ডাকিণী (৮ম পর্ব)

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

পৃষ্ঠাটি শেষ করে বিড়বিড় করে বললাম, হায় আলেস। এসব বিচারের নামে প্রহসন তোমার জন্মের আগেও মানব সমাজে ছিলো, তোমার মৃত্যুর পরে এখনো টিকে আছে। তোমার আগে সক্রেটিস, গ্যালিলিও, পিথাগোরাস প্রমুখ এর শিকার হয়েছেন। তোমার পরে, আমেরিকার লুথার কিং, ইতালির মোসলিনী, মার্কো, প্রমুখ। এমনকি এই কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাংলাদেশে মানবতাবিরোধীদের বিচারের নামে প্রহসন হয়ে গেছে। মানব সমাজে কোন কালেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত ছিলো না, আর কখনো হবেও না। তাই বলে তুমি মরে গিয়েও এই কর্টেজকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে? পরপারে তোমার জন্যে নতুন জীবন অপেক্ষা করছে। হয়তো ওখানে মার্টিনী তোমার পথ চেয়ে আছে। তুমি যাচ্ছ না কেন? লাইব্রেরীর এক কোন থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। দরজায় লেখা ভাসলো, “মুক্তি দাও আমায়।” এবার আমি গলা চড়িয়ে বললাম, কিন্তু কিসের মুক্তি? কার থেকে মুক্তি? প্রত্যুত্তরে বাইবেলের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন লেখা বেরুলো।
আলেসের লেখায়,
“বাহ। আজ সকাল হতে না হতেই এক প্রহরী এসে আমায় কতগুলি ফল, পানি, আর রুটি দিলো। প্রথমে এদের এই আকর্ষিক মহানুভবতার কারণ বুঝতে না পারলেও এখন ভালই বুঝতে পারছি। চারদিন পর যখন আমার লাশটা শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হবে তখন সে জীর্ণশীর্ণ দেহ থেকে যথেষ্ট যৌন সুখ নাও পেতে পারে। তাই এই চারদিন আমাকে খাইয়ে দাইয়ে কিছুটা ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। আমি গতরাতে আমার ডাকিণী হওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছি। আমার ডাকিণী হওয়ার আসল কারণ হল আমার বাবার ফেলে যাওয়া পারিবারিক সরাইখানাটি। আমাদের সরাইখানাটি শহরের প্রায় তোরণদ্বারে অবস্থিত। শহর থেকে যারাই বেরুয় বা যারাই শহরে নতুন আসে তারা সবাই এই সরাইখানায় রাত কাটাতো। ফলে আমাদের প্রচুর মুনাফা হতো। বাবার মৃত্যুর পর ওটা আমার মালিকানাধীন ছিলো। এমতাবস্থায় যেহেতু আমার কোন সন্তান বা উত্তরাধিকারী ছিলো নাহ তাই আমি মারা গেলে সরাইখানাটি পরিতাজ্য সম্পত্তি হিসাবে গির্জার অধীনে চলে যাবে। গির্জার প্রিস্ট ও সেবকদের জন্যে অতিরিক্ত আয়ের উৎস খুলবে। তাই শুধু এই সরাইখানাটির মালিকানার জন্যেই আমি আজ এক ভয়ঙ্কর ডাকিণীতে পরিণত হয়েছি। এসব বিচার, ডাকিণী অপবাদ, কেবল লোক দেখানোর নাটক বৈকি আর কিছু নয়। সবই স্পষ্টত ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমি এতে এতটাই জড়িয়ে গেছি যে মৃত্যুর পরেও আমি এ থেকে বেরুতে পারব নাহ। রবিবার প্রার্থনার পর ফাঁসির দড়ি আমাকে এখান থেকে মুক্তি দিতে আসবে নাহ। আসবে আমাকে এখানে চিরতরে বেধে রাখতে। চারিদিকে কেবলি অন্ধকার। আমি একা একা এর মধ্যে কেবলই তলিয়ে যাচ্ছি, আরো গহীনে। কপালে দাসত্বের চিহ্ন নিয়ে। ”
পরের পাতায়,
” আজ দুপুরে ওরা আমায় সেই পুকুরে নিয়ে গেছিলো গোছল করাতে। কাল যে আমাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। তাই আজ শরীরটাকে একটু ঘসা মাজা করে একে প্রিস্টের যৌন শুদ্ধিকরণের জন্যে তৈরি করে নিতে হবে তো। আমি গোসল করতেই চাইছিলাম নাহ। কিন্তু আমাকে গোসল করানোর জন্যে দুজন বিশালদেহী মহিলাকে নিয়োগ দিয়েছে। ওদের সাথে জোরাজোরি করার শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট নেই। তাই বাধ্য হয়েই সুবোধ মেয়ের মতো গোসল করে নিলাম। ওরা আমার সারা দেহকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরিষ্কার করে দিলো। ওরা আমার স্তন যৌনি নিতম্বে সবচেয়ে বেশী মনযোগ দিয়ে পরিষ্কার করলো। বুঝলাম এরা প্রফেশনাল। এদের কাজই হল মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মেয়েদের দেহকে প্রিস্টের বিকৃত কামনা পুরণের জন্যে তৈরি করা। ওদের একনিষ্ঠ পরিশ্রমে আমার জীর্ণ দেহটা খানিকটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ঊঠলো। কিন্তু কপালে আংটির পোড়া দাগটা থেকেই গেল। এত সহজে যাবে বলে মনেও হয় না। একটা ছোট্ট আংটি, কিন্তু ক্ষতটা পুরো কপাল ভরে ছড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কপালে কেউ একটা পুকুর খুঁড়েছিলো। আর যন্ত্রনার কথা না হয় নাই বললাম। পুরো মাথা ঝিমঝিম করতেছে। মেঝে থেকে মাথাটা তুলতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে যেন। বাকিটা দিন আমি শুয়েই কাটালাম। কিন্তু মনেই হলো নাহ যে আমি পবিত্র গীর্জায় শুয়ে আছি। মনে হচ্ছিল যেন আমি নরকের তপ্ত অগ্নি পিন্ডে ঝলসে যাচ্ছি। অনুভব করলাম নরকের কীট এই লোকগুলি পবিত্র গীর্জাকেও নরকে পরিণত করে ফেলেছে। ছোটবেলায় যখন আমি এ গীর্জার শিক্ষানবিশ ছিলাম তখন আমাদের রোজ সকালে বলা হতো, ” ঈশ্বর এই গীর্জার পুজো বেদীর উপর স্থাপিত ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে আছেন। যাও, তাকে ফুল দিয়ে সম্মান জানাও।” কিন্তু আজ বুঝলাম ঈশ্বর কখনোই কোন গীর্জায় থাকেন নাহ। গির্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীটগুলি বাস করে। আর ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে।”
ডায়ারীটা সমাপ্ত। আলেসের আর কোন লেখা খুঁজে পেলাম না। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। ওর শেষ উক্তিটি বারবার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। ঈশ্বর গীর্জায় থাকেন নাহ। গীর্জায় প্রিস্টের মতো কতগুলি ছদ্মবেশী নরকের কীট বাস করে। ঈশ্বর থাকেন বিশ্বাসীদের হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে! ও এক চিরায়ত সত্য কথা বলেছিলো যা প্রায় সব ধর্মের জন্যেই প্রযোজ্য। খৃষ্টানদের গীর্জা, মুসলমানদের মাজার, বৌদ্ধদের পাগোডা, হিন্দুদের মন্দির এগুলি শুধুই মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বানানো এক একটা ব্যাবসা প্রতিষ্টান ছাড়া আর কিছুই নয়। এগুলিতে কখনই ঈশ্বর থাকতে পারেন নাহ। মনে পড়লো বাংলাদেশে থাকতে আমি একবার শাহজালালের মাজারে গিয়ে ১০০ টাকা দিয়েছিলাম। নিজের বোকামির কথা মনে পড়ায় নিজেকেই ধিক্কার দিলাম। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি। আলেস কেন এই কটেজে আটকে আছে? কেন পরপারে যেতে পারছে নাহ! কিসের মায়ায় ও এখানে এতদিন ধরে পড়ে আছে? যাহোক গত রাত আমি লাইব্রেরীতে কাটিয়েছি আলেসের ডায়ারীটা পড়ে পড়ে। আজকের রাতটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমার ঘুমানোর প্রয়োজন। লাইব্রেরীর আলো নিভিয়ে আমার বেডরুমের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু তখনো লাইব্রেরীতে একটা নারী কণ্ঠ কেঁদেই যাচ্ছিলো। একটানা বিলাপের সুর। আমি ওকে কাঁদতে দিলাম। ওর উপর দিয়ে সীমাহীন ঝড় বৃষ্টি বয়ে গেছে। প্রাণ খুলে কাঁদলে হয়তো ওর দুঃখের বোঝাটা কিছুটা হলেও হালকা হবে। নিজের বেডরুমে এসে দেহটাকে বিছানায় ছুড়ে দিলাম। মনে হল সমগ্র পৃথিবীটাই নরকের মতো অশান্তিপূর্ণ। শুধু বিছানাটা ছাড়া। বিছানার প্রশান্তিতে মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

2 thoughts on “ডাকিণী (৮ম পর্ব)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.