অতৃপ্ত

4

ঘটনাটি ঘটেছিল আমাদের গ্রামে ১৯৯৫ সালের কোন এক মাসের ২২ তারিখ সকালে। ঘুম থেকে উঠার শুনতে পাই আমাদের গ্রামের এক ছেলে ফাঁসি নিয়ে আত্নহত্যা করছে। শুনে মনটা ভিষণ খারাপ হয়ে গেল দুই দিন আগে তার সাথে নাস্তা করলাম মনটাকে মানাতে পারছিলামনা।ছেলেটা ছিল হিন্দু আর তার নাম ছিল রাতুল সাহা। আমরা সবাই তাকে রাতুল’দা বলে ডাকতাম। রাতুল’দা পড়াশুনা করতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। তার মৃত্যু তার বন্ধুরাও সহজে মেনে নিতে পারে নি। খুব খারাপ লাগলেও তাকে সৎকার করার জন্য তার বাড়িতে সবাই যাই। দাহ শেষ করে আমরা চলে আসি। এ ঘটনার পাঁচ দিন পর রাতুলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বনন্ধু ছিল, তার নাম রানা, এক সে রাত্রে বাড়ি যাবার সময় শোনে কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। গলাটা রাতুলের মত লাগলেও সে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা। মনে মনে ভাবছিলো রাতুল তো পাঁচ দিন আগেই মারা গেছে, ও আমাকে কেন ডাকবে। মনের ভুল ভেবে সে আবার হাঁটতে লাগলো। আবার কিছু দূর হাঁটার পর শুনতে পেল কে যেন খুব কাছ থেকে বলে উঠলো – “কিরে রানা শুনছিস না তোকে আমি ডাকছি!” এবার রানা ভয় পেইয়ে গেলো। এরপর আর কি হল রানা বলতে পারে নি।

এর সাত দিন পরের ঘটনা। রাতুল’দার পাশের বাড়ির এক বয়সী হিন্দু ভদ্রলোক থাকতেন। তাকে সবাই কাকা বলে ডাকতো। তিনি মাঝরাতে বাথরুম করার জন্য প্রায়ই উঠতেন। তো সেদিনও তিনি বাথরুম সেরে ঘরে আসছিলেন। আসার সময় তিনি হঠাৎ শুনতে পেলেন কে যেন তাকে বলছে – “কাকা ভাল আছো?” এ কথা শুনে কাকা একটু অবাক হলেন। ভাবলেন এই মাঝরাতে এখানে এসে কে তাকে ডাকলো! অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। সেই কন্ঠটা আবারো বলে উঠলো-“কাকা ভালো আছো?” কাকা এরপর বুঝতে পারলেন যে এটা আসলে রাতুল’দা এর গলা। কাকা অনেক তুকতাক আর তন্ত্র-মন্ত্র জানেন, এই ধরনের ঘটনা তার সাথে আগেও ঘটেছে। তাই তিনি তার স্বভাবমত কথা বলতে শুরু করলেন। কাকা জিজ্ঞেশ করলেন – “তুই এখানে কেন?” উওরে রাতুল’দা বলল – “আসলাম তোমাদের দেখতে।“ কাকা বললেন – “তুই এখান থেকে চলে যা রাতুল” এই কথা শুনে রাতুল’দা কাকার সাথে তর্ক শুরু করে দিলো। অনেক্ষন তর্কের ষেশে কাকা রাতুল’দা কে চলে যাবার জন্য বোঝাতে সক্ষম হলেন। এরপর রাতুল’দা ছলে গেলো। যাবার আগে কাকার সাথে তার ঠিক কি কি কথা হয়েছিলো তা আমাদের কাওকে কাকা কোনদিন বলেননি, আমরা জোর করলেও …………………।

 

[ঘটনার স্থান, কাল ও পাত্রর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে গোপনীয়তার প্রয়োজনে। এজন্য আমি দুঃখিত। কেউ যদি জানতে চান তাহলে কমেন্ট করুন।]

ভুতংগম (পর্ব ০২)

7

আজ ৬ মাস হয়েছে পত্রিকা অফিসে আর যাইনি । সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পিয়ন দরজার নীচ দিয়ে দুটি চিঠি দিয়ে গেছে । একটিতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” প্রাপকে আমার নাম, ঠিকানা, কিন্তু প্রেরকের কোনো ঠিকানা দেয়া নেই । খুবই অবাক ব্যাপার । অন্যটা এসেছে “সূর্যের দিন” পত্রিকা অফিস থেকে । জরুরী যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে । প্রেরক, সম্পাদক সাহেব, “সূর্যের দিন” পত্রিকা । চিঠি দুইটি টেবিলের উপর রেখে বাথরুমে ঢুকে গেলাম ফ্রেশ হয়ে সোজা নাস্তার টেবিলে, বাবা নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছেন তাই আর দেরী করলাম না । “তোমার পড়ালেখার কি খবর?” বাবা নাস্তা করতে করতে জিঞ্জেস করলেন । আমি উত্তর দিলাম “জ্বি ভালো, দুদিন ছুটি আছে তাই ভাবছি, নানুকে দেখে আসবো”, বাবা কোনো কথা বললেন না । শুধু আ্ওয়াজ করলেন “হুম” ।

নাস্তা সেরে ঠিক করলাম নানুকে দেখতে যাওয়ার আগে পত্রিকা অফিস হয়ে যাবো । সাথে কিছু টাকা, ব্যাগ, টর্চলাইট, সেভিং এর সরঞ্জাম, মোবাইল চার্জার, প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম । সেবার শ্যামপুরে যাওয়ার সময় অনেক কিছুই সাথে ছিল না । তাই এবার মনে করে প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম মগবাজার পত্রিকা অফিসের উদ্দেশ্যে । পত্রিকার সম্পাদক সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত আমার উপর, আমি দীর্ঘদিন কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখিনি । তবে আমার ফিচার শ্যামপুরের সেই ঘটনা নাকি ওনার কাছে খুব ভালো লেগেছে তাই তিনি আবার আমাকে ডেকেছেন । বিশেষত আমার বেতন খুব সামান্য তবে ফিচার জমা দেয়ার পর এককালীন বিশেষ একটা সম্মাননা ভাতা দেয়া হয় । আমার মনে হল আসলে আমার লেখা নয়, অদ্ভুদ ভুতুরে কোন সংবাদ সংগ্রহের জন্য উনি আমাকে ডেকেছেন । আমি জানি আমি ছাড়া আর কেউ এ ধরনের সংবাদ বা ফিচার সংগ্রহের জন্য রাজি হবে না । একবার ভাবলাম চাকুরীটা ছেড়ে দেই কিন্তু সম্পাদক সাহেব বিশেষত আমার উপর আশা করে আছেন তাই তাকে আর নিরাশ করলাম না । বললাম “নানুর বাসায় যাচ্ছি নরসিংদীতে, সেখানে কালীমন্দিরের কাছে শ্বশানঘাটে নাকি ভুতুরে সব ঘটনা ঘটে, যদি সময় পাই একবার যাব, অদ্ভুত ফিচারের জন্য”  শুনে সম্পাদক সাহেব খুব খুশি হলেন বিদায় জানিয়ে প্রথমে বাসে পরে ট্রেনে ঘোড়াশাল পৌঁছলাম । সেখান থেকে অটোরিক্সায় সোজা নানুর বাড়িতে । নানু অনেক খুশি হলেন, দুদিন থাকবো শুনে । বাজার করার মতো কেউ নেই, তাই পাশের বাড়ির এক আত্মীয় সম্পর্কে মামা হয়, তাকে নিয়ে বাজারে গেলাম । তার নাম মোবারক, বয়সে আমার সমান হবে । নানু কে না বলে আমি মোবারক মামাকে সাথে নিয়ে রিকসায় বাজারে চলে এলাম । যাবার সময় অনেক ব্যাপারে মোবারক মামার সাথে কথা হল । কালীমন্দির, শ্বশানঘাট ও বাশঁ ঝাড়ের নীচে কবরস্থান নিয়েও অনেক কথা হল । রীতিমত গাঁ শিউরে উঠে সে গল্প শুনে । কিন্তু আমি প্রমানে বিশ্বাসী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এগুলো মানুষের ভ্রান্ত ধারনা । গল্প করতে করতে আবার রিকসা নিয়ে বাজার করে নানুর বাড়িতে চলে এলাম । তখন সবেমাত্র দুপুর ১২টা বেঁজেছে । মোবারক মামাকে বললাম আমি এখানে কেনো এসেছি । শুনে উনি হাসলেন । বললেন অহেতুক ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কি ? বেড়াতে এসেছেন, কয়েকদিন আনন্দ করে যান ।

দুপুরে খাওয়ার সময় উনাকে আর খুঁজে পেলাম না । কিছুক্ষণ পর মোবারক মামা হাজির, আমি ওনাকে আমার চিঠিটা দেখালাম যেটাতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” সে চিঠিটা দেখে “থ” হয়ে গেল, এই লেখাটা তো মনে হয় কোথাও দেখেছি । ওনার ধারনা এ লেখাটা উনি কোনো একটা কবরের উপর ফলকে দেখেছেন, তবে কোন কবরে তা আর এখন মনে করতে পারছেন না । কিন্তু কবরস্থানের নামটা তার নাম মনে আছে । আমি কিছুটা ভয় পেলাম কারণ এ ধরনের চিঠি আমাকে কোন মৃত মানুষের কবর থেকে পাঠিয়েছে তা ভেবে । তবে তা সামলে নিয়ে মোবারক মামাকে বললাম “মামা যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কাল সকালে বা বিকেলে ওই কবরস্থানে একটু ঘুরে দেখতে চাই” , তিনি কিছুটা বিমর্ষভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনার কি মাথা খারাপ, ওখানে কেউ যায় নাকি? এখন তো মানুষ কবর দিতেও ওখানে যায় না, তবে যদি দিনের বেলাতে মানে সকালে যান তাহলে সাথে যেতে পারি” , আমি তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে পরের দিন সকালে যাব মনস্থির করলাম ।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম মোবারক মামার জন্য । নানুকে শুধু বললাম ঘুরতে যাচ্ছি, বিকেলেই চলে আসবো । নানু কিছু বললেন না, শুধু বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস্ । মোবারক অনেক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হল । বললাম এতক্ষণ দেরী হল কেন? ।, সে বলল, ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে তাই । নানুকে বিদায় জানানোর সময় মোবারককে বললাম ভিতরে যেতে, নানুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য । সে বলল “উনি মুরুব্বী মানুষ আমাকে নাও চিনতে পারেন, অনেকদিন দেখেন নাতো আর অহেতুক দেরী করে লাভ কি, আমাদের আগে আগে ফিরতে হবে” , আমি আগেও লক্ষ্য করেছি মোবারক মামা নানুর সামনে যেতে চান না । কেন চান না বুঝতে পারলাম অনেক পরে । যাই হোক ঘর থেকে বের হলাম, দুপুরে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার নিয়ে ব্যাগে রাখলাম, সাথে দুই লিটারের এক বোতল মিনারেল ওয়াটার । মোবারক মামাকে জিঞ্জেস করলাম রিকসা নিতে হবে কিনা ? মনে হল তিনি আমার কথায় বেশ মজা পেয়েছেন । তাই বঁত্রিশ দাঁত বের করে হাসছেন, বললেন “আপনার কি ধারনা পরিত্যক্ত একটা কবরস্থানে রিকসা বা গাড়ী যাওয়ার মনোরম রাস্তা থাকবে, হা…হা….হা..” , আমি কিছুটা বিব্রত হলাম, বললাম “ঠিক আছে চলেন যেভাবে যাওয়া যায়, যদি হেটে যেতে হয় তাহলে আমার কোন সমস্যা নেই” ।

আমরা হাটতে থাকলাম । আমার শরীর ক্লান্ত আর ঘামে ভিজে চুপসে গেছে সারা শরীর আর জামাকাপড়, তবুও হাটছি আর হাটছি । মোবারক এ গ্রামেরই ছেলে তাই হয়তো তার শরীর কোন ঘাম নেই । সে দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে পথ চিনিয়ে চিনিয়ে । প্রায় দু ঘন্টামত হাটার পর জন-মানবহীন নীর্জন এক জঙ্গলে এসে পৌঁছলাম । বড় বড় গাছ আর লতাগুল্ম দিয়ে ঘেরা । সূর্যের আলো এখানে ঝিমিয়ে পড়েছে কিন্তু বেলা বাঁজে ১টা মাত্র । দিক ঠিক করা যাচ্ছে না তবে মোবারক মামার মনে হচ্ছে দিক ঠিক করতে কোন সমস্যা হচ্ছে না । আমি কিছুটা সাহস পেলাম এই ভেবে যে আমি একা নই, মোবারক মামা সাথে আছেন । আরো প্রায় ১ ঘন্টা হাটার পর একটা বিশাল বাঁশঝাড়ের সামনে এসে পৌঁছলাম । আমি দেখলাম এটাকে আসলে আগে বাঁশবাগান বলা হলেও এখন তা বাঁশঝাড় বা বাঁশের জঙ্গলে পরিনত হয়েছে । যে কেউ এখানে একা থাকলে ভয়ে তার অঞ্জান হওয়ার মত অবস্থা হবে । চারদিক ঘন লতাগুল্ম আর বাঁশের ঝোপঝাড় ।

মোবারক মামা আমাকে বললেন “এটাই সেই কবরস্থান এখানে অনেকগুলো কবর আছে তবে কোথায় যে আপনার সেই কথাটা লেখা আছে তা আমি বলতে পারবো না, আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে”  আমি আশাহতের মত চারদিকে তাকালাম কারন এখানে কোন কবরই ভালোমত বোঝা যাচ্ছে না । ঝোপঝাড়ের কারনে সব ঢেকে গেছে । কিছুক্ষন পর মনে হল আমার পায়ের নীচে একটা কবর, আমি একটা কবরের উপর দাড়িয়ে আছি । ভয়ে আমার সারা শরীরে শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল । সরে গিয়ে পাশে দাড়ালাম । দুপুর প্রায় আড়াইটা বাজে, ক্ষিদে পেয়েছে তাই ব্যাগ খুলে খাবার বের করলাম মোবারক মামাকে বললাম “আগে খেয়ে নিই, পরে কাজে নামব” , মনে হল তিনি আমার কথায় গুরু্ত্ব দিচ্ছেন না । অন্য দিকে বিমর্ষভাবে তাকিয়ে আছেন । কিছুক্ষণ পর আবার আমি বললাম । মোবারক মামা এবার শুনতে পেলেন, উত্তর দিলেন “আমার ক্ষিদে নেই” , আপনি খেয়ে নিন আমি একটু আসছি, বলে তিনি ঝোপের ভিতর চলে গেলেন । আমি খাওয়া সেরে অনেক্ষণ তাকে খুঁজলাম । নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকলাম । ভাবলাম হয়ত সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে । চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, এখন প্রায় বেলা ৫টা বাঁজছে । সূর্য হেলে পড়াতে বাঁশঝাড়ের ভিতরে অন্ধকার নেমে এসেছে । আমি আমার টর্চলাইটটা বের করলাম ব্যাগ থেকে । অনেক খুঁজেও মোবারক মামাকে পেলাম না । তাই ঠিক করলাম বাড়ি ফিরে আসব, হাতে একটা মার্কার পেন আর একটা টর্চলাইট । মার্কার পেন দিয়ে বাশ কিংবা গাছে দাগ টেনে চিহ্ন দিচ্ছিলাম আর সামনে এগুচ্ছিলাম কিন্তু অন্ধকারে কিছুই ভালো দেখা যাচ্ছে না । চারদিক এখন ঘোর অন্ধকার তাই কিছুক্ষণ পরপর টর্চলাইট জ্বালাতে হচ্ছে । একটানা জ্বালালে ব্যাটারী শেষ হয়ে যেতে পারে । এভাবে এগুতে থাকলাম প্রায় আধঘন্টা । হঠাত পা ফসকে একটা গর্তে পড়ে গেলাম । চার দিক সমান ভাবে কাটা, চার দেয়ালে আমি আটকা পড়েছি, আমার আর বুঝতে বাকি রইল না আমি একটা কবরের ভিতরে আটকে গেছি …(চলমান..)
ভুতংগম-পর্ব-০২-বাকি-অংশ
ভূতংগম(পর্ব ১)

ব্যাখ্যার বাহিরে

1

আজ আমি আমার জীবনের ঘটে যাওয়া একটি চরমতম অস্বাভাবিক ঘটনা শেয়ার করবো।জানি,আপনাদের মধ্যে হয়তো কেউ ঘটনাটা বিস্বাস করবেন না,কিন্তু যারা আমার কাছের মানুষ,তারা মোটামুটি সবাই কাহিনিটা জানে।

২০০৮ সালের শেষ বা ২০০৯ সালের শুরুতে,একদিন বিকেল বেলা,মুখ চেনা একজন লোক কে দেখি,হালুয়াঘাট কামারপট্টীর সামনে দাড়ানো।মুখ চেনা কিন্তু কখনই কথা হয়না তাই কিছু বলিনি।এই দেখার কয়েকদিন পর তার সাথে আবার দেখা কৃষি ব্যাংক এর সামনে।এর পর প্রায় সপ্তাখানেক পর তার সাথে দেখা হালুয়াঘাট জিরো পয়েনট এ,রাম পুজন এর হোটেলের সামনে।আমি ঢুকবো,সে ঢোকার রাস্তায়।চোখে চোখ পরে যাওয়ায় সৌজন্যতা বশত তাকে জিজ্ঞাস করি,কেমন আছেন ?উনি উত্তর দেন,ভালই।আবার বলি,আপনাকে ইদানিং দেখি না,কই থাকেন ?উনি উত্তর দেন,আমি ত অনেক দূরে থাকি।সেদিন এতটুকুই আলাপ।
দিন পনের পর তার ছোট ভাই এর সাথে দেখা,তাকে কথা প্রসঙ্গে বললাম,আপনার বড় ভাই এর সাথে সেদিন দেখা হল।
সে বলল,কি বল আবল তাবল?আমার বর ভাই কে তুমি দেখবা কোথা থেকে,সে ত আড়াই বছর আগে মারা গেছে !
আমি বললাম,আমি শিওর, আমি আপনার বড় ভাইকেই দেখছি।
সে বল্ল,কি ভাবে সম্ভব?
আমি তাকে বললাম,চলেন আপনার বাসায়,আপনার ভাই এর ছবি দেখব।
তার সাথে তখন এ তার বাসায় যাই,গিয়ে তার ভাই এর ছবি দেখে আমার শিড়দাড় দিয়ে বিদ্দুত এর মত কিছু চমকে উঠে !
কারন,ছবির ব্যক্তি আমি যার সাথে কথা বলেছি,সেই !
এই ঘটনাটা আমার আশপাশের অনেকের সাথেই শেয়ার করেছি,কিন্তু কেউ এর গ্রহনযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারে নি,বেশিরভাগ লোক ই বিশ্বাস করেনি।
এর পর থেকে অবধি আমি মনে মনে সেই লোক টাকে খুজি।
আর একটা বিষয় হল,তার সাথে আমার ৩ বার ই প্রায় same যায়গায় দেখা হয়েছে।

ভৌতিক ঘুড়ি (সংগৃহীত)

3

মঙ্গলবার বড়দিন বলে আমি ঘুমাতে গেলাম দেরীতে, ‘বাটাভিয়া মেডিকেল জার্নাল’-এর জন্য একটি লেখা তৈরি করলাম দুপুর পর্যন্ত, তারপর গেলাম জাহাজঘাট। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার জন্য জাহাজের টিকেট কাটতে। সামারিন্ডায় কম দিন তো কাটালাম না। পুরো ছয় বছর। এখন এই জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছি চিরতরে। অবশ্য এজন্য আমি মনে মনে খুশি।কাজটাজ সেরে ফিরে এলাম বাড়িতে। বাঁধাছাঁদা শুরু করলাম। দুপুর দুটোর দিকে হঠাৎ কেন জানি একটা অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করল আমাকে। ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো বাজার শব্দ হলো, শব্দটা থেমে যেতেই ভয়ের শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে।

হঠাৎ এই ভয় এবং অস্থিরতার কোনও কারণ খুঁজে পেলাম না আমি। আধিভৌতিক কোনও ব্যাপারেও আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি অহেতুক আমার ভেতরে এ ধরনের কোনও অনুভূতি কাজ করছে না। মনে হলো খুব শিগ্গিরই ভয়ঙ্কর কোনও ঘটনার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি আমি।

ঘণ্টাখানেক পর কর্লিনের কাছ থেকে একটি অদ্ভুত চিঠি পেলাম আমি। চিঠিটি নিয়ে এল এক ক্যান্টোনিজ ছোকরা। চিঠিতে লেখা :

প্রিয় ডাক্তার ভ্যান রুলার,
আপনি এলিসকে শেষ বার যখন দেখে গেলেন, বললেন জ্বর হয়েছে। সেই জ্বর এখন আরও খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। সামারিন্ডা ছেড়ে যাওয়ার আগে অনুগ্রহ করে একটিবার যদি আমার বাড়িতে পদধূলি দেন, চিরকৃতজ্ঞ থাকব আমি।
আর একটি ব্যাপারে আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, আসার পথে জঙ্গলের ওপর যদি কোনও ঘুড়ি উড়তে দেখেন, মনের ভুলেও ওটাকে মাটিতে নামানোর চেষ্টা করবেন না।
আপনার বিশ্বস্ত
এডওয়ার্ড কর্লিন।

বার দুই চিঠিটি পড়লাম আমি। কর্লিনের সঙ্গে আমার পরিচয় বেশি দিনের নয়। বছরখানেক আগে সে ব্রিটিশ নর্থ বোর্নিও থেকে এখানে আসে। ওখানে সে জঙ্গল রক্ষক হিসেবে কাজ করত। তার আসার কয়েকদিন পর অন্য আরেকটি স্টীমারে আসে তার স্ত্রী এলিস এবং কন্যা ফে।

কর্লিন সম্পর্কে লোকে নানা কথা বলে। গুজব আছে, জঙ্গলরক্ষকের চাকরি করার সময় ডায়াক আদিবাসীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সে তাদের সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। তার এই নিষ্ঠুরতার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করে।

সামারিন্ডায় আসার কিছুদিনের মধ্যে কর্লিন মাহাকাস নদী থেকে কিছু দূরে, একটি পুরনো রেস্ট হাউসে আস্তানা গাড়ে। পরে ওটাকেই সে নিজের বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। তার স্ত্রী এবং কন্যা তখন থেকে বাধ্য হয় জঙ্গলের ওই অনাত্মীয় পরিবেশে প্রায় একঘরে অবস্থায় জীবনাযাপনে।

ক্যান্টোনিজ ছেলেটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে সামনে। আমার ইচ্ছে করল সরাসরি বলি যে যাব না। সত্যি বলতে কি কর্লিনকে আমি খুব একটা পছন্দ করি না। কিন্তু চিঠিতে ঘুড়ির ব্যাপারটা আমাকে আগ্রহী করে তুলল। তাই ছোকরাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাংচো, তোদের গ্রামের ডায়াকরা কি ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব শুরু করেছে?’
মাথা নাড়ল সে।
‘তাহলে কি মালয়রা ওড়াচ্ছে?’
‘ওখানে কোনও মালয় নেই। মাত্র একটি ডায়াক গ্রাম আছে। আপনি যাবেন?’
আমি একটু ইতস্তত করলাম। তারপর বললাম, ‘হ্যাঁ, যাব। তোর মাঝিমাল্লাকে সাম্পান নিয়ে রেডি থাকতে বল। আমি আধঘণ্টার মধ্যে জেটিতে আসছি।’

আমি এমনিতে সাম্পানে চড়ে কোথাও গেলে খড়ে ছাওয়া কেবিনের ছায়ায় বসে পাইপ খেতে খেতে যাই। কিন্তু আজ টেনশনের জন্যই বোধহয় সূর্যের প্রখর তাপ অগ্রাহ্য করে গলুইতে বসে তীরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম।

ঘণ্টা দুই কেটে গেল কোনও ঘটনা ছাড়াই। তারপর, কর্লিনের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেছি, নদীর শেষ মোড় ঘোরার সময় কাংচো আঙুল তুলে আকাশ দেখাল। উত্তেজিত গলায় বলল, ‘দেখেছেন? ঘুড়ি, বড় ঘুড়ি।’

নদীর বুকে বসে স্পষ্ট দেখতে পেলাম ঘুড়িটিকে। তবে অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না। ঘুড়িটি বেশ বড়, দু’টুকরো বাঁশ আর লাল রাইস পেপার দিয়ে সুন্দর করে ওটাকে তৈরি করা হয়েছে, লেজটা লম্বা, রূপকথার ড্রাগনের কথা মনে করিয়ে দিল।

হঠাৎই জিনিসটা চোখে ধরা পড়ল আমার। যে সুতোতে বেঁধে ঘুড়িটি উড়ছে, ওটা গ্রামবাসীদের তৈরি পাটের দড়ি কিংবা সুতো নয়, তার। তামার তার! সূর্যের আলোতে সোনার মত ঝকমক করে উঠল তারটি। ক্রমশ নিচু হতে হতে একসময় জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

‘তীরে, কাংচো,’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, ‘জলদি তীরে ভেড়াও সাম্পান।’

কয়েক মিনিট পর ঘন জঙ্গল আর পোকামাকড় অগ্রাহ্য করে ছুটতে শুরু করলাম আমি সামনের দিকে। একটি বড় পালাপাক গাছের মাথায় আটকে আছে তারটি।

কাছে পিঠে কোনও মানুষজন চোখে পড়ল না আমার। অবাক হলাম ভেবে তাহলে ঘুড়িটি কে ওড়াচ্ছিল? ঘুড়িটি কোনও আদিবাসীর তৈরি, কিন্তু ওই তামার তারের সঙ্গে কোনও শ্বেতাঙ্গের সম্পর্ক আছে, ধারণা করলাম আমি।

চিন্তান্বিত মুখে ফিরে চললাম আবার সাম্পানে। মিনিট দশেক পরে কর্লিনের জেটিতে মাঝিরা সাম্পান বাঁধল। কাংচো আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল কর্লিনের বাড়িতে।

কর্লিন দরজায় দাঁড়িয়েছিল। আমার সাথে হাত মিলিয়ে ঢুকল ভেতর ঘরে।
‘আপনি এসেছেন বলে খুব খুশি হয়েছি, ডাক্তার,’ বলল সে। ‘আপনার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চিন্তায় মরে যাচ্ছিলাম আসবেন কি আসবেন না ভেবে। এলিস পেছনের ঘরে আছে। আমার মেয়ে ফে তার সেবা করছে।’
‘রোগীর অবস্থা এখন কেমন?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘ভাল না,’ বলল কর্লিন। ‘কুইনাইন খাওয়াচ্ছি ওকে যেভাবে আপনি বলেছেন। কিন্তু জ্বরের জন্য সে এত অসুস্থ হয়ে পড়েনি। আচ্ছা ডাক্তার, আসার সময় কোনও ঘুড়ি চোখে পড়েছে আপনার?’

আমি লোকটার দিকে কড়া চোখে তাকালাম। কর্লিনের মুখটা বাজপাখির মত, চোখদুটো শুয়োরের চোখের মত কুঁতকুঁতে। ওর মুখে, হাতে পোকামাকড়ের অসংখ্য কামড়ের দাগ। এসব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। ওর চেহারায় প্রচণ্ড অস্থির একটা ভাব। আমার কঠিন দৃষ্টি দেখে সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তারচে’ আপনি বরং আমার স্ত্রীকে একবার দেখুন।’ পেছনের একটি ঘরে নিয়ে গেল সে আমাকে।

ঘরটি ছোট। একটি মাত্র বিছানা ঘরে। জানালার শাটার অর্ধেক নামানো। অসুস্থ মানুষের গায়ের গন্ধ প্রকটভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরটিতে। কর্লিনের স্ত্রী মরার মত পড়ে আছে বিছানায়। তার পাশের চেয়ারে বসে আছে তার মেয়ে, ফে।

আমি মহিলার হাতের নাড়ি পরীক্ষা করতে লাগলাম, তাপমাত্রা দেখলাম। হৃৎস্পন্দন দ্রুত। কিন্তু থার্মোমিটারে দেখলাম স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে।

কর্লিন হঠাৎ এসে ঢুকল ভেতরে, আমাকে টেনে নিয়ে গেল জানালার কাছে। আঙুল তুলল আকাশের দিকে। ‘দেখুন!’ ভাঙা গলায় বলল সে। ‘দেখতে পাচ্ছেন?’

দেখলাম। সেই ঘুড়িটি। আগের মত উঁচুতে আকাশে উড়ছে, কিন্তু বাতাস কাছিয়ে আনছে ওটাকে দ্রুত। লাল রাইস পেপার নীল আকাশের বুকে ক্ষতচিহ্নের মত দগদগে হয়ে ফুটে আছে।
‘দেখলাম,’ বললাম আমি। ‘একটা ঘুড়ি। কিন্তু তাতে কী…?’
কর্লিন দ্রুত বাধা দিল, ‘ঘুড়িটা দেখতে থাকুন ভ্যান রুলার। কথা বলবেন না, প্লীজ।’
আমি আবার আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইলাম। এবার বুকে হাতুড়ির বাড়ি পড়তে শুরু করল।
‘ঘুড়িটা দেখতে দেখতে ওর নাড়ি পরীক্ষা করে দেখুন,’ কর্কশ গলায় বলল কর্লিন। কাঁপা হাতে একটি সিগারেট ধরাল সে, হেলান দিয়ে দাঁড়াল দেয়ালের গায়ে।

আমি অনেকক্ষণ ধরে এলিসের নাড়ি পরীক্ষা করলাম, ঘুড়িটির দিকে চোখ রেখে। ড্রাগনের মত লেজ বাতাসে উড়ছে পতপত করে, নামতে নামতে ঘুড়িটি মাটি থেকে পঞ্চাশ ফুট উচ্চতায় এসে দাঁড়াল।

এলিসের ভয়ানক শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। হাঁপানি রোগীর মত শ্বাস টানতে শুরু করল সে। নাড়ির গতি ভয়ানক ক্ষীণ হয়ে এল।

আমি তাড়াতাড়ি একটি ক্যাপসুল খাইয়ে দিলাম এলিসকে। ধীরে ধীরে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এল। বাইরে চেয়ে দেখি ঘুড়িটি ওপরে উঠতে শুরু করেছে, তাড়া খাওয়া পাখির মত ওটা দিক বদলে চলে গেল।

সেন্ট্রাল রুমে এসে ঢুকলাম আমি। এক গ্লাস হুইস্কি ঢেলে কর্লিনের মুখোমুখি বসলাম।

‘কর্লিন,’ কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে করতে বললাম, ‘বোর্নিওতে আমি ছয় বছর ধরে আছি। অনেক অদ্ভুত এবং কঠিন রোগের চিকিৎসা করেছি। কিন্তু এমন ঘটনা আমার জীবনে এই প্রথম। এটা-এটা-গুড লর্ড, এ অসম্ভব!’
‘তাহলে আমি মিথ্যে বলিনি, বলেন?’ বলল কর্লিন। ‘আপনি দেখেছেন?’
‘আমি দেখেছি,’ বললাম আমি। ‘আর ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। আপনার স্ত্রীর শারীরিক সুস্থতা কোনও অদ্ভুত এবং অশুভভাবে ওই ঘুড়ির ওড়াউড়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ঘুড়িটি যখন ওপরে উঠতে থাকে, তখন তার নাড়ির গতিও থাকে স্বাভাবিক। কিন্তু যেই মুহূর্তে জিনিসটা মাটির দিকে নেমে আসতে শুরু করে, তার হৃৎস্পন্দন ধীর হয়ে আসে, মৃত্যু চলে আসে নিকটে। এই ব্যাপারটার শুরু কবে থেকে?’
‘গতকাল দুপুর থেকে,’ বলল কর্লিন। ‘এলিস এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে বিছানায় শুয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। প্রথমেই আমার মনে আসে ওই শয়তান ঘুড়িটাকে টেনে নামানোর, আমি কাজটা করতে গিয়েছিলাম। সেই সঙ্গে প্রায় মেরে ফেলার জোগাড় করেছিলাম ওকে। ওই গাছে উঠে ওটাকে আস্তে আস্তে টেনে নামাতে শুরু করেছি, এই সময় ফে রিভলভারে গুলি ছুঁড়ে জানাল ওর মায়ের অবস্থা খুবই খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। গাছ থেকে নেমে পড়ি আমি তৎক্ষণাৎ।
কর্লিন আমার দিকে ঝুঁকল। ‘খোদার কসম, ডাক্তার! এ কিসের বিরুদ্ধে লড়াই করছি আমরা?’
আমি জবাব না দিয়ে পাশের আরেকটি কামরার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতরে দেখলাম অনেকগুলো শেলফ, দেয়ালে থরে থরে সাজানো অদ্ভুত কিছু জিনিস।
‘আপনার কালেকশন আমাকে দেখতে দিন,’ বললাম, ‘হয়তো এ থেকে কোনও ক্লু খুঁজে পাবো।’
কর্লিন তার কালেকশনের জন্য এই এলাকায় বেশ পরিচিত। বহু বছর ধরে সে এই কালেকশনের পেছনে লেগে আছে। সে মাথা ঘুরিয়ে ডাকল, ‘কাংচো, এদিকে আয় শিগ্গির।’
ক্যান্টোনিজ ছেলেটি দৌড়ে এল কর্লিনের গলা শুনে, দ্রুত দরজা খুলল।
‘কয়েকদিন আগে এক চোর ঢুকেছিল আমার ঘরে,’ বলল কর্লিন। ‘আমার জিনিসপত্র চুরি করতে চেয়েছিল হারামজাদা। আমি গুলিও করেছিলাম ব্যাটাকে লক্ষ করে। কিন্তু মিস হয়েছে গুলি।’

কর্লিনের সংগ্রহের বেশিরভাগ জিনিস বোর্নিও থেকে সংগ্রহ করা। বেশকিছু জিনিস যেমন জাগ, সিলেবস। এসব চীন থেকে আনা। আমার চোখে পড়ল পরাং ব্লো-পাইপ এবং কিছু মৃন্ময়পাত্র। তবে চোখ আটকে গেল কোনার দিকে একটি শেলফের ওপর। টকটকে লাল রঙের বিশাল একখণ্ড সিল্কের কাপড় রাখা ওখানে।

‘সিল্কের এই কাপড় খণ্ড খাঁটি তিব্বতী কাজ,’ আমার আগ্রহ লক্ষ করে বলল কর্লিন। ‘এনেছি উত্তর ভারতের নিষিদ্ধ মন্দির পো উয়ান কোয়ান থেকে। যখন জিনিসটা আমার চোখে পড়ে তখন ওটা দিয়ে অগ্নিদেবতার পূজা করা হচ্ছিল।’
‘আ-সত্যি বলতে কি, আমি লোভ সামলাতে পারিনি। বাইরের দেয়াল বেয়ে, খোলা এক জানালা দিয়ে ঢুকে কাপড়টা নিয়ে আসি আমি। মন্দিরের পুরোহিতরা তখন সবাই ঘুমাচ্ছিল।’
‘আপনি ওটা চুরি করেছেন?’ চিৎকার করে উঠলাম আমি। মাথা ঝাঁকাল কর্লিন। ‘যারা এসব দু®প্রাপ্য জিনিস সংগ্রহ করে তাদের প্রয়োজন পড়লে এরকম এক আধটু শঠতার আশ্রয় নিতেই হয়। এতে অন্যায়ের কিছু নেই। তিব্বতীদের কাছে এই কাপড়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সন্ন্যাসীরা এটাকে অগ্নি দেবতার বস্তু বলে উল্লেখ করছিল। তাদের বিশ্বাস যারা এই বস্ত্রের অবমাননা করবে তাদের ওপর সপ্ত নরক ভেঙে পড়বে।’

বস্ত্রখণ্ডটির সকল সৌন্দর্য নিহিত এর মাঝখানে, ড্রাগনের ছবি আঁকা ডিজাইনটির মধ্যে। আমি ঠিক নিশ্চিত নই, তবে জানি সকল পৈশাচিক পূজা অর্চনা এই ড্রাগনের নামেই করা হয়। এশিয়ার সবচে অজ্ঞাত ধর্মগুলোর মধ্যে এটিও একটি। ধর্মটি প্রেতপূজার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং…

আমি কাছে এসে কাপড়টি পরীক্ষা করে দেখলাম। ডানদিকের নিচের অংশটি ছেঁড়া লক্ষ করলাম।

‘যে চোরটা ওটা হাতাবার চেষ্টা করেছিল সে এই কাজ করেছে,’ ঘোঁতঘোঁত করে উঠল কর্লিন। ‘তবে কাপড়টা নিয়ে যাওয়ার আগেই আমি এসে উপস্থিত হই। সে ওইটুকু ছিঁড়ে অন্ধকারে পালিয়ে যায়- কি হয়েছে, ফে?’
কর্লিনের মেয়ে এসে ঢুকেছে ঘরে। তার মুখ কাগজের মত সাদা।
‘তাড়াতাড়ি, ডাক্তার,’ কেঁদে উঠল সে, ‘আমার মা…’

বিদ্যুৎবেগে আমি এলিসের ঘরে ঢুকলাম। তার পাশে বসেই বুঝতে পারলাম সমস্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে সে। মারা গেছে এলিস কর্নিল।

স্পন্দনহীন কব্জিটি হাতে ধরে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আতঙ্কিত হয়ে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে। ঘুড়িটি ধীরে ধীরে নেমে আসছে নিচে। গাছের মাথায় আছড়ে পড়ল ওটা, পরক্ষণে অদৃশ্য হয়ে গেল ঘন জঙ্গলে।

সামারিন্ডা ত্যাগ করার জন্য যেভাবে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, এলিস কর্লিনের অস্বাভাবিক মৃত্যু আমার সেই ব্যস্ততার আগুনে জল ঢেলে দিল। ডেথ সার্টিফিকেট যদিও লিখলাম অতিরিক্ত ম্যালেরিয়া জ্বর এলিসের মৃত্যুর কারণ, কিন্তু আমি জানি কারণটা আরও রহস্যময়, আরও গভীরে প্রোথিত।
ঘুড়িটিকে সংগ্রহ করেছি আমি। কর্লিনের বাড়ির কাছে ডায়াক অধিবাসীরা তামাকের বদলে ওটাকে দিয়ে গেছে আমায়। জিনিসটা বাঁশ আর রাইস পেপার দিয়ে তৈরি, যেমন ধারণা করেছিলাম আমি। কিন্তু ওপরের অবশিষ্টাংশে ছোট এক টুকরো লাল সিল্ক কাপড় সিরিশ দিয়ে জোড়া লাগানো।

গন্ধ শুঁকলাম। কর্লিনের সেই অগ্নি দেবতার পূজার বেদির কাপড়ের গন্ধ!

হপ্তাখানেক পর কর্লিন এল আমার বাড়িতে। বারান্দায় মুখোমুখি বসলাম দু’জনে। কর্লিনকে ভয়ানক উদ্ভ্রান্ত লাগছে।
‘ভ্যান রুলার,’ বলল সে। ‘আবার আরেকটা ঘুড়ি।’
‘কী?’ চিৎকার করে উঠলাম।
মাথা ঝাঁকাল কর্লিন। ‘অবিকল আগেরটার মত। একই সাইজ, একই রঙ, একই রকমের তার, দিন দুই ধরে দেখতে পাচ্ছি ওটাকে। তবে মনে হয় রাতের বেলা ওটা অদৃশ্য হয়ে যায়। আমার মেয়ে ফে…’
‘ওকেও ধরেছে?’ ভয়ে কেঁপে উঠলাম আমি।
কর্লিন হাত মুঠি করল। ‘এলিস যেভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সেভাবে নয়। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ফে। কোনও দুষ্ট আত্মা ওকে ক্রমশ গ্রাস করে চলেছে।’
এবার নিজে থেকেই বললাম, ‘ফে-কে দেখতে যাব আমি।’ কর্লিনকে অপছন্দ করলেও ঘটনাটা আমাকে যেন সম্মোহিত করে তুলছিল। কর্লিনকে জানালাম ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমি সাম্পানে চড়তে যাচ্ছি।

রাতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ার কারণে আকাশের মুখ কালো। কাংচোকে নিয়ে সাম্পানে চড়ে বসলাম আমি। ও সাম্পানের পেছনে বসে ডায়াক মাঝিদের নির্দেশ দিতে লাগল।
গতবারের ঘুড়িটি যে জায়গায় দেখেছিলাম ঠিক একই স্থানে এই ঘুড়িটিকেও দেখলাম। নদীঘাটে সাম্পান ভেড়ার আগ পর্যন্ত এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলাম ঘুড়িটির দিকে। কিন্তু কোনও মন্তব্য করলাম না।

কিছুক্ষণ পর ফে কর্লিনের সঙ্গে দেখা করলাম আমি। ঘরের মাঝখানে একটি চেয়ারে পাথরের মূর্তি হয়ে বসে আছে মেয়েটি। চোখ দুটো সামনের দিকে স্থির। একটি মুখোশ যেন পরে আছে সে, ঠোঁট দুটো রক্তশূন্য।

মিনিট পাঁচেক ওর সঙ্গে আস্তে আস্তে কথা বলার চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু ফে কোনও কথা বলল না। হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে পড়ল, গলা চিরে বেরিয়ে এল সুতীব্র আর্তনাদ। পরমুহূর্তে মরা মানুষের মত ধপাস করে পড়ে গেল মেঝের ওপর। আমি ওকে পরীক্ষা করার জন্য এগিয়ে গেলাম বটে, কিন্তু ভয়ে আমার বুক ইতোমধ্যে ধড়ফড় শুরু করে দিয়েছে।ঘুড়িটি আবার তার কাজ শুরু করে দিয়েছে!
কিন্তু এবার আর ব্যাপারটাকে সহজে ছেড়ে দেব না প্রতিজ্ঞা করলাম। মেয়েটির শারীরিক সামর্থ্য ওই ঘুড়ির ওঠা-নামার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। অবিশ্বাস্য হলেও ব্যাপারটা সত্য। ঘুড়িটিকে টেনে নামানো যাবে না, তাহলে মেয়েটি মারা যাবে, ওকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করতে হবে।

ওষুধের বাক্সটা নিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরুলাম আমি। জঙ্গলের মধ্যে থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এলাম নদীর ঘাটে। চড়ে বসলাম সাম্পানে। তীর লক্ষ করে বৈঠা বাইতে শুরু করলাম সর্বশক্তি দিয়ে।

আকাশে ঝড়ো মেঘ জমেছে, ঝড়ের পূর্বাভাস। তামার তারটিকে অনুসরণ করে আমি তীরে চলে এলাম, ঢুকলাম জঙ্গলে।

তারটি এখনও সেই পালাপাক গাছের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমি ওষুধের বাক্স খুলে কাজে লেগে গেলাম।
প্রথমেই বের করলাম পাইরোক্সিলিন, প্রে করে দিলাম সামনে। ইথার এবং অ্যালকোহলের সঙ্গে চল্লিশ গ্রাম পাইরোক্সিলিন মেশালে তৈরি হয় কলোডিয়ন, ছোটখাট ক্ষত সারাবার মহৌষধ। আসলে পাইরোক্সিলিন গানকটন ছাড়া অন্য কিছু নয়।

বাক্স থেকে একটি ব্রাশ টিউবও বের করলাম। ওটার দুটো মুখেই বারুদের ক্যাপ পরানো। ক্যাপ দুটো খুলে ওগুলোর মধ্যে গানকটন ঢোকালাম। পকেট থেকে একটা বড় কাগজের টুকরো বের করলাম, তারপর ঘড়ির চেইনটি খুললাম।

বাচ্চাদের ঘুড়ির লেজেতে বেঁধে খবর পাঠাতে দেখেছেন? আমিও তাই করতে যাচ্ছি। তবে পার্থক্য হলো আমার ‘খবর’ হচ্ছে বিস্ফোরক গানকটন।
আকাশে বিদ্যুৎ জ্বলে উঠলেই হলো, সামান্য ছোঁয়াও যদি এই পাইরোক্সিলিনে লাগে, সঙ্গে সঙ্গে মাঝ আকাশে ধ্বংস হয়ে যাবে ওই ঘুড়ি। আমি তামার তারটিকে গাছের সঙ্গে ভাল করে বাঁধলাম, তারপর মালমশলা জড়ানো কাগজটিকে ওটার সঙ্গে বেঁধে দিলাম।

কাজ করতে করতে কাছিয়ে এল ঝড়। ঘুড়িটি জঙ্গলের ঢেউ খেলানো গাছগুলোর ওপর উড়তে শুরু করল।
আমি তারটিকে খুলে দিলাম। তারের সঙ্গে বাঁধা কাগজের টুকরোটি এক মুহূর্তের জন্য নট নড়ন চড়ন হয়ে থাকল, তারপর মৃদু গুঞ্জন তুলে তারের সঙ্গে ওটা উঠতে লাগল ওপরের দিকে। আমি আর দেরী করলাম না। ফিরে চললাম সাম্পানের উদ্দেশে। বাইতে শুরু করলাম বৈঠা।বাড়ি ফিরে দেখি ফে কর্লিনের কালেকশন রুমের কটে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ঘরের শেষ মাথার জানালার কাছে উঁকি মেরে দাঁড়িয়ে আছে ক্যান্টোনিজ ছোকরা কাংচো।
আমি ফে-র কব্জি চেপে ধরে বসে থাকলাম। কর্লিন ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করল। কাংচোকে দেখেও না দেখার ভান করল।
ঘরের কোণে, কাঠের বাক্সে রাখা তিব্বতী সেই সিল্ক কাপড় খণ্ডকে দেখলাম অনেকখানি বেরিয়ে আছে বাইরে। লাল রঙটাকে আরও উজ্জ্বল এবং তীব্র লাগছে।
ঝড় বোধহয় এসেই গেল। পুবাকাশ থেকে ছুটে এল বিশাল এক টুকরো কালো মেঘ, ধেয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। পরক্ষণে সাপের জিভের মত ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ ঠিক ঘুড়িটির কাছে। প্রচণ্ড বজ্রপাতের শব্দে গোটা বাড়ি কেঁপে উঠল থরথর করে।

পাঁচ সেকেন্ড পর আকাশে জ্বলে উঠল আগুনের বিশাল এক চাবুক, খোলা জানালার ওপরে। চাবুকটা আঘাত হানল ড্রাগন লেজটাকে, তামার তারটি সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল দাউদাউ করে, সাপের মত পাক খেতে লাগল। পরমুহূর্তে ঘুড়িটি অদৃশ্য হয়ে গেল চোখের সামনে থেকে।
খাটে শুয়ে থাকা মেয়েটির সারা শরীর নাড়া খেল প্রবলবেগে। মুখ দিয়ে গোঙানি বেরিয়ে এল। নাড়ি কাঁপতে লাগল থরথর করে। তারপর ধীরে ধীরে বিট স্বাভাবিক হয়ে এল, আমি স্বস্তিসূচক চিৎকার দিলাম।

সাফল্যের উল্লাসের স্বাদ অনুভব করার আগেই কাংচো-র গগনভেদী চিৎকারে আঁতকে উঠলাম আমি। ছেলেটা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে রক্তলাল সিল্কের কাপড়ের টুকরোটির দিকে।
স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম কাপড়টি থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে, পরক্ষণে দপ করে আগুন জ্বলে উঠল ওটাতে।
গুঙিয়ে উঠল কর্লিন। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, যেন নড়তে ভুলে গেছে। কাঠের বাক্সটির মুখ খুলে গেল কারও অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে, সাপের মত জটা মেরে এঁকেবেঁকে বেরুতে শুরু করল জ্বলন্ত সিল্কের টুকরো। তারপর বাতাসে যেন পাখা মেলল ওটা, ভাসতে থাকল ঘরের মধ্যে।

কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে জ্বলন্ত এবং জ্যান্ত কাপড়ের টুকরোটি ছুটে গেল কর্লিনের দিকে। পালাতে চেষ্টা করল কর্লিন, কিন্তু ওর পা যেন গেঁথে থাকল মেঝের সঙ্গে, ভীত এবং হতভম্ব হয়ে সম্মোহিতের মত চেয়ে রইল সে ছুটে আসা মৃত্যুদূতের দিকে। আতঙ্কিত আমি দেখলাম জ্বলন্ত সিল্ক টুকরো সাপের মত পেঁচিয়ে ধরল কর্লিনকে। ওকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে যেতে চাইলাম সামনে। কিন্তু অদৃশ্য কোনও শক্তি এক পা-ও এগুতে দিল না আমাকে নিজের জায়গা থেকে।

ভয়ঙ্কর চিৎকার করে মেঝেতে ছিটকে পড়ল কর্লিন। ধোঁয়ার বিশাল এক পর্দা ঘিরে ফেলল ওকে। মাংস পোড়ার তীব্র গন্ধ ভেসে এল নাকে।
এই সময় আমি নড়ে উঠলাম, দৌড় দিলাম সামনের দিকে। দুই হাত দিয়ে কাপড়ের টুকরোটিকে ছুটিয়ে আনতে চাইলাম কর্লিনের শরীর থেকে। কিন্তু ওটা যেন জোঁকের মত সেঁটে থাকল তার শিকারের গায়ে। একটা কম্বল চোখে পড়ল আমার অদূরে, ওটা দিয়ে আগুন নেভানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু লাভ হলো না কোনও, বরং শিখা আরও লকলক করে উঠল।

শেষ মরণ চিৎকারটা দিয়ে স্থির হয়ে গেল কর্লিন। উপুড় হয়ে পড়ে থাকল।

জানুয়ারির ২৯ তারিখ সামারিন্ডা ত্যাগ করল ফে। আমি এক হপ্তা পর যাত্রা শুরু করলাম সিঙ্গাপুর অভিমুখে। কিন্তু কাংচো-র টিকিটির দেখাও পেলাম না কোথাও।
এডওয়ার্ড কর্লিনের মৃত্যুর জন্য ক্যান্টোনিজ এই ছোকরা যে দায়ী তা আমি ডাচ কর্তৃপক্ষকে বলতে পারতাম। অথবা এই ঘটনার ওপর একটি তদন্ত করার দাবিও জানাতে পারতাম। কিন্তু এগুলো করে ‘কলোনিয়াল কোর্ট অভ ল’ যে কথা জানতে পারত তা তাদের কাছে অবিশ্বাস্য এবং অসম্ভব বলেই মনে হত।

পুরো ব্যাপারটাকে আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। যেমন, আমি কর্লিনের বাড়িতে গ্যাসোলিনের একটি ক্যান আবিষ্কার করেছিলাম। তাছাড়াও ওই বাড়িতে আমি খুঁজে পেয়েছি একগোছা তার, তার গোছা কালেকশন রুমে ছিল। সম্ভবত বাঁশের কার্টেনের সাপোর্টিং লাইন হিসেবে ওগুলোর ব্যবহার করা হত। এবং এই তার থেকে সৃষ্ট আগুন ওই সিল্কের কাপড়ে আগুন লাগার কারণ হিসেবে বলা যায়। আর কাংচো-র ব্যাপারে যে কথাটি আমি জেনেছি তা হচ্ছে সে আদৌ ক্যান্টোনিজ নয়, সে আসলে সেই নিষিদ্ধ মন্দির পো ইয়ান কুয়ান, যেখান থেকে কর্লিন অগ্নি দেবতার বস্ত্র চুরি করেছিল, সেখানকার এক প্রাক্তন সন্ন্যাসী, একজন তিব্বতী।

কিন্তু তারপরও সেই ভৌতিক ঘুড়ি, কর্লিনের স্ত্রীর মৃত্যু এবং তার কন্যার জীবনে সেটার অদ্ভুত প্রভাব, এসব প্রশ্নের জবাব আমি খুঁজে পাইনি। শুধু জ্বরের কারণে এলিস মারা গেছে কিংবা ফে অসুস্থ হয়েছে, এই কথা আমি বিশ্বাস করি না।

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব ১৫

3

চট্রগ্রামের ফয়েজ লেক দিনের বেলা আনন্দ আর উৎসবের এলাকা হলেও রাতের বেলা ১টি ভৌতিক জায়গাতে পরিণত হয়।। লেকের ১টা সাইড আছে যেখানে বোট নিয়ে যাওয়া নিষেধ। সেখানে ১টা ওয়ার্নিং বোর্ডও লাগানো আছে।। শোনা যায় যে, ঐ সাইডটাতে একটা পাথরের দ্বীপ আছে এবং একবার কেউ ওইপাশে চলে গেলে সে আর সহজে পথ খুঁজে পায় না।। অনেকেই দূর থেকে ঐ দ্বীপটাতে একটা মেয়েকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। বিভিন্ন জনের বর্ণনা থেকে জানা যায়,মেয়েটা একটা সাদা জামা পড়ে থাকে, তার চুল ছাড়া থাকে, এবং লক্ষ্য করলে বুঝা যায় কোনও কারণে তার মন বিষণ্ণ।। এ ছাড়াও ফয়েজ লেকের ভেতর কিছু বড় বড় মূর্তি আছে যে গুলোর মাথায় মাগরিবের আজানের সময় কালো চাদরে জড়ানো এক বৃদ্ধ মহিলাকে বসে থাকতে দেখা যায়।। ফয়েজ লেকের পানিতে ডুবে বছরে প্রায় ৪-৫ জন মানুষ মারা যায়।। এছাড়াও ঐ জায়গার স্থানীয় অনেকেই গভীর রাতে লেক সংলগ্ন এলাকার আসে পাশে জান্তব চিৎকার শুনতে পায় এবং অদ্ভুত
সাদা আলো দেখে।

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব ১৪

0

মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় পুখুরিয়া এলাকায় একবার অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই লাশটির কোনও নাম পরিচয় পাওয়া না যাওয়ায় তকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরদিন সকালে স্থানীয় কয়েকজন কবরটির উপরের মাটি সরে থাকতে দেখে এলাকার পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে তাদের লোক নিয়ে কবর খুঁড়ে দেখে কবরটি ফাঁকা, এবং সেখানে শুধু কাফনের কাপড় পড়ে আছে।

এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় মানুষের অনেক গরু ছাগল খুব দ্রুত কোনও কারণ ছাড়াই মারা যেতে লাগলো। এমন অদ্ভুত রোগ কেউ কখনো দেখে নি। তাদের গরু বা ছাগলগুলো খোওয়ারে মরে থাকতো এবং গাঁয়ে কোনও রক্ত থাকতো না।

কেউ যেনও রক্ত চুষে নিয়েছে সেগুলোর গা থেকে। ভয়ে অনেক গৃহস্থ সেই এলাকায় গরু ছাগলগুলো বিক্রি করে দেয়। এলাকার স্থানীয় কৃষক, বাচ্চু মিয়াঁ একবার নিজের খোওয়াড়ে অদ্ভুত শব্দ পেয়ে উঁকি দেন। তখন সন্ধ্যা মাত্র হয়েছে। তাই ফাঁকফোকর দিয়ে খোওয়াড়ে আলো পড়ছে খানিকটা। সেই আলোতে তিনি দেখলেন তার একটা গরু মরে পড়ে আছে এবং তার উপর এক অদ্ভুত মানুষসদৃশ প্রাণী চেপে বসে আছে।

সেই প্রাণীটি ঐ গরুর গলায় কামড় দিয়ে ধরে যেনও রক্ত খাচ্ছে। ভয়ে বাচ্চু মিয়াঁর গলা দিয়ে আঁতকে উঠার শব্দ বের হয়। সাথে সাথে ঐ বস্তুটি বাচ্চু মিয়াঁর দিকে চোখ তুলে তাকায়। খানিকটা অন্ধকারেও সেই বস্তুর চোখ থেকে নীল আলোর মতো বের হচ্ছিল। এরপর তা খুব দ্রুত খোওয়াড়ের পাশে জানালা দিয়ে বের হয়ে পাশের ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বাচ্চু মিয়াঁর ভাষ্যমতে, ঐ বস্তু মানুষের মতই দৌড়চ্ছিল। তবে খুব দ্রুত। প্রায় চোখের পলকে হারিয়ে যায় বস্তুটি। ঐদিনের পর থেকে ঐ গ্রামে আর কোনও গৃহপালিত পশু মরার কথা শোনা যায় নি।

মমি নিয়ে একটি পোস্ট।। বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করা আপনার উপর।।

0

অবিশ্বাস্য বা কাকতালীয় মনে হলেও পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। তেমনই বেশ কিছু ঘটনা আছে সমাধি সৌধ মমিকে কেন্দ্র করে। মিসরীয় রাজা-রানীরা বিশ্বাস করত মৃত্যুর পর আত্মা পুনর্জীবিত হয়ে পুনরায় দেহে ফিরে আসে। তাই তাদের মৃত্যুর পর মৃতদেহ মমি করে কফিনে রেখে দেওয়া হতো। এই বিশ্বাসের কারণেই মিশরে গড়ে উঠেছিল আশ্চর্যজনক সব পিরামিড। মমি আজো মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর বিষয়। মমি-কে নিয়ে আজো মানুষের মনে রয়েছে হাজারো বিস্ময়। এ মমিকে নিয়ে বেশ কিছু অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনাও রয়েছে। আসুন তার মধ্য থেকে কয়েকটা ঘটনা আমরা জানি।

এক সময় মিশরে দুর্দান্ত প্রতাপশালী ফারাওদের বসবাস ছিল। যাদের আমরা বলি ফেরাউন জাতি। ফারাওদের মধ্যে তুতেম খামেনের নাম খুবই উল্লেখযোগ্য। তিনি খুব অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ যথারীতি একটি সোনার কফিনে মুড়ে বহু মূল্যবান ধনরত্নসহ মমি করে রেখে দেওয়া হয়। ১৯২২ সালের ২৬ নভেম্বর, প্রত্মতত্ত্ববীদ মি. হাওয়ার্ড, তার পার্টনার ও অর্থ জোগানদার কর্নারভান আবিষ্কার করেন ধনরত্ন, মণিমুক্তা খচিত ফারাও তুতেনের কফিন। সেটা ছিল পৃথিবী কাঁপানো এক ঘটনা। কিন্তু আসল ঘটনার উদ্ভব ঘটে এরপর থেকে। তুতেন খামেনের গুপ্তধন আবিষ্কারের ৫ মাসের মাথায় অর্থ জোগানদার কর্নারভানের মৃত্যু হয়। কিভাবে বা কেন কর্নারভানের মৃত্যু হয় তা সম্পূর্ণ অজানা। সে কি কারণে মারা যায় ডাক্তাররাও তা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন। তার মৃত্যু আরেক বিস্ময়কর ঘটনার সৃষ্টি করে। যে মুহূর্তে তিনি মারা যান তখন মিশরের রাজধানী কায়রোর সবগুলো বাতি হঠাৎ নিভে যায়। শুধু তাই নয়, লন্ডনে তার পোষা কুকুরটিও একই সময় ছটফট করতে করতে মারা যায়। এরপর বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, মমিটির গায়ে যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র ছিল, কর্নারভানের শরীরও ঠিক সে রকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র হয়ে গিয়ে ছিল। কিন্তু এর প্রধান আবিষ্কারক মি. হাওয়ার্ড ৭০ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন।

মমি নিয়ে আরেকটি পোস্ট।।

0

এখানে জানা যাবে মমি কিভাবে করা হতো, কত সময় লাগতো, কতোগুলো মমি পাওয়া গিয়েছে বিশ্ব জুড়ে, মমি কেনো করা হতো, ইত্যাদি!!

মমির নাম শুনলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কফিনের ভেতর ব্যান্ডেজে মোড়া কোনো মানুষের মৃতদেহ। মিসরীয় মমিগুলোই সবচেয়ে বিখ্যাত, তবে পৃথিবীর আরো অনেক জায়গায়ই মমির খোঁজ পাওয়া গেছে।

যে মমি নিয়ে দুনিয়াজোড়া এত মাতামাতি, সেই মমি আসলে বানানো হয় কিভাবে, তা নিয়েও কৌতূহল অনেক। প্রথমে মৃতদেহকে রাসায়নিক দ্রব্যে ডুবিয়ে কিংবা অত্যধিক ঠাণ্ডা বা গরম এবং কম আর্দ্রতাপূর্ণ বা বায়ুহীন কোনো জায়গায় রেখে দেওয়া হতো। মৃতের শরীর থেকে আর্দ্রতা সরানোর জন্য ব্যবহার করা হতো লবণজাতীয় পদার্থ। এমনই একটি পদার্থ হলো ন্যাট্রন, যা মমি করার ক্ষেত্রে বিপুলভাবে ব্যবহৃত হতো। ন্যাট্রনের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মরুর গরম বালুর চেয়ে দ্রুত শরীরকে শুকিয়ে ফেলত। মৃতদেহটি শুকানোর পর বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি অনুসারে তেল আর সুগন্ধি দেওয়া হতো। এরপর মৃতদেহটি সাদা লিনেন কাপড়ে এবং তারপর ক্যানভাসের টুকরায় ভালো করে মোড়োনো হতো। সেই সঙ্গে খারাপ কোনো শক্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এসব কাপড় আর মমির গায়ে লেখা হতো জাদুমন্ত্র। ধারণা করা হতো, এসব মন্ত্র মৃতের পরবর্তী জীবনে বয়ে আনবে সৌভাগ্যের বার্তা। মমি করার প্রক্রিয়াটি যদি ঠিকমতো করা সম্ভব হয়, তাহলে মৃতদেহটি জীবদ্দশায় কেমন ছিল দেখতে, সেটিও বলে দেওয়া সম্ভব। শেষে এটি রাখা হতো পাথরের তৈরি শবাধারে।

প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত, মৃত্যুর পরের জীবনে নিরাপদে প্রবেশ করার একটি মাধ্যম হলো ঠিকভাবে মমি করা। সে সময় মমি করার প্রক্রিয়াটি ছিল অনেক দীর্ঘ আর ব্যয়বহুল। আর তাই যাঁরা উচ্চপদের নাগরিক, যাজক কিংবা ফারাও আর তাঁর রানির আশীর্বাদপুষ্ট, তাঁরাই কেবল মৃত্যুর পর মমি হওয়ার সুযোগ পেত। মমি তৈরির প্রক্রিয়াটি শেষ হতে লেগে যেত প্রায় ৭০ দিন। এভাবে তিন হাজার বছর ধরে বানানো হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি মমি। বেশির ভাগ মমি ঠিকমতো সংরক্ষণের অভাব আর কবরচোরের কবলে পড়ে হারিয়ে যায়। কেবল ফারাও আর তাঁদের স্বজনদের মমিগুলো টিকে আছে। শুধু মানুষের মমিই নয়, ১০ লাখের বেশি পশুর মমিও পাওয়া গেছে মিসরে, যার বেশির ভাগই ছিল বিড়াল। চীনে পাওয়া গেছে হাজারের বেশি মমি।
প্রাচীন মিসরের বিখ্যাত মমিগুলোর মধ্যে তুতেনখামেন আর রেমেসিস দ্বিতীয়র মমি উল্লেখযোগ্য। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাচীন মিসরীয় মমিটি সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। এর ডাকনাম জিনজার, যেটি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। এটি মরুভূমির তপ্ত বালুর নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পর্ব ১৩

1

ঢাকার গুলশান ২ এলাকায় একটা এপার্টমেন্ট ছিল।। কোনও ফ্যামিলিই ঐ এপার্টমেন্টে বেশি দিন থাকতে পারতো না।। তারা নানা ধরনের প্রবলেম ফেস করতো।। সবই আধিভৌতিক।। যেমন, রুমের দেয়াল থেকে রক্ত পড়তে দেখা, ঘুমানোর সময় রুমের ভেতর বাচ্চা কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া ইত্যাদি।। এছাড়াও প্রতি রুমের মধ্যে ভ্যাপসা একটা ভাব লক্ষ্য করা যেতো।। এপার্টমেন্টটিতে কেউ থাকতে পারে না দেখে ডেভেলপাররা ঐ এপার্টমেন্টটি ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।। এপার্টমেন্ট ভাঙার সময় শ্রমিকরা স্টোর রুমে একটি সিল করা কফিন খুঁজে পায়।। কফিনের ভেতরটি মাটি দিয়ে ভরা ছিল।। মাটি সরানোর পর একটি ৬-৭ বছরের বাচ্চার ডেড বডি পাওয়া যায়।। বাচ্চাটার লাশ এতই জীবন্ত ছিল যে দেখে মনে হচ্ছিল বাচ্চাটাকে মাত্রই কফিনে রাখা হয়েছে।। এছাড়া কফিনটির ভেতর একটি কাগজ ছিল, যেখানে পবিত্র কুরআন শরীফের কিছু আয়াত উল্টা করে লেখা ছিল।। ধারণা করা হয়, লাশটাকে শয়তানের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হয়েছিলো।। গুলশান ২ এর মতো জায়গাতেও এই ধরনের ঘটনা আসলেই অনাকাঙ্ক্ষিত।। তবে, জানা যায়, যেইসব ঘরে শয়তানের পূজা করা হয়, সেখানে কেই শান্তিতে বাস করতে পারে না।।

নিশুত রাতের অতিথি (সংগৃহীত)

2

আলতাখালি গ্রামের একমাত্র হাইস্কুলের একমাত্র অঙ্কের শিক্ষক জোনাব আলী। স্কুলের একমাত্র আবাসিক শিক্ষকও তিনি। বয়স চল্লিশোর্ধ হয়ে গেলেও এখনো বিয়ে করেননি। স্কুলের পাশেই ছোট্ট টিনের চালাঘরে তার একাকি বসবাস। জোনাব আলী যুক্তিবোধ সম্পন্ন মানুষ। ভূত প্রেত জাতিয় অতিপ্রাকৃত বিষয়ে তার কোনরূপ বিশ্বাস নেই। তাই স্কুলের এই বিশাল নির্জনতায় রাত-বিরেতে একা থাকতে তার মোটেও সমস্যা হয় না।

এক সন্ধ্যায় তিনি হারিকেনের টিমটিমে আলোয় বিছানায় শুয়ে শুয়ে কী একটা উপন্যাস পড়ছিলেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন উঁ উঁ উঁ উঁ…… আওয়াজ করে দূরে কোথায় কেউ যেন কাঁদছে। জোনাব আলী জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। কৃষ্ণপক্ষের আঁধার তখন ভালোই ঘনিয়েছে। মনে হচ্ছে জানালায় কেউ ঘনকালো পর্দা ঝুলিয়ে দিয়েছে। তিনি বই পড়ায় মন দিতে যাবেন এমন সময় আবার সেই কান্না – উঁ উঁ উঁ উঁ…….. !

জোনাব আলী উঠে বসলেন। এমন দুঃখের কান্না এই রাতে এখানে কে কাঁদতে এলো? হারিকেনটা হাতে নিয়ে বাইরের দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। দাওয়ার সামনে থেকেই স্কুলের মাঠ শুরু হয়েছে। মাঠ পেড়িয়ে ওপাশে স্কুলের দোতলা বিল্ডিং। হারিকেনটা উঁচু করে দেখার চেষ্টা করলেন কাউকে দেখা যায় কিনা। কিন্তু না ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকারে কিছু দেখার জো নেই।

আলোটা উঁচু করে ধরেই তিনি দাওয়া থেকে মাঠে নামলেন। কোন দিক থেকে কান্নার আওয়াজটা এসেছে ঠিক ঠাহর করতে পারছেন না। এমন সময় আবার সেই কান্নার আওয়াজ – উঁ উঁ ঊঁ ঊঁ…… তিনি বুঝতে পারলেন আওয়াজটা আসছে স্কুল বিল্ডিং-এর ওদিক থেকে। ধীর পায়ে তিনি সেদিকে হাটা শুরু করলেন। রাত নেমেছে একটু আগে। অথচ মনে হচ্ছে কত না জানি গভীর রাত। চারিদিকে থম ধরা এক নিস্তব্ধতা। তার মাঝেই কোথায় এক রাতের পাখি ডেকে উঠলো – কুপ! কুপ! কুপ! কুপ! …..

বিল্ডিং-এর কাছে এসে এদিক ওদিক আলো বাড়িয়ে দেখলেন তিনি। কেউ নেই কিছু নেই এখানে। তখন আবার সেই কান্না শোনা গেল – উঁ উঁ ঊঁ ঊঁ…… এবার জোনাব আলী বুঝলেন কান্নাটা আসছে স্কুলের পেছন থেকে। ওখানে ছোট খাটো একটা দীঘি আছে। দীঘির চার পাশটা জুড়ে নানা গাছ-গাছালির ভীড়ে ছোটখাটো একটা জঙ্গল তৈরি হয়েছে।

বিল্ডিং পাশ কাটিয়ে তিনি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবার আলো উঁচু করতেই তিনি দীঘির পাড়ে এক আবছায়া মুর্তি দেখতে পেলেন। আরেকটু এগিয়ে যেতেই ছায়ামুর্তি স্পষ্ট হলো। দীঘির দিকে মুখ করে এক নারী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা শাড়ি। মাথায় ঘোমটা টানা। মেয়েটির বয়স যে খুব বেশি না তা পেছন থেকে দেখেও বোঝা যায়। আলোর আভাস পেয়ে মেয়েটি তার ঘোমটা আরো লম্বা করে টেনে দিলো। তার মুখ থেকে তখনো ফোঁপানোর আওয়াজ আসছে।

জোনাব আলী জিজ্ঞেস করলেন – কে তুমি ? এতো রাতে এখানে কী করছো? মেয়েটি কোনো জবাব দিল না। কেবল কান্নার দমক একটু বাড়লো তার। জোনাব আলী আবারো একই কথা জিজ্ঞেস করলেন। এবার মেয়েটি জবাব দিলো – আমার নাম বিন্দু।

– এতো রাতে এখানে কী করছো ?
– আমার স্বামী মারা গেছে কয় দিন আগে। তাই শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমারে বাইর কইরা দিছে ঘর থিকা। (মেয়েটি আবার উঁ উঁ করে কেঁদে ওঠে)

শুনে জোনাব আলী খুব দুঃখ পান। বলেন – তা তোমার বাবার বাড়ি কই? সেখানে যাও নাই কেন ? মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতেই বলে – বাপের বাড়ি অন্য গ্রামে অনেক দূরে। এত রাইতে যাওয়া যাবে না।

জোনাব একটু ভাবেন, তারপর বলেন – তা হলে কী আর করা, আজ রাতে আমার বাড়িতেই থাকো। যদিও আমি একা থাকি তারপরও তোমার ভয়ের কোনো কারণ নেই। নিজেকে আমি সৎ-চরিত্রবান বলেই জানি। আগামি কাল ভোরে তোমাকে তোমার বাবার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবো না হয়।

**********************************************************************

পনের বছর পরের কথা – জোনাব আলীর বয়স এখন ষাট। রিটায়ারমেন্টের পর আজ তার বিদায় সংবর্ধণা হয়েছে স্কুলে। ছাত্র শিক্ষক মিলে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছে। মঞ্চে উঠে তাঁর সহকর্মীরা বক্তৃতা দিতে গিয়ে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরাও
চোখের পানি ফেলেছে। তাদের এতো প্রিয় অঙ্কের শিক্ষক আজ বিদায় নিচ্ছেন।

এখন সন্ধ্যা ঘানিয়েছে। তিনি স্কুলের পাশে তাঁর ঘরে বসে নানা কথা চিন্তা করছেন। জীবনটা তো একা একাই পার করে দিলেন। আগামিকাল এই স্কুল, এই ঘর ছেড়ে তাঁর নিজের গ্রামে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে বলতে গেলে নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে। এই বুড়ো বয়সে তা কি তিনি পারবেন? নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে। কত যে স্মৃতি তাঁর এই স্কুলকে ঘিরে!

হঠাৎ দরজার কড়া নড়ে উঠলো। কেউ এসে দাঁড়িয়েছে বাইরে ঘরের দাওয়ায়। জানালা দিয়ে তিনি বাইরে তাকালেন। আজো কৃষ্ণ পক্ষের রাত। জানালার বাইরে নিকশ কালো আঁধার। তিনি দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন – কে? বাইরে থেকে পুরুষ কন্ঠের জবাব এলো – স্যার, আমাকে আপনি চিনবেন না। তবে আপনার সাথে খুব জরুরী কিছু কথা ছিল। একটু যদি দরজাটা খোলেন!

জোনাব আলী দরজা খুলে হারিকেনের আলোয় এক অপরিচিত মুখ দেখলেন। ভদ্রলোক কালো স্যুট পড়ে আছেন। মুখে মৃদু হাসি। তিনি তাঁকে ভেতরে আসতে বললেন। ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকেই টেবিলের পাশে রাখা একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। জোনাব আলী বসলেন তার পাশের চেয়ারে। হাসি মুখে বললেন – আপনি কে চিনতে পারিনি। দয়াকরে যদি আপনার পরিচয় বলতেন! তাঁর মনে মৃদু সন্দেহ হচ্ছে এ নিশ্চই তাঁর কোনো প্রাক্তন ছাত্র।

কিন্তু ভদ্রলোক তাঁকে হতাশ করে বললেন – স্যার আমি আপনার পরিচিত কেউ নই। বলতে পারেন আমি একজন শখের গোয়েন্দা। আপনি আগামি কাল এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবেন। তার আগে ভাবলাম আপনার সাথে কিছু কথাবার্তা বলি। জোনাব আলীর ভ্রু কুঁচকে গেল, বললেন – আপনার সাথে আমার কী কথা থাকতে পারে?

ভদ্রলোক হাসলেন – স্যার আমার আসলে কিছু প্রশ্ন ছিল। আপনার কি মনে পড়ে অনেক বছর আগে এক রাতে আপনার এই ঘরে একটা মেয়ে আশ্রয় নিয়েছিল? জোনাব আলী চমকে উঠলেন। তিনি কোনো কথা বললেন না। তবে তাঁর চোখের দৃষ্টি তিক্ষ্ণ হলো। লোকটি আবারো প্রশ্ন করলো – মনে পড়ে স্যার? মেয়েটির নাম ছিল বিন্দু। শাদা শাড়ি পরে ছিল। স্বামী মরার পর তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। আপনি তাকে দয়া করে আশ্রয় দিয়েছিলেন এক রাতের জন্য, মনে পড়ে?

জোনাব আলী অস্বস্তি ঢাকতে চশমা খুলে পাঞ্জাবির খুঁটে কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে বললেন – এতো দিন পরে আমাকে এ প্রশ্ন করছেন কেনো? লোকটি হাসি মুখে বলল – কারণ স্যার সেই রাতের পর থেকে মেয়েটির আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। আপনি কি বলবেন তার কী হয়েছিল? জোনাব আলী আবারো চমকে উঠলেন ভীষণ। তাঁর হাত থেকে চশমাটা মাটিতে পড়ে গেল এবং চশমা তুলতে গিয়ে তিনি জমে গেলেন। একটা তিব্র ভয়ের স্রোত তার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে গেল। লোকটি কথা বলছে আর পা নাচাচ্ছে এক নাগাড়ে। সেই পায়ের দিকেই তিনি তাকিয়ে আছেন। হারিকেনের আবছা আলোয় তিনি দেখতে পাচ্ছেন স্যুট পড়া
থাকলেও লোকটির পায়ে কোনো জুতো নেই এবং সেই পা উল্টো দিকে ঘোরানো। যেন কেউ মুচড়ে পা দুটোকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

জোনাব আলী ভয়কে কিছুটা জয় করে উঠে বসলেন। তিনি চোখে ভুল দেখছেন বলে নিজেকে প্রাবোধ দিলেন। কিন্তু তারপর যে ঘটনা ঘটলো তার জন্য তিনি মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। হঠাৎ লোকটি হেলমেট খোলার মতো করে নিজের মাথাটা আলতো টানে খুলে নিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিল। যেন এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যপার। মাথাহীন শরীরটা টেবিলে হাতের আঙুল দিয়ে বাজানা বাজালো। মাথাটার মুখে হাসি ঝুলে আছে তখনো। হাসি মুখে টেবিল থেকেই সে বলল – স্যার কিছু মনে করবেন না। আমার মাথার ওজনটা একটু বেশি তাই মাঝে মাঝে খুলে রাখতে হয়।

জোনাব আলী ভয়ে পুরোপুরি জমে গেছেন। মুখ থেকে কোনো কথা বেরুলো না। এটা তিনি কী দেখছেন? ভূত-প্রেতে তাঁর মোটেই বিশ্বাস নেই। কিন্তু চোখের সামনে যা ঘটছে তা তিনি অস্বিকার করেন কী করে? ধরহীন মুন্ড আবার কথা বলল – স্যার এখনো কি মনে পড়ে নাই। ভালো করে ভেবে দেখুন। মেয়েটিকে আপনি ঘরে নিয়ে আসলেন। অল্প বয়সী মেয়ে। সে আপনার রান্নার তোরজোর দেখে নিজেই এগিয়ে এলো। আপনাকে বসে থাকতে বলে নিজে রান্না ঘরে গেল রান্না করতে। আপনি অন্ধকারে বসে জানালা দিয়ে তাকে দেখছিলেন। মেয়েটি তরকারি কাটছিল। তার ঘোমটা তখান খশে পড়েছে। হারিকেনের আর জ্বলন্ত চুলোর আলোয় আপনি দেখলেন এক অপূর্ব সুন্দর মুখ। মনে পড়ে স্যার?

জোনাব আলী জবাব দেবেন কী, তিনি তখন কেমন একটা ঘোরের ভেতর চলে গেছেন। মুন্ডু বলে চলল – মেয়েটির আঁচল খশে পড়েছিল ঝুঁকে তরকারি কাটতে গিয়ে। আপনি তখন মেয়েটির দিক থেকে কিছুতেই দৃষ্টি সরাতে পারছিলেন না। আপনি মেয়েটির পায়রার মতো বুকের গড়ন দেখলেন। তার মোমের মতো ত্বকে আলোর ঝিলিক দেখলেন।

মনে পড়েছে স্যার ? আপনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ধীর পায়ে দুয়ার ডিঙিয়ে মেয়েটির হাত ধরেছিলেন শক্ত করে। দুর্বল মেয়েটি বাধা দিতে চেয়েও পারেনি। আপনার দীর্ঘ দিনের ক্ষুধার্থ দেহে তখন পৌরুষের বান ডেকেছে। আপনি মেয়েটিকে ঘরে এনে স্রেফ ঝড় বইয়ে দিলেন। আপনার যুক্তি, ভয়, দ্বিধা, দ্বন্দ, ন্যায়, নীতি সব উবে গেল। আপনি মেয়েটিকে বলাৎকার করলেন।

আশ্চর্য স্যার এত বড় ঘটনার কিছুই কি আপনার মনে পড়ছে না? যখন আপনার হুঁশ হলো তখন মেয়েটি নগ্ন, বিছানায় কোঁকাচ্ছে যন্ত্রনায়। আপনি তখনো তার উপর উপবিষ্ট। আপনার মনে হলো এই ঘটনা জানাজানি হলে গ্রামে ছিছিক্কার পড়ে যাবে। আপনার আদর্শ শিক্ষক জীবনের ইতি ঘটবে। পুলিশি ঝামেলা হবে। এসব ঝামেলা এড়াতে আপনি তাই খুব ঠান্ডা মাথায় তবে দ্রুত ভেবে চিন্তে একটি কাজ করলেন। মেয়েটির মুখে বালিশ চেপে ধরলেন।

স্যার কিছু কি মনে পড়েছে? আপনি স্কুলের মাঠে গিয়ে ইট সংগ্রহ করে আনলেন। মৃত মেয়েটিকে বস্তায় ভরলেন। ইটগুলোকে একট ব্যাগে ভরলেন। তারপর সব নিয়ে দীঘির পাড়ে গেলেন। সেই রাতের নির্জনতায় আপনি মেয়েটিকে দীঘির তলায় আশ্রয় দিলেন। কেউ আর তাকে খুঁজে পেলো না। অবশ্য কেউ খুঁজলোও না। শ্বশুর বাড়ির লোকজন তো তাড়িয়ে দিয়েই খালাশ। বাপের বাড়ির লোকজন মেয়েটির নিরুদ্দেশের খবর শুনে ভেবেছে আপদ গেছে।

মুন্ডুটি একটু চুপ করে তবে তার হাসি তখনো ঝুলে আছে ঠোঁটে। ধরটি তখনো আঙুল দিয়ে টেবিলে বাজনা বাজাচ্ছে – ঠক্ ঠকা ঠক্ ঠক্ । মুন্ডু আবার কথা বলে – কী হলো স্যার ? এখনো আপনার মনে পড়েনি? জোনাব আলীর তখন উত্তর দেবার জো ছিলনা। তিনি ঘোর লাগা পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছেন। তার মুখ থেকে লালা ঝরা শুরু হয়েছে। দৃষ্টি ঝাপসা। কানে কেমন শো শো আওয়াজ। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন ঘরের দরজা আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। অন্ধকারেও সেখানে একটি উজ্জ্বল শাদা হাতের উপস্থিতি দেখলেন তিনি। একটা সপ্ সপ্ আওয়াজ হলো। ভেজা পায়ে কেউ যেন হাটছে এবং একটু পরেই মেয়েটি ঘরে ঢুকলো। এ সেই বিন্দু। পুরো শরীর থেকে পানি ঝরছে। শাদা শাড়ির ভেজা আঁচল মাটিতে লুটাচ্ছে। তার পুরো শরীর জুড়ে আলোর দ্যুতি। তার দেহের ভাঁজ আরো মোহনীয় হয়েছে যেন। কামাতুর দৃষ্টি নিয়ে সে জোনাব আলীর দিকে এগিয়ে এলো ধীর পায়ে। রিনরিনে গলায় বলল – সার আপনে কেমন আছেন সার? আপনের বিরহে আমি দেওয়ানা হইছি সার!

কাছে এসে জোনাব আলীর একটা হাত ধরে সে তার নরম বুকে ঠেকালো – সার আপনেরে ছাড়া আমার চলবে না সার! আপনে আমার লগে চলেন। আপনেরে লইয়া সুখে ঘর করমু ! আপনেরে অনেক সুখ দিমু! খল খল করে হেসে ওঠে সে। জোনাব আলীর মুখ থেকে একটা ঘর ঘর আওয়াজ বের হয়। তারপর সে লুটিয়ে পড়ে ঘরের মেঝেতে।

পরের দিন ভোরে স্কুলের লোকজন জোনাব আলীকে বিদায় দিতে এসে দেখে তিনি ঘরের মেঝেতে মরে পড়ে আছেন। সবাই খুব আফসোস করে – আহা লোকটা খুব ভালো ছিল ! কেবল একটা জিনিসই কেউ ভেবে পায় না, ঘরের মাটির মেঝেটা এমন ভিজে আছে কেন?