ডাকিণী ৪৩তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি: “হ্যালো আদিন। তুমি কি এখন আমার কটেজে আসতে পারবা?”
আদিন: “তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে তো এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি। ”
আমি: “ঠিক আছে। তুমি চলে আসো তাড়াতাড়ি। আমি অপেক্ষায় আছি।”
আধাঘন্টার মধ্যেই ওর ফোর্ডটা চলে এলো। কিন্তু এবার আর ও গাড়িটা সোজা গ্যারেজে রেখে এলো। কুয়োর পাশ দিয়ে গাড়ি চালানোর মতো দুঃস্বাহস দেখালো না।
তবে আমরা কুয়োর পাশ দিয়ে হেটেই কটেজে ঢুকলাম। ও একটা বিশাল লাগেজ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। ভেতরে কি আছে তা দেখার জন্যে আমি প্রচন্ড কৌতুহল অনুভব করলাম।
ও কটেজের সদর দরজার সামনে দাড়িয়ে ল্যাগেজটা খুললো। ল্যাগেজটা যত্তসব উৎকট রিচুয়াল জিনিসপত্রে ঠাসা।
ল্যাগেজটা থেকে ও একটা পুরাতন চামড়ার বই, কতগুলি ছোট মাটির ঘটি, এক প্যাকেট মোমবাতি বের করলো। সদর দরজা খুলাই ছিলো। ও দরজা গলে ভেতরে ঢুকে পড়লো। আমিও ঢুকছিলাম পেছন পেছন। কিন্তু ও আমায় মানা করে দিলো। “সাঞ্জে। আমি একটু সময় তোমার কটেজে একা থাকপ্তে চাই। যদি তুমি কিছু মনে না করো। ”
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম “ঠিক আছে।”
কিন্তু মনটা খচখচ করতে লাগলো। বুঝতে পারছি না আমার অনুপস্থিতিতে ও ঠিক কি করতে চাইছে আমার কটেজে। আমি বাহিরে একা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষার প্রহর সত্যিই খুব বিরক্তিকর। হঠাৎ মনে হতে লাগলো আদিনকে আমার কটেজে এভাবে একা ঢুকতে দেওয়া উচিৎ হয় নি। মাত্র কদিন হলো আমি ওকে চিনি। ওর সম্পর্কে আমার তেমন ভালো ধারনাও নেই। মাস কয়েক আগেও ও একজন ভবঘুরে ছিলো। নানান উল্টোপাল্টা কাজে ওর জুড়ি মেলা ভার। আমার কটেজে ও যেকোন সময় লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিতে পারে।
এসব যখন ভাবছিলাম তখনই ভেতর থেকে আদিনের ডাক শুনতে পেলাম। “সাঞ্জে, দয়া করে কি একটু ভেতরে আসবে? ”
ইতস্তত পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকলাম। কিন্তু আদিন কোথায় গেলো! ওকে তো দেখছি না! আমি হাক ছাড়লাম, “আদিন কোথায় তুমি?”
আদিন: “ড্রয়িং রুমে বসে আছি। তাড়াতাড়ি আসো তো।”
হঠাৎ কি মনে হতেই আমি আমার ফোনটা বের করে ভিডিও তুলতে লাগলাম। ভাল খারাপ যাই ঘটুক না কেন আমি এর ভিডিও ডুকুমেন্ট রাখতে আগ্রহী। আমি ড্রয়িংরুমে যেয়ে দেখি আদিন সোফায় বসে আছে। আমি ড্রয়িং রুমে ঢুকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু দরজার সামনেই ও আমায় হাত তুলে ইশারা করে থামিয়ে দেয়। ড্রয়িংরুমের ভেতরটায় ভাল করে তাকাতে যেয়ে দেখি মেঝেতে, মাটির ঘটির মধ্যে সামান্য পানি রেখে তার উপর একটা মোমবাতি বসানো রয়েছে। ঘটির মধ্যে পানির লেভেল এমন ভাবে রয়েছে যেনো মোমবাতির তিন ভাগের দুভাগ পানিতে ঢুবে থাকে, কিন্তু বাকী একভাগ জ্বলন্ত অংশ সহ পানির উপরে থাকে। এবার আদিন আমার সামনে মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দিলো। মোমবাতিটা ঠায় দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই জ্বলতে লাগলো। তারপর ও আমাকে ইশারায় ভেতরে ডাকলো। আমি ভেতরে ঢুকতেই মাটির ঘটিতে রাখা জলে বড় ঢেউ উঠে তা মোমবাতির জ্বলন্ত অংশের উপর দিয়ে বয়ে গেলো। তারপর ঘটিতে একটা ভেজা, নিভে যাওয়া মোমবাতি পড়ে থাকলো। তারপর ও আমায় নিয়ে অন্যকক্ষ গুলিতে ঢুকলো। সবগুলি কক্ষেই ড্রয়িংরুমের মতো মাটির ঘটিতে মোমবাতি জ্বলছিলো। সেগুলিও আমি ঢুকা মাত্র একই ভাবে নিভে গেলো। তারপর আদিন আমায় নিয়ে বেসমেন্টে ঢুকলো। কিন্তু আমরা সেখানে ঢুকে দেখলাম ওখানকার মোমবাতিটা ইতিমধ্যেই নিভে আছে।
তারপর সবশেষে আমরা গেলাম আমার বেডরুমে। সেখানেও বেসমেন্টের দশা। মোমবাতি আগে থেকেই নিভানো! বলা বাহুল্য আমার ভিডিও ক্যামেরা সবই রেকর্ড করছিলো। আমি কিছুই বুঝতে না পেরে দপ করে বিছানায় বসে পড়লাম। হতাশ কন্ঠে বললাম, “এসব কি হচ্ছে আদিন। আমি আর সইতে পারছিনা। আমি কটেজটা বিক্রি করে দেবো ভাবছি।”
আদিন বলল, “ভাবো তো, তুমি কটেজটা যার কাছে বিক্রি করবে তারও তো একই হাল হবে। তুমি নিজে যা সইতে পারছো না তা কেনো অন্যের ঘাড়ে চাপাবে? এটা মোটেও ঠিক হবে না।”
আমি: “কিন্তু আদিন, আমি এর চেয়ে বেশী আর কি ই বা করতে পারি? ”
আদিন: “নিরাশ হয়ো না সাঞ্জে। আমার কাছে এর সব কিছুরই ব্যাখ্যা আছে। তোমার সহায়তা পেলে আমরা এ সমস্যাটা সমাধান করে ফেলতে পারবো।”
আমি: “কি ব্যাখ্যা আছে? আর সমাধানটাই বা কি? ”
আদিন: “শোন তাহলে। প্রতিটা কক্ষে মোমবাতি জ্বলার মানে হলো এসব কক্ষে কোন প্রেতাত্মার প্রভাব নেই। কিন্তু তুমি প্রবেশ করা মাত্র মোমবাতিগুলি নিভে যেয়ে প্রেতাত্মার প্রভাবের কথা জানান দিয়েছে। ও তোমাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। তুমি মারগারেটের পোষকদেহ হিসেবে কাজ করছো।”
আমি: “কিন্তু বেসমেন্ট আর বেডরুমে তো মোমবাতি জ্বলছিলো না। তুমি কিভাবে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিবে? ”
আদিন: তোমার আন্দাজ মতো এই বেডরুমেই যেহেতু মারগারেটকে ফ্যাসিতে ঝুলানো হয়েছিলো তাই এখানে তার স্বভাবসুলভ প্রভাবই বিদ্যমান। তাই মোমবাতিটা নিভে গিয়েছিলো। কিন্তু বেসমেন্টের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ওটা মারগারেট হতে পারে, কিংবা সেখানে নির্যাতিত অন্য কারো আত্মাও হতে পারে, আবার একটা মামুলি দমকা বাতাসের কারসাজিও হতে পারে। ”
আমি: “ঠিক আছে। বুঝলাম। কিন্তু আমি কিভাবে মারগারেটের বাহক হতে মুক্ত হতে পারি? একটা না একটা উপায় তো নিশ্চয় আছে?”
আদিন: “দেখো সাঞ্জে। রেস্টুরেন্টে তুমি যখন আমাকে মারতে গিয়েছিলে তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে তুমি একটা বাহিক মাত্র। আসলে মারগারেট দৃষ্টির অলখ্যে সকল কলকাঠি নাড়ছে। তাই আজ আসার সময় আমি একটা ব্যবস্থা ঠিক করেই এসেছি।”
আমি অধীর আগ্রহে জিজ্ঞাস করলাম, “তাই আদিন! কি ওটা? ”
আদিন: দেখো সাঞ্জে, আমাদের দেহটা অনেকটা কম্পিউটারের হার্ডওয়ারের মতো। উপযোক্ত পদ্ধতিতে যেমন কম্পিউটারের একটা অপারেটংসিস্টেম পাল্টে অন্য অপারেটিংসিস্টেম ইন্সটল দেওয়া যায় তেমনি উপযুক্ত পদ্ধতিতে আমাদের দেহ হতে একটা আত্মা বের করে অরেকটা আত্মা ভরে দেওয়া যায়। এগুলি উচ্চতর কালো জাদুবিদ্যার বিষয়।”
আমি: ” হা। মারগারেটও তাই চায়। আমার দেহটাকে দখল করে নিতে,,,,”
বলতে বলতে আমার গলাটা ধরে এলো। সত্যিই আমার দেহটাকে আমি অত্যন্ত ভালবাসি। এটাই আমার জীবন্তজগতের অস্তিত্ব। এটা অন্য একজন ব্যবহার করবে তা ভাবতেও আমার কষ্ট হচ্ছে।
আদিন আমায় সান্তনা দিয়ে বলল, “ভেবো না সাঞ্জে। তুমি যেমন আছো তেমনই থাকবে। তবে আমার একটা প্লান আছে। এটা কাজ করতেও পারে আবার নাও করতে পারে।”
আমি: “কি সেটা? ”
আদিন: “আংটি পড়া অবস্থায় তোমাকে অক্ষত দেহে মেরে ফেলবো। এতে তোমার আত্মা পরপারে যাওয়ার বদলে এখানেই আটকে পড়বে। অপরদিকে মারগারেটের জন্যে তো।আর দেহে প্রবেশ করা সহজতর হবে। তারপর ও তোমার দেহে প্রবেশ করা মাত্র আমি আংটিটা খুলে নেবো। তারপর ঠিক আগের মতোই অক্ষত রেখে ওকেও মেরে ফেলবো। এতে ওর আত্মাটা পরপারে চলে যেতে বাধ্য হবে। তারপর তোমার দেহতে তোমার আত্মাকে ফেরৎ আনবো! ”
আমি: “এই প্লানটা ভুলে যাও আদিন। তুমি কখনই আমায় মারতে পারবে না। এটা একটা পাগলের প্লান। তোমার আগের প্রচেষ্টার মতোই এটাও পন্ড হবে। মাঝখান থেকে আমার প্রাণটা গচ্চা যাবে।”
আদিন: “এর থেকে ভালো কোন প্লান কি তোমার মাথায় আছে? প্লীজ। তুমি বিশ্বাস করো আমার প্লানটা কাজ করবে। এই যে আমার হাতে চামড়ার বইটা দেখছো এতে মৃতদেহে আত্মা প্রবেশ করানোর মন্ত্র লেখা আছে। ওটা পড়লেই তুমি তোমার দেহে ফেরত আসবে। আর এই যে দেখ পকেটে করে সায়ানাইড ট্যাবলেট নিয়ে এসেছি। একটা খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়। আমি খুব শীঘ্রই তোমায় জাগিয়ে তুলবো।”
আমি: “না না আদিন। আমি তোমার মতো একটা মাথা মোটা পাগল নই। আমি তোমার মত একটা পাগলের কথায় সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করছি না। আমি আমার দেহ, আমার পরিবার, আমার জীবনকে প্রচন্ড ভালবাসি। আমি তোমার মতো একটা ছন্নছাড়া ভবঘুরে নই। ”
আদিন একটা ট্যাবলেট সামনে বাগিয়ে ধরে এক পা আগে বাড়লো। আমি সভয়ে পিছিয়ে গেলাম। বুঝতে পারছি খেতে না চাইলে ও জোর করে ট্যাবলেটটা মুখে পুরে দেবে। ক্যামারাটা তখনো ওর দিকেই ফোকাস করা ছিলো। ও এগিয়ে আসতে আসতে ঘরের মাঝখানে ঠিক ঝাড়বাতিটার নিচে চলে আসলো। ঠিক যেখানে মারগারেটকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। অমনি ভারী ঝাড়বাতিটা সশব্দে ওর মাথায় আছড়ে পড়লো। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, না আ আ আ আ আ
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.