ঝাউদীঘির আতঙ্ক [শেষ অংশ]

1

কক্ষের বিশাল জানালা দিয়ে হু হ করে চৈত্ররাতের বাতাস ঢুকলেও আমার ভীষণ গরম লাগছিল। পায়জামা পরে খালি গায়েই ছিলাম। বেশি গরম লাগলে নীচে নেমে দীঘির জলে সাঁতার কেটে আসব বলে ঠিক করলাম।
লিখলাম … প্রাথমিক ভাবে আমার ইনামগড়ের জমিদারবাড়ির এরিয়া প্রায় ছয় একর বলে মনে হয়েছে। অবশ্য কম হতে পারে আবার বেশিও হতে পারে। সবচে উল্লেখযোগ্য যেটা, লেবুবাগানে বৌদ্ধদেবী তারার একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে।মন্দিরটি সন্দেহ নেই পাল আমলের নির্মিত। কাজেই প্রায় হাজার বছরের পুরনো হওয়ার কথা। এটা একটা অনন্য ডিসকভারীই বলা যায়। তবে কিছু প্রশ্ন জাগে …
টাইপ করতে করতে মনে হল আকাশ থেকেফুটফুটে জ্যোস্না ঝরছে। অলিন্দে দাঁড়ালে দেখতে পাব চৈত্রপূর্ণিমার পূর্র্ণযৌবনা চাঁদ আর ঝাউদীঘির টলটলে রূপালি জল । বেশ বুঝতে পারছি যে আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। না হোক। কত রাতই তো আমার বই পড়ে কেটেছে। দূরথেকে হুইশিলের আওয়াজ ভেসে এল। কুউউউ ঝিকঝিক। মাঝরাতের ট্রেন। স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকারের মুখটা মনে পড়ে গেল । ভদ্রলোক যদি জানতেন যে আমি এই মধ্যরাতে জমিদার হেমেন্দু বিকাশরায় চৌধুরীর শয়ন কক্ষে বসে আছি এবং ঝাউদীঘির টলটলে রূপালি জলে উদোম হয়ে সাঁতার কাটার প্ল্যাট আঁটছি …
আমি লিখছিলাম … সেনআমলে সেনরাজাগণ বৌদ্ধদের ওপর প্রচন্ড দমনপীড়ন চালিয়েছিলেন । তাহলে লেবুবাগানের ওই বৌদ্ধমন্দিরটি কি ভাবে আজও ইনট্যাক্ট রয়েছে? এই বিষয়টির গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা কি?
এই পর্যন্ত লিখলাম। আসলে ইতিহাসএবং প্রত্নতত্ত্ব হল অনেকটা গোয়েন্দা কাহিনীর মতো । অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। তখন মাথায় জট পাকিয়ে যায় । সিগারেট টানতে টানতে পায়চারি না করলে আমার আবার মাথার জট খুলে না।
আমি দিনের বেলায় ধূমপান থেকে বিরত থাকি। রাতের হিসেব অবশ্য অন্যরকম। মালবোরোর সাদা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম।
তারপর উঠে অলিন্দে চলে এলাম।
মার্চরাত্রির স্নিগ্নধবল জ্যোস্নায় ভীষন মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ঝাউগাছের পাতা ছুঁয়ে মধুর চৈত্র বাতাস ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।মুহূর্তেই আমি পুরনো ইতিহাসের গূঢ় জিজ্ঞাসার কথা ভুলে গেলাম ।
প্রকৃতির মধ্যে ডুবে যেতে লাগলাম। প্রকৃতি ঘুমিয়ে পড়েছে। কী নির্জন চরাচর! কেবল একটি রাতচরা পাখি কর্কস কন্ঠে ডেকে গেলে সে অটুট নির্জনতা ক্ষণিকেরজন্য ভেঙে পড়ল। তাকিয়ে দেখলাম ঝাউদীঘির রূপালি জলে কাঁপন উঠেছে। মাছ নিশ্চয়ই। আজ যে রুইমাছ খেলাম ওই দীঘিরই বোধহয়। ওসমান গাজী ধরে রেখেছিল। আমি যে আসছি সে তো ওসমান গাজী জানতই ।
ঝাউদীঘির পানি থেকে একটা মাথা ভেসে উঠল।
মানুষের মাথা।
আমার শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে গেল।
মাথাটা ধীরে ধীরে ঘাটে এসে ঠেকল । তারপর ধীরে ধীরে উঠে এল। জলে ভেজা শরীরের পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এক হাতে একটা কোদাল। অন্য হাতে টুকরি। সে মুখ তুলে দোতলার অলিন্দের দিকে তাকাল। আমি আমূল কেঁপে উঠলাম। আমার হাত থেকে সিগারেট খসে পড়ল। ঝাউদীঘির মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুর? কিন্তু কিন্তু তা কি করে সম্ভব? ততক্ষণে দীঘির পানিতে আরও অনেক মাথা ভেসে উঠে। আমি কি ভুল দেখছি? আমার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে?
অবচেতন মনে কে যেন তাড়া দিল।
আমি দিগবিদিগ দৌড়ে নীচে চলে এলাম।
অন্ধকারে বেশ ক’বার ঠোক্কর খেলাম। অবশ্য যন্ত্রণা টের পেলাম না। আমার শরীর ভীষন কাঁপছিল।
ওসমান গাজী ! ওসমান গাজী ! আমার মুখে কথা ফুটল না।
ওসমান গাজী টিনসেড থেকে বেড়িয়ে এল। বলল, হজুর জলদি গাড়িতে উঠেন।বলেই এক লাফে জুরীগাড়িতে চড়ে বসল ওসমান গাজী।
আমিও দরজা খুলে ভিতরে বসতে দেরি করলাম না । থরথর করে কাঁপছিলাম। ঘামে শরীর ভিজে গেছে।
জ্যোস্নামাখা লেবুবনের মাঝখান দিকে ঘোড়াগাড়ি ছুটছে।
দু’পাশের লেবুগাছগুলি ভীষন কাঁপছিল। অশুভ আত্মার তপ্ত নিঃশ্বাস টের পাচ্ছিলাম যেন। দেখতে দেখতে জুরীগাড়ি শালজঙ্গলে উঠে এল। ঘোড়া দুটি ভীষণ চিঁ হি চিঁ হি করছে। ওরাও ভয় পেয়েছে। দু’পাশের শালজঙ্গলেওযেন ঝড় উঠেছে। ভয়ানক শনশন আওয়াজ হচ্ছে । গাছগুলি দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। জুরীগাড়ি একবার কী সেরধাক্কায় ভয়ানক কেঁপে উঠল। ওসমান গাজী প্রাণপন চেষ্টা করে তাল সামলালো।
তারপর কখন যেন রেলস্টেশনের সামনে জুরীগাড়িটা থামল ওসমান গাজী ।
নামেন হুজুর। আর কোনও ভয় নাই।
আমি দরজা খুলেই এক লাফে নীচে এলাম।
তারপর ছুটে গেলাম স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে।
স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সিগারেট ফুঁকছিলেন। আমাকে দেখেই বললেন, বুঝেছি। বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। যাক। আধঘন্টা পরেই ঝিকড়গাছার একটি ট্রেন আছে। সেই ট্রেনে আপনাকে তুলে দেব। এখন আমার ঘরে আসুন। কিছু একটা পরে নিন।

(সমাপ্ত)

লেখক~ইমন জুবায়ের

প্রেতনারী­ [১ম অংশ]

0

কমলদিঘির পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে শাওন বলেছিল, একটা মেয়ে ওকে কমলদিঘিতে টেনে নিয়ে যাবে। কমলদিঘিতে ভোরবেলা ওর লাশ ভাসবে… কতকাল পর শাওনের কথা মনে করে শিউরে ওঠে তানিম । শাওনের কথা সত্যি হয়েছিল। ভোরবেলা কমলদিঘিতে ওর লাশ ভেসেছিল ।

বৈশাখের দুপুরে হঠাৎই প্রচন্ড শীত বোধ করে তানিম। অথচ চারপাশে ছড়িয়ে আছে আগুন-ছড়ানো খর রোদ্দুর। নির্জন দুপুরে এক ঝাঁক টিয়ে টি টি শব্দ করতে করতে উড়ে যায় কমলদিঘির ওপর দিয়ে উত্তরের শালজঙ্গলের দিকে। এ দিককার দিঘিরঘাটটি বেশ প্রশস্ত। পুরনো ইটের তৈরি, সিঁড়ির ধাপে-ধাপে শ্যাওলা জমে আছে। কমলদিঘিটি বেশ প্রাচীন । টলটলে কালচে রঙের পানি। এ দেশে যেমনটা হয়, কমলদিঘি ঘিরেও কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে। চৈত্র মাসের নবমী তিথিতে স্থানীয় সনাতনধর্মাবলম্বীরা দিঘিপাড়ে পূজা- অর্চ্চনা করে। কাল মোবাশ্বের চাচা এসব কথাই তানিমকে বলছিলেন।

অনেক বছর পর কমলনগর এল তানিম। তা ৭/৮ বছর তো হবেই। তানিম তখন স্কুলে পড়ত। ক্লাস সেভেনে। দু’চোখে রাজ্যের কৌতূহল। সব ঘুরেফিরে দেখে অবাক। পুরনো জমিদার আমলের দোতলা দালান। তবে সবটাই এখন আর অবশ্য বসবাসের উপযোগি নয়। দিনের বেলায় কেমন অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে থাকে। দালানের পিছনে ফলের বিশাল বাগান। আম-জাম-লিচুই বেশি, তবে আমলকি, জলপাই আর কামরাঙার গাছও আছে। কমলদিঘিটা মূল দালানের সামনে । এই অঞ্চলের একটি প্রাচীন বংশের স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে। তানিমের দাদুবাড়িটি এ অঞ্চলের লোকে বলে: ‘দৌজাবাড়ি’। দৌজাবংশের প্রথম পুরুষ শাফাতউজ দৌজা নাকি দোদর্ন্ড প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন; সাড়ে ছ’ ফুট উচ্চতার বলিষ্ট শরীরে নাকি বাঘের মতন শক্তি ছিল। একরোখা রাগী শাফাতউজ দৌজার ভয়ে নাকি বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। তবে এ অঞ্চলের লোকে বলে, জমিদার শাফাতউজ দৌজা যেমন অত্যাচারী ছিলেন, তেমনি ছিলেন দয়ালু; কর আদায়ে যেমন নির্মম ছিলেন, আবার প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য নিজস্ব উদ্যেগে দিঘি খনন করিয়েছিলেন। তবে অমন বিশাদেহী পালোয়ানের মতন মানুষটির লাশ কেনই-বা এক ভোরে কমলদিঘির জলে ভাসতে দেখা গিয়েছিল-সেও এক অমীমাংশিত রহস্য বটে …

তানিম ওর দাদুবাড়ি শেষবার যখন এসেছিল তখনও ওর বাবা বেঁচে ছিলেন। মোবাশ্বের চাচার স্ত্রী মনোয়ারা চাচী বেঁচে ছিলেন, মোবাশ্বের চাচার ছেলে শাওনও বেঁচে ছিল … শাওন অবশ্য তানিমরা কমলনগর থাকতে থাকতেই দিঘিতে ডুবেমারা গিয়েছিল …

দোতলার অলিন্দে দাঁড়িয়েছিল তানিম। বৈশাখের দুপুর ঝাঁঝাঁ করছিল। লোহার রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে একটা কাক ডাকছিল। নির্জনদুপুর বলে কাকের ডাক আরও গভীর শোনায়। তানিম একটা সিগারেট ধরায়।মোবাশ্বের চাচারা নীচতলায় থাকে। দোতলায় সার সার ঘর। তারই একটা ঘরেমা ঘুমিয়ে। গত রাতে মার ভালো ঘুম হয়নি। অথচ মা ক্লান্ত ছিল। ওরা ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কমলনগর পৌঁছেছে বিকেলে। ড্রাইভার মকবুল ছুটিতে। তানিমই ড্রাইভ করছিল।

কমলনগর আসার বিশেষ একটা কারণ ছিল। কমলনগরে তানিমদের পৈত্রিক সম্পত্তির পরিমান কম না। মোবাশ্বের চাচা একাই ভোগদখল করছেন। মার এখানেই আপত্তি। দিন কয়েক আগে মা বলল, কমলনগরে তোদের অনেক জায়গাজমি পড়ে আছে। তুইও যখন সম্পত্তির অংশীদার- তখন মিছিমিছিদেশের জমি ফেলে রাখবি কেন? তোর বাবা বেঁচে থাকলে না-হয় একটা কথা ছিল।

সে জন্যই আসা। কিন্তু, সিফাতজান ফুপু ভয় ধরিয়ে দিলেন। সিফাতজান ফুপুর অনেক বয়স। সত্তর তো হবেই। ধবধবে ফরসা, শনের মত চুল, চোখ দুটি ঘোলা। সিফাতজান ফুপু এ বাড়ির বড় মেয়ে। অল্পবয়েসেই বিধবা হয়েছিলেন, তারপর থেকে বাবার বাড়িতেই আছেন। সিফাতজান ফুপু খনখনে গলায় বললেন, ও রেহনুমা। তোমরা এইখান থেকে কালই চইলা যাও।

কেন? চলে যাব কেন? মায়ের মুখ কেমন থমথমে হয়ে উঠল।

সিফাতজান ফুপু একটুখানি চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, কমলদিঘিতে মোবাশ্বেরের পোলা শাওন রে টাইনা নিয়া গেছে। এইবার তোমার পোলা রেও নিব দেইখো।

যাঃ। আপনি এসব কী যা তা বলছেন!

তানিম জানে মা চিন্তাভাবনায় আধুনিক। ঢাকার একটি মহিলা কলেজে ইতিহাস পড়ান। উন্নয়নকর্মী। মা এসব গ্রামীণ কুসংস্কারে বিশ্বাস করবে কেন?

তবে সিফাতজান ফুপুর কথা শোনার পর থেকে মা কেমন গম্ভীর হয়ে উঠল। মা গজগজ করতে করতে বলছিল, বুড়ির মাথাখারাপ। আসলে এ বাড়ির সম্পত্তি একাই জমি গ্রাস করবে বলে বুড়ি ভাইয়ের সঙ্গে জোট পাকিয়েছে।

রাতে মার আর ঘুম হয়নি। মা এখন ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু, সিফাতজান ফুপু যে বললেন, ‘ কমলদিঘিতে মোবাশ্বেরের পোলা শাওন রে টাইনা নিয়া গেছে। এইবার তোমার পোলা রেও নিব দেইখো।’ … এই কথার কি মানে? শাওনের মৃত্যু কি নিছক অ্যাকসিডেন্ট নয়? যদি তাই হয় তাহলে শাওন কেন বলবে-একটা মেয়েওকে কমলদিঘিতে টেনে নিয়ে যাবে। শাওনের কথা তো সত্যি হয়েছিল। ভোরবেলা ওর লাশ ভেসেছিল কমলদিঘিতে।

তানিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলদিঘির দিকে তাকায়। দিঘির জলে রোদ পড়ে ঝিকঝিক করছিল। তানিমের গা ছমছম করে। কী এক রহস্য আছে কমলদিঘি ঘিরে? কি সেই রহস্য?

শেষবার যখন কমলনগর এসেছিল তানিম, শাওনের সঙ্গেই ঘুরত তানিম। মোবাশ্বের কাকার ছেলে শাওন তানিমেরই সমবয়েসি। ক্লাস সেভেনে পড়ত। এক দুপুরে খাওয়ার পর দিঘির পাড় ধরে হাঁটছিল। গায়ের রং শ্যামলা। সরল নিষ্পাপ চোখ। পরনে নীল রঙের হাফপ্যান্ট, সাদা গেঞ্জি। হঠাৎ শাওন বলল, আমি মারা যাব তানিম।

মারা যাব মানে! হাতের ঝিনুক কমলদিঘিতে ছুড়ে তানিম বলে। দিঘি রোদে ভাসছিল । নির্জন ঝিম-ধরানো ফড়িং-ওরা দুপুর। মাথার ওপরে একটা নির্জন নীল আকাশ। শাওনের কথা কেমন অলীক মনে হয়।

শাওন বলে, তুমি জান না, আমাদের বংশের একজন করে কমলদিঘিতে ডুবে মারা যায়।

কমলদিঘিতে ডুবে মারা যায়? তোকে কে বলল?

সিফাতজান ফুপু বলছে। কেন তুমি জান না? মোজাম্মেল চাচা কমলদিঘিতে ডুবে মারা মারা গেছে।

মোজাম্মেল চাচা পানিতে ডুবে মারাগেছেন? তানিমের বুকটা ধপ করে ওঠে। ওর হাত-পা শিরশির করে।

হ্যাঁ। কেন তুমি জান না? একটা মেয়ে পূর্ণিমার রাতে কমলদিঘি থেকে ঘাটে উইঠা আসে। সেই তো মোজাম্মেল চাচা রে টাইনা নিয়া গেছে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [৩য় অংশ]

1

একতলার একটি কক্ষে কারুকাজ করা দেয়াল দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখে রঙ্গশালা মনে হল। ঝটপট বেশ ক’টা ছবি তুলে নিলাম। বেশ ধনী ছিল রায়চৌধুরী পরিবার । বিস্তর জমিজমা বাদেও লবনের মতো লাভজনক ব্যবসা ছিল সম্ভবত।
দোতলায় উঠবার কাঠের সিঁড়িটি ভাঙা। দোতলার দরজা-জানালাগুলিও ভাঙা । বেশ বুঝলাম সংস্কার কাজে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরকে বেশ খরচ করতে হবে। দোতলার একটা কক্ষে সুন্দর একটি দেয়াল আয়না দেখে থমকে দাঁড়ালাম। সেই ঘরেরই মাঝখানে সেগুন কাঠের একটি পালঙ্ক, একটি টেবিল ও দুটি চেয়ার রয়েছে। টেবিলের ওপর পুরনো আমলের একটি হারিকেন আর চিমনি। দেওয়ালেএক মহিলার সাদাকালো ছবি টাঙানো।ভারি শ্রীময়ী চেহারা । কার ছবি? হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর স্ত্রী চিত্রলেখা দেবীর নয় তো? চারিদিকে তাকিয়ে ভাবলাম এই কক্ষটিই কি জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর শয়নকক্ষ?
হ্যাঁ, তাইই।
কক্ষের ওপাশেই বিশাল অলিন্দ।
অলিন্দে পা রাখতেই এক ঝাঁক পায়রা উড়াল দিল। বেশ প্রশস্ত অলিন্দ। এখানেই চৈত্রের এক মাঝরাতে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী পায়চারি করছিলেন। সে সময় কী দেখে তিনি ঢলে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। হঠাৎই আমার মনে পড়ল আজ তো চৈত্রমাসের দু তারিখ! আশ্চর্য!
অবশ্য এসব ভাবনা আমার মাথা থেকে উবে গেল। যখন আমি টলটলে ঝাউদীঘির দিকে তাকালাম। তাকিয়েই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। বিশাল দীঘি। আয়তকার। টলটলে কালোপানি, তাতে তিরতিরে ঢেউ। দীঘির কোথাও এতটুকু কচুরিপানা চোখে পড়ল না। দীঘির তিন দিকেই নিবিড় ঝাউবন। মনে পড়ল ঝাউবনের মাঝখানেদীঘির জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
পিছনে পায়ের শব্দ হল।
ওসমান গাজী । হাতে চায়ের কাপ। খুশি হলাম। এই জিনিসটা আমার আবার ঘন্টায় ঘন্টায় চাই। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলাম। চিনে মাটির তৈরি অদ্ভূর সুন্দর কাপ। উনিশ শতকে বনেদী পরিবারে যে রকম কাপ ব্যবহার করা হত, ঠিক সেরকম। পিরিচের এক কোণে হালকা লাল রঙের ছোপে ‘চিত্রলেখা’ শব্দটা লেখা। অবাক হয়ে বললাম, এইকাপ তুমি কই পেলে ওসমান গাজী?
একতলার সিন্দুকে ছিল হজুর। বৃদ্ধ কেয়ারটেকারের কন্ঠস্বর কেমন ফ্যাসফ্যাসে।
সিন্দুকে ছিল মানে? সিন্ধুক তো তালা মারা দেখলাম। তুমি … তুমি চাবি পেলে কই?
কথাটা ওসমান গাজী এড়িয়ে গেল। বরং জিজ্ঞেস করল, রাতে কি খাইবেনহজুর?
বললাম, রাতে আমি তেমন কিছু খাই না। যা হয় একটু কিছু কররো। রুটি করতে পারবে?
পারুম হজুর ।
বেশ। আর শোন রাতে আমি ওই ঘরেই থাকব। ওই ঘরে চেয়ার টেবিল আছে। রাতে আমাকে লেখালেখির কাজ করতে হবে। বলে এতক্ষণে চায়ে চুমুক দিলাম। মুহূর্তেই বিস্মিত এবং মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চায়ের স্বাদ দুর্দান্ত । চায়ের পাতা অত্যন্তদামী মনে হল। দুধও খাঁটি। আশ্চর্য! এই ঈশ্বর পরিত্যক্ত জায়গায় ওসমান গাজী এত সব রাজকীয় উপাচার পেল কী ভাবে?
আমি ওই ঘরে থাকব শুনে ওসমান গাজীর মুখের ভাব কেমন যেন বদলে গেল।
বললাম, আমি এখন গোছল করব।
আমি পানি আইনা দিতেছি হজুর ।
না, না। তোমাকে পানি আনতে হবে না। আমি দীঘি তে গোছল করব। যা গরম পড়েছে। বলে চায়ের কাপটা ওসমান গাজীর হাতে দিয়ে নীচে নেমে এলাম।
টিনসেডের বারান্দায় বেঞ্চির ওপর সুটকেশটা পড়েছিল। ওটা খুলে জামাকাপড় সব বের করে নিলাম। দীঘিতে যাওয়ার পথটা লেবুবনের ভিতর দিয়ে । গোধূলি বেলা। এমন সময় পাখপাখালি তারস্বরে চেঁচায়। তাই করছিল তারা। লেবুবনে কেমন আলোআধাঁরির খেলা। জ্বোনাক পোকারা জ্বলছিল আর নিভছিল। ঝিঁঝিরা ডাকছিল কাকপাখিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
দীঘির ঘাটে এসে দাঁড়াতেই কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি টের পেলাম। অন্তত দেড়শ বছরের পুরনো ঘাট। এখানে সেখানে ফাটল ধরেছে। ফাটলে ঘাস। আর সিঁড়ির ধাপে শ্যাওলা। সাবধানে পানিতে নেমে ডুব দিলাম। শীতল পানির ছোয়ায় পরম শান্তি পেলাম। তারপর অনেক ক্ষণ ঘাটে বসে গা ঘঁষলাম। মনে হলপানির তলার থেকে কারা যেন আমাকে দেখছে। পাত্তা দিলাম না।
ফিরে আসার আগে দীঘির জলে ভুস করেএকটা টুকরি ভেসে উঠল।
সেই শিরশিরে অনুভূতি টের পেলাম।
ওসমান গাজী টিনসেডের বারান্দায় টেবিলের ওপর খাবার সাজিয়েছে । টেবিলের ওপর একটা হারিকেন জ্বলছিল। উষ্ণ কোমল গরম পানিতে আমার হাত ধুইয়ে দিল ওসমান গাজী। তারপর খেতে বসে ভারি অবাক হয়ে গেলাম। রুটি ছাড়াও ভাত করেছে ওসমান গাজী । রুইমাছ ভাজি, মাছেরডিমের বড়া, রুই মাছের বলে মনেই হল, রুই মাছের দো পেঁয়াজা, মুড়ি ঘন্ট, কইমাছ ভাজা, কইমাছগুলি সাইজে অনেক বড়, অত বড় সাইজের কইমাছ আজকাল পাওয়ার কথা না; চিংড়ি মাছের বড়া, আমের আচার, গুড়ের পায়েস এবং দইমিষ্টি। আশ্চর্য! ওসমান গাজী এত সব রাঁধল কখন। কথাটা যে ওসমান গাজী কে জিজ্ঞেস করব সে উপায় নেই । আশেপাশে বুড়োকে কোথাও দেখতে পেলাম না। আশ্চর্য! কোথায় গেল ভুতুরে বুড়ো? একটু আগেই তো আমার হাত ধুইয়ে দিল।
অগত্যা নিরবে খেয়ে উঠলাম। রান্নার স্বাদ একেবারে অন্য রকম। এক সময় উনিশ শতকের বনেদি বাঙালি বাড়ির রান্নার ওপর বিস্তর পড়াশোনা করেছি। রান্নার স্বাদ অনেকটা ও রকম বলেই কেন যেনমনে হল।
কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব?
খাওয়ার পর সুটকেশটা নিয়েই দোতলায় উঠে এলাম । প্রত্নতাত্ত্বিকের সুটকেশ বলে কথা। ভারী ভারী সব বই আছে ওতে। এতসব ভুতুরে ব্যাপারের মধ্যেও আমি ভুলে যাইনি যে আমাকে ইনামগড়ের রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়িটির সংরক্ষণ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
ডেল নোটবুকটা রাখলাম টেবিলের ওপর । বসলাম জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর শয়নকক্ষের অর্জুন কাঠের চেয়ারে । তারপর প্রাথমিক কিছু কথা টাইপ করতে শুরু করলাম। টেবিলের ওপর হারিকেন জ্বলেছিল। নিজেই জ্বালিয়ে নিয়েছি। তেল ছিল বলে অবাক হয়নি। এই ভুতুরে হানাবাড়িতে পা রাখার পর থেকে কত কিছু যে ঘটছে! তখন দীঘির জলে একটা টুকরি ভেসে উঠল কেন? একটা হাতও দেখলাম বলে মনে হল।
সেই শিরশিরে অনুভূতি টের পেলাম।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [২য় অংশ]

1

 

সবাই বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী নাকি ঝাউদীঘির জল থেকে কয়েক শ মানুষ ভেসে উঠতে দেখেছিলেন। মানুষগুলির পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি; এক হাতেকোদাল, অন্য হাতে টুকরি।

বলেন কী!

হ্যাঁ। ইনামগড়ের লোকে বলে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী ঝাউদীঘি থেকে মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুরদের উঠে আসতে দেখেই মারা গেছেন।

কথাটা আমার কেন যেন ঠিক বিশ্বাস হল না। আমি ঠান্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবলাম।

(১) জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে। হয়তো হার্ট অ্যাটাক করেছিল। সেই আমলের মানুষ আজকের দিনের মতো এত স্বাস্থসচেতন ছিল কি? আর ডাক্তারি বিদ্যের জোর তো তথইবচ

(২) ঝাউদীঘি থেকে মৃত শ্রমিকদের তো জীবিত উঠে আসার প্রশ্নই আসে না।

(৩) এ দেশের মানুষ ভীষন গল্পপ্রিয়। অনেকে আবার ভালো গল্প-বলিয়ে। স্টেশনমাস্টারটি সেরকমই গুণধর একজন মানুষ । নির্জন স্টেশনের নিঃসঙ্গ মানুষটি আমাকে দেখে গা ছমছমে গল্প ফেদেছেন, সমস্ত প্রতিভা উজার করে দিয়েছেন। গল্পবরং উপভোগ করাই ভালো। তর্ক করে লাভ নেই।
আমি গত তিরিশ বছর পেশাগত কাজে কতপুরনো বাড়িতে কাটিয়েছি। কই, কখনও তো কোনও অশুভ প্রেতাত্মা ভয়াল রূপ ধরে আমার সামনে এল না । বন্ধুরা আমাকে ডাকাবুকো বলে। পরলোকে অবিশ্বাসী বলেও আমার দুর্নামও আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, পরের বছর চৈত্র মাসের গোড়ায় মারা গেলেন জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর জ্যেষ্ট পুত্র জমিদার দিব্যেন্দুপ্রকাশ রায়চৌধুরী। ওই একই ভাবে। গরমে ঘুম আসছিল না। মাঝরাতে অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ ঢলে পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
ওহ্ ।
আপনাকে তখন একবার বলেছি সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধর ইন্ডিয়া চলে যায়। এখন নাকি রায়চৌধুরী পরিবারের অনেকেই বিলেতে থাকেন।
আচ্ছা।
স্টেশনের বাইরে খটাখট খটাখট ঘোড়া ক্ষুরের আওয়াজ পেলাম।
স্টেশনমাস্টার সচকিত হয়ে বললেন,আপনার লোক বুঝি এসে গেল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাদিক সাহেব? অমন অশুভ জায়গায় আপনার না গেলে চলে না?
মৃদু হেসে বললাম, উপায় নেই। সরকারি কাজে এসেছি। বলে ভারী সুটকেশটা তুলে নিলাম।
স্টেশনমাস্টার বললেন, ঠিক আছে। অশুভ জায়গায় যখন যাচ্ছেন যান। কিন্ত বলে রাখি, আমি সারারাতই স্টেশনে আছি। তেমন কোনও বিপদ টের পেলেই ছুটে আসবেন ।
কথাটা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
কেয়ার টেকারের নাম ওসমান গাজী। বৃদ্ধই বলা যায় । তবে স্বাস্থ বেশ ভালো। এই বয়েসেও বেশ গাট্টাগোট্টা। গায়ের রং বেশ কালো। মাথায় নীল রঙের মখমলের টুপি। টুপির নীচে পিছনের দিকে চুল যা বেরিয়ে আছে তার সব পাকা। বসন্তের দাগ ভরতি মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ফিরোজা রঙের সদরিয়া আর চোস্ত পাজামা পরে ছিল ওসমান গাজী । বৃদ্ধের হাঁটাচলার ভঙ্গি খুবই নিরীহ । কথাবার্তায়ও অত্যন্ত বিনয়ী।
ওসমান গাজী আমার সুটকেশটা ঘোড়াগাড়িতে তুলে দিল। ইনামগড়ের রাস্তায় যে আজও এই একুশ শতকের বাহনটি চলে সেটি জানতাম না। নিছক ছ্যাকড়া গাড়ি হলে না-হয় এক কথা ছিল, এ তো দেখছি রীতিমতো জমিদার আমলের আলিশান জুরীগাড়ি! ভিতরে সবজে রঙের গদিওয়ালা বসার আসন। ওপর থেকে ঝুলছে ছোট ছোট ঘন্টি লাগানো ঝালর। ছোট আয়নাও বসানো রয়েছে দেখলাম। বেশ উপভোগই করলাম উনিশ শতকী বাহনটা।
শালজঙ্গলের মাঝখান দিয়ে পিচরাস্তা বেঁকে চলে গিয়েছে। শেষবেলায় উজ্জ্বল রোদ ছড়িয়ে ছিল। সবে চৈত্রের শুরু। বনে অজস্র শুকনো পাতা। আচমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
ঘোড়াগাড়ি বাঁ দিকে মোড় নিতেই একটা ময়ূর চোখে পড়ল । বেশ পুরনো আমলের আবহ। পথটা ধীরে ধীরে সরু হয়ে উঠেছে। দু’পাশে এখন ঘন লেবুবাগান। লেবুবাগানে আলোআধাঁরির খেলা আর কাক-পাখিদের অসহ্য কিচিরমিচির।
লেবুবাগানের মাঝখানে একটা টিনসেড। তারই সামনে ঘোড়াগাড়ি থামল। ঘোড়াগাড়ি থেকে নেমে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি। একতলা টিনসেডের সামনে একচিলতে বারান্দা। খাওয়ার টেবিল। কাঠের একটা বেঞ্চি। ওসমান গাজী বেঞ্চির ওপর আমার সুটকেশটা রেখেঅত্যন্ত বিনীত কন্ঠে বলল- সে এই টিনসেডেই থাকে। আমার থাকার ব্যবস্থাও নাকি সে ওখানেই করেছে।
ভিতরে ঢুকে দেখলাম রান্নার জায়গা বাদেও ছোট ছোট দুটি ঘর। একটা ঘরের মেঝেতে কোদাল ও টুকরি দেখলাম। হয়তো ওগুলি বাগানে কাজ করার সময় ওসমান গাজীর কাজে লাগে।
লেবুবাগানের ভিতর ছোট্ট একটি পুরনো মন্দিরও চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলাম।বৌদ্ধদেবী তারার মন্দির। বাংলাদেশে এ ধরনের মন্দির রেয়ার। আমি ঝটপট আমার ক্যানন রিবেল এক্সএসটা বের করলাম। তারপর বিভিন্ন অ্যাঙেলে ছবি তুলে নিলাম।
তখনও যেহেতু দিনের আলো ছিল। আমি জমিদার বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখব ভাবলাম। অল্প একটু ঘুরে যা মনে হল আমার। জমিদার বাড়ির চৌহদ্দিটা অন্তত ছয় একরের কম হবে না। মূল ভবনের ইমারতগুলি বেশ উঁচু উঁচু । দেখেই বুঝলাম উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত।রায়চৌধুরীরা যে জৌলুসপূর্র্ণ জীবনযাপন করত তাও বোঝা গেল। এখন অবশ্য ইমারতগুলি – দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে যা হয়-ইঁদুর, চিকা, চামচিকা, চড়–ই পাখি আর কবুতর দখলে চলে গেছে।
প্রধান প্রবেশপথের বাম পাশে মূলভবনের এলাকার মধ্যেই খোলা জায়গায় একটি কৃষ্ণমন্দির। তারই ডান পাশে মূল ভবনের বহির্বাটি এবং প্রবেশপথ। তারপর বর্গাকার একটি চত্বর। পূর্ব দিকে চত্বরমুখী সমতল ছাদবিশিষ্ট আরও একটি মন্দির। মন্দিরের সামনের অলিন্দ এবং মন্দিরের ছাদটি রয়েছে চারটি স্তম্ভের উপর । মূল বাড়িটি তিনটি প্রধান মহলে বিন্যস্ত। আয়না মহল, রানী মহল এবং ঠাকুরবাড়ির মহল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দলদালানের ইট ক্ষয়ে গেছে।
একতলার কক্ষের দরজা-জানালাগুলিভেঙে পড়েছে । অনেক দরজায় আবার তালা। তালাগুলি ওসমান গাজী কে দিয়ে ভাঙাতে হবে। একতলার একটি কক্ষে বড় বড় ছ’-সাতটি সিন্দুক দেখলাম । সিন্দুকগুলি খুলে দেখতে হবে। ভিতরে যা আছে তার লিষ্ট করতে হবে।

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

ঝাউদীঘির আতঙ্ক [১ম অংশ]

1

স্টেশনমাস্টারের কথায় রীতিমতো চমকে উঠলাম। ইনামগড়ের রায় চৌধুরীদের জমিদার বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত। রাতের বেলা তো দূরের কথা স্থানীয় লোকজন দিনের বেলাও নাকি ওদিকে ঘেঁষে না। আমি খানিকটা বিমূঢ় বোধ করলাম। কারণ একটু পরই আমার রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়ি তে যাওয়ার কথা। আমি স্টেশনমাস্টারের মুখের দিকে তাকালাম। মাঝবয়েসি ভদ্রলোক । শিক্ষিত, ভদ্র চেহারা। এমন মানুষের তো কাউকে মিছিমিছি ভয় দেখানোর কথা না। আমি যদিও অভিশপ্ত ভুতুরে হানাবাড়িতে বিশ্বাস করি না। তাই সদ্য পরিচিত ভদ্রলোকের সামনে ভদ্রতা করেই চুপ করে রইলাম। স্টেশনমাস্টার চা খেতে দিয়েছেন। তাতেই চুমুক দিলাম।
স্টেশনমাস্টার রফিক উদ্দীন সরকারের মাথায় মস্ত টাক। গায়ের রং যথেষ্ট ফরসাই বলায় যায়। ছোটখাটো গড়ন। পরনের পাজামা-পাঞ্জাবি দেখলেই বোঝা যায় স্টেশনমাস্টারটি অত্যন্ত সাদাসিদে । আধঘন্টা আগে যখন আমি ইনামগড় স্টেশনে নামলাম তখন তিনিনিজে থেকেই আলাপ করতে এলেন। তার ঘরে ডেকে বসালেন। তারপর প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর চা খেতে দিলেন।
আমি যখন ইনামগড় স্টেশনে নেমেছি বেলা তখন তিনটা। ঝকঝকে দিনের আলো ছড়িয়ে ছিল। স্টেশনটি অবশ্য নিজর্নই ছিল। আমি সামান্য অস্বস্তির মধ্যেই পড়ে গিয়েছিলাম। আমার জন্য একজন কেয়ারটেকার অপেক্ষা করার কথা। স্টেশনে সেরকম কাউকে অবশ্য দেখতে পেলাম না।
আমি পুরাতত্ত্বের ওপর কিছু বই লিখেছি। বইগুলি দেশিবিদেশি পুরাতাত্ত্বিক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। দিন কয়েক আগে পুরাতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। আমি যেন সংরক্ষণ এবং পর্যটনের সম্ভাবনা বিবেচনা করে ইনামগড়ের রায়চৌধুরীদের জমিদারবাড়িটির ওপর একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিই। এ কারণেই আমার আজ ইনামগড়ে আসা।
স্টেশনমাস্টার বললেন, সাতচল্লিশে পার্টিশনের পর হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর বংশধরেরা ইন্ডিয়া চলে যায়। তারপর থেকেই ইনামগড়ের জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে।
আচ্ছা। বলে আমি চায়ে চুমুক দিলাম। তারপর স্টেশনমাস্টার কে জিজ্ঞেস করলাম, তখন ঝাউদীঘি নিয়ে কি যেন বলবেন বললেন?
স্টেশনমাস্টার ম্লান হেসে বললেন, আমি এই ইনামগড়ে এসে যা শুনেছি তাই আপনাকে বলছি। এখানে এসেই শুনেছি রায়চৌধুরীদের ওই জমিদারবাড়িটি অভিশপ্ত। জানি যে একুশ শতকে এই সব কথা বিশ্বাস করাকঠিন। আর আপনি যখন শিক্ষত মানুষ।
আপনি কখনও গিয়েছেন জমিদারবাড়িতে? আমার প্রত্নবিদের মন প্রশ্নটা করে বসল।
সর্বনাশ! বলেন কী আমি যাব ঐ অলুক্ষে হানাবাড়িতে?
তাহলে তা সবই শোনা কথা?
হ্যাঁ। তা বলতে পারেন। সবই শোনা কথা। স্টেশনমাস্টার যেন সামান্য মিইয়ে গেলেন।
বললাম, বলুন তাহলে শুনি, আপনি কি শুনেছেন। হাতে যখন সময় আছে।
স্টেশনমাস্টার বললেন, বলছি, শুনুন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। এ অঞ্চলে খুব খরা হল।মাঠঘাট, খালবিল, নদীনালা সব শুকিয়ে কাঠ। পানির অভাবে ঘরে-ঘরে কান্নার রোল। তৃষ্ণার্ত প্রজারা ভাবল- একটা জলাশয় থাকলে এত দুর্ভোগ ভোগ করতে হত না। কিন্তু কথাটা তারা রগচটা জমিদারের কানে তুলতে সাহসপেল না। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর স্ত্রী চিত্রলেখা দেবী ছিলেন ভারি দয়ালু মহিলা । নিয়মিত ধ্যান-দান করতেন। প্রজাদের সুখদুঃখের খোঁজখবর করতেন। তো, চিত্রলেখা দেবীর কাছেই প্রজারা একটি দীঘি খননের অনুরোধ করে। স্ত্রীর সানুনয় অনুরোধ নাকি জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী উপেক্ষা করতে পারেন নি। জমিদারবাড়ির পিছনে ছিল বিশাল একটি ঝাউবন । সেই ঝাউবনে জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী দীঘি খননের জন্য জমি দান করে দিলেন। শত শত মাটি-কাটিয়ে মজুর দিনরাত কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে লাগল, তাতে একটা গভীর খাত তৈরি হল ঠিকই- কিন্তু পানি উঠল না। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী মাটি-কাটিয়ে মজুরদের মাটি কেটে আরও গভীরে যেতে নির্দেশ দিলেন। তারপরও পানি উঠল না দেখে অসন্তুষ্ট জমিদার এক তান্ত্রিক যোগী তলব করে জলশূন্য দীঘির পাড়ে ‘জলধি পূজার’ আয়োজন করলেন । তারপরও পানি উঠল না। হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরী মাটি-কাটিয়ে মজুরদের মাটি কেটে আরও গভীরে যেতে নির্দেশ দিলেন। শত শত শ্রমিক খাদের তলায় কোদাল দিয়ে মাটি কেটে চলেছে। টুকরি করে মাটি ওপরে এনে ফেলছে। হঠাৎ এক বিকেলে পানি উঠে গভীর খাতটা ভরে গেল। মুহূর্তেই সব মজুর তলিয়ে গেল।
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। হতভাগ্য শ্রমিকদের ভাগ্য চিরকালই মন্দ। এদের মধ্যে বিশ্বজুড়ে খনিশ্রমিকদের অবস্থাই সবচে করুন সম্ভবত।
স্টেশনমাস্টারের টেবিলের ওপর একটা মেরুন রঙের পুরাতন ফ্লাক্স। তিনি ফ্লাক্স খুলে কাপে চা ঢাললেন। তারপর সিগারেট ধরালেন। বাতাসে তামাকের গন্ধ ছড়াল । স্টেশনমাস্টারের চেয়ারের ঠিক পিছনেই একটি জানালা। জানালার কাঁটাতারের বেড়ায় রঙনের গুল্ম। বেড়ার ওপাশেশালগাছের ঘন জঙ্গল চোখে পড়ে। অনেক কাক ডাকছিল। রোদের রং ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চৈত্রবেলার নির্জন অপরাহ্ন। স্টেশনটা কেমন সুমসাম করছে।
চায়ের কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বললাম, তারপর কি হল?
একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, ইনামগড়ের মানুষ খরায় অসহ্য বোধ করছিল। দীঘি পানি তে ভরে উঠলে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেল। টলটলে পানির দীঘির চারধারে ঝাউগাছ । তাতে দীঘির নাম লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল- ঝাউদীঘি।
আর মৃত মাটি-কাটিয়ে মজুররা? ওদের লাশ পাওয়া যায়নি?
না।
না। আশ্চর্য!
স্টেশনমাস্টার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, লাশ হয়তো সেভাবে খোঁজাও হয়নি । সেকালে দরিদ্রশ্রেণির মানুষের মৃত্যু নিয়ে কে অত মাথা ঘামাত বলুন?
হুমম। আমি মাথা নাড়লাম। মনে মনে বললাম … দরিদ্রশ্রেণির অবস্থা এই একুশ শতকেও তো বিশেষ বদলায়নি।
প্রবীণ স্টেশনমাস্টারের মুখ কেমন গম্ভীর হয়ে উঠেছে। বোঝাই যাচ্ছে ভদ্রলোক এখনি পিলে চমকানো কোনও তথ্য দেবেন। এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্টেশনমাস্টার বললেন, তারপর কী হল শুনুন। জমিদার হেমেন্দুবিকাশ রায়চৌধুরীর অনিদ্রা রোগ ছিল। মাঝরাতে শয়নকক্ষের বাইরের অলিন্দে পায়চারি করছিলেন। ভীষন গরম। চৈত্রমাসের শুরু। হঠাৎ তিনি ঢলে পড়ে গেলেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
মারা গেলেন? কি হয়েছিল? আমি ভুঁরু কুঁচকে জিগ্যেস করলাম

(চলবে)

লেখক~ইমন জুবায়ের

 

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [শেষ অংশ]

0

 

অফিসঘর পেরিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। অফিঘরের আসবাবপত্র ভীষণ শব্দে ভেঙে ফেলছে। এক দৌড়ে সদর দরজা পেরিয়ে গেলাম। জঙ্গলের ভিতরে প্রাণপন দৌড়াচ্ছি। পিছনে দু’পাশের গাছে দুদ্দার শব্দে । যেন ভয়ানক ঝড় উঠেছে।
তারপর কখন যে তল্লা বাঁশের ঘন বন পেরিয়ে গুহার মুখে এসে পৌছলাম।তবে দৌড়ের গতি কমালাম না। একেবারে মঙ্গল ভট্টারক- এর সামনে এসে থামলাম। ভীষন হাঁপাচ্ছিলাম। মেঝের ওপর বসে পড়লাম। দরদর করে ঘামছিলাম সম্ভত। কান পাতলে নির্জন গুহায় আমার হৃৎস্পন্দন শোনা যাবে।
মঙ্গল ভট্টারক ধ্যানমগ্ন ছিলেন। এখন চোখ খুলে তাকালেন। তারপর প্রসন্নকন্ঠে বললেন, ভীত হইও বৎস। এক্ষণে তুমি নিরাপদ বলয়ে অবস্থান করিতেছ।
আমি কিছু বলতে গেলাম। মঙ্গল ভট্টারক হাত তুললেন। অর্থাৎ সব আমি জানি।
আমার ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল। মঙ্গলভট্টারক কীভাবে যেন টের পেলেন। আমার দিকে একটি কলো রঙের মাটির পাত্র এগিয়ে দিলেন। কি আছে পাত্রে? অত ভাববার সময় নেই। এক চুমুকে শেষ করলাম। মিষ্টি পানীয়।অপরিচিত স্বাদ। তবে মুহূর্তেই আমার সমস্ত শরীর জুড়িয়ে গেল।
গুহার বাইরে বজ্রপাতের প্রচন্ড শব্দ হল। আমি চমকে উঠলাম। মঙ্গল ভট্টারক বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন, বৎস, এক্ষণে আমি তোমার কৌতূহল মিটাইব। মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।
আমি শুনতে লাগলাম।
মঙ্গল ভট্টারক বলতে লাগলেন-মানবজগতে আদিকাল হইতেই এক দূরাত্মা সম্প্রদায়ের যোগীগণ ডাকিনীবিদ্যা সাধনা করিত। পক্ষান্তরে পূণ্যাত্মা সম্প্রদায়ের যোগীগণ চৈতন্যময়ী সত্তার সাধনা করিত। যোগীগণ আপন আপন স্বভাব বশত ডাকিনীবিদ্যা কিংবা চৈতন্যময়ী সত্তার সাধনা করিত। তবে আদিকাল হইতেই চৈতন্যময়ী সত্তার সাধকগণ মহেশ্বরের আর্শীবাদ লাভ করিয়া আসিতেছেন। গোপনে ডাকিনীবিদ্যার সাধনা করে এইরূপ দূরাত্মা যোগী কামাখ্যা শক্তিপীঠে দূলর্ভ নয়। প্রাচীন নিগূঢ়শাস্ত্রে লিখিত আছে যে- ডাকিনীবিদ্যার সাধনা সার্থক হইলে কিংবা ব্যর্থকাম হইলে জগতে ঘোর তমসা নামিয়া আসে। তেমনই এক ডাকিনীবিদ্যার সাধক হইলদূরাত্মা জগন্ধর।
দূরাত্মা জগন্ধর? আমি জিজ্ঞেস করি।
হাঁ। দূরাত্মা জগন্ধর। প্রাগজ্যোতিষপুর নিবাসী দূরাত্মা জগন্ধর স্বভাবে খল, ধূর্ত এবং প্রতারক। তাহার গুরু ছিল কামাখ্যা মন্দিদের ঋষি সত্যবর্মন। হা, ঋষি সত্যবর্মনকে আমরা সত্যদ্রষ্ট্রা ঋষি জ্ঞান করিতাম। তিনি অতি উচ্চস্তরের যোগী ছিলেন। ঋষি সত্যবর্মন চৈতন্যময়ী সত্তার সাধক হইলেও ডাকিনীবিদ্যার সম্বন্ধে গভীর বুৎপত্তি অর্জন করিয়াছিলেন। সত্যবর্মন বৃদ্ধ হইয়াছিল। যুবা বয়েসে জগন্ধর ঋষি সত্যবর্মন- এর নিকট হইতে ডাকিনীবিদ্যার গূহ্যজ্ঞান কৌশলে আত্বসাৎ করে এবং সত্যবর্মন কে হত্যা করে। ইহার পর জগন্ধর কামরূপ হইতে আসামের গভীর অরণ্যে পালাইয়া যায় এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে ডাকিনীবিদ্যা সাধনা করিতে থাকে ।কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধনঞ্জয় জগন্ধর- এর উপর অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া উঠিলেন। জগন্ধর এর সাধনা চরিতার্থ হইলে জগতে অশেষ অকল্যাণ সাধিত হইবে এই ভাবিয়া তিনি জগন্ধর কে হত্যার সিদ্ধান্ত লন। এই উদ্দেশ্যে কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধনঞ্জয় অষ্টাদশ সন্ন্যাসীকে মন্ত্রপূত ত্রিশূল প্রদান করিয়া জগন্ধর হত্যার দায়িত্ব অর্পন করে। আমি হইলাম অষ্টাদশ সন্ন্যাসীর একজন।
আমি চমকে উঠে বললাম, আপনি?
হাঁ। আমি। আমি ধ্যানযোগে জগন্ধর- এর অবস্থান জানিতে পারি। জঙ্গলবাড়ির পিছনে ছাঁচি বেতের ঘোর অরণ্যের পশ্চাতে যে পার্বত্যটিলা রহিয়াছে তাহারই এক নিভৃত গুহায় বসিয়া দূরাত্মা জগন্ধর সাধনা করিত।
আশ্চর্য!
ঋষি সত্যবর্মন-এর অভিশাপে জগন্ধর ডাকিনীবিদ্যায় সিদ্ধি লাভ করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। জগন্ধর এখন মূর্তিমান ডাকিনী হইয়া উঠিয়াছে। সে স্ত্রীলোকের মূর্তি ধরিয়া তরুণ যুবকের রক্ত পান। স্ত্রীলোকের মূর্তি করিতে জগন্ধর তোমার স্ত্রীর উপর ভর করিয়াছে।
আমি শিউরে উঠলাম। মনে পড়ল আজ জ্বরথেকে উঠে রামুর দিকে অদ্ভূত দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল পিয়ালী। তারপর রান্নাঘরে রামুর রক্ত খাচ্ছিল।
গুহামুখে ঝড় আর বজ্রপাতের শব্দ ততক্ষণে থেমে গেছে। এবার ক্রদ্ধ বাঘের রাগী গর্জন শোনা গেল। মঙ্গল ভট্টারক সেদিকে একবার তাকালেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। মঙ্গল ভট্টারক আমাকে অভিভূত করে চোখের নিমিষে জটাধারী শিবমূতি ধারণ করলেন। ডানহাতে চকচকে ত্রিশূল। বিদ্যুৎগতিতে ‘রে’ ‘রে’ শব্দে ভয়ঙ্কর চিৎকার করে ত্রিশূল উঁচিয়ে গুহামুখের দিকে ছুটে গেলেন মঙ্গল ভট্টারক । আমিও পিছন পিছন ছুটলাম। গুহামুখে ঝলমলে রোদ। সেই রোদের আলোয় একটা বিশালকায় ডোরাকাটা প্রাণি দেখতে পেলাম । অনেকটা বাঘের মতন দেখতে। তবে আকারে অনেক বড়। প্রায় হাতির সমান। প্রাণিটা মঙ্গল ভট্টারক- এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু তার আগেই ক্ষিপ্র গতিদে প্রাণিটাকে লক্ষ করে সুতীক্ষ্ম ত্রিশূল ছুঁড়ে মারলেন মঙ্গল ভট্টারক। ত্রিশূল হলদে ডোরাকাটা প্রাণির দেহে বিদ্ধ হল। মর্মদন্ত চিৎকারে গুহা কেঁপে উঠল। কেঁপে উঠল বনভূমি। প্রাণিটা সশব্দে আছড়ে পড়ল। তারপরই চারধার ঘন ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমি কটূ গন্ধ পেলাম । একটু পর ধোয়া সরে গেলেমঙ্গল ভট্টারক কিংবা কোনও বিশালকায় ডোরাকাটা প্রাণির প্রাণহীন দেহ দেখতে পেলাম না।
দ্রুত জঙ্গলবাড়িতে ফিরে এলাম। রামুর লাশটা তখনও একতলার রান্নাঘরে পড়েছিল। আমার কান্না পেল। কিন্তু, পিয়ালী কে পেলাম না।বুকটা ভীষণ কাঁপছে। দ্রুত দোতলায়উঠে এলাম। পিয়ালী বিছানার ওপর শুয়ে ছিল। ভঙিটা বিধস্ত। যেন অনেক ঝড় বয়ে গেছে। শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। শ্যামলা মুখটা কেমন ফ্যাকাশে। ফিসফিস করে বলল, আমার কি হয়েছে?
ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, কিছু হয়নি।
পিয়ালীর চিকিৎসা দরকার। দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। তারপর আমি আর পিয়ালী নীচে নেমে এলাম। অরুকে দেখলাম সদর দরজার কাছে ।
রুস্তমের পিঠে চড়ে থানচি রওনা হলাম। থানচি পৌছে রামুর লাশ সৎকারের জন্য অরুকে টাকা দেব। আজ রাতটা থানচির রেস্টহাউজে থাকব। কাল সকালে বান্দারবানের বাস ধরব।
এই জীবনে আর জঙ্গলমুখো হচ্ছি না।
টেকনাফ শহরে বাপদাদার ভিটেয় পিয়ালীকে নিয়ে সুখের ঘর বাঁধব

সমাপ্ত

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [৩য় অংশ]

0

জঙ্গলবাড়ি পৌছতে-পৌছতে আমার নববধূকে দূর্গমপথের যে ধকল সইতে হল তা জঙ্গলের আদিম সৌন্দর্য দেখে পুষিয়ে নিল মনে হয়।মুগ্ধ হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। জঙ্গলবাড়ি দেখেও পিয়ালী মুগ্ধ হল।আমিও পিয়ালীর স্নিগ্ধ-মধুর সান্নিধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম।তাছাড়া পিয়ালীর রান্নার হাত চমৎকার। ঠিক আমার মায়ের হাতের রান্নার মত।স্থানীয় আদিবাসী রান্না আমার ভালো লাগে।তবে সব সময় না। রামুর রান্নায় রয়েছে আদিবাসী ছেঁওয়া। তা ছাড়া পিয়ালী ফল-ফুল গাছ পছন্দ করে।নাগেশ্বর গাছের ফুল দিয়ে মিষ্টি পারফিউম তৈরি করে আমায় তাক লাগিয়ে দিল। তবে পিয়ালী কথা কম বলে।অবশ্য হাতির পিঠে চড়ে বেড়ানোর সময় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
যেমনটা আশঙ্কা করেছিলাম। সেটা অমূলক করে দিয়ে রামুর সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে নিল পিয়ালী। এই সমঝোতার ভিত্তি হয়ে উঠল রান্না। পিয়ালী রামুর কাছে আদিবাসী রান্না শিখছে, আর রামু পিয়ালীর কাছে শিখছে বাঙালি রান্না ।নির্জন অরণ্যে আমার সংসার গভীর সুখশান্তিতে ভরে উঠেছে। এই অভাবনীয় সুখশান্তির জন্য সর্বশক্তিমানের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা জানালাম।তবে সে সুখ যেন মঙ্গল ভট্টারক- এর অশুভ ভবিষ্যৎবাণী সত্য করে দিতেই বেশি দিন রইল না।
একদিন সকালবেলা। দোতলার পিছনের দিকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।ভাদ্র মাস। আকাশের রং গভীর নীল।শুভ্র মেঘখন্ড ভেসে বেড়াচ্ছিল।নীল আকাশের নীচে বনতলে শরতের ঝরঝরে সাদা রোদ ছড়িয়ে ছিল। কাঞ্জল গাছে ফুল ফুটেছে। কাঞ্জল ফুলের রং হলদে সবুজ। মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম। ছাঁচি বেতে জঙ্গলটা রোদের বন্যায় ভেসে যাচ্ছিল। বিসোয়াল ঝোঁপের ওপর উড়ে এসে বসল একটা সবজে ধূসর রঙের পাহাড়ি তিতির। লতানে বিসোয়াল ঝোঁপের পাশেই একটা চিকড়াসী গাছে। তার তলায় রুস্তম দাঁড়িয়ে। চিকড়াসী গাছের পাশেই অরু-র চালাঘর।
পায়েলী আমার পাশে এসে দাঁড়াল। নীল রঙের শাড়ি পরেছিল। সাদা ব্লাউজ। গোছল সেরে এসেছে।ছড়ানো চুল ভিজে। লাক্স সাবানের গন্ধ পাচ্ছিলাম। পায়েলীকে কি সুন্দর যে লাগছিল। সাধারণ এই সময়ে আমি পিয়ালীর চুলে মুখ গুঁজে গন্ধ নিই। আজ ওর ভিজে চুলের গন্ধ নিতে যাব- হাত তুলে রোদ ঝলমলে ছাঁচি বেতে জঙ্গলটা দেখিয়ে পিয়ালী বলল, ওই জায়গাটা ভালো না।
আমি অবাক হলাম। বিস্ময়ের ধাক্কায়কাটিয়ে উঠে বললাম, জায়গাটা ভালো না মানে?
রুক্ষ কন্ঠে পিয়ালী বলল, আমি অত মানে-টানে জানি না। আমার মনে হয় তাই বললাম। আশ্চর্য! পিয়ালীর এত মধুর স্বভাব। কখনও মাথাব্যথা হলেও আমার সঙ্গে হেসে কথা বলে। আজকি হল ওর?
যাগ গে। আমার অত ভাবার সময় নেই এখন। জরুরি কাজে আমাকে বাইরে বেরুতে হবে।
তবে আমার যাওয়া হল না। কেননা ক্ষানিক বাদে পিয়ালীর ভীষণ জ্বর এল। জ্বর ধাপে ধাপে বাড়তে লাগল। আমি চিন্তিত হয়ে উঠলাম। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন এইসব বিরান জঙ্গলে অসুখ- বিসুখ হলেই সর্বনাশ। সহজে ডাক্তার-বৈদ্য পাওয়া যায় না। তবে সব সময় হাতের কাছে কিছু জরুরি অষুধ রাখি। রামু -অরুরা দেখিছি অসুস্থ হলে কীসব পাহাড়ি লতাপাতা চিবিয়ে খায়। দিব্যি সেরেও ওঠে। আমার আবার ওসব জঙ্গুলে ট্রিটমেন্টে বিশ্বাস কম।
পিয়ালীকে দুটো প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলাম। ঠিক করলাম বিকেলের মধ্যে জ্বর না সারলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করব। আমি ভারি উদ্বিগ্ন বোধ করলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। রামু পিয়ালীরমাথার কাছে বসে জলপট্টি দিচ্ছে। রামুর মুখ কালো। আমার দেরি অরুও দোতলায় উঠে এসেছে। দরজার কাছে মাটিতে বসে আছে।
আশ্চর্য! ঘন্টা খানেকের মধ্যে পিয়ালীর জ্বর একেবারে সেরে গেল। তবে পিয়ালীর কথাবার্তা আর আচরণ কেমন বদলে গেছে বলে মনে হল। চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। ভাবলাম জ্বরের জন্য এমন উদভ্রান্ত দেখাচ্ছে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। রামুর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিল পিয়ালী। এই তাকানোটা আমার কাছে অসহ্য ঠেকল । আজ আমার এক উর্ধ্বতন ফরেষ্ট অফিসারের সঙ্গে জরুরি মিটিং ছিল।পিয়ালীকে রামুর জিম্মায় রেখে নীচে নেমে এলাম।
মিটিং সেরে জঙ্গলবাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়াল।
দূর থেকে দেখলাম সদর দরজা হা করে খোলা। কি ব্যাপার? হাতির পিঠ থেকে নামার সময় রামুর ওপর রাগ হল আমার। কতবার ওকে বলেছি সদর দরজা বন্ধ রাখতে। নইলে বুনো শুয়োর ঢুকে পড়তে পারে। সময় কাটানোর জন্য শখ করে শশা আর কলাচাষ শুরু করেছি। বুনো শুয়োরের দল মিছেমিছিশশা আর কলার চারাগুলো উপড়ে ফেলবে।
অরু আমায় সদর দরজার কাছে নামিয়ে দিল। তারপর রুস্তমকে গোছল করাতে ঝর্নার দিকে চলে গেল ।
পিয়ালীর আবার জ্বর আসেনি তে। ভাবতে ভাবতে আমি চাতাল পেরিয়ে একতলার বারান্দায় উঠে এলাম। বারান্দার ওপাশে ঘরটাই অফিসঘর। অফিসঘরে একটা সিন্ধুক, আলমারী আর চেয়ার- টেবিল আছে। অফিসঘর পেরোলে ছোট একটা করিডোর। করিডোরের শেষ মাথায় সিঁড়ি। সিঁড়ির বাঁ পাশে রান্নাঘর। রামুর এখন রান্নাঘরেই থাকার কথা।
রান্নাঘরে ঢুকতে যাব-সামলে নিলাম। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভয়ানক চমকে উঠলাম। রান্নাঘরের বড় জানালা দিয়ে রোদ ঢুকেছে । মেঝের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে রামু । পিয়ালী রামুর ঘাড়ের কাছে উবু হয়ে বসে আছে। আমার মাথায়রক্ত চড়ে গেল। এ কী! পিয়ালী রামুর ঘাড়ের কাছে উবু হয়ে বসে কি করছে? পিয়ালী কি করছে প্রথমে বুঝতে পারি নি।বুঝতে পারার পর আমার মাথা বো করে চক্কর দিয়ে উঠল। আমি ভীষণ শিউরে উঠলাম।কিন্তু … কিন্তু পিয়ালী … রামুর ঘাড় কামড়ে আছে কেন?রক্ত খাচ্ছে কি? তাই তো মনে হল।কিন্তু …কিন্তু পিয়ালী রামুর রক্ত খাচ্ছে কেন?কিছুই তো বুঝতে পারছি না।ভাবতেও পারছি না।পিয়ালী হঠাৎ মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল।ওর ঠোটের কিনার থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছিল। চোখের দৃষ্টিতে আদিম হিংস্রতা। কাঁধের দু’পাশে চুল অবিন্যস্ত। আমাকে দেখে পিয়ালী হাসল। কী কুৎসিত হাসি!আমার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল।যেন জঙ্গলবাড়িতে ভূমিকম্প হচ্ছে।
অবচেতন মনে টের পেলাম আমার পালানো উচিত।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। করিডোরে দৌড়াচ্ছি।পা দুটো অবশ মনে হল।মাথার ভিতরে শীতল হিমস্রোত বইছে।পিছনে মনে হল পিছনে কিছু ভয়ঙ্কর শব্দে বিস্ফোরিত হল।রান্নাঘরের দরজা ভেঙে গেছে মনে হল।অবশ্য আমিপিছনে ফিরে তাকালাম না। যে করেই হোক মঙ্গল ভট্টারক এর গুহায় পৌছতে হবে।কিন্তু … কিন্তু তিনি কি এখনও গুহায় আছেন ?

চলবে

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [২য় অংশ]

0

 

এই সময়ে মন্দিরের জলসমূহ রক্তবর্ণ ধারণ করিতে দেখাযায়।
হুমম।কামাখ্যা মন্দির বেশ রহস্যময় আর বিচিত্র স্থান বলেই তো মনে হচ্ছে। আমি মনে মনে ভাবলাম। এই ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠলাম মঙ্গল ভট্টারক না-আবার আমার মনের কথা পড়ে ফেলেন। হাজার হলেও সিদ্ধযোগী। চারিদিকে একবার আমতা- আমতা করে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললাম, সারা জীবন আপনি এত যে কষ্ঠ করলেন। কিন্তু আপনি কি কোনও ধরণের অলৌকিক শক্তি হাসিল … মানে… অর্জন করেছেন?
মঙ্গল ভট্টারক মৃদু হাসলেন। তারপর হাসি থামিয়ে খানিকটা পরিহাসের স্বরে বললেন, আমি দিব্যশক্তি অর্জন করিয়াছি কিনা তাহা তুমি সময় হইলেই টের পাইবে বৎস।
মানে? এই মুহূর্তে আমার মুখটা নিশ্চয় বেকুবের মতন দেখাচ্ছে।
মঙ্গল ভট্টারক অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে বললেন, জঙ্গলবাড়িতে অত্যন্ত সাবধানে থাকিবে বৎস।
আমি চমকে উঠলাম।মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, ক্য ক্য কেন … কেন আমাকে সাবধানে থাকতে বলছেন?
মঙ্গল ভট্টারক বললেন, তুমি যে জঙ্গলবাড়িতে বাস কর তাহা অভিশপ্ত।
আশ্চর্য! আমি যে জঙ্গলবাড়িতে থাকি সে খবর মঙ্গল ভট্টারক কী ভাবে জানলেন? অরু বলেছে কি? গতকালতো অরু মঙ্গল ভট্টারক কে দেখেছিল। আমি বললাম, অভিশপ্ত? কই আমি তো কিছু টের পাইনি।
জঙ্গলবাড়ি অভিশপ্ত কি অভিশপ্ত নহে তাহা অবিলম্বেই টের পাইবে বৎস। কথাটা বলে চোখ বুজলেন মঙ্গল ভট্টারক। যেন গভীর ধ্যানে ডুবে গেছেন।
মনের মধ্যে ভীষণ অস্বস্তি টের পাচ্ছি। এখানে বসে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। তাছাড়া এখন এই আসন্ন সন্ধ্যায় গুহায় ঝাঁক ঝাঁক বাদুড় ঢুকবে। তাতে ধ্যানস্থ সন্ন্যাসীর ধ্যানের ব্যঘাত ঘটবে কিনা জানি না-আমি আহত হলেও হতে পারি। একবার চারিদিকে তাকিয়ে উঠেদাঁড়ালাম। তখনই ক্ষীন জলধারা শুনতে পেলাম। কাছেই কোথাও ঝরনা আছে। হাঁটতে-হাঁটতে গুহামুখের কাছে চলে এলাম। ভাবলাম আজ এখানে না এলেই বুঝি ভালো হত। প্রতিটি মানুষই জানে যে তার চলার পথে বিপদ-আপদ ওত পেতে থাকে। কিন্তু ওতপেতে থাকা বিপদটা কেউ নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দিলে অস্বস্তি তো হবেই।
যখন জঙ্গলবাড়ি ফিরে এলাম তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে উঠেছে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ছোট জায়গা । শক্ত গামার কাঠের তৈরি সদর দরজাটি বেশ বড়। গেটের পাশে বিশাল একটা শিল কড়ই গাছ। ভিতরে ঢুকলে দু’পাশে কাঠের স্তূপ চোখে পড়বে; ডান পাশে কাঁটাতারের ওধারে চোখে পড়বে চাপালিশ, শমী আর বনকাপাস গাছের ঘন জঙ্গল; চোখে পড়বে লালচে কামদেব কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট দোতলা বাড়ি। দোতলায় ছোট একটি বারান্দা। বারান্দার দু’পাশে নীচ থেকে মাটি ফুঁড়ে উঠে গেছে শ্যামলতা, অনন্ত কান্তা ও মিঠাবিষ লতা । বাড়ির পিছনে ছাঁচি বেতের ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের পিছনে বেশ বড় একটি টিলা। টিলায় গুহাও আছে।
মাস দুয়েক হল আমি এই জঙ্গলবাড়িতে এসেছি । আগে থাকতাম থানচির কাছাকাছি একটা টংঘরে। ওখানেই আমার কাঠের আড়ত। আমার বাবা শেষ জীবনে কাঠের ব্যবসায় নেমেছিলেন। মৃত্যুর আগে ব্যবসা আমাকে বুঝিয়েদেন। ব্যবসায় নামার আগে আমি কক্সবাজার শহরে লেখাপড়া করতাম।
তো, হাজারও সমস্য সত্ত্বেও ব্যবসা ভালোই চলছে। বছর দুয়েক আগে ড্রাইভারসহ (মাহুত) একটা সেকেন্ড হ্যান্ড হাতিও কিনেছি। হাতি নাম: রুস্তম। মাহুতের নাম অরু। অরুই তো গতকাল রুস্তমকে ঝরনায় গোছল করাতে গিয়ে মঙ্গল ভট্টারক কে দেখল। অরু বেশ বিশ্বস্ত। অরুর গায়ের রং তামাটে।তবে বয়স বোঝা যায় না। অরুরা নাকি বংশানুক্রমিকভাবে মাহুতের কাজ করে আসছে।
তবে এই নির্জন জঙ্গুলে পরিবেশে আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী অরু নয়। রামু। একুশ/বাইশ বছর বয়েসি এই স্থানীয় ছেলেটি আমার ভীষণ ভক্ত। রামুই জঙ্গলবাড়ি দেখাশোনা করে। রান্নাবান্নাও রামুই করে। রামু বেশ হাসিখুশি ছেলে। হলদে মঙ্গোলয়েড মুখে সারাক্ষণ হাসি লেগেই আছে। ভারি ঝকঝকে দাঁত। রামু রোজ দু-বেলা কাঞ্জল গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মাজে। এটাই রামুর ঝকঝকে দাঁতের রহস্য কিনা কে জানে।
আমরা বাড়ি টেকনাফ শহরে । টেকনাফ শহরে আমাদের বেশ কিছু পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে। সেসবের দেখাশোনা করতেই মাঝে-মাঝে আমাকে বান্দরবান থেকে টেকনাফ যেতে হয়। আমার মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। ছোটএক বোন ছিল। আফরোজার শ্বশুরবাড়ি কক্সবাজার শহরে । ছোটবোন সুখেই ঘরসংসার করছে। বলতে গেলে আমার কোনও পিছুটানই নেই । তার ওপর আমারআবার ভবঘুরে স্বভাব। জঙ্গলে ভালোনা লাগলে আবার হয়তো টেকনাফ শহরেই ফিরে আসব।
বহুদিন পর বাড়ি গেলাম।
মাজেদা ফুপু আমায় ফোন করে ডেকে পাঠালেন। মাজেদা ফুপু বাবার চাচাতো বোন। থাকেন টেকনাফ শহরের পুরনো বার্মিজ মার্কেটের কাছে। মাজেদা ফুপু বিধবা। তবে বেশ ধনী। আফজাল ফুপার চিংড়ির ব্যবসা ছিল। কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে বাসও ছিল।আরাকানের সঙ্গেও নাকি কী সব গোপন ব্যবসাও ছিল শোনা যায়।
আমার নাম কামরুল হলেও মাজেদা ফুপু আমাকে ছেলেবেলা থেকেই আদর করে ‘তোতা’ নামে ডাকেন। আমাকে দেখেমাজেদা ফুপু বললেন, কি রে তোতা? তুই বিয়ে করবি না? বিয়ের বয়স হল।
আমি কি আর বলব। চুপ করে রইলাম। মাজেদা ফুপু সবই জানেন। ব্যবসার কাজে গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই । তার ওপর মা-বাবা নেই। বিয়ের কথা কে তুলবে? এদিকে আমার বয়সও ত্রিশের কোঠায় ঠেকল। তাই ভাবলাম, জঙ্গলবাড়িতে আমার পাশে একটা উষ্ণ-কোমল আর মমতাময়ী বউ থাকলে মন্দ কি।
পাত্রী মাজেদা ফুপুই ঠিক করে রেখেছেন। পাত্রী মাজেদা ফুপুর ননদের মেয়ে- থাকে উখিয়া। পাত্রীর মা-বাবা নেই। পাত্রীর নাম: পিয়ালী। (কি সুন্দর নাম) উখিয়া গিয়ে পাত্রী দেখে এলাম। গায়ের রং শ্যামলাই বলা যায়। তবে চোখ দুটি এতই গভীর যে আমার হবু বউয়ের মনে হয় না চোখে কাজল লাগানোর দরকার হয়। তবে পিয়ালীকে কিছুটা দুঃখী বলে মনে হল। হয়তো নতুন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মা-বাবার কথা ভাবছে। মনে মনে ভাবলাম আমি আর পিয়ালী যখন রুস্তমের পিঠে চড়ে বনের ভিতরে বেড়াব তখন ওর সব দুঃখ ঘুচে যাবে।
পিয়ালীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল।
আমরা জঙ্গলবাড়িতে ফিরে এলাম।

চলবে

লেখক~ইমন জুবায়ের

জঙ্গলবাড়ির ডাকিনী­ [১ম অংশ]

0

তল্লাবাঁশের ঘনবনের মাঝখান দিয়ে সরু পাহাড়ি পথ। কিছু দূর হাঁটতেই চাকুয়া কড়াই আর নাগেশ্বর গাছের জঙ্গল পড়ল। সে জঙ্গল পেরুতেই চোখে পড়ল বড় একটি টিলা। টিলার পুবপাশে ছোট একটি গুহা। অরু গতকাল বিকেলে আমাকে বলল যে ওই গুহার ভিতরে নাকি এক সন্ন্যাসী আস্তানা গেড়েছে। কথাটা শুনে আমি মোটেও অবাক হইনি। বান্দারবানের পূর্ব দিকে বার্মার বর্ডার। সেই বর্ডার পর্যন্ত গহীন জঙ্গল আর ছোট ছোট পাহাড়-টিলার অজানা রাজ্য। যাকে বলে- ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ ; আজও এখানে কত যে সাধুসন্ন্যাসী ঘুরে বেড়াচ্ছে। বছর পাঁচেক হল আমি বান্দরবানে আছি। বছর তিনেক আগে একবার আমি গহীন জঙ্গলের ভিতর সাঙ্গু নদীর তীরে একটা বড় হরিণা গাছে নরমন্ডু ঝুলিয়ে তার তলায় এক তান্ত্রিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে বসে থাকতে দেখেছিলাম।

তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর টিলাটি বান্দরবানের গভীর অরণ্যে আমার যেজঙ্গলবাড়িটি রয়েছে- তার বেশ কাছে। কাজেই হেঁটে যাব বলে হাতির পিঠে চড়িনি। শুকনো পাতা মাড়িয়ে হাঁটছি। শেষ বিকেল। চারিদিকে নরমহলদে আলো ছড়িয়ে আছে। বনের বাতাসে লতাপাতার মাদক- মাদক গন্ধ। তবে এ সময়টায় কাকপাখির চিৎকারে কান পাতা দায়। প্রথম প্রথম জঙ্গলে এসে কাকপাখির চিৎকার যন্ত্রণার মতন লাগত। এখন অবশ্য কর্কস কলতান অনেকটাই সহ্য হয়ে গেছে। বেশ নিশ্চিন্তেই হাঁটছি। অরণ্য-প্রকৃতি আমার ভালো লাগে। নইলে এতটা বছর কীভাবে কাটল এই ঘোর জঙ্গলে?
বাঁ পাশে একটা কামদেব গাছ। সেই গাছ থেকে সরসর শব্দে নেমে এল একটাখয়েরি রঙের বুনো খরগোশ। তারপর চোখের পলকে ওদিকের উলু ঘাসের আড়ালে সুড়ৎ করে লুকালো। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে খসখস শব্দে কি যেনএকটা চলে গেল। ডান পাশে একটা বাঁদলহোলা গাছ। তারই ডালে বসেছিলএকটা ছাই রঙের পাহাড়ি বাজ। চোখে পড়ামাত্রই বাজটা উড়াল দিল। বাদামি রঙের উল্টোলেজি একটা বাঁদর বসে আছে একটা উদাল গাছের ডালে । বাঁদরটা আমায় আমায় চেয়ে চেয়ে দেখছিল। তবে মুখ ভেঙচালো কিনা ঠিক বোঝা গেল না। উল্টোলেজিটাকে তেমন বখাটে মনে হলনা।
শুকনো পাতা মাড়িয়ে গুহার সামনে এলাম । গুহার মুখটি বেশ বড়োসরো। আল্লা-খোদার নাম নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বাতাসে কেমন বিদঘুটে গন্ধভাসছিল; ঠিক গন্ধক কিংবা চুনাপাথরের গন্ধ নয়, কেমন চর্বিপোড়া গন্ধ মনে হল। তান্ত্রিক সাধুসন্ন্যাসীর গুহায়এমন বিদঘুটে গন্ধ অস্বাভাবিক কিছু না। চারপাশে আবছা অন্ধকার জমে ছিল। ওপাশে আলো চোখে পড়ল। ধুনির আগুন জ্বলেছিল। তারই সামনেএকজন মাঝবয়েসি জটাধারী সন্ন্যাসী বসে রয়েছেন। ভঙ্গিটা পরিচিত। বজ্রাসন। সন্ন্যাসী চোখ বুজে ধ্যানস্থ ছিলেন। শীর্ণ শরীরটি হাড্ডিসার। মাথার চুলে এন্তার জটা থাকলেও চুল চুড়া করে বাঁধা। তবে চোখ দুটি শান্তই মনে হল যখন চোখ খুলে সন্ন্যাসী তাকালেন। আমাকে কিছুক্ষণ দেখে সামনে বসতে ইঙ্গিত করলেন। আশ্বস্থ হলাম। কেননা, আমায় দেখে সন্ন্যাসী যদি বিরক্ত হতেন তাহলেআসতাম না বলে ঠিক করেছিলাম।
সন্ন্যাসীর সামনে বসলাম।
আমি আর কী বলব। একটু পর সন্ন্যাসীই নিরবতা ভাঙলেন। জানালেন সন্ন্যাসীর নাম- মঙ্গল ভট্টারক। এমন কাটখোট্টা নাম শুনেঅবশ্য অবাক হলাম না। কাপালিক-সন্ন্যাসীগণের নাম এমনই গুরুগম্ভীর হওয়া উচিত। কিন্তু, মঙ্গল ভট্টারক কি কাপালিক? তান্ত্রিক এবং কাপালিকের মধ্যে ঠিক কি পার্থক- আমি সেটি জানি না।
তবে মজার ব্যাপার হল মঙ্গল ভট্টারক কথা বলেন সাধু ভাষায় । আদিবাড়ি সিলেটের জৈন্তারপুরে । (মঙ্গল ভট্টারক পিতৃ প্রদত্ত নামটি অবশ্য বললেন না …) হৃদয়ে বাল্যবয়েস থেকেই চৈতন্যময়ী সত্তার স্বরূপ জানার উদগ্র ইচ্ছা। সুতরাং কিশোর বয়েসে তন্ত্রসাধনার উদ্দেশে আসামের কামরূপ জেলার কামাখ্যা মন্দিরে গমন করেন। কামাখ্যা মন্দিরে সুদীর্ঘ তিরিশ বছর তন্ত্রবিদ্যায় দীক্ষা নিয়েছেন। এখন নির্জন সাধনার উদ্দেশ্যে বান্দরবানের এই দুর্গম অরণ্যে এসেছে।
কথাগুলি শুনে সামান্য উসখুস করি।কারণ সময়টা একুশ শতক। তাই জিজ্ঞেস করলাম, কামাখ্যা মন্দিরেকথা অনেক শুনেছি। তা ওই মন্দির সম্বন্ধে যেসব কথা শুনতে পাই সেসব সত্য নাকি?
মঙ্গল ভট্টারক মাথা দুলিয়ে বললেন, অবশ্যই সত্য। কামাখ্যা মন্দির হইল শক্তিপীঠ।
মনে মনে বললাম, বুঝলাম যে কামাখ্যা মন্দির হল শক্তিপীঠ। কিন্তু তাতে কি প্রমাণ হয় যে কামাখ্যা মন্দির অপ্রাকৃত যাদুবিদ্যারও পীঠস্থান? আমি সন্দেহের সুরে বললাম, কামাখ্যা মন্দিরটা আসামের ঠিক কোথায় বলেন তো?
মঙ্গল ভট্টারক আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী সব দেখতে লাগলেন। আমার অস্বস্তি হতে লাগল। আমি যে সংশয়বাদী তা সম্ভবত তিনি টের পেয়েছেন। আমার চোখের দিকে তাকিয়েমঙ্গল ভট্টারক গম্ভীর কন্ঠে বললেন, শক্তিপীঠ কামাখ্যা মন্দিরহইল প্রাগজ্যোতিষপুরের পশ্চিমে নীলাচল নামক একটি পর্বতের উপরে।
কথাটা মঙ্গল ভট্টারক এমনভাবে বললেন যেন ভারি এক গুপ্তকথা বলেছেন।
তবে মঙ্গল ভট্টারক পুরনো নাম বললেন। ইচ্ছে করেই কিনা কে জানে। প্রাগজ্যোতিষপুর এখন গোহাটি শহর। তিনি প্রাগজ্যোতিষপুর না বলে গোহাটিও বলতে পারতেন। তাতে অবশ্য তন্ত্রবিদ্যার মাহাত্ম ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা ষোলআনা।
জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক কি আছে কামাখ্যা মন্দিরে?
মঙ্গল ভট্টারক এবার খানিকটা প্রগলভ হয়ে উঠলেন যেন। প্রসন্ন কন্ঠে বললেন, শক্তির পীঠস্থানে রহিয়াছে দেবী কামাখ্যার সুপ্রাচীন প্রতিমা। বড় জাগ্রত দেবী কামাখ্যা । তিনখানা প্রাচীনপ্রকোষ্ঠ লইয়া মন্দির গঠিত হইয়াছে। পশ্চিমের আয়তক্ষেত্রকারপ্রকোষ্ঠখানাই বৃহদাকার। সাধারনপূণ্যার্থীগণ পশ্চিমের এই বৃহদাকার প্রকোষ্ঠখানায় বসিয়া দেবী উপাসনা করিয়া থাকে। মধ্যবর্তী প্রকোষ্ঠখানা আকারে চতুস্কোন। ইহাতে শক্তিদেবীর ছোট্ট একখানা প্রতিমা রহিয়াছে। দেওয়ালের পাষানে নারায়ণের এবং অন্যান্য দেব-দেবীর প্রস্তর-চিত্রাবলী অঙ্কিত রহিয়াছে। মধ্যবর্তী প্রকোষ্ঠটিই কামাখ্যাশক্তিপীঠের অতিশয় পবিত্রতম স্থান। প্রকৃতপক্ষে এই পবিত্রতম স্থানটি একটি ভূগর্ভস্থ গুহা। ইহাতে যোনিসদৃশ্য একখানি প্রস্তরখন্ড হইতে প্রবাহিত হইতেছে ঝরনাধারা। প্রত্যেক বৎসর গ্রীষ্মে শক্তিপীঠে অম্বুবাচী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সেই অম্বুবাচীউৎসবে দেবী কামাখ্যার ঋতু উদযাপিত হয়।

চলবে

লেখক~ইমন জুবায়ের