আধিয়ার (শেষ খন্ড)

2

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

রাতের খাবার খেয়ে বারান্দায় বসে আছি আমি, সাত্তার সাহেব ও তাঁর স্ত্রী জয়গুন নাহার। বাহিরে গুড়ি গুড়ি মিহি বৃষ্টি, হাল্কা বাতাস। কারেন্ট আসেনি এখনো। আমি বসেছি চেয়ারে। সাত্তার সাহেব মাদুর বিছিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছেন। হুক্কা টানছেন। গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। চারপাশে মিষ্টি জাফরানের ঘ্রাণ। জয়গুন নাহার স্বামীর পাশে বসে পানের খিলি সাজাচ্ছেন।
“এরপর কি হল? তাজল মারা যাবার পরের ঘটনা?” কৌতুহলি কন্ঠে জানতে চাইলাম আমি।

হুকার পাইপে বারদুয়েক টান দিয়ে এক রাশ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আমার দিকে তাকালেন সাত্তার সাহেব, চোখে বিচিত্র একটা দৃষ্টি, “এরপরের ঘটনাটা একটু আজব -অবাস্তব বলে মনে হবে তোমার”

জয়গুন নাহারকে দেখলাম সামান্য ভীত চোখে অন্ধকার জমিটার দিকে তাকালেন একবার। চাপা গলায় বললেন, “রাত বিরাতে কিসব শুরু করলা? জামাই মানুষ, ভয় টয় পাবে তো!”

“আরে পাবে না। সাহস আছে ছেলের”, আমার দিকে তাকালেন। আমি ঢোক গিললাম।

“তাজল শেখ মারা যাওয়ার দিনের ঘটনা। কবরটা দেয়া হয়েছিল এখান থেকে এক মাইলের মত পূবে একটা গোরস্থানে। অল্প কয়েকটা কবর মাত্র সেখানে। বেশিদিন হয়নি ওখানে গোরস্থানের জন্য জমি দেয়া হয়েছে। জঙ্গল ধরনের জায়গা। বড় বড় বাঁশঝাড় আর ঝোপে ভরা। দিনের বেলাতেই যেতে কেমন লাগে যেন। রাতের বেলাতো ওটার ধারে কাছ দিয়েও মানুষ যায় না। তাজলের কবরটা দেয়া হল জঙ্গলের মাঝামাঝি একটা জায়গায়। সরু পথ কেটে জঙ্গলের ভেতর তাজনের কবর পর্যন্ত নেয়া হয়েছিল। তাজলের জানাযার সময় অনেক মানুষ এসেছিল ওকে দেখতে। তাই কবর দিতে দিতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। প্রচন্ড গরম পড়েছিল সেদিন। কবর দিতে গিয়ে সবাই ঘেমে নেয়ে একাকার। সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টির ভাব শুরু হল। ঘন মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, গর্জন করছে গম্ভীর স্বরে। গোরস্থানের বাঁশঝাড়গুলো একবার এদিক দুলছে আরেকবার ওদিক।

দাফনের কাজ শেষে সবাই মোনাজাত ধরেছি সবে এমন সময় বৃষ্টি নামল চারপাশ ঝাপিয়ে। এমনিতেই সন্ধ্যা তার ওপর ঘন মেঘের জন্য চারপাশে অন্ধকার নেমে এসেছে। জানাযার নামাজে মুসল্লি যতজন হয়েছিল-দাফনের সময় এসেছে একেবারেই কম। মাত্র আটজন।

ইমাম সাহেব সবে হাত তুলে দোয়া পড়ানো শুরু করেছেন তখন নামল বৃষ্টি। আমরা কবরটা চারপাশ থেকে ঘিরে মোনাজাত করছি। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়াতে খারাপ লাগছে না। গরমের হাত থেকে বাঁচা গেল। চোখ বন্ধ করে মোনাজাত করছি।

প্রথম দিকে কেমন একটা গোঁ গোঁ চাপা শব্দ হচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল না শব্দটা কোথা থেকে আসছে। হঠাৎ ঘটল ঘটনাটা। প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে আচমকা কবরের ভেতর থেকে কাঁচা মাটি ফুঁড়ে একটা কালো কুচকুচে হাত বের হয়ে এলো! বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা হাতটার গায়ে লেগে থাকা কাদা মাটি ভিজিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। আমরা যারা ছিলাম ওখানে ব্যাপারটা অনেকেই প্রথমে খেয়াল করল না কারণ মোনাজাত করছিল সবাই নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে। সম্ভবত আমিই প্রথম দেখলাম ব্যাপারটা। জমে গেলাম বরফের মত। আমার থেকে বড়জোড় দুই হাত সামনে কবরের ভেতর থেকে হাতটা কব্জি সহ আরো একটু বেরিয়ে এসেছে! কয়লার মত কালো হাত। দ্বিতীয় ধাক্কায় অন্য হাতটা বের হয়ে এলো কবর ফুঁড়ে! সেই হাতে একটা ত্রিশূ্ল ধরা! ত্রিশূলের চকচকে ফলা বজ্রপাতের আলোয় জ্বলজ্বল করছে! আমি শুনতে পেলাম বাকিরা ভয়ঙ্কর আতংকে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পালানো শুরু করেছে! আমিই কেবল নড়তে পারছিনা। আমার দুই পা যেন হাজার মণ ভারি হয়ে গেছে। মাটি থেকে তুলতেই পারছি না।

বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে দেখলাম কবরের বাঁশ চাটাই সব ঠেলে নিচ থেকে কালো কুচকুচে একটা মানুষের মাথা বের হল কবরের মাটির ওপর! বজ্রপাতের সাদা আলোতে দেখতে পেলাম হলুদ রঙের দুটো চোখে মানুষটা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছে! মানুষের চোখের মণি এরকম হলুদ হতে পারে না! লোকটার গলায় পেঁচানো কালো বিষধর একটা সাপ! ফণা তুলে হিস্ হিস্ করছে……

আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। বোধহীন জড়বস্তুর মত সেখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমার চোখের সামনে মানুষটা কবর ভেঙে উঠে এল মাটির ওপর। কাদা মেখে আছে লোকটার গায়ে। সাদা কাফনটা দিয়ে কোমড়ের অংশটা পেঁচিয়ে রেখেছে। তাজল শেখ!

এত কালো ছিল না দাফনের আগেও….. এখন দেখতে ওকে ঠিক সেই শিব মূর্তিটার মত লাগছে অবিকল….. তাজল আমার দিকে তাকিয়ে চিনতে পারার মত কোনো ভাব দেখালো না। হলুদ রঙের জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে দীর্ঘ একটা মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে খুরওয়ালা পায়ে সাবলীল ভঙ্গিতে হেঁটে বৃষ্টির মাঝে জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে গেল! ওর পিঠে আরো দুইজোড়া হাত টিউমারের মধ্য থেকে নড়ছে….

আমি নিজের পায়ের উপর ভর টিকিয়ে রাখতে পারছিলাম না। কেবল মনে হচ্ছিল ভয়ঙ্কর অশুভ-অশূচি কিছু একটা ঘটছে…….

ঘটনাটা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল সারা গ্রাম জুড়ে। এমনকি শিব মন্দিরের পুরোহিতদের কান পর্যন্ত চলে গেল। সেই রাতেই মন্দিরের পুরোহিতরা চলে এলো গোরস্থানে। তাদের কথা অনুযায়ী তাজল শেখ হল তাদের দেবতা- তার শরীরে শিব ভর করেছে। কবরটার ভেতরে তখন হাজার হাজার সাপ কিলবিল করছে যখন পুরোহিতরা যায় ওখানে। কিন্তু তাজল শেখকে পাওয়া যায়নি। বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে। মশাল জ্বালিয়ে সারা জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খুঁজল মন্দিরের সবাই। বার বার বলতে থাকল তারা- তাদের দেবতা মন্দির ছেড়ে চলে এসেছে বলে মন্দিরটা ভেঙে গেছে। মাটির নিচে চলে গেছে মূর্তিগুলো। তাই তাদের দেবতাকে খুঁজে বের করতে হবে।

কিন্তু চারপাশের দশ মাইল চষে ফেলার পরও তাজল শেখকে পাওয়া যায়নি। সে রাত থেকে আমার প্রচন্ড জ্বর শুরু হল। এমন জ্বর বহুদিন হয়নি। কাউকেই চিনতে পারছিলাম না। কেবল বিছানায় শুয়ে কাথার নিচে কাঁপছিলাম থরথর করে আর পাগলের মত প্রলাপ বকছিলাম।

সুলতানার কোনো আত্বীয় স্বজন ছিল না। কারণ তাজল শেখ মারা যাবার সময় কেউ আসেনি। থাকলে নিশ্চই আসতো। স্বামী মারা যাওয়ায় মেয়েটা পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। তোমার চাচী সুলতানাকে এবাড়িতে এনে রেখেছিল কিছুদিন। কারো সঙ্গে কোনো কথা বলত না। একা একটা ঘরে সারাক্ষণ দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। কিছু খেতেও চাইত না। ফেলে দিত সব। জয়গুন অনেক চেষ্টা করেও সুলতানাকে কিছু খাওয়াতে পারত না। দেখতে দেখতে হাসিখুশি মেয়েটা চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে লাগল। শুঁকিয়ে চোয়ালের হাড় বের হয়ে এল। বড় মায়া লাগত মেয়েটাকে দেখে।

আমার জ্বর থেকে সেরে উঠতে পাঁচদিন সময় লাগল। সুস্থ হবার পর প্রায়ই গিয়ে সুলতানাকে বোঝাতাম খাওয়া দাওয়া করার জন্য। মানুষ মারা যাবে এটাইতো স্বাভাবিক। এভাবে ভেঙে পরলে তো জীবন চলবে না। ওর বয়স কম। সামনে ওর পুরো জীবনটা পরে আছে। কিন্তু এত কথা বলে কোনো লাভ হত না। মূর্তির মত যে মেয়েটা বসে থাকত তো থাকতই। কোনো কথাই বলত না।

প্রায় রাতেই মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে ফিরে আসলে সুলতানার ঘরের দিক থেকে শুনতে পেতাম একা একা কথা বলছে মেয়েটা। শুনে মনে হয় যেন কারো সঙ্গে কথা বলছে -কেবল অন্যজনের কথা শোনা যাচ্ছেনা। আমি পাগলের প্রলাপ ভেবে পাত্তা দিতাম না।

তাজল শেখের কবর থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনাটা সুলতানাকে কেউ বলেনি। বললে কি করত কে জানে। এমনিতেই তাজলের শোকে পাথর হয়ে আছে।

আমি শুক্রবার বিকেলে আমাদের বাড়িতে হুজুর এনে মিলাদ দেয়ালাম। কারণ তাজল শেখ মারা যাবার পর থেকেই এই বাড়িটা কেমন যেন হয়ে গেছে। যদিও এ বাড়িতে তাজল থাকত না। কিন্তু সুলতানা আসার পর থেকে এ বাড়িতে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। খুব বেশি সাপ বের হচ্ছে বাড়ির নানান জায়গা থেকে। হাঁস মুরগি গুলো সব মরতে শুরু করেছে একে একে। আর বাড়ির চারপাশে কে যেন মাটি খুঁড়ে বড় গর্তের মত করে রাখে প্রতিরাতে।

মিলাদের পরদিন কাজের চাপে সারাদিন বাসায় আসতে পারলাম না। গঞ্জে যেতে হয়েছিল মালপত্র নিয়ে আসতে। সেসময় এখানে লোক এসে কোল্ড স্টোরেজ়ে বস্তা দিয়ে যেত না। গঞ্জে আমার মূল অফিসে দিয়ে যেত। আমাকে নিয়ে আসতে হত। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। নামাজের পর ফিরলাম। রাতে আমি মসজিদ থেকে ফিরে সবে বাড়িতে পা রেখেছি অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। বাড়ির কোথাও কোনো আলো নেই। কারেন্ট না থাকতে পারে কিন্তু হারিকেন তো জ্বলবে-সেটাও জ্বলছে না। আমি হাতের টর্চ দিয়ে এদিক সেদিক দেখলাম। জয়গুন কিংবা আমার বড় মেয়ে কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই। অবাক হলাম ভীষণ। এমনকি চারপাশে অদ্ভুত একটা নিস্তব্ধতা, কোনো ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দও নেই। হাঁস মুরগির খোঁপ গুলোতেও কোনো আওয়াজ হচ্ছে না! সারা বাড়ি যেন কবর হয়ে আছে!

আমি জয়গুনের নাম ধরে সবে ডাকতে যাবো- মুখ খুলেছি- হঠাৎ শুনতে পেলাম সুলতানা ওর ঘরটা থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অস্পষ্ট গলায় কিছু বলছে। বোঝা যাচ্ছে না। আমি টর্চের আলো ফেললাম ওর ঘরটার দিকে, জানালা বন্ধ, দরজাও বন্ধ। অন্ধকারে ভয় পেয়ে কাঁদছে নাকি? আমি এগিয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি। ওর ঘরটার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে যাবো-থমকে গেলাম আমি। স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা পুরুষ কন্ঠে কেউ বলছে, “মোর নগত কাহো আসিবা পারিবা নাহায় …….”

কন্ঠটা শুনে জমে গেলাম। তাজল শেখের গলা! শুনতে পেলাম সুলতানা ভাঙা গলায় বলছে, “মুই যাম, মুই একলা রহিবা পারিবা নহু।”

আমি দরজার ফাঁক দিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকালাম ভেতরে কি হচ্ছে দেখার জন্য। কিন্তু তার আগেই আমার হৃদপিন্ডটা ধরাস করে উঠল। আমি দরজার যে অংশে চোখ রেখে তাকাতে গেছি- ঠিক সেখানেই হলুদ একটা চোখ আমার দিকে ওপাশ থেকে চেয়ে আছে দরজার ওপাশ থেকে!

গোরস্থানের সেই তাজলের চোখগুলো!

আমি আতংকে পেছন দিকে ছিটকে এলাম। পায়ে পা বেঁধে হোচট খেয়ে পরে গেলাম উঠানে। টর্চটা হাত থেকে গড়িয়ে অন্যদিকে চলে গেল। আমি ভয়ার্ত চোখে দেখলাম সুলতানার ঘরের দরজা খুলে গেল। চাঁদের ঘোলাটে আলোয় দেখা গেল তাজল শেখের সেই দেবতা রুপটা একহাতে ত্রিশূল নিয়ে, গলায় সাপ পেঁচানো- কালো কুচকুচে মুখে হলুদ দুটো চোখ। জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! অন্য হাতে সুলতানার একটা হাত ধরে রেখেছে। আমি নড়তে পারছিলাম না ভয়ের চোটে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তাজল সুলাতানার হাত ধরে নেমে এল উঠানে। আমার দিকে না তাকিয়ে দুজন সোজা হেঁটে যেতে লাগল ওদের মাটির বাড়িটার দিকে! পুরো দৃশ্যটায় ভয়ংকর একটা অশুভ আর অবাস্তব ব্যাপার রয়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমি খুব ভয়াবহ একটা দুঃস্বপ্ন দেখছি। কারণ আমি চাঁদের আলো আর পরে থাকা টর্চের আলোতে আবছা ভাবে দেখতে পাচ্ছি সুলতানার ঘরের খোলা দরজাটা দিয়ে-সিলিং থেকে সুলতানা ঝুলে রয়েছে ঘরের ভেতর! ওর শাড়িটা ফাঁস বানিয়ে গলায় দেয়া, ব্লাউজ আর পেটিকোট পরনে। দু’পা সোজা হয়ে রয়েছে, আঙ্গুল গুলো মাটির দিকে!

বিস্ফোরিত চোখে অন্য দিকে তাকালাম। এখনো চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে সুলতানা ওর স্বামীর দেবতা মূর্তির হাত ধরে ওদের পুরনো ভিটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জমির আল দিয়ে। সুলাতানা যদি ওখানে থাকে-তবে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে কে?

আমি হাঁচড়ে পাচড়ে উঠে টর্চ হাতে দৌড়ে ঘরটায় ঢুকলাম। সুলাতানা ঘরে ফাঁস দিয়ে ঝুলে রয়েছে। এক নজর দেখেই বোঝা গেল ফাঁসটা এখন না, বেশ আগেই খেয়েছিল। ফুলে রয়েছে সারা শরীর!

আমি খুব একটা সাহসী মানুষ তা বলব না। তবে সে সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলাম। জয়গুন আর বড় মেয়েকে না দেখতে পাওয়ার কারণটা বুঝতে পারলাম। সম্ভবত লাশটা দেখে ভয়ের চোটে অন্য আধিয়ারদের বাড়িতে চলে গেছে। আমি নেই- ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। হয়ত অন্যদের ডেকে আনার আগেই আমি চলে এসেছিলাম।

সুলতানার লাশটা নামাতে গেলাম না আমি। পুলিশি ব্যাপার। ওরা আসুক আগে। কতক্ষন আগে ফাঁস খেয়েছিল কে জানে। লাশটা দ্রুত ফুলে যাচ্ছে।

আমি উঠানে বেরিয়ে এলাম টর্চ হাতে। দেখতে পেলাম চারপাশের জমিগুলোর আধিয়ারদের বাড়ি থেকে হারিকেন হাতে লোকজন ছুতে আসছে ক্ষেতের মাঝ দিয়ে।

আমি তাজলদের মাটির বাড়িটার দিকে তাকালাম। শিরশির করে উঠল গা।

ভোররাতে পুলিশ যখন আসে তার একটু আগে সুলতানার লাশটা বেশি ফুলে গিয়ে শাড়ি ছিঁড়ে মেঝেতে পড়ে যায়। ঠিক একই সময়ে তাজলদের মাটির বাড়িটা অদ্ভুতভাবে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে। একেবারে মিশে যায় বাড়িটা……” থামলেন সাত্তার সাহেব।

আস্তে আস্তে বললাম, “সুলতানা এমন করল কেন?”

হাসলেন তিনি, “সংসার। সংসার বড় আজব জিনিস। । বেধে রাখা যায় না, আবার ছেঁড়ার পরেও জোড়া দেয়ার বড় পাগল নেশায় টানে……. সুলতানাকে সংসারের নেশায় ধরেছিল, তাজলের সংসারের নেশা। কাটাতে পারেনি সেটা। ফাঁসিতে ঝুলে নতুন করে ছেঁড়া সম্পর্কটা জুড়ে দিতে চেয়েছিল।” চুপ হয়ে গেলেন দীর্ঘ কয়েকটা মুহূর্তের জন্য। চারপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোঁকার একঘেয়ে ডাক।

আমি ঢোক গিললাম, “তারপর?”

“তারপর অনেক ঘটনা ঘটেছিল, সব বলার মত না। তবে একটা ব্যাপার- ওরা মারা যাওয়ার পর আমার কোল্ড স্টোরেজে প্রায় রাতেই তাজল আর সুলতানাকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে অনেকে। আমি নিজেও তালা বন্ধ করতে গিয়ে বেশ কয়েক রাতে দেখেছি। আবছা অন্ধকারের মাঝে কোল্ড স্টোরেজের ভেতরে বাঁশের তাকগুলোতে বস্তার উপর পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে তাজল শেখ।পায়ে ঘোড়ার খুর,গলায় সাপ। চুপচাপ বসে আছে প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝে। কুয়াশার মত ধোঁয়া ওর চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। অদ্ভুত সুরে বিজাতীয় ভাষায় গুনগুণ করে গান গাওয়ার মত করে কিছু একটা বলে তাজল শেখ। কাকে বলে জানিনা। কিন্তু ঐ সময়টায় পুরো এলাকার সব ঝিঁ ঝিঁ পোকা, শিয়াল, খাটাস- একদম চুপ মেরে যায়। কোনো প্রাণের সাড়া পাওয়া যায় না।”

হুক্কা টানতে গিয়ে খেয়াল করলেন আগুন নিভে গেছে। বিরক্ত হলেন যেন পাইপটার উপর। ফেলে দিলেন একপাশে পাইপটা। দীর্ঘ নীরবতা।

“জামাই, অনেক রাত হয়েছে। ঘুমায় পরো বাবা।” জয়গুন চাচী বললেন এক সময়।

আমি মাথা কাত করে উঠে দাঁড়ালাম। চারপাশে কুয়াশার মত বৃষ্টি, তার মাঝেই মেঘ সরে গিয়ে চাঁদের ঘোলাটে আলো ছড়িয়ে পরেছে চারপাশের ক্ষেত গুলোতে। চাঁদের আলোতে মিহি বৃষ্টি। হঠাৎ খেয়াল করলাম চারপাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকা, শিয়াল, কুকুর- কোনো কিছুর ডাক শোনা যাচ্ছে না! গায়ে কাঁটা দিল! কেন যেন মনে হল অন্ধকার জমির সেই জায়গাটায় আলের ওপর থেকে কেউ একজন জ্বলজ্বলে হলুদ চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এইদিকে। চোখের ভূল কিনা বুঝতে পারলাম না। তবে হঠাৎ যেন লাগল সেখানে কম বয়সী একটা মেয়ের আবছা অবয়ব প্রকট হচ্ছে ধীরে ধীরে প্রথম জনের পাশে…..

মোঃ ফরহদ চৌধুরী শিহাব (ভূতুড়ে গল্প)

আধিয়ার (প্রথম পর্ব)

2

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

বিয়ের মাত্র এক মাস হয়েছে। শ্বশুড় সাহেব অসুস্থ শুনে বৌকে নিয়ে দেখতে গিয়েই বিপদ হল। নতুন জামাইকে আলুর বস্তা ধরিয়ে দিয়ে কেউ কোল্ড স্টোরেজে পাঠাবে এটা আশা করিনি। তারওপর কলেজ পাস জামাই আমি। এলাকায় একটা সুনাম আছে আমার- সেই আমাকেই কিনা আমার নতুন শ্বশুড় আব্বা তার এই বছরের আলু গুলো বস্তায় বেধে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “বাজান, শরীলটা ভাল ঠেকতেছে না। আলুর বস্তা গুলা একটু ঠাকুরগাঁও গিয়া কোল্ড স্টোরেজে রাইখা আসো। ঘরে তো ছেলে পেলে নাই। তুমিই যখন আসছো – একটু কষ্ট কইরা আলু গুলা দিয়াসো। আমার নাম বললেই হবে। রিসিটে নাম্বার দিয়া দিবে। রিসিট নিয়া আসবা সাবধানে। বস্তা প্রতি দুইশো পনেরো টাকা লাগবে। টেরাক দিয়া দিছি। নিয়া পৌছায়া দিবে।” বোগল ঘ্যাস ঘ্যাস করে চুলকাতে চুলকাতে বললেন কথাগুলো। হাত পাখার ডাট দিয়ে পিঠে চুলকালেন, ঘামাচি হয়েছে তার।

আমি কোনো মতে মুখে হাসি টেনে বললাম, “অবশ্যই আব্বা। কোনো চিন্তা করবেন না। যাবো আর আসবো।”

“রাস্তা খারাপ। যাবো আর আইবো বললে হবে না। যাইতে যাইতে সন্ধ্যা হইয়া যায়। স্টোরের মালিক আমার বদনু মানুষ। সাত্তার আলী। সে তোমার আর ড্রাইভারের থাকার ব্যবস্থা কইরা দিবে সেখানে। পরের দিন টেরাক নিয়া চলে আসবা।”

“জী আচ্ছা আব্বা।” ঘাড় কাত করে বললাম। আমার স্ত্রী পারুল পাংশু মুখে খাটের স্ট্যান্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আব্বাকে বাধা দেয়ার সাহস নেই তার। তবে আমার শ্বাশুড়ি আম্মা একটু চেষ্টা করলেন কথা বলার, “ ইয়ে, নতুন জামাই মানুষ। শিক্ষিত পোলা। তারে দিয়া এইসব কাজে না পাঠাইলে হয় না?”

ধমকে উঠলেন আব্বা, “তুমি চুপ করো। মহিলা মানুষ- বুদ্ধি শুদ্ধি তোমার হাটুর নিচে। শিক্ষিত পোলা দেখেই তো হিসাব পাতির কাজ দিয়া পাঠাইতেছি। অন্য কাউরে দিলে তো সব উল্টায় পাল্টায় দিবো!”

আমি জোর করে হাসি আনলাম মুখে, “জী আব্বা ঠিক বলেছেন। হিসাব কিতাবের ব্যপার। যে কেউ কি আর বুঝবে? আমার যাওয়াটাই ভাল হবে।”

“উত্তম বলছো জামাই। এই জন্যই তোমারে আমার এত পছন্দ। ভাল কথা, আমার বন্ধু সাত্তার আলীরে আমি মোবাইল ফোনে সব বইলা রাখছি। তুমি খালি নিয়া যাবা বস্তাগুলা। বাকি কাজ তার। সে কিন্তু আমার মত গেরস্থ না। খুব শিক্ষিত মানুষ। আমাদের আমলের বি.এ. পাস। বিরাট বড়লোক। আদব লেহাজের সাথে চলবা। সে যেন মন্দ কথা না বলে তোমারে নিয়া।” আব্বা বোগল যে হারে চুলকাচ্ছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে পাঞ্জাবীর বোগল আজকে ছিঁড়েই উঠবেন। নতুন খদ্দরের পাঞ্জাবী কিনে এনেছিলাম তার জন্য। কিন্তু ওনার হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে পাঞ্জাবীটা কাপড়ের না, বিচ্ছুটি পাতার পাঞ্জাবী।

“জী আব্বা।” আমি মাথা কাত করে উঠে পরছিলাম। উনি বললেন, “জামাই, তোমার পছন্দ বড় ভাল।”

“জী আব্বা?” বুঝতে না পেরে ফিরে তাকালাম।

“এই যে পাঞ্জাবীটা আনছো- খুব ভাল পাঞ্জাবী। কিন্তু মাড়ের গন্ধটা একদম সহ্য করবার পারিনা। তাই আতর মাখছি। আতর মাখলেই ঈদ ঈদ লাগে।” দেখলাম একটা শিশি থেকে আতর নিয়ে পাঞ্জাবীতে লাগাচ্ছেন। এই নিয়ে তেরো চৌদ্দবার আতর মাখলেন, “মাখবা নাকি একটু?”

একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, “ না আব্বা। আপনি মাখেন।”

আমার শ্বশুড় বাড়ি হল ময়দানদীঘি নামের একটা জায়গায়, পঞ্চগড় জেলার পূর্ব দিকে। এখানে প্রায় সব পরিবারই কৃষি নির্ভর পরিবার। তার মধ্যে আমার শ্বশুড় শমসের মিয়া হলেন বিশাল ধনী কৃষক। মাইলের পর মেইল জমি তার। তার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করেছি এক মাস হল। শ্বশুড় বাড়ি আসতে না আসতেই আলুর বস্তা নিয়ে ঠাকুরগাঁও যেতে হবে- ভাবিনি।

এখান থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের দূরত্ব দুই ঘন্টার রাস্তা। তবে গ্রামের ভেতরের রাস্তা খারাপ বলে সময়টা আরো বেশি নেয়। আলুর বস্তা ট্রাকে নিয়ে আরো আগে বের হওয়া যেত। কিন্তু বের হতে হতে বিকেল তিনটা বেজে গেল আমার। বেশ অসন্তুষ্ট মনে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছি। ড্রাইভার মতিন পাশে। গান ধরেছে হেড়ে গলায়-

“আমার লাইন হইয়া যায়

আঁকা বাঁকা

ভাল না হাতের লেখা……….”

লাইন আঁকা বাঁকার সঙ্গে রাস্তার সম্পর্ক কোথায় বুঝলাম না। সে একবার ডানে যায়, একবার বামে। ট্রাক জমির মধ্যে নামিয়ে দেবে যেন! আমি প্রমাদ গুণছি মনে মনে। ঠাকুরগাঁও আদৌ পৌছাবো তো? নাকি ট্রাক উল্টে জমির মধ্যে পরবো?

“দুলাবাই? মুখের কন্ডিশন এরুম ক্যা?” মতিন দাঁত বের করে হাসল।

“তুমি ভাল করে ট্রাক চালাও। সন্ধ্যার আগে আগে ঠাকুরগাঁও যেতে হবে।” থম থমে গলায় বললাম।

“রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ দুলাবাই। যাতি যাতি রাত্তির নামিবি।” গ্রামের কাঁচা রাস্তা দেখিয়ে বলল ও।

“এটা তো আরো ভালো কথা!” বিড়বিড় করলাম। হাতে একটা চিরকুটে কোল্ড স্টোরেজের ঠিকানা দেয়া-

“হিমাদ্র কোল্ড স্টোরেজ,

বাঘাই পট্টি, ঠাকুরগাঁও।”

কতক্ষণে যে পৌছাবো……

হাত ঘড়িতে সাড়ে ন’টা বাজে। হিমাদ্র কোল্ড স্টোরেজে এসে আলুর বস্তাগুলো নামিয়ে তাতে নাম্বার দিয়ে স্টোরে জমা দিতে দিতে দেরি হয়ে গেল। কোল্ড স্টোরেজের মালিক সাত্তার আলী অনেক সাহায্য করলেন এ সময়। নিজের লোক দিয়ে বস্তা গুলো আনলোডিং এর কাজ করে দিলেন। ভদ্রলোকের বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। মাথা ভর্তি পাঁকা চুল। মুখে পাতলা গোঁফ। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা পরে থাকেন সারাক্ষান। হঠাৎ করে দেখলে ভার্সিটির প্রোফেসর বলে মনে হয়। খুব ফর্সা আর শক্ত সামর্থ একটা চেহারা। দেখেই বোঝা যৌবন কালে অসম্ভব সুদর্শন ছিলেন। নতুন জামাই বলে খুব খাতির যত্ন করলেন। মতিনকে আবার ট্রাক নিয়ে উত্তরে যেতে হবে এখান থেকে। আব্বা কোনো কাজ দিয়ে দিয়েছেন ওকে। কোল্ড স্টোরেজের লোকদের সাথে আগেই খেয়ে নিল। সাত্তার সাহেব চাচ্ছিলেন মতিন ওনার বাসায় খেয়ে যাক এক বেলা, কিন্তু ওর নাকি তাড়া আছে। জরুরী কাজ দিয়েছেন শ্বশুড় আব্বা। মালপত্র নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।

সাত্তার আলী আমাকে নিয়ে কোল্ড স্টোরেজের পেছনের দিকে ওনার বিশাল টিনের বাড়িতে এলেন। হিমাদ্র কোল্ড স্টোরেজ আর টিনের বাড়িটা একেবারে সামনা সামনি। কোল্ড স্টোরেজের বিল্ডিংটা পাঁচ তলা বিল্ডিং এর সমান উঁচু, অনেক বড়। পেছনে জেনারেটর হাউস আর কুলার মেশিনের ঘর। রাতের ঝিঁ ঝিঁ পোঁকার শব্দ ছাপিয়ে মেশিনের শব্দ রাতের বাতাস ভারী করে রেখেছে।

আমি টিনের বাড়িটার একটা ঘরে বসে আছি। বাংলা ঘরের মত অনেকটা। বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায় খুব শখ করে বানিয়েছেন সাত্তার আলী। নাস্তা দিয়েছে। একটু পর রাতের খাবার দেবে। আমি বসে বসে গল্প করছি সাত্তার আলীর সাথে।

“চাচা, এত টাকার কারবার, কিন্তু বাড়িটা পাঁকা না করে টিন শেডের করলেন কেন?”

“তোমার চাচী আম্মার ইচ্ছা। উনার ভয় একদিন ভূমিকম্প হবে আর ছাদ ভেঙ্গে পরবে মাথার উপর, টিন শেডের হলে তো আর তেমন কিছু হবে না যদি ভেঙ্গে পরে- তাই।” হাসতে লাগলেন।

চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলাম। ওপরে গাঢ় স্বর ভাসছে। গরুর দুধ দিয়ে বানানো। চুমুক দিতেই শরীরটা ঝরঝরে লাগা শুরু করল।

“চাচী আম্মা কি ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ? নাকি বাড়ি দূরে?”

“সোঁনাগাজী। দূর আছে। বছরে একবার যায় ঘুরে আসতে। নয়তো সারা বছরে বাড়ির কাজ নিয়ে পরে থাকে।” দরজা দিয়ে বাহিরে রান্না ঘরের দিকে তাকালেন, চাচী সেখানে বসে রান্না করছেন লাকড়ির চুলায়। গলা উঁচিয়ে বললেন, “কই? তাড়াতাড়ি করো। জামাই মানুষ- কতক্ষণ না খাওয়ায় রাখবা?”

শুনতে পেলাম চাচী বলছেন, “এই তো হয়ে গেছে। তোমরা গল্প করো। আমি ঠিক ঠাক করে নেই।” কড়াইয়ের তেলে মাছ ভাজার শব্দ হচ্ছে, বাতাস মোঁ মোঁ করছে সেই ঘ্রাণে। আমার পেটের ক্ষিদেটা আরো চাগিয়ে উঠল। সেটাকে ঢাকতে সাত্তার সাহেবের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম। ভদ্রলোক বেশ বাঁচাল স্বভাবের মানুষ, প্রচুর কথা বলেন। সারাক্ষণ চেষ্টা করেন বইয়ের মত শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে, তবে মাঝে মাঝে আঞ্চলিকতা এসে পরে। কথা বলে জানা গেল ভদ্রলোকের তিন মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। দুই জন থাকে দুবাই স্বামী বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে, আরেক জন থাকে পঞ্চগড় শহরে। এই বিশাল বাড়িতে মানুষ বলতে এখন সাত্তার সাহেব, তার স্ত্রী জয়গুণ নাহার আর কামলা মোতালেব থাকে। মোতালেব রাত কানা মানুষ। তাই সন্ধ্যা হতে না হতেই খেয়ে ঘুমিয়ে পরে। সাত্তার সাহেবের ধারণা মোতালেব আসলে রাত কানা না, কাজ যাতে কম করতে হয় তাই রাত কানার ভান করে থাকে। কারণ এই রাত কানা মোতালেবই গত বছর রাতের বেলা একটা সিঁদেল চোরকে ধরে গামছা দিয়ে বেধে রেখেছিল! সেই থেকেই গ্রামের লোকজন মোতালেবকে খুব তেয়াজ করে চলে। তাদের ধারণা মোতালেবের গায়েবি শক্তি আছে। রাতে না দেখতে পেলেও দৈব শক্তি বলে সব দেখতে পায়। তবে তার নাকি একটা বদ অভ্যাস আছে, ছোট থেকেই লুকিয়ে কেরোসিন তেল চুরি করে খায়। এ বাড়ির কোনো হারিকেনে তাই তেল থাকে না। মোতালেবকে দেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সে এখন ঘুমাচ্ছে। সন্ধ্যার সময় তাই কোল্ড স্টোরেজের এক লোক দিয়ে বাজার করিয়ে এনেছেন সাত্তার সাহেব।

ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরমে ঘামছি দর দর করে। মাথার ওপর হলুদ একটা বাতি জ্বলছে আর একটা ফ্যান ঘটর ঘটর করে ঘুরছে। বেশ জোরেই ঘুরছে- কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার গায়ে বাতাস লাগছে না! আমি হাত পাখা দিয়ে নিজেকে বাতাস করছি। সামনে সাত্তার সাহেব না থাকলে শার্টের দু একটা বোতাম খুলে বুকে পেটে বাতাস দেয়া যেত। কিন্তু ওনার সামনে তো আর তা করা সম্ভব না। নতুন জামাই বলে কথা।

সাত্তার সাহেবের বোধ হয় এত গরম লাগছে না। অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন, “তা জামাই, শুনলাম তুমি নাকি লেখা লেখি করো? টুকটাক বই পত্রও বের হয়েছে। সত্য নাকি?”

নড়ে চড়ে বসলাম। এই তথ্যটা পুরোপুরি ঠিক না। লেখা লেখি করার অভ্যাস আছে আমার ঠিকই। তবে হাজার চেষ্টা করেও বই বের করতে পারিনি। প্রকাশকদের কাছে পান্ডুলিপি নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে জুতার শুঁকতলা ক্ষয়ে গেছে- কিন্তু লেখা প্রেসের মুখ আর দেখেনি। লেখার হাত নাকি আমার যাচ্ছে তাই। ভাষা জ্ঞান ভাল না। তবে এক প্রকাশক গোপনে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “লেখা ছাপাইতে পারি- তয় একতা কথা, আমার কোম্পানির রাতের কাজের জন্য কিছু চটি বই লেখে দিতে হইবো। চটি বই কি জিনিস জানো তো?” হলুদ দাঁত বের করে হেহ হেহ করে হেসেছিল। ঢোক গিলে শুকনো মুখে চলে এসেছিলাম সেদিন। তখনই লেখা ছাপানোর চেষ্টার ইস্তিফা দিয়ে দিয়েছি। আমাকে দিয়ে লেখা লেখি সম্ভব না।

কিন্তু সাত্তার সাহেবকে তো আর এত কিছু বলা সম্ভব না। নিশ্চই আমার শ্বশুড় আব্বা বড় মুখ করে কথা গুলো বলেছেন। এখন যদি অন্য কিছু বলি তাতে শ্বশুর আব্বা কষ্ট পাবেন শুনলে। তাই ইতস্তত গলায় বললাম, “এই টুকি টাকি আর কি। তেমন বেশি কিছু না।”

“খুব ভালো অভ্যাস। ছাড়বা না, সবাই পারে না এইসব জিনিস।” বেশ ভরাট গলায় বললেন, “এক কালে আমিও চেষ্টা করেছিলাম লেখার, পারিনি।”

আমি মাথা ঝাঁকালাম কেবল, জোর করে হাসলাম।

বাড়িটার মেঝেটাই পাঁকা। দেয়াল, ছাদ- সব টিনের। খোলা জানালা দিয়ে হঠাৎ করে বেশ জোরে সোরে বাতাস আসা শুরু করেছে। উল্টো পাল্টা বাতাসে জানালার পর্দা উড়ছে। বাহিরে তাকালেন গা ছম ছম করে ওঠে। কোল্ড স্টোরেজ আর এই বাড়িটা ছাড়া এই এলাকায় দেড় দুই কিলোমিটারেও কোনো বাড়ি ঘর নেই। চারপাশে ভূট্টা আর পাটের বিছানো ক্ষেত। এগুলোর মালিক নাকি সাত্তার সাহেব। অন্ধকারে বাড়ির সীমানার বাহিরের ক্ষেত গুলোর দিকে তাকালে কেমন অদ্ভূত লাগে, জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম দমকা ঝড়ো বাতাসে ভূট্টা আর পাট ক্ষেতের লম্বা গাছ গুলো ধীরে ধীরে দুলছে, ঢেউ বয়ে যাচ্ছে যেন। বাহিরে চাঁদ নেই, কৃষ্ণপক্ষের রাত চলছে।

সাত্তার সাহেব খোলা দরজা দিয়ে বাহিরের আকাশটা দেখলেন এক নজর, “জামাই, বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। তোমার চাচী একা একা পাক ঘরে ভয় পাবে- আসো, বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসি।” উনি একটা চেয়ার নিয়ে বাহিরে বারান্দায় এলেন। আমিও একটা চেয়ার উঠিয়ে তাঁর পিছু পিছু এলাম।

এখানে বাতাস অনেক। ঘরের ভেতরের মত গুমোট ভাবটা নেই। গরম লাগছে না। ভালই লাগছে। বাতাসের ছোটা ছুটির মাঝে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির পানি হঠাৎ হঠাৎ হায়ে এসে পরছে।

“তুমি একটু বসো। কারেন্ট চলে যেতে পারে। হারিকেন জ্বালিয়ে আনি। মোতালেবের অত্যাচারে তো কেরোসিন লুকিয়ে রাখতে হয়।”

দেখলাম ভেতরের ঘরের আলমারি খুলে কেরোসিনের বোতল বের করলেন। দেয়ালে হারিকেন ঝোলানো ছিল- সেটা নামিয়ে আগে কেরোসিন ভরলেন। তারপর হারিকেন জ্বালালেন। আমি চুপচাপ বসে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি। উঠানের অন্য প্রান্তে রান্নাঘর। খোলা রান্না ঘর, লাকড়ির চুলাতে রান্না করছেন চাচী। তার ওপাসে কলতলা, যদিও বাড়িতে মোটর রয়েছে। তারপরো টিউবয়েলের ব্যবস্থা আছে।

চারপাশে নিচু জমিতে ভূট্টা আর পাট ক্ষেত। বাড়ি আর কোল্ড স্টোরেজটা জমির লেভেলে থেকে সামান্য উঁচুতে। যত দূর চোখ যায় ভূট্টা আর পাটের বিছানো ক্ষেত। অন্ধকারের সমুদ্র যেন। উঠানের এক পাশে কয়েকটা আমগাছ আর পেয়ারা গাছ। বাতাসের চোটে এদিক সেদিক দুলছে যেন মাতাল হয়ে। আকাশে থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।

সাত্তার সাহেব হারিকেন জ্বালিয়ে আমার সামনে এসে বসার সাথে সাথে কারেন্ট চলে গেল।

“বললাম না কারেন্ট যাবে! এই পল্লি বিদ্যুতের লাইন এত খারাপ!” বিরক্তি মেশানো গলায় বললেন তিনি। ফিরে রান্না ঘরের দিকে চেঁচিয়ে বললেন, “জয়গুণ, ভয় পেলে ডাক দিও। আমরা বারান্দাতেই আছি।”

রান্না ঘরে এখন চেরাগ জ্বালিয়েছেন জয়গুণ নাহার। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, “ভয়ের কি আছে? বয়স কি কম হয়েছে নাকি! এই বয়সে আবার কিসের ভয়?”

“ভয় না পেলেই ভাল।” চেয়ার টেনে বসলেন। হারিকেনের হলদে আলোয় তাঁর দিকে তাকালাম, “আমি এসে আসলে আপনাদের অনেক ঝামেলায় ফেলে দিলাম। চাচীর অনেক কষ্ট হচ্ছে। সাহায্য করারও কেউ নেই দেখি। একা ওনাকে এত সব ঝামেলায় না ফেললেই ভাল হত।” একটু অপ্রস্তুত গলায় বললাম।

হা হা করে উদার গলায় হাসলেন সাত্তার সাহেব, “আরে রাখো তো তোমার ভদ্রতা! নতুন জামাই তুমি। শমসের আলীর জামাই মানে আমারও জামাই। তোমার জন্য আরো অনেক কিছু করা উচিত ছিল। তাহলে ভাল লাগত নিজের কাছে। এগুলো তো সামান্য।”

আমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “কোল্ড স্টোরেজে জেনারেটর আছে এখানে আনলেন না কেন?”

“ছিল। কিন্তু লাইনে সমস্যা করছে কয়দিন ধরে।”

আমি কিছু বললাম না আর। একা দুজন বয়স্ক মানুষ আমার মেহেমানদারী করছেন- ভেবেই কেমন যেন খারাপ লাগছে। অন্ধকার জমি গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম এক দৃষ্টিতে।

“একে বারে বিরান জায়গায় বাড়ি করেছেন। থাকেন কিভাবে?” হঠাৎ প্রশ্ন করলাম সাত্তার সাহেবকে।

চশমাটা খুলে নাকের দুপাশের গভীর দাগ গুলোয় আঙ্গুল বোলালেন, “অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি আগে থেকেই ঘর কুনো স্বভাবের মানুষ ছিলাম। একা থাকতে ভাল লাগত। অবশ্য আগে ঘরটা এত খালি ছিল না। মেয়ে গুলো থাকতে বাড়িটা ভরা থাকত। বিয়ের পর চলে যাওয়ায় এখন বাড়িটা খালি হয়ে গেছে। জমি গুলো যে দেখছো- রাতের বেলা দেখা যাচ্ছে না, ওখানে আধিয়ারদের বাড়ি আছে ছাড়া ছাড়া ভাবে। আমার জমিতে থেকে চাষ করে খায়। তুমি তো এই এলাকার ছেলে- আধিয়ার মানে বোঝো তো?”

“জানি, বর্গা চাষী।”

সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন, “হ্যা। ওদের বাড়ি গুলো জমির মধ্যে, তাই এখন বোঝা যাচ্ছে না। দিনের বেলা দেখা যায়। তাই একেবারে যে বিরান জায়গা- তা বলা যাবে না।”

“কবে থেকে আছেন এখানে? মানে আপনার পৈতৃক ভিটা কি এখানেই ছিল?”

“নাহ। শহরের দিকে ছিল। এখানে এসেছি তো কোল্ড স্টোরেজ দেয়ার পর। একটু নিরিবিলি জায়গা পছন্দ আমার। তোমার চাচীও এ রকম জায়গায় থাকতে চেয়েছিল- তাই চলে এলাম বাড়ি করে।”

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বারান্দায় বসে থাকায় গায়ে বৃষ্টির ছিটে এসে পরছে। ভালই লাগছে।গরমে অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি আসায় হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

সাত্তার সাহেব চেয়ার টেনে সরে বসলেন, “আমার আবার একটুতেই ঠান্ডা লাগে, ভিজি না তাই।”

আমি হাসলাম কেবল। কিছু বললাম না। টিনের চালে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে । শব্দটা শুনতে খুব ভালো লাগছে। একটানা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। তাকিয়ে দেখলাম সাত্তার সাহেব এক দৃষ্টিতে জমি গুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। চোখে ভূলও দেখে থাকতে পারি- মনে হল তার মুখে অদ্ভূত একটা যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছে। অন্ধকার জমির দিকে স্থির চোখে চেয়ে আছেন।

ভাবলাম জিজ্ঞেস করবো- কিন্তু তার আগেই আস্তে আস্তে বললেন, “তুমি তো লেখা লেখি করো জামাই? জীবনে ব্যাখ্যাতীত কোনো ঘটনা ঘটতে দেখেছো?”

প্রশ্নটা কোন দিক থেকে করলেন বুঝতে পারলাম না, “ভূতের গল্প? মানে ভূতুড়ে ঘটনা? নাহ। আমি এমনিতেই ভীতু স্বভাবের মানুষ। ভূতুড়ে কিছু দেখলে জানে পানি থাকবে না আমার।”

“আমি দেখেছি।” একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকালেন।

“কি রকম?” সামান্য কৌতুহলি গলায় বললাম।

“আমি প্রায় ত্রিশ বছর আগে এখানে আমার কোল্ড স্টোরেজটা দিয়েছিলাম। তখনকার ঘটনা। আমার জমিতে আধিয়ার তখন অল্প। দুই তিনটা পরিবার হবে। আর আমার বড় মেয়ের বয়স তখন তিন কি চার। ছোট দুটো তখনো হয়নি। ঐ দিকে- ” হাত তুলে অন্ধকার জমির দিকে দেখালেন- একটু আগে সে দিকেই তাকিয়েছিলেন। “ওখানে একটা আধিয়ারের বাড়ি ছিল। মাটির বাড়ি। এখন নেই। বাড়িটা যার ছিল, মানে আধিয়ারটার নাম হল তাজল শেখ। পঞ্চগড় থেকে এসেছিল। শক্ত সামর্থ জোয়ান মানুষ। ওর বৌটা ছিল ঠিক ওর অর্ধেক বয়সের। সুলতানা। তের কি চোদ্দ হবে বয়স। বিয়ে করে এখানেই প্রথম এনে তুলেছিল। শ্যামলা রঙের হালকা পাতলা মেয়েটা। একা থাকতে পারতো না, দৌড় দিয়ে তোমার চাচীর কাছে চলে আসতো যখন তখন। এটা সেটা করে দিত। ভীশণ ভাল একটা মেয়ে। দেখতেও খুব সুন্দর ছিল। বয়স কম বলে সারাক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো। সেজে গুজে থাকতে খুব পছন্দ করত। তাজল প্রায়ই নানা রকম চুড়ি, লেস ফিতা, কাজল কিনে দিত মেয়েটাকে। আমার বড় মেয়েটা তখন কথা বলতে পারে বেশ ভাল মত, ওটাকে নিয়ে কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়াতো সে-ই জানে। আমিও কিছু বলতাম না। ছোট মানুষ- ছটফটে স্বভাবের তো হবেই। আমার কোল্ড স্টোরেজে প্রায়ই গিয়ে হাজির হত- বলত ঠান্ডা কুয়াশার মত স্টোর রুমে যেতে নাকি খুব মজা লাগে। আমিও কিছু বলতাম না, ছেলে মানুষ, নতুন বিয়ে হয়েছে – বাচ্চা স্বভাবটা এত তাড়াতাড়ি যায় নাকি। তাই নিষেধ করতাম না। বরং চারপাশে এ রকম ছটফটে স্বভাবের কাউকে পেয়ে ভালই লাগত, একা নির্জন এই জায়গাটাকে সুলতানা মাতিয়ে রেখেছিল বলতে পারো।

তাজল শেখ সারা দিন জমিতে চাষ বাষ নিয়ে পরে থাওক্ত, সুলতানা থাকত তোমার চাচীর সঙ্গে। তাজল মাটি কুপিয়ে সারাদিন খেটে যেত। বেশ ভাল একটা ছেলে – নামায কালামও পড়তো নিয়মিত। কত বার দেখেছি ভর রদ্দুরে জমিতে গামছা বিছিয়ে নামায পড়ছে। ওদের দুজনকে দেখলে এমনিতেই কেন জানি মনটা ভাল হয়ে যেত। ভাল মানুষ গুলোর ভেতরে বোধ হয় আল্লাহ নিজে কিছু দিয়ে দিয়েছেন। দেখলেই মন ভাল হয়ে যায় সে জন্য।”

কিন্তু ভাল মানুষ বেশি দিন থাকে না আমাদের মাঝে। দুনিয়ার বড় অদ্ভূত নিয়ম! তাজল একদিন জমি কোপাতে গিয়ে মাটির নিচে বাঁকা ভাবে বসে থাকা একটা মূর্তি আবিষ্কার করে। মূর্তিটা কালো রঙের শিবের মূর্তি। গলায় সাপ প্যাঁচানো। কিন্তু কিছু পার্থক্য রয়েছে। শিবের মূর্তিতে কোনো বাড়তি হাত ছিল না, এটায় আছে। তিন জোড়া হাত। সব থেকে বড় পার্থক্যটা হল এই শিবের মূর্তি কোমড়ের নিচ থেকে মাছের মত আঁশ আর পায়ের জায়গায় ঘোড়ার খুড়ের মত। অনেকটা গ্রিক পুরাণের কাহিনীর মত। আদৌ সেটা শিবের মূর্তি কিনা বোঝা গেল না। দৈর্ঘে চার ফুটের মত। তাজলের কোঁদালের আঘাতে মূর্তিটার কাঁধের দিকে বিশাল একটা জায়গা কেটে গেছে।

ঘটনাটা ঘটেছিল ভর দুপুরে। জমিতে কয়েকজন মিলে কাজ করার সময় হয়েছে। মাটি কোপানোর সময় শক্ত কিছুতে লাগতেই তাজল বাকিদের ডেকে মাটি খুঁড়তে শুরু করে। খুঁড়তে গিয়ে মূর্তি বের হয়। যারা যারা ওখানে ছিল- সবাই দেখেছে কোঁদালের কোপে মূর্তিটার কাঁধের দিক থেকে জীবন্ত প্রাণির মত ফিনকি দিয়ে রক্ত পরছে, কালচে রক্ত!

আমি অবশ্য যখন যাই তখন রক্ত টক্ত দেখিনি, তবে কাঁধের কাছটা কেটে মাংস বের হয়ে থাকার মত ফাঁক হয়েছিল তখনো। ব্যপারটা জানা জানি হতেই আশে পাশের মন্দির গুলো থেকে পুরোহিতরা চলে আসে দেখতে। একটা শিব মন্দির থেকে কয়েক জন ঠাকুর এসে মূর্তিটাকে গোসল করিয়ে নিয়ে চলে যায়। আমি বাধা দেইনি। কারো দেবতা আটকে রাখার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। যদিও আমি আমার জমিতে দেবতার মূর্তি থাকার পেছনে কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না। কিভাবে এলো পুরোহিতরাও জানে না। কেবল অনুমান করলেন হয়ত বহু বছর পূর্বে এখানে কোনো মন্দির জাতীয় কিছু ছিল, সেখান থেকেই এসেছে এটা। এর থেকে ভাল কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না

যা হোক। কাহিনী এর পর থেকে ঘটতে সুরু করে। যদিও বেশ ছোট ঘটনা।

তাজলের কাঁধে দু দিন পরেই আপনা আপনি বিশাল একটা কাটা ক্ষত সৃষ্টি হয়। মূর্তিটার কাঁধে যে রকম ঠিক সে রকম, কোনো কিছু দিয়ে কাটেনি। এমনি এমনি হয়ে গেল! দিন রাত চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পরে। আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার সেলাই করতে গিয়ে সুঁই ভেঙ্গে ফেলতে লাগলেন বারবার। অবাক হয়ে বললেন, “আশ্চর্য! এনার চামড়া মানুষের নাকি লোহার? ঢুকছেই না সূঁচ!” আমি নিজেও টিপে দেখলাম- লোহার মত হয়ে আছে কাটা জায়গাটার চারপাশের চামড়া! আর বরফের মত ঠান্ডা! ভীষণ অবাক হলাম! ক্ষত স্থান গরম হয় বলে জানতাম, এটা এমন কেন?

সেলাই করা সম্ভব হল না। ডাক্তার সাহেব রক্ত পরা থামাতে আয়োডিন লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। বাড়ি নিয়ে এলাম। তবুও রক্ত থামে না। এদিকে সুলতানা তো কান্না কাটি করে ঘর ভাসিয়ে দিচ্ছে তাজলের রক্ত দেখে। তোমার চাচী আর আমি মিলেও ধরে রাখতে পারছি না মেয়েটাকে।

তাজল খুবই শক্ত সামর্থ ছেলে। টানা দশ দিন এভাবে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ল, তবু ছেলেটা দিব্যি চলে ফিরে বেরাচ্ছে। এর মাঝেই একদিন আমাকে একা ডেকে জানাল তার কোমরের নিচ থেকে পঁচন ধরেছে। কেমন মাছের মত আঁশে ঢেকে যাচ্ছে। আমাকে দেখালো পা আর ঊরুর অবস্থা। আমি তো দেখে থ হয়ে গেলাম। ইলিশ মাছের মত জ্বলজ্বলে রুপালী আঁশে ঢেকে গেছে কোমর থেকে পা পর্যন্ত। পায়ের আঙ্গুল গুলো পঁচে যাচ্ছে……. আমি মহা দুশ্চিন্তায় পরে গেলাম।

তাজল মাথা চুলকে বলল, “সাত্তার ভাই, মোর মনে হয় ওই মূর্তি কুপাইয়া এই ব্যারাম ধরাইছ। নাইলে এতদিন তো ভালা আছিলাম।”

“কি করতে বলো তাহলে আমাকে?”

“গিয়া মূর্তিটার কাছে মাফ চাইয়া আসিম? ঠাকুরক কহিম মন্ত্র পড়ে পূজা দেয়ে দেক?”

“এরকম করে যদি লাভ হয়- করে দেখতে পারো। আমিও গেলাম তোমার সাথে।”

সেদিন আমি আর তাজল সন্ধ্যার দিকে রওনা হলাম পূর্ব দিকের শিব মন্দিরে। দশ মাইলের বেশি পথ। তাজল পায়ের পঁচন ব্যাথায় হাটতেই পারছে না। তবু দাঁতে দাঁত চেপে হেটে যাচ্ছে।

আমরা যতক্ষণে পৌছালাম- রাত হয়ে গেছে। গিয়ে দেখি নতুন কাহিনী- মন্দির গত পরশু রাতে আপনা আপনি ভেঙ্গে পরেছে! ভেতরের সব মূর্তি মাটির নিচে চলে গেছে! একটা মূর্তিও নেই! আমাদের সেই মূর্তিটাও না।

কি আর করা, তবুও পুরোহিত দিয়ে ছোট একটা পূজা দেয়ালাম। চলে এলাম তাজলকে নিয়ে। কিন্তু আসার বেলা তাজল হাটতেই পারলো না, ওর পায়ের আঙ্গুল পঁচে খুব খারাপ অবস্থা, গোড়ালির দিকটা কাঠের মত শক্ত হয়ে যাচ্ছে। কেমন যেন খুড়ের মত অবস্থা…….ভীষণ জ্বর তারওপর। শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আমি উপায় না দেখে একটা মোষের গাড়ি ভাড়া করলাম।

ফেরার পথে সারা রাত জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বকতে লাগল তাজল শেখ। প্রায় সব কথাই অর্থহীন, বিজাতীয় ভাষায় ও কি সব বলল। মনে হল কথাগুলো তাজল না, অনয কেউ বলছে। একতা কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল- বারবার বলছিল বলে বুঝতে পেরেছিলাম কথাটা-

“মোক ঠান্ডায় নিয়ে যা, মোক খুব গরম লাগেছে। মুই আলো বাতাসত রহিবা পারিমনে……”

তাজল শেখ মারা যায় এক মাসের মাথায়। মৃত্যুর পূর্বে ওর দুপা পঁচে গিয়ে খুড়ের মত হয়ে গিয়েছিল। পিঠের মেরুদন্ডের দিকে টিউমারের মত হয়ে দুই জোড়া হাতের মত তৈরি হয়েছিল- কিন্তু খুব ছোট। সারাক্ষণ মাটির বাড়ির মেঝেতে শুয়ে থাকতো। আর বিড়বিড় করে বলত ওকে বরফ দিয়ে চেপে ধরে রাখতে। কয়েকবার বলেছিল মাটি খুড়ে তাকে মাটি দিয়ে গলা পর্যন্ত ঢেকে দিতে। কোনোটাই করা হয়নি। সুলতানা ওর ওসুখ দেখে পাগলের মত হয়ে যায়। তাজল মারা যাওয়ার দিন রাতে নাকি একটা কালো সাপ এসে ওর গলায় পেঁচিয়ে বসেছিল। মারা যায় তারপর। সুলতানা তাজলের মৃত্যুর পাগল হয়ে গিয়েছিল।”

ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফ্বলল্বন সাত্তার সাহেব। আমি চুপচাপ তাঁর কথাগুলো শুনছিলাম, উনি থামতেই বললাম, “এখানেই শেষ? তাজল আসলে ঐ মূর্তিটার রূপ ধরে মারা গিয়েছিল- তাই না? এরপর? এরপর আর কিছু হয়নি?”

হাসলেন বিচিত্র ভাবে, কাঁশলেন খুক খুক করে, “এর পরেই তো আসল কাহিনীর শুরু। বললাম না ব্যাখ্যাতীত ঘটনা? তাজলের মৃত্যুর পরেই আসল ঘটনা শুরু হয়েছিল। যেটার কোনো ব্যাখ্যা আমি আজ পর্যন্ত ভেবে বের করতে পারিনি।”

বৃষ্টি বাড়ছে ক্রমশ। আমি অন্ধকার জমির দিকে তাকালাম নিজের অজান্তেই। গা শির শিরে একটা অনুভূতি হল………..

মোঃ ফরহদ চৌধুরী শিহাব (ভূতুড়ে গল্প)

অর্গ্যানের সুর

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

সকাল থেকে রাত অব্দি একটানা বৃষ্টি হচ্ছে । সেই সাথে মাঝে মাঝে বজ্রপাত । বিদ্যুৎ নেই তাই মোম জ্বালিয়ে শেলী উপন্যাস লিখছে । খুব শীঘ্রই তার এ উপন্যাসটা প্রকাশিত হবে । ঔপন্যাসিক হিসেবে শেলী রোজালীন বেশ নাম করা । নির্জনতা শেলীর ভাল লাগে । তাই হেনরিভিলে একটা বাড়ি কিনেছে কয়েক মাস আগে । বাড়িটা অর্ধ পুরোনো । বাড়ির মালিক ছিলেন হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক জেন কারমাইকেল । বাড়িটার একটা ভুতুড়ে গুজব রয়েছে বলে কেউ কিনতে চায়নি । এ বাড়িতে রাতের বেলায় নাকি অর্গ্যানের সুর ভেসে আসে মাঝে মাঝে ।

অনেকদিন বাড়িটা খালি পড়ে ছিল । পত্রিকায় বাড়ি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে শেলী একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল । তখনই হেনরিভিলে এই বাড়িটার খোঁজ পেয়ে অতি অল্প দামে শেলী বাড়িটি কিনে নেয় । তার মনের মত জায়গায় বাড়িটা পেয়ে শেলী এ জন্য আনন্দিত , উৎফুল্ল । এ বাড়িতে বেশ কিছু পুরোনা আসবাবপত্রের সাথে একটা পুরোনো অর্গ্যান ছিল । জিনিসগুলো একটা আলাদা ঘরে রেখে শেলী নিজের জিনিসপত্র দিয়ে ঘর সাজিয়ে নিয়েছে ।

অবিবাহিত শেলীর রান্নাবান্নার কাজ করে হাউজকিপার জুন মারিয়া । বেশ হাসি খুশি মহিলা । শেলী তাকে খুব পছন্দ করে । বৃষ্টির কারণে আজ আসতে পারেনি । তাই শেলীকে আজ খাবার কিনে খেতে হয়েছে । তার উপন্যাসটা প্রায় শেষের পথে । কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকাশককে দিয়ে দেবে ।

শেলী এক মনে লিখে চলেছে । ওদিকে টেবিলে রাখা মোমটা গলে গলে প্রায় শেষ । কিন্তু সেদিকে শেলীর খেয়াল নেই । বসার ঘরে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে । দপ করে মোমটা নিভে গেলে শেলী চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে আর একটা মোম জ্বালিয়ে আনল । হঠাৎই সে খেয়াল করল তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে । মোম হাতে নিয়ে রান্না ঘরের ফ্রিজ খুলে স্যান্ডউইচের প্যাকেট আর মিল্কশেক বের করল । টেলিফোনের শব্দ পেয়ে খাবারগুলো রান্না ঘরের টেবিলে রেখে নিজের ঘরে ফিরে এলো । হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জুনের কণ্ঠ ভেসে এলো । জুন বলল, ‘মিস শেলী আপনার কোন অসুবিধা হয়নিতো ? আসলে আমি বৃষ্টির কারণে আসতে পারিনি । লাইন খারাপ থাকায় ফোনও করতে পারিনি ।` শেলী হেসে বলল , ‘না না আমার কোন অসুবিধা হয়নি । তুমি কোন চিন্তা কর না । কাল বৃষ্টি কমলে চলে এসো ।` ‘আচ্ছা ঠিক আছে রাখি ।` শেলী ফোন রেখে রান্না ঘরে এসে দেখল খাবারগুলো নেই । হঠাৎই পাশের ঘর থেকে দুপদাপ শব্দ ভেসে এল শেলীর কানে । শেলী রান্না ঘর থেকে ছুটে বের হল । শব্দ শেষ হতে না হতেই পুরোনো অর্গ্যানটা বেজে উঠল মৃদুভাবে । ভীষণ ভয় পেল সে । পুরোনো অর্গ্যান কে বাজাতে পারে ভাবতে ভাবতে রুমের দিকে এগিয়ে গেল । আলতো করে দরজাটা খুলে উঁকি দিয়ে কাউকে দেখতে পেল না সে । পুরোনা অর্গ্যানটা পড়ে রয়েছে অনড় হয়ে । দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল । ভাবল সবই তার মনের কল্পনা । ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতে যাবে অমনি আবার অর্গ্যানটা বাজতে লাগল আগের চেয়ে কিছুটা জোরে । শেলী আবার দরজা খুলে উঁকি দিয়েই স্থির হয়ে গেল । ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার শরীরে । দেখল বেশ মনোযোগ দিয়ে অর্গ্যান বাজাচ্ছে কালো আলখেল্লা পড়া কেউ একজন । শেলী কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি ? এখানে কেন ?` শেলীর কথায় আগন্তুক অর্গ্যান বাজানো বন্ধ করে দিয়ে ধীরে ধীরে শেলীর দিকে আসতে লাগল । শেলী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । আগন্তুকের চেহারা দেখেই তার গলা চিরে বেরোলো চিৎকার । হাত থেকে মোমটা পড়ে গিয়ে নিভে গেল । প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত হল কাছাকাছি কোথাও । সেই সাথে বিদ্যুৎ চমকলো । সেই আলোয় দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোমশ শরীরের এক ভয়ঙ্কর জীব । মানুষের মত দুটি করে হাত পা থাকলেও মুখটা দেখতে একেবারে নেকড়ের মত । চোখ দুটো টকটকে লাল। দুটি বড় বড় দাঁত বেরিয়ে আছে ঠাঁটের বাইরে । অজ্ঞান হয়ে গেল শেলী । অনেক পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে শেলী প্রাণপণে দৌড় দিল নিজের ঘরের দিকে । বসার ঘর দিয়ে যাওয়ার সময় সোফার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল সে । কোন রকমে উঠে আবার দৌড় দিয়ে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল । কাঁপা হাতে টর্চ জ্বেলে টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল শেলী কিন্তু টেলিফোনের রিসিভার তুলতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল । টেলিফোন ডেড । কিছুক্ষণ আগেই সে জুনের সাথে কথা বলেছে । বাইরে বৃষ্টির বদলে এখন ঝড় শুরু হয়েছে । ঝড়ের কারণে কোথাও হয়ত তার ছিড়ে গেছে । নেকড়েরূপী জীবটা দরজায় আঘাত করছে । শেলী দৌড়ে গিয়ে ড্রয়ার খুলে তার লাইসেন্স করা রিভলভারটা হাতে তুলে নিল । অদ্ভুত প্রাণীটা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে শেলী গুলি চালাল । প্রাণীটা লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে । শেলী প্রাণপণে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের দরজার কাছে চলে গেল । কিন্তু দরজাটা খুলতে পারল না । ওদিকে অদ্ভুত প্রাণী উঠে দাঁড়িয়ে শেলীকে আবার ধরার জন্য ছুটে এলো । শেলী চিৎকার করলেও তার কান্না বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে । প্রাণীটি বিকট শব্দ করতে করতে তার দিকে ধেয়ে আসছে দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শেলী দৌড়ে জানালা খুলতে চেষ্টা করল । কিন্তু খুলতে পারল না । পাশে রাখা একটা চেয়ার নিয়ে জানালার কাঁচে আঘাত করল । কাঁচ ভাঙার পর কোন রকমে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে । জ্ঞানশূণ্য হয়ে এই নির্জন জায়গায় শেলী ছুটতে লাগল প্রাণপণে । কাদায় হোচট খেয়ে পড়ে গেল বার
কয়েক । প্রাণীটাও ছুটে চলেছে তার দিকে । শেলীও প্রচন্ড বেগে দৌড়াতে লাগল । হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল রাস্তার পাশের ছোট্ট একটা খাদে । কোন রকমে উঠে দেখল প্রাণীটা নেই । বৃষ্টির মধ্যে যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখল প্রাণীর কোন চিহ্নই নেই । স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধপ করে বসে পড়ল রাস্তার পাশে । শহরটাতে বাড়িঘরের ঘনত্ব কম । দূরে একটা খামার বাড়ি চোখে পড়ল তার । ক্ষণিকের জন্য সে বাড়িটা দেখলো বজ্রপাতের আলোয় । শেলী বাড়িটার দিকে দৌড়াতে লাগল । হঠাৎ রাস্তায় দেখতে পেল হেড লাইট জ্বেলে দ্রুতবেগে ছুটে আসছে একটা গাড়ি । রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে শেলী বাঁচার আনন্দে গাড়িটা কাছে আসতেই সে চিৎকার করে থামতে বলল । সাহায্য প্রার্থনা শুনে গাড়ির ড্রাইভারের সহানুভুতি হল । তাড়াতাড়ি শেলী বলল, ‘আমাকে বাঁচান একটা ভুত আমাকে তাড়া করেছে । যে কোন সময় সে চলে আসতে পারে ।` ড্রাইভার কোন কথা বলল না । শেলী তার চেহারা দেখতে পেল না। কারণ লম্বা একটা হ্যাটের কোণা দিয়ে সে মুখ ঢেকে রেখেছে । তুমুল বৃষ্টি শুরু হতে লাগল । সেই সাথে ঘন ঘন হতে লাগল বজ্রপাত । শেলী আবার করজোরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, `প্লিজ আমাকে বাঁচান ।` লোকটা হ্যাট খুলে ফেলল । শেলী অন্ধকারে লোকটার মুখ দেখতে পেল না । লোকটা বলল, `এত তাড়া কিসের ?` শেলী আবার কেঁদে বলল, `আমাকে একটা ভুত তাড়া করেছে ।` লোকটা খনখনে হাসি দিয়ে বলল, `তাই নাকি !’ শেলী চমকে উঠল । লোকটার মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল গাড়ির ড্রাইভার আর কেউ নয় স্বয়ং সেই অদ্ভুত প্রাণী । কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শেলী উল্টো দিকে দৌড়াতে লাগল । ভুতটাও গাড়ি নিয়ে তার পেছনে ধাওয়া করল । এক সময় গাড়ির ধাক্কায় শেলী উল্টে পড়ে গেল রাস্তার উপর । ভুতটা বাইরে বেরিয়ে শেলীর দূরবস্থা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল । শেলী ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে বলল, `তুমি কেন আমাকে মারতে এসেছ ?` বিকট কণ্ঠে ভুতটা বলল, `আমি এই বাড়িতে কাউকে থাকতে দেব না ।` কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে গাড়িতে উঠে ভুতটা শেলীর গায়ের উপর দিয়ে চালিয়ে দিল । তারপর হাসতে হাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল বাতাসের মধ্যে । পড়ে রইল শেলী রোজালীনের রক্তাক্ত বিকৃত লাশ ।

ঊর্মি খান   (ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

জ্বিন কন্যা

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

কে কে ওখানে ।

আমি ।

আমি কে ?

বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ । কোন উত্তর নেই । তারপর একটা র্দীঘ শ্বাস ফেলার শব্দ । আমি আবার ও জিজ্ঞেস করলাম । আমি কে ? কথা বলছেন না কেন ?

আমি !

আমি কে ? আমি আবারও ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলাম ।

আমি কেউ না ।

তবে আমার ঘরে কি করছেন ? কি ভাবে এসেছেন ? দরজা খুললো কে ? এক সাথে এতোগুলো প্রশ্ন করে আমি প্রায় হাপিয়ে উঠলাম । এমনিতেই আমার হার্টের অবস্থা ভাল নয় । এখন তো মনে হচ্ছে ভয়ে হার্ট ফেল করবে । ঘুমিয়ে ছিলাম ; হঠাৎ খুট খুট শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল । প্রথমে ভেবে ছিলাম ইদুর টিদুর হবে । কাজের মেয়েটার উপড়ে মেজাজ খারাপ হলো ,কতো দিন বলেছি রাতে শোয়ার আগে তেলাপোকা ,ইদুর এর ঔষুধ ছিটিয়ে ঘুমাতে । না তার কোন খবর নেই । মনে হয় এনে দেওয়া ঔষুধ গুলোর কথা মেয়েটা ভুলেই গেছে । কাল নিজেই ছিটিয়ে দিতে হবে । রাতে এমনিতেই আমার ঘুম হয়না ।তাও আজ লেট নাইটে শুয়েছি । ভোরে অফিস ধরতে হবে । একবার ঘুম ভাংলে আর ঘুম আসবে না । আমার স্ত্রী তিথি ছেলে মেয়েকে নিয়ে দু’দিনের জন্য বাবার বাড়ী গেছে । পুরো বাসায় আমি একা ।

অফিস থেকে ফিরে সামান্য লেখা লেখির চেষ্টা করা আর টিভি দেখা ছাড়া করার তেমন কিছু নেই । আজ ইস্পিলবার্গের একটা ছবি দেখে শুতে এমনিতেই দেরি করে ফেলেছি । মনে হয় আধা ঘন্টাও ঘুমাতে পারিনি এর মধ্যে খুট খুট শব্দ করে যন্ত্রনা শুরু হয়েছে । একবার মনে হলো ইদুর রান্না ঘরে শব্দ করছে । ঘুমের মধ্যেই হুস হুস শব্দ করে ইদুর তারাতে চেষ্টা করলাম ।

হুস , হুস করে আমি ঘুমিয়ে যাচ্ছি আবার শুরু হচ্ছে খুট খুট শব্দ করা । খেয়াল করে দেখলাম আমি হুস হুস করলে কিছু সময়ের জন্য থেমে যাচ্ছে খুট খুট শব্দ । চোখ লেগে আসতেই আবার সেই খুট খুট শব্দ । কখন যে হুস হুস করতে করতে ঘুমিয়ে পরে ছিলাম খেয়াল নেই । হঠাৎ অনুভব করলাম, কে যেন আমার বা পায়ের বুড়ো আঙুল ধরে আলতো করে টানছে । চোখ থেকে ঘুম পুরোপুরে সড়ে গেছে । আমি চোখ হালকা করে তাকালাম । পুরো ঘর অন্ধকার । বাতি জ্বালিয়ে ঘুমাতে ভুলে গেছি ? এখন দেখছি বাতি নিবানো । যতো দূর মনে মনে আছে -টিভি বন্ধ করে শন্করের একটা বই পড়ছিলাম । ঘরের বাতি জ্বলছিল । তা হলে বাতিটা নেভালো কে ?

পায়ের আঙুলে আবার কেউ র্স্পশ করলো । আমি ভয় পেতে শুরু করছি কেননা চোখ খুলে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না । ইদুরের চিন্তাটা বাদ দিয়ে দিলাম । আমি মশারি টানিয়ে শুয়েছি । শোয়ার আগে বেশ ভাল মতো মশারী গুজে তারপর শুয়েছি । ভেতরে ইদুর থাকলে আগেই দেখতে পেতেম । হঠাৎ ভুতের কথা মনে হলো ? ভুত নয় তো ? ভুতের কথা মনে হতে ভয় বেড়ে গেলো । ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে । নড়তে পারছি না । মনে হলো নড়াচড়া করলে কেউ আমাকে মেরে ফেলবে । আবার ভয় পাচ্ছি দেখে নিজের উপড়ই রাগ লাগছে । কেউ শুনলে হাসবে । ছেলেটার কথা মনে হলো । ভাবলাম ও ,ও মনে হয় আমার চাইতে বেশী সাহসী ।

বা পাটা আমি একটু নাড়ালাম । এমন ভাবে নাড়ালাম যেনো ঘুমের মধ্যে নাড়াচ্ছি । সঙ্গে সঙ্গে স্পর্শটা বন্ধ হয়ে গেলো । মনে হলো কেউ পায়ের উপড় থেকে হাতটা সড়িয়ে নিল । এবার ভাবলাম , ইদুর হবার প্রশ্নই আসে না । আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে পরে আছি । ডাইনিং রুম থেকে ভেসে আসা ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনতে পাচ্ছি । এ ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই । চারিদিকে শুনশান নীরবতা , একটু আগে হয়ও খুট খুট শব্দটাও এখন আর হচ্ছে না ।

হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার শরীরে থাকা চাদরটা ধরে টানছে । আমি মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়তে লাগলাম । নিজের ঘরে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সন্মুক্ষিন হবো কল্পনাও ছিল না । ভয়ে হাত পা একেবারে জমে যাচ্ছে । শরীর থেকে চাদরটা একটু একটু করে নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে । যে করছে কাজটা , বুঝা যাচ্ছে সে খুব ধীরে সু্স্থেই কাজটা করছে ।

কি করবো বুঝতে পারছিনা । বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখাই হচ্ছে আসল ব্যাপার ।

শুধু মাত্র বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখার কারনে ৭০% লোক মৃত্যুর হাত থেকে বেচেঁ যায় । পরিসংখ্যানটা কোথায় যেন পড়েছিলাম । আমি মাথা ঠান্ডা রাখতে চেষ্টা করলাম ।

একবার ভাবলাম জোরে চিৎকার করে উঠি । তাতে চাদর টেনে যে আমাকে ভয় দেখাতে যাচ্ছে সে উল্টো ভয় পেয়ে যাবে ।

তার পরই মনে হলো চোর নয় তো ? বেশ কিছু দিন যাবত মহল্লায় চোরের আনাগোনা বেড়ে গেছে । সেদিও নাকি জ্বানালা দিয়ে বাড়ী ওয়ালির ব্যাগ থেকে মোবাইল ,টাকা নিয়ে গেছে চোর । কিন্তু আমার বিছানাটা তো জানালা থেকে বহু দূরে । জানালাও বন্ধ । তবে কি চোর আগেই ঘরের ভেতরে ডুকে ছিল ? এখন আফসোস হচ্ছে কেন শোয়ার পূর্বে চেক করে শুলাম না ।

অনেকক্ষন অন্ধকারে থাকার ফলে অন্ধকারটা চোখে সয়ে এসেছে । পায়ের দিকে কিছু একটা নড়ে উঠলো । আবচ্ছা আলোয় একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে । আমি চোখ কুচকে ভাল করে দেখতে চেষ্টা করলাম । মনে হলে কেউ একজন মেঝেতে হাটু ঘেরে খাঁটের উপর কুনি রেখে বসে আছে । ভয়ে আমার অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো । শুয়ে থেকেও স্পষ্ট নারী অবয়বটা দেখতে পাচ্ছি । ঘারের উপরে উড়তে থাকা চুল পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি । আমার সমস্ত শরীর ঘেমে উঠেছে । কখন যে পুরোপুরি চোখ খুলে তাকিয়ে আছি বলতে পারবো না ।

হঠাতই অবয়বটা আমার পায়ের উপড় থেকে হাতটা সড়িয়ে নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকালো । আমার মনে হলো , সে মনে হয় বুঝতে পেরেছে আমি তাকিয়ে আছি । আমি চোখ বন্ধ করার সাহস পেলাম না । দু’জন চোখাচোখি তাকিয়ে থাকলাম । আমি মুহুত কাল ভুলে গেছি । চুপ করে পরে আছি । হঠাৎ ঘরের ভেতর প্রচন্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করলো । মনে হলো সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যাবে । আমি দু’হাত দিয়ে খাটের কিনার আকড়ে ধরে থাকলাম । এক সময় বাতাস হঠাৎ ই থেমে গেল ।

অবয়বটা এক সময় উঠে দাঁড়ালো ।আমি কিছু একটা বলতে চাইলাম , কিন্তু পারলাম না । মনে হলো গলার ভেতরের সব রস কেউ নিংরে বেড় করে নিয়েছে । তবুও মাথা ঠান্ডা রেখে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম । ভয় পেলে চলবে না । ভয় পেলে চলবে না । বাঁচতে হলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে । এছাড়া অন্য কোন উপায় নেই । শুধু মাত্র মাথা ঠান্ডা রাখার কারণে ৭০% লোক বেঁচে যায় । সঙ্গে সঙ্গে একটা হিন্দি ছবির ডায়ালোগ মনে হলো -জো ডরগায়া ও মর গায়া ।

আমি শরীরের সকল শক্তি এক করতে চেষ্টা করলাম । তখনই আমার মুখ থেকে প্রশ্নটা ছুটে গেলো কে কে ওখানে ? নিজের গলার স্বর নিজেই চিনতে পারলাম না । মনে হলো আমার গলায় অন্য কেউ কথা বলছে । আমি আবার ও একই প্রশ্ন করলাম -কে কে ওখানে ?

এবার মৃর্দু একটা হাসির শব্দ ভেসে এলো ।

আমি আবার বললাম কে ?

-আমি । খুব আস্তে উত্তর এলো । কেউ খেয়াল না করলে শুনতে পেত না ।

-আমি কে ? ভয়ে আমার হাত পা অসার হয়ে আছে ।

-আমি কেউ না ,বলে আবয়বটা হেসে উঠলো । যেন নিক্কন হয়ে কানে বাজছে । আমি মুগ্ধ হলাম । তিথির ভাষায় অতি তারাতারি মুগ্ধ হয় গাধা মানবরা । নিজেকে আমার কাছে গাধা মানব মনে হলো ।

-আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি । দয়া করে বলুন আপনি কে ? নিজেকে কেমন শিশু শিশু মনে হলো ।

এবার কোন উত্তর এলো না । তবে আবয়বটা উঠে গিয় ঘরের মাঝখানে রাখা রকিং চেয়ারটাতে বসে পরলো । মশারির ভেতর থেকেও দেখতে পাচ্ছি চেয়ারটা দুলছে । কেউ একজন হেলান দিয়ে বসে আছে চেয়ারটাতে । আমি স্বপ্ন দেখছি নাতো ? হাত নাড়িয়ে চিমটি কাটার শক্তি বা সাহস কোনটাই পেলাম না । শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি চেয়ারটার দিকে ।

 

(২)

 

পৃথিবীতে কোন কিছুই যেমন স্থায়ি নয় । তেমনি আমার ভয়টাও স্থায়ি হলো না । খুব ধীরে ধীরে ভয়টা কেটে যাচ্ছে । গুন গুন করে একটা শব্দ হচ্ছে । মনে হলো আমার ঘরে থাকা আবয়বটা গান গাচ্ছে । কিন্তু আমার পরিচিত কোন সুরে নয় , অচেনা কোন সুরে । তিথি যেমন ঘরের কাজ করতে করতে আমন মনে সুর ভাজে , তেমনি । আমি সুরটা ধরতে চেষ্টা করে পারলাম না । না । এমন সুর আগে কখন ও শুনিনি । তবে সুরের মাদকতায় ভেসে গেল পুরো ঘর । আমি চোখ বন্ধ করে গান শুনছি । আর ভাবছি কি করা যায় । একবার মনে হলো হাউমাউ করে কেঁদে কেটে যদি মাপ চাই তবে কেমন হয় । নিজেরই পছন্দ হলো না ব্যাপারটা । আমার মাথা কাজ করতে শুরু করছে । চিন্তা করতে পারছি দেখে ভাল লাগল । একবার ভাবলাম হেলুসিনেশন নয় তো ? নিজের মুখ দিয়েই বিরক্তি সূর্চক শব্দ “চুক”বেড় হয়ে এলো । সঙ্গে সঙ্গে আবয়বটির দোল খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে আমার দিকে তাকালো ।

আপনি কে ? দয়া করে বলবেন ?

মনে হলো একটা দীর্ঘস্বাস পরলো ।

এবাবে অর্যাচিত ভাবে কাউকে আমার ঘরে দেখে আমি ভয় পাচ্ছি এবং অসুস্থি বোধ করছি । দয়া করে বলুন আপনি কে ? কি চান ?

-আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই । আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না । আপনি ঘুমান । আবাও সেই হাসির শব্দ ।

-কিন্তু এবাবে কেউ ঘরে বসে থাকলে তো আমার ঘুম আসবে না ।

-চলে যেতে বলছেন ?

আপনি কে ? কেনো এসেছেন তা যদি বলতেন । আমি কৌশলে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলাম ।

-আমি আফরোজা । এসেছি তাকাফুল শহর থেকে । আমি মানুষ সম্প্রদায়ের কেউ নই । আমি জ্বিন সম্প্রদায়ের মেয়ে বলে মেয়েটি হেসে উঠলো । জ্বিন ; শুনে আমি কেঁপে উঠলাম । কোথা থেকে হালকা চাপা ফুলেন মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসছে , পুরো ঘর মো মো করছে । হাসির শব্দে আমি আবার বিমহিত হলাম ।

আপনার হাসিটা অনেক সুন্দর । আমার মুখ ফসকে বের হয়ে গেল কথাটা । নিজেকে আবারাও কেমন হেবলা মনে হলো । তিথির কথা মনে হলো ও যদি জানে গভীর রাতে ঘরে বসে আমি কোন জ্বিন মেয়ের হাসির প্রশংসা করছি তা হলে ও কি করবে ?

আপনার স্ত্রীর কথা ভাবছেন ?

আমি মাথা নাড়ালাম ।

খুব ভালবাসেন বুঝি ? বলে মেয়েটি হাসতে লাগলো । রকিং চেয়ারটি আবার দুলছে । আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটি বললো , এখন কি আপনার ভয় লামছে ?

আমি না, বললাম । আমি মিথ্যা বললাম ।

মানুষরা খুব সহজে মিথ্যা বলতে পারে । বলে মেয়েটি আবার হাসছে । মিথ্যা বলে ধরা খাবার জন্য কেমন লজ্জা লাগছে ।

আমার একবার মনে হলো বাতি জ্বালাবো কি না ?

দয়া করে বাতি জ্বালাবেন না । আমি বাতি সহ্য করতে পারিনা । আর একটু পরে আমি চলে যাবো ।

আমি চমকে উঠলাম এ যে দেখছি আমার থর্ট রিড করতে পারছে ।

আপনি কেন এসেছিলেন ………..আমি প্রশ্নটা শেষ করতে পারলাম না ।

-এমনিতেতো আসিনি । আছে একটা কারণ আছে ।

কি কারন ?আমি কারন যানার জন্য অস্থির হলাম । আমার ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটিকে দেখি ।

-আমাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তাই না ? মেয়েটি হাসতে হাসতে বললো ।

জ্বি । আমি ছোট্র করে উত্তর দিলাম ।

আমাকে না দেখাই ভাল । আমরা দেখতে মানুষের মতো নই । আমরা হচ্ছি আগুনের তৈরি । আর মানুষ হচ্ছে মাটির । আমাদের কোন নিদিষ্ট কোন আকৃতি নেই । আমরা যে কোন আকার ধারন করতে পারি । যে কোন জায়গাতে যেতে পারি । শুধু মাত্র আসমানের নিদিষ্ট্য একটা সীমা পর্যন্ত ।

তা হলে এটা কি আপনার আসল আকৃতি নয় ?

না ।

আপনি কি তা হলে মেয়ে নন ?

আমি মেয়ে জ্বিন । আমাদের মধ্য ছেলে মেয়ে দুটো প্রজাতি আছে । মানুষের মধ্যে আছে তিনটি ।

মানুষের মধ্যে তিনটি ? একটি নারী এবং অন্যটি পুরুষ । আমি আরেকটি খুঁজে পেলাম না । মাথা কাজ করছে না ।

আমি এখন যাবো ।

কেন এসেছিলেন তা তো বললেন না ?

আরেক দিন বলবো ।

তার মানে এখনই চলে যাবেন ?

হ্যা , আযান এর সময় হয়ে এসেছে । আমি যাই ।

মনটা খারাপ হয়ে গেল । এমন সময় মসজিত থেকে ফজরের আযান ভেসে এলো । মেয়েটি হঠাৎই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল ।

আমি তরিঘড়ি করে উঠে বাতি জ্বালালাম । না ! কেউ নেই । চেয়ারটা দুলছে । আমার মাথাটা কেমন করে উঠলো । অজানা কোন ভয়ে শরীর ছমছম করছে । কোন মতে বিছানায় বসে পরলাম ।

 

পরিশেষ : যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি হাসপাতালে । সবাই মনে করলো আমি হঠাতই মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিলাম । আমি ও কাউকে কিছু বললাম না । সব নিজের ভেতরে চেপে রাখলাম । বললে সবাই হয়তো হাসবে । তবে আশ্চযের বিষয় হলো এটা যে -মেডিকেল বোর্ড তন্ন ,তন্ন করে খুঁজেও আমার হার্টে কোন অসুখ খুঁজে পেলো না । যেনো রাতারাতি সব উবে গেছে । ডাক্টারা সবাই বললো মিরাকল ! মিরাকল ! কিন্তু আমি মনে মনে আফরোজাকে ধন্যবাদ দিলাম । সকল মিরাকলের পেছনেই কারো না কারো হাত থাকে । এখন আমার যখনই গভীর রাতে ঘুম ভাঙে তখনই আমি নিজের অজান্তে আফরোজা নামক জ্বিন কন্যাকে খুঁজি ।।

শেষ

মুহাম্ম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন (ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

আজরাইল

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

ঘটনার শুরু আজ থেকে চার বছর আগে এক রাতে। আমি সিলেট এর ওসমানী মেডিকেল এ একটা সেমিনার শেষ করে নিজেই ড্রাইভ করে ফিরছিলাম ঢাকায়। সাধারণত আমার পাজেরো টা আমার খুব প্রিয় হওয়াতে আমি কাউকে ড্রাইভার রাখিনি। সেদিন ও আমি নিজেই চালিয়ে নিয়ে আসছিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। পথে খানিক টা ঘুম ঘুম ভাব আসলেও মন টা সতেজ ছিল- কারন সেই সেমিনারে আমি আমার গবেষনার জন্য পেয়েছি প্রচুর হাততালি। সাংবাদিক রা ফটাফট ছবি তুলে নিয়েছিল আমার। পরদিন পত্রিকায় আমার ছবি সহ লিড নিউজ ও হবার কথা ই ছিল এবং হয়েছিল ও তাই। আমি একটা বিশেষ হার্ট সার্জারি আবিষ্কার করেছিলাম- যেটা আজ পৃথিবীর সব দেশে দেশে রোগীদের জীবন বাঁচাচ্ছে- মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন জীবনের।সেমিনারের সফলতা তাই জুড়ে ছিল আমার মনে প্রানে।

রাস্তায় যেতে যেতে সেদিন আমি গান শুনছিলাম। গানের তালে তালে ধীর গতিতে গাড়ি চালাই আমি। বেশি গতি আমি কখনোই তুলিনা।সেদিন ও ৫০ এর কাছাকাছি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। সিলেট থেকে রওনা দিয়ে উজানভাটি এলাকার কাছাকাছি আসতেই হটাত করে আমার সামনে এক সাদা পাঞ্জাবি পড়া বৃদ্ধ লোক এসে দাঁড়ায়। রাত তখন প্রায় দুইটা। এই সময় রাস্তায় হাইওয়ের গাড়ি গুলো ছাড়া কোন যানবাহন ও ছিলনা। হটাত করে আমার সামনে কোত্থেকে লোকটা এসে পড়ল কিছু বুঝে ওঠার আগেই। আমি ও লোকটাকে বাঁচাতে গিয়ে ও পারলাম না। সোজা সেই লোকের ঊপর চালাতে বাধ্য হলাম। আর সেখানেই গাড়ির সামনের অংশে বাড়ি খেয়ে লোকটা ছিটকে পড়ল হাত পাঁচেক দূরে। আমি হার্ড ব্রেক কষে সেইবৃদ্ধের কাছে ছুটে গেলাম। কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ। মাথার কাছটায় আঘাতে মৃত্যু বরন করেছে বৃদ্ধ ততক্ষনে। জীবনে ও আমি কোন দিন এক্সিডেন্ট করিনি।সেটাই ছিল আমার প্রথম এক্সিডেন্ট। আমি দিশেহারা হয়ে যাই। কিভাবে কি করব বুঝে ঊঠতে না পেরে কিছুক্ষন ঝিম মেরে থাকলাম সেখানেই। তারপর বৃদ্ধকে গাড়িতে তুললাম। পাশে বসিয়ে আবার ড্রাইভ করলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে।

ঢাকায় পৌছে সোজা মেডিক্যাল এ নিয়ে গেলাম লাশ টাকে। সেখানে গিয়েই পুলিশ কে জানানো হল। পুলিশ এসে আমার কাছ থেকে জবানবন্ধি নিয়ে লাশ টা থানায় নিয়ে গেল। আমি প্রথমে ঠিক করেছিলাম পুলিশ কে সব খুলে বলব। কিন্তু পরে কি ভেবে যেন আমি মিথ্যে বলি। পুলিশ ও আমার কথা গুলো কোন রকম সন্দেহ ছাড়াই বিশ্বাস করে। নিজের কাছে আমি কিছু টা অপরাধী বোধ করলে ও নিজের ইমেজ বাঁচাতে এই মিথ্যেটা আমাকে বলতেই হয়েছে।

তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো মাস। আমি আমার আবিষ্কৃত প্যারা সার্জারি সিস্টেম এর জন্য অনেক গুলো পুরষ্কার ও পাই। খ্যাতি আর অর্থ দুটোই এসে ধরা দেয় আমাকে। ধীরে ধীরে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস বেড়ে চলে আমার। নিজেকে কিছুটা ঈশ্বরের সমপর্যায়ের ভাবতে থাকি। এরজন্য মিডিয়া ও কম দায়ী নয়।খবরের পাতায় কারো না কারো জীবন বাঁচানোর জন্য আমি ঊঠে আসতে থাকি নিয়মিত ভাবে। ধীরে ধীরে আমি অনেক অনেক বেশী অহংকারী হয়ে ঊঠি। কাউকেই পরোয়া না করার একটা ভাব চলে আসে আমার মাঝে। মানুষ কে আমি মনে করতে শুরু করি হাতের পুতুল। আমি চাইলেই যেকোন মৃত্যু পথযাত্রীর জীবন বাচিয়ে দিতে পারতাম। এই জন্য আমার কাছেই ছুটে আসতে লাগল হাজারো মানুষ। এই যশ আর খ্যাতি যখন তুঙ্গে তখন আমার কাছেই রুগী হয়ে আসেন বাংলাদেশের প্রথিত যশা রাজনীতিবিদ রেজোয়ানুল হক। আমি বাকি সবার মত উনাকেও আস্বস্থ করেছিলাম যে উনার কিছু ই হবেনা।

যেদিন উনার অপারেশন – সেদিন আমি আরো দুটি হার্ট অপারেশন করে ফেলেছিলাম। তাই কিছু টা ক্লান্তি ছিল। একটানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপারেশন গুলো করতে হয়। তাই ক্লান্তি ভর করে সহজেই। আমি ক্লান্ত থাকলে ও মনে মনে পুলকিত ছিলাম কারন এর পরেই আমি রেজোয়ানুল হকের অপারেশন করবো। উনাকে যখন অজ্ঞান করা হল তখন আমি নিজের কস্টিউম পড়ছি। জুনিয়র ডাক্তার কে দিয়েই এগুলো করাই আমি। আমি শুধু গিয়ে কাটাকাটির কাজ টা করি। সেদিন ও জুনিয়র তিনজন ডাক্তার মিলে সব প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা সেরে আমাকে কল দিল। আমি ও গেলাম। আর গিয়েই শুরু করলাম অপারেশন। ওপেন হার্ট সার্জারি ছিল সেটা। আমি যখন সব কেটে কুটে মাত্র হার্ট টাকে দেখতে লাগলাম এমন সময় আমার চোখ গেল ওটি রুমের বাম কোনায়। সেখানে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে সেই বৃদ্ধ। আমি দেখে চোখের পলক ফেলতেই দেখি উনি নেই। হ্যালুসিনেশন মনে করে আবার অপারেশন শুরু করলাম। রেজোয়ানুল হকের হার্ট এর নিলয় এর দুটো শিরায় চর্বি জমেছিল। আমি সেগুলো পরিষ্কার করতে করতে হটাত করে কানের কাছে একটা কাশির শব্দ শুনলাম। প্রথমে পাত্তা দিলাম না। কারন এইখানে কোন ভুল হলেই রোগী মারা যাবেন। আমার কোন রকম ভুলের কারনে এতবড় মানুষ টার মৃত্যু হবে ভেবে আমি আবার মনযোগ দিলাম। কিন্তু আবার কাশির শব্দ আসল। কাশিটা আসছিল বাম দিক থেকে। আমি বামে মাথা ঘুরিয়ে দেখি বৃদ্ধ হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ঠোট নাড়ার আগেই বলে ঊঠল –

“বাবাজি তুমি তো উনাকে বাঁচাতে পারবানা”

আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি আকাশ পাতাল চিন্তা করে চলেছি। একজন মৃত মানুষ কিভাবে আমার পাশে এসে দাড়াতে পারে সেটাই মাথায় আসছিল না। আমি কোন উত্তর দেবার আগেই সেই লোকটি বলল-

“ কি বুঝতে পারছো নাতো? শোনো- আমি জানি তুমি অনেক চেষ্টা করবে উনাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু পারবেনা”- বলেই আবার হেসে দিল সাদা পাঞ্জাবি পড়া বৃদ্ধ।

আমি বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছি উনার দিকে। কি বলব বুঝতে পারছিনা। উনাকে কি বলবো বুঝতে বুঝতে কাটিয়ে দিলাম পাঁচ সেকেন্ড। তারপর আবার মনযোগ দিলাম অপারেশনে। রোগীর অপারেশন সাকসেস হল। আমি ও হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। সেলাই করে দিয়ে শেষ বার ড্রেস করতে দিয়ে আমি মাস্ক খুলতে যাব এমন সময় হটাত করে রোগীর পালস রেট গেল বেড়ে। মেশিন গুলো যেন চিৎকার শুরু করে দিয়েছে।

হটাত করে বুকের ভেতর ধপধপ করা শুরু করল। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে রোগীর প্রেশার দেখলাম- বেড়েই চলেছে প্রেশার। হটাত করে এই অবস্থা হবার কথা না। আমি কয়েকজন ডাক্তারকে বললাম প্রেশারের ইনজেকশন দিতে। ওরা সেটা দিতেই প্রেশার ডাউন হওয়া শুরু করল। কিন্তু আবার ও বিপত্তি। এবার প্রেশার কমতে লাগল। আমি আবার টেনশনে পড়ে গেলাম। কিন্তু কোনভাবেই কিছু করতে পারলাম না। রোগীর হার্ট বিট ভয়ানক ভাবে কমতে কমতে একেবারে শুন্য হয়ে গেল নিমিশে। এবং আমি তাকিয়ে তাকিয়ে রেজোয়ানুল হকের মরে যাওয়া দেখলাম। প্রথম বার আমার সামনে এক রোগী বলে কয়ে মরে গেল- আমি কিছুই করতে পারলাম না।

আমি আমার রুমে এসে বসে পড়লাম। রাগে আমার গা জ্বলতে শুরু করল। নিজেকে অনেক অসহায় মনে হতে লাগল। পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় রেজোয়ানুল হকের পাশাপাশি আমার হতাশাগ্রস্থ মুখ ও প্রকাশিত হল। মিডিয়া এমন এক জিনিস- কাঊকে মাথায় তুলতে দেরী করেনা- কাউকে মাটিতে আছাড় মারতে ও দেরী করেনা। আমাকে ও মাটিতে নামিয়ে আনল ওরা। আমার বিরূদ্ধে হত্যা মামলা রজু করা হল সেই নেতার দলের লোকজনের পক্ষ থেকে। কিন্তু সরকার আমার পাশে ছিল বলে মামলা ধোপে টেকেনি। টাকা পয়সা খাইয়ে পুলিশ আর আদালতের সবকটাকে কিনে নিয়েছিলাম।

তারপর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি ও ফিরে আসি বাস্তব জীবনে। রোগীদের সেবায় মনযোগ দেই। ছোটখাট অপারেশন এ যোগ যেই। এরপর আসতে আসতে আমার জীবন স্বাভাবিক হয়ে ঊঠে।কিন্তু এর ঠিক ছয় মাস পড়েই এই মহিলা ডাক্তার কে অপারেশনের দায়িত্ব পরে আমার উপর। আমি নিরুপায় ছিলাম। উনাকে আমি কর্মজীবনে শ্রদ্ধা করতাম। আমার শিক্ষিকা ছিলেন। উনার হার্টে ব্লক ধরা পড়াতে উনাকে অপারেশনের দায়িত্ব উনি নিজেই আমাকে দেন। খুব ছোট অপারেশন। হরহামেশাই এই ধরনের অপারেশন হত-এখন ও হয়। হার্টের যে ধমনী গুলো ব্লক হয়ে যায় সেগুলোতে রিং পড়ানোর কাজ। আমি প্রথমে রাজি হইনি। কিন্তু রোগীর পীড়াপীড়ি তে রাজি হই।

অপারেশন টেবিলের সামনে এসেই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কারন সেখানে সেই দিনের মতই বাম কোনায় বসে ছিল সেই বৃদ্ধ। উনাকে দেখেই বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠে আমার। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠে মন।

কিন্তু বাধ্য হয়ে আমাকে অপারেশন করতে হয়। আমি ও শুরু করি। হার্টের ধমনী একটাতে রিং পড়ানো শেষ করে আরেকটা যখন ধরবো এমন সময় কানের কাছে ফিসফিস করে বৃদ্ধ সেই আগের মতই বলল-

“বাবাজি- আজকা ও তুমি উনারে বাচাতি পারবানা”

হাসি হাসি মুখের ভেতর যেন রাজ্যের ঘৃণা। আমি উনার চেহারার দিকে এক পলক তাকিয়েই আবার কাজ শুরু করলাম। কিন্তু রিং পড়াতে গিয়েই হটাত করে ভুল করে কেটে গেল ধমনী টা। গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করল। নিরুপায় হয়ে তিন চার জন মিলে সেই রক্ত বন্ধ করে ধমনী পরিষ্কার করে জোড়া লাগাতে বসল। আমি নিজেও হাত দিলাম। কিন্তু যা হবার তাই হল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে রোগীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেল। আমি রক্তের জন্য লোক পাঠালাম। কিন্তু সামান্য ও পজেটিভ রক্ত সেখানে ছিলনা। এতবড় একটা হাসপাতালে ও পজেটিভ রক্ত না পেয়ে সেই ডাক্তার আপা মারা গেলেন চোখের সামনে। আমার কিছু ই করার ছিলনা।

এরপর একদম ভেঙ্গে পড়েছিলাম আমি। আমার পরিবার থেকে বিয়ে করার জন্য চাপ আসল। আমি ও বিয়ে করলাম। মিতি- আমার বৌ- লক্ষ্মী বৌ আমার। যাকে বলে একেবারেই আটপৌরে মেয়ে। বিয়ে হয়েছে আমাদের মাত্র তিন সপ্তাহ। এরমাঝেই আমাকে করেছে আপন। কিন্তু ভাগ্য সহায় না থাকলে যা হয়- বিয়ের তিন সপ্তাহের মাথায় ওর আব্দার রাখতে গেলাম কক্সবাজার এ। সেখানে প্রথম দিনেই একটা আছাড় খেল মিতি বাথরুমে। প্রথমে আমি তেমন কিছু না বলে পাত্তা না দিলে ও পরে বুঝতে পারি মিতির কোন একটা বিশেষ সমস্যা হয়েছে।

তখনই আমি মিতিকে নিয়ে আসি ঢাকায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানতে পারি মিতির মাথায় রক্তক্ষরণ হয়েছে আছাড়ের ফলে। খুব দ্রুত মিতিকে অপারেশন করাতে হবে। নিজের স্ত্রী বলে মিতির অপারেশন আমি করতে চাইনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে সব ভাল ভাল সার্জন রা দেশের বাইরে থাকাতে আমাকেই দায়িত্ব নিতে হল। আমি ও মেনে নিলাম অর্পিত দায়িত্ব।

আমি এখন বসে আছি মিতির রুমের সামনে। আরেকটু পর মিতির অপারেশন। আমি মিতির দিকেই তাকিয়ে ছিলাম- কিন্তু হটাত করে চোখ গেল মিতির কেবিনের বাম কোনায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে সেই বৃদ্ধ। জানিনা কি হবে আজকে। যে কোন ভাবে মিতিকে বাঁচাতেই হবে। কিন্তু আজরাইলের বেশে বৃদ্ধের মুচকি হাসি দেখে আমার আশার প্রদিপ নিভতে শুরু করে দিয়েছে……

(সমাপ্ত)

লিখেছেন : নষ্ট কবি   (ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

ভূতের গোসল !

2

প্রথমেই বলে রাখি আমি বড় মাপের কোন লেখক নই । তাই, আমার গল্পে সমষ্টিগত অনেক ভূল হতে পারে এজন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আগেই । যাহোক , কাহিনী টা শুরু করি । এটি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনা । এর ব্যাখ্যা দাড় করাতে পারছিনা । আমি যে ঘরে থাকি সেই ঘর থেকে আমাদের মসজিদ এর দূরত্ব ২৫-৩০গজ । মসজিদ এর টিউবওয়েলের পাশেই অনেক পুরাতন একটি নারকেল ও পুরুষ তাল গাছ । এ গাছদুটিতে নাকি জ্বীনেদের আবাস । অবশ্য তা প্রথম জানতে পেরেছি আমার মায়ের মুখে এবং পরে এলাকার মুরুব্বীদের অনেকের কাছ থেকে । তবে এই জ্বীনগুলো নাকি ভাল জ্বীন । কারো কোন ক্ষতি করে নাই কোনদিন । আমার দাদার সাথে নাকি অনেকদিন তাহাজ্যুতের নামাজ পড়েছে এই জ্বীনটি । তো ঘরে শুয়ে থেকেই জানালা দিয়ে নারকেল ও তাল গাছ গুলো এবং টিউবওয়েল স্পষ্ট দেখা যায় । চৈত্র গরমের রাতঃ ০২:৩৫ মিঃ এ টিউবওয়েল ঠেঁলার চেঁচামেচি শব্দে ঘুম ভেঁঙ্গে যায় আমার । কিছুটা বিরক্ত মনে করলাম । এতরাতে কে গোসল করে তা দেখার জন্য জানালা দিয়ে উকি দিলাম । দিয়ে যা দেখলাম তাতে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল । শরীরের ভীতর একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল । দেখলাম, মাটি থেকে এক হাত ভাসমান একটি কুঁচকুঁচে কালো লোক কাপড় পরিস্কার করছে । ভয়ে আমার শরীরের সমস্ত লোম গুলো খাঁড়া হলো । আমি স্পষ্টই দেখতে থাকলাম, মসজিদের বাইরের কারেন্টের বাল্ব এর আলোতে লোকটাকে মোটামুটি পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । লোকটার দিকে নিঃশ্বব্দে অপলক চেয়ে যেন থমকে গেলাম কিছুক্ষনের জন্য ! দেখছি আর ভাবছি, আজ আমার রক্ষা নেই । প্রায় মিনিট ৫ এক পর লোকটির কাপড় ধোয়া শেষ হলে এদিক ওদিক তাকিয়ে নারকেল গাছটার কাছে গেল । গিয়ে লিফ্ট এর মত শূণ্যে ভাসতে ভাসতে নারকেল গাছ বেয়ে (হাত দিয়ে না ধরেই) তরতর করে উপরে উঠে গেল । এ দৃশ্য দেখে আমার শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো । ঐ মূহুর্তে আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে প্রাকতিক কাজটি বিছানাতেই. . . . . . . . . . . . . . . . . . , . . . . . . . । পরে বাকি রাত গায়ে মুখে কাঁথা দিয়েও ভয়ের চোটে আর ঘুমাতে পারিনি এবং জানালাও বন্ধ করতে পারি নি । ভাগ্যিস সেদিন অজ্ঞান হয়ে হইনি ।

রানী তোমানের মূর্তি

0

সূর্যটা প্রায় পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সূর্যের অস্ত যাওযার এই দৃশ্যটা প্রতিদিন মুগ্ধ হয়ে দেখে লিন্ডা, আর দেখে সরাইখানার বাইরের উঠানে রাখা রানী তোমানের মূর্তিটাকে।

টেক্সাস শহরের অনেকটা বাইরে অবস্থিত ক্রিস আর লিন্ডার অনেক কষ্টে তৈরি করা সরাইখানা “লিন্ডা’স লজ”, লিন্ডার স্বামী ক্রিসের বয়স প্রায় ৭৫ এর কাছাকাছি আর লিন্ডার বয়স ৬৮, কোন ছেলেমেয়ে নেই ওদের। দীর্ঘদিন ধরে এই সরাইখানা চালাচ্ছে ওরা স্বামী-স্ত্রী মিলে। সুখাদ্য আর অমায়িক ব্যবহারের জন্য হাইওয়ের যাত্রীরা কিছুটা ঘুরে হলেও ওদের সরাইখানায় আসে, খেতে আর বিশ্রাম নিতে। বিয়ের পর থেকেই লিন্ডা বাইরের উঠানে রানী তোমানের মূর্তিটাকে দেখে আসছে। প্রায় ৭ ফুট উচু রানী তোমানের মূর্তি সগর্বে দাড়িয়ে আছে হাতে এক ভয়ঙ্কর দর্শন ছোরা নিয়ে। মাথায় ময়ুরের পালকের তৈরি মুকুট। কানে বেশ বড় ঝিনুকের তৈরি দুল। পায়ের কাছে জিভ বের করে দাড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর দর্শন এক জংলী কুকুর। যেন এক্ষুনি অদৃশ্য কোন শিকারের উপর ঝাপিয়ে পড়বে ওটা। বিয়ের পর প্রথম প্রথম মূর্তিটাকে দেখে বেশ ভয় পেত লিন্ডা কিন্তু এখন আর পায় না। ক্রিসের কাছে রানী তোমানের মূর্তিটার ইতিহাস শুনেছে লিন্ডা। ক্রিসের দাদার দাদা, রেমন্ড, অনেক আগে জঙ্গলে ঘেরা রেড ইন্ডিয়ানদের একটা গ্রামে গিয়েছিলেন শিকার করতে। সৌভাগ্যক্রমে রেড ইন্ডিয়ান সর্দারের একমাত্র মেয়েকে তিনি উদ্ধার করেন এক বন্য শুকরের কবল থেকে। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সর্দার রেমন্ডকে রানী তোমানের এই মূর্তিটা উপহার হিসেবে দেয়। রানী তোমান রেড ইন্ডিয়ানদের অনেক পুরোনো এক দেবী। ইন্ডিয়ানদের বিশ্বাস, যুগে যুগে তাদের উপর যত বিপদ এসেছে তার মোকাবেলা করে তাদেরকে নিরাপত্তা দেয় রানী তোমান। তোমান কে তাই তারা ডাকে নিরাপত্তার দেবী বলে। রেড ইন্ডিয়ান সর্দার রেমন্ডকে একটা কথা বলে দিয়েছিল, “কখনও অসম্মান করোনা দেবীর, দেখো বিপদে ঠিক তিনি তোমার পাশে এসে দাড়াবেন।”

সেই থেকে আজ পর্যন্ত রেমন্ডের বংশধররা দেবী তোমানের মূর্তিটা সযত্নে সংরক্ষন করে আসছে। লিন্ডা জানে ব্যাপারটা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু কিছু বলেনি ক্রিসকে। থাকনা, যে যার বিশ্বাস নিয়ে।

রাত প্রায় ১২ টা। এখন আর কাস্টোমার আসবেনা বললেই চলে। লিন্ডা রান্নাঘরের সিন্কে এঁটো বাসন মাজছে। ক্রিস ক্যাশের হিসাব নিকাশ নিয়ে ব্যাস্ত। হঠাৎ দরজা খুলে তিনজন মুখোশ পড়া লোক হুড়মুড় করে ভিতরে এসে ঢুকলো। একজন দৌড় দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়লো তারপর লিন্ডার মুখ চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসল। অন্য একজন ক্রিসের মাথা বরাবর একটা শটগান চেপে ধরল। তারপর ফিসফিস করে ক্রিসের কানে কানে বলল,”জলদি, ক্যাশে যা আছে চটপট বের করো, বেশী সময় নেই। না হলে বুড়িটার বুক ঝাঁঝরা করে ফেলবো” …ততক্ষনে লিন্ডাকে যে ধরেছিল তার হাতে বের হয়ে আসলো একটা ছোট পিস্তল। লিন্ডার মাথার উপর পিস্তলটা ধরে কুৎসিত দাঁত বের করে হাসতে লাগলো সে।

শটগানধারী তৃতীয়জনকে উদ্দেশ্য করে বলল, “পল, সামনে রাখা সিন্দুকটার তালা ভেঙ্গে ফেলো, তাড়াতাড়ি।”

ছটফট করে উঠলো ক্রিস। ঐ সিন্দুকে তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় রাখা আছে। শটগানধারীকে অনুরোধ করলো, বারবার মিনতি করলো কিন্তু কোন কাজ হলো না। বরং শটগানের বাটের এক বাড়ি খেয়ে ক্যাশের উপর ছিটকে পড়লো সে।

সিন্দুকটা খোলার অনেক চেষ্টা করলো পল, কিন্তু পারলো না। শটগানধারীর দিকে ফিরে বলল, “জ্যাক, কাজ হচ্ছেনা, বুড়োটার কাছে আনলক কোড জিজ্ঞেস করো।”

জ্যাক ক্রিসের কলার চেপে টেনে তুলল।
“কোড বল, বুড়ো, নাহলে বুড়ি খতম”
ক্রিস কিছু বলল না শুধু নিজেকে ছাড়ানোর প্রানপন চেষ্টা করতে লাগলো।
জ্যাক ক্রিসের গালে জোরে একটা চড় মারল। আবার ছিটকে পড়ল ক্রিস। তারপর লিন্ডাকে যে ধরেছিল, তার উদ্দেশ্যে বলল, “কেভিন, বুড়িটার মাথায় ২ রাউন্ড গুলি ঢুকিয়ে দে।”
“নাহ”, চিৎকার করে উঠল ক্রিস, “আমি বলছি। সিন্দুকের কোড হলো ২৩৯৭….”

শেষ করতে পারলো না ক্রিস, তার আগেই কোথা থেকে যেন এক বিশাল জংলী কুকুর এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো পলের গায়ের উপর। চিৎকার করারও সময় পেলনা পল, তার আগেই তার টুঁটি চেপে ধরল কুকুরটা। একটানে ছিড়ে ফেলল পলের কন্ঠনালী। মেঝেতে পড়ে কয়েক সেকেন্ড ছটফট করলো পল। তারপর একেবারে নিথর হয়ে পড়ে থাকলো।

চোখের সামনে এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠল জ্যাক। শটগানটা ক্রিসের মাথার উপর ধরলো আবার, কিন্তু গুলি করতে পারলো না। তার আগেই ক্যাশ টেবিলের উপর মুখ থুবড়ে পড়লো সে। ক্রিস অবাক হয়ে দেখলো, জ্যাকের গলা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। কেউ যেন অত্যন্ত নিপুন ভাবে, ধীরে সুস্থে জ্যাকের গলার একপাশ থেকে অন্যপাশে ধারালো একটা ছুরির ফলা বুলিয়ে দিয়েছে।

এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো লিন্ডা। দ্রুত ঘুরে দাড়ালো ক্রিস কিন্তু পিছনে কেউ নেই। তাহলে? কে হত্যা করলো শটগানধারীকে?

ততক্ষনে লিন্ডাকে ছেড়ে দিয়েছে কেভিন।

“কে?” চিৎকার করে উঠলো সে। ঘরের চারদিকে কয়েক রাউন্ড গুলি করলো। বোঝাই যাচ্ছে ভয় পেয়েছে। ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে, দরদর করে ঘামছে। পিস্তল ধরা হাতটা খুব জোরে কাঁপছে তার। আস্তে আস্তে পিছু হটতে লাগলো কেভিন। উদ্দেশ্য পরিস্কার, কোনভাবে দরজা পর্যন্ত যেতে পারলেই কোন একদিকে ছুট লাগাবে। হঠাৎ কেভিনের পিছে এসে দাড়ালো এক রেড ইন্ডিয়ান যুবতী। অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো ক্রিস। খুব চেনা মনে হলো যুবতীর মুখখানা। কিন্তু কোনভাবেই মনে করতে পারলোনা মেয়েটা কে? হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর দর্শন ছুরি উঠে আসলো যুবতীর হাতে। বামহাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরলো কেভিনকে। মরন ভয়ে চিৎকার করে উঠলো কেভিন। ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু যুবতীর হাত যেন শক্ত পাথরে গড়া। একটুও নড়লনা তার হাত। ডানহাতে ধরা ছোরাটা কেভিনের গলার বামদিকে চেপে ধরল। তারপর খুব ধীরে বামদিক থেকে ডানদিকে ঘুরিয়ে আনলো ছোরাটা। ফিনকি দিয়ে টকটকে লাল রক্ত বের হয়ে আসলো কেভিনের গলা দিয়ে। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল কেভিনের। আস্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো কেভিন। রক্তে ভেসে যেতে থাকলো সরাইখানার মেঝে।

বীভৎস এ দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল লিন্ডা। ক্রিস যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মেয়েটা ক্রিসের দিকে চেয়ে সামান্য মাথা ঝোকালো। তারপর একে একে তিনটা লাশ নিয়ে টানতে টানতে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় হালকা একটা শিস দিল। লাফ দিয়ে কুকুরটা উঠে দাড়ালো তারপর পিছু নিল রহস্যময়ী রেড ইন্ডিয়ান যুবতীর।

নিজেকে সামলে নিতে কিছুটা সময় নিল ক্রিস। তারপর ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল লিন্ডাকে।

“কে, কে ওটা,” ভীত গলায় প্রশ্ন করলো লিন্ডা।
“আমি জানি না। তবে…….” অনিশ্চিত গলায় বলল ক্রিস।
“তবে কি, বলো?”
“না কিছু না,” একইভাবে অনিশ্চিত গলায় বলল ক্রিস।

সেরাতে আর ঘুম হলোনা ক্রিস আর লিন্ডার। সরাইখানার চারদিকে রক্তে মাখামাখি। পরিস্কার করতে করতে ভোর হয়ে গেল। পূর্ব আকাশে তখন কেবল হালকা লালচে আভা ফুটে উঠেছে। এক কাপ কফি হাতে ক্রিস সরাইখানার বাইরে বের হয়ে আসল। নরম ঠান্ডা একঝলক বাতাস বয়ে গেল ক্রিসের উপর দিয়ে। রানী তোমানের মূর্তি তার জায়গায় নীরবে দাড়িয়ে আছে। কিন্তু, কিন্তু কি যেন একটা অসামন্জস্যতা চোখে পড়ল ক্রিসের। মূর্তিটার দিকে এগিয়ে গেল সে। হ্যা, এবার বুঝতে পারলো ক্রিস। কুকুরটা রানীর বামদিকে ছিল আগে এখন কিভাবে যেন ডানদিকে চলে এসেছে। আর, আর রানীর ছুরিটা! ছুরিটার কিছু অংশ লালচে হয়ে আছে। রক্ত!!!

রাতে তাদেরকে সাহায্যকারী রেড ইন্ডিয়ান যুবতীর কথা মনে পড়ে গেল ক্রিসের। এখন বুঝতে পারলো, কেন এত চেনা চেনা লাগছিল মেয়েটাকে।

নিথর

0

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

রাত দুইটা বাজে। এবার উঠতে হবে। টাইড খেলা অনেক হয়েছে। আর ভাল লাগছে না। যদিও তাসের এই পর্ব সারারাতই চলবে। মামুন বিদায় নিল। বন্ধুরা নাছড় বান্দা। কেউ ছাড়তে চাই না। চাদঁ রাত বলে কথা। সারারাত ক্লাবে হই হুল্লর। আজ আবার একটা ছাগল চুরি করা হয়েছে। রান্না ভাল হয়নি। কেমন একটা বমি বমি লাগছে। মামুন ঢাকায় থাকে। ঈদের সময় শুধু বাড়ি আসা। চাদঁ রাতে পাড়ার এই ক্লাবটির চেহেরায় বদলে যায়। প্রায় সব বন্ধু ই জড়ো হয়। এবার শুধু নয়ন নেই। ডিভি পেয়ে আমেরিকা চলে গেছে। নয়নের উদ্দেশ্যে শোকগাথাঁ লেখা হয়েছে। কাশেম লিখেছে। কবি হিসাবে এই মফস্সল শহরে তার আবার খানিক নাম ডাক আছে। ভোর চারটায় আরেকবার গলা ভেজানোর ব্যবস্থা আছে। মামুনের মন ক’দিন ধরে এমনিতেই খারাপ। বিয়ের পর রুমা’কে ছাড়া প্রথম ঈদ করছে। মামুন শত প্রলোভন উপেক্ষা করে বেড়িয়ে পড়ল। শরিরটা আসলেই খারাপ করেছে। মাথার ভিতর একটা ভোতাঁ যন্ত্রনা। ক্লাব থেকে বেরিয়ে বাড়ির সর্টকার্ট পথ ধরল। ধানক্ষেতের আল দিয়ে। রাত ভালই হয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইলে চার্জ নেই। অনভস্ত্যতায় পথ চলতে একটু কষ্টই হচ্ছে। হঠ্যাৎ করে বমি চলে এসেছে। আর আটকাতে পারল না। ধান ক্ষেতের পাশেই বসে পড়ল। মনে হচ্ছে আর দাড়াতে পারবে না। আশেপাশে কাউকে খোজাঁর চেষ্টা করল। কেউ কি আছে। অন্ধকারে ভাল করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এখনো অনেক পথ। একটু পানি পেলে ভাল লাগত। কুলি করা দরকার। ঠিক এসময় নিমাই দা এসে উপস্থিত
: কিরে, মামুন না। কি হয়েছে তোর।
: নিমাই দা। খুব খারাপ লাগছে
: দাড়া। আমাকে ধরে দাড়া।
: মনে হয় পারব না। একটু পানি খাওয়াতে পারবে।
: পানি নেই। ধর স্প্রাইট খা।
: দেও।
মামুন স্প্রাইট দিয়েই কুলকুচি করল। আরেকবার বমি হয়ে গেল।
: নিমাই দা, আমাকে একটু বাসায় দিয়ে আসবা।
: শোন আমার বাসাতো কাছেই। তুই চল। আগে কিছুক্ষন রেস্ট নিবি।


মামুন বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল। নিমাই দা স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের অংকের মাষ্টার। মামুনদের দু-ব্যাচ সিনিয়ার। অসম্ভব ভাল। কিছু মানুষ থাকে উপকার করার জন্য জন্মায় সেই টাইপের। মামুন নিমাই এর হাত ধরে উঠে দাড়াল। দু-জনেই নিরবে এগিয়ে চলছে। গুনগুন করে নিমাই দা কি যেন একটা গাইছে। মামুনের তখন শোনার মত অবস্থা নেই। হঠ্যাৎ নিমাই দা মামুনের হাত শক্ত করে ধরল।
: কি হয়েছে?
: সামনে দেখ।
সামনে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কাফনের কাপড় পড়ে পাচঁটা লাশ পড়ে আছে ধান ক্ষেতের উপর। হালকা নড়ছেও। ভয়ের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল কেন জানি।
: চল
: কি ওগুলো
: চল না। যেয়ে দেখি।
: যাবা
: দুর গাধা। তুইতো ভয়েই আধমরা হয়ে গেলি।
: আমিতো এমনিতেই আধঁমরা। কিছু দেখলে কিন্তু ফুল মরা হয়ে যাব।
: বকবক করিস না। চল
কিছু দুর যেয়েই ঘটনা পরিস্কার হল। ধান ক্ষেতের উপর কে যেন কাপড় শোকাতে দিয়েছে। সাদা কাপড়। সেগুলোই দূর থেকে লাশের মত লাগছে। দু-দজনার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি। নিমাই দা’র গানটা এবার বোঝা যাচ্ছে। নজরুল সংগীত।
শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে
বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে
শাওন রাতে যদি….

ভুলিও স্মৃতি মম নিশীথ স্বপন সম
আঁচলের গাঁথা মালা ফেলিও পথ পরে
বাহিরে ঝড় বহে নয়নে বারি ঝরে
শাওন রাতে যদি….


মামুন শুয়ে আছে নিমাই দা’র বাড়িতে। বাসা পর্যন্ত যেতে পারে নি। নিমাই দা’র বাড়ির সামনে আরেকবার বমি। কিছুতেই নিমাই দা ছাড়ল না। একটা এভোমিন পাওয়া গেছে। বৌদিও খুব ভাল। সাক্ষাত প্রতিমা’র মত চেহারা। মামুনের বিছানা গুছিয়ে দিল। বেশি কথা না বাড়িয়ে মামুন চুপচাপ শুয়ে পড়ল। ছোট্ট একটা বাড়ী নিমাই দা দের। তিন রুমের। উপরে টিন। নিমাই দা বৌদি’ পাশের রুমে। বাসায় বোধহয় আর কেউ নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিমাই দা’র একটা ছোট বোন ছিল। রাজশ্রী। মামুনের সাথে একটা অনৈতিক সম্পর্কও কিভাবে যেন গড়ে উঠেছিল যৌবনের প্রথম বছরে। বেশি দূর আর এগোয়নি। মামুন ঢাকা বিশ্ব-বিদ্যালয়ে চলে এল। পরের বার গিয়ে শোনে বিয়ে হয়ে গেছে। সে অনেক দিন হল। শুনেছি এখন তিন ছেলে মেয়ের মা।মামুন রাজশ্রীর চেহারাটা মনে করা চেষ্টা করছে। কিছুতেই মনে পড়ছে না। আর দু-চোখ খোলা রাখা যাচ্ছে না। কখন ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই। হঠ্যাৎ ঘুম ভেঙে গেছে। অদ্ভুত একটা শব্দে। মনে হচ্ছে এ ঘরে কোন মহিলা নামাজ পড়ছে। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবে নামাজ পড়ার সময় যেমন আওয়াজ হয় সেরকম আওয়াজ। মামুন চোখ বন্ধ করে ফেলল। মনে মনে বলার চেষ্টা করল সে ভুল শুনেছে। গাছের শব্দ হতে পারে। কিছুক্ষন পর আর আওয়াজ পাওয়া গেল না। চোখ খুলে আরেক বিষ্ময়। নিমাই দা দের ঘরে টাঙিয়ে রাখা কৃষ্ঞ এর ছবিটা যেন মামুনের দিকে তাকিয়ে হাসছে। অদ্ভুত ভঙ্গিতে। ঘুটঘুটে অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মামুন চোখ বন্ধ করে ব্যাখ্যা দ্বার করাবার চেষ্টা করল। দূরের কোন আলো জানলা দিয়ে ছবির উপর পড়ে এমন হতে পারে। ঠিক তাই। নিজের আহাম্মকিতে নিজেই হাসার পালা। ঘুমানো’র চেষ্টা করছে কিন্তু ঘুম আসছে না। একটা’র পর ভুতের গল্প মনে পড়ছে। মামুন রুমা’র কথা মনে করার চেষ্টা করল।


অনেকক্ষন ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছে। ঘামে একাকার। একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু লাইন ছেড়ে যাওয়া যাবে না। বিডিআর দের একদল রিলিফ দিচ্ছে লা্ইন এদিক ওদিক হলেই লাঠির বাড়ি। মামুন রিলিফ নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়ায়নি। পুরো ব্যবস্থাটা সরেজমিনে প্রতক্ষ করছে নিছক কৌতুহলে। অসহায় মানুষদের কষ্ট উপলদ্ধির ব্যর্থ চেষ্টা। ভদ্রলোকের মুখোস পড়ে আতলামী আর কি? মামুনের সঙ্গে কামাল ভাই। একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছেন ক’দিন ধরে। একটা পত্রিকায় কাজ করেন। তার সঙ্গেই আসা। পরীক্ষা দিয়ে কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এ সময় দেশ জুড়ে ঝড়ের ভয়াল থাবা। ঘূর্ণিঝড়ে বিধস্ত এলাকা পরির্দশনের কৌতুহল আর কামাল ভাই যাচ্ছে তার সঙ্গি হওয়াতে কৈশর থেকেই রোমান্চ অনুভব করা। কিন্তু রোদের দাপটে আর টিকতে পারল না। সরে আসতে হল। ভরপেট খেয়েও দাড়াতে পারল না আর না খাওয়া লোকগুলো কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে আছে ভাবতেই অবাক হতে হয়।গত কয়েকদিন দেখেছে মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম। বেচেঁ থাকা কত কষ্টকর তবু কি আশায় যেন বেঁচে থাকে মানুষ। স্বপ্ন প্রতারিত তবু স্বপ্ন দেখে বারবার। পথের এক কোণে একটি চায়ের দোকান দিয়ে বসেছে এক বুড়ো চাচা। কাষ্টমার নেই বললেই চলে। জনাকয়েক সাংবাদিক আর রিলিফ দিতে আসা মামুনে’র বয়সী কিছু ছেলে মেয়ে আছে। চা খাব। পিরিচে না ঢেলে চা খেতে পারে না সে। একটা মেয়ে খুব কৌতুহল নিয়ে মামুনের ফু দিয়ে চা খাওয়া দেখছে। মামুন তাকে কিছুটা অবাক করে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করল
: ভালো আছেন?
অবাক হয়ে মামুনের দিকে তাকিয়ে সীমাহিন চেষ্টা স্মরন করার। মামুনই আবার কথা বলে উঠল –
: আপনি ঢাকা থেকে আসছেন।
: জি। কিন্তু আপনাকে তো…
: চিনতে পারলেন না। তাই তো। আমিও পারিনি।
চা এর বিল মিটিয়ে সোজা হাটা ধরে মামুন। পিছনের দিকে একবারও ফিরে না তাকিয়ে। জানে অবাক বিস্ময়ের এক জোড়া চোখ নিরীক্ষন করছে। সেই প্রথম রুমা’র সাথে দেখা।


মেঘের দিকে তাকিয়ে ছবি কল্পনা করা মামুনের ছোট বেলার অভ্যাস। পাবলিক লাইব্রেরীর চত্তরে বসে সেই চেষ্টায় করছিল। এমন সময় প্রশ্ন –

: কেমন আছেন।

অবাক হবার পালা। সেই মেয়েটি। যেন মামুনকে জব্দ করার জন্যই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।

: আপনি ঢাকাতেই থাকেন।

আগের সেই কথোপকথনের প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা বোধহয়।

: আপনি

: কি চিনতে পারেন নি। আমি কিন্তু ঠিকই চিনেছি।

: আমিও চিনেছি। কিন্তু একটু অবাক হয়েছি আপনাকে দেখে।

: আপনি তো অবাক করে দিতে ভালবাসেন। তা নিজে অবাক হয়ে কেমন লাগছে।

মামুন হাসল। সে হাসিই যেন মামুন আর রুমা’র সম্পর্কটাকে আরও অনেক দূর নিয়ে চলল। পরিচয় থেকে আস্তে আস্তে ভাব ভালবাসায় গড়াল ব্যাপারটা। মনের রঙিন ঘুরি উড়িয়ে দিল এই যান্ত্রিক নগড়ে। সব কোলাহোল ছাড়িয়ে নির্জন নিরিবিলিতে প্রেম করতে করতে একদিন রুমা’র সাথে বিয়ে হয়ে গেল।আসলে বাধা হয়ে দাড়াতে পারে এমন কিছুই ছিল না দুজনের ভিতর।সে পারিবারিক হোক আর সামাজীক। তাই খুব সহজেই ওরা একে অপরের কাছে আসতে পেরেছিল। বাসর রাতে হৈমন্তীতে পড়া সেই কথাটা নাড়া দিয়ে গেল – “পাইলাম”।


রুমা আর মামুনের সম্পর্কটা বন্ধুর মত। একে বারে তুই সর্ম্পক। ভালোবাসার কমতি পরিলক্ষিত হয়নি কখনো কোথাও। ঢাকা শহরে একটা ছোট্ট ফ্লাটে থা্কে। একটা কাজের মেয়ে দেশের বাড়ী থেকেই এসেছে। ভালই চলছিল। খুনসুটি ঝগড়া ঝাটি যে একেবারে হত না তা না। তবে সাময়িক। সকাল ৭টার মধ্যে মামুনকে বেড়িয়ে পড়তে হয়। সারাদিন গার্মেন্টেস এ থাকে। ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলতে ঠেলতে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ৯ টা। অফিসের আশেপাশে বাসা নিয়ে লাভ নেই। কারন অফিসে তার কোন কাজ নেই। যখন যে গার্মেন্টস এ কাজ চলে সেখানেই ডিউটি। রুমা’র একাক্বিত্ব ঘোচানের চেষ্টার কমতি নেই মামুনে’র। টি.ভি তো আছেই সাথে একটা নেট এর লাইন সহ একটা পি.সি কিনে দিয়েছে। শিখিয়ে দিয়েছে হাতে ধরে ব্যবহার। কিন্তু এই নেট লাইন ই একদিন দুই জনের নিবিড় সর্ম্পকে হঠ্যাৎ কেন যে ফাটল ধরাল তা বুঝে উঠতে পারল না। আসলে দোষটা কার কোথায় কতটুকু সে প্রশ্নে কোনদিনই একমত হতে পারেনি। প্রথম প্রথম নেট এ রুমা কি করে না করে খুব আগ্রহ ভরে মামুনকে দেখাতো। কিন্তু তারপর কোথায় যেন একটা গোপনীয়তা। লুকোচুরি খেলা। কিছু বিশেষ লোকের সাথে আলাপ চারিতায় বারবার মানা করা সত্বেও মামুন আবিষ্কার করে কি নেশায় আড্ডায় বুদ হয়ে থাকে সে। ভয়ঙ্কার কিছু হলেও হতে পারে ছা’পোষা মানুষ মামুন প্রশয় দিতে পারে না।নিজের মনটা’র ভিতর অশুভ চিন্তা বয়ে যায়। নারীর অধিকারের প্রশ্নে বড় বড় বুলি আউরানো এই মামুনই নিজেকে আবিষ্কার করে পৃথিবীর রঙ্গমন্চে অভিনেতা হিসাবে। এক কথা দু কথায় তর্ক। থামতে চাই না। বহু ব্যবহার করা তর্কের মূহৃতে বুকের ভিতর জড়িয়ে ধরে ঠোটের আলতো স্পর্শ মেখে দিয়া ঠোটে ওষুধটাও ইদানিং আর কাজ করে না। ঝগড়া চলতেই থাকে ভোর রাত অবধি –

: এটা কি হলো?

: ভালোবাসা।

: এ সব ন্যাকামী আমার সাথে আর করবা না।

: আচ্ছা করব না একটু হাস।

: ধ্যাৎ, ছাড় না, ছাই?

: ছাড়ব না।কি করবি?

: উফ। অসহ্য।

রুমা রেগে উঠে চলে যায়। অনেকক্ষন কোন খোজঁ নেই। মামুন পিছু পিছু যেয়ে দেখি সেই নেট। মেজাজ তিরিক্ষি হয়। সব ভালবাসাকে অপমান করে গায়ে হাত তুলে ফেলে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রুমা। দুচোখ বেয়ে নেমে আসতে থাকে জল। লজ্জায় সে জল মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে সামনে থেকে দ্রুত উঠে গিয়ে বেডরুমে ভিতর থেকে দরজায় সিটকিনি দেই। কিংকতর্ব্যবিমুঢ় হয়ে বসে থাকে মামুন।

পরদিন অফিস থেকে ফিরে রুমা’কে আর বাসায় দেখতে পাই না। ফুলির হাতে ছোট্ট একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে গেছে –
: “চললাম। সন্দেহ করে ভালবাসাকে অপমান করেছ। আমার একাকিত্বকে ঘোচাতে না পেরে সহজাত পুরুষালী স্বভাব দেখিয়েছ। তোমার কাছ থেকে আমার আশা অনেক বেশী ছিল। আর দশ জনের সাথে তোমার পার্থক্য ঘুচিয়ে দিলে।ভাল থেকো।”

তারপর প্রায়ই একমাস হত চলল। রুমা বাপের বাড়ী থেকে আসে নি। মামুন একাই ঈদ করতে চলে এসেছে গ্রামের বাড়ী। এই মধ্যরাতে ভয় তাড়াবার জন্য এসব যখন ভাবছে মামুন ঠিক তখনই ভূমিকম্প হল। প্রথম দফা’য় তাই মনে হয়েছে। কিন্তু চোখ খোলার আগেই মনে হল পুরো খাট ধরে কেউ যেন ঝাকি দিচ্ছে। কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভীষন ভয় লাগছে। কোন ব্যাখা দাড় করাতে পারছে না। কলেমা মনে করার চেষ্টা করতে লাগল প্রান পনে। এতে ভয় দূর হয়। কিছুতেই মনে পড়ছে না। এ সময় গগন বিদারি একটা চিৎকার ভেসে এল। কোন পিচাশের পক্ষেই এরকম আওয়াজ করা সম্ভব। মামুন লাফ মেরে উঠল। নিমাই দা নিমাই দা বলে প্রান পনে চিল্লাতে লাগল। কোন সাড়া শব্দ নেই। দরজা খুলে বাইরে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু দরজা খুলতেই যে দৃশ্য দেখল তাতে আত্বারাম খাচাঁ হবার যোগাড়। বৌদি দাড়িয়ে আছে। সিনেমায় দেখা রক্তচোষা ড্রাকুলাদের মত লাগছে। দাতে রক্ত লেগে আছে। সারা শরিরে রক্ত। কুৎসিত শব্দ করছে। কাচাঁ মাঙসের গন্ধ এসে নাকে লাগল। সামনে নিমাই দা’র লাশ পড়ে আছে। সেখান থেকে কলিজা বের করে খাচ্ছিল বোধহয়। ওফ এত বিভৎস! থুথু না বমি যেন করল বৌদি। গলা মাংস আর কলিজা বের হয়ে আসছে মুখ দিয়ে। মামুন স্থির। মামুনের দিকে এগিয়ে আসছে নর খাদকটা। নখ গুলো বেশ বড় বড়। মামুন ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল। কিন্তু একেবারে নিখুত কাজ। সোজা মামুনের গলায় দাতঁ বসে গেছে। অজগরের খড়গোশ ধরার মত মামুনকে জাপটে ধরে রক্ত চুষতে লাগল। মামুনের দেহ নিথর। শেষবারের মত রুমা’র মুখটা মনে পড়ছে।

পাদটীকা.

মামুনের লাশ পাওয়া গেল পরদিন সকালে ঝিলের ধারে। নিমাই সরকার প্রথম দেখে। পরে সবাইকে খবর দেয়। পুলিশি তদন্ত চলছে। কি হয়েছিল ঠিক কেউ বলতে পারে না। তবে মামুনের গলায় দুটো ফুটো ছিল এটা নিশ্চিত।

(ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

সহযাত্রী

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

কোন কাজ সময় মতো শুরুও শেষ না করতে পারার জন্য আমার বেশ বদনাম আছে । আর এর জন্য কেউ আমাকে কোন দায়িত্ব দিয়ে খুব একটা শান্তিতে থাকতে পারেনা । আমি নিশ্চিন্তে থাকলেও যে দায়িত্ব দেয় কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেশ টেনশনে থাকতে হয় । বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলে তো আর কোন কথাই নাই ।
সুতারাং কাজটাজ নিয়ে আমাকে খুব একটা টেনশন করতে হয় না , যার কাজ তারই আরেকটা কাজ হয়ে যায় আমাকে মনে করিয়ে দেয়া ।
বেকারদের সবাই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাবে । আমার বেলাতেও তার কোন হেরফের নেই । যখন যার যেমন ইচ্ছে হুকুম দিয়ে যাচ্ছে , আর আমি তা পালন করে যাচ্ছি । ঠিক মতো করতে পারলে ভাল , তা না হলে আমি পৃথিবীর সবচাইতে অপদার্থদের সরদার ।
টুকটাক লেখা লেখি ছাড়া আমি তেমন কিছু একটা করি না । দু’একটা পত্রিকাতে কবিতা টবিতা লিখি । ইদানিং ব্লগেও লেখালেখি শুরু করেছি । ভূতের গল্প লিখে সবার কাছে মোটা মুটি একটা অবস্থা করে নিয়েছি । যদিও আমি নিজে কখনও ভূত দেখিনি । আর ভূতে বিশ্বাসও করিনা । তবে মনে বড়ো খায়েশ নিয়ে আছি যদি কখন ভূতরা দয়া পরবস হয়ে দেখা দেয় , তবে আমি তাদের নিয়ে লিখেটিখে একেবারে মহালেখক হয়ে যাই ।
আমি থাকি পুরান ঢাকায় বোনের বাসায় । দুলাভাই বড় ব্যবসায়ী । বেশ হোমরা-চোমরা মানুষ । আমায় গৃহপালিত প্রাণির মতো বেশ স্নেহ করেন । সকাল বিকাল খোঁজ খবর নেন । হাত খরচ দিয়ে সাহায্য করেন । আমার মতো , দুলাভাইরা ও দু’ভাই বোন । ওনার বড় বোন লুবনা আপা , আমি যাকে মাথা খারাপ আপা বলে ডাকি , থাকেন চিটাগাং । লবনা আপুর স্বামীর তেলের ব্যবসা । বেশ ধনী মানুষ । ধনী মানুষের সেবা যত্নের জন্যও মহান আল্লাহতালা পৃথিবীতে অনেকে কিছু পাঠান । যাদের কাজই হচ্ছে শুধু ধনী মানুষদের সেবা যত্ন করা । নিজেকে আমার মাঝে মাঝে সেই শ্রেণীর মনে হয় । যাই হোক এসব বলে কয়ে কোন লাভ নেই । সবই হচ্ছে কপাল ! কিনলাম গাই হইল আবাল অবস্থা ।

রাত বাজে প্রায় দশটা ।
আমি কমলাপুল রেল স্ট্রেশনে রিকসা থেকে নামলাম । গন্তব্য চিটাগাং লুবনা আপার বাসা । দুলাভাই বোনের জন্য মাথা ঠান্ডা করার ঔষুধ নিয়ে এসেছেন , চায়না থেকে । আমি তা নিয়ে যাচ্ছি । ট্রেন ছাড়ার কথা সাড়ে দশটায় । আমি আজ বেশ সময় মতো আসতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করলাম । না , যাক এ কাজটা অন্তত ঠিক মতো শেষ হবে । একটা সিগারেট কিনে ধরালাম । পকেট থেকে টিকিটটা বেড় করে দেখলাম ট্রেন ছাড়ার সময় এর জায়গায় সাড়ে দশটা লেখা । মোবাইলে ঘড়ি দেখলাম – ৯টা ৫৫ মিনিট । সিগারেট শেষ করে প্লাটফমের দিকে এগুলাম । প্লাটফমটা কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো । লোকজন খুব একটা নেই । দু’একজন বেঞ্চিতে বসে ঝিমুচ্ছে । আমি আবার ঘড়ি দেখলাম , দশটা বাজে । আরো ত্রিশ মিনিট সময় আছে । কিন্তু ট্রেন কৈই ?
সাধারনত ট্রেন ছাড়ার আধা ঘন্টা আগে লোকজনের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার কথা । কিন্তু এখানে দেখছি ট্রেন ও নাই ,যাত্রী ও নাই । হরতাল টরতাল না তো ?
আমি পায়চারি করতে লাগলাম । ঘড়িতে দশটা ১৫ বাজার পরও কোন ট্রেনের দেখা নেই । আজব তো । আমার ক্যামন জানি সন্দেহ হলো , পকেট থেকে টিকিটা বেড় করে আবার দেখলাম । আজকের তারিখ ইতো লেখা রয়েছে । তা হলে ? ঘটনা কি !!
আমি টিকিট কাউনন্টারে চলে এলাম । প্রায় সব গুলো কাউন্টার খালি । একটাতে একজন বসে কম্পিউটারে কার্ড খেলছে । আমি টিকিটা এগিয়ে দিয়ে বললাম ,- ভাইজান ট্রেন কখন ছাড়বে ?
লোকটা কম্পিউটার থেকে চোখ না সড়িয়েই বললো -কোন ট্রেন ?
আমি টিকিটটা দেখিয়ে বললাম এটা ।
লোকটা টিকিটা নিয়ে একবার দেখে বললো – এ ট্রেন তো আরো এক ঘন্টা আগে ছেড়ে গেছে ।
বলেন কি ? আমি চমকে উঠলাম । কিন্তু ট্রেন ছাড়ার সময় তো সাড়ে দশটায় ।
সাড়ে দশটা না ; ভাল করে দেখেন ।
লোকটা টিকিটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললো । চোখে মুখে র্স্পষ্ট বিরক্তি । যেন এই মূর্হুতে আমি পৃথিবীর সব চাইতে বিরক্তি কর কোন প্রাণি । আমি টিকিটটা আবার দেখলাম , আবচ্ছা আলোয় আমার কাছে লেখাটা সাড়ে দশটাই বলেই মনে হলো ।
ভাই সাড়ে দশটাই তো লেখা ? আমি আগের চেয়ে নরম সুরে বললাম ; লোকটা এবার ফোনে কারো সাথে কথা বলছে । আমার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে চুপ থাকতে বললো । মনে মনে নিজের ভাগ্যটাকে গাল মন্দ শুরু করলাম । কৈ ভেবে ছিলাম কোন সুন্দরী সহযাত্রীর পাশে বসে গল্প করতে করতে চিটাগাং যাবো ! না এখন রাগে দু:খে নিজের মাথার সব চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে । নিজেকে হঠাৎ খুব অসহায় মনে হলো । মনে হলো আসলেই আমি এ পৃথিবীতে চলার জন্য একজন অক্ষম মানুষ । মনে মনে বললাম হে বিধাতা আমাকে কেন পাঠালে তোমার এ মহা বিশ্বে , আর পাঠালে যদি কেন যোগ্য করে পাঠালে না ? বুক চিড়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস বেড় হয়ে এলো ।
লেখা পড়া জানেন ? লোকটা ফোন রেখে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো । চোখে মুখে আগের চেয়েও বেশি বিরক্তি ।
-সরি বুঝলাম না ভাই । আমি অবাক হয়ে বললাম ।
জিজ্ঞেস করছি পড়া লেখা জানেন ?
জ্বি জানি । রসায়নে এমএসসি করেছি , ঢাকা ভারসিটি থেকে । আপনি কতো দূর করেছেন ? আমি যতোটুকু সম্ভব মাথা ঠান্ডা রেখে উল্টো জিজ্ঞেস করলাম ।
সময়টা দেখে পড়তে পারেন না , যে , সাড়ে নটা লেখা আছে ।
আমি আবার টিকিটটার দিকে তাকালাম । কিন্তু আমার কাছে মনে হলো সাড়ে দশটাই লেখা ।
এমন সময় আরেক জন হেংলা পাতলা লোক ঢুকলে কাউন্টারে ।
কি মতিন ভাই , কি হইচ্ছে ? হইচই কেন ! লোকটা একটা বুথে বসতে বসতে বললো ।
আরো দেখ না , সাড়ে নটায় যে ট্রেন ছেড়ে গেছে সেটার জন্য উনি এখন এসেছে ।
ভাই আপনি ট্রেন ফেল করেছেন । নতুন আসা লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো ।
আমি বুঝলাম এদের সঙ্গে কথা বলে পারা যাবে না , তাই অনেকটা কম্পোমাইজের সুরে বললাম – আমার খুব আর্জেন্ট কাজ আছে , আজ চিটাগাং যেতেই হবে । আমার চোখে মুখে অনুনয় ঝরে পরতে লাগলো ।
রাতে আর কোন ট্রেন নাই ; ভোর সাড়ে সাতটায় আছে । সেটায় চলে যান ।
কিন্তু ভাইজান আমাকে কাল ভোরে যে করে হোক চিটাগাং পৌঁছাতেই হবে । কিছু একটা ব্যবস্থা করুন প্লীজ ।
স্যার কি রাতে চিটাগাং যাবে মতিন ভাই ?
হু ! যাবে । আগের লোকটা উত্তর দিলো ।
দেখেন দেড়টার সময় আমাদের একটা স্পেশাল ট্রেন যাবে চিটাগাং । আপনি চাইলে যেটায় ব্যবস্থা করে দিতে পারি ।
প্লিজ ভাই , দেননা ব্যবস্থা করে ; আমার অনেক উপকার হবে ;
তয় , ভাড়া পরবে পাঁচশ টাকা ।
আমি বললাম- কোন ব্যাপার না , আমি রাজি ।
ঠিক আছে , কম্পাটমেন্টে গিয়ে বসেন , আমি ট্রেন ছাড়ার আগে আপনাকে ডেকে নেবো ।
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম । যাক বাঁচা গেল । যতো মুশকিল ততো আসান । আমি আকাশের দিকে মুখ করে আল্লাকে ধন্যবাদ দিলাম ।

দুই …………….

স্যার ; আসেন ট্রেনে ছেড়ে দেবে । বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরেছিলাম , হঠাৎ কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠে তাকালাম । কাউন্টারের সেই হেংলা মতো লোকটা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। এতো কাছ থেকে দেখে লোকটাকে আরো বেশি রোগা মনে হলো ।
সবাই উঠে গেছে , বড় সাহেব আসলেই রওনা ট্রেন দেবে । চলেন স্যার ।
এ ট্রেন চিটাগাং যাবে তো ? আমি আবারো কনফারর্ম হবার জন্য জিঞ্জেস করলাম ।
কি যে বলেন না স্যার , অবশ্যই চিটাগাং যাউব , এখন তারাতারি চলেন ।
আমি ব্যাগটা নিয়ে উঠে পরলাম ।
ট্রেনটা ছোট , সিটগুলো মুখোমুখি বসানো ; দেখেই বোঝা যায় বেশ আরামদায়ক । আমার ভাল লেগে গেল । মনে মনে বললাম, উপড় তলার মানুষরা সব সময় আরামে থাকে । আমি কি কখনও উপড় তলার মানুষ হতে পারবো ? নিজের চিন্তার ধরন দেখে নিজেরই হাঁসি পেল । লকারে ব্যাগটা রেখে আমি বাপাশের একটা সিটে বসে পরলাম । মনেমনে ভাবলাম আর কেউ না উঠলে শুয়েও যাওয়া যাবে । ঘড়ি দেখলাম , রাত দেড়টা বাজে । জানালা দিয়ে বাহীরে তাকিয়ে দেখলাম পুরো প্লাটফমটা ক্যামন ভূতরে হয়ে আছে ,কোন লোকজন নেই । এখানে সেখানে দু’একজন কাথা মুড়ি ঘুমাচ্ছে । দেখে বুঝাই যায় না প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখান দিয়ে আসা যাওয়া করে । শত শত দু:খ ,কষ্ট ভালবাসা বুকে নিয়ে । হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাষ বেড় হয়ে এলো ।
আস্তে আস্তে ট্রেনটা চলতে শুরু করলো । আমি বাহীরে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম । সবকিছু ক্যামন পেছনে চলে যাচ্ছে । অনেকটা আমাদের জীবনের মতো । সব কিছু হারিয়ে যায় কালের গহর্ব্বরে । মিনিট বিশেক চলার পর ট্রেনটা থামলো কোথাও । আমি বুঝতে পাললাম না কোথায় থেমেছে ।
মনে হলো ঢাকার আশে পাশে কোথাও ।
ব্যাগ নিয়ে সার্ট প্যান্ট পরা একজন মাঝ বয়সি লোক উঠলো । চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকালো অনেকটা পরিচিতের মতো । তারপর এগিয়ে এসে ব্যাগটা রেখে ধপ করে আমার মুখোমুখি বসে বললো- ক্যামন আছেন ? কোথায় যাচ্ছেন ? আমি বেশ অবাক হলাম । আমি চিনতে পারলাম না । কোথাও দেখেছি তা ও মনে পড়লোও না । আমার কপাল কুচকে গেল । আমি ছোট্র করে বললাম ভাল । আপনি ক্যামন আছেন ? শেষের কথাটা ভদ্রতা রক্ষার জন্য বললাম ।
আর ভাল , যে দিন কাল পড়েছে , তাতে টিকে থাকাই দায় । লোকটা ফোস করে বললো ।
আমি কিছু না বলে জানালার দিকে ঘুরে বসলাম । ট্রেনটা খুব জোরে চলতে শুরু করেছে । ঠান্ডায় হাওয়ায় চোখ বুঝে আসতে চাইছে । লোকটা একটা বই বেড় করে বসেছে । আমি সিটের হাতলে মাথা রেখে শুয়ে জানালা দিয়ে বাহীরে তাকিয়ে রইলাম ।
কোথায় যাচ্ছেন তা তো বললেন না ?
চিটাগাং । আমি কথা না বাড়াবার জন্য ছোট্র করে উত্তর দিলাম । অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলাঠা ঠিক না । লোকটা মনে হয় আমার মনোভাব বুঝতে পারলো । মৃর্দু হেসে বললো – আমি কিন্তু আপনাকে চিনি ?
আমি বেশ অবাক হয়ে আগের চেয়েও বেশি কপাল কুঁচকে লোকটার দিকে ভাল করে তাকালাম । ক্লিন সেইভ গোলগাল মুখমন্ডল আর চোখ নাক ছাড়া অন্য অন্য এমন কিছুই দেখতে পেলাম যে লোকটাকে আমার কাছে পরিচিত বলেমনে হবে ।
আমার যদি ভুল না হয় – আপনি “আমার কবিতা” নামে ব্লগে লিখেন , ঠিক বলেছি না ?
এবার আমি বেশ চমকে উঠলাম । আরে এ বলে কি । এতো দেখি কোন ব্লগার ভাই ।
কিন্তু , আমি তো আপনাকে চিনলাম না ভাই । আমি শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে বললাম ।
আমাকে চিনবেন না । আমি কোন ব্লগার নই । তবে আমার মেয়ে ব্লগার । সেই লেখেটেখে । আমি শুধু সময় পেলে মাঝে মাঝে পড়ি । আপনার ভূতের গল্পগুলো আমার মেয়ের খুব প্রিয় । আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম । তারপরও লজ্জাবনত চোখে বললাম – তাই নাকি । আমি হেসে ফেললাম , মনে মনে বেশ খুশি হয়ে উঠেছি । এর চাইতে বড় প্রাপ্তি একজন লেখকের কাছে আর কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না ।
জ্বি , আপনার প্রতিটি ভূতের গল্প আমার মেয়ের কাছে প্রিন্ট করা আছে , সময় পেলেই পড়ে । প্রতি শুক্রবার অপেক্ষায় থাকে আপনার নতুন কোন গল্পের জন্য । আমার লজ্জা পাবার পরিমান বেড়ে গেল ।
আরে বাস ! বলেন কি । আমি কি সব আবল তাবল ; যা তা লিখি , তা আবার কারো কাছে ভাল লাগে নাকি । কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কি ভাবে ?
বারে , ব্লগে আপনার ছবি দেয়া আছে না । লোকটা হেসে বললো ।
তা আপনার মেয়ে কি নামে লেখে ?
আপনিও ওকে চিনবেন ; ওর নাম নিসা । আপনার অনেক গল্পের নায়িকার নাম নিসা , তাই না ?
ও আচ্ছা ! হ্যা ; আমি তো ওনাকে চিনি । আমার অনেকগুলো গল্প বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়েছে । কিন্তু অনেক দিন ব্লগে আসছেন না ।
ব্লগে না আসলেও আপনার গল্পগুলো কিন্তু বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ে ।
আমি ধন্য হলাম , আমার নাম সাখাওয়াত হোসেন বলে আমি লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম ।
আমি মোজাম্মেল হোসেন । আপনার সঙ্গে মিলিত হতে পেরে খুব ভাল লাগল । মোজ্জামেল সাহেব আমার হাতটা ধরতেই আমি চমকে উললাম । মনে হলো এক টুকরো বরফ কেউ আমার হাতে চেপে ধরলো । এতো ঠান্ডা কারো হাত হয় নাকি ?
আমি কোন মতে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম – আমারও খুব ভাললাগলো ।
আচ্ছা আপনি বই বেড় করছেন না কেন ?
জ্বি বই ! আমি মৃদু হাসলাম , তারপর বললাম – চাইলে-ই তো হয় না । তবে ইচ্ছে আছে , আল্লাহ চাইলে বেড় করবো ।
যদি কিছু মনে না করেন আমার মেয়ের জন্য যদি একটা অটোগ্রাফ দিতেন । মোজাম্মেল সাহেব অতি বিনয়ের সঙ্গে বললো । এবার আমি সত্যি সত্যি চমকে উঠলাম । আমার মনে লজ্জ আমার গাল চোখ মুখ নাক গলে মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে পরছে । না , না আমি এতো বড় লেখক এখনও হয়ে উঠতে পারিন ।
তার মানে অট্রোগ্রাফ দেবেন না ।
না , না দেবো না কেন ।
তাহলে এখানে কিছু লিখে একটা অটোগ্রাফ দিন প্লিজ । মোজাম্মেল সাহেব আমার দিকে একটা ঔষুধ কম্পানীর প্যাড আর কলম এগিয়ে দিয়ে বললো ।
আমার হাতে আবার ও ঠান্ডা হাতের র্স্পশে পুরো শরীর শিউরে উঠলো । কলমটাকে মনে হলো ফ্রিজ থেকে বেড় করে আনা হয়েছে । আমি কাঁপাকাঁপা হতে লিখলাম – প্রিয় নিসাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা সহ ভালবাসা – “আমার কবিতা” তারপর ছোট্রো করে সাইন করে দিলাম ।
আচ্ছা সাখাওয়াত সাহেব , আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন ? মোজাম্মেল সাহেব খুব সিরিয়াস ভাবে জিজ্ঞেস করলেন ।
আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না । হেসে প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলাম ।
কি হলো কিছু বলছেন না যে ? আপনি কি ভূত প্রেতে বিশ্বাস করেন ? ভূত প্রেতদেখেছেন কখনও ?
আমি একটু থেমে সময় নিয়ে বললাম – বিশ্বাস করিনা । আসলে ভূত বলে কিছু নেই । আমাদের অনুভুতির খুব সূক্ষ্ন একটি ভীতিকর অংশের নামই হচ্ছে ভূত । তা ছাড়া আমরা মানুষ ও জীব যন্তুদের মস্তিস্কে কিছু সেল বা কোশ রয়েছে যেখানে কোন ঘটনার পরিপেক্ষির ভীতি কর অনুভুতির জন্ম হয় অ আসলে সেটাই ভৌতিক ভীতি বা ভূতের ভয় ।
তারমানে আপনি ভূতে বিশ্বাষ করেন না ?
জ্বি ,আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা । আসলে সবটাই অনুভুতির ব্যাপার । আমি বেশ বিজ্ঞের মতো বললাম ।
দেখেন ; বিশ্বের সব জাতি কিন্তু ভূতের ভয় করে । আমেরিকা , লন্ডনে এমন অনেক বাড়ী আছে যেগুলো ভূতের ভয়ে খালি পরে আছে । মোজাম্মেল সাহেব রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন ।
আপনার কথা সত্যি । কিন্তু প্রকৃত খোঁজ নিয়ে দেখবেন এগুলো আসলে সবটাই হিউমার । আমি আজ পর্যন্ত এমন কাউকে পাইনি যে , বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে সে ভূত দেখেছে । ভূত টুত বলে আসলে কিছু নেই ।
তাহলে আপনি এসব ভৌতিক কাহীনি লিখেন কেন ?
আর ভাই , এটা তো আমাদের বিনোদনের একটা অংশ মাত্র । এর বাহীরে কিছু না । আমি হাসতে হাসতে বললাম । তারপর একটু থেমে মোজাম্মেল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললাম – আচ্ছা আপনি কি কখনও ভূত দেখেছেন ?
মূর্হুতে মোজাম্মেল সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল । একটা র্দীঘশ্বাস ফেলে বললেন সে কথা পরে হবে ।
দেখলেন তো আপনিও উত্তর দিতে পারলেন না । আসলে ভূত বলে কিছু নেই । যদি থাকতো , তবে এতো দিনে মানুষের সঙ্গে আপোষ-রফা করে আমাদের সমাজেই প্রকাশ্যে বসবাস করতো । ঈদে-র্পাবণে আমরা যেতাম ভূতের বাসায় বেড়াতে ওরাও আসতো আমাদের বাসায় । হা হা হা হা আমি হাসতে লাগলাম ।
মোজ্জামেল সাহেব আমার হাসিতে মনে হলো একটু বিরক্ত হয়ে , পেছনে হেলান দিয়ে বসতে বসতে বললেন – কিন্তু আমি ভূতে , বিশ্বাস লেখক সাহেব !
তাই নাকি ?
তো কেন বিশ্বাস করেন । ভূত দেখেছেন নিশ্চই ? আমি একটু ঝুকে অনেকটা ফিসফিস করে জিঞ্জেস করলাম ।
মোজ্জাম্মেল সাহেব এবার হাসলেন । হাসির মানেটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না । তবে কেন যেন আমার বিরক্ত লাগলো, কোন কিছুতে বিশ্বাস করতে হলে চোখে দেখতে হয় , না দেখে বিশ্বাস করা যায় না , আমি যখন কথাগুলো বলছিলাম ঠিক সেই সময় খুব শব্দ করে পাশ দিয়ে একটা ট্রেন উল্টো দিকে চলে গেল ।
এটা কোন যুক্তি হতে পারে না লেখক সাহেব । এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা না দেখেও বিশ্বাস করি ।
– যেমন ? আমি কপাল কুচকে নাচিয়ে উদাহারন চাইলাম ।
যেমন ধরেন – বাতাস , যেমন ধরেন সৃষ্টিকর্তা । এরকম অসংখ্যা উদাহারণ আছে , ক’টা চাই আপনার ?
উ–প—স । আমি পিছিয়ে গেলাম । না আপনার সঙ্গে যুক্তিতে পারছি না । বলে আমি রন ভেঙে দিলাম ।
তারমানে কি আপনি ভূতে বিশ্বাস কললেন ? মোজ্জামেল সাহেব হাসতে হাসতে বললেন ।
না । না । কখনওই না । ভূত বলে কিছুই নেই । সবই মানুষের কল্পনা । আমি একটু জোড়েই বলে উঠলাম ।
মোজ্জামেল সাহেব হাতের বই প্যাড ব্যাগে ডুকাতে লাগলেন । আমি বেশ অবাক হয়ে জিঞ্জেস করলাম – নেমে যাবেন নাকি ?
হা ।
এখানে কোথায় নামবেন ?
সামনে কালিগন্জ ট্রেন থামবে ।
বুঝলেন কিভাবে যে ট্রেন কালিগন্জ চলে এসেছে ?
মোজ্জামেল সাহেব আবারও হাসলেন । ট্রেন কিন্তু থামলো না ; চলতেই থাকলো । আমি বাহীরে তাকিয়ে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না ।

তিন…………….

আমি হাতের কলমটা নাড়াচাড়া করতে করতে মোজ্জাম্মেল সাহেবের ব্যাগ গোছানো দেখছি । ব্যাগ গোছানো শেষ করে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- তাহলে চলি লেখক সাহেব ।
আমি উঠে হাত মেলাবার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিলাম , মনে মনে শিউরে উঠলাম ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতে হবে বলে । কিন্তু মোজ্জাম্মেল সাহেব হাত না মিলিয়ে , আসি বলে , সামনে পা বাড়ালেন । আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম । হঠাৎ করে আমার হাত থেকে কলমটা পরে গেল , আমি বসে মোজ্জালেম সাহেবের দিক থেকে চোখ না সড়িয়ে বসে কলমটার জন্য হাতাতে লাগলাম , মোজ্জাম্মেল সাহেব তখন পৌচ্ছে গেছেন দরজার কাছে , হঠাৎ আমার চোখে গেল মোজ্জাম্মেল সাহেবের পায়ের দিকে – সঙ্গে সঙ্গে আমি ভয়ে আতকে উঠলাম , মোজ্জাম্মেল সাহেবের পা দুটো আমার দিকে ঘুরানো , অথচ তিনি দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন । এটা কি করে হয়, শরীরটা সামনের দিকে অথচ পায়ের পাতা দুটো পেছনর দিকে । আমি কি করবো বুঝতে পারলাম না । ভয়ে সিটের দিকে চেপে গেলাম । মোজ্জাম্মেল সাহেব দরজার কাছে দাঁড়াতেই দরজাটা আপনা আপনি খুলে গেল । সঙ্গে সঙ্গে কামরাটায় এক রাশ ঠান্ডা হাওয়া এসে ডুকলো , ভয়ে আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করেছে । মোজ্জাম্মেল সাহেবের মাখুটা আস্তে আস্তে তার ঘাড় বেঁকে আমার দিকে গুরে গেল , আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম ,না , না এ হতে পারে না । মোজ্জাম্মেল সাহেব মুখ হাসি হাসি করে বললেন – কি ভূতে বিশ্বাস হয় না ? বলেই উনি চলন্তে ট্রেন থেকে বাহীরে হেঁটে গেলেন । আমি ভয়ে ভয়ে জানালার কাছে গিয়ে মোজ্জাম্মেল সাহেবকে দেখার জন্য বাহীরে তাকালাম , কিছু চোখে পরলো না । হঠাতই মোজ্জাম্মেল সাহেব জানালায় কাছে উদয় হয়ে বিকট শব্দে হেসে উঠলেন – হাঅঅঅঅঅঅঅ । আমি ভয়ে চমকে গিয়ে , চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালাম ।

লিখেছেন : মুহাম্ম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন

(ভূত ও ভৌতিক -> ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প)

জ্বিনের ছেলে

1

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

যারা নাক সিটকান,কিংবা ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহে জর্জরিত,তারা না পড়লেই খুশী হব।
আমার ফুফুর বাড়িতে একজন মহিলা আছে যার বিয়ে নাকি জ্বিনের সাথে হয়েছে।মহিলার বাবা একজন পুরোদুস্তুর মসজিদের ইমাম।আগাগোড়া আল্লাহ ভক্ত মানুষ।তিনি গত হয়েছেন অনেক আগেই।তারপর থেকেই ঘটনা শুরু হয়।মেয়েটা কে মাঝে মাঝে গাছের ডালে বসে থাকতে দেখা যেত।মাঝ রাতে নদীর পাড়ে মেয়েটা একা একা কারো সাথে কথা বলত একা একা আর খুব জোরে জোরে হাসত।গ্রামদেশে মেয়েদের এহেন আচরণ সত্যিই প্রশ্নসাপেক্ষ।অনেক কথা রটে গেল।অনেকে বলতে লাগল বাবার মৃত্যুর পর মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেছে আরো হাবিজাবি।অনেকে বললেন মেয়েটাকে জ্বিনে ধরেছে।যেহেতু সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে তাই ওর ভাইরা জ্বিন তাড়ানোর ওঝা নিয়ে এল।ওঝা সরিষার তেল,তুতড়া পাতা,ঝাটা চাইল।কাজ শুরুর আগেই হঠাত মেয়েটি পুরুষ্ঠ মোটা গলায় সবাইকে সালাম দিল।বলল,”আমি তো আপনাদের কোন ক্ষতি করিনি,ক্ষতি করার চেষ্টাও করিনি।তাহলে আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন কেন??আর মেয়েটির ওপর কোন ধরনের আঘাত কিংবা আঘাত করার চেষ্টা করবেন না।আমি ওকে বিয়ে করব।পুরো এলাকাবাসী অবাক হয়ে গেল।ওঝা মেয়েটিকে সরিষার তেল নাকে ধরে বলতে থাকল,তুই যাবি কিনা বল।আর এখানে কিভাবে আসলি?জ্বিন টা বলল,আমি অনেক দূরে থাকি।এক দিন এখানে এসেছিলাম কেন তা মনে নাই।তবে ওই মসজিদে একদিন জুম্মাহর নামাজ পরেছিলাম।হামিদার(ঐ মেয়েটির নাম)বাবা ইমামতি করেছিলেন।আমার ওনার খুতবা খুব ভাল লেগেছিল।নামাজ শেষে আমি ওনার সাথে কথাও বলেছিলাম।নিজের পরিচয় দিয়েছিলাম।উনি আমাকে মেহমান হিসেবে নিয়েছিলেন।তখন থেকে এখানে প্রায়ই আসতাম।একদিন উনি আমাকে দাওয়াত করে খাওয়ালেন ও।যদিও খাবারের পরিমান কম ছিল,তবুও আমি রাগ করিনি।হামিদা খুব সুন্দর মহিলা।তখন থেকেই মেয়েটাকে পছন্দ করি।ইমাম সাহেব প্রথম প্রথম খুব বকা দিতেন।পরে আর দেন নাই।উনি ভাবতেন মানুষ আর জ্বিন বিয়ে হয় না।কিন্তু আমাদের অনেকেই মানুষকে বিয়ে করতে চায়।ওরা অনেক ভাল হয়।আমি জানিনা এটা যায়েয নাকি না যায়েয তবুও করব।আপনি তাড়ায়ে দিলে আবারো আসব।আমি ভাল জ্বিন।কারো ক্ষতি করতে চাইনা।আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন।আমি ওকে নিয়েই চলে যাব।ওঝা বিরক্ত গলায় বললেন,তুই এখনি যাবি।না হয়,ঘর বেধে ধুপ পুড়ানো শুরু করব,তখন এখানেই মারা যাবি।জ্বিনটা বলতে শুরু করল,আমি এখন গেলেও পরে তো আবার আসব।লাভ কি??আমাদের এক জায়গায় বেশীদিন থাকার নিয়ম নেই।আমি ওকে বিয়ে করে এখানে সবসময় থাকব।ওঝা বলল,এটা বদজ্বিন।উনি কালকে এর ব্যবস্থা করবেন।কিন্তু মেয়েটাকে এরপর আর পাওয়া যায়না।অনেক খোজা হয়।

অনেক দিন পর মেয়েটা একটা বাচ্চা নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে সাথে একটা বাচ্চা নিয়ে।নাক সিটকানো গ্রামের মানুষের কোন উত্তরই মেয়েটা দিতে পারেনি।শুধু বলেছিল এটা ওর ছেলে।মেয়েটাকে ছেলে সহ গাছের সাথে বেধে ফেলে ওর ভাইরা।সাথে সাথেই গর্জন শোনা গেল।মেয়েটা আড়ষ্ঠ গলায় বলছে ও আমার স্ত্রী।এখানে বেড়াতে এসেছে।কিছুদিন পরই চলে যাবে।কিন্তু সেদিনই ওঝ ডেকে ওকে বোতলে ফেলা হয়।তওবা করানো হয় যাতে এ দিকে আর না আসে।জ্বিনটা তখন চলে যায়।আর কখোনই আসে নি।মেয়েটাও নিখোজ হয়নি।সেই ছেলেটার এখন ১১ বছর।মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে।অসম্ভব রকম ভাল ছাত্র।এখনই হাফেজী শেষ করে ফেলেছে।মহিলাটাকে অনেক বার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কোথায় ছিল,বাচ্চা কিভাবে আসল।ও বরাবরের মতই চুপ ছিল।ছেলেটা অসম্ভব সুন্দর।ছেলেটাকে গ্রামের সবাই জ্বিনের ছেলে নামে চেনে।গ্রামটা কিশোরগঞ্জের কাছাকাছি জাহাঙ্গীরপুর।

(ভূতুড়ে গল্প)