ডাকিণী ৪৫তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি মারগারেটের প্রবেশ ঠেকাতে নিজেকেই শেষ করে দিতে বসেছিলাম। কিন্তু কাঁচটা গলার চামড়া কেটে যখনই শ্বাসনালীর উপর চাপ দিতে শুরু করেছিলো তখনই আংটিপরা ডান হাতটা সক্রিয় হয়ে উঠে। ওটা হঠাৎ করেই আমার কাঁচ ধরা বাম হাতে প্রচন্ড জোরে একটা থাবা বসিয়ে দিলো। আমি কখনোই এর জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। হাত থেকে কাঁচের টুকরাটা ফসকে গিয়ে দুরে ছিটকে পড়লো। সেই সাথে উৎকট হাসিটাও পাল্লা দিয়ে চলল। আমার শরীরে ইতিমধ্যেই কাঁপুনি ধরে গেছে। কাঁপুনির সাথে সাথে মুখে ফেনা জমেছে। আর কোন পথ নেই। অবশেষে আমি মারগারেটের কাছে হেরে গিয়েছি। আমার ক্রোধই আমায় হারিয়ে দিয়েছে। আর কিছুই করার নেই দেখে চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। চিরনিদ্রার অপেক্ষায়। কিন্তু তখনি বিষ্ময়কর ভাবে আমার মস্তিষ্ক ঘুরে দাঁড়ালো। দুমাস আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমার রজঃস্রাব নিয়মিত ঘটানোর জন্যে আমি একবার কেমিস্টের দোকান থেকে এনাফাইলো-টক্সিন কিনেছিলাম। দোকানি জোর করে এক ডোজ আন্টি-হিস্টামিন ও সাথে দিয়েছিলো। পোল্যান্ডের আইন অনুযায়ী কেউ যদি কেমিস্টের দোকান থেকে কোন টক্সিন কেনে থাকে তবে তাকে অবশ্যই সেই টক্সিনের একটা নির্দিষ্ট পরিমান আন্টিডট কিনতেই হবে। অনাকাঙ্খিত বীষক্রিয়া প্রতিরোধেই এই আইন করা হয়। আদিন যদি বৈধ কোন কেমিস্টের দোকান থেকে সায়ানাইড ট্যাবলেটটা কিনে থাকে তবে ওর সাথে অবশ্যই এক ডোজ আন্টিডট ও কিনেছে। আন্টিডটটাও খুব সম্ভব ওর পকেটেই আছে। দ্রুত ওর পকেট হাতড়াতে লাগলাম। প্রথম পকেটে শুধুই মানিব্যাগ। পরের পকেটে আরেকটি সায়ানাইড ট্যাবলেট। তৃতীয় পকেটেই সেই কাঙ্খিত আন্টিডট, সোডিয়াম থায়োসালফেট আমাইনো নাইট্রেটের একটা ভায়াল ও দুটো সিরিঞ্জ। ভায়াল থেকে আন্টিডট সিরিঞ্জটায় ভরতে লাগলাম। অক্সিজেনের অভাবে মাংসপেশিতে ইতিমধ্যেই ল্যাকটিক আস্যিড জমে শক্ত হতে শুরু করেছে। সেই সাথে বুকের বা পাশে একটা চিনচিনে ব্যাথা ঈঙ্গিত দিচ্ছে যেকোন সময় আমার মায়োকার্ডিয়াল ফেইলোর হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একটা ইঞ্জেকশন লোড করা যে কি দুর্ধর্ষ কাজ তা কেবল আমিই জানি। ইঞ্জেকশনটা লোড শেষে নিজের গলা হাতড়ে জুগুলার শিরার অবস্থানটা নিশ্চিত করে নিয়ে , সুইটা গেঁথে দিলাম। ইঞ্জেকশনটা পুশ করার পরেও আমার অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন হলো না। বুঝতে পারছি ইঞ্জেকশনটা কাজ শুরু করতে কিছুটা সময় নিবে। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত আমার কোষ কলায় বেঁচে থাকার মতো অক্সিজেন থাকবে তো?
অনেক দেরী হয়ে গেছে। হয়তো ওটা আর পুষিয়ে নেওয়া যাবে না। আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। চোখ দুটো মুদে আমি আবারো ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি নিশ্চিত ভাবে জানতাম না এ ঘুমটা আর ভাঙবে কি না।
প্রায় দু ঘন্টা পর আমার ঘুম ভাঙলো। প্রথমে কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। কিন্তু আদিনের লাশের দিকে চোখ যেতেই সব মনে পড়তে শুরু করলো। হৃদয়টা হাহাকার করে উঠলো। আমিই আদিনকে এই মৃত্যুর মুখে ডেকে এনেছি। আমিই ওর মৃত্যুর জন্যে দায়ী। ছেলেটার সংসার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেলো। ব্যার্থ মনোরথে আমি পুলিশের কাছে ফোন দিলাম। আদিনের লাশটার একটা ব্যাবস্থা করতে হবে যে।
দশ মিনিটের মধ্যেই দুটো পুলিশ কার ও একটা আম্বুল্যান্স আমার কটেজে এসে হাজির হলো। প্যারামেডিকরা আমার গলাটা ব্যান্ডেজ করে দিলো আর আদিনের লাশটা তুলে আম্বুল্যান্সে করে নিয়ে গেলো। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। হুহু করে কেঁদে উঠলাম। ছেলেটা একটু পাগলাটে হলেও মানুষ হিসেবে সত্যিই অনেক ভালো ছিলো। একজন মহিলা পুলিশ অফিসার এসে আমায় জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিলো। কিন্তু আমার হৃদয়টা কিছুতেই বাধ মানলো না। আমার স্তম্ভিত ফিরে পেতে অনেকটা সময় লেগে গেলো। কিছুটা শান্ত হয়ে গেলে আমি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পড়লাম। কয়েকজন পুলিশ অফিসার তখনো আমার বেডরুমে দুর্ঘটনার সুত্র অনুসন্ধান করছে। কিছুক্ষণ পর একজন অফিসার এসে আমায় রূঢ় কণ্ঠে বলল, “মিস সাঞ্জে। দুর্ঘটনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আপনাকে এখন আমাদের সাথে হবে। আপনি দ্রুত তৈরি হয়ে নিন।”
আমার অবস্থা তখন অবর্ণনীয়! এই ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমি কোথাও যেতে চাই না। তাছাড়া গত সপ্তাহে স্টারদের সাথে আমার একটু ও ভালো সময় কাটেনি। এবার পুলিশের সাথে যে কি হবে তা এক ঈশ্বরই ভালো জানেন। আমি এসব ভেবে আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম। “দেখুন মিঃ অফিসার। আমি এখন কোথাও যেতে পারবো না। আমি ক্লান্ত ও আহত। আপনাদের উচিৎ মানবিক দিক বিবেচনায় আমাকে এখানে ছেড়ে যাওয়া।”
অফিসার: “দেখুন মিস সাঞ্জে। দুর্ঘটনাটা আপনার কটেজেই ঘটেছে। আপনি ঝাড়বাতি টাঙাতে দুর্বল তার ব্যবহার করেছেন বলেই আজ এই দুর্ঘটনাটা ঘটেছে। আপনি কিছুতেই এর দায় এড়াতে পারেন না।
আমি: “মিঃ অফিসার। কটেজটা আমি পোলিশ সরকারের কাছ থেকে কিনেছি। ঝাড়বাতিটা আমি এই কটেজে আসার আগে থেকেই লাগানো ছিলো। সরকারি রক্ষণাবেক্ষণকারীরাই ওটা লাগিয়েছিলো। এর জন্যে আপনারা কিছুতেই আমাকে দোষারোপ করতে পারেন না।”
অফিসার: “তবুও দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে আপনাকে একবার আমাদের ওখানে যেতেই হবে। আপনিই এর একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। ”
হঠাৎ মনে পড়লো, সমগ্র ঘটনাই তো আমি ভিডিও করেছিলাম। ওই ভিডিওটা দিয়ে এই নাছোড়বান্দা পুলিশদের হয়তো হঠানো যেতে পারে। আমি দৃঢ় কন্ঠে বললাম, “দেখুন মিঃ অফিসার। আমি কিছিতেই আদিনের মৃত্যুর সাথে জড়িত নই। আর এই দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ দিতেও আমার ঘোর আপত্তি। সাক্ষ দেওয়ার জন্যে আমি দুর্ঘটনাটা ফের মনে করতে চাই না। আমি ওটা যত দ্রুত সম্ভব ভুলে যেতে চাই।”
এবার অফিসার গলা চড়ালো, “আপনি কিছুতেই এটা করতে পারেন না মিস সাঞ্জে। আপনাকে অবশ্যই পুলিশকে সাহায্য করতে হবে। যত কষ্টই হোক। আপনি যতই ব্যাপারটা ভুলে যেতে চান না কেন সাক্ষ্য আপনাকে দিতেই হবে।”
আমি: “সাক্ষ্য দেওয়ার বদলে আমি যদি আপনাদের দুর্ঘটনার সম্পূর্ণ ভিডিও ফোটেজ দিয়ে দেই তবে কি কাজ চলবে? ”
অফিসারের চেহারাটা লকলকিয়ে উঠলো, “কোথায় ওটা, আমাদের দেখান তো মিস সাঞ্জে।”
আরো ঘন্টা খানেক পরে অফিসারগণ তদন্ত কার্য সমাপ্ত করে ভিডিওটার একটা কপি নিয়ে চলে গেলো। সারাটা দিন এসব ঝামেলায় জড়িয়ে থাকায় আর লাঞ্চ করতে পারিনি। তাই আজ বিকাল ৭টার মধ্যেই তাড়াতাড়ি ডিনার সারলাম। অফিসাররা আমার বেডরুম সীলগালা করে দিয়ে গেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওখানে ঢুকা নিষেধ। তাই খাওয়া শেষে আমি ড্রয়িংরুমে কাউচের উপর শুয়ে পড়লাম। কিন্তু মনিকার জন্যে মনটা খচখচ করতে লাগলো। মেয়েটা সেই যে সকালে বেরিয়েছে, এখনো ফিরে নি। কোন ঝামেলায় পড়লো না তো? ফোনটা হাতে নিয়ে ওকে কল দিলাম,,,,,,
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.