ডাকিণী ৪৭তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমারই চোখের সামনে পরপর দুদিনে আমার দুজন বন্ধু প্রাণ হারালো মারগারেটের হাতে। এতোক্ষণ ছাড়ানো না গেলেও মনিকা মারা যাবার সাথে সাথে ডান হাতটা সুবোধ বালকের মতো ওর গলা ছেড়ে উঠে এলো। কিন্তু মনিকার নিষ্প্রাণ হাত দুটো তখনো আমার ডান হাতটাক্র আকড়ে ধরেছিলো। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহুর্ত পর্যন্ত ও এই হাতটা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে লড়ে গেছে। বিষ্ময়ের ঘোর কাটতেই আমি মনিকাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। “মনিকা, আমি সত্যি দুঃখিত মনিকা, আমি কখনোই তোকে মারতে চাইনি। তোকে যে আমি আমার মেয়ের মতো ভালবাসিরে।”
কিন্তু মনিকা আর ফিরলো না। ও ঠায় শুয়ে রইলো। ওর বিষ্ফোরিত চোখ দুটো অবাক বিষ্ময়ে আমারই দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে জড়িয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম, “মনিকা রে রে রে রে,,,,,,”
আবেগআপ্লুত হয়ে আমি ডান হাতটা থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছিলাম। আমি জানতাম মারগারেট আমার ক্রোধকেই কেবল ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এখন জানলাম ও আমার যেকোন উচ্চ আবেগকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটা রাগ হোক, বা দুঃখ। মনিকাকে হারানোর ব্যাথায় কাতর হয়ে আমি যখন ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম তখন আমার ডানহাতটা নিঃশব্দে হাত থেকে আংটিটা খুলে ওর হাতে পড়িয়ে দেয়।
আমি ওকে আমার বুকের সাথে জড়িয়ে ধিরেছিলাম। হঠাৎ ওর নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পেলাম! আশ্চর্য! ওকি তবে বেঁচে আছে? ডানহাতটা এনে পরীক্ষা করার জন্যে ওর নাকের কাছে ধরিলাম! আরে হা! ও তো নিঃশ্বাস নিচ্ছে! ওয়াও!
কিন্তু পরীক্ষা করার সময় আমার ডান হাতের দিকে নজর যেতেই মনটা আতঙ্কে ছেয়ে গেলো। হাতটা একদমই খালি। কোন আঙ্গুলেই আংটিটা পড়ানো নেই! কোথায় গেলো আংটিটা? হায় হায়! এটা মনিকার হাতে গেলো কি করে! বুঝলাম মারগারেট আমার দেহে নয়, এবার মনিকার দেহে ফিরে আসতে চাইছে। ওকে আমার থামাতেই হবে। দ্রুত ওর হাত থেকে আংটিটা খুলতে গেলাম, কিন্তু ততক্ষণে ওর আংটিপরা হাতটা মুঠো হয়ে গেছে। কিছুতেই আংটি খুলতে দেবে না। ওদিকে ওর শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে। যেকোন সময় ও চোখ মেলে জেগে উঠবে। অগত্যা ওর মুঠো করা হাতের আংটিপরা আঙ্গুলটাকে মোচড়ে ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। মটমট করে হাঁড় ভাঙ্গার শব্দ হলো। কিন্তু ওর আঙ্গুলটা কিছুতেই বিচ্ছিন্ন করতে পারলাম না। ওটা বেকায়দায় ভেঙ্গে গিয়ে উল্টোদিকে ঝুলে আছে। ওদিকে ওর চোখ পিটপিট করা শুরি করে দিয়েছে! যেকোন সময় চোখ খুলে জেগে উঠবে! সাঞ্জে বেঁচে থাকতে তোকে কিছুতেই চোখ খুলতে দেবে না শয়তান।
ওর ঝুলে থাকা আঙুলটাকে আমি কামড়েই ছিড়ে ফেললাম। ফিংকি দিয়ে ওর হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগলো। ভেবেছিলাম দেহ থেকে আংটিটা বিচ্ছিন্ন করে দিলেই ও আবার নিথর হয়ে যাবে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিলো। আসলে আংটিটা প্রয়োজন মৃতদেহে আত্মাকে প্রবেশ করাতে। মনিকার দেহে মারগারেটের আত্মা ইতিমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছে। তাইতো ওর শ্বাস প্রশ্বাস চালু হয়েছে। এখন কালক্ষেপণের মাধ্যমে ওর আত্মাটা নতুন দেহের নিয়ন্ত্রণ নিতে শিখছে। তাই শুধু আংটিটা বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ওকে আর থামিয়ে দেওয়া যাবে না। ওকে থামাতে হলে আবারো খুন করতে হবে। ওর গলাটা আবার টিপে ধরতে গেলাম। হাতটা ওর গলা স্পর্ষ করা মাত্র ও চোখ খুলে তাকালো। আমি খুবই দ্বিধান্বিত ছিলাম, মনিকা কি সত্যিই মরে গিয়ে মারগারেটকে দেহে জায়গা করে দিয়েছে? নাকি এটা সত্যি সত্যিই মনিকা, কোন ভাবে আমার ভয়ঙ্কর ডান হাতটার কবল থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধাটা কেটে গেলো। মনিকা না মরলে কি আমার হাতটা ওর গলা ছেড়ে দিতো? মোটেও না। তারমানে ওটা মারগারেটই।
সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে আবার মনিকার দেহে ঢুকা মারগারেটের গলা চিপে ধরতে গেলাম। কিন্তু তখনই মারগারেট ত্রাহি চিৎকার ছেড়ে উঠে বসলো। আমি সভয়ে পিছিয়ে গেলাম। হলিউডে অনেক মুভিতে দেখেছি মৃত মানুষ জেগে উঠলে জম্বি হয়ে যায়। তখন জ্যান্ত মানুষকে খেতে শুরু করে দেয়। মারগারেটও কি তাই করবে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আমার কি করা উচিৎ।
ও আমাকে ভড়কে দিয়েছিলো ক্ষাণিকের জন্যে। আমি যখন আতঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলাম ও সেই সুযোগে ড্রয়িংরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। আমিও দ্রুত আতঙ্ক কাটিয়ে ওর পিছু ধাওয়া করি।
আমি: “তোকে আজ কিছুতেই ছাড়বো না মারগারেট। মেরেই ফেলবো।”
ও এক ছোটে কিচেনে ঢুকে পড়লো। কিচেনের পেছনে একটা জানালা আছে। ও সহজেই ওটা গলে বেরিয়ে যেতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব ছুটে যেয়ে কিচেনে ঢুকে পড়লাম। প্রথমেই চোখ গেলো জানালাটার দিকে। ওটা ভেতর থেকেই বন্ধ আছে। তারমানে ও এখনো কিচেনেই আছে! কিন্তু কোথায়! হয়তো কিচেনের কোন তাকের আড়ালে লুকিয়ে আছে। অসাবধানতা বশত ওর কাছে চলে গেলেই কিচেন নাইফটা বুকে সেঁধিয়ে দিবে। কিন্তু আমিও এর শেষ না দেখে ছাড়ছি না। হয় ওকে মেরে আমার বন্ধুদের মৃত্যুর বদলা নিবো, নইলে অন্যদের মতো ওর হাতে নিজের প্রাণটা বিসর্জন দিয়ে পরপারে পাড়ি জমাবো।
কিচেনের একটা একটা করে প্রতিটা রেকের পেছনটা আমি ভালো করে চেক করলাম। কিন্তু মারগারেটকে কোথাও পেলাম না। আশ্চর্য! হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো নাকি ডাইনীটা? ঠিক তখনি একটা মৃদু গোঙ্গানি আওয়াজ ভেসে এলো। বুঝলাম আঙুল হারানোর ব্যাথ্যা ওকে কষ্ট দিতে শুরু করেছে। ভালো করে কান পাতলাম। আরে! ওটাতো রান্নাঘরের কোনে রাখা ডিপ ফ্রিজটা থেকে আসছে। বুঝলাম ঘুঘু এবার নিজেই এসে ফাঁদে ধরা পড়েছে। গুটিগুটি পায়ে নিঃশব্দে ফ্রিজের কাছে চলে গেলাম। হা। এই তো গোঙ্গানিটা আবারো শোনা যাচ্ছে। মুখে একটা আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ফুটলো। মনেমনে বললাম এবার তোমার পরপারে যাওয়ার পালা মারগারেট। তারপর ফ্রিজের লকটা বাহিরে থেকে শক্ত করে লাগিয়ে দিলাম।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.