ডাকিণী ৪২তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
মনে হচ্ছিলো যেন আমার হাতের নিজস্ব একটা প্রাণ আছে। ওটা নিজে থেকেই কাজ কছে। কপাল গুনে আদিন যথা সময় হাতটা খপ করে ধরে ফেললো নইলে একদম রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেতো।
ও আমার হাতটা ধরে খুটিয়ে খুটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগলো। তারপর হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে সবিষ্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলো, “সাঞ্জে, হু আর ইউ? ”
আমি ওর আর কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে বললাম, ” আমি অত্যন্ত দুঃখিত আদিন। আমার কটেজ খালি হওয়া মাত্র আমি তোমায় আসতে বলবো। শুধু মেহমানটা কে বিদেয় হতে দাও।”
ওর মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটলো। ও বলল, “এইতো ভালো মেয়ের মতো কথা বলছো।”
আমি: “আচ্ছা আদিন, এবার তবে উঠি। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। তুমি কিছু মনে করো না। কেমন? ”
আদিন আমার দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “এখনই উঠবে? তুমি তো কিছুই খেলে না। এতো তাড়া কিসের শুনি? ”
“দুঃখিত, কাজ আছে।” একথা বলেই আমি ঘুরে হাটতে শুরু করলাম। আদিনের দিকে ফিরেও তাকালাম না। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরুতেই মনে পড়লো মনিকাকে কটেজে একা রেখে এসেছি। যতবারই ওকে একা ফেলে এসেছি ততবারই ও একটা না একটা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে দ্রুত পা চালালাম। কটেজে ঢুকে প্রধান ফটকের সামনে থমকে দাঁড়ালাম। সামনেই সেই অভিশপ্ত কুয়ো। একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। তারপর এক দৌড়ে কুয়োটাকে পাশ কাটিয়ে যেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই হেটে গেলাম কটেজের সদর দরজা পর্যন্ত। দরজায় বেল টিপতেই মনিকা উদভ্রান্তের মতো দরজা খুলে বেরিয়ে এসেই আমায় জড়িয়ে ধরলো। ওর উষ্ম আলিঙ্গনে অনুভব করলাম ওর দেহটা কাঁপছে! “কি ব্যাপার মনিকা? কোন সমস্যা হয়েছে।”
ও তোতলাতে তোতলাতে বললো, “তোমার বেসমেন্ট থেকে কে যেন আমায় নাম ধরে ডাকছিলো। এখন আমার খুব ভয় করছে।”
বেসমেন্ট থেকে! বেসমেন্ট তো আলেসের আস্তানা! তবে কি আলেস এখনো যায় নি? তবে কি ও মারগারেটের সাথে জোট বেধেঁছে! আলেস যদি থেকেই থাকে তবে ও হয়তো আমায় সাহায্য করতে পারবে। কেন জানি মনে হলো আলেসই আমায় মারগারেটের হাত থেকে মুক্তির এক মাত্র উপায়। ঠিক করলাম আজ রাতে বেসমেন্টে ঘুমাবো। জীবনের শেষ দুঃস্বপ্নটা দেখার আশায়।
এসব ভাবতে ভাবতে ভয়ার্ত মনিকার পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিয়ে বললাম, “অসব কিছু না ডার্লিং। একা থাকতে যেয়ে তোমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আমি এসে গেছি তো। এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
মনিকা আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ফ্রীজ থেকে দু টুকরা পিজা খেয়ে বেডরুমে ফিরে আসলাম। প্রায় সারাটা দিন আমি বাথরুমে যাই নি। কিন্তু এবার যে যেতেই হবে। এটা আমার কটেজ, মারগারেটকে এখানে থাকতে হলে আমার ভয়ে তটস্থ হয়েই থাকতে হবে। আমি কেন ওকে উল্টো ভয় পাবো? এসব বলে মনকে প্রবোধ দিলাম।
বাথরুমে ঢুকতেই দেখলাম আয়নাটা জোড়া লেগে আছে। আমি এক নজর দেখেই ওটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। তবে বাথরুমে আর কোন উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো না। বাথরুম থেকে বেরুতেই নিজের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো। বালিশ আর বিছানার চাদর নিয়ে চললাম বেসমেন্টের দিকে। আজ রাতটা ওখানেই ঘুমাবো।
বেসমেন্টের দরজা খুলতেই একটা মৃদু কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। কে যেনো বিলাপ করে কাঁদছে। কিন্তু আমি যেই সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম কান্নাটা থেমে গেলো। বেসমেন্টে আলেসের বন্দিশালায় ঢুকে আবারো বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম। মনে মনে শুধু আলেসকে ডাকছি। তারপর গলা চড়িয়ে পোলিশ ভাষায় বললাম “দেখো আলেস। আমি তোমার জন্যে অনেক কষ্ট করেছি। প্রতিদান হিসেবে তুমি আমায় মারগারেটকে তাড়াতে সাহায্য কর। প্লীজ। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ”
অন্ধকারে শুয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু বিষ্ময়কর হলে সত্য, আমি সেরাতে আমি কোন স্বপ্নই দেখি নি। সকালে অনেক দেরীতে ঘুম থেকে উঠলাম। প্রায় দশটা বাজে। এতো লম্বা ঘুম ঘুমিয়ে আমি নিজেই বিষ্মিত! মনিকা হয়তো ইতিমধ্যেই ঘুম থেকে উঠে আমায় খুজতে শুরু করে দিয়েছে। তাড়াহুড়া করে উঠে বেরিয়ে এলাম বেসমেন্ট ছেড়ে। মনিকার অলক্ষেই আমার বেডরুমে ফিরে গেলাম। তারপর বাথরুমে যেয়ে হাত মুখ ধোয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিন্তু ভুলেও আয়নার দিকে তাকালাম না। বাথরুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে গিয়ে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে লাগলাম। তখনই মনিকা আমার পেছনে এসে দাড়ালো। “কি ব্যাপার সাঞ্জে ডার্লিং। আজ এতো দেরীতে ঘুম থেকে উঠলে যে।”
আমি: “আর বলো না ডার্লিং, উইকএন্ডে স্বভাব বিগড়ে যায়। আলস্য পেয়ে বসে। কিছুতেই ঘুমটা ভাঙতে চায় না। ”
কথা বলতে বলতেই খেয়াল হলো ও অসম্ভব সুন্দর করে সেজেছে। একটা উত্তেজক লাল রঙের খোলামেলা জামার সাথে ম্যাচিং লিপস্টিক, নেইলপলিশ আরো কত কি।
আমি: “ওয়াও। মনিকা। তোমায় আজ অসাধারণ লাগছে ডার্লিং।”
মনিকা: “অবশেষে তোমার চোখে পড়লাম তাহলে। হিহিহিহিহি। থ্যাংকস হানি।
আমি: “মোস্ট ওয়েলকাম। কোথাও বেরাতে যাচ্ছ না কি?”
মনিকা: “বারে! আজ রোববার না? আজ যীশুর কাছে প্রার্থনা করতে গীর্জায় যেতে হবে যে।”
প্রার্থনা করতে গেলে এতো সাজ গোজ লাগে! দেখে তো মনে হয় প্রার্থনা করতে নয়, বরং যীশুর সাথে ডেটিং করতে যাচ্ছে। কি আজব ধার্মিকতা!
আমাদের দেশেও এমন অনেক আজব ধার্মিক মেয়ে আছে। শরীরে রঙ বেরঙের ডিজাইন ওয়ালা টাইট বোরকা, মুখে কয়েক কেজি ময়দার মাখামাখি, ঠোটে রক্ত লাল লিপস্টিক। পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে গায়ে কড়া পারফিউম আর পায়ে ঝুনঝুন নুপুর। এদের ধার্মিকতা স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্যে না কি পুরুষের সন্তুষ্টির জন্যে তা আজো আমার কাছে এক অভেদ্য রহস্য।
খানিক ভেবে আমি বললাম, “ঠিক আছে মনিকা। তবে তুমি নাস্তাটা সেরে যাও। ”
মনিকা: “দুঃখিত ডার্লিং। আমি তোমায় ঘুমে রেখেই নাস্তা সেরে নিয়েছি। তোমার আরামের ঘুমটা হারাম করতে চাই নি। ”
আমি: “ওহ আচ্ছা। ভালো করেছো। চল তোমায় এগিয়ে দিয়ে আসি। ”
মনিকা: “এগিয়ে দিয়ে আসতে হবে কেনো? আমি কি কচি খুকি? ”
আমি: “না না। তা বলি নি। গাড়িটা নেই তো। তাই তোমাকে প্রধান ফটকটা পার করে একটা ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে আসবো। এখানকার ট্যাক্সিওয়ালারা তো আর ইংলিশ জানে না। পরে দেখা যাবে তুমি গির্জার কথা বলেছো আর ওরা তোমাকে নাইটক্লাবে নিয়ে গেছে।”
মনিকা: “হিহিহিহিহি। চলো তবে। ”
আসলে আমি চাইছিলাম মনিকাকে কুয়োটা পার করে দিয়ে আসতে। সেদিনের মতো যদি কোন সমস্যা হয় তবে ওকে যেনো আমি সাহায্য করতে পারি। মনিকাও রাজি হয়ে গেছে। ভালই হলো।
নাস্তা সেরে কোন সমস্যা ছাড়াই ওকে কটেজের বাহিরে নিয়ে গিয়ে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে আসলাম। কিন্তু কটেজের ভেতরে ফের একা একা ঢুকতে সাহস হলো না। মারগারেট তো এটাই চেয়েছিলো। কটেজে আমায় একা পেয়ে অক্ষত রেখে খুন করবে। মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো। ভয়ে আমার জমে যাওয়ার দশা। হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো! আরে! কটেজটা তো এখন ফাঁকাই আছে। এই সুযোগে আদিনকে নিয়ে আসলে কেমন হয়! হয়তো ও ভুত তাড়াতে আবারো ব্যার্থ হবে, কিন্তু ওর উপস্থিতিতে আমার ভয়টা কিছুটা হলেও কমবে।
খানিকক্ষণ ইতস্তত করে শেষমেশ আদিনকে ফোন দিলাম,,,,,,
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.