেখে আবার তুষাড়পাত শুরু হয়েছে।
ততোক্ষনে জাপানের আকাশে ভোরের সূর্য ও উঠতে শুরু করেছে। দিনের আলোয় মুছে গেছে অন্ধকার রাতের অন্ধকার গল্প।

“ভয়ংকর রা‌ত্রি”- রওনক নূর

2

images-2

কাব্য অার নুসরাত দাদাবাড়ী যাওয়ার জন্য খুব ব্যস্ত হ‌য়ে গে‌ছে। ছোট বেলা থে‌কে বাবা – মা কত ঘু‌রি‌য়ে‌ছে ও‌দের দেশ বি‌দেশ। শুধু দাদাবাড়ী কখনও যে‌তে দেয়‌নি। বিশাল রাজবাড়ী ও‌দের। কিন্তু ও‌দের দাদা-দাদীও চায়না ওরা ওখা‌নে যাক। কিন্তু এবার ওরা যা‌বেই। অ‌নেক ক‌ষ্টে বাবা-মা‌য়ের অনুম‌তি নি‌য়ে রওনা হল ওরা। পৌছা‌তে রাত হ‌য়ে গে‌লো। অন্ধকার অার ঝি‌ঝি পোকার ঝিঁ ঝিঁ শ‌ব্দে বেশ রহস্যময়ী লাগ‌ছে গ্রামটা‌কে। দেখ‌লো একজন লোক ও‌দের নি‌তে অাস‌ছে। অন্ধকা‌রে হা‌রি‌কেন হা‌তে। উ‌নি বল‌লেন কেন এ‌সে‌ছো? খুব অবাক হ‌লো ওরা। অার কোন কথা হলনা। উনার পেছন পেছন চল‌তে থাক‌লো ওরা। অব‌শে‌ষে পৌছা‌লো ওরা দাদাবাড়ী ।

জোছনার অা‌লোয় চকচ‌ক কর‌ছি‌লো ও‌দের রাজবাড়ী। এত সুন্দর মহল অার বাবা-মা ও‌দের‌কে কখনো অাস‌তে দেয়‌নি ভে‌বে রাগ হ‌চ্ছি‌লো ও‌দের। সব‌কিছুই ভা‌লো ছি‌লো শুধু বিদ্যুত নেয় এ গ্রা‌মে। দুই ভাই‌বোন মি‌লে অন্ধকা‌রে জোছনা উ‌পো‌ভোগ কর‌ছি‌লো। হঠাৎ কর্কশ ক‌ন্ঠে কে যেন ব‌লে, “বা‌হি‌রে বের হ‌বেননা।” হঠাৎ এমন শু‌নে কেঁ‌পে উ‌ঠে ওরা। দে‌খে যে লোকটা ও‌দের এ‌নে‌ছে উ‌নিই কথা বল‌ছেন। কাব্য ক্ষে‌পে যে‌য়ে বল্ল এভা‌বে ভূ‌তের মত কেউ কথা ব‌লে। লোকটা কিছুক্ষন চুপ ক‌রে থে‌কে ব‌লে এ বাড়ীর চা‌রি‌দি‌কে পাপ, তাই সাবধান করলাম। অামা‌কে ছাড়া কেউ বা‌হি‌রে যা‌বেননা। সাম‌নেই কা‌লি ম‌ন্দির, ভয় পে‌তে পা‌রেন। লোকটা একটা পাগল, কি সব ব‌লে। কিছুই বিশ্বাস ক‌রে‌নি ওরা। শি‌তের কনক‌নে রাত, খুব ঠান্ঠা লাগ‌ছি‌লো ও‌দের। কিছুক্ষন পর সেই লোকটা এ‌সে ও‌দের কম্বল দি‌য়ে গে‌লো। লোকটা বেশ অদ্ভুত দেখ‌তে, দেখ‌লেই ভয় লা‌গে। ভয় পা‌চ্ছি‌লো দুজনই, কিন্তু কেউ কাউ‌কে বল‌ছি‌লোনা। অদ্ভুত লোকটা বার বার অাস‌বে ভে‌বে নুসরাত কাব্য‌কে দরজা লা‌গি‌য়ে দি‌তে ব‌লে। কাব্য দরজা লা‌গি‌য়ে দেয়। দুজন কম্বল নি‌য়ে শু‌য়ে প‌ড়ে। সা‌থে সা‌থে অাবার দরজায় ঠকঠক শব্দ। কাব্য ব‌লে নিশ্চয় ওই বা‌জে লোকটা অাবার অাস‌ছে। দরজা খুল‌তেই দে‌খে সেই লোকটা। বল‌লেন এই শী‌তে খেজু‌রের র‌সের মজাই অালাদা, চলুন রস পে‌ড়ে অা‌নি গা‌ছের থে‌কে। কাব্য শু‌নে‌ছি‌লো গ্রা‌মে শী‌তের দি‌নে রা‌তে গাছ থে‌কে খেজু‌রের রস পে‌ড়ে খাওয়ার মজাই অালাদা। সে এটা‌কে মিস কর‌তে চায়‌লোনা। নুসরাতকে রে‌খেই সে চ‌লে গে‌ল লোক‌টির সা‌থে। নুসরাত‌কে ব‌লে গেল একটু অ‌পেক্ষা কর‌তে , ও এক্ষু‌নি চ‌লে অাস‌বে।

কাব্য লোক‌টির পিছ পিছ হাট‌তে লাগ‌লো। পথই যেন শেষ হ‌চ্ছেনা। ত‌বে জোছনা রা‌তে গ্রা‌মে হাট‌তে ভা‌লো লাগ‌ছে তার। ত‌বে নুসরা‌তের জন্য একটু চিন্তা হ‌চ্ছে তার। হয়‌তো বোনটা তার একা একা ভয় পা‌চ্ছে। কিছুদুর যে‌তেই যে‌তেই একটা ম‌ন্দির দেখ‌তে পায় কাব্য, অার শুন‌তে পায় ঢোল অার নুপু‌রের শব্দ। লোকটা ব‌লে ভয় পে‌য়ে‌ছেন, ওখা‌নে অাজ তারা উৎসব কর‌ছে। কারা উৎসব কর‌ছে সেটা কাব্য অার শুন‌লোনা। অাল্লার না‌মে হাট‌তে থাক‌লো। কিছুক্ষন পর বাচ্চা‌দের কান্নার অাওয়াজ শুন‌তে পেল কাব্য। ম‌নে হ‌চ্ছে অ‌নেকগু‌লো বাচ্চা একসা‌থে কাদ‌ছে। অা‌স্তে অা‌স্তে কা‌ব্যের ভয় বাড়‌তে থাক‌লো। যত সাম‌নের দি‌কে যা‌চ্ছি‌লো ত‌তো কান্নাটা বে‌শি বে‌ড়ে যা‌চ্ছিল। কাব্য লোক‌টির দি‌কে তাকা‌তে দেখ‌লো লোক‌টি হাস‌ছে। কি ঘট‌তে যা‌চ্ছে কিছুই বুঝ‌তে পার‌ছি‌লোনা । ও ভাব‌ছিল নাজা‌নি বোনটার সা‌থে কি ঘট‌ছে। কা‌ব্যের বু‌কের ভেতর কেমন জা‌নি হ‌চ্ছি‌লো। হঠাৎ কাব্য অনুভব কর‌লো কান্না থে‌মে গে‌ছে। ওরা একটা নদীর ধা‌রে পৌ‌ছে গে‌লো। চা‌রি‌দি‌কে পোড়া গন্ধ, ছমছ‌মে প‌রি‌বেশ। এবার অার সে থে‌মে থাক‌তে পার‌লোনা। লোকটা‌কে বল্ল কোথায় যা‌চ্ছি অামরা? হেঁসে উ‌ঠে লোকটা ব‌লে অার যা‌চ্ছিনা অামরা, চ‌লে অাস‌ছি।
কাব্য জোর গলায় প্রশ্ন করল কোথায় এ‌সে‌ছে সে অার উত্ত‌রে লোক‌টি হে‌সে উ‌ঠে ব‌লে এ‌টি শ্বশান ঘাট।

খুব চিন্তা হ‌চ্ছি‌লো নুসরা‌তের। ভাইয়া কোথায় গে‌লো, এখনও অাস‌ছেনা। দরজায় ঠকঠক শব্দ শু‌নে ভাব‌লো ভাইয়া হয়ত চ‌লে অাস‌ছে। দরজা খুল‌তেই দেখ‌লো সেই লোক‌টি, সা‌থে তার ভাইয়া নেয়। লোক‌টির কা‌ছে নুসরাত শু‌নে যে তার ভাইয়া কোথায় অার উত্ত‌রে লোক‌টি ব‌লে যে সে জা‌নেনা কাব্য কোথায়। অার এটাও ব‌লে যে সে এখা‌নে ছি‌লোনা অার কাব্য‌কেও খেজু‌রের রস পাড়‌তে ডা‌কে‌নি। লোক‌টি নুসরাত‌কে ব‌লে এক্ষু‌নি তার সা‌থে যে‌তে , তা না হ‌লে হয়ত তার ভাই‌কে অার খু‌জে পাওয়া যা‌বেনা। নুসরাত অার সেই লোক‌টি মি‌লে শ্বশান ঘা‌টে গি‌য়ে দেখ‌লো কাব্য অঙ্গান হ‌য়ে প‌ড়ে অা‌ছে।

নুসরাত চিৎকার ক‌রে ভাইয়া ভাইয়া ব‌লে ডাক‌তে থাক‌লো। নুসরা‌তের চিৎকা‌রে কাব্য ঘুম ভে‌ঙে উঠ‌লো। বুঝ‌তে পার‌লো সে স্বপ্ন দেখ‌ছি‌লো এতক্ষন। নুসরাত কাব্য‌কে জানা‌লো গ্রাম থেকে কেয়ার‌টেকার অাস‌ছে তা‌দের নি‌তে, তাড়াতা‌ড়ি রে‌ডি হ‌য়ে নি‌তে ব‌লে। কাব্যের ম‌নে প‌ড়ে অাজ ও‌দের গ্রা‌মে যাবার কথা ছি‌লো তাই হয়ত রা‌তে এমন স্বপ্ন দেখ‌ছে। কাব্য রে‌ডি হ‌য়ে ড্রইং রু‌মে যেতেই অবাক হ‌য়ে গে‌লো। গ্রাম থে‌কে যে লোক‌টি অাস‌ছে তা‌দের নি‌তে সে অার কেউ নয়, এটা তার স্ব‌প্নে দেখা সেই লোক‌টি। কাব্য‌কে দে‌খে লোক‌টি রহস্যময় হা‌সি দি‌য়ে ব‌লে, ” ভয় পে‌য়ে‌ছেন না‌কি স্যার”।

” উইন্ড মিল”-নুরুন নাহার লিলিয়ান।

0

images-3

মানুষের ভাবনার সাথে বাস্তবতার অনেক দূরত্ব । বাস্তবতার কাছে বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস দুটোই সমান্তরাল । তবুও কখনও মানুষ তার ভাবনা দিয়ে বাস্তবতা কে অতিক্রম করতে পারে না ।প্রচণ্ড খুশি লাগছিল যখন বিজয় পি এইচ ডি শেষে বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলো ।

বিনীতা দেশের বাইরে পরবাসী জীবন পার করতে চায়নি । স্বামীর সাথে আমেরিকায় সুখ বিলাসে জীবন কাটলেও মনের ঘাটতি থেকেই যেতো । বিজয় বাংলাদেশে ফিরেই বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারে বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করলো । গবেষণাগারের ভিতরের আবাসিক এলাকায় বড় ফ্ল্যাট । দুজন মানুষের জন্য এই পাঁচ রুমের ফ্ল্যাটটা একটু বড় । প্রতিটা ফ্ল্যাটে কাজের মানুষের জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা আছে ।

নতুন জায়গায় বিনীতার ও একটু একটু করে ভাল লাগা শুরু হয় । প্রতিটা মেয়েরই সংসার সাজানোর জন্য আলাদা স্বপ্ন থাকে । নিজের মতো করে বিনীতা নানা রকম ফুল গাছ দিয়ে বাসার চারপাশ সুন্দর করে তুলল । প্রায় একশ একর জায়গা জুড়ে চট্টগ্রাম গবেষণাগার । গবেষণার প্রয়োজনে বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে শুধু গাছ আর ক্ষেত । দেশে ফেরার পর গবেষণার কাজে বিজয় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে । প্রথম কয়মাস ঘর গুছানো আর সংসারের কাজ নিয়ে বিনীতার খুব ব্যস্ততায় কাটে ।

 

তারপর হঠাৎ কোন একদিন থেকে নিজের ভিতর গভীর একাকীত্ব অনুভব করতে শুরু করে । সাজানো সংসার আর চোখের সামনে নিজের ফুল বাগান অর্থহীন মনে হতে লাগলো । ধীরে ধীরে বিজয় যেন অচেনা অনুভূতিহীন মানুষে পরিণত হল । প্রচণ্ড ব্যস্ততায় বিজয় আর বিনীতার মধ্যে গভীর দূরত্ব তৈরি হল । দূরত্বটা ঠিক কোথায় বিনীতা কিছুতেই আবিষ্কার করতে পারেনা । তবে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ অপ্রয়োজনীয় মনে হতে লাগল । নিজের ভিতরের অচেনা অনুভুতি গুলোর ভাষা বিনীতার কাছে নেই । চারদিকের ভয়ংকর স্বার্থপরতায় বিনীতা সংকুচিত হয়ে যেতে লাগল । প্রতিটা সকাল যেন প্রতারনায় ভরা । প্রতিটা রাত যেন স্বপ্নহীন । বিজয়কে খুব কাছে পেয়ে ও বিনীতা নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না ।

অদ্ভুত অচেনা দ্বন্দ্ব নিজের বর্তমান অনুভুতি গুলোর গলা টিপে ধরে । সম্পর্ক আর স্বপ্ন ভাঙার ভয়ে নিজের মনটা নিজের কাছেই বন্দী রাখে খুব গোপনে । কোথাও কিছু ভুল নিজের জীবন ঘিরে । বিকেলের কিছু সময় বিনীতা নিজের থেকেই বিনয়ের কাছে ল্যাব এ চলে আসে । আবাসিক এলাকা থেকে সংরক্ষিত এলাকা দিয়ে ল্যাব এর দূরত্ব কম । অনেকটা পথ গভীর অরণ্য । সেই গা ছিম ছিম অরণ্য পথে একটা উইন্ড মিল আছে । সেটার কাছাকাছি এলেই হঠাৎ উইন্ড মিলের পাখা গুলো ঘুরতে থাকে । তখন কেন জানি বিনীতার গা বিনা কারনেই হীম শীতল হয়ে উঠে । মার্চের গরমেও হাড় ধরা কাঁপুনি । সব সময় মনে হয় কেউ যেন আছে সাথে । কেউ কিছু দেখছে । পেছনের বারান্দার সাথে কাজের মানুষের জন্য যে রুমটা প্রতি রাতেই বিনীতা বন্ধ করে রাখে ।

সকাল হলেই যেন খোলা । পুরো ফ্ল্যাটের প্রতিটা রুম যেন নিস্তব্ধতার শব্দ করে উঠে । একদিন একা বাসায় বিনীতা চিৎকার করে উঠে । গভীর আর্তনাদে ফেটে পড়ে । ঘুমের ঘোরে কেউ যেন বলে যায় । এই পৃথিবীরে মাঝে অন্য পৃথিবী আছে । সেই পৃথিবীর সবাই সব গোপন রহস্য ধারণ করে । প্রাপ্যর প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করে না । ধৈর্যশীলরা চিরকাল বেঁচে থাকে ।কোন প্রতারণাই গোপন নয় ।প্রকৃতির নিয়মে সব প্রাপ্তি ফিরে আসে । কখন দিন শেষে রাত হয়ে গেছে টের পায়নি । বিনয়ের ডাকে বিনীতার ঘুম ভাঙে ।

নিজের ভিতরের সেই অনুভুতি গুলো আর নেই । বিনয় যেন এই কয়দিনে অনেক বেশি যত্নবান আর দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে । এক সপ্তাহ পর বিনয় একটি ফেসবুকে মেসেজে বিনীতাকে জানায় । যতোটা ব্যস্ততা সে দেখিয়েছে ততোটা ব্যস্ত ছিলনা ।আসলে সে অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে ছিল মনের অজান্তে । সে মনই তাকে থামিয়ে দিয়েছে । কোন কিছুই বিবেকের কাছে লুকানোর নেই । মানুষের জীবন বিচিত্র । মন তার চেয়েও বেশি রহস্যময় ।

“ঘড়া”২-মারিয়েন ফয়সল।

0

images-2

 

নিচে নেমেই দোউখানু অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।খুব ভোরে দোউখানুকে সব বুঝিয়ে দেব, তবে কাজটা করতে হবে রাঁধুনী মেয়ে এলোকেশী মতিবিবি আসার আগেই।

ছেলের ‘আম্মু’ বলে ডাক শুনে দৌড়ে ওর কাছে গেলাম ।ভেবেছিলাম ও বোধহয় দোউখানুকে দেখে ফেলেছে। না, এই মাঝ রাতেও ও কাজ করছে। ফিরতি পথে আবারও ‘আম্মু’… ।
-‘তুমি কি আমাকে ডাকলে…’
-‘না’
-‘ও সন্দেশ আম্মু।’ দোউখানুর উপস্থিতি অনুভব করে রাগে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে আমার!
-‘দোউখানু, তোমাকে কে বলল যে আমার নাম ‘সন্দেশ, আর আমাকে ‘আম্মু’ বলে ডাকছো কেন?’
-‘আমি তো আপনার নাম জানি না, আপনি সন্দেশজাদীর মত দেখতে বলে ‘সন্দেশ আম্মু’ বলেছি। ‘
-‘কিন্তু আম্মু কেন?’
-আমি ভেবেছি এখনকার মানুষেরা আম্মাকে ‘আম্মু’ বলে । কিন্তু আমি যে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, কোথায় বসব একটু বলে দেবেন?’ রান্নাঘরে এক কোণে একটা টুলের উপর দোউখানুকে বসতে বলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম, এত বড় একটা ঘটনা,অথচ আমি কাউকে বলতে পারছি না… । ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুমাতে গেলাম।
ঘুমাতে পারছি না।ভয়,কখন আবার মতিবিবি চলে আসে!
ঘন্টা খানেক পর উদ্বেগ সামলাতে না পেরে আমি রান্নাঘরে উপস্থিত। কিচ্ছুক্ষণের জন্য আমি স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম; আমার রান্নাঘরটা যেন বিদেশী হোম ইন্টেরিওর ম্যাগাজিনের কিচেন সেক্শনের ফ্রন্ট পেজ , একটু দূরে দোউখানু রুপালি রঙের একটা কড়াই হাতে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
-‘আমি বুঝতে পারিনি যে কালো রঙটাই এই সব বাসনের বিশেষত্ব… ।’ দোউখানুর সলজ্জ স্বীকারোক্তি।
-‘ঠিক আছে। সবগুলোই কি..…!’
-না,না,শুধু এটাই… ।’
-‘বাসনটা আমাকে দিয়ে দাও। মতিবিবি আসার আগেই লুকিয়ে ফেলতে হবে। ঠিক আটটার দিকে সদর দরজার কলিং বেলে চাপ দিয়ে দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকবে, আমি দরজা খুলে দেব, তারপর তুমি কাজে জয়েন করবে।’
মাথা নাড়ালো দোউখানু।
-‘আর একটা প্রশ্ন সন্দেশ আম্মা,মতিবিবিকে কি ‘মতি আম্মু’ বলে ডাকব?’
-ডেকে দেখতে পার, কিন্তু তারপরের পরিণতি সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে পারি না আর আমাকে সন্দেশ আম্মা বলে ডাকবে না সবার সামনে।নিজে থেকেই জেনে নিতে হবে কি বলে ডাকতে হবে।’

হাতে এখনও তিন ঘন্টার মত সময় আছে, আগামী পরিকল্পনাগুলো মনে মনে গুছিয়ে নেবার জন্য নিজের ঘরে ফিরে গেলাম।সকাল আটটার মধ্যে সবার প্রশ্নের উত্তর তৈরী করে রাখতে হবে । সময় মত পাকড়াশের আগমন এবং রীতিমত দাম দস্তুর করে ওকে চাকুরীতে বহাল করলাম । মতিবিবিকে ডিপার্টমেন্টাল হেড বানিয়ে পাকড়াশকে এ্যাসিস্টান্ট বানালাম, যদিও পাকড়াশ এতে একটু মনক্ষুণ্ণ হল। মতিবিবিকে খুশী রাখতেই এই কাজটা করতে হল। সহকর্মী করলেই ভালো হত কিন্তু তাহলে মতিবিবির মুখের ধার সামলানো বেশ কষ্টকর হয়ে যেত । বাড়ী সদস্যদের প্রশ্নবোধক দৃষ্টি দেখেও না.দেখার ভান করে আমার ঘরে গিয়ে ঢুকলাম, আসলে পালিয়ে এলাম ।পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি মাত্র, দোরগোড়ায় ছল ছল চোখের মতিবিবিকে দেখে, পরিকল্পনার আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে প্রশ্ন উত্তর পর্বের জন্য তৈরী হতে হল।
-‘মিডাম,আমার কোমরের ব্যাথা শুনে এক রাতের মইধ্যে এত কাজ কইরে ফেইললেন! বইয়ের ছবির মত লাইগছে! মানুষের জইন্য আপনার অনেক মহব্বত!’
আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম আমি। চোখ প্রায় জলে ভরে উঠেছে। অন্তত শশুরবাড়ীর দেশের লোক তো আমাকে ভালো বলেছে! ‘মহব্বত’ শব্দটা আমার কানে ঘুরে ফিরে রিনিঝিনি সুরে বেজে চলেছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে মতিবিবি আবারও বলল, ‘বৃদ্ধ বয়সে এত কাজ করা ঠিক নয় মিডাম। এমনিতেই আপনার হার্ট দুর্বল তার উপর এত কাজ কইরে যদি এপার ওপার কিছু হয়ে যেত!’ এই প্রথম জানলাম যে আমি হার্টের রোগী।
দোউখানুর ‘সন্দেশ আম্মু’ সম্মোধনটা মিঠে লাগছে এখন! আংগুলে বিপি মেশিনটা লাগিয়ে ফেলেছি। মনে মনে বললাম ,’তাহলে তো তোমার পোয়া বারো হত!’
-‘মতিবিবি, তুমি আমার থেকে কত ছোট?’
-‘ঠিক কইরে বইলতে পারব না, তবে বছর বিশেকের ছোট তো হবই দুই এক বছর বেশিও হতে পারে । আপনি শারের (স্যার) কথাটা একটুকুও ভাবলেন না! বুড়ো মানুষটাকে কে দেখা শোনা করতো তখন!’ বলা বাহুল্য, মতিবিবির বয়স পঞ্চাশের কোঠা পেরিয়েছে। আমার শাশুড়ীর আমলের লোক, বয়সের আন্দাজ খুব সহজেই করা যায়। তবে মতিবিবি এককালে রূপবতী ছিল এ কথা ঠিক। ওই রূপের বেশ কিছু অংশ এখনও অবশিষ্ঠ আছে।
অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে বললাম, ‘আমার এপার ওপার কিছু হয়ে গেলে তুমি না হয় দেখা শোনা করবে।’
মনে মনে ভাবছি,’মতিবিবি, বুড়ো মানুষটার ফৌজি হাতের একটা চড় খেলে কমপক্ষে একপাটি দাঁত তোমার খুলে পড়ে যাবে, এমনিতেই তোমার উপরের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই; আর তুমি যতই রূপবতী হও না কেন হাঁসলে তোমাকে ঠিক শাকচুন্নির মত মনে হয়। দোউখানুও তোমাকে হাঁসতে দেখলে নিঃসন্দেহে ভয় পাবে।
-‘না মিডাম, তা কি করে হয়।মানুষে মন্দ কথা বলবে, আমি যদি আপনার মত বুড়ো হতাম তাহলে না হয় একটা কথা ছিল! ও কাজ না হয় ফজলু করবে, আমি এদিকটা সামাল দেব।’
আমার মৃত্যুর পর সংসারটা ভালো ভাবেই চলবে ভেবে আমি বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলাম কিন্তু রহিমা, ফজলু আর আজিজ-এদেরকে কি ভাবে সামাল দেব!

রহস্য গল্প : ‘মেঘ ভাসে নীল আকাশে “

0

images-2

গত তিন দিন একটানা তুষাড়পাত। পুরো সাপ্পোরো শহর ভারী তুষাড়শুভ্র হয়ে উঠেছে। সকাল থেকে গুড়িগুড়ি বৃষ্টিজল রাস্তার ছোট ছোট বরফ স্তুপ গুলোকে কেমন করে ভাঙতে শুরু করেছে। তিন দিন ধরেই সোনালী ঘরে অদ্ভুতুড়ে জীবন পার করছে। জাপানের আকাশে বাংলাদেশের মতো রিমঝিম বৃষ্টি নেই। এখানকার বৃষ্টির আলাদা ভাষা। সোনালীর বর চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। পদার্থ বিজ্ঞানে সে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করলেও ব্যক্তি মানুষ হিসেবে ভীষন অপদার্থ প্রকৃতির। সেচ্ছাচারিতা আর স্বার্থপরতা যেন ভদ্রলোকের সাধারন স্বভাব । বিয়ের পর পরই সোনালী কে নিজের চেনা জগৎ ছেড়ে বরের সাথে এই বিচ্ছিন্ন হোক্কাইডো দ্বীপে চলে আসতে হয়েছিল। বরের উপর নির্ভরশীল জীবন নিজের চিন্তাজগত কে অসহায় করে তুলেছে।

নিজের বারান্দা থেকে দেখা রাস্তার গলে যাওয়া তুষাড় গুলো মন টাকে সিক্ত করে তুললো। গল্প টা ঠিক এমন হওয়ার কথা ছিল না। সোনালীর প্রতিটি অনুভুতির মুল্য দিবে। মাস শুরুতেই হাত খরচ দিবে। সোনালীর উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করবে। মিথ্যা সীমাহীন অজস্র প্রতিশ্রুতির দৃশ্যগুলো সোনালী কে আঘাত করতে লাগলো। নিজের ভিতরের স্বপ্ন গুলো অসহায় হয়ে উঠলো। সারাদিনের দুঃখ শোনার ও কেউ নেই। নিঃসঙগতা যেন গলা চিপে ধরছে। এমন সময় মোবাইলে রিং বেজে উঠলো। জাপানি বান্ধবী আরিসার নাম ভাসছে। আরিসা ভাল ইংরেজী পারে। তিন বার সোনার মেডেল পেয়েছে আর্চারি প্রতিযোগিতায়।

সোনালীর একা একা দিন গুলোতে আরিসা যেন এক চিলতে সুখ। আরিসা হলো সোনালীদের জাপানি বাড়িওয়ালার ভাইয়ের মেয়ে। ভিন দেশী দেখলে জাপানিরা খুব আন্তরিকতা নিয়ে সাহায্য করে। আরিসা অবসরে ফোন করে জানালো মারুয়ামা পাহাড়ের যে ক্যাফেতে পার্ট টাইম কাজ করে সেখানে আজকে জাপানি ট্রাডিশনাল অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু সেখানে একা যেতে পারেনা। রাস্তা আর সাবওয়ে ঠিক ভাবে চিনে না। সব সময় সে আরিসার সাথে গিয়েছে। আজকে আরিসা খুব ব্যস্ত ।আজকে ক্যাফেতে গান গাইতে হবে। জাপানি মিউজিক ইন্সট্রুমেনট সুর তুলতে হবে। সোনালী কে সে গুগল ম্যাপ থেকে লোকেশন দিয়ে ঠিকানা ফেসবুকে দিল। বিকেলের দিকে একটু তুষাড়পাত কমলো। প্রায় আধা ঘণ্টার রাস্তা যেন দশ মিনিটে এল। সাবওয়ে থেকে নেমে গেট দিয়ে বের হয়ে যেন অন্য পৃথিবী দেখলো।

হয়তো কোন মেলা হচেছে। বুকের ভিতরটা নড়ে উঠলো। চারপাশের মানুষ গুলোর চেহারা ঠিক জাপানিদের মতো নয়। সে কি কোন ভুল করেছে? অন্যকোন জায়গায় চলে এসেছে? অনেক ভাবনা মনের ভিতর ঘুরপাক করছিল। এমন সময় আরিসা এলো। দুজনে ক্যাফেতে ঢুকার পর আরিসা জানাল তাকে গানের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তাই ক্যাফের ভিতরে গেল।সেদিনের সব অনুষ্ঠান সোনালী দেখল। ক্যাফের নাম “মেঘ ভাসে নীল আকাশে “। এই ক্যাফে সব ক্যাফের মতো সাধারন নয়। এখানে অনেক গানের শিল্পীরা আসে তাদের গান পরিবেশন করতে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। আরিসা ভিতর থেকে আর বের হলো না।

সোনালী কে বাসায় ফিরতে হবে। পরিচিত ম্যানেজার কে আরিসার কথা জিজ্ঞেস করাতেই সে কপাল কুচকালো। আরিসা! সে তো দুই মাস হলো কিউশু দ্বীপে দাদীর কাছে যাওয়ার পর প্রিয় দাদীর ক্যানসারে মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। সোনালীর বুকের ভিতরটা আতংকে মোচর দিয়ে উঠলো। মাথাটা চক্কর দিল। তবে আজকে সারাদিন যা কিছু ঘটেছে সব কি মিথ্যা? আরিসা নেই সে জানতো না। তবে কে যোগাযোগ করলো। মোবাইলে কল চেক করে দেখলো আরিসা কোন ফোন নেই। ভয়ে সোনালীর হাত পা কাপতে লাগলো। খুব দ্রুত সে বাসায় ফিরে এলো।

গভীর বন্ধুত্ব হয়তো মানুষের অনুভুতিতে মিশে থাকে। জীবনের হিসাব বরাবর ব্যাখাহীন। নিজের চারপাশে ঘটনাগুলো বিশ্বাস না হলেও আরিসার জন্য খারাপ লাগতে শুরু করলো।

“ঘড়া” পর্ব ১- মারিয়েন ফয়সাল

0

 

images
প্রায় সপ্তাহ দুই আগে আমার আদি বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়ীটা প্রায় ৩০ বছরের উপর পরিত্যাক্ত অবস্থায় আছে। একজন বৃদ্ধ কেয়ার টেকার আছেন ঠিকই, কিন্তু কিছু কিছু ঘর প্রায় একশ বছরের উপর বন্ধ অবস্থায় ছিল। বাড়িটা প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো বলে জানি। কি ধরনের মেরামত করলে বাড়িটাকে আরও কিছু বছর টিকিয়ে রাখা যায় সেটা দেখার জন্যই ওখানে গিয়েছিলাম । বন্ধ ঘরগুলো খোলার প্রয়োজন হয়েছিল সেই কারণেই।
ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ঘরটা যখন খুললাম, ঘরের এক কোণে, একটা সিন্দুক পেলাম।
আমার দেখা সিন্দুক্গুলো থেকে একেবারেই ভিন্ন ধরনের । সিন্দুকটা বেশ পুরোনো আর প্রয়োজনের তুলনায় অরিরিক্ত মজবুত। অবশ্য এটাও ঠিক যে সিন্দুক কতটুকু মজবুত হবে তার কোনো মাপকাঠি নেই। বিশ্বস্ত কিছু লোক নিয়ে সিন্দুকটা ভেঙ্গে ফেললাম। দেখলাম, মাত্র একটা ঘড়া রয়েছে সিন্দুকটার ভিতর। বৃদ্ধ কেয়ার টেকার ওটাতে হাত দিতে মানা করেছিল।
বলেছিল,-‘ ছোট আম্মা, ওটা যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিন । আপনার নানীজানের মুখে এই সিন্দুক সম্পর্কে খুব একটা ভালো কথা শুনি নাই। দরকার নেই এই ঘর মেরামত করার। আপনি ঘড়াটা সিন্দুকেই থাকতে দিন, আর সিন্দুকটা আবার লোহার পাত দিয়ে আটকে দেই, তারপর দরজায় আবার আগের মত তালা লাগিয়ে দেই।’
আমি শুনিনি বৃদ্ধের কথা। বলেছিলাম, ‘এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই, আর আমি নিজেই এখন নানীজান।’
যাইহোক, বাড়ি মেরামতের জন্য লোক লাগিয়ে যথারীতি ঢাকায় ফিরে এসেছি। )

নিজের বাড়িতে ফিরে ঘড়াটা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়লাম, সবার অগোচরে কি করে লুকিয়ে রাখব, কোথায় রাখব ভেবে পাচ্ছিলাম না; অবশেষে চিলেকোঠাটাকেই বেশ নিরাপদ মনে হল। চিলেকোঠার চাবি আমার কাছেই থাকে, সুতরাং ভয়ের কিছু নেই।
ঘড়াটাতে কি আছে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছিল, অবশেষে গত বুধবার রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, আমি ঘড়ার শীল গালা ভেঙ্গে ফেললাম আর তখন থেকেই ঘটনার শুরু।

ঢাকনাটা খুলতেই কালচে নীল একটা ধোঁয়া কুণ্ডুলী পাকিয়ে উপরে দিকে উঠতে শুরু করেছে। অসম্ভব ভয় লাগছে আমার। বাড়ির বাকি সদস্যদের সঙ্গী করার উপায় নেই! ঘড়াটা যদি সোলেমানী ঘড়া হয় তাহলে আমি সবার জন্য বিরাট বিপদ ডেকে এনেছি! নাহ! তা কি করে হয়! ঘড়াটার বয়স যত দূর বুঝতে পারছি, দুইশত বছরের বেশি হবে না।
নিজের চিন্তায় মশগুল ছিলাম । অন্য কারো উপস্থিতি অনুভব করতেই চমকে ঘুরে তাকালাম। এ বাবা! এটা আবার কে? বছর তিরিশেকের বেশি হবে না লোকটার বয়স।গিলে করা ফিনফিনে পান্জাবী, চুড়িদার আর পায়ে নাগড়াই। মাথাভর্তি একঝাকড়া চুল আর মুখে চাপ কালো দাড়ি।
চিলেকোঠায় তো অন্য কারো থাকার কথা নয়, দরজার চাবি তো আমার কাছেই থাকে!
ভয়ে বেশ দিশেহারা হয়ে পড়েছি! হাতের কাছে একটা পাইপ পেয়ে ওটা হাতে নিয়েই মরিয়া হয়ে মারমুখী হয়ে দাঁড়িয়েছি! ‘আসসালামু আলাইকুম, শাহজাদী বিলকিস বেগম! আপনি এরকম পোশাক পরে আছেন কেন? এরকম বেআব্রু হয়ে আপনি যত্র তত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন এটা ঠিক নয় । আপনি আপনার ভ্রমর কালো চুলের একি দশা করেছেন!’
ততক্ষণে আমার রাগ ব্রম্ক্ষতালু ছুঁয়েছে।
বললাম, ‘সংযত হয়ে কথা বলুন, আমি বিলকিস বেগম নই।’
-‘তাহলে আপনি কে?’
-আমি কে তা আপনার না জানলেও চলবে , এই চিলেকোঠায় আপনি কিভাবে এলেন?’
লোকটাকে বেশ হতচকিত দেখাচ্ছে।
-‘আমি ওই ঘড়াটার মধ্যে বন্দী ছিলাম, আপনি ঘড়ার মুখটা খুলে দিলেন আর আমি বের হয়ে পড়লাম।’
ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি কি ভুলই না করেছি আমি।নিজে হাতে ‘জ্বীন্ִ’ ডেকে এনেছি। মনে মনে নিজেকে সাহস যোগাচ্ছি-সামাল দিতে হবে।
প্রশ্ন করলাম, ‘কে আপনাকে বন্দী করেছিল?’
-‘সন্দেশজাদী’
মনে পড়ল সন্দেশজাদী আমার পূর্বসুরীদের একজন ছিলেন, আর শাহজাদী বিলকিস বেগম তাঁর কনিষ্ঠা কন্যার নাম।
জ্বীন তাড়ানোর উপায় আমার জানা নেই কিন্তু একে তো তাড়াতে হবে। আল্লাহ ভরসা, কোনো না কোনো একটা উপায় বের হয়ে আসবেই। আপাতত কথা চালিয়ে যাই ওর সাথে। ভুলিয়ে ভালিয়ে যদি বিদায় করা যায়…
-‘আপনার চেহারার সাথে সন্দেশজাদীর চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছি । আপনি সন্দেশজাদী নন তো?’
বেশ ভীত শোনালো লোকটার গলা।
‘না আমি সন্দেশজাদী নই। আমি ওনার বংশধর। উনি প্রায় একশ আশি বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন।’
হতভম্ব দেখালো লোকটাকে।
আবারও প্রশ্ন করলাম,’ কে বন্দী করেছিল আপনাকে?’
-‘সন্দেশজাদী। শাহজাদী বিলকিস বেগম কোথায়? আর, আমি কত বছর বন্দী ছিলাম?’
-‘শাহজাদী অনেক আগেই মারা গিয়েছেন।’ .
ধেড়ে লোকটার ভেউ ভেউ কান্না শুরু হাওয়ায় অন্য প্রশ্নের সুযোগই পেলাম না। জ্বীনের চোখে জল; দেখার মত বিষয়!
কান্নার প্রকোপ একটু থামতেই আবার প্রশ্ন করতে শুরু করলাম।
-‘কেন বন্দী করা হয়েছিল আপনাকে?’
-‘বিলকিস বেগমের প্রতি আসক্ত হয়েছিলাম তাই! আমার ‘হতে পারত শাশুড়ী আম্মা’ বেশ রাগী ছিলেন।’
-‘খুলে বলুন।’
– ‘আমি পেশায় বাবুর্চি। কোহেকাফের প্রধান মন্ত্রির বাবুর্চি ছিলাম।একদিন রান্নায় স্বাদ বাড়ানোর জন্য লতা গুল্মর খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, হঠাৎ সন্দেশজাদীর বাগানের দিকে নজর পড়ে। বাগানে শাহজাদী বিলকিস বেগমকেও দেখি। আহা কি রূপ! যেন ঝিনুক খোলায় রামধনু রঙা মুক্তা… ভ্রমর কালো…’
-‘রূপের বর্ণণা এখন থাক। আসল কথায় চলে আসুন।’
সন্দেশজাদীর মত দেখতে হওয়ার কারণে লোকটা মনে হয় আমাকে একটু ভয় পাচ্ছে; আর আমি তো প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে কথা বলে চলেছি।
বলেই ফেলল, ‘আপনি আমাকে তুমি করেই বলেন, আপনি আমার মাতৃতুল্য।’
‘আপনার মাতৃতুল্য হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই, তবে আমি আপনাকে তুমি করেই বলব । এখন বল, তুমি শাহজাদী বিলকিসের সাথে কি করেছিলে? তোমার নামটা এখনও জানতে পারিনি।’
-‘আমার নাম ‘দোউখানু নিয়ামি পাকড়াশ’। বিলকিস বেগমের রূপে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই, আহা কি তার রূপ, কি তার গুন । আমি শুধু তার পাশে পাশে থাকতে চাইতাম। কোহেকাফে না ফিরে ওই বাড়িতেই রয়ে গেলাম । ছয় মাস চেষ্টার পর বিলকিস বেগমও আমার প্রতি আকৃষ্ট হন, আর এই ঘটনাতে আমার ‘হতে পারত শাশুড়ী আম্মা” রেগে গিয়ে আমাকে ঘড়া বন্দী করেন।’
বিলকিস বেগমকে নিয়ে বেশ গর্বিত বোধ করছি, বিলকিস বেগমের সাহসিকতায় আমি মুগ্ধ। মানুষ হয়ে জ্বীনের প্রেমাসক্ত! দোউখানু প্রতিও বেশ টান অনুভব করছি। হাজার হোক আমার পূর্ব পুরুষের প্রেমিক।
বললাম, ‘তুমি তো এখন মুক্ত, কোহেকাফে ফিরে যাও।’
বিব্রত দেখাচ্ছে দোউখানুকে।
-‘সন্দেশজাদী আম্মা, আমার যে কোহেকাফে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই! কোহেকাফে বেকার লোকদের কোনো জায়্গা নেই।তার উপর আমার প্রাক্তন প্রেমিকা ওখানে আছে। কে জানে আমাকে ঝাটা পেটা করবে কিনা! বেকারদের কোহেকাফ থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন ওর আপনাদের আশে পাশে এসে আস্তানা গাড়ে আর আপনাদেরকে ভয় দেখায়। বিশ্বাস করুন আমরা জ্বীনেরা সবাই খারাপ নই! ‘
খুবই ম্রিয়মান দেখালো দোউখানুকে। সন্দেশজাদী আম্মা বলে ডাকার জন্য ওর উপর রাগ করতেও ভুলে গেলাম।
-‘ও সন্দেশ আম্মা, আপনি আমাকে কয়েকদিন আপনার বাড়িতে থাকতে দিন, আমি খুব ভালো রাঁধতে পারি, আপনার রান্না আমি করে দেব। এর মধ্যে আমি কোহেকাফের সাথে কথা বলে একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করে ফেলবো আর আমার প্রাক্তন প্রেমিকাকেও বুঝিয়ে বলব।’
কি বলবে প্রাক্তনকে? ‘
-‘বলব, জ্বীন মাত্রই ভুল করে।’
মন্দ বলেনি পাকড়াশ! আজ কালের মধ্যে বাড়ীতে একটা বড় নৈশভোজের আয়োজন করতে হবে। বেশ চিন্তায় আছি আমি।মনে মনে বললাম, ‘বেটা বাবুর্চি! বিলকিস বেগমের সাথে প্রেম করতে গিয়েছিলি! বামুন হয়ে চাঁদে হাত! তোকে আমি বাবুর্চীর কাজই করাব!’
-‘ঠিক আছে তুমি বাবুর্চী পদে বহাল হলে, তবে মাত্র সাত দিনের জন্য। এই সাত দিনের মধ্যে দু’টো ছোট খাটো বিয়ে বাড়ি সমান নৈশভোজের আয়োজন সামাল দিতে হবে। আজ তুমি এই চিলেকোঠায় রয়ে যাও, কাল তোমার জয়েনিং। ওহো! তোমাকে আমি ‘পাকু মিয়া’ বলে ডাকব। খুব ভোরে নিচে আমার রান্নাঘরে এসো, আমি বুঝিয়ে বলব কিভাবে কাজ করতে হবে।’
দোউখানু চিঁ চিঁ গলায় বলে উঠল,-‘ও সন্দেশ মা,দয়া করুন, এই চিলেকোঠায় আমি একা থাকতে পারব না!’
অগত্যা দোউখানুকে সাথে নিয়েই নিচে নামতে হলো! (To be continued

রহস্য গল্প :ড.ভূইয়া

0

images

জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে উড এন্ড কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের পিএইচডির নতুন ছাত্র বাংলাদেশের এম. এন ভূইঁয়া।গত দুই বছর একই ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্স ও করেছে। মাস্টার্সে রেজাল্ট ভাল হওয়ায় মুনোগাকুবসু বৃত্তিটা আরো তিন বছরের জন্য বাড়ানো হলো।

দিন রাত পরিশ্রম করছে এম. এন ভূইঁয়া। তবুও কাংক্ষিত ফলাফলের ক্যামিক্যালটা খুজেঁ পাচেছ না। পিএইচডি তে ও ছয় মাস চলে গেছে। যে বিষয়টা নিয়ে এম.এন ভূইঁয়া কাজ করছে সেটা তার আগে আরো তিনজন কাজ করেছে।কিন্তু তারা অর্ধেক কাজ করে রেজাল্ট না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে চলে গেছে। বাংলাদেশের এম.এন ভূইঁয়া কে ব্যর্থ হলে চলবে না। জাপান সরকারের দামি বৃত্তি। নিরাপদ পরিবেশ এবং জীবনব্যবস্থা ।

গবেষনার জন্য এমন সূযোগ আর কোথায় পাবে। বাংলাদেশে সরকারী বৈজ্ঞানিক পদের চাকরির পদোন্নয়নে ভাল রেজাল্ট নিয়েই দেশে ফিরতে হবে। নিজের ভিতরে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তাকে পিএইচডি ডিগ্রী নিয়ে ড.ভূইঁয়া হতেই হবে।দিন রাত ভূতের মতো ল্যাবে কাজ করে। বাইরের সমাজ কিংবা পৃথিবীর কোন কিছুতে তার আগ্রহ নেই। কিছু দিন যাবৎ তার মন ভাল নেই।

খুব কাছের কেউ তার বিশ্বাসের জগৎ ধোয়াটে করেছে। দুই সপ্তাহ ধরে মধ্য রাত অবধি ল্যাবে মেশিনের সামনে বসে থাকে। টনে টনে পানি তাকে বাষ্পীয়ভাবে উড়াতে হয়।সেই পানির মধ্যেই আছে হয়তো তার আকাংক্ষিত ক্যামিক্যাল। পানি বাষ্প করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন ফেসবুকটাই আপন হয়ে ধরা দেয়।

কিংবা জাপানি সংস্কৃতি অনুষ্ঠান উপভোগ করে। প্রতি মঙ্গলবার বিশ্ব বিদ্যালয়ের করিডোরে বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইকেবানা দেখানোর আয়োজন হয়। প্রফেসরদের স্ত্রীরা সেচ্ছাসেবী হিসেবে বিনামূল্যে ফুল সাজানো শেখায়। জাপানে ফুল সাজানোর শিল্পকেই ইকেবানা বলে। ছাত্রছাত্রীদের শেখানোর পর কিছু ফুল দিয়ে বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গা সাজিয়ে রাখা হয়।

নিজের রুমের কাছেই সুন্দর একটা ইকেবানা। ভেঙেগ যাওয়া ধুসর মনটাকে সবুজ আর লালে রঙিন করে দিল। কাঁচা ফুল গুলো থেকে অদ্ভূত ঘ্রান। সেদিন মধ্যরাতে নিজের অফিস রুম থেকে ল্যাবের দিকে যাচিছল। হঠাৎ মনে হল সাদা এপ্রোন পড়া কোন জাপানি মেয়ে মাথা নিচু করে ভূঁইয়ার পিছনে পিছনে হাটছে। কয়েক মিনিট নিজের মনে ল্যাবের দিকেই হাটছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হল কেউ নেই। আশে পাশে ঢোকার মতো কোন রুম নেই। সাদা এপ্রোন পড়া মেয়েটি তাহলে কোথায় গেল।বিজ্ঞানী বলে কথা। বিজ্ঞান চিন্তা মাথায় নিয়ে তো ভূতের কথা ভাবা যায় না।

সেদিনের পর থেকে ল্যাবের সুনসান নিরবতার মাঝে ও কোন এক সুঘ্রাণ বহন করা অস্তিত্বের টের পায়। পানি বাষ্প করার মেশিনটা হঠাৎ করে কেপে উঠে। সামনে নানা রকম ক্যামিক্যাল রাখার কাঁচের ছোট ছোট ক্লনিকেল ফ্লাস্ক গুলো হালকা কাপতেঁ থাকে। এম. এন ভূইয়া মনেকরে মৃদু ভূমিকম্পে জাপান দেশটা বুঝি কাঁপছে। গভীর রাতের ঘুমে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ঠিক সে সময় দুই ফুট উচ্চতার প্রায় অষ্টাদশী কোন মেয়ে যেন তার সামনের ডেস্কে বসে পা দুলাচ্ছে। তার দুই হাতে ছোট ছোট দুটো ক্লনিকেল ফ্লাস্ক। একটিতে গাড়ো সবুজ রংয়ের ক্যামিক্যাল আর অন্যটিতে মেরুন রংয়ের।

তারপর কাছে এসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নাকি সুরে বলে,”ভূঁইয়া ও ভূইঁয়া ঘুমিয়ে গেছো! কি ক্লান্ত! রিসার্চ নিয়ে চিন্তা হচ্ছে! সব ঠিক হয়ে যাবে। যেকোন কষ্টের ফলাফল আছে। এই নাও ফ্লাস্ক দুটো রাখোতো। ”
এমন করে প্রায় প্রতি গভীর রাতে ল্যাবে সেই প্রিয়দর্শিনীর সাথে কথা হয়। সারাদিনের চেনা জীবন থেকে এম.এন ভূঁইয়া অন্যকোন জগতে চলে যায়। আলো আধারির সেই প্রিয়দর্শিনীর সাথে জীবনের অনুক্ত দু:খ সুখ গুলো এম.এন ভূঁইয়া কোন দ্বন্দ্ব ছাড়াই প্রকাশ করতে পারে। চেনা প্রিয় মানুষরাও মাঝে মাঝে ঈর্ষা কাতর হয়ে মনের অজান্তে ব্যথা দেয়। কিন্তু অদৃশ্য অস্তিত্বরা তা করে না ।

কারন মানব মনের মতো কোন স্বার্থপর মন তাদের থাকে না। এই চেনা পৃথিবীর থেকে অচেনা এক জগৎ নিয়ে এম.এন ভূইয়ার অদ্ভূত জীবনটা ভালই কাটছিল। একদিন ভোর রাতে ল্যাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।তখন রাত সাড়ে তিনটায় ঘুম ভেঙেগ যায়।তিন ঘনটা সময় পার্থক্য হওয়ায় বাংলাদেশে তখন রাত সাড়ে বারোটা। কি মনেকরে ফেসবুকে হোম পেজে ঢুকতেই দেখে সেই অদৃশ্য প্রিয়দর্শিনীর মতো কোন মানবী। ঘুম ঘোরে কিছুই বিশ্বাস হচেছে না। অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকার পরও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস হয়না।

তারপর থেকে এম.এন ভূঁইয়া সেই প্রিয়দর্শিনীর দেখা পায়না।জীবনে আসা সেই মানবীর মাঝেই যেন সেই অষ্টাদশী প্রিয়দর্শিনীর অদ্ভূত অবয়বের ছায়া। জীবনের অদ্ভূত খেলায় সব যেন নিজের নিয়মের মধ্যেই চলছে। তারপর একদিন অজস্র পানির বাষ্প কনা থেকে সেই ক্যামিক্যালটি পাওয়া গেল। দুর্ভেদ্য অসম্ভব সফলতা সহজ পথে হাটতে লাগলো। রহস্যময় বিজ্ঞানের ইতিহাসে নিজের নামটিও যুক্ত হলো।

তবুও কোথাও যেন জীবনের রহস্যভেদ হলো না। সাথে আসা সেই অজানা পারফিউমের সুঘ্রাণটা মস্তিষ্কের কোথাও একান্ত গভীরে জায়গা করে নিল। একদিন ফেসবুকের টাইম লাইনে ভাসা সেই মানবী ও জাপান সাগর অতিক্রম করে সহস্র মেঘ ছুয়েঁ ছুয়েঁ এম.এন ভূইয়ার জীবনে সত্যি হয়ে এলো।

জীবনের সব মেঘজাল কেটে গিয়ে সাফল্যের সূর্যের হাসি দেখা দিল। তবুও প্রাত্যহিক জীবনের নানা জটিলতা আর সুখ দু:খের মাঝে সেই নিরবে আসা অদৃশ্য প্রিয়দর্শিনীর আধারি অবয়ব ভেসে উঠে। কখনও পাশে থাকা মানবীর মাঝে আবার কখনও ক্লান্ত বিকেলের একান্ত নিঃসঙগ ভাবনায়।

রহস্য গল্প: “সানি সাইড হাউজ”

1

sunnyside farm house১৮ নাম্বার সাব ওয়ে স্টেশন পার হলেই মারুয়ামা পাহাড়ের দিকে মাটির নিচ দিয়ে সোজা একটা টানেল গিয়েছে। টানেলটা পার হলেই একটা টি রুম। সব সময় খোলা থাকে। আর খুব সুন্দর জাপানি ক্লাসিকেল মিউজিকের সুর ভেসে আসে। টি রুম টার কাছেই দুটো জাপানি ট্রাডিশনাল বাড়ি। লাল রংয়ের যে দুতলা বাড়িটি। সেটির নাম “সানিসাইড হাউজ”।এই বাড়িটির এমন সুন্দর নাম শুনেই নিশুতির খুব ভাল লেগে গেল।এইতো তিন মাস হয় হোক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে এসেছে।

হোক্কাইডো দ্বীপের সুপরিকল্পিত সাপ্পোরো শহরের সব কিছুতে তার মন ছুয়েঁ গেল। বাড়ির মালিকের নাম সাইতো। তার চার মেয়ে। দুই মেয়ে বিয়ে করেছে আর দুই মেয়ে চাকরি করছে। “সানিসাইড হাউজ”টি মেইন রোডের সাথে। আর সকালের সূর্যের আলোটা যেন তার হাউজেই প্রথম ধরা দেয়। তাছাড়া বাড়িটি সাধারন জাপানি বাড়ির মতো হলেও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অসাধারন। বাড়ির মালিক রিটায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ার। তাই প্রযুক্তি নিয়ে তার একটু বেশী জ্ঞান।তার বাড়ির দুতলায় উঠতেই একটা সেন্সর লাইট লাগানো আছে। উপরে কেউ উঠতে গেলে প্রথম সিড়িতে পাড়া দিতেই দেখা যাবে সেন্সর লাইট জলে উঠে। তাই সিকিউরিটি ভাল দেখে মনে মনে স্বস্তি খুঁজে পেল। এখানে বাংলা ভাষাভাষীর লোক সংখ্যা কম। বাঙালি কমিউনিটি যারা আছে তারা দূরে থাকে। তাছাড়া এইতো গত মাসে কমিউনিটির একটা প্রোগ্রাম হলো।

নিশুতির সাথে কয়েকজন বাঙালি ভাবির সাথে পরিচয় হলো। সবাইকে ভাল লাগলেও দু একজনের দৃষ্টি আর অতি কৌতুহলী আচরন যেন নিজের মন কে বিষিয়ে দিচিছল। মনে হচিছল এমন ভয়াবহ পরিচয়টা না হলেই ভাল হতো। বিষাক্ত সঙ্গীর থেকে নিসঙগতা অনেক নিরাপদ। কেন একা একা বিদেশে পড়তে আসছে? বিয়ে কেন করেনি? তার কোন এ্যাফেয়ার আছে কিনা? এই জাতীয় প্রশ্ন গুলো করে তার জীবনের কোন সমাধান খুজেঁ দিবে না। বরং তাকে অপ্রস্তুত করে বিকৃত মজা নেওয়াই আনন্দ। যাইহোক নিজেকে প্রশ্নের থেকে দূরে রাখতেই সে নিজস্ব কমিউনিটি এড়িয়ে থাকে। বাঙালি কমিউনিটির চোখের সামনে যাওয়া মানে নিজেকে আলোচনার কোন ইস্যুতে পরিনত করা। তার চেয়ে সারা দিন ল্যাব করার পর সানিসাইড হাউজের করিডোরে দাড়িয়ে নিঃসঙগতায় ডুবে থাকাও আনন্দের ।

নিশুতির রুম থেকে চারটা রুম পরে একটা রুম। সে রুমটায় তালা লক করা ছিল ।প্রথমে মাসের শেষের দিকের ঘটনা। ঠিক এমন মার্চের বরফাচ্ছন্ন শহরের নিসঙগতা দেখতে দেখতে নিজের রুমের সামনের করিডোরে চা খাচিছলো। একটি অত্যন্ত সুন্দরি জাপানি মেয়ে সে রুম থেকে হাসি মুখে বের হয়ে এলো। নিশুতি তাকে নিজের রুমে নিয়ে আসে। সে টুকটাক বাংলা পারে। নিশুতিও অনেকটা জাপানিজ শিখে গিয়েছে। ভালই দিন কেটে যাচিছল। হঠাৎ একদিন স্বপ্ন দেখে ঐ মেয়েটির রুমে আগুন লেগেছে।

কিন্তু সে নিজের রুম খুলে যেতে পারছে না। রাতে বেলা মারাত্মক ভয় পেয়েছিল। মেয়েটিকে রাতের স্বপ্নের গল্প টা বলার জন্য অপেক্ষা করছিল। পরের দিন থেকে সে মেয়েটিকে সে দেখতে পায় না। তার রুমের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আরো দুই মাস কেটে যায়। কোন এক ছুটির দিন দেখে বাড়িওয়ালা একজন কে দেখানোর জন্য রুমটা খুলছে। নিশুতি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,সে মেয়েটি কোথায়? যে নিয়মিতভাবে তার সাথে চা খেতো। বাড়িওয়ালা অবাক হয়ে বলল, তোমার তো তাকে দেখার কথা নয়।

আয়কা নামের সে মেয়েটি তুমি আসার আগেই আগুনে পুড়ে এ রুমে আত্মহনন করে ছিল।সে আর স্বপ্নেরর কথাটা বলতে পারলো না। বুকের ভিতরটা কেমন দুক করে উঠলো। আয়কার স্মৃতি গুলো যেন জীবন্ত হয়ে ছায়ার মতো হাটতে লাগলো। এক টা তীব্র অশান্তি মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। মনেহয় সেন্সর লাইট টা বুঝি জলে উঠলো। কেউ বুঝি কলিংবেল বাজালো। জীবন যেন বাস্তবতা আর কল্পনা কে এক করে চলতে লাগলো।

তারপর একদিন এই “সানিসাইড হাউজ ” ত্যাগ করে বিশ্ব বিদ্যালয়ের ডরমিটরি তে উঠলো। পেছনে সানিসাইড হাউজের দিকে তাকালো না। আর মনে মনে ভাবলো যে কোন বাড়িতে প্রথম সূর্যের আলোর সরাসরি অনুপ্রবেশ কল্পনাকে ঠিক উজ্জীবিত করে। কিন্তু কিছু অন্ধকার ও লুকিয়ে থাকে যা সূর্যের আলোতেও ধরা পড়ে না।