ডাকিণী ৪০তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
লাইব্রেরীর হাসিটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলো। আমি কি মারগারেটকে কোন জোকস বলেছি না কি? এখানে এতো হাসার কি হলো? আমি ঝুকে বসে বইটা পড়ছিলাম। হঠাৎ বইটার পাতায় এক ফোটা তাজা রক্ত আবিষ্কার করলাম! ব্যাপার কি! বইয়ে রক্ত এলো কোত্থেকে! অনুভব করলাম নাকের পাশ দিয়ে যেনো একটা পিঁপড়া হেটে যাচ্ছে। নাকে হাত দিতেই কেমন ভেজা ভেজা লাগলো। হাতটা সরিয়ে চোখের সামনে ধরতেই হাতে রক্তের ছোপ লেগে থাকতে দেখলাম। আরে! আমার নাক দিয়ে রক্তের ধারা বইতে শুরু করেছে! হঠাৎ খুব অসুস্থবোধ হলো! মনে হলো চারপাশেসবকিছুই যেনো দুলছে! তারপরেই গলা থেকে একদলা রক্ত, বমি হয়ে বেরিয়ে আসলো। বুঝতে পারছিলাম লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। ভেবেছিলাম ডেস্ক থেকে উঠে হেটে বেরিয়ে যাবো। কিন্তু নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতেই মাথা ঘোরে মেঝেতে পড়ে গেলাম! বুঝলাম একই পদ্ধতিতে ও খানিক আগে মনিকাকেও কাবু করেছিলো। এখন আমার পালা। হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে এগুতে লাগলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে কেউ যেনো আমার শরীরের উপর কয়েক মন ওজনের পাথর চাঁপা দিয়েছে! আমার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কিছুতেই লাইব্রেরীর দরজার ধারে কাছেও যেতে পারছি না। হামাগুড়ি দিয়ে দু এক ফুট এগুতেই জ্ঞান হারালাম।
জ্ঞান ফিরলে নিজেকে ড্রয়িংরুমে কাউচের উপর শুয়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। কি আশ্চর্য! আমায় এখানে কে আনলো! আমি তো লাইব্রেরীতে পড়ে ছিলাম। খুব সম্ভবত মনিকা। ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে পড়া আংটিটার দিকে নজর গেলো। এর জন্যেই যতো সমস্যা। ইচ্ছা করলো ওটা খুলে ফেলে দেই। কিন্তু এই আংটি খুলে ফেললেই কি আমি মারগারেটের হাত থেকে মুক্তি পাবো? কই? মনিকা তো আংটি পড়েনি! তাই বলে মারগারেট কি ওকে ছেড়ে দিয়েছে? এই আংটি খুলে ফেললে বরং ওর সুবিধাই হবে। আংটি পরা থাকায় ও আমায় এমন ভাবে মারতে চাইছে যেনো কোন আভ্যন্তরীণ ক্ষত না থাকে। আংটি খুললে ম্যারগারেটের জন্যে আভ্যন্তরীণ ক্ষত থাকা বা না থাকা সমান হয়ে যাবে। ও যখন দেখবে যে কোন ভাবেই আমার দেহে প্রবেশ করতে পারছে না তখন ও খুব সম্ভব আমায় মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিবে। আর তখন যে কোন এক ভাবে আমায় মেরে ফেললেই হলো। এসব ভাবতে ভাবতে আমি উঠে বসলাম।
কাউচে উঠে বসতেই মনিকা দু কাপ কফি হাতে রুমে ঢুকে বলল, “এই নাও। কফিটা খেয়ে নাও। ”
আমি ব্যাস্ত কণ্ঠে বললাম, “মনিকা, আমি সত্যিই দুঃখিত। সকালে আমার ওভাবে কথা বলা উচিৎ হয় নি,,,,”
ও আমায় থাামিয়ে দিয়ে বলল, “ওসব কিছু না ডার্লিং। আগে কফিটা খেয়ে নাও। তারপর সব কথা শুনবো।”
আমি: “ধন্যবাদ ডার্লিং। ”
কফি খাওয়ার পর ও আমার সামনে চেয়ার টেনে বসে বলল, “হা। এবার সব কিছু খুলে বলো। ”
আমি তখনো ওকে সব কিছু খুলে বলতে তৈরি ছিলাম না। ও খুব সম্ভব এই সোমবারেই চলে যাবে। আজ ওকে এসব বলে বিব্রত না করলেই ভালো। আমি ব্যাপারটা চেপে যেয়ে বললাম, “দেখ মনিকা। সকালে আমার মা ফোন দিয়েছিলো। আমাকে পরিবার থেকে বিয়ে করার জন্যে প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে তখন আমার মেজাজটা বিগড়ে যায় ও আমি চিৎকার করে উঠি। তারপর তুমি ভুল সময়ে নক করে বস! আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে তোমার দিকে খেঁকিয়ে উঠি। সকালের এহেন ঘটনার জন্যে আমি সত্যিই দুঃখিত! ”
মনিকা: “ওহ আচ্ছা। কিন্তু তুমি লাইব্রেরীর ব্যাপারটা কিভাবে ব্যাখ্যা করবে? ”
আমি: আসলে লাইব্রেরীতে যে কি হচ্ছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি এ ব্যাপারে কিছু জানা মাত্রই তোমাকে জানাবো।”
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না? না কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো? ”
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললাম, “তোমার কাছ থেকে লুকানোর কি আছে ডার্লিং। তুমি তো ইতিমধ্যেই আমার সব কিছুই দেখে ফেলেছো।”
ও হেসে বলল, “দেখলে কি হবে? এখনো তো অধরাই রয়ে গেলো।”
ওর কথায় আমরা দুজনই হেসে উঠলাম। তখনই বেডরুম থেকে আমার ফোনটা বেজে উঠলো।
আদিন ফোন করেছে। ধরবো কি ধরবো না খানিক ইতস্তত করে অবশেষে ফোনটা রিসিভ করলাম।
আমি: “হ্যালো আদিন! কেমন আছো? ”
আদিন: “যেমন থাকার কথা। কিন্তু তুমি কেমন? ”
আমি: “ভালো না। সমস্যাগুলি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে ।”
আদিন: “আজ তো উইকএন্ড। ডিনারে চলে আসো ম্যাকডোনাল্ডে। ”
আমি: “বাসায় মেহমান ছিলো যে! ওকে সাথে নিয়ে আসবো? ”
আদিন: “ওকে কি সমস্যার ব্যাপারে সব খুলে বলেছো? ”
আমি: “না। ও দুদিনের জন্যে এসেছে। কি দরকার ওকে এসবে জড়ানোর। ”
আদিন: “তাহলে ওকে সাথে আনার দরকার নেই। তুমি একাই চলে আসো। আমি অপেক্ষা করছি।”
ও আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলো। আমি ভেবেছিলাম মনিকার সাথে ডিনার করে সকালের মনোমালিন্যের ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলবো। কিন্তু আদিন বাধঁ সাধলো! মনিকা দুদিন পরেই চলে যাবে। আজ যদি ওর সাথে ডিনার না করি তো ব্যাপারটা খুবই অসৌজন্যমূলক দেখায়। কিন্তু পাগলা আদিনটা যে কি? কিচ্ছু বুঝতে চাইলো না। সৌজন্যতার খাতিরেই মনিকাকে আবারো মিথ্য বলতে হবে দেখছি।
আমি: “এই মনিকা। একটু আগে আমার একটা ফোন এসেছিলো। আমার এক ক্লোজ ফ্রেন্ড আক্সিডেন্ট করেছে। আমার ওকে দেখতে যেতে হবে। আমি সত্যিই দুঃখিত।”
মনিকা: “ওহ গড! ওকে আমার পক্ষ থেকে সমবেদনা জানাতে ভুলবে না কিন্তু।”
আমি: “হা জানাবো। তবে আমার ফিরতে দেরী হবে। সম্ভবত তোমাকে আজ একাই ডিনার করতে হবে। আমি এর জন্যে ক্ষমা প্রার্থী। ফ্রিজে সব কিছু আছে। যা পছন্দ হয় খেয়ে নিও। আরেকটা কথা, আমি ফিরে আসার আগে পর্যন্ত দয়া করে ঐ লাইব্রেরীর ধারে কাছেও যেও না।”
মনিকা: “এসব নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি ভালই থাকবো।”
আমি: “নিজের প্রতি খেয়াল রেখো।”
মনিকার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বেডরুমে এসে কাপড় বদলে বেরিয়ে পড়লাম। হেটেই যেতে হবে। গাড়িটাকে খুব মিস করছি। আমি আমার গাড়ির দুর্ঘটনা নিয়ে জুয়া খেলতে চাই নি। তাই আমার গাড়ির কোন বীমাপত্র করাই নি। এই গাড়িটা আমার গচ্চা গেলো।
এসব ভাবতে ভাবতে কুয়োর পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। গাড়িটা খুয়ানোর জন্যে মারগারেটের উপর প্রচন্ড রাগ হলো। রাগে আচ্ছন্ন হয়ে অবচেতন মনে ফের ভাবতে শুরু করলাম, কুয়োয় আরেকটি বার নামা উচিৎ। একটা শক্ত দেখে দড়ি নিয়ে গাড়ির বনেটে বেধে রেখে আসবো। তারপর একটা ক্রেন এনে ওটাকে টেনে তুলবো। মারগারেট। তোমাকে দেখিয়ে দেবো আমার গাড়িটাকে আমি কতটা ভালবাসি।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কুয়োর কাছে চলে গেছি খেয়াল ছিলো না। যখন হুঁশ হলো তখন নিজেকে সেই মৃত্যুগুহার মুখের সামনে ঝুকে দাড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম। আবারো মারগারেট আমার ক্রোধ কে ব্যবহার করে আমাকে তার শিকার ক্ষেত্রের খুব কাছে টেনে এনেছে। উপলব্ধি করলাম আমাকে দ্রুত এখান থেকে সরে আসতে হবে। কিন্তু কুয়ো থেকে পেছনে ফিরতেই পা পিছলে কুয়োর দিকে হেলে পড়লাম! কুয়োর নিচ থেকে আবারো সেই শয়তানী হাসিটা শোনা গেলো।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.