অতিপ্রাকৃত ­ [শেষ অংশ]

1

আদিত্য উঠে দাঁড়াল। ওকে ভাঙতি কিছু টাকা দিয়ে দরজা অবধি পৌছে দিলাম। তারপর দরজা বন্ধ করে গেস্টরূমে উঁকি দিলাম। সাদেক মিঞা ভোস ভোস করে ঘুমাচ্ছে। তবে গেস্টরুমে আতরের তীব্র গন্ধ পেয়ে অবাক হলাম।
আমার ঘরে যেতেই বাজে একটা আশটে গন্ধ। মনে পড়ল আদিত্য নিশিকাটি গ্রামে হাজেরাকে দেখেছে বলল। আসলে আদিত্যর কোনও কারণে হেলুসিনেশন হয়েছে। ভারি সেনসেটিভ ছেলে।
হাজেরার রান্নার কদ্দূর কি হল। হলে সাদেক মিঞাকে ডেকে খেতে বলব। রান্নাঘরে গেলাম। রান্নাঘরে হাজেরা নেই। ডালের চুলা বন্ধ। ভাতের হাঁড়ি বারান্দায়। বারান্দায় হাজেরা নেই। বাকি রূমগুলো দেখলাম। নেই। বাথরুমে নেই। ও বাইরে যায়নি তো । না। আমার ঘরে আমি যে চেয়ারে বসে ছিলাম সেখান থেকে মেইন গেইটা দেখা যায়। নাহ্ । কেউ বেড়িয়ে যায়নি।
জেসমিনকে ফোন করলাম। হাজেরা কি তোমার ওখানে?
না মামা।
আশ্চর্য!
কেন আপনার ওখানে নেই?
না। আচ্ছা। তোমায় সব পরে জানাচ্ছি।
আচ্ছা।
ইন্টারকমে নীচে ফোন করলাম । জামাল ধরল, বললাম, সেভেন বি- থ্রিরকাজের মেয়েটি কি নীচে নেমেছে?
না স্যার।
তুমি সিওর?
জ্বী, স্যার।
বেশ খানিকটা স্তম্ভিত হয়ে রিসিভার রেখে দিলাম। আদিত্যর তাহলে হেলুসিনেশন হয়নি। আমার কি হচ্ছে? আমি হাজেরাকে দেখছি না কেন? ওয়াল ক্লকের দিকে তাকালাম। একটা বাজতে পাঁচ মিনিট। গেস্ট রুমে ঢুকলাম। বিছানার ওপর বসে আছে সাদেক মিঞা। কানে সিটিসেলের একটা শস্তা সেট ঠেকিয়ে কার সঙ্গে ফোন কথা বলছে। সেটটায় আবার লাল সুতলি বাঁধা। সাদেক মিঞা বলল, আইচ্ছা আমি আইতেছি। তুমি আধামন চুন সংগ্রহ কর সালামত। তারপর ফোন অফ করে আমার দিকে তাকিয়ে সাদেক মিঞা বলল, স্যার। আমারে এখনি একবার মানিকগঞ্জের ঘিওর যাইতে হইব। মৌলভী সুলেমান মুন্সির পুকুরে জিনিসটা দেখা গেছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, আচ্ছা যাও। তার আগে একটু ভাত মুখে দিয়ে যাও।
সময় নাই ছার। সন্ধা নাগাদ জিনিসটা ভাইসা উঠব। তখনই চূনপড়া ছিটাইতে হইব। বলতে বলতে সাদেক মিঞা বিছানা থেকে নেমে গেস্টরুমের বাইরে বেরিয়ে এল। বলল, আমার ব্যাগখান কই ছার?
ও তোমার ব্যাগ । তোমার ব্যাগ তো রান্নাঘরে। এসো।দিচ্ছি।
রান্নাঘরের মেঝের ওপর একটা রুইমাছ পড়ে আছে। বেশ বড় মাছ। আমারশরীর কেঁপে উঠল।
সাদেক মিঞা বলল, জিনিসটা তাইলে এইখানে। বলে মাছটা ধরে ব্যাগে ভরল। তারপর বলল, আমি মাছটা নিয়া গেলাম স্যার। এইটা এইখানে থাকলে মুসিবত আছে।
আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না।
দরজার কাছে এসে সাদেক মিঞা বলল, আমি আবার আসমু সার। দেখলেন তো কেমন ব্যস্থ থাকি। তয় আপনার ছুট বইনের পোলায় হারা বছর আদার-বাদারে ঘুইরা বেড়ায়। কিয়ের মইধ্যে গিয়া পড়ে, কি দেখে না দেখে, নিজেও ঠাওর পায় না। তারে এই তাবিজখান দিয়েন স্যার ।এই তাবিজ ধারণ না করলে হে বড় বিপদে পড়ব কইলাম।
বলে শূন্য থেকেই একটা কাইতন লাগানো ছোট্ট রুপোর তাবিজ আমাকে দিল।
আমি কখনও কোনওদিনই এইসব তাবিজ-কবজের মন্ত্রশক্তি কিংবা অতিপ্রাকৃত ঘটনায় বিশ্বাস করিনি।
আজ আর তাবিজ না নিয়ে পারলাম না ..

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অতিপ্রাকৃত ­[৩য় অংশ]

1

আদিত্য কি বলতে যাবে- হাজেরা চা নিয়ে এল। এত শীঘ্র চা বানাল কীভাবে। আমি অবাক হলাম। দেখলাম আদিত্য অবাক হয়ে হাজেরার মুখের দিকে চেয়ে আছে।
চা দিয়ে হাজেরা চলে যেতেই আদিত্য বলল, মামা আমি এই মেয়েটাকে এর আগে দেখেছি।
সে কী রে। কোথায় দেখেছিস?
তোমাকে বলেছিলাম না- গতবছর আমি সুতারখালী গিয়েছিলাম?
হ্যাঁ। মনে আছে।
মেয়েটাকে ওখানে দেখেছি।
বলিস কী। তুই বলছিলি ওখানকার জেলেরা নাকি কাঁচামাছ খায়?
হ্যাঁ, খায়। তবে আরও অনেক কিছুই তারা করে।
আমি দর্শনের অধ্যাপনা করেছি। কুসংস্কার প্রশ্রয় দিইনি। আমি বিশ্বাস করি সব কিছুর ব্যাখ্যা রয়েছে। আজহোক কাল হোক বোঝা যাবে …আমার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল। বললাম, খুলে বল ।
আদিত্য বলল, গত বছর যখন সুতারখালীযাই- আমার সঙ্গে আমার বন্ধু আদনানছিল। আমরা ঠিক করেছিলাম খুব কাছ থেকে আমরা জেলেদের জীবন দেখব এবং জেলেপাড়ায় আগে থেকে খোঁজ খবর করে যাব না। কোনও উপজেলায় নেমে লোকাল বাসে চেপে কোনও নদীর ধারে নেমে পড়ব। এভাবে দাকোপ উপজেলায় নেমে লোকাল বাসে চেপে নিশিকাটি বলে একটা গ্রামে পৌঁছে গেলাম। গ্রামটা ভদ্র্রা নদীর পাড় ঘেঁষে । ছোট গ্রাম। আমি আর আদদান এক জেলে পরিবারে উঠেছিলাম। তো, পরদিন খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙল। আদনান ঘুমিয়ে ছিল। আমি উঠে ভদ্রা নদীর পাড়ে গেলাম। নির্জন পাড়। বাতাসে কেমন আশটে গন্ধ। দেখি যে নদীর ধারে কয়েকজন লোক বসে আছে। গতকাল এদের জেলেপাড়ায় দেখেছি। তারা কাঁচা মাছ খাচ্ছে।
কাঁচা মাছ? কি মাছ?
এই ধর, খলিসা, মেনি, চাপিলা।
কাঁচাই খাচ্ছে?
হ্যাঁ, কাঁচা। চিবিয়ে।
কথাটা শুনে আমার মুখটা মনে হয় এখনসিরিয়াস দেখাল।
আদিত্য বলল, আমার বমি বমি লাগছিল।ফিরে এলাম। রোদ উঠতে দেখি আদনান- এর খুব জ্বর । দুপুরে ওর জ্বর সারল। ও আর ওখানে থাকতে চাইল না। অগত্যা ফিরে এলাম। এই ক’দিন আগে আবার গেলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, একা?
হ্যাঁ। একা। আদনান সিলেট। অন্যদেরও পেলাম না।
গেলি কি কাঁচামাছ খাওয়ার রহস্যভেদ করতে?
ঠিক তা না মামা। নিশিকাটি গ্রামটা কেমন টানছিল। গতবছর ভোরের ভদ্রা নদীর ছবি তুলেছিলাম।ভদ্রার ওইপাড়ে বিস্তীর্ণ মাঠ। এতবড় মাঠ এর আগে দেখিনি। ঠিক যেন তেপান্তরের মাঠ। গাছপালা নেই। আকাশের রংও যেন কেমন। গভীর ফিরোজা। কোনও চেঞ্জ নেই। তাই ভাবলাম পূর্ণিমায় নদী-মাঠের ছবি তুলব। এবার পূর্ণিমা হিসেব করে রওনা হলাম। এবারও সেই জেলেপরিবারেই উঠেছি। রাতে ঘুমালাম না । মাঝরাতে ভদ্রার পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। চারিদিকে দিনের মত অলো। পাড়ে উলটানো নৌকা। একটা নৌকায় হেলান দিয়ে বসে রইলাম। হাতে তোমার দেওয়া ১৮ মেগার ক্যানন ইওএস এমটা । মাঝে মাঝে ছবি তুলছিলাম । ওপারে তেপান্তরের মাঠ চাঁদের আলোয় ভেসেযাচ্ছিল। এমন সময় বড় একটা মাছ ভেসে উঠেই আবার আবার ডুবে গেল। অনেক বড় মাছ, এই ধর একটা নৌকার সমান। মাছটা রুই মাছে মতন দেখতে। আমি তো অবাক। তবে ছবি তুলে নিলাম।তখনই অদ্ভূত এক আওয়াজ শুনতে পেলাম। দেখলাম জেলেপাড়ার সবাই অদ্ভূত আওয়াজ করতে করতে ছুটে আসছে। এই ধর দু-তিনশ জন হবে। দলটায় ছেলেবুড়ো সবাই আছে। তারা পানির কাছে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু, পানিতে পড়ার আগে এক এক জন রুই মাছ রূপান্তরিত হল।
ক্বি! কি বলছিস তুই!
হ্যাঁ। যা দেখেছি তাই বলছি।ভৌতিকদৃশ্যটা দেখে আমার শরীর জমে গেল। মনে হচ্ছিল অজ্ঞান হয়ে যাব। নদী শান্ত। মৃদু রূপালি ঢেউ। একটু পর ঝাঁক ঝাঁক রুইমাছ ডলফিনের মতন লাফালাফি করতে লাগল। ছবি তুলে নিলাম। অনেক মাছ। এই ধর কয়েক হাজার । আবার সেই বড় রুই মাছটা ছোট তিমির মতন ভেসে উঠল। ছবি তুলেনিলাম। আমার হাত কাঁপছিল। হঠাৎ দেখলাম রুইয়ের ঝাঁক দ্রুত তীরের দিকে আসতে লাগল। তীরে উঠেই সব কটামাছ ভয়ঙ্কর রূপ ধরল। ভীষণ বিভৎস-কী বলব।হলুদ লম্বা কান, মাথায় ছোট্ট লাল রঙের শিং। সারা শরীরে সোনালি রোম। তারা উলু ধ্বণির মতন শব্দ করে আমার দিকে তেড়ে আসতে ।
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, তারপর?
আমি উঠে দৌড় দিলাম। উচুঁ পাড়ে উঠেএকবারও পিছনে না তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকি। এড়বোখেবড়ো রাস্তা। ওপাশে একটা খাল। খালটা আড়াআড়ি পেরোতেই ক্যামেরা ছিটকে পানিতে পড়ে যায়। পিছনের ওরাও খালের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মুখ দিয়ে সেই অদ্ভূত স্বর করছে …তারপর আমি কীভাবে খাল পেরিয়ে করলা আর কলমি শাকের ক্ষেত আর শিরীষের জঙ্গল পেরিয়ে পিচ রাস্তায় উঠে এলাম বলতে পারব না। দৌড়াতে দৌড়াতে টের পেলাম শেষ রাত। তখনও দৌড়াচ্ছি। আন্দাজে। আধা কিলোর মতন দৌড়ানোর পর আজান শুনতে পেলাম।তখন পিছনে ওদের আওয়াজ কমে এল। একটা মসজিদ চোখে পড়ল। মসজিদের সামনে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। তারপর মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে দেখি মাথার কাছে মুয়াজ্জ্বিন সাহেব বসে।দোওয়া দরুদ পড়ছে। সব শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, নিশিকাটি গ্রামের নাম বাপ-দাদার আমলে শুনছি। অনেক বছর আগে ছিল। এখন আর নাই। বন্যায় নাকি ভেইসে গেছে। তিনিই টাকা-পয়সা দিয়ে আমাকে খুলনার বাসে তুলে দিলেন।
ওহ্। আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছি না।
ঠিক তখনই ফোন বাজল। শবনম।
হ্যাঁ। বল।
শবনম থমথমে গলায় বলল, ভাইজান আদিত্যকে এখুনি বাড়ি আসতে বল, ও যদি এখন না আসে, তাহলে যেন সারাজীবনে না আসে।
ঠিক আছে। পাঠাচ্ছি। বলে ফোন অফ করে দিলাম। বললাম, শোন, আদিত্য। তুই এবার বাড়ি যা। তোর মা ক্ষেপেছে । আবার আসিস। তখন ঘটনাটার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাব।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অতিপ্রাকৃত ­[২য় অংশ]

2

লিফটের কাছে তাঁকে রিসীভ করে বললাম, এসো সাদেক মিঞা। কেমন আছ?
আল্লায় তার বান্দারে রাখছে। আপনার শরীর ভালো নি?
আমি ভালো।
ঘরে এসে দরজা বন্ধ করতে করতে বললাম। বস। আরাম করে।
সাদেক মিঞা সোফায় বসল। এদিক-ওদিক দেখছে। ড্রইংরুমটা তেমন সাজাগো গোছানো না। বইপত্র ছড়ানো।
সাদেক মিঞার হাতে একটা পাটের ব্যাগ। অতি গ্রাম্য চেহারা । পরনে পুরনো হলেও পরিস্কার সাদা লুঙ্গি আর খয়েরি রঙের পাঞ্জাবি। মাথায় কাপড়ের টুপি। গোলপানা হলদেমঙ্গোলয়েড চেহারা। ভুঁরু কম। তবেভরাট মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি।
জিজ্ঞেস করলাম, ঢাকা কবে এলে?
গতকাল নরসিংদী আইছিলাম । শিবপুর।হারুন চেয়ারম্যান ছারের ভিটায় একটা জিনিস ভর করছিল। সেইটারে ভোররাইতে পাটের বস্তায় বাইন্দা আইজ ভোর ভোর টাইমে যাত্রা করছি।
ও। সাদেক মিঞার জগৎ ভিন্ন।সেই জগতে ঘটনার কার্যকারণ অন্য রকম। যা আমাদের নিত্য দিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে মেলে না। জিনিস বলতে সে জগতে জিনভূত বোঝায়।
সাদেক মিঞা কী বলতে যাবে -অমনি ঝনঝন করে টিএনটি ফোনটা বাজল । শবনম।
বললাম, হ্যালো। শবনম। বল।
ভাইজান আদিত্য কে ফোনে পাচ্ছি না।
ওনা কয়েক দিন আগে খুলনা গেল। সুতারখালী না কই-
হ্যাঁ। আদিত্যর ফোন বন্ধ। কাল রাত থেকে ফোনে পাচ্ছি না।আজ সকালেও পাচ্ছি না।
সে কী! আচ্ছা আমি খোঁজ নিচ্ছি। তুই অত ভাবিস না। বলে অফ করে দিই। পাত্তা দিলাম না। শবনম- এর টেনশন করার বাতিক আছে। আদিত্য আমার অতি আদরের ভাগ্নে। আমার মতোই স্বভাবচরিত্র ওর । কী এক নেশায় বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। এদিকে ওর মায়ের টেনশন আর টেনশন।
সামান্য তেজারতি স্যার। বলে পাটের ব্যাগটা দেখলো সাদেক মিঞা ।
কি দরকার ছিল বলে ব্যাগটা রান্না ঘরে নিয়ে গেলাম।টের পেলাম আমার মন কিছুটা বিষন্ন হয়ে রয়েছে । আসলে আমারও আদিত্যর জন্য টেনশন হচ্ছিল। বড় ছন্নছাড়া ছেলে-কখন কোন্ বিপদে জড়ায় কে জানে ।আদিত্য বুয়েটে পড়ছে। ওর মা-বাবা চাইছে ওকে বাইরে পাঠিয়ে দিতে। আদিত্য বাইরে যাবে না। এমন ত্যাঁদোড় ছেলে।
পাটের ব্যাগের ভিতর কাঁচা কলা, কাকরোল, দুটো কাঁচা পেঁপে দেখলাম। আখের গুড় আর এক শিশি কালিজিরার তেলও আছে ।ওগুলো বের করে ব্যাগটা রান্নাঘরে রাখলাম।
ড্রইংরুমে ফিরে এসে সাদেক মিঞাকেজিজ্ঞেস করলাম, সে কিছু খাবে কিনা?
না। হারুন চেয়ারম্যান ছারে খাসীরগোশতের বিরানি পাকায়ছিল।খাইছি পেট ভইরা।
ও। তাহলে পরে খেও। আমি রান্নাবান্না করে রাখব। বলে একটাকাপে সাদেক মিঞাকে চা দিলাম। চা খেয়ে সাদেক মিঞা বলল, স্যার আমার একটুখানি ঘুমান দরকার। জিনিসটা ধরতে সারা রাইত হারুন চেয়ারম্যানছারের পুকুরের পাড়ে জাম্বুরা গাছে বইসা ছিলাম। মশায় কামড়াইছে।
আচ্ছা, তুমি তাহলে রেস্ট নাও। গোছল করবে?
হইলে ভালো হয়।
সাদেক মিঞা কে গেস্টরূমের লাগোয়াবাথরুমটা দেখিয়ে দিলাম। তারপর সর্ষের তেলের শিশি আর নতুন একটা লাক্স সাবান দিলাম। নতুন তোয়ালে বাথরুমেই আছে।
সাদেক মিঞা গোছল সেরে শুয়ে পড়ল।
ইলেকট্রিশিয়ান সাইফুল এল। বললাম,দেখ তো বাবা ইন্টারকমটা কি হয়েছে । সাইফুল দুমিনিটেই ঠিক করে ফেলল । ওকে ৫০টাকা দিয়ে বিদায় করলাম।তারপর জেসমিন কে ইন্টারকমে ফোন করলাম। বললাম, আমার একজন গেস্ট এসেছে। রান্নাবান্না করা দরকার। তুমি কিহাজেরাকে পাঠাতে পারবে? অসুবিধে হবে?
না না, অসুবিধে হবে না মামা। নাসরীন এসেছে। আমি ওকে এখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
বললাম, আচ্ছা মেয়েটির কোথায় বাড়ি কোথায় বলেছে?
খুলনা।
খুলনা কোথায়?
দাকোপ। সুতারখালি।
সুতারখালি শব্দটা শুনে আদিত্যর কথা মনে পড়ল। কী হল ছেলেটার?
রিসিভার রাখতেই কলিংবেল বাজল। হাজেরা? এত তাড়াতাড়ি। দরজা খুললাম। বছর তিরিশের একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কালো শীর্ণ শরীর। পরনে সবজে শাড়ি ।
বললাম, তুমি হাজেরা?
হ।
চুলা ধরাতে পার?
পারি।
যাও তাহলে ভাত আর ডাল বসিয়ে দাও। আমি এখন বাজারে যাচ্ছি।
হাজেরা নিঃশব্দে রান্নঘরে চলে গেল।
বাজার কাজেই । আলুপটল ছাড়াও পঁচিশটা কই মাছ কিনলাম। মাছওয়ালার নাম মুসলিম। আমার পরিচিত। তরতাজা মাছই দিল। সেবার সাদেক মিঞা বলেছিল তার নাকি কইভাজা আর কইমাছের তরকারি খেতে ভালো লাগে । গতবছর আমার বিপদের সময় সে অনেক সেবাযত্ন করেছে। তাকে সামান্য আপ্যায়ন না করলে কেমন দেখায়। আমার আবার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা আছে। দু ডজন কলা আর ইসুফগুলের ভূষি কিনে বাড়ি ফিরলাম।
ফিরতে ফিরতে প্রায় ১১টা বাজল।
লিফটের কাছে আদিত্য দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম । ভাঙাচোরা চেহারা। চুল উশখোখুশকো। চোখ লাল। পরনের টি-শার্টটা মলিন।শ্যামলা মুখে ক্লান্তির ছাপ।
কি হয়েছে রে তোর? এ কি চেহারা করেছিস?
আদিত্য ফিসফিস করে বলল, ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম মামা।
আহা। সে তো বুঝলাম । তাই বলে মাকে ফোন করে জানাবি না কই আছিস।
ফোন তো ফেলে এসেছি। পরে আর সময় পাইনি। একটু আগে বাস থেকে নামলাম।
লিফট এসে গেছে। বললাম, আচ্ছা সব শুনছি। আগে ওপরে চল।
ওকে নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। পকেটে চাবি ছিল। কলিংবেল বাজাতে হল না। নিঃশব্দে ভিতরে ঢুকে আদিত্যকে আমার ঘরে বসতে বললাম। তারপর বাজার নিয়ে রান্না ঘরে গেলাম। দেখলাম ডাল চুলায়। হাজেরা কিচেনের বারান্দায় ভাতের মাড় গালছিল। আমাকে দেখে উঠে এল।
ইচ্ছেই করেই কইগুলো মেঝেতে ফেললাম। ওগুলি তড়পাড়ে লাগল। বললাম, দশটা কই ভাজ আর দশটা আলুপটল পটল দিয়ে রান্না কর।
আইচ্ছা।
আর আমার ঘরে দুকাপ চা দিয়ে যাও।
আইচ্ছা।
ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি বের করে বেডরূমে এলাম। আদিত্য বাথরুম গিয়েছিল একটু পর বেরিয়ে এল। ওকে পানির বোতল দিয়ে চোয়ারে বসলাম। আদিত্য আমার মুখোমুখি বিছানার ওপর বসল। ঢকঢক করে পানি খেল।
আমি বললাম, দাঁড়া আদিত্য তোর মাকেআগে একটা ফোন দিই। তোর মা একেবারেঅস্থির হয়ে উঠেছে।
শবনম ফোন ধরল।
বললাম, আদিত্য আমার কাছে আছে। ও একটু পরে বাড়ি যাবে।
শবনম চেঁচিয়ে উঠল, সে কী ভাইজান! ওর ভিসার কাগজপত্র সব রেডি। কাল অ্যামবাসিতে দাঁড়াতে হবে।
আমি ঝাঁঝ দেখিয়ে বললাম, আদিত্য লন্ডন যেতে চাচ্ছে না। তোরাই ওকে জোর করে পাঠাচ্ছিস।
শবনম শান্তস্বরে বলল, ওকে ফোনটা দাও তো।
আদিত্য গোছল করছে।
শবনম ভীষণ মেজাজি । ফোন রেখে দিল।আদরের ছোটবোন। ফোন অফ করে বললাম, এবার বল তো শুনি কী হয়েছে তোর।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অতিপ্রাকৃত [১ম অংশ]

0

সকালবেলায় জেসমিন-এর ফোন। চাপা স্বরে বলল, মামা, আমার সর্বনাশ হয়েগেছে । আমার কাজের মেয়েটা না পেত্নী!
সাত সকালে এমন ফোন পেয়ে থ হয়ে গেলাম। তবে জেসমিন- এর বিবেচনাবোধ সম্বন্ধে আমার ভালো ধারণা আছে।সুতরাং শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে বুঝলে যে তোমার কাজের মেয়েটা পেত্নী!
জেসমিন বলল, কাজের মেয়েটা নতুন এসেছে। আপনি এখনও দেখেননি। নাম হাজেরা । ভোরবেলা উঠেছি। তো কিছুক্ষণ আগে বাথরুম থেকে ফিরছি।এমন সময় কী মনে করে রান্নাঘরে উঁকি দিলাম। দেখি হাজেরা রান্নাঘরের মেঝের ওপর বসে কচকচ করে কাঁচা মাছ খাচ্ছে। কই মাছ। দেখে আমা গা কেমন গুলিয়ে উঠল। হাজেরা পেত্নী না তে কী।
আমি খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বল কী। মাছ কি কাঁচাই খাচ্ছিল?
হ্যাঁ, মামা। কাঁচা।লবনও নেয়নি।
ওহ্ । তা, মেয়েটার বয়স কত?
এই তিরিশের কাছাকাছি হবে। বিধবা।৬/৭ বছরে একট মেয়ে আছে। গ্রামে মায়ের কাছে রেখে এসেছে।
জিজ্ঞেস করলাম, মেয়েটা নতুন বললে। কে ঠিক করে দিয়েছে, সোলেমান?
হ্যাঁ।
সোলেমান এ পাড়ায় কাজের মেয়ে সাপলাই দেয়। বললাম, আচ্ছা দেখছি কী করা যায়। তুমি এ নিয়ে ভেব না।
ফোন অফ করে ভাবতে বসলাম। জেসমিনকে সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। তার কারণ আছে। আমি বৃদ্ধ এবং বিপত্নীক মানুষ। আমার একটিই মেয়ে। তামান্নার বিয়ে হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া থাকে। ছ’তলার এই ফ্ল্যাটে আমি একাই থাকি। নিজেই রান্নাবান্না করি, বাজার করি। এই বহুতলের আট তলায় থাকে।জেসমিন আমার ভাগ্নে বুলবুল-এর বউ। বুলবুল একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে উঁচু পদে আছে। অফিস থেকে লোন নিয়েফ্ল্যাট কিনল। আমিও রায়ের বাজারেদু’কাঠা জমি বেচে ফ্ল্যাট কিনলাম। জেসমিন অবশ্য রাতে খাবারটা পাঠায়। গেস্ট এলে জেসমিনওর কাজের মেয়েকে পাঠায়। ঘর ঝাঁট দিতে আসে। বড় ভালো মেয়ে জেসমিন। আমি ওকে মেয়ের মতই দেখি। তাই জেসমিনকে সান্ত্বনা দেওয়া দরকার।
ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাজেরার ব্যাপরটা নিয়ে ভাবতে বসলাম। গত বছর আমি রিটায়ার করেছি। পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা করতাম। যৌক্তিক কারণ খোঁজার বাতিক আছে আমার। তাই ভাবলাম কাঁচামাছ খাওয়ার ব্যাপারটা কি স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক। এটি কোনও মানসিক সমস্যা? না একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা? কাজের মেয়ে রান্নাঘরে বসে কচকচ করে কাঁচা মাছ খাচ্ছে এ রকম একটি দৃশ্য ডিসগাস্টিং সন্দেহ নেই। জেসমিন পেত্নী বলল। কাঁচা মাছ জাপানিরা খায়। জাপানিরা ওই জাতে পড়ে না। পৃথিবীতে আরও অনেক জাতি কাঁচা মাছ খায়। তারাও ভূত কিপেত্নীবর্গের নয়। তবে কাঁচা মাছ-মাংস খাওয়া সেইফ কিনা ইদানীং তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুনেছি কাঁচা মাছ খেলে গলব্লাডারের সমস্যা হয়।
টেবিলের ওপর তামান্নার পাঠানো ১৩ইঞ্চি ডেল আলট্রাবুক। ‘ইটিং র ফিস- দ্য জেঞ্জারস’ লিখে সার্চ দিলাম গুগলে । পেইজগুলি এলে পড়তে শুরু করলাম। একটা পেজে লিখেছে: দ্য রিপোটের্ড ডেঞ্জার’স অভ ইলনেস বট অন বাই ইটিং র ফিস অ্যান্ড মিট অফন কজ ফিয়ার অ্যান্ড কনফিউঝন ইন দ্য মাইন্ডস অভ দোজ হু ইনজয় সাচ ফুডস, আইদার ফরদেয়ার এসথেটিক অর নিউট্রিশন্যাল বেনিফিটস।
মনে পড়ে গেল আদিত্যর কথা। আদিত্য আমার ছোট বোন শবনম এর ছেলে। খুব ঘুরে বেড়ায় আদিত্য। ওই একবার বলেছিল খুলনার সুতারখালীর এক জেলেপাড়ার লোকজন নাকি কাঁচামাছ খায়।
জেসমিনকে ফোন করলাম।
জ্বী মামা, বলেন।
বললাম, কাঁচামাছ খাওয়ার ব্যাপারটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয় জেসমিন।
মামা কী বলছেন আপনি? হাজেরা কাঁটাশুদ্ধ কই গিলে খেল।
খেল ঠিক আছে। কাঁচা মাছ পৃথিবীতে অনেকেই খায়। তাই তোমার নতুন কাজের মেয়েটা পেত্নী না!
পেত্নী না!
না।
ও। আচ্ছা ঠিক আছে।
শোন জেসমিন। নেদারল্যান্ডের অধিবাসীরা বছরের একটা সময়ে কাঁচামাছ খায়। যখন হেরিং মাছ বিক্রি করার মৌসুম শুরু হয়, তখন খায়। তারা নিশ্চয়ই জিন-ভূত না।
অ।
ফোন রেখে দিলাম।
কলিংবেল বাজল।
কে এল আবার। উঠে দরজা খুলে দেখি- জামাল। এ বহুতলের গার্ড । কথায় অত্যধিক স্যার ব্যবহার করে। বললাম, কি ব্যাপার জামাল?
স্যার, আপনার ইন্টারকম কি নষ্ট, স্যার?
হ্যাঁ।
ফোন করছিলাম স্যার কেউ ধরল না স্যার । স্যার আপনার কাছে এক বেটাআইছে স্যার ।
বেটা? কি নাম? আমি অবাক।
স্যার নাম কইলন স্যার সাদেক মিঞা স্যার। চিনেন স্যার?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিনি চিনি। যাও ওকে নিয়ে এসো। আর সাইফুল কে পাঠাও। ইন্টারকম ঠিক করে দিয়ে যাবে।
আইচছা স্যার । বলে জামাল চলে গেল।
আশ্চর্য! সাদেক মিঞা ঢাকায়? সাদেক মিঞার মোবাইল আছে। আমার নাম্বারও সে জানে। তাহলে সে আমাকে ফোন করল না কেন। আসলে সাদেকমিঞা ভারি অদ্ভূত এক মানুষ। নিজেকে তান্ত্রিক বলে পরিচয় দেয়।অশুভ যাদুটোনা বন করে। তবে আমার এসব ব্ল্যাকআর্টে বিশ্বাস হয় না। দাড়ি-টুপি পরা মুসল্লী চেহারা একজন লোক তান্ত্রিক হয় কী ভাবে। গতবছর জুন মাসে দিনাজপুরে সাদেক মিঞার সঙ্গে আমার পরিচয়। সদ্য স্ত্রী মারা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে উদভ্রান্তের মতন এখানে-ওখানে ঘুরছি। বিরল রেলস্টেশনে এক বেঞ্চির ওপর মাঝরাতে বসে আছি। বাইরে তুমুল বৃষ্টি । সাদেক মিঞাও বসেছিল। বয়স ঠিক বোঝা গেলনা। তবে পঞ্চাশ পেরিয়েছে। সেইযেচে আলাপ করল।বিষয়: সাপের মাথার মনি, লালমাই পাহাড়ের গোপন সুড়ঙ আরকামরূপ কামাখ্যা মন্দির।এসব রূপকথা শুনতে শুনতে স্টেশনেই কেঁপে জ্বর এল । বৃষ্টি থামলে সাদেক মিঞা ধরাধরি করে এক পুরনো পরিত্যক্ত মাজারের পিছনে একটা টিনসেডের ঘরে নিয়ে তুলল। তারপর মন্ত্রপূত কালিজিরার তেল খাইয়ে জ্বর সারিয়ে তুলল।তার ওখানে দিন সাতেক ছিলাম। সাদেক মিঞা ভারি যত্ন নিয়েছিল আমার । কত রহস্যময় সব গল্প শোনালো। একবার জিন নামাতে চেয়েছিল । আমার শরীর কাহিল ছিল তাই জিন দেখতে ইচ্ছা হয়নি। দিনাজপুর থেকে আসার সময় সাদেক মিঞাকে ঢাকার ঠিকানা দিয়ে এসেছিলাম। সাদেক মিঞা এর আগে কখনও আমার ফ্ল্যাটে আসেনি । আজই প্রথম এল।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অন্ধকার সিঁড়িতে প্রেত­ [শেষ অংশ]

1

দরজায় তালা লাগাতে যাব ঠিক তখুনি অন্ধকারে নারীকন্ঠ ফিসফিস করে বলছে, তুমি আমায় ভুলতে পার না কেন জাফর? আশ্চর্য! ফরিদা ভাবির কন্ঠস্বর।
কে যেন খনখনে কন্ঠে বলল, আমি যে তোমায় ভালোবাসি পরী।
আমি শিউরে উঠলাম।
সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে আসি। নীচে বাল্ব জ্বলেছিল। আবছা আলোয় দেখলাম একটি নারীমূর্তি একটি লম্বা শীর্ণ ছায়া ছায়া শরীরের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে আছে। নারীকন্ঠ বলল, আমি এখন যাই জাফর। আমার স্বামী ঘুমিয়ে আছে।ঘুম ভেঙেআমাকে না দেখলে আমি বড় বিপদে পড়ব যে।
আচ্ছা যাও। কাল আবার এসো কেমন।
আসব। তুমি অপেক্ষায় থেকো। কেমন?
আমি চট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে দরজার আড়ালে চলে এলাম। পাল্লার ফাঁকে দেখি আবছা অন্ধকারে নারীমূর্তি। দরজার পাল্লা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ফরিদা ভাবি?
আমার কৌতূহল হল। আমি দ্রুত রান্নাঘরে চলে আসি। রান্নাঘরে অন্ধকার। জানালার ওপাশের ধবল পূর্ণিমার আলো। বাঁশঝাড়ে বাতাসের শনশন শব্দ। কে যেন কবরস্থানের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। লম্বা, শীর্ণ, ছায়া-ছায়া শরীর। আবু জাফর? না তার প্রেত? প্রেত পিছন ফিরে ঘুরে ওপরে তাকালো। রান্নাঘরে তো অন্ধকার। কী করে টের পেল যে আমি তাকে দেখছি ? আমি কেঁপে উঠলাম। দ্রুত ভাবছি উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে আমার কালিকাপুর স্টেশনে পৌছতে কত সময় লাগবে …..

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

অন্ধকার সিঁড়িতে প্রেত­ [৩য় অংশ]

1

মোজাফফর ভাই বললেন, অর্থমন্ত্রী একটা স্রেফ গ … কথা শেষ হল না- টুম্পা এল । হাতে একটা গ্লাস। গ্লাসে সাদা ঘন তরল। বোরহানি মনে হল। জিনিসটা আমার ভারি পছন্দের। গ্লাসটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে টুম্পা বলল, খেয়ে দেখ তো আঙ্কেল, কেমন হয়েছে।
গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুক দিয়েছি। লাচ্ছি মনে হল। তবে পুদিনা পাতার গন্ধ বেশি।
এবার বল, কেমন হয়েছে? টুম্পা জিজ্ঞেস করল।
নাইস। হেসে বললাম।
সত্যি?
সত্যি।
টুম্পা বলল, এটা হল পুদিনা লাচ্ছি। আমি বানিয়েছি। ঝুমুর আন্টি রেসিপি দিয়েছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ঝুমুর?
হ্যাঁ। বলে সাঁই করে ঘুরে চলে গেলটুম্পা। আমি খানিকটা হতভম্বই হয়েগেলাম।
মোজাফফর ভাই পোলাও-বিরিয়ানি খেতেপারেন না। ফরিদা ভাবি ভাতই রেঁধেছেন। ভাতের সঙ্গে বেগুন ভাজি, টমেটো দিয়ে রূপচাঁদা মাছের শুঁটকি, কাচকি মাছ ও কাঁঠালের বিচির চচ্চড়ি; মাংসের মধ্যে পেস্তাবাটা দিয়ে সাদা মুরগী, আর মেথি কলিজা; ঘন ডাল, টমেটোর চাটনী, চমচম, ঘরে তৈরি নারকেলের সন্দেশ আর টুম্পার পুদিনা লাচ্ছি ।
খেতে বসে মোজাফফর ভাইয়ের একটা কথায় ভীষণ অবাক হলাম। মোজাফফর ভাই ভাত মাখতে মাখতে বললেন, শোন, রায়হান? কথাটা তোমাকে বলি।
জ্বী, বলুন।
তোমার ভাবির এই বাড়িটা বেশ পছন্দ। আমাকে কিনে নিতে বলছে ।
আমি অবাক হয়ে ফরিদা ভবির দিকে তাকালাম। ফরিদা ভাবি মোজাফফর ভাইয়ের প্লেটে বেগুন ভাজি তুলে দিলেন। মুখ কেমন থমথমে মনে হল।
মোজাফফর ভাই ভাত মুখে ফেলে চিবুচ্ছেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, আর তোমার ভাবিরও কপাল। আজ বাড়িওলা হাজিসাহেব নরসিংদী থেকে আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছেন মেয়ের কাছে। এ বাড়ি অর্ধেক দামে ছেড়ে দেবেন যদি আমি কিনি। ভাবছি তোমার ভাবির যখন এতই শখ, তখন রাউজানের পৈত্রিক জমিজমা বিক্রি করে আর ব্যাঙ্ক থেকে লাখ তিরিশেক লোন নিয়ে বাড়িটা কিনেই নেব।
টুম্পা খেতে বসেনি। ও হাততালি দিয়ে বলল, হ্যাঁ বাবা, হ্যাঁ। কিনোফ্যালো, প্লিজ। এই বাড়ি আমারও খুবপছন্দ।
আমার কপালে ভাঁজ পড়ল । আমার মনে হল, ফরিদা ভাবির সমস্যাটা নিয়ে খুব শিগগিরই একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দরকার হলে ফরিদা ভাবি কে ঢাকায় নিয়ে যাব। আমাদের বাড়িতে থাকবেন।সালমা ভাবির হাজব্যান্ড আবিদ ভাই। তার বড় বোন ড. রেহনুমা আহমেদ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। গ্রিনরোডে চেম্বার। কথাটা মোজাফফর ভাইকে কিবলব? উনি যদি আমাকে ভুল বোঝেন? তাহলে? আমি তো আর প্রমাণ করতে পারব না যে ফরিদা ভাবি বহু বছর আগে মরে যাওয়া এক মৃতের ভাবনায় আচ্ছন্ন। যাকে বলে অবসেসড।
মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত সাড়ে দশটার দিকে ঘরে ফিরে এলাম। জামা-কাপড় খুলে, দাঁত ব্রাশ করে, বাতি নিভিয়ে জাজিমের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। মাথার কাছে খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে ফুটফুটে জ্যোস্না ঢুকছিল ঘরে। আর উথাল-পাথাল হাওয়ায় জানালায় পাল্লায় শব্দ হচ্ছিল। একটা সিগারেট ধরালাম। আমার মাথায় তখন থেকে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল। ফরিদাভাবি কেন কালিকাপুরে স্থায়ী ভাবেথেকে যেতে চাইছেন? টুম্পারই-বা এই জায়গা কেন এত পছন্দ ? আমাকেই- বা কেন ফরিদা ভাবি আজ সকালে ঘটনাটা বললেন? যতই ভাবছি তালগোল পাকিয়ে ফেলছি। কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি না। মগজের গোড়ায় তামাকের ধোঁওয়া দিয়েও জট খুলছিল না। রাত কেবল বাড়ছিল …
আমার ঘুম আসছিল না। ভিতর ভিতর ভীষণ অস্থিরতা টের পাচ্ছিলাম। একএক করে বেশ ক’টা সিগারেট শেষ করলাম। নীচের রাস্তায় কুকুর ডাকছিল। দায়োয়ান দোলোয়ার হোসেন জড়ানো গলায় কুকুরদের ধমক দিল। দোলোয়ার হোসেন নেশা করে মনে হল। কথাটা একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে অস্বীকার করেছিল।
কুউউ ঝিকঝিক শব্দ করে একটি ট্রেন যাচ্ছিল।কবরস্থানের ওপাশ দিয়ে রেললাইন। শেষ সিগারেটটা এ্যাশট্রেতে গুঁজে রাখলাম। আমি রাতেও মোবাইল অফ করি না। কেবল মোবাইলের রিং টোন ডিজঅ্যাবল করে ভাইব্রেশন মোড সেট করে রাখি।
আমার কেমন ঘুম পাচ্ছিল। আধোঘুমে আধোজাগরণে দেখলাম আবছা আলোয় ঘন বাঁশঝাড়। মাঝখানে সরুপথ … চৈতী হাঁটছে। কোথায় যেন যাচ্ছে ও। চৈতী না টুম্পা? ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। হঠাৎ চৈতী কিংবা টুম্পা দৌড়াতে লাগল। ঝাঁক ঝাঁক মৌমাছি ওদের তাড়া করেছে। বন বন বনবন শব্দ হচ্ছে। শব্দটা আস্তে আস্তে বাড়ছিল … আমার মনে হল মৌমাছি না, মোবাইলটা ভাইব্রেইট করছে। বালিশের পাশ থেকে আমি এলজিটা তুলে নিলাম। ঝুমুর ! এত রাতে? আমার বুক ধক করে উঠল।
ভাইয়া … মা না …
মা-র কি …আমার গলায় স্বর ফুটল না।
আমি আর মা টিভি দেখছিলাম … মা হঠাৎ সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেলেন । আমি চিৎকার করতেই আবিদ ভাইয়া আর সালমা ভাবি এলেন। ওরা মাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। আমি … আমি ভীষণ ভয় পাচ্ছি ভাইয়া। বলে ফুঁপিয়ে উঠল ঝুমুর।
আমি আসছি। বলে ফোন অফ করে দিলাম। খালি গায়ে লুঙ্গি পরে ছিলাম। দ্রুত প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে নিলাম। পকেটে মানিব্যাগ আর তালাচাবি ঢুকালাম। আর কিছু নেব না। কিন্তু, এখন কি ট্রেন বা বাস পাব? রেন্ট- এ- কার- এর দোকান কি খোলা পাব? আমার সারা শরীর কাঁপছিল। মায়ের কিছু হলে …আমি কিছু ভাবতে পারছি না।
দরজা খুলে বাইরে এলাম। সিঁড়ি ঘরে অন্ধকার। অসুবিধে নেই মোবাইলে টর্চ আছে। পকেট থেকে তালা বের করলাম। ঠিক তখনই ভীষণ পচা গন্ধ পেলাম। আমার সমস্ত শরীর গুলিয়ে উঠল। সিঁড়িতে কোথাও ইঁদুর মরে পচে আছে। কই তখন তো ইঁদুরের গন্ধ পাইনি।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অন্ধকার সিঁড়িতে প্রেত­ [২য় অংশ]

0

বাজার করে ফেরার সময়ই দৈনিক পত্রিকা কিনে আনি। এক সঙ্গে বেশ ক’টা পত্রিকাই কিনি। দৈনিক পত্রিকা পড়েই আমার অবসর সময়টুকু কেটে যায়। আমি পত্রিকায় চোখ বোলাতে থাকি। দুঃসংবাদই বেশি। জানালা দিয়ে হু হু করে রোদ ঢুকে পড়েছে জাজিমের ওপর, পত্রিকায়, আমার মুখের ওপর । নীচের গাছপালায় পাখিদের সরব কিচিরমিচির শুনতে পাচ্ছি।
পুরনো এই দোতলা বাড়িটি কালিকাপুরের বেশ নিরিবিলি এলাকায় । একতলায় পিএন ফার্মা নামে একটি অষুধ কোম্পানির গুদাম ঘর। বাড়িওয়ালার নাম হাজি সাদেকুররহমান। তিনি নাকি নরসিংদীর বিরাটব্যবসায়ী। অবশ্য তাকে আমি কখনও দেখিনি। বাড়ি ভাড়া দিই দারোয়ানেরহাতে। তার নাম দেলোয়ার হোসেন। মাঝবয়েসি লোকটাকে আমার তেমন পছন্দ না।
অফিস এই বাড়ি থেকে কাছেই। হেঁটেই যাই। রেললাইন ক্রশ করতে হয়। কালিকাপুর রেলওয়ে স্টেশনটিও কাছেই। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম না এলেস্টেশনে চা খেতে চলে যাই। মধ্যরাতের নিঝঝুম স্টেশন আমার ভালো লাগে।
মোবাইলটা বাজল। ঝুমুর। আমার ছোটবোন। ইডেনে পড়ছে। দিনে অন্তত দশবার ফোন করবে। বললাম, কী রে? কী হয়েছে বল।
ঝুমুর বলল, ভাইয়া, ভাইয়া। মা না চৈতী আপুকে পছন্দ করেছে। তোমার সঙ্গে বিয়ে দেবে। তুমি রাজি হয়ো না কিন্তু।
আমার মন বিষাদে ছেয়ে যায়। চৈতীকে আমার ভালো লাগে বলে। বললাম, কেন? আমি রাজি হব না কেন?
ঝুমুর বলল, ওই মেয়েটাকে আমার পছন্দ না।
পছন্দ না কেন?
উফঃ বললাম তো ওই মেয়েটাকে আমার পছন্দ না।
কেন পছন্দ না সেটাই তো আমি জানতে চাচ্ছি? আমার কন্ঠস্বর কি খানিকটা রূঢ় শোনালো?
ওকে একটা ছেলের সঙ্গে বসুন্ধরায় দেখা গেছে ।
আমার বুক ধক করে উঠল। কে বলল তোকে?
নাম বলা যাবে না।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। আমি ওকে বিয়ে করব না। এবার খুশি তো?
থ্যাঙ্কস ভাইয়া! তুমি কবে ঢাকায় আসছো?
দেখি। পসিবলি বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে রওনা হব।
রাখছি, কেমন?।
ফোন রেখে বিষন্ন বোধ করি। মা আমারজন্য চৈতীকে পছন্দ করেছে।চৈতী কেআমি চিনি। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের সালমা ভাবির কাজিন। চৈতী জাহাঙ্গীরনগরের পড়ছে। ইংরেজি অনার্স । শ্যামলা, লাবণ্যময়ী মেয়েটাকে আমি মনে মনে কল্পনায় নিয়ে আসি। এখন ঝুমুর বাগড়া দিচ্ছে। সমস্যা হল পাত্রী হিসেবে কোনও মেয়েকেই ঝুমুরের পছন্দ না। আজব সাইকোলজি ওর। ওর ওপর রাগও করতে পারি না। ও খুব ছোট থাকতে বাবা মারা গিয়েছে। ঝুমুর আমার অনেক আদরের … কিন্তু, আমার চৈতীকে ভালো লাগে। এই আমার বিষন্নতার কারণ। মফঃস্বলে একা একা থাকি। পাশে চৈতী থাকলে ভালোই হত। আবার ভাবি এই একাকী নিঃসঙ্গ জীবনও তো একেবারেই মন্দ না …
ভাত প্রায় হয়ে এসেছে। কলিং বেল বাজল। দরজা খুলে দেখি টুম্পা। পরনে সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ । সবুজ ওড়না। লাক্স সাবানের গন্ধ পেলাম। গোছল সেরে এসেছে মনে হল। চুল খোলা। টুম্পার হাতে একটি ট্রে।
এসো । বললাম।
টুম্পা ঘরে ঢুকে চেয়ারের ওপর ট্রেটা রাখল। ট্রের ওপর ঢাকনা দেওয়া তিনটি বাটি। ঢাকনা সরিয়ে দেখাল … একটা বাটিতে মেথি কলিজা; অন্যটিতে ঘন ডাল; আরেকটিতে টমেটোর চাটনী
ধন্যবাদ। বললাম।
টুম্পা আদুরে গলায় বলল, ধন্যবাদ দিতে হবে না আঙ্কেল। আমি এখন যাই।বাটি থাক। পরে এসে নিয়ে যাব।
ঠিক আছে।
টুম্পা দরজার কাছে এসে বলল, ওহো, আঙ্কেল। তোমাকে একটা কথা বলতেই তো ভুলে গেছি। এই দ্যাখো, আজকাল আমার যে কী হয়েছে।
কী কথা শুনি?
টুম্পা বলল, আজ সকালে বাবা এসেছে।মা রাতে তোমাকে আমাদের সঙ্গে খেতে বলেছে।
আচ্ছা, আমি যাব।
যাবে কিন্তু, নইলে অনেকক্ষণ ধরে মিস কল দেব।
না, না। মিস কল দিতে হবে না। আমি সময়মতো চলে যাব।
টুম্পার মুখটা ওর মায়ের মতন। ফরিদা ভাবির জন্য উদ্বেগ টের পেলাম। সুখের সংসার । এখন কী মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন তিনি। সতেরো-আঠারো বছর বয়েসে আবু জাফর নামে একজন শিক্ষক ফরিদা ভাবির প্রেমে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। সেই অপরাধ বোধে ভুগছেন কালিকাপুরে এসে। আবার এমনও তো হতে পারে … হয়তো জাফর স্যারের সঙ্গে গভীর সর্ম্পক ছিল ফরিদা ভাবির। যে জন্য টুম্পার বাবার কাছে নিজেকে অপরাধী ভাবছেন।
দুপুর কাটল চৈতীর স্বপ্নে। আমার চৈতীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে। গতবার যখন ফোন-টোন না করে হুট করে ঢাকা গেলাম। দেখি দরজায় তালা। ঝুমুর কলেজে। কিন্তু মা কোথায়? সালমা ভাবিদের ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজালাম। সালমা ভাবি দরজা খুলে আমাকে দেখে অবাক। সালমা ভাবি বললেন, আরে তুমি? মাকে না দেখে অবাক, না? আমি মাথা নাড়লাম। সালমা ভাবি বললেন, খালাম্মা আমার শাশুড়ির সঙ্গে মিরপুর মাজারে গিয়েছেন । এসো ভিতরে এসো। আমি ভিতরে ঢুকে অবাক। চৈতী সোফার ওপর বসে আছে। আমাকে দেখে খুশি হল মনে হল। বেগুনি রঙেরআটপৌড়ে সুতির শাড়ি পড়েছিল চৈতী । সোফায় বসে শাদাবকে খাইয়ে দিচ্ছিল। শাদাব সালমা ভাবির ছেলে।ভীষণ দুষ্ঠু।
আমি হাতমুখ ধুয়ে এলাম। খিদে পেয়েছে। খেতে বসলাম। চৈতীও এল। আমার আর চৈতীর ব্যাপারে সালমা ভাবির প্রশ্রয় আছে। চৈতী বলল, আমার না মফঃস্বল শহর খুব ভালো লাগে …কথাটা শুনে আমি বুকের মধ্যে আনন্দ টের পেলাম …
তো এখন ঝুমুর কেন যেন বেঁকে বসেছে…
রাত ন’টার দিকে গেলাম ফরিদা ভাবিরবাসায়।
মোজাফফর ভাই লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরে ড্রইংরুমে বসে ছিলেন। টিউব লাইট জ্বলে ছিল। মোজাফফর ভাইয়ের মাথায় মস্ত টাক। কপালের বাঁ পাশে বড় আঁচিল। তবে বিদঘুটে দেখায় না। মোজাফফর ভাইয়ের স্বাস্থ বেশ ভালো।
ব্যাঙ্কাররা ঘরে বসেও নাকি ব্যাঙ্কেরই আলাপ করে। আর আমিও ওইদিকেই পড়াশোনা করেছি। কাজেই অনিবার্যভাবেই, বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের রিজার্ভের পরিমান, সুদের হার, গ্রামীণব্যাঙ্ক, শেয়ারবাজার, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি এবং সরকারি ব্যাঙ্কের কেলেঙ্কারি- এসব প্রসঙ্গ উঠে এল।
মোজাফফর ভাই একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছিলেন। ড্রইংরুমের বাতাসে মশলার ঝাঁঝ। আমি পরদার ফাঁক দিয়ে ফরিদা ভাবি আর টুম্পাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে মা ও মেয়ে। ফরিদা ভাবির পরনে হলুদ রঙের শাড়ি, লাল ব্লাউজ।মুখটা কেমন গম্ভীর। গাঢ় নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ আর সাদা ওড়না পরে পরীর মতন উড়ছিল টুম্পা ।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

অন্ধকার সিঁড়িতে প্রেত­ [১ম অংশ]

3

ফরিদা ভাবি বললেন, কলেজে পড়ার সময়আমাকে … আমাকে একজন ভালোবাসত। আমার … আমার বিয়ের কথা শুনে সে আত্মহত্যা করে। এখন …এখন … আবার সে এত বছর পর আমার কাছে ফিরে এসেছে।
আমি চমকে উঠলাম। ফরিদা ভাবি এসব কী যা তা বলছেন! মানুষ মরে গেলে আবার ফিরে আসে নাকি?
ফরিদা ভাবি বললেন, আবু জাফর স্যারদূর্গাপুর মহিলা কলেজে আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। উনি আমাকে ভালোবেসে ফেলেন। আমাকে তিনি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন। লিখেছেন, পরী, তোমায় আমি না- পেলে আমার জীবন অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু … কিন্তু বিশ্বাস কর রায়হান, আমার … আমার করার কিছুই ছিল না। আমার বাবা-মা নেই। বড় মামার কাছে মানুষ হয়েছি। বড় মামা ছিলেন দূর্গাপুর থানার দারোগা। ভীষণ কড়া মেজাজের মানুষ।এই বলে চুপ করে গেলেন ফরিদা ভাবি।হয়তো অতীতে ফিরে গেছেন। ফরিদা ভাবির কন্ঠস্বর কেমন কাঁপছিল। গোলপানা ভরাট ফরসা মুখে নীল রঙের গভীর ছাপ।মুখে ঘাম ফুটে আছে। চোখ দুটিতে কেমন যন্ত্রনার চিহ্ন।
কিছুক্ষণ আগে বাজার করে ফিরছি। দেখি যে সিঁড়িতে ফরিদা ভাবি দাঁড়িয়ে আছেন । আমাকে দেখে বললেন,তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে রায়হান। ভাবলাম টুম্পার ব্যাপারে কিছু বলবেন। সেদিন অফিসথেকে ফেরার সময় দেখলাম টুম্পা রূপমতী সিনেমাহলের সামনে একটি ছেলের সঙ্গে কথা বলছে। কথাটা হয়তো ফরিদা ভাবির কানে গিয়েছে; টুম্পার বাবাকে বলতে সাহস পাচ্ছেন না। আমার সঙ্গে আলোচনা করতে চান। বললাম, আসুন, ঘরে আসুন।
ভাবি ঘরে এসে বললেন, টুম্পা কোচিংয়ে। আর তোমার ভাই ফরিদগঞ্জ থেকে কিছুক্ষণ আগে রওনা হয়েছেন। আমার হাতে বেশি সময় নেই। যা বলার তাড়াতাড়ি বলতে হবে।
আচ্ছা, বলুন।
তখন আমি ভাবতেও পারছি না ফরিদা ভাবি এমন অবাস্তব ভৌতিক কাহিনি শোনাবেন । ফরিদা ভাবির বয়স প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশের কাছাকাছি। এই বয়েসে মহিলারা কী এমন অযৌক্তিক ইমোশ্যনাল কথাবার্তা বলে? অবশ্য আমি সিওর নই।
ফরিদা ভাবি বললেন, আবু জাফর স্যারের বাড়ি ছিল কালিকাপুর।
আমি এবার অবাক হয়ে বললাম, কালিকাপুর মানে! এখানে?
হ্যাঁ। আত্মহত্যার পর এখানেই জাফর স্যারকে কবর দেওয়া হয়েছিল। কবর থেকেই উঠে এসে জাফর স্যার গতকাল গভীর রাতে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন ।
কথাটা শুনে আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ফরিদা ভাবির সঙ্গেমৃত কারও দেখা হয়েছে … এমনটা আমি নটরডেম কলেজের সায়েন্স ক্লাবের একজন প্রাক্তন সদস্য বলেই মেনে নিতে পারছি না। আমি জানি ফরিদা ভাবির সমস্যাটি কোনওমতেই সুপারন্যাচারাল না। মনে হয় মানসিক।
ফরিদা ভাবির জন্য আমার ভীষণ খারাপই লাগছিল। আমি নতুন চাকরি পেয়ে মাসখানেক হল এই মফঃস্বল শহরে এসেছি। ফরিদা ভাবিরা থাকেন আমার ঠিক পাশের ফ্ল্যাটে । স্বামী-সন্তান নিয়ে কী সুখের সংসার । পরিবারটি ভারি মিশুক আর অমায়িক। আমার নিঃসঙ্গ মফঃস্বল জীবন আনন্দে ভরিয়ে রেখেছে। ফরিদাভাবি ভারি নরম মনের মানুষ। বড় বোনের মতো নিয়মিতই আমার খোঁজখবরনেন তিনি। প্রায়ই এটা-ওটা রান্না করে খাওয়ান। এমন একজন দরদি মানুষ মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছেন । আমার তো খারাপ লাগবেই।
ফরিদা ভাবি বললেন, তোমার ভাই কালিকাপুর বদলি হয়ে আসার পর থেকেই আমি জাফর স্যারকে স্বপ্ন দেখতে থাকি। জাফর স্যার বলেন… পরী তুমি এখন আমার কাছে ফিরে এসেছ। তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে না পরী? আমি বললাম …আপনাকে কেমন করে করব? আপনি তো বেঁচে নেই। তখন জাফর স্যার বলেন, আমি তোমাকে দেখববলে আজও বেঁচে আছি পরী। আমি তোমারজন্য তোমাদের বাড়ির সিঁড়িতে অপেক্ষা করে থাকব। রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে তখন তুমি না হয় এসো কেমন। একই স্বপ্ন পরপর কয়েক রাত দেখলাম। মাঝখানে অবশ্য দেখিনি। গতকালও অনেক রাতে ওই একই স্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্নে জাফর স্যার বললেন আমি তোমার জন্য সিঁড়িতে অপেক্ষা করে আছি। সবাই ঘুমিয়ে আছে। এখন তুমি আমার কাছে আস। আমার ভীষণ কৌতূহল হল। আমি সিঁড়িতে যাই। দেখি জাফর স্যার বসে আছেন।
আমি চমকে উঠলাম। এসব কী আজেবাজে কথা বলছেন ফরিদা ভাবী। মৃতের সঙ্গে অভিসার! ফরিদা ভাবির কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? ফরিদা ভাবিকে অবিলম্বে মনোরোগ চিকিৎসক দেখানো দরকার। দরকার হলে ফরিদা ভাবি কে ঢাকায় নিয়ে যাব। মোজাফফর ভাইয়ের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলা দরকার।
আমি কী বলতে যাব- ফরিদা ভাবির মোবাইল বাজল। মোবাইলে কার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বললেন। তারপর ফোন অফ করে বললেন, আমি এখন যাই। তোমার ভাইয়ের ফোন। তোমার ভাই রওনা দিয়েছেন। বলে দ্রুত পায়ে চলে গেলেন।
ফরিদা ভাবির স্বামী মোজাফফর ভাই ব্যাঙ্কার। চট্টগ্রামের মানুষ। ভীষণ আন্তরিক । মাস দুয়েক হল তিনিও কালিকাপুর বদলি হয়ে এসেছেন; মোজাফফর ভাইয়ের পোস্টিং যদিও ফরিদগঞ্জ ব্রাঞ্চে। জায়গাটা কালিকাপুর থেকে পঁচিশ-ছাব্বিশ কিলোমিটারের মতন। নিয়মিতই যাতায়াত করেন বাসে কিংবাট্রেনে। আবার মাঝে মাঝে ফরিদগঞ্জেই থাকেন।
বাজারের থলে নিয়ে রান্নাঘরে এলাম। বাজার প্রতিদিনই করি। আমারফ্রিজ নেই । আসলে এ বাড়িতে আসবাবপত্র তেমন কিছুই নেই। শোওয়ার ঘরের মেঝেতে একটা জাজিম; দুটি কমলা রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার। আর একটি আলনা। ব্যস। আসবাব বলতে এই।
হিটারে চায়ের পানি চড়িয়ে দিলাম। আমি একা মানুষ। রান্নাবান্না নিয়ে বেশি ঝামেলা করি না। ফরিদা ভাবি অবশ্যি দু’বেলাই খেতে বলেন। মাঝে-মাঝে খাইও; তবে টুম্পাকেও পড়াই। টুম্পা ক্লাস টেন-এ পড়ে। মেয়েটির মুখচোখ শার্প হলেও ওর গায়ের রং ওর বাবার মতন; শ্যামলা। বেশ উচ্ছ্বল আর প্রাণবন্ত মেয়েটি। তার তুলনায় ফরিদা ভাবি কেমন যেন শীতল।
রান্নাঘরটি ছোটই। পশ্চিমের দিকের জানালায় রোদ। ঘন বাঁশঝাড়েরফাঁকে আস্তরহীন প্রাচীর চোখে পড়ে। ওটাই স্থানীয় কবরস্থান। বেশপুরনো । হিটার থেকে সসপ্যান নামাতে-নামাতে ওদিকে চোখ যেতেই চকিতে ভাবলাম … ওই কবরখানায় আবু জাফর- এর কবর হয়নি তো? বুঝতে পারছি না।
চা নিয়ে শোওয়ার ঘরে ফিরে এলাম।ভাবছি, ফরিদা ভাবি আসলে বিয়ের পর ওই ট্র্যাজিক ঘটনাটি ভুলেই ছিলেন। টুম্পার বাবা কালিকাপুর বদলি হয়ে আসার পরই পুরাতন স্মৃতির মনে পড়ে যাওয়ায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছেন।
মেঝের ওপর চায়ের কাপ রেখে জাজিমের ওপর শুয়ে পড়লাম।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

মানুষখেকো দানব [শেষ অংশ]

2

আসসালামু ওয়ালাইকুম। সবাই সালামের জবাব দিলাম।সবার চোখে-মুখে উৎকন্ঠা স্পষ্ট। আমি একটু আগ বাড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার বলুনতো। সবচেয়ে বৃদ্ধ যে লোকটা সে বলল “মৃত ব্যাক্তিটি হলো এই এলাকার জামাই।শশুর বাড়ীতে এসেছিল। সাপের কামড়ে সন্ধায় মৃত্যু হয়েছে। এখন ঐ পাড়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে দাফনের জন্য।” সবার জড়তা মনে হয় একটু কাটল।

-বাবা নৌকা নাই

-না চাচা দেখি না তো

-ঠিক আছে তাহলে আপনারা এইখানে লাশের পাশে দাড়ান আমরা গিয়ে নৌকা নিয়ে আসছি।

এইটা কি কয়? মাথাটা আবার ঝিনঝিন করে উঠল। একটু সন্দেহও লাগছিল। শেষে আমি বললাম আপনারা চারজন এবং আমরা চারজন মিলে গিয়ে নৌকা নিয়ে আসব। আর বাকি সবাই এখানে থাকুক।চাচা মনে হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারল। চাচার মুখে যে হাসিটা দেখলাম সেই হাসির রহস্য হাজার রকমের হতে পারে।

আমরা আটজন মিলে রওনা হলাম। নদীর পাড়ে ধরে হাটছি। সাথে দুইটি হারিকেন। চাচা মনে হয় মাঝির বাড়ি চিনে।সেই দেখলাম চিনিয়ে চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটা জায়গায় এসে চাচা থামল। টর্চলাইট মেরে দেখলাম ঘাটে ঐ বিশাল নৌকাটা বাধা আছে। জায়গাটা অনেক অন্ধকার। নদীরপাড়ের উপরে বাড়ি ঘরও আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুপুরী। কিছুটা ভয় ভয় লাগছে। একটা প্যাচা উড়ে গেল।পানিতে কিছু পড়ার শব্দ। ঐ হাইল্যা… হাইল্যারে…….. বুঝতে পারলাম মাঝির নাম হালিম। কোন সারাশব্দ নাই। চাচা রাগে বলতে লাগল সবাই কি মইরা ভূত হয়ে গেছে। শেষে আমরাই নৌকা নিয়ে আসলাম।

অনেক বড় নৌকা। নৌকার ছাদ নেই। উপরে কাঠ দিয়ে মেঝে করা হয়েছে। তবে মাঝখানে চার হাতের মত জায়গা ফাকা। পানি সেচের সুবিধার জন্য এটা করা হয়। আমরা এই ফাকের এক পাশে বসলাম। অন্য পাশে ওরা। আমি নৌকার শেষ মাথায় বসলাম। নৌকা যখন ছাড়বে, ঠিক তখনি কাশবনের ভিতর থেকে একটা আওয়াজ আসল।

-বাবারা আমারে একটু নিয়া যাও।

টর্চ লাইট মেরে দেখি এক বৃদ্ধলোক। ভাবলাম এতরাত্রে আমরা নিয়া না গেলে বেচারা কিভাবে পার হবে? তাই আমিই সবাইকে অনুরোধ করলাম নেওয়ার জন্য। নৌকাটি ভাসিয়ে লোকটি লাফ দিয়ে নৌকায় উঠল। নৌকাটি দোলনার মত দোল খেতে লাগল। আমার কাছে মনে হলো সবাই নৌকায় উঠার পর নৌকাটি যতটুকু ডুবল ঐ লোকটি উঠার পর আরও বেশী ডুবল। লোকটি লাশের ঠিক পায়ের কাছে বসল। নৌকা চলতে লাগল।

খুব বেশী বড় নদী না। কিছুটা স্রোতআছে। মনের ভিতর অজানা আশংকটা যতই ভুলে থাকার চেষ্টা করছি ততই মনে পড়ছে। এই হালকা চাদনী রাতে কাশবনের উপরে কুয়াশার ধোয়া যে মায়াবী জাল সৃষ্টি করেছে তা আলিফ লায়লার কথা মনে করিয়ে দিল। ভয় কাটানোর জন্য মনে মনে গানগাওয়ার চেষ্টা করলাম। জোর করেই কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে যেতে চাইলাম। দূরে ভেসে যাওয়া কলাগাছরুপী লাশগুলোকে একমনে দেখছিলাম।

হঠাৎ যে নৌকা চালাচ্ছিল তার বিকট চিৎকার। কেউ একজন পানিতে ঝাপিয়ে পড়ার শব্দ। আমি ঘুরে তাকাতে তাকাতেই সমস্ত নৌকাটা দুলে উঠল যেন কোন নীলদড়িয়ায় নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়েছে। সবাই লাফিয়ে পানিতে পড়ছে। মামা চিৎকার করে পানিতে লাফ দেওয়ার জন্য বলছে। আমি উঠে দাড়ালাম। নৌকার শেষমাথায় টর্চলাইট মেরে দেখি বৃদ্ধটি লাশের একটি পা ধরে পা’র মাংস খাচ্ছে। পায়ের হারটি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বৃদ্ধটির মুখে আলোপড়তেই আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।চোখ থেকে নীলআলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মুখে রক্তের দাগের মত এ্যাবরো-থেবরো মাংস লেপটানো। বিবৎস দৃশ্য। খুব বমি আসতে লাগল। আমি জোড়করে চেষ্টা করছি সবকিছু আটকিয়ে রাখতে। তীরের দিকে তাকালাম। বুঝতে পারছি এতটুকু সাতার দিয়ে পার হওয়া আমার পক্ষে সম্ভবনা। সবাইকে দেখলাম চিৎকার করছে আর দৌড়াচ্ছে। আমি বৃদ্ধের দিকে টর্চলাইট মেরে দাড়িয়ে রইলাম। বৃদ্ধটি আমার দিকে তাকালো…… উঠে দাড়ালো….. ঝপাৎ।

যতক্ষণ পারলাম সাতার কাটতেই থাকলাম। শেষে মাটি হাটুতে বাজল। বুঝতে পারলাম তীরে এসে পৌছেছি। দৌড় লাগালাম। চিৎকার অনুসরণ করে কাশবনের ভিতর দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। হাজার-হাজার মানুষের চিৎকার। চারদিকে মশাল আর মশাল। কেউ কেউ ডাকাত ডাকাত করেও চিল্লাচ্ছে। কাশবনের ঐ পাশেই একটা বাড়ী আছে সেখানে সবাই পরে রইলো। আমিও গিয়ে ঐ খানে শুয়ে পড়লাম। চারদিকে মানুষ ঘিরে ধরেছে। কেউ কেউ আমার কাছে ঘটনা জানতে চাইলো…. আমার মুখ দিয়ে কোনকথা বের হচ্ছিলনা। এর মাঝে একজন সবাইকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিল। সবার মাথায় পানি ঢালার ব্যাবস্থাকরতেবলল। মামার হুশ হওয়ার পর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল- ভাইগ্না বাইচ্যা আছ? আপা আমারে মাইরাই ফালতো। একে একে সবাই হুশ হলো। আমিসব ঘটনা খুলে বললাম। এর মাঝে দেখিশরীফের আব্বাও লোক নিয়ে হাজির। কেউ কেউ নদীর পাড়ে যাওয়ার সাহস দেখালো। শেষে আমি সবাইকে নিয়া নদীর পাড়ে গেলাম। নৌকা নাই। আমরা স্রোতের অনুকুলে হেটে যাচ্ছি। সবাই চিৎকার করে উঠল এই যে নৌকা। দেখলাম শুধু কংকালটা আছে। এর মাঝে একজন বলল দেখিতো মাটিতে রাক্ষসটার পায়ের দাগ আছে কিনা? আমরা নদীর পাড়ে কোন পায়ের দাগও পাইনি।

শেষে ঐ কংকালটিই মাটি দেওয়া হলো।

সমাপ্ত

মানুষখেকো দানব [১ম অংশ]

0

এস.এস.সি পরিক্ষা শেষ। কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না? একদিন আম্মা বলল চল সইয়ের বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসি। আমি, আম্মা, বদরুল, হাদীমামা সবাই মিলে কিশোরগন্জের পাকুন্দিয়া আম্মার সইয়ের বাড়ী বেড়াতে গেলাম।হৈ হৈ রৈ রৈ করে দিনগুলো খুব ভালই কাটছে। এর মাঝে একদিন ঐ এলাকায় মাইকে প্রচার হচ্ছে যাত্রা হবে।আমরা খুবই উৎফুল্ল। রাত্রে আমি, মামা, নয়ন ভাই, স্বপন, শরিফ, আরও তিনজন মিলে রওনা হলাম। মোটামুটি তিন কি.মি. রাস্তা। তার মাঝে নাকি আবার নদী পার হইতে হয়।

প্রচন্ড শীত। খোলা গলায় গান ছেড়ে নদীর পাড় দিয়ে চলছি। পাশের ঘন কাশবনের ফাক দিয়ে মাঝে মাঝে একজোড়া…দুই জোড়া চোখ এসে উকি দেয়। উকি দিয়েই শেয়াল গুলো পাশের ঝোপে হারিয়ে যায়। মামা বলল শেয়ালেরা রাত্রে নদীর পাড়ে আসে কাকড়া খাওয়ার জন্য।

আমরা মূল নদীরঘাটে এসে পৌছালাম। দেখি মাঝি নাই কিন্তু নৌকা আছে। আমরা মাঝিকে ডাকাডাকি করতে লাগলেকিছুক্ষণ পর মাঝিকে দেখলাম কাশবনথেকে বেড়িয়ে আসল। কিছুটা অপৃকতস্থ কি লেগেছিল? মনে নাই। নদী পার হলাম। আরও এক কিলোমিটার।

এবার কিন্তু সোজা কাশবনের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। ছোট একটা রাস্তা। বোঝাই যাচ্ছে এটা একটা কাশবনই ছিল। মানুষ হাটতে হাটতে কিছুটা রাস্তা হয়েছে। হালকা চাদনী। দুইধারের কাশের জন্য দুইপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। শুধু সামনে আর পিছনে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সামনে আর পিছনের দুইপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। কেননা চাদের আলো এত নিচে এসে পৌছাচ্ছেনা। আমরা সবাই হাটছি তো হাটছিই। কুয়াশা পরে দুইপাশের কাশগুলো কিছুটা নুয়ে পড়েছে। ফলে হাটার সময় আমাদের মুখে এসে লাগছে। খুবই বিরক্তিকর একটা ব্যাপার।

অনেকক্ষণ যাবৎ আমি একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যে কিছুক্ষণ পর পরই কাশবনের ভিতর একটা শব্দ হচ্ছে। শেষবার যখন শব্দটা শুনলাম তখন আমার মনে হলো কিছু একটা আমাদের সাথে সাথে চলছে। আর কিছুক্ষণ পরপর শব্দটা শুনিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছে বুঝলাম না। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর একই শব্দটা শোনা যাচ্ছে। বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে করে সামনে যাওয়ার যে শব্দটা ঠিক সেই রকম। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম।তবে কারও কাছে কিছু বললাম না।সোজা সামনে হাটছি।

থেকে থেকে শব্দটা আমি ঠিকই শুনতে পাচ্ছি। একটা জিনিস খুব অদ্ভুত লাগছিল যে সবাই কেমন জানি নির্বিকার, কেউ কি কিছু শুনতে পাচ্ছেনা। তাহলে আমি কি কোন হ্যালুসুনেশনে আছি। মানুষের চেচামেচি শোনা যাচ্ছে। আমি আর মামা ছাড়া আর বাকি সবাই দেখি দৌড় দিল। আমরাও পিছনে পিছনে দৌড় লাগালাম।

মোটামুটি সামনেই বসলাম। সবাই চিৎকার-চেচামেচি করছে। দুইঘন্টা……… এরমাঝে আয়োজকদের একজন এসে বলে গেল চুপ করার জন্য এখনি নাকি যাত্রা শুরু হবে। ৫-১০ সেকেন্ট চুপ ছিল আবার চিল্লা-চিল্লি। এবার স্থানীয় চেয়ারম্যানের অনুরোধ। সবাই চুপ।

নুপুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল। নাচ শুরু হবে মনে হচ্ছে।সে কি নাচ……..নাচেরতালে­ তালে দর্শকরা সবাই উন্মাতাল। মামার দিকে তাকিয়ে দেখি বসে বসে লাফাচ্ছে। মামা আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা লজ্জা পেল। কেউ কেউ টাকাও ছুড়ে মারছে। নৃত্যশিল্পী টাকা কুড়িয়ে ব্লাউজের ফাক দিয়ে বুকে রাখছে আর গা থেকে ধীরে ধীরে কাপড় খুলে ফেলছে। মামাকে দেখি বসা থেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে লাফাচ্ছে। এদিকে দর্শক সারি থেকে কে জানি কাগজ দিয়ে বল বানিয়ে নৃত্যশিল্পীর গায়ে মারল। শিল্পী কিছুটা বিব্রত বোঝাই যাচ্ছে।

আয়োজককারীদের মধ্য থেকে একজন এসে অনুরোধ করে যাচ্ছে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। অহেতুক জামেলা কার সহ্য হয়? কেউ একজন ঐ আয়োজককারীর গায়ে জুতা ছুড়ে মারল। সেচ্ছাসেবক দলের আট-দশজন মিলে একটা লোককে সনাক্ত করে মাইর শুরু করল। সাথে সাথে দর্শকরাও ঝাপিয়ে পড়ল। মুহুর্তের মাঝেই হাজার হাজার মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। শরীফ, স্বপন বলল মামা দৌড় দেন….বিরাট মাইর লাগব…….এই এলাকা খুব খারাপ।

আমরা দৌড় লাগালাম।

শরীফ, স্বপনরা সামনে দিয়া আমরা পিছনে। দৌড়াচ্ছিতো… দৌড়াচ্ছিতো… পিছন দিয়া ধর ধর….জইল্যারে ছাড়িসনা………মজিত্যা কই?এরকম হাজারও চিৎকার কানে ভেসেআসছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি হাজারও মানুষ দ্বিক-বেদ্বিক হয়ে দৌড়াচ্ছে। আমরা তখন রাস্তাছেড়ে কাশবনের ভিতর দিয়া হামাগুড়ি দিয়েদিয়ে আগাচ্ছি। মামার জুতা ছিড়ে গেছে। বেচারা ঐ জায়গায় বসে জুতার জন্য শোক করা শুরু করল। মামা আবার ভীষন কৃপণতো। আমরা মামাকে ধরে টেনে হিচড়ে ভিতরে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে ধর ধর আওয়াজটাও স্তিমিত হয়ে আসছে।

আমরা নদীরপাড়ে এসে দাড়ালাম। হালকা চাদনি। ঘাটে কেউ নেই। সহজেয় বুঝতে পারলাম ভয়ে কেউ এদিকটায় আসেনি। শরিফ বলল এখানে দাড়ানো মোটেও নিরাপদ নয়। যে কোন ভাবেই নদীপাড় হতে হবে। আমি আবার সাতার জানিনা। মামা বলল ভাগ্নে তুমি আমার কাদে উঠ। আমি রাজি হলামনা। আমি সারাজীবন সব জায়গায় মাতব্বরি করতাম শুধু পানি ছাড়া। কেননা হাজার চেষ্টা করেও যে সাতারটা শিকতে পারলামনা। আমার সবসময় ভয় বেশী পানিতে গেলে নিচ দিয়ে যদি কেউ টান দেয়। সবাই আমাকে অনেক বুঝানোর পরও রাজি হলামনা। সবাই নদীর পাড়ে দাড়িয়ে আছি। একটা অজানা আতংক সবার ভিতরে কাজ করছে।

আল্লাহু… আল্লাহু…   সবাই একটু ছড়ানো – ছিটানো থাকলেও দেখলাম মুহুর্ত্তের মাঝে একসাথে জড়ো হয়েগেল। শব্দটার উৎপত্তি বুঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। এর মাঝে শুনলাম ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…. কাশবনের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে সে দিকে একটা ক্ষীণ আলোররেখা কাশবনের উপরদিয়ে দেখা যাচ্ছে। আমরা সবাই সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। আলোর তীব্রতা এবং শব্দের তীব্রতা বেড়েই চলছে।

সবাই একদৃষ্টিতে ঐ দিকে তাকিয়ে আছি। দেখি দুইজন মানুষ ঐ কাশবনের পথ দিয়ে বের হয়ে আসছে। দুইজনের হাতে দুইটি হারিকেন। পিছনে চারজনে কাদে করে একটি খাটিয়া নিয়ে আসলো। সাদা কাপড়ে ঢাকা। বুঝলাম কোন লাশ নিয়ে এসেছে। তার পিছনে আরও দুইজন হারিকেন হাতে। অবাক হয়ে গেলাম।