ভূতেরা যখন ভালবাসে…(আনন্দবাজার পত্রিকা'য় প্রকাশিত )

1

ভূত ভয় দেখানো ছাড়া আর কী কী করতে পারে? আমরা বাংলা সাহিত্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পে পড়েছি, ভূত অঙ্ক কষে দেয়, ভূত বন্ধুর মতো নির্জন রাস্তা পার করে দেয়, এমনকী ভূত হেলমেট পড়ে মোটরবাইকও চালায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূত একেবারে ‘লাভ মেকিং’-এর ভূমিকায়!

কোনও গল্প উপন্যাসের প্লট নয়, একেবারে বাস্তবেই প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করলেন আমেরিকার ওয়াশিংটনের উত্তর ওয়াহিওর একটি পরিবার। ওই পরিবারের এক সদস্য ডায়ানে কার্লিসেলের দাবি, তাঁর বসার ঘরে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ভূতের এই কাণ্ড। শুধু প্রত্যক্ষ করাই নয়, এমনকী তাঁর চার বছরের নাতনি কিমোরা সেই ভূতের উদ্দাম ভালবাসার ছবিও তুলে রেখেছে।

কার্লিসেল জানাচ্ছেন, সে এক অদ্ভুত গা ছমছমে অভিজ্ঞতা। বাড়িতে কেউ নেই। লিভিং রুমে তিনি আর তার চার বছরের নাতনি। হঠাৎ তারা হাই হিল পরা এক মহিলার ছায়ামূর্তি দেখতে পান। ওই হাই হিল পড়া মহিলা তাঁর পুরুষ শয্যাসঙ্গীর সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে আলিঙ্গনবদ্ধ। তাদের উদ্দাম ভালবাসার বিভিন্ন ভঙ্গির দৃশ্যে চমকে ওঠেন তিনি। ঘটনাটির বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যে তাঁর নাতনির মোবাইলে কয়েকটা ছবিও তারা তুলে রেখেছেন। এই হাই-টেক যুগে, ভূত বিপন্ন এই কথাটা তো তাহলে আর বলা যায় না।

দিব্য পান্ত ভূতের জ্যান্ত ছানাপোনারা জোছনায় গা এলিয়ে নেচে বেড়াচ্ছেন। এমনকী তারা বংশবৃদ্ধিতেও মন দিয়েছে। ভূতের এই কাণ্ডকে আমরা স্বাগত জানাতেই পারি।

তথ্যসূত্র: এ এন আই

সেইরাত প্রতিরাত

7

সন্ধ্যার পর এই নদীর ঘাটে কেউ আর আসে না। লোকে বলে এখানে এমন সময় ভূত আসে। কিন্তু, সেই বাঁধানো ঘাটে সন্ধ্যের পর রঞ্জন আসে। অফিসের দরজায় ধর্না দিতে দিতে যে এখন ক্লান্ত, বিষন্নতার তীব্র আঘাতে প্রায় অনুভূতি শূন্য। এমন লোকের কাছে আবার কিসের ভূতের ভয়! প্রতিদিন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে তাকে একবার আসতেই হত এখানে।
হঠাৎ একদিন লোকশূন্য সেই ঘাটে সে লোকের সন্ধ্যান পেয়েছিলো। নিস্তব্ধ নদীর ওপার থেকে একটা নৌকাকে ওপার থেকে এপারে চলে আসতে দেখেছিলো সে। নৌকার যাত্রী বলতে একটি আট-নয় বছরের ছোট্টো ছেলে আর এক আধ-বুড়ো মাঝি। নৌকা থেকে ঘাটে নেমে রঞ্জনের দিকে তর-তর করে হেটে আসতে লাগলো ছেলেটা। ডান হাতে একটা চায়ের ফ্লাক্স আর বাম হাতে ফ্যাঁকাসে লাল রঙের ছোট্ট একটা বালতি। বালতির ভেতর থেকে অদ্ভূত একটা শব্দ ভেসে আসছিলো। কয়েকটা কাঁচের গ্লাস আর পানি একসাথে যখন প্লাস্টিকের বালতির গায়ে আঘাত করে তখন যেমন শব্দ হয় ঠিক সেই রকম।
রঞ্জনের কাছে এসে ছেলেটি বললোঃ
-চা লাগবো স্যার?
রঞ্জন হঠাৎ-ই কৌতুকের সুরে বলে উঠলোঃ দেখি তোর পা উল্টা নাকি?
ছেলেটি কথাটায় তেমন একটা আমল না দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলোঃ গরম চা দেই স্যার? ভালো চা। কাপ গরম পানিতে ধুইয়া দিমু।
রঞ্জন বললোঃ নাম কি রে তোর?
– মোতালেব।
-বাহ! অনেক ভারী একটা নাম! শুনলে মনে হয় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের কেউ হবে। তা তুই এই রাতের বেলায় চা বিক্রি করতে আসলি! তাও আবার লোক নাই, জন নাই এমন এক ঘাটে?
– এই ঘাটে আইজ ই প্রথম। দেখি বিক্রি না হইলে অন্য জায়গায় যামু।
-তা, তোর বাড়ীতে কে কে আছে ?
-শুধু বুড়া নানী আসে। আম্মা মইরা গেসে, আর আব্বা আরেক বিয়া করসে। নতুন মা’য় খেদায়া দিসে।

কথাটা শুনে স্বভাবতই ছেলেটার প্রতি একটা মায়া জন্মে গেলো রঞ্জনের।

– তা ভাই মোতালেব, বানাউ দেখি এক কাপ চা।

মোতালেব একরকম গদবাধাঁ পদ্ধতিতেই ছোট্টো একটা কাপে ফ্লাক্স থেকে গাঢ় রঙের এক কাপ চা ভরে রঞ্জনের হাতে তুলে দিলো।

রঞ্জন চায়ের কাপে জোড়ালো একটা চুমুক দিয়ে বললো।

– মোতালেব, তোমার পড়ালেখা করতে ইচ্ছা করেনা?

-করে। অনেক ইচ্ছা করে।

-লাভ নাই। লেখাপড়া করে কোনো লাভ নাই।

-সবাইতো উলটা কয়।

-ভূল বলে, সবাই ভূল বলে। যাক বাদ দাও। একটা গল্প শুনবা?

-আইচ্ছা কন।

-বেশ কিছুদিন আগে এই জায়গাটায় রাতের বেলাতেও মানুষ আসতো। প্রচন্ড গরমে একটু ঠান্ডা বাতাস খাওয়ার জন্য আসতো।

কিন্তু, এখন দিনের বেলায় আসলেও রাতে আর কেঊ এইখানে আসে না। বলে এখানে নাকি সন্ধ্যের পর ভূত দেখা যায়। এইতো গত সপ্তাহে আমাদের পাশের বাসার লিয়াকত খান এসেছিলো। লোকটা খুব লোভী। নিজের একটা কারখানা আছে। নিজ কারখানায় চাকরী দেবার নাম করে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়; তারপর চাকরীও দেয়না আর টাকাও ফেরত দেয়না। এই খানে ভূতে নাকি তাকে এক ধাক্কায় নদীতে ফেলে দিয়ে ছিলো।

কথাটা বলে রঞ্জন অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ল। তারপরই বললঃ
-ঠিকই আছে, ব্যাটার আচ্ছা শাস্তি হয়েছে।
-তার পরে কি হইলো স্যার।
-ও! আসলে এইখানে একটা যুবক ছেলে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেছিলো। বেকার ছেলে। ভালো রেজাল্ট, অনেক ডিগ্রী। তারপরও চাকরি পায়নি। সংসারে অভাব। তার ওপর দেনা। সবার কাছে খারাপ ছেলে হয়ে গিয়েছিলো সে। এখনো মনে আছে ছেলেটা যেদিন ম্যাট্রিক পরীক্ষায় , ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করলো তখন বাসার মানুষ, প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কত না আদর করেছিলো তাকে। কত প্রশংসাই না করেছিলো। অথচ ছেলেটা যখন চাকরী পাচ্ছিলো না, বেকার বসেছিলো দিনের পর দিন; তখন ওই মানুষ গুলোর কাছে সে খারাপ হয়ে গেলো, অপদার্থ হয়ে গেলো। সমাজের কটাক্ষ আর সহ্য করতে না পেরে ছেলেটা মারাই গেলো। বেচারা!! ঠিকই তো করেছে সে। কি বল মোতালেব?

– হ স্যার তাইলে লেখা পড়া কইরা কি লাভ!! এমনেই তো তাইলে ভালা আসি। কিন্তু, স্যার। পোলাডা কি আপনার বন্ধু আসিলো? ওরে নিয়া এতো কথা আপনি জানেন কেমনে?
প্রচন্ড হাসিতে ফেটে পড়লো রঞ্জন। সে এমন ভাবে হাসছে যেনো মোতালেব তাকে মহা নির্বোধের মত কোনো একটা প্রশ্ন করে বসেছে।
– আমি কিভাবে জানি! এখানে আসার সময় আমি তোমাকে প্রথম যে প্রশ্নটা করেছিলাম মনে আছে? তোমাকে যে জিজ্ঞেস করলাম তোমার পা উল্টা নাকি মনে আছে?

-হ আসে ক্যান?
-দ্যাখোতো আমার পা দুটো।

মূহুর্তেই মোতালেব ভূত দর্শন করলো। সামনে জলজ্যান্ত উল্টা পায়ের একটা মানুষ, না না ভূত। হ্যা, ভূত।
– চা এর ফ্লাক্স আর আনুষঙ্গিক জিনিস পত্র হাতে নিয়ে গলা ফাটিয়ে ভূত! ভূত! চিৎকার করতে করতে উর্ব্ধশ্বাসে দৌড়ে পালিয়ে গেলো মোতালেব। আর যেতে যেতে মনে মনে বলতে লাগলো শালায় মাগ্নাও চা খাইলো আবার ভয়ও দেখাইলো। ভূত ও এমন ফাজিল হয়………

ভুতুরে রাস্তা (ছবিসহ)

5

এই ছবিটি কোন ভূতুড়ে এলাকার নয়, নয় কোন পরাবাস্তব জগতের ছবি। কিন্ত অন্ধকার এই সরণী ধরে আপনি যখন এগিয়ে যাবেন তখন আপনি হয়তো সেটাই মনে করবেন! দুপাশের গাছের দাঁড়ানো সারির বুক ছিঁড়ে যে সড়কটি চলে গেছে তাঁর নাম Bregagh Road। আয়ারল্যান্ডের Armoy শহরের কাছের এই সড়ককে গত ৩০০ বছর ধরে পাহারা দিচ্ছে এর দুপাশে দাঁড়ানো বীচ (Beech) বৃক্ষ গুলি। তীব্র বাতাসে এই গাছগুলির ডালপালা যখন নড়েচড়ে উঠে তখন এখানে ভেসে উঠে আলোআঁধারির এক আধিভৌতিক খেলা।

 

অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই বীচ বৃক্ষ গুলি এখানে লাগিয়েছিলেন বিখ্যাত স্টুয়ার্ট পরিবার , তখন এই সড়কটি ছিল তাদের নিবাস Gracehill House এর প্রবেশ পথ। বর্তমানে এই বাড়িটি গলফ ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তখন তাঁরা কি ভাবতে পেরেছিলেন দুই শতাব্দী পরে এই গাছ গুলো পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত হয়ে যাবে এবং ফটোগ্রাফারদের কাছে হয়ে উঠবে তুমুল জনপ্রিয়?

 

কিংবদন্তী অনুযায়ী এই সড়কে রাতের বেলায় অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা সম্পন্ন সাদা গাউন পরিহিত এক রমণীকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। নিশ্চুপ এই রমণী একাকী পথ ধরে হেঁটে চলে, একটা সময় শেষ গাছটির ভিতরে ঢুকে পড়ে। অনেকের ভাষ্য মতে এই রমণীটি কাছাকাছি কোন বাড়ির দাসী ছিল , যে শত বছর আগে তার মালিকের অত্যাচারে মারা গিয়েছিলেন।

আবার অনেকের মতে মহিলাটি একটি প্রেতাত্মা যাকে নিকটস্থ এক জায়গায় কবর দেয়া হয়েছিলো। হ্যালোইন রাত্রির সময় ঐ মহিলার সাথে যোগ দেয় আরও কিছু প্রেতাত্মা যাদেরকে তাঁর পাশে কবরস্থ করা হয়েছিল এবং মারা গিয়েছিল তাঁর মত অত্যাচারিত হয়ে । সত্যিই ভুতুরে ব্যাপার ।

সাঁপ

2

অনেক দিন আগের কথা ! প্রতিদিনের ন্যায় বিকেল বেলা তমাল বাড়ীর উঠোনে বের হয়েছে । উঠোনের পাশেই কবরস্থান । যেমন তেমন কবরস্থান নয় এটি । অনেক পুরাতন । বেশিরভাগ কবরের পরিচয় জানেনা কেউ । যে জাম গাছটার নিচে প্রতিদিন বসত আজও সেই জায়গায় দাড়িয়ে আছে তমাল । প্রকৃতির সবুজ ঘেরা অসম্ভব সুন্দর সৌন্দর্য উপভোগ করছে আর ভাবছে. . . . . .
কি বিচিত্র আল্লাহর সৃষ্টি ! কত সুন্দর করে নিপুন হাতে গড়েছেন এই পৃথিবী । কোথাও কোন বিন্দু মাত্র ভুল নেই । সৃষ্টির কারুকার্য দেখে সেচ্ছায় সৃষ্টিকর্তার কাছে মাথা নত হয় তমালের । একমনে শুধু ভাবছে আর ভাবছে । কবরস্থানের দিকে তাকিয়ে মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যায় । কি সম্বল আছে ওপারে যাওয়ার ? আমার তো তেমন কোন পুণ্যই নেই । কিভাবে থাকবো ঐ অন্ধকার কবরে । যেখানে একদিন সবাইকেই যেতে হবে ।কি করেছি আমি এই ছোট্ট জীবনে ? যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু পাপাচার আর অনাচার ।কেউ কি ভয় করেনা নাকি যে তাদের একদিন মরতে হবে । যেতে হবে সেই অন্ধকার কবরে । নাহ্ আর ভাবতে পারছিনা । আল্লাহর ভয়ে কেমন জানি অন্যরকম লাগছে । কেনজানি হঠাত্‍ বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো । ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন সুললিত কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পায় তমাল । কান পেতে থাকে কোন দিক থেকে আওয়াজটা আসে । এমন সুমধুর সুরে কোরআন তেলাওয়াত ইতি পূর্বে কখনও শোনেনি । কে তাহলে এত সুন্দর করে তেলাওয়াত করছে ?
এমন সময় চোখ পড়লো তার থেকে ৩-৪ হাত দূরেই একটি গোখরা সাঁপ ফনা তুলে তার দিকে চেয়ে আছে । আর ঐ তেলাওয়াতের সুরটাও সাঁপটার কাছ থেকে আসছে । সাঁপটি মাথা দুলাচ্ছে আর অসম্ভব সুন্দর করে তেলাওয়াত করছে । তমাল ভেবে পায়না এখন তার কি করা উচিত ? ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলো তমাল । দৌড় দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে তমাল । কিন্তু তা আর হয়না যেন । পাঁ টা যেন প্যারালাইজড হয়ে গেছে । কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন আটকে রেখেছে তাকে ।সাঁপটি অনবরত তেলাওয়াত করেই যাচ্ছে ।

কতক্ষন এভাবে কাটলো বুঝতে পারেনা তমাল ।ভয় অনেকটাই কেটে গেছে । ভয় পাওয়ার কি আছে? সাঁপটা তো আর তার কোন ক্ষতি করছেনা ।মনে মনে নিজেই নিজেকে সাহস দেয় তমাল । দেখিনা শেষ পর্যন্ত কি হয় । মনে হয় জ্বীন ভুত জাতিও কিছু একটা হবে এটা । শরীর থেকে টপটপ করে ঘাঁম পড়ছে যেন গোসল সেরে আসলো এখনি । কি আর করা , হাঁ করে সাঁপটার দিকে তাকিয়ে শুধু তেলাওয়াত শুনছে তমাল । তমালের মনে হলো সাঁপটা কোন একটা বড় সূরা ধরেছে এবং তা সম্পূর্নটা না শুনিয়ে ছাড়বে না । না শুনতে চেয়ে তো আর লাভ নেই । আর তাছাড়া শুনতে তো ভালোই লাগছে ।
ছদাকল্লাহূল আযীম. .. .. . .
যেন জ্ঞান ফিরে পায় তমাল । এখন বোধহয় ছাড় পাবো । নাহ্ পাঁ তো উঠছেনা । আরো কি . .. . . . ? মুখ ফসকে কথাটা বের হয় তমালের । চেয়ে দেখে সাঁপটার দিকে । হঠাত্‍ . . .
সাঁপটা তার চেহারা বদলালো । পরিনত হলো একটি মৌমাছি তে ।সাইজটাও অন্য সব মৌমাছি থেকে অনেকটা বড় । আরে এতো দেখছি আমার দিকেই উড়ে আসছে । পালাই যদি কামড় মারে । তমালের পাঁ দুটো এবার কিন্তু ফ্রি হলো । এক দৌড়ে আঙিনায় এসে উপস্থিত । আর ঐ মৌমাছিটাও পিছন পিছন উড়ে আসে । এসে বসে আঙিনায় থাকা ঠিক লাউয়ের মাঁচার উপর । আর অদ্ভুদ সব ঘটনা ঘটে যেতে লাগলো তখন । নিমিষেই লাউ গাছে ফুল আসলো । পরাগায়ন ঘটলো, লাউয়ের জালি গুলো অতি দ্রূত বড়ও হওয়া শুরু করলো । একি ! অবাক কান্ড । ব্যপারটাতো মাকে জানানো লাগে, বলেই মা মা মা বলে ডাকতে থাকে তমাল । মা আসতে এত দেরি করছে কেন ? জোরে জোরে ডাতে লাগলো মা ও মা ও মা . . .. . . . .
মাথায় কারও যেন পরশ অনুভব করে তমাল ।চেয়ে দেখে তার মা । কিরে ঘুমের মধ্যে আমাকে ডাকছিস কেন ? কোন স্বপ্ন দেখেছিস?

সহযাত্রী

2

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

কোন কাজ সময় মতো শুরুও শেষ না করতে পারার জন্য আমার বেশ বদনাম আছে । আর এর জন্য কেউ আমাকে কোন দায়িত্ব দিয়ে খুব একটা শান্তিতে থাকতে পারেনা । আমি নিশ্চিন্তে থাকলেও যে দায়িত্ব দেয় কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেশ টেনশনে থাকতে হয় । বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলে তো আর কোন কথাই নাই ।
সুতারাং কাজটাজ নিয়ে আমাকে খুব একটা টেনশন করতে হয় না , যার কাজ তার আরেকটা কাজ হয়ে যায় আমাকে মনে করিয়ে দেয়া ।
বেকারদের সবাই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাবে । আমার বেলাতেও তার কোন হেরফের নেই । যখন যার যেমন ইচ্ছে হুকুম দিয়ে যাচ্ছে , আর আমি তা পালন করে যাচ্ছি । ঠিক মতো করতে পারলে ভাল , তা না হলে আমি পৃথিবীর সবচাইতে অপদার্থদের সরদার ।
টুকটাক লেখা লেখি ছাড়া আমি তেমন কিছু একটা করি না । দু’একটা পত্রিকাতে কবিতা টবিতা লিখি । ইদানিং ব্লগেও লেখালেখি শুরু করেছি । ভূতের গল্প লিখে সবার কাছে মোটা মুটি একটা অবস্থা করে নিয়েছি । যদিও আমি নিজে কখনও ভূত দেখিনি । আর ভূতে বিশ্বাসও করিনা । তবে মনে বড়ো খায়েশ নিয়ে আছি যদি কখন ভূতরা দয়া পরবস হয়ে দেখা দেয় , তবে আমি তাদের নিয়ে লিখেটিখে একেবারে মহালেখক হয়ে যাই ।
আমি থাকি পুরান ঢাকায় বোনের বাসায় । দুলাভাই বড় ব্যবসায়ী । বেশ হোমরা-চোমরা মানুষ । আমায় গৃহপালিত প্রাণির মতো বেশ স্নেহ করেন । সকাল বিকাল খোঁজ খবর নেন । হাত খরচ দিয়ে সাহায্য করেন । আমার মতো , দুলাভাইরা ও দু’ভাই বোন । ওনার বড় বোন লুবনা আপা , আমি যাকে মাথা খারাপ আপা বলে ডাকি , থাকেন চিটাগাং । লবনা আপুর স্বামীর তেলের ব্যবসা । বেশ ধনী মানুষ । ধনী মানুষের সেবা যত্নের জন্যও মহান আল্লাহতালা পৃথিবীতে অনেকে কিছু পাঠান । যাদের কাজই হচ্ছে শুধু ধনী মানুষদের সেবা যত্ন করা । নিজেকে আমার মাঝে মাঝে সেই শ্রেণীর মনে হয় । যাই হোক এসব বলে কয়ে কোন লাভ নেই । সবই হচ্ছে কপাল ! কিনলাম গাই হইল আবাল অবস্থা ।

রাত বাজে প্রায় দশটা ।
আমি কমলাপুল রেল স্ট্রেশনে রিকসা থেকে নামলাম । গন্তব্য চিটাগাং লুবনা আপার বাসা । দুলাভাই বোনের জন্য মাথা ঠান্ডা করার ঔষুধ নিয়ে এসেছেন , চায়না থেকে । আমি তা নিয়ে যাচ্ছি । ট্রেন ছাড়ার কথা সাড়ে দশটায় । আমি আজ বেশ সময় মতো আসতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করলাম । না , যাক এ কাজটা অন্তত ঠিক মতো শেষ হবে । একটা সিগারেট কিনে ধরালাম । পকেট থেকে টিকিটটা বেড় করে দেখলাম ট্রেন ছাড়ার সময় এর জায়গায় সাড়ে দশটা লেখা । মোবাইলে ঘড়ি দেখলাম – ৯টা ৫৫ মিনিট । সিগারেট শেষ করে প্লাটফমের দিকে এগুলাম । প্লাটফমটা কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো । লোকজন খুব একটা নেই । দু’একজন বেঞ্চিতে বসে ঝিমুচ্ছে । আমি আবার ঘড়ি দেখলাম , দশটা বাজে । আরো ত্রিশ মিনিট সময় আছে । কিন্তু ট্রেন কৈই ?
সাধারনত ট্রেন ছাড়ার আধা ঘন্টা আগে লোকজনের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার কথা । কিন্তু এখানে দেখছি ট্রেন ও নাই ,যাত্রী ও নাই । হরতাল টরতাল না তো ?
আমি পায়চারি করতে লাগলাম । ঘড়িতে দশটা ১৫ বাজার পরও কোন ট্রেনের দেখা নেই । আজব তো । আমার ক্যামন জানি সন্দেহ হলো , পকেট থেকে টিকিটা বেড় করে আবার দেখলাম । আজকের তারিখ ইতো লেখা রয়েছে । তা হলে ? ঘটনা কি !!
আমি টিকিট কাউনন্টারে চলে এলাম । প্রায় সব গুলো কাউন্টার খালি । একটাতে একজন বসে কম্পিউটারে কার্ড খেলছে । আমি টিকিটা এগিয়ে দিয়ে বললাম ,- ভাইজান ট্রেন কখন ছাড়বে ?
লোকটা কম্পিউটার থেকে চোখ না সড়িয়েই বললো -কোন ট্রেন ?
আমি টিকিটটা দেখিয়ে বললাম এটা ।
লোকটা টিকিটা নিয়ে একবার দেখে বললো – এ ট্রেন তো আরো এক ঘন্টা আগে ছেড়ে গেছে ।
বলেন কি ? আমি চমকে উঠলাম । কিন্তু ট্রেন ছাড়ার সময় তো সাড়ে দশটায় ।
সাড়ে দশটা না ; ভাল করে দেখেন ।
লোকটা টিকিটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললো । চোখে মুখে র্স্পষ্ট বিরক্তি । যেন এই মূর্হুতে আমি পৃথিবীর সব চাইতে বিরক্তি কর কোন প্রাণি । আমি টিকিটটা আবার দেখলাম , আবচ্ছা আলোয় আমার কাছে লেখাটা সাড়ে দশটাই বলেই মনে হলো ।
ভাই সাড়ে দশটাই তো লেখা ? আমি আগের চেয়ে নরম সুরে বললাম ; লোকটা এবার ফোনে কারো সাথে কথা বলছে । আমার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে চুপ থাকতে বললো । মনে মনে নিজের ভাগ্যটাকে গাল মন্দ শুরু করলাম । কৈ ভেবে ছিলাম কোন সুন্দরী সহযাত্রীর পাশে বসে গল্প করতে করতে চিটাগাং যাবো ! না এখন রাগে দু:খে নিজের মাথার সব চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে । নিজেকে হঠাৎ খুব অসহায় মনে হলো । মনে হলো আসলেই আমি এ পৃথিবীতে চলার জন্য একজন অক্ষম মানুষ । মনে মনে বললাম হে বিধাতা আমাকে কেন পাঠালে তোমার এ মহা বিশ্বে , আর পাঠালে যদি কেন যোগ্য করে পাঠালে না ? বুক চিড়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস বেড় হয়ে এলো ।
লেখা পড়া জানেন ? লোকটা ফোন রেখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো । চোখে মুখে আগের চেয়েও বেশি বিরক্তি ।
-সরি বুঝলাম না ভাই । আমি অবাক হয়ে বললাম ।
জিজ্ঞেস করছি পড়া লেখা জানেন ?
জ্বি জানি । রসায়নে এমএসসি করেছি , ঢাকা ভারসিটি থেকে । আপনি কতো দূর করেছেন ? আমি যতোটুকু সম্ভব মাথা ঠান্ডা রেখে উল্টো জিজ্ঞেস করলাম ।
সময়টা দেখে পড়তে পারেন না , যে , সাড়ে নটা লেখা আছে ।
আমি আবার টিকিটটার দিকে তাকালাম । কিন্তু আমার কাছে মনে হলো সাড়ে দশটাই লেখা ।
এমন সময় আরেক জন হেংলা পাতলা লোক ঢুকলে কাউন্টারে ।
কি মতিন ভাই , কি হইচ্ছে ? হইচই কেন ! লোকটা একটা বুথে বসতে বসতে বললো ।
আরো দেখ না , সাড়ে নটায় যে ট্রেন ছেড়ে গেছে সেটার জন্য উনি এখন এসেছে ।
ভাই আপনি ট্রেন ফেল করেছেন । নতুন আসা লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো ।
আমি বুঝলাম এদের সঙ্গে কথা বলে পারা যাবে না , তাই অনেকটা কম্পোমাইজের সুরে বললাম – আমার খুব আর্জেন্ট কাজ আছে , আজ চিটাগাং যেতেই হবে । আমার চোখে মুখে অনুনয় ঝরে পরতে লাগলো ।
রাতে আর কোন ট্রেন নাই ; ভোর সাড়ে সাতটায় আছে । সেটায় চলে যান ।
কিন্তু ভাইজান আমাকে কাল ভোরে যে করে হোক চিটাগাং পৌঁছাতেই হবে । কিছু একটা ব্যবস্থা করুন প্লীজ ।
স্যার কি রাতে চিটাগাং যাবে মতিন ভাই ?
হু ! যাবে । আগের লোকটা উত্তর দিলো ।
দেখেন দেড়টার সময় আমাদের একটা স্পেশাল ট্রেন যাবে চিটাগাং । আপনি চাইলে যেটায় ব্যবস্থা করে দিতে পারি ।
প্লিজ ভাই , দেননা ব্যবস্থা করে ; আমার অনেক উপকার হবে ;
তয় , ভাড়া পরবে পাঁচশ টাকা ।
আমি বললাম- কোন ব্যাপার না , আমি রাজি ।
ঠিক আছে , কম্পাটমেন্টে গিয়ে বসেন , আমি ট্রেন ছাড়ার আগে আপনাকে ডেকে নেবো ।
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । যাক বাঁচা গেল । যতো মুশকিল ততো আসান । আমি আকাশের দিকে মুখ করে আল্লাকে ধন্যবাদ দিলাম ।

দুই …………….

স্যার ; আসেন ট্রেনে ছেড়ে দেবে । বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম , হঠাৎ কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠে তাকালাম । কাউন্টারের সেই হেংলা মতো লোকটা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। এতো কাছ থেকে দেখে লোকটাকে আরো বেশি রোগা মনে হলো ।
সবাই উঠে গেছে , বড় সাহেব আসলেই রওনা ট্রেন দেবে । চলেন স্যার ।
এ ট্রেন চিটাগাং যাবে তো ? আমি আবারো কনফারর্ম হবার জন্য জিঞ্জেস করলাম ।
কি যে বলেন না স্যার , অবশ্যই চিটাগাং যাউব , এখন তারাতারি চলেন ।
আমি ব্যাগটা নিয়ে উঠে পরলাম ।
ট্রেনটা ছোট , সিটগুলো মুখোমুখি বসানো ; দেখেই বোঝা যায় বেশ আরামদায়ক । আমার ভাল লেগে গেল । মনে মনে বললাম, উপড় তলার মানুষরা সব সময় আরামে থাকে । আমি কি কখনও উপড় তলার মানুষ হতে পারবো ? নিজের চিন্তার ধরন দেখে নিজেরই হাঁসি পেল । লকারে ব্যাগটা রেখে আমি বাপাশের একটা সিটে বসে পরলাম । মনেমনে ভাবলাম আর কেউ না উঠলে শুয়েও যাওয়া যাবে । ঘড়ি দেখলাম , রাত দেড়টা বাজে । জানালা দিয়ে বাহীরে তাকিয়ে দেখলাম পুরো প্লাটফমটা ক্যামন ভূতরে হয়ে আছে ,কোন লোকজন নেই । এখানে সেখানে দু’একজন কাথা মুড়ি ঘুমাচ্ছে । দেখে বুঝাই যায় না প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখান দিয়ে আসা যাওয়া করে । শত শত দু:খ ,কষ্ট ভালবাসা বুকে নিয়ে । হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাষ বেড় হয়ে এলো ।
আস্তে আস্তে ট্রেনটা চলতে শুরু করলো । আমি বাহীরে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম । সবকিছু ক্যামন পেছনে চলে যাচ্ছে । অনেকটা আমাদের জীবনের মতো । সব কিছু হারিয়ে যায় কালের গহর্ব্বরে । মিনিট বিশেক চলার পর ট্রেনটা থামলো কোথাও । আমি বুঝতে পাললাম না কোথায় থেমেছে ।
মনে হলো ঢাকার আশে পাশে কোথাও ।
ব্যাগ নিয়ে সার্ট প্যান্ট পরা একজন মাঝ বয়সি লোক উঠলো । চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকালো অনেকটা পরিচিতের মতো । তারপর এগিয়ে এসে ব্যাগটা রেখে ধপ করে আমার মুখোমুখি বসে বললো- ক্যামন আছেন ? কোথায় যাচ্ছেন ? আমি বেশ অবাক হলাম । আমি চিনতে পারলাম না । কোথাও দেখেছি তা ও মনে পড়লোও না । আমার কপাল কুচকে গেল । আমি ছোট্র করে বললাম ভাল । আপনি ক্যামন আছেন ? শেষের কথাটা ভদ্রতা রক্ষার জন্য বললাম ।
আর ভাল , যে দিন কাল পড়েছে , তাতে টিকে থাকাই দায় । লোকটা ফোস করে বললো ।
আমি কিছু না বলে জানালার দিকে ঘুরে বসলাম । ট্রেনটা খুব জোরে চলতে শুরু করেছে । ঠান্ডায় হাওয়ায় চোখ বুঝে আসতে চাইছে । লোকটা একটা বই বেড় করে বসেছে । আমি সিটের হাতলে মাথা রেখে শুয়ে জানালা দিয়ে বাহীরে তাকিয়ে রইলাম ।
কোথায় যাচ্ছেন তা তো বললেন না ?
চিটাগাং । আমি কথা না বাড়াবার জন্য ছোট্র করে উত্তর দিলাম । অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলাঠা ঠিক না । লোকটা মনে হয় আমার মনোভাব বুঝতে পারলো । মৃর্দু হেসে বললো – আমি কিন্তু আপনাকে চিনি ?
আমি বেশ অবাক হয়ে আগের চেয়েও বেশি কপাল কুঁচকে লোকটার দিকে ভাল করে তাকালাম । ক্লিন সেইভ গোলগাল মুখমন্ডল আর চোখ নাক ছাড়া অন্য অন্য এমন কিছুই দেখতে পেলাম যে লোকটাকে আমার কাছে পরিচিত বলেমনে হবে ।
আমার যদি ভুল না হয় – আপনি “আমার কবিতা” নামে ব্লগে লিখেন , ঠিক বলেছি না ?
এবার আমি বেশ চমকে উঠলাম । আরে এ বলে কি । এতো দেখি কোন ব্লগার ভাই ।
কিন্তু , আমি তো আপনাকে চিনলাম না ভাই । আমি শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে বললাম ।
আমাকে চিনবেন না । আমি কোন ব্লগার নই । তবে আমার মেয়ে ব্লগার । সেই লেখেটেখে । আমি শুধু সময় পেলে মাঝে মাঝে পড়ি । আপনার ভূতের গল্পগুলো আমার মেয়ের খুব প্রিয় । আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম । তারপরও লজ্জাবনত চোখে বললাম – তাই নাকি । আমি হেসে ফেললাম , মনে মনে বেশ খুশি হয়ে উঠেছি । এর চাইতে বড় প্রাপ্তি একজন লেখকের কাছে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না ।
জ্বি , আপনার প্রতিটি ভূতের গল্প আমার মেয়ের কাছে প্রিন্ট করা আছে , সময় পেলেই পড়ে । প্রতি শুক্রবার অপেক্ষায় থাকে আপনার নতুন কোন গল্পের জন্য । আমার লজ্জা পাবার পরিমান বেড়ে গেল ।
আরে বাস ! বলেন কি । আমি কি সব আবল তাবল ; যা তা লিখি , তা আবার কারো কাছে ভাল লাগে নাকি । কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কি ভাবে ?
বারে , ব্লগে আপনার ছবি দেয়া আছে না । লোকটা হেসে বললো ।
তা আপনার মেয়ে কি নামে লেখে ?
আপনিও ওকে চিনবেন ; ওর নাম নিসা । আপনার অনেক গল্পের নায়িকার নাম নিসা , তাই না ?
ও আচ্ছা ! হ্যা ; আমি তো ওনাকে চিনি । আমার অনেকগুলো গল্প বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়েছে । কিন্তু অনেক দিন ব্লগে আসছেন না ।
ব্লগে না আসলেও আপনার গল্পগুলো কিন্তু বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ে ।
আমি ধন্য হলাম , আমার নাম সাখাওয়াত হোসেন বলে আমি লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম ।
আমি মোজাম্মেল হোসেন । আপনার সঙ্গে মিলিত হতে পেরে খুব ভাল লাগল । মোজ্জামেল সাহেব আমার হাতটা ধরতেই আমি চমকে উললাম । মনে হলো এক টুকরো বরফ কেউ আমার হাতে চেপে ধরলো । এতো ঠান্ডা কারো হাত হয় নাকি ?
আমি কোন মতে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম – আমারও খুব ভাললাগলো ।
আচ্ছা আপনি বই বেড় করছেন না কেন ?
জ্বি বই ! আমি মৃদু হাসলাম , তারপর বললাম – চাইলে-ই তো হয় না । তবে ইচ্ছে আছে , আল্লাহ চাইলে বেড় করবো ।
যদি কিছু মনে না করেন আমার মেয়ের জন্য যদি একটা অটোগ্রাফ দিতেন । মোজাম্মেল সাহেব অতি বিনয়ের সঙ্গে বললো । এবার আমি সত্যি সত্যি চমকে উঠলাম । আমার মনে লজ্জ আমার গাল চোখ মুখ নাক গলে মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে পরছে । না , না আমি এতো বড় লেখক এখনও হয়ে উঠতে পারিন ।
তার মানে অট্রোগ্রাফ দেবেন না ।
না , না দেবো না কেন ।
তাহলে এখানে কিছু লিখে একটা অটোগ্রাফ দিন প্লিজ । মোজাম্মেল সাহেব আমার দিকে একটা ঔষুধ কম্পানীর প্যাড আর কলম এগিয়ে দিয়ে বললো ।
আমার হাতে আবার ও ঠান্ডা হাতের র্স্পশে পুরো শরীর শিউরে উঠলো । কলমটাকে মনে হলো ফ্রিজ থেকে বেড় করে আনা হয়েছে । আমি কাঁপাকাঁপা হতে লিখলাম – প্রিয় নিসাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা সহ ভালবাসা – “আমার কবিতা” তারপর ছোট্রো করে সাইন করে দিলাম ।
আচ্ছা সাখাওয়াত সাহেব , আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন ? মোজাম্মেল সাহেব খুব সিরিয়াস ভাবে জিজ্ঞেস করলেন ।
আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না । হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলাম ।
কি হলো কিছু বলছেন না যে ? আপনি কি ভূত প্রেতে বিশ্বাস করেন ? ভূত প্রেতদেখেছেন কখনও ?
আমি একটু থেমে সময় নিয়ে বললাম – বিশ্বাস করিনা । আসলে ভূত বলে কিছু নেই । আমাদের অনুভুতির খুব সূক্ষ্ন একটি ভীতিকর অংশের নামই হচ্ছে ভূত । তা ছাড়া আমরা মানুষ ও জীব যন্তুদের মস্তিস্কে কিছু সেল বা কোশ রয়েছে যেখানে কোন ঘটনার পরিপেক্ষির ভীতি কর অনুভুতির জন্ম হয় অ আসলে সেটাই ভৌতিক ভীতি বা ভূতের ভয় ।
তারমানে আপনি ভূতে বিশ্বাষ করেন না ?
জ্বি ,আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা । আসলে সবটাই অনুভুতির ব্যাপার । আমি বেশ বিজ্ঞের মতো বললাম ।
দেখেন ; বিশ্বের সব জাতি কিন্তু ভূতের ভয় করে । আমেরিকা , লন্ডনে এমন অনেক বাড়ী আছে যেগুলো ভূতের ভয়ে খালি পরে আছে । মোজাম্মেল সাহেব রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন ।
আপনার কথা সত্যি । কিন্তু প্রকৃত খোঁজ নিয়ে দেখবেন এগুলো আসলে সবটাই হিউমার । আমি আজ পর্যন্ত এমন কাউকে পাইনি যে , বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে সে ভূত দেখেছে । ভূত টুত বলে আসলে কিছু নেই ।
তাহলে আপনি এসব ভৌতিক কাহীনি লিখেন কেন ?
আর ভাই , এটা তো আমাদের বিনোদনের একটা অংশ মাত্র । এর বাহীরে কিছু না । আমি হাসতে হাসতে বললাম । তারপর একটু থেমে মোজাম্মেল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম – আচ্ছা আপনি কি কখনও ভূত দেখেছেন ?
মূর্হুতে মোজাম্মেল সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল । একটা র্দীঘশ্বাস ফেলে বললেন সে কথা পরে হবে ।
দেখলেন তো আপনিও উত্তর দিতে পারলেন না । আসলে ভূত বলে কিছু নেই । যদি থাকতো , তবে এতো দিনে মানুষের সঙ্গে আপোষ-রফা করে আমাদের সমাজেই প্রকাশ্যে বসবাস করতো । ঈদে-র্পাবণে আমরা যেতাম ভূতের বাসায় বেড়াতে ওরাও আসতো আমাদের বাসায় । হা হা হা হা আমি হাসতে লাগলাম ।
মোজ্জামেল সাহেব আমার হাসিতে মনে হলো একটু বিরক্ত হয়ে , পেছনে হেলান দিয়ে বসতে বসতে বললেন – কিন্তু আমি ভূতে , বিশ্বাস লেখক সাহেব !
তাই নাকি ?
তো কেন বিশ্বাস করেন । ভূত দেখেছেন নিশ্চই ? আমি একটু ঝুকে অনেকটা ফিসফিস করে জিঞ্জেস করলাম ।
মোজ্জাম্মেল সাহেব এবার হাসলেন । হাসির মানেটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না । তবে কেন যেন আমার বিরক্ত লাগলো, কোন কিছুতে বিশ্বাস করতে হলে চোখে দেখতে হয় , না দেখে বিশ্বাস করা যায় না , আমি যখন কথাগুলো বলছিলাম ঠিক সেই সময় খুব শব্দ করে পাশ দিয়ে একটা ট্রেন উল্টো দিকে চলে গেল ।
এটা কোন যুক্তি হতে পারে না লেখক সাহেব । এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা না দেখেও বিশ্বাস করি ।
– যেমন ? আমি কপাল কুচকে নাচিয়ে উদাহারন চাইলাম ।
যেমন ধরেন – বাতাস , যেমন ধরেন সৃষ্টিকর্তা । এরকম অসংখ্যা উদাহারণ আছে , ক’টা চাই আপনার ?
উ–প—স । আমি পিছিয়ে গেলাম । না আপনার সঙ্গে যুক্তিতে পারছি না । বলে আমি রন ভেঙে দিলাম ।
তারমানে কি আপনি ভূতে বিশ্বাস কললেন ? মোজ্জামেল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন ।
না । না । কখনওই না । ভূত বলে কিছুই নেই । সবই মানুষের কল্পনা । আমি একটু জোড়েই বলে উঠলাম ।
মোজ্জামেল সাহেব হাতের বই প্যাড ব্যাগে ডুকাতে লাগলেন । আমি বেশ অবাক হয়ে জিঞ্জেস করলাম – নেমে যাবেন নাকি ?
হা ।
এখানে কোথায় নামবেন ?
সামনে কালিগন্জ ট্রেন থামবে ।
বুঝলেন কিভাবে যে ট্রেন কালিগন্জ চলে এসেছে ?
মোজ্জামেল সাহেব আবারও হাসলেন । ট্রেন কিন্তু থামলো না ; চলতেই থাকলো । আমি বাহীরে তাকিয়ে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না ।

তিন…………….

আমি হাতের কলমটা নাড়াচাড়া করতে করতে মোজ্জাম্মেল সাহেবের ব্যাগ গোছানো দেখছি । ব্যাগ গোছানো শেষ করে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- তাহলে চলি লেখক সাহেব ।
আমি উঠে হাত মেলাবার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলাম , মনে মনে শিউরে উঠলাম ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতে হবে বলে । কিন্তু মোজ্জাম্মেল সাহেব হাত না মিলিয়ে , আসি বলে , সামনে পা বাড়ালেন । আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম । হঠাৎ করে আমার হাত থেকে কলমটা পরে গেল , আমি বসে মোজ্জালেম সাহেবের দিক থেকে চোখ না সড়িয়ে বসে কলমটার জন্য হাতাতে লাগলাম , মোজ্জাম্মেল সাহেব তখন পৌচ্ছে গেছেন দরজার কাছে , হঠাৎ আমার চোখে গেল মোজ্জাম্মেল সাহেবের পায়ের দিকে – সঙ্গে সঙ্গে আমি ভয়ে আতকে উঠলাম , মোজ্জাম্মেল সাহেবের পা দুটো আমার দিকে ঘুরানো , অথচ তিনি দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন । এটা কি করে হয়, শরীরটা সামনের দিকে অথচ পায়ের পাতা দুটো পেছনর দিকে । আমি কি করবো বুঝতে পারলাম না । ভয়ে সিটের দিকে চেপে গেলাম । মোজ্জাম্মেল সাহেব দরজার কাছে দাঁড়াতেই দরজাটা আপনা আপনি খুলে গেল । সঙ্গে সঙ্গে কামরাটায় এক রাশ ঠান্ডা হাওয়া এসে ডুকলো , ভয়ে আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করেছে । মোজ্জাম্মেল সাহেবের মাখুটা আস্তে আস্তে তার ঘাড় বেঁকে আমার দিকে গুরে গেল , আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম ,না , না এ হতে পারে না । মোজ্জাম্মেল সাহেব মুখ হাসি হাসি করে বললেন – কি ভূতে বিশ্বাস হয় না ? বলেই উনি চলন্তে ট্রেন থেকে বাহীরে হেঁটে গেলেন । আমি ভয়ে ভয়ে জানালার কাছে গিয়ে মোজ্জাম্মেল সাহেবকে দেখার জন্য বাহীরে তাকালাম , কিছু চোখে পরলো না । হঠাতই মোজ্জাম্মেল সাহেব জানালায় কাছে উদয় হয়ে বিকট শব্দে হেসে উঠলেন – হাঅঅঅঅঅঅঅ । আমি ভয়ে চমকে গিয়ে , হাঅঅঅঅঅঅঅ করে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালাম ।

লিখেছেন :মুহাম্ম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন

অবিশ্বাস্য তবু বিশ্বাস করতে হবে(পর্ব ৩)

2

প্রাচীন বিশাল আকৃতির একটা পাথর রয়েছে সৌদিআরবের Al-Hassa গ্রামে। পাথরটি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাটি থেকে ১১ সে:মি: শূন্যে ভেসে থাকে। ইতিহাসে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে একজন মুজাহিদকে এই পাথরের উপর/পাশে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ছিল এপ্রিল মাসের। তারপর থেকে প্রতি বছর এপ্রিল মাসের নির্দিষ্ট এই দিনে পাথরটি আধা ঘন্টা মাটির উপর ভাসমান হয়ে থাকে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখন এই ঘটনা ঘটে তখন পাথরটিতে লেগে থাকা রক্ত তাজা/ভেজা দেখা যায় এবং উজ্জ্বল হয়ে গাঢ় বর্ন ধারন করে। স্হানীয়রা পাথরে লেগে থাকা এই রক্ত মোছার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু পরবর্তীতে আবারও পাথরের গায়ে রক্ত দেখা যায়।

ভুতুড়ে ঘড়ি

2

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

আমাদের গ্রামে একটা বড় বাগানবাড়ি আছে। মুখার্জিবাড়ি। তবে লোকে ওটাকে বলে পোড়াবাড়ি। বছর ত্রিশ-চল্লিশ আগে এই বাড়িতে মুখার্জি পরিবারের সব সদস্য আগুনে পুড়ে মারা যায়। সেই থেকে এটার নাম পোড়াবাড়ি। এলাকায় এটা ভুতুড়ে বাড়ি নামেও পরিচিত। পরিচিতির কারণ, এ বাড়িতে আছে একটি বড় দেয়ালঘড়ি। আগুনে সবকিছু পুড়ে গেলেও কোন এক রহস্যময় কারণে এই ঘড়িটি পোড়েনি। অনেকে নাকি রাতে এই ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজও শুনেছে। তাই রাতে তো বটেই, বিকেলের পর ওদিকের পথ আর কেউ মাড়ায় না। একদিন বন্ধুদের সঙ্গেবসে মাঠে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ নরেন বলল, জানিস, গতকাল বিকেলে ওই পোড়াবাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমিও ওই ঘড়ির ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। আমি বললাম, যা যা, গুল মারিস না। তেল নেই, চাবি নেই, ওই ঘড়ি চলছে কি না তারও ঠিক নেই, আর উনি ঘণ্টার আওয়াজ শুনেছেন! আরে গিয়ে দেখ, এত দিনে হয়তো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। নরেন বলল, তাহলে কি আমি তোদের মিথ্যা বলছি? আমি বললাম, তোর মতো ভীতু কি মিথ্যা ছাড়া সত্য কথা কখনো বলবে? নরেন রেগে বলল, তা তুই তো খুব সাহসী, যা না, গিয়ে পোড়াবাড়িতে ঘড়িটার সঙ্গে একটি রাত কাটিয়ে আয়। নরেনের সঙ্গে এবার সবাই যোগ দিল, হ্যাঁ, ঠিকই তো। যা, গিয়ে থেকে আয়। বন্ধুমহলে আমি একটু সাহসী হিসেবেই পরিচিত, তাই তাচ্ছিল্যের স্বরে বললাম, হ্যাঁ, থাকবই তো। তবে থাকতে পারলে তোরা আমাকে কী দিবি ? সাগর বলল, তোকে আমরা এক হাজার টাকা দেব। তবে তুই যদি হেরে যাস তাহলে তুই আমাদের এক হাজার টাকা দিবি, রাজি? বেশ, আমি রাজি। সে রাতেই আমি পোড়াবাড়ির দিকে রওনা হলাম, সঙ্গে নিলাম পাঁচ ব্যাটারির টর্চ, কম্বল, বালিশ, দুটো মোম, ম্যাচ আর একটা ছোট ছুরি। অমাবস্যার রাত। বলা তো যায় না কী হয়। তাই আর ঝুঁকি নিলাম না। পোড়াবাড়ির জলসাঘরের ঘড়িটার সামনে আমি আমার বিছানা পাতলাম। মোম দুটি ধরিয়ে দিলাম। কিন্তু তাতে অন্ধকার কাটল বলে মনে হলো না। ঘড়ির দিকে একপলক তাকালাম, নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই ঘড়ি নাকি ঘণ্টা পেটায়—ভাবতেই হাসি পেল। রাত যেন কাটছে না। হাতঘড়িতে রাত ১২টা বাজার শব্দ শুনতে পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার মোমবাতি দুটো নিভে গেল। অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরোঘর। ঢং-ঢং- ঢং। একি! এ যে ঘণ্টা পেটার আওয়াজ! কিন্তু ঘড়িটা তো নষ্ট! তবে কী… হাতড়ে হাতড়ে টর্চটা অন করলাম। জ্বলছে না কেন? ঘড়ির ঘণ্টার শব্দ যেন আমার বুকে আঘাত করছে। আমার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।এই শীতের রাতেও আমি ঘেমে গেলাম। বাইরে চাঁদ উঠেছে। আজ না অমাবস্যা! অমাবস্যায় চাঁদ উঠল কী করে? ভয়ে আমি বারবার কেঁপে উঠছি। এই বাড়ি ছেড়ে পালাব, তারও উপায় নেই। দরজা দুটো খুলছে না। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি। একি! আমার বিছানা যে হাওয়ায় উড়ছে! বাঁচাও বাঁচাও বলে কয়েকবার চিৎকার দিলাম। কেউ মনে হয় তা শুনতেও পায়নি। হঠাৎ দেখি ঘড়িটা আলোকিত হয়ে উঠল। ঘড়ির উজ্জ্বল আলোয় পুরো ঘর আলোকিত হলো। আস্তে আস্তে ঘড়িটা আমার দিকে এগিয়ে এল। ভৌতিক গলায় বলল, আমি নষ্ট? তেল নেই, চাবি নেই, আমি চলব কী করে? তুই আমাকে অপমান করেছিস। আর যে আমাকে অপমান করে, তার শাস্তি মৃত্যু। হা-হা-হা! হঠাৎ আমার বিছানাটা গায়েব হয়ে গেল। আমি নিচে পড়ে যেতে লাগলাম। নিচে, আরও নিচে। সেখানে শুধুই অন্ধকার। বিজয়, এই বিজয়, বিজয়! কী ঘুমরে বাবা! কতক্ষণ থেকে ডাকছি, শুনতে পাস না? নরেন বলল। দেখলাম অপু, সাগর ওরা সবাই এসে ঘরে ঢুকেছে। আমি ভয়ে ভয়ে একবার ঘড়িটার দিকে তাকালাম। ঘড়িটা যেমন ছিল তেমনই আছে। তবে কি সারা রাত আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?

পরিশিষ্ট: বন্ধুদের অনেক সাধাসাধির পরও আমি বাজির টাকা নিলাম না। সাগর বলল, তুই তো পোড়াবাড়িতে থাকতে ভয় পাসনি, তাহলে টাকা নিবি না কেন? আমি ভয় পেয়েছি কি পাইনি, তা তো আর আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। মনে মনে বললাম আমি।

(লেখক এর নাম পাওয়া যায় নাই।)

(ভূতুড়ে গল্প)

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য (বারমুডার ট্রায়াঙ্গল রহস্য)

1

আপনি হয়ত জানেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে পৃথিবীর রহস্যময় স্থানগুলোর অন্যতম বলা হয় । কিন্তু ইতোমধ্যেই যে প্রমাণিত হয়েছে, কিছু প্রকৃতিগত ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য ছাড়া এই ট্রায়াঙ্গল অন্য সব এলাকার মতোই স্বাভাবিক- সেই খবর বোধকরি খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেনি। এটা ঠিক, পৃথিবীর সবচাইতে অভিশপ্ত স্থানগুলোর মধ্যে বারমুডা টায়াঙ্গল বা ত্রিভুজকে চ্যাম্পিয়ন বলে মনে করা হয়। কারণ এ যাবৎ এখানে যতো রহস্যময় ও কারণহীন দুর্ঘটনা ঘটার কথা শোনা গিয়েছে, অন্য কোথাও এতো বেশি এরকম দুর্ঘটনা ঘটে নি বলে দাবি করা হয়। এ জন্যে স্থানীয় অধিবাসীরা এ এলাকাটির নামকরণ করেছে পাপাত্মাদের ত্রিভুজ। বারমুডা ত্রিভুজের অবস্থান হচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরে। মোট তিনটি প্রান্ত দ্বারা এ অঞ্চলটি সীমাবদ্ধ বলে এর নামকরণ করা হয়েছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা বারমুডা ত্রিভুজ। এ অঞ্চলটি যে তিনটি প্রান্ত দ্বারা সীমাবদ্ধ তার এক প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডা, একপ্রান্তে পুয়ের্টো রিকো এবং অপর প্রান্তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারমুদা দ্বীপ অবস্থিত। ত্রিভুজাকার এই অঞ্চলটির মোট আয়তন ১১৪ লাখ বর্গ কিলোমিটার বা ৪৪ লাখ বর্গ মাইল। এটি ২৫-৪০ ডিগ্রি উত্তর আংশ এবং ৫৫-৫৮ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ অঞ্চলের রহস্যময়তার একটি দিক হলো, কোনো জাহাজ এই ত্রিভুজ এলাকায় প্রবেশ করার কিছুণের মধ্যেই তা বেতার তরঙ্গ প্রেরণে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং এর ফলে জাহাজটি উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়। একসময় তা দিক নির্ণয় করতে না পেরে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্কিন নেভির সূত্র অনুযায়ী, গত ২০০ বছরে এ এলাকায় কমপে ৫০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ২০টি বিমান চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৯৬৮ সালের মে মাসে হারিয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ডুবোজাহাজের ঘটনাটি সারা বিশ্বে সবচাইতে বেশি আলোড়ন তুলে। ঘটনা তদন্তে এর মধ্যে সবচাইতে বিজ্ঞানসম্মত যে ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে তা হলো, এলাকাটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে স্বাভাবিকের চাইতে কুয়াশা অনেক বেশি এবং এর ঘনত্বও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে নাবিকেরা প্রবেশের পরই দিক হারিয়ে ফেলে এবং তাদের মধ্যে একপ্রকার বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। হয়তো এ বিভ্রান্তির ফলেই তারা যথাযথভাবে বেতার তরঙ্গ পাঠাতে পারে না। প্রমাণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, আধুনিককালে যে সমস্ত জাহাজ জিএসএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে, তাদের একটিও এ সমস্যায় পড়েনি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মতো আরেকটি আগ্রহ-উদ্দীপক কাহিনী হচ্ছে- ফ্লাইং সসারের আগমন। অনেকে মনে করেন, এ এলাকাটি উন্নত গ্রহের প্রাণীদের পৃথিবীতে অবতরণ স্থান। এ ধারণার কারণ হিসেবে তারা কিছু নাবিকের কথা বলে থাকেন যারা নাকি এ এলাকায় মাঝে মাঝে উড়ন্ত সসারের আনাগোনা দেখতে পান। তবে এটি এখনো নিছক কল্পনা হিসেবেই চিহ্নিত। এর কোনো সত্যতা এখনো পাওয়া যায় নি।

জনৈক ভুত বাবার সাক্ষাতকার

7

ভুতের ব্যাপারে আমার বরাবরই একটা সন্দেহ ছিল “ভুত আছে বা নেই” , বিশেষ কৌতুহলের কারণে তাই বার বার ভুত বিষয়ে লিখেছি । আসলে ভুত নেই বিষয়ে যেমন হাজারটা প্রমান দেয়া যায় একইভাবে ভুত আছে এ ব্যাপারে হাজারটা প্রমান দেয়া যাবে । আমার দাদার বাড়ী গাজীপুরের পূর্বাচলে যা এখন ঢাকার পূর্বাচল টাউন নামে পরিচিত । বছরে দুই একবারের বেশি যাওয়া হয় না । যারা পূর্বাচল টাউনে কখনও গিয়েছেন তারা জানেন সবাই যেভাবে বলে সেরকম উন্নত নয় এ এলাকা । এখানে এখনও অনেক গ্রাম আছে যেখানে অনেক ভুত বা জ্বিন বাস করে । এখনও অনেক প্রেতসাধক আছে যারা চোখের নিমিষে আপনাকে কোনও অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে সক্ষম । এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল আমার সাথে গতবছর গ্রীষ্মের সময় ।

প্রচন্ড গরমে উঠোনের এক পাশে সবাইকে নিয়ে গাছের নীচে বসে গল্প করছিলাম, চাচা চাচী, চাচাতো ভাই-বোন ও আমি । দাদা-দাদী মারা গেছেন প্রায় ১৫ বছর এর উপর হয়েছে । হঠাৎ গ্রামের এক মধ্যবয়েসী লোক উঠোনের এক পাশে দাড়িয়ে চাচাকে সালাম দেয় । উনার নাম সুশীলবাবু । পেশায় একজন মাছ ব্যাবসায়ী । চাচা ওনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন । সুশীলবাবু মাছের ব্যাবসা করেন কিন্তু নিরামিষভোজী, ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যজনক । গ্রামে ওনার আরেকটা পরিচয় আছে “প্রেতসাধক”, তবে ভয়ে কেউ সামনাসামনি এ কথা বলে না । লোকটার সাথে অনেক বিষয়ে কথা হল, এক পর্যায়ে আমি ভুত বিষয়ে জানতে চাইলে সে উত্তর না দিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে উঠে পড়ে, বলে “যাই অনেক কাজ ফেলে এসেছি” ; তার এরকম আচড়ন আমার কৌতুহল আরো বাড়িয়ে দিল । বললাম “আজকে চলে যাচ্ছেন ঠিক আছে কিন্তু কালকে আবার আসবেন, আপনার সাথে আমার কথা আছে” ; তার মুখে কোনো উত্তর শোনা গেলনা । শুধু মৃদু হাসলেন । তার হাসির অর্থ বুঝতে পারলাম না, তিনি আসবেন নাকি আসবেন না ।

পরদিন সুশীলবাবুকে আর দেখা গেল না, আমি বেশিদিন থাকবো না তাই কৌতুহল মেটানোর জন্য আমি নিজেই তার বাসায় হাজির হলাম ।সুশীল বাবু প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে বুঝতে পারলাম তিনি খুশি হয়েছেন আমি আসাতে । ওনাকে ভুত বিষয়ে আবারও একই প্রশ্ন করলাম “আপনি কি আমাকে ভুতের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন?” সুশীলবাবু আবারও হাসলেন, তার হাসির রহস্য আমি বুঝতে পারলাম না । তাই বিরক্ত হয়ে বললাম, “দেখুন, না পারলে তো লজ্জার কিছু নাই, হাসির মানে কি?” সুবললেন “আপনার কথা শুনে হাসলাম, কারণ, মনে হচ্ছে গাছে পাকা আম ঝুলে আছে আর আপনি বলছেন আমটা পেরে দিতে । যদি সত্যি আপনার আগ্রহ থাকে তাহলে আমাকে ২ ঘন্টা সময় দিতে হবে আর মিষ্টি, দই, পান-সুপারি, জ্যান্ত মুরগী একটা অথবা মুরগীর পরিবর্তে দুইটা জ্যান্ত কবুতর বলি দিতে হবে ভুতবাবার সামনে”
-এত কিছু কেন” আমি জিজ্বেস করলাম ।
-ওনারা মেহমান । আমার বাসায় আসলে ওনাদের সমাদর না করলে পরের বার ডাকলেও আর আসবে না, তাই ।
যাই হোক আমাকে আজ ভুতের সাথে সাক্ষাৎ নিতেই হবে । বাজার থেকে সব কিছু কিনে দিলাম সুশীলবাবুকে । যথারীতি ৩ ঘন্টা পর সন্ধ্যায় সুশীলবাবুর বাসায় আমি ও আমার এক চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে হাজির হলাম । সাথে কলম ও ডায়েরী, ভুত বাবার সাক্ষাৎ নেয়ার জন্য । সুশীলবাবু ধ্যানে বসে অনেক মন্ত্র পড়লেন, প্রায় ১ ঘন্টা মত হবে । ১ ঘন্টা পর ঘরের সব আলো নিভে গেল । ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল । সুশীলবাবু একটা মোমবাতিতে আগুন ধরিয়ে আমাদের সামনে রাখলেন । এক পাশে আমি, আমার চাচাতো ভাই অন্য পাশে সুশীলবাবু ও জনৈক ভুতবাবা । ভুতবাবাকে অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । তবে সুঠাম দেহের লম্বা বাবরি চুলের একজন ঠিক বোঝা যাচ্ছে । লম্বা লম্বা হাত পা, ভরাট কন্ঠে ভুতবাবা জিজ্বেস করলেন “আমাকে ডেকেছিস কেন?” আমি বললাম, “জ্বি আপনার একটা ছোট সাক্ষাতকার নেয়ার জন্যে, যদি বেয়াদবি না হয়, খুব বেশিক্ষণ লাগবে না । ভুতবাবা মনে হল ফিসফিস করে সুশীলবাবুর কানে কানে কি যেন বলছেন । সুশীলবাবু বললেন “ঠিক আছে বাবাজী বেশিক্ষণ সময় দিতে পারবেন না , উনার একটা প্রোগ্রাম আছে” ; আমি বললাম “না বেশিক্ষণ লাগবে না এই ধরেন ২০ কি ২৫ মিনিট, আমি আগে থেকেই প্রশ্ন লিখে এনেছি” ।

আমি আমার সাক্ষাতকার নেয়া শুরু করলাম । পাঠকের সুবিধার্তে সাক্ষাতকারটি হুবুহু তুলে ধরা হলঃ

জনৈক ভুতবাবার সাক্ষাতকার
সাক্ষাৎ গ্রহনকারী: সাকি বিল্লাহ্
সার্বিক সহযোগীতা ও ভুতবাবার সাথে সাক্ষাতের জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ: সুশীলবাবুকে ।
-আপনাকে আমরা কি বলে ডাকবো?
-আমাকে তোমরা ভুতবাবা বলে বা বাবাজী বলে ডাকতে পারো ।
-আমরা কি আপনাকে সালাম দিব নাকি নমষ্কার দিব?
-ভুতদের আসলে কোন ধর্ম নাই, দুনিয়ার সব ভুত পরস্পর ভাই ভাই । তবে মানুষের যেহেতু ধর্ম আছে তাই যার যে ধর্ম সেই অনুযায়ী ডাকতে পারো । যেমন হিন্দু হলে নমস্কার, মুসলমান হলে সালাম দিতে পারো ।
-আসসালামু ওয়া আলাইকুম
-ওয়া আলাইকুম আসসালাম
-আপনার সম্পূর্ণ নাম কি ?
-হা—হা—-, ভুতদের কোনো নাম থাকে না, আমাদের বিভিন্ন জাত রয়েছে, যেমন মেছো ভুত, সরষে ভুত, কানা ভুত, মাথাকাটা ভুত, শাকচুন্নী ভুত, পেত্নী ভুত । তবে আমরা নামের জন্য ভুত প্রোটোকল ব্যাবহার করি, যেমন ধরো, ছোটভুত, মাঝারিভুত, বড়ভুত, আবার নীলভুত, লালভুত, কালো বা সাদাভুত, সব কিছু হিসেব করে আমাদের একটা ইউনিক আইডি দেয়া হয় । যেমন ধরো আমার আইডিঃ ভুতভুতং-সাদা-মাঝারি-গ-০১৭০ এটা আমাদের ভুত কল্যাণ সংস্থা থেকে দিয়ে দেয় ।
-খুবই সুন্দর নিয়ম । নামেই সব কিছু বোঝা যাচ্ছে ।
-হ্যাঁ । আমাদের বিশ্বকবি “ভুতকবিং-বড়-সাদা-র-০১৯০” তাই বলেছেন, “বৃক্ষ তোমার ফল কি নামে পরিচয়”
-কথাটা মনে হচ্ছে রবি ঠাকুরের কিন্তু কেমন একটু উল্টো পাল্টা লাগছে ।
-কথাতো উল্টোপাল্টা লাগবেই কারন এটা ওনারই লেখা বানী । কিন্তু উনি মরে ভুত হওয়ার পর ওনার নাম দেয়া হয়েছে “ভুতকবিং-বড়-সাদা-র-০১৯০” আর উনি ভুত হওয়ার পর থেকে কবিতা ও বাণীতে কিছু পরিবর্তন এনেছেন ।
-হুম্ । যাই হোক আপনার মাতাপিতার পরিচয়?
-মাতা ভুত হয়েছেন গত বছর কিন্তু পিতা এখনও জীবিত তাই ভুত হওয়ার ১নং শর্ত উনি এখনও পূরণ করতে পারেননি । তাছাড়া ভুত হওয়ার বেশ কিছু শর্ত আছে । এগুলো মানতে পারলে ভুত হওয়া যায় ।
-শর্তগুলো কি ব্যাখ্যা করা যাবে, দেশ ও জাতির ভবিষ্যত ভুতদের কথা চিন্তা করে ?
-আলবৎ যায় । আমাদের সংখ্যা বাড়াতে আমি যেকোন কাজ করত আগ্রহী । প্রধান প্রধান শর্তগুলো হচ্ছে একজন ভুত হতে হলেঃ
১/ যেকোনো মারাত্বক দুর্ঘটনায় মৃত হতে হবে মানে স্পট ডেথ ।
২/ হত্যা, গুমখুন হলে তার ১ বছর পর প্রাথমিক ভুত হিসেবে আবেদন করতে পারবে ।
৩/ নিবন্ধিত ভর্তি ফরম পূরণ করে ভুত সংগঠনের সদস্য হতে হবে ।
৪/ কমপক্ষে ১৫-২০ জন মানুষকে ভয় দেখাইয়া প্যান্টে বা কাপড়ে ইয়ে সারাইতে পারিলে ।
৫/ ভুতের ব্লগের নিয়মিত পাঠক হিসেবে পুরস্কৃত হইলে ।
ইত্যাদি..ইত্যাদি…..
-শর্তগুলো মানা খুবই কঠিন ব্যাপার । যাই হোক আপনার প্রিয় ফল?
-মাকালফল ।
-প্রিয় ফুল?
-সরষেফুল
-প্রিয় খাবার?
-চাঁদের আলোর সাথে কাঁচা ইলিশ মাছ ।
-প্রিয় রং?
-কালো, নিকষ কলো [হে…হে….]
-হাসলেন যে, কারন কি?
-হে…..হে… কালো ঘুট ঘুটে অন্ধকারেইতো মানুষদের বেশি ভয় দেখানো যায়, তাই ।
-হুম্–, প্রিয় ব্যক্তিত্ব?
-ঠাকুমা ।
-যদি কিছু মনে না করেন, ঠাকুমা আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব কেন?
-কারন উনিই প্রথম আমাদের নিয়ে গল্প লিখেছেন “ঠাকুমার ঝুলি” ।
-বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভুতের সংখ্যা কত?
-এটা বলা খুবই কঠিন কারন প্রতিদিন যে হারে মানুষ গুমখন হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে তাতে সংখ্যা বেড়েই চলছে । তবে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে, ….হুম….ভুতভুতং…ভুতভুতং….প্রায় ৫১৯৮১৮২০ জন ভুত রয়েছেন ।
-খুবই ভয়ের কথা । এভাবে ভুত বাড়তে থাকলে এক সময় বাংলাদেশে শুধু ভুতেরা বাস করবে আর মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না ।
-তোমার আরো প্রশ্ন থাকলে করতে পারো । আমার তাড়া আছে । ভুত কল্যাণ সমিতির একটা অনুষ্ঠান আছে “ভুতনৃত্য” বেলী ড্যান্স, শেওড়া গাছের মগডালে । আমাকে সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে ওরা ইনভাইট করেছে ।
-আমি আপনাকে আর বেশিক্ষণ ধরে রাখবো না । শেষ দু-তিনটে প্রশ্ন, আপনাদের মানে ভুতদের দিনের বেলায় দেখা যায় না কেন?
-দিনের বেলায় আমরা ঘুমাই আর রাতের বেলায় কাজ করি কারন আমরা নিশাচর প্রাণী, তবে কিছু কিছু ভুত আছে যারা ওভার টাইম মানে দিনের বেলাতেও কাজ করে ।
-বুঝতে পেরেছি । আচ্ছা মানুষদের ভয় দেখিয়ে আপনাদের কি লাভ? মানুষ ও ভুত কি বন্ধু হতে পারে না?
-(উত্তেজিত হয়ে) না-আলবত না, ভুত ও মানুষ কখনও বন্ধু হতে দেয়া যায় না । তবে ইদানিং কিছু বাজে ভুত, যারা ভুত নামের কলঙ্ক, মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব করছে যা কিনা ভুত এর অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরুপ, এটা ঠিক না । ভেবে দেখো মানুষই আমাদের ভুত বানিয়েছে, তারপর আবার কিছু কিছু সন্নাসী ও কবিরাজগণ আমাদের বোতলে ভরে রাখতেও দিধা করে না । সেই মানুষ তো আমাদের বন্ধু হতে পারে না । আমি যাচ্ছি অন্য একদিন হয়ত দেখা হবে । বিদায় বৎস ।
মনে হল ভুতবাবা খুবই রাগ করেছেন এ ধরনের প্রশ্ন করাতে । তিনি তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন, মোমবাতি নিভে গেল । সুশীলবাবু এবার হ্যারিকেন জ্বালালেন । বাইরে বৃষ্টি হবে হয়ত । চারদিকে নিঝুম অন্ধকার । বাড়ীতে চলে আসছি, রাস্তা এগিয়ে দিচ্ছেন সুশীলবাবু, তার হাতে হ্যারিকেন । বাড়ীর প্রায় কাছাকছি চলে এসেছি, সামনে পুকুরপাড়ের উল্টো দিকে একটা শেওড়া গাছ চোখে পড়ল । হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানিতে এক ঝলক আলোয় মনে হল শেওড়া গাছের মগডালে একঝাক ভুত নৃত্য করছে, বেলী ড্যান্স, চারদিকে অনেক ভুতেরা বসে তা দেখছে আর মধ্যিখানে বসে আছেন প্রধান অতিথি জনাব ভুতবাবা ।

পোড়োবাড়ির ইবলিশ

1

দু’দিন ধরে মরিয়মের ওপর ক্ষেপে আছে মুনিরা ।স্নেহার পুতুলটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মরিয়ম মিনমিন করে বলে, মামী, আমি দেখি নাই। পুতুলটা স্নেহাকে উপহার দিয়েছিল রেবেকা । রেবেকার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত মুনিরা। তেমন ঘনিষ্টতা অবশ্য ছিল না । রেবেকার ডিপার্টম্যান্টও আলাদা ছিল। কম কথা বলা ধবধবে ফরসা একটা মেয়ে । সব সময় বিষন্ন থাকত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর আর রেবেকার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। …বিয়ের পর বরের সঙ্গে দু বছরের জন্য জাপান চলে যায় মুনিরা। স্নেহার জন্মদিনে সেই রেবেকা এসে উপস্থিত ।দুপুরবেলা। মুনিরা কিচেনে ছিল। পায়েস রাঁধছিল। কলিংবেল শুনে মরিয়মকে বলল, দেখ তো কে এল। তারপর ড্রইংরুমে এসে মুনিরা অবাক। রেবেকা। পরনে কালো রঙের সালোয়ার-কামিজ। কালো ওড়না। সেই ফোলা ফোলা ধবধবে ফরসা মুখ।
আশ্চর্য! তুই?
রেবেকা ম্লান হাসে।
ঠিকানা পেলি কই? আশ্চর্য! আমি যে এখানে থাকি কে বলল তোকে?
রেবেকা এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেল। তেমন কিছু বলল না। বেশিক্ষণ বসল না। কেবল ব্যাগ থেকে একটা পুতুল বের করে স্নেহাকে দিল। ছোট কাপড়ের পুতুল। হলদে রঙের। কালো সুতার চুল। কপালে লাল টিপ। মনে হয় না ওটা স্নেহার পছন্দ হয়েছে। স্নেহা পুতুলটা লুকিয়ে রাখেনি তো? স্নেহা ক্লাস টুয়ে পড়ে। এই বয়েসেই ওর পছন্দ-অপছন্দ বেশ তীব্র । মুনিরা দুপুরে লাঞ্চের পর বেরুল। গত রাত্রে বাবাকে স্বপ্ন দেখেছে। বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনবে । শপিং মলের নাম: ‘মিলি প্লাজা’। কাছেই। হেঁটেই যাওয়া যায়। মুনিরার বাবা আহাদ উদ্দীন আহমেদ রূপগঞ্জ থাকেন। সরকারি চাকরি করতেন। রিটায়ার করে বৃদ্ধ এখন গ্রামেই বাস করছেন। পোলট্রি আর ফিশারি নিয়ে ব্যস্ত। সকাল-সন্ধ্যা দরবেশ ইলিয়াস শাহর সঙ্গে জিকির-আজগার করেন। ইলিয়াস শাহ মুনিরার বাবার ছেলেবেলার বন্ধু-আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী বিরাট দরবেশ মানুষ।ইয়া লম্বা- চওড়া আর ফরসা চেহারা। সব সময় কালো পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরেন। মাথায় কালো পাগড়ী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন ইলিয়াস শাহ। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে একরাতে কী এক স্বপ্ন দেখলেন। তারপর রাতারাতি বদলে যান তিনি । সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশের এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান। পৃথিবীতে একদল বদ কিসিমের ইবলিশ আছে।তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে বালামুসিবতে ফেলে। দরবেশ ইলিয়াস শাহ খারাপ আছর থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করেন । তাঁর ঝুলিতে অলৌকিক মেশক মেশানো সুরমা থাকে । সেই অলৌকিক
মেশক মেশানো সুরমা ইবলিশের ওপর ছিটিয়ে দিতে পারলেই ইবলিশ কুপোকাত! পাঞ্জাবি কিনে শপিং মল থেকে বেরুতে বেরুতে তিনটা বাজল।ইলিয়াস চাচা মেশক অম্বর আতর পছন্দ করেন। ইলিয়াস
চাচার জন্য মেশক অম্বর আতর কিনেছে মনিরা। ইলিয়াস চাচা মাঝেমধ্যেই ঢাকা আসেন। তখন মুনিরার ফ্ল্যাটে ওঠেন। ঢাকার তালতলার সুলায়মান পীরের বয়স প্রায় একশ। তিনিই ইলিয়াস চাচার ওস্তাদ । ইলিয়াস চাচা ঢাকায় এলে ওস্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। তালতলার সুলায়মান পীর ইবলিশ ধ্বংসের অনেক দোওয়া-দরূদ জানেন। তিনিই নাকি অলৌকিক মেশক মেশানো সুরমা তৈরি করেন।
মোবাইল বাজল। মরিয়ম। বল কি হয়েছে? স্নেহায় ঘুমায় না মামী। খালি কয় কাটুন দেখব। আচ্ছা দেখুক। বলে ফোন অফ করে দেয় মুনিরা। হাসে। মুনিরা বাইরে থাকলে খোঁজখবর নেয় বলে মরিয়ম-এর কাছে একটা মোবাইল থাকে । অবশ্য মরিয়ম যখন-তখন ফোন করে মুনিরাকে বিরক্ত করে। সাবরিনার ফ্ল্যাটটা শপিং মলের কাছেই । সাবরিনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত মুনিরা । বিয়ের পর সাবরিনা বছর কয়েক চট্টগ্রামে ছিল। তারপর ঢাকায় ফিরে এসেছে। ওর বর রাশেদ ভাই এই ওয়ারী তে ফ্ল্যাট কিনেছে। এর আগে একবার সাবরিনার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল মুনিরা। ষোল ’শ স্কয়ার ফুটের ছিমছাম সাজানো- গোছানো ফ্ল্যাট। সাবরিনার বর রাশেদ ভাই অমায়িক মানুষ; শিপব্রেকিংয়ের ব্যবসা করে কোটি টাকা করেছেন বোঝাই যায় না। অবশ্য অনেক দিন যাওয়া হয় না ওর ওখানে। আজ কী মনে করে ফোন করল মুনিরা । সাবরিনা বলল, বাসায় আছি। চলে আয়। একটা কনফেকশনারিতে ঢুকে ইগলু আইসক্রিমের একটা বক্স কিনল মুনিরা। সাবরিনা সাদা রঙের ম্যাক্সি পরে ছিল। চোখ মুখ কেমন ফোলাফোলা। ঘুমিয়েছিল বোধহয়। দরজা খুলে মনিরাকে দেখে খুশি হয়ে বলল, আয়। সোফায় বাসার সময় চোখ আটকে যায় মুনিরার । মৃদু চমকে ওঠে। উলটো দিকের সোফায় একটা হলদে রঙের পুতুল। ছোট, কাপড়ের তৈরি। মাথায় কালো সুতার চুল। কপালে বড় লাল টিপ। অবিকল সেই রেবেকার দেওয়া পুতুলের মতো। ওটা কোথায় পেলি রে? অস্ফুট স্বরে বলল মুনিরা। ও, ওটা? রেবেকাকে তোর মনে আছে? সোস্যাল ওয়েলফেয়ারে পড়ত? হ্যাঁ। মুনিরার বুক ঢিপঢিপ করছে। কয়েকদিন আগে রেবেকা এসে হাজির। আমি তো অবাক। বললাম- ঠিকানা পেলি কই? আমি যে এখানে থাকি তা জানলি কি করে? ও এসব কথা এড়িয়ে গেল। বলল, এই পুতুলটা রাখ। গিফট। আজ তোর জন্মদিন। ওর কথা শুনে আমি অবাক। আমার জন্মদিন রেবেকা জানল কী করে … তারপর ও আর বেশি ক্ষণ বসেনি অবশ্য। আশ্চর্য! মুনিরার মুখ কালো হয়ে যায়। নিঃশ্বাস ঘন হয়ে ওঠে। রেবেকা স্নেহার জন্মদিনে এসেছিল। তাহলে? ক্ষীণ  এক রহস্যের আভাস পায় যেন মুনিরা। আকাশে মেঘ জমছিল বলে দ্রুত বিদায় নিয়ে নীচে নেমে একটা রিকশা নিয়ে বাড়ি ফিরে এল মুনিরা। গেটের কাছে পৌঁছতেই মরিয়মের ফোন। মামী জলদি আসেন। বৃষ্টি আইতাছে। আমি নীচে। মুনিরা বিরক্ত হয়ে বলল। তারপর ফোন অফ করে গেট দিয়ে গ্যারেজে ঢুকে পড়ল। ওর ননদের ড্রাইভার আসলাম ওকে দেখে সালাম দিল। এই অ্যাপার্টম্যান্টটা রায়হানদের পৈত্রিক
জমির ওপর; রায়হানের ভাইবোনেরা মিলে থাকে। যে কারণে রায়হান দেশের বাইরে থাকলেও মুনিরা নিরাপদ বোধ করে। মুনিরার বর রায়হান একটা মালটি ন্যাশনালের হিউম্যান রিসোর্সে রয়েছে। একটা সিম্পজিয়ামের যোগ দিতে রায়হান এখন ম্যানিলায় । রাতে রূপগঞ্জ থেকে বাবার ফোন এল । বাবা বলল, তোর ইলিয়াস চাচা আগামী সপ্তাহে একবার ঢাকায় যাবে রে মুনিরা। তোর ওখানেই উঠবে। তুই তোর চাচার যত্নআত্মি করিস মা। মুনিরা বলল, আব্বা, তোমাকে ও নিয়ে ভাবতে হবে না। ইলিয়াস চাচা মুগের ডালের খিচুরি খেতে ভালো বাসেন। আমি দুবেলা চাচাকে রেঁধে খাওয়াব।আর শোন আব্বা, তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনেছি। ইলিয়াস চাচার হাতে পাঠাব। ঠিক আছে মা। ঠিক আছে। আর ইলিয়াস চাচার জন্য আতর কিনেছি। মেশক অম্বর। ঠিক আছে মা। ঠিক আছে। কয়েক দিন পর সাবরিনার ফোন পেল মুনিরা। কি রে মুনিরা তোর বর ফিরেছে? না রে। ওর ফিরতে সেই নেক্সট মান্থের ফাস্ট উইক। কী যে বাজে সময় কাটছে … সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হল না বলে রাশেদ কী আফসোস করল। রাশেদ বলল একদিন আমাদের এখানে তোর বরকে নিয়ে ডিনার খেতে। মুনিরা বলল, ও আগে ফিরুক। তারপর । ওকে। তাহলে রায়হান ভাই ঢাকায় এলে আমাকে ফোন করে জানাস কিন্তু। ওকে, জানাব। সাবরিনা তারপর বলল, কি হয়েছে জানিস? কি? রেবেকার দেওয়া সেই পুতুলটা খুঁজে পাচ্ছি না।
আমার ফ্ল্যাটে লোকজন তেমন আসে না। সামান্য কাপড়ের পুতুল। কে নিল বুঝতে পারছি না। কাজের মেয়েটা বাঁধা, ছুটা না। তার ওপর বিশ্বাসী। ও নেবে না। সারা শরীরে মুনিরা কেমন ক্ষীণ একটা শিরশিরানি টের পায়। ওর কেমন সন্দেহ জাগে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে হাজির হল রেবেকা। ও ঠিকানা জানল কি করে? সাবরিনার বাড়ির ঠিকানাই-বা জানল কী করে? রেবেকারা থাকত পুরোনো ঢাকার আর্মানীটোলায় এক সরু গলির ভিতর। গলিটা আর্মেনীয় গীর্জার কাছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একবার গিয়েছিল মুনিরা। যদিও রেবেকা কখনও ওদের বাড়ি নিয়ে যায়নি। মুনিরা কী মনে করে নিজেই গিয়েছিল। ছাই রঙের পুরনো আমলের দোতলা বাড়ি। দোতলায় লোহার কাজ করা রেলিং। দরজা-জানালার রং সবুজ। বোঝা যায় বনেদী পরিবার। রেবেকার বাবা গালিব চাচা। লম্বা-চওড়া বলিষ্ট গড়ন । মনে আছে সবুজ পাঞ্জাবি পরে ছিলেন গালিব চাচা । মাথায় উশকো-খুশকো চুল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, একমুখ ঘন কালো দাড়ি। উর্দু মিশিয়ে ভীষণ মিষ্টি করে কথা বলেন। যত্ন করে বাদাম
দেওয়া সবুজ রঙের শরবত খাইয়েছিলেন। মনে আছে দোতলার একটা বেশ বড়সরো ঘর … কেমন ঠান্ডা আর মিষ্টি গন্ধ ছড়ানো। দেওয়ালে সাদা রং করা। দেয়ালে রেবেকার মৃত মায়ের সাদাকালো একটা ছবি টাঙানো। ঠিক তারি নীচে শোকেস। শোকেসে পুতুল। ছোট, কাপড়ের তৈরি । হলদে রঙের। কালো সুতার চুল। কপালে লাল টিপ। গালিব চাচার মা নাকি শখ করে পুতুল বানাতেন … আর্মানীটোলায় সেই সরু গলির সামনে রিকশা থেকে নামল মুনিরা। চারিদিকে দুপুরের রোদ ছড়িয়ে ছিল। মুনিরার চোখে সান গ্লাস। ফরসা সুন্দর মুখ। আশেপাশের লোকজন তাকাচ্ছিল। ও পাত্তা না দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে গলির ভিতরে ঢুকে পড়ে। অন্ধগলি। শেষ বাড়িটাই ছিল রেবেকাদের। এত বছর পর বাড়িটা ঠিক চিনতে পারল না মুনিরা। কেবল একটি বাড়ির কাঠামো দাঁড়িয়ে। তবে কাঠামোটা পোড়া বলে মনে হল। দরজা-জানলা নেই। হা হা করছে। দোতলার রেলিংটাও ভাঙাচোরা। গলিতে কয়েকজন ঝালাইয়ের লোক বসে ছিল।
ওদের কাছে গিয়ে মুনিরা জিগ্যেস করল, এই বাড়ি তে যারা ছিল তারা এখন কোথায় বলতে পারেন?
একটা অল্প বয়েসি ছোকড়া বলল, এই বাড়িতে তো আগুন লাগছিল আফা? মুনিরা চমকে উঠল। আগুন লেগেছিল? কবে? চারপাঁচ বছর হইব। এবার এক বৃদ্ধ বলল। কিন্তু এ বাড়িতে যারা ছিল, তারা এখন
কোথায়? আপনে গালিব সাবের কথা কইতেছেন তো ? সেই বৃদ্ধ জিগ্যেস করল। হ্যাঁ। আমি তাঁর মেয়ের সঙ্গে পড়তাম। তারা কেউ বাঁচেনি। আগুনে পুইড়া তারা দুইজনেই মারা গেছে। মুনিরার শরীর জমে। হঠাৎ শীত করে। মাথা টলে ওঠে। বেশ কিছুক্ষণ পর সামলে নিয়ে বলল, তাহলে এখানে কেউ থাকে না?
বৃদ্ধ বলল, আগে একটা গরীব ফেমেলি থাকত। এখন আর থাকে না। কেন? কি নাকি দেখছিল তারা … মুনিরা ধীরে ধীরে গলির মুখে ফিরে আসে। বুক ধড়ফড় করছে । রেবেকা কি পুড়ে মারা গেছে?
তাহলে সেদিন কে গেল? সাবরিনার বাড়ি কে গেল? মুনিরার সারা শরীর কাঁপছিল। রিকশার জন্য এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। ব্যাগের ভিতর মোবাইলটা বেজে উঠল। মরিয়ম। বলল, মামী, আপনার
কি আইতে দেরী হইব? না। কেন? কি হয়েছে? মুনিরার গলা কাঁপছে। কিছু হয় নাই। স্নেহা কি করে?
খেলতেছে। খেলছে? কার সঙ্গে খেলছে? হেই দিন না আইল? স্নেহারে হইদা রঙের পুতুল
দিল। সেই বেটির লগে খেলে। রেবেকা! কি বলছিস তুই? মুনিরা এদিক-ওদিক তাকায়। মাথা ভীষণ
টলছিল। আশেপাশে দৃশ্য কেমন আবছা হয়ে যায়। কানের কানে গুনগুন গুনগুন শব্দ। কপালের
দুপাশের শিরা লাফাচ্ছে। তবে আজ বুঝি ওর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। নইলে ঠিক ওর সামনেই এখটা খালি সিএনজি এসে কেন? মুনিরা ওঠে পড়ে। বলে, ওয়ারী। জলদি। জলদি যান। ড্রাইভার বৃদ্ধ। তাকে নির্বিকার দেখাল। হয়তো জানে মেয়েদের অস্থিরতা বেশি। বৃদ্ধ ড্রাইভার ধীরেসুস্থেই সিএনজি চালাতে থাকে। মুনিরা সিটের ওপর অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। ঘামে জবজব করছে ওর ঘাড়, পিঠ। একটু পর সিএনজিটা থেমে গেল। সামনে পথ আগলে একটা ট্র্যাক থেমে আছে। বাঁ পাশে রড সিমেন্টের দোকান, ডান
পাশে মিষ্টির দোকান। মুনিরা মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাবে। সারা শরীর ভিজে গেছে। তারপর কীভাবে যেন অ্যাপার্টমেন্টের কাছাকাছি পৌঁছে গেল সিএনজি। একটা রিকশা থেকে ইলিয়াস চাচা নামছেন
দেখে ধড়ে প্রাণ এল মুনিরার। ইলিয়াস চাচার পরনে কালো রঙের পায়জামা-পাঞ্জাবি। মাথায় কালো পাগড়ী। কাঁধে ঝুলি। মুনিরা স্বস্তি বোধ করে। ইলিয়াস চাচাকে নিশ্চয়ই আল্লাহ পাঠিয়েছেন। ও চিৎকার করে উঠল, ড্রাইভার সাহেব। সিএনজি থামান। সিএনজি থামান। সিএনজি থামতেই দ্রুত সিএনজি থেকে নেমে চিৎকার করে উঠল মুনিরা, ইলিয়াস চাচা! কি হইছে মা? তোমারে এমন উতলা দেখাইতেছে কেন? জলদি উপরে চলেন চাচা। আমার সর্বনাশ হয়েছে। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল
মুনিরা। ওদের ফ্ল্যাটটা দোতলায়। সিঁড়ি ভেঙে কখন পৌঁছল বলতে পারবে না। কলিংবেল বাজানোর পর দরজা খুলল। মরিয়ম। স্নেহা কই বলে ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ভিতরে ঢুকল মুনিরা। রেবেকা কার্পেটের ওপর বসে আছে। পরনে কালো সালোয়ার-কামিজ। ওর সামনে স্নেহা বসে । ওদের মাঝখানে সেই হলুদ রঙের পুতুল। রেবেকা মুখ তুলে তাকাল। হাসল। হাসিটা ধীরে ধীরে কেমন বিকৃত হয়ে যায়। মুনিরার শরীরের রক্ত জমে যায়। রেবেকা মুখ ঘুরিয়ে কাকে যেন দেখছে। ইলিয়াস চাচাকে সম্ভবত। ইলিয়াস চাচা বললেন, আরে এইটা তো একটা জলজ্যান্ত ইবলিস! এইটা এইখানে কেমনে আইল?
মুনিরা চমকে ওঠে। দূর হ শয়তান! ইলিয়াস চাচা গর্জে উঠলেন। মুনিরার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে।
স্নেহা ছুটে ওর মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইলিয়াস চাচা ঝুলি থেকে কী বার করলেন। মনে হল মেশক মেশানো সুরমা। সেই গুঁড়ো ছুঁড়ে মারলেন রেবেকার দিকে । রেবেকা ভয়ানক কেঁপে উঠে তীব্র চিৎকার
করে উঠল। আর ওর চোখ দুটি কেমন লাল হয়ে উঠল। তারপর চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গুঁড়ার মতো মিলিয়ে গেল বাতাসে। দৃশ্যটা এত ভয়ানক। মুনিরা আর মরিয়ম একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে। ইলিয়াস চাচা বললেন, বড় বাঁচা বাঁচছ মা। মুনিরার শরীর তখনও কাঁপছিল। তারপর সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে সব খুলে বলে। ইলিয়াস চাচা বললেন, ইবলিশ দুইটা পুইড়া মরলেও ওরা এখনও ওই পোড়াবাড়িতেই আছে মা। ইবলিশগো এখন মরণের দেশে পাঠায় দিতে হইব। কথাটা শুনে মুনিরার শরীর অবশ হয়ে আসে। ঠিকানা কও মা। আমার এখনই ওই পোড়াবাড়িত যাইতে হইব। চাচা আমি যাব। মুনিরা বলে।
তুমি যাইবা? তুমি ভয় পাইবা না মা? না। আপনি থাকলে আমি ভয় পাব না। সিএনজি যখন গলির মুখে থামল তখন সন্ধ্যা। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল । গলিটা ফাঁকা। ঝালাইয়ের লোকগুলি কেও দেখা যাচ্ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে ওরা পোড়াবাড়ির সামনে চলে এল। অশান্ত বাতাস এসে ঝাপটা মারছে। ভাঙা দরজার সামনে এসে ইলিয়াস চাচা বললেন, আস মা। ভয় পাইও না। খালি আল্লাহর নাম কর।
মুনিরা ভিতরে পা বাড়ায়। ওর বুক ভয়ানক কাঁপছে। দোওয়া দরুদ যা জানে পড়ছিল মনে মনে। ভিতরে অন্ধকার। তবে স্ট্রিট লাইটের আলো ভাঙা দরজা- জানালা দিয়ে ঢুকছিল। মেঝেতে ভাঙা ইট। বালি আর কাঠ ছড়িয়ে। বাতাসে কেমন চুনাপাথরের গন্ধ। একপাশে সিঁড়ি। এইদিকে আস মা। ইলিয়াস চাচা বললেন। মুনিরা পিছন পিছন ওঠে। সিঁড়িটা পরিস্কার। মনে হল নিয়মিত ঝাঁট দেওয়া হয়। কে ঝাঁট
দেয়? কেউ তো এই পোড়াবাড়িতে থাকে না। তাহলে? মুনিরা ওর হৃৎস্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পেল যেন।
দোতলায় মৃদু আলো রয়েছে। তবে আলোর উৎস বোঝা গেল না। সেই বেশ বড় বসার ঘর। সেই পুরনো আসবাবপত্র। মুনিরা সব চিনতে পারল। দেয়ালে রেবেকার মৃত মায়ের একটা সাদাকালো ছবি। ঠিক তার নীচে শোকেস। তাতে ছোট কাপড়ের পুতুল। হলদে রঙের। কালো সুতার চুল। কপালে লাল
টিপ। ওদিকে একট কালো সোফা। ওদিকে চোখ যেতেই মুনিরা চমকে উঠল। সোফায় গালিব চাচা বসে আছেন। সেই লম্বা-চওড়া বলিষ্ট গড়ন। আজও সবুজ পাঞ্জাবি পরে ছিলেন। মাথায় উশকো-খুশকো চুল, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, একমুখ ঘন কালো দাড়ি। মিষ্টি কন্ঠে বললেন, বসুন, ইলিয়াস সাহেব।বসুন। আপনার তবিয়ৎ ভালো তো? দূর হ শয়তান! ইলিয়াস চাচা গর্জে উঠলেন। গালিব চাচা হো হো করে হেসে উঠলেন। যেন ভারি মজার কথা শুনেছেন। তিনি গড়া চড়িয়ে ডাকলেন, রেবেকা। রেবেকা … জ্বী, আব্বাজান। ওপাশের ঘর থেকে রেবেকার কন্ঠস্বর ভেসে এল। বাড়িতে মেহমান এসেছে। মেহমানদের শরবত দাও। জ্বী, আব্বা। আনছি। ওপাশে একটা দরজা। দরজায় আকাশী রঙের পরদা। পরদা সরে যায়।
টুংটাং করে ঘন্টি বেজে উঠল। রেবেকা ঘরে ঢুকল। পরনে কালো রঙের সালোয়ার কামিজ। কালো ওড়না।
হাতে একটা ট্রে। তাতে শরবতের গ্লাস। রং সবুজ রঙের শরবত। রেবেকা ঘরে ঢুকতেই ঘরটা কেমন আশ্চর্য মিষ্টি গন্ধ ভরে উঠল। গন্ধটা অনেকটা শুকনো গোলাপ পাপড়ির মতো … দূর হ শয়তান! ইলিয়াস চাচা আবার গর্জে উঠলেন। এরই মধ্যে কাঁধ থেকে ঝুলি নামিয়ে নিয়েছেন। ঝুলি থেকে মেশক মেশানো সুরমা বার করে ওদের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটা দুলে উঠল। আর চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। মুনিরা সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ভয়ানক চিৎকার শুনতে পেল। আর প্রচন্ড শব্দ। যেন অন্ধকারে দুপক্ষের তীব্র লড়াই চলছে। মুনিরা ওর চোখে মুখে গরম ভাপ টের পেল। আতঙ্কে মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাবে। ও সরে যেতে চাইল । অথচ ওর পা দুটো সরল না। পা দুটো লোহার মত ভারী ঠেকল। একটু পর আলো ফিরে এল। মেঝের ওপর দুটো পোড়া শরীর পড়ে রয়েছে। মুনিরা মুখ ফিরিয়ে নিল। ইলিয়াস চাচা বললেন, আর কোনও ভয় নাই মা। ইবলিশ দুইটা তাগো দুনিয়ায় ফেরৎ চইলা গেছে। একটু পর মুনিরা যখন নীচে নেমে এল তখন ওর শরীর প্রচন্ড ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। পা চলছিল না। গলার কাছে প্রচন্ড তৃষ্ণা। বারবার স্নেহার মুখটা ভাসছিল। ব্যাগের মধ্যে ফোনটা বাজল। মরিয়ম । মামী? বল। ক্লান্ত স্বরে বলল মুনিরা। আপনের কি আইতে দেরি হইব? না। কেন? স্নেহায় খায় না। খালি টিভি দেখে।
আচ্ছা। না খাক।

লিখেছেন : ইমন জুবায়ের