ভৌতিক জঙ্গল

2

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

২০০৯ সালের এপ্রিল মাস। আমার এস, এস, সি পরীক্ষার পর আমি আমার খালার বাড়ি সাতক্ষিরার শ্যাম নগর থানায় বেড়াতে যাই। আমার মা বাবা দুজনই জব করেন, তাই আমাকে বাসে তুলে দেয়া হয় আর আমি একাই যাই।

পথে আমাদের বাসটা নষ্ট হয়ে যায় এবং সেটা ঠিক করতে প্রায় ২ ঘণ্টার মত সময় লাগে। যখন আমি সাতক্ষিরায় পৌঁছাই তখন রাত প্রায় ১০ টা। আমি বাস থেকে নেমে দেখলাম আমার খালু আর খালাতো বোন আমাকে নিতে এসেছে। বাস স্ট্যান্ড থেকে আমার খালার বাসায় যেতে মিনিট দশেক সময় লাগে। আমরা মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। কেন যেনও মনে হচ্ছিল রাস্তা ঘাঁট একটু বেশি নির্জন। আমার খালু একটু আগে আগে হাঁটছেন আর আমি আর আমার বোন পিছে পিছে। আমিই নিরবতা ভাঙলাম। আমার আপুকে জিজ্ঞেস করলাম রাস্তা এতো সুনসান কেন? আপু উত্তরে বলল, তাদের বাড়ির পাশের জঙ্গলে ২ দিন আগে একটা লোককে কে বা কারা যেনও খুব করে ফেলে রেখে গেছে। এই কথা শুনে আমার কেন যেনও একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। কেন যেনও মনে হতে লাগলো পেছনে কেউ হাঁটছে। ২-৩ বার ভয়ে ভয়ে পেছনে ফিরলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। এভাবে ভয় পেতে পেতে কোনোভাবে খালার বাসায় এসে পৌঁছলাম।

খালার বাসা ২ তলা। বিশাল এই বাড়িতে উনারা শুধুমাত্র ৩ জন থাকেন। আমার খালা, খালু, আর আমার খালাতো বোন। বাড়ির চারপাশে ঘন বোন জঙ্গল। কেমন যেনও গা ছমছম করে। আবার নাকি কাকে সেখানে খুব করে ফেলে রেখে গেছে। ভাবতেই ভয় লাগছিল। সেদিন রাতে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে কেমন যেনও ক্লান্তি অনুভব করছিলাম। খালাদের প্রকাণ্ড অট্টালিকায় নিচে ৫ খানা ঘর আর উপরে ৩ টি ঘর। এক একটি ঘর যেনও এক একটি খেলার মাঠ। যাই হোক, আমার জন্য নিচ তোলার একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথমে একটু ভয় করছিলো একা একা থাকতে, কিন্তু মনে সাহস আনলাম। এবং এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত তখন কয়টা বাজে আমি জানি না, কিন্তু হটাত আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। গ্রীষ্মকাল ছিল তাই আমার মাথার কাছের জানালাটা খোলা ছিল। ঐ জানালা দিয়ে সেই জঙ্গলটা দেখা যায় যেখানে ২ দিন আগে খুনটা হয়েছে। যাই হোক, জানালার দিকে চোখ পড়তেই খুব ভয় পেলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেও কোনও একটা অভয়বের উপস্থিতি লক্ষ্য করলাম মনে হল। সেটা নাড়াচাড়া করছিলো! আমি শুধু এতটুকু দেখেই ভয়ে জোরে চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকারের কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি খালা, খালু ছুটে আসলেন। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে। তো, আমি বললাম আমি কি দেখেছি। কিন্তু উনারা বললেন যে এটা মনের ভুল। আলো জ্বালানোর পর আমার কাছেও ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হচ্ছিল। তাই আমিও সেই কথাটা মেনে নিলাম। সেইদিন রাতে এরপর আমি আর আমার খালাতো বোন এক সাথে ঘুমাই।

 

এরপর দিন দুপুরের পর আমাকে নিয়ে তারা বেড়াতে বের হন। আমরা বেড়াতে বেড়াতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বাড়ি ফেরার পথে আবার সেই জঙ্গলটা পড়ে। জঙ্গলটা দেখে আমার আবার গতরাতের কথা মনে পড়ে গেলো। খানিকটা ভয় ভয় করতে লাগলো। ভয় কাটানোর জন্য আমি আর আমার খালা গল্প করতে করতে এগুচ্ছিলাম। এর মাঝে আমরা খেয়াল করিনি যে আমার খালাতো বোন আমাদের সাথে নেই। আমরা যখন প্রায় বাড়ির কাছাকাছি তখন দেখলাম আপু আমাদের সাথে নেই। সবাই আপুকে খুঁজাখুঁজি শুরু করলাম কিন্তু আপুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ মেশ কিছু মানুষজন জোগাড় করে সেই জঙ্গলে যাওয়া হল। সেখানে গিয়ে দেখা যায় আপু মাটিতে পড়ে আছে। তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ২ দিন সেখানে থাকার পর আপু বাসায় ফিরে। সবাই জিজ্ঞেস করায় সে সবাইকে সেদিনের ঘটনা খুলে বলে। সেদিন সে আমাদের পেছন পেছন আসছিলো এমন সময় কে যেনও তাকে পেছন থেকে তার নাম ধরে ডাকছিল। সে পেছনে ফিরে দেখে কেউ নেই, কিন্তু ডাকটা বারবার কানে আসছে। তাই সে ডাক শুনে পেছন দিকে যেতে লাগলো। সে নাকি বুঝতে পারছিল না যে সে কি নিজের ইচ্ছায় যাচ্ছে না কি কেউ তাকে সম্মোহন করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে লাশটা পাওয়া গিয়েছিলো সেখানে গিয়ে আপু দেখল লাশটি মাটিতে পড়ে আছে। লাশটির দু চোখ খোলা এবং সেই দু চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে  আপুর দিকে তাকিয়ে আছে। আপুর নাকি এতো টুকুই মনে আছে। এরপর জ্ঞান ফিরলে সে নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করে।

এরপরের দিনই আমি ঢাকায় ফিরে আসি। আমি সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারিনি।

যিনি পাঠিয়েছেনঃ Nusrat Jahan Ivy

(ভূতুড়ে গল্প)

মৃত্যুর পরে

3

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

এই যে ভায়া , হ্যাঁ আপনাকেই বলছি… কখনো কিজের চোখে ভুত দেখেছেন?”

প্রশ্নটা যাকেই করা হোক সেই চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাকিয়ে ডানে বামে নেড়ে না বোধক উত্তর দেবে।আমি জানি আপনি ও পারবেন না।

ভুতের গল্প আপনি শুনেছেন আপনার দাদীমার মুখে, কিনবা আপনার নানীর মুখে। উনি আবার শুনেছেন উনার কোন এক ফুফাত বা খালাতো ভাইয়ের মুখে- তিনি আবার অন্য কোন এক আত্মীয়ের মুখে- এভাবে আস্ল মানুষটাকে খুঁজতে গেলে দেখা যাবে- উনি সাধারন একটা কাপড় দেখে মনে করেছেন শাকচুন্নি। আসলে বাংলার ভুতের এই গল্প গুলো এই আত্মীয় তত্ত্বের বেড়াজাল থেকে কখনোই বের হতে পারেনি।

ভাবছেন কেন আমি এত কথা বলছি? কারন আমি সত্যি সত্যি ভুত দেখেছি। আর এটাকে ভুত না বলে অতৃপ্ত আত্মা বলা ভাল। তাহলে প্রথম থেকে ই শুরু করি।

ঘটনাটা খুব একটা বেশী দিন আগের না। আমার বিয়ে হয়েছে দিন দশেক হয়েছে। নবম দিন আমি আর আমার স্ত্রী রুপা গেলাম কক্সবাজার।আগেই বলে রাখি আমি কিন্তু একটু পাগল টাইপের। সংসার আমার কোন দিনই ভালো লাগেনি। সংসার বৈরাগ্যের কারনে প্রায় সময় আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি জংগলে জংগলে। কোন এক অজানা কারনে সেই পাগলামি আমাকে হটাত ছেড়ে গেছে- ফলাফল আমি আজ বিবাহিত।আর রুপা নামের অজানা মেয়েটি আমার বউ।

আর আমার মায়ের ইচ্ছেতেই আমি চোখমুখ বন্ধ করে কবুল করলাম আর তাঁর ইচ্ছাতেই হানিমুনে এলাম কক্সবাজার। আর আমার সেই ভৌতিক ঘটনার সুত্রপাত এই কক্সবাজারেই।

আমি আর রুপার কারোরই হোটেল পছন্দ না- আমরা তাই আমার এই পরিচিত বন্ধুর রেষ্টহাঊজে ঊঠলাম।

ঘটনা যেই দিনের সেদিন আমি মাত্র ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে করতে শাওয়ার নিচ্ছিলাম। এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ। আমি ব্রাশ মুখে দিয়েই দরজার ফুটো দিয়ে বাইরে তাকালাম- কিন্তু বেচারা যে এসেছে- সে এমন ভাবে দাঁড়াল যে আমি তাকে দেখতেই পারছিনা। শেষে রাজ্যের সমস্থ বিরক্তি মুখে নিয়ে আমি দরজা খুলে দিলাম।আর খুলেই আমি অবাক হয়ে কিছু ক্ষন আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কারন যে আমার সামনে দাড়িয়ে আছে- সে আর যেই হোক সভ্য কোন মানুষ হতে পারেনা।সারা শরীর ময়লা মুখে গোঁফ দাঁড়ির জঙ্গল- দেখার মাঝে দেখা যাচ্ছে জ্বলজ্বলে চোখ দুটো।

আর সেই চোখদুটি দেখে চিনলাম- সে আমার ছোটবেলার বন্ধু তৌহিদ। একসাথে আমরা স্কুলে পড়েছি- কলেজে বিড়ি টেনেছি, ইউনিভার্সিটিতে হলে থেকেছি- আরও কত কি? যেন এক সেকেন্ডে পুরনো সেই দিনগুলো আমার চোখের সামনে উঠে এল একে একে। আর সাথে সাথে আমি জড়িয়ে ধরলাম তৌহিদকে।

রুপার সাথে পরিচয় পালা শেষ করে তৌহিদ কে নিয়ে গেলাম সেলুনে। সেখান থেকে চুল দাঁড়ির জংগল কাটিয়ে এনে বাসায় গোসল করালাম। তারপর একসাথে দুজনে বসে দুপুরের খাবার খেলাম। এভাবে যে কখন দিন কেটে রাত নেমে এল বুঝতেই পারলাম না।

রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে তৌহিদ কে নিয়ে গেলাম কাছের একটা বারে। সেখানে পেগ চারেক হুইস্কি হিলে বাসায় আসার পথে তৌহিদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিমর্ষ দেখাল। আমি কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই সে একটা কাহিনী শোনাল।

তৌহিদে ভাষায় বলি-

“তুই চাকরির জন্য ঢাকা চলে গেলে আমি খুব একা হয়ে যাই। আমি চট্টগ্রামেই ছিলাম। একটা ব্যাবসায় হাত দিয়েছিলাম- কিন্তু লস খেলাম”।

এর মাঝেই কারেন্ট চলে গেল। আমি মোমবাতি জ্বালালাম। সাথে করে চার্জার আনিনি বলে নিজের কপাল চাপড়ালাম। তারপর আবার তৌহিদের কাছে এসে বসলাম। মোমবাতির আলোয় তৌহিদ আবার বলতে শুরু করল-

‘আমি যে ফার্মে জয়েন করেছিলাম সেখানে এক কলিগের সাথে আমার বেশ ভাব হয়েগেল। ওর নাম জীবন। আমার সাথে সাথে সে ও ভাবের পাগল। আমি ওকে সাধনা করতে বনে যেতে বলতেই সে একপায়ে খাড়া। তারপর আমি আর জীবন মিলে গেলাম বান্দরবান।

কিন্তু সেখানে মাত্র দুদিন থেকে ই আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম।সময়টা বর্ষা কাল ছিল। তাই মশক কুলের কামড়ের চোটে আমার ম্যালেরিয়া বেধে গেল।আমার জ্ঞান ছিলনা দুইদিন। আমি জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে আবষ্কার করি একটা পাহাড়ি ঘরে- সেখানে আমার পাশে জীবন ও পড়েছিল- আর আমাদের দুজনকেই সুস্থ করে তুলল দেবী নামের এক পাহাড়ি মেয়ে।

তারপর আমরা প্রায় একমাস পর আবার ফিরে আসি জঙ্গলে। আমি মনযোগের সাথে সাধনা করতে পারলেও জীবন কিছুটা অস্থির ছিল। পড়ে জানতে পারলাম দেবীর সাথে জীবনের মন দেয়া নেয়া হয়েছে- তখন খুব একটা খুশি হতে পারিনি। কারণ এটা জানার পরদিন ই আমাদের পাহাড়িরা উঠিয়ে নিয়ে যায়। পাহাড়িরা খুব সহজ সরল-কিন্তু ক্ষেপে গেলে ওদের থামানো যায়না- আর তাই দেবীর সাথে ভালবাসার দায়ে জীবনকে আর আমকে মার খেতে হল।আমি আর ওমুখ না হলেও জীবন কিন্তু দেবীর উপর ক্ষেপে গেল। কারন দেবীর আগে একটা স্বামী আর একটা মেয়ে আছে। জীবন ঠিক করল সে প্রতিশোধ নেবে। তাই এর পরের পূর্ণিমায় ওই পাহাড়ি গ্রামে যখন উৎসব চলছিল তখন জীবন এক কোপে দেবীকে দুই ভাগ করে ফেলে।

লাশের পাশেই বসে ছিল জীবন। ওকে এভাবে দেখে কারোর কিছু বুঝতে বাকি থাকেনা। সবাই মিলে প্রথমে জীবনকে মিলিটারির কাছে তারপর পুলিশে হস্তান্তর করে।

তারপর বিচারে জীবনের ফাসি হয়। আমাকে একমাত্র বন্ধু হিসেবে জীবনের ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকতে হয়। সেখানে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জীবনের মৃত্যু দেখেছি। বুঝিনা- কেন মৃত্যুর অনেক গুলো উপায় থাকতেও কেন বাংলাদেশে এখনো ফাঁসির মত একটা মধ্যযুগীয় বিচার ব্যাবস্থা এখনো রয়ে গেছে?

দেখলাম নিজের চোখে সব। একজন জল্লাদ জীবনকে কালো কাপড় পড়িয়ে দিল। হাত পিছনে নিয়ে দড়ি দিয়ে বাঁধল। পায়ে শক্ত করে বেধে ঠিক বারোটা এক মিনিটে ঝুলিয়ে দিল জীবনকে। আমার চোখের সামনে জীবনকে মরণের দিকে ঠেলে দিল ওরা- আমি কিছুই করতে পারিনি। চেয়ে চেয়ে দেখেছি। এর পরের দৃশ্য আরও ভয়াবহ। এক ডাক্তাররুপি জল্লাদ জীবনের লাশটাকে নামাল। তারপর হাতপায়ের সব রগ একে একে কেটে দিল। তারপর লাশ নিয়ে গেল পোস্টমর্টেম করতে। একটা বাচ্চা যেখানে দেখেই বলতে পারবে যে জীবন আর বেঁচে নেই সেখানে ওর লাশ কেটে দেখার কি আছে সেটাই বুঝলাম না।

সকালে যখন আমাকে লাশ হস্তান্তর করা হল তখন জীবনকে চেনা দায়। আমি ওর লাশ নিয়ে গেলাম জীবনদের গ্রামে। ওর তিন কূলে কেউ ছিলনা। আমি ওর গ্রামের এক দুঃসম্পর্কের ভাইকে লাশ বুঝিয়ে দিলাম। তারপর আমি আর গ্রামের কিছু লোক মিলে লাশ দাফন করলাম জানাজা পড়ে।

আসল ঘটনার শুরু এখান থেকে। আমি বাসায় ফিরে এলাম- কিন্তু শান্তি তে থাকতে পারলাম না। কেঊ যেন আমাকে কিছু একটা বলতে চাইছে। আমি সব সময় উপলব্ধি করি কেউ যেন আমাকে কিছু একটা বলতে চাইছে- কিন্তু আমি সেটা বুঝতে পারিনা।

এটা আমার মা ও বুঝতে পারেনা। তারপর আমার মা এক হুজুর কে ডাকান। উনি এসে বলেন যে এক অতৃপ্ত আত্মা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে চাইছে। আমি বললাম যেন হুজুর যোগাযোগ করেন।

পরদিন রাতে হুজুর আস্র বসালেন। আসর বসানোর পর কিছু তুকতাক করতেই হুজুরের গলার স্বর কেমন যেন হয়ে গেল। হুজুর অন্য এক স্বরে বলল- যে সে হল জীবনের আত্মা- সে মরে গিয়ে ও শান্তি পাচ্ছেনা। যেন আল্লার দরবারে বিশেষ মোনাজাত করে ওর আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।

আমরা তাই করলাম। পরের দিন একটা ফাতিয়া দেবার ব্যবস্থা করলাম। আল্লার দরবারে সবাই মিলে মোনাজাত করলাম।

এরপর থেকে আমরা আর কোন সমস্যা উপলব্ধি করিনি।

এতসবের পর আমি আর নতুন করে চাকরি করিনি। জঙ্গলে চলে গেলাম- সেখানে হটাত তোর কথা মনে হতে চলে এলাম”।

কথাগুলো বলেই কেমন যেন চুপ হয়ে গেল তৌহিদ। আমি ও আর কথা বাড়ালাম না। তৌহিদকে একটা রুমে ঘুমাতে দিলাম। নিজে গিয়ে শুলাম আমাদের রুমে।

 

তারপর- সকালে একটা বিকট চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি দৌড়ে গেলাম- দেখলাম রুপা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে তৌহিদের রুমের সামনে। আমি তাড়াতাড়ি রুমে ঢুকতেই নাকে একটা পচা গন্ধ বাড়ি মারল যেন- ঠিক মানুষ পচা গন্ধ। আমি রুমে গিয়ে যেটা দেখলাম সেটা বর্ণনা করতেই এখনো গা শিঊরে উঠছে।

দেখলাম- তৌহিদের শরীরটা যেন এক মৃত লাশ। আমি হাতটা নিয়ে পালস দেখতে গিয়েই থেমে গেলাম। হাতের আর পায়ের রগ কাটা। তাড়াতাড়ি গলায় দেখলাম- দেখলাম গলায় একটা গাড় রশির দাগ। আমার তারপর আর হুশ ছিলোনা……

 

আমার জ্ঞান ফেরে দুইদিন পর পুলিশ কাষ্টাডিতে। আমাকে এরেষ্ট করা হয়েছে। কারন আমি নাকি তৌহিদের লাশ ফাঁসি হবার পর ওর গ্রামে নিয়ে যাবার বদলে চুরি করেছি। আমি কোনভাবেই আদালতকে বুঝাতে পারলাম না- যে আমি মাত্র ১২ দিন আগে বিয়ে করেছি রুপাকে- আমার কোন কথাই ওরা বিশ্বাস করছেনা।

 

আজ আদালতে মামলা উঠবে। আমাকে হাজির করা হচ্ছে। রুপা আছে বলেই ভরসা- নাহলে আমি হয়ত বাঁচতেই পারতাম না। আমাকেও ঝুলতে হত ফাঁসিতে নাহয় যাবতজীবন হয়ে যেত।

 

তাই এখন কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলি আমি ভুত দেখেছি- একেবারে চোখের সামনে দেখেছি। একসাথে মদ ও খেয়েছি। বিশ্বাস না করলে জাতীয় কারাগারের ১৩৭ নম্বর সেলে এসে আমাকে দেখে যেতে পারেন। আমি আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছি………

 

লিখেছেনঃ নষ্ট কবি

(ভূতুড়ে গল্প)

অচেনা জগত

2

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

সবে ১৫ রোজা চলছে।ছাত্রাবাসে আজ থেকে ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে।সকল ছাত্র খুব তাড়াতাড়ি করে বাড়ী চলে গেলেও আমি ব্যক্তিগত ঝামেলায় ছাত্রাবাস পরিচালককে রাজি করিয়ে আরো কয়েকদিন ছাত্রাবাসে আছি।ঝামেলাটা হয়েছে রাজনীতি নিয়ে।প্রতিপক্ষের সাথে একটু বুঝাপড়া আছে তো,তাই ঠান্ডা মাথায় আমাদের দলের বড়ভাই নতুন প্ল্যান করছে আর আমাদের দলের সবাইকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে বলেছে।এইসব রাজনৈতিক বড়ভাইদের পাল্লায় পড়ে শেষ পর্যন্ত ঈদের আনন্দ মাটি হতে চলল।ঝামেলা শেষ হতে হতে বোধ হয় শবে কদর শেষ হয়ে যাবে।ঝামেলার কারণে বাড়ী যেতে পারছি না এজন্য মন খুবই খারাপ,সেই সাথে দুঃচিন্তায় রাতে ঠিকমত ঘুম আসে না।রাত হয়েছে।রুমে তথা গোটা ছাত্রাবাসে আমি একা।ছাত্রাবাসের কর্তৃপক্ষ সবাই নিজের বাসায় চলে গেছে।খুব ভয় পাচ্ছি তা নয়,দুঃচিন্তায় আছি।রাতে তাই ঘুমাতে পারছি না।অগত্যা ঘুমানোর জন্য পাশের বেডের শফিউলের ব্যক্তিগত ডায়েরিটা পড়তে লাগলাম-

“রাত প্রায় দুইটা।অন্ধকার রুমে একাকী শুয়ে আছি।কিছুতেই ঘুম আসছে না।ইদানিং রাতে ঠিকমত ঘুম হচ্ছে না।তো একদিন ঘুমানোর আগে গোছল করেছি,এতেই কেল্লা ফতে।রাতে এত ভালো ঘুম হল কিন্তু হঠাত্‍ কে যেন আমাকে লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জাগাতে লাগলো আর বলতে লাগলো,”ঐ বেটা উঠ,যা ভাগ এখান থেকে।”আমি লাফ দিয়ে ওঠলাম।কিন্তু এ আমি কোথায়?এযে লাকসাম রেল স্টেশন!আমার গায়েও দেখছি ছেড়া-ময়লা জামা কাপড়!আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি একটা টোকাই। আমি কি স্বপ্ন দেখছি?কিন্তু ঐ আনসারের লাঠির গুতোঁয় যে ব্যথা পেয়েছিলাম,তা এখনো অনুভূত হচ্ছে।আচ্ছা এককাজ করি,আমি ঢাকায় আমার ছাত্রাবাসে চলে যাই।কিন্তু এভাবে টোকাইয়ের বেশে কিভাবে যাব?যাক সে পরে দেখা যাবে।আমি এখন যে জগতে আছি,সে জগতে আমি একটা টোকাই।তাই আমাকে এখন টোকাইয়ের কাজ করতে হবে।দেখি কেমন লাগে।

সারাদিন মানুষের দৌড়ানি খেয়ে অনেক কাগজ টোকাইছি।এবার প্লাটফর্মে ঘুমাতে যাব।আজকে রাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে হবে কিভাবে ঢাকায় যাওয়া যায়।কৌতূহল বশত একটি আয়নায় নিজের টোকাইরূপী চেহারা দেখার ইচ্ছে হল।আমার চেহারা দেখে আমি তো অবাক।এটা কার চেহারা,একে তো আমি জীবনেও দেখিনি।দুনিয়াটা খুব আজব লাগছে।কাল ঘুম থেকে ওঠে যেভাবেই হোক ঢাকায় আমার ছাত্রাবাসে যাব।এরকম ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন মাত্র সকাল হয়েছে।কিন্তু একি,আমি আমার ছাত্রাবাসের সীটে।আরো অদ্ভুত ব্যপার,পত্রিকায় তারিখ দেখলাম।আমি মাত্র গতকালই গোছল করে ঘুমিয়ে ছিলাম,এবং সে ঘুম মাত্র ভেঙ্গেছে।তাহলে টোকাইয়ের ঘটনাটা নিশ্চয়ই স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু না।ঐ দিন রাতেও গোছল করে ঘুমালাম এবং ঘুম ভাঙ্গলো লাঠির গুঁতোয়।মাত্র একটি ট্রেন এসেছে।আমি এই নতুন জগত সম্পর্কে জানতে ট্রেন থেকে নামা একজন পত্রিকার হকারকে বলি আজ কয় তারিখ।জবাবে সে যেই তারিখের কথা বলে,তা আমার ঢাকার জগতের হিসেবে ভবিষ্যত্‍ কাল।এই জগতে এখনো ঈদের পাঁচদিন বাকী।আর ঢাকায় মাত্র রমজান শুরু হল।আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম।হঠাত্‍ ট্রেন থেকে একটি কফিন নামল।কফিনে একজন ছাত্রের লাশ,ঢাকা থেকে এসেছে।রাজনীতি করতো,প্রতিপক্ষের গুলিতে গতকাল রাতে মারা যায়।লাশের কফিনটি প্লাটফর্মে পড়ে থাকে।কিছু লোক এসে কফিনটি নিয়ে লাশের বাড়ীতে রওনা হয়।আমিও গেলাম লাশ দেখতে।লাশের বাড়ীতে যাওয়া মাত্র দেখলাম,ঘর থেকে আমার রুমমেট মামুনের আব্বা ও আম্মা পাগলের মত ছুটে আসছে।তাহলে কি মামুনের কোন সমস্যা হয়েছে?কফিনের ঢাকনা সরিয়ে যেই না লাশের মুখের কাপড় সরানো হল,আমি শোকে পাথর হয়ে গেলাম।এ যে আমার রুমমেট মামুনের লাশ!তার বুকে গুলি লেগেছে।কিছুতেই নাকি তাকে বাচাঁনো গেল না।আমি সারাদিন মামুনের বাড়ীতেই ছিলাম।বাড়ীর মানুষজন দয়া করে আমাকে পেট ভরে খেতে দিল।কিন্তু কেউই জানলো না যে,আমি মামুনের রুমমেট।কারণ এই দ্বিতীয় জগতে আমি একটা টোকাই।ঐ রাতে আমি মামুনের বাড়ী থেকে চলে আসার সময় মামুনদের বাড়ীর পাশ থেকে একটা স্বর্ণের আংটি খুঁজে পাই।আমি কাউকে না বলে আংটিটা আমার পকেটে রাখি।কারণ আংটির কথা বললে সবাই আমাকে চোর ভাববে।ঐ রাতেও আমি স্টেশনে এসে ঘুমাই এবং যথারীতি ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি আমার ছাত্রাবাসে।দূর যতসব আজগুবি স্বপ্ন।হঠাত্‍ আমি আমার পকেটে ঐ আংটিটি খুঁজে পাই।মামুনকে অবশ্য আংটির কথা বলি নি।তার বাড়িতে গিয়েই আংটি টা ফেরত দেব ভাবছি।

ঐ দিন রাতেও গোছল করে ঘুমাতে গেলাম কিন্তু আমি আর আমার স্বপ্নের বা দ্বিতীয় জগতে যেতে পারলাম না।তারপর দিনও কিছু হল না।আমি মামুনকে আংটির কথা ছাড়া সব খুলে বললাম কিন্তু সে হেসে সব উড়িয়ে দিয়ে বলল আমি নাকি তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরাতে এসব গল্প বানাচ্ছি।আমি তাকে আর কিছু বললাম না,শুধু সাবধানে থাকতে বলেছিলাম।ঈদের ছুটিতে বাড়ীতে যাব।তবে অবশ্যই ঐ নির্দিষ্ট দিনে আংটিটি পকেটে করে লাকসাম রেল স্টেশনে থাকব।”

আমি ডায়েরিটা পড়া শেষ করলাম।শফিউল ব্যটা একটা চাপাবাজ এবং আংটি চোর।তবে আমি সাবধানে থাকার চেষ্টা করব।রাজনীতি মানেই রিস্ক।

২৩রোজার দিন আমাকে শফিউল ফোন করে বলল”মামুন তুই কই?”যখন বললাম যে আমি ঢাকায়,ও পাগলের মত বলতে লাগল,”বন্ধু ঢাকায় থাকলে আর মাত্র একদিন তুই বাচঁবি,তাড়াতাড়ি বাড়ী চলে আয়।”আমি কল বন্ধ করে দেই।যত্তোসব ভীতুলোক।

একটুপরেই আমার রাজনৈতিক দলের বড়ভাই ফোন দিয়ে বলে,”মামুন,কালকে সন্ধ্যায় ধোলাইখালে একটা অপারেশনে যেতে হবে।ভয়ংকর এবং চূড়ান্ত অপারেশন।আমাদেরকে অবশ্যই কঠিন লড়াই করতে হবে।তুমি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নাও।আর অপারেশনে যারা যোগ দেবে না,তাদেরকে আমি নিজ হাতে গুলি করব।তুমি কিন্তু অবশ্যই আসবা।”মূহুর্তেই আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।আমি ভয়ে ভয়ে বলি,”জ্বী,ঠিক আছে বড়ভাই।”আমি ভালো করেই জানি বড়ভাইয়ের নির্দেশ অমান্য করলে তিনি মৃত্যুদন্ড কার্যকর করবেন আর “ভয়ংকর লড়াই”তে অংশ নিলে বেশ ক’জন মারা যাবে নিশ্চিত।এখন বাচঁতে চাইলে পালাতে হবে।আমি তাড়াতাড়ি ছাত্রাবাস থেকে বেড় হলাম।বের হয়েই দেখি বড়ভাইয়ের লোক আমাকে নিতে এসেছে।বুঝলাম,মৃত্যু ছাড়া গতি নাই।বড়ভাইয়ের বাসায় গেলে তিনি আমার হাতে একটা রিভলবার তুলে দেন এবং টুকটাক প্রশিক্ষণ দেন।আমি অন্যমনস্ক হয়ে থাকি।

তারপর যা ঘটেছিল তা খুবই মর্মান্তিক।বুকে গুলি লাগে আমার।অচেতন হয়ে যাই।তবে মারা গিয়েছিলাম কিনা জানি না।চেতনা ফিরলে নিজেকে আবিস্কার করি একটা পাগল হিসেবে যে লাকসাম রেল স্টেশনে সারাক্ষণ পাগলামি করে বেড়ায়।তবে অনেক চেষ্টা করেও আমি আমার সেই পুরোনো জগতে যেতে পারি নি।কিন্তু রহস্যজনক ভাবে সেই মামুন নামধারী আমাকে এবং পরিচিতজনদেরকে আমি বহু চেষ্টা করে কোথাও খুজেঁ পাই নি।এমনকি আমার বুকেও কোন গুলির চিহ্ন নেই।হয়তো আমি অতিরিক্ত ভবিষ্যতে চলে এসেছি।

 

লেখকঃ Muhammad Abdullah Al Mamun

(ভূতুড়ে গল্প)

স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

মানুষের এই পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যার কোনো ব্যাখ্যা খুজেঁ পাওয়া যায়না। আর আমি অত সহজে কোনো কিছু বিশ্বাস করিনা। আমি যুক্তিবাদী মানুষ। অনেকেই আমাকে নাস্তিক বলে। কিন্তু আমি নাস্তিক না। আমার সাথে যে গঠনাগুলো ঘটে আমি সেগুলোর ব্যাখ্যা দাড় করানোর চেষ্টা করি কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পারিনা।
আমার যতদুর মনে পড়ে আমার ৪ বছর বয়স থেকেই ঘটনার সুত্রপাত। (এর আগে ঘটে থাকলে তা আমার মনে নেই।) তখন আমরা খাগড়াছড়িতে ছিলাম। আমি তখন ও স্কুলে ভর্তি হইনি। সম্ববত ১৯৯৪ সাল। আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাসার পাশে মাঠে খেলা করতাম। আম্মু ও আন্টিরা হাঁটাহাটি করত। তখন আমি দেখতাম মাঠে আমাদেরই মত, কিন্তু আমাদের চাইতে আলাদা কিছু মানুষ ও হাঁটাহাটি করছে। এককথায়, আমি একটা দেয়ালের সামনে দাড়ালে যেমন ছায়া পড়বে তেমন, কিন্তু ছায়াটা সাদা, টর্চ লাইটের আলোর মত সাদা। অনেকগুলো সাদা আলোর মানুষ মাঠে খেলছে, আমি আম্মুকে জিজ্ঞেস করতাম ওগুলো কি ? আম্মু বলত শেয়াল (পাশের জঙ্গলে অনেক শেয়াল ছিল, আম্মু ভাবত শেয়াল দেখে ভয় পাচ্ছি)।

এভাবে প্রতিদিনই আমি তাদের দেখতাম, আমার কাছে সেটা স্বাভাবিক ছিল। আমি ভয় পেতাম না।
কাহিনীতে কিছুটা পরিবর্তন আসে ১৯৯৭/৯৮ এর দিকে। তখন আব্বুর বদলি হয়ে গেছে চট্টগ্রামে। আমি থ্রিতে পড়ি। বদলটা হল, খাগড়াছড়িতে আমি ওদের দেখতাম মাঠে, আর চট্টগ্রামে ওরা চলে যায় দেয়ালে, ছায়ার মত। অবিকল একটা মানুষের ছায়া কিন্তু টর্চ লাইটের আলোর মত উজ্জ্বল। সন্ধ্যায় খেলার সময় দেখতাম দেয়াল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে অনেকগুলো আলোর মানুষ। কিন্তু ওদের পা কখনো মাটিতে লাগানো থাকতনা। শূন্যে ভাসমান থাকত। আমি ভয় পেতাম না। খেলার সাথীদের বলতাম, তারা মজা করে ধরতে যেত, কিন্তু ধরতে পারত না। (পরে জানতে পারি তারা কেউ দেখত না, দুষ্টুমি করত)
২০০৩ সালে আমরা ব্রাক্ষনবাড়িয়া চলে আসি। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। সন্ধ্যায় বের হওয়া বন্ধ। তাই আর আলোর মানুষ দেখিনা।
২০০৬ সাল। আমি এস.এস.সি পরীক্ষার্থী। গ্রাম থেকে নানু ও মামা এসেছে। পরীক্ষার আর ১৫/১৬ দিন বাকী। নানু আমার সাথে ঘুমায়। আমি রাত ১.৩০ পর্যন্ত পড়ি। হঠাত এক রাতে-
আনুমানিক রাত ৩.০০টা। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। হঠাত দেখি আমার রূমে তিনজন লোক চাঁদর মুড়ি দিয়ে হাঁটছে। তাদের গাঁ থেকে আলো ছড়াচ্ছে। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। আমি ভয়ে পাথর হয়ে গেলাম। প্রায় ৩০ মিনিট জেগে ছিলাম। নানুকে জড়িয়ে ধরলাম। নানু বলল_ “কি হয়েছে ?” আমি বললাম_ ” ভয় পাই”।
সকালে আমি নানুকে জিজ্ঞেস করলে নানু বলেন সত্যিই গতরাতে গতরাতে আমি “ভয় পাই” বলেছি। (জিজ্ঞেস করার কারন আমি যুক্তি, প্রমাণ ছাড়া কিছু বিশ্বাস করিনা) ঘটনাটা আমার স্যারের সাথে শেয়ার করলে উনি বলেন এগুলো জ্বীন। আয়াতুল কুরসী পড়ে ঘুমাতে বলেন।
এর পর কেটে গেল আরও ২ বছর।
২০০৮ সাল। আমি এইচ. এস. সি দিয়ে ঢাকা গেছি কোচিং করতে। হোষ্টেলে থাকি। হঠাত একদিন _
স্বপ্নে দেখি আমাকে আমার বড় খালা মারছে। পেটে জোরে জোরে লাথি মারছে। আমার চোখ লাল হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি মরে যাচ্ছি। ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি কোথায় ? এরা কারা ? আমি কে ? কিছুই মনে করতে পারছিনা। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিনা। পেটে খুব ব্যাথা। প্রায় ১৫/২০ মিনিট। হঠাত আমার রূমমেট আমার গা ধরে ঝাঁকুনি মারে। আমার সব মনে পড়ে যায়। তাকিয়ে দেখি সকাল ১১.০০ টা। তার পর দেখি আমার পেট লাল হয়ে আছে। যেন সত্যিই কেউ প্রচন্ড জোরে লাথি মেরেছে। ঘটনাটা আমার মাকে বলি। তারপর বাসায় চলে যাই। আম্মু একটা তাবিজ দিয়ে দেন। হোষ্টেলে হঠাত একদিন দেখি হাতে তাবিজ নেই। কোথাও খুঁজে পাইনা। তারপর যখন বাসায় যাই_ টানা ২১ দিন জ্বর, বমি। আর ভয়াবহ সব দুঃস্বপ্ন। প্রতিটা স্বপ্নের বিষয় বস্তু _ আমাকে মারছে, আমি মরে যাচ্ছি, মৃতু্যর এক সেকেন্ড আগে ঘুম ভেঙ্গে যেত। শরীরে খুব ব্যাথা করত। সকাল, বিকাল, দুপুর, রাত যখন তখন স্বপ্ন। এমনকি সোফায় বসে ৫ মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করলে ও স্বপ্ন চলে আসত।
তারপর, সুস্থ্য হই। হোষ্টেলে যাই। তাবিজটা খুজে পাই বিছানার তোশকের নিচে। কিন্তু তোশকের নিচে কিভাবে গেল ?
যাই হোক। ২০০৯ সালে আমরা সিলেটে। ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমার বয়স ১৮+ ।

আমার জীবনে নেমে এল ভয়াবহ বিপর্যয়। একটা রাত ঘুমাতে পারিনি। এক কথায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। স্বপ্নের মাঝে কতবার যে মৃতু্যর হাত থেকে ফিরে আসতাম…।
ভয়াবহ সেই ড্রাকুলার চেহারা আমাকে প্রতি রাতে তাড়িয়ে বেড়াত। ৫ মিনিটের জন্য ঘুমাতে পারতাম না। স্বপ্নে যে জায়গায় মারা হতো ঘুম থেকে উঠার পর সে জায়গা ব্যাথা করত। লাল হয়ে থাকত। সায়েন্স এ নাকি এ সমস্যাকে ওহাবৎঃ জবধপঃরড়হ বলে। আমার ভার্সিটিতে যাওয়া বন্ধ প্রায় ৩ মাস। আমি কি বলি, কি করি কিছুই মনে থাকেনা। এমনকি আমার নানা_নানু নাকি ঐসময় আমাদের বাসায় ছিলেন কিন্তু আমি আজ ও মনে করতে পারিনা। অনেকের সাথে কথা বলে জানতে পারি আমাকে নাকি তখন দেখতে অপ্রকৃতস্থের মতো দেখাত। বিশেষ করে আমার চোখ। সাধারন ও মানসিক সব ডাক্তারই দেখানো হয়েছে। তারা শুধু ঘুমের ওষুধ দিয়ে দিত। আর যখন খুব সমস্যা হত, ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত। স্যালাইন দেয়া হত। আমার মনে আছে, দিনে ৭টা ইনজেকশন পর্যন্ত দেয়া হয়েছে।
আমার একপাশে ভাই আর একপাশে মা ঘুমাতো, আমি মাকে ধরে রাখতাম আর ভাই আমাকে ধরে রাখতো। কিন্তু স্বপ্নগুলো আমাকে ছাড়তোনা। আমি প্রতি রাতে চিৎকার করতাম, দিনে যখন তখন মাথা ঘুরে পড়ে যেতাম। আবোল তাবোল বকতাম।
এক হুজুর (আমি এগুলোতে বিশ্বাস করতাম না) আমাকে তেলপড়া মেখে ঘুমাতে বলল। অবিশ্বাস্যরকম ভাবে যেদিন তেলপড়া মাখতাম সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখতামনা। যেদিন মাখতামনা সেদিন ই…।
আমাকে অসহায়ভাবে “হুজুর” বিশ্বাস করতে হলো। কিন্তু সেই হুজুর আমাকে স্পষ্ট করে কিছুই বললেননা।
শাহপরাণ মাজার এর হুজুর বললেন আমার উপর জ্বীনের নজর আছে। (আমি বিশ্বাস করিনা) আমাকে পানি পড়া আর তাবিজ দিলেন। আমি ব্যবহার করিনি। ফেলে দিয়েছি সুরমা নদীতে। আর আমার সেই “হুজুর” আমাকে একটা শরীর বন্ধের তাবিজ দিলেন যা আমি ব্যবহার করে সুফল পেয়েছি। (তাবিজ গলায় লাগাবার সাথে সাথে অবিশ্বাস্যভাবে সব ভয় চলে গেছে)
২০১০ সাল। আমি ২য় বর্ষে পড়ি।
হঠাৎ একদিন দেখি গলায় তাবিজ নেই। আমি ভয় পেলাম। তাবিজ খুঁজে পেলাম ঘরের এক কোণায়। কিন্তু আর গলায় দিলাম না। একদিন-
আম্মু অসুস্থ্য হয়েগেছে। আবোল তাবোল বকছে। হঠাৎ আমাকে ডাক দিল। “তোর যে বড় তাবিজটা আছে না, হুজুর যে দিছে, ঐটা ফেলে দে, ঐটা ভালো না, এক্ষন ই ফেলে দে যা ফেলে দে” (যদিও আম্মু পরে অস্বীকার করেছে)।
আমি ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু তাবিজ ফেললাম না। একটা কাঁচের বয়ামে রেখে দিলাম।
তারপর-
আমি আবার স্বপ্ন দেখি…..
প্রতি রাতে…..
২০১১ সাল-
একদিন রাতে বাথরূমের আয়নায় একজনকে দেখি। সেই ড্রাকুলা (অথবা অন্যকিছু)।

আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার চেহারা কী যে ভয়ংকর, আমার অনুভুতি নাহয় না ই লিখলাম। তবে অনেক কেঁদেছি। আমার সাথেই কেন এমন হবে? আমি কি দোষ করেছি….?
এখন আমার কাছে এটা কোন ব্যাপার না। একজনের সাথে এই ঘটনা শেয়ার করেছিলাম সে বলেছে রাতের বেলা রূমের মাঝখানে বসে তার/তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতে, তারা কি চায় জানতে। করিনি। কি লাভ?
ক’দিন আগে। আমার ভাইয়ের পরীক্ষা। দেখলাম, সে আকাশি রঙের আর নীল জিন্স পড়ে ডান হাতে বোর্ড নিয়ে বাম হাতে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল। একটু পড়ে দেখি সে আবার একইভাবে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম “কিরে তুই ঢুকলি কখন?” সে তো পুরা অবাক। – “আমি বের হলাম কখন?” আমি বললাম- “তাহলে দুই মিনিট আগে কে গেলো?” সে বলল “মানে?” আমি বুঝতে পাড়লাম ঘটনা কি। আমি ওকে যেতে বললাম। কারণ এর আগেও এ ঘটনা দুই তিন বার ঘটেছে। শুধু ভয় পাচ্ছিলাম ওর যাতে কিছু না হয়।
আমি অনেক কিছুই বলে দিতে পারতাম। যা অন্য কেউ পারতোনা। নিজেই অবাক হতাম । যেমন- আমার বান্ধবীর বয়ফ্রেন্ড ভালোবাসা দিবসে কার সাথে কোথায় বেড়াতে গেছে আমি সেটা পর্যন্ত বলে দিয়েছিলাম। (যেটা এখন আর পারিনা বা পারতে চেষ্টা করিনা)

*** যারা এ লেখাটি পড়লেন আমি তাদের জায়গায় হলে এটি বিশ্বাস করতাম না। কারন আমি অবিশ্বাসিদের দলে। তবে আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যার সাথে ঘটে সে ই বুঝে।।

লেখক/ লেখিকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

(ভূতুড়ে গল্প)

লামিয়া

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

পুতুলটা কিনে আনার দিনই টিয়ে পাখিটা মরে গেল। অ্যাকুয়ারিয়াম –এর তিন জোড়া গোল্ডফিশ, দু জোড়া এ্যাঞ্জেল আর এক ঝাঁক ব্ল্যাক মলি মরে উলটো হয়ে ভাসতে লাগল। আর ঘোর জ্বরে পড়ল নাসিমা । এসবই হয়তো কোইন্সিডেন্স। তবু মোর্শেদ কেমন গম্ভীর হয়ে ওঠে। অদিতির ফরসা মুখেও মেঘ জমে উঠল। পুতুলটা অবশ্য ভারি সুন্দর । ছোট্ট, হলদে হলদে হাত-পা, লালচে চুল, বড় বড় চোখ, ঢেউ খেলানো বড় বড় পাঁপড়ি; মনির রং গাঢ় নীল। চোখের দৃষ্টি অবশ্য কেমন যেন শীতল, একটানা তাকিয়ে থাকলে শরীর কেমন হিম হয়ে যায় অদিতির ।
গুলশান- এর একটা শপিং মল থেকে পুতুলটা কিনেছিল মোর্শেদ। দিন কয়েক আগের কথা। বিকেলের দিকে অফিস
থেকে বাড়ি ফিরছিল। কী মনে করে গাড়ি ঘুরিয়ে শপিংমলে ঢোকে। খেলনার দোকানটা দোতলায় । বাঁ দিকে । নাম:
‘ম্যারিল্যান্ড গিফটশপ।’ ভিতরে ছোটখাটো মঙ্গোলয়েড চেহারার এক টেকো লোক ছিল। পরনে চক্রাবক্রা শার্ট।
চোখে কালো সানগ্লাস। পুতুলটা দেখাতেই গমগমে কন্ঠে সে বলল, ভেরি নাইস ডল স্যার। থাইল্যান্ডের লামিয়া কোম্পানীর মাল। দশটা এসেছে স্যার। সব বিক্রি হয়ে গেছে। একটাই পড়ে আছে। দাম বারো শ টাকা চাইল। পছন্দ হয়েছে বলে দরদাম করেনি মোর্শেদ। পুতুল দেখে মুনা খুশি হলেও কেমন যেন গুটিয়ে যায়। অদিতিও ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল।

মোর্শেদ মেয়েকে বলেছিল, পুতুলের কী নাম দেবে মা?

তুমি দাও।

না, তুমি দাও। মোর্শেদ আদুরে কন্ঠে বলে।

লামিয়া। অদিতি ফস করে বলে। বলে স্তম্ভিত হয়ে যায়। নামটা ও বলতে চায়নি।

তাহলে কে বলল?

মোর্শেদ অবাক। অদিতি কীভাবে জানল পুতুলটা থাইল্যান্ডের লামিয়া কোম্পানীর?

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল নাসিমা। ও বলে, মামী আমার জ্বর আসতেছে। যা, শুয়ে থাক।
মোর্শেদ একটা পলিথিনের ব্যাগে মরা টিয়া আর মরা মাছগুলি ভরে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে ফেলে । তারপর হাঁটতে হাঁটতে কাছের একটা ফার্মেসিতে যায় অষুধ কিনতে । নাসিমা বেশি দিন জ্বরে পড়ে থাকলে সমস্যা। আদিতির ওপর চাপ পড়বে। এমনিতেই অদিতির মাইগ্রেনের সমস্যা আছে। নাসিমা মেয়েটা ভালোই, দু’বছর ধরে কাজ করছে।

রাত আটটায় একটা দুঃসংবাদ পেল মোর্শেদ। এহসান গ্রুপের এমডি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম ফোন করে জানালেন মগবাজারের প্রজেক্টটা ক্যান্সেল হয়ে গেছে। ‘ইসমত টাওয়ার’ নামে একটি বহুতল হওয়ার কথা ছিল মগবাজারে। প্রায় একশ কোটি টাকার প্রোজেক্ট। মোর্শেদ হতাশ হয়ে পড়ে। এমনিতেই বাংলাদেশের রিয়েল এসটেট মার্কেট ছোট এবং কমপিটিটিভ ।
এভাবে প্রোজেক্ট হাতছাড়া হয়ে গেছে তো আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা !
রাত্রে মোর্শেদ এর ঘুম আসে না। পাশে অদিতি ল্যাপটপ নিয়ে খুটখুট করছিল। ওপাশে মুনা ঘুমিয়ে। ছটফট করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিল মোর্শেদ। অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম চোখে বাথরুম যায়। মাথায় আবছা চিন্তা …
লামিয়া কি অশুভ? ওই পুতুলটা কেনার পরই টিয়ে পাখিটা মরে গেল, অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছগুলিও মরে গেল …আর … এত টাকার প্রোজেক্টটা প্রসপন হয়ে গেল? বাথরুম থেকে বেরিয়ে কী মনে করে বেডরুমের দরজা খুলে ড্রইংরুমে উঁকি দেয় মোর্শেদ । ওপাশের বারান্দায় আলো জ্বলে আছে। ওখানে কে যেন কথা বলছে। দ্রুত পায়ে ড্রইংরুম ক্রশ করে বারান্দায়
চলে আসে মোর্শেদ। বারান্দার মেঝের ওপর মুনা বসে আছে। ওর সামনে লামিয়া। মুনা লামিয়াকে কি যেন বলছে।

এখানে কি করছ বাবা?

আমরা তো খেলছি ।

দেখছো না?

এখন?

হ্যাঁ। আমি তো আম্মুর পাশে ঘুমিয়ে ছিলাম।
লামিয়াই তো তখন আমাকে বলল- চল আমরা খেলি।
মোর্শেদ পিঠের ওপর শিরশিরে অনুভূতি টের পায়। ছ’তলার গ্রিলে দূরন্ত বাতাস আছড়ে পড়ে। বাতাসে পচা গন্ধ। কাছেই গুলশান লেইক। সে ঝুঁকে মুনাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, এখন খেলতে হবে না মা । চল,, এখন ঘুমাবে। চল।
রাতে ভালো ঘুম হল না। একবার মনে হল পুতুলটা গুলশান লেইক-এ ফেলে দিয়ে আসতে । এত রাতে কে দেখবে? একবার
উঠে আলো জ্বালিয়ে পুতুলটা খুঁজল। পেল না। গেল কোথায়? তখন তো বারান্দায় ছিল। মোর্শেদের মনের মধ্যে কেমন এক
আঠালো অস্বস্তি¡ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব কথা কথা সে অদিতিকে জানাবে না ঠিক করে। সকালে গম্ভীর মুখে ব্রেকফাস্ট সারে মোর্শেদ ।
অদিতি বলে, শোন আজ কিন্তু টক দই এনো।
ওকে।
মোর্শেদ অফিসে বেরিয়ে যায়। অফিস কাছেই। গুলশান। অফিসে ফিসফিস। গুঞ্জন। ‘ইসমত টাওয়ার’ নিয়ে আলোচনা চলছে। এগারোটায় এমডির সঙ্গে মিটিং। মোর্শেদ যা বলার বলল। সে আশাবাদী। মগবাজারের কাজটা ক্যান্সেল হওয়ার ব্যাপারটা মোর্শেদ লাভ বা ক্ষতি হিসেবে দেখতে চায় না । লাঞ্চের পর অফিস থেকে বেড়িয়ে পড়ে। কিছু কেনাকাটা আছে। মোর্শেদ- এর বন্ধু আসবে রাতে । সাদী নিউজিল্যান্ডে থাকে । বউ-বাচ্চা নিয়ে মাসখানেকের জন্য দেশে এসেছিল। এ সপ্তাহেই আবার
নিউজিল্যান্ড ফিরে যাচ্ছে। সাদী মোর্শেদের ছোটবেলার বন্ধু। তবে দু’জনার সর্ম্পক মোটেও স্বচ্ছ না। দু’জনার
মধ্যে এক ধরনের রেষারেষি আছে। সাদী বেশিদূর পড়াশোনা করেনি। তবে মোটর পার্টস- এর ব্যবসা করে বেশ টাকা-
পয়সা করেছে। সেসব নিয়মিত ‘শো’ করে সাদী। মোর্শেদ আর্কিটেক্ট । তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষাদীক্ষা আর পরিশীলিত
মনের চাপা অহঙ্কার। নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন শহরে সাদীর নিরিবিলি ছবির মতো বাড়ি। মুনা-অদিতি দের নিয়ে গত
জুনে বেড়িয়ে এসেছিল মোর্শেদ । সাদ-এর বউ শায়লা। শায়লা দামী দামী গয়না দেখিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল অদিতির। সেই থেকে শায়লার ওপর অদিতির ক্ষোভ।

অদিতি শায়লাকে বলে, যেন সর্দি লাগে, সেজন্য সুইমিংপুলে মুনাকে বেশিক্ষণ রেখেছিল শায়লা । এসব কারণে সাদী আর
শায়লার মোর্শেদ- এর ক্ষোভও কম না। তবে মোর্শেদ চাপা স্বভাবের বলেই তা প্রকাশ করে না।
সাদী দেশে এলে ডিনারের ফর্মাল দাওয়াত দেয় ঠিকই, তবে মনে মনে প্রতিশোধের কথাও ভাবে। মোর্শেদের বিশ্বাস অদিতির
সঙ্গে বিয়েটাও ভাঙতে চেয়েছিল সাদী … সেই শপিং মলটা কাছেই। হেঁটেই যাওয়া যায়। মোর্শেদ কী মনে করে ঢুকে পড়ল। মঙ্গোলয়েড চেহারার সেই টেকো লোকটার সঙ্গে কথা বলা দরকার। লামিয়া সর্ম্পকে আরও তথ্য জানতে হবে। সে এক্সেলেটরে চড়ে দোতলায় উঠে এল। তারপর অবাক হয়ে যায়। দোতলায় ‘ম্যারিল্যান্ড গিফটশপ’ নামে কোনও দোকান নেই। কি ব্যাপার? আমার ভুল হয়নি তো? নাহ্, ভুল হবে কেন? দুপাশে সার সার মোবাইল, ঘড়ি আর জুয়েলারির দোকান। একটা দোকানে ঢুকে সেই গিফটশপের কথা জিগ্যেস করল। ওরা বলল, এই জিসান প্লাজায় তারা দু বছর ধরে আছে ।
‘ম্যারিল্যান্ড গিফটশপ’ নামে এখানে কোনও দোকান নেই। কখনও ছিলও না। আর এই শপিংমলে ছোটখাটো মঙ্গোলয়েড চেহারার টেকো লোকও নেই। তাহলে? হ্যালুসিনেশন? মোর্শেদ অবশ বোধ করে । ধীরেসুস্থে বেরিয়ে আসে শপিং মল
থেকে। কথাটা অদিতিকে জানাবে না ঠিক করল মোর্শেদ। দুপুরে ল্যাপটপের সামনে বিছানার ওপর উপুর
হয়ে শুয়েছিল অদিতি । একটা হিন্দি গানের ডাউনলোড লিঙ্ক খুঁজছিল। অনেক দিন আগে শুনেছিল। আজই হঠাৎ মনে পড়ল। সার্চ করতেই এমপিথ্রি ফাইলটা পেয়ে গেল। ডাউনলোড বাটনে ক্লিক করে অদিতি। ঠিক তখনই হঠাৎই কথাটা মনে পড়ে যায় ওর। মোবাইল তুলে নিয়ে একটা নাম্বারে ফোন করে।

হ্যালো।

ফৌজিয়া আপা?

আপনি কেমন আছেন?
এদিকে একেবারে আসেনই না। আমরা বড়লোক?
নাকি আপনি বড়লোক? আমাদের একদম ভুলে গেছেন। হ্যাঁ। মুনা কে এ বছরই স্কুল দিলাম। ওর একজন টিউটর লাগবে। তেমন কাউকে পেলে আমাকে একটু জানাবেন, প্লিজ।
ফৌজিয়া আপা বললেন, ইশরাত নামে একটা মেয়ে আছে। বিবিএ পড়ছে। ওকেই একদিন পাঠিয়ে দেব।
ঠিক আছে আপা। বলে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন অফ করে দেয় অদিতি।
ফৌজিয়া আপা মোর্শেদের কাজিন। মহিলা অ্যাডভোকেট। খুবই হেল্পফুল। বিয়েতে মোর্শেদের মা রাজি ছিলেন না।
কারা যেন ফোন করে অদিতির নামে যাতা বলেছিল। তখন ফৌজিয়া আপাই মোর্শেদের মা কে বুঝিয়ে- সুজিয়ে রাজি করিয়েছিলেন।
গানটা ডাউনলোড হয়ে গেছে। গানটা প্লে করতে যাবে- এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। মিস রিফাত। মুনার স্কুলের মিস।
অদিতির ভ্রু কুঁচকে যায়।

হ্যালো।

ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসে- মিসেস তানভীর?
হ্যাঁ। বলুন।
ম্যাডাম। আমরা তো স্কুলে স্টুডেন্টদের পার্সোনাল টয় এলাউ করি না। যদি হারিয়ে যায় …
সো?

আজ মুনার ব্যাগে একটা পুতুল ছিল।
ওহ!
প্লিজ, ফিউচারে এমন যেন আর না হয়।
ওকে আমি দেখব। থ্যাঙ্কস। বলে অদিতি ফোন অফ করে দেয়। ও রাগ টের পায়। মুনা কখন লামিয়াকে ব্যাগে ভরল? ব্যাগ তো আমি গুছিয়ে দিয়েছি। অদিতি বেডরুম থেকে ড্রইংরুমে আসে। নাসিমা কার্পেটের ওপর বসে চাদরমুড়ি দিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। ওর জ্বর এখন কিছু কম। অদিতিই আজ মুনাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। মুনা টিভি দেখছিল। অদিতি রিমোট তুলে টিভির ভলিউম কমিয়ে রাগ সামলে মেয়েকে জিগ্যেস করে,

তুমি স্কুলে লামিয়াকে নিয়ে গিয়েছিলে? সত্যি কথা বল।
মুনা মাথা নাড়ে। বলে, আমি তো, আমি তো লামিয়াকে ইশকুলে নিয়ে যাইইনি। ছত্তি। বলে অদ্ভূত ভঙ্গিতে দুহাত
তুলে নাড়ে মুনা। হাসে।
অদিতি পুতুলটা খুঁজতে থাকে। ওটা পেলে জানলা দিয়ে ফেলে দেবে। পেল না। মুনার ব্যাগে, ড্রইংরুমে। না, কোথাও নেই। অদিতি হতাশ বোধ করে।কি করবে বুঝতে পারে না। সন্ধ্যার পর গেস্ট আসবে। ও রান্নাঘরে ঢোকে । এখন রান্নার আয়োজন করলে মাথা ঠান্ডা হবে। সন্ধ্যার পর মোর্শেদ ফেরে। নাসিমা দরজা খুলে দেয়। মুনা সোফার ওপর ঘুমিয়ে ছিল। অদিতি কিচেনে ছিল। কলিংবেলের শব্দ শুনে ও কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। মোর্শেদের হাতে লামিয়াকে দেখে অবাক হয়।
অস্ফুটস্বরে বলে,ওমাঃ ওটা তুমি কই পেলে?
নীচে। গ্যারেজে। গাড়ি পার্ক করে লিফটে ওঠার সময় দেখলাম।
আর আমরা খুঁজে পাইনি।
ও। বলে পুতুলটা সোফায় রাখে মোর্শেদ ।
রাত আটটার মতো বাজে। অদিতি কিচেনে ফ্রাইপ্যানে কাবাব ভাজছিল । শশা আর টমাটো কাটছিল নাসিমা । বোরহানীটা মোর্শেদই বানাবে। এরই মধ্যে মসলা মিক্স করে ফেলেছে সে। মুনার ঘুম ভেঙেছে। ড্রইংরুমের সোফায় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে চিপস খাচ্ছে। আর কার্টুন দেখছে। উলটো দিকে সোফার ওপর লামিয়া। মুনার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়েছিল। রাত নটার দিকে সাদীরা এল। ওদের একটাই ছেলে। সিয়াম। সিয়াম মুনারই সমবয়েসি। ড্রইংরুমের সোফার ওপর লামিয়াকে দেখেই ‘আমি এটা নেব‘ ‘আমি এটা নেব’ বলে চেঁচাতে থাকে সিয়াম ।
ঠিক আছে সিয়াম। আমি এটা তোমায় গিফট করলাম। বলে মোর্শেদের দিকে তাকায় অদিতি । অদিতির চোখে চাপা কৌতূক।
শায়লা বলে, না, না অদিতি। ওটা তো মুনার।
ইটস ওকে। মুনার আরও আছে। এটা আমাদের সিয়ামসোনার। বলে মোর্শেদ
আড়চোখে অদিতির দিকে তাকায়। সমস্যার এত সহজ সমাধান ভাবতেও পারেনি সে। আজ যখন নীচের গ্যারেজে লামিয়াকে দেখল তখন একবার মনে হল ওটাকে গুলশান লেইক- এ ফেলে আসতে। তখন বড় টায়ার্ড লাগছিল
বলে যায়নি। সিয়াম লামিয়াকে নিয়ে যাবে । এতে মুনা কে মোটেও ঈর্ষান্বিত মনে হল না। বরং মুনা হাসছিল। নাসিমাও
খুশি বলে মনে হল। অদিতিও। পরদিনই মোর্শেদ নীলক্ষেত থেকে একটা টিয়া পাখি কিনে আনে। তার পরের দিন অ্যাকুয়ারিয়াম-এর জন্য মাছ কিনে আনে। গোল্ডফিশ, অ্যাঞ্জেল, ব্লু গোরামিন আর ব্ল্যাক মলি। মোর্শেদ আর অদিতির মুখ আনন্দে ঝলমল করে। ওদের একটা মেগা স্ক্রিনের প্লাজমা টিভি কেনার শখ ছিল। প্যানাসনিক-এর শোরুমে গিয়ে টাকা দিয়ে এল মোর্শেদ। মডেল অবশ্য অদিতিই পছন্দ করল । তারপর লোকজন এসে বিশাল জিনিসটা বেডরুমে ফিট করে দিয়ে গেল। ওদের আনন্দ দেখে কে! এহসান গ্রুপের এমডি ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম ফোন করে কক্সবাজারে দেড় শ কোটি টাকার একটা প্রোজেক্ট এর কথা জানালের। ইনানী বিচে হোটেল কমপ্লেক্স হবে। কথাটা অদিতিকে জানাতেই ও নেপালে ছোট্ট একটা ট্রিপের আবদার করে । অবশ্যই। ছোট্ট করে বলে মোর্শেদ। ফেসবুকে শায়লার সঙ্গে অনেক দিন ধরেই
চ্যাট করে আদিতি। গতকাল শায়লা লিখেছে … আমার বাড়িতে ভূতের আছর হইছে জান। সকালে ফ্রিজ খুলে দেখি সারারাত কারেন্ট অফ ছিল। মাছমাংস শাকসবজি সব পচে গেছে। এমন তো হওয়ার কথা না। শখ করে গত মাসে একটা ক্যানারি পাখি কিনছিলাম। পাখিটা মরে গেল। একুয়ারিয়ামের মাছগুলি মরে উলটে ভাসতে লাগল। সাদী ধুম জ্বরে পড়ল। চারিপাশে কি যে শুরু হইল অদিতি । সিয়াম আজকাল ঠিক মতো ঘুমায় না। খালি পুতুল নিয়ে খেলে।
অদিতি অবাক হলেও মুখ টিপে হাসে। এক ধরণের আনন্দ বোধ করে। শায়লার লেখা কপি করে মোর্শেদের মেইল এ পোস্ট
করে ‘সেন্ড’ করে।সেদিন বিকেলে ল্যাপটপের সামনে বিছানার ওপর উপুর হয়ে শুয়েছিল অদিতি । একটা জাপানি হরর মুভির ডাউনলোড লিঙ্ক খুঁজছিল। অনেক দিন আগে দেখেছিল। আজ মনে পড়ল। টরেন্ট ফাইল পেল। এখনও টরেন্ট ফাইল ডাউনলোড করতে পারে না অদিতি। বুকমার্ক করে রাখল। রাতে মোর্শেদকে বলবে ডাউনলোড করে দিতে। নাসিমা লেবু চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
দে। অদিতি বলে।
নাসিমা বলে, মামী?
কি? দেশে ফোন করবি? কর।
না। তাহলে?
হেই পুতুলডা বাড়ি থেইকা যায় নাই মামী।
কি বলিস তুই। চায়ের কাপ রেখে ধড়মড় করে উঠে বসল অদিতি।
হ। যায় নাই।
যায় নাই মানে কী! ফাইজলামি করিস? যাঃ ভাগ। অদিতির ফরসা মুখটা গনগনে হয়ে উঠেছে। নাসিমা মুখ কালো করে চলে যায়। অদিতির শরীর শিরশির করতে থাকে। নাসিমা কি বলল? জ্বরের ঘোরে মাথা ঠিক নেই। হেই পুতুলডা বাড়ি থেইকা যায় নাই । এর মানে কি? আজকাল অবশ্য মুনার দিকে তাকালে শরীর কেমন হিম হয়ে যায়। মেয়েটার চোখের মনির রং বদলে যাচ্ছে। কথাবার্তাও কেমন কমে গেছে। তা বলে … অদিতি কী করবে বুঝতে পারে না। অদিতির মোবাইল বেজে ওঠে। নকিয়াটা তুলে অদিতি বলে, হ্যালো।
হ্যালো। আমি ইশরাত ।
ফৌজিয়া আন্টি আমাকে আপনার সেলনম্বর দিয়েছেন।
ও হ্যাঁ।
আমি কখন আসব?

অদিতি বলে, কাল সকালে আসতে পারবে? কাল তো ফ্রাইডে। আমার হ্যাজব্যান্ড ঘরে থাকবে। ওই সব ফাইনাল করবে।
ওকে। আমি কাল সকাল নটার মধ্যেই চলে আসব।
ওকে। থ্যাঙ্কস।
ভালোই হল। ইশরাত মেয়েটা মুনাকে পড়াবে। মুনাকে নিয়ে পড়ানোর সময় হয় না অদিতির । টিভি, ফেসবুক আর রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া অদিতি ইদানীং একটা বাংলা ব্লগে ‘বিষন্ন অনাদৃতা’ নামে কবিতা লিখে প্রায়ই পোস্ট
করে। এমন কিছু না, দূর্বল কবিতা, তবে মেয়ে বলেই সম্ভবত প্রচুর মন্তব্য পড়ে। মন্তব্য পড়ে শরীর আনন্দে শিরশির করে। যেমন জাপানপ্রবাসী ব্লগার ‘পথহারা পথিক ২’ মন্তব্য করেছে: ‘আপনার কবিতা আমার এই ধূসর প্রবাসজীবনের আলোর দিশারী’। এসব কারণে ব্লগ এখন প্রায় নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে অদিতির । পরদিন সকালে ইশরাত এল। অদিতিই
দরজা খুলে দিল। সবুজ ওড়না আর সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা শ্যামলা সুশ্রী মেয়ে। দেখলেই ভালো লাগে। চোখে ছোটচারকোণা চশমা ।
এসো বস। ইশরাত সোফায় বসে। উলটো দিকে সোফায় মোর্শেদ বসে ছিল। এতক্ষণ খবরের কাগজ পড়ছিল সে । অন্যদিন সময় পায় না। শুক্রবার সকালেই যা একটু খবরের কাগজ পড়া হয়। সে ইশরাতকে দেখে মাথা নাড়ে। মিষ্টি করে হাসে। মুনা ওর বাবার গায়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে ছিল।
মুনাকে দেখিয়ে অদিতি বলে, এই হল তোমার ছাত্রী ।
ইশরাত বলে, বাহ্। কী কিউট!

তারপর হেসে জিগ্যেস করে, কি নাম তোমার? মুনা চুপ করে থাকে।
বল, নাম বল। অদিতি বলে।
আমার নাম লামিয়া।
মুনার কথা শুনে মোর্শেদ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে …

লিখেছেন : ইমন জুবায়ের

(ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

মূর্তি ( ভৌতিক পিশাচ গল্প )

4

শফিকের কয়েকদিন অফুরন্ত অবসর । রিজিয়া গত কিছুদিন আগে বাপের বাড়ি যাওয়াতে ,পাচটায় অফিস ছুটির পর বাজার করার ঝামেলা নাই। তাই অফিস থেকে ফিরে কাপড় পাল্টে বের হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম শহরটা এখনও ঢাকার মত অতটা ব্যাস্ত হয়ে উঠেনি। পাহাড়ের আড়ালে-আবডালে শুয়ে থাকা শহরটা ঢাকার তুলনায় অনেকটা শান্ত। ইদানিং শফিক অফিস ছুটির পর একা একা উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে হাটে আর দু চোখ দেখে শহরের শান্ত সৌন্দর্য।
ওয়াসার মোড় থেকে আলমাস সিনেমার দিকে যেতে পথে হাতের বাম দিকে সি এন জি ষ্টেশনের পাশে দোকানটা । অনেক দিনের পুরাতন রঙ চটে যাওয়া সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা “পুরাতন সামগ্রীর দোকান” নীচে ছোট্ট করে লেখা এখানে বিভিন্ন প্রকার পুরাতন সৌখিন সামগ্রী পাওয়া যায়।
শফিক হাটতে হাটতে রাস্তার অপর পার থেকে সাইন বোর্ডটা পড়ল। এই পথ দিয়ে অনেক বার আসা যাওয়া করেছে তখন দোকানটা চোখে পড়লেও কখনও ঢু মেরে দেখা হয়নি। আজ কৌতুহলী হয়ে রাস্তা পার হয়ে দোকানটাতে ঢুকল।
দোকানে ঢুকতেই পুরোনো জিনিসের গন্ধটা নাকে আঘাত করল। শফিক গন্ধটা নাকে সামলে নিয়ে দোকানের ভিতরে এসে দাড়াল। বেশ বড় দোকান । দোকানে বেশির ভাগই আসবাব পত্র । নকশা করা চেয়ার ,টেবিল ,পালংকে ভর্তি । বেশ বড় কয়েকটা আলমারী ও আছে। দোকানের কাউন্টারের পিছনের তাকে সারি সারি সাজানো আছে কাচের জিনিস পত্র। কয়েকটা কাঠের মুখোশও আছে। মুখোশগুলো অদ্ভুত সুন্দর ।
শফিক কাউন্টারের সামনে গিয়ে মুখোশটা চাইল। মধ্যে বয়স্ক সেলসম্যান মুখোশটা শফিকের হাতে দিল। শফিক মুখোশটা উল্টে-পাল্টে দেখে মুখে লাগাল ,এরপর আয়নার সামনে এসে দেখতে লাগল। আয়নায় মুখোশ পড়া চেহারা দেখতে দেখতে হটাৎ আয়নার ভিতর দিয়ে ওর পিছনে একটা মূর্তি দেখতে পেল। অপূর্ব সুন্দর একটা নারী মূর্তি। মুখোশটা খুলে পিছনে ফিরে দেখল ছোট্ট একটা আলমারীর উপর মূর্তিটা। মুখোশটা সেলসম্যানের হাতে দিয়ে ,মূর্তিটার সামনে এসে দাড়াল। প্রায় এক ফুট লম্বা অপুর্ব সুন্দর চেহারার নারী মূর্তি। পরনে নীল রংয়ের শাড়ী আকা। কপালে লাল রংয়ের গোল টিপ আকা ।সামনে বাম দিকে ভরাট বুকের উপর লম্বা ঘন চুলগুলো কোমর পর্যন্ত ছড়ানো। হালকা ত্রি-ভংগীমায় দাড়ানো, মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি, মদিরা দৃষ্টিতে কেমন যেন রহস্যময় আহ্ববান।
শফিক মুর্তিটার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল।
ঃ নেবেন নাকি মূর্তিটা ?
সেলস ম্যানের কথায় শফিকের ধ্যান যেন ভাংগল। জিঘ্গাসা করল মূর্তিটা কোথাকার ?
ঃ তা বলতে পারি না । পুরাতন ভাংগা জিনিস-পত্র বেচে এমন দোকান থেকে সংগ্রহ করেছি ।
ঃ সেলস ম্যান মুর্তিটা আলমারীর উপর থেকে নামিয়ে শফিকের হাতে দিয়ে বলল আর যাই বলুন মুর্তিটা যেই বানিয়েছে, সে খুবই দক্ষ কারিগর এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।
শফিক হালকা মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করল ।
ঃশফিক মুর্তিটা কিনে নিয়ে এল। এনে শোয়ার ঘরের ড্রেসিং টেবিলে রেখে দিল। রেখে মুর্তিটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে ভাবল’ এটা যদি এক ফুট না হয়ে যদি মানুষ সমান হত তাহলে যে কেউ জীবন্ত নারী ভাবত।
বেশি চিন্তা করার সময় পেল না হঠাৎ মনে পড়ে গেল কাল রিজিয়া বাবার বাড়ি থেকে চলে আসবে। ঘরে কোন বাজার নাই । বাজারে যেতে হবে নিজের জন্য রাতের খাবার রান্না করতে হবে।
বাজার করে রান্না করে খাওয়া দাওয়া করতে প্রায় রাত বারটা বেজে গেল। কাল আবার অফিসে যেতে হবে । সে তাড়তাড়ি শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল আজকে কেনা নারী মুর্তিটার কথা । কাল রিজিয়া এসে মুর্তিটা দেখলে খুব খুশি হবে। ওর মত খুত খুতে মেয়েও বলতে বাধ্য হবে এরকম শো পিস হাজারেও একটা পাওয়া যায় না।
শফিকের ঘুম পাতলা , তাই ঘরের ভিতর হালকা ধুপ করে শব্দ হতেই ঘুমটা ভেংগে গেল। মাত্র কিছুক্ষন আগে দুচোখে গভীর ঘুম জড়িয়ে এসেছে তাই, হঠাৎ ঘুম ভেংগে যাওয়ায় বুঝে উঠতে পারছে না কিসের শব্দ হল। ডিম লাইটের হালকা নীলাভ আলোয় ডুবে আছে রুমটা। দুচোখ খুলে কান পেতে থাকল আবার কোন শব্দ শোনা যায় কিনা । না শব্দ আর শোনা যাছ্ছে না। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করল, বেলী ফুলের তীব্র ঘ্রানে পুরো ঘরটা ভরে গেছে । শফিক অবাক গেল । দুচোখে লেগে থাকা ঘুমের রেশ চট করে কেটে গেল । ওর সব ইন্দ্রয় পূর্ণ সজাগ হয়ে গেল । এই সময় ঘরের ভেতর শুনতে পেল নারীর হাতের চুড়ির আওয়াজ। আস্তে করে বালিশ থেকে মাথা তুলে ড্রেসীং টেবিলটার দিকে তাকাতেই দেখল টেবিলটাকে আড়াল করে আছে এক নারী। গাঢ় নীল রংয়ের শাড়ি পড়া, ঘন কালো লম্বা চুলের গোছা সামনে ভারী বুকের উপর বিছানো। দুহাতে স্বর্ণের বালা, গলায় স্বর্ণের বিশাল একহার যা বুকের গভীর উপত্যকাকে প্রায় ঢেকে রেখেছে । ত্রি-ভংগিমায় দাড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিট হাসছে। নারীটাকে দেখা মাত্রই শফিকের কলজেটা ধক করে বুকের পাজরে সজোরে ধাক্কা খেল । ভয়ে নয় নারীর অসহ্য অপরুপ রুপের কারনে। কোন নারী এত রুপসী হতে পারে ভাবাই যায় না । যেন কোন গুনি শিল্পী নিজ হাতে আপন মনে বানিয়েছে অপার্থিব সৌন্দর্য দিয়ে। ও প্রায় লাফ মেরে শোয়া থেকে উঠে বসল।
ঃ কে আপনি ? কোথ্থেকে এসেছেন ? কিভাবে এসেছেন ? কেন এসেছেন ?
নারীটি এতক্ষন শফিকের কার্যকলাপ দেখছিল। যা সে প্রতিবারই উপভোগ করে।
নারীটি এবার নড়ে উঠল। বুকের উপড় বিছানো চুল গুলো পিছনে ছড়িয়ে দিল। নারীটি নড়ে উঠাতেই সারা কামরায় বেলী ফুলের তীব্র ঘ্রানে ভরে গেল। এতে শফিকের মাথার ভিতরটা কেমন যেন ফাকা হয়ে গেল। নারীটির গভীর কাজল কালো চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মোহীত হয়ে পড়ল। নারীটি যেন বাতাসে ভেসে এল। শফিকের সামনে এসে বসল।
নারী বললঃ আমি কুন্তলা । ভাওয়াল জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায়ের প্রিয়তমা স্ত্রী ।
শফিক কম্পিত স্বরে বলল ঃ আপনি এখানে কেন এসেছেন ?
মেয়েটি কোমল হাতে শফিকের হাত দুটি ধরে বলল “আমি আসিনি”তুমিই আমায় এনেছ। আজ তুমি যে মুর্তিটা কিনে এনেছ সেই-ই আমি।
শফিক নিজের অজান্তেই হা হয়ে গেল।
ঃ আমি এখানে কেন এসেছি সেই কথা জানতে চাও ? শোন তাহলে ।
আমি চারশো বছর আগে এই দেহে এই রুপে ভাওয়ালরের জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায়ের প্রিয়তমা স্ত্রী ছিলাম। জমিদার আমাকে খুব ভালবাসত আমিও জমিদারকে খুব ভালবাসতাম । তখন পৃথিবীটাকে মনে হত স্বর্গ । সে আমাকে ছেড়ে এক দন্ডের জন্য কোথাও যেত না । এই কারনে ওর আত্মিয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব সব দুরে সরে গেল। জমিদার এতে এতটুকুও বিচলিত হলো না। কারন তার রাত-দিনের ধ্যান এ ধারনা ছিলাম আমি শুধু , আমি কুন্তলা।
কিন্তু এত ভালবাসা এত সুখ বেশি দিন থাকল না । হঠাৎ করে আমি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলাম । সেই ব্যাধিতে আমার রুপ-লাবন্য সব হারিয়ে গেল। আমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম । আমার এই অবস্থায় কৃষ্ণকান্ত রায় পাগলের মত হয়ে গেলেন দেশ বিদেশের যত হেকিম কবিরাজ ছিল সবাইকে এনে দেখাতে লাগল। ওরা সবাই এসে নিরাশার কথাই বলত। এর মধ্যে একদিন কে যেন বলল মুণি-ঋষিদের দেখাতে জমিদার তাও করল। আরেকদিন আরেকজন বলল পীর-দরবেশ দেখাতে । তাও দেখানো হল । এত কিছুর পরও কিছুতেই কিছু হল না। মৃত্যুর দুয়ারে আমার এগিয়ে যাওয়া কিছুতেই থামানো যাছ্ছেনা। আমার জন্য এসব করতে যেয়ে কৃষ্ণকান্ত রায় তার জমিদারীর বেশির ভাগ খরচ করে ফেলল। এসব নিয়ে দৌড়াদৌড়ি আর চিন্তা করতে যেয়ে নিজেও অসুস্থ হয়ে যেতে লাগল । তারপর সে ক্ষ্যান্ত দেয়নি । সারাদিন আমার চিকিৎসার জন্য ছুটে বেড়াতেন রাত হলে আমার পাশে বসে আমাকে সান্তনা দিতেন ঃ কুন্তলা তোমাকে আমি যে করে হোক যমের কাছ হতে ফিরিয়ে আনবই । কোন শক্তিই তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা । তুমি চলে গেলে আমি কাকে নিয়ে বাচব ?
আমি শুনতাম আর দুচোখের জল ফেলতাম । এভাবেই কাটছিল আমাদের বিষাদের বিদায়ি দিন গুলো ।
এর মধ্যে একদিন কৃষ্ণকান্ত রায়ের এক দারোয়ান এসে বললঃ মহাশয় যদি অভয় দেন তাহলে আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।
ঃ বল।
ঃ আমাদের গ্রামে এক কাপালিক আছে অদ্ভুত তার চিকিৎসা পদ্ধতি। কিন্তু ধনন্তরি । ওর কাছে গিয়ে কেউ ভাল হয়নি এমনটা শুনিনি। আপনি যদি চান তাহলে…….।
দারোয়ানের কথা শুনে জমিদার যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন ।
ঃ এতদিন এই খবরটা দিসনি কেন ? আমি পাগলের মত পথে প্রান্তরে দৌড়াছ্ছি আর তুই মজা দেখছিলি।
জমিদারের রাগ দেখে দাড়োয়ান কাপতে কাপতে বললঃ মহাশয় অপরাধ নেবেন না ওর চিকিৎসা পদ্ধতি একটু অন্য রকম বলে আপনাকে এতদিন ভয়ে বলিনি।
সেদিনই কাপালিককে নিয়ে আসা হল। প্রায় ছয় ফুট লম্বা কালো রংয়ের হ্যাংলা পাতলা দেহের মানুষ। মাথা ভরা কোকড়া চুল ,চোখ দুটো টকটকে লাল ।
কাপালিককে আমার কামরায় নিয়ে আসা হল । সে আমার পাশে এসে দাড়িয়ে কিছুক্ষন আমাকে নিরক্ষণ করল । তারপর আমার দুই চোখের মাঝখানে বাম হাতের বুড়ো আংগুলটা চেপে ধরে অনুচ্চস্বরে কি যেন পড়ল । তারপর আমার কামরা থেকে সোজা বের হয়ে গেল। জমিদার আমার অন্য পাশে দাড়িয়ে ছিল। কাপালিকের সাথে সাথে সেও বের হয়ে গেল।
জমিদার উৎকন্ঠা নিয়ে জিগ্গাসা করল।
ঃ কাপালিক কেমন দেখেছ ?
ঃ কর্তা এই রোগীকে পৃথিবীর কেউ বাচাতে পারবে না ।
কাপালিকের কথা শুনে জমিদার কৃষ্ণকান্তর আশা জাগা মুখখানিতে কে যেন কালো ছোপ একে দিল।
সেদিন রাতে জমিদার আর আমার কাছেও এল না। সারারাত চিলেকোঠায় বসে কাটিয়ে দিয়েছে। দাসীদের জিগ্গাসা করলামঃ তোদের জমিদার বাবু কোথায় ?
ঃ কর্তা বাবু চিলে কোঠায় চুপচাপ বসে আখি জল বিসর্জন করছেন।
আমারও দু আখিতে নেমে এল নোনা জলের ধারা।
সেদিন মধ্য রাতে আবার সেই দারোয়ান এল। জমিদার বাবুকে বললঃ কর্তা কাপালিক এসেছ , আপনার সাথে একান্তে কথা বলতে চায় ।
কাপালিক আসার কথা শুনে জমিদার খুশি হয়ে গেলেন। মনে করলেন কাপালিক হয়ত এমন কোন ঔষধ পেয়েছে যার দ্বারা আমাকে বাচানো যাবে।
ঃ ওকে এই চিলেকোঠায় নিয়ে এস।
দারোয়ান কাপালিককে চিলে কোঠায় পৌছে দিয়ে চলে যেতেই জমিদার জিগ্গাসা করলঃ বল কাপালিক কোন আশার বাণী আছে কিনা।
ঃ না জমিদার তেমন কোন আশা বাণি নাই তবে………
এইটুকু বলে কাপালিক চুপ হয়ে যেতেই জমিদার বললঃ থামলে কেন বল।
ঃ কর্তা আপনি যদি চান বউঠাকরুন কে অন্য ভাবে বাচিয়ে রাখা যায়।
জমিদার কাপালিকের কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন , “অন্য ভাবে মানে ?
ঃঅন্য ভাবে বলতে বউ ঠাকরুন বেচে থাকবেন , তবে এই দেহে নয়। অন্য জায়গায়।
ঃ কাপালিক বুঝিয়ে বল কারন আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না ।
ঃ কর্তা প্রথমে নিয়ম মত ঠিক বউ ঠাকরুনের মত একটা মুর্তি বানাতে হবে।তারপর সেই মুর্তিতে বৌ-ঠাকরুনের আত্মাকে একটা যগ্গের মাধ্যমে দেহ থেকে বের করে অধিষ্ঠান করাতে হবে।
ঃ কিন্তু তাতে কি হবে ? আমিতো ওকে এই রক্ত মাংসের জীবন্ত নারী হিসেবে পাব না।
ঃনা কর্তা পাবেন , তবে তা সব সময়ের জন্য নয়।
ঃতাহলে ……..
ঃ প্রতি বার বছর পর পর শুধু এক রাতের জন্য বৌ ঠাকরুনকে পাবেন, অপুর্ব সুন্দরী সুস্থ-স্বাস্থ্যবান প্রান চান্চল্য ভরপুর নারী হিসেবে । যে নারী আপনাকে সারা রাত দেবে স্বর্গসুখের অনুভূতি। কিন্তু ……
ঃ কিন্তু কি ?
ঃ যেই দিন বার বছর পার হবে সেইদিনই উনার পান করার জন্য একজন যুবকের দেহের তাজা রক্ত লাগবে। যদি যুবকের রক্ত না পায় তাহোলে আগামী বার বছর পর বৌ-ঠাকরুন আর দেহ ধারন করতে পারবে না।

কাপালিকের কথা শুনে জমিদার কৃষ্ণকান্ত হতভম্ব হয়ে গেলেন । কাপালিক জমিদারের অবস্থা দেখে বললঃ কর্তা এ ছাড়া বৌ-ঠাকরুনকে বাচানোর আর কোন উপায় নাই । আপনি ভেবে-চিন্তে আমাকে খবর দেবেন।
জমিদার সারারাত আর ঘুমাতে পারল না। পরদিন সকালে কাপালিককে ডেকে পাঠাল। কাপালিক জমিদারের আদেশ পেয়ে দুই দিনের মধ্যে ঠিক আমার মত দেখতে এক ফুট লম্বা এই মূর্তিটা বানাল।
অমাবশ্যার রাত। নিকষ কালো অন্ধকারে সারা পৃথিবী ডুবে আছে। অপার্থিব ফিসফিস শব্দ বাতাসের সাথে মিশে হাহাকার করে উঠছে নির্জন প্রান্তর , শ্মশান আর ছাড়া বাড়ির পরতে পরতে। সেইদিন মধ্য রাত পেরিয়ে গেলে জমিদার বাড়ি থেকে বের হলাম আমরা তিনজন। কাপালিক, জমিদার ও আমি । আমি অসুস্থ তাই জমিদার কৃষ্ণকান্ত আমাকে পাজাকোলা করে নিয়েছে। আমরা তিনজন চলছি শ্মশানের দিকে। কাপালিকের এক হাতে একটা হ্যারিকেন অন্য হাতে দুইটা দড়িতে বাধা দুটি ছাগল একটি সম্পূর্ন সাদা একটি সম্পূর্ন কালো , আর কাধে একটা ঝোলা। চারদিক নিকষ কালো অন্ধকার হারিক্যানের আলোকে যেন চেপে ধরেছে। কতক্ষন মেঠো পথ কতক্ষন জমির আইল উপর দিয়ে হাটতে হাটতে এক সময় নদীর পাড়ে এক শ্মশানে এসে পৌছলাম।
আমাকে এনে শ্মশানের মধ্যখানে আগে থেকে রাখা একটা খাটিয়ার শোয়ানো হল। খাটিয়ার চারপাশে মাটির প্রদীপ জ্বালানো হল। প্রদীপগুলো শিয়ালের চর্বিতে জ্বলছে। কাপালিকের কাধে ঝোলানো থলে থেকে মাটির মুর্তিটা বের করে আমার মাথার দিকে রাখল। এরপর খাটিয়া থেকে অনেকটা দুরে মাটিতে একটা গোল দাগ দিয়ে জমিদারকে বললঃ আপনি এখানে বসে থাকুন সাবধান যাই কিছু ঘটুক এই গোল দাগ থেকে বের হবেন না । এখান থেকে বের হলে আপনার মৃত্যু অনিবার্য ।
তারপর সাদা পাঠাকে আমার মাথার দিকে আর কালো পাঠাটাকে আমার পায়ের দিকে বাধল।
এরপর ঝোলা থেকে নানা ধরনের উপকরন বের করে সাজিয়ে রাখল । সাজানো শেষ করে এবার মন্ত্র পড়া শুরু করল। কাপালিক মন্ত্র পড়া শুরু করতেই স্মশানের শান্ত আবহাওয়াটা হঠাৎ করে বদলে গেল । চারদিক থেকে শো শো শব্দে হিমেল বাতাস শ্মশানের বুকে আছেড়ে পড়তে লাগল ।
অমাবশ্যার নিকষ অন্ধকারের আরও অন্ধকার যেন ছেয়ে গেল । চারদিক থেকে অশরীরি আত্মারা এসে আমার পাঠখড়ির মত দেহটাকে ছিড়ে-ফেড়ে খাওয়ার জন্য অপার্থীব চিৎকার দিতে লাগল। না পেরে ওরা জমিদারকে দেখে ওদিকে এগিয়ে গেল। জমিদার কাপালিকের মন্ত্র পড়া গোল দাগের ভিতর থাকায় কিছুই করতে পারল না ।
কাপালিক মন্ত্র পড়তে পড়তে আমার মাথার দিকের সাদা ছাগলটা জবাই করে রক্তটুকু একটা পাত্রে নিল তারপর কালো ছাগলটা জবাই করে আগের পাত্রে এর রক্তটুকু ও নিল। ছাগল গুলো জবাই করে রক্ত নেওয়ার পর কাপালিক যখন মৃত দেহগুলো ছুড়ে ফেলে দিল তখন পিচাশ আত্মাগুলো ছাগলের দেহ মাটিতে পড়ার আগেই শূণ্য থাকতে ছিড়ে-ফেড়ে খেয়ে ফেলল।
কাপালিক রক্তের পাত্রে আরও কিছু উপকরন মিশিয়ে নিল। তারপর আমার মাথার চুল ধরে এক টান দিয়ে, আমি ছয় মাসের রোগীকে খাড়া করে ধরল । এরপর পাত্রের রক্ত গুলো মন্ত্র পড়তে পড়তে আমার মাথার উপর ঢেলে দিল। আমার গায়ে রক্ত পড়ার সাথে সাথে আমার মনে হল আমি সম্পূর্ন সুস্থ হয়ে গেছি । আমার দেহে যেন অসুরিক শক্তি ভর করল । কাপালিকের হাত থেকে ছুটার জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগলাম । কিন্তু কাপালিকের শক্তির সাথে পেরে উঠলাম না। কাপালিক এবার উচ্চ স্বরে মন্ত্র পড়তে পড়তে হঠাৎ করে থেমে গেল। এবার বললঃ কুন্তলা বের হয়ে আয় । কুন্তলা বের হয়ে আয় ।
আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমার আত্মাটা আমার দেহ থেকে বের হয়ে যাছ্ছে । তারপর আত্মাটা দেহ থেকে বের হতেই , কাপালিক আমার দেহটাকে ছুড়ে ফেলে দিল। পিচাশরা আমার আত্মাবিহীন দেহটা পেয়ে সাথে সাথে টুকরা টুকরা করে খেয়ে ফেলল। আমি সবই দেখতে পাছ্ছিলাম কিন্তু কিছুই করতে পারিনি । কাপালিকের মন্ত্র বলে আমি হয়ে গেছি কাপালিকের দাসি। আমার আত্মাটা একটা অদৃশ্য দৈহিক আকৃতি নিয়ে কাপালিকের ডান হাতের মুঠায় ধরা ছিল । কাপালিক এবার একহাত আমার আকৃতির মুর্তিটা বাম হাতে নিল। মন্ত্র পড়তে পড়তে মূর্তিটা আমার আত্মার সাথে ধরতেই আমি মুর্তিটার অভ্যন্তরে বন্দি হয়ে গেলাম। আমি মুর্তির ভিতর প্রবেশ করতেই চারদিকের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে গেল। পিচাশ আত্মাগুলো চলে গেল।
কাপালিক এবার তার জিনিসপত্র গুলো থলেতে ভরে , থলেটা কাধে ঝুলিয়ে নিল। তারপর জমিদারের দিকে এগিয়ে গেল । দেখতে পেল জমিদার কৃষ্ণকান্ত ভয়ে বেহুশ হয়ে গোল দাগের ভিতর পড়ে আছে। কাপলিক এক হাতে মুর্তি অন্য হাতে জমিদারকে কাধে নিয়ে শশ্মান থেকে বের হয়ে গেল।
সকালে মুর্তিটা জমিদারের হাতে দিয়ে বলল, “কর্তা, এই নিন বৌ-ঠাকরুনকে । মনে রাখবেন ঠিক বার বছর পর পর বৈ-ঠাকরুন এক রাতের জন্য দেহ প্রাপ্ত হবেন এবং সেই রাতে, উনার জন্য অবশ্যই একজন যুবকের দেহের রক্ত লাগবে। এরপর কাপালিক চলে গেল ।
এই ঘটনার কয়েক বছর পর জমিদার কৃষ্ণকান্ত আমার বিরহে পাগল হয়ে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল। সারা বাড়ি আগুনে পুড়ে গেলেও আমার কিছুই হল না কারন আমি জমিদসারের হাতে ছিলাম। এর কিছুদিন পর জমিদার কৃষ্ণকান্ত মারা গেল। এরপর আমাকে তার এক আত্মিয় পায় । আমার এই ব্যাপারটা এতই গোপনে হয়েছিল যে কেউই জানত না। আত্মিয়টা আমার মুর্তিটাকে খেলার পুতুল মনে করে তার মেয়েকে দেয় । তার মেয়ে বড় হয়ে বিয়ের পর আমাকে সাথে করে তার শ্বশুর বাড়ি যায়। সেখানে এক বছর পর আমার বার বছর পূর্ণ হয় । বার বছর পূর্ণ হওয়ার দিনই আমি রক্ত-মাংসের দেহ ধারন করে , তার যুবক স্বামির রক্ত পান করি।
সেই হতে চারশ বছর পর আজ আমি তোমার ঘরে । গতবারের পর আজই আমার বার বছর পূর্ণ হয়ে আজ দেহ ধারন করার রাত । তাই আজ যেভাবেই হোক আমার জীবিত মানুষের রক্ত পান করতে হবে। তানা হলে আগামী বার বছর পর আমি আর দেহ ধারন করতে পারব না। এসো প্রিয় আজ তুমি আমাকে জীবন দান করবে।
অপরূপ সুন্দরী নারীটি শফিককে বুকে টেনে নিল।

পরদিন রিজিয়া বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এসে দেখকে বিছানায় শফিকের রক্তাত্ত লাশ আর ড্রেসীং টেবিলের উপর অপরূপ সুন্দর একটি নারী মুর্তি ।

( আমার এই লেখাটি ২০০৫ সালের জুন মাসের সংখ্যা ” রহস্য পত্রিকায় ” ছাপা হয়েছিল । এটি আজকে একটু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ব্লগে পোষ্ট করলাম। )

বলয়

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছিলাম যেদিন আমি জেলখানায় ফাঁসির আসামী সুলেমান এর সাথে শেষ দেখা করতে গেলাম। সুলেমানের ব্যাক্তিগত উকিল আমি। তাই প্রতিবার মামলা চলার সময় আমাকে সুলেমান এর সাথে দেখা করে মামলা নিয়ে আলোচনা করতে হত। সেই থেকে সুলেমান এর সাথে আমার বন্ধুত্ব। কি? ভাবছেন কিভাবে একজন ফাঁসির আসামীর সাথে আমার মত একজন উকিলের বন্ধুত্ব হতে পারে? ফাঁসির আসামী হতে পারে- খুন করতে পারে সে- কিন্তু তার ভেতর বাস করে একজন অন্যরকম মানুষ। এই ভেতরের মানূষটাই আমাকে টেনেছিল। দীর্ঘ দুই বছর ওর সাথে মামলা নিয়ে কথা বলতে বলতে বুঝেছি ওর মত ভাল মানূষ হয়না। জ্ঞান হবার পর থেকে এক ওয়াক্ত নামাজ সে কাজা করেনাই। একটা রোজা ও সে ভাঙ্গে নাই স্বেচ্ছায়। কিন্তু সব কিছুর পর ও সে একজন খুনি। নিজের মুখেই স্বীকার করেছে সে খুনের কথা। আমি ও প্রমান পেয়েছি। তাই শেষ পর্যন্ত ওকে আমি বাঁচাতে পারিনি- কিনবা মন থেকেই চাইনি একজন খুনি বেঁচে যাক। ওর নিজে থেকেই আমি সাই পাইনি। তাই আমি ও বেশী দিন ওর জন্য মামলায় সাক্ষি জোগার করে নিজেকে নিজের কাছে অপরাধী করতে চাইনি। ওর যখন ফাঁসির আদেশ হয়- নিজে থেকেই মেনে নিয়েছিলাম। এই শেষ সময়ে আমি তাই ওর সাথে দেখা করতে চাইনি। কিন্তু ও বিশেষ ভাবে ডেকে পাঠায় আমাকে। আমি যেতে চাইনি। একজন খুনির ফাঁসি হবে সে জন্য না- একজন ভাল মানূষের ফাঁসি হবে সে জন্য যেতে চাইনি ওর সামনে। সেদিন ঠিক বারোটা এক মিনিট এ সুলেমানের ফাঁসি হবে জানতে পেরে শেষ ইচ্ছা জানিয়েছে একান্তে আমাকে কিছু কথা বলতে চায়।

আমি পৌছাতেই পুলিশ আমাকে কয়েকটা বড় বড় সেল পার করে রেস্ট্রিক্টেড এড়িয়াতে নিয়ে যায়। সেখানে রাজনৈতিক নেতা এবং ফাঁসির আসামীদের হেপাজতে রাখা হয়। আমি যাওয়ার আগেই আমার কালো গাউন আর ফাইল পত্র বাইরে রেখে আসতে হল। রেখে আস্তে হল আমার চশমাটাও। কোন ভাবেই যেন সুলেমান আমাকে মেরে ফেলতে না পারে। বাইরে দুইজন গার্ড দাঁড়িয়ে থাকবে-এর মাঝেই আমাকে বলতে হবে একান্ত কথা। এটাই এখানকার নিয়ম।

আমি পৌছাতেই দুইটা তালা আর একটা কম্বিনেশন লক খুলে আমাকে সুলেমানের সেলে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে আবার লক করে দেয়া হল দরজা। রুমের ভেতর বেশ ছিমছাম পরিবেশে সুলেমান বসে আছে। পরিপাটি বিছানা। পাশেই একটা কমোড আর একটা বেসিন। খাটের উপর পদ্মাসনে বসে ছিল সুলেমান। আমি যেতেই আমাকে ইশারায় সামনে বসতে বলল সুলেমান। আমি বসলাম ওর সামনে।

 

“তোমাকে একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি আমি” – চোখ বন্ধ করেই বলতে লাগল সুলেমান।

“তোমার কাছে আজ পর্যন্ত আমি কিছু লুকাইনি । তুমি জান আমি কাকে কিভাবে মেরেছি। কিন্তু অনেকবার জানতে চাইলে ও কেন মেরেছি সেটা আমি তোমাকে বলিনি। তুমি তো জানো আমি খুন করেছিলাম আমার বাল্য বন্ধু শাহজাদ কে। ওর সাথে আমি একসাথে কাটিয়েছি অনেক গুলো বছর। একসাথে লেখা পড়া করেছি। যেদিন আমি ওকে মেরে ফেলি ঠিক তার তিন দিন আগে আমি ওর মাথার ইঞ্চি তিনেক ঊপরে একটা হাল্কা আলোর রেখা দেখতে পাই। ওকে সেটা বলতেই ও হেসে উড়িয়ে দেয়। দুইদিন পর আমি ওর মাথার উপর সেই আলোর রেখা আবার দেখতে পাই। সেটা তখন আলোর বলয়ের মত হয়েছিল। ভালভাবে তাকাতে সেই বলয়ের ভেতর আমি সোনালী আলোর রেখা ও দেখতে পাই। ওকে আমি আবার ও জানাই সেই কথা। ও আমার কথা আবার হেসে উড়িয়ে দেয়। সব সময় খানিক টা ফাজিল টাইপের ছিল । আমাকে নিয়ে ফাজলামি শুরু করে দিল সে। হটাত আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেল কেন যেন। কথাকাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। সেই কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে আমি শাহজাদের গলা চেপে ধরি। কিন্তু বুঝিনি সে মরে যাবে। পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির বিশাল দেহের শাহজাদ আমার সাথে জোর জবরদস্তি করতেই পারলনা। মরে গেল আমার চোখের সামনেই। আর সাথে সাথে মাথার উপর থেকে বলয় টা অদৃশ্য হয়ে গেল নিমিষেই।

 

আমি সেদিন বুঝিনি আলোর বলয় টা কি ছিল। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পেরেছি সেটা কি ছিল। আমার মামলা চালানোর সময় আমার বন্ধু শাহজাদের স্ত্রির উকিল সামসুল সাহেবের কথা আপনার মনে আছে? মামলা চলার সময় উনি হটাত হার্ট এটাকে মারা গেলেন- পরে আরেকজন উকিল আসল উনার যায়গায়। সেই সামসুল সাহেবের মাথায় ও দেখেছিলাম আমি সেই বলয়। মৃত্যুর ঠিক একদিন আগেই আমি সেই বলয়ের ভেতর সোনালী বলয়ের রেখা ও দেখেছিলাম।পরের দিন উনার মৃত্যু সংবাদ শুনেই বুঝেছিলাম সেই বলয় ছিল মৃত্যু বলয়। আমি কোন একভাবে টের পেতে শুরু করেছি এই বলয়। এটা সবাই দেখেনা। কেউ কেউ দেখে। কিন্তু মানুষকে জানায় না। কেউ হয়ত মাথায় বলয় নিয়েই ঘুরছে- কিন্তু জানেই না মৃত্যু তার সমাগত।

তোমাকে এই লূকানো সত্য কথাটা বলার জন্যই ডেকেছিলাম – এখন তুমি যাও “- বলেই চুপ মেরে গেল সুলেমান। আমি ও নিরবে ত্যাগ করলাম ওকে। সেই সময় ওকে মনে মনে বদ্ধ পাগল বলে চলে যেতে যেতে কি মনে করে পিছন ফিরেই দেখেছিলাম সুলেমানের মাথার ঠিক তিন ইঞ্চি উপরে একটা হালকা আলোর বলয়। আমি চোখ বন্ধ করে আবার তাকালাম। দেখলাম কিছু নেই সেখানে। বুঝে নিয়েছিলাম আমারই চোখের ভুল। পাগলের সাথে থাকলে নিজের ভেতর ও কিছুটা পাগলামি চলে আসে ভাবতে ভাবতে চলে আসি সেদিন।

 

ঠিক তিন দিন পর আমি আজকে আমি বউ কে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছি।বিয়ের পনের বছর উপলক্ষে আমাদের এই সিলেট ভ্রমণ। আমার মেয়ে সুদিপার সামনেই পরীক্ষা। তাই ওকে আমার মায়ের কাছে রেখেই রওনা দিলাম।

এর মাঝেই ট্রেন চলতে শুরু করেছে।একটু আগেই নিশিতা টয়লেট থেকে আরেক প্রস্ত সেজে আসল। নিশিতার শুধু সাজার বাতিক। যেখানেই যাবে সাথে করে নিয়ে যাবে মেকাপ বক্স। ট্রেনে উঠেই তাই সাজার কাজটা আবার সেড়ে আসতেই আমি গেলাম টয়লেটে। গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম জিনিসটা। আর কিছুই না- মাথার উপর হালকা আলোর রেখার ভেতরে হলদে একটা রশ্মি নেচে নেচে ঘুরছে। দেখেই মাথাটা খানিক টা চক্কর মেরে উঠল। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?? আমি আবার পানির ঝাপটা দিলাম। মনে মনে বললাম- আমি যা দেখছি- সব মিথ্যা-সব হ্যালুসিনেশন। কিন্তু চোখ মেলে আবার দেখতে পেলাম সেটাকে। আমার দিকে তাকিয়ে যেন তাচ্ছিল্যের হাসি দিচ্ছে বলয়টা। আমি ছুটে এলাম নিশিতার কাছে।এসে দেখি নিশিতা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর অনন্য সুন্দর মুখটার উপর একটা হালকা আলোর বলয়- ঠিক আমার তার মত। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম খুব- দুই চোখে তাকালাম ট্রেনের বাকি যাত্রিদের উপর- দেখলাম প্রায় ৩০জন যাত্রির সবার মাথার উপর একটা করে আলাদা বলয় তৈরি হয়ে আছে। এই মুহূর্তে আমি নিশিতার দিকে তাকিয়ে আছি। অপেক্ষা করছি সামনে অপেক্ষমাণ মৃত্যুর জন্য। আর আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে যেন নিশিতার মাথার উপর বলয়ের ভেতরকার হলদে আলোর রেখা।

 

লিখেছেনঃ নষ্ট কবি (ভূতুড়ে গল্প)

মৃত্যু শিকল

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

একটা দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নটা চলছেই। থামার কোন নাম নেই। হঠাৎ উঠে বসল সুমন। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন। এরকম স্বপ্ন মানুষ দেখে!! ডানদিকে ফিরে তাকাতেই চমকে ওঠে। আরে ওটাতো আয়না। আয়নায় নিজেকেই দেখেছে ও। সারারাত আর ঘুম আসবে বলে মনে হয়না। এমন একটা দুঃস্বপ্ন। কে যেন ওকে বেঁধে দিয়েছিল। পা দুটো খোলা ছিল। হাঁটছিল ও। আর কোথা থেকে যেন অজস্র কুড়াল উড়ে আসছিল ওর দিকে। কিভাবে যে বেঁচেছে কয়েকবার। একবার ভাবে স্বপ্নটা নিয়ে। তারপর চিন্তা করে দুঃস্বপ্ন নিয়ে ভেবে কি হবে? ঘুমানোর চেষ্টা করি। শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ মিলির কথা ভাবলে হয়তো ঘুম চলে আসবে। কিন্তু তাও হলনা। রাতটা কোনমতে পার করল সুমন।

 

মিলি সুমনকে দেখে চমকে উঠল।

: কি হয়েছে তোমার?

: কিছুনা।

: এমন চেহারা কেন?

: কিছুনা বললাম তো

: বলনা কি হয়েছে?

: চুপ কর তো। কথা বলতে ভাল লাগছেনা।

এটা ইদানীং সুমনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কথায় কথায় রেগে যায়। মিলি কিছু বলেনি। ভেবেছে সময় হলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সুমনের এই অভ্যাসটা দিন দিন বাড়ছে। কি হয়েছে ওর? কিছুতো বলেও না। এ দিকে সুমনের মাথায় অন্য চিন্তা। ফটোগ্রাফী কোর্সের জন্য ওকে সোনারগাঁ যেতে হবে। আগামীকাল। কোনভাবেই মনোযোগ দিতে পারছেনা। যেভাবেই হোক আজ রাতে ওর ভালভাবে ঘুমাতে হবে। কোনভাবেই আজে বাজে কিছু চিন্তা করা যাবেনা। বাসায় ফিরে এল ও।

রাতে সময়মত ঘুমাতে গেল। কিছুক্ষণ পর ওর ঠান্ডা লাগতে শুরু করল। এসি টা বোধহয় বেশি বাড়ানো। রিমোট নিয়ে অফ করে দিল এসি। তারপরও ঠান্ডা লাগছে। ব্যাপার কি? বাইরে কি বাতাস বেশি? জানালা তো সামান্য খোলা। উঠে বসল ও। ডানে আয়নার দিকে তাকিয়ে ভয়াবহ চমকে গেল। ওটা কি? গাছের উপর সাদা আলখেল্লা পরা কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে।

না, শুধু দাঁড়িয়ে আছে তা না। হাততালি দেয়ার মত করছে। আয়নায় দেখছে। তারমানে জিনিসটা ওর পেছনে। ভয়ের শীতল শিহরণ নেমে গেল ওর মেরুদন্ড দিয়ে। পেছনে ফিরে তাকাবেনা চিন্তা করেও পেছনে তাকাল। কিছুই নেই। আবার আয়নার দিকে তাকাল। সেখানেও কিছু নেই। চোখের ভুল? মনের ভুল? সে রাতেও ঘুম হলনা ওর।

 

ভোরেই ঘুম ভাঙ্গল। সোনারগাঁ যেতে হবে। খেয়ে দেয়ে রেডি হল। বের হয়ে পড়ল। সঙ্গে থাকবে ওদের টীম। সকাল ৯টার মধ্যে পৌঁছে গেল। টীম নেমে প্রথমে এলাকাটা ভালভাবে ঘুরল। মনে খটকা লেগে আছে সুমনের। জায়গাটা কোথায় যেন দেখেছে ও। মনে করতে পারছেনা। কিছুতেই পারছেনা। ওইতো দাবার বোর্ডের মত মার্বেল পাথরের মেঝে। ওপরে ঝাড়বাতি লাগানোর জায়গা। কিন্তু এটা ও আগে কোথায় দেখেছে। মনে করতে করতেই ক্যামেরার লেন্সে ছবি তোলার জন্য চোখ লাগায়। আর তখনই দেখতে পায় একটা কুড়াল ওর দিকে ছুটে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ে ও। কিন্তু কোথায় কি? কিচ্ছু নেই। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল কোথায় দেখেছে এই জায়গাটা। স্বপ্নে। খুব ভয় পায় সুমন। ভয়ে ভয়ে আবার ক্যামেরার লেন্সে চোখ লাগায়। নাহ, এবার কিছু নেই। বিভিন্ন জায়গার ছবি তুলে টীমসহ ফিরে আসে ঢাকায়।

 

দিনে দিনে কাজে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে সুমন। ও এ পর্যন্ত যা যা দেখেছে সেগুলো নিয়েই ভাবে। মনে মনে সেগুলো ওর করতে ইচ্ছা করে। পরের দিন রাতে গাড়িটা নিয়ে চলে যায় আবার সেই জায়গায়। চিন্তা করে আজ কিছু একটা হয়ে যাক। মরে গেলে মরেই যাব। চারদিক অন্ধকার। দূরে স্ট্রীট লাইটের আবছা আলো। মেইন গেট খুলে ভিতরে ঢুকে ও। কিছু দেখতে পায়না। হাটতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সেই ঘরটা খুজে পায়। কিন্তু চিন্তা করে স্বপ্নের মত কে ওকে বেধে দেবে যাতে শুধু পা দুটো খোলা থাকে। চিন্তাটা বাদ দিল। সাথেই ছিল ক্যামেরা। ছবি তুলল কয়েকটা। বাসায় ফিরে এল। ওয়াশ করল ছবিগুলো। ছবিগুলো দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল সুমন। প্রত্যেকটা ছবিতে সাদা কাপড় পরা ভূতটা। লেন্সের সামনে বা আশেপাশে। কিন্তু একবারও দেখা দেয়নি। ভয় পেল ও। মেজাজ ও খারাপ হল। চিন্তা করল যেই গাছে ভূতটা দেখেছিল সেখানে যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাছটার নিচে গিয়ে দাড়াল। কিছুই নেই। কিছুক্ষণ পর ভূতটা ভেসে এল কোথা থেকে। ভয় পেল সুমন। থেমে গেল ভূতটা। তারপর উল্টো দিকে ভেসে চলতে লাগল। অবাক হল সুমন। কিন্তু ভূতটার পিছনে পিছনে যেতে লাগল সে। ভূতটাও যাচ্ছে। সুমনও হাঁটছে। কিছুক্ষণ পর মনে হল আর যাওয়া উচিত হবেনা। ফিরতে হবে। কিন্তু সুমন দেখে পিছনে যেতে পারছেনা ও। সামনেই চলেছে ওর পা। সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে ভূতটার পিছনে পিছনে। কখন যে একটা গোরস্থানের ভেতর ঢুকে পড়েছে খেয়াল করেনি ও। হাঁটতে হাঁটতে একটা গর্তে পড়ে গেল ও। ভূতটাকে এখন আর দেখতে পাচ্ছেনা। উপুড় হয়ে পড়েছে ও। ঘুরে আকাশের দিকে তাকাতেই সজোরে একটা কুড়াল এসে আঘাত করল ওর মাথায়। মারা গেল সুমন।

 

সুমনের বাসায় এসেছে মিলি। সুমন মারা গেছে আজ চারদিন। মিলাদে এসেছে ও। কেউ কিছু বোঝেনি যে কেন সুমন ওভাবে মারা গেল। কেঁদে কেঁদে চোখ লাল হয়ে গেছে মিলির। অনেক ভালোবাসতো ও সুমনকে। সুমনের ঘরে ঢুকল ও। সুমন ব্যবহার করে এরকম কিছু জিনিস নেবে। সুমনের স্মৃতি হিসেবে। সুমনের রুমের আয়নার সামনে বসল মিলি। চোখ লাল। নিজেকে আয়নায় দেখে অঝোরে কান্না এল ওর। মুখ নিচু করে কাঁদতে লাগল। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে আয়না দিয়ে জানালাটা দেখল। গাছটা চোখে পড়ল। মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল মিলি।

কিন্তু……….. মিলির প্রতিবিম্বটা মিলির মত উল্টো দিকে জানালার দিকে ফিরে তাকায়নি। আয়নায় মিলির প্রতিবিম্বটা লাল চোখে আর ক্রূর হাসি ঠোঁটে নিয়ে মিলির দিকেই তাকিয়ে আছে।

মিলি এখনও জানেনা কি অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে ও…………….. সুমনের পর এবার হয়ত ওর পালা……….

 

দিয়েছেনঃ কাজী ইরফান বিন ইউসুফ (ভূতুড়ে গল্প)

নাবিলা (শায়লা গল্পের দ্বিতীয় খন্ড) শেষ পর্ব

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

হঠাৎ কি যেন হয় । ওই হাত ছুয়ে দেবার আগেই… নূরজাহানের মুখের হাসি হঠাৎ মিলিয়ে যায়। সেই সাথে ঘরের মাঝে একটা অস্বাভাবিক থমথমে ভাব চলে আসে…হঠাৎ করেই অনেকগুলো নারীর সম্মিলিত কন্ঠের ক্রুদ্ধ চিৎকার বেজে ওঠে নাবিলার মস্তিষ্কে…বাজতেই থাকে… বাজতেই থাকে…সেই সাথে ঘোর কেটে যায় ওর । আর সকল ভোঁতা হয়ে যাওয়া অনুভূতিগুলো তাদের সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভয়,আতংক,হতাশা…ঝট করে হাত সরিয়ে নেয়… চিৎকার করে হাত দিয়ে কান চেপে ধরে নাবিলা…লাভ হয়না…শব্দ তো আর ঘরের ভেতরে হচ্ছে না। এ যেন এক নিঃশব্দ চিৎকার…

কিছু একটা যেন খুঁজছে ওরা। নাবিলা বুঝতে পারে না ওরা কি খুঁজছে…কেন খুঁজছে…ক্রুদ্ধ আর প্রচন্ড হতাশ ওরা। যেন কোন কিছুর অপেক্ষায় ছিল। না পাবার হতাশা…হঠাৎ ঘরের মাঝে কি যেন নড়তে দেখে নাবিলা…ছবি নয়…অন্য কিছু…ঘুরে দেখতে যাবার আগেই হঠাৎ প্রচন্ড শীতল কিছু একটা ওর পা চেপে ধরে…নিচে তাকায় নাবিলা…ঘরে ছড়িয়ে থাকা সাদা নারীমূর্তিগুলোর একটা ওর পা ধরে টানছে…আতংকে আবারো চিৎকার বেরিয়ে আসে ওর গলা চিরে…পা ঝাড়া দিতে থাকে নাবিলা। কিন্তু ছাড়াতে পারে না। আঁতিপাতি করে এদিকে ওদিকে তাকায় ও…শক্ত কিছু খোজে। এদিকে ঘরের আলোগুলো একে একে নিভে যেতে শুরু করেছে। একটা কাঁসার মোমদানি খুজে পায় নাবিলা। ওটা তুলে সর্ব শক্তি দিয়ে মারে মুর্তিটার হাতে। আবার মারে…আবার…হিস্টরিয়া গ্রস্ত মানুষের মত মারতেই থাকে। মূর্তির হাতটা ভেঙ্গে আসে। ঘরের প্রায় অন্ধকার আলোতে যা দেখে নাবিলা তা চোখের ভুল নাকি তা ও বলতে পারেনা হঠাৎ। কিন্তু ক্রমাগত চিৎকার করতে থাকা কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে। সাদা প্লাস্টার অব প্যারিসের মাঝ দিয়ে যেন একটা কঙ্কালসার হাত উঁকি দিচ্ছে। ভাল করে তাকায় নাবিলা। হঠাৎ ঘটনার বীভৎসতা ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। খানসামার হাতের ধোয়াঁ ওঠা বালতির রহস্যও পরিষ্কার হয়ে যায় নাবিলার। তাহলে কি এই সবগুলো মূর্তিই রাজীবের শিল্পের নিদর্শন?”নশ্বর দেহের সৌন্দর্য ধরে রাখা”র সত্যিকার অর্থ আবিষ্কার করে নাবিলার দেহ অবশ হয়ে আসে।

নাবিলা পালাবার পথ খোঁজে…ঘরটা বেশী বড় না। কয়েক কদম দূরেই দরজা…কিন্তু পালাবার পথটা অসম্ভব মনে হল…ঘরের সবকিছুই যে এখন জীবন্ত… একটু আগের সেই শান্ত পরিবেশ এখন আমুল বদলে গেছে…শিকারকে বাগে আনার আগে যেমন শিকারি ভুলিয়ে ভালিয়ে কাছে আনে…ঠিক তেমন ছিল পরিবেশটা…হঠাৎ কি হল?শিকারীর হাত থেকে যেন শিকার হাতছাড়া হয়ে গেছে…কিন্ত ও তো এখানেই…তবে কি…

 

এত কিছুর মাঝেও নাবিলার মাথা হঠাৎ কাজ করা শুরু করেছে। মূর্তিগুলোর রহস্য জানতে পেরে আর ছবিগুলোর আচরণে একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যায়। ওরা এই জমিদারের হাতেই অত্যন্ত কষ্ট নিয়ে মারা গেছে। তাই ওই জমিদারের উত্তরাধিকারদের আজীবন এই ছবির অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। দুইএ দুইএ চার করে নিতে অসুবিধে হয় না। এ বাড়ির কোন পুরুষকে ওরা বাঁচতে দেবে না। “ওদের নিয়ে ভিতরে এসো”,আর ঘোরের মাঝে রায়ান আর রিমনকে নিয়ে আসতে চাইবার অযৌক্তিক ইচ্ছার কারণ বুঝতে পারে এখন নাবিলা। ওরা আসেনি নাবিলার সাথে । নাবিলা জানায়ই নি ওদেরকে যে ও বাংলাদেশ এ  যাচ্ছে…এটাই হয়ত ওদের ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে…

নাবিলা হাতের মোমদানিটা শক্ত করে চেপে ধরে। এটাই একমাত্র ভরসা এখন। ঘরে এখনও আলো আছে। বেশীক্ষন থাকবে না। তার আগেই এখান থেকে পালাতে হবে। মূর্তিগুলো পা হেঁচড়ে হেঁচড়ে এগিয়ে  আসছে নাবিলার দিকে। নাবিলা দরজার দিকে দৌড় দেবার প্রস্তুতি নেয়। মাথার ভেতর চিৎকার গুলো বেজেই চলেছে…সমস্ত মানসিক শক্তি একত্র করে নাবিলা পা বাড়ায় দরজার দিকে…

এর পরের ঘটনা গুলো খুব দ্রুত ঘটে যায়। হাতের মোমদানি টা পাগলের মত ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগোয় নাবিলা। প্রথম মুর্তিটার গায়ে যখন লাগে মোমদানিটা তখনও নাবিলা দরজা থেকে অনেক দূরে। হাতের নাগালের আরেকটা মূর্তি হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। আরো তিনটা মূর্তি সামনে। মাটিতে পড়ে থাকা মূর্তিগুলোও গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে নাবিলার পা লক্ষ্য করে। নাবিলা মরিয়া হয়ে ওঠে বাঁচার জন্য। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জানতে পারলে মানুষের শরীরে অসুরের শক্তি চলে আসে। এলোপাথাড়ি হাত ছুঁড়তে ছুঁড়তে আর মোমদানির আঘাতে মূর্তিগুলো ধরাশায়ী করতে করতে নাবিলা যখন দরজার ঠিক সামনে যখন পৌছায় ঠিক তখনই ঘরের শেষ আলোটাও নিভে যায়।

ঠিক তখনই নাবিলার পা চেপে ধরে একটা মূর্তি। দৌড়তে থাকা নাবিলা নিজেকে আর সামলাতে পারে না। হাত থেকে মোমদানিটা কোথায় যেন পড়ে যায়। মাটিতে আছড়ে পড়ার আগে অন্ধকারে কিছু একটা আঁকড়ে ধরার শেষ চেষ্টায় হাত বাড়ায় দরজার দিকে। কিন্তু সে হাত আর দরজার হাতল খুঁজে পায় না। হাতদুটো শূন্যে বৃথা হাতড়াতে থাকে। হঠাৎ সে হাত চেপে ধরে আরেকটা ভেজা বরফ শীতল হাত।

হঠাৎ যেমন শুরু হয়েছিল তেমনি ভাবে ঘরের সবকিছুই থেমে যায়। নরম মোমের আলো জ্বলে ওঠে দরজার ঠিক পাশের ছবিটার ভেতরে। সে আলোয় দেখে নাবিলা, নূরজাহানেরই হাত ধরে আছে ও। নূরজাহানের মুখে প্রশান্তির হাসি…আহবানের হাসি। একটু আগের সেই ক্ষোভের একটুও অবশিষ্ট নেই। নাবিলা সব বুঝতে পারে, সব। একটি মাত্র স্পর্শই ওকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। নাবিলাকে কখনোই মারতে চায়নি ওরা। রায়ানকে না পেয়ে ওরা প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল এই যা। কিন্তু ওরা এখন অনেক শান্ত…কেবল একটা স্পর্শই প্রয়োজন ছিল ওদের। কেবল একটি মাত্র স্পর্শ…

শরীর থাকার অনুভূতিটা আমি বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলাম। নাহলে এত গরম লাগার তো কথা না…এখন তো শীতকাল হবার কথা। মেয়েটার স্মৃতি তো তাই বলে…রঙের মাঝে সবকিছুই এত শীতল ছিল…!!! দরজা খুলে ঘরের বাইরে বের হলাম…

বাড়িটার কি অবস্থা…!! তা অবশ্য হবারই কথা…কেউ যত্ন করার নেই তো…ভাঙ্গা সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। সারা শরীর খুব ব্যাথা…পায়ে বোধহয় কেটেও গেছে…সত্যিই দেহটা আমাদের খুবই…কি যেন বলতেন উনি…নশ্বর?

অন্ধকারে দেখতে এখন আর সমস্যা হয় না…এখানে ওখানে অনেক কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে…সবকিছু ডিঙ্গিয়ে বাইরে বের হতে খুব একটা সমস্যা হল না।

বাইরে এসেই চমকে গেলাম…আজকে পূর্ণিমা…এত্ত বড় চাঁদটা ওই অশ্বথ গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে…সেদিন রাতটাও পূর্ণিমা ছিল না? সেদিন রাতের কথা মনে পড়তেই আবার মাথায় আগুন ধরে গেল আমার…

আমার যে আর কোন উপায় ছিল না। ওদের যে আমার খুঁজে বের করতেই হবে…মেয়েটার স্মৃতি ঘাঁটতে থাকি আমি…দেখি কি পাওয়া যায়..

 

অনেক ঠান্ডা…কিন্তু কেন যেন শীত লাগছে না নাবিলার…সময় বোধহয় এখানে থমকে থাকে। নাবিলা প্রথম থেকেই জানে না ও কতদিন এখানে আছে…কখনো মনে হয় এক মুহূর্ত…কখনো মনে হয় সারাজীবন…এখানে নাবিলা কখনোই একা না…আবার ও প্রচন্ড একা…এখানে চারিদিকে কেবল রঙের ছড়াছড়ি তবুও কেন যেন সবকিছুই সাদাকালো…

বোধহয় ছবির জগতে প্রবেশ করার ঠিক আগের চিন্তাটাই সারাজীবন গেঁথে থাকে ওদের সবার মাথায়। নাহলে নাবিলার চোখে বারবার রিমনের চেহারা ভাসবে কেন? “সারাজীবন” শব্দটা বোধহয় ঠিক হল না…শব্দটা বোধহয় হবে “অনন্তকাল…”

 

-Amin-Al-Maksud

(ভূতুড়ে গল্প)

নাবিলা (শায়লা গল্পের দ্বিতীয় খন্ড) ৩য় পর্ব

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

প্রচন্ড ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ঘুম ভাংল আমার। বিকেলবেলাটা পুকুরপাড়ে বসেছিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।আজকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বেশ তটস্ত হয়ে থাকি। ওই সময়টা উনি বাসায় থাকেন। গতকাল ছবি আঁকা শেষ হয়েছে। উনাকে খুব তৃপ্ত মনে হল। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ছবিটা দেখতে,কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছিল না।

ঘরে যেতে হবে। মাঘ মাসের শীত, বড় কঠিন। ঘাট থেকে উঠে পেছনে ফিরতেই চমকে উঠলাম। উনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার পেছনে। তাড়াতাড়ি ঘোমটাটা মাথায় তুলে দেই। একটু অবাক লাগছে। উনি এই সন্ধ্যায় বাড়ীতে কি করছেন। জিজ্ঞাসা করার সাহস হয় না ।মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি।

“এখানে কি করছ? ঠান্ডা লাগবে তো, ভেতরে এসো”

উনার গলায় কি যেন ছিল, আমার হৃদয় নেচে উঠল। এত নরম গলায় কখনো তো তিনি আমার সাথে কথা বলেন নি!! তবে কি…!!

কিছুটা শংকা আর কিছুটা আশা বুকে নিয়ে উনার পেছন পেছন বৈঠকখানায় ঢুকি। শঙ্কার পরিমাণটাই বেশী, সারাগায়ের ব্যাথা এখনো যায়নি আমার…আমাকে বসতে বলেন উনি…বেতের বেশ কিছু চেয়ার সাজানো ছিল সে ঘরে। জড়সড় হয়ে তারই একটাতে বসি।

মাথার উপর ঝাড়বাতিটা জ্বলছে। সারা ঘরে এক মোহনীয় আলো। দেয়ালের সবগুলো ছবির সামনে আজ একটা করে মোমবাতি জ্বলছে। উনি এগিয়ে আসেন আমার সামনে। সম্ভাবনায় বুকটা আমার কাঁপছে। আমাকে ধরে দাঁড় করান উনি। ভয়টা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। হঠাৎ কোথা থেকে যেন একরাশ লজ্জা এসে চেপে ধরল। আমার মুখটা দুহাতের মাঝে নিয়ে উনি আমার দিকে তাঁকিয়ে থাকেন…আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে আবেশে…

অনেকক্ষণ পর আমি চোখ খুলি।সেই একই ভাবে দাড়িয়ে আছি আমরা । আমার দিকে উনি তাকিয়ে আছেন অপলক চোখে…তার চোখে মুগ্ধতা…

“তুমি ওদের সবার চেয়ে অনেক বেশী সুন্দর…”ওনি বলেন মায়ামাখা কন্ঠে।

মনটা খুশীতে ভরে ওঠে…সেই সাথে বিভ্রান্তি…”ওদের চেয়ে???”

“তুমি আমাকে ভালবাস নূরজাহান?”

আকস্মিক এ প্রশ্নে থমকে যাই…সত্য কথাটা মুখে সরে না…আমি কি ভালবাসি ওনাকে? হয়ত…এতদিনের ভয়ের অনুভূতিটাকে ছাপিয়ে আজ যে নতুন অনুভূতিটা টের পাচ্ছি…এর নামই কি ভালবাসা? মাথা নাড়ি আমি…

“তাহলে তুমি কি আমার জন্য একটা কাজ করে দিতে পারবে?”

আবার ঘাড় নাড়াই আমি। মনের কোণে কোথায় যেন শংকা উঁকি দেয়। আমাকে ছেড়ে দেন উনি…হাত ছড়িয়ে দেন দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর দিকে…

“এই যে এই বাড়িতে যে ছবিগুলো দেখছ…যে মূর্তিগুলো দেখছ, সব আমার নিজ হাতে আঁকা…নিজের হাতে বানানো…কিন্তু আমি্ যে একা একা পারি না…।আমাকে সাহায্য করবে তুমি? করবে?”

মনটা আবারো বিভ্রান্ত হয়, আমি? আমি কি করব? কোনদিন…বাড়ির কাজ ছাড়া কিছুই করিনি আমি। ওগুলো সব পারব, কিন্তু ছবি আঁকা!! মৃদুস্বরে ওটাই জানাতে চেষ্টা করি আমি।

হেসে ওঠেন উনি…”হাসালে নূরজাহান” কাছে এসে আবার মুখটা উনার হাতের দু আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করেন…এত আস্তে;যেন জোরে ছুঁয়ে দিলে আমি ভেঙ্গে যাব…”তুমি কি জান বিধাতা তোমাকে নিজ হাতে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন? তোমার সৌন্দর্য যেন বিধাতার নিজ হাতের সৃষ্টি…আমাকে তার কিছুটা ধার দেবে নূরজাহান?

মনের বিভ্রান্তিটা কাটে না। সৌন্দর্য কিভাবে দেয় মানুষ? তবুও মাথা ঝাঁকালাম। দেব আমি, আমার স্বামী উনি…আমার সবকিছু তো ঊনারই সম্পত্তি…

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন উনি আবার…হাত সরিয়ে নেন হঠৎ…”ওরা সবাই তাই বলেছিল…কিন্তু নিজে থেকে কেউ দেয়নি…কেউ না…”আমার হাত ধরে উনি দেয়ালের পাশে নিয়ে যান…মোমের আলোয় তার চোখের বিষাদটা আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে…

খানসামা কে ডাক দেন উনি। হাতে কি যেন নিয়ে অন্ধকার থেকে উদয় হয় খানসামা । বালতি? হ্যা, বালতিই বোধহয় তার হাতে। ধোঁয়া উঠছে কি ওখান থেকে?

“আমাদের দেহ বড় নশ্বর নূরজাহান। মানুষ বুড়িয়ে যায়, মুটিয়ে যায়…তুমি এখন যেমন আছ তেমনি সুন্দর…আমি তোমার সৌন্দর্য কে সৃষ্টির শেষ সময় পর্যন্ত ধরে রাখতে চাই…” হাত দুটো আমার গালে আলতো করে ছোয়ান তিনি…তার চোখে পূজারীর ভক্তি…যেন কোন দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে স্তুতি করতে ব্যাস্ত…

 

হঠাৎ একরাশ হাওয়া এসে ঝাড়বাতিটা নিভিয়ে দেয়…কিন্তু ছবিগুলোর মাঝে আলো জ্বলতে থাকে…ছবির সবগুলো মেয়ে যেন আমার দিকে চেয়ে থাকে…আলো আঁধারির খেলা? হবে হয়ত…আমার মনে তখন অনেক গুলো অনুভূতির সমাহার। উনার কথাগুলো বুঝতে পারি না আমি, কিন্তু অনেক ভাল লাগে…আবার অনেক ভয় লাগে…উনার আঙ্গুলগুলো আমার মুখমণ্ডলে খেলা করে…আলতো ভাবে…আবেশে আমার চোখ আবার বুঁজে আসে। উনার হাতদুটো আস্তে আস্তে আমার গলার উপর আসে…শিরাগুলো দপদপ করে লাফিয়ে উঠছে  আমার। উনি আলতো করে ছুয়ে যান ওগুলো…হাত দুটো আরও নিচে নিয়ে যাবার অপেক্ষায় থাকি…এ অপেক্ষা অনেকদিনের…আজ আমার স্বপ্ন তবে…

আস্তে আস্তে হাতদুটো গলার উপর চেপে আসে যেন। চোখ বন্ধ আমার তখনো। ভাল লাগাটা আস্তে আস্তে ভয়ে রূপ নেয়…উনার হাতের চাপ কি বাড়ছে?…হ্যা আরো বাড়ছে…চোখ খুলি আমি…বিভ্রান্ত চোখ উনার চোখের গভীরে আঁতিপাতি করে ভাল্বাসা খুজে পাবার শেষ চেষ্টা করে…পায়না কিছুই…সে দৃষ্টিতে কেবল লোভ আর নতুন কিছু পাবার উত্তেজনা…ছোটবেলায় মেলায় গিয়ে নতুন নতুন খেলার পুতুল দেখে লতার চোখে এরকম দৃষ্টি খেলা করত… আমার হাতদুটো ঊনার হাতের উপর চলে আসে হঠাৎ…প্রথম স্পর্শ…কিন্তু সে স্পর্শে ভালবাসা নেই…আছে আতঙ্ক…হাত দুটো ছাড়াতে চেষ্টা করি…পারি না…ছটফট করতে থাকি…শ্বাস নিতে পারছি  না…ওনার চোখ আমার চোখ থেকে সরে না…উনি ফিসফিস করে কি যেন বলতে থাকেন আমার কানে কানে…আমার চিৎকারে সেটা চাপা পড়ে যায়…থুতু দেই আমি উনার মুখে,হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে পালাতে চেষ্টা করি…পারি না…আমার চুল খামচে ধরেন উনি। দেয়ালে চেপে ধরেন আমায়। ঠিক দেয়ালে নয়…দেয়ালের ছবিটাতে। চিৎকার করতে থাকি অনবরত আমি, ছটফটাতে থাকি…ওনার গায়ে যেন অসুরের শক্তি…প্রচন্ড রেগে গেছেন এখন…উনার বিড়বিড় এখন বিজাতীয় ভাষার কোন চিৎকারে পরিণত হয়েছে…একচুল নড়তে পারি না…ছবিটা খামচে ধরি একহাতে…আরেক হাত মুচড়ে পেছনে নিয়ে গেছেন উনি…আমার চুল ধরে পেছনে টানেন উনি.. আবার মাথাটা ঠুকে দেবার জন্য ছবির সাথে…প্রচন্ড বেগে ছবিটা কাছে আসার সময় হঠাৎ ছবিটা দেখতে পাই…ছবিটা…ছবিটা…

 

ওই শোবার ঘরের মেয়েটা…হঠাৎ সময় যেন থেমে যায় আমার চারপাশে…..মেয়েটা ছবির একেবারে সামনে চলে আসে…যেন বেরুতে চাইছে…হাত বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে…আস্তে আস্তে খোলা হাতটা চলে যায় মেয়েটার দিকে…ছুয়ে ফেলি…

তারপর যেন কি হয়…হঠাৎ করেই আমার সব কষ্ট চলে যায়…আমি কি মারা গেছি? না তো…এখনো সব একই আছে…কেবল আমি আমাকে দেখতে পাই…কষ্টগুলো চলে গেছে…আমার দেহটা কেমন যেন নিথর…ছবির সামনে রাখা মোম বাতিটা থেকে আমার শাড়িতে আগুন ধরে যায়…আমি চিৎকার করে সাবধান করি…কিন্তু উনি শুনতে পাচ্ছেন বলে মনে হয়না…আমি যেমন শুনতে পাচ্ছি না উনার ক্ষুব্ধ চিৎকার…চোখের কোন দিয়ে  দেখি খানসামা দৌড়ে আসছে…উনাকে শান্ত করার পর আমার নিথর দেহটাকে টেনে নিয়ে যেতে দেখি…ওই তো ওইখানে বালতিটা আছে…ওখানে…

আমি কোথায়?…আমি বোধহয় ছবির ভেতরে…

 

পুরাতন বাড়িটার সামনে দাড়িয়ে আছে নাবিলা…শরীরটা অসম্ভব দূর্বল…প্লেনের বাকি রাস্তাটা বমি করতে করতে গেছে ওর। প্লেনের ডাক্তার ওকে ঘুমের ওষুধ দিতে চাইলে চিৎকার করে না করে…ওকে নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ…ট্রানজিট ছিল বাহরাইনে। কয়েক কাপ কফি খেতেই অনেকটা ভাল লাগতে থাকে নাবিলার। তারপর থেকে টানা ২ দিন না ঘুমিয়ে, ঢাকায় নেমে সোজা বিমানে করে সৈয়দপুর…তারপর বাসে করে ঠাকুরগাঁও…রেন্ট-এ-কার এখানে নেই মনে হল…

জায়গাটা খুজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়ছে…ভাল কাপড় চোপড় পরা বাংলা ভাল না বলতে পারা বাঙ্গালী এখনো এখানে বেশ দর্শনীয় বস্তু…তার উপর আবার অসুস্থ …নাবিলার কৌতূহল এর চেয়ে হুজুগে বাঙ্গালীর কৌতূহল বরাবরই বেশী হবার কথা…সেটা তো আর নাবিলার জানা নেই…বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে তখন ও।

 

বাড়িটাতে ঢোকার আগে আরেকবার চিন্তা করে নেয় নাবিলা । সাহসে কুলাচ্ছে না…কেন এখানে এল তার কারণ টা এখনো ষ্পষ্ট নয় ওর কাছে।

যত কারনই থাকুক…যতই অতীতের রহস্য ভেদ করার আর এই ঘটনার শেষ দেখার ইচ্ছে থাকুক না কেন, কেন যেন কোন কারণকেই অতটা বাস্তব সম্মত মনে হচ্ছে না এখন ওর। এখানে আসার কোন কারণই নেই…কি করবে ও?কি ই বা করতে পারে?এ বাড়িটা ঘিরে যে রহস্য জড়িয়ে আছে তার সমাধান কি ও করতে পারবে? কিভাবে পারবে?যেন এক অদৃশ্য টানে এখানে ছুটে এসেছে ও। চিন্তাটা ওর মেরুদন্ড দিয়ে একটা শীতল পরশ বুলিয়ে গেল।

এখন কি ফিরে যাবে? এতদূর এসে ফিরে যাবে? এখানে এক হোটেলে উঠেছে নাবিলা। বিকেল হয়ে আসছে…এখন ঢুকবে? নাকি কাল সকালে?বাড়িটার শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। দেয়াল বেয়ে নাম না জান লতা পাতা বাসা বেঁধেছে,একটা অশ্বথ গাছও উঁকি দিচ্ছে ওপাশের দেয়ালে।ছাদ ধসে পড়েনি এখনো এই বিশাল বাড়ীটার, ধসে পড়তে বেশী বাকী নেই এটাও বোঝা যাচ্ছে। অনেক বছর ধরে কেউ যত্ন  নেবার নেই। আর কত? এলাকার মানুষ এ বাড়িকে নিশ্চয়ই যমের মতন ভয় পায়। পাবারই কথা। পাশের সেই পুকুরটা এখন ডোবায় পরিণত হয়েছে,কিছুদিন আগে হয়ত পাট পচানো হয়েছে, জীবিকা তো আর ভুতের ভয় মানে না…

 

“তুমি এসেছ?” রিনরিনে এক কণ্ঠ শুনে চমকে ওঠে নাবিলা। কণ্ঠের মালিক কে দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। কাউকে দেখে না…

“আমি বাড়ির ভেতরে, ওদের নিয়ে ভেতরে এস” হঠাৎ ওর আফসোস হতে থাকে কেন রায়ান আর রিমনকে নিয়ে এলনা ও। জানেনা কেন কিন্তু নাবিলা ইচ্ছে হয় ফিরে গিয়ে ওদের নিয়ে আসতে…

তখনো কাউকে খুঁজে পায়নি নাবিলা। কণ্ঠটার মাঝে এক মায়াময় আহবান,সে আহবান ঝেড়ে ফেলতে সহসা ইচ্ছা করবেনা কারও। ওরও করে না। ওর দেহ আর মন যেন ভিন্ন ভিন্ন দুটো সত্ত্বা । ওর সমস্ত অস্তিত্ব ওকে চিৎকার করে বলছে ওখানে না প্রবেশ করতে। প্রচন্ড অশুভ একটা ব্যাপার আছে সে আহবানে…কিন্তু এড়াতে পারেনা নাবিলা…পাথরের মত ভারী পা দুটো টেনে টেনে আস্তে আস্তে মন্ত্রমুগ্ধের দরজার দিকে এগিয়ে যায় নাবিলা। মেহগনি কাঠের দরজা ,ঘুনে ধরে না। তাই বলে অক্ষত নেই মোটেও। বয়সের ছাপ পড়েছে এখানে ওখানে । সানসেটের মত কিছু একটা ছিল দরজার উপরে, সেটা ভেঙ্গে দরজার সামনে। তাই বৃষ্টির পানিতে ভিজে ভিজে দরজায় পচন ধরেছে। সামান্য ঠেলা দেবারই কেবল অপেক্ষা ছিল। প্রচন্ড শব্দে ভেঙ্গে পড়ল।

ভেতরটা বসার ঘর, মানে বৈঠক খানা। নূরজাহানের স্মৃতি, আর নাবিলার ছেলেবেলার স্মৃতি দুটো একসাথে জট পাকিয়ে সামনে এসে হাজির হয়। ঝাড়বাতিটা নেই, নেই সেই টান পাখাও। নাহ আছে, টানপাখাটা মেঝেতে পড়ে আছে।ছেলেবেলার স্মৃতিতে এত ছবি ছিল না, ছিল না কোন মূর্তিও। এখনও নেই। জীর্ণ শীর্ণ আসবাব আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা আবর্জনা এড়িয়ে ঘরের মাঝখানে চলে যায় নাবিলা। সিঁড়ির নিচে কোন ছবি নেই,থাকার কথা ছিল না?

কাঠের সিঁড়িটাতেও বয়সের ছাপ পড়েছে। পা দিতে তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল। তার সাথে সাথে খিলখিল হাসির শব্দে ভরে গেল…কি ভরে গেল? ঘর? না তো…শব্দের উৎসটা তো দূরের কথা শব্দটা বাজছে কোথায় সেটাই তো বুঝতে পারছে না নাবিলা। শব্দটা কি তবে নাবিলার মাথার ভেতর?

এত চিন্তা করার মত শক্তি বা মানসিক অবস্থা কোনটাই নেই এই মূহুর্তে ওর। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে । কেবল বারবার মনে হতে থাকে রায়ান আর রিমনের কথা…কেন যেন মনে হতে থাকে ওদের না নিয়ে এসে খুব ভুল করেছে ও। ধীরে ধীরে সিড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে থাকে নাবিলা…পচা কাঠে পা দিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে যেতে থাকে, নিজেকে সামলে নেয় কোনমতে । আস্তে আস্তে দোতলায় উঠে আসে। সেই গোল করিডোর…পাশে সারি সারি দরজা । সারি সারি দরজা পার হয়ে আস্তে আস্তে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। নাবিলা নূরজাহান কে যেন অনুভব করতে পারছে তার মাথার ভেতর। নূরজাহান যেন অনেক আনন্দিত এখন । বার বার ঐ ঘরটাতে ঢুকতে বলে নাবিলা কে, আর কাকে যেন খুঁজতে থাকে নাবিলা বুঝতে পারে না। নাবিলার আর কোন প্রতিরোধের শক্তি অবশিষ্ট নেই তখন। অনিচ্ছুক হাত চলে যায় পুরনো দরজার হাতলে।

দরজা খোলাই ছিল। ঘরের ভেতর  ঘুটঘুটে অন্ধকার। দেখা যায় না কিছুই। সন্ধ্যা হয়ে আসছে…বাইরেও অন্ধকার প্রায়। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নাবিলা । ঘরের এক কোণে কোথায় যেন ধীরে ধীরে আলো জ্বলে ওঠে…আলোর উৎসের দিকে চোখ যায় নাবিলার। ওখানে একটা ছবির ফ্রেম। তার মাঝে আলো জ্বলছে…একটা মোম…মোমটা একটা মেয়ের হাতে, ছবির ভেতরেই। মোমটায় এক ধরনের অপার্থিব আলো। তেল রঙে আঁকা মোমবাতি থেকে বের হওয়া আলো, অদ্ভুত মায়ামাখা,স্নিগ্ধ। সে আলোয় ঘরের কিছুই আলোকিত হয় না। ধীরে ধীরে ঘরের সবগুলো দেয়ালে এক এক  করে আলো জ্বলে উঠতে থাকে। প্রতিটি দেয়ালে অনেকগুলো করে ছবি,প্রতিটি ছবিতে একটা করে মোম হাতে নেয়া মেয়ে। আস্তে আস্তে পুরো ঘরটা আলোকিত হয়ে যায়।

ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নাবিলা। ওর চারপাশে ৩০-৪০টা ছবি । সবগুলো ছবিই মেয়েদের। কেউ কিশোরী,কেউ যুবতী,তবে সবারই বয়স ২৫ এর নিচে হবে। সবাই এই ছবি জগতের বাসিন্দা। কেউ জলরঙে আঁকা, কেউবা তেল রঙে। আর ঘরের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলো মূর্তি, নারীমূর্তি । কোনটা দাঁড়িয়ে আছে…কোনটা আবার মাটিতে অবিন্যাস্ত অবস্থায় পড়ে আছে…পাথরের মনে হল দেখে…না, পাথর নয়…ওগুলো কি? ভাল করে দেখে নাবিলা। প্লাস্টার অব প্যারিস ! সবগুলো মূর্তিই কি তবে প্লাস্টার অব প্যরিস দিয়ে বানানো?

নূরজাহানের ছবিটা ছিল ঘরের ঠিক মাঝখানের দেয়ালে…সেই বিয়ের শাড়ি…গত কয়েকদিন আয়নায় দেখে আসা সেই মুখ…সেই স্নিগ্ধ হাসি…ওকে দেখতে পেয়েই নাবিলার মনের সব অনুভুতি যেন একটা স্নিগ্ধ আবেশে ছেয়ে যেতে থাকল…নূরজাহান হাত নেড়ে ডাকে ওকে নিজের দিকে…নাবিলা এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে নূরজাহান…ঠিক আগের মত…নাবিলা নিজেকে আটকাতে পারে না…ও হাত বাড়িয়ে দেয়।

 

(আগামী খণ্ডে সমাপ্ত)

 

-Amin-Al-Maksud

(ভূতুড়ে গল্প)