ধুপ [শেষ অংশ]

1

wWw.ThumperDC.COM  -  013

নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য চুপ করে থাকেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই নির্জনতায় দীর্ঘশ্বাস পরিস্কার শোনা যায়। প্রায় অনুচ্চস্বরে বললেন, অর্চনাকে তারা পুড়িয়ে মেরেছিল কার্তিক মাসে। বলে বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আজও কার্তিক মাসে পুরানবাড়িতে অর্চনা ফিরে আসে। সন্ধ্যায় ধূপ জ্বালায়। আপনাদের দারোয়ান সোলাইমান সবই জানে। ছেলেটা বড় ভালো। চাঁদসাধুর শিষ্য। তার ওপরসাধুর আর্শীবাদ আছে। ঘরসংসার করেনি। ধর্মকর্ম নিয়ে আছে। বছরে একবার অর্চনাকে দেখার আশায় বেঁচে আছে।
অর্চনাকে দেখার আশায় বেঁচে আছে মানে? শওকতকে কেমন হতবাক বিমূঢ় দেখায়।
দুই জনের বেশ ভাব। ভাইবোনের সর্ম্পক। হাজার হলেও সোলাইমানের ধর্মপিতা সালামত আলীকে অর্চনা বাবা ডেকেছিল। কার্তিক মাসের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে সোলাইমান।
এসব … এসব কথা আমাদের আগে বলেননি যে? শওকত অস্ফুটস্বরে জিগ্যেস করে।
আমি জানতাম আপনারা এসে আমাকে পুরানবাড়ির রহস্য সম্বন্দে জিজ্ঞেস করবেন। আমি আগ বাড়িয়ে এসব কথা বলে আপনাদের মিছিমিছি আতঙ্কগ্রস্থ করতে চাইনি।
ওহ। শওকত ভাবল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচায স্বশিক্ষিত বলেই বিচক্ষণ। সে বলল, এখন … এখন কি করা যায় বলেন তো ? আমরা কি পুরান বাড়ি ছেড়ে দেব?
সে আপনাদের ইচ্ছে। বলে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য উঠে চলে গেলেন।
বাড়ি ফিরে আসার পথে চাঁদপিরের গলির মুখ থেকে দৈনিক পত্রিকা কিনল শওকত। ঝরঝরে রোদ উঠেছে। আজ শুক্রবার। অফিস যাবার বালাই নেই। কলিংবেল চাপার পর দরজা খুলল রাইসা। আজ এত সকালে উঠেছে বলে অবাক হল শওকত। রাইসা সাদা রঙের ফ্রক পরে আছে। মাথায় লম্বা সোনালি চুল। কী টলটলে মায়াবী চোখ। রাইসার হাতে একটা বাটি। বাটিতে কী মুড়কি।
মাথায় নেড়ে বলল, মা কই রে?
আম্মু, রান্নাঘরে ।
ড্রইংরুমে টিভিটা অন করা। কার্টুন ছবি চলছে। রাইসা দেখছিল। শওকত বারান্দায় চলে আসে। আজ রওশন আপাদের আসার কথা। বাজারে যেতে হবে। বাজারটা নবীগঞ্জে। নবীগঞ্জের বাজারে টাটকা রুইমাছ পাওয়া যায়। রওশন আপা রুইমাছ পছন্দ করেন।
তানজিনা চা নিয়ে এল। বলল, তোমাকেএখন খিচুড়ি গরম করে দেব?
না। বাজার থেকে ফিরে এসে খাব। আচ্ছা, সোলাইমান এসেছিল?
সোলাইমান । না তো। তানজিনা অবাক।
তাহলে রাইসাকে মুড়কি কে দিল?
মুড়কি?
হ্যাঁ। তখন রাইসার বাটিতে মুড়কিদেখলাম।
তানজিনা বলল, আশ্চর্য! ও মুড়কি পাবে কই?
বুঝেছি। শওকত বলল। মুখে হাসির আভা।
কী বুঝেছ? তানজিনাকে কেমন অস্থির দেখায়।
চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, রাইসাকে মুড়কি দিয়েছে অর্চনা।
অর্চনা মানে? কি যাতা বলছ!
চায়ে চুমুক দিয়ে শওকত বলল, আজ ভোরে শিব মন্দিরে গিয়েছিলাম। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যর সঙ্গেকথা হল। তিনি আমাকে পুরানবাড়ি ইতিহাস বললেন।
কী বললেন তিনি? তানজিনার মুখে রঙিন আভা ছড়ালো।
অর্চনা ছিল …শওকত বলতে থাকে। অর্চনার মর্মস্পর্শী জীবনকাহিনী শুনতে শুনতে তানজিনার ফরসা মুখটি বিষাদে ভরেওঠে। চোখে জমে বেদনার জল।
চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে শওকত বলল, যাই, আমি এখন বাজারে যাই। দাও, আলমারী থেকে টাকা বের করে দাও।
তানজিনা গম্ভীরকন্ঠে বলল, শওকত।
বল।
মেজোভাই ফোন করেছিলেন। আমাকে আররওশন আপাকে রায়পুরা জমিজমার ভাগদেবেন বললেন। শোন, শওকত। আমি জমির যে টাকা পাব আর তোমাদের দেশের বাড়ির যে টাকা আছে সেসব মিলিয়ে চল আমরা এই বাড়িটা কিনে নেই। সস্তাই হওয়ার কথা। দরকার হলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেবে। এ বছর চাকরি করলে এক টাকাও তো লোন নিলে না। তুমি আজই বাড়িওলার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বল।
শওকত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ওকে।

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ধুপ [৩য় অংশ]

1

এই ভোরেও চাঁদপিরের গলির মুখে মধু ঘোষের মিষ্টির দোকান খোলা। পাশেই বাসষ্ট্যান্ড। ভিতরে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিল শওকত। মাথায় কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কাল সন্ধ্যায় রাইসার আচরণ অস্বাভাবিক ঠেকছে। ও তো ঘুমিয়ে ছিল। ও জানল কি করে সোলাইমান মিঞা খুচড়ি এনেছে? ও গতকাল দুপুরে কাকে দেখল ছাদে? অর্চনা মেয়েটি কে? সন্ধ্যায় কে ধূপ জ্বালায়? এসবের ব্যাখ্যা কী? শওকত কেবলি ভাবছিল । তানজিনা আর পুরান বাড়িতে থাকতে চাইছে না। সোলাইমান মিঞাকে ও এ মাসের মধ্যেই রাইসার স্কুলের আশেপাশে বাড়ি দেখে রাখতে বলেছে।রাতে সোলাইমান মিঞা কে রাতে ড্রইংরুমে শুতে বলেছে।
চা শেষ করে বিল মিটিয়ে দোকানের বাইরে বেড়িয়ে এল শওকত । তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে পিচ রাস্তারপাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে। বাতাসে ডিজেলের গন্ধ। হাতের ডাইনে একটাসরু গলি। গলির শেষ মাথায় একটা পানাপুকুর। বাঁশঝাড়, তারপর মেঠোপথ …
শওকত প্রাচীন শিব মন্দিরের পাশেসতীর দিঘীর ঘাটে এসে বসল। দিঘীর ঘাটের ঠিক পাশেই একটা হরীতকী গাছ। ঘাটের ওপর শিশির ভেজা পাতা পড়ে আছে। পরপর দুটো সিগারেট শেষ করল সে। খালি পেটে সে অবশ্য সিগারেট খায় না। তানজিনার বারণ আছে। আজ ভীষণ অস্থির লাগছিল। কার যেন পায়ের শব্দ শুনতে পেল শওকত। চাদরমুড়ি দিয়ে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখল-নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। শিব মন্দিরের পুরোহিত। বৃদ্ধের বয়েস সত্তরের কম হবে না। শ্যামলা মতন গায়ের রং। শক্তসমর্থ শরীর। পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন, আজ আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে যে? জলজ গম্ভীর কন্ঠস্বর।
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শওকত বলল, আপনি কি সুলতানগঞ্জে অনেক দিন ধরে আছেন?
হ্যাঁ। আমার দেশের বাড়ি ছিল যশোর। সুলতানগঞ্জে এসেছি স্বাধীনতার এক বছর আগে।
পুরানবাড়ি সর্ম্পকে আপনি কিছু জানেন? লোকজন কেন ওই বাড়িতে থাকতে চায় না।
নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য চুপ করে রইলেন। পাতার ওপর শিশির পতনের শব্দ । কুয়াশায় একটা কাক উড়ে যায়। দিঘীতে কী একটা মাছ যেনঘাই দেয়। নিস্তরঙ্গ জলে তরঙ্গ ছড়ায়। নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বললেন, জানি প্রশ্নটা আপনি করবেন।
জানেন মানে? শত্তকত বৃদ্ধের মুখখুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
এর আগে যারা ওই পুরানবাড়িতে ছিল তারা সবাই আমাকে ওই একই প্রশ্ন করেছে।
ওহ্ ।
শোনেন, বলি তা হলে । বিশ্বাস করবেন কিনা সেটি আপনার ব্যাপার।পুরান বাড়ি এক অশরীরী আছে। কার্তিক মাসে তাকে দেখা যায়।
শওকত চমকে ওঠে। অস্ফুটস্বরে বলল, অশরীরী? মানে?
উত্তর না দিয়ে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য চুপ করে থাকেন। বৃদ্ধ পুরোহিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ভোরের এই নির্জনতায় দীর্ঘশ্বাস পতনের শব্দ পরিস্কার শোনা যায়। প্রায় অনুচ্চস্বরে বৃদ্ধ পুরোহিত বললেন, তখন যুদ্ধের বছর। এক বছর আগে আমি যশোহর থেকে সুলতানগঞ্জেএসেছি। শিব মন্দিরে পূর্জঅচ্চনা করি। রাইচরণ নামে আমার এক সেবায়েত ছিল । ভারি গরিবসে। রাইচরণের ছিল পরমা সুন্দরী এক যুবতী কন্যা। কন্যার নাম অর্চনা।
শওকত চমকে ওঠে। কি নাম বললেন?
অর্চনা।
ওহ্ ।
অর্থের অভাবে অর্চনার বিবাহ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমিও যে সাহায্য করব আমার সে উপায় ছিল না। কন্যাদায়গ্রস্থ ম্যালেরিয়ায় রাইচরণ মারা যায়। অসহায় অর্চনা পুরাণবাড়িতে কাজ নেয়। পুরান বাড়িতে বাস করত এক পাকিস্তানি পরিবার । বাড়ির কর্তা ছিল ব্যবসায়ী। নাম জামশেদখান। বেগম ছাড়াও এক কন্যা আর তিনপুত্র ছিল তার । অর্চনা হিন্দুঘরের মেয়ে, সন্ধ্যায় মেয়েটি ধূপ জ্বালাত। পাকিস্তানি পরিবারের ধূপের গন্ধটা না-পছন্দ ছিল। তারা অর্চনাকে ধূপ জ্বালাতে নিষেধ করে। আসলে বাঙালি বলে, কালো বলে, হিন্দু বলে তারা নানান ছুতায় অর্চনার ওপর অত্যাচার-নির্যাতনকরত। পূর্ব-পাকিস্তানে শেখমুজিব পাকিস্তানবিরোধী গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে যাবে-এই আশঙ্কায় পাকিস্তানিরা আক্রশবশতঅর্চনার উপড় রাগ ঝাড়ত। আসলে জামশেদ খান আর তার বড় ছেলে জুনায়েদ খানের নজর পড়ছিল টলটলে শরীরের উপর।
কিন্তু, … কিন্তু, এসব কথা আপনি জানলেন কী করে?
পুরানবাড়ির বাগানে মালি ছিল সালামত আলী । বিহারী হলেও সে ছিলউদার হৃদয়ের। অর্চনা তাকে সব বলেছিল। অর্চনা পালিয়ে যেতে পারছিল না, বাবা নেই, তারাও তাকে এক রকম বন্দি করে রেখেছিল। যুদ্ধ শুরু হলে জামশেদ খান পরিবারকে লাহোর পাঠিয়ে দেন। পুরানবাড়িতে থাকল সে আর তার বড় ছেলে । পুরানবাড়ি পরে পাকিস্তানি আর্মি অফিসারদের আস্তানা হয়ে উঠেছিল। দিনদিন অর্চনার ওপর অত্যচারের মাত্রা বাড়ছিল। একদিন অর্চনাকে ছাদে নিয়ে তারা ধর্ষন করে। পাকিস্তানি আর্মি অফিসাররাও ছিল। তারপর মেয়েটার গায়ে কেরোসিন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে।
শওকত চমকে ওঠে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ধুপ [২য় অংশ]

0

তানজিনা চা নিয়ে এল। চায়ের কাপ নিতে নিতে শওকত জিগ্যেস করে, কী হয়েছে বলো তো?
রাইসা আজ একটা মেয়েকে দেখেছে। তানজিনা বলল।
শওকত চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলে এনেছিল, হাত থমকে গেল। বলল, রাইসা আজ একটা মেয়েকে দেখেছে মানে?
আমি রান্না করছিলাম। রাইসাকে বললাম জলপাই ছাদ শুকোতে দিয়ে আসতে। ও গেল। একটু পর ফিরে এসে বলল, ছাদে জলপাই রেখে ফেরার সময় সিঁড়িঘরের ঠিক সামনে একটা মেয়েকে দেখেছে। মেয়েটার গায়ের রং কালো হলেও দারুণ সুন্দরী। আকাশি রঙের শাড়ি পরা ছিল। রাইসা বলল, তুমি কে ? মেয়েটি বলল, আমি অর্চনা। রাইসা বলল, তুমি কোথায় থাক? মেয়েটি বলল, বলল, আমি এই বাড়িতে থাকি। রাইসা বলল, দেখি নাকেন? মেয়েটি বলল, আমাকে তো দেখা যায় না। বলে মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
তারপর? শওকত কেমন বিমূঢ় বোধ করছিল।
তারপর রাইসা টিভি দেখতে-দেখতে ঘুমিয়ে গেল। আমি ওকে অবশ্য তুলে একবার খাইয়ে দিয়েছি।
চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে একটা সিগারেট ধরালো শওকত। কপালে ভাঁজপড়েছে। বলল, রাইসার ভুল দেখেনি তো? অন্য কেউ ছাদে ওঠেনি তো?
অমাঃ ও ভুল দেখবে কীভাবে? ছাদের চাবি তো আমাদের কাছেই থাকে।
ওহ্ ।
এই বাড়িটা ভালো না শওকত। আমার আরভাল্ লাগছে না। কয়েক দিন আগে জুয়েলের মাও বলল এই বাড়িতে নাকি জিনের আছর আছে। ভাড়াটিয়ারা থাকতে চায় না। কী সব নাকি দেখে। এই কারণে ভাড়া নাকি কম। কাল তোমার ফিরতে দেরি হল। রাইসাকে নিয়ে পড়তে বসিয়েছি। তখন ঘরে হালকা ধূপের গন্ধ পেয়েছি।
শওকত বলল, আমি আজ সিঁড়িতে ওঠার সময় ধূপের গন্ধ পেয়েছি।
একতলার হোমিও ডাক্তার ধূপ জ্বালান নি তো?
মনে হয় না। ভদ্রলোক তো কিছু দিন ধরে আসছেন না। বলে শওকত এক মুখ ধোঁয়া ছাড়ে। ঠিক তখনই তারা মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আছে। অন্ধকার ঘনিয়ে উঠছে। বারান্দায় শীত মাখানো বাতাস ছড়ায় । ওরা ধূপের গন্ধ পায়।তানজিনা চমকে উঠে। বলে, ধূপের গন্ধ পাচ্ছ?
হু। বলে শওকত উঠে দাঁড়ায়। তারপর দ্রুত ঘরের ভিতরে চলে এল। তানজিনা সুইচ অন করে বাতি জ্বালায়। ঘরের বাতাসে তীব্র ধূপের গন্ধ । রাইসা বিছানার ওপর গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে।
কে ধূপ জ্বালালো? ফিসফিস করে বলল তানজিনা।
শওকত কাঁধ ঝাঁকায়। তাকে কেমন বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে।
কলিংবেল বাজাল।
কে এল? তানজিনা প্রায় আর্ত চিৎকার করে উঠল।
ওরা প্রায় দৌড়ে ড্রইংরুমে এল। সুইচ অন করে শওকত বাতি জ্বালালো। দরজা খুলে তীব্র আতরের গন্ধ পেল তানজিনা । চাদরমুড়ি দিয়ে সোলাইমান মিঞা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কাগজ দিয়ে ঢাকা একটি প্লাস্টিকের গামলা। তার ওপর মিষ্টির একটা প্যাকেট। বলল, সেলাম ম্যাডাম।
সালাম। কী ব্যাপার সোলাইমান?
সোলাইমান মিঞা হেসে বলল, আইজ চাইনপীরের মাজারে মায়ফিল বইসিলে ম্যাডাম। আপনাগো জইন্য তবারক নিয়া আরসি । আইজ গুলজারে সবজি খিচুড়ি পাকায়ছিলে।
ওহ। এসো, ভিতরে এস।
সোলাইমান মিঞা ভিতরে ঢোকে।তানজিনা জিগ্যেস করে, মিষ্টি কিসের?
মিষ্টির প্যাকেট আর খিচুড়ির গামলা ড্রাইনিং টেবিলের ওপর রেখে সোলাইমান মিঞা বলল,
আমাগো বাড়িওলায় আশীষ খোনকার আইজনানা হইছেন, বোঝলেন। এই আনন্দে হে নাকি নবীগঞ্জবাসীরে দাওয়াত করিয়া খাওয়াইবেন কইলেন। আপনাগোও দাওয়াত করিবেন কইলেন । আইজ তিনি আমারে ফোন করিয়া আপনাগোরে মিষ্টি কিন্না খাওয়াইয়া দেতে কইলেন।
আচ্ছা, তুমি এখন বস, একটু চা খাও।বলে তানজিনা রান্নাঘরে চলে যায়।
শওকত একটা চেয়ার টেনে বসল। ধূপের গন্ধটা তখনও বাতাসে ভাসছিল। মোবাইলের রিংটোন শুনতে পেল। মোবাইলটা বেডরুমে। সে দ্র্রুত বেডরুমে চলে আসে। মোবাইল টেবিলের ওপর থেকে তুলে নেয়। রওশন আপা। হ্যাঁ, আপা বলেন।
একটু আগে ছোটনের সঙ্গে কথা হল। ভাইরা আমাদের জমির ভাগ দেবে বলল।
আচ্ছা। সে তো ভালো কথা।
তারপরও আমরা কাল আসছি, বুঝলি?
ঠিক আছে। আসুন না।
বেশি ঝামেলা করতে যাস না আবার। কাল বিকেলেই ফিরে আসব। লোপার আবার পরীক্ষা।
না, না ঝামেলার কি আছে।
ফোন অফ করে ড্রইংরুমে এসে চেয়ারে বসল শওকত । সোলাইমান মিঞা আরষ্ট ভঙ্গিতে বসে আছে। শওকত বলল, সোলাইমান মিঞা?
কন ছার।
তুমি এই বাড়িতে কত দিন ধরে আছ?
পুরানবাড়িত আমি দেখতে আছি জন্মের পরের থন। দূর্গাপাড়ায় আমার মায়ে কাম করতে। আমি তখন ছুড। দ্যাশ স্বাধীন হইলে পর আমার মায়ে মরল।আমি অথই গাঙে পড়লাম। পুরানবাড়ির মালি আছিল সালামত আলী। বিহারী হইয়াও আমার লালনপালনের ভার লইলেন। তখন মমতাজ ছিনেমা হলের মালিক গুলাম দস্তগীর ছাহেব পুরানবাড়ি কিন্না লইলেন। তারপর তিনি বিলাতচইলা গেলেন। এইবার পুরানবাড়ি কিন্না লইলেন চকখোলা হাজী কেরামত । তিনি মারা গেলে পর এইবার সুনতানগঞ্জের আশীষ খোনকারে কেনলেন পুরানবাড়ি। পুরানবাড়ি অনেকবার হাত বদল হইছেছার। তয় তামারে কেউ খেদায় নাই।
শওকত বলল, লোকে বলে পুরানবাড়িতে জিনভূত না কী সব নাকি আছে। তুমি দেখেছ কখনও?
লোকে তো হেইয়া কয়। আমি হইলাম চাইনপীরের মুরিদ। জিনপরি আমার কাছে ঘেঁষবে কন সাহসে কন? তয়-
তয় কী? শওকতের চোখ সরু হয়ে ওঠে।
মিছা কমুনা ছার।
আহা বল না
কার্তিক মাস আইলে না ছার … একডা কালা কইরা সুন্দরী মাইয়ায় …
কথা শেষ হল না। তানজিনা চা নিয়ে এল। তারপর বসতে বসতে বলল, সোলাইমান মিঞা?
সোলাইমান মিঞা গরম চা সুরুত করে শব্দ বলল, কন ম্যাডাম।
রাইসার স্কুলের আশেপাশে ভাড়াবাড়ি পাওয়া যাবে? সস্তায়?
যাইব ম্যাডাম। তয় কার জইন্ন ম্যাডাম?
আমাদের জন্য।
আয় হায়। কন কী! আপনারা পুরান বাড়ি ছাইড়া চইল্যা যাইবেন ম্যাডাম?
হ্যাঁ।
কী বলতে যাবে- বেডরুমের দরজায় শব্দ হল। রাইসা দাঁড়িয়ে। রাইসা তখনও চোখ কচলাচ্ছে। ঘুমের ঘোর কাটেনি। ও আদুরে গলায় বলল, মা। আমাকে খিচুড়ি দাও না। আর শোন মিষ্টিও দিও।
তানজিনা ঝট করে তাকালো শওকতের মুখের দিকে।
খিচুড়ি খাইবা মা? আইয়ো। তোমারে খিচুড়ি দেই। সোলাইমান মিঞা বলল।
সারারাত শওকতের ঘুম হল না। একবার ঘুম হল ঠিকই। আবোলতাবোল স্বপ্ন দেখল। ভোরে বিছানায় শুয়েফজরের আজান শুনল। ভোরে হাঁটাহাঁটি না করলে সারাদিন গা ম্যাজম্যাজ করে। মেয়েকে জড়িয়ে তানজিনা ঘুমিয়ে।ও কালই বলেছিল মেয়েকে ফেলে আজ আর হাঁটতে যাবে না।
শওকত চাদর জড়িয়ে মাঙ্কি ক্যাপ পরে নীচে নেমে এল। নীচতলার বাগানে কুয়াশা। ফটকের কাছে সোলাইমান মিঞা। মসজিদে যাচ্ছে হয়তো।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ধুপ [১ম অংশ]

2

আজ বিকেলে ব্যাঙ্ক থেকে বেরুতেই দারোয়ান রশিদ মিঞা সালাম দিয়ে বলল, ছার, আপনারে একখান কথা কই। আপনে পরিবার পরিজন লইয়া যেই বাড়িত উঠছেন, সেই বাড়িটা ভালো নাছার, বাড়িতে জিনের আছর আছে। এট্টু দেইখা শুইনা থাইকেন সার।
কথাটা শুনে শওকতের ভ্রুঁ কুঁচকেযায়। কুসংস্কার বেশ মজার ব্যাপার। আর কুসংস্কার জিনিসটা মানসিকভাবে লালন করারও একটা ব্যাপার আছে। দারোয়ান, কাজের ঝি-এই শ্রেণির লোকজন কুসংস্কার জিনিসটা লালন করে। সযত্নে। নতুনকাজের মেয়েটিও নাকি তানজিনাকে বলেছে বাড়িটা নাকি ভালো না। শওকত খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। তারপর হাঁটতে থাকে। তখনও ঝরঝরে রোদ ছিল। দূর্গাপাড়ার বাড়িটা কাছেই। এখানকার লোকে বলে পুরানবাড়ি । রেললাইন পেরিয়ে, বাসষ্ট্যান্ড, তারপর আসফ আলী মিলনায়তন, চাঁদপিরের গলি। সেই গলির শেষ মাথায় বেশ নিরিবিলি গাছপালায় ঘেরা পুরনো আমলের দোতলা বাড়ি। একতলায় গ্রিন হোমিওহল। মোছলেম উদ্দীন নামে একজন বৃদ্ধ ডাক্তার সকাল-সন্ধ্যা বসেন। বৃদ্ধ কানে কম শোনেন বলেই হয়তো পসার তেমন ভালো না। শওকতরা থাকে দোতলায় । পুরনো আমলের বাড়ি বলেই ছাদে কড়িবর্গা, বেশ বড় বড় রুম, বড় বড় বাথরুম আর বড় বড় জানালা। পানির সমস্যা নেই। সোলাইমান মিঞা নামে একজন দারোয়ান আছে । মুসল্লী টাইপের লোকটাকে মধ্যবয়েসিই বলা চলে। সোলাইমান মিঞা থাকে একতলায় । মাঝেমধ্যে বাজার- টাজার করে দেয়। চাঁদপিরের মাজার থেকে সিন্নী এনে দেয়। বাড়িওলা আশীষ খোন্দকার সুলতানগঞ্জের বড় ব্যবসায়ী। নবীগঞ্জ থাকেন। ভাড়ার টাকা সোলাইমান মিঞাই নবীগঞ্জে পৌছে দেয়।
সুলতানগঞ্জ ব্রাঞ্চে সদ্য বদলী হয়ে এসেছে শওকত। নির্জন ছিমছাম শহর সুলতানগঞ্জ । এই শীত আসি-আসি সময়ে ভালো লাগছে। অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যাবেলায় বেডরুম-লাগোয়া দোতলার বড় বারান্দায় বসে শওকত । তখন রাইসাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখে; গল্প বলে, যে গল্প মায়ের মুখে ছেলেবেলায় শুনেছিল, সেই গল্প । তখন নীচের বাগানের গাছপালা, দূরের আবছা গাছপালা, শিবমন্দির, সীতার দিঘী কেমন স্তব্দ হয়ে থাকে । দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ায়ের ডাক । দূরে কুয়াশা ঢাকা নিঝঝুম গ্রাম। খুব ভোরে উঠে যে গ্রামের মেঠেপথে তানজিনার সঙ্গে চলে যায় শওকত। শিশির-ঝরা নির্জন গ্রাম্য পথে হাঁটে। কুয়াশার ভিতরে তখন একটি-দুটি কাকা উড়ে যায়।
তানজিনার সঙ্গে শওকতের স্কুল জীবন থেকে প্রেম ( সর্ম্পকে তানজিনা শওকতের খালাতো বোন)। সেপ্রেম এত বছর পর এখনও অটটু। … কখনও ওরা হাতে হাত রেখে বসে প্রাচীন শিব মন্দিরের সিতার দিঘীর ঘাটে । শিব মন্দিরের পুরোহিত নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তার সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে। সৌম্য বৃদ্ধটি বেশ অমায়িক আর স্বশিক্ষিত। চমৎকার জলদ গম্ভীর কন্ঠস্বরে কথা বলেন।তানজিনার আবার পুত্রসন্তানের ভীষণ শখ। বৃদ্ধ পুরোহিত তানজিনার হাত দেখে গর্ভধারণের দিনক্ষণ বলে দিয়েছেন। পুত্র সন্তান নাকি কুম্ভ রাশির জাতক হবে। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রমতে কুম্ভ রাশির জাতক অত্যন্ত মেধাবী হয়। … রোদ উঠি-উঠি ওরা সময়ে ফিরে আসে। রাইসা তখনও ঘুমে কাদা। “স্কুলে যেতে হবে মা।” বলে মেয়ে কে ডেকে তুলে রান্নাঘরে যায় তানজিনা । শওকতের বদলীর চাকরি। মেয়ের স্কুল নিয়ে সমস্যা হয়। তবে এবার ভাগ্য প্রসন্ন বলতেই হয়। রাইসারস্কুল পুরানবাড়ির একেবারে কাছেই, আসফ আলী মিলনায়তনের পাশে। তানজিনাই মেয়েকে নিয়ে যায়, নিয়ে আসে। রাইসা এবার ক্লাসফাইভে উঠল।
রাইসার জন্য কী যেন কিনতে হবে। ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ল না। তানজিনাকে ফোন করবে কিনা ভাবল।মোবাইলটা প্যান্টের পকেটেছিল। ভাইব্রেশন মোডে ছিল। ওটা বিজবিজ করে উঠল। ফোন বের করে দেখল-ওশন আপা। তানজিনার বড় বোন।মাগুরা থাকেন। তানজিনা সর্ম্পকে শওকতের খালাতো বোন বলেই বিয়েতে সাংঘাতিক ঝামেলা হয়েছিল। তখন রওশন আপাই নানা ঝক্কি সামলিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন।
হ্যালো । স্লামালাইকুম আপা।
অলায়কুমআস সালাম। ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল রওশন আপার কন্ঠস্ব।
কেমন আছেন আপা?
ভালো থাকি কি করে বল? রায়পুরায় আমাদের দাদারবাড়ির জমিজমা সব ভাগভাঁটোয়ারা হচ্ছে। ছোটন বিদেশ থেকে এসেছে। ভাইরা আমাদেরঠাকাচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না। এখন আমরা চুপ করে থাকলে ঠকে যাব না? তুই কি বলিস?
শওকত বলল, এসব আপনাদের ব্যাপার আপা। আমার কিছু বলা কি ঠিক হবে?
তোরা বাপেরবাড়ির সম্পত্তি থেকে পরীকে ভাগ দিলি না?
শওকতদের দেশের বাড়ি যশোর। পৈত্রিক জমিজমা বিক্রি করে গত মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়েছে। শওকতরা এক বোন, দুই ভাই। ছোট বোন পরীকে কিছু টাকা দিয়েছে। সে বলল,একটাই বোন। আদরের …
আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? আমরা নেকস্ট উইকে রায়পুরা যাচ্ছি। তুই তানজিনা কে ছাড়বি তো?
ওর ইচ্ছে হলে যাবে। শওকত বলল। তারও ইচ্ছে তানজিনা ওর ভাগের টাকা পাক।
তুই যাবি রায়পুরা?
আমি বরং না যাই।
ঠিক আছে। কাল শুক্রবার। আমি আর তোর দুলাভাই কাল সুলতানগঞ্জ আসছি।
ঠিক আছে। আসুন।
এখন রাখছি তাহলে।
ঠিক আছে।
চাঁদপিরের গলির মুখে মধু ঘোষের মিষ্টির দোকান। রাইসার জন্য আধ কে জি বুন্দিয়া কিনল শওকত। মেয়েটা বুন্দিয়া খেতে ভালোবাসে। তানজিনারও এই জিনিসটা পছন্দ। গলির মুখে অস্থায়ী বাজার বসেছে। টমাটো, লেবু, ধনেপাতা, আর একটা মাঝারি সাইজের লাউ কিনল শওকত। তারপর বাজার নিয়ে বাড়ির সামনে চলে আসে। ট্রেনের হুইশেলের শব্দ শুনল। স্টেশন কাছেই।
দোতলার সিঁড়িতে ওঠার সময় ধূপের গন্ধ পেল। কে ধূপ জ্বালিয়েছে? তানজিনা?
দরজা তানজিনাই খুলল। ওর মুখ কেমন গম্ভীর দেখাচ্ছে।
কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে? তরিতরকারি ভর্তি প্লাস্টিকের ব্যাগটা দিতে দিতে জিগ্যেস করল শওকত।
বলছি। তুমি বারান্দায় গিয়ে বসো।আমি চা নিয়ে আসছি।
টেবিলের ওপর বুন্দিয়ার প্যাকেট রেখে শওকত জিগ্যেস করল, রাইসা কোথায়?
ও ঘুমাচ্ছে।
ঘুমাচ্ছে? এখন?
এসে সব বলছি। বলে তানজিনা রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
শওকত কাপড় বদলে হাতমুখ ধুয়ে গায়ে বারান্দায় বসে। শেষবেলার রোদ মিলিয়ে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ফুটে উঠছে। বাগানের গালপালায় অল্প রোদ লেগে আছে। কাকপাখিরা তারস্বরে চিৎকার করছিল। অক্টোবরের শেষ। এই সময়ে মফস্বলেবেশ কুয়াশা পড়ে। সন্ধ্যার পরপরইদূরের গ্রাম থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ফোঁড়া [শেষ অংশ]

0

কিন্তু রাকিব সাহেব কে দেখেই ভয় পেয়ে যান তিনি।রাকিব সাহেবের পেটটা অস্বাভাবিক ভাবে ফোলা। ঠিকযেন সন্তান সম্ভবা মায়ের মত। আর ঠিক সেই সময় রাকিব সাহেব চিৎকার করে ঊঠে অজ্ঞান হয়ে যান। এবং সেইসময় তাহসিনার চোখের সামনে ঘটল এক বিষ্ম্য় কর ব্যাপার। রাকিব সাহেবের নাভির উপরের ফোঁড়া থেকেএকটা লালচে পিণ্ড বের হতে লাগল। আস্তে আস্তে পিন্ড টার কিছু অংশ বের হয়ে চোখ আর মুখে অস্তিত্ব জানান দিল। এর পর তাহসিনা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দেয়া মহিলা কে গামছা আর কুসুম গরম পানিআনতে বলে নিজে কোন রকম টান দিয়ে বের করেন বাচ্চা টাকে। অদ্ভুত সুন্দর সেই সন্তান টাকে কোলে নিয়ে হতভম্ভ হয়ে যান তিনি। বাচ্চা টা যেন ঘুমাচ্ছে।
এর মাঝে তোয়ালে নিয়ে সেই মহিলা আসলে তিনি তোয়ালে দিয়ে কোন রকম বাচ্চা টাকে মুছিয়ে দেন। তারপর খেয়াল করেন বাচ্চা টা কাঁদছে না। তিনি অনেক চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনভাবেই বাচ্চাটাকে কাঁদাতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত দেখলেন বাচ্চাটা মারা গেছে।
বাচ্চাটা মারা যাবার পর তিনি রাকিব সাহেবের দিকে খেয়াল দিলেন। এতক্ষন তিনি যেন ঘোরের মাঝে ছিলেন। মেডিক্যাল সায়েন্স কে বোকা বানিয়ে এই মাত্র এই লোকটা একটা বাচ্চা জন্ম দিল। কিন্তু বাচ্চাটাকে তিনি বাঁচাতে পারলেন না। আগে জানলে তিনি ঠিক ই রাকিব সাহেবের ব্যাবস্থা করতেন। তিনি তাড়াতাড়ি রাকিব সাহেব এর নার্ভ দেখলেন। কিন্তু হতাশ হলেন।তিনি ভেবেছিলেন রাকিব সাহেব অজ্ঞান হয়েছেন। আসলে তিনি মারা গেছেন সেই চিৎকার দিয়েই। এবার কিছু টা মুষড়ে পড়লেন তাহসিনা। তিনি লোকটাকে বিশ্বাস করলে দুইজনকেই হয়ত বাচানো যেত।
এরপর তাহসিনা সেই বাচ্চাটাকে গোপনে সরিয়ে ফেলার ব্যাবস্থা করেন। সেই বৃদ্ধা মহিলা কে দিয়েই বাচ্চাটাকে সেই বাড়ির এককোনায় কবর দেবার ব্যাবস্থা করেন। আর রাকিব সাহেব কে কবর দেয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। এই সব ব্যাপার ভাল মত সারতে সারতেউনার কয়েকদিন লেগে যায়।
এর তিন দিন পর রাতে ক্লান্ত ডঃ তাহসিনা মাত্র হাসপাতাল থেকে এসেবাসায় খেয়ে দেয়ে শুয়েছেন।এমন সময় উনার ঘরের বারান্দায় একটা আলতো টোকা দেয় কেউ একজন। তখন ও ঘুমান নি তাহসিনা। আস্তে করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে ঊঠে বারান্দার দরজা খুলেই দেখেন একটা বাচ্চা ছেলে দাড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে।মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আন্টি আন্টি বলে ঝাপিয়ে পরে তাহসিনার শরীরের সাথে মিশে যায়। ব্যাপারটা এতই তাড়াতাড়ি হয়েছে যে তাহসিনা বেশ কিছুক্ষন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়লেন তিনি সেখানেই।
পরদিন জ্ঞান ফিরে নিজেকে মাটিতে দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যান তিনি।তারপর রাতের ঘটনা কে নিছক স্বপ্ন ভেবে হেসে ঊড়িয়ে দিলেন তিনি। তারপর ফ্রেশ হবার জন্য বাথরুমে গেলেন। হাত মুখ ধুয়ে বের হতে যাবেন তখন পেটে চিনচিনে একটা ব্যাথা টের পেলেন। তাড়াতাড়ি নাইট গাঊনটা সরিয়ে পেটে হাত বুলালেন তিনি। এবং দিনের আলোতেই পরিষ্কার টের পেলেনতিনি – উনার পেটের যেখানে নাভি- ঠিক তার উপরেই একটা ফোঁড়া ঊঠেছে। লালচে ফোঁড়াটা দেখতে ঠিকরাকিব সাহেবের সেই ফোঁড়াটার মত।সাদৃশ্য টা টের পেতেই আবার জ্ঞান হারালেন সাইকিয়াট্রিষ্ট ডঃ তাহসিনা……
( সমাপ্ত )

ফোঁড়া [১ম অংশ]

0

অনেকক্ষন ধরে সামনে বসা মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছেন ডঃ তাহসিনা। মাথাটা নিচু করে বসেই আছে সেই লোক। অনেকক্ষণ ধরে বসে থেকে থেকে শেষে বলতে শুরু করল-
“আমার যে সমস্যা সেটা হল আমার পেটে একটা ফোঁড়া ঊঠেছে।”
বলেই শুন্য দৃষ্টিতে ডঃ তাহসিনারদিকে তাকিয়ে থাকল। ডঃ তাহসিনা অনেক ভাল একজন সাইকায়াট্রিষ্ট। উনি এর আগে ও অনেক মেন্টাল রুগীকেভাল করেছেন। কিন্তু আজকের এই রুগি এসে বসেছে তো বসেছে কথা বলারকোন নাম গন্ধ নাই। অনেক ক্ষন মাথানিচু করে চুপ করে থেকে শেষে বলতে শুরু করল।
” আমার সমস্যার শুরু যখন আমি আমারস্ত্রি মাহমুদা কে খুন করি। আমার স্ত্রি কে নিয়ে আমি খুব সুখে ছিলাম। কিন্তু আমার একটা এক্সিডেন্টের কারনে ডাক্তার আমাকে বলেন যে আমি আর কোন দিন বাবা হতে পারবোনা। এর পর মাহমুদা আমাকে প্রথম প্রথম মেনে নিয়েছিল। আমাদের বিয়ে হবার পর ঠিক করেছিলাম ৩ বছর পর বাচ্চা নেব। এর মাঝেই ঘটে যায় সেই এক্সিডেন্ট। এরপর মাস ছয়েক ঠিক ছিল। কিন্তু একদিন আমি জানতে পারি মাহমুদার সাথে আমার এক আত্মীয়র অবৈধ সম্পর্ক হয়েছে। এটা শোনার পর আমার মাথা ঠিক ছিলনা। আমি দুইবার আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এর মাঝেই আমাকে মাহমুদা ওর অবৈধ সম্পর্কের কথা জানায়। আমি বিমূঢ় ছিলাম বেশ কিছু দিন। কিন্তু এর মাঝেই জানতে পারি মাহমুদা কনসিভ করেছে। এটা শুনে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। ওর পেটে বাচ্চা যখন ৮ মাস – তখন আমি একদিন মাহমুদা কে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলি। মেরে ফেলি পেটের বাচ্চা টাকে ও। আমি একজন পুলিশ অফিসার ছিলাম সেই সময়। এখন আমি রিটায়ার্ড। সেই সময় আমার ক্ষমতা বলে মাহমুদা কে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কোনরকমে দাফন করে আসি। এর পর আমি অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম।” বলেই একবার দম নিল লোকটা। তারপর টেবিল থেকে পানির জগটা নিয়ে অদ্ভুত ভাবে পানি গ্লাসে না ঢেলে জগ থেকেই ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল অর্ধেক পানি।
তারপর আরেকটা দম নিয়ে আবার বলা শুরু করল সে –
” এর পরের বছর আমি দেশে ফিরে আসি। চাকরি থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। সেখানে আবার জয়েন করি। কিন্তু দুই মাস আগে আমি ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাই। সেখানে ঈদের দিন রাতে আমি একাকী বসে ছিলাম আমার বাড়ির পেছনের বারান্দায়। তখন দেখি মাহমুদার কবর থেকে একটা বাচ্চা ছেলে বাবা বাবা করে ডেকে আমার দিকে দৌড়ে এসে আমার মাঝে ঢুকে গেছে।
সেদিন রাতে আমি খানিকটা নেশা করেছিলাম। তাই সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সব আজগুবি মনে করে ভুলে যাই। কিন্তু পরদিন আমার পেটে নাভীর গোড়ায় একটা ফোঁড়া ঊঠে। প্রথমে এটা ফোঁড়ার মতই ছিল কিন্তু আস্তে আস্তে এটা বড় হতে থাকে। আমি এই কয়দিন প্রায় সময় স্বপ্নে দেখছি একটা বাচ্চা ছেলে আমাকে বাবা বাবা করে ডাকছে আর বলছে আমার পেট থেকে নাকি তার জন্মহবে। এই যে দেখেন আমার পেটের মাঝেএটা কি”- বলে শার্টের ভাজ খুলে দেখায় ডঃ তাহসিনাকে।
তাহসিনা কিছুক্ষন দেখেন ফোঁড়া টা। বেশ বড় আকারের একটা ফোঁড়া। লালচে ভাব ধরেছে। তারপর হেসে লোকটাকে বললেন-
“দেখুন মি.”- বলে নামটা জানার জন্যতাকালেন উতসুক দৃষ্টিতে লোকটার দিকে।
উনি বললেন “ রাকিব- মোঃ রাকিব”।
“হুম – দেখুন রাকিব সাহেব- আপনার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল- সেই দিন রাতে। আপনি আপনার স্ত্রীকে অনেক ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। তাই আপনি উনাকে এবং উনার সন্তান কে মেরে ফেলে অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেইদিন আপনার পিতৃসত্ত্বা আপনার মাঝে আপনার মৃত সন্তান কে ঢুকে যেতে দেখিয়েছে। এটা নিছক ই কল্পনা। আর বেশি কিছু না”।

বলে  মিষ্টি  করে  হেসে রাকিব সাহেবের দিকে তাকালেন।

“ কিন্তু আমার পেটের এই ফোঁড়া কিভাবে আসল?” এবার ক্ষেপে গেলেন রাকিব সাহেব।
“এটা কো- ইন্সিডেন্স মাত্র। এটার সাথে আপনার স্বপ্ন কিনবা হ্যালুসিনেশন কে মেলালে তো চলবেনা”-বললেন ডঃ তাহসিনা।
“ দেখেন আমি মেলাচ্ছিনা। কিন্তু ইদানিন আমার পেটের ভেতর কিছু একটা লাথি মারে। কিছু একটা হচ্ছে আমার পেটের ভেতর”- বলেই প্রায় কেঁদে ফেলে রাকিব সাহেব।
“ দেখুন আপনাকে আমি কিছু ঔষধ লিখেদিচ্ছি।এগুলো খান। আশা করি আপনারভাল ঘুম হবে। এবং আপনার এই বিশাল ফোঁড়া ও কমে যাবে” বলেই খস খস করে কিছু ঔষধ লিখে প্যাড থেকে কাগজ ছিড়ে দেন রাকিব সাহেব কে।
তারপর বললেন-“ আপনার যে কোন সমস্যা হলে আমি নিজে গিয়ে আপনাকে দেখে আসব। আপনার এখানে আসার আর দরকার নেই। এইখানে আমার ফোন নাম্বার দেয়া আছে। সেখান থেকে আমাকে ফোনে জানাবেন কি হয়েছে”- বলেই ঊঠে পড়লেন ডঃ তাহসিনা।
“আমার একটা সেমিনার আছে- আমাকে এখন সেখানে যেতে হবে” বলে বের হয়ে গেলেন ডঃ তাহসিনা।
…………..
তিন মাস পর রাত ১টায় ফোনের শব্দেঘুম ভেঙ্গে গেল ডঃ তাহসিনার। উনি ফোনটা ধরেই আরেক পাশ থেকে শুনতে পেলেন- রাকিব সাহেবের কন্ঠ-
“ আপা একটু আসবেন আমার বাসায়? প্লিজ আপা আসেন।প্লিজ আসেন। আমারপেটে প্রচন্ড ব্যাথা করছে” বলেই বাসার ঠিকানা দিলেন ডঃ তাহসিনাকে।
সারাদিন মেডিক্যাল এ সেমিনারে ছিলেন তিনি। তাই বাসায় এসে মাত্র শুয়েছেন। কিন্তু এই রকম কল এলে প্রায় সময় তিনি ঘুম রেখেই দৌড় মারেন রূগীর বাসায়। নিজের জীবনের চেয়ে রোগীকে অনেক গুরুত্ব দেন তিনি। আর এই রাকিব সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে তিনি অনেক পড়াশুনা করেছেন ইদানিন। তাই তিনি এত রাতে ফোন পেয়ে কোন রকমে পোশাক পাল্টে গাড়ি নিয়ে বের হলেন।
রাকিব সাহেবের বাসায় বাসা গুলশানে। সেখানে পৌছে একটা সাদা রঙ এর বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে নিজেই ঢুকে পড়লেন ভেতরে। বাড়িতে গিয়ে বেল টেপার পর খুলে দিল একজন বৃদ্ধা মহিলা। তিনি রাকিব সাহেব কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই মহিলা তাহসিনাকে নিয়ে গেলেন একটা ঘরে। সেখানে শুয়ে আছেন রাকিব সাহেব।

(চলবে)

সতরই জুলাই(অতিপ্রাকৃ­ত) [শেষ অংশ]

1

রাতে ভালো ঘুম এল না। ঘুমটা বারবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছিল। একবার ঘুমের মধ্যেই যেন … কী একটা গাছ দেখতে পেলাম, গাছটা বেশবড় । গাছ থেকে অনেক পাখি উড়ে গেল…সবুজ রঙের পাখি মনে হল…টিয়াপাখি মনে হল … দৃশ্যটা কেমন পরিচিত মনে হল …মনে হল বহুদিন আগে দেখেছি …
সতরই জুলাই ভোরবেলা ওয়াহেদ- এর ফোন পেলাম।
ওয়াহেদ বলল, আজ ফ্রি আছিস?
আছি। আমার কন্ঠস্বর কেমন ফ্যাঁসফ্যাঁসে শোনালো।
তাহলে চলে আয়।বলে গ্রিন রোডের এক বাড়ির ঠিকানা দিল ওয়াহেদ। আটাত্তর বাই বি । দুপুরের দিকে যেতে বলল ।
ঠিক আছে। কিন্তু শোন, তুই আমার টেলিফোন নাম্বার কই পেলি?
উত্তর না দিয়ে ফোনটা কেটে গেল ওয়াহেদ।
কেমন হতভম্ভ হয়ে গেলাম। প্রবল অস্বস্তি আমাকে ঘিরে ধরল। একবার মনে হল জাফর মিথ্যে বলেছে।আবার মনে হল তা কী করে হয়। জাফর- এর ভিজিটিং কার্ডটা বের করলাম। একবার মনে হল ওকে ফোন করি, সব খুলে বলি। পরক্ষণেই চিন্তাটা বাতিল করে দিলাম। আমি চাইনা জাফর আমায় পাগল ঠাওরাক।
কেমন ঘোরের মধ্যে সকালটা কাটল …
দুপুরের দিকে কোনওমতে নাকেমুখে কিছু গুঁজে ঘর থেকে বেরুলাম। গ্রিন রোডের ঠিকানাটা আমার পরিচিত না। তবে খুঁজে নিতে সমস্যা হবে না।ছুটির দিন। মেঘশূন্য ফিরোজা রঙের আকাশ ।
ঝরঝরে রোদ উঠেছে। ভীষণ নার্ভাস লাগছিল।অস্বস্তি এড়াতে সিএনজিতে একটা সিগারেট ধরালাম। তামাকের স্বাদ বিস্বাদ ঠেকল ।
সরু গলির ভিতরে অনেকটা হেঁটে শেষ পর্যন্ত বাড়িটা খুঁজে পেলাম। আটাত্তর বাই বি লেখা কালো রঙের লোহার গেট। দারোয়ান গোছের কাউকে দেখতে পেলাম না। কলিং বেলও নেই। ঠেলা দিতেই খুলে গেল। জানতাম খুলে যাবে। ওয়াহেদের ফোন পাওয়ার পর থেকেই কেমন রহস্যময় ঘটনা ঘটছে।জাফর- এর সঙ্গে এত বছর পর দেখা হয়ে যাওয়াটাও কি নিছক কাকতালীয়? এর মধ্যে কি অন্য ব্যাপার নেই? কিংবা নিউইয়র্কে জাফর-এর সঙ্গে ওয়াহেদ- এর দেখা হয়ে যাওয়াটা …
গেটটা অল্প ঠেলে ভিতরে পা দিলাম।অগোছালো মলিন বাগান অযত্নে পড়ে আছে।ওপাশে একটি দোতলা বাড়ি। এককালে হয়তো সাদা রং ছিল -এখন রং-টং উঠে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে । বেশ পুরনো বাড়ি। এ ধরনের বাড়ি তো ঢাকায় আজকাল ভেঙে ফেলে। কোন দৈববলে এটি দাঁড়িয়ে আছে কে জানে।
দোতলা বারান্দার গ্রিলে সবুজ রংকরা । একতলার গ্রিলের রঙও সবুজ। বাড়ির পিছনে বিশাল একটি কামরাঙাগাছে চোখ পড়তেই এক ঝাঁক টিয়া ফিরোজা রঙের আকাশে সবুজ চাদর বিছিয়ে উড়ে গেল …
একতলায় গ্রিল-বারান্দার একপাশে ছোট্ট একটি লোহার দরজা । বন্ধ। জানতাম ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।ভিতরে ঢুকে শুকনো বকুল ফুলের গন্ধ পেলাম। বেশ বড় বারান্দা। কেমন ছায়া ছায়া। মেঝেতে সাদাকালো ক্ষয়ে যাওয়া মোজাইক । দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটি বেতের চেয়ার ।আর একটি টেবিল। টেবিলের ওপর একটি খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখা । তার পাশে একটি চায়ের কাপ।ধোঁয়া উড়ছিল। অ্যাশট্রে ভর্তি আধ- পোড়া সিগারেট। কেউ এখানে বসেছিল? ওয়াহেদ? না, অন্য কেউ?চারপাশ কেমন নির্জন হয়ে আছে। একটা কাক ডাকছিল। আমি এখানেই অপেক্ষা করব, না ভিতরে যাব ঠিক বুঝতে পারছি না। ওয়াহেদ কি সত্যিই আছে এ বাড়িতে? কিন্তু তা কি করে সম্ভব? জাফর তো …
হঠাৎই চোখে পড়ল জিনিসটা। টেবিলের ওপর একটা টিয়া পাখি। সবুজ রঙের, মাটির তৈরি। এত বছর পরও চিনতে পারলাম। ওয়াহেদ-এর জন্মদিনে এই মাটির টিয়াপাখিটাই ওকে উপহার দিয়েছিলাম।এত বছর পর এটা এখানে এল কিভাবে? ভাবতেই আমার শরীরে হিম ছড়িয়ে গেল। কপালের দু’পাশের শিরা দপদপ করতে লাগল। চোখের সামনে ঘন কুয়াশার সমুদ্র জেগে উঠছে …
কে যেন আমার কাঁধ স্পর্শ করে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে দিল।
ওয়াহেদ?
কেমন ভূতগ্রস্থের মতন আমি বাগানে নেমে এলাম।
একটু পর গলিতে বেরিয়ে এসে ভাবলাম … অশরীরী ওয়াহেদ কে দেখতে পাইনি ঠিকই … তবে ও আমার খুব কাছাকাছি এসেছিল…..

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

সতরই জুলাই(অতিপ্রাকৃত) [১ম অংশ]

1

কয়েক বছর আগে আমার একবার অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমার এক মৃত বন্ধু আমার কাছে ফিরে এসেছিল। ওই অস্বাভাবিক ঘটনাটি মনে পড়লে আজও আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই …
বছর কয়েক আগের কথা । বর্ষাকাল। রাতদিন দফায় দফায় বৃষ্টি। এক রাতে ভিজে অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছি। আমি তখন ঢাকায় একাই থাকি। মা-বাবা থাকেন যশোর । আমার তখনও ঘরসংসার পাতা হয়নি। মা-বাবা অবশ্য বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। অবশ্য আমার বন্ধনহীন জীবন বই পড়ে আর আকাশকুসুম ভাবনায় গা ভাসিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিল।
রাতে ঘুমাবার আগে কিছুক্ষণ বই পড়ি। সে রাতেও বই পড়তে-পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোররাতে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল । জানালায় ঝিরঝির বৃষ্টির শব্দ। টের পেলাম মোবাইলের রিংটোন বেজেচলেছে। বালিশের পাশ থেকে মোবাইলতুলে দেখি অপরিচিত নাম্বার। ঘুমজড়ানো কন্ঠে বললাম-হ্যালো।
আমি ওয়াহেদ। ওপ্রান্ত থেকে যান্ত্রিক স্বর ভেসে এল।
ওয়াহেদ? আমি অবাক হয়ে বললাম।
কেন, তোর মনে নেই, আমরা একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম?
কথাটা শুনে আমি আশ্চর্য হলাম। হ্যাঁ ওয়াহেদ নামে আমার এক সহপাঠী ছিল অবশ্য। সেই ওয়াহেদ ফোন করেছে? এত দিন পর? এই সময়ে? বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে বললাম, ওয়াহেদ?
যাক। চিনতে পারলি তাহলে?
হ্যাঁ। কতদিন পর। এখন কোথায় থাকিস?
আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ওয়াহেদ বলল, আমি দেশের বাইরে থাকি। এ মাসে একবার দেশে আসছি। তখন তোর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।
অবশ্যই। বললাম। আমারও কেমন কৌতূহল হচ্ছিল। ওকে খুব পছন্দ করতাম। ভারি সহজ সরল ছিল। ভীষণ পাখি পছন্দ করত …
ওয়াহেদ বলল, দেশে ফিরে আমি তোকে আমার ঠিকানা জানিয়ে দেব। সতরই জুলাই তোর সঙ্গে দেখা করব।ঠিক আছে?
আমি বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু শোন,ওয়াহেদ, তুই আমার টেলিফোন নাম্বার পেলি কই ?
উত্তর না-দিয়ে ফোনটা কেটে দিল ওয়াহেদ।
ঠিক ওই দিনই আরেকটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটল …
সন্ধ্যের পর অফিস থেকে ফিরছি । বৃষ্টি ঠিক পড়ছিল না। তবে আকাশ মেঘলাই ছিল। আমি একটা গলির মুখে ঢুকছিলাম।ঠিক তখনই ছেলেবেলার বন্ধু জাফর- এর সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হয়ে গেল।ওর সঙ্গে যশোরে একই স্কুলে পড়েছি। ওর বাবার বদলীর চাকরি। আমরা যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন ওরা য়শোর থেকে খুলনায় চলে যায়। তারপর আর জাফর-এর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিলনা।
জাফরই আমায় চিনতে পেরে ডাক ছিল, শাহেদ।
আমার নাম শুনে থমকে গেলাম। তারপর জাফরকে দেখে অবাক। প্রাণবন্ত ছেলে জাফর। দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর আমরা একটা রেষ্টুরেন্টে ঢুকলাম। আফটার অল এতদিন পর দেখা। অনেক প্রশ্ন অনেক কৌতূহল জমে আছে। বেশ ভালো চাকরি করে জাফর। বিয়েও করেছে। ইন্সটলমেন্টে ফ্ল্যাটও নাকি কিনেছে মীরপুরে।
কথায় কথায় ওকে জিগ্যেস করলাম, তোর ওয়াহেদকে মনে আছে জাফর?
আমার প্রশ্ন শুনে জাফর- এর মুখে মেঘ জমে উঠল। চায়ে চুমুক না-দিয়ে সিগারেট ধরালো। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলল, আছে। কেন?
ওয়াহেদ আজ আমাকে ফোন করেছিল।
অসম্ভব!
অসম্ভব মানে? আমি অবাক।
ওয়াহেদ তো …
কী!
ও তো বেঁচে নেই।
বেঁচে নেই মানে? আমার মনে হল আমার পায়ের নীচের মেঝে হঠাৎ সরে গেছে।জাফর এসব কী যা তা বলছে। ওয়াহেদ বেঁচে না থাকলে আজ ভোরে আমাকে কে ফোন করল?
জাফর চুপ করে থাকে। গভীরভাবে কী যেন ভাবছে।সিগারেট টানতেও ভুলে গেছে। একটু পর সচেতন হয়ে উঠল। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, গত বছর আমি অফিসের কাজে নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম । ওখানেই হঠাৎ এক সাবওয়ে স্টেশনে অনেক বছর পর ওয়াহেদের সঙ্গে দেখা।ওই আমাকে চিনতে পারল। দেখে জড়িয়ে ধরল।
তারপর? আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। রেষ্টুরেন্টের গুঞ্জন ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল বলে মনে হল।
জাফর বলল, ওয়াহেদের বাড়ি ব্রুকলিনের আটলান্টিক অ্যাভিনিউতে । জোর করে নিয়ে গেল। বউ ক্যাথেরিন আর মেয়ে সুজানা কে নিয়ে ছোট্ট সুখি সংসার । তোর কথাও জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম, তোর সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই।
তারপর?
তোর কথাই বেশি বলছিল ওয়াহেদ। বলল যে, তোরা নাকি ভালো বন্ধু ছিলি। একসঙ্গে পাখির বাসা খুঁজতিস। একবার নাকি তুই ওকে ওর জন্মদিনে মাটির টিয়া পাখি উপহার দিয়েছিলি । আজও যত্ন করে পাখিটা রেখে দিয়েছে বলল।
হ্যাঁ। বললাম। আর তখনই আমার দপ করে মনে পড়ে গেল … ওয়াহেদ-এর জন্মদিন ছিল সতরই জুলাই। কেমন ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেলাম। আশ্চর্য! কবে কত বছর আগে ওয়াহেদকে ওর জন্মদিনে মাটির টিয়া পাখি উপহার দিয়েছিলাম, পাখিটা আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
জাফর বলল, নিউইয়র্কে আমি সপ্তাহখানেক ছিলাম। তখনই ওয়াহেদ- এর মৃত্যু সংবাদ পেলাম।
আমি কেঁপে উঠলাম।মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল, মারা গেল? কীভাবে?
কার অ্যাক্সিডেন্ট।অফিস থেকে ফিরছিল। তারিখটা আমার মনে আছে। সতরই জুলাই। বলে এক মুখ ধোঁয়া ছাড়ল জাফর।
আশ্চর্য!আমি জাফর এর দিকে তীক্ষ্ম চোখে তাকালাম। ধোঁয়ার ভিতরে ওর মুখ কিছু আবছা দেখায়। জাফর বলল, ক্যাথেরিনই আমাকে ফোন করেছিল। আমি কাজ ফেলে ব্রুকলিনে ছুটে যাই ।যদিও আমার ভীষণই অস্বস্তি লাগছিল। ওদের কী শান্ত¦না দেব-বিপর্যস্ত ক্যাথেরিন, তিন বছরের ফুটফুটে সুজানা। তাই বলছিলাম ওয়াহেদ তোকে ফোন করবে কোত্থেকে। তোর কোথাও ভুল হচ্ছে না তে শাহেদ?
আমি চুপ করে রইলাম। কী বলব বুঝতে পারছি না। ওয়াহেদ যে নাম্বার থেকে ফোন করেছিল সেটি এখনও আমার মোবাইলে সেভ করা আছে।
খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। জাফর- এর মোবাইলটা বাজল। কার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলল সে।তারপর কথা শেষ করে ফোন অফকরতে করতে বলল, আমি আজ উঠি রে । শাশুড়িকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। এই যে আমার কার্ড। যোগাযোগ রাখিস দোস্ত। বলে ভিজিটিং কার্ড দিয়ে চলে যায় জাফর।
আমার মাথা কেমন ঝিমঝিম করছিল। ঘোরের মধ্যে রেষ্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে কখন বাড়ি এসেছি। সতরই জুলাই তারিখটা মাথার ভিতরে ঘুরছিল। ওয়াহেদ কেন ওর জন্মদিনের দিনই আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে? ও যদি বেঁচে না-ই থাকে তো তাহলে কে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে?

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

গোলাপ ফুলের ঘ্রান [শেষ অংশ]

0

মঞ্জুর হাত তুলে মেয়েকে বলল, ওই যে দেখ মা। কী সুন্দর।

তাহিয়া লাল মাটির ওপর রোদের চিকড়ি-মিকড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ। অনেক সুন্দর বাবা।

বর্ণা আজ কালো রঙের জামদানী পড়েছে। বার্থ ডে গিফট। মঞ্জুর আগেই কিনে রেখেছিল। শাড়িটা বর্ণার গায়ের ফরসা রঙের সঙ্গে দারুণ মানিয়েছে। আশেপাশের মেয়েরা ওর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল।

তাহিয়া বেশ টইটই করেই হাঁটছিল।বর্ণা খানিকটা অবাক। তবে আজ সকালে টেবিলের ওপর গোলাপ পায়নি বলে খানিকটা নিশ্চিন্ত।মাইগ্রেনের ব্যাথাটাও সেরে গেছে ওর।তাহিয়া হাত তুলে বলল,ওটা কি বাবা?

কোনটা মা?

ওই যে,অনেক উঁচু,আর লাল রঙের।

ওহ্।ওটা?বুঝেছি।ওটা হল উইপোকার ঢিবি।বলে মঞ্জুর ওর প্যানাসনিকটা দিয়ে উইপোকার ঢিবির একটা স্ন্যাপ নেয় ।তারপর হঠাৎই অফিসের এক কলিগের কথা মনে পড়তেই বলল,জানো তাহিয়া বৃষ্টি পড়লেও না ওই উইপোকার ঢিবি নষ্ট হয় না।

সত্যি?

হ্যাঁ।সত্যি।

আলতাদিঘীর সবচে কাছের গ্রামটির নামও আলতাদিঘী। গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িই মাটির ।অনেক বাড়িই আবার দোতলা। ছবির মতন পরিষ্কার নিকানো উঠান।শীত পড়তে শুরু করেছে। আকাশ ধূসর।দূরের দিগন্তরেখায় এই সকালেও কুয়াশার ঘের।

মঞ্জুরের অফিসের স্টাফ নাসিরের আত্মীয়র বাড়িটিও দোতলা। অবস্থা বেশ স্বচ্ছল বলেই মনে হল।নাসিরের এক খালাতো ভাইয়ের নাম সাঈদ।নওগাঁ কলেজে পড়ে।যত্ন করে বসিয়ে গুড়ের সন্দেশ আর পেঁপের শরবত খেতে দিল সে।সাঈদই ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সব দেখাল।গ্রামের পরই শালবন ঘেরা আলতাদীঘি।টলটলে কালো জলের বিশাল দীঘি।দেখে অনেক প্রাচীন বলে মনে হয়।দীঘির জলে পদ্মফুল চোখে পড়ে ।একটি দুটি হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে।তাহিয়া হাত তুলে দেখিয়ে বলল, বাবা দেখ। কী সুন্দর পাখি।

সাঈদ হেসে বলল,ওগুলি হল অতিথি পাথি।শীত পড়তে শুরু করেছে বলে আসতে শুরু করেছে।

আলতাদীঘির টলটলে কালো জলের বিস্তার দেখে বর্ণার শরীর শিরশির করতে থাকে।যে জলসম্ভারকে ও ভয় পায়, ঘৃনা করে-কখনও ভাবেনি সেই জলের সম্ভারের পাশে একদিন এসে ও দাঁড়াবে।

আলতাদীঘির দৈর্ঘ্য কত হবে জান সাঈদ? মঞ্জুর জিজ্ঞেস করে।

সাঈদ বলল এক কিলোমিটারের মতন হবে স্যার। ওই যে, ওই দিকে ইন্ডিয়ার বর্ডার।

ওয়াও।

দীঘিতে নৌকা আছে। দাঁড়টানা নৌকা। মঞ্জুর ওদের নিয়ে নৌকায় উঠতে চাইল। বর্ণা কিছুতেই নৌকায়উঠবে না।

মঞ্জুর বলল, থাক, তাহলে।

ও লক্ষ করেছে আলতাদীঘির পাড়ে আসার পর থেকেই বর্ণা কেমন গম্ভীর হয়ে আছে।

দুপুরের সাঈদদের বাড়িতে কালোজিরার ভর্তা, নিরামিষ, লেবু-নারকেল দিয়ে হাঁসের তরকারী, আমের টক আচার আর দই খেয়ে সন্ধ্যের আগেই ধামইরহাট শহরে ফিরে এল ওরা ।

রাতে শোওয়ার ঘরে গোলাপ ফুলের হালকা ঘ্রান পেল বর্ণা। নিমিষে মনটা অস্বস্তিতে ছেয়ে যায়। ঘরে আবছা অন্ধকার। তাহিয়া বিছানার এক কোণে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে। মঞ্জুর বারান্দায়। সিগারেট খাচ্ছে।

গোলাপ ফুলের ঘ্রান এই মুহূর্তে ঘন হয়ে উঠেছে। বর্ণা চোখ বন্ধ করে। বিশাল প্রাচীন আলতাদীঘির টলটলে কালে জলের বিস্তার ভেসে ওঠে। ও কেঁপে ওঠে। দীঘির জলের পদ্মবনের নীচে একটি বালকের লাশ।ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়।

ঠিক তখনই মঞ্জুর ফিরে আসে। বর্ণার পাশে শোয় বিছানায়। বর্ণাতামাকের গন্ধ পায়। ও ফিসফিস করে বলে, মঞ্জুর?

বল।

আজ আমি আলতাদীঘি যেতে চাইনি কেন জান?

কেন?

অলক নামে আমার এক ভাই ছিল। ও যখন স্কুলে পড়ত … ক্লাস সেভেনে। আমিসে বছর এসএসসি দেব। আলতাদীঘি পিকনিকে এসেছিল অলক।

তারপর?

বর্ণা চুপ করে থাকে।অন্ধকারে গোলাপ ফুলের ঘ্র্রান পায়।

তারপর কি হল? মঞ্জুরের কন্ঠস্বরকেমন অসহিষ্ণু শোনায়।

বর্ণা জিগ্যেস করে, তুমি … তুমি ঘরে গোলাপ ফুলের গন্ধ পাচ্ছ মঞ্জুর?

হ্যাঁ।

অলক ভোরবেলা আমায় গোলাপ ফুল এনে দিত । আমাদের নীলফামারীর বাড়িটাছিল অনেক পুরনো । পিছনে কালীবাড়ির মাঠ, তারপর প্রতিমা বিদ্যানিকেতন। আমি অবশ্য ওই স্কুলে পড়িনি। বাবা ছিলেন নীলফামারী জাদুঘরের কিউরেটর … অলক গোলাপ ফুল ভালোবাসত। ও ভোরবলা

কালীবাড়ির মাঠ পেরিয়ে কই যেন চলে যেত। ভালো করে রোদ ওঠার আগেইগোলাপ ফুল নিয়ে ফিরে আসত। … ও কোথায় গোলাপফুল পেত তা কখনও বলেনি, জিজ্ঞেস করলে হাসত কেবল…ও ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে আলতাদীঘিতে পিকনিকে গেল। বাবা ওকে ছাড়তের না। অলক পড়ত দীনবন্ধু হাই স্কুলে। ওই স্কুলের বাংলার শিক্ষক অজিত স্যার ছিলেন বাবার বন্ধু ।

তারপর?

তারপর অলক … অলক আলতাদীঘি ডুবে মারা যায়। ও … ও নৌকা থেকে পড়ে গিয়েছিল। ওর … ওর লাশ পাওয়া যায়নি।

ওহ্ ।

বর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, অলকের মৃত্যুর পর আমিমানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। সেই প্রথম মাইগ্রেনের ব্যাথা টের পেলাম। কোনওমতে এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। বাবাও মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতেন না। ভাগ্যিস সেসব দুঃসহ দিনে অজিত স্যার আমার পাশে ছিলেন । তারপর … তারপর অদ্ভূত সব ঘটনা ঘটতে লাগল।

কী!

আমি আর বাবা ঘরে গোলাপ ফুলের গন্ধ পেতাম।আর আর মনে হত ঘরের মধ্যে কে যেন অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। একে অলক -এর শোক, তার ওপর অশরীরীর উৎপাত।আমাদের দিনগুলি রাতগুলি অসহ্য হয়ে উঠছিল … যা তোমাকে বোঝাতে পারব না। অজিত স্যার এক তান্ত্রিক ডেকে এনেছিলেন। লাভ হয়নি। বরং অশরীরীর উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। বাবা অতিষ্ঠ হয়ে চাকরি ছেড়ে দিলেন। তারপর আমরা বগুড়ায় চলে এলাম।

তারপর?

তারপর আর গোলাপ ফুলের গন্ধ পাইনি, অশরীরীর উৎপাতও হয়নি। গতকালই অনেক দিন পর তাহিয়ার হাতে গোলাপ ফুল দেখে চমকে উঠলাম।তাহিয়ার হাতে!মানে?

হ্যাঁ। কাল দুপুরে।

তুমি তখন অফিসে।আমি ওকে বললাম ফুল পেলি কই?ও বলল, টেবিলের ওপর পেয়েছি।অলকও আমার ঘরের টেবিলের পর গোলাপ ফুল রেখে যেত যখন যখন ও বেঁচে ছিল।ও যখন মরে গেল তখনও টেবিলের ওপর গোলাপ ফুল দেখতাম ।

আমার মনে হল পর্দার ওপাশে বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে …

মঞ্জুর মাথা তুলে বারান্দার দরজার দিকে তাকালো।

বর্ণা চাপাস্বরে বলে, তোমার…তোমার কি মনে হচ্ছে পর্দার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে?

হ্যাঁ।

বর্ণা ফিসফিস করে বলল, আমাদের এখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে মন্জুর ।

 

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

গোলাপ ফুলের ঘ্রান [১ম অংশ]

0

তাহিয়ার হাতে গোলাপ ফুল দেখে বর্ণা চমকে উঠল।ও অস্ফুট স্বরে বলে,ফুল পেলি কই তুই?তাহিয়া রিনরিনে গলায় বলল,টেবিলের ওপর পেয়েছি।আম্মু তুমিফুলটা নেবে বলে ফুলটা বর্ণার দিকে বাড়িয়ে দেয়।বর্ণা এক পা পিছিয়ে আসে।ভীষণ কাঁপছিল ও।আশ্চর্য! তাহিয়া গোলাপ ফুল পেল কই?এ বাড়ির নীচতলার বাগানে তো গোলাপের ঝাড় নেই।ছাদে কি বারান্দায় গোলাপের টবও নেই। তাহলে?ফুলটা টেবিলের ওপর পেয়েছে বলল।টেবিলের ওপর কে গোলাপ ফুল রাখল? আশ্চর্য! তাছাড়া …না, বর্ণা ওই ব্যাপারটা ভাবতে চায় না..এত বছর পর

কথাটা কি মঞ্জুর কে বলব? না থাক।মঞ্জুর এখন অফিসের কাজে ব্যস্ত।মাসখানেক হল নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা সদরে বদলী হয়ে এসেছে।নতুন অফিস সেটআপ করার দায়িত্ব ওর ওপরই।সেই সাত সকালে বেড়িয়ে যায়।ফেরে অনেক রাতে।বর্ণার অবশ্য নিরিবিলি এই মফস্বল শহরটা ভালোই লাগছে। মঞ্জুরের ব্যস্ততা সত্ত্বেও ওরা এরই মধ্যে বেশ কিছু জায়গা ঘুরেও দেখেছে। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, পতিসর রবীন্দ্র কাচারিবাড়ি, কুশুম্বা মসজিদ। বলিহার রাজবাড়ি, আলতাদীঘি, হলুদবিহার, আর দুবলহাটি জমিদারবাড়িও দেখার কথা আছে।নতুন জায়গায় সময় বেশ কেটে যাচ্ছে।তাহিয়া এবার ক্লাস থ্রিতে উঠল।ওর স্কুলটা কাছেই। গলির মুখে বড় রাস্তার ওপর। বর্ণাই মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসে।নিয়েও আসে। অভিভাবকদের সঙ্গে গল্প-টল্প করে সময়টা ভালোই কেটে যায়।খালি বাড়িতে থাকলে শরীর কেমন শিরশির করে।সকালবেলায় অবশ্য একজন মাঝবয়েসি মহিলা আসে।ঘরদোর পরিস্কার করে দেয়,রান্নাবান্নাও করে।তার সঙ্গে কথা বলে কিছু সময় কাটে। অন্য সময়টুকু পার করে তাহিয়াকে পড়িয়েকিংবা গল্প করে।কিন্তু তাহিয়া গোলাপ ফুল পাওয়ার পর থেকেই সারাক্ষণ গা কেমন ছমছম করছে বর্ণার।

টেবিলের ওপর কে গোলাপ ফুল রাখল?

সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে।দোতলাএই বাড়িটা বেশ পুরনো।ঘরগুলি বেশ বড় আর অন্ধকার।এক এক করে ঘরের আলো জ্বালালো।তাহিয়া ড্রইংরুমে টিভি দেখছিল।এখন সোফার ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে।আজান শুনতে পেল বর্ণা। মাথায় কাপড় দিয়ে টিভির সাউন্ড কমিয়ে দিল।ঠিক তখনই কলিংবেল বাজল।দরজা খুলে দেখল মঞ্জুর।ওকে দেখেই মঞ্জুর বলল,হ্যাপি বার্থ ডে।

বর্ণা হাসল হাসল।পরক্ষণেই হাসিমুছে গেল।মঞ্জুরের হাতে গোলাপ।মুহূর্তেই বর্ণার মন অস্বস্তিতে ছেয়ে যায়। বলে,আশ্চর্য!ফুল পেলে কই?

টুটপাড়ার মোড়ে একটা ছেলে বিক্রিকরছিল ।ভাবলাম তোমাকে উইশ করব।এই নাও ধরো।

ফুল নিতে নিতে বর্ণা বলল,আরে,আমার জন্মদিন তো কাল।

জানি।বলে মঞ্জুর ঘরে ঢুকল। ব্রিফকেস রেখে চেয়ারে বসল। জিগ্যেস করল,তাহিয়া কখন ঘুমিয়েছে?

এই তো ঘন্টাখানে হল।থাক ঘুমাক।বলে রান্নাঘরে এল বর্ণা। গোলাপ ফুলের দিকে তাকালো। জন্মদিনের প্রথম উপহার।বর্ণা কে কেমন অন্যমনস্ক দেখায়।জন্মদিন এলেই বাবাকে মনে পড়ে যায় ওর ।মেয়ের জন্মদিন নিয়ে বাবার যে কী উৎসাহ ছিল।বাবা নিজেই মেয়ের জন্মদিনের সকালে খেজুরের গুড়ের পায়েস রান্না করতেন।কী চমৎকার রান্নার হাত ছিল বাবার।বর্ণার বান্ধবীরা সব আসত।কী অদ্ভূতসুন্দর ছিল নীলফামারীর সেই মেয়েবেলা। বাবা ছিলেন নীলফামারী জাদুঘরের কিউরেটর। ছেলে আর মেয়েকে কী ভালোই না বাসতেন ।বর্ণা আর অলককে নিয়ে কতজায়গায় যে ঘুরে বেড়াতেন।ধর্মপালের রাজবাড়ি, ময়নামতি দুর্গ,সৈয়দপুরের চিনি মসজিদ,কুন্দুপুকুর মাজার, দুন্দিবাড়ী স্লুইসগেট..মা যে নেই তা মা মরা দুই অনাথ শিশুকে মোটেও বুঝতে দিতেন না।একটা কাঁচের গ্লাসে পানি ভরে তাতে গোলাপ ফুল ভিজিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর এনে গ্লাসটা রাখল বর্ণা।মঞ্জুর জুতা খুলতে খুলতে বলল,কাল ছুটি নিয়েছি,বুঝলে। সকাল-সকাল সোজা আলতাদীঘি ন্যাশনাল পার্ক চলে যাব।সারাদিন ঘুরে বেড়াব।উত্তর না-দিয়ে মঞ্জুরের দিকে অদ্ভূত চোখে তাকালো বর্ণা।সারাশরীর কাঁপছে ওর ফরসা মুখটা আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে।বর্ণা টের পাচ্ছে ওর মাইগ্রেনের ব্যাথাটা ফিরে আসছে

রাত এগারোটার মত বাজে।তাহিয়া বিছানার এক কোণে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে। মঞ্জুর বারান্দায়;দিনের শেষ সিগারেট খাচ্ছে।ও ঘরে সিগারেট খায় না।বর্ণা বিছানায় শুয়ে আছে।কপালের দু’পাশের শিরা টিপটিপ করছে।সন্ধ্যার পর থেকে মাথা ধরে আছে ওর।এখনও ছাড়ছে না।দুটো প্যারাসিটামল খেয়েছে।কাজ হয়নি।সিগারেট শেষ করে মঞ্জুর শোওয়ার ঘরে আসে। বর্ণার পাশে শোয় বিছানায়। বর্ণাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে।বর্ণা বলে,কাল আলতাদীঘি না গেলে হয় না মঞ্জুর?

কেন?

এমনি।বরং চলো,কাল আমরা দুবলহাটি জমিদারবাড়ি যাই।ওখানে তো এখনও যাওয়া হয়নি।বাবার মুখে শুনেছি দুবলহাটি জমিদারবাড়ির দালানগুলি নাকি অসাধারণ।

মঞ্জুর বলে,আহা বুঝলাম তো। কিন্তু,দুবলহাটি জমিদারবাড়ি পরে গেলেও তো চলবে।আমার তো এখনই ধামইরহাট থেকে ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে না।বর্ণা বলল,সে না হয় বুঝলাম।কিন্তু,শুনেছি,আলতাদীঘি যেতেনাকি কাঁচা রাস্তায় অনেকক্ষণ হাঁটতে হয়।তাহিয়া অত হাঁটতে পারবে না।মঞ্জুর বলল,আহা, তাহিয়া হাঁটতে না পরলে ওকে কোলে নেওয়া যাবে।এতদিন হল ধামইরহাট এসেছি,এখনও আলতাদীঘি ন্যাশনাল পার্ক যাওয়া হল না শুনে অফিসের কলিগরা আমাকে এক হাত নিল।আলতাদীঘির কাছেই এক গ্রামে আমাদের অফিসের একজন স্টাফ এর এক আত্মীয়র বাড়ি।ছেলেটির নাম নাসির।নাসির তাদের টেলিফোন করে জানিয়ে দেবে ওখানেই কাল দুপুরে আমরা খাব।

ওহ।তাহলে সব ঠিক করেই এসেছে বর্ণা খানিকটা ফুঁসে ওঠে বলল।

সাইপ্রাইস!সাইপ্রাইস!মাই ডিয়ার। বলে বর্ণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মঞ্জুর।কানের লতিতে আলতো করে চুমু খায়।বর্ণা চুপ করে থাকে।শরীর শিরশির করছিল। তবে বুকের ভিতর ভীষণ আলোরণও টের পাচ্ছিল।একটু পর মঞ্জুর ঘুমিয়ে পড়ে।বর্ণা জেগে থাকে।অন্ধকার ঘরে গোলাপ ফুলের হালকা গন্ধ।আশ্চর্য!মুখ ফিরিয়ে দেখল-বারান্দার পর্দা বাতাসে নড়ছে।বর্ণার মনে হল পর্দার ওপাশে কে যেন দাঁড়িয়ে…..

আলতাদীঘি ন্যাশনাল পার্কটা ধামইরহাট উপজেলা সদরের ৫ কিলোমিটার উত্তর দিকে।একটা ব্রিজের পর কাঁচা রাস্তা।রাস্তার দু’পাশে বাঁশঝাড় আর গাছপালা।লালমাটির উচুঁ-নীচু রাস্তায় কিছুক্ষণ হাঁটার পর দু’পাশে ঘন শালবন চোখে পড়ে।তবে শালবনে রোদ সরাসরি পড়েনি।লতাপাতায় জড়িয়ে মাটিতে পড়েছে।দেখে মনে হয় যেন লাল মাটিতে জ্যোত্‍স্না বিছানো।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের