ডাকিণী (৮ম পর্ব)

2

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি শেষ করে বিড়বিড় করে বললাম, হায় আলেস। এসব বিচারের নামে প্রহসন তোমার জন্মের আগেও মানব সমাজে ছিলো, তোমার মৃত্যুর পরে এখনো টিকে আছে। তোমার আগে সক্রেটিস, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস প্রমুখ এর শিকার হয়েছেন। তোমার পরে, আমেরিকার লুথার কিং, ইতালির মোসলিনী, মার্কো, প্রমুখ। এমনকি এই কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের নামে প্রহসন হয়ে গেছে। মানব সমাজে কোন কালেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, আর কখনো হবেও না। তাই বলে তুমি মরে গিয়েও এই কর্টেজকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে? পরপারে তোমার জন্যে নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। হয়তো ওখানে মার্টিনী তোমার পথ চেয়ে আছে। তুমি যাচ্ছ না কেন? লাইব্রেরীর এক কোন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। দরজায় লেখা ভাসলো, “মুক্তি দাও আমায়।” এবার আমি গলা চড়িয়ে বললাম, কিন্তু কিসের মুক্তি? কার থেকে মুক্তি? প্রত্যুত্তরে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন লেখা বেরুলো।
আলেসের লেখায়,
“বাহ। আজ সকাল হতে না হতেই এক প্রহরী এসে আমায় কতগুলি ফল, পানি, আর রুটি দিলো। প্রথমে এদের এই আকর্ষিক মহানুভবতার কারণ বুঝতে না পারলেও এখন ভালই বুঝতে পারছি। চারদিন পর যখন আমার লাশটা শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হবে তখন সে জীর্ণশীর্ণ দেহ থেকে যথেষ্ট যৌন সুখ নাও পেতে পারে। তাই এই চারদিন আমাকে খাইয়ে দাইয়ে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। আমি গতরাতে আমার ডাকিণী হওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছি। আমার ডাকিণী হওয়ার আসল কারণ হল আমার বাবার ফেলে যাওয়া পারিবারিক সরাইখানাটি। আমাদের সরাইখানাটি শহরের প্রায় তোরণদ্বারে অবস্থিত। শহর থেকে যারাই বেরুয় বা যারাই শহরে নতুন আসে তারা সবাই এই সরাইখানায় রাত কাটাতো। ফলে আমাদের প্রচুর মুনাফা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ওটা আমার মালিকানাধীন ছিলো। এমতাবস্থায় যেহেতু আমার কোন সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিলো নাহ তাই আমি মারা গেলে সরাইখানাটি পরিতাজ্য সম্পত্তি হিসাবে গির্জার অধীনে চলে যাবে। গির্জার প্রিস্ট ও সেবকদের জন্যে অতিরিক্ত আয়ের উৎস খুলবে। তাই শুধু এই সরাইখানাটির মালিকানার জন্যেই আমি আজ এক ভয়ঙ্কর ডাকিণীতে পরিণত হয়েছি। এসব বিচার, ডাকিণী অপবাদ, কেবল লোক দেখানোর নাটক বৈকি আর কিছু নয়। সবই স্পষ্টত ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমি এতে এতটাই জড়িয়ে গেছি যে মৃত্যুর পরেও আমি এ থেকে বেরুতে পারব নাহ। রবিবার প্রার্থনার পর ফাঁসির দড়ি আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে আসবে নাহ। আসবে আমাকে এখানে চিরতরে বেধে রাখতে। চারিদিকে কেবলি অন্ধকার। আমি একা একা এর মধ্যে কেবলই তলিয়ে যাচ্ছি, আরো গহীনে। কপালে দাসত্বের চিহ্ন নিয়ে। ”
পরের পাতায়,
” আজ দুপুরে ওরা আমায় সেই পুকুরে নিয়ে গেছিলো গোছল করাতে। কাল যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। তাই আজ শরীরটাকে একটু ঘসা মাজা করে একে প্রিস্টের যৌন শুদ্ধিকরণের জন্যে তৈরি করে নিতে হবে তো। আমি গোসল করতেই চাইছিলাম নাহ। কিন্তু আমাকে গোসল করানোর জন্যে দুজন বিশালদেহী মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। ওদের সাথে জোরাজোরি করার শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট নেই। তাই বাধ্য হয়েই সুবোধ মেয়ের মতো গোসল করে নিলাম। ওরা আমার সারা দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিষ্কার করে দিলো। ওরা আমার স্তন যৌনি নিতম্বে সবচেয়ে বেশী মনযোগ দিয়ে পরিষ্কার করলো। বুঝলাম এরা প্রফেশনাল। এদের কাজই হল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মেয়েদের দেহকে প্রিস্টের বিকৃত কামনা পুরণের জন্যে তৈরি করা। ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।”
ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৭ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি পড়ার পর মনে হয়েছিল আলেস তবে এভাবেই ধুকেধুকে মরেছিল! আজ পোল্যান্ডে প্রতি বছর ৬০ হাজার টন মেয়াদউত্তীর্ণ খাদ্য ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এদেশেরই একটা অকুতোভয় কন্যা একসময় খাবারের অভাবে ধুকেধুকে মরতে হয়েছিলো। নিজের দেশের(বাংলাদেশ) দিকে তাকিয়ে দুঃখ হল। সেই অজ্ঞতা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পোল্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সম্পূর্ণ নুয়ে পড়ার পরেও আজ উন্নতির শীর্ষে। কিন্তু আমার সুজলা সুফলা শস্য শামলা বাংলাদেশ আজো তৃতীয়বিশ্বের ক্ষুদা আর দারিদ্র পীড়িতদের কাঁতারে। যাহোক, ক্ষানিকের জন্যে আমি ভেবেছিলাম আলেসের মৃত। কিন্তু পৃষ্ঠা উল্টাতেই আবারো আলেসের লেখা বেড়িয়ে পড়লো।

“আজ সন্ধ্যায় এক রক্ষী দুটো ভূট্টা আর এক মশক পানি নিয়ে এসেছিল। আমি ওর কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে খাবার নেইনি। কেন জানি মনে হল সেই হয়তো আমার মার্টিনীকে খুন করেছে। হয়তো ওর হাতে এখনো মৃত মার্টিনীর রক্ত লেগে আছে। গত রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল। ওর হাত থেকে খাবার নেওয়াটা আমার কাছে সেই স্বপ্নে দেখা মার্টিনীর ঝুলন্ত লাশ থেকে ঝরা রক্ত খাবার মতোই নিকৃষ্ট মনে হলো। আমি শুয়ে থাকলাম। ও কিছুক্ষণ খাবার হাতে দাড়িয়ে থাকল। যখন দেখলো আমি উঠে ওর কাছ থেকে খাবার নিচ্ছি নাহ তখন সে মশক আর ভূট্টা দুটো আমার সেলের ভেতর ছুড়ে ফেলে চলে গেল। মাটিতে পড়ে মশক ফেটে মেঝেতে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। সে পানির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মেঝে থেকে সবটুকু পানি চুষে খেলাম। আহ পানি…..ঈশ্বরের এক মহিমান্বিত উপহার। পানিটুকু খাওয়ার পর আমি ভূট্টা দুটো কুড়িয়ে খেতে লাগলাম। পানির অভাবে আমার গলাটা এতটাই শুকিয়ে গেছিলো যে ভূট্টার দানাগুলি বারবার আটকে যাচ্ছিলো। খাবার সময় গলায় প্রচন্ড জ্বালাপোড়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিলো যেন জ্বলন্ত কয়লা খাচ্ছি। কিন্তু তবুও পেটের দায়ে না খেয়ে উপায় ছিলো নাহ। একটা ভূট্টা খাওয়ার পর যখন অপরটিতে কামড় বসালাম তখন মনে পড়লো মার্টিনীর কথা। ও থাকলে হয়তো দুজনে ভাগ করে খেতাম। এতে পেট কম ভরলেই মনটা আনন্দে ভরে যেত। বুকের গহীন থেকে এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। মনেমনে বললাম আমি আর পারছি না প্রভু।এই নৃসংশতা থেকে এবার আমায় মুক্তি দাও। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চল প্রভু। আজ রাতই যেন আমার এই ঘৃন্য জীবনের শেষ রাত হয়। কিন্তু প্রভু যীশু আমার গতরাতের প্রার্থনা অগ্রাহ্য করলেন। আমি বেঁচে রইলাম আরেকটি দুর্বিষহ দিনের অভিজ্ঞতা গ্রহণের জন্যে। ”

তার পরের পৃষ্টায় আবার লিখেছে,
” আজ সকালে এক প্রহরীর লাথি খেয়ে আমার ঘুম ভাঙ্গল। অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল শরীর নিয়ে আমি এতটাই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম যে প্রহরীর হাঁকডাঁকে কোন কাজই হয়নি। বাধ্য হয়েই ওকে কষ্ট করে সেলের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে আমাকে জাগাতে হয়েছে। আমাকে লাথি মেরে সে তার এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের শোধ নিতে চাইছে। ব্যাথ্যা পেলেও আমি ওকে কিছুই বললাম নাহ। ইদানীং ব্যাথা পেতে পেতে তা মুখবুজে সহ্য করাও শিখে ফেলেছি। শুধু অবাধ্য চোখ দুটো কোন বাধা মানে না। ব্যাথা পেলেই কয়েক ফোঁটা জল ছেড়ে দেয়। প্রহরী আমায় এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে বলল তাড়াতাড়ি কাপড় পরে তৈরি হয়ে যেতে। আজ নাকি জনসম্মুখে আমার বিচার করা হবে। কাপড় পড়তে গিয়েও আমার মার্টিনীকে মনে পড়ে গেল। এইতো সেদিন আমরা একটা কাপড়কে দুজনে ভাগ করে পড়েছিলাম। আজ তার অনুপস্থিতিতে এ কাপড়ের মালিক আমি একাই। কিন্তু এই একাকীত্বই আমাকে সবচেয়ে বেশী যন্ত্রনা দিচ্ছে। ক্ষুদা, পিপাসা, চাবুকের আঘাত বা অন্যকোন নির্যাতন নয়। মানুষের স্মৃতির এক আশ্চর্য ত্রুটি হল দুঃখ ভুলে যাওয়া কিন্তু সুখময় দিনগুলি মনে রাখা। মার্টিনীর সাথে সেই সুখময় দিনগুলির স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। মৃত্যু ব্যাতিত এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ খুলা নেই। কাপড় পরা মাত্র ওরা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো। সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে একসময় আমরা একতালা গীর্জার ছাদে পৌছে গেলাম। রক্ষীরা আমাকে একটা ঝুলন্ত কাঠের ফ্রেমের সাথে বেঁধে দিল। পূর্ব দিগন্তে তখন সবে মাত্র গ্রীষ্ম ঝলমলে সূর্যোদয় হয়েছে। তার উষ্ম পরশ আমার ভাঙ্গাচুরা শরীরটাকে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। একজন ঘোষক এসে গ্রামবাসীকে গীর্জা প্রাঙ্গণে একত্রিত হওয়ার আহব্বান জানালো। মানুষজন ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু করলো। তারপর সম্মান্বিত পাদ্রী গীর্জার ছাদে এসে বসলেন। শুরু হল তিন তিনটে খুনের দায়ে অভিযুক্ত ডাকিনী আলেসের বিচার।”
তার পরের পৃষ্টায়,
” মাননীয় পাদ্রী একে একে আমার উপর আনা সকল অভিযোগ উপস্থিত সবাইকে পড়ে শুনালেন! প্রথম অভিযোগ হল আমি নাকি সরাইখানার একক মালিক হওয়ার আশায় আমার বাবাকে অভিশাপ দিয়ে মেরে ফেলেছি। কি অদ্ভুত অভিযোগ। বাবা বেঁচে থাকতে আমি কখনোই সরাইখানায় যেতাম না। আমার ব্যবসাপাতিতে একটুও আগ্রহ ছিলো নাহ। যে জিনিসে আমার আগ্রহই নেই তার একচ্ছত্র মালিকানার জন্যে আমি আমার জন্মদাতা পিতাকে খুন করব! এটা ভাবা যায়? তাছাড়াও বাবার সম্পত্তি তো তার একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার কপালেই জুটতো। তাকে খুন করে ছিনিয়ে নেবার কোন প্রয়োজনই তো ছিলো না। তবুও আমি পিতৃঘাতী। এটাই কি পৃথিবীর ন্যায়বিচারের উদাহরণ?
তার পরের অভিযোগ, আমি নাকি সামান্য কটা স্বর্নমুদ্রা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যে সরাইখানার এক ঘুমন্ত অতীথিকে খুন করেছি! ঐ মদ্যপ বুড়োটার কাছে স্বর্নমুদ্রা থাকলে তো নিবো। সে যা আয় করে সবই আমার সরাইখানায় মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। ওর কাছে স্বর্নমুদ্রা আছে এমনটা ভাবাও পাগলামি। আর যদি ঘুর্ণাক্ষরে দু একটা স্বর্নমুদ্রা থাকতো এবং আমার সেটার প্রয়োজন হতো তো আমি ওকে দু বোতল মদ দিয়েই তা বাগিয়ে নিতে পারতাম। খামাখা ওকে খুন করতে যেতাম কেন?আমার এই অতিসাধারণ যুক্তি তর্ক গুলি বিচারে গ্রহণ করা হলো নাহ। আমাকে ওই মদ্যপটার খুনি হিসাবেই চিহ্নিত করা হলো।
অতপর ওই অভাগা রক্ষীকে হত্যার অভিযোগ উঠলো। এবং যথারীতি সকল যুক্তিতর্কের উর্ধে উঠে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। অতপর প্রিস্ট এসে সর্বসম্মুখে আমার গালে চড় মারলেন। নিচে গীর্জা প্রাঙ্গণে গণজমায়েতের মাঝে ওনেক শিশুও ছিলো। এতো গুলি লোকের সামনে এভাবে অপমানিত হওয়ার লজ্জায় আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা হলো। অতঃপর বিচারের রায় ঘোষনা করা হলো। “ডাইনি আলেসকে আগামী রোববার প্রার্থনার পর গীর্জা প্রাঙ্গণে সর্বসম্মুখে ফাঁসীতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। ” মৃত্যুদণ্ড শব্দটা আমার কানে যেন মধু বর্ষণ করলো। আর মাত্র চারদিন। এর পরেই আমি এই নির্মম পৃথিবী ছেড়ে আমার স্রষ্টার পাণ পাড়ি জমাবো। শাস্তি ঘোষনার পর প্রিস্ট তার হাতের আংটি খুলে তা আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করে আমার কপালে ছ্যাঁকা দিলেন। গভীর একটা পোড়া দাগ আংটির উপর মুদ্রিত নকশা সমেত আমার কপালে বসে গেল। এটা সেই চিহ্ন যা দ্বারা একজন ডাইনিকে চিহ্নিত করা হয়। কপালের অসহ্য জ্বালাপোড়া আর মিথ্যা ডাইনি অপবাদের যন্ত্রনায় আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। আমার কান্না দেখে উপস্থিত অনেকেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। অতপর প্রিস্ট সগর্বে গীর্জার ছাদ থেকে নেমে গেলেন। প্রিস্ট চলে যেতেই উপস্থিত জনতা আমার দিকে বৃষ্টির মত পাথর ছুড়তে লাগলো! যারা পাথর ছুড়ছিল তাদের প্রায় সবাইকেই আমি চিনি। তাদের মধ্যে ছিলো জোসেফ আন্টোনিও, সেই মোখপোড়া চাষি। গতবছর ওর ক্ষেতের ফসল আগাম শীতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ফসল ফলাতে পারেনি বলে সে বউ বাচ্চা নিয়ে শীতে উপোস করে মরতে বসেছিলো। একরাতে সে আমাদের বাসায় এসে কিছু অর্থকড়ি ভিক্ষা চায়। আমার বাবা ওকে সাফ মানা করে দেন। কিন্তু ওর অসহায় মুখের দিকে চেয়ে আমি আমার বড়দিনের উপহার কেনার জন্যে জমানো টাকার পুরোটাই তার হাতে তুলে দেই। সেই শীতের রাতে সে আমাকে মা মেরী অবতার বলে কুর্নিশ করেছিল। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের ব্যবধ্যানে আজ রোদ্রউজ্জল গৃষ্মে সে আমাকে ডাইনি বলে পাথর ছুড়ছে! কতই না দ্রুত এই মানুষগুলি বদলে যায়। তারপর চোখ পড়লো রজার বরিসের দিকে। আমার প্রাক্তন প্রেমিক। সেও সবার সাথে তাল মিলিয়ে আমার দিকে সমানে পাথর ছুড়ছে। অথছ কদিন আগেও সে কতনা মধুর কন্ঠে আমার রূপের প্রসংশা করতো। প্রতি বৃহষ্পতিবার সন্ধায় ও আমাদের গোয়ালঘরের পেছনে আমার সাথে মিলিত হবার জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো। আমিও বোকার মতো বাবার চোখকে ফাকি দিয়ে ওর মতো একটা লম্পটের সাথে মিলিত হতাম। ও আমাকে স্বর্গদেবী বলে ডাকতো। এইতো দুমাস আগেও সে তার স্বর্গদেবীকে বিছানায় পাবার জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আজ সেই স্বর্গ দেবীকে নরকের ডাইনি বলে গালি দিচ্ছে আর খুজে খুঁজে বড় পাথরগুলি বের করে ছুড়ে মারছে। ধ্বংস হোক এমন স্বার্থপর লম্পট পুরুষজাতির। ওর দিকে তাকাতেও আমার ঘেন্না হচ্ছে।
গীর্জা প্রাঙ্গণের এক কোণে কতগুলি শিশু কিশোর জড় হয়ে হৈ হোল্লড় করছে আর আমার দিকে পাথর মারছে। কচি অপ্রস্তুত হাতে ছোড়া পাথরগুলির বেশীরভাগই লক্ষভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের মধ্যে আমি আলেক্স রবার্ট উইলসন কে দেখতে পেলাম। ওর মা আমার প্রতিবেশী। ছেলেটা দেখতে খুবই সুন্দর। কচি বয়স ৪-৫ হবে। এইতো সেদিন ওর জন্মের সময় খুব বেশী তুষার ঝড় হয়েছিল। রাস্তায় তুষার জমে আমাদের গ্রামটা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এমন প্রতিকুল পরিবেশে ওর মায়ের যখন প্রসব বেদনা উঠে তখন কোন ধাত্রীকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছিলো নাহ। ওদিকে সে তার মায়ের যৌনিতে উল্টো হয়ে আটকে গেছিলো। ওর বাবা বাড়ি ছিলো নাহ। লোকটা কাঠ কাটতে পার্শ্ববর্তী উইলো জঙ্গলে গিয়েছিলো। ওর মা ঘরে সম্পূর্ণ একা কাতরাচ্ছিলো। সেদিন তার আর্তচিৎকার শুনে আমি ওদের বাড়ি ছুটে গিয়েছিলাম। গরম পানি তৈরি করে, ওর মা কে শুইয়ে আমি নিজের হাতে ছেলেটাকে টেনে বের করেছিলাম। আমার হাত ধরেই ও এই পৃথিবীতে এসেছিলো। কৃতজ্ঞতাবশত তার মা আমার নামের সাথে মিলিয়ে তার নামকরণ করেন আলেক্স। আজ সেও আমার পর হয়ে গেছে! অতপর পাথরের আঘাতের তীব্রতায় আমি এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। রক্ষীরা আমার অজ্ঞান দেহকে বয়ে সেলের ভেতর নিয়ে এলো। জানিনা কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখলাম রাত হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই দেখলাম সেলের এক কোনে রক্ষীরা খাবার আর পানি রেখে গেছে। হয়তো জীবনের শেষ চারটে দিন ওরা আমায় অভুক্ত রাখতে চায় না। খেয়ে দেয়ে আমি আবারো লিখতে বসলাম। মৃত্যু প্রতিক্ষায়, জীবনের আতিবাহিত আরেকটি দীর্ঘ গ্রীষ্মের দিনের বর্ণনা।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৬ষ্ঠ পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

মার্টিনির জন্যে আমার হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। স্রষ্টাকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতে লাগলো আমার কাছে। এভাবে পুতুলের মতো একটা মেয়েকে অকালে এভাবে নিয়ে গেল কেন? কি দোষ ছিলো তার? একজন বা কয়েকজনের প্রাণ নিলে সে খুনি। কিন্তু একে একে যে সবার প্রাণ যে হরণ করে সেই ঈশ্বর। জগতের কি অমোঘ লীলা! পরের পৃষ্টায় গেলাম,

আলেস লিখেছে,
“কাল রাতে একটুও ঘুমুতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই মার্টিনীর চেহারাটা ভেসে উঠছে! জানি আজ রাতে ওর মৃতদেহটাকে শুদ্ধিকরণের নামে প্রিস্ট ভোগ উৎসবে মেতে উঠবে। আমি যেন ওর আত্মার আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। গীর্জার ঐ উপরের তলায় সে সাহায্যের জন্যে হাহাকার করছে। ওর অতৃপ্ত আত্মাটা হয়তো অসহায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে, নিজের প্রাণহীন দেহটাকে কিভাবে ঐ জানোয়ারটা খুবলে খুবলে খাচ্ছে! ছিঃ। কোন মানুষ তার স্বজাতির মৃতদেহের এমন অমর্যাদা করতে পারে তা আমার জানা ছিলো নাহ। তাও আবার ঈশ্বর গৃহ গীর্জার ভেতরে বসে! হে ঈশ্বর তোমার গজব দিয়ে এই নষ্ট গীর্জাকে ধ্বংস করে দাও। এই শয়তানের আখড়া পুড়িয়ে ছাই করে ফেলো! প্রতিদিনকার মতো আজ সকালেও ওরা খাবার দিয়ে গেছে। চারটে রুটি। কিন্তু আজ আমি কার সাথে ভাগ করে খাব? মার্টিনী তো চলে গেছে। তাই খাবারের পুটলিটা আমি সেলের ফাঁক গলে ওদের উপর ছুড়ে ফেলে দিলাম। আর চিৎকার করে বললাম, তোদের খাবার তোরাই খা। শুধু আমার মার্টিনীকে ফিরিয়ে দে। এক শয়তান রক্ষী ভেঙ্গচি কেটে বলল, “ঐ ডাইনিকে নরকে পাঠানো হয়েছে। শীঘ্রই তোকেও সেখানে পাঠানো হবে।” যদিও আমি খুন না করেও খুনের দায়ে দোষী তবুও জীবনে কখনোই আমার মনে কারো প্রাণনাশের স্পৃহা জাগেনি। কিন্তু আজ প্রচন্ড ইচ্ছা করছিলো ঐ রক্ষীকে মেরে নরকে পাঠিয়ে দেই। একরাশ থুথু ওর মুখে ছিটিয়ে দিলাম। শয়তানটা অপর রক্ষীর হাত থেকে চাবুক নিয়ে আমার সেলে ঢুকে আমাকে খুব পিটালো। নিয়মিত চাবুক খেতে খেতে আমার পিটে পূঁজ হয়ে গেছে। ও যখন এই ক্ষত বিক্ষত পিঠে আবার মারলো তখন মনে হলো প্রতিটা চাবুক যেন পিঠ ভেদ করে হৃদপিন্ডে আঘাত করছে। খুব বেশীক্ষণ এ আঘাত সহ্য করতে হয়নি আমায়। দুচারটা চাবুক খাবার পরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সেলে সম্পূর্ণ একা আবিষ্কার করলাম। একাকীত্ব আর শূন্যতা পুরো হৃদয়কে গ্রাস করলো। এই একাকীত্ব থেকে বাঁচতেই বাইবেলটা নিয়ে লিখতে বসলাম।”

এ পৃষ্ঠাটা পড়ে চোখ বন্ধ করতেই যেন আলেসের ক্ষত বিক্ষত পিঠটা দেখতে পেলাম। ওহ! এই সাহসী মেয়েটা এতকিছু সহ্য করতে পেরেছে শুধু মার্টিনীর অপমান ছাড়া। তাই রক্ষীটা যখন মার্টিনীকে নরকে পাঠানোর কথা বলে তখনই সে সাপের মতো ফুসে উঠেছে। নির্যাতন নিশ্চিত যেনেও এর প্রতিবাদ করেছে! শুধু অনুভব করলাম জেলের অন্ধপ্রকোষ্টে এই দুই নারীর প্রেম অবলীলায় লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের মত প্রেমগাথাঁকে ম্লান করে দেবার যোগ্যতা রাখে।

পরের পৃষ্টায়,
“সেদিনের ঘটনার পর থেকে আজ দুদিন হয়ে গেল, ওরা আমাকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর সপ্তাহ খানেক আগের সেই নোংরা শুদ্ধিকরণের পর থেকেই ওরা আমাকে নগ্ন করে রেখেছে। ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম এগিয়ে আসছে বলে ঠান্ডা থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছি। কিন্তু পিপাসায় বোধ শক্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করেছে। গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি মার্টিনীকে আমার সেলের ভেতর ফাঁসীতে ঝুলানো হয়েছে। ওর ঘাড় ভেঙ্গে ধড়টা বেকায়দা ভাবে ঝুলছে। মৃত্যু যন্ত্রনায় সুন্দর মুখটা হা হয়ে জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে। ওর খোলা মুখ থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে আর আমি তৃষ্ণার তাড়নায় মেঝে থেকে সে রক্ত চেটে চেটে খাচ্ছি। উহঃ। কি বীভৎস স্বপ্ন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি অনেক ক্ষণ কেঁদেছিলাম। কিন্তু তৃষ্ণায় সবটুকু পানিই শুকিয়ে গেছে। চোখ থেকে বেরুনোর মত আর কোন পানি অবশিষ্ট ছিলো না। দুপুরের দিকে তৃষ্ণার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে অঞ্জলি ভরে নিজের মুত্র পান করেছি। হলুদ বিস্বাদ তরলটা যেন আমার পিপাসাটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছি, তাড়াতাড়ি খাবার -পানি না পেলে আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত। তাই শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে এখন লিখতেছি। জীবনের শেষ অক্ষরমালা। জীবনের শেষ শব্দ, মার্টিনী।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা