ডাকিণী (৫ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

সেদিন অফিসে মন দিতে পারলাম নাহ। ঘুমের ঘোরে একসময় ডেস্কে মাথা ফেলেই কুপোকাত। কপাল ভাল অফিসে আমিই এক্সিকিউটিভ অফিসার। আমার উপরে কেউ নেই। আমার কোন বস থাকলে এতক্ষণে সোজা ঘাড় ধরে অফিস থেকে বের করে দিত। আজ বিকালটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। অফিস যেন শেষ হতেই চাইছে না। অবশেষে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় চলে এলাম। কাপড় ছেড়ে একটা লম্বা শাওয়ার নিলাম। আয়নায় চোখ যেতেই দেখলাম আলেস আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এবার ওকে দেখে মোটেও ভয় পেলাম না। বরং দুষ্টুমি করে চোখ টিপলাম। ও মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। ওকে পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে মন চাইলো। অঞ্জলিতে পানি নিয়ে আয়নায় ছিটিয়ে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আলেস আয়না থেকে চলে গেছে। শাওয়ার সেরে ডিনার রেঁধে খাবার টেবিলে বসলাম। খাবার টেবিলে আমি একটা প্লেট টেনে নিলাম আরেকটি প্লেট পেতে রাখলাম আলেসের জন্যে। জানি ও খাবার দাবার সহ সকল জাগতিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে তবুও কেন জানি ওকে ছেড়ে খেতে বসতে আমার বিবেকে বাধলো। খাবার শেষে লাইব্রেরীতে ফিরে গেলাম। আলেসের ডায়ারীটা আমার পড়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েই আছে। কাল বিলম্ব না করে পড়া শুরু করলাম।

” গত দুটো দিন কিছুই লিখতে পারিনি। প্রচন্ড জ্বর এসেছিল আমার। শরীরটা সেরাতের ধকল সহ্য করতে পারেনি। আধোঘুম আধোজাগরণেই কাটিয়ে দিয়েছি। আজ যখন হুশ হল তখন দেখলাম মার্টিনী আমাকে ওর কাপড় পড়িয়ে দিয়ে নিজে নগ্ন হয়ে আমার মাথার পাশে বসে আছে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ও হেসে সুপ্রভাত জানালো। নগ্ন মার্টিনীকে তখন আমার ভেনাসের চেয়েও বেশী সুন্দরি মনে হচ্ছিলো। ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, “জ্বর গায়ে নগ্ন থাকা ঠিক না। তাই আমার কাপড়টা খুলে তোমায় পড়িয়ে দিয়েছি। আর আমি তো জানিই তুমি আমাকে কাপড় ছাড়াই বেশী ভালবাস।” ওর কথা শুনে চোখে জল চলে আসলো। একটাই কাপড় আমরা দুজন ভাগ করে পড়তেছি। ও শুধু আমার জন্যে এই শীতেও সারাটি রাত নগ্ন থেকেই কাটিয়ে দিয়েছে! হায় ঈশ্বর! এ তোমার কেমন অসম বন্টন। তুমি মার্টিনীর হৃদয়ে যতটা ভালবাসা দিয়েছো তার এক কানাকড়িও যদি প্রিস্টের হৃদয়ে দিতে তবে আজ আমাদের এতটা কষ্ট পেতে হত না। বিছানা থেকে উঠে গিয়ে মার্টিনীকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। ও যে আমার জীবনের শেষ আশ্রয়। আমার ভেনাস দেবী। আমার স্বর্গের রাণী। আমরা দুজন দুজনাতে হারিয়ে গেলাম। এই মেয়েটা আমাকে স্বর্গসুখে ভাসিয়ে দিল। ওর সান্নিধ্যে এই নরকটা এক স্বর্গউদ্যানে পরিণত হল। মিলন শেষে আমরা দুজন একসাথে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ অনুভব করলাম মার্টিনী আমাকে ঘুমে রেখে উঠে চলে যাচ্ছে। মিটমিট চোখে দেখলাম ও এলোমেলো পা ফেলে উঠে সেলের এক কোণে যেয়ে বমি করলো। বুঝলাম ও অন্তঃসত্ত্বা। প্রিস্টের সন্তান ওর পেটে। দুদিনের ব্যবধানে আমাকেও ওর পরিণতি বহন করতে হবে। আমার পেটে হাত বুলালাম। কিছুই টের পেলাম না। কিন্তু আমি জানি এখানে একটা শুকরছানা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। শুধু একটাই আশা, মৃত্যুই পারে আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিয়ে আমার স্রষ্টার কাছে ফিরিয়ে নিতে। মার্টিনী ফিরে এসে আমার পাশে শুয়ে গভীর মমতা মাখা কন্ঠে বলল, “কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাস করে বাচ্চাটা কার আমি সোজা তোমাকে দেখিয়ে দেব। কি মনে হয়? পারবে তো আমার বাচ্চাটার বাবা হতে?” আমি ওর সুডৌল স্তনে চিমটি কেটে বললাম, যদি তুমি আমায় বিয়ে করে মিসেস আলেস হয়ে যাও তবেই পারব। আমার উত্তর শুনে ও উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। আমিও প্রাণ খুলে হাসলাম। এই বাহ্যিক হাসি ঠাট্টার আড়ালে প্রকৃত সত্যটা আমরা দুজনেই জানি। নিতান্ত ভাগ্যগুণে যদি আমরা এখান থেকে বেরুতেও পারি তবুও আমি আলেসকে বিয়ে করতে পারব নাহ। আমাদের সমাজ দুটো মেয়ের বিয়েকে কখনোই মেনে নিবে নাহ, তারা একে অন্যকে যতই ভালবাসুক না কেন।”
মনেমনে ভাবতে লাগলাম আলেস যদি এখনো বেঁচে থাকতো তবে কতই না খুশি হত। আজ আধুনিক পোল্যান্ড সমকামী বিবাহকে বৈধতা দিয়েছে। ইশ যদি আমি আলেস আর মার্টিনীর বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারতাম কত না মজা হত! এসব ভাবতে ভাবতেই পরের পৃষ্টায় গেলাম,
” আমার হৃদয়টা আজ ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না মার্টিনী আর নেই। আর কখনোই ও আমাকে ভালবাসবে নাহ। ওর নিষ্পাপ কচি চেহারাটা আর কখনোই আমি দেখতে পাব না! ওর মিষ্টি চুমু যা আমার শত নির্যাতন নিষ্পেষণকে মুহূর্তেই ভুলিয়ে দিত তা আজ থেকে অতীত হয়ে গেছে। ওর জাদুকরী হাতের স্পর্শ যা আমায় নিমিষেই চরম যৌন সুখে ভাসিয়ে দিত, সে হাত দুটো আজ নিথর হয়ে পড়ে আছে! আজ ভোরে কতিপয় রক্ষী এসে বলল মার্টিনীর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই ওকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। ও নির্লিপ্ত কন্ঠে প্রশ্ন করলো আমার দেহটার কি হবে? অপর এক রক্ষী উত্তর দিলো প্রিস্ট তোমার দেহকে পরপর তিন রাত শুদ্ধিকরণ শেষে আগুনে পুড়িয়ে দিবেন। এ গীর্জার নিয়ম অনুসারে বুঝি সকল ডাকিণীদেরই এই নিয়মে সমাহিত করার হয়। একথা শুনে মার্টিনী বাচ্চা মেয়েদের মতো ঢুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমাকে বাঁচাও আলেস। শয়তানটা শুদ্ধিকরণের নামে আমার মৃতদেহের সাথেও সঙ্গম করবে! ঈশ্বরের দোহাই লাগে, আমাকে বাঁচাও।” আমি মনস্থির করে ফেলেছিলাম। আমি বেঁচে থাকতে আমার ভেনাসকে এখান থেকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে নাহ। মনেমনে প্রার্থনা করলাম হে ঈশ্বর আমায় শক্তি দাও, আমায় গ্রহণ কর। মার্টিনীকে নিতে প্রথম রক্ষী সেলে প্রবেশ করা মাত্র আমি ওর উপর হামলে পড়লাম। ও তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। আমি ওর গলায় কামড় বসিয়ে দিলাম। ফিংকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসলো ওর গলা থেকে। এমন সময় আরেকটি রক্ষী আমার মাথার পেছনে বাড়ি মারলো। আঘাতের তীব্রতায় আমার চোখের সামনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। আমি জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে সেলে একা আবিষ্কার করলাম। বুঝলাম মার্টিনীকে ওরা নিয়ে গেছে চিরতরে! হায় ঈশ্বর, তুমি ওকে স্বর্গে যীশুর ঠিক পাশেই স্থান দিও। আমেন।”

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৪র্থ পর্ব)

1

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

এরপরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

“আজ হঠাৎ এক প্রহরী এসে চিৎকার করে আমাকে গালিগালাজ করতে লাগল। দুদিন আগে আমি যে রক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছিলাম সে নাকি সিমিলিয়ার যুদ্ধে মারা গেছে। স্বভাবতই এর ধরে নিয়েছে আমিই ওকে খুন করেছি। এই নিয়ে তিন তিনটা খুনের দায় আমার গলায় ঝুলছে। হায় ঈশ্বর, এই নির্বোধরাও কি তোমার সৃষ্টি? যুদ্ধে তো মানুষ যায় মারতে আর না হয় মরতে। না হয় ঐ রক্ষীটা মারা গেছে। কিন্তু তুমি তো জানো আমি ওকে খুন করিনি। আমি কাউকেই খুন করিনি। এরা শুধু শুধু আমাকে এখানে ধরে এনেছে। হায় ঈশ্বর। তুমি এর সুষ্ট বিচার কর। তুমি এই পাপীকে ক্ষমা কর। রক্ষীরা বলাবলি করতে লাগলো যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ততই নাকি মঙ্গল। এসব শুনে মার্টিনী খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। ও আমায় জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল। এ মুহূর্তে ওকে আমার কাছে ঈশ্বরের দূত মনে হল। এই অপবাদ, ঘৃনা, লাঞ্চনা, নিগ্রহের মাঝেও কেবল আমাকে ভালবাসতেই যেন ঈশ্বর স্বর্গ থেকে এক অপ্সরী মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ ঈশ্বর। এই পাপীকে দয়া করার জন্যে।”
তার পরের পৃষ্ঠা,
“আজ সন্ধায় ওরা আমাকে শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। সেলের দরজা খুলে ওরা যখন আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন মার্টিনীর সে কি কান্না। আমি তখনো জানতাম না শুদ্ধিকরণ জিনিসটা কি। যাওয়ার সময় আমি যতক্ষণ সম্ভব ওকে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। ও উন্মাদের মতো মাটিতে পড়ে নিজের চুল ছিঁড়ছে আর বিলাপ করছে। একটা সময় সেলের দেয়ালের আড়ালে ও ঢাকা পড়ে গেল। আমি সর্বশক্তিতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “মার্টিনী, আমি তোমায় ভালবাসি।” রক্ষীরা আমাকে নিয়ে একসময় প্রিস্টের কক্ষে পৌছে গেল। গীর্জার উঁচু তলায় সুরম্য কক্ষে, বিলাসবহুল আসনে অধিষ্ঠিত শ্মশ্রুমন্ডিত প্রিস্টকে দেখে আমি অবনত হয়ে সম্মান জানালাম। অতপর উনার পায়ে ধরে বললাম, “ধর্মাবতার, আপনি আমাকে চেনেন। আমি শৈশবে আপনার গীর্জায় দুবছর বিদ্যার্থী ছিলাম। আমার জীবনে এমন কোন রবিবার নেই যেদিন আমি সাপ্তাহিক প্রার্থনায় ফাঁকি দিয়েছি। আমি স্রষ্টার একজন একনিষ্ঠ সেবিকা হিসাবেই জীবনে বেঁচে থাকতে চাই। মা মেরীর কসম আমি ডাকিণী নই।”
প্রিস্ট আমার মাথায় লাথি মেরে বললেন আমি নাকি একজন ছদ্মবেশী ডাকিণী। ধার্মিকতার ছদ্মবেশ নিয়ে আমি নাকি ৩ জন কে খুন করেছি। তাই আমার অবধারিত শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু দন্ডের আগে অবশ্যই আমার দেহটাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে যেন মৃত্যুর পর আমার পাপাত্মা আমার দেহে আর ফেরত আসতে না পারে। প্রিস্টের ইঙ্গিতে দুজন রক্ষী এসে আমার দুহাত শক্ত করে চেপে ধরল। আর প্রিস্ট ছুরি দিয়ে আমার পরিধেয় কাপড় কেটে ফেলে আমাকে উলঙ্গ করে দিল। আমি লজ্জায় অপমানে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচালাম। আমার বিশ্বাস ছিল হয়তো মা মেরী আমার চিৎকার শুনে সাহায্য করতে আসবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে প্রিস্টের বিশাল হাতের চড় খেয়ে আমি লুটিয়ে পড়লাম।”
এ পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমার হাত পা অসার হয়ে আসতে শুরু করলো। অনেকটাই অনুমান করতে পারছিলাম এর পর অসহায় আলেসের উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টালাম।
” ওরা আমাকে পাশের কক্ষের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শেকলের সাথে বেধে দিলো। অতঃপর প্রিস্ট এসে আমার নগ্ন দেহে পানিপড়া ছিটিয়ে দিল।তারপর সে আমার দেহটাকে পুরো রাত জুড়ে চারবার ভোগ করল। আমি সারারাত মা মেরীকে ডেকেছি একটু সাহায্যের জন্যে। কিন্তু উনি আমার ডাক কবুল করেননি। সকালে আমাকে এই বিধ্বস্ত দেহেই সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরা আমাকে গোসলও করতে দেয়নি। আমার দুপায়ের মাঝখানে এতবেশী ব্যাথা করছিল যে আমি হাঁটতে পারছিলাম নাহ। কিন্তু রক্ষীদের নির্দয় চাবুকের আঘাতে টলতে টলতে কোনরকমে আমার সেলে পৌছালাম। সেলে মার্টিনী শুয়ে ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি খানিকটা ইতস্তত করলাম। আমার সারা দেহে রক্ত আর বীর্যের মাখামাখি। এ দেহে ওকে জড়িয়ে ধরলে তার কাপড় নোংরা হয়ে যাবে। কিন্তু ও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল নাহ। একটা সময় আমি ক্লান্ত দেহটা ওর বাহুডোরে এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে আমি আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। দেখলাম গীর্জার প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিশ ছোট্ট আলেসকে নিতে আমার বাবা মা এসেছেন। সাথে করে গরম ভূট্টা ভাজা আর রাইয়ের মন্ড নিয়ে এসেছেন। এসব পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে! তারপর বাবা মায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখলাম মার্টিনী তার কাপড়ের ছোট্ট কোন ছিড়ে একটা রুমাল বানিয়েছে। আর মশক থেকে পানি নিয়ে সে রুমাল ভিজিয়ে আমার দেহের নোংরা রক্ত, বীর্য মুছে দিচ্ছে। ঘৃণায় আমার মুখ বেঁকে গেল। ছিঃ। এটা যদি শুদ্ধিকরণ তবে কালিমালেপন কি? কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বাইবেলটায় লিখতে বসলাম। গতরাতের ঘটনা নিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। এভাবে ভোগ হওয়া হয়তো আমার কপালে লিখা ছিলো। কিন্তু আমার একটাই আফসোস। আমি ঐ প্রিস্টের মতো এক সাক্ষাৎ শয়তানকে ধর্মাবতার ডেকেছি। তার পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছি। এর চেয়ে আমি মরে গেলেই ভাল হতো। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়া শেষে আমার সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছিল! নিঃসন্দেহে আলেস অনেক সাহসী আর মানসিক শক্তি সম্পন্ন ছিল। এতটা নির্যাতনের পরেও সে ভেঙ্গে পড়েনি। স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস অটুট রেখেছিল। কিন্তু ধর্মের ধ্বজা ধারিদের ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা আমাকে বিষ্মিত করে। একেই হয়তো বলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এটাই হল ধর্ম ব্যবসার চরম রূপ। আলেসের মতই সেসব ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি ঘৃণায় নিজের অজান্তেই আমার মুখ কুঁচকে গেল। পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথেই আমার বেডরুমে অ্যালার্ম বেজে ঊঠলো! কি আশ্চর্য! আমি সারাটি রাত লাইব্রেরীতে আলেসের ডায়েরী পড়েই কাটিয়ে দিয়েছি! আলেসকে আমার একাকীত্বের বন্ধু, সুখ দুখের সাথী মনে হল। বিড়বিড় করে বললাম, তোমাকে ভালবাসি আলেস।

যাক। অনেক হয়েছে। এবার উঠে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমি আমার কটেজ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি নাহ। আমি এখানেই থাকব। আলেসের সাথে। আপাতত অফিসে যাচ্ছি। আলেসকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে নাহ। কিন্তু অফিসে যে যেতেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (৩য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পরদিন ঘড়ির আলার্ম শুনে ঘুম ভাঙ্গলো। নিজেকে বাথরুমের ফ্লোরে আবিষ্কার করলাম। মাথাটা খানিকটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে জমাট বেধে আছে। টলমল পায়ে উঠে ভয়ে ভয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। এবার সবকিছু ঠিকঠাক। প্রতিবিম্বে আমিই আছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নাস্তা সেরে অফিসে গেলাম। অফিসের সহকর্মীদের কপালের আঘাতের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি। ওরা নিজনিজ কাজেই ব্যস্ত হয়ে গেল। সেদিন অফিস শেষে বাড়ি ফিরে কাপড় চোপড় গোছগাছ করতে শুরু করে দিলাম। আমি আর এ কটেজে থাকব নাহ। আর যাওয়ার আগে আলেসের ডাইরিটাকে পুড়িয়ে দিয়ে যাব। হয়তো এটাই ওর মুক্তির শেষ পথ। আমার ক্লজিটের সকল কাপড় লাগেজে পুরে নিলাম। তারপর লাইব্রেরিতে গেলাম আলেসের ডাইরিটা নিতে। লাইব্রেরীতে ঢুকা মাত্র লাইব্রেরীর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি সভয়ে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই দরজার ঠিক ওপাশ থেকে এক আর্তচিৎকার ভেসে এলো। এবার আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। তারপর সারা বাড়িতে যেন প্রলয় শুরু হল। জিনিসপত্র ভাঙ্গার আওয়াজ, কান্নার বিলাপ, দেয়ালে আঁচড় কাটা, আরো বিভিন্ন রকমের শব্দ। এক সময় আমি অসহ্য হয়ে চিৎকার করে বললাম, “আলেস, তুমি কি আমায় মেরে ফেলতে চাও? ” খানিক পরেই দরজায় লেখা উঠলো, “নাহ, চলে যেও নাহ। আমায় সাহায্য কর বন্ধু। ” অতঃপর দরজা খুলে গেল। আমি দৌড়ে আমার রুমে গেলাম। যেভাবে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনেছিলাম তাতে অনুমান করেছি আমার রুমের কিছুই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু রুমে ঢুকে দেখলাম সবকিছুই স্বাভাবিক ও সাজানো গোছানো। তারপর বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলাম। আমি জানিনা আলেস কে। ওর উপর হওয়া নির্যাতন আমাকে ব্যথিত করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি আমার কটেজে একটা অশরীরীর উপস্থিতি মেনে নেব। একটা সময় কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। আয়নায় দেখা বিম্বের সেই মেয়েটি আমার পায়ের কাছে পড়ে কাঁদছে। তার মুখ কালো কাপড়ে বাধা। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু মুখে কাপড় থাকার কারণে পারছে নাহ।এক সময় সে তার কটিবস্ত্রের মধ্য থেকে সেই বাইবেলটা বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর ঘুরে চলে গেল। মাঝরাতে স্বপ্নটা দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠে দুগ্লাস পানি খেলাম। তারপর ফ্রিজ থেকে দুটুকরো স্যান্ডুইচ খেয়ে রওনা হলাম লাইব্রেরী পানে। রহস্যের সব জট এখন ঐ বাইবেলের দিকে ইঙ্গিত করছে যাতে লেখা আছে আলেসের ডায়ারী। লাইব্রেরীতে গিয়ে ওটা বের করে আবার আলেসের লেখা পড়তে শুরু করলাম।
“আজ সকালে রক্ষীরা আমাদের খাবারের সাথে সাথে মার্টিনীর জন্যে দুই প্রস্থ কাপড়ও দিয়ে গেল। ও যখন কাপড় পরছিল তখন আমার হৃদয়ে হতাশা মোচড় দিয়ে উঠলো! ওর নিজের কাপড় আছে। এখন থেকে ও হয়তো আমার কোলে ঘুমুতে চাইবে নাহ। কিন্তু পরক্ষণে সে হতাশা উবে গেল। নীল কাপড়ে ওকে রাজকুমারীর মত লাগছে। আমি ওর উপর থেকে চোখ ফিরাতে পারছিলাম নাহ। ব্যাপারটা ওর নজর এড়ালো নাহ। ও মৃদু হেসে জিজ্ঞাস করলো কেমন লাগছে ওকে। আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারলাম, অসাধারণ। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে আজ রাতে আমার কোলেই শুয়ে পড়লো! তবে কি সেও আমাকে ভালবাসে? নাকি এটা নিছক একত্রে ভাল থাকার অভিনয়। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু ও দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে। আমার বুকে ও বারবার মুখ ঘসছে। মনে হচ্ছে যেন ভালবাসার শেষ আশ্রয় খুঁজছে। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম। এই মেয়ে দুটো প্রমাণ করে গেছে, ভালবাসা স্থান, কাল, উঁচু নীচু, জাত ভেদ, বর্ণ লীঙ্গ ভেদাভেদ মানে নাহ। ভালবাসা ভালবাসাই। পৃষ্ঠা উল্টে পরের পাতায় গেলাম।
” কাল এক স্বপ্নময় রাত কাটিয়েছি আমি আর মার্টিনী। ওকে এভাবে কাছে পাবো কখনোই কল্পনা করিনি। এই মেয়েটা শুধু দেখতেই সুন্দরি না, বিছানায়ও অসাধারণ। ঈশ্বরের অমায়িক সৃষ্টি। হে স্রষ্টা আমায় ক্ষমা কর । আমার হেন পাপ মোচন কর। কিন্তু আমার পাপের শাস্তি তুমি মার্টিনীকে দিওনা কভু। দরকার হলে ওর মৃত্যুদ্যুতকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও তবুও ওকে এই নরক থেকে উদ্ধার কর প্রভু। আমেন।”
তার পরদিন ও লিখেছে,
“আজ ধরে আনার ৭ দিন পর ওরা আমাকে আর মার্টিনীকে একটা ছোট্ট পুকুরে নিয়ে যায় গোসল করাতে। যাহোক ওরা একদম নির্দয় নয়। পুকুরের উষ্ম প্রস্রবণে গা ডুবিয়ে দিতেই চাবুকের ক্ষতগুলিতে অসহ্য জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল। আমি আর মার্টিনী জল ছিটানোর খেলায় মেতে উঠলাম। কিন্তু বেরসিক রক্ষীদের তা পছন্দ হল নাহ। একটা নেতা গোছের রক্ষী এসে আমার আর মার্টিনীর দিকে পাথর ছুড়ে মারতে লাগল। আমি নীচু হয়ে যাওয়ায় পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা পেলাম কিন্তু বেচারি মার্টিনীর আহত মাথায় আবারো একটা পাথরের আঘাত লাগল! আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। এরা আমার সামনে আমার প্রিয়াকে আঘাত করতে পারে নাহ। আমি ওদের চিৎকার করে অভিশাপ দিলাম যেন সে শীঘ্রই নরকে প্রবেশ করে। আমার অভিশাপ শুনে ঐ রক্ষী সভয়ে পিছিয়ে গেল। ওরা আমাকে ডাইনি ভাবে। তাই আমার অভিশাপকে ভয় পেয়েছে। নিজেকে একটু হলেও ক্ষমতাবান মনে হল। মার্টিনীকে আর আমাকে আবার সেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। প্রভু তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ। আজকের এই চমৎকার দিনের জন্যে। ”

এই পৃষ্ঠা পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার লাইব্রেরীর দরজা সশব্দে বন্ধ হল। আর ধুলোর মধ্যে লেখা ফুটলো, আলেস+মার্টিনী। এই প্রথম আমি আলেসের ডায়রি পড়ে হাসলাম। মেয়ে দুটো এত্তসবের মাঝেও প্রেমে পড়েছিল আর জেলখানায় চুটিয়ে প্রেম করছিল। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তখনই খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এলো। আমিও সে হাসিতে যোগ দিলাম। আলেসের প্রতি আমার ভয় ভীতি সবকিছুই কেটে গেল। নিঃসঙ্গ কর্টেজে এমন একজন সঙ্গিনী পাওয়া মন্দ কি? হোক না সে অশরীরী।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

ডাকিণী (২য় পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

“আজ হঠাৎ করে আমার সেলের দরজা খুলে, আমার সমবয়সী এক নগ্ন মেয়েকে ছুড়ে ভেতরে ফেলা হল। রক্ষীরা চেঁচিয়ে বলল, “দুই ডাকিণী একসাথে মর।” ওরা যতবারই আমাকে ডাকিণী বলেছে আমি উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এবার আমি নবাগত মেয়েটিকে দেখে খানিকটা আভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটা এক কোথায় অপরূপা সুন্দরী। মুখের ছলে যাওয়া চাবুকের দাগ কিংবা সারা শরীরের নির্যাতনের চিহ্ন তার সৌন্দর্য্যকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। ও বার দুয়েক মাথা তুলার চেষ্টা করতেই জ্ঞান হারালো। আমি ওর কাছে যেয়ে ওকে দেখতে লাগলাম। ওর অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। ওর মাথার পেছনে বড় একটা ক্ষত যা থেকে তখনো রক্ত বেরুচ্ছিল। আমি আমার কোটিবন্ধনী দিয়ে ওর মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিলাম। এই শীতে অসুস্থ মেয়েটাকে ধুকেধুকে মরতে দেখে আমার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো। চাবুকের অসংখ্য আঘাতে আমার নিজের কাপড়ই ছিড়ে একাকার। তবুও যতটা সম্ভব ওকে আমার কোলে জড়িয়ে রেখে গরম রাখার চেষ্টা করলাম। দেয়ালে টাঙ্গানো একটা মশাল এনে ওর পাশে পুঁতে দিলাম। ওকে কোলে নিয়েই এখন লেখতেছি। মশালের আলোয় ওকে আরো অপূর্ব লাগছে। আমাকে ক্ষমা কর ঈশ্বর। আমি তোমার এই অপরূপ সৃষ্টির প্রেমে পড়ে গেছি। ”
এই পৃষ্ঠা পড়ে বুঝলাম আলেস এক নারী সমকামী ছিল। ওই মেয়েটার সহচর্য এই নিদারুণ বন্দিত্বেও ওর হৃদয়ে প্রেমের জোয়ার তোলেছিল। অথবা হয়তো ও সমকামী ছিলনা কিন্তু পরিস্থিতি ওর মনে খানিকের মোহের সৃষ্টি করে। কিন্তু নতুন মেয়েটার নাম কি ছিল? প্রশ্নটা আমার মাথায় আসতেই লাইব্রেরীর দরিজা সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ধুলি মাখা দরজার কপাটে আলেসের সুস্পষ্ট হস্থাক্ষরে একটা নাম ফুটে উঠলো, “মার্টিনী।” ক্ষানিক পরেই তা আবার ধুলায় মিলিয়ে গেল। এবার প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আলেস মরে গিয়ে আমার কর্টেজে আটকে পড়েছে। আজ এই লাইব্রেরীতে ও আমার সাথে আছে। কিন্তু আমি ওকে দেখতে পারছি নাহ। এটা ভাবতেই আমার ঘাড়ের সবকটি লোম দাড়িয়ে গেল! প্রচন্ড ভাবে ঘামতে শুরু করলাম। ঠিক তখনই বদ্ধ ঘরে কোথা থেকে একটা দমকা হাওয়া এসে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে আলেসের লেখা পরবর্তী পৃষ্টায় নিয়ে গেল। বুঝলাম আলেস চাইছে যেন আমি ওর লেখা পড়ি। আমার মনে হলো ও দরজা আটকে আমার পালানোর সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন যদি আমি ওর ইঙ্গিত না শুনি তবে এই বদ্ধ লাইব্রেরীতে ও হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে। ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকালাম। দরজায় আবার লেখা উঠলো, “সাহায্য কর বন্ধু। ” তারপর আস্তে করে দরজাটা খুলে গেল। দরজা খুলে যাওয়ায় আমার মনে কিছুটা সাহস ফিরে আসলো। আলেস আমাকে বন্ধু বলে সম্বোধকরেছে! ওর সাহায্যের প্রয়োজন। কিন্তু কেন? শেষ মেষ কি হয়েছিল ওর ভাগ্যে। এসব কৌতুহল আমাকে ওর পরবর্তী পৃষ্ঠা পড়তে বাধ্য করল। সেখানে লেখা ছিল,
“আজ সকালে আমার কোলেই মেয়েটার জ্ঞান ফিরলো। আমি ওকে শুভ সকাল জানালাম। কিন্তু ও ভাবলেশহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তন্মধ্যে রক্ষীরা চলে আসলো। আমাকে এখানে নিয়ে আসার তৃতীয় দিনের মাথায় ওরা প্রথম আমাকে খাবার দিলে। খাবার বলতে ছিল চার টুকরো বাসী পঁচা রুটি আর এক মশক পানি। আমি দুটুকরো রুটি ঐ মেয়েটাকে দিয়ে দিলাম। ও বুভুক্ষুর মত গোগ্রাসে গিললো। খাবার শেষে পানিটুকু আমরা দুজন ভাগ করে খেলাম। স্রষ্টাকে অসংখ্য ধন্যবাদ উনি অভুক্তদের খেতে দিয়েছেন, তৃজ্ঞার্তদের পান করিয়েছেন। আমি এবার মেয়েটার কাছে গিয়ে ওর মাথার ক্ষতটা দেখলাম। সারতে অনেক দেরি হবে মনে হচ্ছে। তবে সেরে যাবে। খেয়াল করলাম ওর নগ্ন দেহে ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে গেছে। সারারাত জ্বলতে জ্বলতে মশালটাও নিভে গেছে। ও ঠান্ডায় মারা যেতে বসেছে। ওকে আবার আমার কোলে নিয়ে আসলাম। প্রথমে বাধা দিলেও এক সময় ও বাধ্য হয়েই এসে আমার কোলে বসল। আমার ছেড়া কাপড়টুকু আমি আমাদের দুজনের দেহের উপর টেনে দিলাম। ও আমার বুকে মাথা গুজঁলো। ও খানিকটা স্থির হলে আমি ওর সাথে কথা বলতে শুরু করিলাম। ও জানালো তার নাম মার্টিনী গুয়েন্থার। ও নিমেসুয়েরার পাহাড়ি গ্রামে থাকতো। ওর বাবা একজন ভেষজ চিকিৎসক। ওর বাবাকে স্থানীয় গীর্জার প্রিস্ট খুন করে। তার অপরাধ ছিলো সে একজন পানিতে ডুবা ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। ছেলেটার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও ওর বাবা ছেলেটাকে বুকে হাত দিয়ে চেপে বাঁচিয়ে ফেলে। প্রিস্টের মতে ছেলেটা মারা গিয়েছিল। কিন্তু ওর বাবা ছেলেটিকে মৃত্যুর ওপার থেকে কালোজাদুর মাধ্যমে ফিরিয়ে এনেছে। এর অপরাধে প্রিস্ট ছেলেটি ও মার্টিনীর বাবাকে শুলে চড়ায়। মার্টিনীকে ডাইনি আখ্যায়িত করে একরাত উলঙ্গ করে বরফে বেধে রাখে। পরদিন ওকে এখানে নিয়ে এসে …… মার্টিনী আর বলতে পারছিলো না। ও ফোঁপিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বুঝে গেলাম প্রিস্ট ওকে সারাদিন ভোগ করে রাতে আমার সেলে ছুড়ে ফেলেছিলো। আমি মার্টিনীকে আরো শক্ত করে আমার বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছুক্ষণ পর ও ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ওকে কোলে নিয়েই আবার লিখতে শুরু করলাম। ”
পৃষ্ঠাটা উল্টাতে গিয়ে খেয়াল হল ওটার অর্ধেকটা আমার চোখের পানিতে ভিজে গেছে। মনের মধ্যে ওসব ধর্ম ব্যাবসায়ী প্রিস্ট বাপিস্টদের প্রতি তীব্র ঘৃনা অনুভব করলাম। তখনই বেডরুমে আমার ফোনটা বেজে উঠে। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে আমার রুমে ঢুকে ফোন ধরলাম। আম্মু ফোন দিয়েছে। আবার আম্মু আমাকে কাঁদতে দেখে ফেলল। জিজ্ঞাস করল আমার বাগদত্তার সাথে কোন সমস্যা হয়েছে কি নাহ। আম্মুকে উল্টাপাল্টা বলে আমি প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলাম। আম্মুর সাথে কথা শেষে চোখমুখ ধুতে বাথরুমে ঢুকলাম। বেসিনে নীচু হয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে যখন মাথা তুললাম তখন আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব ছিলো নাহ। ওটা অন্য একটা মেয়ে ছিলো। আমার অনুভব করলাম এটাই আলেস। আয়নার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর সহ্য করতে পারলাম নাহ। চিৎকার করে বাথরুমে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

দ্রষ্টব্যঃ

লেখিকা বলেছেনঃ আসলে উপন্যাসটিতে সমকামিতা আনতে চাইনি। কিন্তু আমি চাইছিলাম একটা টোটাল উপন্যাস যাতে একসাথে ভয় রোমাঞ্চ প্রেম ভালবাসা থাকবে। প্রথমে ভেবেছিলাম আলেসের সাথে একটা রক্ষীর প্রেম ঘটাবো। কিন্তু সেটা অতিরঞ্জন হয়ে যাবে। সবাই জানে মধ্যযুগীয় রক্ষীরা ভালবাসা বিবর্জিত খুনে লুটেরা টাইপের। তারপর চাইলাম আলেসের সাথে অন্য এক পুরুষ বন্দির প্রেম ঘটাবো। কিন্তু মধ্যযুগে ডাকিনীদের পুরুষ বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা হত। তাই সেটাও অসম্ভব। শেষে বাধ্য হয়েই মার্টিনীকে আনতে হয়েছে।

ডাকিণী (১ম পর্ব)

0

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

আজ আমার নতুন কর্টেজ কিনলাম। ফার্মাসিউটিক্যালস এ নতুন চাকুরী পেয়ে যেন কপাল হঠাৎ খুলে গেছে আমার। পাঁচ মাসের বেতন জমিয়ে কিনে ফেললাম এই কর্টেজটা। বিশাল কর্টেজ। সে তুলনায় প্রায় পানির দামে কিনেছি। ৭০ হাজার ইউরোতে এই বিশাল কর্টেজটা শুধু কপালগুণেই জুটতে পারে। কর্টেজটা আমি পোলিশ সরকারের কাছ থেকে নিলামে কিনেছি। এটা আগে একটা গীর্জা ছিল। সারাটা দিন পুরো কর্টেজ ঘুরে ফিরে দেখলাম। ওনেক পুরাতন বাড়িতেই ভুগর্ভস্থ কুঠুরি থাকে, কিন্তু আমার কর্টেজের ভুগর্ভস্থ কুঠরি বেশ ভিন্ন ধরনের। এক সারিতে পাঁচটা ঘর সবগুলিতেই ধাতব শিখ দিয়ে ঘেরা। কেমন যেন জেলখানা জেলখানা ভাব। উপরে একটা বিশাল লাইব্রেরি পুরাতন বই পুস্তকে ঠাসা। লাইব্রেরীতে কয়েকটা বই ঘাটতেই একটা পুরাতন বাইবেল আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মনে হল বাইবেলটা যেন টেনে আমার হাতটা তার উপর নিয়ে গেল। বাইবেলটার প্রথম পাতা উল্টাতেই একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। বাইবেলের প্রতিটা পাতার একপিঠে ছাপা আর অপর পিঠে কাঠ কয়লায় ছোট ছোট মেয়েলী হস্থাক্ষরে পোলিশ ভাষায় লেখায়। ধর্মকর্মে আমার এতটুকু আগ্রহ নেই তাই বাইবেল বাদ দিয়ে উল্টোপিঠের লেখাগুলি পড়তে শুরু করলাম। লেখার উপরে শিরোনাম ছিল ডাকিণী। প্রথম পাতার সরল বঙ্গানুবাদ হবে অনেকটা এরকম,
“আমি এক হতভাগী। নাম আলেস ভন্টেইজিয়ান। আমাকে ওরা ডাকিণীবিদ্যা চর্চার অপরাধে এখানে ধরে এনেছে। আমার বাবার একটা সরাইখানা ছিল। মা অনেক আগেই মারা গেছেন। গত সপ্তাহে বাবাও মারা যান। বাবার মৃত্যু পর আমিই সরাইখানার মালিক হই ও তাকে হারানোর শোক ভুলে কাজে মন দেই। সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে আসছিলো। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে দুদিন আগে। আমার সরাইখানায় একজন অতীথি মারা যায়। আমার যতটুকু বিশ্বাস লোকটা অতিরিক্ত মদ গিলে অক্কা পেয়েছে। কিন্তু কারা যেন গুজব ছড়িয়ে দেয় আমি নাকি ডাকিণী। আমি বুঝি ডাকিণীবিদ্যা প্রয়োগ করে আমার বাবা আর ওই অতীথিকে খুন করেছি। অতপর গীর্জা থেকে প্রিস্টের নির্দেশে আমাকে এখানে বন্দি করে আনা হল। সরাইখানাটা গীর্জার সম্পত্তি হিসাবে দখল করে নেওয়া হল। ডাকিণীবিদ্যার কিছুই জানিনা আমি। তবুও ওরা আমাকে কষে চাবুক মারল। কতবার আমি ওদের বললাম আমি ডাকিণী নই, আমি আলেস, তোমরা সবাই আমাকে চেন, আমি প্রতি রবিবার গীর্জায় প্রার্থনায় আসি, কিন্তু ওরা কেউ আমার কথা শুনল নাহ। একসময় আমি জ্ঞান হারালাম। তারপর জেগে দেখি আমি এখানে পড়ে আছি। জানিনা আমাকে আরো কত শাস্তি সইতে হবে তবুও আমি পণ করেছি যাই হোক না কেন আমি ডাকিণীর অপবাদ স্বীকার করব নাহ। বাইবেলটা আমার কুঠোরির এক কোণে পড়ে ছিল। মশালের নিচে থেকে এক টুকরা কয়লা নিয়ে পবিত্র বাইবেলে আমি ইশ্বরের নামে শপথ করে লিখছি, আমি ডাকিণী নই। ”
প্রথম পাতা পড়ার পরে মনের অজান্তেই মেয়েটার জন্যে চোখে পানি চলে আসলো। আমি জানতাম মধ্যযুগে মেয়েদের ডাকিণী অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হত কিন্তু কখন ভাবিনী এমন একজন ভিক্টিমের সাথে এভাবে পরিচিত হব। বুঝতে পারলাম আমার কর্টেজটাই সেদিনের গীর্জা ছিল আর কর্টেজের ভুগর্ভস্থ পাঁচ কুঠোরির কোন একটাতেই আলেসকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার পরের পৃষ্টার গতবাধা বাইবেলের লেখা উল্টাতেই আলেসের লেখাটা পেয়ে গেলাম।
“আজ দুদিন হল আমি এখানে আছি। এর মধ্যে এরা আমাকে একফোঁটা পানিও খেতে দেয় নি। একবার আমার প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে আমি ওদের অনেক ডাকলাম কিন্তু কেউ আমাকে বাহিরে নিয়ে গেল না। শেষে বাধ্য হয়েই এক কোণে কাজ সারলাম। হে ঈশ্বর কোন অপরাধে এই শাস্তি দিচ্ছ আমায়। খানি আগে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। মা কে স্বপ্নে দেখলাম আমার জন্যে গোশত আর রুটি নিয়ে এসেছে। তারপর জেগে দেখি একটা ইঁদুর আমার পায়ের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। ওটাকে ধরে ওর গলায় দাঁত ফুটিয়ে দিলাম। দুদিন উপোস থাকার পর এই ইঁদুরের রক্ত আমার পিপাসার্থ গলায় অমৃতসম মনে হল। ইঁদুরটা খানিকটা খাওয়ার পরেই এক পাহারাদার আমাকে দেখে ফেলল। ও চিৎকার করে বলতে লাগল আমি নাকি ইঁদুরটা খেয়ে প্রমান করে দিয়েছি আমি একটা ডাকিণী। আরো কয়েকজন পাহারাদার এসে ওর সাথে যোগ দিল। আমি ওদের বললাম আমি ক্ষুধার্ত হয়েই এটা খেয়েছি কিন্তু ওরা শুনল নাহ। একজন শিখের ফাক দিয়ে হাত গলিয়ে আমার গালে সশব্দে চড় বসিয়ে দিল। আমি মাটিতে পড়ে গেলে ওরা আমার সেলে ঢুকে ইঁদুরের বাকীটুকু নিয়ে গেল, প্রিস্টকে আমার ডাকিণীবিদ্যা চর্চার প্রমাণ দেখাবে বলে। আজ যা ঘটলো তাতে ওদের কাছে আমার ডাকিণী হওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেল। কিন্তু ঈশ্বর তো জানেন আমি ডাকিণী নই, আমি তার একনিষ্ঠ সেবক।”
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি ঢুকরে কেঁদে উঠলাম। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটি মেয়ের উপর চলা অমানুষিক নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা পড়ে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। ফোঁপাতে ফোঁপাতে আমার মায়ের কাছে উদভ্রান্তের মতো ফোন দিলাম। আম্মু আমার লালচে চোখ আর ফোলে উঠা নাক দেখে আতঁকে উঠলো। আমি আম্মুকে আলেসের ব্যাপারে কিছুই বললাম নাহ। শুধু বললাম আম্মু, তোমাকে খুব মিস করছি তাই চোখে জল চলে আসছে। আম্মু কিছুক্ষণ আমাকে খুটিয়ে দেখে একগাল হেসে বলল পাগলী মেয়ে আমার। চিন্তা করিস নাহ। আগামী উইকএন্ডেই আমি তোর নতুন বাসায় বেড়াতে আসব। আমাকে দাওয়াত দিবি তো? আমিও খানিক হেসে বললাম নাহ। তোমাকে দাওয়াত দেওয়ার কি আছে? তোমাকে তো কোলে করে আমার বাড়িতে নিয়ে আসব। এভাবে আম্মুর সাথে কথা বলতে বলতে একসময় মন ভালো হয়ে গেল। সেদিন আর আলেসের ডায়েরি পড়িনি। পাছে যদি আবার মন খারাপ হয়ে যায়। একটা কমেডি মুভি দেখে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। কাল আবার অফিসে যেতে হবে।
সেরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমার কর্টেজের পেছনে কুয়োর পাশেই একটা মাঝারি ক্যাম্পফায়ারের মতো অগ্নিকুণ্ড যা জ্বলতে জ্বলতে একসময় একটা নারীমূর্তির আকৃতি ধারণ করলো, আর পর একটা কর্কশ চিৎকার, আর অগ্নিকুণ্ডটা দপ করে নিভে গেল।
পরদিন সকালে উঠে দাঁত মাজতে মাজতে বাথরুমের আয়নায় চোখ পড়লো। ধুলি মাখা আয়নায় কে যেন ছোট ছোট হস্থাক্ষরে পোলিশ অক্ষরে সাইন দিয়েছে আলেস। চমকে দুপা পিছিয়ে আসলাম। তারপরে ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গিয়ে আয়নায় ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম ওখানে কিছুই লিখা নেই। পুরোটাই ধুলি মাখা। আপন মনেই হাসতে লাগলাম। বুঝলাম এসব অচেতন মনের ফালতু কল্পনা। সেদিন অফিসের শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে বিকালেই ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার মাসিক শুরু হয়েছিল তাই আরো বেশী ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। বিকালে সূর্যালোক থাকতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই কর্টেজের কোন বাতিই জ্বালাই নি। রাত ঘনিয়ে এলে কর্টেজটা অন্ধকারই থেকে যায়। মাঝরাতে একটা করুণ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। অন্ধকার রুমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না আমি। কিন্তু মনে হচ্ছিলো কান্নাটা আমার পাশের লাইব্রেরী থেকেই আসছে।হাতড়ে হাতড়ে রুমের আলো জ্বালিয়ে গেলাম পাশের লাইব্রেরীতে। যাওয়ার সময় আমার ডেজার্ট ঈগল পিস্তলটা সাথে নিলাম। ভাবলাম হয়তো কর্টেজে কোন নেকড়ে ঢুকেছে। রাতে মাঝেমধ্যে নেকড়ের ডাক অনেকটা মানুষের কান্নার মতোই মনে হয়। তাই আমি ঝুকি নিতে চাই না। আমার রুম থেকে বেরুনোর সাথে সাথেই কান্নার আওয়াজটা থেমে গেল। লাইব্রেরীতে গিয়ে আলো জ্বালালাম। লাইব্রেরীতে কিছুই নেই। তবে গতকালের বাইবেলটা ডেস্কে খোলা পড়ে আছে। আমি কাছে গিয়ে দেখলাম গতদিন আলেসের যে দুই পাতা আমি পড়েছিলাম তার পরবর্তী পাতা অর্থাৎ তৃতীয় পাতা বেরিয়ে আছে। যেন আমার পড়ার অপেক্ষায়। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে গতকাল আমি বাইবেলটা বন্ধ করে শেলফে তুলে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ এটা ডেস্কে এলো কিভাবে? ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে বাইবেলটা তুলে আলেসের লেখাগুলি পড়তে শুরু করলাম। ও লিখেছে, …….

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

বুনো শিয়ালের টিলা [শেষ অংশ]

0

ধূপের মালসাটি বিছানার কোণে রেখে য়ংদ্দ এসে আমার সামনে দাঁড়াল। কী যেন বলতে চায় মনে হল।আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কিছু বলবে?

য়ংদ্দ চুপ করে মাথা নীচু করে রইল। তারপর বলল, আপনি আজ এইখান থেইকে চইলে যান বাবু।

চলে যাব। কেন? আমি অবাক।

য়ংদ্দ ইতস্তত করে। তারপর বলল, আপনে এইখান থেইকে এখনি চইলে যান বাবু।

কী বলছ তুমি।মৃদু ধমক দিলাম লোকটাকে। আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। ধমক খেয়েও লোকটা ভড়কে গেল না। বরং বলল, নাইলে বিপদে পড়িবেন।

আমি য়ংদ্দর ওপর বিরক্ত হলাম। কী কারণে চলে যাব সেটাই তো বলছে না।ও স্থানীয় কুসংস্কারগ্রস্থ মানুষ। ওর কথায় আমি যাব কেন? আমার কেমন জেদ চেপে যায়। আজ ভোরে যামিনীরঞ্জন বলল, আজ কার্তিক মাসের সাত তারিখ। আজ রাতে মাইসাং ভিলায় মাইসাং চৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী জাগ্রত হবে। আপনি ভিলা থেকে চলে যান। আশ্চর্য! য়ংদ্দও আমাকে চলে যেতেবলছে। ভাবলাম এদের কথায় এখন ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে ফিয়াট পালিওসটা চালিয়ে সিধে কমলছড়ি থেকে ঢাকায় চলে গেলে ব্যাপারটা হাস্যকর দেখাবে না ?

ভোরে উঠে হাঁটাহাঁটি করি বলে আমি সাধারণত রাত দশটার মধ্যেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ি। তার আগে বিছানায় শুয়ে লেখাটায় একবার চোখবুলাই । মাথার কাছে টেবিলের ওপর কুপি জ্বলেছিল। ম্লান আলোয় পড়ছি। হাতে একটা বল পয়েন্ট। নতুন আইডিয়া এলে লিখে রাখি। এলোমেলো ভাবে লিখছি …,

এক্সটিএক্স-থ্রি গ্রহেরই অন্য একটি অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত উন্নত সভ্যতার আরেকটি নভোচারীর দল অবতরণ করবে। লৌহযুগে। ওদেরও স্মৃতি থাকবে এক্সটিএক্স-থ্রিবাসীর মনে । লিখিত ভাষার আবিস্কার পর তারা স্মৃতিকথা লিখে রাখবে। পরবর্তীতে এক্সটিএক্স-থ্রি গ্রহে উন্নত সভ্যতার বিকাশ হয়। আমাদের স্মৃতিকথাই একমাত্র সত্য- এই দাবিতে এক্সটিএক্স-থ্রিবাসী দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে … লেখাটায় টেকনিক্যাল তেমন কিছু নেই। মহাকাশের দূরতম এক সৌরজগতের একটি গ্রহে ঘটনা ঘটছে বলেই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। এক্সটিএক্স-থ্রি গ্রহের সভ্যতার অগ্রগতি … সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিবর্তন … বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক উন্নতি … আণবিক শক্তির আবিস্কার…স্মৃতিকথা নিয়ে বিভেদ …

দরজার কাছে খুট করে শব্দ হল। মুখতুলে তাকালাম। ঘরের মধ্যে তিনটেআবছা ছায়ামূর্তি আমার দিকে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। এর আগে এদের কখনও দেখিনি তা সত্ত্বেও মাইসাংচৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলীকে চিনতে পারলাম। … আমি জানি ওরা মিথ্যে। ছায়া। মরিচিকা। যামিনীরঞ্জনের গল্প থেকে উঠে এসেছে। এই মুহূর্তে আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কে যেন মাথার ভিতর থেকে বলল …

সোয়েব পালাও। ঘরে গিয়ে গাড়ির চাবি নাও। নীচে ফিয়াট পালিওসটা যাও দেরি করো না

…আমি উঠে দাঁড়ালাম। তারপর দাঁড়িয়ে থাকলাম। মাইসাং চৌধুরি থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমি দাঁড়িয়েই থাকলাম। ভীষণ ঘামছি। তৃষ্ণা টের পেলাম। য়ংদ্দ ! বলে আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার গলায় স্বর ফুটল না।

আমার ঘুম ভেঙে গেল …

ঘরে অন্ধকার। কূপি কখন নিভে গেছে। জানালার কাছে জ্যোস্নার আলো। বাতাসে হালকা ধূপের গন্ধ। এখন ক’টা বাজে? টেবিলের ওপর হাতঘড়িটা আছে । আন্দাজে হাত বাড়ালাম। তিনটে বাজতে দশ মিনিট।লেখাটা পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টেবিলের ওপর একটা জগ আর গ্লাস। অসম্ভব তৃষ্ণা পেয়েছে। পানি খেলাম।

আজ রাতে আর ঘুম হবে না। গায়ে চাদর ধরিয়ে একটি সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। আকাশে পূর্ণিমার ধবধবে সাদা আলোয় কুয়াশার মিশেল । বেশ শীতও করছি। ভিলার পিছনে ঘন বাঁশঝাড়ের দিক থেকে পাহাড়ি শেয়াল ডাক ভেসে এল। ডাকে শরীরের রক্ত জমে যায়। ভালো করে তাকিয়ে নীচে য়ংদ্দ কে দেখলাম। আশ্চর্য! এত রাতে য়ংদ্দওখানে কি করছে? য়ংদ্দর ঠিক পাশে যামিনীরঞ্জন দাঁড়িয়ে । আমি চমকেউঠলাম। লোকটা য়ংদ্দ কে কী যেন বলছিল। কিন্তু, ওখানে … ওখানে যামিনী রঞ্জন কেন? কুয়াশায় কী যেন নড়ছিল। ভালো করে চেয়ে দেখি বুনো শেয়াল। একটি-দুটি নয- অজস্র। গুণে শেষ করা যাবে না। আমি সিগারেটে টান দিতে ভুলে গেছি। কুয়াশা ফুঁড়ে তিনটি ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল। আমি চমকেউঠলাম। আমার হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ল। এদের আমি এর আগে কখনও দেখিনি। তবে মাইসাং থংজা, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী কে চিনতে ভুল হল না। অমঙ্গলী মুখ তুলে ওপরে তাকালো। আমাকে দেখছে?আমি আর ওই দৃশ্য এই মুহূর্তে মায়াছায়া মিথ্যে মরিচিকা ভাবতে পারলাম না । আমি জানি এবার আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে না। আমি তিনটি প্রেত দেখতে পাচ্ছি। যারাঅনেক অনেক দিন আগে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে মরে গিয়েছিল। ঠিক তখুনি আমার মাথার ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল …

সোয়েব! পালাও। ঘরে গিয়ে গাড়ির চাবি নাও। তারপর নীচে নেমে যাও। দেরি করো না। যাও। আমি ঘরে চলে এলাম। টেবিলের ওপর গাড়ির চাবি নেই। আমার বুক ধক করে উঠল…কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কারা যেন উঠে আসছে। আমার পা আটকেআছে। দরজার ওপাশে বুনো শেয়ালরা ভয়ানক গর্জন । আমার চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল ….

আমার চোখেমুখে গরম লাগছিল টের পেলাম । চোখ খুলে একটা গাছ দেখতেপেলাম । ডালপালার ফাঁকে সূর্যেরআলো। গাছটা কৃষ্ণচূড়া বলে মনে হল। কাকপাখিরা সব ডাকছিল। টের পেলাম মাঝ্যাং বিহারের ঠান্ডা চাতালের ওপর শুয়ে আছি।

আমি এখানে এলাম কী করে? আমার পাশে লাল রঙের চীবর পরা সেই বৃদ্ধ ভিক্ষু বসে আছেন। বৃদ্ধেরপাশে একটি তামার পাত্র। তাতে টলটলে পানি। পানিতে কয়েকটি পদ্মপাপড়ি। বৃদ্ধ ভিক্ষু আমার চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। কীঠান্ডা সুগন্ধী পানি। হৃদয়ে গভীর প্রশান্তি অনুভব করলাম …

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুনো শিয়ালের টিলা [৩য় অংশ]

0

মাইসাং চৌধুরির বয়স তখন প্রায় সত্তর। এসব কথা আমি আমার বাপঠাকুর্দার কাছে শুনেছি। সত্যমিথ্যা বলতে পারব না। বলে যামিনীরঞ্জন চুপ করে রইল।

তারপর? আমি ততক্ষণে গল্পের মধ্যে ঢুকে গেছি। কিছুটা আঁচও করতে পারছি। দীর্ঘদিন গল্প লিখলে এ ধরণের ক্ষমতা জন্মায়।

তারপর মানে … ইয়ে আর কী …মাইসাং চৌধুরি নাকি উদ্ভিন্ন যৌবনা অমঙ্গলীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন । ওই বয়েসে … মানে বুঝতেই পারছেন … পথের কাঁটা দূরকরতে মাইসাং চৌধুরি পরিকল্পনা আঁটতে থাকেন।

কথাটা শুনে আমার ভ্রুঁ কুঁচকে যায়। এটাই তাহলে গল্পের ক্লাইমেক্স? বেশ কমন প্লট।

যামিনীরঞ্জন বলল, যামিনীরঞ্জন নামে মাইসাং চৌধুরির এক পোষা গুপ্তঘাতক ছিল।

যামিনীরঞ্জন? আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম।

হ্যাঁ। যামিনীরঞ্জন। বলে লোকটা মাথা নাড়ল।

আপনার … আপনার নামও তো যামিনীরঞ্জন। বলে লোকটার আঙুলের প্রবালের দিকে তাকালাম।

যামিনীরঞ্জন হাসল। আহা, জগতে কত লোকের নামই তো যামিনীরঞ্জন। আহ্, শোনেন না তারপর কী হল। কার্তিক মাসের এক শীতের রাত। যামিনীরঞ্জন ধারালো বার্মিজ কিরিচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঘুমন্ত থিরিথুধম্মার ধড় থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। তারপর বিভৎস মৃতদেহটা মাইসাং ভিলার পিছনে বাঁশবনে ফেলে রাখে । পাহাড়ি শেয়ালরা তার ক্ষতবিক্ষত শরীর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। বলতে বলতে কেমন ফুঁসে ওঠে লোকটা। মুখচোখ কেমন কুঁচকে গেছে।

আমি চমকে উঠলাম । আপনি … আপনি এসব জানলেন কি করে?

যামিনীরঞ্জন কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, আহা, তখন আমি বললাম কী। বললাম না আমি এসব বাপঠাকুর্দার মুখে শুনেছি। সত্যিমিথ্যা জানি না।

আমি চুপ করে থাকি। ক্লাইমেক্সটা হঠাৎ করেই বিভৎস রূপ নেয়াতে অস্বস্তি বোধ করতে থাকি।

যামিনীরঞ্জন বলল, কার্তিক মাসেরসাত তারিখ রাতে যামিনীরঞ্জন থিরিথুধম্মা কে খুন করে । ওদিকে কী হল শুনুন। অমঙ্গলী থিরিথুধম্মার সাধনসঙ্গিণী ছিল বটে, তবে থিরিথুধম্মার মৃত্যুর পর অমঙ্গলী বৃদ্ধ চৌধুরির মনোরঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু, কী এক অজ্ঞাত কারণে থিরিথুধম্মার মৃত্যুর এক বছর পরই ওই কার্তিক মাসেরই সাত তারিখ রাতে ধারালো বার্মিজ কিরিচ দিয়ে হাতের শিরা কেটে অমঙ্গলী আত্মহত্যা করে।

ওহ্। বেশ গোছানো প্লট। আমি গল্প লিখে আনন্দ পাই, আর যামিনীরঞ্জন গল্প বলে আনন্দ পায়। এ ধরণের কল্পনাপ্রবণ মানুষ আমি এর আগেও ঢের দেখেছি।

যামিনীরঞ্জন বলে চলেছে, অমঙ্গলীর আত্মহত্যার পর মাইসাং চৌধুরি নাকি উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। মাইসাং ভিলার পিছনে বাঁশবনে আনারস ক্ষেতে মূল্যবান রত্নপাথর ছড়াতেন। পাহাড়ি শিয়ালের ডাক শুনলে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বন্দুক দিয়ে গুলি ছুঁড়তেন। অমঙ্গলীর আত্মহত্যার ঠিক এক বছর পর কার্তিক মাসের সাত তারিখ রাতে একটি ছায়ামূর্তি ঘুমন্ত মাইসাং চৌধুরি বুকে বার্মিজ কিরিচ ঢুকিয়ে খুন করে। বলে চুপ করে রইল। আমি চেঙ্গী নদীর জলের শব্দ শুনছি। দীর্ঘশ্বাস ফেলব কিনা ভাবছি।

একটু পর নিরবতা ভেঙে যামিনীরঞ্জন বলল, মাইসাং চৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী… এরা তিনজন আজও কার্তিক মাসের সাত তারিখ রাতে মাইসাং ভিলায় ফিরে আসে।

কথাটা শুনে আমি চমকে উঠলাম না। কারণ এই কথাটা বিশ্বাসযোগ্য না।মৃত ব্যাক্তির ফিরে আসা ভৌতিক কাহিনীর খুবই একটা কমন প্লট। যা একুশ শতকের লেখকেরা এড়িয়েই যান।তবে ক্যামেরার কাজ ভালো হলে এ ধরনে হরর ফিলম বেশ উপভোগ্যই হয়।

যামিনীরঞ্জন উঠে দাঁড়াল। গায়ে ভালো করে চাদর জড়িয়ে বলল, আজ কার্তিক মাসের সাত তারিখ। আজ মধ্যরাতে মাইসাং চৌধুরি, থিরিথুধম্মা আর অমঙ্গলী মাইসাং ভিলায় জাগ্রত হবে। আপনি আজই এখান থেকে চলে যান। নইলে বিপদে পড়বেন । বলে লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলেন। একটু পর কুয়াশায়মিলিয়ে গেল।

আমি পাথরের বসে থাকি। মনের মধ্যে ক্ষীণ অস্বস্তি পাক খাচ্ছে। মাঝ্যাং বিহারে যাওযার ইচ্ছে ছিল। মনটা দূষিত হয়ে যাওয়ায় আজ আর মাঝ্যাং বিহারে যাব না ঠিক করলাম। মনের মধ্যে অস্থিরতা নিয়ে মাইসাং ভিলায় ফিরে এলাম।

বাথরুম থেকে ফিরে একটা সিগারেট ধরালাম। তারপর দোতলায় বারান্দায় বসলাম। আটটার মতন বাজে। কার্তিক সকালের টলটলে রোদ। বাতাসে সূর্যমূখি ফুলের গন্ধ। য়ংদ্দ চা নিয়ে এল। তাকে কেমন গম্ভীর দেখালো। তার হলদে মুখটি কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। কী যেন বলতে চায়। যামিনীরঞ্জন আজ যে গল্পটা বলল তা কি য়ংদ্দ জানে? য়ংদ্দ কদ্দিন ধরে মাইসাং ভিলা তে আছে?

সকাল বেলাটায় লিখে কাটল। মহাকাশের দূরতম এক সৌরজগতের এক গ্রহে পৃথিবীর নভোচারীরা অবতরণ করেছে। এদের মধ্যে বাঙালি নভোচারী সায়েম হকও রয়েছে । গ্রহটির একটি ডিজিটাল নাম দিয়েছি। এক্সটিএক্স-থ্রি।এই অবধি লিখেছি। কাহিনীতে এখনও ক্লাইমেক্স আনতে পারছি না। ক্লাইমেক্স ছাড়া গল্প জমবে না। লিখতে- লিখতে যামিনীরঞ্জনের গল্পটা কখন ভুলে গেছি …

দুপুরে খেতে বসে দেখি য়ংদ্দ ছোট ছোট পাহাড়ি আলু দিয়ে বনমোরগের মাংস রেঁধেছে । ঝাল ঝাল স্বাদ । লালচে ধোওয়া ওঠা জুমভাতের সঙ্গে মাখিয়ে খেতে ভালোই লাগছিল। বুনো জলপাইয়ের আচার ভাতের আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

লেখায় বিষম ঘোর লেগেছিল। লিখে- লিখেই দুপুর আর বিকেলটা কেটে গেল। সন্ধ্যার ঠিক আগে-আগে আজকের মতো লেখা শেষ করলাম। নীচের বাগানের সূর্যমূখীর ঝাড় খুব টানছিল। ভাবছি নীচে নেমে একবার বাগানে যাব কিনা। ঠিক তখনই চা নিয়ে এল য়ংদ্দ । একটা সিগারেট ধরালাম। য়ংদ্দ কী এক বুনোপাতা মিশিয়েছে চায়ে; লেবু -লেবু স্বাদ। আশ্চর্য! দুধ চায়ে কেমন লেবু-লেবু স্বাদ! বেশ লাগছিল কিন্তু চুমুক দিতে। দুধটাও টকে যায়নি।

সন্ধ্যার পর টলটলে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে পড়ল । বেশ কুয়াশা ছড়িয়েছে। আমি সাধারণত সন্ধ্যার পর লিখি না। তাছাড়া মাইসাং ভিলায় ইলেকট্রিসিটিও নেই। বারান্দায় শীত করছিল। ঘরে এসে গায়ে চাদর জড়িয়ে একটা ইজিচেয়ারে বসেছি। য়ংদ্দ কূপি জ্বালিয়ে এনে টেবিলের ওপর রাখল। সন্ধ্যার পর মশা তাড়ানোর জন্য ধূপও জ্বালায় । এদিকটায় মশার ভীষণ উৎপাত। দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। অবশ্য ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় ঔষুধপত্র সবই এনেছি।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুনো শিয়ালের টিলা [২য় অংশ]

0

বুদ্ধমূর্তির সামনে পদ্মাসনে বসে বৃদ্ধ ভিক্ষু। ধ্যানে বসেছেন মনে হল। বৃদ্ধের পরনে লাল রঙের চীবর। মসৃনভাবে মাথা কামানো। গভীর প্রশান্তময় দৃশ্যটা আমার অত্যন্ত ভালো লাগছিল। আমি নিঃশব্দে কক্ষের ভিতরে ঢুকে বৃদ্ধের পাশে বসলাম।চোখ বুজতেই গভীর এক অনুভূতিতে ডুবে গেলাম।

কতক্ষণ যে ধ্যানের মধ্যে কাটল …

চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি বৃদ্ধ ভিক্ষু আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে ক্ষীণ বিস্ময়ের রেখা। চওড়াকপালে ভাঁজ পড়েছে। বৃদ্ধের পাশেএকটি বড় তামার পাত্র। তাতে টলটলে পানি। পানিতে কয়েকটি পদ্মপাপড়ি। বৃদ্ধ একটি পদ্ম পাপড়ি তুলে আমার দিকে ছুড়ে দিলেন। কী ঠান্ডা আর সুগন্ধী পাপড়ি। হৃদয়েগভীর প্রশান্তি অনুভব করলাম। আমি তখনও বুঝিনি যে ওই মন্ত্রপূতঃ পদ্ম পাপড়িটি আমাকে ভয়ঙ্কর এক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দেবে। বৃদ্ধ ভিক্ষু কোনও কথা বলছেন না। কোনও প্রশ্নও করছেন না। তিনি হয়তো মৌনব্রত পালন করছেন। আমি তাকে বিরক্ত না করে একটু পর বিহার থেকে বের হয়ে এলাম।

আজও খুব ভোরে হাঁটতে বেরিয়েছি। গায়ে চাদর জড়িয়ে কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে পাকদন্ডীর পথ বেয়ে নীচে নামছি। একটা বুনো শেয়াল ওদিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। মনের মধ্যে কেমন একটা ক্ষীণ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। রাতে একবার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারপর আর ঘুম হয়নি। ঘরে আবছা অন্ধকার। জানালার কাছে চাঁদের আলো। ঘরের মধ্যে কে যেন। য়ংদ্দ? না। দরজা তো বন্ধ। বাতাসে হালকা ধূপের গন্ধ। নারীমূর্তি মনে হল। চেয়ারের ওপর রাখা আমার ব্যাগের ওপর ঝুঁকে কী যেন দেখছে। হ্যালুসিনেশন? বুঝতে পারলাম না। তারপর আর কাউকে দেখতে পাইনি… রেম্রাচাই চৌধুরির ঠাকুরর্দানাকি তার বেডরুমে খুন হয়েছিলেন।আমি দোতলার যে ঘরে থাকি সেই ঘরটাই মাইসাং চৌধুরির বেডরুম কিনা বলতে পারব না। কই, য়ংদ্দ তো এ নিয়ে আমাকে কিছু বলল না। ওকি জানে মাইসাং ভিলাটি অভিশপ্ত? কিন্তু, রাতে আমি ঘরে কাকে দেখলাম? আমার মনের মধ্যে অস্বস্তির এই কারণ …

বড় একটি পাথরের ওপর চেঙ্গী নদীর পাড়ে এত ভোরে একজন লোক বসে আছে দেখে আমি অবাক হলাম। কে লোকটা? মাঝবয়েসি লোকটার গায়ে ছাই- ছাই রঙের নকশাদার বার্মিজ চাদর; মাথায় কমলা রঙের উলের নেপালি টুপি। ছোটখাটো গড়নের লোকটা স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কেউ? ঠিক বোঝা গেল না। ধীরে ধীরেহেঁটে লোকটার কাছে গেলাম। বাঙালি বলেই মনে হল। বেশ কালোই মুখের রং, ভাঙ্গা চোয়ালে খোচা খোচা পাকা দাড়ি গোফ। আমাকে দেখে দু’হাত জড়ো করে সাবলীল ভঙ্গিতে বললন, নমস্কার।

আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম।

লোকটার দীর্ঘ কালো সরু আঙুল। মধ্যমায় টকটকে লাল রঙের প্রবাল।কী কারণে মনে পড়ে গেল রেম্রাচাই চৌধুরির ঠাকুরর্দা মাইসাং চৌধুরির আরাকানে রত্নপাথরের ব্যবসা ছিল।

লোকটা বলল, আমার নাম যামিনীরঞ্জন। থাকি লংগদু। আমার পূর্বপুরুষ অবশ্য বার্মায় সেটল করেছিলেন। এখন কাঠের ব্যবসা করি। লিজ নেওয়ার জন্যেই এদিককার জঙ্গল দেখতে এসেছি। তা আপনি?

আমি আমার পরিচয় দিলাম।

যামিনীরঞ্জন বলল, বসুন না।

বড় একটি পাথরের ওপর আমি পা ঝুলিয়ে বসলাম। এই নির্জন ভোরে কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না যদিও- তবে আমি লেখালেখি করি বলেই হয়তো মধ্যমায় টকটকে লাল রঙের প্রবাল পরা লোকটা সম্বন্ধে ভারি কৌতূহল হচ্ছিল আমার।

যামিনীরঞ্জন জিজ্ঞেস করল, তা, আপনি এদিকে কোথায় এসেছেন?

আমি উঠেছি এই কাছেই। মাইসাং নামে একটি ভিলায়।

যামিনীরঞ্জন চমকে উঠল মনে হল। তারপর অদ্ভূত চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি লোকটাকে আশ্বস্ত করার জন্য চট জলদি বললাম, এখানকার চৌধুরি পরিবারে ছোটছেলে রেম্রাচাই চৌধুরি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। আমি একটা উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছি। শহরের হৈহল্লা আমার ভালো লাগছিল না। লেখাটা শেষ করব বলে নিরিবিলি একটা জায়গা দরকার ছিল আমার । রেম্রাচাই চৌধুরিদের কমলছড়িতে একটা ভিলা আছে জানতাম । ওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সিধে কমলছড়ি চলে এলাম।

কবে এসেছেন? যামিনীরঞ্জনের কন্ঠস্বর কেমন গম্ভীর শোনালো।

এসেছি গত পরশু বিকেলে। বললাম। চারিদিকে তাকালাম। দূরে চেঙ্গী নদী নদীতে একটি সাম্পান। ধূসর কুয়াশার ভিতর দৃশ্যটা কেমন অলৌকিক দেখায় । একটা সিগারেট ধরাবো কিনা ভাবলাম।

হুমম। বুঝেছি। তা আপনি মাইসাং চৌধুরি নাম শুনেছেন তো? যামিনীরঞ্জন জিগ্যেস করলেন।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। শুনেছি। তিনি রেম্রাচাই চৌধুরির ঠাকুরর্দা।

হ্যাঁ। এই কমলছড়িতে এককালে মাইসাং চৌধুরি বিস্তর প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। আগে তার পরিবার মাটিরাঙ্গা ছিলেন । পরে কমলছড়ি চলে আসেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মায় বাঙালি কুলি সরবরাহ করে মাইসাং চৌধুরি বিস্তর অর্থসম্পদের মালিক হন। কমলছড়িতে টিলা ইজারা নিয়ে একটি ভিলা তৈরি করেন। বলে যামিনী রঞ্জন চুপ করে রইল। একটু পর এদিক -ওদিক চেয়ে লোকটা বলল, আমি আমার বাপ-ঠাকুর্দার কাছে শুনেছি মাইসাং চৌধুরি লোকটা নাকি আধা-উন্মাদ ধরনের ছিলেন। বুনো শিয়াল পুষতেন। যে জন্য স্থানীয় লোকেরা মাইসাং চৌধুরির টিলাকে বুনো শিয়ালে টিলা বলে। মাইসাং ভিলার পিছনে বাঁশবনে ভিতরে একটি দালানে মধ্যরাতে গুপ্ত তান্ত্রিক সাধনা করতেন মাইসাং চৌধুরি । অবশ্য অতি গোপনে । এই সাধনাই তার জীবনে কালহয়ে দাঁড়ায়।

কি ভাবে? আমি কৌতূহল বোধ করি। গল্পের আবহ পাচ্ছি। আমি কেবল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীই যে লিখি তা নয়, রহস্য গল্পও লিখি।

বলছি। যামিনীরঞ্জন বলল। ধীরে ধীরে চারধারে রোদ ফুটে উঠছিল। চেঙ্গী নদীর পাড়ের গাছপালায় কাকপাখিরা ডাকছিল। নদীতে একটা সাম্পানে একজন কিশোর দাঁড়িয়ে লগি ঠেলছিল । আমার একবার মাঝ্যাং বিহারে যাবার ইচ্ছে ছিল। বুদ্ধমূর্তির সামনে লাল রঙের চীবর পরা বৃদ্ধ ভিক্ষুর ধ্যানরত গভীর প্রশান্তময় দৃশ্যটা আমাকে টানছিল।

যামিনীরঞ্জন বলল, ব্রিটিশ আমলেরকথা। আমি আমার বাপঠাকুর্দার কাছে শুনেছি। আরাকানের রাহেংনগর থেকে থিরিথুধম্মা নামে এক আরাকানি বৌদ্ধ তান্ত্রিক কী কারণে কমলছড়ি পালিয়ে এসেছিল। থিরিথুধম্মার সঙ্গে ছিল অমঙ্গলী নামে এক অত্যন্ত রূপবতীএক যুবতী । অমঙ্গলী ছিল থিরিথুধম্মার সাধনসঙ্গিনী। থিরিথুধম্মা তান্ত্রিক বৌদ্ধ শুনে মাইসাং চৌধুরি তাকে মাইসাংভিলায় আশ্রয় দেন।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

বুনো শিয়ালের টিলা [১ম অংশ]

0

রেম্রাচাই চৌধুরি বলল, আমার ঠাকুরর্দা মাইসাং চৌধুরি তাঁর বেডরুমে খুন হয়েছিলেন। তুমি কিন্তু মাইসাং ভিলার দোতলার বেডরুমে রাতে থেকো না শোয়েব।

তথাস্তু। আমি বললাম। আমি একটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখায় হাত দিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিলাম কমলছড়ি চলে যাব। তখনও বুঝিনি যে কী ভয়ঙ্কর এক বিপদের মুখোমুখি হতে চলেছি … বুনো শিয়ালের ডাকে আমার শরীরের রক্ত জমে যাবে …

ঢাকা শহরে বড় হৈহল্লা। লেখাটা শেষ করার জন্য নিরিবিলি একটা জায়গা চাই। আমার বন্ধু রেম্রাচাই চৌধুরিদের কমলছড়িতে একটা ভিলা আছে শুনেছি; ওকে ফোন করলাম। ও অবশ্য এটা-ওটা বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কমলছড়ির মাইসাং ভিলাটা নাকি ভালো না। অভিশপ্ত। ওদের পরিবারের কেউই নাকি দীর্ঘদিন ধরে কমলছড়ির মাইসাং ভিলায় যায় না। আমি ওর কথায় পাত্তাই দিলাম না। উলটো ওকে বললাম, অভিশপ্ত হলেতো ভালোই। বেশ একটা লেখার প্লট পেয়ে যাব। আমার কমলছড়ি যাওয়ার ব্যাপারে রেম্রাচাই চৌধুরি যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হয়েছিল।

সিলভার কালারের ফিয়াট পালিওসটা চালিয়ে সিধে কমলছড়ি চলে এলাম। (রেম্রাচাই চৌধুরি ডিটেইস ঠিকানা বলে দিয়েছিল) জায়গাটা খাগড়াছড়ি সদরের বেশ খানিকটা পুবদিকে । মাঝখানে পাথর ভরতি খরস্রোতা একটি পাহাড়ি নদী; সে নদীর নাম চেঙ্গী । সে পাহাড়ি নদীর নির্জন তীর ঘেঁষে বাঁশবনে ঘেরা বেশ উঁচু একটি টিলায় পিচ রাস্তার পাকদন্ডীর পথ ঘুরে ঘুরেউঠে গেছে । দু’ পাশে দীর্ঘ ইউক্যালিপ্টাস গাছ। ফিয়াটটা নিয়ে ওপরে ওঠার সময় ইঙ্গিনের শব্দে শিশির ভেজা পাতার ওপর দিয়ে একটি খরগোশ কি দুটি কাঠবেড়ালী সুরুৎ সুরুৎ এদিক- ওদিক পালিয়ে যাচ্ছিল।

টিলার ওপরে অনেকটা হলদে সূর্যমূখীর বাগান। একপাশে পেঁপে, লিচু, সফেদা আর পাহাড়ি কলার বোঝ ছাড়াও মাল্টা, কমলা, আগর আর কফিগাছও চোখে পড়ল। টিলা থেকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ঢালে আনারসের ক্ষেত। ভিলার পিছনে ঘন বাঁশঝাড় । তার ভিতর দিয়ে একটা সরু পথ। ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা পাকা দালানোর মতন কাঠামো চোখে পড়ল। জিনিসটা যে কী তা ঠিক বোঝা গেল না। তবে বুনো শেয়াল দেখলাম। একসঙ্গে বেশ ক’টা বন্য শৃগাল দেখে অস্বস্তিই লাগল।

আরাকানি স্টাইলের বার্মা টিকের কালো রঙের কাঠের দোতলা বাড়িটিই ‘মাইসাং ভিলা’ । এক তলায় বিশাল বারান্দা, কাঠের মেঝে, বিশাল বৈঠকখানা। আসলে ভিলাটির একতলা আর দোতলায় রুমগুলি বেশ বড়-বড়। বেশ আলোবাতাস খেলে। সবচে বড় কথা হল ভিলাটি ভারি নির্জন। লেখালেখির জন্য ভারি উপযুক্ত।

একতলার বৈঠকখানার দেয়ালে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বুঝছে পুরনো আমলের একটি গাদা বন্দুক, একটি বুনো শিয়ালের স্টাফ-করা মাথা আর বারো ইঞ্চি একটি বার্মিজ কিরিচ। দেয়ালের অন্য পাশে একজন বৃদ্ধের রঙিন একটি তৈলচিত্র টাঙ্গানো । ইনিই সম্ভবত রেম্রাচাই চৌধুরির ঠাকুরর্দা মাইসাং চৌধুরি । কিছুটা মঙ্গেলয়েড চেহারার বেশ সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ। পরনে শেরওয়ানি। মাথায় পাগড়ি। কোমরে তরবারি ঝুলছে। কমলছড়িতে এককালে নাকি রেম্রাচাই চৌধুরির পরিবারের বেশ প্রভাবপ্রতিপত্তিছিল। মাইসাং চৌধুরিই পরিবারের কর্তা। আরাকানে রত্ন পাথরের ব্যবসা ছিল। রেম্রাচাই চৌধুরির মুখে শুনেছি ইনিই ব্রিটিশ আমলে মাইসাং ভিলাটি তৈরি করেছেন । রেম্রাচাই চৌধুরি যে ঠাকুরর্দার গল্প করত- তা কিন্তুনয়; বরং কী এক অজ্ঞাত কারণে এড়িয়েই যেত। রেম্রাচাই চৌধুরি পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকাতেই থাকে। পাকিস্তান আমল থেকেই নাকিতারা কমলছড়ি আসে না। কেন আসে না -সেও এক রহস্য।

মাইসাং ভিলা দেখাশোনার জন্য একজন কেয়ারটেকার আছে । ছোটখাটো হলুদাভ গড়নের

মাঝবয়েসি স্থানীয় আদিবাসী লোকটার নামটি ভারি অদ্ভূত – য়ংদ্দ । (জানি না সঠিক বানান লিখতে পারলাম কিনা ) য়ংদ্দ সব্যসাচী ধরণের লোক; বাগানে মালির কাজও করে দেখলাম। টিলার খাড়া ঢালে আনারস ক্ষেতে উবু হয়ে বসে থাকে। ওই গড়ানো ঢালে কীভাবে যে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখে সেটাও একটা বিস্ময়।

আমি আবার ঘন ঘন চা খাই। টি-ব্যাগআর গুঁড়ো দুধের কৌটো সঙ্গেই এনেছি। চিনি আনতে ভুলে গেছি। য়ংদ্দকে বাজার করার জন্য টাকা দিয়েছি; কাছেই একটা বাজারে গিয়ে বাজার-টাজার করে ফিরে আসার সময় এক কেজি চিনিও নিয়ে এল । লোকটা বাংলা বলতে পারে কিনা সে বিষয়ে আমার খানিকটা সন্দেহই ছিল। তবে বাজারের টাকা ফেরত দেবার সময় বুঝলাম য়ংদ্দ কেবল বাংলা ভালোই বোঝে না, চমৎকার বাংলা বলতেও পারে।

কার্তিক মাসের শুরু। সকাল-সন্ধ্যায় টিলার বাঁশঝাড়ে আর আনারস ক্ষেতের ওপরে হালকা কুয়াশা ছড়িয়ে থাকে। দোতলার পুব দিকের বারান্দায় বসে লিখি। গায়েউষ্ণ রোদ এসে পড়ে। ভারি আরাম লাগে আমার। কমলছড়ি মাস দুয়েক থাকব। আশা করি ততদিনে লেখাটা শেষ করে ফেলতে পারব।

কমলছড়ি আসার পরদিন সকালেই রেম্রাচাই চৌধুরির ফোন পেলাম। ( মোবাইলে তখনও সামান্য চার্জ ছিল)

কি সোয়েব? অসুবিধে হচ্ছে না তো?

আরে না না। রাজার হালে আছি। তোমাদের এই য়ংদ্দ কিন্তু বেশ।

অস্বাভাবিক কিছু দেখলে নাকি?

না,না। এখনও দেখিনি। কপাল মন্দ হলে যা হয় আর কী!

সাবধানে থেকো কিন্তু।

আচ্ছা, থাকব।

রেম্রাচাই চৌধুরি কিছু বলার আগেই মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যায়। যাক, সমস্যা নেই। আমি তো ওই জিনিসটা কমলছড়ি পৌঁছেই অফ করে রাখব ভেবেছিলাম।

খুব ভোরে উঠে গায়ে চাদর জড়িয়ে হাঁটতে বেরোই। টিলা থেকে কুয়াশাছড়ানো পাকদন্ডীর পথ দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসি নীচে। শব্দহীন নির্জন চেঙ্গী নদীটি ভোরবেলা ছবির মতন স্থির হয়ে থাকে । নদীর পাড়ে পাড়ে বড়-বড় পাথর। তারই একটার ওপর বসে থাকি। অনেকক্ষণ। তরুণ বয়েসে ধ্যান করতাম। সেই নির্মল অনুভূতি অনেক বছর পর আবার ফিরে পেলাম।

চেঙ্গী নদীর পাড় ঘেঁষে একটা পুরাতন বৌদ্ধবিহার। বিহারের তোরণদ্বারের ওপরে এক সিমেন্টের স্ল্যাবের ওপর বাংলায় লেখা: ‘কমলছড়ি মাঝ্যাং বিহার’। দু-একটিঅক্ষর ক্ষয়ে গেছে। ঠিকমতো বোঝা যায় না। তোরণদ্বারের বাঁ পাশে বিশাল একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। ভিতরে অপরিসর একটি সিমেন্টের চাতাল। চাতালে অজস্র শুকনো পাতাপড়ে ছিল । উবু হয়ে চটি খুলে ভিতরে পা বাড়ালাম। ধূপ ধূপ একটা মিষ্টি গন্ধ ভাসছিল বাতাসে। বিহারের উত্তর দিকে বড় একটা কক্ষে কাঠের একটি বুদ্ধমূর্তি ।প্রায় আট ফুট উঁচু।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

আমি শাহাজাদা [শেষ অংশ]

0

আমি বিস্ময় চেপে তরুণকে ইঙ্গিতেবসতে বললাম। তারপর প্রেসক্রিপশনের প্যাডটা টেনে স্বভাবসুলুভ ভঙ্গিতে জিগ্যেস করলাম, শুনি, কি সমস্যা?

আমার কোনও সমস্য নেই স্যার। তরুণটি বলল।

সমস্যা নেই মানে ? আমি মুখ তুলে তরুণের মুখের দিকে তাকালাম। টিউবলাইটের আলো এসে পড়েছে। কী আশ্চর্য কমনীয় মুখ। রূপটান ব্যবহার করে বলে মনে হল।

তরুণটি বলল, আমি … আমি শাহাজাদা স্যার।

তুমি শাহজাদা মানে? আমি আকাশ থেকে পড়লাম। চেনা চেনা মুখ। চেনা চেনা আতরের গন্ধ পাচ্ছি। । তবে মনে করতে পারছি না সবটা।

আমি ইবনে ইয়াসিনের নাতি স্যার।

আমার বিস্ময় কাটছিলই না। পালটা প্রশ্ন করলাম, আমি ইবনে ইয়াসিনের নাতি মানে?

শাহাজাদা নামে তরুণটি বলল, কেন আপনার মনে নেই অনেক বছর আগে

এক রাতে ট্রাকের সঙ্গে আমার নানা ইবনে ইয়াসিনের ধাক্কা লেগেছিল।

আপনি নানার প্রাথমিক চিকিৎসা করলেন। তারপর আমাদের ডালিম বাগানের বাড়িতে গেলেন। নানীর হাতের রান্না খেলেন। তারপর আমারনাম রাখলেন। আমার মায়ের নাম জান্নাত আরা স্যার। কেন আপনার মনে নাই?

আমার মনে আছে। আমি শীতল কন্ঠে বললাম। ভিতরে ভীষণ কাঁপুনি টের পাচ্ছি। এও কি সম্ভব?

শাহজাদা বলল, কুসুমপুরে আমি ব্যবসার কাজে এসেছিলাম স্যার। আপনার মনে নাই আমার আব্বা আন্দালিব সুলতানগঞ্জে নাশপাতি আর পেস্তার ব্যবসা করতেন। আব্বার ব্যবসা এখন আমিই দেখাশোনা করছি। ভাবলাম কুসুমপুর যখন এসেছি তখন আপনার সঙ্গে একবার দেখা করেই যাই।

বেশ। তো, তোমার নানা কেমন আছে?

ভালো। নানা গতবছর একটা বিয়ে করছেন।

ওহ্!

আমি এখন যাই সার। ওরা অপেক্ষা করছে। বলে শাহজাদা অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি অনেক ক্ষণ চেম্বারে বসে ছিলাম। মুসলমান বলে জিন বিশ্বাসকরি তাই বলে এভাবে জিন দেখব ভাবতেই পারিনি। ব্যাপারটা আমার কাছে আজও এক অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা মনে হয়। সে যা হোক। তারপর আমি মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। টেনিস বলের সমান মিষ্টির সাইজ দেখে তোর মামী তো অবাক। অবাক আমিও । তোদের মামী মৃদু সমালোচনা করে বললেন, ধ্যাত,কালোজামের সাইজ এত বড় হয়? কোন্ দেশের রুগী? আমি এড়িয়ে গেলাম।

নীলু বলল, শাহাজাদা জিন ছিল মামা?

রবিন মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, আহ! রাবুমামা তাহলে এতক্ষণ কী বলল । শাহাজাদা জিন না হয়ে যায়ই না।

মুনিয়া বলল, মামা।

বল।

তুমি তখন বললে না যে হর্ন বাজিয়েএকটি ট্রাক চলে যায়।

হ্যাঁ।

তারপর বললে হঠাৎ দেখি রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধ পড়ে আছে। তাকে ট্রাক ধাক্কা দিল মনে হয়।

হ্যাঁ।

জিনদের কি ট্রাক ধাক্কা দিতে পারে মামা? ওরা না আগুনের তৈরি?

হুমম। আমিও কথাটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। সত্যিই ওদের অনেক ক্ষমতা। আমি নিজের চোখে দেখেছি।যখন- তখন তারা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। ওই যে বললাম, সে রাতে আমি রাজারহাটের ডালিমবাগানে যা দেখেনি তা আমি আজ অবধি গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারিনি।

নীলু বলল, এর কুড়ি বছর পর তুমি আবার ইবনে ইয়াসিনের নাতী শাহাজাদাকে দেখলে।

হুমম।

রবিন কী বলতে যাবে-রাবুমামা ওকেথামিয়ে বললেন, চল, এখন শুয়ে পড়ি। অনেক রাত হয়েছে। আর বেশ শীতও পড়েগেছে। কাল আবার ঝিলাই নদীর চরে পিকনিক। সকাল সকাল বেরুতে হবে …চল …

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের