শবসাধকের কাল্ট – ১ম পর্ব

0

জ্যোস্নার আবছা আলোয় দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক (নাকি শব?) বেরিয়ে এল। আশ্চর্য! কে লোকটা? এতরাতে কি করছিল মর্গে?এখন প্রায় শেষরাত। জানলার পাশে এসে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম। অনেক দূরে কুকুর ডাকছিল। হঠাৎ মর্গের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। ভালো করে লোকটাকে দেখাও গেল না। চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল কলাঝোপের আড়ালে। চোখের ভুল? লাশকাটা ঘরটা অবশ্য বেশ দূরে। চারতলা সরকারি কোয়ার্টারের জানালার পাশ থেকে দেখছি। রাতজাগার ফলে হয়তো আমি চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখছি। বছর খানেক ধরে ইনসমনিয়ায় ভুগছি। রাতে ভালো ঘুমও হয় না। বই পড়ে, মুভি দেখে, ঘরে পায়চারী করে কিংবা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে, সিগারেট টেনে রাত কাটে। আবছা অন্ধকারে টেবিলের কাছে এলাম। এলজিটা তুলে দেখলাম: দুটো বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট। ইশতিয়াক বিছানার ওপর হাত পা ছড়িয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে। ঘরে বেনসনের গন্ধ ভাসছিল। শালা চেইন স্মোকার। আজই ঢাকা থেকে এসেছে। কালই চলে যাবে। ইশতিয়াক আমার ছেলেবেলার বন্ধু। চারুকলা থেকে পাস করেছে। খুবই আমুদে আর অস্থির। চাকরি- বাকরিতে মন বসে না। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। মুভি পাগল। আমার জন্য ৬/৭টা ডিভিডি এনেছে। আজ রাত জেগে ল্যাপটপে একটা মুভি দেখছিলাম। নেকক্রোমানটি। পুরনো দিনের জার্মান হরর ছবি।শসম্ভোগ বা নেক্রোফিলিয়ার ব্যাপারটার জন্য ছবিটা বিতর্কিত। যদিও‘কাল্ট ফিলিম’- এর মর্যাদা পেয়েছে নেকক্রোমানটি। আমি নির্জনতাপ্রিয় মুখচোরা মানুষ। ডাক্তারি করি জেলা সদরে সরকারি হাসপাতালে। নির্জন এই শহরটাও আমার বেশ ভালো লেগে। বড়োখেবড়ো হলেও ছিমছাম নির্জন পথঘাট। ঘুমন্ত দোকানপাট, ঘরবাড়ি। লাল রঙের নিঝঝুম রেলস্টেশন। শীতল সর্পিল রেললাইন। হলুদ-হলুদ সরকারি কোয়ার্টারস। প্রাচীন মন্দির। অ-দূষিত বাতাস।…মর্গটা আমার কোয়ার্টারের পিছনেই। হাসপাতালে আসতে যেতে চোখে পড়ে। একতলা হলুদ দালান। সামনে বড় সিমেন্ট বাঁধানো একটি চাতাল। চারপাশে ঘন গাছপালা। পচা পাতাভরা পুকুর। শ্যাওলাধরা দেয়াল। নাড়িকেল গাছ। তারপর রেললাইন। নিরিবিলি এই মফস্বল শহরে দিনগুলি বেশ কেটে যাচ্ছে। রোজ দু’বেলা হাসপাতালে যাই, রোগী দেখি। ধৈর্যশীল চিকিৎসক হিসেবে সামান্য নামও ছড়িয়েছে। স্থানীয় লোকজন শ্রদ্ধভক্তি করে। মাঝেমধ্যে ইশতিয়াক-এর মতন দু- একজন বন্ধুও আসে বেড়াতে। দু- একদিন থেকে চলে যায়। আমার একজন পিয়ন আছে। নাম মুখতার। মধ্যবয়েসি লোক। মিশমিশে কালো থলথলে শরীর। মুখতারকে শার্ট- প্যান্টে একেবারেই মানায় না। মাথাটা মুড়িয়ে রাখে। মাথার তালুও কালো। সেই কালো তালুর মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল। কানে ছোট্ট একটা পিতলের রিং। মুখতার সন্ন্যাস নিয়েছে কিনা বোঝা গেল না। কথা কম বলে। তবে কথাবার্তায় অনেকবারই অসংলগ্নতা টের পেয়েছি। তবে মুখতার-এর রান্নার হাত ভালো। আর বেশ বিশ্বস্ত। রাতে অবশ্য চোখ লাল থাকে তার । নেশাটেশা করে মনে হল। বাজার সদাই মুখতারই করে। মাছমাংস খায় না দেখি। মুখতার মনে হয় গৃহীসন্ন্যাসী। সকালবেলা ইশতিয়াক কে বিদায় দিতে রেলস্টেশনে এসেছি। ইশতিয়াক বেশ রোম্যান্টিক জীবন কাটাচ্ছে। ট্রেন পেলে বাসে চড়বে না। ওকে ট্রেনে তুলে দিয়ে রেলস্টেশন বাইরে চলে এসেছি। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। দেখলাম একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে জিন্নাত আলী দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখেই সালাম দিল। লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সে। থাকে পিছনের রেলওয়ে কলোনিতে । জিন্নাত আলী বিপত্নীক। একটি মেয়ে বাবার সংসারে থাকে । মধ্যবয়েসি মেয়ের নাম মুমতাজ। মুমতাজ রক্তশূন্যতায় ভুগছিল। মাস কয়েক আগে অবস্থা কাহিল হলে ওরই ট্রিটমেন্ট করতে গিয়েছিলাম। আমি সাধারণত স্থানীয় গরিব লোকদের কাছ থেকে ফি- টি নিইনা। জিন্নাত আলী সেটা মন
ে রেখেছে। মাঝেমধ্যে দেখা হলে সালাম দেয়। জিন্নাত আলী বলল, রিকশা নিবেন স্যার? ডাইকা দিমু? না, না। আমি হেঁটেই যাব। বিসটি ছার। অসুবিধে নেই। বলে হাঁটতে থাকি। স্টেশন থেকে আমার কোয়ার্টারটা কাছেই। বড় রাস্তায় খানিক হেঁটে বাঁয়ে মোড় নিলে কালিবাড়ির গলি। সে গলি পেরিয়ে মর্গের পিছন দিয়ে মিনিট দশকের পথ । কালিবাড়ির গলিটা বেশ সরু। গলিতে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ঝিরঝির বৃষ্টিটা থেমে রোদ উঠল। গলির বাঁ পাশে একটা কালো রঙের লোহার গেইটের সামনে দেখলাম গফুর আসকারী সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোক আমার মোটামুটি পরিচিত। ধ্যাপক। এখন অবশ্য রিটায়ার করেছেন। লোকটা বেশ অদ্ভূত। বয়স ষাটের কাছাকাছি।মাথায় টাক-টাক নেই; একমাথা ধবধবে চুল। চোখে পুরু লেন্সের কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচ বেশ ধূসর। বৃদ্ধ বেশ লম্বা আর ফরসা। স্বাস্থও ভালো। তবে মুখ কেমন ফ্যাকাশে। অ্যানিমিক মনে হয়। ভদ্রলোক আমাকে দেখে কেন যেন গেইটের ভিতরে ঢুকে যেতে চাইলেন। তার আগেই আমি সালাম দিয়ে বললাম, কেমন আছেন? গফুর আসকারী মুহূর্তেই ভোল পালটে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললেন, আরে ইয়াংম্যান যে। খবর কী? ভালো । বললাম। বলে হাসলাম। গফুর আসকারী গেইটটা খুলে বললেন, এসো এসো। বাসায় এসো। এক কাপ চা খেয়ে যও। গেইটের ওধারে ছোট্ট শ্রীহীন বাগান। বাগান মানে পেঁপে, শুপারি আর এঁটে কলার অযত্ন লালিত ঝোপ। গফুর আসকারী বিপত্নীক এবং নিঃসন্তান। দেখাশোনার জন্য আবদুর রহমান নামে একটা লোক আছে। মাস ঝয়েক আগে তারই অসুখ হয়েছিল। আমিই তখন টিট্রমেন্ট করেছিলাম। তখনই গফুর আসকারীর সঙ্গে পরিচয়। কলাঝোপের মাঝখান দিয়ে সরু পথ। তারপর একতলা লালটালির ছাদের বাংলোবাড়ি। ছোট্ট লাল মেঝের বারান্দা। বসার ঘরে সোফা কিংবা আসবাবপত্রের বদলে শ্রীহীন কাঠের তিনটে চেয়ার আর চার- পাঁচটা আলমারী। আলমারী ভর্তি বাংলা- ইংরেজি বই। গফুর আসকারী অধ্যাপনা করেছেন দর্শনশাস্ত্রে । বইয়ের এরকম কালেকশন থাকাই স্বাভাবিক। গফুর আসকারী বললেন, তুমি ঐ চেয়ারে বস। আমি একটা চেয়ারে বসতে যাব গফুর আসকারী বললেন, না, না। ডানপাশেরটায় বস । হ্যাঁ। ঠিক আছে। বস। আমি চা করে আনি। হাসি চেপে বৃদ্ধের দেখিয়ে দেওয়া চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম, চা আপনি বানাবেন? কেন?আবদুর রহমান কি বাসায় নাই? বৃদ্ধ বললেন, আর বলো না ডাক্তার। দেশে যাব বলে দু’দিনের ছুটি নিয়ে ছেলেটা সেই যে গেল। প্রায় দু সপ্তাহ হল-এখনও ফিরে এল না। দেখ দেকি কী কান্ড। বৃদ্ধের ফরসা মুখে অবশ্য বিরক্তির কোনও চিহ্ন দেখতে পেলাম না। ফিরে এল না? আশ্চর্য! কেন? কি ভাবে বলি বল? যাক, সে ছেলে চুলায় যাক। তুমি বস। চলে যেও না। আমি এখুনি চা তৈরি করে নিয়ে আসি। বৃদ্ধ ভিতরে চলে গেলেন। বসার ঘরে ঢুকেই কেমন পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম। ইঁদুর বিড়াল মরে পচে গেলে যে রকম গন্ধ ছড়ায়। ঠিক সেই রকম। গন্ধের উৎস বোঝা গেল না। বাগানে কিছু মরে পড়ে থাকতে পারে। বুড়োর খেয়াল নেই। ছন্নছাড়া লোকের ছন্নছাড়া সংসার। বইয়ের আলমারীতে একটা বইয়ের ওপর চোখ আটকে গেল। গ্যাবরিয়েলি উইটকপ-এর দি নেকক্রোফিলিয়াক ; একেই বলে কোইন্সিডেন্স। গতরাত্রেই নেকক্রোমানটি ছবিটা দেখছিলাম। শবদেহের প্রতি এক ধরনের যৌন আকর্ষনকে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় বলা হয়নেকক্রোফিলিয়া । এই যৌন আকর্ষনকে আমেরিকান সাইক্রিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন- এর ডাগায়নোস্টিক অ্যান্ড স্ট্রাটেস্টিটিকাল ম্যানুয়ালপ্যারাফিলিয়া বর্গের অন্তর্ভূক্ত করেছে। প্যারাফিলিয়া শব্দটি গ্রিক । এর অর্থ প্রেম। তবে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় শব্দটির মানে স্বাভাবিক উপায়ের বদলে অস্বাভাবিক বিষয়ে বা পরিস্থিতিতে যৌনবোধ জাগ্রত হওয়া। এতে ব্যক্তির আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে । মনে পড়ল কাল অনেক রাতে দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল।শবদেহের প্রতি এক ধরনের য
ৌন আকর্ষনকে বয়োমেডিক্যাল পরিভাষায় বলা হয় নেকক্রোফিলিয়া । কেউ লাশকাটা ঘরে ওই কাজটা করে না তো? অবশ্য এমনটা ভাবার কোনওই কারণ নেই। গফুর আসকারী এক কাপ চা নিয়ে ফিরলেন। কাপ নিতে বললাম, আপনার চা কই? লাজুককন্ঠে বৃদ্ধ বললেন, চা আমি রান্নাঘরে বসেই খেয়ে এসেছি। বলেই ধপ করে কাঠের চেয়ারের ওপর বসলেন। অরেকটু হলেই উলটে পড়তেন। আগেই লক্ষ্য করেছি গফুর আসকারী বেশ মজার মানুষ । লেবু চা । চুমুক দিয়ে বোঝা গেল চিনির বদলে গুড় দিয়েছেন। আরও বোঝা গেল দর্শনের এই অধ্যাপকটি বেশ উদ্ভট আর উৎকেন্দ্রীক মানুষ। বৃদ্ধকে দেখে বরাবারই আমার বেশ খানিকটা খাপছাড়া আর উদভ্রান্ত মনে হয়েছে। চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, কাল রাত্রে অদ্ভূত এক দৃশ্য দেখলাম। কি বল তো শুনি? বৃদ্ধ ঝুঁকে পড়লেন। দেখলাম মর্গের দরজা খুলে একটা লোক বেরিয়ে এল।তখন অনেক রাত। এই ধরুন শেষ রাত। হুমম। তো? গফুর আসকারী সাহেব স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। চশমার কাঁচে কুয়াশা জমে আছে। বড় বড় দুটি কর্নিয়া দেখা যায়। তবে কাঁচ এত ঘোলা হওয়ায় তিনি দেখছেন কীভাবে তা ঠিক ভেবে পেলাম না। বললাম, না, মানে… নেক্রোফিলিয়াক কেউ হতে পারে কি? এই নিয়ে তো আপনি বেশ পড়াশোনা করেছেন দেখলাম। বলে চায়ে চুমুক দিলাম। গফুর আসকারী যতই পাগলাটে লোক হোক, চায়ের স্বাদ দারুন হয়েছে। যাওয়ার সময় রেসিপিটা জেনে নিতে হবে। বৃদ্ধ বললেন, হুমম হতে পারে। তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমন প্রবণতা অতি সাধারণ মানুষের ভিতরেও সুপ্ত থাকতে পারে। শোন একটা ঘটনা বলি। তখন আমি সোহাগপুর কলেজে পড়াই। সেই সময়টায় আমি তন্ত্র, শবসাধনা এসব নিয়ে খুব পড়াশোনা করছিলাম। বয়স কম । জানে সাহস ছিল। রাতবিরেতে শ্মশানে-গোরস্থা নে ঘুরে বেড়াতাম। ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম। আমি আতকে উঠে বললাম, বলেন কী! হ্যাঁ। আমি একটা বিষয়ে আগ্রহ বোধ করলে তার শেষ দেখেই তবে ছাড়ি, বুঝলে। বুঝলাম। তা আপনি শ্মশানে- কবরস্থানে মাঝরাতে ঘাপটি মেরে বসে থাকতেন কেন? বলে ছোট্ট চুমুকে চাটুকু শেষ করে কাপটা সামনের বেতের টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। বৃদ্ধ বললেন, হাতেনাতে শবসাধকদের ধরব বলে। ধরতে পেরেছেন কখনও? আমার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগার। হুমম। একবার ধরেছি। তখন আমি সৈয়দনগর মহিলা কলেজে বদলি হয়েছি। শহরের উপকন্ঠে নদীর ধারে কবরখানা। এক মধ্যরাত্রে একটা বহেড়া গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছি। দেখি গুটিশুটি পায়ে কে যেন এসে কবরের মাটি খুঁড়তে লাগল। গিয়ে জাপটে ধরলাম। কে সে? আবদুর রহমান। আবদুর রহমান! ঠিক আছে, ধরলেন। তারপর? আমার কৌতূহল চরমে উঠেছে। ধরার পর কতক্ষণ চলল ধস্তাধস্তি। আবদুর রহমান-এর বয়স তখন এই আঠারো কি উনিশ। টেনে- হিচঁড়ে ঘরে নিয়ে এলাম। কিছুতেই বলবে না কবরখানায় কেন গিয়েছিল। সে যা হোক। ওকে ধীরে ধীরে থেরাপি দিয়ে সুস্থ করে তুললাম। এখন ও সুস্থ। তবে আবার কেন পালাল ঠিক বুঝতে পারছি না। পালিয়েছে মানে? প্রায়ই তো পালায়। পাজী, নচ্ছাড় ছেলে একটা। বলতে বলতে গফুর আসকারী হাই তুললেন । বললেন, আমার এখন ঘুম পাচ্ছে ডাক্তার। তুমি না হয় চুপটি করে বস। আমি ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিই। না। না। আমি ঘুমান। আমি এখন যাই। পরে সময় করে একদিন আসব। আর একটা কথা। ইয়ে …মানে… আপনি কি বইটই ধার দেন? বই? না,না। আমি ওই কাজটি কক্ষনো করি না। তুমি বরং অন্যকিছু ধার নাও। এই ফুলদানীটা ধার নেবে? ফুলদানী? না থাক। আমি বরং এখন যাই। বই যখন ধার দেন না। তখন গুড় দেওয়া লেবু চায়ের রেসিপিও বলবেন না। বাগান পেরিয়ে গলিতে বেরিয়ে মনে মনে হাসলাম। কিন্তু আমার হাসা উচিত নয়। আমি ডাক্তার। গফুর আসকারী এমনিতে ভালো মানুষ তবে ঐ একটু …। মর্গের পিছন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি। আবদুর রহমান পালিয়ে গেল কেন? সে গোরস্থানে কবর খুঁড়ত? কেন? কথাটা বৃদ্ধ এড়িয়ে গেলেন। কেন? বসার ঘরে পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম
। কেন? গফুর আসকারীর পাগলামী কোনও কারণে চরমে পৌঁছে যায়নি তো? রহস্য ঘনীভূত হয়ে উঠল।রহস্য যখন ঘনীভূত হয়ে উঠলই … তখন কাউকে না কাউকে তো সন্দেহ করতেই হয়।

১ম পর্ব সমাপ্ত

by ইমন জুবায়ের

নকশা – শেষ পর্ব

1

রুমাকে প্রায়ই একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলে ভাবতাম। কিন্তু সে এত অল্প সময়ের জন্য আসত যে আর জিজ্ঞেস করা হত না। একদিন জিজ্ঞেস করে ফেললাম,
-‘আচ্ছা তুই যাদের জন্য চলে গেলি, তাদের কিছু করতে ইচ্ছা হয় না?’
-‘ ইচ্ছা ত হয়। কিন্তু উপায় নাই’
-‘কেন?’
-‘আমরা ত নিজ থেকে কিছু করতে পারি না। সাবজেক্ট কে দিয়ে করাই।’
-‘আমি যদি করি?’
-‘তুই পারবি না। তুই হাবলু’
-‘ না পারব। বল কি করতে হবে’
-‘ না বলব না’
এরপর থেকে রুমার জন্য আমার খুব মায়া হত। আমি ঠিক করলাম রুমার জন্য একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু কিভাবে করব তা কিছুতেই মাথায় আসছিল না। আমাকে যা করতে হবে তা তিনজনের সাথে করতে হবে। তিনজনকে একসাথে পাব কি করে? ভাবতে শুরু করলাম। মাথায় একটা প্ল্যান আসল । কিন্তু সেটা বেশ কঠিন। আমি একদিন হারুন স্যারের বাসায় গেলাম। স্যারের সাথে আমার যোগাযোগ সব সময়ই ছিল। শুনে হয়ত অবাক লাগবে যে আমি জার্মানী থেকে ফিরে আসার পর তিনি তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। স্যারকে বললাম আমাদের গ্রামে একটা ফার্মহাউজ এর ডিজাইন করেছি। কন্সট্রাকশান কাজ দেখতে যদি স্যার দয়া করে আমার সাথে গ্রামে গিয়ে একরাত থাকতেন তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। স্যার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। পরদিন সকালে একটা মাইক্রো বাসে আমি, হারুন স্যার, রশিদ স্যার, মোস্তাক স্যার আর ফিরোজ স্যার আমাদের গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দুপুর নাগাদ কন্সট্রাকশান সাইটে পৌছলাম। দোতলা ফার্মহাউজের সব কলাম আর বিম তোলা শেষ। এখন শুধু পার্টিশান ওয়াল আর ফ্লোর ঢালাই এর কাজ বাকি। সিড়ির ঢালাই তখনও শেষ হয়নি। একজন রাজমিস্ত্রী কে বলা আছে সে যেন সময় মত কাঁচা সিড়ির উপর ভুল করে একটা বালুর বস্তা ফেলে। আমরা পাঁচজন দোতলার সিড়ির নিচে গিয়ে দাড়ালাম। স্যারকে কিছুক্ষন ডিজাইন বোঝানোর পর আমি মোস্তাক স্যারের সাথে সিগারেট খাবার জন্য একটু দূরে যেতেই সিড়িটা তাদের তিনজনের উপর ধসে পড়ল। হারুন স্যারের মাথা থ্যাঁতলে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মারা গেলেন। রশিদ স্যার আর ফিরোজ স্যার হাসপাতাল পর্যন্ত পৌছতে পারলেন কিন্তু বাঁচলেন না। আমার পরিকল্পনা একশভাগ সফল হল। মোস্তাক স্যার কে সময় মত জায়গা থেকে সরাতে পেরেছিলাম, তাই কোন অঘটন ঘটেনি। এর প্রায় তিন বছর পর একদিন সকালে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের দু’জন সদস্য আমার বাসায় এলেন। তাদের সাথে সেই রাজমিস্ত্রীটিও ছিল। সিনথিয়া প্রায়ই আমার কাছ থেকে বিশ্বস্ত আর ভদ্রগোচের মিস্ত্রীদের ঠিকানা চাইত। কারন মহিলা আর্কিটেক্টের কথা নাকি তাঁরা সহজে শুনতে চায় ন। আর তাকে এই মিস্ত্রীটির ঠিকানা দিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছিলাম। রুমার ডিজাইন করা সবচেয়ে বড় নক্শাটি এখন আমার ঘরের আলমাড়িতে পড়ে আছে। নক্শাটি বাস্তবে দেখে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না তা আমি জানতাম। তাই খারাপ লাগছেনা।
তবে আমি এই নক্শাটি এমন কারও হাতে তুলে দিব যেন সে অথবা তাঁর নিকট কোন উত্তরসূরী খুব কম সময়ের মধ্যে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পাতাল পথে চলে যেতে পারে। আমার এমন কাউকে খুঁজ়ে বের করতে হবে যার স্নায়বিক চাপ দূর্বল নয়। সে যেন আমায় দেখে ততটা ভয় না পায় যতটা আমি পেতাম রুমা কে দেখে। আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি একটা প্লাটফর্মের উপর। আমার চারপাশ উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। আমার পরনে সাদা কালো ডোরাকাটা পোশাক। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে, কারন এরকম কালো কাপড়ে ঢাকা তিনজন মানুষকে আমি সরিয়ে ফেলতে পেরেছি, যাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে থাকার কোন অধিকার নেই। রুমা অনেক্ষন ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমিও অধীর আগ্রহে তার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।

সমাপ্ত

-by জোবায়ের বিন ইসলাম

আমার বন্ধু রিয়ান-পর্ব-১

0

রিয়ানকে দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই প্রথম রিয়ান আমাকে না জানিয়ে কোথায় যে ডুব মেরেছে বুঝতে পারছি না। সেবার বাড়ি থেকে পালিয়ে ও যে বান্দরবান গিয়েছিলো তা একমাত্র আমিই জানতাম। আমাদের ক্লাসমেট শান্তা আর সজীবের রিলেশনের ব্যাপারটা ওদের বাসায় জানিয়ে একটা ঝামেলার সৃষ্টি করেছিলো রিয়ান,সেটাও একমাত্র আমিই জানতাম। আর সেই রিয়ান দুদিন ধরে কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় যে গেছে আল্লাহ মালুম। রাগ লাগছে আমার আবার সাথে সাথে দুশ্চিন্তাও হচ্ছে ওর জন্য। কোন ঝামেলায় পড়ে নাই তো ও। আর যদি কোথাও যেয়েই থাকে তাহলে আমাকে বললো না কেন?

কি এমন জরুরী কাজ পড়লো ?? মাঝে মাঝেই রিয়ান এমন হাওয়া হয়ে যায় তাই ওর বাবা মা তেমন দুশ্চিন্তা করছেন না ; কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে কোথাও কোন বড় অঘটন ঘটেছে। ওকে মোবাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। কোন পজেটিভ নিউজ পাবো না জেনেও রিয়ানের আম্মাকে ফোন করলাম।

-অ্যান্টি রিয়ানের কোন খোজ পেলেন?

-না বাবা। জানোই তো ও বরাবরই এমন করে। দেখো ঠিকই ৪-৫দিন পর এসে হাজির হবে।

-জ্বি অ্যান্টি,তাই হবে হ্য়ত। ঠিক আছে রাখি।

অ্যান্টিকে বলতেও পারলাম না যে অন্যবারের মত নিশ্চিত মনে বসে থাকতে পারছি না আমি। কারণ এবার যে রিয়ান আমাকেই কিছু বলে যায় নাই। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছি শেষ কখন,কি কথা বললাম রিয়ানের সাথে। হ্যা মনে পড়েছে,রিয়ান সেদিন রাতে রাস্তা দিয়ে হাটছিলো যথারীতি অন্যান্য দিনের মত। রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা ওর শখ। হাটতে হাটতে আমাকে ফোন করেছিলো,কথা বলছিলাম দুজন।

হঠাৎ রিয়ান “পরে ফোন দিচ্ছি” বলেই কলটা কেটে দিলো। ব্যস এইটুকুই। তারপর থেকেই ওকে ফোনে আর পাওয়া যাচ্ছে না। ধ্যাত কারেন্ট চলে গেলো। মোমবাতি জ্বালিয়ে ড্রইংরুমে এসে বসলাম। আব্বা আম্মা গেছেন ছোটমামার বাসায়। কখন আসবেন ঠিক নেই। ওহ এত গরম লাগছে কেন আমার। এখন তো শীতকাল!! যদিও শীতের মাত্রাটা কম,কিন্তু গরম লাগার কথা না।ভাপসা গরমের সাথে পোড়া পোড়া গন্ধও পাচ্ছি। মনে হচ্ছে বাথটাবে বসে থাকি। দরজায় নক করার আওয়াজে চিন্তায় ছেদ ঘটলো। কিন্তু কলিং বেল না বাজিয়ে দরজায় নক করছে কোন বেকুব। একটু বিরক্তি নিয়েই দরজা খুললাম। রিয়ান দাড়িয়ে বাইরে!! কোন কথা না শুনে গালাগাল শুরু করলাম ওকে। “কোথায় ছিলি? আর কাউকে নাহোক আমাকে তো বলে যেতে পারতি। কারো কেয়ার তো তুই কখোনোই করিস নাই,ভাবতাম আমার জন্য একটু হলেও দরদ আছে তোর। কিন্তু না,আমাকেও অপ্রয়োজনীয় মনে করিস তুই। এখন আর চুপ করে দাড়িয়ে না থেকে ভিতরে এসে বোস। বলে আমিই আগে ঘরে ঢুকলাম। সোফায় বসতে যেয়ে দেখলাম রিয়ান ঘরে ঢোকেনি। দরজায় তাকিয়ে দেখলাম সেখানে কেউ নাই। আরে একটু আগেও তো রিয়ান ছিলো এখানে। ভীষণ রাগ লাগলো আমার। রিয়ান কি শুরু করেছে এসব। “দরজা খুলে রেখেছিস কেন?” ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাবা বললেন।“না মানে…” বলতে যেয়েও চেপে গেলাম। বাবা মা পছন্দ করেন না,আমি রিয়ানের সাথে মিশি। কারন রিয়ান আগে ড্রাগ এডিক্ট ছিলো কিন্তু এখন ও পুরাপুরি সুস্থ, কিন্তু সেকথা বাবা মাকে কে বোঝাবে? চুপচাপ নিজের ঘরে চলে আসলাম। তাহলে কি বাবা মা কে দেখেই রিয়ান চলে গেল। বাবা মা থাকলে ও বাসায় আসে না।ও জানে বাবা মা চান না আমি ওর সাথে মিশি। রাগ কিছুটা কমে গেল আমার। কিন্তু রিয়ান এত চুপচাপ ছিলো কেন? ৫ মিনিট ধরে আমি এতগুলো কথা বললাম্, ও না উত্তর দিলো না নিজে থেকে কিছু বললো। তবুও আশ্বস্ত হলাম এটা চিন্তা করে ও ফিরে তো এসেছে। খুশী হলাম অনেক্,রিয়ান কে ছাড়া আমিও যে অচল। রাতের খাবার খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম। অনেক সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল আমার। নাস্তা খেয়ে ভার্সিটিতে যাবো বলে ফোন দিলাম রিয়ানকে। ফোন বন্ধ। ফাজিলটা নিশ্চই ফোনে চার্জ দেয়নি। আন্টির মোবাইলে ফোন করলাম। আমি হ্যালো বলতেই আন্টি বললেনঃ “ কি বাবা রিয়ানের কোন খোজঁ পেলে?”

আন্টির কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম। রিয়ান কি তবে বাসায় যায়নি? কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলাম। রিয়ান কি শুরু করেছে এগুলো? কাল রাতে দেখা হলো আমার সাথে ,এখন আবার লাপাত্ত্বা। এই ছেলের কপালে যে কি আছে আল্লাহ জানে। এতই বেশি রাগ লাগছে আমার যে মনে হচ্ছে রিয়ানের সাথে যোগাযোগ করাই বন্ধ করে দেই। আর ওকে ফোন দিবো না ডিসাইড করলাম। একাই রওনা দিলাম ভার্সিটির দিকে। সন্ধায় বাসায় ফিরে শুনলাম বাবা দেশের বাড়িতে যাবেন বলে ঠিক করছেন। আমরাও যাবো সাথে,৫ দিন পর ঢাকায় ফিরবো। আমার ঢাকার বাইরে যেতে ভালো লাগে না কিন্তু বাবার উপর কথা বলার সাহস আমার নেই। পরদিন অনেক সকালে আমরা রওনা হলাম বাগেরহাটের পথে। পৌছালাম বিকাল ৩টায়। খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়েই ঘুরতে বের হলাম। ছোট্ট একটি মফস্বল শহর বাগেরহাট কিন্তু খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। রাস্তা ঘাট চিনি না কিন্তু তবুও হাটতেই থাকলাম। দড়াটানা নদীর তীরে যেতেই এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে গেলো। চুপচাপ এক গাছের নিচে বসেই সারাবিকেল পার করে দিলাম। শেষ বিকেলের লালচে কালো আভাটুকুও মিলিয়ে গেলো নদীতে তবুও বসে রইলাম মনোমুগ্ধের মত। ঠান্ডা বাতাসে গায়ে রীতিমত কাঁপন ধরে গেলো।সকাল থেকে এত ব্যস্ত ছিলাম যে রিয়ানের ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। এখন মনে পড়ে গেল। নতুন করে ভাবনাগুলো এসে একসাথে ঘিরে ধরলো আমায়। খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো আমার;অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে উঠে দাড়ালাম। ওহ! হঠাৎ করে এত গরম লাগছে কেন? এত গরমে মানুষ জামা কাপড় পড়ে থাকে কিভাবে;আমি আবার পড়েছি ফুল স্লীভ টি-শার্ট। মনে হলো একটানে শার্ট খুলে ফেলি।চুপচাপ হাটতে থাকলাম।একটু সামনে হেটে আসতেই মনে হলো দূরে কেউ গাছের নিচে কেউ বসে আছে। যে কেউ বসে থাকতে পারে, সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু আমার কেন জানি ভীষন অস্বস্তি লাগতে লাগলো।কারণ যে বসে আছে তার বসার গড়ন আমার খুব পরিচিত,তার চুলগুলোও লম্বা;ঠিক যেন রিয়ানের মত। ওটা রিয়ান না তো ?? মনে হলো সেও আমাকে দেখছে। হাটতে হাটতে ছেলেটির কাছে চলে আসলাম আমি। যা ভেবেছি ঠিক তাই।রিয়ানই!! কিন্তু ও এখানে কি করছে? আমি বেশ রাগান্বিত হয়েই ডাকলাম “রিয়ান!” রিয়ান খুব আস্তে,খুবই আস্তে উচ্চারণ করলো “স্বাধীন আমাকে সাহায্য কর” আমি অবাক হয়ে গেলাম ওর গলার স্বর শুনে।রিয়ানের ভয়েজ তো এমন কখনোই ছিলো না।এতই আস্তে এবং ফ্যাসফ্যাসে গলা যে ও কি বললো তা বুঝতে আমার কিছুটা সময় লাগলো।কি বলবো ঐ মূহর্তে ভেবে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ আমার কাঁধে হাত রাখলো। ফিরে দেখি একটা লোক। আমাকে তাকাতে দেখে জিজ্ঞেস করলো “ভাই কি শহরে নতুন?” “না,আমার দাদাবাড়ি এখানে। কিন্তু আমরা ঢাকায় থাকি” “তাইলে ভাইজান একটা কথা কই,এই জায়গা খুব একটা সুবিধার না।বাড়িত যান,এইখানে খাড়াবার দরকার কি ? শীতের রাইত, লোকজন কম,কি হয় কওয়া যায় না।” এটুকু লোকটা হাটা শুরু করলো। রিয়ানের দিকে ঘুরতেই দেখি ও নেই। নদীর পাড়ে যতটুকু চোখ যায় দেখি শুধু লোকটি হেটে যাচ্ছে আর আমি দাড়িয়ে আছি।হাওয়ার মিলিয়ে যাওয়ার মত এত তাড়াতাড়ি রিয়ান গেলো কোথায় ?? একটু একটু ভয় লাগলো আমার। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম রিয়ান আমাকে কিছু বলতে চায়;বলার জন্যই আসে আমার কাছে কিন্তু সামনে থাকলে চলে যায়।রিয়ান জানলোই বা কিভাবে আমি এখন বাগেরহাটে।আগে তো ও কখনো আসে নাই এদিকে!!ও জানতো আমার দাদাবাড়ি বাগেরহাটে,কিন্তু ঠিক এখানে আসলেই যে আমাকে এখন পাওয়া যাবে তা তো রিয়ানের জানার কথা না!! খাপে খাপ মিলাতে পারলাম না আমি। মাথা ঘুরতে লাগলো;বাড়ির দিকে রওনা হলাম আমি।এত ঠান্ডা লাগছে যে গরম কাপড় পড়ে বের হলাম না কেন ভাবছি। একটা কথা খেয়াল করা মাত্রই আমার গাঁ শিরশির করে উঠলো। ঢাকায় আমার বাসায় যেদিন রিয়ান এসেছিলো ঔদিন ঠান্ডার মাঝেও অস্বাভাবিক গরম লেগেছিলো আমার এ
বং আজও লাগলো। রিয়ান চলে যাবার পর আবার ঠান্ডা লাগা শুরু করলো!!এমন কেন হলো? রিয়ান কি তবে অশরীরী কিছু একটা??আর কিছু ভাবতে পারলাম না ঠান্ডার মধ্যে ভয়ে শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো।

 

রোদেঁশী

১ম পর্ব সমাপ্ত

নকশা – ১ম পর্ব

0

তখন আমার ফাইনাল ইয়ারের থিসিস চলছিল। থিসিসের টপিক হিসেবে পুরান ঢাকার একটি জনবহুল অংশকে বেছে নিয়েছিলাম। আমার কাজ ছিল সেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটিকে কিভাবে ঝুঁকিমুক্ত করে সেখানকার বাড়িগুলা কে বসবাসের আরও উপযোগী করে তোলা যায় তার ডিজাইন করা। সহজ ইংরেজীতে যাকে বলে ‘রিহ্যাবিলেশান অফ বিল্ডিংস’ থিসিসের  জন্য  প্রায়  সব  ইউনিভার্সিটিই  স্টুডেন্টদের ছয় মাস সময় দিয়ে থাকে। ছয় মাসের মধ্যে চার মাস প্রায় শেষ। আর মাত্র দু’মাস বাকি। অথচ আমার কাজ তেমন এগোয়নি। এমাসের মধ্যে যদি রিসার্চ শেষ না হয় তাহলে আমি বিপদে পড়ে যাব। কারন ফাইনাল ড্রইং আর মডেলের জন্য কমপক্ষে দেড় মাস প্রয়োজন। শুধু আমার নয়, সবারই নূন্যতম এই সময়টুকু দরকার হয় ডিজাইন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবার জন্য। একে ত সময় নেই, তার উপর মাথায় স্কলারশিপের চাপ। যদি প্রথম তিনজনের মাঝে না আসতে পারি তাহলে কমনওয়েল্থ স্কলারশিপ নিয়ে আর বিলেত যাওয়া হবেনা। আর স্কলারপ ছাড়া আমার পক্ষে নিজের টাকায় মাস্টার্স করা সম্ভব না। রাত সোয়া তিনটা। কম্পিউটারে বসে কিছু ড্রইং ড্রাফ্ট করছিলাম। পরদিন সকালে স্যারকে দেখাতে হবে। স্যার এই ড্রাফ্ট টা এপ্রুভ করলেই ফাইনাল ড্রইং এর কাজ শুরু করে দিব। ড্রইং করতে করতে হঠাত ঝিমুনির মত চলে এসেছিল। হঠাত শুনতে পেলাম কে যেন আমাকে অষ্পষ্টভাবে ডাকছে ‘হিমেল এই হিমেল’ বলে। বেশ চমকে গেলাম। বাসার সবাই ঘুমাচ্ছে। শুধু আমার ঘরে বাতি জ্বলছে। তাই কিছুক্ষন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপচাপ বসে থাকার পর ভয় চলে গেল। বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা ঘুমের মধ্যে ঘটেছে অথবা মনের ভুল ছিল। তাছাড়া আমি ত স্পষ্ট কিছু শুনিনি। আজকের মত ড্রইং এখানেই শেষ ভেবে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাব ঠিক সেই মুহূর্তে স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা নারী কন্ঠ ফিসফিস করে বলছে ‘হিমেল যেয়োনা দাঁড়াও……কথা আছে তোমার সাথে। ভয় পেয়োনা লক্ষীটি’একথা শুনার পর আমার আর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াবার মত সাহ

Werewolf বা মায়া নেকড়ে সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?

0

Werewolf “ শব্দটি প্রাচীন ইংরেজি শব্দ werewolf থেকে এসেছে । এর প্রথমাংশটি সাধারণত প্রাচীন ইংরেজি শব্দ “wer” হিসেবে শনাক্ত করা গেছে , যার অর্থ দাড়ায় “man” বা মানব ! আর wolf অংশটি “wolf” বা

নেকড়ে এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা । এর বাংলা সহজ অর্থ “নেকড়ে মানব” দাঁড়ালেও , “মায়া নেকড়ে” শব্দটি ‘সুন্দর’ হওয়ার কারনে বাংলা সাহিত্যিকরা এটাকেই বেছে নিয়েছেন ।মায়া নেকড়ে রূপকথার ভুবনে খুবই জনপ্রিয় , প্রায় সকল নেকড়ে অধ্যুষিত এলাকায় এর প্রচলন রয়েছে । আমাদের দেশে নেকড়ে থাকলে আমরাও হয়ত ছোট বেলায় এর গল্প শুনতে পেতাম । এই রূপকথার প্রচলন হয়েছে মুলত ইউরোপে । মায়া নেকড়ে বলতে বুঝায় এমন একজন ব্যক্তিকে , যে রাতের বেলায় নেকড়ে তে পরিনত হয় এবং মানুষ , জীব-জন্তু হত্যা করে বা মৃতদেহ ভক্ষন করে , আবার দিনের বেলায় মানুষ রূপ ধারন করে । ধারনা করা হয় কিছু মায়া নেকড়েরা তাদের ইচ্ছামতো তাদের রূপ পরিবরতন করতে পারে । এছাড়া মায়া নেকড়েরা কাউকে আঁচড় বা কামড় দিলে সেই ব্যক্তিও মায়া নেকড়েতে পরিনত হয়ে যাবে ! বংশানুক্রমেও বা ‘উত্তরাধিকারসূত্রে’ ও কেউ মায়া নেকড়ে হতে পারে । উপরিউক্ত দুইটি ক্ষেত্রে ( উত্তরাধিকারসূত্রে ও আঘাত প্রাপ্ত) ‘আক্রান্ত’ ব্যক্তি শুধুমাত্র পূর্ণ চাঁদের আলো বা জোৎস্নার সময় নেকড়ে রূপ ধারন করবে ! চাঁদের আলো যতক্ষণ থাকবে , সে ততক্ষন মায়া নেকড়ে থাকবে । সে মায়া নেকড়ে হবে নিজের অজান্তেই এবং মানুষ রূপ ফিরে পাবার পর সে রাতের ঘটনা ভুলে যাবে ! মায়া নেকড়েকে মেরে ফেললে সে আবার তার আগের রূপে (মানুষ রূপে ) ফিরে যাবে এবং তার দেহে তখন আঘাতের কোন চিহ্নই থাকবে না !
আমেরিকার বুনো পশ্চিমে অনেক Rancher রা দাবি করেন তারা মায়া নেকড়েকে তাদের গবাদি পশুকে হত্যা করতে দেখেছেন ! কেউ কেউ আবার গুলি খেয়ে আহত মায়া নেকড়ের পালিয়ে যাবার কথাও শুনিয়েছেন । তবে বাস্তব প্রমান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।মায়া নেকড়েতে বিশ্বাস প্রায় সারা পৃথিবীতেই আছে সেই প্রাচীন কাল থেকে । তবে এই ধারনা ষোড়শ শতাব্দিতে ফ্রান্সে গেড়ে বসে ।
এমনকি এমন মানুষও আছে যারা নিজেদেরকে নেকড়ে হিসেবে ভাবে ! তাদের এই অবস্থাকে মানসিক ভারসাম্যহীনতা ধরে নেওয়া হয় , এবং একে lycanthropy বলে । lycanthropy শব্দের উদ্ভব আধুনিক ল্যাটিন lycanthropia থেকে যা এসেছে গ্রীক lukathropia থেকে , এর অর্থ ‘lukos’ বা wolf + ‘anthropos’ বা ‘man’ .পোস্টটি লিখেছেনঃ Masud Shihab

পান খাওয়া সাদা বুড়ি

1

আব্বা WAPDA তে চাকুরী করতেন। সেই জন্য ওনার পোস্টিং হতো কয়েক বছর পর পর দেশের বিভিন্ন শহরে। আমি তখন ক্লাস ২ তে পরি। এবার আব্বা বগুড়া তে পোস্টিং পেয়েছেন। নতুন স্কুল, নতুন জায়গা, নতুন বন্ধু সব কিছুই এলো মেলো। গোছাতে সময় লাগবে। স্কুলটা কিন্তু WAPDA এর ভেতর ছিলনা,আমাদের যেতে হতো প্রায় ১ KM হেটে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর স্কুল এ। স্কুল এর বন্ধুরা বলতো তোমাদের কলোনিতে ভূত আছে। বিশ্বাস করতাম ছোটো ছিলাম বলে।

রাতের বেলায় ঘুমানোর সময় তাই বড় ভাইকে ধরে ঘুমাতাম। সেদিন যে খাটে শুয়েছি পা বরাবর অনেক বড় জানালা। গরম বেশি থাকাতে জানালাটা খুলেই ঘুমিয়েছি দুভাই। আমার বড় ভাই সব সময় আমাকে ঘুমানোর আগে দোয়া পরিয়ে ঘুম পারাত, কিন্তু সেদিন আমি দোয়া না পরেই ঘুমিয়ে গেছি। মাঝ রাত্রে স্বপ্নে দেখলাম এক সাদা কাপড় পড়া বুড়ি পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে। তার হাসি দেখে পিলে চমকে যাওয়ার মত অবস্থা সেই ঘুমের মধ্যেই। স্বপ্নের মধ্যেই দেখলাম মা আমাকে তুলে ছুঁড়ে দিল ঐ বুড়ির দিকে আর বুড়িটা আমাকে নিয়ে চলে যাওয়া মুহূর্তে মা আমাকে আবার ছিনিয়ে নিচ্ছে ঐ বুড়ির কাছ থেকে। মা আমাকে শক্ত করে ধরে আছে আর বুড়িটা মায়ের কাছে থেকে আবার আমাকে নিয়ে নেয়ার জন্য হাত বাড়াচ্ছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে মা আমাকে আবার তার কাছে ছুঁড়ে দিল এবং বুড়িটি আমাকে নিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আবার মা আমাকে ছিনিয়ে নিল তার কাছ থেকে। এভাবে চলল কিসুক্ষন এবং আমি জোরে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম। বাসার সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলো আমাকে নিয়ে, আমি জানালা থেকে দূরে সরে আসার অনেক চেষ্টা করতে লাগলাম, মা যখন আসলো তখন তাকে এমন জোরে ধরেছি যে আমাকে ছুটানর জন্য আব্বা আর ভাই দুই জন শক্তিশালী মানুশ এর প্রয়োজন হয়েছিল। আর আমি বারবার বলছিলাম আমাকে দিয়ে দিওনা ঐ বুড়ির কাছে। মা আমাকে আয়াতুল কুরসি পরে বুকে ফুঁক দিলেন এবং ঐ রাত্রের জন্য আমরা সবাই এক ঘরে ঘুমালাম। কারন জানলাম যে বড় ভাইও ভয় পেয়েছেন আমার চিৎকারে।

পরের দিন মসজিদের হুজুর কয়েক আয়াত পরে বুকে ফুঁ দিলেন আমার জন্য। এর পর থেকে প্রায় রাত্রেই গোঙাতাম আর ঘুম ভেঙ্গে যেত ভাই এর ডাকে। এত গেল স্বপ্নে দেখা সাদা বুড়ি। এই বুড়িকে আমি বাস্তবে দেখেছি ৬ বছর পর। আসছি শেই ঘটনায়। আল্লাহ্‌ বলেছেন, “অয়ামা খালাক্তুল জিন্নাহ অয়াল ইনসা ইল্লা লিয়াবুদুন”—“আমি জিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি”।

মানুষের মদ্ধে যেমন ভালো খারাপ আছে তেমনি ওদের মদ্ধে ও ভালো খারাপ আছে। মানুষ এক প্রজাতি হয়ে যেমন অন্য প্রজাতির ক্ষতি করে তেমনি জিনরাও অন্য প্রজাতির (মানুষ সহ) ক্ষতি করে। তাই খারাপ জীন আছে এটা বিশ্বাস করলে দোষের কিছু হবেনা। আর ভুতের কথা বলছেন? এরাও জীন, কেও ভালো আবার কেউবা খারাপ। ভুত শব্দটা আমরা আমাদের কথিত বাংলা ভাষায় ব্যাবহার করে থাকি।

আমি তখন ক্লাস এইট এ পড়ি। গ্রামে নতুন বাড়ি কেনা হয়েছে মুনশিগঞ্জের শ্রীনগর থানার হাঁসারা গ্রামে। ভাই চলে গেছেন বিদেশে চাকরির খাতিরে তাই বাড়ির বড় ছেলে বলতে আমি। জিবনে কখনো গ্রামে থাকিনি নানির বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ছাড়া, তার উপর ইলেক্ট্রিসিটি অথবা ভাল রাস্তাঘাট ছিলনা ঐ সময়। ভুতের ভয়ের চাইতে বিষাক্ত শাপের ভয় বেশি ছিল ঐ বয়সে। বাড়ির পাশেই একটা মাঝারি ধরনের বট গাছ, তার পর বড় বড় কতগুলো দিঘি, এগুলর বা দিকে আছে একটা অনেক বড় খালি বাড়ি। বাড়িটাতে অনেক বড় বড় আম গাছ আর করই গাছ। সামনে আসে একটা ভয়ঙ্কর রকমের ভাঙ্গা জমিদার বাড়ি নাম সেনের বাড়ি, অনেক বড় এলাকা জুড়ে ছিল এই বাড়িটি। হাজার রকমের বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা। ভেতরে ঢুকলে সূর্যের আলো চোখে পরেনা। তার ২০০ গজ দুরেই আমাদের স্কুল। মুনশিগঞ্জের সবচেয়ে পুরনো স্কুল। বাজারে যাওয়ার সময় আমি এই দিক দিয়ে না যাওয়ার চেষ্টা করতাম আর যদি জেতাম তবে মানুষ থাকত। অন্য দিক দিয়ে বাজারে গেলে সোজা রাস্তা। বর্ষার সময় এই রাস্তাটা দুবে যেত তাই বাধ্য হয়েই আমাকে এই রাস্তা দিয়ে প্রাইভেট পরতে যেতে হত বিকাল বেলায় সেই ভাঙ্গা বাড়ির সামনে দিয়ে আর ফিরতে হত সন্ধ্যার সময় কখনো কখনো রাত ১০ টার পর।

এখন বর্ষাকাল তাই আমাকে বিকাল বেলায় কাজের ছেলে করিম নৌকায় করে স্যারদের এলাকায় দিয়ে গেল। জায়গাটার নাম পালের বাড়ি। করিম বয়সে আমার চাইতে বছর ২ এর ছোট হবে, দুজনেই নৌকা বাইতে খুব পছন্দ করতাম, তাই আমাকে হেটে যেতে হলনা। ও বাড়িতে চলে গেল আর আমি গেলাম স্যার এর বাসায় পরতে। পরালেখায় মোটামুটি ছিলাম তাই ক্লাস ৮ এর বৃত্তির জন্য খুব প্রস্তুতি চলছিল। পরতে পরতে রাত সাড়ে ১০ টা বেজে গেল। স্যার বলল যেতে পারবি বাড়িতে না দিয়ে আসতে হবে? প্রেস্টিজে লেগে গেল যদি ও ভয় পাচ্ছিলাম, বললাম স্যার কি যে বলেন না। কাল দেখা হবে স্কুলে বলে আমায় যেতে বললেন। আমার হাতে একটা কলমের সাইজ এর মত একটা টর্চ ভাই পাঠিয়েছে বিদেশ থেকে। কিন্তু এটার একটা সমস্যা হল ৫ থেকে ৬ সেকেন্ড পর বন্ধ করতে হয় কিচুক্ষনের জন্য। যেহেতু করিম আসবেনা এত রাতে তাই আমাকে হেটে যেতে হবে সেই ভাঙ্গা বাড়ি দিয়ে।

আয়াতুল কুরসি পরে বুক এ ফুঁ দিয়ে হাটা শুরু করলাম। মহাসড়ক দিয়ে ১৫ মিনিট হাটার পর ডানদিকে বাক নিতে যাওয়ার সময় আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালাম কারন সামনে দেখি একলোক যাচ্ছেন আমার রাস্তা বরাবর। তার পিছু নিলাম। ৩ মিনিট পর সেই ভাঙ্গা সেনের বাড়ি। আমি এটাকে এড়িয়ে অন্য দিক দিয়ে গেলে আমাদের স্কুল দিয়ে যেতে পারি কিন্তু গেলাম না কারন আমার সাথে ঐ ব্যাক্তি আছেন। মজার ব্যাপার হল এতক্ষনের জন্য আমি একবার ও তাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি উনি কেমন আছেন বা কোথা থেকে এলেন। আর তাছাড়া এলাকায় নতুন বলে অনেকে আমাকে ঠিক মত চিনেও না, আমিও অনেক কম চিনি। চুপচাপ তাকে ফলো করে সেনের বাড়ি যেটা এখন শবাই বলে সেনের বাগে ঢুঁকে গেলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর ঐ ব্যাক্তি আমার সামনে থেকে একটু দূরে কোথায় গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার পেন্সিল টর্চ দিয়ে খোঁজার চেষ্টা বৃথা কারন উনি কথাও নেই। ডাকলাম কিন্তু অনেক বাদুড়ের শব্দ ফিরে এল। টর্চটা জালিয়ে আর বন্ধ করলাম না। দিলাম দৌড়। এক দৌড়ে বাড়ি পার হয়ে এলাম এবং সামনে গ্রাম্য পোষ্টঅফিস। সেখান থেকে একটা বাঁশের পুল প্রায় দেড়শ গজের মত লম্বা হবে ওপাড়ের এক বন্ধুর বাড়ি আলামিন দের বাড়িতে সংযুক্ত। আমাকে বাড়ি পৌছতে হলে এ পুল বা সাকো পার হতেই হবে। আয়াতুল কুরসি পরছি আর আল্লাহ, আল্লাহ্‌ করছি। সাঁকোর মাঝ খানে এসে হঠাত আমার চোখ যায় ডান দিকে সেই খালি বাড়িটার দিকে। আমার জান বের হয়ে যাওয়ার মত অবস্তা। দেখলাম একটা অনেক বড় আম গাছের নিচে সেই সাদা বুড়িটা পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে নাচানাচি করছে আর আমাকে ডাকছে হাত দিয়ে ওখানে যেতে। তার হাসি দেখেত আমার হার্টবিট আর বেড়ে গেল। আমি এখন না পারি আলামিনদের বাড়ি যেতে না পারি সেনের ভাঙ্গা বাড়ি পথ দিয়ে স্যার এর বাসায় ফিরে যেতে। অগত্যা আল্লাহ নাম করে সাঁকো শক্ত করে ধরে পাড়ি দিচ্ছি খুব সাবধানে। তারাতারি যেতে পারছিনা কারন একেত ভয় তার উপর গ্রামের সাঁকোতে নতুন নতুন চরার অভিজ্ঞতা। যতই আলামিন্দের বাড়ির কাছে যাচ্ছি বুড়ির গলার শব্দ শুন্তে পাচ্ছি। কি? আমায় চিনতে পারছিস? আমি এসেছিলাম তোকে নিতে, তোর মা দেয় নি। আজ কে আটকাবে? বন্ধুরা, তার চেহারা দেখতে আমাদের বুড়ো নানি দাদিদের মতই দেখতে। কিন্তু লম্বায় প্রায় ২০ ফুট এর মত হবে। বুড়ির তামশা মনে হয় আর বেড়ে গেল। এখন চাঁদের আলোয় তাকে আর পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বুড়ি নাচছে আর আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমাকে বলছে তোকে আজ এই গাছের নিচে পুঁতে রাখব। আমি চার কুল পরে বুকে ফুঁ দিয়ে ওর দিকেও তাক করে ফুঁ দিলাম। এখন আমি আলামিন্দের বাড়ির নামায় এসে পরেছি। আমি দৌড় দিলাম না। তাকিয়েই ছিলাম ঐ বুড়ির দিকে। হঠাত সেই বুড়িটা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আর দেখতে পেলাম না। আমি আর দেরি না করে বাড়ির দিকে রউনা হলাম। দিঘি পার হয়ে বট গাছ আসল। আমি আগে থেকেই করিমকে ডাকলাম নৌকা নিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে বট গাছের কাছ থেকে। করিম ঘুমিয়ে পরেছিল। গ্রামের সবাই ঘুমে। মা করিমকে ডাকছে উঠোন থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি বট গাছের ওখানে দারিয়ে থেকে। বট গাছের ডাল পালা ভেঙ্গে যাওয়ার মত অবস্থা। আমি মাকে জোরে বললাম আমার ভয় লাগে করিম কে তারতারি পাঠাও। মা বলল, “ভয় পাবিনা আমি দারিয়ে আছি এই পারে”।

করিম ঘুম থেকে উঠলো ঠিকই কিন্তু ওর ও ভয় লাগে। ও আগে নিশ্চিত হয়ে নিল আমার নাম ধরে ডেকে যে এটা আমি কিনা। মা চলে গেল তার ঘরে আর করিম আশ্ছে নৌকা নিয়ে কচুরিপানা সরিয়ে আছতে আছতে। গাছ থেকে ফিশ ফিশ শব্দ করে কে জেন বলল তোর মা তোকে অনেক কিছু শিখিয়েছে বেচে গেলি আজ।

বাড়ি আসলাম মাকে কিছু বললাম না। পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখব কি সেটা। কিন্তু পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় আমি ভুলে গেলাম সম্পূর্ণ রূপে। জানিনা এত বড় ঘটনাটা কিভাবে একটা মানুষ ভুলতে পারে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন কিরে বাড়ি ফিরতে সমস্যা হয়নিত? আমার মনে পরে গেল সেই ঘটনা। আমি বললাম না স্যার কোনও সমস্যা হয়নি। স্কুল ছুটির পর বাড়িতে ফেরার সময় সেই গাছটির দিকে তাকালাম। কিছুই দেখলাম না। দেখার কথাও না। কারন আমার সাথে স্কুল বন্ধুরাও ছিল। আমাকে প্রাইভেট পড়ার ছলে এই যন্ত্রণা আর দুর্ভগ আর ৩ দিন সইতে হয়েছিল, তারপর এই বুড়িকে আর দেখিনি। দরুদ, কোরানের আয়াত আর নতুন আয়ত্ত করা সাহস আমাকে শিখিয়েছিল ঐ রকম পরিবেশে কিভাবে চলতে হয়। এখন আমি ইউকে তে থাকি। আমার বাসার পাশের কবরস্থান। এখানে ও আমি অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিশ দেখি সেটা নাহয় আরেকদিন বলব? ভালো থাকবেন। যে যে ধর্মই পালন করেননা কেন। সৃষ্টিকর্তা কে সব সময় মনে রাখবেন। উনি আপনাকে, আমাকে সবসময় রক্ষা করবেন।

শেয়ার করেছেনঃ Aminul Islam

গর্জনিয়ার উড়ন্ত লামা ও অলৌকিক নীলশঙ্খ – শেষ পর্ব

0

শান্তা বলল, আমি তোমাকে এর  আগে কোথায় দেখেছি। কোথায়? আমার কন্ঠস্বর কেঁপে উঠল। আমাকে তো ওর দেখার কথা নয়। উত্তর না-দিয়ে শান্তা জিগ্যেস করল, আমাকে কি তুমি এর আগে কোথাও দেখেছ? না। সত্যি করে বল? শান্তার কন্ঠস্বর এই মুহূর্তে বুড়িদের মতো কেমন খনখনে শোনাচ্ছে।

আমি কি বলব? আমি কি শান্তাকে বলব যে রোমেলের বাসায় তোমার ছবি দেখেছি? তুমি আসলে মৃত। রামুর কাছেই কোথাও অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছ। এসব কথা কি বলা যায়? আমরা হাঁটতে- হাঁটতে লনের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, ঠিক সেখানেই একটি কফি গাছ। টিলাটি এখানে ঢালু হয়ে অন্তত তিনশ ফুট নীচে নেমে গেছে। ধবল জোছনায় টিলার ঢালে শাল গাছ, কলা গাছ, কাঁঠাল গাছ এমন কী নীচের রাস্তাও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে মঠের চূড়াও চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আমার কেন যেন মনে হল শান্তা আমাকে ইচ্ছে করে টিলার কিনারে নিয়ে এসেছে। কেন? শান্তার উদ্দেশ্য ঠিক বোঝা গেল না। তবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। ওর চোখে মনি দুটি ফসফরাসের মতন জ্বলজ্বল করছে। জ্বলজ্বলে চোখে বারবার আমার ডান বাহুর দিকে তাকাচ্ছে। যেখানে  এথিন লামা ছোট্ট নীল শঙ্খ বেধে দিয়েছে। মনে হল ওই নীলশঙ্খের ওপর শান্তার আক্রোশ। শান্তা বলল, তোমার ডান বাহুতে কি একটা নীল রঙের শঙ্খ বাঁধা আছে?

হ্যাঁ। আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুমি জানলে কি করে? খসখসে কন্ঠে শান্তা বলল, আমি জানি। তুমি এখন ওই  নীলশঙ্খটা বাহু থেকে খুলে নীচে ফেলে দাও। নীলশঙ্খ ফেলে দেব? কেন? আমার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। শান্তা ধমকের সুরে বলল, ওসব মাদুলিতে কাজ হয় না। তারপর কন্ঠস্বর নরম করে বলল। তা ছাড়া আমি তোমাকে আজ রাতে আশ্চর্য এক দেশে নিয়ে যাব । যেখানে দিনও হয় না রাতও হয় না …  শান্তার কথা শেষ হল না … কফি গাছের ওপাশ থেকে কে যেন বেরিয়ে এল। খসখসে কন্ঠে বলল, কেমন আছ? কে? আমি চমকে উঠলাম। আমি … আমি এথিন লামা। ওহ্ । আপনি?

কিন্তু এথিন লামা এখানে এল কী ভাবে? উড়ে আসেনি তো। তবে এথিন লামাকে দেখে শান্তা যে ভয় পেয়েছে তা ঠিকই বুঝতে পারলাম। শান্তার মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। আমার দিকে ফিসফিস করে বলল, চল, এখান থেকে চলে যাই। ওই লোকটা ভালো না। আমি কতকটা রুক্ষ কন্ঠে বললাম, তুমি যাও । আমি আসছি। শান্তা দ্রুত হাঁটতে থাকে। পিছন দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। আমি মুখ ফিরিয়ে কফি গাছের দিকে তাকিয়ে দেখি ওখানে এথিন লামা নেই। যেন এথিন লামা আসেনি। গভীর বিস্ময় নিয়ে বাংলোয় ফিরে এলাম। রাতে খাওয়া তেমন   জমল না। খরগোশের মাংস রাবারের মতো ঠেকল। ছোট খালু সেনাবাহিনীতে থাকার সময় বান্দরবানের গভীর অরণ্যে অজগর শিকারের কাহিনী বলছেন। শান্তা মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে। তেমন কিছু খেল না শান্তা। আমি কিচেনে এলাম। মং ছিং প্লেট-গ্লাস ধুচ্ছিল। মিলি খালা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে দুধ ভরতি সসপ্যান। মিলি খালাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, শান্তার মা তোমার ঠিক কি রকম বান্ধবী হয় বল তো ? মিলি খালা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল, কেন রে? হঠাৎ? এমনি । বল না। ছোট খালা বলল, শান্তার মা সাবিহার সঙ্গে কলেজে পড়েছি। তারপর  ওর বিয়ে হয়ে গেল। মাঝে- মাঝে টেলিফোনে যোগাযোগ ছিল। এই। অনেক দিন দেখাসাক্ষাৎ হয় না, না? আমি জিগ্যেস করি। হ্যাঁ। তুই জানলি কি করে? মিলি খালাকে অবাক মনে হল। তার পর মিলি খালা বলল, সকালে আমার কিন্তু খটকা লাগল আবীর । কি? আজ সকালে শান্তা যখন এল। তখন বললাম, বাড়ি চিনলে কি করে? শান্তা এড়িয়ে গেল। বলল, ওর এক মামা টিলার নীচে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। ভদ্রলোক ওপরে উঠে এলেন না বলে কেমন খটকা লাগল। শান্তার সঙ্গে কোনও ব্যাগট্যাগও ছিল না। হুমম। আমি শরীরে শিরশিরানি আর কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ নিয়ে দোতলায় উঠে এলাম। তার আগে মিলি খালার লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিয়ে এলাম। দোতলার সিঁড়ির পরে ছোট করিডোর। অল্প পাওয়ারের নীল আলো জ্বলে ছিল। ডান পাশের প্রথম ঘরটি আমার। ঘরটা ছোট। তবে গরাদহীন জানালাটা বেশ বড়। বিছানায় শুয়ে এ.আর আরভিং –এর লেখা ‘টিবেটান মিষ্ট্রি অভ ফ্লাইং লামা’ বইটি পড়ছি। মন বসছে না। কেবল শান্তার মুখটা ভাসছিল। রোমেল বলল, গত বছর শান্তারা সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রামুর কাছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। মিলি খালা বললেন, শান্তাকে আজ সকালে ওর এক মামা দিয়ে গেলেন। ঠিক কোথায় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল? শান্তা যদি অ্যাক্সিডেন্টে মারাই যায় তাহলে শান্তা এলই-বা কেন? কী ভাবে এল? মৃত্যুর পরও কি বেঁচে থাকা সম্ভব? এসব চিন্তা সরিয়ে বই পড়ার চেষ্টা করি। ‘টিবেটান মিষ্ট্রি অভ ফ্লাইং লামা’বইটি মিলি খালার লাইব্রেরি থেকে এনেছি। লামারা উড়তে পারে কি না সেটাই জানতে ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ নেভির সদস্য এ.আর আরভিং তিব্বতে গিয়েছিলেন। বইতে সে অভিজ্ঞতাই বর্ণনা করেছেন এ. আর আরভিং। তিনি নাকি লামাদের উড়তে দেখেছেন। কিন্তু কথাটা কতটুকু সত্যি? এথিন লামাও কি উড়তে পারে? মং ছিং নাকি এথিন লামাকে উড়তে দেখেছে।

ঘুম আসছিল না। ঘর অন্ধকার। ঘরে রিডিং ল্যাম্পের আলো। সে আলোয় হঠাৎ দেখি দরজার কাছে শান্তা দাঁড়িয়ে।  দরজা তো বন্ধ ছিল। ও এল কি করে? শান্তার পরনে সাদা নাইটি। আমি আতঙ্ক সিদে হয়ে বসি। হাত থেকে বই খসে যায়। শান্তা খনখনে কন্ঠে বলল, তখন তুমি  কিচেনে মিলি খালাকে বললে আমাদের সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে ? আমি চমকে উঠলাম। ও জানল কি করে? কিচেনে মং ছিং ছাড়া অন্য কেউ ছিল না । মুহূর্তেই আমি এক লাফে জানালার কাছে চলে আসি। গরাদহীন জানালাটা খোলা। জানালার ওপাশে একটি গালিচা। শূন্যে ভাসছে। গালিচার ওপরে দাঁড়িয়ে এথিন লামা। আমি বিস্মিত হব কী- পরক্ষণেই নিজেকে গালিচার ওপর আবিস্কার করলাম। গালিচা খানিকটা সরে অনেকখানি ওপরে উঠে এল। ঠিক লনের ওপর। জোছনার আলোয় লন আলোকিত। যেন দিন। নীচে তাকিয়ে দেখি জানালা দিয়ে অনেকখানি কয়লার গুঁড়া ছিটকে বেরিয়ে এসে ঘূর্নির আকার ধারণ করল। গালিচা দুলছিল। কয়লার গুঁড়া নারীমূর্তি ধারণ করে গালিচা ঘিরে আকাশে ঘুরপাক খেতে লাগল। আর রক্ত হিম করা খল খল হাসি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ।এথিন লামা চারপাশে নীল রশ্মি ছুঁড়ে মারতে লাগল। কালো নারীমূর্তি শূন্যে মিলিয়ে গেল। নীচে তাকিয়ে দেখি লনে ছোট খালু, মিলি খালা আর মং ছিং এসে দাঁড়িয়েছে । মিলি খালা চিৎকার করে কী যেন বলছে।

এথিন লামা ধীরে ধীরে গালিচা নামিয়ে আনল। গালিচা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। তোর কোনও ক্ষতি হয়নি তে? বলে মিলি খালা আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি লজ্জ্বা পেলাম। আমি তো আর ছোটটি তো নই। মং ছিং ঝুঁকে এথিন লামাকে প্রণাম করল। হাজার হলেও গুরু। ছোট খালু বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। লামাদের শূন্যে ওড়ার দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়েছেন। এথিন লামা হাসছিল। বলল, কদিন আগে মঠে বসে ধ্যান করার সময় জেনেছিলাম এমনই এক ঘটনা ঘটবে। তাই রামুতে বাসে উঠে এর পাশে বসি। বলে আমাকে দেখাল। আমার মনে পড়ল এথিন লামা আমার বাহুতে ছোট নীলশঙ্খ বেঁধে দিয়েছিল। বাহু স্পর্শ করে নীলশঙ্খটা ঠিক জায়গায় আছে বলে নিশ্চিন্ত হলাম। শঙ্খটি এথিন লামা তিববতের মানস সরোবরের পাড়ে কুড়িয়ে পেয়েছিল।ওটাই তো আমাকে ডাকিনী শান্তার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। আবার যে ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব না কে বলতে পারে।

 

সমাপ্ত

গর্জনিয়ার উড়ন্ত লামা ও অলৌকিক নীলশঙ্খ-১ম পর্ব

0

রামু থেকে গর্জনিয়া যাওয়ার পথে বাসে একজন মাঝবয়েসি ভিক্ষু আমাকে বলল, খুব শিগগির নাকি আমি এক ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব । কথাটা শুনে আমি সাঙ্ঘাতিক রকমের ঘাবড়ে গেলাম। আমার ঘাবড়ে যাওয়ারই কথা। কারণ ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়া তো ভারী সাঙ্ঘাতিক ঘটনা। তা ছাড়া আমি এর আগে কখনও ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়িনি। সত্যিকারের ডাকিনীরা দেখতে কেমন হয়, তাও জানি না। তবে এই ইন্টারনেটের যুগেও যে ডাকিনীর মুখোমুখি হওয়া সম্ভব, সেকথা ভেবেও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম । তবে ভিক্ষু আমাকে অভয় দিয়ে বলল, অসুবিধে নেই। এই শঙ্খটি ডাকিনীর হাত থেকে রক্ষা করবে । বলে আমার ডান বাহুতে ভিক্ষু একটা ছোট নীল রঙের শঙ্খ বেঁধে দিল। অবশ্য মন্ত্রপূতঃ নীল শঙ্খটি শরীরে ধারণ করে কোনওরকম টের পেলাম না।

চট্টগ্রাম থেকে রামু পৌঁছেছি দুপুর নাগাদ। একটা হোটেলে ঢুকে খেয়ে- দেয়ে আবার গর্জনিয়ার বাসে ওঠার পর ভিক্ষুর সঙ্গে পরিচয়। ভিক্ষু মুখ গম্ভীর। মাঝবয়েসি যে তা আগেই বলেছি। যথারীতি মঙ্গোলয়েড মুখ। মাথা নিখুঁত ভাবে কামানো। পরনে লাল রঙের গেরুয়া (বৌদ্ধরা চীবর বলে ) ।

ভিক্ষুকে আমি আমার নাম বললাম। গর্জনিয়া যাওয়ার কারণও বললাম। ভিক্ষুও গর্জনিয়া যাবে। ওখানেই একটা মঠে নাকি থাকে। নাম এথিন লামা। ভিক্ষুর নাম ‘এথিন লামা’ শুনে অবাক। এথিন লামা বলল, তার জন্ম রামুতে হলেও তরুণ বয়েসে তিব্বতে চলে গিয়েছিল। প্রায় তিরিশ বছর তিব্বতের একটি নির্জন গুম্ফায় ছিল। পাঞ্চেন নামে এক লামার কাছে গুপ্ত  তন্ত্রবিদ্যা অধ্যয়ন করেছে। তারপর রামুতে ফিরে এসেছে। রামুর লোকজন তাকে এথিন লামা বলেই ডাকে । এথিন লামা নাকি অশুভ শক্তি নাশ করে। এই উদ্দেশ্যে এখানে- ওখানে ঘুরে বেড়ায়।

এসব শুনে আমি কৌতূহল বোধ করি। তিব্বত নিয়ে আমার উৎসাহ আছে। শুনেছি তিব্বতের লামারা নানা গুপ্তমন্ত্র জানে। তারা নাকি উড়তেও পারে। কথাটা সত্যি কিনা জিগ্যেস করতেই এথিন লামা কিছু না- বলে মিটমিট করে হাসতে লাগল।

গর্জনিয়া পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হল। বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে কড়–ই গাছের নীচে দাঁড়ালাম। ছোট খালু আমাকে এখানেই অপেক্ষা করতে বলেছেন। ছোট খালু রামু তে সেটেল করার পর থেকে আমায় অনেকবার যেতে বলছেন । যাব- যাব করেও এর আগে আসা হয়নি। এবার এইচ এস সি পরীক্ষার পর ফুসরত মিলল ।

রামু থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব মাত্র ২৫ কিলোমিটার । মনে সমুদ্র দেখার লোভও ছিল। আমার পাশে এথিন লামাও দাঁড়িয়েছে। জায়গাটা বাজারের মতো। রাস্তার দু’পাশে স্থানীয় আদিবাসীরা বাঁশের ঝুড়িতে আদা, আনারস, কাঁকরোল, কাঁচা কলা নিয়ে বসেছে। গর্জনিয়া রামুরই একটি ইউনিয়নে । রামু সদরের অনেকটা পুবে। প্রচুর আনারস আর আদা ফলে। বৌদ্ধ মন্দিরের জন্যও বিখ্যাত গর্জনিয়া। কাছেই রাস্তার ওপারে একটি বৌদ্ধ মঠ। এথিন লামা হাত তুলে মঠটি দেখিয়ে বলল, আমি ওই মঠেই থাকি।

বেশ বড় মঠ। কাঠের। চূড়টি ধবধবে সাদা। সুন্দর। বললাম। এথিন লামা হাসল। কড়–ই গাছের নীচে একটা চা স্টল। বেঞ্চ। একটি অল্প বয়েসি রাখাইন ছেলে চা বানাচ্ছে। এরই মধ্যে আমার এথিন লামার সঙ্গে বেশ খাতির হয়ে গেছে। হাজার হলেও আমাকে একটি নীলশঙ্খ উপহার দিয়েছে। কাজেই বললাম, চলেন, খাই।

এথিন লামা রাজি। আমার সঙ্গে বেঞ্চিতে চা খেতে বসে। চা খাওয়া শেষ। বললাম, আজ আর সময় হবে না। কাল সকালের দিকে আপনার মঠে আসব। এথিন লামা মাথা নাড়ল। দাঁত বের করে হাসল। ঠিক তখনই দূর থেকে রাস্তার ওপারে ছোট খালু কে একটি কাকাও গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি এথিন লামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তা পার হয়ে ছোট খালুর কাছে যেতেই খালু আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, আয়। ছোট খালু আগে চট্টগ্রামে মোটর পার্টসের ব্যবসা করতেন । তার আগে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। এখন ওসব ছেড়ে গর্জনিয়ায় জমি কিনে আদা আর আনারস চাষ করছেন। ছোট টিলার ওপর বাংলো বাড়ি করেছেন। ছোট খালা-খালুর একটাই মেয়ে। সাদিয়া আপা আমেরিকায় পড়াশোনা করছে। বৌদ্ধ মঠের পাশ দিয়ে উঠে গেছে বাঁকানো লাল মাটির পথ। দু’ পাশে রেইনট্রি আর ইউক্যালিপটাস।

শেষবেলায় অজস্র পাখি কিচিরমিচির করছে। একটা খরগোশ দৌড়ে রাস্তা  পাড় হল। গাছ থেকে সরসর করে নেমে এল একটা কাঠবেড়ালী। আর ঝিঁঝির ডাকে কান পাতা দায়। চারিদিকে মনোরম আলো ছড়িয়ে আছে। গাছতলায় কেমন ছায়া-ছায়া। কী সুন্দর জায়গা। রোমেল কে মিস করছি। রোমেল আমার বন্ধু। একই কলেজ থেকে এবার এইচ এস সি দিয়েছি। রোমেলও গর্জনিয়া আসতে চেয়েছিল। হঠাৎ জ্বরে পড়ল বেচারা। পথটা যেখানে শেষ হল সেখানে সাদা রং করা কাঠের বেড়া। মাঝখানে গেট। দু’পাশে দুটো ইপিল ইপিল গাছ। তারপর লন। এক পাশে ফুলের গাছ। অন্য পাশে ছবির মতো সাদা রং করা কাঠের একটা বাংলো। একতলা আর দোতলায় বিদেশি স্টাইলের গরাদহীন জানালা। জানালার ফ্রেমের রং সবুজ। মনে হল রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছি। বাংলোর পিছনের ঢালে সম্ভবত আদার খেত আর আনারস বাগান। বাংলোর সামনে একটা জিপ।

মিলি খালা আমাকে দেখে এগিয়ে এল। বলল, এলি শেষ পর্যন্ত? আমি হাসলাম।

ছোট খালু বললেন, মিলি তোমরা বসে কথা বল। আমি চট করে একবার বাজার থেকে ঘুরে আসি। বলে ছোট খালু জিপের দিকে এগিয়ে গেলেন। মিলি খালা বললেন, খরগোশ পেলে এনো কিন্তু।

শান্তা খরগোশের মাংস খেতে চেয়েছে। ওকে। বলে ছোট খালু জিপে উঠে স্টার্ট নিয়ে চলে গেলেন। সূর্য ডুবতে এখনও অনেক দেরি । শেষবেলায় চারিদিকে যথেষ্ট আলো ছিল। আমরা লনেই বসলাম। বেতের চেয়ার পাতা ছিল। এলোমেলো ফুরফুরে বাতাস বইছিল। আকাশের রং বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। একজন অল্পবয়েসি ছেলে এল। হাতে ট্রে। ট্রেতে চায়ের পট আর কাপ। ছেলেটির গড়ন ছোটখাটো , শরীর হলদে রঙের । গলায় সাদা শঙ্খের মাদুলি। ছেলেটির পরনে সবুজ রঙের সারং আর সাদা রঙের ফতুয়া। ছেলেটিকে রাখাইন বলে মনে হল। রামুতে রাখাইনদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। টেবিলের ওপর চা রেখে চলে গেল ছেলেটি। মিলি খালা ঝুঁকে চায়ের কাপ তুলে নিতে নিতে বলল, ওর নাম মং ছিং। ছেলেটা রাখাইন। বৌদ্ধ। বেশ বিশ্বস্ত। আর ধার্মিক। এথিন নামে এক তান্ত্রিক লামার শিষ্য মং ছিং ।

আমি চায়ের কাপ তুলেছি, চুমুক দেওয়ার আগে আমার হাত শূন্যে থমকে গেল। বললাম, এথিন লামা মানে- নীচের ওই বৌদ্ধ মঠে থাকে ? হ্যাঁ। তুই চিনলি কি করে? মিলি খালার এবার অবাক হওয়ার পালা।

গর্জনিয়া আসার সময় বাসে দেখা হয়েছে। বললাম। চায়ে চুমুক দিলাম। ও। জানিস আবীর। ভিক্ষু এথিন নাকি শূন্যে ভাসতে পারে। তাই? এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। এথিন লামার সঙ্গে কত কথা হল, কই এ ব্যাপারে তো সে কিছু বলেনি । অকাল্ট সায়েন্স নিয়ে মিলি খালার বেশ আগ্রহ আছে। মিলি খালার লাইব্রেরিতে অকাল্ট সায়েন্স বিষয়ক অনেক বই আছে। এথিন লামা সম্বন্ধে তার জানারই কথা।

মিলি খালা বলল, মং ছিং নাকি এথিন লামাকে একবার উড়তে দেখেছে। আমি জিগ্যেস করলাম, সত্যি কি তিব্বতের লামারা উড়তে পারে? মিলি খালা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, না। সবাই পারে না। কেউ কেউ পারে, যাদের কাজ হল পৃথিবী থেকে অশুভ শক্তি দূর করা, শুধু তারাই পারে । আর যখন কেউই লামাদের আকাশে উড়তে দেখেনি তখন অবিশ্বাস করার কোনও মানে হয় না।

তুমি কখনও এথিন লামাকে উড়তে দেখেছ? না। তবে মং ছিং উড়তে দেখেছে। মং ছিং মিথ্যে কথা বলার লোক না। অন্তত আমাদের কাছে । তিব্বতের লামাদের ওপর লেখা তোকে একটা বই দেব পড়তে। বইটা পড়লেই সব বুঝতে পারবি। আমি কি বলতে যাব … দূর থেকে একটা মেয়েকে আসতে দেখলাম। পরনে ফোলা সাদা শার্ট আর নীল রঙের লং স্কার্ট । পায়ে কেডস। মুখটা খুব চেনা চেনা ঠেকল।

মেয়েটা কাছে আসতেই আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম। মেয়েটি বেশ লম্বা। এক মাথা কোঁকড়া চুল। শ্যামলা মিষ্টি চেহারা। চোখে চশমা। ছোট খালা বলল, আবীর। এ হল শান্তা। এবার এইচ এস সি দিল। আমার এক বান্ধবীর মেয়ে। শান্তারা সিলেট থাকে। শান্তা আজ সকালেই এসেছে। কিছুদিন বেড়াবে এখানে।

ওহ! আমার শরীরে হিমস্রোত বয়ে যায়। শান্তাকে আমি এর আগে দেখেছি। তবে ঠিক সামনাসামনি নয়, রোমেলদের পারিবারিক অ্যালবামে শান্তার ছবি দেখেছি। সিউর। আমার ভুল হওয়ার কথা না। রোমেলকে আমি জিগ্যেস করেছিলাম, এই মেয়েটির কি নাম রে? রোমেল  বলল, শান্তা। আমার খালাতো বোন স্বপ্নার বান্ধবী। (স্বপ্নারা সিলেট থাকে, রোমেলের কাছেই জেনেছি …)

আমি বললাম, কী মায়াবী চেহারা। রোমেল বলল, গত বছর শান্তারা সপরিবারে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিল। শান্তার এক মামা রামুতে থাকেন। কক্সবাজার থেকে রামুতে যাওয়ার সময় রামুতে একটা বৌদ্ধবিহারের কাছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে শান্তাসহ সবাই মারা যায়। শান্তাকে দেখে এটাই আমার চমকে ওঠার কারণ। আমি ঘামতে থাকি। আমার গলা ভীষণ শুকনো ঠেকছে।

মিলি খালা বললেন, আয় শান্তা। বস । চা খা। শান্তা বসল। বসে মেয়েটি আমার দিকে সরাসরি তাকাল। কী শীতল দৃষ্টি। মনে হল আমি যে ওর ছবি দেখেছি সেটা ও জানে। মিলি খালা বলল, অনেক দিন থেকেই শান্তাকে এখানে আসতে বলছি। এদ্দিনে সময় হল। শান্তার এক মামা রামু থাকেন । ভদ্রলোক সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। তিনিই আজ সকালে শান্তাকে নামিয়ে দিলেন। দু-তিন দিন পর আবার নিয়ে যাবেন। আমি ঘামছি। শান্তার দিকে তাকিয়ে মিলি খালা বলল, এ হল আমার বড় আপার ছেলে। আবীর। আবীরও এবার এইচ এস সি দিল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে লনে ফুটফুটে জোছনা ছড়াল। ছোট খালা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা বসে গল্প কর আবীর। আমি দেখি মং ছিং রান্নার কদ্দূর কি করল। আজ ছোট আলু দিয়ে খরগোশ রাঁধব। ছোট খালা চলে যাওয়ার পর চারিদিকে তাকিয়ে শান্তা বলল, কী সুন্দর জোছনা। চল, এখানে বসে না থেকে হেঁটে আসি। বলে উঠে দাঁড়াল।

আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়ালাম। শান্তার সঙ্গে আমার দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না । লনের ওপর পাশাপাশি আমরা হাঁটছি। লনের ঘাসে আমার লম্বা ছায়া পড়লেও শান্তার ছায়া পড়েনি। আমার কেমন শীত শীত করে। ফুরফুরে বাতাস বইলেও কেমন এক আঁষটে গন্ধ পাচ্ছি। আজ এথিন লামা আমাকে বলল, খুব শিগগির নাকি আমি এক ডাকিনীর খপ্পড়ে পড়ব। আমি ডানবাহু স্পর্শ করি। নীলশঙ্খের স্পর্শে স্বস্তি বোধ করি ।

 

১ম পর্ব সমাপ্ত

ভয়ংকর ভুতুরে ছবি

1

দুর্বল মনের মানুষ দয়া করে এ ছবি গুলো দেখবেন না, যে কোন সময় হার্ট এটাক হতে পারে । 😉

যারা ভুতকে ভয় পায় না তাদের জন্য এই ছবির প্রদর্শণী । যার যে ছবি টা ভালো লাগে, কমেন্টস এ লিখুন, আর কোন ছবি টা দেখে সব চাইতে বেশি ভয় পেয়ছেন তা লিখতে ভুলবেন না যেন । তো দেখতে থাকুন সব ভয়ংকর ভুতুরে ছবি ।

বি:দ্র: ভয় না পেলেও দয়া করে জানাবেন !

“প্রতিটি ছবিই চলমান(এনিমেটেট .জিআইএফ ফরমেটে) তাই ছবিতে ক্লিক করে দেখলে ভালো করে দেখতে পারবেন । যেকোন ছবিতে ক্লিক করলে তা বড় আকারে প্রদর্শিত হবে আর পরবর্তী ছবি দেখার জন্য শুধু বর্তমান ছবির উপর ক্লিক করলেই হবে ।”

বীভৎস নারী

0

ঘটনাটি খুব ছোট। কিন্তু সেদিনের পর থেকে তা আমার জীবনের কয়েকটা কাজকর্ম আমূল পাল্টে দেয়।

আমি গ্রামের ছেলে। মফঃস্বল শহরে একটা কলেজে পড়ার জন্য গ্রাম ছেড়ে মফঃস্বলে চলে আসি। এখানে আমার এক কাকার বাসায় থাকতাম।

যাই হোক, ছুটি ফাটা বা বৃহস্পতিবার কলেজ শেষে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতাম। একদিন থেকে পরের দিন সকালে চলে আসতাম ক্লাস ধরার জন্য।

তেমনি করে এক বৃহস্পতিবার আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই। কলেজে ব্যাবহারিক ক্লাসের কিছু কাজ থাকায় বের হতে একটু দেরি হয়ে যায়। ঠিক ৫ টার দিকে বাসে উঠি আমি। বাড়ি ১ ঘণ্টার রাস্তা। অর্থাৎ, সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আমি ৬ টার দিকেই গ্রামের রাস্তায় পৌঁছে যাবো।

বলে রাখা দরকার, তখন শীতকাল ছিল। যারা গ্রামে থাকেন তারা জানেন যে, শীতকালে গ্রামে-হাটে যাত্রাপালা, নাটক ফাটক বেশি হয়। আমি যখন গিয়ে বাস থেকে নামি তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাতের আলোতে দেখলাম গ্রামের বাজারে শহর থেকে একদল নাট্যকর্মী গেছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতি ছোট বেলা থেকেই আমার বেজায় ঝোঁক। অনুষ্ঠান দেখলাম প্রায় ২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। রাত তখন সাড়ে ৮টা বাজে প্রায়। আর দেরি করলে মা চিন্তা করবে। এখানে বলে রাখা ভালো, তখনো আমার গ্রামে মোবাইল এতো একটা জনপ্রিয় ছিল না। তাই চাইলেও আমি মাকে ফোন করে জানাতে পারছিলাম না। অগত্যা বাড়ির দিকে রওনা হই।

বাজারের সব মানুষই তখন নাটক দেখতে ব্যাস্ত। পথে চলতে চলতে লক্ষ্য করলাম, প্রায় সব দোকানই বন্ধ করে দোকানিরা গেছে নাটক দেখতে। এমনকি হাঁটার পথে কারো সাথে যাবো এমন মানুষও দেখলাম না। মাথার উপর বিরাট থালা আকৃতির চাঁদ। বিসমিল্লাহ বলে হাঁটা দিলাম।

আমাদের বাজার থেকে বাড়ি প্রায় মাইলখানেক। হেঁটে যেতে ২০ মিনিটের মতো লাগে। আমি নিজের মনে গুনগুন করতে করতে হাঁটতে লাগলাম। মিনিট পাঁচেক হেঁটেছি, এমন সময় রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে খসখস আওয়াজ পেলাম। প্রথমে ভাবলাম মনের ভুল। পাত্তা না দিয়ে হেঁটে এগুতে লাগলাম। মিনিটখানেক সব চুপচাপ। এরপর আবার রাস্তার পাশে কেমন যেনও খসখস শব্দ হলো। এবার খানিকটা ভয় পেলাম। রাতের বেলা গ্রামের পথে শেয়াল চলাচল করে। একা মানুষ পেলে নাকি মাঝে মাঝে আক্রমণ করে বসে। শেয়াল তাড়ানোর জন্য গ্রামের মানুষ লাইট, টর্চ লাইট, নিদেনপক্ষে আগুন নিয়ে ঘুরে। আমার কাছে তার কিছুই নেই। কি করা যায় ভাবছি। এই অবস্থায় যথা সম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। সাহস হারানো মানে ক্ষতি হবার সম্ভবনা। মনের সব জোর একত্রে করে বলাম, “হুর হুর হুস হুস”! একটা-দুটো হলে হয়তো গলা শুনেই চলে যাবে। এই ভেবে এমন করা। ঝোপের পাশের আওয়াজ থেমে গেলো একবারে। হটাত করে চারপাশে নেমে এলো সুনসান নীরবতা।

আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই ক্ষণটা। ঝোপের পাশ থেকে সাদা কাপড় পড়া একটা মহিলা মতন কে যেনও বের হয়ে এলো। তার উচ্চতা সাধারন মানুষের দ্বিগুণ হবে কমপক্ষে। প্রথমে ভাবলাম চোখে ভুল দেখছি। কিন্তু চেহারার দিকে তাকাতেই মনের ভুল ভেঙ্গে গেলো।

চাঁদের আলোতে চারপাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সেই আলোয় দেখলাম, বীভৎস এক মুখ। চোখের জায়গাটা গর্ত, কিন্তু কোনও মণি নেই। কপালের মাঝখান বরাবর এক দগদগে ঘায়ের মতো। সেখান থেকে একটি চোখ জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হাতগুলো শরীরের দিকে কেমন যেনও বাকা হয়ে আছে। অনেকটা পোলিও আক্রান্ত মানুষদের মতো। চিকন চিকন হাত। মুখ ঘুরে আমার চোখ আসলো সেই মহিলার পায়ের দিকে। দেখলাম পায়ের পাতা পিছন দিকে বাঁকানো। আমার আর বুঝতে অসুবিধা হল না যে আমি কিসের পাল্লায় পড়েছি। যেনও আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেই আমার দিকে তাকিয়ে কুৎসিত একটা হাসি দিলো সেই মহিলা। এরপর মাথাটা নিচের দিকে দিয়ে পা শরীরটাকে হেঁচড়ে হেঁচড়ে আসতে লাগলো আমার দিকে। আমার এদিকে ভয়ে দম বন্ধ হয়ে যাবার দশা। প্রানপনে চেষ্টা করছি সুরা কালাম পড়ার। কারণ মা বলতো, এসব আসে পাশে আসলে বা উপস্থিতি টের পাওয়া গেলে সুরা পড়তে হয়। সুরা পড়লে এগুলো চলে যায়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, অজানা এক ভয়ে আমার তখন বেহুশ হবার অবস্থা। কোনও সুরা তো মনে পড়ছেই না উল্টা চিৎকার করার শক্তিও যেনও হারিয়ে ফেলছি। নিজেকে বাঁচানোর কোনও আশা দেখছিলাম না।

মহিলাটা এগিয়ে এসে এক হাতে আমাকে ধরতে নিলো। কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে আমাকে ধরার সাথে সাথে “ঘুত” টাইপের একটা আওয়াজ করে ছিটকে পিছিয়ে গেলো। আমি কিছু বুঝে পেলাম না। দেখলাম, সেই মহিলা আতঙ্কিত হয়ে আমার গোলার কাছের আল্লাহু লেখা তাবিজটির দিকে তাকিয়ে আছে। ঘটনা বুঝতে আমার ২ সেকেন্ড সময় লাগলো। বুঝতে পারলাম, আল্লাহর নাম দেখে সে আমাকে ধরতে পারছে না। মনে মনে মাকে ধন্যবাদ দিলাম। মা বলতো ছোট বেলায় একবার আমাকে নাকি নিয়ে যাওয়ার জন্য জীন এসেছিলো। তার পর থেকে আমার গলায় এই তাবিজটা থাকতো। আমি কখনো খুলতাম না।

এই ফাঁকে হটাত দূরে কিছু মানুষের আসার আওয়াজ শোনা গেলো। তাকিয়ে দেখলাম হাতে টর্চ লাইট নিয়ে কারা যেনও আসছে। আমি লোকগুলোর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে মহিলাটির দিকে তাকালাম। আমার দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে সেই মহিলা বলল, “আজকে বেঁচে গেলি। পরেরদিন দেখবো তোকে কে বাঁচায়!”

এই বলে আমার চোখের সামনে সেটি কুণ্ডলী পাকিয়ে একটি সাদা ধোঁয়ায় পরিণত হল। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। জ্ঞান হারালাম।

যতদূর শুনেছিলাম, বাজার থেকে নাটক দেখে ফেরার পথে কিছু লোক আমাকে পেয়ে সেই রাতে বাসায় পৌঁছে দেয়। আমি প্রায় ৪-৫ দিন অচেতন হয়ে বাসায় পরে ছিলাম। সেই সময় নাকি প্রতি রাতেই আমাদের বাসার চালে প্রচুর পরিমাণ ঢিলের আওয়াজ হতো। কে বা কারা একনাগাড়ে ঢিল দিতো, বাড়ির পাশের বাগানে গাছপালা ভাঙার শব্দ পাওয়া যেত। আমি এইসময়ে খুব দুর্বল হয়ে পড়ি। স্বাস্থ্য ফিরে পেতে আমার প্রায় ২ মাস সময় লাগে।

ঘটনাটি জানিয়েছেনঃ আহসান সেলিম অরণ্য (Ahsan Selim Oronno)

আহসান সেলিম অরণ্য বলেছেনঃ ঘটনাটি আমার কাকাতো ভাইয়ের সাথে ঘটেছিলো। এটা আমার নিজের জীবনের ঘটনা নয়। তবে উপরোক্ত ঘটনা সত্য এবং আমি নিজেও এর একজন সাক্ষী।