! ! ! অবশেষে ভূত দেখলাম ! ! !

6

ভূত দেখার শখ কার নেই ? এমন লোক খুজে পাওয়া দূস্কর । ভূত আছে কি নেই তা নিয়েও ৯৯% মানুষ দ্বিধাদ্বন্দে ভোগেন । কিন্তু চরম বাস্তবতা হলো ভূত বলে কিছু নেই । আছে শুধু মানুষের মত একটি জাতি আর তা হলো জ্বীন জাতি । মানুষের যেমন নারী পুরুষ দুটি জাত আছে, তেমনি জ্বীনদেরও আছে জ্বীন ও পরী দুটি জাত । আপনাকে এটি বিশ্বাস করতেই হবে যদি আপনি ঈমানদার হন । মানুষের মধ্যে যেমন ভাল মন্দ উভয় প্রকার লোক থাকে তেমনি জ্বীনদের মাঝেও ভাল মন্দ উভয় প্রকার জ্বীন থাকে ।
থাক সেসব কথাঃ আসল ঘটনাটা বলছি শুনুন ।
প্রতিবছর রমজান মাসে আমার একটা দায়িত্ব পড়ে যায় আর তা হলো- মসজিদের মাইকে শেষ রাতে অর্থাত্‍ সেহরীর সময় এলাকাবাসীকে শব্দ যন্ত্রের মাধ্যমে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা । আর তাই মসজিদের একটা চাবিও দেয়া হয়েছে আমাকে । আমি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় রাত ০২:৩০ মিনিটে মসজিদে গিয়ে এই কল্যানমূলক কাজটি করি । এতদিন কোন সমস্যা হয়নি । আর অসম্ভব ঘটনাটা ঘটলো গতকালই । গতকাল রাতে মসজিদের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে লাইট অন করে দিলাম । শব্দ যন্ত্রটা যেখানটায় আছে সেদিকে গেলাম । আমি যন্ত্রটার পাওয়ার সুইচ অন করে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে যথারীতি উঠুন জাগুন সেহরী পাক করুন সেহরী পাকের উত্তম সময় হয়ে গেছে এখন রাত ০২ টা ৩০ মিনিট ।
এরপর একটা ইসলামী সঙ্গীত শুরু করলাম- আমি কোরআনের সুর মাঝে শুনেছি যে নাম আযানের সুর মাঝেও শুনেছি ও নাম . . . . . . . .
হঠাত্‍ আমার নজর পড়লো মসজিদের মেহরাবের কাছে । দেখি সাদার চেয়েও অনেক বেশি সাদা রঙ্গের পাঞ্জাবী পরা লম্বা ফর্সা অনেক সুন্দর চেহারার এক অপরিচিত লোক নামাজ আদায় করছে । এই দেখে ভয়ে আমার গান গাওয়া কখন থেমে গেছে জানিনা । হার্ট এটাক হওয়ার উপক্রম । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । শরীরের সমস্ত লোম খাঁড়া হয়ে গেছে । ঘামে ভিজে গেলাম তবুক চাতক পাখির ন্যায় অপলক চেয়ে আছি লোকটার দিকে ।
কিছুক্ষন পর লোকটা সালাম ফিরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিলেন । আমি কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে মাইক্রোফোনটা রেখেই দিলাম দৌড় বাড়ী অভিমুখে । এত বেশি ভয় পেয়েছিলাম যে পায়ের জুতাজোড়াও আর নেইনি । বাড়ীতে ঢুকেই কযেক গ্লাস পানি খেলাম । আর ঘটনাটি বাড়ীতে সবার কাছে গোপন রাখলাম । আপনাদের কাছে শেয়ার করলাম । জানিনা ঠিক করলাম কিনা ?

ভয়

1

বিকেল বেলা আকাশটা খুব পরিস্কার ছিল। আকাশে ছিটে ফোটা মেঘও ভাসতে দেখিনি। লাল হতে হতে সূর্যটা যখন বিদায় নিলো তখনো ছিল মেঘ মুক্ত স্বচ্ছ আকাশ। আমার ঘরে বিদুৎ নেই মাস খানেক যাবৎ। বিদুৎ অফিসের লোকজন মিটার খুলে নিয়ে গিয়েছে। তাদের দাবী আমি নাকি গত পাঁচ মাস বিদুৎ বিল দিচ্ছি না। তাদের এতো করে বললাম যে আমার কাজের ছেলে হানিফ মিয়া প্রতি মাসে বিল দিয়েছে, তারা আমার কথা বিশ্বাস করলো না। বাধ্য হয়ে হানিফ কে ডাকলাম। অবাক কান্ড হানিফকে কোথাও খুজে পেলাম না। অথচ গত চার বছর সে আমার কাছে ছিল।

হানিফের বিস্থতা প্রশ্নাতিত ছিল। সে কি শুধু বিদুৎ বিল মেরেছে নাকি আরো কিছু করেছে?

ডজন খানেক মোমবাতি কিনে ছিলাম। সাথে হারিকেন আর কেরোসিন তেল। মোমবাতি শেষ, তাই হারিকেনের লাল আবছা আলোয় বসে তিন দিনের বাসি পেপার পড়ছি।

অজপাড়া গা না হলেও এই গ্রামটা থানা সদর থেকে অনেক দুরে। রাস্তা ঘাট তেমন সুবিধের না। কাচা মাটির রাস্তার উপর ইট বিছিয়ে দেওয়া হয়ে ছিল। তবে সেই ইট এখন আর তেমন একটা নেই, আছে কেবল মাটি।

আমার বাবা কবি ছিলেন। তিনি শেষ জীবনটা গ্রামে কাটাবেন বলে এই সেমিপাকা বাড়িটা করে ছিলেন। কিন্তু তিনি শেষ জীবনটা কাটাতে পারেন নাই। কারন বাড়ির কাজ শেষ হবার আগেই তিনি এই বাড়িতে আসার পথে বাস দুঃর্ঘটনায় মারা যায়। তখন আমি স্কুলে দশম শ্রেনীতে পড়তাম। বাবার সরকারী চাকুরি ছিল। মা পেনশন আর জমানো টাকা দিয়ে আমাদের বড় করেন। আমরা তিন ভাই। সবাই ভাল চাকুরি করছি। ছোট দু’ভাই শহরে বেশ ভাল রোজগার করছে। তবে বাবার ইচ্ছে পুরন করার জন্য আমি এই গ্রামে পড়ে আছি। আমার শহরের বন্ধুরা আমাকে পাগল ভাবছে। ওদের ধারনা আমার মাথার স্কু ঢিলা আছে। তবে আমি স্কু নিয়ে ভাবছি না। আমার মায়ের ধারনা বাবার সব কিছু আমি পেয়েছি। সে আমাকে নিয়ে বেশ বিচলিত। তবে আমার খুব ভাল লাগছে এখানে থাকতে। আমি স্থানীয় কলেজের বাংলায় অধ্যাপনা করছি।

প্রতিদিন পুরো পত্রিকা পড়া আমার নেশা কিন্তু দুঃখের ব্যাপার এখানে সঠিক সময় পত্রিকা পৌছায়না। পিয়নটাও বজ্জাত কখনো কখনো তিন চার দিনের পত্রিকা এক সাথে দিয়ে যায়।

দু’দিন পর আজ বিকেলে পিওন পত্রিকা দিয়ে গেল। বাসি পত্রিকাই মনোযোগ দিয়ে পড়তে ছিলাম, হটাৎ করেই ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলো। ধপাস করে জানালার কবাট আছড়ে পড়ল। বিকট শব্দ হল। খোলা জানালা দিয়ে প্রবল বাতাস ঘরে ঢুকে সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে যেন। আমি দ্রুত জানালা বন্ধ করে ফেললাম। আশে পাশে কোথাও ব্যাপক শব্দে বাজ পড়ল। বিদুৎ চমকাচ্ছে খুব। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। আকাশে মেঘ জমার ফলে অন্ধকার এত গভির। আধার আমার ভাল লাগে। গভির রাতে আমি জানালা খুলে আধার দেখি। হানিফ অবশ্য আধার খুব ভয় পায়। ওর ধারনা এ বাড়িতে একটা মেয়ে ভুত আছে। যে সাদা শাড়ি পড়ে ঘুরে বেড়ায়। ভুতটার বয়স বেশি না। উনিষ কুড়ি বছর হবে। তবে সে ভয়ানক সুন্দরী। পুকুর ঘাটে প্রায়ই রাতে তাকে দেখা যায়। হানিফ ভুতের ভয়ে অস্থির!

আমি ছোট বেলায় মায়ের মুখে অনেক ভুতের গল্প শুনেছি। তাই হানিফের গল্প বেশ পরিচিত মনে হয়েছে। আমি জানি ভুত বলতে কিছু নেই। সবি দূর্বল চিত্তের মানুষের কল্পনা মাত্র।

 

হানিফ এই গল্প সারা গ্রাম ভরে শুনিয়েছে কিনা কে জানে? পরসু সন্ধায় চায়ের দোকানদার ফজুলু মিয়া আমাকে ডাকলো,কাছে যেতেই মোলায়েম স্বরে বললো

বাবাজি ভালো আছোনি?

জ্বি। ভালো।

বসো, চা খাও।

না চাচা, আমার হাতে সময় নেই।

এবার তিনি সিরিয়াস ভংঙ্গিতে বললেন, কি দরকার বাবা ঐ অভিশপ্ত বাড়িতে একলা পড়ে থাকার ! তুমি শহরের মানুষ তোমার কি এত বড় রিস্ক নেওয়া ঠিক হইতাছে? ভুত-প্রেত কি বাবা শিক্ষিত দেইখা তোমারে সুযোগ পাইলে ছাইড়া দিবো?

এ ব্যাপারে অন্যদিন কথা বলবো আজ আমার হাতে সময় নেই।

আমি মুচকি হেসে চলে আসায় ফজুলু কাকা বেশ আহত হল।ফজলু মিয়া খুব সুন্দর করে গল্প বলে, তার চায়ের দোকানের কাষ্টমার গণ খুব ভাল ¯্রােতা। ভুত-প্রেত নিয়ে তার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া দু একটা গল্প সে হয়ত আমাকে শুনাতে চেয়ে ছিল। কিন্তু বিকেল বেলা আমার কফি খাওয়ার নেশায় ধরে তাই তাকে রেখে চলে আসি। ফজলু মিয়া বিরবির করে কি যেন বললো। বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। কিন্তু পিছন ফিরে তাকাইনি।

 

পত্রিকা থেকে চোখ সরিয়ে আমার রুমে পূর্ব দিকের কোনায় তাকালাম। বাতাস প্রবেশের জন্য যে ফাঁকা জায়গা রয়েছে সেখানে একটা চড়–ই পাখি বাসা বেধেছে। পাখিটা প্রতিদিন আমার কাজ কর্ম মনোযোগ সহ লক্ষ করে। আজ চড়–ই পাখিটাকে দেখছি না। সে হয়ত তার কোন আতিœয়র বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। আচ্ছা পাখিদের কি আতিœয়র বাড়ি আছে? নাকি সেও ভুতের ভয়ে চলে গিয়েছে!

আমার বাবা বাড়িটা বেশ বড় করেই তৈরী করে ছিলেন। সামনে পুকুর ঘাট। আর উত্তরের দিকে ফুলের বাগান। দক্ষিনে ফাকা মাঠ। সুযোগ পেলে আমি মাঠে গিয়ে বসি। তেমনী গতকালও বসে ছিলাম। তখন মিজান এসে আমার সামনে দাড়ালো। মিজান এই গ্রামেরই ছেলে। বয়স ১৭ বছর হবে। সে কৃষি কাজ করে। আমি বললাম কি কেমন আছ মিজান? মিজান বললো আপনী অনেক সাহসী, না?

হেসে বললাম না, আমি একটা ভিতুর ডিম! মিজান বললো আমি অনেক দিন ধরে গরু চরাই কিন্তু আপনাদের মাঠে এত ঘাস থাকলেও গরু বাধতে পারি না। আমি অবাক হয়ে বলি কেন?

মিজান নিচু স্বরে বলে, যত বারই গরু বাধি এসে দেখি রশি ছিড়ে গরু পলাইছে। এমন কি আপনাগো বাড়ির সামনে দিয়ে গরু নিয়ে যাবার সময় গরু দৌড় দেয়!

আমি হেসে বললাম তোমার গরুর দৌড় দেয় কেন? ও অবাক হয়ে বললো কেন দেয় আপনী জানেন না? আমি মাথা দুলিয়ে বললাম নাতো? কেন দেয়?

ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো, আপনাদের বাড়িতে ভুত আছে। গরুরা ভুত দেখতে পায় তাই ওরা দৌড় দেয়।

আমি বললাম এমন আজব তথ্য তুমি কোথা হতে পেলে? ও আহত হয়ে বলে ,আমার দাদা বলেছে। দাদা ভুতের ওঝা সে সব জানে। তার দাদা ওঝা বলে মিজানের চোখে খুব অহংঙ্কার। কিন্তু আমি তার বা দাদার সর্ম্পকে কোন আগ্রহ না দেখানোয় সে খুব আহত হয়। আমার উপর রাগ করে চলে যায় মিজান। আমি ছেলেটার রেগে চলে যাওয়া দেখে ভাবি সত্যি পৃথীবিতে সবাই তাদের কাঙ্খিত মূল্যায়ন টুকু চায় না পেলে আহত হয়।

ধপ করে হারিকেন নিভে গেল। ভাবনায় ছেদ পড়ল। টেবিলের ড্রয়ারে আমি নিজ হাতে ম্যাচটা রেখেছি কিন্তু এখন খুজে পাচ্ছিনা। কালো অন্ধকারে চারপাশ ছেয়ে গিয়েছে। দু’চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। কে যেন আমার রুমে প্রবেশ করল। হাটা চলার শব্দ পাচ্ছি। পায়ের নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ শুনছি। কিন্তু কাউকে দেখছি না। বুকের ভেতর আচমকা শূন্যতা অনুভব করছি। ভয় লাগছে। ভীষন ভয় পাচ্ছি। কে যেন আমার কাধে হাত রাখল। ভয়ানক ঠান্ডা সেই হাত। ভাবছি দরজা খোলার শব্দ পেলাম না কিভাবে ঢুকলো আগন্তুক!!

ভুত পোষা

0

এ লেখাটি আমি ক্লাস এইট-এ পড়াকালীন সময়ে লিখে ছিলাম । কিন্তু কোথাও প্রকাশ করিনি । “ভুতের-ব্লগ”-এ এটি প্রথম প্রকাশিত হল আর লেখাটি আমি ভুতের ব্লগের পরিবারবর্গ কে উৎসর্গ করলাম ।
———————————————————————-
১.
তখন আমি ক্লাস ফাইভ এ পরতাম । আমাদের গ্রামের বাড়ির এক স্কুলে । স্কুলটি ছিল জমিদার আমলের, যার কারণে ক্লাসগুলোতে অনেক ফাঁকি দেওয়া যেত । যেমন নাম কল করার পর কেউ কেউ ভাঙ্গা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেত । তাদের প্রধান ছিল শান্ত । নামে শান্ত হলেও আসলে সে কিন্তু শান্ত ছিল না, তাই ড্রিল টিচার প্রায়ই তাকে শাস্তি দিতেন আর ডাকতেন অশান্ত বলে । তাকে ভয় পেত না এরকম বুকের পাটা আমাদের কারও ছিল না, তাই পালিয়ে গেলেও কেউ ভয়ে বলত না ।
একদিন সে ক্লাসের সবাইকে বলল, আমি তোমাদের ভুতের বাচ্চা দেখাব । আমরা তো সবাই হেসেই খুন, ভুতের বাচ্চা হা…..হা…..হা… ; ক্লাসের সবাই হাসছে কিন্তু আমার হাসিটা মনে হয় একটু বেশি শব্দে হয়ে গিয়েছিল, তাই আর কাউকে লক্ষ্য না করে, শান্ত আমাকে ধমকের সুরে বলল, দেখ হাসবি না বলছি, এমন ঠেঙ্গানি দেব না যে নিজের নাম ভুলে যাবি । আমি আমার হাসি থামাতে না থামাতেই ক্লাসে টিচার চলে এলেন ।
এক এক করে যখন শেষ ঘণ্টা এলো তখন খবর পাওয়া গেল আমাদের শেষ ঘণ্টায় অন্য স্যার আসছেন । কারণটা অবশ্য জানা যায়নি । এমন সময় এলেন শফিক স্যার, তিনি যেমন মেজাজি তেমনি কড়া । তিনি বললেন আমি তোমাদের একটি অনুচ্ছেদ লিখতে দেব । আমরা তো পড়লাম মহা মুশকিলে, তিনি আবার কারো কথা শুনবেন না । কিছুক্ষণ পর তিনি লিখতে দিলেন “শিমুল গাছের প্রয়োজনীয়তা”।                                                                          আমরা    তো  অবাক হঠাৎ করে শিমুল গাছ  নিয়ে লেখা চাট্টিখানি কথা নয় । তাও আবার প্রয়োজনীয়তা । ক্লাসের ছাত্র হিসেবে আমি ছিলাম মধ্যম, তাই পাশের জনেরটা না দেখে উপায় ছিল না । দেখছি আর লিখছি, লিখছি আর দেখছি । এমন সময় পেছন থেকে স্যার আমার কানটা টেনে ধরলেন, আর রাগে গরগর করতে লাগলেন । তারপর অনেক চেষ্টা করেও বাঁচতে পারলাম না । স্যার তার বেত দিয়ে ধমাধম কয়েকটা বেত্রাঘাত করলেন । এরপর সারা ক্লাসে কান ধরে দাড়িয়ে থাকতে হল ।

ছুটি হয়ে গেলে সবাই হৈ হুল্লোড় করতে লাগল কিন্তু আমার মনটা খারাপ । আমার মনের অবস্থা দেখে শান্ত বলল চল্ তোকে ভুতের বাচ্চা কিনে দেব । তুই ইচ্ছা করলে বাড়িতে পুষতে পারবি, যা হুকুম দিবি তাই করে দেবে । আমি বললাম, তোর কি মথা খারাপ হয়েছে, এটা কি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ যে,যা চাইব তা-ই পাব । শান্ত উত্তর দিল, কেন তোর বিশ্বাস হচ্ছে না? চল্ আমার সাথে । সে আমাকে এক প্রকার জোড় করেই নিয়ে গেল ।
যেতে যেতে এসে থামল আমাদের গ্রামের পুরনো এক মন্দিরে । এখানে নাকি আজ ভুতের মেলা হবে আর অনেক বাচ্চা ভুত এতে অংশ নিবে, ঠিক “নতুন কুড়ি” অনুষ্ঠানের মত এবং এ মেলা থেকে অনেক বাচ্চা ভুত হারিয়ে যাবে । আমরা সেই বাচ্চা ভুতদের একটি কীডন্যাফ করবো, বুঝলি? শান্ত বলল । আমি বললাম, না, বুঝি নাই । শান্ত উত্তর দিল, থাক তোর ওসব বুঝে কাজ নেই, এখন যা বলি তাই কর
-কি করব?
-আমার ব্যাগটা রাখ আর তুই এখানে দাড়িয়ে থাক । আমি যাব আর আসব ।
শান্ত আমাকে মন্দিরের বাইরের রাস্তায় দাড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল ।

২.
প্রায় আধ ঘণ্টা হয়ে এলো তাও শান্ত ফিরছে না । কারণটা কি? নিজের চোখে দেখার জন্য মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়লাম । অনেক পুরনো মন্দির, কেউ বোধ হয় এখানে আর আসে না । কিন্তু ভিতর থেকে ধুয়ার কুণ্ডলী বের হচ্ছে । ভিতরের এক কুঠুরি থেকে শব্দ আসছে গরর…র…র..হুশ…হুশ….যা…যা….ঢুক….ঢুক………. ভিতরে ঢুক । শব্দ শুনে কুঠুরিটা চিনতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কিন্তু ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাচ্ছিল । কুঠুরিতে ঢুকতেই শান্ত আমাকে ইশারায় ওর মত চন্দ্রাসনে বসতে বলল । আমি তাই করলাম । দেখি ২ হাত লম্বা দাড়িওয়ালা আলখেল্লা পরা এক জন বুড়ো আমার সামনে বসে আছেন । তার সামনে একটি কৌটা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে । আমি বললাম, আচ্ছা এখানে না “নতুন কুড়ি” হওয়ার কথা, ভুতের মেলা, বাচ্চা কিছু-ইতো দেখতে পাচ্ছি না । শান্ত ফিসফিসিয়ে বলল, হিস…সসস, একদম চুপ, পরে কথা হবে, দেখছিস না সাধু বাবা ধ্যানে বসেছেন ।
-আমি বললাম, কোথায়? তাকে তো আমি দিব্যি ঝিমুতে দেখছি ।
-শান্ত অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ধ্যাৎ কি যে করিস না ধ্যানে বসেই ভুতের বাচ্চা কীডন্যাফ করতে হয় । কেন তুই জানিস না? তুই এভাবে ডিস্টার্ব করলে ভুতের বাচ্চা তো দূরে থাকুক পরে আমরাই ভুত হয়ে ফিরব ।
সাধু বাবা এবার মুখ খুললেন, চোপ বেত্তমিজ, না লায়েক, তোদের জন্য হাত ফসকে একটা বেরিয়ে গেল, দুটো ধরেছিলাম । এই নে, হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছি, শিশি এনেছিস?
শান্ত বলল, জ্বি না, শিশি আনি নাই । মনে হল সাধু বাবা খুবই বিরক্ত হলেন, রাগান্বিত স্বরে তিনি বললেন, ভুত কিনতে আসছিস আর শিশি আনিস নাই মানে? এখন তোর মুখের মইধ্যে নিবি, বেয়াকুব? আমি বললাম, না ভুতবাবা ও মুখে নিতে রাজি হবে না কারণ, শুনছি ভুতেরা পেছাব করে দেয়, যদি মুখে নিলে ওর মুখে..মানে, বলছিলাম আমার কাছে পানির ফ্লাক্স আছে । শান্ত আমার কথায় প্রথমে রাগ করলেও পরে পানির ফ্লাক্স এর কথা শুনে রাগ দমে নিল । সাধু বাবা উত্তর দিলেন, ঠিক আছে পানির ফ্লাক্স দে, আপাতত এটাতেই রাখ আর আমি ভুতবাবা না, আমি সাধু বাবা । সাধুবাবা পানির ফ্লাক্স এ ভুতের বাচ্চাটা রাখলেন আর বললেন, এবার আমার মওকাটা দে, একশত পাঁচ টাকা চাইর আনা পাঁচ পাই আর শোন এটা হচ্ছে মেছো ভুতের বাচ্চা । তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজ, এর এক চোখ কানা তাই সবাই একে কানাভুত বলে ডাকে । সকাল বিকাল পুকুরে বা নদীতে চুবিয়ে রাখলে এটা আপনা থেকেই মাছ ধরে খেতে পারবে । তবে আধ ঘণ্টার বেশি চুবিয়ে রাখলে এটা মাছ মানে মাছভুত হয়ে যাবে ।
শান্ত তার পকেট থেকে ৭০ টাকা বের করল । তার কাছে আর নেই তার মানে বাকিটা আমাকে দিতে হবে । কিন্তু চার আনা পাঁচ পাই কোথায় পাব । সাথে তো নেই, এদিকে সাধু বাবা বেকে বসলেন । অবশেষে ১৭০ টাকা দিয়ে তবে মুক্তি । বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় আটটা বাজতে চলল । শান্ত কানাভুত টাকে আমার কাছে দিয়ে বলল, দেখ তুই তো জানিস আমার বাবা ট্রাক চালায় তার মাথা সব সময় ঠিক থাকে না । মা মারা যাবার পর থেকে এমনটা হল । এটাকে মানে কানাভুতটাকে তুই যত্ন করে রাখিস । কথা শেষ হতে না হতে আমার বাড়ির গেটের সামনে এসে হাজির হলাম । শান্ত বিদায় নিয়ে চলে গেল । আমিও ভিতরে ঢুকলাম । ভিতরে ঢুকতেই ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল, ভাইয়া এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আজ তোমাকে দিয়ে.. কথা শেষ না হতেই বাঘের হুংকার, মানে আমার বাবা, কিরে স্কুল ছুটির পর এ তিন ঘণ্টা কোথায় ছিলি? তোকে দিয়ে আজ ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়াবো । মামা সামনেই ছিলেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন । তিনি বললেন, দুলাভাই ঘুড়ি বানানোর কাজটা না হয় আমিই করি । আপনি বরং ফ্লাশ লাইটের ব্যবস্থা করেন ।
-দেখ জালাল সব সময় ইয়ার্কি ভাল লাগে না, ছেলেটা যদি বদমায়েশ হয়ে যায় তখন আমার মুখে চুন কালি পড়বে সেটা কি তুমি চাও ?
-আহা দুলা ভাই চটছেন কেন? আপনি যান আমি সব দেখছি ।
এমন সময় এলেন মা, তিনি জালাল মামার কাছে আমাকে দিয়ে বাবাকে টেনে নিয়ে গেলেন ।
কিরে এতক্ষণ কোথায় ছিলি? পড়িস ক্লাস ফাইভে আর এ বয়সেই সেয়ানা হয়ে গেছিস, সিগারেট ধরেছিস নাকি? আফিম? অবশ্য গাঁজাও আজকাল খুব জনপ্রিয় । আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মামা আমাকে থামিয়ে বললেন, যা টেবিলে ভাত রাখা আছে খেয়ে শুতে যা, কাল সকালে তোর সাথে কথা বলব ।

৩.
আমি কথা না বলে ভাত খেয়ে গেলাম বিছানায়, গিয়ে দেখি কে যেন আমার ব্যাগ খুলেছে । আমি ভীত গলায় কানাভুতকে ডাকলাম । কানাভুত… ও কানাভুত.., সাথে সাথে উত্তর এল, কিরে তুই তো আস্ত একটা গাড়ল, আমাকে এর ভিতর বন্দি করে রেখেছিস আবার ব্যাগটাও বন্ধ করে রেখেছিস, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাই বের হয়েছি । আমি বললাম ঠিক আছে আমার ভুল হয়েছে কিন্তু তুমি আমাকে তুই তুই করে বলছ কেন? আমি তো তোমার বন্ধু না, তাছাড়া ..
-তাছাড়া কি?
-তাছাড়া তোমরা হচ্ছ ভুত জাতি আর আমরা মানুষ ।
মুচকি হাসির শব্দ হল এবং কানাভুত বলল, তাতে কি হয়েছে, আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি তুইও ক্লাস ফাইভে পড়িস । একই ক্লাসে পড়লে কি বন্ধু হওয়া যায় না? কিন্তু তার আগে তুই বল আমাকে কেন বন্দি করে এনেছিস ? অবশ্য তিন কুলে আমার কেউ নাই, বাবা মা ভাই বোন সবাইকে কাচু মুন্সি তাবিজ করে মেরে ফেলেছে । এবার নতুন কুড়ি মানে ভুতের নতুন কুড়িতে বাদাম আর পানি বেচতে এসেছিলাম কিন্তু শয়তান কাচু মুন্সি আমাকে ধরে এই পানির বোতলে আটকে দিয়েছে । এখন তুই-ই বল এটা কি ঠিক হল? আমি বিরক্ত ভরে বললাম, না ঠিক হয় নাই, কিন্তু তুমি আমাকে তুই তুই করে বলছ কেন? ঘনিষ্ঠতা ছাড়া কেউ তুই তুকারি করলে আমার ভালো লাগে না, অনেক রাগ হয় ।

একবার আমাদের হেডস্যার আমাকে তুই করে বলেছিল বলে আমি দুদিন স্কুলে যাইনি, পরে অবশ্য বাবা হেডস্যার কে সব খুলে বলেছিলেন, তারপর থেকে হেডস্যার আমাকে তুমি করে বলেন । অথচ সামান্য একটা পুচকে ভুতের বাচ্চা কিনা আমাকে তুই করে বলছে । যাক কি আর করা ভুতের বাচ্চা বলে কথা । সহসা কানাভুত বলল, কিরে কোন কথা বলছিস না যে? তোর কি শরীর খারাপ নাকি আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না? চল আজ থেকে আমরা দুজনে বন্ধু হয়ে যাই । আমি উত্তর দিলাম, তুই করে বললে আমার ভালো লাগে না, বন্ধু হব তবে.. ; ভুতের বাচ্চা বলল, তবে কি? তোকে তুই করে বলব না, এইতো? ঠিক আছে যা আজ থেকে তোকে আর তুই করে বলব না । এখন এক কাজ কর আমাকে এই বোতলের ভিতর থেকে বের করে দে । আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম কেন..কেন?
-কেন আবার বাইরে বের হব । তোর সাথে খেলব, একই বিছানায় ঘুমাব, একসাথে খাব, স্কুলে যাব, আরও শুনবি?
-না..না..থাক আর শুনতে হবে না । কিন্তু তুমি যদি মুক্ত হয়ে চলে যাও আর না আসো । ধমকের সুরে কানাভুত বলল, কিযে বলিস, ভুত পুষতে এনেছিস আর এটা জানিস না যে ভুতেরা সমাজ ছেড়ে এলে আর সমাজে যেতে পারে না, তাছাড়া আমি আর তুই তো বন্ধু, বন্ধুকে ছেড়ে কি কখনও যাওয়া যায়, বল?
ঠিক এমন সময় আম্মা ও ঘর থেকে বললেন, কিরে কার সাথে কথা বলছিস । আমি তাড়াতাড়ি বাতি নিভিয়ে দিলাম কিন্তু ঘুম আসছে না । কারণ গল্পের ভুত নয়, বাস্তব ভুত আমার সাথে বাস করছে । হঠাৎ নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম, গরর…ররর…র.. হুস…স.. , নাক ডাকার শব্দ শুনে কিছুটা অবাক হলাম কারণ আমাদের বাড়িতে কেউ নাক ডাকে না । তখন বুঝতে পারলাম এটা কানাভুতের নাক ডাকার শব্দ । পরদিন ভুতের বাচ্চাকে মানে কানাভুতকে নিয়ে কি কি করব তা চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা আর টের পাইনি । অবশ্য ঘুমিয়ে গেলে টের পাওয়া যায় না কি ভাবে ঘুম এল । একদিন বিছানায় শুয়েছি রাত ১০:৩০ মিনিট বাজছে, হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা হল মানুষ কি ভাবে ঘুমায়, ঘুম কিভাবে আসে, কেন ঘুম আসে, কখন আসে দেখতে কি রকম ইত্যাদি, ইত্যাদি । কিন্তু ১০:৩০ থেকে ১২:০০ বাজতে চলল, ঘুম আর আসে না । তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা আর টের পাইনি ।

৪.
সকালে দেখি পানির ফ্লাক্স নেই । কোথায় গেল পানির ফ্লাক্স, খুঁজেও পেলাম না, মা কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন অঞ্জনা ধুতে নিয়ে গেছে । অঞ্জনা হচ্ছে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার মানে কাজের মেয়ে । কাজের মেয়ে বলা আমাদের বাসায় নিষেধ, এটা আমার বাবার হুকুম, তাই আমি কারও সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলি ও হচ্ছে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার । অদ্ভুত তার কাণ্ড কারখানা, একদিন তাকে কফি বানাতে বলায় সে কফি বানিয়ে তা ছাকনি দিয়ে ছাঁকছে কিন্তু কোন কফি দানা পাচ্ছে না বলে সেই খানেই মাথায় হাত দিয়ে বসে সূরা ইয়াসিন পড়ছে । প্রথম প্রথম যখন সে আমাদের বাড়িতে এসেছিল, একদিন সকাল বেলার ঘটনা, বারান্দায় একশ পাওয়ার এর বাতিকে সে ফু দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করছে, নিভছে না বলে তাকে খুবই উৎকণ্ঠা মনে হল, আমাকে দেখে বলল, ভাইজান কুফি ডা মানে হারিকেন ডা নিভাইতে পারলাম না, অনেক বার ফু দিছি কিন্তু নিভে না, এহন কি লতে ধইরা টান দিমু? তার কথা শুনে আমি তো ‘থ’ হয়ে গেলাম কারণ লত বলতে সে বিদ্যুতের তার কে বোঝাচ্ছে । যাক্ এসব কথা কিন্তু চিন্তা হচ্ছে এখন আবার আমার পানির ফ্লাক্স মানে কানাভুত নিয়ে না জানি কি করছে । অঞ্জনা..এই অঞ্জনা..তুমি কি আমার পানির ফ্লাক্স ধরেছ? আমি জিজ্ঞেস করলাম । অঞ্জনা বলল, জ্বে ভাইজান, আম্মাজান কইল আইজ আফনের স্কুল বন্ধ তাই ধুইয়া দিতে ।
-কিন্তু কোথায় পানির ফ্লাক্স?
-জ্বে, ছাদে শুকাইতে দিছি ।
অঞ্জনা বসে বসে চিরুনি দিয়ে উকুন আনছে আর কটাস কটাস করে মারছে । দেখে আমার ঘেন্না লাগছে । মনে হয় যেন তার মাথা একটা উকুন সমুদ্র । তা থেকে হাজার বিলিয়ন উকুন মারলেও কমবে না । আচ্ছা একটা পরিসংখ্যান করলে কেমন হয়, যদি একজন মানুষের মাথায় ১০০টি উকুন থাকে তাহলে প্রতিদিন দশটা করে মারলে দশদিনে তা শেষ হবার কথা কিন্তু বাকি ৯০ টা হতে দৈনিক গড়ে ১০০০ টা ছোট উকুন মানে বেবী উকুন জন্ম নিচ্ছে, কাজেই যা করতে হবে তা হল সমূলে ধ্বংস করতে হবে । অর্থাৎ মাথার চুল ফেলে দিতে হবে বা উকুন নাশক শ্যাম্পু দিতে হবে । কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে কানাভুত কে নিয়ে, নিশ্চয়ই সে ছাড়া পেয়ে উড়ে গেছে । হঠাৎ কানে কানে কে যেন বলল, কি রে কি ভাবছিস, আমি চলে যাইনি । আমি বললাম, কিন্তু তুমি তো চলে যেতে পারতে ।
-পারতাম কিন্তু যাইনি, কারণ শত হলেও তুই আমার বন্ধু । চল আমরা বাইরে থেকে ঘুরে আসি ।
-কিন্তু মা যদি বকা দেয়, এই সাত সকাল বেলা বাইরে বের হলে ।
-বকা দিবে না, চল্ ।
তারপর দুজনে মানে আমি ও কানাভুত গ্রামের এক পুরনো রাজ বাড়িতে ঘুরতে গেলাম । অনেক পুরনো প্রায় দুশো বছর আগের । কানাভুতের সাথে রাজ বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে অনেক কথা হল, কানাভুত হঠাৎ বলল, জানিস এই রাজ বাড়িটা আমাদের ছিল ।
আমি স্তম্ভিত গলায় বললাম, কিভাবে? কানাভুত অনেক উৎসাহ নিয়ে বলল, কিভাবে? শুনবি? আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই শুনবো ।
-এই বাড়ির মোট সদস্য ছিল বারোজন তাদের মধ্যে আমার চারজন চাচা-চাচীও ছিলেন । আমি ছিলাম আমার বাবা মা’র ছোট ছেলে, দাদা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন । দাদার নাম ছিল শায়েব উদ্দিন খান আর বাবা’র নাম ছিল নওয়াব উদ্দিন খান । চাচারা ধন সম্পত্তির লোভে আমাকে এবং আমার বাবা মা’কে বিষ খাইয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল । সেখানে আমাদের লাশ শেয়াল কুকুর আর শকুনেরা খুবলে খুবলে খেয়েছে । তারপর আমরা ভুত হয়ে গেছি এবং প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মানুষদের শান্তিতে থাকতে দেব না ।

-মানুষ কি মরলে ভুত হয়ে যায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম ।
-না, সব সময় হয় না । যখন তার আত্মা অতৃপ্ত থাকে এবং তাকে কবর দেয়া হয় না, তখন সে ভুত হয়ে যায় ।
ভয়ে আমার বুক ধুক্ ধুক্ করছে । আমি তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম, তার পর কি হল?
-তারপর, এইতো কদিন আগে আমার বাবা মা’কে কাচু মুন্সি তাবিজ করে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে । অবশ্য আমরা আমাদের চাচার বংশধরদের কাউকেই বাঁচতে দেইনি ।
-কিন্তু তুমি তো এখন ক্লাস ফাইভে পড়, এসব ভুতুরে ঝামেলায় যাওয়া কি ঠিক?
-না, ঠিক না । তবে …
-তবে কি?
-থাক না এসব কথা । আসল কথাইতো তোকে বলা হল না । আজ তোদের বাড়িতে সমরেশ বাবু আসবেন তোর নামে নালিশ করতে ।
-সমরেশ বাবু মানে আমাদের অংক স্যার । কিন্তু উনি আমার নামে নালিশ করবেন কেন?
-কারণ, তুই এবার অংকে ডাব্বা মেরেছিস ।
-কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে ডাব্বা মারিনি । পড়তে তো ভালো-ই লাগে, মুখস্থও হয় কিন্তু পরীক্ষার হলে গেলে সব ভুলে যাই ।
-হুম্ বুঝতে পেরেছি, চল্ বাড়িতে যাই । বাড়ি গিয়ে একটা উপায় বের করতে হবে ।

৫.
ড্রয়িংরুমে সমরেশ স্যার, বাবা, মামা, আমি ও কানাভুত । সমরেশ স্যার কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে, দেখুন জালাল সাহেব পড়ালেখা ছাড়া আমাদের দেশে কোনো গতি নাই । সবাইকে শিক্ষিত করার জন্য সরকার কত কিছু করছে আর আপনার ভাগনে অংকে ডাবল জিরো পেয়েছে । আমি মাথা নিচু করে কানাভুতের সাথে কথা বলছিলাম । কানাভুত তুমি আমাকে বাঁচাও । হঠাৎ বাবা হুংকার দিলেন, কি রে, সমরেশ স্যার এটা কি বলছেন? মাথা নিচু কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল, অংকে নাকি ডাবল জিরো পেয়েছিস? আমি ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, হঠাৎ সমরেশ স্যার এর কথাবার্তা কেমন যেন বদলে গেল । সমরেশ বাবু বললেন, আহা থাক্ না, এত ধমকা-ধমকির কি আছে, এবার ভালো নাম্বার পায়নি পরের বার পাবে । টমাস আলভা এডিসন বলেছেন, শুধু কয়েকটা পরীক্ষার খাতা কারও ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না । তাছাড়া আইনস্টাইন, নিউটন, সবাই অংকে ফেল করেছিল । বাস্তব জীবনে তারা ভালো ছাত্র ছিল না ।
জালাল মামা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন এবার তিনি বললেন, তার মানে বলতে চাচ্ছেন ও বড় হলে নিউটন, আইনস্টাইন হবে?
সমরেশ বাবু পরিস্থিতি সামলে উত্তর দিলেন, না ঠিক তা না, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি ওকে অংকটা পড়াতে চাই । অংকে কিভাবে ভালো রেজাল্ট করতে হয় তা আমি জানি । সমরেশ বাবু একটা শয়তানি হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন, যার অর্থ হাড্ডি আর মাংস আলাদা, হাড্ডি গার্জিয়ানের আর মাংস আমার । আমি বুঝতে পারলাম কপালে শনি লেগেছে । সমরেশ স্যার অনেক স্টুডেন্টকে মেরে অজ্ঞান করার রেকর্ড আছে তার । ছাত্রছাত্রীদের মেরে উনি একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পান । তবে সব স্যার এক রকম না, এক্ষেত্রে ফয়সাল স্যার অনেক সহজ সরল আর ছাত্রছাত্রীদের অনেক যত্ন করে পড়ান । উনার কথা হচ্ছে স্টুডেন্টদের মারধর করা হচ্ছে মধ্যযুগের বর্বর কায়দা । এটা আধুনিক যুগ, এ যুগের ছাত্রছাত্রীরা শিখবে খেলার ছলে । যাই হোক সমরেশ স্যার চলে গেছেন, কাল থেকে উনি পড়াবেন । মনে হচ্ছে উনি স্কুল ছুটির পরপরই চলে আসবেন মানে বিকালে ঘুরতে যাওয়া বা খেলাধুলা বন্ধ । শুনে খুবই মন খারাপ হল । রাতের খাবার খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম কি করা যায়? এমন সময় কানাভুত বলল, কি রে, কি ভাবছিস? কাল থেকে খেলা বন্ধ এটা নিয়ে চিন্তা করছিস, তাই না?
-হ্যাঁ, তাই নিয়ে ভাবছি ।
-ভাবার কিছু নাই, আমি সমরেশ স্যার কে এমন ভয় দেখাব যে ভয়ে প্যান্টে হিসু করে দিবে । উনার ব্যবস্থা আমি করছি বলে কানাভুত কোথায় যেন চলে গেল । কানাভুত.. ও.. কানাভুত.., বার কয়েক ডেকেও কোনও সাড়া পেলাম না ।
পরদিন স্কুলে আর সমরেশ স্যার কে দেখা গেল না । বিকালে খবর এল স্যার এর জ্বর হয়েছে । তাই উনি আসতে পারবেন না । মনে হচ্ছে কানাভুত কিছু একটা করেছে, হয়তো ভয় দেখিয়েছে । পরীক্ষায় পাশ করার জন্য একবার তাবিজ এনে দিল কানাভুত । এরপর থেকে সব বিষয়ে ভাল রেজাল্ট হতে থাকল । রোল নং ৬০ থেকে সোজা ৭ হয়ে গেল । বাড়ির সবাই হতবাক । কিভাবে এত ভাল রেজাল্ট হল । জালাল মামা একদিন জিজ্ঞেস করলেন, কিরে স্যার ছাড়া এত ভালো রেজাল্ট করলি কিভাবে? আমি উত্তর দিলাম, এমনি । মামা বললেন, এমনি না, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে । আমি মুখ ফসকে বলে ফেললাম, কানাভুত একটা তাবিজ এনে দিয়েছে । এটা শুনে জালাল মামা খুবই বিরক্ত হলেন, কারণ উনি একজন বিজ্ঞানী মানুষ । উনার নিজস্ব ল্যাব আছে । ভুত বিষয়ে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নাই তাই উনি ভুত বিশ্বাস করেন না । উনি বললেন, তোর মানুষিক সমস্যা হচ্ছে, এটাকে বলে হ্যালুসিনেশন, তুই অদ্ভুত কিছু দেখছিস বা শুনতে পাচ্ছিস, এটা তোর উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র । অথবা সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে । আমি বললাম, না মামা,আমি সত্যি-ই ভুতের সাথে কথা বলেছি, ওর নাম কানাভুত, এক চোখ কানা তাই কানাভুত, যেমন কানা বগির ছা-এর একচোখ কানা ঠিক তেমন । ও অনেক ভালো ভুত, ওকে আমি পোষার জন্য এনেছি । মামা বিরক্ত হয়ে বলল, কি যাতা বকছিস, পোষার জন্য এনেছিস মানে?
-মানে ভুত পোষা, বাসায় এনে কোন ভুতকে পুষে রাখা । যদি বুনো ভুত হয় তাহলে পোষ মানবে না আর যদি গৃহপালিত ভুত হয় তাহলে পোষা যাবে । এটা গৃহপালিত ভুত ।
-মামা অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিলেন, আরে বোকা ভুত বলতে কিছু নাই । এই গুলা ফালতু কথা । কোথায় তোর ভুত ওকে ডাক, দুচারটে কথা বলি । হা….হা…. এগুলি অবাস্তব বিষয় ।
আমি অনেক চেষ্টা করেও মামার সাথে সামনা সামনি পরিচয় করিয়ে দিতে পারিনি । কানাভুত মামার সাথে কথা বলতে রাজি না, কারণ যারা ভুত বিশ্বাস করে না তাদের সাথে কানাভুতের কথা বলতে ভালো লাগে না । মনটা অপমানে আর রাগে গজগজ করতে লাগল । কানাভুতের উপর ভীষণ রাগ হল । মামা আমার অবস্থা দেখে বললেন, ঠিক আছে তুই যদি এমন কোন অস্বাভাবিক কাজ করে দিতে পারিস তাহলে ভাববো কানাভুত সত্যিই আছে । আমি বললাম, কি কাজ করতে হবে, বল?
-ধর আমি নদীতে যাব কালকে, আমার হাতের ঘড়িটা নদীতে ফেলে দেব, যদি কানাভুত সেটা পানির নীচ থেকে তুলে আনতে পারে, তাহলে আমি বিশ্বাস করব যে ভুত বলতে সত্যিই কিছু আছে ।
আমি বললাম ঠিক আছে । আগামীকাল তোমাকে আমি প্রমাণ দেব যে কানাভুত সত্যিই আছে । রাতে ফিসফিসিয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা মা’র কাছে ধরা খেয়ে গেলাম । আমি ভুতের সাথে কথা বলি, বাবা জালাল মামাকে বললেন, ওর কি কোন সমস্যা হচ্ছে নাকি? জালাল মামা উত্তর দিলেন, আমি সব দেখছি, মনে হচ্ছে ওর সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে তবে ঘাবড়ানোর কিছু নাই । আমার কাছে এর ঔষধ আছে, তাছাড়া আমার এক বন্ধুর বাবা মানসিক রোগের ডাক্তার ।

৬.
পরদিন বিকালে নদীতে মামা ও আমি আর কানাভুত । কানাভুত অদৃশ্য বলে তাকে দেখা যাচ্ছে না । ভুতেরা বায়বীয় পদার্থের তৈরি, হ্যালোজেন জাতীয় গ্যাস তাই ভেসে থাকতে পারে । অনেকটা টিউব লাইটের ভিতরের গ্যাসের মত আয়নাইজড হলে উজ্জ্বল সাদা দেখায় তবে ভুতের ক্ষেত্রে নীলাভ সাদা দেখায় । চাঁদনি রাতে খুব খেয়াল করলে ভুতদের অবয়ব দেখা যায় কারণ তখন তারা চাঁদের আলো খেয়ে আয়নাইজড থাকে । অবশ্য এ সব ধারনা সম্পূর্ণ আমার নিজের থেকে । ভুত নিয়ে ছোট থেকে অনেক গবেষণা করতে করতে আমি এ ধারনায় উপনীত হয়েছি যে ভুত আছে, হতে পারে তারা এলিয়েন অথবা প্রেতাত্মা ।
যাই হোক, কানাভুতের কথা আমি শুনতে পাচ্ছি কিন্তু জালাল মামা শুনতে পাচ্ছেন না, কে জানে হয়তো না শোনার ভান করে আছেন । অনেকটা আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকদের মত, যখন কোন সাধারণ মানুষের সমস্যা হয় তখন তারা কানে শোনে না । হয়ত জালাল মামা বিজ্ঞানী মানুষ তাই শুধু কানে শুনে বা চোখে দেখে উনি ভুত বিশ্বাস করছেন না । উনি ওনার হাতের ঘড়ি টা পানিতে ছুড়ে ফেলে দিলেন, ঝপাং করে একটা শব্দ হল, তারপর ঘড়িটা পানিতে তলিয়ে গেল । আমার দিকে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, হে…হে…..এই বার আমার হাত ঘড়িটা ফেরত আনতে বল তোর কানাভুতকে, দেখি বেটা পারে কিনা ।
কিছুক্ষণ পর আমি আমার প্যান্টের ভিতর থেকে একটা ঘড়ি বের করে মামার হাতে দিলাম, এই যে তোমার ঘড়ি । মামা আমার হাতে তার ঘড়ি দেখে খুবই অবাক । তার মুখ শুকিয়ে গেল । তিনি ঘড়িটা নিয়ে সোজা বাসায় চলে এলেন, কোন কথা বললেন না । মনে হচ্ছে তার এখন বিশ্বাস হয়েছে । কিন্তু উনি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না । এরপর ঐ দিন রাতেই উনার শরীরে জ্বর এলো । উনি অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে গেলেন । আমাকে ডেকে পাঠালেন তার রুমে । আমি উনার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম । মামা জিজ্ঞেস করলেন, তোর কি ধারনা ভুত সত্যিই আছে? আমি উত্তর দিলাম, জ্বি, অবশ্যই । ভুত আছে । অবশ্যই আছে । উনার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে থাকল । ভাবলাম উনাকে সত্যি কথা টা বলি । নইলে উনি ধীরে ধীরে মারাও যেতে পারেন । তাই ৩/৪ দিন পর ওনার রুমে ডুকে বললাম, মামা, আমি তোমার সাথে মিথ্যা বলেছি । তোমার হাত ঘড়ি পানি থেকে তুলে আনা হয়নি । এটা বাবার ঘড়ি । জালাল মামা ও বাবা একই রকম ঘড়ি পড়তেন, মা কিনে দিয়েছিল । শুনে জালাল মামা পরক্ষণেই অনেক উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন, হ্যাঁ তাই তো, এখন মনে পড়েছে, তুই যখন ঘড়িটা দিয়েছিলি তখন ওটা শুকনো ছিল । যদি পানির নীচে থেকে তুলে আনে তাহলে তো ওটা ভেজা থাকার কথা । আমি বললাম, কিন্তু মামা কানাভুত সত্যিই আছে, ও বলেছে ও তোমার সাথে কথা বলবে । তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনলে তার কথা শুনতে পাবে ।
কানাভুতের সাথে মামার পরিচয় করিয়ে দিলাম । উনি এখন কানাভুতের ভক্ত । তবে উনার ধারনা উনি আমার মত মানুষিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাই ভুতের সাথে কথা বলছেন । কানাভুত ওনাকেও একটা তাবিজ এনে দিয়েছে যাতে উনি বি,সি,এস ক্যাডার হতে পারেন । ১ বছর পর উনি বি,সি,এস ক্যাডার হয়ে ট্রেনিং শেষে আমাদের সাথে ও কানাভুতের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন । ওনার কথা হল, যদি কারো কোন সমস্যা না হয় তাহলে ভুত বিশ্বাসটা বিশেষত খারাপ না । ভুতের উপর বিশ্বাস যদি কারো পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করে তোলে তাহলে সেই ভুতের সাথে কথাও বলা যেতে পারে ।
আমি ক্লাস সিক্সে উঠেছি আমার রোল নং এখন ১ ; পড়ালেখায় ব্যস্ত আমি এখন আর ভুতের সাথে কথা বলার সময় পাই না । কানাভুতের দায়িত্ব শেষ, তাই হয়ত সে চলে গেছে অচেনা কোন দেশে । হয়ত ছোট বেলার সেই ভুত আর ফিরে আসবে না কিন্তু ভুতের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝে যে দূরত্ব তা আরও কমিয়ে দিয়ে গেছে, যা আজও বর্তমান ।

জ্বীন দেখার সেই অভিজ্ঞতা

1

আমার সাথে ঘটা একটি সত্য ঘটনা
.
.
আমার বয়স তখন বড়জোর ৭ হবে ।
ক্লাস টু এ উঠেছি সবে । তখন অক্সফোর্ড প্রি ক্যাডেট স্কুলে পড়তাম ।
এই স্কুলটা অবশ্য আমার বাবারই তৈরী হলে আমি সিম্পলি চলাফেলা করতাম ।

রোজ কড়া দুপুর ২ টায় বাসায় আসতে হতো । যদিও বাসা থেকে স্কুলটা বেশী দুরে নয় , আমাকে স্কুলে নিতে যেতে চাইত আম্মু ।
আমি একটু বড়াই করে বলতাম যে আমি এখন আর সেই ছোট ছেলে নেই ।
বলাই বাহুল্য যে আমার স্কুলের পাশে একটি পুরোনো পুকুর ছিল যেটার পাশ দিয়ে আমাকে রোজ বাড়ি যেতে হতো ।
কোন দিনও কোন সমস্যা হয়নি তবুও আমি অযথাই এটাকে দেখে ভয় পেতাম । বাবা মা হাঁসবে ভেবে আমি এটাকে এড়িয়ে যেতে চাইতাম ।

একদিন বাড়ি ফিরছিলাম । পুকুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার কোন দিকেই খেয়াল ছিলনা ।
২৬শে মার্চের জন্য মাঠে প্রদশর্তনীর চলচিত্রের রিয়ারসাল করে একটু দেরীই হয়ে গেছিল সেদিন ।

আমি আপন মনে হেঁটেই চলেছি ।

হঠাত্‍ মনে হলো কেউ যেন আমায় পিছন থেকে ডাকছে ।

পরিচিত গলা ।

আমি পিছন তাকালাম । নাহ কেউই নেই ।
আমি মনে করলাম ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তাই ভুল শুনছি ।

একটু পরে আবার সেই ডাক ।

তারপর আবার…… ।

আমি চিত্‍কার দিয়ে বলে উঠলাম -“ঐ শান্ত বেরিয়ে আয় , ভয় দেখাচ্ছিস ? কালকের কথা মনে নেই ? ” ।

আমি আমার বন্ধু শান্তকে লক্ষ করে বললাম ভেবেছিলাম হয়তো শান্ত আমাকে ভয় দেখাচ্ছে ।

কিন্তু শান্ত তো ওখানে ছিলনা ।

আমি ভয় পেলাম ।

তবে ভুতের নয় ।

ছেলেধরার ।

শিমু আপু আমাকে ছোট থাকতে আজগুবি সব ভয়ংকর গল্প শোনাত । ছেলে ধরা বা বাঘ বুড়ি নামের একবুড়ি তার বস্তাতে করে বাচ্চা ধরে নিয়ে গিয়ে বেচে দিত ।

তাই আমি আর আমার ভাতিজা রাফি এই জিনিসটাকে যমের মত ভয় করতাম ।

আমি তো ভয়ে অস্থির ।

যাইহোক আমি দিলাম ছুট ।

কিন্তু একি পা চলছেনা কেন ?

একটু পরে দেখলাম যে একটি অতি সুন্দরী এক মেয়ে গলি থেকে বের হয়ে আসল ।
বয়সে আমার চেয়ে ঢের বড় ।
বলল “আমার সাথে যাবে ? অনেক গল্প শোনাব ।”

আমার আবার এখনও গল্প শোনা বা পড়ার নেশাটা একটু বেশীই । কিন্তু কেন জানি আমি তার কথায় রাজী হলামনা ।
“মা বকবে বলে ।” অসহায়ের চোখে তার দিকে তাকালাম ।

“কিচ্ছু বলবেনা ।” সে উত্তর দিল । কিন্তু আমার একই জিদ আমি যাবনা ।
তারপর সে রেগে গিয়ে আমার ডানহাতটা ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগল ।

বরফের মত হাতটা স্পর্শ করার পর আমার আর কিছু মনে নেই ।

যখন চোখ খুললাম তখন আমি আমার বড়আম্মুর কোলে নিজেকে আবিষ্কার করলাম । নিজেই হতবাক ।
কি হয়েছে ? পাড়াসুদ্ধ লোক সবাই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আর পাশে মা কাঁদছে ।বড়আব্বুর কন্ঠে শুনতে পেলাম সুরা দরুদ আর ফুক দেবার শব্দ । তখন আমাকে কেউই কিছু বললনা ।

পরে আমাকে জানানো হলো যে আমি নাকি স্কুল ছুটির পর উল্টো রাস্তা দিয়ে নদীর দিকে যাচ্ছিলাম । পার্থ নামের এক বড়ভাই আমাকে ভয়ানক অবস্থা থেকে উদ্ধার করে এখানে এনেছে । আমি নাকি নদীর ধারে যাচ্ছিলাম আর তার ডাক উপেক্ষা করে আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম । তারপর একটা দৃশ্য ভেসে উঠলো স্মৃতিতে , নদীর পাশে বড়আব্বুর তেলের পাম্পে বসে থাকা দেলোয়ার ভাইয়াকে অনেক বার ডেকছি কিন্তু গলা থেকে কোন আওয়াজই বের হয়নি ।

তার পার্থ ভাই আবার বললো , আমি এক পর্যায়ে নদীর পানিতে চলে যেতে থাকি । আমি হাঁটুপর্যন্ত নেমে গিয়েছিলাম যদিও আমি এখনও ভালভাবে সাঁতার জানিনা । এবং পার্থদাদা যখন আমাকে শেষবার ডাক দেন তখন নাকি আমি তার দিকে একবার ঘুরে এক গাল হেঁসে পানিতে অজ্ঞান হয়ে যাই । এবং তিনি তখন আমাকে পানি থেকে তুলে আনেন আমার বডআব্বুর বাসায় ।

মজার ব্যপার হলো এটা যে পার্থদা নাকি আমার ডিরেক্শনেই বাড়িতে পৌছে দিয়ে গেছে । কিন্তু আমি তখন পুরো বেঁহুশ ।

ঘটনা এখানেই শেষ নয় ।
চলছেই…

মাস তিনেক পর
আমি পড়তে পড়তে বা কোন কিছু করতে করতে যদি দেওয়ালে তাকাতাম আমার মনে হত যে কোন কালো ছায়া আমাকে এতক্ষন লক্ষ করছিল এই মাত্র সরে গেল । এরপর এই সমস্যা শোনার পর আমার বাবা এনায়েত পুরের এক কবিরাজ আইজুল মুফতির কাছে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন । তিনি আমাকে কিছু ঔষধ , কালজিরা ও পানিপড়া দিলেন । এরপর আমি আবার সুস্থ ঠিক আগের মত ।
কিন্তু জ্বীন দেখার সেই অভিজ্ঞতাকে কখনও ভুলতে চাইনা ।

তারপর ধীরে ধীরে এদের প্রতি আকর্ষন আমাকে জিনভুত গবেষক হতে সাহায্য করছে । যার কারনে অল্প বয়সেই আমি এপথে পা দিয়েছি যা সবাই প্রাপ্ত বয়সেও দেয়না ।

by: Mdsumon Ahmed ভাইয়ের বন্ধু র্সূয্য চৌধুরি

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব-২৩

0
charles_ gate_college

Charles gate college

বোস্টনের চার্লসগেট হোটেলটি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু একবার এক ছাত্র এখানে আত্মহত্যা করায় ব্যবস্থাপনা কমিটি এমারসন কলেজকে ১৯৮১ সালে তা বিক্রি করে দেয়। কিন্তু লিফটে এক ছাত্রীর মৃত্যু হওয়ায় ধরে নেয়া হল যে হোটেলটি ভূতুড়ে। অনেক শিক্ষার্থী নাকি রহস্যময় ছায়ার নির্দেশ পেয়েছিল। অনুসন্ধান করতে নেমে তারা এক রহস্যাবৃত সত্য উদঘাটন করল। হোটেলের দেয়ালের ভেতরে এক গোপন কামরায় তারা কালো জাদু চর্চারপ্রমাণ পায়। ১৯৯৪ সালে হোটেলটি নিলামে বিক্রি হয়ে গেলে কনডোমিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়।

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব-২২

0
Most_Popular_Ghost_Pic

Most Popular Ghost Pic

এই ছবিটি তোলার কয়েকদিন পরেই নাকি ছবির ডান পাশের কালো জামা পড়া মেয়েটি মারা যায় । ইন্টারনেটে অনেক প্রচলিত একটি ছবি এটি । সত্যতা কতোটুকু জানি না । তবে অসংজ্ঞায়িত ব্যাপারের কি কোন শেষ আছে ?

অপেক্ষমান

0

এই ছবিটি শিকাগোর সান টাইমস এবং দ্য ন্যাশনাল এক্সামিনার উভয় পত্রিকাতে এসেছিল । ১৯৯১ সালের ১০ ই আগষ্ট ব্যাচেলরস্ গ্রোভ সেমেট্রিতে একটি ইনভেস্টিগেশনের সময় এই ছবিটি তোলা হয়েছিল । ছবিটি তুলেছিলেন GRS গ্রুপের একজন সদস্য । ছবিতে সাদা এবং কালোর আধিক্য বেশী কারণ এটি তোলা হয়েছে ইনফ্রারেড ক্যামেরা দিয়ে । ছবিটি সেমেট্রির এমন একটি জায়গায় তোলা হয়েছে , যেখানে GRS সদস্যরা কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার আগে থেকেই লক্ষ করেছিলেন এবং তাদের যন্ত্রপাতি গুলো সেট করেছিলেন । এই ছবিটি তখন একজন সদস্যের ক্যামেরায় ধরা পড়ে । ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে , একজন যুবতী মেয়ে একটি পাথরে বাঁধানো কবরের উপর বসে আছে এবং তার শরীরের উপরে এবং নীচের অংশ আধা স্বচ্ছ অবস্থায় রয়েছে । যে পোশাক মেয়েটির পরনে , তা অনেক পুরোনো ধাঁচের বলে ধারণা করা হয় । ছবিটি তুলেছেন GRS সদস্য জুড হফ ফেলজ । কারো অপেক্ষায় যেন অপেক্ষমান এই যুবতী মেয়ে ! কে সে ? অন্য কোন অশরীরী ??

লাশ খেকোর প্রত্যাবর্তন

0

আপনি হয়তো গভীর রাতে দূরপাল্লার বাসে দূরের কোন গন্তব্যে যাচ্ছেন । বাসে যাত্রী বলতে গেলে শুধুই আপনি । সাথে আছে হেল্পার আর ড্রাইভার । হঠাত্ কিছু লোক আপনাদের বাসটাকে থামতে ইশারা করলো । তাদের সাথে একটা কাপড়ে জড়ানোলাশ । বাস থামলে তারা ড্রাইভারের কাছে একটা লিফ্ট চাইলো । তারা বললো যে, লাশটাকে তারা কবরস্থানে নিয়ে যাচ্ছে দাফন করার জন্য । কাছাকাছি কোন কবরস্থান পেলেই নেমে যাবে । হেল্পার আর ড্রাইভার কোন সন্দেহ ছাড়াই তাদেরকে লিফট দিল । বাসের একদম পিছনে গিয়ে তারা বসলো । কিছুক্ষণ পর আপনি লক্ষ্য করলেন যে তারা অদ্ভূত একটা কাজ করছে । লাশটাকে কাপড় থেকে বের করছে । তারপর আপনার চোখের সামনে আপনাকে হতবাক করে দিয়ে হঠাত্ তারা লাশটাকে টেনে টেনে , কামড়ে কামড়ে খেতে লাগলো । কেমন লাগবে আপনার টাটকা একটা লাশ এভাবে খেতে দেখলে ??

এটা কোন হরর মুভির দৃশ্য নয় । বাংলাদেশ সহ আরো বিভিন্ন দেশের ভয়াবহ ঘটনা এটি ।
উপরে এতক্ষণ যাদের কথা পড়লেন , এরা এমন এক ধরনের জিনিস যাদের কাজই হলো লাশ খেয়ে ফেলা । এদেরকে বলা হয় “আদমখোর ।”

আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন , যারা এই আদমখোরদের কথা জানেন । গ্রামেও অনেক
ঘটনা আছে আদমখোরদের নিয়ে । গভীর রাতে কবরস্থান থেকে সদ্য সমাহিত করা লাশ এসব
আদমখোরেরা চুরি করে নিয়ে যায় । পরে সেসব লাশ কে আধা খাওয়া অবস্থায় পাওয়া যায় । লাশের ভিতরে দেখা যায় কলিজা, কিডনি , ফুসফুস এগুলো নেই । অনেকেই বলে যে , এসব কাজ শিয়ালে করে থাকে অথবা অনেক অসাধু লোক মরা মানুষের কিডনি , লিভার চুরি করে বিক্রী করে দেয় । তবে যেটাই ঘটে থাকুক না কেন , কোন কোন জংলা জায়গায় অথবা কবরস্থানে অনেকেই এসব আদমখোরদেরকে লাশ খাওয়া অবস্থায় দেখেছেন ।

আদমখোররা দেখতে মানুষের মত হলেও এরা আদৌ মানুষ কিনা সে ব্যাপারে সংশয় আছে ।

এম্বুলেন্স দিয়ে লাশ নিয়ে যাওয়ার সময়ও অনেক আজব আজব ব্যাপার ঘটে । এম্বুলেন্সের
ড্রাইভারদের সাথে এমন সব ঘটনা ঘটে যার কারণে অনেকেই এম্বুলেন্স চালানো ছেড়ে দেয় । এক এক জনের অভিজ্ঞতা এক এক রকম । কেউ কেউ বলেছে যে , লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ীর ইঞ্জিনে সমস্যা হয়েছে । কারো গাড়ীর গতি কমে গিয়েছিল , কেউ কেউ রাস্তায় কাপড়
দিয়ে ঢাকা লাশ পড়ে থাকতে দেখেছে । অনেকে এও বলেছে যে তারা গাড়ীর ভিতরে লাশকেই
বসে থাকতে দেখেছে !

কল্পনা হোক অথবা বাস্তবই হোক , এরকম পরিস্থিতিতে নিশ্চয় আপনি গাড়ী চালাতে পারবেন
না !! অনেকেই বলে থাকেন যে, লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় খারাপ জিনিস লাশকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চায় । নৌকা দিয়ে লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় নাকি অদৃশ্য কিছু লাশকে খেয়ে রেখে যায় । কিসের কাজ কে জানে ??

বিদেশে প্রেতসাধনা অথবা শয়তান কে খুশী করার জন্য গ্রেভইয়ার্ড থেকে লাশ চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয় । টাকার বিনিময়ে প্রেতসাধকরা এসব কাজ গ্রেভইয়ার্ডের লোকদের দিয়ে করায় । সমাহিত করার সময় কফিনের ভিতর লাশ আছে নাকি নেই , সে মাথাব্যাথা কারই বা থাকবে??

আপনি এখন হয়তো বাসে করে কোথাও যাচ্ছেন । বাসে আপনি ছাড়াও পিছনের সিটে কিছু লোক বসে রয়েছে । তাদের সাথে লাশ না থাকুক তাতে কী ? তাকিয়ে দেখুন তো , দু চোখ ভরা লোভ নিয়ে ওরা আপনার দিকে তাকিয়ে নেই তো ?? সুযোগ পেলে মরা মানুষের চেয়ে জ্যান্ত মানুষের মাংস খেতে ওরা নিশ্চয় দ্বিধা করবেনা ?!?

কে ওখানে

1

যারা ভুত বিশ্বাস করেন না এ লেখাটি তাদের জন্য নয় । কেননা এটা একটি ভুত সংক্রান্ত লেখা বা ঘটনা । যা কিনা আজো আমার কাছে জীবন্ত । এখন ও আমি মাঝ রাত্রিরে জেগে বসে থাকি ভুতের ভয়ে । ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে । কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এইতো সেদিন ঘটলো ঘটনাটি । ঘটনাটির কথা মনে হলে হাত পা আমার এখনও ঠান্ডা হয়ে যায় ।

আমারা তখন পুরানো ঢাকাতে থাকি । বাবা সরকারি চাকুরি করেন । বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করেই আমরা বড় লোক হয়ে গেলাম । তা ও বাবার এক ফুপুর কল্যাণে । বাবার বড়লোক ফুপুর মৃত্যুর পর তার বিষয় সম্পতির ছোট একটি অংশ আমাদের বড়লোক করে দিল রাতারাতি ।

আমারা ভাড়া বাসা থেকে আমরা নিজেদের বাড়ীতে উঠলাম । তাও আবার তিন তলা বাড়ী । ৬টা ভাড়াটিয়াসহ বিশাল বাড়ী । আমরা উঠেছি দোতালায় । সারা দিন ভাই বোনদের সঙ্গে আনন্দ করে সময় কাটে । বাড়ীর সামনে দু’টো বড় বড় মেহগনি গাছ । তার একটিতে ছোটকাকু দোলনা টানিয়ে দেয়াতে আমাদের আনন্দের মাত্রা বেড়ে গেছে কয়েক গুন । সারা দিন হৈই চৈই । বিকেল বেলা সবাই মিলে ছাদে খেলা করতাম । এতো বিশাল ছাদ আমি আগে কখনও কল্পনাও করতে পারতাম না তা আবার নিজেদের । ছাদ সাধারনত মা তালা দিয়ে রাখতেন । শুধু বকেল বেলায় খুলে দিতেন । সন্ধ্যার পর শুধু পড়তে বসতাম । রাতে খাওয়া দাওয়ার পর কাকুর কাছে গল্প শুনতে বসা । কাকু নিত্য নতুন ভূতের গল্প বলে আমাদের ভয় পাইয়ে দিতেন । মাঝে মাঝে মাও আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিতেন । গল্প শেষে মা প্রায়ই হেসে বলতেন । ভুত বলে কিছু নেই ।

দেখতে দেখতে আমার এস এস সি পরীক্ষা চলে এলো । ভাল রেজাল্ট করতে পারলে বাবা রেসিং সাইকেল কিনে দেবো । তাই রাত জেগে পড়া শুনা করছি । ভাল রেজাল্ট করার চাইতে আমার সাইকেলটার দিকেই বেশি মনোযোগ । বাসার সবাই ঘুমিয়ে গেলেও আমি সারা রাত জেগে পড়ি । মাঝে মাঝে ঘরের ভেতর হাটা হাটি করি । বেশি খারাপ লাগলে ছাদে চলে যাই । কাকুর ভাষ্য মতে রাতের একটি ভাষা আছে । তাছাড়া রাতের আকাশ ও আমার দেখতে খুব ভাল লাগে । বিশাল রহস্যময় আকাশের শৈল্পিক কারুকার্য আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে ।

সেদিন ছিল পূণিমার রাত । রাত প্রায় তিনটা বাজে । আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম । বাসার সবাই ঘুম । হঠাৎ ছাদ থেকে ধুপ ধুপ শব্দ ভেসে এলো । বিকেল বেলায় আমরা ছাদে খেললে যেমনটি শব্দ হয় ঠিক তেমনটি । আমি বেশ অবাক হলাম , এতো রাতে ছাদে আবার কে খেলছে !

কাকু আর আমি একই রুমে থাকি । বেশ কয়েকবার শব্দ হওয়ায় কাকুকে ডাক দিলাম । কাকুর উঠার নামটি নেই । নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে । অনেকক্ষন ডাকা ডাকি করার পরে কোন রকম মাথা তুলে বললেন তুই গিয়ে দেখনা কে ?
ইদুর টিদুর হবে হয়তো । বলে কাকু আবার নাক ডাকতে শুরু করলেন । এদিকে ছাদের শব্দ দৌড়া দৌড়ি পর্যায় পৌছে গেছে । আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম আমার তেমন ভয় করছেন । বরং দেখতে ইচ্ছে করছে এতো রাতে ছাদে কে দৌড়া দৌড়ি করছে ।

আমাদের রান্না ঘরের দেয়ালে মা ছাদের চাবি ঝুলিয়ে রাখেন । আমি ঘর থেকে বেড় হয়ে ছাদের চাবি নিলাম । আমাদের ফ্লাট থেকে বেড় হতেই ডান দিক দিয়ে উঠে গেছে ছাদের সিঁড়ি । প্রতিটি বারান্দায় বাতি জ্বলছে । তিন তলার বারান্দা গুরে ছাদের সিঁড়ি । আমি ছাদের সিঁড়িতে উঠার পরও আমার কোন ভয় লাগছিল না । তিন তলা থেকে ছাদের ছাদের দরজা দেখা যায় । বন্ধ দরজা । তালা দেখা যাচ্ছে । তবে ছাদে শব্দ করছে কে ?

আমি ছাদের তালা খুলে ফেললাম । চাঁদের আলোয় ছাদ ভেসে যাচ্ছে । ছাদে বেড় হলেই সামনে রবিন চাচ্চুদের ৪ তলা বাড়ী । রবিন চাচ্চুদের বাসা থেকে আমাদের পুরো ছাদটা দেখা যায় ।

ছাদের এ মাথা ; ও মাথা বেশ ভাল করে দেখলাম কেউ নেই । আমি বেশ অবাক হলাম । তা হলে শব্দ করলো কে ? পানির ট্যেন্কির উপড় দেখলাম । না । কেউ নেই । এবার কিন্তু আমার গা বেশ কেমন ছমছম করছে । আশে পাশের বাড়িগুলোর দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়ে আমি নীচে নেমে এলাম ।

ঘরে এসে ডকডক করে দু গ্লাস পানি খেলাম । এমনিতেই আমি বারবার হিশু পায় বলে রাতেরবেলা পানি কম খাই । কিন্তু সেদিন তেস্টা যেনো আর মিটছিলো না । ২য় গ্লাস পানি শেষ করার মুর্হুতে আবার ধুপ ধুপ শব্দ ভেসে এলো । আমি গ্লেলাসটি রেখে উঠে পড়লাম । ছাদের সিঁড়িতে এসে দেখি ছাদ তালা মারই আছে । দরজা বন্ধ । কিন্তু দরজার ওপাশেই কে যেনো দৌড়াচ্ছে । আমি ভয়ে ভয়ে তালা খুলে ছাদে এলাম । আবারও চাঁদের আলোয় চোখ ভেসে গেলো । আমি পুরো ছাদ বেশ ভাল করে দেখলাম । না । কেই নেই । নিজেকে কেমন বোকাবোকা মনে হলো । নিজেকে শান্তনা দিলাম হয়তো রাত জেগে পড়ার ফলে উল্টা পাল্টা শব্দ শুনছি ।

ছাদ তালা দিয়ে নামার জন্য পেছন গুড়তেই চমকে উঠলাম । হাতের ডান পাশে সিঁড়ির শেষ মাথার ছাদের দেয়াল ঘেষে কে যেনো বসে আছে । ভয়ে আমার বুক তখন হাপারের মতো উঠা নামা করছে । আমি কোন রকম জিজ্ঞষ করলাম । কে ! কে ওখানে ? হালকা আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্চে দু’হাটুর মাঝ খানে মাথা রেখে কে যেনো বসে আছে ।
ছোট্র শরীরটা দেখে আট দশ বছরের বাচ্চা বলে মনে হলো । আমি কানে তখন কিচ্ছু শুনছি না ।
চোখেও ভাল করে দেখছি বলে মনে হলো না ।
শুধু তাকিয়ে আছি । আর জোড়ে জোড়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করছি কে ! কে ওখানে ?

বেশ কয়েক বার চিৎকার করতেই সামনে বসে থাকা কায়াটা হাটু থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো । ভয়ে আমি চমকে উঠলাম । জাপানি ভুতের সিনামায় দেখা আট নয় বছরের একটি ছেলে আমার দিকে হাটু থেকে মুখ তুলে তাকালো । বড় বড় দুটো চোখ । সমস্ত মুখ কেমন ফেকাসে হয়ে আছে ।
অনেকক্ষন পানিতে ভিজলে চামড়া যেরকম ফেকাসে হয় তেমনটি ।
আমি আরো জোড়ে চিৎকার করলাম কে কে ?
ছেলেটি কোন উত্তর দিলো না শুধু একটি হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো ।
আমি ভয়ে তখন কি ভাবে যে নীচে নেমে এলাম বলতে পারবো না ।
যখন চোখ খুললাম তখন দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি মা ;বাবা,কাকু আর একজন ডাক্টার আমায় ঘিরে আছেন ।

বাবা কাকুকে বকছেন আমদের কেন ভুতের গল্প শুনায় তার জন্য । মা’র হাতের ফাঁক দিয়ে আমার চোখ যখন দরজার কাছে গেলো তখন আবার চমকে উঠলাম । ছাদে দেখা ছেলেটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে । আমার চোখা চোখি হতেই । ডান হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো । আমি আবার জ্ঞান হারালাম ।

সে বার আমাকে অনেকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো । কিন্তু আশ্চযের বিষয় সে রাতের পর ঐ ছেলেটিকে আর কোনদিন দেখা যায়নি আমাদের ছাদে দেখা যায়নি। সে রাতে অবশ্য আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল সেটি হলো আমাদের পাশের বাসার রবিন চাচ্চু মারা গিয়েছিলো । ভাল মানুষ হঠাৎ নাকি কি দেখে খুব ভয় পেয়েছিলেন । প্রিয় পাঠক এ দুটো ঘটনার মাঝে কোন মিল আছে কিনা আমি বলতে পারবনা ।আপনারা ভেবে দেখুন ।।

শেয়ার করেছেনঃ Mirza Jubayer Mamun