ডাকিণী ৪৯তম পর্ব (গ অংশ)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
আলেসের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আমার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়েছিলো! আমি ভেবেছিলাম ও আমায় আক্রমণ করে বসবে। কিন্তু না। তার বদলে ও পোলিশ ভাষায় খেঁকিয়ে উঠলো, “আমায় ফিরিয়ে আনলে কেনো। আমি তো ফিরতে চাই নি। আমি শুধু পরপারে চলে যেতে চেয়েছিলাম। এ দুনিয়ার প্রতি আমার ঘৃনা ধরে গেছে।”
আমি: “ওহ গড! দেখ আলেস, তোমার মৃত্যুর পর অনেকটা সময়ই পেরিয়ে গেছে। পৃথিবীটা আগের চেয়েও অনেক বেশী বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। মানুষজন বদলে গেছে, সেই সাথে সমাজও। আমার বিশ্বাস তুমি এই নতুন সময়ের সাথে সঠিকভাবেই মানিয়ে নিতে পারবে। এর জন্যে আমি তোমাকে সর্বউচ্চ সাহায্য করবো।”
আলেস: “কিন্তু আমার মার্টিনীর কি হবে? ও যে আমার জন্যে পথ চেয়ে বসে আছে।”
আমি: “ওতো হাজার বছর ধরে তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছে। তারমানে আরো ৪০-৫০ বছর ও সহজেই অপেক্ষা করতে পারবে। এর মধ্যেই তোমার জীবনকালও শেষ হয়ে যাবে। তুমি স্বাভাবিক নিয়মে মৃত্যুবরণ করে ওর কাছে পৌছে যাবে।”
আলেস: “আরো ৪০-৫০ বছর! আমি যে আর একটা মুহুর্তও ওর জন্যে অপেক্ষা করতে পারছি না।”
আমি: “আমি সত্যিই দুঃখিত আলেস। এটা ছাড়া আমার কোন উপায় ছিলো না। তুমিই কটেজে থেকে যাওয়া একমাত্র আত্মা ছিলে। তুমি আমার বন্ধুপ্রতিম হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছো। প্লীজ। আমার অবস্থাটা বুঝার চেষ্টা কর। আমাকে ক্ষমা করে দাওওওও,,,,,,,”
কথাগুলি বলতে বলতে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। সত্যিই তো। আমি আলেসকে অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ফাঁদে আটকে দিয়েছি যখন ও মুক্ত হতে চাইছিলো। সব দোষ আমার।
আমার কান্না দেখে আলেস এগিয়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিলো। আমিও ওর ঊষ্ম বাহুডোরে নিজেকে এলিয়ে দিলাম। ও আমার পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিলো। ওকে আমার খুব আপন মনে হলো। যেন শত বছরের পরিচিত বন্ধু। হঠাৎ অনুভব করলাম ও আমার ঘাড়ে চুমু খাচ্ছে! ওকে বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছা দুটোই আমার ছিলো না। কেবল মুখে বললাম, “চলো আলেস। এবার উপরে যাওয়া যাক।”
ও আলিঙ্গন ভেঙ্গে ওর ডায়ারীটা কুড়িয়ে নিয়ে সেটা ছিড়ে কুটিকুটি করলো। বুঝলাম ও নিশ্চিত করতে চাইছে যে এবার মারা গেলে আর কোন কিছুই ওকে এই কটেজে আটকে রাখতে পারবে না। ওর কাজ হয়ে গেলে আমরা দুজনই বেসমেন্ট ছেড়ে উপরে উঠে এলাম। অভিশপ্ত বেসমেন্টটা এবার প্রকৃতপক্ষেই শূন্য হয়ে গেলো।
সেদিন আমরা এক জম্পেশ ডিনার করলাম। আমার ফ্রিজে যত ধরনের ফুড আইটেম ছিলো তার সবই আমি প্রস্তুত করেছিলাম। আলেস এতো বছর অভুক্ত থাকার পর ফের খেতে বসেছে। আজ ওর ক্ষুদাটা আমি ভালভাবেই মিটিয়ে দেবো। হিহিহিহিহিহি।
আলেস কাঁটা চামচ আর ছুরির ব্যবহার জানতো না। মধ্যযুগে পোল্যান্ডে তো আর ডায়ানিং ম্যানার বলে কিছু ছিলো না। ওরা খাওয়ার জন্যে বাঙালীদের মতোই হাত ব্যবহার করতো। তাই আজ মাংসের কাবাবটা খেতে ওর খুব সমস্যা হচ্ছে। তা দেখে আমি ওকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলাম। ও খাবার টেবিলে পুরোটা সময় আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। আবেদনময় সেই দৃষ্টিতে আমি ভালবাসার আর্তি দেখতে পেলাম।
খাওয়া শেষে আমরা ড্রয়িংরুমে গেলাম টিভি দেখতে। আলেস কখনোই টিভি দেখেনি। প্রথম টিভিটা চালু করতেই ও ভয়ে পেয়ে আমায় জড়িয়ে ধরলো। টিভি চ্যানেলে তখন একটা প্রাচীন যুদ্ধের ফিল্ম দেখাচ্ছিলো। ঘোড়ায় চড়ে দুদল আদিম অস্ত্র সজ্জিত সৈন্যদলের লড়াই। বুঝলাম আলেস যদ্ধ বিগ্রহকে ঘৃনা করে। আমিও করি। কিন্তু আমি কি করে ওকে বলবো যে সেই আদিম মৃত্যুলীলা এখনো সাঙ্গ হয় নি। এখনো আধুনিক বিশ্বে প্রভাবশালীরা কারণে ওকারণে দুর্বল রাষ্টের উপর আক্রমণ চালায়। ছিঃ ছিঃ, কি লজ্জা। আমি রিমোট টিপে চ্যানেল পাল্টে গানের চ্যানেল আনলাম। আর্থ ডে উপলক্ষে একটা গান প্লে হচ্ছিলো তখন। এবার আলেস ভয় কাটিয়ে দেয়ালে ফিট করা টিভির স্কিন ছুয়ে দেখে বলল, “কি অসাধারণ জাদুকরী জানালা লাগিয়েছো এ ঘরে! আচ্ছা সাঞ্জে, তুমি কি জাদু জানা কোন ডাইনী? ”
ওর এমন প্রশ্ন শুনে আমি তো হেসেই খুন।
আমি: “আরে বোকা এটা জানালা না। টেলিভিশন। এটা দিয়ে দুরের জিনিশ দেখা যায়। আর আমি কোন ডাইনী না। একজন ফার্মাসিস্ট। ঔষধ বিশেষজ্ঞ।”
ও যে কী বুঝলো তা সেই ভালো জানে। কেবল মুখে হাসি এনে মাথা নাড়লো। আমি আবার চ্যানেল পরিবর্তন করে আরেকটি চ্যানেল টিউন করলাম। ওই চ্যানেলে তখন পোলিশ ভাষায় ডাবিং করা “ফ্যন্সি নান্সি” মুভিটা দিচ্ছিলো। এই মুভিটা আমার ভালই লাগে। মুভিটা চলার এক পর্যায়ে একটা চুমু খাওয়ার রোমান্টিক দৃশ্য চলে আসে। আলেস শিহরিত হয়ে আমার হাতটা আকঁড়ে ধরে। ওর অবস্থা দেখে আমার ভিষণ হাসি পাচ্ছিলো। অনেক কষ্টে আমি সেটা ঠেকালাম। কিন্তু আলেস আর আমার হাতটা ছাড়লো না। বরং হাতটা ধরে আমায় ওর কাছে নিয়ে একটা চুমু খেয়ে বসলো। আমি এর জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু আমি কখনোই আলেসকে নিরাশ করতে চাইনি। আমিই ওকে ফিরিয়ে এনেছি, নইলে ও এতক্ষণে মার্টিনীকেই চুমুটা দিতো। যাহোক, ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেই সবচেয়ে ভালো হবে। অনেক্ষণ আমরা কেউ কারো সাথে কথা বললাম না। কেবম নিরবে মুভিটা দেখতে লাগলাম। মুভিটা শেষ হলে আলেস আবারো আমায় জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। এবার আর চুমুটা ভাঙতেই চাইলো না। হয়তো এতো বছর পরে আমায় কাছে পেয়ে ওর বুকের জমানো সব ভালবাসা উথলে উঠেছে। ধিরে ধিরে আমিও ওর ভালবাসায় হারিয়ে যেতে লাগলাম।
সেরাতে আমার বেডরুমে আমরা দুজন একসাথেই ঘুমিয়েছিলাম। এই কটেজে আসার পর থেকে দু একটা রাতে বাদে প্রায় প্রতিটা রাতই আমি দুঃস্বপ্ন দেখে কাটিয়েছি। কিন্তু সেরাতটা ছিলো এক অসাধারণ স্বপ্নময় রাত। আমি কেবল চাইছিলাম এই সুখস্বপ্নের যেনো কোন শেষ না হয়। কি দরকার ভোর হবার। এই সুন্দর রাতটাই চিরস্থায়ী হোক না।
পরদিন সকালে আমাদের একসাথেই ঘুম ভাঙলো। আমরা বাথরুমে যেয়ে একে একে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর আমি ম্যাকডোনাল্ডে ফোন দিয়ে সকালের নাস্তার জন্যে কিছু খাবার ও জুস অর্ডার করলাম। আধাঘন্টার ভেতরেই হোম ডেলিভারি এসে পৌছালো। তবে নাস্তার টেবিলে এক থমথমে নিরবতা বিরাজ করছিলো। আমাদের কারো মাঝেই গতরাতের সেই উচ্ছাসটা আর নেই। আলেসকে দেখলাম মনমরা হয়ে নাস্তার টেবিলে কেবল খুটেই চলেছে। কিছুই খাচ্ছে না। গতরাতের মতো আমি ওকে খাইয়ে দিতে গেলাম। কিন্তু ও শুধু পানি খেয়েই টেবিল ছেড়ে উঠে বেডরুমে চলে গেলো। বুঝলাম, ওর মনটা আজ ভালো নেই। থাক। আজ আর অফিসে যাবো না। প্রধান নির্বাহীর বিশেষ ক্ষমতাবলে আমি বছরে তিনদিন কোন কারণদর্শানো ব্যাতিত অফিস ছুটি ঘোষণা করতে পারি। আজ সেই সুযোগটা কাজে লাগালাম। অফিসের সবাইকে টেক্সট করে জানিয়ে দিলাম আজ অফিস বন্ধ।
অফিস ছুটি দিয়ে আমি বেডরুমে ফিরে এলাম। বেডরুমে যেয়ে দেখি আলেস একাকী বসে বসে কাঁদছে। আমাকে দেখতেই চোখের পানি লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলো। আমি এগিয়ে যেয়ে ওকে চুমু খেয়ে বললাম, “কি ব্যাপার আলেস? মন খারাপ? মার্টিনীকে খুব মনে পড়ছে বুঝি।”
ও কেবল মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো।
আমি: “আলেস, প্লীজ, মন খারাপ করো না। আমি তো আছিই। চল না বাহিরে থেকে ঘুরে আসি। বাহিরে সব কিছুই নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। আজ তুমি হাজার বছর আগের পোল্যান্ডের সাথে আজকের আধুনিক পোল্যান্ডকে মিলিয়ে দেখবে। প্লীজ, চল চল, চল। “

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.