বারান্দার ওপাশে ॥ দুই ॥ Collected Story


কি আশ্চর্য ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। রাগ হচ্ছে আমার। বিরক্ত হচ্ছি। থপথপ শব্দটা এখন ও বন্ধ হয়নি। বিরক্তির মাঝে সে শব্দ যেন আগুনে ঘি এর কাজ করলো। আর শুয়ে থাকা গেলোনা। উঠে গিয়ে হাজির হলাম বারান্দায়। একরাশ আঁধার সাথে সাথেই গ্রাস করতে ছুটে এল। অন্য যেকোন রাতের চেয়ে পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অথবা ভিন্ন আমার দৃষ্টি। ঘন্টা খানেক আগেও জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। এখন প্রায় থেমেই গেছে। হাতটা বাড়িয়ে দিতেই দু একটা নাবালক ফোঁটার অস্তিত্ব টের পাওয়া গেলো। ভেজা আমেজটা আছে, বেশ ঝিরঝিরে বাতাসে বইছে। সে বাতাসে নিশির শীতল দেহের উষ্ণ অভাব বোধ বেড়ে যেতে চাইছে একটু বেশী। অন্যরকম মনে হচ্ছে সত্যি পরিবেশটাকে। অন্ধকারটাও যেনো একটু বেশি বেশি।

বারান্দার সামনের গলিটা একটা অন্ধ গলিই বলা চলে। আমাদের বাড়ীর এই বারন্দাটা দক্ষিন দিকে আর বাড়ীর মেইন গেট পূর্বে, গেটের সামনেই বড় রাস্তা চলে গেছে , সেটারই একটা শাখা এই গলি। গলিটার সামনের ডানপাশের বাড়ীটার পাশেই একটা প্লট খালি। সেখানের বুনো ঝোপঝাড়ের পাতগুলো ভীষণ কালা কালো দেখাচ্ছে। মনে পড়ছে ওটার বামপাশেই ল্যাম্পপোষ্টটাতে সোডিয়ম বাতি জ্বলে রোজ। আজ জ্বলছেনা। ওটা জ্বললেও অন্ধ গলির শেষমাথায় এই বাড়িক’টা একটু নির্জনতায়ই ডুবে থাকে। নিশির বিহনে আঁধার নিশি যেনো আমাকে টানছে কাছে। দু’একটা জানালায় হালকা নীল বা লাল আলো জ্বলছে। তাতেই পথটা একটু আধুটু চিকচিক করে উঠছে; ভেজা পথতো। কিন্তু না কোথাও কেউ হাঁটছেনা। কোন জনমানবের কোন চিহ্নই নেই। শব্দ আবার কানে আসতেই চোখ চলে গেলো সামনের খালি প্লটের দিকে। আমাদের পাশের বাড়ীটা  তিন তলা করার সময় ওখানে একটা একচালা টিনের ঘর করা হয়েছিল, মালসামান রাখার জন্য। মিস্ত্রীরাও থাকত। তারই কিছু ভাঙা বেড়া , চাল বাঁশ এখনও বিমুর্ত হয়ে পড়ে আছে। ভাঙা চালের কোন এক কোনে পানি জমেছে , সেখানথেকেই চুয়ে চুয়ে পানির ফোঁটা পড়ছে নিচে। নিচে  তো থাকার কথা মাটি খোয়া বা ঘাস লতা। টুপটুপ শব্দ থপথপ হয়ে গেলো কেনো?  ধূর! এই শব্দ নিয়ে এত ভাবার কি আছে, শব্দ তো কত রকমই হতে পারে। নিচে প্লাস্টিক বা কাঠ টাঠ কিছু পড়ে আছে মনে হয়, সেখানে পানির ফোঁটাগুলো পড়ছে নির্দিষ্ট সময়ের বিরতি দিয়ে আর এই সুনশান পরিবেশে সেই শব্দ আমার কানে ওমন ভয়াবহ হয়ে ধরা পড়েছে। তাই হবে। চিন্তুা মুক্ত হয়ে এবার ঘুমানো উচিৎ। কিন্তু নিশি এখনও মোবাইল বন্ধ করে রেখেছো কেনো? মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে একটা ঝগড়ার ভাব আসছে আমার।

সামনের বাড়িটার দোতলায় চোখ গেলো ঘোরার মুহুর্তে । ক’দিন আগে ঠিক এইরকম সময়েই তো ঝগড়া বাধিয়েছিল। সেদিন কৌতূহল হয়নি। আজ হচ্ছে । আজ কেনো আবার ঝগড়া করছেনা। কান পেতে মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, শিখতাম একটু। এত ঘুম কেনো আজ ও বাসায়? সব ঘরের আলোই বন্ধ। এত ঝগড়ার পর আবার সকালে কি করে ওমন ঢেউ খেলোনো মধুর প্রেমের বাতাস বয় দুজনার মনে? খটকা! পরীক্ষা একটা করেই দেখতে হবে। আমার দ্বারা কি একসাথে ওমন দুটো ভিন্ন ডাইমেনশনে রূপদান করা আদৌ
সম্ভব? মনে হয়না।

ঘুরে দরজায় পা বাড়াতে গিয়েই চোখ আটকে গেলো । বারান্দার কোল ঘেঁষে নিচে সোজা নেমে গেছে দু দুটো পাইপ। বেশ মোটাই এবং লোহার।
বিল্ডিয়ের ডিজাইন হিসাবে খাঁজগুলো পাইপের সাথে সাথে এমনভাবে মিলেছে যে সহজেই পাইপ বেয়ে কেউ উঠে আসতে পারবে। একবার চেষ্টা করে দেখবো নাকি? সাহস কিন্তু পাচ্ছি। ঐ খাঁজটা ভেঙে দিলেই তো হতো…কিন্তু কোনদিন চোখে পড়েনি কেনো? নিশির চোখ তো এড়ানোর কথা না। নিশির চোখ যখন এড়িয়ে গেছে, চোরের চোখতো এড়াবেই।

হু হু করে জোড়ালো এক পশলা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগলো মুখের বাম পাশে। একটু অবাক হলাম। মনে পড়ল, নিশি বলেছিল, কোন এক রাতে-এমন এক পশলা বাতাসের হঠাৎ ঝাপটা নাকি বিপদের সংকেত। কতনা কুসংস্কার বিশ্বাস করে মেয়েটা! আমি কখনও বিশ্বাস করিনা। দূর বলে উড়িয়ে দেই। বাতাসের কাজ আসা যাওয়া , তাই তার যেভাবে ইচ্ছে আসবে , তাতে ঘটনার সম্পর্ক যুক্ত করা কেনো বাবা? কিন্তু নিশি মানেনি। পরদিন সকালে যখন বিল্ডিংয়ে কাজ করতে গিয়ে একটা লোক পড়ে গেলো, নিশি চেয়ে চেয়ে দেখলো। বলল, ওটাই সেই বিপদ, রাতের বাতাসের। কি ভীষন ভয় পেয়েছিল সেদিন নিশি। কম করে হলেও ১০ দিন ও জানালার পাশে যায়নি। আমি কিন্তু মানিনি। তিনতলা থেকে মিস্ত্রী পড়ে যাবার উপযুক্ত কারন ছিল। পুরাতন রশি দিয়ে বাঁশ বেঁধেছিল। নিজের দোষে নিজে পড়েছে। বাতাস মিয়া এখানে কি দোষটা করল কে জানে? নিশিকে কে বোঝাবে?  জানি বোঝাতে পারবনা, তাই ওর বিশ্বাসে বেশী জোড়ে হাতুড়ি চালাইনি। কটা ভাঙব। ওমন শত শত কুসংস্কার ওর মনে। আর ভেঙেও লাভ কি? ঐ যে কথায় বলে না…বিশ্বাসে মিলায় বস্তু..  বিশ্বাস নিয়েই তো সুখী আমার নিশি। তাই ও যখন গলিতে কোন হৈচৈ শুনে বারান্দায় গিয়ে কান পাতে সন্ধার পরে আমি আর মনে করিয়ে দেইনা হঠাৎ ভুলে যাওয়া তার কুসংস্কার- “সন্ধ্যায় মেয়েদের খোলা চুলে আকাশের তলে দাঁড়াতে নেই।” সাময়িক কুসংস্কার ভুলে হৈচৈ এর কারন অনুসন্ধানে যে আনন্দ পাচ্ছে, পাক না।

একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল যেনো আশেপাশে, থপথপ শব্দর সাথে মিশে সে কান্না পরিবেশটাকে কেমন জানি ভূতুড়ে করে তুলল। আমার মনেও কুসংস্কার চলে আসতে চাইলো সে শব্দে। আবার কান্নার শব্দ। আরে দূর! বাচ্চা হবে কেনো? ওটা তো বিড়ালের কান্না। নিশিও একবার বেশ ভয় পেয়েছিল ও কান্না শুনে। আমি যতই বলি বিড়াল, ও মানবে না। সেই রাত দুটোর দিকে দারোয়ানকে ডেকে তুলে খুঁজতে যেতে হলো কোথায় বাচ্চা কাঁদছে। কেউ আশে পাশে বাচ্চা টাচ্চা ফেলো দিয়েছে হয়তো, ও ভাবলো তাই। আমি একাই যেতে চাইলাম। না কিছুতেই একা দেবে না যেতে। দারোয়ানকে নিয়েই যেতে হবে। এই এক জ্বালা। নিজে কুসংস্কার বিশ্বাস কর ভাল, আমাকেও করতে হবে কেনো? অবশ্য এর একটা ভালো দিক আছে- অনাহুত বিপদ এড়ানো যায়।

2 thoughts on “বারান্দার ওপাশে ॥ দুই ॥ Collected Story

  1. ভুতের ভাইজান গল্পের প্রথম পর্ব পরে পরের পর্ব কবে আসবে সেই চিন্তা ছিলনা। কিন্তু এখন বলতেই হচ্ছে পরের পর্ব কবে দিবেন ভাই?????

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.