ডাকিণী ৪৪তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
হঠাৎ ঝনঝনিয়ে ভারী ঝাড়বাতিটা আদিনের মাথায় ভেঙে পড়লো। আমি এর জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু পরক্ষণেই স্তম্ভিত ফিরে পেয়ে ওর কাছে দৌড়ে গেলাম। “আদিন! আদিন তুমি ঠিক আছো? ” কিন্তু বলা বাহুল্য ও ঠিক ছিলো না। ঝাড়বাতির কাঁচটা ভেঙে ওর পুরো মাথায় গিথেঁ আছে, একটা চোখ বেরিয়ে এসেছে, পুর মুখ রক্তে লাল হয়ে গেছে। কি ভয়ানক দৃশ্য। রাগটা আমার মধ্যে আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করলো! রাগে চিৎকার করে উঠলাম, “মারগারেট, তোকে আমি নরকে পাঠাবো বীচ।” পরক্ষণেই আবার সেই খিলখিল হাসি। মাথায় যেন আগুন ধরে গেছে। আমার রাগটা বাড়াতেই যেন হাসিটা আরো উচ্চতর হলো। রাগের যাই মুখে আসলো তাই বলে আমি মারগারেটকে গালি দিতে লাগলাম। ডান হাতটা সেই সুযোগে নিজের মতো করে কাজ করা শুরু করে দিয়েছে।ওটা আদিনের হাত থেকে পড়ে যাওয়া সায়ানাইড ট্যাবলেটটা কুড়িয়ে নিলো। তারপর আমি আবার চিৎকার করার জন্যে মুখ খুলতেই হাতটা এক ঝটকায় ট্যাবলেটটা মুখে পুরে দিলো। বিষ্ময়ের প্রথম ধাক্কা সামলাতে প্রায় সব মানুষই ঢোক গিলে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়। আমিও তাই করলাম। কিন্তু আত্মঘাতী ভুল হয়ে গেলো। ঢোক গিলতে যেয়ে ট্যাবলেটটাকেও পেটে চালান করে দিলাম। ঘটনার আকর্ষিকতায় আমি সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেলাম। আবারো মারগারেট আমার ক্রোধকে ব্যবহার করলো। আমি দ্রুত রাগকে নিয়ন্ত্রণে আনলাম। কিন্তু ততক্ষণে সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি সায়ানাইড ট্যাবলেট খেয়ে ফেলেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চিত মৃত্যু। তারপরেই মারগারেট দেহটা দখল করে নিবে। প্রচন্ড কান্না আসছিলো আমার। না পারলাম আদিনকে বাঁচাতে না পারলাম নিজেকে। হতাশায় মুষড়ে পড়ার মতো অবস্থা। এইটুকু সময়ের মধ্যেই হাত পা অবশ হয়ে আসতে শুরু করেছে। বিশ্বাসঘাতক ডান হাতটার দিকে তাকালাম। মৃত্যুর আগেই ওটা থেকে আংটিটা খুলে ফেলতে হবে। কিন্তু দুষ্ট হাতটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। ওটা শক্ত করে মোঠ ধরে আছে। মোঠ করা হাত থেকে আমি কিছুতেই আংটিটা খুলে আনতে পারবো না। বা হাত দিয়ে ডান হাতের মুঠো খুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই খুলছে না। ধস্তাধস্তিতে বরং আরো দ্রুত দুর্বল হয়ে যেতে লাগলাম। তারপর একসময় হাল ছেড়ে দিলাম। নাহ। ওটা খুলা সম্ভব না। তার বদলে ঝাড়বাতির একটা বড় ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো কুড়িয়ে নিলাম। ভেবেছিলাম ওটা দিয়ে হাতের কব্জি পর্যন্ত কেটে বাদ দিয়ে দেবো। এমন বিশ্বাসঘাতক হাত রেখে লাভ কি? চোখ বন্ধ করে কব্জিতে দিলাম এক ঘা। কিন্ত কাঁচটা ঝনঝনিয়ে ভেঙে পড়লো। ভাঙা কাঁচ আমার হাতের কব্জিতে একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করলো। বুঝলাম হাতের কাছে থাকা এসব কাচ দিয়ে হাড় কাটা যাবে না। মোল্লার দৌড় যেমন ঐ মসজিদ পর্যন্ত, তেমনি এসব কাচের কাটার ক্ষমতাও চামড়া আর মাংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হাত কাটতে হলে আমাকে স্টোররুমে যেয়ে চাকুটা নিয়ে আসতে হবে। উঠে দাড়িয়ে স্টোররুমে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে সায়ানাইডের প্রতিক্রিয়ায় আমার পায়ে পেরেসিস হয়ে গেছে। দাড়াতেই আবার ধপাস করে পড়ে গেলাম। পড়বি তো পড়, একদম ঝাড়বাতির ভাঙা কাঁচগুলির উপর। অনেকগুলি সুচালো ভাঙ্গা কাচের টুকরা আমার পিঠের মাংস ভেদ করে এক সাথে গেঁথে গেলো। আর ব্যাথা সহ্য করতে পারলাম না। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। কিন্তু মারগারেটের হাসি আমার আর্তনাদকে ছাপিয়ে গেল। একটানা বাজতেই থাকলো, “হিহিহিহিহিহি।”
আমার তো একদম কানে তালা পড়ার জোগাড়। আমি মারা যাচ্ছি আর ও হাসিতে ফেটে পড়ছে। যেনো শিওরে দাড়ানো কোন এক শকুনী মৃতপ্রায় মানুষের মৃত্যু প্রতিক্ষায় ক্ষণ গুনছে। আমি জীবনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলাম। ভাঙ্গা কাঁচগুলি হাড় কাটিতে না পারলেও মাংস ভালই কাটতে পারে। এগুলি দিয়ে হাত কাটা অসম্ভব হলেও গলা কাটা খুবই সহজ। বিড়বিড় করে বললাম, “আমার নিজের গলা কেটে হলেও তোমার প্রত্যাবর্তণ প্রতিহত করবো মারগারেট। আমার দেহটা তুমি কখনোই পাবে না।”
বা হাতে বড় দেখে আরেকটি কাঁচের টুকরো তুললাম। বাহ। ভালই ধারালো দেখছি। শেষবারের মতো ডান হাতের দিকে তাকালাম। হাতটা তখনো মুঠো ধরে আছে। কিছুতেই আংটিটা খুলতে দিবে না। জীবনের শেষ দৃশ্যটা দেখে নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললাম। নিজের গলা কাটার সময় আমি কখনোই সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে পারবো। আমার সে সাহস নেই। মনের গহীনে মায়ের হাসি মাখা সেই মুখটা ভেসে উঠলো। সবকিছুকেই পাশ কাটিয়ে আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল রইলাম। এমনিও মরছি ওমনিও মরছি। আমার কাছে এখন দুটোই সমান।
বা হাত দিয়ে ভাঙ্গা কাঁচটা গলা মাঝ বরাবর স্থাপন করলাম। তারপর ওটা সজোরে গলায় ঠেসে ধরে ঘসতে শুরু করলাম। ঘাড় বেয়ে বয়ে যাওয়া গরম রক্তের ধারাই বলে দিচ্ছে যে কাঁচটা কাজ করছে,
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.