শেষ রাত- নুরুন নাহার লিলিয়ান।

দুই একদিনের ট্যুর। কিছু ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট করতে হবে। নিজের মতো থাকার জন্য সে সব সময় গেস্ট হাউজ অথবা ভাল কোন হোটেল। বিচিত্র রকমের মানুষ। আত্মিয় স্বজন কিংবা বন্ধুদের বাসা। কোথাও রাত্রি যাপন তার পছন্দ নয়।নিজের বাসা তো ভাড়া দেওয়া। বছরের বেশীর ভাগ সময় তাকে এদেশ ওদেশ ঘুরতে হয় গবেষনার প্রয়োজনে।

দিঠি তার বর নাগিবের অদ্ভুত সব একরোখা আচরনে ক্লান্ত হয়ে উঠে। বন্ধু আত্মিয় সবার কাছে তার এই অদ্ভুত আচরনের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। এবার ও বরের সাথে ঝগড়া করতে করতে চিটাগাং থেকে ঢাকা এলো।
বরাবরের মতো ঢাকা বিসিএসআইআর গবেষনাগারের গেস্ট হাউজ। এই গেস্ট হাউজের কেয়ার টেকারের নাম নবাব। এই ছেলেটির আপ্যায়নে নবাবি সটাইল আছে। একবার কোন খাবার যদি বলা হয় ভাল লেগেছে সে সেটারই বারবার আয়োজন করবে। যখন দিঠি প্রথম বার এই গেস্ট হাউজে এলো তখন পাশের রুমে থাকা সাদা চুল ওয়ালী অবসর প্রাপ্ত মহিলা বিজ্ঞানীর সাথে ভাব হল।

ঠিক এবারও সে মহিলা এসেছে গাজী পুর থেকে। দিঠি মনে মনে ভাবলো সে থাকাতে গল্প করা যাবে। তিন তলা গেস্ট হাউজের ডান দিকে খুব সুন্দর কৃষ্ণচূড়া গাছের সাথে অদ্ভুত একটা সুপারি গাছ। এই জায়গাটায় বসলে মনটা বাতাসে হাল্কা হয়ে যায়। জীবন থেকে জীবনের হারিয়ে যাওয়া অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। লং জার্নির ক্লান্তিতে আর তার সাথে এ রাতে কথা হলো না। তারাতারি ঘুমিয়ে পড়াতে শেষ রাতে ফজরের আযানে ঘুম ভেঙে গেল।

দিঠির কিছু ভাল লাগছিল না। দরজা খুলে বারান্দায় গেল। সেই সুপারি গাছের সামনে চেয়ার নিয়ে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে সাদা চুলের বৃদ্ধা। দিঠি ঘুম চোখে এগিয়ে যাওয়াতে সে মনে হলো রেগে দাড়িয়ে গেল। তার শরীর থর থর করে কাপছে। ডেঙ্গু জ্বরের কারনে যেমন চোখ হয় রক্তিম।

ঠিক তেমন নয় বরাবর দাড়ানো অবস্থায় দেখলো ঘন রক্ত দু চোখ দিয়ে গড়িয়ে নামছে। দিঠির হাত পা অবশ হয়ে গেল। কি করবে বুঝতে পারলো না। শেষ রাতের গল্প টা ভিষন ভয়ংকর হয়ে উঠলো। সে কঠিন কণ্ঠে বলল, “আপনি ভিতরে যান।”
দিঠি হাপাতে হাপাতে রুমে ফিরে এলো। দেখলো বরের পিঠ জুরে শুধু আচরের লাল দাগ। দিঠি ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করাতে ঘুমের মধ্যেই বর বলল,ঘুমের মধ্যে হয়তো আমি নিজের পিঠ নিজেই আচরেছি। কাল নখ কাটতে হবে। দিঠির ভিতর থেকে ভয় যেন নামছে না। ফজরের নামাজ পড়ে আয়তুল কুরসী পড়ে নিজেকে এবং ঘুমন্ত নাগিব কে ফু দিল। সকালে নবাবকে সে মহিলার কথা জিজ্ঞেস করাতে জানালো সে গাজীপুর চলে গেছে।
দিঠির আর জিজ্ঞেস করা হলো না শেষ রাতের গল্প করতে সেই এসেছিল নাকি।

দিঠি জানে সায়েন্টিস্ট বরের কাছে আধি ভৌতিক যন্ত্রনার গল্প শেষ রাতের গল্পের মতোই। ভোরের আলোর সাথে সব ফুরিয়ে যায়।
তখন থেকেই দিঠির গায়ে প্রচণ্ড জর। চোখের সামনে থেকে সাদার চুলের বৃদ্ধার রক্তিম চোখ দুটো স্থির হয়ে রইলো। ট্রেন চলছে চিটাগাংয়ের পথে। দিঠি টের পেল এসি থাকার পরও জামার ভিতর দিয়ে ঘাম টপ টপ করে পড়ছে।

One thought on “শেষ রাত- নুরুন নাহার লিলিয়ান।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.