কবরের আযাব সম্পর্কে একটি ভয়ানক ঘটনা!!!! {সংগৃহীত}

1

বিশ্ব যুদ্ধের সময় পরাশক্তিধরদের হিন্দুস্থানে আক্রমন করার সময় ইংরেজ বাহিনীকে সিঙ্গাপুর ও বার্মায় অস্ত্র রাখতে হয়ছিল। অস্ত্র রাখার সময় ইংরেজ জেনারেল সৈন্যদেরকে অনুমতি দিল, যে সৈন্য পলায়ন করে প্রান বাঁচাতে পারবে সে যেন তার প্রান বাঁচায়। সৈন্যদের এক মেজর তোফায়েল তার এক সাথী মেজর নেহাল সিং এর সাথে পালিয়ে গেল।

মেজর তোফায়েল বর্ণনা করেন: আমরা উভয়ে অন্ধকার রাতে ঘোড়ায় চড়ে বের হলাম এবং বার্মার রণাঙ্গন ধরে ঘোড়া হাঁকালাম। বার্মার ঘন জন-মানব হীন অন্ধকার ভয়ানক জঙ্গল বিশিষ্ট এলাকা, যা অতিক্রম করা অত্যন্ত দূরহ কাজ ছিল। যাই হোক আমরা অনুমানের ভিত্তিতে হিন্দুস্থানের জেলা আসাম মূখি হলাম। যেখানে জাপানীদের আক্রমন থাকা সত্বেও ইংরেজদের প্রাধান্য বিস্তার করছিল। পরামর্শের ভিত্তিতে রাস্তা অতিক্রম করতে থাকলাম। এর মধ্যে কত রাত অতিক্রম হয়েছে তার কোন হিসাব আমাদের কাছে ছিল না। পানাহার সামগ্রী শেষ হয়ে আসছিল। জঙ্গল ও নদ-নদীর উপর দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। কোন কোন সময় ভয়ঙ্কর সাপ-বিচ্ছুর মুখো মুখিও হতে হয়েছে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পথ চলেছি। একদিন সামনে এক খালী জায়গায় একটি কবরস্থান চোখে পরল।

সেখানে প্রায় ২৫-৩০টি কবর হবে । এক কবরে মৃতের প্রায় অর্ধেক দেহ পঁচা গলা অবস্থায় কবরের বাইরে পরেছিল। লাশের উপর ছোট একটি বিচ্ছু বারবার দংশন করছিল। আর লাশ খুব ভয়ঙ্করভাবে চিল্লাছিল। কোন জীবিত মানুষকে যেমন কোন বিচ্ছু দংশন করলে তার বিষাক্ততার ফলে সে কাঁদত তা এমন মনে হচ্ছিল। যা জীবিত অন্যান্য মানুষকে ও প্রাণীকে বেঁহুশ করে দিতে যথেষ্ট ছিল। সত্যিই এ এক ভয়ানক দৃশ্য ছিল। মেজর নেহাল সিং আমার বাধা সত্বেও বিচ্ছুটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল, এতে একটি অগ্নিশিখা বিচ্ছুরিত হল বটে কিন্তু বিচ্ছুর কিছু হয় নাই। নেহাল সিং আবারো গুলি করার প্রস্তুতি নিল, আমি তাকে কঠোর ভাবে বাধা দিলাম এবং তার পথে তাকে চলতে বললাম, কিন্তু সে আমার কথায় কর্ণপাত না করে কবর স্থানের এক মৃতকে বাঁচাতে গিয়ে বিচ্ছুকে আবার গুলি করল। আবারো একটি অগ্নিশিখা বিচ্ছুরিত হল বটে কিন্তু বিচ্ছুর কিছুই হলোনা। বরং বিচ্ছুটি তখন লাশকে ছেড়ে আমাদের দিকে ছুটে আসতে লাগল। আমি তখন নিহাল সিংকে বললাম: “বিচ্ছু ও লাশ ছেড়ে এখান থেকে ভাগ, বিচ্ছু্ আমাদের দিকে এগিয়ে আসা আশংকা মুক্ত নয়”। আমরা ঘোড়া চালাতে শুরু করলাম, কিছুদূর যাওয়ার পর পিছনে তাকিয়ে দেখি, বিচ্ছুটি পিছনে পিছনে খুব দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। আমরা ঘোড়াকে আরো দ্রুত চালাতে শুরু করলাম। কয়েক মাইল চলার পর এক নদী সামনে পরল, যা খুবই গভীর মনে হচ্ছিল। একটু থেমে চিন্তা করতে লাগলাম, নদীতে ঘোড়া নিক্ষেপ করব না নদীর তীর ধরে চলে কোন রাস্তা খোঁজব। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তের পূর্বে ঐ বিচ্ছুটি আমাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। আমরা লক্ষ্য করলাম যে আমরা সশস্ত্র হওয়া সত্বেও এ বিচ্ছুটি আমাদেরকে আতংকিত করে তুলেছিল। এমনকি আমাদের ঘোড়াও লাফাচ্ছিল যেন সেও ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত। বিচ্ছু নিহাল সিং এর দিকে এগোচ্ছিল। নিহাল সিং ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘোড়া নিয়ে নদীতে ঝাপিয়ে পড়ল। আর তার পিছে পিছে বিচ্ছুও নদীতে ঝাপিয়ে পরল। আল্লাহ জানেন বিচ্ছু ঘোড়ার শরীরের কোন অংশে কেটেছিল যার ফলে সেটিও এ অস্বাভাবিক আঘাতের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। ঘোড়াটি কাঁপতে শুরু করল। নেহাল সিং ভয়ানক ভাবে চিৎকার করে আমাকে বলতে লাগল: “তোফায়েল আমি ডুবে যাচ্ছি, জ্বলে যাচ্ছি, আমাকে বিচ্ছু থেকে বাঁচাও”। আমিও তখন ঘোড়া নিয়ে

ঝাপিয়ে পড়লাম এবং বাম হাত তার দিকে বাড়ালাম। সে তখন আমাকে খুব শক্ত করে ধরে নিল। আমার মনে হচ্ছিল এটা নদীর স্বভাবিক পানি নয়, বরং কোন বিষাক্ত পানি, যা শুধু আমার হাত নয় সমস্ত শরীরই জালিয়ে দিবে। আমি তখন আমার অস্ত্র বের করে আমার বাম হাত কেটে ফেলে নিজেকে রক্ষা করে দ্রুত নদীর তীর ধরে চলতে শুরু করলাম। মেজর নেহাল সিং আমাকে চিৎকার করে ডাকতে থাকল আর পানিতে ডুবতে লাগল। নদীর বড় বড় ঢেউ তাকে গ্রাস করতে লাগল। এ হল আল্লাহর শাস্তি…. বিচ্ছু নিজের কাজ করে চলে যাচ্ছিল, আমার সামনে আসে নাই। আল্লাহর সৈন্যদের মধ্যে সে একাই এক গায়েবী সৈন্যের মত। সে আমার কোন ক্ষতি করে নাই যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই চলে গেল।

অনভি-প্রেত!!!!

3

রাস্তায় শুনশান নিরবতা। তখন ১২টা কি সাড়ে বারটা। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। প্রাইভেট টিউটর একটু আগেই আমাকে পড়িয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন। স্যার যাওয়ার পর দরজাটা বন্ধ করে আমি জানালা দিয়ে একা রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। রাস্তায় একটা মাত্র লাইট।

আমি যে বরাবর তাকিয়ে ছিলাম সেই রাস্তায় দুই তিনটা বাসা পরই আর একটি বাসা ছিলো । বাসাটির সামনের অংশটা ছিলো কিছুটা খালি যায়গা যেই জায়গায় দু-একটি খুব ছোটো আকারের নারকেল গাছ ছিলো। কি মনে করে আমি সেই নারিকেল গাছের দিকে চেয়ে রইলাম। দেখতে দেখতে হঠাৎ আমি চমকে উঠলাম। দেখতে পেলাম সাদা কাপড় মোড়ানো একটি মহিলা যার আকৃতি সাধারন মানুষের চেয়ে অনেক বড়। তার দেহের অর্ধেকটুকু দেখা যাচ্ছে । আর দেহের বাকি অংশটা মনে হচ্ছে হয়তো মাটির নিচে হবে। আর কিছু বুঝার চেষ্টা করার আগেই আমি ভয়ে দৌড়ে ভেতরের ঘরে মা’র কাছে চলে গেলাম। মা আমার মুখে স্পষ্ট ভয়ের চিহ্ন দেখে কারণ জিজ্ঞাস করলেন। আমি তাকে সব খুলে বললাম। মা কথাটা বাবাকে জানানোর পর বাবা আমার ভয় কাটানোর জন্য তৎক্ষনাৎ টর্চ হাতে ঐ জায়গায় নিয়ে গেলেন। তখন ওখানে আর  কিছু দেখা গেলনা।তবুও বুঝতেই পারেন। ভয় কি আর অত সহজে কাটে? জিনিসটা বার বার আমার মনে ভাসতে লাগলো। দু-তিন দিন যাবার পর ভয় কিছুটা কাটলো। কিন্তু, তখনো ঐ রাস্তা দিয়ে আমি রাতের বেলায় যাতায়াত বন্ধ করে দিলাম। কি জানি কখন আবার কি চলে আসে চোখের সামনে!!

তারও কয়েকদিন পর লোক মুখে শুনতে পেলাম যে, ঐ বাসাতেই মাস খানিক আগে এক সদ্য বিবাহিতা বউ এর অপমৃত্যু হয়েছে। মাস খানিক আগে একজনের মৃত্যুর খবর আমি শুনেছিলাম কিন্তু তখন কে মারা গেলো কিভাবে মারা গেলো তা নিয়ে এতটা মাথা ঘামাইনি যতটা এই অভিজ্ঞতার পর ঘামিয়েছি…… আজও বেশি রাত্রি হলে আমি ঐ রাস্তা দিয়ে যাতায়াত থেকে বিরত থাকি……

রাতের বিভীষিকা !!!!!!!!

4

আজ কাজে আসতে কামালের একটু দেরী হয়ে যায় । এখন বাজে সকাল প্রায় ৯ টা ৪৫ মিনিট । হাজিরা খাতায় সই করতে করতে কামাল একবার আশে পাশে চোখ বুলায় তারপর ঝট করে হাজিরের ঘরে লিখে ফেলে ৯টা ৩০ মিনটি । তার পর পাশের টেবিলে বসা এক বুড়োকে লক্ষ্য করে বলে- বুঝলেন কলিম চাচা বউডার শরীর বেশি ভালা না । আট মাস চলতাছে । অনেক চিন্তায় আছি । বাসায় কেউ নাই যে দেখভাল করবো । কি যে করি ? একটু থেমে আবার বলে -আমারই সব করতে হয় । তার উপর টাকা পয়সার সমস্যায় আছি ।

-একটা কামের লোক রাখতে পারো না মিঞা ? পাশের টেবিলে বসে থাকা ৬০ বছর বয়সের বৃদ্ব কলিম মিয়া কথাটা বলে কিছুটা থামে , তারপর আবার বলে – জানো তো পরপর তিনদিন লেট হইলে এক দিনের বেতন পানিতে যাইবো । তোমার এ মাসে ওলরেডি ৭ দিন লেট । মানে ২ দিনের বেতন নাই । ব্যাপারটা মাথায় রাইখো ।

কামাল কিছু বলে না মাথা নাড়ায় । সে ব্যাপারটা জানে ।

সরওয়াদি হাসপাতালের এ্যম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসাবে গত মাস দু’য়েক আগে যোগ দিয়েছে কামাল । ওর কাজ হলো সারাদিন এ্যম্বুলেস চালান । যেদিন কাজের চাপ থাকে সেদিন এতো বেশি থাকে যে খাওয়া দাওয়ার সময় থাকে না । আর যেদিন কাজের চাপ কম থাকে সেদিন দেখা যায় দু’একটা ট্রিপ মারার পরই বসে বসে ঝিমোতে হয় । তবে কাজের মধ্যেই থাকতে বেশি ভাল লাগে কামালের । তার উপর কখন ও সখন ও দু’পয়সা উপরি পাওয়া যায় । শুরুতে রুগি ,লাশ পরিবহন করতে একটু খারাপই লাগত । কিন্তু এখন তা সয়ে গেছে । ও চিন্তা করে দেখেছে যাত্রী পরিবহন করার চেয়ে রুগি আর লাশ পরিবহন করাই নিরাপদ। হাউকাউ চেচামেচি কম করে । সই করে এ্যম্বুলেন্সের চাবির জন্য দোতালায় উঠতেই শান্তি দিদির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় । তিনি প্রায় দৈড়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দিকে যাচ্ছিলেন । শান্তি দিদি হাসপাতালের সিনিয়র নার্স । কামালকে বেশ স্নেহ্ করে । ঠিক কামালের মতো দেখতে নাকি তার এক ভাই ছিল ।

– কি দিদি কি খবর ?

– ২১ নম্বর রুগির অবস্হা বেশি ভাল না রে । স্যারদের খবর দিতে গেছিলাম । তোর বউ কেমন আছে ? কোন চিন্তা করবি না আমরা আছি । শান্তি দিদি দাঁড়ায় না ।

কামাল কিছু বলার সুযোগ না পেয়ে হেসে অফিস রুমে ঢুকে যায় । সেখান থেকে চাবি নিয়ে সোজা বাহার ভাইয়ের চায়ের দোকানে । চাবি নেয়ার মানে কামাল গাড়ি সহ রেডি । কল আসলেই চলে যাবে । বাহার ভাই এর দোকানে কামাল এলাহি ভাইকে দেখতে পায় । আরো কয়েকজনকে নিয়ে বসে চা খাচ্ছে আর হাত নেড়ে নেড়ে কি যেন বলছে । এলাহি ভাই এই হাসপাতালের ড্রাইভার ইউনিয়নের নেতা । তার হুকুম ছাড়া হাসপাতালের একটা গাড়িও চলে না । তার কথাই আইন । কামাল কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বলে ভাই কেমন আছেন ?

সালামের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে এলাহি মিয়া বলে – কি ব্যাপার কামাল আজকাল থাকো কৈই ? ইউনিয়িন অফিসে আসো টাস না । শুধু কি রুগিগো সেবা করলে চলবো ? নিজের ভবিষ্যতের দিকে ও তো তাকাইতে হইবো, না কি ? সর্মথনের আশায় এলাহি মিয়া পাশে বসে থাকা অন্য সবার দিকে তাকায় । সবাই মাথা নেড়ে তাকে সর্মথন দেয় ।

– লিডার কামাল মিয়ার তো বাচ্চা হইবো । পাশে বসে লম্বা মতো তেল চোরা জহির বলে ।

-আবে কামালের বাচ্চা হইবো নাকি ? ক’ওর বউ এর বাচ্চা হইবো । আরেকজন কথাটা বলার সাথে সাথে সবাই হো হো করে হেসে উঠে । কামাল কিচ্ছু বলে না । মুখে হাসি হাসি একটা ভাব করে রাখে । যেন খুব মজা পাচ্ছে ।

-বস । চাটা খাও । তয় ভাই বাচ্চা হওনের পর কিন্তু ইউনিয়নের জন্য সময় দিবা । আমি তো শালায় তোমগো লাইগা খাটতে খাটতে শেষ । আর যে কোন দরকারে আমার ফোন দিবা । তোমগো লাইগা আমার জান কোরবান । বলে এলাহি মিয়া দল বল নিয়া চলে যায় ।

কামাল বুঝতে পারে আজকের দিনটা ওর বসে বসেই কাটবে । চায়ের দোকানে দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর ও কোন কল আসেনা । কামাল উঠে ওর এ্যম্বলেন্সের কাছে চলে আসে । ১৭ নম্বর এ্যম্বুলেন্স । দরাজা খুলে ও এ্যম্বুলেন্সে উঠে রেডিও চালিয় কতোক্ষন খবর শুনে ।

এমন সময় সোলেমান এসে একটা ঠিকানা দিয়ে যায় । গুলশান যেতে হবে । রুগী নিয়ে আসতে হবে । কামাল বের হয়ে যায় । যাবার সময় একটা কলা আর বন রুটি নিয়ে নেয় বাহার এর দোকান থেকে দুপুরের খাবার হিসাবে খাবে বলে । খাতায় লিখে রাখতে বলে ও টান দিয়ে গাড়ী নিয়ে বেড় হয়ে যায় । হাসপাতালের গাড়ি চালালে আরেকটা সুবিধা হলো রাস্তায় সাজেন্টের সঙ্গে ঝামেলায় পরতে হয় না । কথায় আছে এ্যম্বুলেন্সের সাইরেন শুনলে প্রধান মন্ত্রীর গাড়ীও নাকি সাইড দেয় । কথাটা অনেকটা সত্য ।

দেশের অবস্থা খুব একটা ভাল না । রাস্তা ঘাটে প্রচুর জ্যাম । তাড়াতাড়ি গুলশান থেকে ফিরতে পারলেই দ্বায়িত্ব শেষ করে বাসায় ফেরা যায় । মায়া বাসায় একলা । দুবার এর মধ্যে ওর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে । মায়া বলেছে ও ভাল আছে । কোন সমস্যা নাই । তাই ও এখন অনেকটা নিশ্চিন্তে আছে । গুলশান থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায় । দোতালায় চাবি জমা দেবার জন্য আসতেই কামাল খবর পায় শান্তি দিদি ওকে কয়েকবার খুঁজেছে । অফিস রুমে খবর দিয়ে রেখেছে যেন ও আসলেই যেন ৭ নম্বর ওয়ার্ডে চলে আসে ।

৭ নম্বর ওয়ার্ডটা খুব বড় । ঢুকতেই হাতের ডান পাশে নার্সদের বসার জায়গা । শান্তি দিদি সেখানেই বসে আছেন । ওকে দেখে বলেন- কামাল এদিকে আয় । তোর সঙ্গে কথা আছে ।

-দিদি বাসায় যেতে হবে । তাড়াতাড়ি কও কি কইবা । কামাল একটা খালি চেয়ার টেনে বসে পরে ।

-তোর বউ কেমন আছে ?

-আছে কোনরকম । দিদি রাইত হইছে । কাজের কথা কও । বউডা একলা ঘরে । কামাল তাড়া দেয় ।

-আরে বছ না ছেমরা । কাজ ছাড়া কি তোরে ডাকছি ? কামাল মাথা নাড়ে দিদি ঠিক বলেছ কাজ ছাড়া ডাকেনি । শুন ২১ নম্বর বেডের রুগীডা মারা গেছে । লাশ মর্গে আছে । তোরে একটু দিয়া আইতে হইবো ।

-কি কও ? এ্যই রাইতের বেলা ? জাকিরের তো নাইট ,ও’রে কও ? কামাল চলে যাবার জন্য দাঁড়িয়ে যায় ।

-আরে শুন ; শুন; তোর তো টাকা দরকার । মালদার পাটি ; পাথের খরচ বাদ দিয়াও মনে হয় হাজার পাঁচেক দিবো । জাকির গেছে সাভারে আসলে কমু । ও মনে হয় রাজি হইয়া যাইবো । সামনে তোর পোলা পাইন হইবো হাতে টাকা পয়সা দরকার তাই আমি তোরে কইলাম । এখন যাওয়া না যাওয়া তোর মর্জি ।

পাঁচ হাজার ! কামাল একটু দ্বিধায় পরে যায় । আসলেই তো ওর হাতে তেমন টাকা পয়সা নাই । প্রতি মাসে মাটির ব্যাংটাতে এতোদিন যা জমিয়েছে সব মিলিয়ে হয়তো হাজার পাঁচেকই হবে । এ সময় পাঁচ হাজার টাকা হলে বাচ্চা হওনের সময় অনেক নিশ্চিত হওয়া যায় ।

-কিন্তু দিদি মায়া তো বাসায় একলা । দেরী করলে ভয় পাইতে পারে ।

-আরে ছেমরা কয় কি ? ভয় পাইবো কেন ? লাগলে আমি যাওনের সময় একবার দেইখা যামু । শান্তি দিদি খাতায় কিছু লিখতে লিখতে বলে ।

– কৈই যাইতে হইবো ? মাথা চুলকাতে চুলকাতে কামাল জিজ্ঞাসা করে ।

-কুমিল্লা । শান্তি দিদি লেখা বন্ধ না করেই বলে ।

-ও মা কও কি দিদি ? কুমিল্লা ! কামাল আতকে উঠে । তাইলে তো ফিরতে ফিরতে ভোর হইয়া যাইবো ।

-আরে না । ভোর হইবো না । এ্যই ধর তিনটা চারইটা বাজতে পারে ।

-হেইডা তো ভোরই । কাইল আবার ডিইটি আছে না ? কখন ঘুমামু কখন কামে আমু ।

-কাইল ১২ দিকে আবি ।সুপার স্যাররে আমি কইয়া রাখুম । কোন অসুবিধা হইবো না । শান্তি দিদি ফাইলটা আলমারিতে রাখতে রাখতে বলে ।

-একটা কথা কও তো দিদি তোমার এতো গর্জ কেন ? ভালাই পাইছো মনে হয় ।

-আরে ছেমরা মর । আমার আবার গর্জ কি ? তুই যখন মরবি তখন তোর লাইগাও আমি মাইষের হাতে পায়ে ধরমু ।

-আহা দিদি রাগ করো কেন ?

-শুন । দিদি কামালের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে । যে মরছে সে অনেক বড় লোক আছিল । বড়লোকগো যেমন খাসলত ভালা হয় না । এই ব্যাডারও তাই আছিল । শেষ বয়সে তিনডা বিয়া করছে । কচি কচি মাইয়া গুলি এই এক সপ্তাহ বুইড়াডার লাগি যা করলো । এখন মরার পরও লাশ নিয়া বইয়া আছে । তুই যাইয়া পৌছে দিয়ে আয় । তোর কাম শেষ । শান্তি দিদি ওর হাতে একটা সাদা খাম দেয় ।

-কি এইডা ? কামাল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ।

-কি আবার টাকা আর ঠিকানা যেহানে যাবি । যা গাড়িতে গিয়া ব।

-কিন্তু দিদি এতোটা পথ এই রাইতের বেলায় লাশ নিয়া একলা যাইতে পারুম না ।

-আরে ছেমড়া একলা যাবি কেন । বুইড়ার তিন বউ যাইবো তোর লগে । দেখিস আবার না তুই বুইড়া হইয়া যাছ ।নিজের রসিকতায় নিজেই শান্তি দিদি হেসে উঠে ।

-কি যে কওনা দিদি ? আমি তাইলে গাড়িতে যাই ।

-যা । আর শুন বউরে নিয়া চিন্তা করবি না । আমি তোর দিদি আছি । যা ভাগ ।

কামাল বের হয়ে যায় । হঠাৎ করে টাকাটা পেয়ে মেজাজ ভাল হয়ে গেছে । যেতে যেতে মায়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলে । মায়াকে জানায় – ওকে এখন কুমিল্লা যেতে হচ্ছে , ফিরতে রাত হবে । মায়া যেন কোন চিন্তা না করে । যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ও ফিরে আসবে ।

কামাল নীচে নেমে দেখে লাশ ওর গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে । মনির মিয়া গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে ।

এতো ভারী কারো শরীর হয় ? চাইর জন মিল্লাও তুলতে যে কষ্ঠটা হইলো । কামালের দিকে তাকিয়ে হাত ঢোলতে ঢোলতে কথা গুলো এক নি:শ্বাসে বলে মনির মিঞা ।

-অনেক ভারী নাকি ? পাল্টা জিজ্ঞাসা করে কামাল তাকায় এ্যম্বুলেন্সের ভেতরে । বাম পাশের বেডের উপর লাশটা রেখে সাদা একটা চাদর দিয়ে লাশটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে । মিনির মিঞা বাম দিকের দরজা বন্ধ করে দেয় । কালো বোরকা পরা লম্বা মতোন দু’জন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির পাশে । একবার কামালের দিকে তাকিয়ে দু’জন নীচু স্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকে । কামালের কান পর্যন্ত সে কথার আওয়াজ পৌছায় না । কাগজ নিয়ে আরেক জন বোরকা পড়া মহিলা কামাল এর কাছে এসে বলে – আপনিই কি যাবেন ভাই ?

-কামাল উপরে নীচে হা সূর্চক মাথা নাড়ে ।

-তা হলে চুলুন রওনা হই । মহিলা মিনির মিয়ার হাতে কয়েকটা একশ টাকার নোট দিয়ে অন্য দুজন মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে – কৈই তোমরা আস ।

সবাই উঠে বসতেই কামাল এ্যম্বুলেন্স ছেড়ে দেয় । ঘড়িতে তখন কাটায় কাটায় রাত ১২ টা বাজে ।

রাস্তায় খুব একটা গাড়ি নেই । সোডিয়াম বাতির আলোয় পথ ঘাট কেমন ভৌতিক মনে হচ্ছে । কামাল এমনিতে ভুত প্রেত বিশ্বাস করে না । তবু এ নির্জন রাতে কেন যেন ওর শরীরে কাটা দিয়ে যায় । গাড়ির গতি ঘন্টায় ৬০ রাখে কামাল । মনে মনে ঠিক করে কোন অবস্থাতেই গাড়ির গতি ৬০কি.মি: এর উপড় নেবে না । কামালের শশুরই ছিল ওর ওস্তাদ । সে শিখিয়েছে রাতের বেলা রাস্তা ঘাট যতোই ফাঁকা হোক না কেন একটা নিদিষ্ট গতিতে গাড়ী চালালে কোন এক্সিডেন্ট হয় না । কামাল কথাটা বিশ্বাস করে । তাই আগে বাগে মনে মনে গাড়ির গতি ঠিক করে নেয় ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার ।সংসদ ভবন এর সামনে আসতেই বৃষ্টি শুরু হলো । কামাল মনে মনে বলে- বৃষ্টি হবার আর সময় পেল না । কামাল গাড়ীর গতি আরো কমিয়ে আনে । আসাদ গেটে আড়ং এর সামনে আসতেই সিগনাল পরে গেল । কামাল একবার ভাবলো টান দিয়ে চলে যাবে কিনা ? কিন্তু পরক্ষনেই ভাবলো; না । অস্থির হবার কিছু নাই ।

ও গাড়ী থামিয়ে গ্রীন বাতির জন্য অপেক্ষা করে । রাস্তা প্রায় ফাঁকা । কোন জন মানব নেই । ডানে বামে তাকালে ওর কেমন একটা গা ছমছম করে উঠে । দুর ! যতোসব ফালতু চিন্তা ভাবনা । এক কিলোও আসতে পারলাম না আর ভুতের চিন্তা পেয়ে বসেছে । নিজেক নিজেই সান্তনা দেয় কামাল । হঠাৎ বাম পাশের জানলা দিয়ে একটা মুখ উকি দিতে চমকে উঠে চিৎকার করে কামাল কে ? কে ?

জানালায় দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে আছে এক বুড়া । মাথায় এলোমেলে সাদা চুল । দু’হাত দিয়ে জানালার কাঁচ চেপে আছে । দাঁত গুলোও কেমন ফাঁক ফাঁক । লোকটা বলে উঠে- দে ; দে; টাকা দে । ভাত খামু টাকা দে ।

মেজাজ খারাপ হয়ে যায় কামালের । মনে হয় নাইমা দুইটা চড় মারে । হারমজাদা ভিক্ষা চাওনের আর কোন সময় পায় না । মর যাইয়া । ও শার্ট ফাঁক করে বুকে থুতু দেয় ।

মনে মনে গজগজ করলেও বুক পকেট হাতরে পাঁচ টাকার একটা নোট বেড় করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে ধরে । লোকটা টাকা না নিয়ে বলে -ভাগ । ভাগ । তাড়াতাড়ি ভাগ ।

কথার আগা মাথা বুঝতে পারে না ও । কামালের মনে করে হয়তো পাগল- টাগল হইবো । ঠিক এই সময় ওর পেছনের ছোট জানলায় টোকা দেবার শব্দ হয় । কামাল ওর ঠিক পিঠ লাগোয়া যে জানালাটা সেটা একটু ফাঁক করে ও ০পেছনে না তাকিয়েই বলে- জ্বি বলেন ?

-কি হয়েছে ? পেছন থেকে তিন জনের একজন জিজ্ঞাসা করে ।

-না কিছুনা ।

সিগনাল ছেড়ে দেওয়ায় কামাল গাড়ী টানদেয় । কামাল বাম পাশের মিররে তাকিয়ে বুড়োটাকে আর দেখতে পায় না । মনে মনে ভাবে আরে গেলো কোথায় ? ও একটু সামনে ঝুকে ফুটপাতটা দেখতে চেষ্টা করে ;কিন্তু বুড়োকে আর দেখতে না পেয়ে বেশ অবাক হয় ও ; তারপর ফার্মগেটের দিকে টার্ন্ নেয় ।

পেছন থেকে ফিস ফিস করে কথা বলার শব্দ কানে আসে কামালের । এই নিরবতায় তাতে ও কিছুটা সাহস পায় কামাল । মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি শো শো করে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে । রাতে রাস্তায় বেশির ভাগ ট্রাকই চলে । দানবের মতো ট্রাকগুলি ঘোত ঘোত শব্দ করে চলে যায় । সায়দাবাদ ; যাত্রাবাড়ি হয়ে কামাল গাড়ি চালাতে থাকে শনির আখড়া দিয়ে কুমিল্লার দিকে । এ রাস্তাটা ওর বেশ পরিচিত । একটানা বৃষ্টি হচ্ছে । মনে হয়ে আজ সারা রাতই হবে । মাঝে মাঝে বিকট শব্দে বিদ্যুত চমকাচ্ছে । শীত; শীত একটা ভাব চলে এসেছে । কামাল পানির বোতল খুলে পানি খায় । আশে পাশের দোকান পাট সব বন্ধ । আজ মনে হচ্ছে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কম । পেছন থেকে আবারও টুক টুক করে শব্দ হয় ।

– জ্বি বলেন ? কামাল মাথাটা একটু পেছনে নিয়ে বলে ।

-আমরা একটু নামবো ? এক জন বলে । কামাল অবাক হয় ।

-এখানে ?

-জ্বি । আপনি কি একটু থামেন ।

-মনে হয় দাউদকান্দি এসে পরেছি । সেখানে থামলে হতো না ?

-না । সামনের বড় গাছটার কাছে থামুন । পেছন থেকে অন্য একটি কন্ঠ বলে উঠে । কথাটা আদেশেয মতো শুনার ওর কাছে । কামাল এ্যম্বুলেন্সটা রাস্তার পাশে একটা বড় গাছের গা ঘেষে দাঁড় করিয়ে দেয় । পেছনের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ও জানালাটা দিয়ে পেছনে তাকায় । আধো আলোয় যা দেখতে পায় তাতে কামাল এর মাথা ঘুরে উঠে । সিটের উপর মৃত ব্যক্তি বসে আছে । শুধু বসেই নেই ; হাত নেড়ে নেড়ে কি যেনো বলছে । ও প্রচন্ড রকমের ভয় পেয়ে যায় । কামাল পেছন থেকে চোখ সরিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করে । সামনে তাকালে দু’ছায়া দেখতে পায় ও । কোন শরীর নেই । শুধু বোঝা যাচ্ছে দেহের অস্তিত্ব । বাতাসে ভেসে ভেসে ছায়া দু’কামালের দিকেই আসছে । ভয়ে ওর জান বের হয়ে যাবার জোগার । মনে হচ্ছে মরে যাবে । নিজেকে সিটের সঙ্গে চেপে রাখে ও। মনে হচ্ছে নিজেকে সিটের ভেতর ডুকিয়ে ফেলতে পারলে ভয় কিছুটা কমে যেতো । মনে মনে আল্লাহ্ ; আল্লাহ্ করতে থাকে । ছায়া দু’টো ওর পাশ দিয়ে পেছনে চলে যায় । পেছন থেকে হঠাৎ হাসির শব্দ ভেসে আসে । কামাল সাহস সঞ্চয় করে আবার পেছনে তাকায় ।

লাশটা গাড়ি থেকে নেমে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে । শরীরে জড়ানো মুদ্দারের কাপড় এলোমেলো ঝুলে আছে । লোকটার হাতে সাদা কাপরের একটা পুটলির মতো কিছু । দু’জন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে লোকটার ঠিক সামনে । একজন পুটুলিটি একটু ফাঁক করেতেই কামাল একটি শিশুর মাথা দেখতে পায় ।

লোকটা পুটুলিটা গাড়ির ভেতরে ছুরে মারে । প্রায় সাথে সাথে হুরমুর করে সবাই গাড়িতে উঠে পরে গাড়িতে। কামালের শরীর শক্ত হয়ে গেছে । একবার ভাবলো গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দেবে কিনা । কিন্তু কোথায় যাবে ? তার চেয়ে ভাল কিছু না দেখার ভান করে থাকলে হয়তো জানে বেচে যাওয়া যাবে । ও মনে মনে প্রার্থনা করে আল্লাহ্ বাঁচাও । পেছন থেকে টোকা দেবার শব্দ আসতেই কামাল চমকে উঠে – গাড়ি চালান । ভারী এটা কন্ঠ বলে । কামাল চাবিতে হাত দিতেই গাড়ি স্টাট হয়ে যায় । কামালের মাথা কাজ করছে না । গাড়ি রাস্তায় উঠার সময় সাইড মিররে দেখতে পায় ছায়া দু’টো এখনও দাঁড়িয়ে আছে । হাতে ধরে আছে সাদা মতো দু’টো পুটুলি । এখন আর বৃষ্টি পড়ছে না ; তবে মাঝে মাঝে বিদ্যূত চমকাচ্ছে । মেইন রাস্তা ধরে গাড়ি চালাচ্ছে কামাল । ও চালাচ্ছে না বলে গাড়ি নিজে নিজে চলছে বললেই ভাল শুনায় । কেননা এই মুর্হুতে গাড়ির উপর ওর কোন কন্ট্রোল নেই । ও শুধু চুপচাপ বসে আছে । গাড়ি নিজে নিজে চলছে । পেছন থেকে চুক চুক শব্দ ভেসে আসছে । কামাল নিজেকে সামলে সাহস সঞ্চয় করে আবার পেছনে তাকায় । দেখতে পায় দু’জন করে দুপাশে বসে সবাই সামনের দিকে ঝুকে বাচ্চাটা

খাচ্ছে। দু’জনের হাতে বাচ্চাটার ছেড়া পা ; অন্য দু,জনের হাতে বাচ্চাটার ছেড়া দুটো হাত । বাচ্চার মাথাটা নীচে পড়ে আছে । চোখ দুটো খোলা । কামাল এ সমগ্র শরীর গুলিয়ে উঠে । বমি পেয়ে যায় । কি করবে বুঝতে পারে না । সারা শরীর কাঁপছে । মনে হচ্ছে ও মরে যাবে । সামনে ডান পাশে একটা বাড়ী দেখা যাচ্ছে । বারান্দায় আলো জ্বলছে । কামাল সমস্ত শক্তি দিয়ে ব্রেক চেপে ধরে । এ্যম্বুলেন্সটি একটা প্রচন্ড ঝাকি খেয়ে থেমে যায় । পেছনে বসে থাকা সবাই ধাক্কা খেয়ে কামাল এর দিকে চলে আসে । পেছন থেকে হালকা একটা কাশির শব্দ শোনা যায় । পুরুষ কন্ঠে কেউ একজন বলে – কি হলো ; কি হলো ? আগে বলেছিলাম তোরা ধৈর্য্য ধর । আমার কথা শুনলি না । এখন হলো তো । ড্রাইবার হারামজাদা সব দেখেছে । ধর হারামজাদাটারে । তারপর আবারও কাশির শব্দ । ছিড়ে টুকরা টুকরা করে ফেল । কামালের পেছনের জানালা দিয়ে একটা হাত বেড় হয়ে আসে কামালের দিকে -থামলি কেন চালা চালা । হাতটা থেকে তখনও টপ টপ করে রক্ত পড়ছে । কামাল সামনের দিকে সড়ে এসে পেছনে তাকালে দেখতে পায় শেয়ালের মতো একটা মুখ । চোখ দুটো জ্বলছে । জিহ্বাটা বের হয়ে আছে । কামাল জ্ঞান হারিয়ে সিটের উপর লুটিয়ে পরে ।

পরিশেষ : পরের দিনে ভোরে মসজিদে ফজরের নামাজ শেষে ফেরার সময় মুসুল্লিরা কামাল কে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে । জ্ঞান ফিরে আসার পর কামাল আর কিছু মনে করতে পারে না । আর ওর এ্যম্বুলেন্সটি থেমে ছিলে রাস্তার পাশের একটি বাড়ীর সামনে । এ্যম্বুলেন্সটির পেছনে একটি সাদা কাপড়ের মোড়ান অবস্থায় পাওয়া যায় একটি বাচ্চা ছেলের দেহের অবশিষ্ট অংশ ।

অলৌকিক এক অভিজ্ঞতা……

4

আমার নাম সীমান্ত ।আমি আজ আপনাদের সাথে আমার সাথে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বলব ।আমি তখন খুব ছোট,ক্লাস সেভেনে পড়ি ।আমার মামা বাড়ি কেরানীগঞ্জ ।ডিসেম্বর মাস ।স্কুল ছুটি ।তাই আমি আমার বাবা-মার সাথে মামা বাড়ি বেড়াতে যাই ।সভাবতই ডিসেম্বর মাসে শীতকাল থাকে ।আমার মামাতো বোন তার স্কুলের সাংস্কৃতিক ক্লাবে জড়িত ।অনেকদিন থেকেই সে তার স্কুলের ১৬-ই ডিসেম্বর এর একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ।অবশেষে ১৬-ই ডিসেম্বর এ আমি এবং এলাকার কিছু ছেলে একসাথে অনুষ্ঠান দেখার জন্য রওনা হই ।এই আনুষ্ঠানটি যেখানে হবে সেটা আমাদের বাড়ি থেকে একটু বেশী দূরে ।সেখানে যাবার জন্য দুটি রাস্তা আছে ।একটি রাস্তা দিয়ে যাবার সময় একটি পুরানো বাড়ি পরে আর অপরটিতে পড়ে একটি সিনেমা হল ।আমরা যাবার সময় দিতীয় পথটি দিয়ে যাই ।অনুষ্ঠান খুব ভালো হয় এবং শেষ হয় রাত ১০ টায় ।আমাদের এখানে তখন রাত ৯ টার পর কোনো গাড়ি বা রিক্সা পাওয়া খুব কঠিন হয় ।তাই আমরা সবাই হেটে হেটে বাসায় যাচ্ছি ।আমাদের মধ্যে একটি ছেলে ছিল যে খুব সাহসী ছিল ।আমরা সবাই অনেক মজা করতে করতে আসছিলাম ।এরই মাঝে সে বলল যে সে ওই পুরানো বাড়ির দিয়ে যাবে ।আমরা অনেক নিষেধ করলাম কিন্তু সে শুনলো না ।সে ওই পথে চলে গেলো ।

আমরা তখন ২ জন ছিলাম। আমরা সিনেমা হলের সামনের রাস্তাটি দিয়ে বাসার দিকে হাটা শুরু করলাম। যখন সিনেমা হলের সামনে আসলাম তখন হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে গেলো । আমরা প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু পরে আবার হাটা শুরু করলাম । আমরা দুইজন একসাথেই হাটছিলাম।হঠাৎ করেই আমার বন্ধুটি দাঁড়িয়ে গেলো ।আমি কি হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে সে কিছু না বলে শুধুমাত্র হাত দিয়ে ইশারা করলো যে তার ডানপাশে কিছু একটা আছে ।আমিও পরে তাকালাম ।তাকানোর পর যা দেখলাম তাতে করে আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেলো । দেখি যে একটি বড় শিমুল গাছ আর সেখানে একটি ১৫-১৭ বছরের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।তার গায়ে সাদা রঙের একটি কাপড় । চোখ দুটো অনেক লাল,মুখে একটি বড় কাটা দাগ ।এই দৃশ্য দেখে আমরা ভয়ে দৌড় দেই । অনেকটা সময় দৌড়ানোর পর একটি মানুষকে দেখতে পাই যে অনুষ্ঠান দেখে বাসায় ফিরছিলো । আমরা তাকে অনুরোধ করলাম যে সে যেন আমাদের বাসায় পৌছানোতে সাহায্য করে ।আমার মামাকে এলাকার সবাই চিনে । তাই আমার পরিচয় দেয়াতেই সে রাজি হলো । অবশেষে রাত ১১ টা ৪০ মিনিটের দিকে আমরা বাসায় আসি । পরদিন সকালে অপুকে (যে ছেলেটি পুরানো বাড়ির রাস্তা দিয়ে এসেছিলো) সব ঘটনা বলি । তার উত্তরে আমরা যা শুনলাম তাতে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল । সে বলল যে সেই মেয়েটিকে সে ওই পুরনো বাড়ির দরজার সামনে দেখেছে । তাহলে আমরা তিনজনেই যে মেয়েটিকে দেখলাম সে কে ছিলো ? এর উত্তর আমি আজও পাইনি ।

অবিশ্বাস্য তবু বিশ্বাস করতে হবে(পর্ব- ২)

1

ঝালকাঠি জেলার রুনশি গ্রামে ২০০৮ সালের শেষের দিকে এক অদ্ভুত পরিবারের আগমন ঘটে।। তারা এর আগে কোথায় থাকতো এই ব্যাপারে কারো কোনো নির্দিষ্ট ধারণা ছিল না।। এরা সারাদিন ঘরের দরজা আটকে বসে থাকতো এবং গভীর রাতে এদের বাসা থেকে এক ধরনের পাশবিক আওয়াজ আসতো।। অনেকটা প্রচণ্ড মৃত্যু যন্ত্রণায় কেউ ছটফট করছে,এমন আওয়াজ।। ঐ বাসার লোকদের মাঝে শুধু একজন মাঝে মাঝে কেনাকাটার জন্য ঘরের বাইরে বের হতো।।

পরিবারের সবাই ডিসেম্বর মাসের ২ তারিখে একত্রে মারা যায়।।

ঐদিন সকালে তাদের বাসার দরজা খোলা থাকলে এবং ভেতরে কুকুরের আওয়াজ পাওয়া গেলে গ্রামবাসী সবাই দেখতে উৎসুক হয়ে ঢুকে পড়ে।। দেখা যায়, এক পাশে স্তূপ করে পড়ে আছে ৫ জনের মৃত দেহ এবং সারা ঘরে অদ্ভুত সব আলপনা আঁকা।। এছাড়াও সেই ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় অসংখ্য মানব কঙ্কাল এবং বিড়াল, কুকুর, শিয়াল, মানুষসহ আরো কিছু প্রাণীর মৃত দেহ।।

ঘটনাটি প্রেত সাধনা বলে অনেকেই আখ্যায়িত করেন।। স্থানীয় দৈনিকে এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক “নাজমুল বাশার” লেখালেখি করেন কিছুদিন।। আশ্চর্যজনক ভাবে, বাশারকে একদিন সেই বাড়ির সংলগ্ন পুকুরের পানিতে মৃত অবস্থায় ভাসতে পাওয়া যায়।। (সুত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব) ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন, বাশার হৃদ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।।

গল্প হলেও সত্যি (১)

0

আজ থেকে ৫-৬ বছর আগের একটি কাহিনী এখন আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করব।গল্পটি আমার এক এলাকার মামার কাছে শোনা।মামার নাম বাবু।বাবু মামা প্রায় সময়  নিজের আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে গিয়ে থাকেন।ওখানে চাগদা বলে একটি যায়গায় বাবু মামার বড় ভাই থাকেন।ঘটনাটি বাবু মামার সাথে ঘটে যাওয়া।এবার তাহলে আসল ঘটনায় আসা যাক।

বাবু মামা একবার চাগদা বেড়াতে যান ।চাগদায় বাবু মামার বড় ভাইয়ের বাসা থেকে একটূ দূরে একটা পুকুর আছে।বাবু মামা প্রত্যেকবার চাগদা যাবার পর ওই পুকুরে মাছ ধরতে যান।রাতের বেলা মাছ ধরতে বাবু মামা খুব পছন্দ করেন ,এমন সময় নাকি নীরবতা থাকে তাই মাছ ধরতে সুবিধা হয়।

একদিন রাতের কথা। বাবু মামার শান্ত নামের একটা চাগদায় বন্ধু আছে মাছ ধরা থেকে শুরু করে সবসময় ওরা এক সাথেই থাকে।একদিন রাতে বাড়ির সামনের পুকুরে রাত ১১ টা পর্যন্ত বসে থেকেও খুব একটা মাছ পেলনা বাবু মামা আর তার বন্ধুটা।তাই হতাস হয়ে তারা বসে রইল।এমন সময় শান্ত নামের বন্ধুটি বলল যে ১-১/৫ কি মি দূরে নাকি আরেকটা পুকুর আছে।ওখানে নাকি অনেক মাছে পাওয়া যায়।এ কথা শুনে বাবু মামা এক মিনিট ও দেরি করলেন না।উনি ওই পুকুরের দিকে রওনা হলেন।রাত তখন প্রায় ১২ টা। দুরের পুকুর ঘাটে বসে বাবু মামা ও তার বন্ধু মাছ ধরছেন।পাসে আরও ৩-৪ জন লোক তারাও মাছ ধরায় মশগুল।সবাই চুপ।১০-১২ মিনিট পর পর একজনের বরশি তে মাছ উঠছে আবার উঠছেও না।প্রায় ঘন্টা পার হয়ে গেল।হঠাৎ বাবু মামা খেয়াল করলেন তার পাশের একটা লোক জোরে জোরে হাসছে।বাবু কাকা একবার তার বন্ধু শান্তর দিকে তাকালেন তারপর আবার লোকটির দিকে তাকিয়ে লোকটার হাসির কারন জানতে চাইলেন।এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেই লোকটি হাসি থামিয়ে দিয়ে বাবু মামার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তোর বাড়ি কোথায়?বাবু মামাও তার বাড়ির ঠিকানা বললেন।তারপর লোকটা জিজ্ঞেস করলেন কার সাথে এসেছে,বাবু মামা বললেন তার বন্ধু শান্তর কথা।ওমনি লোকটি আবার হাসতে শুরু করলেন। আর হাসতে হাসতে বললেন একবার তাকিয়ে দেখতো তোর বন্ধুটির দিকে…বাবু মামা তার বন্ধুটির দিকে তাকিয়ে যা দেখেছিলেন তা বলতে বাবু মামা আজও ভয় পান।তিনি দেখেছিলেন তার বন্ধুটির চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে আর বন্ধুটি বসে বাবু মামার ধরা মাছ গুলো কাচা চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে আর বাবু মামাকে বলছে যে আরও দে আরো দে। এমন সময় বাবু মামা তার আসে পাশে তাকিয়ে দেখলেন আসে পাশে অন্য কেউ নেই শুধু শান্ত নামের বন্ধুটি আর পাশের লোকটি।এই দেখে বাবু মামা জ্ঞ্যান হারিয়ে ফেল্লেন।জ্ঞ্যান ফিরলে উনি নিজেকে বাসায় বিছানায় দেখতে পারলেন এবং জানতে পারলেন শান্ত নামের বন্ধুটি সেদিন বাসাতেই ছিল এবং এই পুকুর ঘাটে নাকি এমন ঘটনা প্রায় ই ঘটে থাকে।

ডায়ানার ভূত(ভিডিও ফুটেজ সহ)

0

যুক্তরাজ্যের প্যারানরমাল গবেষকরা এখন রীতিমত ব্যাস্ত এক ভিডিও ফুটেজ নিয়ে। হ্যা, চীনের কয়েকজন পর্যটক যুক্তরাজ্যের গ্ল্যাসগোতে এক গীর্জা ভ্রমন কালে সেখানকার ছবি নিজের ক্যামেরায় ধারণ করে। পরে তারা সে ফুটেজ দেখে রীতিমত অবাক হয় যখন তারা ফুটেজটিতে প্রিন্সেস ডায়ানার মত এক অবয়ব উদ্ধার করে যা ক্যামেরায় চিত্র ধারণ কালে তারা দেখতে পায়নি এবং সেই গীর্যায় এমন কোনো প্রতিকৃতি বা অবয়বই নেই।

গল্প হলেও সত্যি

1

গল্পটা আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা হলেও গল্পটা আমার কাছে বেশ ভাল লেগেছিল।

আমার বন্ধুটির নাম সুমন ওর বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায়।কাহিনীটা আরও বেশ কয়েক বছর আগের।সুমন দের বাসায় একটা কাজের ছেলে ছিল নাম কমল।ছেলেটা এতিম ছিল ।তাই কমলের চাচা তাকে খুব ছোট অবস্থায় সুমনদের বাসায় রেখে যায়।তখন থেকে কমল সুমনদের বাসাতেই থাকতো।সুমনের মা ছেলেটাকে নিজের ছেলের মতই দেখত।কমল সুমনের মাকে মা বলেই ডাকত।এবার তাহলে আসল ঘটনায় আসা যাক।

একদিন দুপুরের কথা।সুমনদের বাসা থেকে একটু দূরে একটা বাতাবিলেবু গাছ আছে।ওই গাছে বাতাবিলেবু ধরেছে ।কমল চিন্তা করল তার মার জন্য বাতাবিলেবু পেরে আনবে।যাবার আগে বলেও গেল ‘মা আমি তোর জন্য বাতাবিলেবু নিয়ে আসছি ও গাছে বড় বড় বাতাবিলেবু ধরেছে।’এই বলে দৌড়ে চলে গেল।কিছুক্ষন পর খবর এল যে কমল বাতাবিলেবু গাছ থেকে পরে খুব ব্যাথা পেয়েছে এবং অবস্থা খুব একটা ভাল না। তাই তাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।সন্ধ্যার দিকে খবর আসে যে কমল মারা গেছে।সুমনের মা এই খবর শুনে খুব অসুস্থ হয়ে পরে এবং অনেকদিন প্রেসার অন্যান্য রোগে ভুগতে থাকে।

ঠিক এক বছর পরের কথা।বাতাবিলেবু গাছে আবার বাতাবিলেবু ধরেছে।সুমনের মা দুপুর বেলায় গাছের নিজ দিয়ে হেটে যাচ্ছে।এমন সময় উনি লক্ষ করলেন যে গাছে অনেক বাতাবিলেবু ধরেছে।তাই কমলের কথা মনে পরে গেল।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতাবিলেবু গাছটির নিচে এক দৃষ্টীতে গাছটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।ঠিক এমন সময় পেছন থেকে একটা হাত এসে সুমনের মার কাধে ঠেকল এবং পরিচিত একটি কন্ঠস্বর বলে উঠল ‘মা বাতাবিলেবু খাবিনা?’ সুমনের মা পেছন দিকে তাকিয়ে পুরো হতবাক হয়ে গেলেন।হায় হায় এ তো কমল। উনি তৎখনাৎ অচেতন হয়ে গেলেন তারপর উনাকে আসেপাসের লোকজন দেখে বাসায় নিয়ে এলেন এবং উনি অনেকক্ষন অচেতন ছিলেন।রাতে জ্ঞান ফিরলে উনি সব কথা খুলে বললেন…।

সাবধান, মিসির আলি সাবধান!! (Collected)

8

বর্ষণ মুখর একটা সন্ধ্যা।
৭ টা বেজে ৩১ মিনিট।
সেই সকাল থেকে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। ইউনুস মিয়া তার বাগান বাড়ির পাশে যে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট

আছে সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। জমাট অন্ধকারে একা, মাথার উপর শরিফ মার্কা ছাতা ধরা। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। ভয়ে বেচারার মুখ পাংশু হয়ে আছে।

গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও ইউনুস মিয়া তার এই বাগান বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগান নাই। কারন এতে তার বড় ভাই ইউসুফের কড়া নিষেধ আছে। ইউসুফ আলো সহ্য করতে পারেন না, তার অন্ধকার খুব প্রিয়।

পুকুর ঘাটে দুই পা তুলে ইউসুফ বসে আছে, দুই হাত বুকের সামনে কাঙ্গালের মত ভাঁজ করে ধরা। একটা মাত্র আধ ছেঁড়া লুঙ্গি পরা সে। বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে গেছে। কপাল বেয়ে পানি নামছে সরু ধারায় সে দিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই, ইউসুফের মেজাজ অনেক বেশি কড়া। এই যেমন এখন খুব কড়া হয়ে আছে ছোট ভাই ইউনুসের উপর।

ইউনুস একটু কেশে আবার বলল “ভাইজান, মিসির আলি নামের এক ভয়ানক বুদ্ধিমান মানুষ আমার বাড়িতে এসেছেন, আমি ভাবতেছি আপনার সমস্যার কথা উনাকে বলব”।

ছোট ভাইয়ের ঔদ্ধত্তে ইউসুফ একটু বিরক্ত হলেন। চোখ তুলে চাইলেন ছোট ভাইয়ের দিকে। বড় ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা ভয়ে হিম হয়ে গেল ইউনুসের। এই অন্ধকারেও বিড়ির আগুনের মত জ্বলছে ইউসুফের চোখ।

ইউসুফ শ্লেষ মেশানো কণ্ঠে বললেন, আমার কোন সমস্যা নাই। তুমি ওকে বলতে পার, তবে লাভ নাই। গতবার তো ঐ স্কুল মাস্টারকে বলচিলা। মনে নাই ঐ স্কুলের মাস্টারকে কিভাবে মারছিলাম? বলেই কেনা কেনা কণ্ঠে উচ্চস্বরে হেসে উঠল ইউসুফ। সেই হাসি যেন ইউনুসের বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল।

ইউনুস অতিদ্রুত বলে উঠল, “মিসির আলি সাহেব ভয়ানক বুদ্ধিমান, সে ঐ স্কুল মাস্টারের মত বোকা না, আপনি তার বুদ্ধির সাথে পারবেন না”।

ইউসুফ একদলা থু থু ফেলল ঘাটের পাকা ফ্লোরে। তারপর বলল “ও আচ্ছা, তাই নাকি? ঠিক আছে তাকে যেভাবেই হোক এখানে নিয়া আস। দেখা যাক”।

বলেই ইউসুফ আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে পুকুরের পানিতে নেমে গেল। হাঁটু পানি থেকে কোমর পানি, কোমর থেকে গলা- একসময় পুরো শরীর ডুবে গেল পুকুরের কাল জলে।
ইউনুস কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পুকুরের দিকে তারপর অন্ধকার বাগান বাড়ি থেকে ধিরে ধিরে পা বাড়াল মূল বাড়ির দিকে।

মিসির আলি সাহেব টিনের তৈরি আধাপাকা ঘরের বারান্দায় বসে আছেন। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে টিপটিপ করে। মিসির আলী সাহেবের টিপটিপ বৃষ্টিই খুব পছন্দ। টিপটিপ বৃষ্টির দিয়েছেন অলস বৃষ্টি! বয়সের কারনে তার নিজের গতিও একটু মন্থর হয়ে গেছে- আর সেই কারনেই অলস জিনিস ইদানিং কালে ভাল লাগছে তার। লক্ষন ভাল না।

গ্রামে গ্রামে এখন বিদ্যুতের ছড়াছড়ি, এই বাড়িতেও বিদ্যুৎ আছে। তবে মিসির আলি সাহেব বারান্দার লাইট অফ করে দিলেন। কারন বিদ্যুতের আলোয় বৃষ্টি দেখতে ভাল লাগেনা। কই যেন পড়েছেন চাঁদের জ্যোৎস্না দেখতে হয় খোলা মাঠে আর রাতের বৃষ্টি দেখতে হয় অন্ধকারে বসে! মিসির আলী অনেক চেষ্টা করলেন কথাটা কার মনে করতে কিন্তু পারলেন না। স্মৃতি বেঈমানি কারা শুরু করে দিয়েছে। লক্ষন ভাল না।

বেতের চেয়ারে দুই পা তুলে বসলেন মিসির আলি। হাতে ধোঁয়া উঠা এক কাপ লাল চা। চায়ে একটু লবন দেওয়া, তবে খেতে ভালই লাগছে তার।

মিসির আলি একটা সিগারেট ধরালেন। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তারপর হঠাৎ একটা কবিতার দুই লাইন আবৃতি শুরু করলেন “আয় বৃষ্টি ঝেপে, ধান দিব মেপে”    এই দুই লাইনই উনি আবৃতি করতে থাকলেন।
মিসির আলী এই পুরা কবিতাটা মুখস্থ পারেন, তার স্মৃতি শক্তি ভাল। তবুও কেন তিনি শুধু এই দুই লাইন আবৃতি করছেন তা বুঝতে পারলেন না।

এই অজপাঁড়া গাঁয়ে এসেছেন একটা বিয়ের দাওয়াতে, কিন্তু শহরে ফেরার আগেই বৃষ্টি শুরু। রাস্তায় পানি উঠে যাওয়ায় বাস চলাচল বন্ধ, তাই শহরে ফিরতে পারেন নি। বিয়ে বাড়িতে অনেক লোকজন। তাদের থাকার বেবস্থা হল প্রতিবেশিদের বাড়িতে। মিসির আলীর দায়িত্ব পড়ল ইউনুস সাহেবের ঘাড়ে।

ইউনুস সাহেব একজন অবস্থা সম্পন্ন মানুষ। গঞ্জে বিরাট দোকান পাট আর গ্রামে তো জমিজমার অভাব নাই। সব অবস্থা সম্পন্ন মানুষের মধ্যে যেমন একটু অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায় ইউনুস সাহেবও তার বেতিক্রম নন। পঞ্চান্ন বছরের এই লোকটি কখনই মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারেন না!

এটা নিজে মিসির আলী একটা লজিক দাঁড় করেছেন। হতে পারে এই লোকটির পুরানো পাপ আছে মনে, তার ভয় হয় তার চোখের দিকে তাকালে সবাই বুঝে ফেলবে যে পাপটা উনিই করেছেন!
ইউনুস সাহেবকে নিয়ে এইধরনের চিন্তা করেছেন বলে মিসির আলী একটু লজ্জিত হলেন। ইউনুস লোকটা যথেষ্ট অমায়িক এবং মিশুক।

মিসির আলির সিগারেট শেষ হয়ে গেল, তিনি আবার একটা সিগারেট ধরালেন। চায়ের খালি কাপটা মেঝেতে রাখলেন। তারপর ঘড়ি দেখেলেন, রাত ৯ টা। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে অবিরত। ইউনুস সাহেব মিসির সাহেবের ফরমাশ খাটার জন্য পাশের বাড়ির একটা ছেলেকে ডেকে এনেছেন। ছেলের নাম মতিন। তবে মতিন এই মুহূর্তে বারান্দার মাটিতে বিছানা পেতে শোয়ার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে চলে গেল। গ্রামের মানুষ খুব দ্রুত ঘুমাতে পারে। মতিন ঘুমে বিছানায় কাত হয়ে ফোঁস ফোঁস করে ঘুমাচ্ছে। ঘুমন্ত মানুষের দিকে তাকাতে ভাল লাগে মিসির আলির। কারন সেই সময় মানুষের মুখ থেকে সকল দুশ্চিন্তা সরে গিয়ে স্বর্গীয় আবেশ চলে আসে। মিসির আলি পরম মমতায় তাকালেন মতিনের দিকে। পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ছেলেটা।

মিসির আলি ঠিক করলেন ইউনুস সাহেবকে বলে একে মিসির আলি ঢাকায় নিজের কাছে নিয়ে যাবে। তিনি ছেলেটিকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবেন। তবে ছেলেটির পড়াশোনায় আগ্রহ একেবারে কম। গ্রামের স্কুলে যায় মাসে দুই তিন দিন, এখনো সে ক্লাস টু পাশ দিতে পারে নাই। সে গত ৪ বছর ক্লাস টু তে, এটা নিয়ে সে গর্বিত। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়-“কিরে মতিন কোন ক্লাসে পড় তুমি??”
মতিন অনেক গর্ব করে উত্তর দেয় “ কেলাশ টু তে পড়ি”!!
সে ফেল করবে তবু স্কুল ছাড়বে না, আবার স্কুলে নিয়মিত যাবেও না।

এমন সময় ইউনুস সাহেব বারান্দায় ঢুকলেন। লোকটা পুরোপুরি ভিজে গেছেন। মিসির আলী একটু অবাক হলেন কারন ইউনুস সাহবের হাতে একটা প্রায় নতুন ছাতা আছে! তবে মিসির আলি কিছু বললেন না। শুধু চেয়ার থেকে পা নামিয়ে বসলেন।

“স্যার, আপনে বসেন, পা নামানোর দরকার নাই”,বললেন ইউনুস সাহেব।
মিসির আলি একটু বিব্রত বোধ করলেন, এই বয়সের একজন মানুষ তাকে স্যার বলে ডাকে এটা শুনতেও একটু অন্যরকম লাগে।

মিসির আলি মৃদু হেসে বললেন- সমস্যা নেই। আপনি যান, কাপড় চেঞ্জ করেন, ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
ইউনুস সাহেব ভিতরে চলে গেলেন, মিসির আলি আবার পা উঠিয়ে আরাম করে বসলেন।

একটা মজার ব্যাপার হল ইউনুস সাহবের এত বড় বাড়িতে শুধু ইউনুস সাহেব একা থাকেন। বিয়ে করেছিলেন তবে বউ বিয়ের দুই মাসের মাথায় চলে যায় আর ফেরত আসেনি, ইউনুস সাহবও বিয়ে করেন নি। পাশের বাড়ি থেকে মতিনের মা এসে রান্না করে দিয়ে যায়। এত বড় বাড়িতে ইউনুস সাহব কিভাবে থাকেন তা ভাবতেই একটু অবাক হলেন মিসির সাহেব। কোথায় যেন একটু অস্বাভাবিকতা আছে একটু। মন বলছে “ সাবধান, মিসির আলি সাবধান”!!

রাত ১০ টা।
সামনা সামনি দুইটা বেতের চেয়ারে বসে আছেন মিসির আলি আর ইউনুস সাহেব। যথারীতি ইউনুস সাহবের চোখ নিচের দিকে। পাশে এখনো মতিন ঘুমাচ্ছে বেঘোরে। বারান্দায় দুটা পাঁচ টাকা দামের মোম বাতি জ্বলছে। বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে ধিরে ধিরে। বাতাসে মোমের শিখা তিরতির করে কাঁপছে। বারান্দায় গভির নিস্তব্ধতা ভর করেছে।

মিসির আলি একটু অস্বস্থি বোধ করলেন। শেষে তিনি নিজেই নিরবতা ভংগ করলেন- আপনাদের গ্রামটা অনেক সুন্দর। আমার ভাল লেগেছে।
ইউনুস সাহেব চোখ তুলে একটু মিসির সাহেবের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেললেন। বললেন- জ্বী, ঠিক বলেছেন স্যার।

আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল, মিসির আলি সাহেব এবার সত্যি সত্যি অস্বস্থিতে পড়ে গেলেন। তবে এইবার নিরবতা ভংগ করলেন ইউনুস সাহেব- “স্যার, আমি আপনার কথা অনেক শুনেছি, আপনি অনেক বিজ্ঞলোক এটা আমি জানি। আমার একটা সমস্যা আছে।
মিসির আলি এবার নড়ে চড়ে বসলেন, একটা বেনসন ধরালেন তিনি। তারপর বললেন- হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন। আমি শুনছি।

ইউনুস সাহেব একটা পুরাতন ছবি দিলেন মিসির আলিকে। তিনি ছবিটা নিয়ে মোমের আলোতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। একজন যুবকের সাদাকাল ছবি। চেহারায় কিছুটা কাঠিন্য আছে যা ইউনুস সাহেবের চেহারায় অনুপস্থিত।

ইউনুস সাহেব মাটির দিকে তাকিয়ে শুরু করলেন- এটা আমার বড় ভাইয়ের ছবি। আজ থেকে ঠিক বত্রিশ বছর আগের, তার নাম ইউসুফ। আমার থেকে তিন বছরের বড়। আমাদের দুই ভাইয়ের মদ্ধে অসম্ভব মিল ছিল। আমি বয়স তখন বিশ কি একুশ বছর। আমরা দুই ভাই বাপের ব্যবসা দেখাশোনা করি। বাপের বিরাট কারবার ছিল গঞ্জে। রাতের বেলা আমরা দুই ভাই পালা করে দোকানে থাকি। আমার মা অনেক আগেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। বাবা অনেক সখ করে ঐ পাশের বাগান বাড়িটা করেছিলেন।

আমাদের বাড়িতে আমি, আমার ভাই ইউসুফ, বাবা ছাড়াও একজন অন্য মানুষ থাকতো। তার নাম ছিল মনি, আমার এক খালাত বোন। বাপ মা মরা মেয়ে ছিল সে। তাই আমার বাবা ওকে আমাদের বাড়িতে এনে রাখেন। ইচ্ছা মনি বড় হলে তাকে বিয়ে দিবেন। মনির তখন প্রায় সতের আঠার বছর। দেখতে অনেক রুপবতি ছিল মনি। মনি সেই ছোট বেলা থেকে আমাদের বাড়িতে মানুষ, আমরা এক সাথে বড় হয়েছে।

বাবা অনেক দেখে একটা ভাল সমন্ধ ঠিক করলেন মনির জন্য। ছেলেও গঞ্জে ব্যাবসা করে। বিয়ে প্রায় ঠিক তখন।
সে দিন এমন এক বৃষ্টির রাত। আমি গঞ্জের দোকানে। রাতে ঐখানে থাকব। বাইরে অনেক ঝড়। দোকানে আমি একা থাকি। রাতের বেলা সব কর্মচারীর ছুটি থাকে। গঞ্জ থেকে আমাদের বাড়ি প্রায় ৩ কিলো দূরে।
সেই রাতেই মনি আমার বড় ভাই ইউসুফের সাথে পালিয়ে গেল। বুঝলাম ভাইয়ের সাথে মনির মন দেওয়া নেওয়া ছিল অনেক আগ থেকেই।
মিসির সাহেব, আপনি কি আমার কথা শুনছেন?

মিসির আলি তন্ময় হয়ে শুনছিলেন। কিছু প্রশ্ন এসেছে মনে- এই যেমন, ইউনুস সাহেব বললেন যে তাদের দুই ভাইয়ের মদ্ধে অনেক মিল ছিল তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই বড় ভাইয়ের প্রনয়ের কথা তার আগে থেকেই জানার কথা! যাই হোক, মিসির আলি আর প্রশ্ন করলেন না। তিনি একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন- হু, বলেন আমি শুনছি।

মিসির আলির সাড়া পেয়ে ইউনুস সাহেব আবার শুরু করলেন- “আমার বাবা তখন ছেলের জন্য পাগল প্রায় হয়ে গেলেন, আমার বাবা অতি ভাল মানুষ ছিলেন। ভাই যদি বলত যে ও মনিকে বিয়ে করতে চায় তাহলে বাবা নির্দিধায় রাজি হয়ে যেতেন কোন ভুল নাই। বাবা তখন ব্যাবসা বাণিজ্য পুরা ছেড়ে দিলেন। সারাদিন বাগান বাড়িতে থাকেন একা একা। আমি তখন ব্যবসা চালাই। আমরা অনেক জায়গায় লোক পাঠিয়েছি তাদের খোঁজে কিন্তু ওদের পাইনি কোথাও। এভাবে প্রায় বছর খানেক চলে গেল।

একদিন সন্ধ্যায় বাবা আমাকে বাগান বাড়িতে ডেকে বললেন, “আমি সপ্নে দেখেছি তোর ভাই আর মনি আর এই দুনিয়াতে নাই। ওরা দুজন আমাকে ডাকছে। আমার সময় বুঝি শেষ হয়ে গেলরে বাপ”, বলে কান্নাকাটি শুরু করলেন।
আমি তেমন গুরুত্ব না দিয়ে দোকানে চলে গেলাম। পরদিন সকালে বাবার মৃত দেহ পাওয়া গেল বাগান বাড়ীর পুকুরে! রাতের বেলা যে কোন কারনে হোক বাবা পুকুরে নেমেছিলেন তারপর আর উঠে আসতে পারেন নি।

মিসির আলি এইবার একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলেন না- “কোন থানা পুলিশ হয়েছিল?
ইউনুস সাহেব একবার চোখ উঠিয়ে আবার নামিয়ে ফেললেন। বললেন- আসলে তখন তো থানা এত কাছে ছিল না, পুলিশে খবর দিতে অনেক সময় লাগত, তা প্রায় আট দশ ঘণ্টার পথ ছিল সেটা। তাই গ্রামের ইমাম সাহেব সহ আমরা লাশ দাফন করে দেই। জানেন তো মৃত দেহ বেশি সময় মাটির উপরে রাখা ঠিক না, এটা মৃতের আত্মা কষ্ট পায়।

মিসির আলি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিলেন, বললেন- হুম সেটা জানি। আচ্ছা ঐ ইমাম সাহেব কই আছেন এখন যিনি আপানার বাবাকে দাফন করেছিলেন?

ইউনুস সাহেব বললেন- ঐ ইমাম ভিনদেশি মানুষ ছিলেন, ওনার বাড়ি ছিল রংপুর, তিনি একদিন রাতে কাউকে কিছু না বলে চলে যান, ওনার বাড়ির ঠিকানা আমাদের কারো জানা ছিল না। উনিও আর কোনদিন ফিরত আসেন নি।

মিসির আলি বললেন- আচ্ছা খুব ভাল, তারপর?
ইউনুস সাহেব বললেন- পরপর আমার তিনজন পরিবারের মানুষকে হারিয়ে আমি একটু বিবাগি হয়ে যাই। ব্যাবসা বাণিজ্য ছেড়ে দেই কর্মচারীদের উপর, আমিও বাবার মত ঐ বাগান বাড়িতে আশ্রয় নেই। সারাদিন সারারাত ওখানেই থাকতাম। আমার খুব মন খারাপ হতো, আমি বাবা বাবা করে কাঁদতাম। এভাবে কত দিন গিয়েছিল জানি না হটাৎ এক গভির রাতে আমি বাগান বাড়ির বারান্দায় বসে ছিলাম। তখন শীত কাল। বাইরে তখন ঘন কুয়াশা, কুয়াশার কারনে আকাশের চাঁদ দেখা যায় না ঠিক মত। আমি কাঁদছি। হঠাৎ দেখি সেই কুয়াশা ভেদ করে একজন মানুষ এসে দাঁড়াল আমার সামনে। অন্ধকার আর চাঁদের আলোর লুকচুরির কারনে লোকটাকে বুঝা যাচ্ছে না, তবে এটুকু বুঝতেসি লোকটির সারা শরীর পানিতে ভেজা!

আমি অবাক হয়ে গেলাম, কারন এ দিকে শীত অনেক বেশি পড়ে আর এই শীতের রাতে কেউ একজন খালি গাঁয়ে মাত্র একটা লুঙ্গি পরে থাকতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করার মত না।
আমি বললাম- কে? কে ওখানে?
লোকটা জবাব দিল- আমি তোর বড় ভাই ইউসুফ, তুই আমার সাথে আয়। বলে লোকটা উল্টো হাঁটা দিল। আমার মনে তখন অনেক আনন্দ! আজ এত বছর পরে আমার ভাই এসেছে!! ভাইকে পাবার আনন্দে তখনকার অস্বাভাবিক ব্যাপার গুলো চোখে পড়ল না। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত হাঁটা ধরলাম ভাইয়ের পিছে পিছে।

দেখি আমার ভাইটি বাগান বাড়ির গাছের ফাক দিয়ে আস্তে আস্তে পুকুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমিও গেলাম। দেখি ভাই আস্তে আস্তে হিম শীতল পানিতে গলা পর্যন্ত নেমে গেল। আমি পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম।
আমার ভাই তখন আমাকে বলল- “ইউনুস, আমি ফিরা আসছি।

আমি বললাম- ভাই এদ্দিন তুমি কই ছিলা?
ভাই আমার কথার জবাব না দিয়ে বলল- “ইউনুস, আমি আর মনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার পরে একটা রাস্তায় আমাদের ডাকাত ধরল। তারপর ওরা আমাকে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিল আর মনিকে কোথায় যেন নিয়ে গেল। সেই থেকে আমি পানি ছাড়া থাকতে পারি না। আমি এখন থেকে এই পুকুরেই থাকব।
আমার তখন ভয়ে হাত পা বরফ হয়ে গেছে। আমি একটা ঢোক গিলে বললাম- মরে গেছ মানে কি?
ভাই একটু খন খনে গলায় বলল- মরে গেছি মানে মারা গেছি। ইন্তেকাল করছি। এইবার বুঝচস?

আমার তখন অবস্থা খারাপ। আমি কোনমতে বললাম- আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার যতদিন ইচ্ছে থাকবা। সমস্যা নেই।
ভাই হেসে বলল- তুই ভয় পাইস না, আমি তোর কোন ক্ষতি করব না, তুই শুধু আমি যা যা বলি তাই করবি। এই পুরো বাগান বাড়ির পাশে দেওয়াল তুলে দিবি যেন কেউ না আসতে পারে, আর এই পুকুরের পশ্চিম পাশে একটা পাকা ঘাটলা তুলে দিবি। আমি রাতের বেলা ওখানে বসে আরাম করব। আর শোন আমার কথা কাউকে বলবি না যেন, নাহলে তোর ক্ষতি হবে আর যাকে বলবি তাকে আমি মেরে ফেলব আমার নিজের জন্য। মনে থাকে যেন।

আমি বললাম ঠিক আছে ভাই। তারপর আমি পুরো বাগান বাড়ির চারপাশে দেওয়াল তুলে উপরে কাচের টুকরা দিয়ে দেই। আর একটা সুন্দর শান বাঁধানো পাকা ঘাটলা তৈরি করে দেই।
মিসির আলি এবার একটু নড়ে বসলেন। হুম। খারাপ না। ভাল একটা গল্প। যদিও অনেক ফাক ফোঁকর আছে। তবুও গ্রামের একজন সামান্য ব্যাবসায়ি এত সুনিপুনভাবে গল্প ফাঁদতে পারেন তবে বলতে হবে লোকটির মেধা অনেক!
মিসির আলি বললেন- আপনি এই ঘটনা কাউকে বলেছিলেন?

ইউনুস সাহেব বললেন- হু, একজনকে বলেছিলাম, আমাদের গ্রামের স্কুলের অঙ্কের মাস্টার, উনি বললেন ঠিক আছে আমি একরাত পুকুর পাড়ে থাকব, পরদিন সকালে অনাকে মৃত অবস্থায় পুকুরের পানিতে ভাসতে দেখা যায়।
মিসির আলি বললেন- তো আপনি আমার কাছে আসলে কি চাচ্ছেন?
ইউনুস সাহেব একটু কেশে নিলেন। তারপর বললেন- দেখেন মিসির সাহেব, আমি গ্রামে থাকতে পারি কিন্তু আমি বি এ পাশ করেছিলাম সেই সময়ে। আমি দেশি বিদেশি লেখকের অনেক বই পড়ি, সেই সুবাদে আপনারও কয়েকটা বই পড়েছি। আমি জানি আমার ধারনা আমি ঐ পুকুর পাড়ে এক ধরনের হেলুসিনেশান হয়।
হঠাৎ যেন ইউনুস সাহবের গলা কেঁপে উঠল- আমি চাই আপনি আমার এই রোগের চিকিৎসা করে দিবেন, আমি সুস্থ হতে চাই!

মিসির সাহেব কিছু বললেন না। তার মাথায় অনেক কিছু চিন্তা চলছে।
তারপর মিসির সাহেব বললেন- ঠিক আছে, আপনি ঘুমান। আমি কাল ঐ বাগান বাড়িটা দেখব আর কাল রাতে আমি ওখানে থাকব।

পরের দিন মিসির আলির অনেক ব্যস্ত একটা দিন গেল। সারাদিন বৃষ্টি ছিল। তবুও উনি সেদিন গ্রামে মসজিদে গেলেন। মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে কথা বললেন। গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষের সাথে কথা বললেন। দুপুরে গেলেন থানায়। চেষ্টা করলেন কিছু তথ্য জোগাড় করার। একটা অদ্ভুত তথ্য পেলেন তিনি- বাগান বাড়ির ঘাটলা বানানোর জন্য মাত্র একজন লোক রেখেছিলেন ইউনুস সাহেব! আর ঐ লোকটিও ঘাটলার কাজ পুরোপুরি শেষ হবার আগে মারা পড়ে, তার লাশও পাওয়া যায় ঐ পুকুরের পানিতে! এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেন ইউনুস সাহেব গোপন করলেন বুঝতে পারলেন না মিসির আলি।

বিকেলে যখন ইউনুস সাহেবের বাড়ি ফিরলেন তখন মিসির সাহেব পুরা কাক ভেজা হয়ে গেছেন। শরীর গরম হয়ে আসছে। জ্বর জ্বর ভাব।
ইউনুস সাহেবও জ্বরে পড়েছেন। প্রায় একশ দুই ডিগ্রির মত।
মিসির আলি একটা ফ্লাক্সে কিছু চা আর এক প্যাকেট বেনসন নিয়ে ইউনুস সাহেবকে বললেন “আমাকে আপনার বাগান বাড়িতে রেখে আসুন, আমি আজ রাতে ওখানে থাকব”।

ইউনুস সাহেব মিসির আলিকে বাগান বাড়িতে নিয়ে গেলেন। মূল ফটকে বিশাল লোহার গেট। গেটে এত বড় এক তালা। সেই তালা খুললেন ইউনুস সাহেব। মিসির আলি অবাক হয়ে দেখলেন গেটের চাবি ইউনুস সাহেবের কোমরে একটা কাল সুতা দিয়ে আটকানো, এবং সেখানে মাত্র একটাই চাবি! বুঝতে পারলেন এই চাবি তিনি এক মিনিটের জন্যও হাত ছাড়া করেন না।
মিসির আলিকে বাগান বাড়িতে রেখে ইউনুস সাহেব চলে গেলেন বাড়িতে। যাওয়ার সময় মিসির আলি খেয়াল করলেন ইউনুস সাহেব জ্বরে কাঁপছেন।

রাত আটটা।

মিসির আলি পুরা বাগান বাড়ি দেখা শেষ করলেন মাত্র। এত বড় বাগান বাড়িকে পুরা মৃত নগরির মত মনে হচ্ছে। অনেক আগাছা আর শুকনো পাতায় ভরে আছে জায়গাটা। কতগুলো দিন এখানে মানুষের আনাগোনা নেই ভাবতেই একটু বিস্ময় অনুভব করলেন তিনি।
আকাশে এখন কাল মেঘের খেলা। এই আসছে এই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আকাশের মেঘ ফুঁড়ে পূর্ণিমার চাঁদ উকি মেরেই আবার লুকিয়ে যাচ্ছে।

মিসির আলি আগে থেকেই একটা ছাতা আর একটা চেয়ার নিয়ে রেখে আসেছিলেন পুকুর পাড়ে, শান বাঁধানো ঘাটলার ঠিক অপরপাশে।
মিসির আলি পুকুর পাড়ে গিয়ে চেয়ারে বসলেন। কাঁধের উপর ছাতাটা ফেলে এক কাপ চা নিলেন। চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরালেন।
বর্ষাকালে চারপাশে বেঙের ডাকে মুখরিত থাকে, তবে এই পুকুরে কোন বেঙ-এর ডাক শুনতে পাচ্ছেন না তিনি। অবাক করা বিষয়! ব্যাপারটা কেমন ভৌতিক মনে হল।
মৃদু হেসে দিলেন মিসির আলি। তিনি ভূতে ভয় পান না, তবে সাপ খোপে ভয় পান। তাই তিনি মাটি থেকে চেয়ারে পা তুলে নিলেন। শুরু হল অপেক্ষার পালা। তিনি কোন আলো জ্বালাননি। শুধু পকেটে একটা ছোট টর্চ রেখেছেন।

ইউনুস সাহেবের ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছেন মিসির আলি। তিনি একটা সাধারন মানসিক রোগে ভুগছেন। এই রোগের রোগিরা নিজেদের চারপাশে এক ধরনের আলাদা জগত তৈরি করে নেয়। সে জগতে দ্বিতীয় কোন সত্ত্বার প্রবেশ নিষিদ্ধ।
যে খুন গুলো হয়েছে এই পুকুরে সেগুলো একদিক থেকে দেখলে খুবই সাধারন খুব হতে পারে, এতে কোন রহস্য নাই।

যেমন স্কুল মাস্টার খুব সাধারন একজন মানুষ ছিলেন, পরকালে ভয়ানক বিশ্বাস করেন তিনি। এই তথ্যগুলো মাস্টার সাহেবের বাড়ির লোকজন থেকে জেনেছেন মিসির আলি। হয়ত ইউনুস সাহেবের গল্প তার মনে দাগ কাটে, রাতে এই নির্জন বাগান বাড়িতে বেড়াতে এসে তিনি হেলুসিনেশানের জন্য কিছু একটা দেখেন। তারপর পুকুরে লাফিয়ে পড়েন। মাস্টার সাহেব সাঁতার জানতেন না, তাই সহজেই মারা যান।

ইউনুস সাহেবের বাবার ক্ষেত্রেও একই ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। বৃদ্ধ মানুষ ছিলেন উনি তার উপরে পুত্র শোক। তাছাড়া অনেকদিন একা একা এই নির্জন বাগান বাড়িতে থাকার কারনে উনিও একধরনের মানসিক সমস্যায় পড়েন।
মসজিদের হুজুর হয়ত সত্যি সত্যি দেশের বাড়ি চলে গেছেন।

ইউনুস সাহেবের এই রোগ সারাতে হলে প্রথমে প্রমান করতে হবে যে তার ধারনা ভুল, তিনি কোন মৃত ভাইকে দেখেননি। কাল সকালে যখন মিসির আলি অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরবেন তখনই একমাত্র তাকে বিশ্বাস করান যাবে।
মিসির আলির এই একটা গুন খুব ভাল, সব সমস্যা আগে সবচাইতে সহজ সমাধান ধরে উনি শুরু করেন। সহজ সমাধান থেকে আস্তে আস্তে জটিলের দিকে যান, এভাবে শুরু করলে কোন পয়েন্ট মিস করবার সম্ভাবনা কম থাকে।

রাত অনেক হল। প্রায় একটা বাজে। মিসির আলি বসে থেকে থেকে কোমর ব্যাথা করে ফেলেছেন। তিনি একটু নড়ে বসলেন। বৃষ্টি অবিরাম ঝরছে, টিপ টিপ শব্দে। পুকুরের পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে এক চমৎকার শব্দ করছে। মিসির আলি মুগ্ধ হয়ে শুনছেন সেই শব্দ।

এমন সময় পুকুরের পানিতে কিছু একটা আলোড়নের শব্দ শোনা গেল, মিসির আলি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন পুকুরের দিকে। কই? নাতো কিছু না, হয়ত কোন বড় মাছ শব্দ করেছে। মিসির আলি ভাল করে খেয়াল করলেন। এই তো এই তো কিছু একটা নড়ছে পুকুরের ঠিক মধ্যখানে! অন্ধকারে ভাল বুঝা যাচ্ছে না।
জিনিসটা আস্তে আস্তে শান বাঁধানো পুকুরের ঘাটলার দিকে এগিয়ে আসছে! মিসির আলি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না!
কেউ একজন মিসির আলির মাথার ভিতর থেকে আর্তনাদ করে চিৎকার করে বলে উঠল- পালাও, মিসির আলি পালাও!!

দ্বিধা

4

দিনটি মঙ্গলবার।

শীতের রাত।

সময় রাত আটটা কি নয়টা।

আতাহার দোকান থেকে কলম কেনার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। বের হওয়ার সময় দেখে আসে যে তার বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন। দোকান টা ছিল বাসা থেকে বেশ খানিক টা দূরে। রাস্তাঘাট ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং জনমানবহীন। কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তাতে কিছুই ভালভাবে দেখা যায় না। হঠাৎ আতাহার খেয়াল করল একটি লোক দাড়িয়ে আছে যার অবয়ব ঠিক তার বাবার মত। চমকে গেলো সে। যে ব্যক্তিটিকে সে কিছুক্ষন আগেও বাসায় শুয়ে থাকতে দেখে এসেছে, তিনি কিভাবে এত তাড়াতাড়ি এখানে চলে আসলেন? কৌতুহল বসত সে লোকটির সামনে গেলো। সামনে গিয়ে সে আরো চমকে গেলো যখন সে দেখলো লোকটি তার বাবাই।
স্বভাবতই সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,
– আব্বু তুমি কখন বের হয়েছো?

কিন্তু, ও দিক থেকে কোনো সাড়াই সে পেলোনা।

একই প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞেস করার পরও আতাহার যখন কোনো উত্তর পেলোনা তখন তার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হল। নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা আছে। সে মনে মনে খুব ভয় পেয়ে গেলো। সে দ্রুত স্থানটি ত্যাগ করে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। বাসায় গিয়ে সে আরও আশ্চর্য হল। সে তার বাবাকে যে অবস্থায় দেখে গিয়েছিলো সেই অবস্থাতেই আছেন। আতাহার তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো,
– তুমি কি বাসা থেকে বের হয়েছিলে?

তার বাবা বলল,
– না, কিন্তু কেনো?

তখন আতাহার বিষয়টি খুলে বলল। সবাই এ ঘটনা শুনে অবাক হল। বাস্তবিক অর্থে বিশ্বাসযোগ্য নয় এমন একটা ঘটনার সম্মুখিন সে আর কখনো হয় নি। সে এর উত্তর এখনও খুঁজে বেড়ায়।