ডাকিণী ৪৯তম পর্ব (ঘ অংশ)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
আমার পীড়াপীড়িতে ও অবশেষে রাজি হলো। প্রথমে ওকে নিয়ে গেলাম, মন্টগোমেরী সিনেমা হলে। বিশাল থ্রিডি
স্কিনের সামনে একটা রোমান্টিক মুভি দেখলাম আমরা। তারপর গেলাম শপিংমলে। ওর জন্যে নতুন কাঁপড় চোপর কিনে আনলাম। ও সারাটাক্ষণ আমায় একের পর এক প্রশ্ন করে ব্যাতিব্যাস্ত করে রাখলো।
আলেস: “ওই দেখো দেখো, একটা উড়ন্ত দানব, ওটা কি মানুষ খায়? ”
আমি: “আরে দুর। ওটা তো পুলিশের টহল হেলিকপ্টার। ওটা মানুষ খেতে যাবে কেন? বরং মানুষই ওটার ভেতরে করে উড়ে বেড়ায়।”
আলেস: “ওহ আচ্ছা, কিন্তু এই লোকটা এভাবে বেকায়দায় দাড়িয়ে আছে কেনো? ওকে কি কেউ জাদুবলে আটকে দিয়েছে? ”
আমি: “আরে নাহ। ওটা দোকানের ডামি। ওটার পড়নের কাপড়টা তুমি পড়লে কেমন লাগবে তা বুঝাতেই ওটা ওখানে রেখেছে।
আলেস: “কে এতো সুন্দর করে পুতুল বানায়? প্লীজ ওকে পেলে বলবে যেনো আমার চেহারার এরকম একটা পুতুল বানিয়ে দেয়।”
সেরেছে। একে নিয়ে শপিংমলে বেশীক্ষণ ঘুরাঘুরি করা যাবে না। প্রশ্ন করতে করতেই প্রাণবায়ূ বের করে ফেলবে।
আমি: “আচ্ছা আলেস। এখন এই কাপড়ের প্যাকেটগুলি নাও। আজ সম্ভবত পুতুল বানানোর লোকটা আসে নি। কাল ও এলে তোমার চেহারার একটা পুতুল বানিয়ে দিতে বলব। কেমন? এবার চল, এখান থেকে যাওয়া যাক।”
ও আর আপত্তি না করেই শপিংমল থেকে আমার সাথে বেরিয়ে এলো। যাক বাবা। উফ। মলের ভেতর মানুষ গিজগিজ করছিলো। এসব প্রশ্ন ওরা শুনলে নিশ্চিত টিটকারি মারতো।
মল থেকে বেরুতে বেরুতে প্রায় দুপুর হয়ে এসেছিলো। আমরা ভালো দেখে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে লাঞ্চ করলাম। লাঞ্চ শেষে আমরা স্থানীয় একটা স্টেডিয়ামে গেলাম রাগবি খেলা দেখতে। খেলা শুরু হতেই আলেসের উচ্ছাসটা আর দেখে কে! ও চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিচ্ছে।
আলেস: “মারো, মারো, আরো জোরে মারো। মেরে ফেলো ওদের। এইতো ভালই কুস্তি লড়ছো! ”
আরে! কি আশ্চর্য! ও রাগবিকে কুস্তি ভেবে বসে আছে। হিহিহিহিহি।
আমি: “আরে আলেস! ওরা কুস্তি লড়ছে না তো। ওরা রাগবি খেলছে। দেখো। ঐ যে একটা ছোট্ট বল দেখছো, ওটা ওরা একে অপরের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বারের ভেতর ঢুকিয়ে গোল দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
আলেস: “তুমি বলতে চাইছো যে ওরা মারামারি করছে না? ”
আমি: “অবশ্যই না। ওরা খেলছে।”
আলেস: “তাই? এযুগে কি কেউ মারামারি করে না? ”
আমি: “একদম যে করে না তা কিন্তু নয়। করে। কিন্তু খুব কম। অন্যায়ভাবে মারামারি করলে শাস্তি পেতে হয় যে।”
আলেস: “কে শাস্তি দেয়? প্রিস্ট? ”
আমি: “কি যে বলো, এ যুগে প্রিস্টের টাইম আছে না কি? এখনকার যুগে প্রিস্টদের আমরা থোড়াই কেয়ার করি। এযুগে বিচার আচার সব বিচারালয় থেকে বিচারকেরা নিয়ন্ত্রণ করেন। ওরা সেই শয়তান প্রিস্টের মতো নয়। ওরা অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও উচ্চশিক্ষিত।”
আলেস: “ওহ তাই? ভালোই তো। আচ্ছা, এ যুগে প্রিস্টের মতো কোন শয়তান নেই? ”
আমি ঠিক এই প্রশ্নেরই ভয় করছিলাম। আমি ওকে কোন মুখে বলবো এই আধুনিক সমাজে এখনো প্রিস্টের মতো নরকের কীটরা ভাল মানুষের মুখোশ পড়ে সমাজের উঁচু তলায় বসে সমস্ত কলকাঠি নাড়ছে।
আমি কথা কাটিয়ে বললাম, “আলেস, এসব খেলা দেখতে আমার ভালো লাগছে না। চল না বীচ থেকে ঘুরে আসি। আজ দুজনে মুক্ত সাগরে অনেক্ষণ সাঁতার কাটবো। চল না প্লীজ।”
আলেস: “ঠিক আছে। চল যাই।”
গাড়ি নেই বলে অনেকটা পথ হেটেই বীচে যেতে হলো। পথিমধ্যে একটা বীমা কম্পানিতে ঢুকে আমার কটেজটার বীমা করিয়ে নিলাম। বীমা না থাকায় গাড়িটা গেছে। এখন কটেজটাই শুধু বাকী আছে। ওটার নিশ্চয়তার জন্যে বীমাটা করিয়ে নিলাম। আলেসকে নিয়ে বীচে পৌছতে পৌছতেই বিকাল চারটা বেজে গেলো। আজ আমরা কেউই বিকিনি আনি নি। আসলে সকালে বেরুনোর সময় বীচে আসার প্ল্যানই ছিলো না। তাই বলে কি সাগরতীরে এসে সাঁতার না কেটেই চলে যাবো? কক্ষনো নয়। পরনের ধোপাদুরস্তর পোশাক নিয়েই আমরা দুজন জলে নেমে পড়লাম। জলে নেমে সাতরে আমরা দুজন তীর থেকে কিছুটা দুরে নির্জনে চলে এলাম। এবার আলেস আমায় জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। আমরা দুজন জড়াজড়ি করে কিছুক্ষণ একসাথে সাঁতার কাটলাম। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দিলাম। আবার সাঁতরে তীরে ফিরে এলাম। এবার যাওয়ার পালা। যাওয়ার সময় আলেস আংটিটা খুলে সাগরে ছুড়ে ফেলতে চাইছিলো। আমি খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেললাম।
আমি: “এটা কি করছো আলেস? ”
আলেস: “আংটিটা ফেলে দিচ্ছি। ওটা আমায় আবার আটকে ফেলবে।”
আমি: “ওটা ফেলে দেওয়ার কি দরকার? বরং আমায় দিয়ে দাও। তোমার ওটার প্রয়োজন না থাকলেও আমার তো থাকতে পারে। ”
আলেস: “ঠিক আছে। এই নাও।”
আলেসের কাছ থেকে আংটিটা নিয়ে আবার আমার মধ্যমায় পড়ে নিলাম। কটেজে আর কোন অশরীরী নেই। তাই এটা পড়া অনেকটাই নিরাপদ।? তাছাড়া কে জানে, হাজার বছর পরে হয়তো কোন একদিন ওটা ব্যবহার করে আমিও আলেসের মতোই আবার ফিরে আসবো।
সারাটা দিন বাহিরে ঘুরেঘুরি করার পর ক্লান্ত হয়ে বিকাল ৭টার দিকে আমরা আবার কটেজে ফিরে আসলাম। কটেজে ফিরেই আলেস বলল, “কাল তুমি কষ্ট করে ডিনার রেঁধেছ। আজ আর তোমায় কষ্ট করতে দিচ্ছি না। আজ আমিই ডিনার রাঁধব। আমাদের সময়কার কিছু জনপ্রিয় ডিশ খেতে নিশ্চই তোমার তেমন খারাপ লাগবে না? ”
আমি: “অবশ্যই খারাপ লাগবে না প্রিয়া। তুমি যা রাঁধবে তাই সই।” চল, তোমায় রান্নার জিনিসপত্র সব দেখিয়ে দিচ্ছি।”
আলেসকে স্টোভের ব্যবহার, ফ্রিজ খুলে কাঁচামাল বের করা ইত্যাদি কসরত দ্রুত শিখিয়ে দিয়ে আমি বেডরুমে ফিরে এলাম। ও একা একাই রান্না করুক, আমি থাকলে বরং অস্বস্তিবোধ করতে পারে। বেডরুমে ফিরে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে বাথরুমে গেলাম গোছল করতে। বাথরুমে গোসল করার এক পর্যায়ে আয়নার দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম! আরে! মনিকা যে! ও এখানে আসলো কি করে! কিন্তু পরক্ষণেই ওর প্রতিচ্ছবিটা আয়না থেকে মুছে গেলো। আমি স্তম্ভিত হয়ে আয়নার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঠিক তখনই কিচেন থেকে আলেসের চিৎকার ভেসে এলো। আমি বাথরুম থেকে হতদন্ত হয়ে বেরিয়েই কিচেনের দিকে ছুটলাম।
দৌড়ে সেখানে যেয়ে দেখি আলেস অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। মাথার কোনটা কেটে রক্ত বেরুচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপারটা হলো ডীপ ফ্রিজের ডালাটা খুলে হাঁ হয়ে আছে। ঠিক যে ফ্রিজটায় আমি মনিকার লাশটা ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। আমি ফ্রিজের ডালাটা নামিয়ে দিয়ে অজ্ঞান আলেসকে কিচেন থেকে আমার বেডরুমে বয়ে আনলাম। তারপর ওকে বিছানায় শুইয়ে বাথরুম থেকে পানি এনে ওর চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ও জ্ঞান ফিরে পেলো। তারপর কাঁপাকাঁপা দুর্বল কন্ঠে বলল, “ও পরপারে যায় নি। ও এখানে আটকে পড়েছে। এখন ও তার দেহটা ফেরৎ চায়।”
আমি: “কি! এসব তুমি কি বলছো? কে আটকে পড়েছে? মারগারেট?”
আলেস: “নাহ। মনিকা।”
আরে! তাইতো! আমি এটা তো ভেবে দেখিইনি! আমার আংটিপরা ডান হাতটা যখন মনিকার গলায় চেপে বসেছিলো তখন সে ওই হাতটা থেকে নিষ্কৃতি পেতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছিলো। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ওর হাত দুটো তার গলা থেকে আমার ডান হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিলো। বেঁচে থাকার জন্যে ওর এতবেশী একাগ্রতা ছিলো যে মৃত্যুর পরেও ওর হাত দুটো আমার ডান হাতটা ধরে ছিলো। ওদিকে আমার ডান হাতটায় তখন সেই মৃত্যুঞ্জয়ী আংটিটা পরা ছিলো। তারমানে মৃত্যুর সময় মনিকার হাতে সেই আংটিটার স্পর্ষ লেগে গিয়েছিলো! তাই ওর আত্মাটা আর পরপারে যায় নি। তার বদলে ওই কিচেনেই আটকে পড়েছে! ইশ! বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আমি ব্যাপারটা আগে আঁচ করতে পারি নি। তাই মনিকাকে উপেক্ষা করে আলেসকেই তার দেহে ভরে দিয়েছি। ধ্যাত। সাংঘাতিক অন্যায় হয়ে গেছে মনিকার সাথে।
আমি: “আচ্ছা, আলেস, ব্যাপারটা ঠিক কি ঘটেছিলো আমায় একটু বিস্তারিত বলতে পারবে? প্লীজ।”
আলেস: ” ও কিচেনে আটকে আছে। ওই সাদা বক্সটার (ডিপ ফ্রিজ) ভেতর, প্রত্যাবর্তণের অপেক্ষায়। তুমি চলে যাওয়ার পর ও আমায় মেরে ফেলার চেষ্টা করে। আমি তখন চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”
বুঝতে পারলাম মনিকার আত্মাটা মরিয়া হয়ে এখন মারগারেটের মতোই আচরণ করতে শুরু করে দিয়েছে। প্রত্যাবর্তণের জন্যে ও যে কাউকে মেরে ফেলতে পিছ পা হবে না। আর আমিও নিজের অজান্তেই তাকে প্রত্যাবর্তণের চাবিটা দিয়ে দিয়েছি। গতরাতে মনিকার লাশটা ধোয়ানোর জন্যে বিশুদ্ধ পানি আনতে যখন কিচেনে ঢুকেছিলাম তখন আমি তোতাপাখির মতো আদিনের বইয়ের সেই মন্ত্রটা আওড়াচ্ছিলাম, ওটা দ্রুত মুখস্থ করার জন্যে। তখন মন্ত্রটা শুনে মনিকা সম্ভবত ওটা শিখে নিয়েছে। এখন ও কেবল একটা অক্ষত লাশ চায় প্রত্যাবর্তনের জন্যে। কেবল একটা লাশ। সেটা আমারই হোক বা আলেসের। ধ্যাত। কটেজটায় একটা না একটা সমস্যা লেগেই রয়েছে। আমি অনেক সহ্য করেছি, কিন্তু আর নয়। যত দ্রুত সম্ভব আমি এটাকে বেঁচে দেবো।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ গেলো আলেসের দিকে। ও ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আচ্ছা ওকে আবার মেরে ফেললে কেমন হয়? ও তো এমনিতেই পরপারে ফিরে যেতে চেয়েছিলো। আমিই ওকে জোর করে ফিরিয়ে এনেছি। ওকে মেরে লাশটা কিচেনে নিয়ে গিয়ে, মনিকাকে তার দেহটা বুঝিয়ে দেবো। কিন্তু পরক্ষণেই উপলব্ধি করলাম আমি কখনোই আলেসকে খুন করতে পারবো না। গতরাতের অনাবিল সুখস্বপ্নের পর আমি নিজের অজান্তেই ওকে ভালবেসে ফেলেছি। আমি ওর ভয়ার্ত ঠোটে চুমু খেয়ে বললাম, “চিন্তা করো না আলেস। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা আর ওই কিচেনে না গেলেই তো হলো। আজ থেকে খাবার দাবার সব বাহিরে থেকে কিনে খাবো তবুও কিছুতেই ওই কিচেনে ঢুকবো না। কেমন?”
আলেস মাথা নেড়ে সায় জানালো। তারপর আমি আবার ম্যাকডোনাল্ডে ফোন দিয়ে ডিনারের অর্ডার করলাম। দুজনে একসাথে ডিনার করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। আজ এত্ত বেশী ঘুরাঘুরি করেছি যে দুজনই খুব ক্লান্ত। কিন্তু তাই বলে আলেস মোটেও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ঘুমানোর আগে ও ঠিকই আমায় সুখ সাগরে ভাসিয়ে দিলো।
সেরাতে দুর্ঘটনার আগে সাঞ্জে তার ট্যাবলেটের “Virtual Diary” তে এইটুকুই লিখেছিলো। তারপর সাঞ্জে আর আলেস ভালবেসে একে ওপরের বাহুডোরে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু সেরাতে সাঞ্জে আলেসকে কিচেন থেকে বেডরুমে বয়ে আনার সময় রান্নাঘরের স্টোভটা বন্ধ করতে বেমালুম ভুলে যায়। পরবর্তীতে মনিকার ভয়ে ওদের কেউই আর রান্নাঘরে ফিরে যায়নি। স্টোভটা সারারাতই জলতে থাকে। ভোররাতের দিকে কিচেনের ডিপ ফ্রিজের ডালাটা আবার খুলে যায়। তারপরেই জ্বলন্ত স্টোভ থেকে একটা অগ্নি শিখা এসে রান্নাঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওদের দুজনের অজান্তেই আগুনটা ধীরে ধীরে পুরো কটেজে ছড়িয়ে পড়ে।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.