ভুতুড়ে ঘড়ি

(অন্য ব্লগ এ পুর্বে প্রকাশিত)

আমাদের গ্রামে একটা বড় বাগানবাড়ি আছে। মুখার্জিবাড়ি। তবে লোকে ওটাকে বলে পোড়াবাড়ি। বছর ত্রিশ-চল্লিশ আগে এই বাড়িতে মুখার্জি পরিবারের সব সদস্য আগুনে পুড়ে মারা যায়। সেই থেকে এটার নাম পোড়াবাড়ি। এলাকায় এটা ভুতুড়ে বাড়ি নামেও পরিচিত। পরিচিতির কারণ, এ বাড়িতে আছে একটি বড় দেয়ালঘড়ি। আগুনে সবকিছু পুড়ে গেলেও কোন এক রহস্যময় কারণে এই ঘড়িটি পোড়েনি। অনেকে নাকি রাতে এই ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজও শুনেছে। তাই রাতে তো বটেই, বিকেলের পর ওদিকের পথ আর কেউ মাড়ায় না। একদিন বন্ধুদের সঙ্গেবসে মাঠে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ নরেন বলল, জানিস, গতকাল বিকেলে ওই পোড়াবাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমিও ওই ঘড়ির ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। আমি বললাম, যা যা, গুল মারিস না। তেল নেই, চাবি নেই, ওই ঘড়ি চলছে কি না তারও ঠিক নেই, আর উনি ঘণ্টার আওয়াজ শুনেছেন! আরে গিয়ে দেখ, এত দিনে হয়তো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। নরেন বলল, তাহলে কি আমি তোদের মিথ্যা বলছি? আমি বললাম, তোর মতো ভীতু কি মিথ্যা ছাড়া সত্য কথা কখনো বলবে? নরেন রেগে বলল, তা তুই তো খুব সাহসী, যা না, গিয়ে পোড়াবাড়িতে ঘড়িটার সঙ্গে একটি রাত কাটিয়ে আয়। নরেনের সঙ্গে এবার সবাই যোগ দিল, হ্যাঁ, ঠিকই তো। যা, গিয়ে থেকে আয়। বন্ধুমহলে আমি একটু সাহসী হিসেবেই পরিচিত, তাই তাচ্ছিল্যের স্বরে বললাম, হ্যাঁ, থাকবই তো। তবে থাকতে পারলে তোরা আমাকে কী দিবি ? সাগর বলল, তোকে আমরা এক হাজার টাকা দেব। তবে তুই যদি হেরে যাস তাহলে তুই আমাদের এক হাজার টাকা দিবি, রাজি? বেশ, আমি রাজি। সে রাতেই আমি পোড়াবাড়ির দিকে রওনা হলাম, সঙ্গে নিলাম পাঁচ ব্যাটারির টর্চ, কম্বল, বালিশ, দুটো মোম, ম্যাচ আর একটা ছোট ছুরি। অমাবস্যার রাত। বলা তো যায় না কী হয়। তাই আর ঝুঁকি নিলাম না। পোড়াবাড়ির জলসাঘরের ঘড়িটার সামনে আমি আমার বিছানা পাতলাম। মোম দুটি ধরিয়ে দিলাম। কিন্তু তাতে অন্ধকার কাটল বলে মনে হলো না। ঘড়ির দিকে একপলক তাকালাম, নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই ঘড়ি নাকি ঘণ্টা পেটায়—ভাবতেই হাসি পেল। রাত যেন কাটছে না। হাতঘড়িতে রাত ১২টা বাজার শব্দ শুনতে পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার মোমবাতি দুটো নিভে গেল। অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরোঘর। ঢং-ঢং- ঢং। একি! এ যে ঘণ্টা পেটার আওয়াজ! কিন্তু ঘড়িটা তো নষ্ট! তবে কী… হাতড়ে হাতড়ে টর্চটা অন করলাম। জ্বলছে না কেন? ঘড়ির ঘণ্টার শব্দ যেন আমার বুকে আঘাত করছে। আমার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।এই শীতের রাতেও আমি ঘেমে গেলাম। বাইরে চাঁদ উঠেছে। আজ না অমাবস্যা! অমাবস্যায় চাঁদ উঠল কী করে? ভয়ে আমি বারবার কেঁপে উঠছি। এই বাড়ি ছেড়ে পালাব, তারও উপায় নেই। দরজা দুটো খুলছে না। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি। একি! আমার বিছানা যে হাওয়ায় উড়ছে! বাঁচাও বাঁচাও বলে কয়েকবার চিৎকার দিলাম। কেউ মনে হয় তা শুনতেও পায়নি। হঠাৎ দেখি ঘড়িটা আলোকিত হয়ে উঠল। ঘড়ির উজ্জ্বল আলোয় পুরো ঘর আলোকিত হলো। আস্তে আস্তে ঘড়িটা আমার দিকে এগিয়ে এল। ভৌতিক গলায় বলল, আমি নষ্ট? তেল নেই, চাবি নেই, আমি চলব কী করে? তুই আমাকে অপমান করেছিস। আর যে আমাকে অপমান করে, তার শাস্তি মৃত্যু। হা-হা-হা! হঠাৎ আমার বিছানাটা গায়েব হয়ে গেল। আমি নিচে পড়ে যেতে লাগলাম। নিচে, আরও নিচে। সেখানে শুধুই অন্ধকার। বিজয়, এই বিজয়, বিজয়! কী ঘুমরে বাবা! কতক্ষণ থেকে ডাকছি, শুনতে পাস না? নরেন বলল। দেখলাম অপু, সাগর ওরা সবাই এসে ঘরে ঢুকেছে। আমি ভয়ে ভয়ে একবার ঘড়িটার দিকে তাকালাম। ঘড়িটা যেমন ছিল তেমনই আছে। তবে কি সারা রাত আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?

পরিশিষ্ট: বন্ধুদের অনেক সাধাসাধির পরও আমি বাজির টাকা নিলাম না। সাগর বলল, তুই তো পোড়াবাড়িতে থাকতে ভয় পাসনি, তাহলে টাকা নিবি না কেন? আমি ভয় পেয়েছি কি পাইনি, তা তো আর আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। মনে মনে বললাম আমি।

(লেখক এর নাম পাওয়া যায় নাই।)

(ভূতুড়ে গল্প)

2 thoughts on “ভুতুড়ে ঘড়ি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.