ডাকিণী ৪৯তম পর্ব (খ অংশ)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
লাইব্রেরীতে সবকিছুই তৈরি করে বইটা খুলে বসলাম। সমগ্র বইটাই দুর্বোধ্য হিব্রু ভাষায় লেখা। বইয়ের মাঝামাঝিতে একটা পৃষ্টা ভাঙা। সম্ভবত কেউ একজন একে চিহ্নিত করতে চেয়েছিলো। এই পৃষ্টায় হিব্রু লেখার সাথে গালিচায় শোয়ানো একটা লাশের স্কেচ আকাঁ। তারপাশেই হিজিবিজি টানা ইংলিশ হরফে একটা মন্ত্রের উচ্চারণ লেখা রয়েছে। সম্ভবত লেখাটা আদিনের। বুঝলাম এটাই সেই আত্মা ঢুকানোর মন্ত্র। আমি ওটা দেখে দেখে সঠিক উচ্চারণে মুখস্থ করে নিলাম। তারপর পৃষ্টা উল্টাতেই আদিনের হস্তাক্ষরে সহজ ইংরেজিতে লেখা কার্যপ্রণালী পেয়ে গেলাম। আদিনের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেলো। ছেলেটা আমার জন্যে এতো কিছু করেছে। কিন্তু শেষমেষ ও নিজের জন্যে কিছুই করতে পারলো না।
কার্যপ্রণালী অনুসারে, প্রথমে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে দেহটা ধুইয়ে নিতে হবে। তারপর দেহের কপালে যে আত্মাটা প্রবেশ করানো হবে তার নাম পবিত্র কাঠ কয়লা দিয়ে লিখতে হবে। তারপর দেহটাকে চিৎ করে শুইয়ে মুখটা হাঁ করিয়ে রাখতে হবে। সবশেষে মন্ত্রটা পাঁচবার ঐ আত্মার নাম ধরে জপতে হবে।
বাস। এইটুকুই! মন্ত্রটা গুনগুন করে আওড়াতে আওড়াতে কিচেনে গেলাম জগ ভরে বিশুদ্ধ পানি আনতে। ততারপর স্টোররুম ঘেটে কতগুলি ভাঙা কাঠের টুকরো এনে স্টোভে পুড়িয়ে কাঠ কয়লা বানিয়ে নিলাম। তারপর ওগুলি নিয়ে লাইব্রেরীতে ফিরে আসলাম। লাইব্রেরীতে ফিরে মনিকার দেহটাকে ভালো করে পানি দিয়ে ধুইয়ে পবিত্র করে নিলাম। তারপর ওর কপালে লিখলাম কাঠ কয়লার কালিতে লিখলাম “ALACE” । তারপর আংটিটা ওর আরেকটি অক্ষত আঙুলে পরিয়ে দিয়ে মন্ত্র পড়া শুরু করলাম। প্রতিবার মন্ত্র পড়ার শুরুতে ও শেষে আলেস ভন্টেইজিয়ান নামটা উচ্চারণ করতে ভুললাম না। কেন জানি ভয় হচ্ছিলো আলেসকে ঢুকাতে যেয়ে যদি অন্য কাউকে ঢুকিয়ে বসি তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। যদি মারগারেট আবার ঢুকে পড়ে ওতে! নাহ। তা কি করে সম্ভব। মারগারেট মনিকার দেহে তার দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, না ওই আংটিটা পড়ে ছিলো, না কপালে ওটার ছ্যাকা খেয়েছিলো। তারমানে ওর আত্মাটা মৃত্যুর সাথে সাথে চিরায়ত নিয়মেই পরপারে পারি জমায়। ফ্রিজে কেবল মনিকার দেহটা পড়ে থাকে। এখন এই দেহে ভালয় ভালয় আলেসকে ঢুকাতে পারলেই হলো।
মন্ত্র পড়া শেষ হলে তীর্থের কাকের মতো লাশটার দিকে চেয়ে রইলাম একটু প্রাণের স্পন্দন পাওয়ার আশায়। সময় টিকটিক করে বয়ে যেতে শুরু করলো। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এভাবে প্রায় আধা ঘন্টা পেরিয়ে গেলো। না আলেস চোখ খুলছে, না একটু শ্বাস নিচ্ছে। সম্ভবত আমার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আদিন কি তবে একটা ফাও বই এনে আমায় ইম্প্রেসড করার চেষ্টা করছিলো? কিন্তু ও যদি ফ্রড হয়ে থাকে তবে কেনো মারগারেট ওকে খুন করবে? নিশ্চই ওর পরিকল্পনাটা কার্যকর ছিলো বলেই মারগারেটের আতেঁ ঘা পড়েছিলো। তাই সে ওকে রাস্তার কাঁটা ভেবে সরিয়ে দিয়েছে। সমস্যাটা সম্ভবত আমার কারণেই হয়েছে। আমার মন্ত্র উচ্চারণে ভুল থাকতে পারে। কিংবা আলেস এ দেহে ঢুকতে চায় নি, ও কেবল পরপারে মার্টিনীর কাছে ফিরে যেতে চাইছে। অথবা জমে থাকা দেহটা আত্মার অনুপ্রবেশের জন্যে মোটেও উপযুক্ত নয়। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হতাশ হয়ে লাইব্রেরীর মেঝেতে বসে পড়লাম। হতাশা আর ক্লান্তি আমায় চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো।
খানিক্ষণ জিরিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম পুরো প্রক্রিয়াটার পুনরাবৃত্তি করবো। তবে লাইব্রেরীতে নয়। বেসমেন্টে। ওখানে নিশ্চিতভাবে আলেসের উপস্থিতি ও প্রভাব সর্বউচ্চ পরিমাণে রয়েছে। তাই ওখানে কাজ করলে ও কিছুতেই এই প্রক্রিয়া থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। তবে তার আগে মনিকার দেহটা কিচেনে নিয়ে গিয়ে কুসুম গরম পানিতে স্নান করিয়ে আনবো। এতে ওর জমাটা বাধা দেহটা পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। আরেকটি জিনিস খেয়াল হলো। মনিকার কপালে কাঠ কয়লায় লেখা আলেসের নামটা আমি ইংরেজিতে লিখেছি। কিন্তু আলেস তো ইংরেজি জানে না। ঠিক করলাম ওটা মুছে দিয়ে পোলিশ ভাষায় ওর নামটা লেখবো। ঠিক যেমন ওর ডায়ারীতে লেখা আছে, “আলেস ভন্টেইজিয়ান”। এত কিছু করার পরেও যদি কাজ না হয় তবে আদিনের মায়ের বাপ। আমি ওর বইটা ছিড়ে কুটিকুটি করে ইঁদুর দিয়ে খাওয়াবো। হুহ। আমার সাথে ফাজলামো?
ভারি জমে থাকা দেহটা আবার কিচেনে বয়ে নিয়ে গেলাম। তারপর সিংকের গরম পানির কল ছেড়ে ওর দেহে ঈষদুষ্ণ গরম পানির ধারা বইয়ে দিলাম। এভাবে আরো আধাঘন্টা পানি দেওয়ার পর ওর দেহটা নমনীয় উষ্ম আর আদ্র হয়ে এলো। এবার ফের কাজ শুরু করা যেতে পারে। ওর দেহটা কাঁধে করে বেসমেন্টে বয়ে নিয়ে গেলাম। এবার বরফ জমে না থাকায় ওর দেহটা বেশ হালকা লাগছে। বেসমেন্টে এসে দেহটাকে ঠিক আলেসের সেলের ভেতরেই চিৎ করে শুইয়ে দিলাম। তারপর সংশোধিত কার্যপ্রণালীতে আবার রিচুয়ালটা সম্পন্ন করলাম। পাঁচবার স্পষ্ট উচ্চারণে মন্ত্র পড়ার পরেও মনিকার দেহে আলেসের কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। আমি একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করতে লাগলাম, এক ঝাঁক আশায় বুক বেঁধে। এই বুঝি আলেস চোখ খুলে উঠে বসবে। কিন্তু প্রথম দশ মিনিট তেমন কিছুই হলো না। অপেক্ষা করতে করতে আমার মাথা বিগড়ে গেলো। সব রাগ গিয়ে পড়লো আদিনের ওই বইটার উপর। শালা অকাজের বই। তোকে আজ ছিড়েই ফেলবো। যখনই বইটা ছিঁড়ার জন্যে হাত বাড়ালাম তখনই নিস্তব্দ বেসমেন্টে একটা ক্ষীণ নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। সাথে সাথেই আমি কান খাড়া করলাম। কয়েক মুহুর্ত পরে আবার শুনে বুঝতে পারলাম শব্দটা মনিকার দেহ থেকেই আসছে।
এগিয়ে গিয়ে আমি মনিকার ঝুকে মনিকার নাকের কাছে হাত রাখলাম। আরে! এই তো! শ্বাস নিচ্ছে! এবার আমি ওর মাথাটা আমার কোলে তুলে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। এই তো লক্ষী মেয়ে। জেগে উঠো। প্লীজ। এই তো হচ্ছে।
ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের হার ক্রমাগত দ্রুত হল। ওর হাতটা ধরে আমি ওর পালসরেটটা চেক করলাম। একটু দ্রুত তবে স্বাভাবিকের প্রায় কাছা কাছি। এবার আমি ওর নাম ধরে ডাকতে লাগলাম।
আমি: “আলেস, আলেস ওঠো। আর কতকাল এভাবে ঘুমিয়ে থাকবে তুমি? এবার তো উঠো। আলেস!!!!”
দু তিনবার ডাকতেই ও চোখ মেলে তাকালো। কেমন ঘোলা আর শূন্য সেই দৃষ্টি। ওতে প্রত্যাবর্তণের আনন্দের চেয়ে বিষাদই যেনো বেশী ছিলো। খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকেই ও হড়হড় করে আমার কোলেই বমি করে দিলো। আহারে বেচারি। নতুন দেহে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। আমি ওর পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিলাম। বমি করা শেষে ও অনেক্ষণ কাশলো। বুঝতে পারছি। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে এ দেহে। তারপর কিছুটা ধাতস্থ হয়ে গেলেই আমায় ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে টলমলো পায়ে উঠে দাড়ালো। ওর কান্ড দেখে আমি ভিষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
আমি: “কি ব্যাপার? তুমি ঠিক আছো আলেলেলে,,,,,”
ওকে প্রশ্ন করতে যেয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। চেয়ে দেখি ও কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন জ্যান্ত খেয়ে নেবে!
আমার মনে খটকা লাগলো। আমার উপর এতটা রেগে আছে কেনো ও? ওর তো আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিৎ। আমার জন্যেই এত বছর পর একটা অক্ষত দেহে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। এতে আমার উপর চটে যাওয়ার কি হলো? আচ্ছে, ও কি সত্যিই আলেস? না কি মারগারেট এই সুযোগে ফিরে এসেছে আমার উপর তার দ্বিতীয় মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে?
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.