ডাকিণী ৪৮তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
বেচারি মারগারেট। এত বছর পর প্রথমবারের মতো জীবন্ত জগতে ফিরে চোখ খুলতেই ও আমাকে ওর গলা চিপে ধরতে দেখেছিলো। যতই যাদুশক্তির অধিকারী হোক না কেন এমন দৃশ্য স্বভাবতই ওর হৃদপিণ্ডটা কাঁপয়ে দিয়েছিলো। ভয়ে দ্বিকজ্ঞিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ও ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে ছুটে সোজা কিচেনের ডিপ ফ্রিজে ঢুকে পড়ে। ভাগ্য ভালো যে মারগারেট ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডায় জমে যাওয়ার ব্যাপারটা সম্পর্কে অবগত ছিলো না। মধ্যযুগে ওর জীবদ্দশায় পোল্যান্ডে ফ্রিজ আসবে কোথা থেকে? ও ফ্রিজটাকে নিছক একটা লুকানোর জায়গা ভেবে ঢুকে পড়েছিলো। এখন ও টের পাবে কত ধানে কত চাল, আর ফ্রিজে ঢুকলেই জমে তাল।আমার ভয় ছিলো মারগারেট হয়তো জাদুবলে লকটা খুলে ফেলবে। তাই রান্নাঘরের ভারী ওভেন আর ডিশ ক্লিনারটা বয়ে এনে ফ্রিজের ডালার উপর রাখলাম। এবার আর কিছুতেই ফ্রিজটা খুলবে না।
ফ্রিজের দেয়ালে একটা আলতো লাথি বসিয়ে দিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিলাম আমি ওর অবস্থান জেনে গেছি। ও ভয়ে সর্বশক্তিতে চেঁচালো আর ফ্রিজের ডালায় ধাক্কাতে শুরু করলো। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। ওর চিৎকার আমার কানে রক মিউজিকের মতোই সুরেলা শুনালো।
চেঁচাতে চেঁচাতে এক সময় ও ক্লান্ত হয়ে চুপ মেরে দিলো। তারপর শুরু করলো মিনতি। পোলিশ ভাষায় ও বলল, “সাঞ্জে আমি মনিকাই। কেন তুমি আমায় মারতে চাইছো? আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি?তোমায় আমি ভালিবেসেছিলাম। এটাতো কোন অন্যায় নয়। তবে কেন আমায় এ শাস্তি দিচ্ছো? ”
হায় রে বোকা মারগারেট। আমাকে ধোকা দেয়া এতো সোজা না। মনিকার ভাব নিয়ে আমার মন গলাতে চাইছে। কিন্তু যত্ত সমস্যা হয়েছে ওই ভাষাতত্বে। মনিকা এতো ভালো পোলিশ জীবনেও বলতে পারবে না। কিন্তু মারগারেট অবলীলায় পোলিশ বলে যাচ্ছে। ওর এসব বৃথা প্রচেষ্টা দেখে আমার নিতান্তই হাসি পেলো।
আমি: “দেখো মারগারেট, আমি ভালো করেই জানি তুমি কে। এসব ভান ধরে কাজ হবে না। তুমি আমার বন্ধু আদিনকে মেরেছো। আমার সন্তানতুল্য মনিকাকে আমার হাত দিয়ে খুন করিয়েছো। ভেবেছিলে এসব করে তুমি পার পেয়ে যাবে। কিন্তু না। আজ তোমাকে মরতেই হবে। তুমি মরবেই।”
ওর ছদ্দবেশ কাজ করছে না দেখে ও এভার স্বরূপে আবির্ভূত হলো,
মারগারেট: “দেখো সাঞ্জে। পৃথিবীতে একজনকে বেঁচে থাকতে হলে অন্যজনকে মরতেই হয়। আমি শুধু বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমায় অন্যায়ভাবে হত্যা করে। এতগুলি বছর পর আমি আবার যখন আজ বেঁচে উঠেছি তখন তুমি আবার আমায় হত্যা করতে নেমেছো। এটাই কি তোমার বিবেক? ”
ভুতের মুখে রাম নাম। যে নিজেই একরাতের ব্যবধানে দুই দুইজন মানুষকে খুন করেছে সে আমার বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তুলছে! গেলো মাথা বিগড়ে।
আমি: “হা আমি বিবেকহীন অমানুষ। আর তুমি খুব বিবেকসম্পন্ন মানবতা দরদী তাই না? তোমার বিবেক নিয়ে ফ্রিজেই জমে মরো। ঠিক যেমন করে তুমি আমার বন্ধুদের মেরেছিলে।”
ওর সাথে কথা বলার সকল ইচ্ছা আমার মন থেকে উবে গেলো। অনেক হয়েছে। এবার ওকে একা একা শান্তিতে মরতে দেওয়া উচিৎ। আমি কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে ড্রয়িংরুমের রক্ত পরিষ্কার করলাম। মনিকার কাটা আঙ্গুলটা কুড়িয়ে নিলাম। তারপর আংটি সহই ওটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। যাক বাবা। এখন আর আমায় অভিশপ্ত আংটিটা সার্বক্ষণিকভাবে পড়ে থাকতে হবে না। ওদিকে ফ্রিজের ভেতর মারগারেট চিৎকার করেই চলেছে। আশাকরি আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ও জমে কাঠ হয় যাবে। আমার অফিসে যাবার সময় ও হয়ে এলো। কাপড় বদলে অফিসের পথ ধরলাম। আজ আর নাস্তা করা হলো না।
অফিসের কর্মচারীরা আজকে খুবই প্রফুল্ল। আজ যে আমি ইন্সপেক্টর মনিকাকে সাথে করে নিয়ে আসি নি
ওদের সবারই প্রায় একই প্রশ্ন ছিলো। মনিকা কি বাল্টিসে আছে না চলে গেছে। ও থাকলে তো সবাইকে আট্যেনশন থাকবে হবে। কখন হুট করে অফিসে ভিজিট দিতে চলে আসবে কে জানে। কিন্তু আমি ওদের সবার কাছে মিথ্যা বললাম। মনিকা কাল রাতেই চলে গেছে। ওরা সবাই খুশি মনে রিলাক্স মুডে যার যার কাজে চলে গেলো। এতগুলি লোকের সামনে মিথ্যা বলতে যেয়ে আমার কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরলো। ক্ষানিকের জন্যে মনে হলো মিথ্যাচারই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন।
সারাদিন অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে কটেজে ফিরলাম। আজ থেকে আমার কটেজ অশরীরী মুক্ত। কিন্তু মনিকার জন্যে সত্যিই অনেক খারাপ লাগছে। আমার লক্ষি মেয়েটা। দু চোখ বেয়ে অজান্তেই জল ঝরতে লাগলো। শ্রাবণের অবাধ বৃষ্টি।
কটেজে ফিরে প্রথম কিচেনে গেলাম মারগারেটের কি হাল হয়েছে তা দেখতে। ফ্রিজটা তো বন্ধই মনে হচ্ছে। এবার ভালয় ভালয় মারগারেট ভেতরে থাকলেই হলো। ওভেন আর ডিশ ক্লিনার দুটো ফ্রিজের ডালার উপর থেকে সরিয়ে দিলাম। তারপরএকটা কিচেন নাইফ তুলে বাগিয়ে ধরলাম। এতক্ষণেও যদি মারগারেট মরে না গিয়ে থাকে তো এই চাকু দিয়ে ওকে গেঁথে দেব। তবুও বুকটা দুরুদুরু করছে। কি হবে যদি ফ্রিজটা খুলে দেখি মারগারেট ওখানে নেই? যদি ও তার যাদু বিদ্যা কাজে লাগিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে থাকে? কিংবা ফ্রিজ খুলতেই একটা মোক্ষম আক্রমণে আমায় শেষ করে দেয়? দুর! বদ্ধ ফ্রিজে কেউ সারাদিন ধরে বেঁচে থাকতে পারে না কি? হয়তো ও সত্যি সত্যিই জমে কাঠ হয়ে আছে। আমি মিছেমিছিই ভয় পাচ্ছি। যা হবার হবে ভেবে এক টানে ফ্রিজের ডালাটা খুলে ফেললাম।
নাহ। ও ঠিক ঠিকই মরে গেছে। জমে কাঠ না, একদম জমে পাথর। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশটা কটেজ থেকে সরাতে হবে। আদিনের মৃত্যুর তদন্তকারী অফিসাররা যদি কোন কারণে ফেরৎ এসে মনিকার লাশটা দেখে ফেলে তো আমায় নির্ঘাত গারদে ঢুকাবে। ঠিক করলাম মনিকার লাশটা আজ রাতের আধারেই গুম করে দিবো। বিশাল কটেজের যেকোন এক কোনে সাড়ে তিন হাত নীচে পুতে দিলেই হলো। ওর ব্যাবহার্য কাপড় চোপড়, জিনিসপত্র আজ রাতেই পুড়িয়ে দেবো। কাল থেকে আমার জীবনে আরেকটি নতুন দিন শুরু হতে যাচ্ছে।
ওর লাশটা জমে অসম্ভব ভারী হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় আমি ওকে বাহিরে বয়ে নিয়ে যেতে পারবো না। তাই লাশটা গলার জন্যে ফ্রিজের বাহিরে রেখে দিলাম। কিচেনের কাজ আপাতত শেষ। এবার গেস্টরুমে যেয়ে মনিকার ব্যবহার্য জিনিসপত্র বের করে নিতে হবে।
কিচেন থেকে একটা বস্তা নিয়ে গেলাম গেস্টরুমে। ওতে একে একে মনিকার জিনিসপত্র ভরতে লাগলাম। প্রথমে শুরু করলাম বাথরুম থেকে। ওর শাম্পু, ফেইসওয়াশ, লোশন, ন্যাপকিন, স্যান্ডেল, ব্যাবহৃত অন্তর্বাস সবই একে একে বস্তায় ভরলাম।
তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে ওর ক্লজিটের কাপড় চোপড়, বিছানার কভার, জুতা, মুজা, চিরুনি, আয়না, হাতঘড়ি সবই ভেতরে পুরলাম। তখনই ওর আই ফোনটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ওটা বের করে মনিকার সাম্প্রতিক কার্যাবলী দেখতে লাগলাম। আজ সকালে গুগল প্লাসে লিখেছে, “সাঞ্জের সাথে অসাধারণ সময় কাটছে। ভাবছি আরো একটা সপ্তাহ বাল্টিসে কাটিয়ে দেবো।” ওই পোষ্টে ২০ লাইক ও ১১ কমেন্ট। তারপর ও গত শুক্রবার আমাদের বীচ ভ্রমণের ছবিও গুগলে আপলোড করেছে। আমাকে নিয়ে অন্য কয়েকটা সামাজিক যোগাযোগের মাধম্যে ওর আরো কয়েকটা পোষ্টও আছে। তারমানে ওর বন্ধুরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে সে আমার এখানে থাকছে! এখন যদি ও গুম হয়ে যায় তো এসব পোষ্টের বদৌলতে সন্দেহের সবগুলি আঙুল আমার দিকেই তাক হবে। তারপর পুলিশ এসে কটেজে কয়েকটা ডোবারম্যান ছেড়ে দিলেই হলো। যত গোপনেই, যতগভীরেই দাফন করি না কেনো, ওরা মনিকার লাশটা সহজেই খুড়ে বের করে ফেলবে। আমি ফেসে গেছি। ভয়াবহ ভাবে ফেঁসে গেছি। এর থেকে মুক্তির আর কোন পথ নেই। হতাশ হয়ে গেস্টরুমের বিছানায় ধপ করে বসে পড়লাম। যখন ভাবছিলাম সব শেষ তখনই লাইব্রেরী থেকে একটা করুণ কান্নার ধ্বনি শুনতে পেলাম! বিলাপের সুরটা আমার কাছে খুবই পরিচিত মনে হলো। আরে! এটা তো আলেসের কান্না! লাইব্রেরীতে ও কি করছে? ওকি তবে পরপারে ফিরে যায় নি? গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে দৌড়ে গেলাম লাইব্রেরীতে।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.