কালীর আখ্যান

1

ছোট বেলায় ভৌতিক সব কল্পকথা শুনতে সবারই ভাল লাগে। আমিও তার বাতিক্রম ছিলাম না। এখন যে ঘটনাটি Share করবো তা আমার বড় চাচার মুখে শোনা তার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প।

আমার চাচার নাম ফজল ব্যাপারী। তিনি গ্রামের সাধারণ হাঁটুরে। তিনি প্রতি শনিবার হালুয়াঘাট বাজার থকে বাঘাইতলা হেঁটে যেতেন।

সকাল সকাল যেতেন ফিরতেন অনেক রাত করে।

হাট শেষে ফিরছেন বাড়ির দিকে। গুণগুণ করতে ভালবাসেন তিনি বেশি ভালবাসেন তিনি গলা ছেড়ে গাইতে।

ধবল জ্যোৎস্না পুরো আকাশে শরতের আবীর। ধবধবে জ্যোৎস্নায় মানুষের ছায়ায় যেন অবিকল আরেকটি প্রানবন্ত মানুষ ভেসে বেড়ায়।

গামছায় বাধা চিড়া, বাম কাধে সাগর কলার ছড়ি। হাতে মহিশের দই আর আনাজ পাতির বাগ।

মাটির রাস্তাধরে হাটছেন, ধুলো উড়ে আসছে পিছে পিছে, হঠাৎ হঠাৎ জোনাক পোকার মিছিলও দেখা যাচ্ছে।

কাঁচা রাস্তা ছেড়ে ধান ক্ষেতের বাঁক পেরুলেই গ্রাম আর সেখানেই বাড়ি আমদের।

বড়চাচা সেদিকটা দিয়ে।

হঠাৎকরে তিনি খেয়াল করলেন লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি পড়া একজন তরুণী ধানক্ষেতের মাঝের আইল ধরে হাঁটছেন পেছনদিক থেকে দেকছিলেন তিনি হাতে কাসার বাটি ও থালা ছিল।

আলতা পরা পায়ের আলতা থেকে ঘাসে লাল রক্ত চুয়ে পড়ছে। ধবল জ্যোৎস্নায় তিনি চোখ কচলাতে শুরু করলেন একি ভ্রান্তি নাকি অন্যকিছু?

আকাশ থেকে রুপালি জ্যোৎস্না এসে মাতিতে মিশছে। জ্যোৎস্নার কারসাজি যেন ফযল সাহেবের কল্পনার জগৎকে প্রভাবিত করছে। চোখ থেকে হাত সরিয়ে দেখতে পেলেন বীভৎসতা কি জিনিস।

hindu-goddess-mother-kali

কালী

মায়াময় মোহিনীর অগ্নিমূর্তি ঘুরে দাঁড়িয়েছে সেই রমণী, সামনা সামনি এখন দুজন। বস্ত্র খুলে ফেলেছে সেই চতুরীনি চুলগুলো আওলাঝাওলা। রক্তাক্ত লাল জিভ বের হয়ে এসেছে। দুহাতে সাদা শাখা। বিবস্ত্র দেহ। পায়ে রুপার খাড়ু। হাতের নখ গুলো দশ ইঞ্চি। নিজের পেটের নাড়ি ভুরি নিজেই টেনে ছিড়ে খাচ্ছে। লোহিত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে নিতম্ব বেয়ে। এসব দেখতে দেখতে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন আমার চাচা।

পরের দিন সকালে তাকে ধানক্ষেত থকে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে আসে সিরাজ ভাই।

আমার চাচা যতবার এ গল্প শুনিয়েছেন আমাদের ততবারই অজানা আতঙ্কে মুখ বিবর্ণ হয়ে এসেছে। তার এ অভিজ্ঞতার নাম দিয়েছেন কালীর আখ্যান।

 

গল্পটি কেমন লাগলো Comments করে জানাতে ভুলবেন না। আপনাদের মন্তব্যই আমার লিখাকে আরও তরান্বিত করবে। ধন্যবাদ।

বারান্দার ওপাশে ॥ পরিশিষ্ট ॥ Collected Story

2

পরিশিষ্ট

…নিশির জ্ঞান ফিরল পরদিন সকালে। বাম হাতের কব্জিতে একটা ফ্রাকচার হয়েছিল।

সুবর্ণাকে রাতেই মৃত ঘোষনা করেছিল ডাক্তার। হাসাপাতাল থেকেই ওর স্বামীকে ফোন করে মোটামুটি সব খুলে বলতে বললাম দাড়োয়ানকে। দাড়োয়ান ওনাকে চিনতো, তাতে কাজটা আরেকটু সহজ হলো। আমিও কথা বললাম।  ফোনের সেই গালিবাজ ভদ্রলোকটিকে আসলেই অতি নিরহ ভদ্রলোক বলেই মনে হলো। তখন যে আমি কল করেছিলাম সেটা আর বললাম না। ওনার কাছে সেটা রাসেল ছিল , তাইই থাক।

আসফাক সাহেব শুনেই রওনা দিয়ে দিলেন। ঐ সেই রাতে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার পরদিন প্রত্যুষে তিনি ব্যবসার কাজে চট্রগ্রাম গিয়েছিলেন। বুঝলাম সেদিন সকালে তাহলে যাকে দেখেছিলাম সেই তাহলে হারামীর বাচ্চা রাসেল।

জ্ঞান ফিরে পেয়েই পুলিশের কাছে জবান বন্দী দেয়ার আগেই নিশির হাতদুটো ধরে পাশে বসে শুনলাম সেই রাতের অজানা ঘটনার আদ্যপান্ত।
…চ্যাঁচাম্যাচি শুনে সে বারন্দায় ছুটে গিয়েছিল। তখনও বৃষ্টি নামে নি। মেঘ করেছিল। কালো মেঘের সাথে কালো সন্ধ্যাও নেমেছিল সবে। বাবার বাড়ী যাবার জন্য রেডি হচ্ছিল নিশি। নিচে নেম ড্রাইভারকে বলতে যাবে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে আনতে ঠিক তখনই  কৌতূহল মেটাতেই তার বারান্দায় যাওয়া আর  সেই কৌতূহলই হলো কাল।

রাসেল যখন গলা চেপে ধরল সুবর্ণার- নিশি দেখে ফেলল । ঢলে পড়ছিল সুবর্ণার দেহটা। ও পাশে নিশির অবাক চেহারটা এড়ালোনা রাসেলের । সুবর্ণার দেহটা মুহূর্তে ছূড়ে ফেলে ছুটে এলো এই বারান্দার উপর। রাসেলের বারান্দার খাঁজ বেয়ে উপরে ওঠার সময়ই নিশি হতভম্ব হয়ে পড়ে। কণ্ঠ কাঁপছিল, দাড়োয়ানের নাম ধরে ডাকবে অথচ মুখ দিয়ে স্বর বেরোচ্ছিলনা ভয়ে। হারামীটা গায়ে হাত দিতেই জ্ঞান হারায়। চিৎকার করার অবকাশই পায়নি সে। তারপর তো বোঝাই যায়। দুই নারীর দেহদুটো মাটি চাপা দিয়ে পালিয়েছে হারামী টা। দাড়োয়ান তখন নিচে ঘরে বসে ঝিমাচ্ছিল। কিছূই টের পাওয়ার কথাও না। কারন দরজা থেকে বারান্দা তো দেখাই যায়না।
নিশিকে জিজ্ঞেস করেও জানা গেলো না হাতটা ভাঙল কেমন করে? সম্ভবত বারান্দা থেকে নিচে নামার সময়ই হাতে আঘাত লেগে থাকতে পারে।
দাড়োয়ান সব শুনে খুব লজ্জিত হলো। কেঁদেও উঠলো। নিশির বাবা আর বড় এসে দাড়োয়ানকে খুব বকেছেন।

পুলিশকে আমিই ফোন করেছিলাম নিশির জ্ঞান ফেরার পর। বিশ্বাস করাতে দেরী হয়নি। আসফাক সাহেবও চলে এসেছেছিলেন। খুব ভেঙে পড়লেও তার চেহারায় অন্য রকম একটা প্রশান্তি আমি ঠিকই দেখেছিলাম। নিশির বাবার পরিচয় পেয়ে পুলিশের বিশ্বাস খুব সহজেই এসেছিল। এটা পৃথিবীর নিয়ম , ক্ষমতার একটা দাপটতো থাকেই। ঐ দিনই সুবর্ণার মোবাইল সীম থেকে রাসেলের ফোন নম্বর খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।  পুলিশ অফিসার কথা দিলেন চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই ব্যাটাকে ধরা যাবে। শুনে অবশ্য আস্বস্ত হবার মত কিছু পেলাম না। নিশির জীবন সান্নিধ্য আর নিজেক অসাধারণ ভাবার সুখেই আমি বিভোর তখন।

নিশির ডান হাতটা  মুঠোয় নিয়ে হাসপাতালে বসেই মনস্থির করলাম বারান্দার ওপাশে ঐ উপরে ওঠার গোপন পথের খাঁজগুলো আজকেই ভেঙে ফেলব, আজকেই।

বারান্দার ওপাশে ॥ তিন ॥ Collected Story

2


কানে থপথপ শব্দের অস্তিত্ব এখনও স্পষ্ট। মন অস্থির হয়ে উঠলো হঠাৎ। নিশি নেই। কুসংস্কার মনে করিয়ে দেয়ার মত কেউ নেই। এই সুযোগ, সময়টাও ভালো কাটবে। যায়ই না একটু, ওমন নিশীথ কাঁপানো ভুতুড়ে শব্দের উৎস খুঁজে দেখেই আসি। একবার ভাবলাম দাড়োয়ানটাকে ডেকে নেই। না থাক। তারচেয়ে বরং বারান্দার সদ্য আবিঙ্কৃত গুপ্ত পথটাই একটু পরখ করে দেখি। খুব সহজ না হলেও খাঁজ গুলো বন্ধুর মত সাহায্য করল নিচে নেম যেতে। যতই কুসংস্কার মুক্ত হই না কেনো। ভয় আমার ঠিকই করছে এখন। পরিবেশটাই তো ভূতুড়ে। কার না ভয়ে গা ছম ছম করবে ? একদিকে থপথপ আর অন্যদিকে নিশ্চুপ নিশীথের অন্ধকারের ছায়া। গাছের পাতাগুলো দুলছে হালকা বাতাসে। পাতার থেকে পানি ছিটকে আসছে মুখে। ভেজা ভেজা এক আলতো পরশ আনন্দ ত্বকে । মনে আমার অসাধারণ কিছু একটা করার গুপ্ত অভিলাষ। এমন কোন কাজ নয়, তবুও অতি সাধারণ এই আমার কাছে স্বাভাবিকতার প্রচন্ড বিপরীত। থ্রীলভাব তাই ভয়ের চেয়ে বেশী কাজ করতে লাগলো। রহস্য উন্মোচনের এক নেশা তখন প্রাণে। গুটি গুটি পায়ে রাস্তা পেরিয়ে ওপারের দুবিল্ডিংয়ের মাঝে খোলা প্লটটা দিকে এগোলাম। পায়ে কিছুর খোঁচা লাগলো, জ্বলে উঠলো। কাটল বোধহয়। হাত দিয়ে দেখলাম কাঁটা গাছের গুল্ম। টর্চ না নিয়ে বড় ভুল হয়ে গেছে। যাক মোবাইলটা আছে পকেটে। তারই টিমটিমে আলোয় এগোতে লাগলাম শব্দের উৎস ধরে।

ভাঙা একটা চালের এক কোনায় পানি জমেছে। চুইয়ে চুইয়ে সেখান থেকে নিচে পড়ছে একটা বাঁেশর বাঁকা অংশে। বাঁশটা ভেঙে বেঁকে আছে। ভাঙা অংশের ভেতরের অংশটা কোটোরের মত । সেখানে পানি জমছে আর একটা লেভেল পর্যন্ত উঠলেই নলের মত একটা গিঁটের গোড়া বেয়ে টুপ করে নিচে পড়ছে। মোবাইলের আলোটা নিচে ধরতেই চোখে পড়ল সাদাটে কিছু একটা। হাতে উঠিয়ে নিলাম। মোবাইলে সিমকার্ড। পাশেই আরেকটা। দুটোই হাতে উঠিয়ে তালুতে রাখলাম। মাটির উপরে একটা ইটের গায়ে লেগে কাত হয়ে পড়েছিল দুটোই। প্রতিবার যখন নির্দিষ্ট সময় পরপর সেই সিম কার্ডদুটোতে পানির ফোঁটা পড়তেই সীমদুটো লাফিয়ে উঠতে চাইছিল আর বাড়ি খাচ্ছিল ইটের গায়। সবমিলে শব্দটা ওমন থপ থপ ধরনের এক অদ্ভুত হয়ে পৌছে যাচ্ছিল আমার কানে। এখন আর সেই বিচিত্র থপ থপ হচ্ছে না। থেমে গেছে, সিম দুটো আমার হাতের তালূতে । শব্দ যা হচ্ছে তা খুবই স্বাভাবিক পানির পতনের শব্দ মাটিতে।

পুলকিত এক শিহরণ মনে জাগলো আমার। মহা এক রহস্য যেন আমি উন্মোচন করে ফেলেছি। বীর দর্পে আমার নিজের বারন্দার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। সীমকার্ডদুটো দুটো যে হাতেই রয়ে গেছে খেয়াল হলো হঠাৎ। কেনো আনলাম? কেই বা ফেলে গেলো …নষ্ট নাকি? কিন্তু দুটো একসাথে। ভাবনা পূর্ণ হবার আগেই যেনো মনে মনে উত্তর ও চলে এলো। নিশ্চয় কেউ ছিনতাই করেছে কাউকে। তা মোবাইল সেটদুটো (কিংবা এক সেটে দুই সীম ও হতে পারে) নিয়ে যাবার সময় সীমদুটো খুলে ফেলে গেছে। ধরা পড়ার ঝামেলা রেখে লাভ কি? তাই হবে , ঠিকই।

আচ্ছা সীমদুটো টেস্ট করে মূল গ্রাহককে ফিরিয়ে দিলে কেমন হয়। বেচারার এমনেতেই সেট গেছে , সীম দুটো পেলে অন্তত নতুন করে তোলার ধকল থেকে মুক্তি পেত। কিন্তু খুশি না হয়ে যদি আমাকেই ছিনতাই কারী ভাবে, কিংবা যদি চোর…

ভাবতে ভাবতে বারন্দার তলে এসে দাড়িয়েছি। একটু ঘুরে ডানে উঁিক দিলাম, দাড়োয়ানের কোন চিহ্ন দেখা গেলো না নিচের বড় দরজায়। নব আবি®কৃত চোরাই পথ বেয়ে অনেক চেষ্টা করেও বারান্দায় এবার উঠা গেলো না। নামা যত সহজ হয়েছিল ওঠাটা আমার জন্য অত সহজ হচ্ছে না। অভ্যেসের ব্যাপার আসলে।

বাধ্য হয়ে দরজার সামনে গিয়ে হাজির হলাম। বড় দুটো তালা ঝুলছে। এ বাড়িতে ১২ টার পড়ে কেউ বাইরে যেতে পারে না আসতেও পারে না। এ বাড়ীর বহুদিনের নিয়ম ওটাই। সেই সুযোগটা কাজে লাগে দাড়োয়ানের । ঘুমাতে কেউ বাধ সাধতে আসে না। আজ আমি এলাম। অবশ্য এ বাড়ীতে লোকই বা আর কয়জন। কে আসবে এত রাতে। দু’তলায় কেবল আমি আর নিশি। নিচতলায় আমার ফুফাতো বোন শিখা আর জামাই আর তাদের ছোট দুটো বাচ্চা। একটার বয়স চার অন্যটার দুই। ওরা অবশ্য ভাড়া দিয়েই থাকে। নিশির নামে বাড়ী তো, আমার আত্মীয় হলেও নিশির কাছে তো ভাড়াটেই। শিখারাও নেই আজ। কক্সবাজার বেড়াতে গেছে। সচারচর লোকজন দেখেছি বর্ষাকালে কক্সবাজার যায়না। অথচ আমার মনে হয় বৃষ্টির সাথে সাগরের মিতালী না দেখলে সাগরের আসল উচ্ছলতা অদেখাই রয়ে যায়।

দাড়োয়ানকে বেশ কয়েকবার ডাকার পর লিকলিকে দাড়োয়ান রূপী লোকটা হাজির হলো। তাকে দেখলে মোটেও দাড়োয়ান মনে হয় না। আমার আপত্তি করার অবশ্য কারন ছিলনা, কারন নিশির বাবাই তাকে পাঠিয়েছিলেন, ওনার খুব বিশ্বস্ত। চোখ ডলতে ডলেেত এসে বলল, “স্যার, এত রাতে ? কই গেছিলেন, বাইর হইলেন কেমতে, ম্যাডাম ওনার ডুপ্লি চাবি দিয়ে খুলে দিয়েছিলেন নাকি?”

…ম্যাডাম মানে, ও সন্ধ্যার সময় চলে গেছে না।
‘তাই নাকি স্যার? আমি তো যাইতে দেখি নাই। দুপুরে বলছিল একবার বাইরে যাইব, কিছু ফলমুল কিনে নিয়া আসতে কইছিল, আইনা ও দিছিলাম। তারপর তো আর ডাকেন নাই ।’

ভীষন অবাক হলাম। অজানা শংকায় কেঁপে উঠল বুকের বাম পাশ।
‘তুমি ঠিক বলছ তো?’ তাপর একটু সুস্থির হবার চেষ্টায় বললাম,‘ তুমি কি বিকালে বাইরে টাইরে গিছিলা হয়তো খেয়াল কর, তখন বের হয়ে গেছে হয়তো, যাও , তুমি ঘুমাও , আমি বারন্দা দিয়া নিচে নেমেছিলাম, এই যে এই কার্ডদুটো পড়ে গিয়েছিল। বারান্দা দিয়ে যে নামা যায়  তুমি নিশ্চয় জানো  না, খেয়াল রোখা , খুব সহজেই ওঠা নমা যায়। খাঁজ গুলো ভেঙে দেবো আগামী শুক্রবার। ম্যাডামরে কিছু বল না।  ’

‘জি স্যার।’

উপরে সিড়ি ভাঙতে ভাঙতেই আবার ফোন দিতে লাগলাম নিশির নম্বরে। রিং হচ্ছে না। বন্ধ বলছে। আশ্চর্য তো! বিপদ আপদ হলো নাতো কোন? শশুর মশাইয়ের বাসার ল্যান্ড ফোনে কল দেবো নাকি ভাবলাম একবার। আচ্ছা যদি নাই যেয়ে থাকে , ওনাদের এত রাতে টেনশনে ফেলে কি লাভ। কিন্তু নিজের উদ্বিগ্নতা দূর করি কেমনে।

হু হু এক পশলা  বাতাস ঢুকলো খোলা জানালা দিয়ে। নিশির বিশ্বাসে ওটা বিপদ সংকেত ! মনে ভাবনার কত শত কালো রূপ। হাতে ধরা সীম কার্ড দুটোর দিকে তাকিয়ে অন্য এক শংকা জাগতেই টেবিলের ড্রয়ার হতে অব্যবহৃত পুরানো মোবাইল সেটটা হাতে নিলাম। চার্জে দিয়ে একটা সীমকার্ড ঢুকালাম। কল দিলাম আমার নম্বর টিপে। হতবাক! বিমূর্ত মুহুর্তে আমি। এত অবাক আমি বোধহয় আর কখনই হয়নি। নিশির জন্য যে বিশেষ রিং টোন সেট করা সেইটা বাজছে। কি ভীষন রকমের অবাক কান্ড। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি নিশির জন্য ব্যবহৃত বিশেষ নামটা উঠেছে । অব্যবহৃত সেটটা লাল বোতাম চাপতেই আমার নিজের নিজ রাজ্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। এটাতো নিশির মোবাইলের সীমকার্ড। কণ্ঠ দিয়ে বের হয়ে হলো -‘ কি আশ্চর্য!’

সাথে সাথে মাথায় ঘুরপাক খেলো অনেকগুলো কিন্তু … ওখানে গেলো কি করে সীমটা? নিশির কি তাহলে কোন…নাহ্, কিন্তু অন্যটা সীমটা আবার কার। আমার অজ্ঞাত কোন গোপন সীম নিশির? কিন্তু…

কি করা উচিৎ ভেবে পাচ্ছিনা। ভাবতে ভাবতেই অন্য সীমটাও সেটে ঢুকালাম। লাগাবার দেরী নেই, কল চলে এল ঐ নম্বরে। রিসিভ করলাম। তীব্র মেজাজে কথা বলতে লাগল ওপাশে একজন পুরষ মানুষ। অনেকগুলো কথা কানে এলো দ্রুত, অনঢ় শুনে গেলাম কিছুক্ষণ। আমার মুখে দিয়ে হ্যালো ছাড়া আর কোন শব্দ উচ্চারিত হলো না। ওপাশের বক্তব্য হতে মোটামুটি বুঝলাম মোবাইল সীমটি সুবর্ণা নামে কোন এক মহিলার। যিনি ফোন করেছেন তিনি ঐ সুবর্ণার স্বামী মহাশয়, ওনার নাম আসফাক। অনেকক্ষণ ধরে ট্রাই করে পাচ্ছেন না বলেই তার এই তীব্র মেজাজ। তিনি ভেবেছেন আমি তার বউয়ের পরকীয়া প্রেমিক-রাসেল। যে প্রেমিকের খবর তিনি সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন। প্রেমে মক্ত হয়ে সুবর্ণা মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। সুবর্ণাকে দিলাম না দেখে খুব গাল মন্দ শুরু করলেন যখন তখন আমি যেই বলতে গেলাম আপনি ভুল করছেন- শুনুন, তার মুখ দিয়ে চ-বর্গীয় শব্দ বের হতে শুরু করল। আমি অফ করে দিলাম , কেনো জানি মনের ভেতর তখন রাগ আর অস্থিরতা মিশে যাচ্ছিল।

দ্রুত কিছু হিসাব মেলাতে চাইল মন আমার। স্পষ্ট মনে করতে পারলাম, সামনের ডানের দোতলায় ভদ্রলোক সেই রাতে তার বউকে ধমাকনোর সময় সুবর্ণা নামটি উচ্চারণ করছিলেন। উহ্ ! আল্লাহ যা ভাবছি তা যেন নাহয়!
প্রচন্ড উৎকণ্ঠায় বারান্দা দিয়ে নেমে যেতে এবার আর কষ্ট ই হলো না। প্রয়োজনে বাধা তুচ্ছ হয়ে যায়, এটা তারই প্রমাণ। নিচে নেমেই দ্রুত ওপারে সেই শব্দের উৎসে চলে গেলাম এক দৌড়ে। টর্চ আনতে এবার আর ভুল হয়নি। মাথা ভালই কাজ করছে টেনশনেও সেটা বুঝতে পেরে কিঞ্চিৎ পুলকিত হলাম। তারপরই টর্চের আলো ভালো  করে মারতেই দেখলাম কিছূ জায়গার মাটি ওলট পালট হয়ে আছে। তখন কেনো খেয়াল করলাম না? সেখানের গুল্ম লতা ভেঙে পড়ে আছে। দ্রুত হাত দিয়ে কিছু খসানে মাটি আলগা করতেই অনড় অসার হয়ে গেলাম। নিশ্চিত সামনে কেউ থাকলে দেখতো চেহারা আমার পুরো ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। মাত্র চার আঙ্গুল মাটির নিচেই পাশাপাশি দুটো নারীর মুখ। মুখ পুরোপুরি মাটিতে ঢেকেও ছিলনা। আলো আঁধারিতে কেবল বোঝা যাবার মত অবস্থায় ছিলনা কাদামাটি মাথা মুখাবয়ব দুটো।

হাত পা অবশ হয়ে আসতে চাইছে, কি করি বুঝতে পারছি না। গলা দিয়ে স্বরও বেরোচ্ছেনা। দাড়োয়ানকে ডাকতে হবে , ডাকতে পারছিনা। অগত্যা  রাস্তা পার হয়ে আমার বাড়ীর দরজায় ধাক্কাই দিলাম গোটাকয়েক। দাড়োয়ান উঠে এলো। না ব্যাটার ঘুম পাতলা আছে। হাতের ইশারায় দরজা খুলে আসতে বললাম। পুরো শরীর কাঁপছে আমার। দাড়োয়ান পিছে পিছে আসতে থাকলো , মুখ থেকে শুধু একটা শব্দ বেরোলো …ওখানে নিশি.. তারপরও দাড়োয়ানও ছুটল আমার সাথে। আলগা মাটি সরাতে বেগ পেতে হলোনা। দুজন মিলে নারী দেহদুটো উঠিয়ে পাকা রাস্তায় শুয়ে দিলাম। নিশির নিথর মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো আমি মুর্ছা যাচ্ছি। দাড়োয়ান আমার হাত ধরে আছে, কাঁদছে। অজান্তেই নিশির বুকে কান পাতলাম। আছে তো, ওঠানাম আছে, বেঁচে আছে এখনও আমার পরান পাখী।
‘দাড়োয়ান, গ্যারেজ খোলো, ’

‘স্যার কিন্তু ড্রাইভার তো চলে গেছে।’
‘লাগবে না আমিই চালাবো’, বলেই দাড়োয়ানের গায়ের চাদরটা টান দিয়ে খুলে নিয়ে মুছে দিলাম দু’ নারীর মুখের কাদামাটি। অন্য নারীটি যে সুবর্ণা আর সন্দেহ নেই। দারোয়ানও চিনতে পারল। তার জীবন স্পন্দন আছে কিনা দেখার প্রয়োজন বোধ হলোনা। দুজনকেই দ্রুত গাড়ীতে তুলে ছুটলাম হাসপাতালে।

বারান্দার ওপাশে ॥ দুই ॥ Collected Story

2


কি আশ্চর্য ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। রাগ হচ্ছে আমার। বিরক্ত হচ্ছি। থপথপ শব্দটা এখন ও বন্ধ হয়নি। বিরক্তির মাঝে সে শব্দ যেন আগুনে ঘি এর কাজ করলো। আর শুয়ে থাকা গেলোনা। উঠে গিয়ে হাজির হলাম বারান্দায়। একরাশ আঁধার সাথে সাথেই গ্রাস করতে ছুটে এল। অন্য যেকোন রাতের চেয়ে পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অথবা ভিন্ন আমার দৃষ্টি। ঘন্টা খানেক আগেও জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। এখন প্রায় থেমেই গেছে। হাতটা বাড়িয়ে দিতেই দু একটা নাবালক ফোঁটার অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলো। ভেজা আমেজটা আছে, বেশ ঝিরঝিরে বাতাসে বইছে। সে বাতাসে নিশির শীতল দেহের উষ্ণ অভাব বোধ বেড়ে যেতে চাইছে একটু বেশী। অন্যরকম মনে হচ্ছে সত্যি পরিবেশটাকে। অন্ধকারটাও যেনো একটু বেশি বেশি।

বারান্দার সামনের গলিটা একটা অন্ধ গলিই বলা চলে। আমাদের বাড়ীর এই বারন্দাটা দক্ষিন দিকে আর বাড়ীর মেইন গেট পূর্বে, গেটের সামনেই বড় রাস্তা চলে গেছে , সেটারই একটা শাখা এই গলি। গলিটার সামনের ডানপাশের বাড়ীটার পাশেই একটা প্লট খালি। সেখানের বুনো ঝোপঝাড়ের পাতগুলো ভীষণ কালা কালো দেখাচ্ছে। মনে পড়ছে ওটার বামপাশেই ল্যাম্পপোষ্টটাতে সোডিয়ম বাতি জ্বলে রোজ। আজ জ্বলছেনা। ওটা জ্বললেও অন্ধ গলির শেষমাথায় এই বাড়িক’টা একটু নির্জনতায়ই ডুবে থাকে। নিশির বিহনে আঁধার নিশি যেনো আমাকে টানছে কাছে। দু’একটা জানালায় হালকা নীল বা লাল আলো জ্বলছে। তাতেই পথটা একটু আধুটু চিকচিক করে উঠছে; ভেজা পথতো। কিন্তু না কোথাও কেউ হাঁটছেনা। কোন জনমানবের কোন চিহ্নই নেই। শব্দ আবার কানে আসতেই চোখ চলে গেলো সামনের খালি প্লটের দিকে। আমাদের পাশের বাড়ীটা  তিন তলা করার সময় ওখানে একটা একচালা টিনের ঘর করা হয়েছিল, মালসামান রাখার জন্য। মিস্ত্রীরাও থাকত। তারই কিছু ভাঙা বেড়া , চাল বাঁশ এখনও বিমুর্ত হয়ে পড়ে আছে। ভাঙা চালের কোন এক কোনে পানি জমেছে , সেখানথেকেই চুয়ে চুয়ে পানির ফোঁটা পড়ছে নিচে। নিচে  তো থাকার কথা মাটি খোয়া বা ঘাস লতা। টুপটুপ শব্দ থপথপ হয়ে গেলো কেনো?  ধূর! এই শব্দ নিয়ে এত ভাবার কি আছে, শব্দ তো কত রকমই হতে পারে। নিচে প্লাস্টিক বা কাঠ টাঠ কিছু পড়ে আছে মনে হয়, সেখানে পানির ফোঁটাগুলো পড়ছে নির্দিষ্ট সময়ের বিরতি দিয়ে আর এই সুনশান পরিবেশে সেই শব্দ আমার কানে ওমন ভয়াবহ হয়ে ধরা পড়েছে। তাই হবে। চিন্তুা মুক্ত হয়ে এবার ঘুমানো উচিৎ। কিন্তু নিশি এখনও মোবাইল বন্ধ করে রেখেছো কেনো? মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে একটা ঝগড়ার ভাব আসছে আমার।

সামনের বাড়িটার দোতলায় চোখ গেলো ঘোরার মুহুর্তে । ক’দিন আগে ঠিক এইরকম সময়েই তো ঝগড়া বাধিয়েছিল। সেদিন কৌতূহল হয়নি। আজ হচ্ছে । আজ কেনো আবার ঝগড়া করছেনা। কান পেতে মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, শিখতাম একটু। এত ঘুম কেনো আজ ও বাসায়? সব ঘরের আলোই বন্ধ। এত ঝগড়ার পর আবার সকালে কি করে ওমন ঢেউ খেলোনো মধুর প্রেমের বাতাস বয় দুজনার মনে? খটকা! পরীক্ষা একটা করেই দেখতে হবে। আমার দ্বারা কি একসাথে ওমন দুটো ভিন্ন ডাইমেনশনে রূপদান করা আদৌ
সম্ভব? মনে হয়না।

ঘুরে দরজায় পা বাড়াতে গিয়েই চোখ আটকে গেলো । বারান্দার কোল ঘেঁষে নিচে সোজা নেমে গেছে দু দুটো পাইপ। বেশ মোটাই এবং লোহার।
বিল্ডিয়ের ডিজাইন হিসাবে খাঁজগুলো পাইপের সাথে সাথে এমনভাবে মিলেছে যে সহজেই পাইপ বেয়ে কেউ উঠে আসতে পারবে। একবার চেষ্টা করে দেখবো নাকি? সাহস কিন্তু পাচ্ছি। ঐ খাঁজটা ভেঙে দিলেই তো হতো…কিন্তু কোনদিন চোখে পড়েনি কেনো? নিশির চোখ তো এড়ানোর কথা না। নিশির চোখ যখন এড়িয়ে গেছে, চোরের চোখতো এড়াবেই।

হু হু করে জোড়ালো এক পশলা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগলো মুখের বাম পাশে। একটু অবাক হলাম। মনে পড়ল, নিশি বলেছিল, কোন এক রাতে-এমন এক পশলা বাতাসের হঠাৎ ঝাপটা নাকি বিপদের সংকেত। কতনা কুসংস্কার বিশ্বাস করে মেয়েটা! আমি কখনও বিশ্বাস করিনা। দূর বলে উড়িয়ে দেই। বাতাসের কাজ আসা যাওয়া , তাই তার যেভাবে ইচ্ছে আসবে , তাতে ঘটনার সম্পর্ক যুক্ত করা কেনো বাবা? কিন্তু নিশি মানেনি। পরদিন সকালে যখন বিল্ডিংয়ে কাজ করতে গিয়ে একটা লোক পড়ে গেলো, নিশি চেয়ে চেয়ে দেখলো। বলল, ওটাই সেই বিপদ, রাতের বাতাসের। কি ভীষন ভয় পেয়েছিল সেদিন নিশি। কম করে হলেও ১০ দিন ও জানালার পাশে যায়নি। আমি কিন্তু মানিনি। তিনতলা থেকে মিস্ত্রী পড়ে যাবার উপযুক্ত কারন ছিল। পুরাতন রশি দিয়ে বাঁশ বেঁধেছিল। নিজের দোষে নিজে পড়েছে। বাতাস মিয়া এখানে কি দোষটা করল কে জানে? নিশিকে কে বোঝাবে?  জানি বোঝাতে পারবনা, তাই ওর বিশ্বাসে বেশী জোড়ে হাতুড়ি চালাইনি। কটা ভাঙব। ওমন শত শত কুসংস্কার ওর মনে। আর ভেঙেও লাভ কি? ঐ যে কথায় বলে না…বিশ্বাসে মিলায় বস্তু..  বিশ্বাস নিয়েই তো সুখী আমার নিশি। তাই ও যখন গলিতে কোন হৈচৈ শুনে বারান্দায় গিয়ে কান পাতে সন্ধার পরে আমি আর মনে করিয়ে দেইনা হঠাৎ ভুলে যাওয়া তার কুসংস্কার- “সন্ধ্যায় মেয়েদের খোলা চুলে আকাশের তলে দাঁড়াতে নেই।” সাময়িক কুসংস্কার ভুলে হৈচৈ এর কারন অনুসন্ধানে যে আনন্দ পাচ্ছে, পাক না।

একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল যেনো আশেপাশে, থপথপ শব্দর সাথে মিশে সে কান্না পরিবেশটাকে কেমন জানি ভূতুড়ে করে তুলল। আমার মনেও কুসংস্কার চলে আসতে চাইলো সে শব্দে। আবার কান্নার শব্দ। আরে দূর! বাচ্চা হবে কেনো? ওটা তো বিড়ালের কান্না। নিশিও একবার বেশ ভয় পেয়েছিল ও কান্না শুনে। আমি যতই বলি বিড়াল, ও মানবে না। সেই রাত দুটোর দিকে দারোয়ানকে ডেকে তুলে খুঁজতে যেতে হলো কোথায় বাচ্চা কাঁদছে। কেউ আশে পাশে বাচ্চা টাচ্চা ফেলো দিয়েছে হয়তো, ও ভাবলো তাই। আমি একাই যেতে চাইলাম। না কিছুতেই একা দেবে না যেতে। দারোয়ানকে নিয়েই যেতে হবে। এই এক জ্বালা। নিজে কুসংস্কার বিশ্বাস কর ভাল, আমাকেও করতে হবে কেনো? অবশ্য এর একটা ভালো দিক আছে- অনাহুত বিপদ এড়ানো যায়।

বারান্দার ওপাশে ॥ এক ॥

0

 

থপ, থপ ……থপ, থপ
তারপর নিরবতা- অল্প কিছুক্ষণ।
আবার – থপ, থপ ……থপ, থপ

একটু পর পরই কানে শব্দটার এই আলোড়ন শুনে মনে হচ্ছে কেউ যেন বারবার কাদা মাড়িয়ে খুব কাছে চলে আসছে…

যদিও রেলিং নেই তবু  দু’তলার উপরে বারান্দায় মই ছাড়া উঠবে কিভাবে? বিছানা থেকে  উঠতে যাব তখনই  মনে হলো-ঠিক সেভাবে কি কখনও খেয়াল করেছি? নিচ থেকে উঠে আসার কোন উপায় তো থাকতেও পারে। কত ব্যাপারই তো চোখ এড়িয়ে যায়, আর আমার তো একটু বেশীই। সে কারনেই তো আমি এত সাধারণ। একটা সময় ছিল এই সাধারণ হওয়াটাকেই ভাল বাসতাম। এক সময় বলছি কেনো- আজও তো তাই। এবং চরম সত্য হলো আমার এই সরল সাধারণ স্বভাবের কারনেই মানুষ আমাকে ভালবাসে, সেটা আমি বুঝি। যে পাত্রে বিপদের সম্ভাবনা ক্ষীণ, সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ভালবাসার কারেন্ট জাল।  নিশির বাবা মানে আমার শশুর মশাইতো বিয়েতে মত দিয়েছিল আমার এই সরলতায় মুগ্ধ হয়েই। গোটাকয়েক কাগুজে সনদ ছাড়া  আর কিই বা ছিল তখন আমার?

শব্দ থেকে কোথায় চলে গেলো ভাবনা। এই একটিই আমার সমস্যা। একা থাকি যখন-একদম একা। চারপাশে সুনশান নিরবতা, হঠাৎ হঠাৎ মন তার স্বাভাবিকতার রূপ পরিবর্তন করে , সরল মনটাও ভাবতে শুরু করে দেয়, সে ভাবনা বিস্তৃত হয় উত্তর থেকে দক্ষিনাবধি। যদিও সে সব ভাবনা কখনও ছুতে পারেনা সরলতা বর্জনের ইচ্ছেকে।

বারান্দায় গিয়ে দেখে আসতে ইচ্ছে করছে । সেই সাথে না হয় একটু পরখ  করে নেবো বহিঃঅনুপ্রবেশ হতে বারান্দাটার সত্যিকার নিরাপত্তা। যদি খুঁজে পেয়ে যাই উপরে উঠে আসার কোন সহজ উপায়, চেপে যেতে হবে, নিশিকে তো একদমই বলা যাবেনা। ভীষন ভয় ওর। বাসায় থাকলে এই থপ থপ শব্দেই এতক্ষন তোলপাড় শুরু করে দিত। প্রথমেই ডাক পড়ত দাড়োয়ানের এবং তাকে তৎক্ষণাৎ শব্দের উৎসের খোঁজ নিয়ে আসতে হতো । কে হাঁটে , কেনো হাঁটে –সব। কৌতূহল অসীম তার। আমাকে কাছে পেলে জিদ ধরবে দেখে আসার জন্য। অথচ আমার আবার কৌতূহল নিদারুনই কম। দুর শব্দ হচ্ছে হোক। ছন্দময় হোক বা ছন্দহীন -আমার তাতে কি? সেই আমি এই মুহূর্তে নিজেকে বদলাতে চাইছি। একাকীত্ব দূর করার ভালো উপায় স্বাভাবিকতার বিরুদ্ধাচারণ। অন্তত এই মুহূর্তে এই থিউরী গ্রহন করতে ইচ্ছে করছে।

থপ, থপ — শব্দটি এখনও শোনা যাচ্ছে সেই একই ছন্দে। নিশ্চিত- কেউ হাঁটাহাঁটিই করছে। কিন্তু এই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাঝে, রাত ১২টায় কেউ হাঁটতে বেরোবে কেনো? হাঁটুক না, আমার তাতে কি? সুর তুলে, ছন্দ বানিয়ে. গলা ছেড়ে গান গেয়ে, থপ থপ গবগব যেমনে ইচ্ছে শব্দ করে হাঁটুক…আমার কি ? অন্য সময় না হলেও এখন অনেক কিছু। নিশিকে ছাড়া একা রাত কাটবেনা। এই একটাইতো নেশা আমার জীবনে। অফিস, মিটিং  সেরে প্রায় প্রতিদিনই একটু দেরীই হয় আমার বাড়ী ফিরতে । তারপর নিশি নিশি আর নিশি , সেই তো সব আমার নিশিথের । তার সান্নিধ্য বিনে আমি যেন নেশাদ্রব্যবিহীন এক পাড় নেশাখোর। উপায় নেই। থপ থপ শব্দ এখন সেই নেশাটাকে ছাইয়ের তলে চাপা রেখে সময়টা পার করার বেশ ভাল একটা পুঁজি ।

নিশিকেও ফোন করা যায় , তাতে নেশার উদ্রেগ হবে আরও তীব্র তাছাড়া রাগও হচ্ছে, সেই সন্ধ্যার পর একটু ফোন করে কোন খবর জানালাও না।  ফোন অবশ্য করব-যখন ঘুম চোখের অধিকার নিয়ে নিতে চাইবে ঠিক তখন। নেশার সাথে ঘুম মিলে যাবে। নিশি হাসবে , আমি ছোট্ট শিশুর মত ঘুমিয়ে যেতে থাকব।

ঘুমের ঘোরেই ঝগড়া করতে থাকব। আসলে আমিই হেরে যাব শেষে। ভাবলাম বলি, কালকে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরতে পারবো, কাল ই না হয় একসাথেই দুজন যাব। বলা হলো না । ‘নিষেধ’ বলে একটা শব্দ যে আদরের বউকে আদৌ বলা যায়, আমি সেটা জানিই না। তাই বলে ভাবলে ভুল হবে আমি স্ত্রৈন। আমি হলাম সরল সাধারণ, নির্ঞ্ঝাট। বাপের বাড়ী যাবে , কোন কারন তো আছেই, যাবেই তো, যাক না । নেশা ছাড়া একটা দুটো রাত কাটানোর প্রয়োজনও আছে। মাঝে মাঝে অসাধারণ হতেও আজকাল ইচ্ছে করে। এইতো মাত্র দুদিন আগে, আমরা ঘুমানোর আয়োজন করছি। হঠাৎ সামনের দোতলা বাড়িটার দোতলায় ডান দিকের ঘরটাতে এক জোড়া নরনারীর চ্যাঁচামেচি। ঝড়গড়াঝাটির পর্যায় পেরিয়ে বিষয়টা আরেকটু বেশীই ছিল। তাদের কথা শুনে সেরকমই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য , তাদের সকালে সে দু’জনকেই দেখলাম বারান্দায় বসে গলাগলি ভাব, হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে পারলে নিচে পড়ে যায় আর কি।

দেখে একটু সময়ের জন্য আফসোস হয়েছিল, সত্যি বলছি। আমার নিশির নেশায় যাতনাটার অভাব সাময়িক  বোধ হলো। ইস ঝগড়াতো আজকেই একটা করা যেত। নিষেধ শব্দটা শিখে নিয়ে বললেই হতো-আজ ও বাড়ী যাওয়া চলবেনা। হঠাৎ কি এই পরিবর্তন সম্ভব, তাও আমার দ্বারা। সেই কখন যাওয়ার কথা, পৌঁছে এখনো অবধি একটা কলও দিলোনা। না ঝগড়ার মজাটা আজকেই শুরু করতে হবে।

(সংগৃহীত)

অপ্রাসঙ্গিক:-[|] (পর্ব -৩)

2

রোজকার মত সেদিন রাতেও খেয়েদেয়ে আমরা সবাই আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে গল্প করলাম। তারপর সবাই মিলে খুনশুটি করতে করতে বিছানায় শুলাম, গল্প করতে করতে ঘুমিয়েও গেলাম।

গভীর রাতে হঠাৎ ভিষণ রকমের গোলমাল আর ভিষণ রকমের কান্নাকাটির শব্দে আমাদের সবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আলো জ্বালিয়ে হঠাৎ করে খেয়াল করলাম রাজীব নেই। তাহলে কি আবার রাজীব… কোনমতে সামলে নিয়ে দৌড়ে বাইরে গেলাম। অনেক মানুষ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। ঠেলেঠুলে সামনে গিয়ে দেখি রাজীব পরে আছে উঠানে। রাজীব আর নেই, ও মারা গেছে! আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার বন্ধুরা সব ছুটে গেলো সামনে। কান্নাকাটির শব্দ বাড়তেই লাগল।

বেশ অনেকটা সময় পরে যখন সবাই একটু ধাতস্ত হলাম তখন জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে হল এমনটা। রাজীব মারা গেলো কিভাবে। তখন মামা বলতে শুরু করলেন- মাঝরাতে তিনি টয়লেটে যাবার জন্য বাড়ির বাইরে বের হন। তখন হঠাৎ দেখেন একটা বাছুর গোয়ালের পাশ দিয়ে ছুটে গেল। তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এত রাতে বাছুর গোয়ালের বাইরে কি করছে! আর তিনি নিজেই তো শোবার আগে সব কিছু দেখে শুনে তারপর শুতে গেলেন। কিন্তু তাহলে বাছুরটা কি করে বাইরে এলো! যাই হোক তিনি বাছুরটা ধরতে ছুটলেন। অনেকটা সময় এদিক সেদিক ছুটে তিনি শেষ পর্যন্ত বাছুরটাকে ধরতে পারলেন, তারপর গোয়ালের দিকে এসে থমকে দাঁড়ালেন। গোয়ালের দরজা পুরোপুরি খোলা! তখনি তার মনে সন্দেহ জাগলো কিছু সমস্যা হয়েছে। তিনি তারপর ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন সবকিছু। হঠাৎ দেখেন আমাদের ঘরের দরজা খোলা। তিনি ঘরে ঢুকে দেখেন আমরা সবাই ঘুমিয়ে কিন্তু রাজীব নেই! রাজীব আবার কথায় গেলো! তিনি খুঁজতে লাগলেন। অনেক্ষন ধরে খুঁজে খুঁজে বাইরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন। আকাশে চাঁদ ছিলো কিন্ত মেঘে আর কুয়াশায় কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছিলো না। হঠাৎ ইনি দূরে একটা শব্দ শুনলেন, কিন্ত বুঝতে পারছিলেন না। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখেন পাশের বাড়ির সামাদ ভাই তাকে ডাকছে। বললেন- কি ভাই কি হল! এই মাঝরাতে ডাকাডাকি করছেন যে! সামাদ ভাই বললেন, কি জানি এক শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোর মনে করে বাইরে খুঁজতে এসে দেখেন মামা দাঁড়িয়ে আছেন। তাই কিছু শুনেছেন কিনা জিজ্ঞেস করতে ডাকা।

দুজনে মিলে গল্প করতে করতে খেয়াল করেন পানিতে কি যেন ভাসছে। দুজনে মিলে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। গিয়ে দেখেন একটা সাদা কাপড়। ভালোমত খেয়াল করে দেখেন একটা মানুষ যেন ভাসছে! মামা ঝাঁপিয়ে পরলেন পানিতে, তারপর কাছে গেয়ে দেখলেন রাজীব পানিতে উপুর হয়ে ভাসছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে মারা গেছে! কিন্ত কিভাবে! হইচই শুরু হয়ে গেল। সবাই এসে পরলো বাড়ির সামনে। রাজীবের লাশটা তুলে নিয়ে যাওয়া হলো।

কিন্তু রাজীব মারা গেলো কিভাবে! পরদিন খবর পেয়ে রাজীবের বাবা মা এলেন লাশ নিয়ে যাবার জন্য। ঢাকায় ফিরে গিয়ে ময়নাতদন্ত হল রাজীবের লাশের। কিন্তু কোন কিছুই ধরা পরলো না। সারা গায়ে অদ্ভুত কিছু আচঁরের দাগ ছাড়া। আর সারা গায়ের হাঁড়গুলো যেন কেও ভেঙ্গে দিয়েছে। ডাক্তাররা কেউ ধরতে পারলো না। বেশ কদিন তদন্ত হলো, পুলিশ এলো, কিন্তু লাভ হল না কিছুই।

তারপর অনেকগুলো দিন কেটে গেছে। রাজীবের মৃত্যুর পর সময়টা যেন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে কেটে গেছে। প্রথম দিকে কোন কথাই কেউ বলতে পারতাম না, শুধু ভাবতাম রাজীব যেন আমাদের পাশে বসে আছে। কিন্তু…।

তারপর রাজীবের স্মৃতিও ঝাপসা হওয়া শুরু করল। আবার আমাদের সময় স্বাভাবিক হওয়া শুরু করল। আমরা আবার পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পরলাম।

সেদিন আমাদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলছিলো। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে কিন্তু তখনও সূমিতের দেখা নেই। আমাদের মাঝে সেই ছিল সবচে’ সিরিয়াস। কখনও সে এক মিনিটও দেরী করতো না। সেই সূমিতের দেরী দেখে আমরা বেশ অবাক হলাম। পরীক্ষা শেষ হলেও সে আমাদের সাথে কোন কথা না বলেই দৌড়ে চলে গেল। আমরা তো অবাক! এই কি সেই সূমিত যে কিনা আগে আমাদের পরীক্ষায় সবার উত্তর না মিলিয়ে বাসায় ফিরতো না, সে কিনা আজ কোন কথা না বলেই পালিয়ে গেলো কেন! বিকালেও সে আমাদের আড্ডায় এলো না। কিন্তু সূমিতের হলটা কি! সেদিন থেকে শুরু আমাদের এড়িয়ে চলা সূমিতের। এভাবে অনেকদিন চলে গেলো।

একদিন সন্ধ্যায় তার বাসায় গেলাম সবাই মিলে। তখনও সে দেখা করতে চায় না। কিন্তু আমরা চাপাচাপি করাতে সে দরজা খুলে দিলো। ঘরে ঢুকে আমরা তো এই মারি কি সেই মারি অবস্থা! জিজ্ঞেস করলাম সে আমাদের হঠাৎ করে এড়িয়ে চলা শুরু করল কেন। এটা ওটা অনেক কারণ বলে গেলো সূমিত। বুঝতে পাচ্ছিলাম সূমিত কোন কথা গোপন করার চেষ্টা করছে। সূমিত কখনো ভালো মিথ্যেবাদী ছিলো না। কিন্তূ আমরা তখন তার কোন কথা শুনতে রাজী ছিলাম না। অনেকক্ষন চুপ থেকে সূমিত শেষ পর্যন্ত বলা শুরু করল ঘটনাটা।

ওই পরীক্ষার আগের দিন রাতে সে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পরেছিল। ভোর রাতের দিকে কেন যেন ঘুম ভেঙ্গে যায় সূমিতের। তখন সে শুনতে পায় কে যেন কথা বলছে, সূমিত সূমিত করে ডাকছে। প্রথমে ঘুমের ঘোরে কিছু বুঝতে পারে না। হঠাৎ চমকে উঠে রাজীবের কন্ঠ শুনে। এমনিতেও সূমিত এসব ব্যাপার খুব ভয় পায়, তার উপর রাজীব তাকেই ডাকছে। ভয়ে ভয়ে সূমিত জিজ্ঞেস করে রাজীবকে সে কেন এসেছে, কি চায়। উত্তরে রাজীব কিছু না বলে শুধু হাসতে থাকে। এরপর রাজীবকে আর সূমিত দেখতে পায় না।

কদিন পর থেকে রাজীব আরো ঘন ঘন সূমিতের কাছে আসা শুরু করে। অনেক কিছু বলতে শুরু করে। আর এসব কথা সে আমাদের বলতে মানা করে। সূমিত কারণ জিজ্ঞেস করলে রাজীব ভিষণ রেগে যায়। চিৎকার করে বলতে শুরু করে- ওরা আমার শত্রু! ওদের কারণেই আজ আমার এই দশা। ওরাই আমাকে এভাবে ফেলে রেখে চলে এসেছে। ওদের আমি ছাড়ব না! আর তুই যদি বলে দিস তাহলে তোকেও ছাড়ব না!

শুনে আমরা ভিষণ অবাক। রাজীব কি সত্যিই তার মৃত্যুর জন্য আমাদের দায়ী করে! আমাদের ভিষণ মন খারাপ হয়ে যায়। সূমিতকে স্বান্তনা দিয়ে আমরা যে যার বাড়ী চলে যাই। আমাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। আবার না বিশ্বাস করেও থাকতে পারছিলাম না। সূমিত আসলেই কোন দিন মিথ্যা কথা বলে ধরা না খেয়ে থাকে নাই। কিন্তু সূমিত যে কথাগুলো বলছিলো সেগুলো বিশ্বাস করার মতও ছিলো না।

এমন ভাবতে ভাবতে বেশ রাত করে ঘুম হয় আমার। পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গে কলিং বেল এর শব্দে। কে যেন পাগল হয়ে গেছে। বাসায় কেও ছিলো না, তাই আমিই ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দেখি সবাই দাঁড়িয়ে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার, এমন পাগলের মত ছুটে আসার কি দরকার, কি হয়েছে। সবাই কোন কথা না বলে ঘরে ঢুকে চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষন পর রনি বলল- সূমিত মারা গেছে। কাল মাঝরাত থেকে প্রচন্ড জ্বর উঠে সূমিতের। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সূমিত কোমায় চলে যায়। ভোরবেলা মারা গেছে ও। সূমিত কোমায় যাবার আগে বারবার বিড়বিড় করছিলো- রাজীব আমরা তোর বন্ধু, তুই অদের কিছু করিস না…।

আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম। কি হচ্ছে এসব! রাজীব কি আসলেই প্রতিশোধ নেয়া শুরু করল! কিন্তু তাও কি সম্ভব! অনেক্ষন পর রনি হঠাৎ বলতে শুরু করে- দোষটা আসলে তার। আমরা কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এবার কি রনিও পাগল হয়ে গেল! রনি কাঁদো কাঁদো হয়ে আবার বলতে শুরু করল- আমি রাজীবের সাথে বাজী ধরেছিলো ওই গাছের নিচে সে আবার যেতে পারবে কিনা। আমি ভেবেছিলাম রাজীব সামলে নিবে, মজা করবে। কিন্তু সে সিরিয়াসলি নিয়ে ঠিকই সেরাতে আমাকে সবাই ঘুমিয়ে গেলে ডেকে তোলে। ধরে নিয়ে পুকুর পাড়ে নিয়ে যায়। তারপর সে একা একা চলে যায় ওই গাছটার দিকে। অনেক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। হঠাৎ শুনি কে যেন আর্তনাদ করছে। চাঁদও তখন মেঘের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। তখন আমি যা দেখতে পাই তা দেখে আমার রোম খাঁড়া হয়ে উঠে। দেখি রাজীব গাছের গোড়ায় অদ্ভূত ভাবে বেঁকে পড়ে আছে যেন কেও তাকে ধরে কাঠির মত মোঁচরাচ্ছে। রাজীব তখন ভিষণ জোড়ে চিৎকার করছিল। আমি ভয় পেয়ে বাড়ির দিকে পালিয়ে যাই। হঠাৎ সামনে দেখি মামা দাঁড়িয়ে আছেন। কি করব বুঝে না উঠে আমি গোয়াল ঘড়ের দরজা খুলে দেই। বাছুরটা বেড়িয়ে গেলে মামা তার পেছনে ছুটে যায় আর আমি সেই ফাঁকে ঘড়ে ঢুকে শুয়ে পড়ি। বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছে করে এমন করি নি। কি করে যে কি হয়ে গেলো আমি বুঝতেই পারি নি। রাজীবের মৃত্যুর জন্য যদি কেও দায়ী থাকে সে আমি…। বলতে বলতে রনি কান্নায় ভেঙ্গে পরলো।

আমরা আবারো হতভম্ভ হয়ে পড়লাম। এমন সময় হঠাৎ লোডশেডিং হল আর সে মূহুর্তেই আমরা টের পেলাম কেও যেন আমাদের পাশে হেঁটে যাচ্ছে। আমাদের ভিষ্ণ ভয় করছিলো। শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু কেন যেন হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিলো…..এমন সময় হঠাৎ রনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করল- রাজীব তোর মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী, তুই যা করার আমাকে কর, ওদের কিছু করিস না। ওরা কিচ্ছু জানত না আমাদের ব্যাপারে। তুই ওদের ছেড়ে আমাকে নে! তখন শুনি আমাদের রুমে কে যেন হা হা হা! করে হাসতে লাগল।…

জানি না কতক্ষন চলল এমন হাসি, হঠাৎ শুনি কেউ যেন রাজীবের গলা চেপে ধরেছে। সেই কন্ঠটা হাঁসফাঁস করতে লাগল। একসময় থেমেই গেলো। ঠিক তখনই শুনতে পেলাম আযান পড়ছে- “আল্লাহু আকবার…”।

এরপর আমরা কেউ আর কখনও রাজিবের কথা শুনতে পাইনি।

 

অপ্রাসঙ্গিক:-[|] (পর্ব -২)

অপ্রাসঙ্গিক:-[|] (পর্ব -১)

পরী (রহস্য গল্প) (Collected)

1

বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে গেছে। অতীতের অনেক বড় বড় আবিষ্কারই চাপা পড়ে গেছে প্রযুক্তি আর তথ্যের স্তূপের নিচে। সভ্যতার এ অগ্রগতি সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু বিচিত্র জায়গা এ পৃথিবী। ব্যাখ্যার অতীত অনেক ঘটনা এখনো এখানে ঘটে। এখনো দেশের বহু মানুষ বিশ্বাস করে জ্বীন-পরীতে। খোদ রাজধানী শহরের অফিসপাড়ায় টিউবলাইটের আলোর নিচে তাবিজের গল্প করতে ভালোবাসেন অনেকে। অনেকে আবার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলীর। নানা চেষ্টা-চরিত্র চলে চারিদিকে। তারা কেউ কেউ একটি স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক জগতের কথাও বলেন, রসায়ন আর পদার্থবিদ্যার সূত্রসমূহ নির্ধারিত হয় যেখানে। যুক্তিবাদীদের সাথে ভীষণ তর্ক শুরু হয়ে যায় তখন তাঁদের। হ্যাঁ, এটা সত্য যে সভ্যতা মানুষেরই সৃষ্টি, কোন ফেরেশতা এসে তাজমহল বানিয়ে দিয়ে যায়নি। কিন্তু পাশাপাশি এটাওতো সত্য যে এই বিশাল মানবসভ্যতাটা ধ্বংসের জন্য একটা গ্রহাণু বা একটা ধূমকেতুর সাথে পৃথিবী নামক গ্রহটার সামান্য একটা সংঘর্ষ কিংবা মানুষের স্বসৃষ্ট পারমানবিক বোমাগুলোর কয়েকটার বিস্ফোরণই যথেষ্ট। তাজমহল তখন একবস্তা ছাই ছাড়া আর কিছুই না। আসলে বেশিরভাগ মানুষের জীবনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের একটা চক্র ছাড়া আর কিছুই নেই। অবিরাম অবধারিত এ চক্র আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না, ফলে অনেকে আবার ঝুঁকে পড়ে সেকেলে জরাজীর্ণ আধ্যাত্মবাদের দিকে – ছাই উড়িয়ে পেতে চায় মানিক-রতন। তাদের অনেকেরই আবার বিশ্বাসের জোর যথেষ্ট নয়। এদিকে সত্য কারো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধার ধারে না, জীবন তার অদ্ভুত রহস্যময়তা নিয়ে বয়ে চলে অবিরাম। ঘষা কাচের মত রহস্যময়তা নিয়ে আসে একেকটা দিন। আমার কম বয়সের এমনি এক রহস্যময় দিনে এক পরীর সাথে দেখা হয়েছিল আমার।

পৃথিবীর ভেতর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা নাকি বাজার। শোনা যায়, বাজারের বিভিন্ন অলি-গলিতে ডিম পেড়ে রাখে মেয়ে শয়তানের দল, সময়মত খোলস ফুঁড়ে বের হয় বাচ্চা শয়তানেরা। আমাদের নিউমার্কেটের এমনি এক গলিতে কিছু লোক ক্রোকারিজের ব্যবসা করে, দোকানও আছে অনেকগুলো। তারই একটাতে দেখলাম একটা মেয়ে দোকানদারের সাথে সমানে তর্ক করছে।

কৌতূহলবশতঃ কাছে এগিয়ে গেলাম, ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝলাম – ভীড়ের মধ্যে ধাক্কা লেগে একটা কাচের বাটি পড়ে ভেঙ্গে গেছে এবং দোকানদার একা মেয়েমানুষ পেয়ে পুরো সেটটারই দাম দাবী করছে। রাগে-অপমানে মেয়েটার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে, কিন্তু বেচারী ভীড়ের মধ্যে কিছুই ঠিকমত বলতে পারছে না। ওকে দেখে আমার মায়াই লাগল, কারণ সে একসময় বাটিটার দাম দিতে রাজী হয়েছিল, কিন্তু দোকানী ছোকড়াটা পুরো সেটটার দাম ছাড়া নিতে রাজীই হচ্ছে না।

হঠাৎ কি মনে করে আমি সামনে এগিয়ে গেলাম এবং ছেলেটাকে থামিয়ে বললাম যে তারও উচিত হয়নি রাস্তার উপর সওদা-পাতি রাখা। সে বোধহয় এর জন্য প্রস্তুত ছিলনা – কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মনে হল আরো ক্ষেপে গেল, এবং শেষে আমার সাথেও তর্ক শুরু করল। আমি যখন ব্যাপারটা মীমাংসার জন্য বণিক সমিতির অফিসে যাবার কথা বললাম, তখন সে আমাকে অশ্লীল একটা গালি দিয়ে বসল।

আমার মনে হল এখন কিছু না করাটা একেবারেই খারাপ দেখাবে, যেহেতু আমি একজন সদ্য তারুন্যোত্তীর্ণ যুবক। আমি সামনে গিয়ে তাকে একটা ধাক্কা মারলাম এবং অপ্রত্যাশিতভাবে সেও আমাকে একটা ঘুষি দিয়ে বসল। হয়তো মানুষের ভুলের কারণেই মারামারি হয়, হয়তো শয়তানরা মানুষের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে পালিয়ে যায় তারপর দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখে। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম, এই নাটকটিতে আমার চরিত্রটি নির্দিষ্ট হয়ে গেছে এবং তাতে আমাকে অভিনয় করে যেতেই হবে।

যেহেতু মঞ্চে একবার ঢুকে গেলে নিজেকে আর প্রত্যাহার করে নেয়া সম্ভব নয়, সুতরাং আমি মারামারিতে জড়িয়েই পড়লাম। কিন্তু অল্পসময়ের ভেতর আশ-পাশ থেকে আরো কিছু দোকানী বের হয়ে আসায় আমরা গুটিকয়েক লোক শেষপর্যন্ত খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারলাম না, বরং মার খেলাম প্রচুর। আমাকেই মারল বেশি। কোনমতে যখন জায়গাটা থেকে বের হয়ে এলাম, তখন আমার অবস্থা প্রায় আধমরা। মেয়েটা কোনমতে আমাকে একটা স্কুটারে টেনে উঠিয়ে একটা ক্লিনিকে নিয়ে গেল। স্কুটারে ওঠার পর আমার মাথা ঘুরছিল। শুধু এইটুক মনে আছে যে আমি তার নামটা জিজ্ঞেস করেছিলাম। যদ্দূর মনে পড়ে, ওর পুরো নাম বলেছিল ইরেন্দিনা হক। অবশ্য এরপর থেকে আমি সবসময় তাকে ইরা নামেই ডেকেছি।

ক্লিনিকে ঘন্টাখানেক রেখে ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। বের হয়ে এসে ওকে অপেক্ষা করতে দেখে বললাম – আপনি অনেক কষ্ট করেছেন, ধন্যবাদ।

সে আমার সাথে সাথে আসছিল। বললাম – আমি এখন বাসায় যেতে পারব, ব্যথা কমে গেছে।

সে কিছু বলল না, পাশাপাশি হাটতে লাগল। আমি অল্প খুড়িয়ে হাটছিলাম, সে সেটা খুব খেয়াল করে দেখছিল।

ঘরে ঢুকে ওকে বসতে বললাম।

বাসায় কেউ নেই?

ওরা এখনো ফেরে নি।

ওরা? মানে? – সে জিজ্ঞেস করল।

আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে থাকি এখানে।

আইজ্যাক সিংগার ভালো লাগে? – সে টেবিল থেকে বইটা তুলে দেখতে লাগল।

আমি মাথা নাড়লাম – মাঝে মাঝে সাময়িকীতে বিদেশী ম্যাগাজিন থেকে লেখকদের সাক্ষাৎকার অনুবাদ করি, লিটারেচারে পড়ার কারণে এটা হয়েছে।

তখন দেয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই সে বলে উঠল ও মাই গড, অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমি তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম।

এরপর সে আরো কয়েকদিন বাসায় এল ব্যথাটার খবর নিতে। সে কথা বলত সোজাসুজি। মেয়েটার চিন্তা-ভাবনা ছিল পরিষ্কার। আমি যখন চুপচাপ শুধু শুনে যেতাম, তখন সে কথা বলে আনন্দ পেত – বলতে বলতে একপর্যায়ে এসে তার বিষন্ন গাম্ভীর্যটাও খসে পড়ত, বেরিয়ে পড়ত মনের একান্ত গোপন ধারণাগুলো। একদিন আমার টেবিলে ডস্টয়েভস্কির বই দেখে বলল – তোমার অনেক কিছুই পিকিওলিয়ার। তুমি র‌্যাদার ওল্ড ফ্যাশান্ড, খুব সম্ভবতঃ অতীতের ঘটনা আঁকড়ে ধরে রাখার বিশ্রী একটা টেন্ডেন্সিও কাজ করে তোমার মধ্যে। তারপরও তোমার মধ্যে কিছু একটা আছে যেটা রেয়ার – সে হেসে বলল – এবং ভালো – সে শেষ করল।

আমি এসেছি পুরানো ঢাকার রক্ষণশীল একটা পরিবার থেকে, ফলে তাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারতাম না। ছোটবেলা আমরা মক্তবে পড়েছি, যেখানে হুজুর আমাদের বেত দিয়ে পেটাতেন আর বলতেন – বেত খাওয়া ভালো, কারণ ওস্তাদের মারের জায়গা দোযখে পুড়েনা।

অল্প কয়দিনের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম – সে বেশ অস্থিরভাবে দিন কাটায়, বিশ্বাস করে না স্থায়ী সম্পর্কে। সে সবসময় একঘেয়েমির ভয়ে থাকত – প্রসঙ্গ পুরনো হয়ে যাবার আগেই উঠে চলে যেত গল্পের মাঝখান থেকে। আমি তার সাথে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করতাম, তার মধ্যে সাহিত্য আর তুলনামূলক ধর্মই ছিল প্রধান।

এক বিকেলে সে আমাদের বাসায় এল স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে। সেদিন কোন প্রসংগই তার ভালো লাগছিল না। অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর সে বলল – সব মানুষই একঘেঁয়ে, অসহ্য। শুধু বাঁচার জন্য বেঁচে থাকার কোন অর্থ আছে ! যেকোন প্রতিষ্ঠানকেই আমি ঘৃণা করি – কারণ পৃথিবীর সবকিছুই অর্থহীন। দেখ, এখানে কারো জন্য কারো কোন দয়া-মায়া নেই। মানুষে মানুষে সম্পর্ক অভিনয় মাত্র, সবকিছুর পেছনেই আছে ব্যক্তিগত স্বার্থ। আমার বার বারই মনে হয়েছে, পৃথিবীতে মানুষ একেবারে একা। আর তার সমস্ত কাজ-কর্ম অর্থহীন, অ্যাবসার্ড।

একটু থেমে সে বলে – যে অস্তিত্ব একদিন শেষ হয়ে যাবে, তার সব কর্মকান্ড অর্থহীন হতে বাধ্য।

কেন? যদি মৃত্যুর পরও – বাই চান্স – জীবন থাকে। তাহলেই তো আমরা বেঁচে গেলাম, তাই না? – আমি হাসি।

ইরেন্দিনা ঠান্ডা গলায় বলে – ওটা অন্ধবিশ্বাস, প্রমাণ ছাড়া কোনকিছুতে আমি বিশ্বাস করি না।

এটা একটা স্বতঃসিদ্ধ কথা বলেছ, আর স্বতঃসিদ্ধও একটা বিশ্বাস। – আমি তাকে রাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাই।

মানুষ জানতে পারে না, এমন কিছু থাকতে পারে না। – সে মুখ শক্ত করে বলে।

কে বলেছে থাকতে পারে না? – আমি হাসতে হাসতেই বললাম।

সে ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। আমি তখন একটু ইতস্তত করে বললাম – আসলে আমি নিজেই এমন ঘটনা দেখেছি যার ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি।

কিরকম? ভৌতিক কিছু নাকি! – তাকে হঠাৎ কৌতুহলী মনে হয়।

সে সন্ধ্যায় বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, আর হঠাৎ কারেন্টও চলে গিয়েছিল। ফলে জমে উঠছিল অমন একটি গল্পের সম্ভাবনা। আমি বলতে শুরু করলাম আমার কৈশোরের সেই বিস্ময়কর কাহিনীটি।

আমার তখন চৌদ্দ পনর বছর বয়স। কারো সাথে মিশতে পারতামনা বলে বন্ধু-বান্ধব তেমন ছিলনা। আর আত্মীয়-স্বজনও আমাকে অসামাজিক বলেই জানত। আমি বলতে গেলে একা একাই থাকতাম। প্রায়ই দুপুর রোদে ছাদে চুপচাপ বসে থেকে অনেক দূরের বাসায় শুকাতে দেয়া কাপড়গুলোর বাতাসে ওড়া দেখতাম। সেরকম এক দুপুরেই প্রথম ঘটেছিল সে ঘটনাটা।

ছাদের যে দিক থেকে মেয়েটা হেটে আসছিল, ওদিক দিয়ে ছাদে ওঠার কোন রাস্তা ছিলনা। কিন্তু আমার তখন সে কথা একবারও মনে হয়নি, আমি এতোটা মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এতো সুন্দর কোন মেয়ে আমি কোনদিন কোথাও দেখিনি। সে আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে হাসল, যেন অনেকদিনের পরিচিত। আমিও হাসলাম, যেভাবে খুব কাছের কাউকে দেখে কেউ হাসে। আমার খুব ভালো লাগছিল। আমি ওর হাত ধরলাম, তখন ও আমার পাশে এসে বসল। আমি ওর নামটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমরা দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম পাশাপাশি – একলা ছাদে।

এরপর থেকে প্রায়ই সে আসত আমার কাছে – নির্জন দুপুরে, গভীর রাতে। হঠাৎ করেই দেখা দিত, যেন আশে পাশেই কোথাও ছিল। ওর সাথে কোনদিন কোন কথা হয়নি, ভাবলে আশ্চর্যই লাগে। সে আমার সাথে খেলত – হাতে হাত রেখে, কিংবা চোখে চোখ – নিঃশব্দ। মাঝে মাঝে যখন ওর মন খুব ভালো থাকত, সুড়সুড়ি দিত পায়ে, আর মিটিমিটি হাসত। প্রায়ই আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকত অন্ধকারে, যেন ভয় পাচ্ছে। তখন ওর জন্য আমার খুব মায়া লাগত। সে প্রায়ই মিষ্টি আর ফুল নিয়ে আসত আমার জন্য। এমন ফুল আমি কখনো কোথাও দেখিনি। অনেককে দেখিয়েছি ফুলগুলো, কেউই বলতে পারেনি ওগুলোর নাম।

কিন্তু যে রাতে ও আমাকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে গেল, এরপর থেকেই বাসার সবাই কেমন যেন আচরণ করতে লাগল আমার সাথে। আমি নাকি টানা এগারদিন নিরুদ্দেশ ছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল – সন্ধ্যার পর অলিগলি পার হয়ে একটা বাগানের মত জায়গায় গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে আমি ওর হাত ধরে অনেকক্ষণ হেটেছি। বাগানে আরো অনেকে ছিল, সবাই দেখতে খুব সুন্দর। আমরা যেন জ্যোৎস্নার আলোয় অনন্তকাল হাটছিলাম। তারপর একসময় কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি – ও নেই, আর আমি খোলা ছাদে শুয়ে আছি। বুঝতে পারলাম না, ছাদে কিভাবে এলাম। যখন নেমে এসে ঘরে ঢুকলাম, সবাই ছুটে এল – যেন আমি অ্যাক্সিডেন্ট করেছি।

ওরা পরদিনই এক হুজুরকে ডাকল। উনি আমাকে বললেন, সবার সাথে বন্ধুত্ব করা যায়না। উনি দোয়া পড়লেন, জাফরানের রং দিয়ে সাদা প্লেটে দোয়া লিখে দিলেন ধুয়ে খাবার জন্য, গায়ের ওপর লেবু কাটলেন, জোয়ার ভাটার পানি খেতে দিলেন, আর গোসল করতে বললেন সেই পানি মিশিয়ে। যাবার আগে বিচিত্র সব নিয়মে কালাম পড়ে, পিন মেরে আর পানি ছিটিয়ে ছাদসহ আমাদের পুরো বাড়ি বন্ধ করলেন। আমাকে তাবিজও দিলেন, যদিও সে তাবিজ হারিয়ে ফেলেছি বহুদিন হয়। কিন্তু আসলে আমি যেটাতে আশ্চর্য হয়েছিলাম, সেটা হল – ঐদিনের পর থেকে মেয়েটা কখনো আর আমার কাছে আসেনি। কতদিন ছাদে বসে থেকে ভেবেছি, এই বুঝি মেয়েটা আসবে। অথবা গভীর রাতে ঘুম না এলে মনে মনে ওর কথা ভেবেছি, কিন্তু সে আসেনি।

ইরেন্দিনা সবটা মন দিয়ে শুনল। হেসে বলল – ইন্টারেস্টিং। তবে খুব গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাখ্যা তো আছেই এটার।

কি ব্যাখ্যা?

ব্যাখ্যা একটাই, তোমার মস্তিষ্কে সমস্যা আছে।

আমি জোরে হেসে উঠলাম।

না, হেসোনা, সত্যি বলছি। তোমার হ্যালুসিনেশন হয়েছিল, মনে হয় তোমার গোপন সিজোফ্রেনিয়া আছে, একা একা থাকাটাও এ ব্যাখ্যার সাথে মিলে যায়। আসলে তুমি বাস্তবে যা পাও নি, তোমার মন সেটা তোমাকে কল্পনার মধ্য দিয়ে পাওয়ানোর চেষ্টা করেছে।

নিঃসঙ্গ কাউকে যদি সিজোফ্রেনিয়া ধরতে পারে, তাহলে পরী কেন পারবে না!

আরো পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ইরেন্দিনা আসলে বিজ্ঞানকে মনে করত বিশ্বাসের একদম বিপরীত কিছু। আমি বলতাম – বিজ্ঞান তো একটা মডেল মাত্র, যা জগৎকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। এরকম আরো মডেল থাকতে পারে। আর তুমি তো জানোই – একটা মডেল তখনই সফল, যখন তার একটা অংশ অন্য একটা অংশের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরী করে না।

বাস্তব সবকিছুকেই মাপা সম্ভব।

কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তা করার শক্তি তো অসীম নয়। তিনটি মাত্রার বেশী কোনকিছুর কথা আমরা কল্পনার চোখ দিয়েও দেখতে পারি না।

এভাবে দিনের পর দিন আমরা তর্কাতর্কি করেছি। কেউ কেউ ধর্মের ব্যাপারে যেরকম অন্ধ, সে ছিল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঠিক তেমনি অন্ধ। কিন্তু তারপরও তাকে আমার ভালো লাগত শুধু এজন্য যে, সে ছিল একটি শিশুর মতই সরল আর ওর মধ্যে কোন স্বার্থান্বেষী প্যাঁচঘোচ ছিলনা।

মার্চের শেষদিকে ইরেন্দিনা আর তার কয়েকজন বন্ধু মিলে ঠিক করল তারা খুলনা বেড়াতে যাবে, সেখানে ইরেন্দিনার চাচা সরকারী বিরাট বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। সবকিছু চুড়ান্ত হয়ে যাবার পর সে আমাকে ফোন করল, খুলে বলল সব পরিকল্পনা। বলল – ঢাকায় সবকিছুই একঘেঁয়ে। আমি কিছু বললাম না।

তুমি আমাদের সাথে যাবে – সে ওপাশ থেকে বলল। আমি এরকম একটা আশংকাই করছিলাম।

চুপ করে আছো যে!

বললাম – কিভাবে যাবে?

বাসে, আসব স্টীমারে – সে বলল।

তাহলে আমার যাওয়া হচ্ছে না।

কেন?

আমি পানি ভয় পাই। বাসে চড়লে আমার বমি হয়।

শয়তান – সে মন্তব্য করল – এসব বলে তুমি পালাতে পারবে না। দরকার হলে লাইফ ইন্স্যুরেন্স করিয়ে নেব।

আমিই যদি না থাকি, আমার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কিভাবে আমার কাজে আসবে? আসল কথা বলি, আমার পকেট এখন খালি।

আমার কাছ থেকে ধার করতে পার।

আমি চুপ করে থাকলাম। সময়ই অনেক ক্ষেত্রে উত্তর দেয়াকে সহজ করে দেয়।

তাহলে আমি টিকেট করে পরে সময়টা তোমাকে জানিয়ে দিব।

সে ফোন রেখে দিল। আমার হাতে সময় আছে, ঢাকার বাইরে কয়টা দিন ঘুরে এলে আসলে মন্দও হয় না। কিন্তু তার বন্ধুদের কথা ভাবতেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি আমার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। যাদের সাথে আমাকে সামনের একটা সপ্তাহ কাটাতে হবে, তাদের কারো সাথেই আমার তেমন কোন মিল নেই। ওরা ফূর্তিবাজ, বর্তমানকে নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যাবে, পৃথিবীতে প্রতিটি মুহূর্ত তাই মূল্যবান। যৌবন চিরস্থায়ী হয় না, সুতরাং এরও সর্বোচ্চ ব্যবহার দরকার। ভোগেও ক্লান্তি আসে, সুতরাং ভোগের মধ্যেও বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করে যেতে হবে এবং সেটা খুব ধৈর্যের সাথে। সেটা নিয়ে নানারকম পরিকল্পনাও আছে তাদের। ওদের মধ্যে জাতীয় সাংসদের ছেলে থেকে শুরু করে সিমেন্টের কোটিপতি ডিলারের মেয়ে পর্যন্ত অনেকেই আছে। এরা সবাই ইরেন্দিনার বন্ধু। যতদূর জানি এদের মধ্যে ইরেন্দিনার বাবাই সবচেয়ে সাধারণ – একজন মাঝারি মাপের সরকারী কর্মকর্তা, যদিও তার মা যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী একজন মহিলা। ইরেন্দিনারা থাকে আজিমপুরের সরকারী কলোনীতে, কিন্তু তার মা প্রতিবেশীদের এড়িয়ে চলেন, মেয়েদের পড়ান ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে – আর মিশতে দেন না বাংলা মিডিয়ামের মেয়েদের সাথে।

আমরা যে সাতজন খুলনা বেড়াতে গেলাম, তার মধ্যে চারজনই মেয়ে। জায়গাটায় বেশিরভাগ সময়ই আমরা ঘুরে বেড়ালাম নদীতে নদীতে, তারমধ্যে তো একবার চলে গেলাম সুন্দরবনের একেবারে মাঝামাঝি এলাকায়। সেখানে একটা রেস্টহাউজ আছে, রাতের বেলা নাকি বাঘের গর্জন শোনা যায় কখনো কখনো। রেস্টহাউজটা সুন্দর, পৌঁছেই ওরা সবাই ছাদে ওঠার জন্য হৈ চৈ করতে লাগল। আমি বসে রইলাম স্পীডবোটের পেছনের অংশটায়। নদীর পাড়ে গোলপাতা গাছগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, অপরিচিত কয়েকটা পাখি মাঝে-মধ্যে উড়ে যাচ্ছিল এদিক-ওদিক। সেখানেই আমি প্রথম ফিঙে দেখলাম।

ইরেন্দিনা কিছুক্ষণ পর আমাকে খুঁজতে খুঁজতে বোটের কাছে চলে এল। বসে থাকতে দেখে সে নিজে বোটে উঠে এল – তুমি গেলে না যে! – সে পাশে এসে বসল।

এ জায়গাটা খুব সুন্দর। – আমি আঙ্গুল তুলে নদীর ঐ পাশটা দেখালাম।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল – তুমি এরকম কেন? কি মনে কর তুমি আমাদের?

আমি ভালো করে তাকে লক্ষ্য করলাম। সে বাচ্চাদের মত করে কথা বলছিল। আমি কথা ঘোরানোর জন্য বললাম – কাল যা হারিয়ে যাবে, আজ তার জন্য অপেক্ষা করে কি লাভ?

সে হঠাৎ হেসে ফেলল। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে বলল – আমরা ছাদে যাচ্ছি। তুমি চলে এসো।

সে চলে গেল। আমি আবার নদীর ওপারে তাকালাম। ইরেন্দিনা জীবন থেকে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আজো খুঁজে পায়নি, ঠিক সেই প্রশ্নগুলোই আমাকেও প্রায়ই ভোগায় – যদিও সে কথা মেয়েটাকে বলা হয়নি কখনো।

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আমি বোটটা থেকে নামলাম, সারেংকে জিজ্ঞেস করে হাটতে শুরু করলাম রেস্টহাউজটার দিকে।

ইরেন্দিনা ছাদে বসে ছিল কার্নিশের ওপর তার ছায়াটাকে ফেলে। আমাকে দেখে বলল – তুমি আট মিনিট পরে এসেছ। আমি ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে তারপর দূরে দিগন্তের দিকে তাকাই, ওখানে সবুজ রংটা আস্তে আস্তে ধূসর হতে হতে একসময় নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে।

তুমি খুব বেশিরকম সেলফ সেন্টারড – হঠাৎ করে ইরেন্দিনা বলল – বুঝেছো?

আমি ইরেন্দিনার দিকে তাকাই, তারপর একটা অনিচ্ছাকৃত হাই তুলে বনের ডানপাশটার দিকে চোখ ফেরাই। ডানপাশটা আরো সুন্দর। ওপাশের দিগন্তে ঘন গাছের একটা রেখা এসে মিশে গেছে। আমি অনেকক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে থাকি।

অথবা তোমার মনের মধ্যে লুকানো কোন হিসেব আছে।

আমি তার দিকে ভালো করে তাকাই – সে কালো রং দিয়ে চোখের পাপড়িগুলো স্পষ্ট করেছে, আর গাঢ় লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট দুটোকে।

আমি হিসেব করে চলি না – আমি গলায় যতটুক সম্ভব রহস্য ঢেলে দিয়ে বলি – আমাকে চালিত করে আমার বিশ্বাস, এবং আমার অবিশ্বাস।

কিন্তু সে ওগুলো শুনেছে বলে মনে হয় না, কারণ সে কথা বলে না, স্বপ্নিল চোখে তাকিয়ে থাকে দিগন্তের দিকে। ইরেন্দিনা রেলিঙে বসে পা দোলাতে থাকে, তখন ওকে দেখায় ছোট্ট একটা মেয়ের মত। ইরেন্দিনার ঠোঁট লালচে, মুখটা গোলাপী। মনে হয়, আকাশ ভেঙ্গে গোলাপী রোদ নেমে এসেছে পৃথিবীতে। অন্ধ হয়ে যাবার আগেই আমি আমি চোখ নামিয়ে নিলাম, ছাদ থেকে নেমে এলাম সন্ধ্যা হবার আগেই।

রাতে ওরা ক্যাম্পফায়ারের আয়োজন করল। ইরেন্দিনার চাচী কিছূক্ষণ ভূতের গল্প বললেন, আমাদের সাথের ছেলে দুটা উশখুশ করতে লাগল। ভদ্রমহিলা গল্প শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন, তখন তারা বলল যে গল্পটা তাদের কাছে ভালোই লাগছিল। তিনি ঘুমাতে চলে যাবার সাথে সাথে সচিবের ছেলে সবাইকে একটা নাচের প্রস্তাব দিল।

ঘর থেকে সেট আনা হল, ব্যাগ থেকে বের করা হল রেডিমেড ক্যাসেট। ওরা একটা গান বাজাল, বলল ওটাকে বলে ড্যান্স ট্র্যাক। ওরা ড্যান্স ট্র্যাক শুনতে থাকল, সাথে সাথে বাড়তে লাগল নাচের উচ্ছলতা। একটা প্রেমিক জুটি ছিল, ওরা হাত ধরাধরি করে মাঝে এসে দাঁড়াল। সচিবের ছেলে বলল, সে বিয়েতে বিশ্বাস করে না। ইরেন্দিনা হেসে হাততালি দিল, অন্য সবাইও খুব করে হাসল। সচিবের ছেলে ব্রিগেডিয়ারের ফর্সা মেয়েটার সাথে গায়ে গা লাগিয়ে অনেকক্ষণ নাচল, তারপর নাচ থেমে গেলে সবার মাঝখানে বসে প্রাপ্তবয়স্কদের কৌতুক বলতে লাগল। মেয়েগুলো হেসে গড়িয়ে পড়ল, ছেলেগুলো দিল স্বতঃস্ফুর্ত হাততালি। আমার তখন খুব ঘুম পেতে লাগল – নেশার মত অনেকটা।

সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ইরেন্দিনা সামনের বাগানটায় দাঁড়িয়ে ছিল, দেখেই আমাকে ডাকল। আমি হাত-মুখ ধোয়ার অজুহাতে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মেয়েরা চাচীর সাথে শুয়েছিল দক্ষিণের ঘরটায়, ওরা নাস্তার টেবিলে এল একটু দেরীতে। সকাল সাড়ে ন’টার দিকে আমরা বোটে উঠে বসলাম সাগরসঙ্গমটা দেখতে যাব বলে। আমি শুনেছিলাম, ঐসব জায়গায় নদীর পাড় দেখা যায়না বলে উঁচু উঁচু ঢেউগুলো নতুনদের মধ্যে খুব ত্রাসের সঞ্চার করে।

খুলনা থেকে ঢাকায় রওনা দিলাম আমরা বুধবার সন্ধ্যার পর। আকাশে চাঁদ ছিল, স্টিমারের ডেকটা ছিল ফাঁকা। ইরেন্দিনার বন্ধুরা সন্ধ্যার পরের সময়টা ডেকের ওপর এলোমেলো হাটাহাটি করে কাটাল। ন’টার পর ওরা কেবিনে ঢুকল তাস খেলবে বলে। আমি ঐ সময়টা বাইরে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়েই দেখি, ইরেন্দিনা রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে নদীর অন্ধকার পাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, সে একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

আমরা অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর সে বলল – তুমি তো আধ্যাত্নিক জগতে বিশ্বাস কর। তাই না!

আমি হাসলাম, বললাম – আমি নিশ্চিত নই।

কিন্তু বিশ্বাসী মাত্রই বোকা। ভালোবাসা তাদের অন্ধ করে।

বিশ্বাসীর পুরষ্কার স্বপ্ন – আমি বললাম।

আর স্বপ্ন মাত্রই অলীক – সে উত্তর দিল।

যখন তুমি স্বপ্ন দেখছ, তখন আবার বাস্তব জীবনটাই তোমার কাছে অলীক। আসলে পুরো ব্যাপারটাই আপেক্ষিক।

ইরেন্দিনা আমার দিকে ঘুরে তাকায় – তোমার সাথে তর্ক করা অর্থহীন।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আকাশে তখন কয়েকটা নতুন তারা দেখা যায়। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম, কতক্ষণ মনে নেই। সেই শেষপর্যন্ত নীরবতা ভাংগে, হঠাৎ করে বলে – আচ্ছা, একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?

নিশ্চয়ই।

তুমি কি পছন্দ কর কাউকে? নাকি তুমি অন্য সব সস্তা মিডল ক্লাস ছেলের মতই মনে মনে চরম প্রতিক্রিয়াশীল?
নিজের আইডেন্টিটি রাখার জন্য একটু রক্ষণশীল হলে দোষ কি ! – আমি বলি।

হঠাৎ করেই সে বলে – সত্যি করে বলতো, তুমি তোমার সেই পরীটাকে আসলেও আর কখনো দেখনি!

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম।

তার মানে আরো দেখা হয়েছে তোমাদের?

দেখা হলেই বা কি? ওটা আরেকটা হ্যালুসিনেশন ছাড়া তো আর কিছু না।

এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবেনা। আমি চিন্তিত তোমার অসুস্থতা নিয়েই।

আমি হেসে ফেললাম, বললাম – আমার কি মনে হয় জানো? বললে তুমি বিশ্বাস করবে না, কিন্তু সত্যি সত্যিই আমার মাঝে মাঝে মনে হয় – তুমিই সেই মেয়ে, এখন ইরেন্দিনা নাম নিয়ে এসেছো।

তোমার সিজোফ্রেনিক চিন্তার জগতে এটা অবশ্যই সম্ভব। – সে বাকা করে হাসল।

অনেকক্ষণ পর সে হঠাৎ বলে – তোমার কোন জিনিসই আমার তেমন ভালো লাগে না। কিন্তু তারপরও আমি মাঝে মাঝে তোমার সাথে যোগাযোগ করি। কেন জানো? তোমার মধ্যে একটা চাইল্ডলাইক ইনোসেন্স আছে, আমি যেটা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখেছি।

সে অদ্�ভুত একটা স্বরে কথাগুলো বলে যায়। সে রেলিঙের ওপর একটা হাত রেখে আমার চোখের দিকে তাকায়। আমি তখন দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করি। রাতের নদীর বুক চিড়ে স্টীমারটা তরতর করে এগিয়ে চলে। আশেপাশের গ্রামগুলো তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

তোমার কি তোমার জীবন নিয়ে সত্যিই কোন প্ল্যান নেই? – সে অন্ধকার দেখতে দেখতে বলে।

তোমাকে একটা কথা বলি – আমার সবসময়ই কেন যেন মনে হয়, এই পৃথিবীটার কোথায় যেন একটা সমস্যা আছে। আচ্ছা সত্যি করে বল তো, তোমার কি কখনোই এমন মনে হয়নি যে আমরা একটি বৃহত্তর স্বত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন! হয়তো যেখান থেকে শুরু সেখানেই সমাপ্তি, আর বিচ্ছিন্নতার অবসান, আর এই বিচ্ছিন্নতার অবসানের নামই স্বর্গ!

তুমি আবার কবে কিসের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে?

জন্মগ্রহণের মাধ্যমেই বিচ্ছিন্নতার শুরু – আমি কণ্ঠে দার্শনিক একটা ভাব এনে বলি।

তাহলে তো এর থেকে বাঁচার জন্য তোমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন গতি নেই।

আমি হেসে ফেললাম। কিন্তু আধো-অন্ধকারেও আমি বুঝতে পারলাম, সে হতাশ চোখে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম, সে কি ভাবছে। নিশ্চিত হলাম, যখন সে ঘুরে বলল – আমি ভেতরে যাচ্ছি।

সে কেবিনের দরজাটা খুলে ভেতরে চলে যাবার সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেতর থেকে হুল্লোড়ের একটা ঝাপটা দমকা বাতাসের মত বেরিয়ে আসে, তারপর হঠাৎই আবার সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আমি আকাশের দিকে তাকাই। দূর আকাশে তখন অসংখ্য তারা মিট মিট করে আলো ছড়াচ্ছে। ডেকের অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় আমার মনের মধ্যে কোন দূর অতীত থেকে পরিচিত মুখগুলো ভেসে আসতে থাকে। তাদের একেকজন একেক পথ ধরে এগিয়ে গেছে, কেউ কেউ হারিয়েও গেছে। কিন্তু আমি অতীতের দিকে ফিরে তাকাইনি, আমি সবসময় একটা পথই আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করেছি আর দিনের পর দিন আমার প্রশ্ন ও প্রার্থণার উত্তর খুঁজেছি। সব প্রশ্নের উত্তর পাইনি, কিন্তু সময় হয়তো এখনো শেষ হয়ে যায় নি।

আমরা ঢাকা এসে পৌঁছলাম সকাল এগারোটায়। সকালবেলা সদরঘাটে ওকে বিদায় জানিয়ে বাসায় চলে এলাম। ইরেন্দিনার সাথে সেটাই আমার শেষ দেখা।

অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমার তখন মনে পড়ল – যাবার সময় কাউকে বলে যাওয়া হয়নি। আশ্চর্য ! পুরো ঘটনাটা ঘটেছে – যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমি।

ইরেন্দিনা আর আমার সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। একদিন ওদের আজিমপুরের বাসায় গিয়েছিলাম, দেখি ওরা ভাড়াবাড়িতে চলে গেছে। ঠিকানা-টিকানা যোগাড় করে একদিন সেই এলাকাতেও গেলাম, দেখি ওখানে ঐ নামে কেউ থাকে না।

আমি সেদিন দুপুরে অনেকক্ষণ রোদে হেটে বাসায় ফিরলাম। ভাবতে চেষ্টা করলাম, যেটা হঠাৎ শুরু হয় সেটা হঠাৎ শেষও হয়ে যায়।

বন্ধুদের যখন ঘটনাটা বললাম, ওরা খুব করে হাসল। হাবীব বলল – তোমারে আবার পরীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল আর কি। হায়, আমাদের এই সৌভাগ্য হয় না।

আমি চুপ করে থাকলাম। রফিক অবশ্য আমাকে সমর্থন দেয়, বলে – যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, ভালোয় ভালোয় ফিরে তো এসেছ।

সে নানা ধরনের কিতাবে নাকি এসব সম্পর্কে পড়েছে – কালো যাদুতে তুমি বিশ্বাস করবে না জানি। কিন্তু কোরানেই আছে, হারুত-মারুত ফেরেশতার মাধ্যমে কিছু ভিন্ন ধাঁচের জ্ঞান মানুষকে বিতরণ করা হয়েছিল। মানুষ কি এরপর থেকে এর অপব্যবহার করেনি! অথচ এসবই ছিল খোদার পরীক্ষা, আর এখন এগুলো কালের বিবর্তনে হয়েছে কালো যাদু। আরে ভাই, তোমরা তো জানো না! ডাইনীরা হাজার বছর ধরে নিঃসংগ ধর্মভীরু ছেলেদের বিশ্বাসকে নিয়ে খেলা করে, শহরগুলির অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে রাখে জাল, স্ট্রীটলাইটের আলোর আড়ালে চলে ষড়যন্ত্র আর কালোযাদুর খেলা। তাবিজ দিয়ে বশ করে রাখে তারা মানুষের বুদ্ধিকে, বুদ্ধি তখন চলে আবেগের নির্দেশে। তুমি যদি এসব থেকে বাঁচতে চাও, মাথার বাইরে এসে চিন্তা কর – পারলে তোমার আবেগকে শ্বাসরোধ করে হত্যা কর, তাহলে হয়তো পাবে সঠিক মানুষটির দেখা। ঐ নতুন সঙ্গিনীর সামনে গিয়ে যখন তুমি দাঁড়াবে, তোমার আর কোন আবেগ অবশিষ্ট নেই – তবু তো তুমি ডাইনীদের হাত থেকে বাঁচতে পারলে। ডাইনীরা আবার যুক্তিকে দারুন ভয় পায়।

পৃথিবীটা বিচিত্র জায়গা। ব্যাখ্যাযোগ্য এবং ব্যাখ্যার অতীত অনেক ঘটনাই এখানে ঘটে। আর তাছাড়া কেউ যখন অন্য কারো জীবন থেকে হারিয়ে যায়, তখন সে পরী ছিল না যাদুকরী শক্তিধর ডাইনী ছিল তাতে কিছুই আসে যায় না। অতীত অতীতই, যা গেছে তা আর ফিরে আসবে না। বরং একদিন আমাদের চারদিকে সবকিছু বদলে যাবে, সেদিন আমরা হয়তো আমাদের অতীত অনুভূতিগুলোকে অন্যভাবে দেখতে শিখব। আর বুঝতে পারব, কতগুলো সত্যকে তলিয়ে না দেখাই ভালো। 

Collected

মাথাহীন লাশ -! (Collected)

0


রাত হলেই শ্যামপুর গ্রামে সুনসান নিরবতা নেমে আসে- এই নীরবতার মাঝে থাকে শুধুই পাতার মর্মর আওয়াজ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। একটানা সেই ডাকে মোহনীয় হয়ে থাকে যেন শ্যামপুর গ্রাম।সুনসান নিরবতার এই গ্রামে আজ ও রাত নেমে এসেছে। কিন্তু প্রতিদিনের মত চুপচাপ নেই কেউ। খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত যে কৃষক সে ও এসে ভিড় করেছে কালনীর শাখা নদী সুলিনার তীরে। ব্যাপার কিছুই না- সেখানে ভেসে উঠেছে এক মহিলার লাশ।

সবাই যে যার মত বলাবলি করছে, চিনতে চেষ্টা করছে লাশটাকে- কিন্তু কেউ চিনতে পারছেনা। কারন কেউ এই মহিলাকে খুন করে মাথাটা কেটে ফেলেছে। এখন চারদিকে লোক পাঠানো হয়েছে মাথার খোঁজে। মাথা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এই লাশ দাফন করার জন্য কেউ এগোচ্ছেনা । এর মাঝেই কোন কোন উতসুক জনতা গিয়ে দূর থেকে কাঠি দিয়ে লাশের হাত পা দেখার চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু কোন ফলাফল নেই। হাতে পায়ে কোন চিহ্ন নেই- যে লাশটাকে চেনা যায়। রাত যত বাড়তে থাকে –তত ভীর বাড়তে থাকে। মাঝে ভীরের চাপ কমে গিয়েছিল। কিন্তু হটাত করে শোনা যায় শেখের বাড়ির সুলেখা কে পাওয়া যাচ্ছেনা। ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করে ঘর থেকে রেগে মেগে বের হয়ে গিয়েছিল সুলেখা। তারপর থেকে ওর পাত্তা নাই। সৎ মা ও সুলেখার কোন খোঁজ করেনাই। এখন ও সুলেখার মায়ের কোন দেখা নাই। শুধু ওর বড় ভাই জামাল শেখ এর কান্না কাটি চলছে লাশটার পাশে। অনেকেই ওকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে- কিন্তু পারছেনা। বার বার আছাড় খেয়ে খেয়ে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে জামাল শেখ। ছোট বোন টাকে অনেক ভালবাসত সে। সকালে ঝগড়া হবার সময় বলেছিল-

“যা- দূরে যাইয়া মর গা” এখন সেই কথা শুনিয়ে বলতে বলতে চিৎকার করে কেঁদে উঠল ও। কিন্তু লাশের পরিচয় পাওয়া গেলনা। এর মাঝেই গ্রামের তিন জন মুরুব্বি এসে নিজেদের মাঝে বাহাস করতে লাগল। কেউ এই লাশ দাফন করতে চায়- কেউ নিয়ে ফেলতে চায় সেই পানিতে- যেখান থেকে ভেসে এসেছে লাশ। কেউ কেউ জানাজা পড়ার জন্যই বসে থাকল। কিন্তু লাশের পরিচয় পাওয়া গেলনা।

এর মাঝেই একটা চিৎকার শুনে সবাই দৌড়ে গেল সেই চিৎকারের উৎসের দিকে। সেখানে এক ১২-১৩ বছরের ছেলে মাটিতে হোঁচট খেয়ে ঊল্টে পড়ে আছে। কিন্তু চিৎকার করেছে ভয়ে। কারন সে যে জিনিস টার সাথে হোঁচট খেয়েছে সেটা আর কিছু না – সেই বেওয়ারিশ লাশের মাথা।মাটিতে সামান্য গর্ত করে কেউ ঢুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু মাটি আলগা হওয়াতে তাতে হোঁচট খেয়েছে ছেলেটা।

এরপর পরই ওঠে কান্না কাটির রোল। সুলেখার নাকের ফুল দেখেই সবাই চিনে ফেলে এটা সুলেখার লাশ। সাথে সাথেই দুই তিন জন মিলে সেই লাশের মাথা নিয়ে এসে লাশের পাশে রাখে। মরা কান্না জুড়ে দেয় জামাল শেখ আর তার আত্মীয় স্বজন রা।

গ্রামের মাতব্বর দের মাঝে দুই-তিনজন এই লাশের জানাজা করে দাফন করতে চায়না।চার পাঁচ জন তাদের সাথে কোরান-হাদিস নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। ওই গ্রামের মসজিদের মওলানার সাথে তর্ক লেগে যায় করিম মওলা আর তার ছেলে রহমান মওলার । শেষে কোন মিমাংসা করতে না পেরে সেই লাশ দুই তিন জন মিলে কোন রকম জানাজা পড়ে দাফন করে। এর মাঝে গ্রামের হেডমাষ্টার সবুজ মিয়া ও ছিল। সবুজ মিয়া নিজের দায় থেকে এই কাজে উৎসাহ দেবার জন্য দোষি সাব্যস্থ হয় পরদিন এক সালিশে। দিন সাতেক সবার মুখে মুখে এই ঘটনা একের পর এক ডানা মেলতে থাকে। কেউ কেউ বলা শুরু করে সবুজ মিয়া এই সুলেখার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আর এর রেশ ধরে কয়েকদিন পর আবার সালিস ডাকা হয়। যেই তিন জন লাশ দাফন ও জানাজা করতে চায়নি তাদের রায়ে সবুজ মিয়া কে এক ঘরে করে রাখে সবাই। আসলে ওই তিন জন খুব ক্ষমতা শালী বলে কেউ ওদের মুখে মুখে তর্ক করতে চায়নি।তাদের মাঝে রহমান মওলা পরের মাসে চেয়ারম্যান পদে ভোটে দাড়াচ্ছে। তাই তার সাথে কেউ কথা কাটাকাটি করতে চায়নি।ফলাফল নিরিহ সবুজ মিয়াকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে সবাই। কিন্তু সুলেখার ভাই জামাল শেখের বন্ধুত্ব ছিল।তাই সবুজ মিয়াকে নিজের ঘরে খাওয়াতে শুরু করে সে। এর মাঝে সবাই সুলেখার কথা প্রায় ভুলে যায়।

দুই সপ্তাহ পর একদিন গ্রামের মসজিদের ইমাম ইসমাইল মিয়া ফজরের নামাজের আজান দিয়ে গিয়ে এক বীভৎস দৃশ্য দেখে ভয়ে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সকালে সবাই তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় মসজিদে খুঁজে পায়। কেউ বলতে পারছেনা কেন সে অজ্ঞান হয়েছে। অনেক ক্ষন পর তার জ্ঞান ফিরলে সে সবাইকে নিয়ে যায় সুলেখার লাশ যেখানে দাফন করা হয়েছিল সেখানে। সুলেখার লাশের পাশে একটা জারুল গাছ আছে – সেখানে একটা ডালে পাওয়া যায় করিম মওলার ছিন্ন ভিন্ন লাশ। প্রথমে কেউ চিনতে পারেনি। কিন্তু গাছের গোড়ায় কে যেন লাশের মাথাটা সযত্নে কেটে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে।

দৃশ্যটা দেখে অনেকেই সহ্য করতে পারেনি। শেষে পুলিশ দেকে পাঠানো হয়। পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায় ময়না তদন্তের জন্য। এর মাঝে রহমান মওলা ক্ষেপে যায় নিজের পিতার এই অবস্থা দেখে। বিকেল যেতে না যেতেই সবুজ মিয়ার বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয় সে। সবাইকে বলে বেড়াতে থাকে যে সবুজ মিয়ে গুন্ডা লাগিয়ে তার বাবাকে হত্যা করিয়েছে। এই সময় তার সাঙ্গ পাংগরা মিলে সবুজ মিয়াকে গাছের সাথে বেধে ইচ্ছা মত মারতে থাকে। শেষে মার খেয়ে সবুজ মিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে ওকে নিয়ে স্কুল ঘরের একটা রুমে বেধে রাখে। সবাই গোপনে সুলেখার ভুতের কথা বললেও রহমান মওলার সামনে কেউ তর্ক করেনি মার খাবার ভয়ে। এর পর থেকে দুইদিন ধরে বন্দি থাকে সবুজ মিয়ে সেই স্কুল ঘরে। সকাল বেলা এসে রহমান মিয়ার লোক খাবার দিয়ে যায়। সবুজ মিয়ের খাওইয়া শেষ হলেই মার শুরু হয়। শেষে অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে দড়ি বেধে রেখে যায় রহমান মওলার লোকজন।

এর তিন দিন পরেই আবার শ্যামপুর গ্রামে শোর গোল ঊঠে। এবার ভোর সকালে পাওয়া যায় রহমান মওলার মাথা কাটা লাশ। মাথা কাটা লাশ গ্রাম বাসি দুইটা দেখেছে। কিন্তু এই রহমান মওলার লাশের পায়ের দিকটা ছিলনা। পাশেই পড়েছিল হাড় গোড়। যেন কেউ এসে খেয়ে গেছে লাশটাকে। এবার পুলিশ এসে সবাইকে জেরা করতে শুরু করে। এবং গ্রামের বেশ কয়েকজন লোকজন পালিয়ে যায় ভয়ে। কিন্তু পুলিশকে রহমান এর ভাই রহিম মওলা টাকা খাইয়ে বিদায় করে দেয়। গ্রাম বাসি স্বস্তি পেলেও ভয়ে বাড়ি থেকে দিনের বেলা ও লোকজন বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। সবুজ মিয়াকে নির্যাতন বন্ধ করা হয়- কিন্তু তাকে বন্দি করেই রাখা হয় সেই স্কুল ঘরে।

এর সাত দিন পরেই পর পর দুই জন লোকের লাশ পাওয়া যায় মাথা কাটা অবস্থায়। এই দুই জন হল গ্রামের সেই দুই মুরুব্বি যারা সুলেখার লাশ দাফনে বাঁধা দিয়েছিল। যারা সুলেখার জানাজা পড়তে চায়নি।গ্রাম বাসি এরপর প্রায় চুপচাপ হয়ে যায়। যারা সেই রাতে মুরুব্বি দের সাথে গলা মিলিয়েছিল তারা দুরের গ্রামে পালিয়ে যায়। এর মাঝে পুলিশ এসে দুইবার সবাইকে জিজ্ঞাসা বাদ করে। কিন্তু খুনি ধরা পড়েনা।

এর ঠিক দুই দিন পরে অমাবস্যা রাতে রহিম মওলা শুয়ে আছে ওর ঘরের খাটে। এই কয়দিনের মাঝেই সে নিজের প্রতিপত্তি প্রকাশে এলাকাতে টহল দিতে শুরু করেছে। মোটর সাইকেল নিয়ে এলাকার চ্যাংড়া ছেলে পেলেদের সাথে ঘুরে ঘুরে নিজেকে বাপ ভাইয়ের যোগ্য উত্তর সুরি হিসেবে জানান দিয়েছে। সারাদিন ঘোরাঘুরি করে অনেক বেশি ক্লান্ত ছিল রহিম মওলা।পাশের মকবুল বুড়ার একটা খাসি জবাই করে খেয়ে দেয়ে শান্তির একটা ঘুম দিয়েছে সে। প্রতিদিনের চেয়ে এই অমাবস্যার রাত ছিল বেশি সুনসান। রহিম মওলা গভীর ঘুমে। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ে। গুনে গুনে তিনটা টোকার শব্দ হয়। আর তাতেই রহিম মওলা জেগে উঠে।কিন্তু দরজা খুলে হতভম্ভ হয়ে পড়ে সে।দেখে তার সামনে দাড়িয়ে ছিল একটা লাশ।দেখেই ভয়ে হতভম্ভ হয়ে যায় রহিম। কিছু বুজে ঊঠার আগেই সেই লাশের ডান হাত তার মাথার ঊপর উঠে আসে। এবং জ্ঞান হারায় রহিম মওলা।

জ্ঞান ফিরেই একটা কুয়াশাচ্ছন্ন এলাকার আবিষ্কার করে রহিম মওলা নিজেকে। চারদিকে ঘন কুয়াশার মাঝে কয়েকবার নিজের বন্ধুদের নাম ধরে ডাক দেয়। কিন্তু কেউ সাড়া দেয়না। মনে করেছিল ওর সাঙ্গ পাংগ দের কেউ ওর সাথে ফাজলামি করছে। চিৎকার করে বিশ্রী গালাগাল ও দিল কিছু। কিন্তু এরপর ই চার দিকে চারটা কাফনে জড়ানো লাশের অস্তিত্ব অনুভব করে সে। এবং একটু পড়েই চার দিক থেকে বেতের বাড়ি শুরু হয়ে যায়। প্রচন্ড সেই মার খেয়ে অজ্ঞান প্রায় রহিম মওলা- এমন সময় মার থেমে যায়। আসতে আসতে ঊঠে বসে সে। সামনে তাকিয়ে তার দৃষ্টি থেমে যায়।অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রহিম-কারন তার সামনে বসে আছে সুলেখা। দেখেই ভয়ে চিৎকার করতে ভুলে যায় সে। এমন সময় সুলেখা বলে উঠে-

“কি রে আমারে চিনতে পারসোস? আমি সুলেখা-এই যে দেখ আমার মাথা এহন ও কাডা”- বলেই নিজের মাথাটা দুই হাত দিয়ে একটানে খুলে রহিম মওলার সামনে ধরল। দেখেই বমি করে দিল রহিম মওলা। দুই হাত দিয়ে পেট চেপে একপ্রস্ত বমি করে রহিম মওলা বলল-

“আমারে ছাড়ি দেও- আমাক মাফ করি দেও সুলি আফা-আমাক মাফ করি দেও” বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল রহিম।

“কি? ছাড়ি দিমু? সেদিন কি আমাক ছাড়িছিলি রে তোরা দুই ভাই? আমি কতক করি কয়েছি আমাক ছাড়ি দে- তোরা আমার ছোট ভাই লাগস- নিজের বইন মনে করি ছাড়ি দে- কই সেদিন তো ছাড়িস নাই। আমাক দুই জন মিলি নষ্ট করলি। তারপর আমাক যাতে কেউ চিনতে না পারে – তুই –তুই মওলার বাচ্চা আমার মাথা কাটি ফালালি। আমার সবুজ মিয়ারে কতক মারলি তোরা- কই সেদিন মনে আছিল না? মনে আছিল না আমার কথা?” বলেই নিজের মাথাটা আবার নিজের ধরে জোড়া লাগাল সুলেখা।

এবার কেদেই ফেলল রহিম-বলল-“আফা ভুল হইয়ে গেছে আফা- তুমি আমারে এবারের মত মাফ করি দেও আফা। আমি কইতাসি আমি এর পেরাচিত্ত করি ছাড়ুম”।

এবার খিল খিল করে হেসে ঊঠল সুলেখা –সেই হাসি শুনে কাঁপতে শুরু করে দিল রহিম মওলা। আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে আসছে সুলেখা। সামনে ভয়ার্ত রহিম মওলা। তারপর রহিমের ধরে একটানে ছিড়ে ফেলল তার মাথাটা- গলগল করে রক্ত পড়ছিল সেই কাটা মাথা থেকে। মাথাটা হাতে নিয়ে গা হিম করা একটা চিতকার দিয়ে কেঁদে উঠল সুলেখা।

এই ঘটনার কিছুক্ষন পর নিজের চোখে মুখে জলের ঝাপটা খেয়ে জেগে ঊঠল জেগে উঠল সবুজ মিয়ে। সপ্তাহ খানেক ধরে এভাবেই তার ঘুম ভাঙ্গে। মওলা দের কেউ একজন চোখে মুখে পানি ঢেলে দেয়। তারপর খাওয়া দেয়। তার কিছু খায়- কিছু খায়না। তারপর শুরু হয় মার। আজকে তাই জেগে ও চোখ বন্ধ করে রেখেছিল সে। কিন্তু মাথায় একটা কোমল স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুলেখা।আসতে আসতে ঊঠে বসল সবুজ। শরীরে এতদিন না খাওয়ার ফলে শক্তি নাই। কিন্তু কেন যেন নিজের চোখকে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে তার। সে বলল- “ সুলেখা তুই?”

“হ আমি –মইরা গেছিলাম। আজকা আমার মুক্তি হইতাসে-তাই শেষ বার তোমারে দেখতে আইলাম” বলেই কেঁদে ফেলল সুলেখা।

“আমার বিশ্বাস হইতেসে না রে- তুই কেমনে মরলি রে?” চোখ বড় বড় করে বলল সবুজ মিয়া।

“এত শুইনে কোন লাভ নাই মাষ্টার। তুমি আসতে আসতে ঊঠ। নাও আমি তোমারে শেষ বারের মত খাওয়াই দিতাসি দুইটা ভাত’ – বলে পাশে রাখা থালা থেকে ভাত খাইয়ে দিল সুলেখা সবুজ কে। সবুজ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনা। কোন কিছুর সাথে কোন কিছু মেলাতে মেলাতে ক্লান্ত হয়ে শেষে ভাত খেতে শুরু করল মন্ত্রমুগ্ধের মত। খাওয়া শেষে সুলেখা বলল-

“আমি যাই মাষ্টার- তুমি কয়দিন পর সুন্দর দেইখে একটা নিকা কইরো। আমাকে ভুলি যাইও মাষ্টার” –বলেই পা বাড়াল সুলেখা।

এতক্ষন ঘোরের মাঝে থাকলেও এখন জ্ঞান ফিরে আসে সবুজ মিয়ার। দৌড় দেয় দরজার দিকে। দরজা খোলাই ছিল। খুলে দেখে ভোর হয়ে গেছে। সূর্য প্রায় ঊঠে গেছে।আর সেই সূর্যের দিকে আসতে আসতে এগিয়ে চলেছে সুলেখা।কিন্তু সবুজ আর দৌড়ায়নি সুলেখার পেছন পেছন- কারন সুলেখা এগিয়ে চলেছিল তার শেষ ঠিকানা সেই কবরের দিকে…

( সমাপ্ত )

বাঘ

5

(আগেই রহস্যপত্রিকা এবং অন্য ব্লগ এ প্রকাশিত)

 

প্রচণ্ড শীতে থরথর করে কাঁপছে রতন। গায়ে চাদর আছে, পাশে বেশ বড় করে আগুন জ্বালিয়েছে কিন্তু এতসব আয়োজন করেও মাঘ মাসের এই প্রচণ্ড শীতকে বশে আনা যাচ্ছেনা। রতন নিরালা আবাসিক এলাকার নাইট গার্ড। অল্প কিছুদিন আগে সে এই চাকরিটা নিয়েছে কিংবা বলা যায় নিতে বাধ্য হয়েছে। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য কিছু একটা তো করতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে এই চাকরিটা নিয়েছে। মোটেই সুখকর কোন চাকরিনা এটা। সারারাত ধরে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে জেগে থাকতে তো হয়ই, তার উপর গত কিছুদিন ধরে যুক্ত হয়েছে বাঘের ভয়। গত পাঁচদিন হলো খুলনা শহরে প্রতি রাতে একটা করে লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিটা লাশ পাওয়া গেছে ক্ষত বিক্ষত অবস্থায়। যেন কোন হিংস্র জন্তু প্রচণ্ড আক্রোশে ছিঁড়ে কামড়ে একাকার করেছে লাশগুলোকে। পেপারে এনিয়ে প্রতিদিন লেখালিখি হচ্ছে। ডাক্তারদের মতে কোন মানুষের পক্ষে এভাবে হত্যা করা সম্ভব না। শুধুমাত্র বুনো কিছু হিংস্র প্রাণী, যেমন- বাঘ, সিংহ, নেকড়ে বা হায়না এই ধরনের প্রাণীর পক্ষেই এভাবে হত্যা করা সম্ভব। খুলনা কেন সারা বাংলাদেশের কোন বনেই সিংহ, নেকড়ে বা হায়না নেই। কিন্তু বাঘ আছে, এই খুলনার সুন্দরবনেই। ডাক্তারদের এই মতের উপর ভিত্তি করে সারা খুলনা শহর চষে ফেলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও বাঘের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। হতভাগ্য লাশগুলোর আশেপাশেই বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। সুন্দরবন থেকে বিশাল ভৈরব নদী পার হয়ে খুলনা শহরে ঢোকা কোন বাঘের পক্ষে সম্ভব না।

আর যদি কোনভাবে ঢুকেও থাকে তাহলে কোথায় লুকিয়ে থাকছে বাঘটা, সেটা এখন পর্যন্ত বের করা সম্ভব হয়নি। রাততো দূরের কথা, মানুষ এখন দিনের বেলাতেও ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। গতকাল রতন একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। চায়ের দোকানের মালিক কাদের ভাইয়ের দেশের বাড়ি সুন্দরবনের পাশেই কোন গ্রামে। সেখানে একটা গল্প প্রচলিত আছে, সুন্দরবনের মির্জা বাড়ি এলাকায় অনেক আগে মির্জা আসাদ ওয়ালি নামে এক জমিদার বাস করতেন। একটা পোষা বাঘ ছিল তার। বাঘটার হিংস্রতা বাড়ানোর জন্য প্রায়ই তাকে অল্প খাবার দেয়া হত। একদিন কোনোভাবে বাঘটা খাঁচা থেকে বের হয়ে আসে। দুর্ভাগ্যক্রমে জমিদার তখন তার বাগানে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। অভুক্ত বাঘটা ক্ষুধার জ্বালায় তার মনিবকেই আক্রমণ করে বসে। জমিদারের ভাগ্য ভালো, মারা যাননি তিনি কিন্তু গুরুতর ভাবে আহত হন। মির্জা আসাদ ওয়ালি যেদিন আহত হন, সে রাতেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কথিত আছে এর পর থেকে প্রতি রাতে আকাশে চাঁদ উঠার পর থেকে তিনি বাঘের রূপ ধারণ করেন এবং প্রতি রাতেই একটা না একটা খুন করেন। মির্জা আসাদ ওয়ালি আহত হবার পর থেকে প্রতি রাতেই একজন করে গ্রামবাসি মায়া বাঘের আক্রমণে মারা যেতে থাকল। গ্রামের মানুষরা মায়া বাঘের ভয়ে একে একে গ্রাম ত্যাগ করতে লাগল। ধীরে ধীরে পুরো গ্রাম জনশুন্য হয়ে গেল। কথিত আছে আজও সেই মায়া বাঘ মির্জা বাড়ির আসে পাশে ঘুরে বেড়ায়। আজও সুন্দরবনের আশেপাশের গ্রামের মানুষ প্রায় রাতেই সেই মায়া বাঘের রক্তহিম করা গর্জন শুনতে পায়। কাদের ভাইয়ের মতে মির্জা আসাদ ওয়ালি রূপী সেই বাঘটা আজ প্রায় একশ বছর পর জঙ্গল ছেড়ে শহরে চলে এসেছেন। দিনের বেলায় মানুষরূপে থাকলেও রাতে তিনি বাঘের রূপ ধারণ করে একের পর এক হত্যা করে চলেছেন। রতন জানে এটা কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু বাঘতো একটা আছেই, যেটা প্রতি রাতে নির্মম ভাবে একটার পর একটা হত্যা করে চলেছে।

 

আবার কেঁপে উঠল রতন। শীতে না ভয়ে তা নিজেও ঠিক বুঝতে পারল না। হঠাৎ পিছনে একটা শব্দ শুনে চমকে ঘুরে তাকাল। নাইটগার্ডের ইউনিফরম পরা একজন লোক ঠিক তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিরাতে দুজন করে নাইটগার্ড এই এলাকা পাহারা দেয়। এই লোকটাকে ও আগে কখনও দেখেনি। নতুন বোধহয়। লোকটা একটু হেসে রতনের পাশে এসে বসল।

“নতুন নাকি? কবে জয়েন করলা”, রতন জিজ্ঞেস করল।

বিদঘুটে ভাবে একটু হাসল লোকটা। “আজকেই”, বলল লোকটা।

“নাম কি?”

“জলিল”

“ঘটনা শুনছ নাকি?”একটু উদাস ভাবে জিজ্ঞেস করল রতন।

“কি ঘটনা?” চোখ দুটো সরু করে জিজ্ঞেস করল জলিল ।

নিজে পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও কাদের ভাইয়ের কাছে শোনা ঘটনাটা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য করে বলে গেল রতন। কিছু কথা বানিয়ে যোগ করতেও ভুললনা। গল্প বলা শেষ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল রতন। হিংস্র চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা।

“আপনি এইসব বিশ্বাস করেন”, রাগত স্বরে জিজ্ঞাসা করল সে।

“বিশ্বাস না করার কিছুই নাই, অনেক আজব ঘটনা ঘটে এই দুনিয়ায়”, দার্শনিকের মত জবাব দেয় রতন, লোকটাকে ভড়কে দিতে পেরে মনে মনে খুশি হয়েছে সে।

 

ক্রূর হাসি হাসল জলিল । চোখদুটো যেন মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল।

“ঠিকই বলেছেন অনেক আজব ঘটনা ঘটে এই দুনিয়ায়। যে মায়া বাঘের কথা আপনি ভাবছেন সে হয়তো আপনার আশেপাশেই কোথাও ঘাপটি মেরে আছে কিংবা মানুষ রূপে আপনার সামনেই রয়েছে, আপনি হয়তো বুঝতেও পারছেন না”, ধ্বক করে জ্বলে উঠল জলিলের চোখজোড়া।

ভয়ের একটা শীতল শিহরন বয়ে গেল রতনের মেরুদণ্ড বেয়ে। একটা অশুভ চিন্তা উঁকি দিচ্ছে মনের ভিতরে। সত্যি না তো কাদের ভাইয়ের কাছে শোনা ঘটনাটা? হয়তো সত্যিই কোন মায়া বাঘ আছে, হয়তো মির্জা আসাদ ওয়ালি নামে সত্যিই কারও অস্তিত্ব আছে যে শহরে এসে প্রতি রাতে নির্মম ভাবে একটার পর একটা হত্যা করছে। জলিলের দিকে তাকাল রতন। কি যেন একটা অশুভ ব্যাপার আছে লোকটার চোখদুটোতে।

 

হঠাৎ মনের মধ্যে উঁকি দিল ভয়ংকর চিন্তাটা, বুঝতে পারল কি ভয়ংকর বিপদের মধ্যে আছে সে। আবার জলিলের দিকে অকাল রতন। এখনও সেই ভয়ংকর হাসিটা লেগে আছে জলিলের ঠোঁটে।

“তাহলে এতক্ষণে চিনতে পারলে আমি কে?”, বাজ পরল যেন লোকটার কন্ঠ থেকে।

ঢোক গিলল রতন। বুঝতে পারছে কাদের ভাইয়ের কাছে শোনা গল্পটা মোটেও বানোয়াট না। কিন্তু বুঝেও আর কোন লাভ নাই, মৃত্যু ওর থেকে মাত্র দুইফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

আবার বিশ্রী করে হেসে উঠল জলিল, কিন্তু এবারের হাসিটা আর ভয়ংকর শোনাল না বরং মনে হল কিছুটা ব্যঙ্গ করে হাসছে জলিল । অবাক হয়ে তাকাল রতন। জলিলের হাসি যেন থামতেই চায়না। হাসির দমকে চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসছে।

“আপনি…আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেছেন। আপনি তো দেখি মিয়া ভয়ে প্যান্ট খারাপ করে ফেলেছেন”, হাসতে হাসতে বললো জলিল।

এতক্ষণে রতন আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল। লোকটা এতক্ষণ যা বলেছে সব মিথ্যা। রাগ হল রতনের। কিন্তু সেটা প্রকাশ করল না।

“তুমি কি মনে করেছ, তুমি যা বলছ আমি তা বিশ্বাস করেছি? তোমার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করিনি। শুধুমাত্র ভয়ের অভিনয় করেছি।” জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল রতন।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে আবার হেসে উঠল জলিল। বুঝিয়ে দিল রতনের কথা সে বিশ্বাস করছে না।

“আমি তোমার কথা এক বর্ণও বিশ্বাস করিনি”, ঝিক করে জ্বলে উঠল রতনের চোখ জোড়া, “আমি প্রথম থেকেই জানি তুমি মিথ্যা কথা বলছ, তুমি মায়া বাঘ না”।

“আচ্ছা, তো কি করে বুঝতে পারলেন আমি মায়া বাঘ না” জিজ্ঞসা করল জলিল।

“ আমি জানি তুমি মায়া বাঘ না”, ঘরঘর করে উঠল রতনের কন্ঠস্বর, “কারণ মায়া বাঘ আমি নিজেই।”

অবিশ্বাস ভরে রতনের দিকে তাকাল জলিল ।

 

হঠাৎ ধ্বক করে জ্বলে উঠল রতনের চোখ জোড়া, চোখ তুলে তাকাল পূর্ণিমার বিশাল চাঁদটার দিকে। ঘনঘন নিশ্বাস নিতে শুরু করল, যা অতি দ্রুত রূপান্তরিত হল চাপা গোঙানিতে। চোখের কালো মণি বদলে গিয়ে হলুদ রং ধারণ করল। হলুদ হয়ে উঠল চামড়া, শরীর ফুঁড়ে বেরুতে শুরু করল থোকা থোকা লোম। কান দুটো আকারে বড় হয়ে উঠল। ফাঁক হয়ে গেল রতনের মুখটা, চোয়ালে ঝিকিয়ে উঠল ক্ষুরধার দাঁতের সারি। রূপান্তরের যন্ত্রণায় হাত দিয়ে মাটি খামচে ধরল রতন, চোখের নিমিষেই ও দুটো পরিণত হল বিশাল রোমশ থাবায়। ধীরে ধীরে রতন পরিণত হল এক বিরাট রয়েল বেঙ্গল টাইগারে।

বিকট এক গর্জন ছেড়ে জলিলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঘরূপী রতন ওরফে এককালের প্রতাপশালী জমিদার, মির্জা আসাদ ওয়ালি।

 

 

 

আগুনটা একটু উস্‌কে দিল রতন। শীতটা যেন আজকে একটু বেশীই পরেছে। হঠাৎ পিছনে একটা শব্দ শুনে চমকে ঘুরে তাকাল। নাইটগার্ডের ইউনিফরম পরা একজন লোক ঠিক তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা একটু হেসে রতনের পাশে এসে বসল।

“নতুন জয়েন করলা মনেহয়” একটু হেসে বলল রতন।

“আজকেই”, প্রত্যুত্তরে বলল লোকটা।

“নাম কি?”

“ইদরিস।”

“ঘটনা শুনছ নাকি?”, একটু উদাস ভাবে জিজ্ঞাসা করল রতন।

“কি ঘটনা?”, জিজ্ঞাসা করল লোকটা।

কাদের ভাইয়ের কাছে শোনা ঘটনাটা বলতে শুরু করল রতন।

চুড়ান্ত ভয়াবহতা……

2

এবার যে গল্পটি বলতে যাচ্ছি তা আমার বন্ধু প্রিন্সের মুখ থেকে শোনা । ও এই গল্পটি ওর মামার কাছ থাকে শুনেছিল ।এই গল্পটি যখনি মনে হয় তখনি আমার সারা শরীর ভয়ে কেঁপে উঠে ।এই ঘটনাটি ঘটে নওগাঁ শহরের একটি রাস্তায় । তখন রাত প্রায় ২ টা বাজে । এই ঘটনাটির স্বীকার একজন সিএনজি চালক । তার নাম হাবিব । হাবিব তখন তার সিএনজি নিয়ে বাসায় ফিরছিল । সে হঠাৎ দেখলো দুইজন মধ্যবয়সী হুজুর ধরনের ব্যক্তি তাকে সিএনজি থামানোর জন্য অনুরোধ করছে । তা দেখে সে থামল এবং একজন হুজুর তার সাথে কথা বললো ।
হুজুরঃ ভাই আমরা খুব বিপদে পড়েছি ।
হাবিবঃ আপনাদের কি হয়েছে জানতে পারি ?
হুজুরঃ সামনে আমাদের এক বন্ধু একটি লাশ নিয়ে দাড়িয়ে আছে । ওই লাশটাকে নিয়ে আমাদের সামনের গ্রামে যেতে হবে । তুমি কি আমাদের পৌঁছে দিতে পারবে?
হাবিব কিছুক্ষণ ভাবলো ।তার মাঝে উনাদের জন্য দয়া হলো ।সে আবার কথা বললো ।
হাবিবঃ আমি আপনাদের পৌঁছে দিব ।
হুজুরঃ ধন্যবাদ তোমাকে ।
এটা বলে দুইজন সিএনজ়িতে উঠে পড়লো । কিছু দূরে যেতেই হাবিব দেখলো আরেকজন
হুজুর লাশ নিয়ে দাড়িয়ে আছে ।লাশটি কাপড় দিয়ে প্যাচানো । হাবিব উনার সামনে এসে সিএনজ়ি থামালো ।এরপর দুই হুজুর নামলো এবং তিন হুজুর লাশটি নিয়ে উঠলো । তারপর তারা হাবিবকে সিএনজ়ি চালাতে বললো । আর একজন হুজুর ওর সাথে কথা বলতে থাকলো ।
হুজ়ুরঃ সামনের গ্রামে যেতে কতক্ষন লাগবে ?
হাবিবঃ প্রায় ৪০ মিনিট ।

হুজুরঃ তুমি পেছনের দিকে চাইবে না । লাশের অবস্থা বেশি ভালো না । দেখলে ভয় পাবে ।

হাবিবঃ আচ্ছা হুজুর ।

তারপর হাবিব সিএনজি চালাতে শুরু করলো । কিন্তু সে লাশ দেখার আকর্ষণ অনুভব করলো কিন্তু সে সাহস পেলো না । এর ৫ থেকে ৬ মিনিট পর সে এক অদ্ভুত বাজে শব্দ শুনতে পারলো ।এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করলো । সে তার মনের ভয় দূর করার জন্য সামনের লুকিং গ্লাস দিয়ে পেছনের দিকে চইলো । চেয়ে যা দেখতে পারলো যা সে কেনো, আমরা কেউ কোনোদিন ভাবতে পারি না । সে দেখলো ওই তিন হুজুর লাশটিকে ছিড়ে ছিড়ে শকুনের মত খাচ্ছে। কেউ কলিজা, তো কেউ বুকের রক্ত পান করছে । তা দেখে সে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।

যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখন সে হাসপাতালে ভর্তি। তার সারা শরীরে ব্যান্ডেজ । তাকে সকালে রাস্তার পাশে একটি খাল থেকে উদ্ধার  করা হয় । এখন সে সুস্থ আছে । কিন্তু ওইদিনের ঘটনার পর থেকে আজও সে সন্ধ্যার পর আর সিএনজি নিয়ে বের হয় না । তাকে আজও ওইদিনের ঘটনা তাড়া দিয়ে বেড়ায় ।