ডাকিণী (৪র্থ পর্ব)

(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)

এরপরের পৃষ্ঠায় লেখা আছে,

“আজ হঠাৎ এক প্রহরী এসে চিৎকার করে আমাকে গালিগালাজ করতে লাগল। দুদিন আগে আমি যে রক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছিলাম সে নাকি সিমিলিয়ার যুদ্ধে মারা গেছে। স্বভাবতই এর ধরে নিয়েছে আমিই ওকে খুন করেছি। এই নিয়ে তিন তিনটা খুনের দায় আমার গলায় ঝুলছে। হায় ঈশ্বর, এই নির্বোধরাও কি তোমার সৃষ্টি? যুদ্ধে তো মানুষ যায় মারতে আর না হয় মরতে। না হয় ঐ রক্ষীটা মারা গেছে। কিন্তু তুমি তো জানো আমি ওকে খুন করিনি। আমি কাউকেই খুন করিনি। এরা শুধু শুধু আমাকে এখানে ধরে এনেছে। হায় ঈশ্বর। তুমি এর সুষ্ট বিচার কর। তুমি এই পাপীকে ক্ষমা কর। রক্ষীরা বলাবলি করতে লাগলো যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ততই নাকি মঙ্গল। এসব শুনে মার্টিনী খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। ও আমায় জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল। এ মুহূর্তে ওকে আমার কাছে ঈশ্বরের দূত মনে হল। এই অপবাদ, ঘৃনা, লাঞ্চনা, নিগ্রহের মাঝেও কেবল আমাকে ভালবাসতেই যেন ঈশ্বর স্বর্গ থেকে এক অপ্সরী মর্ত্যে পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ ঈশ্বর। এই পাপীকে দয়া করার জন্যে।”
তার পরের পৃষ্ঠা,
“আজ সন্ধায় ওরা আমাকে শুদ্ধিকরণের জন্যে প্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। সেলের দরজা খুলে ওরা যখন আমায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন মার্টিনীর সে কি কান্না। আমি তখনো জানতাম না শুদ্ধিকরণ জিনিসটা কি। যাওয়ার সময় আমি যতক্ষণ সম্ভব ওকে পেছন ফিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। ও উন্মাদের মতো মাটিতে পড়ে নিজের চুল ছিঁড়ছে আর বিলাপ করছে। একটা সময় সেলের দেয়ালের আড়ালে ও ঢাকা পড়ে গেল। আমি সর্বশক্তিতে চেঁচিয়ে উঠে বললাম, “মার্টিনী, আমি তোমায় ভালবাসি।” রক্ষীরা আমাকে নিয়ে একসময় প্রিস্টের কক্ষে পৌছে গেল। গীর্জার উঁচু তলায় সুরম্য কক্ষে, বিলাসবহুল আসনে অধিষ্ঠিত শ্মশ্রুমন্ডিত প্রিস্টকে দেখে আমি অবনত হয়ে সম্মান জানালাম। অতপর উনার পায়ে ধরে বললাম, “ধর্মাবতার, আপনি আমাকে চেনেন। আমি শৈশবে আপনার গীর্জায় দুবছর বিদ্যার্থী ছিলাম। আমার জীবনে এমন কোন রবিবার নেই যেদিন আমি সাপ্তাহিক প্রার্থনায় ফাঁকি দিয়েছি। আমি স্রষ্টার একজন একনিষ্ঠ সেবিকা হিসাবেই জীবনে বেঁচে থাকতে চাই। মা মেরীর কসম আমি ডাকিণী নই।”
প্রিস্ট আমার মাথায় লাথি মেরে বললেন আমি নাকি একজন ছদ্মবেশী ডাকিণী। ধার্মিকতার ছদ্মবেশ নিয়ে আমি নাকি ৩ জন কে খুন করেছি। তাই আমার অবধারিত শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। কিন্তু দন্ডের আগে অবশ্যই আমার দেহটাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে যেন মৃত্যুর পর আমার পাপাত্মা আমার দেহে আর ফেরত আসতে না পারে। প্রিস্টের ইঙ্গিতে দুজন রক্ষী এসে আমার দুহাত শক্ত করে চেপে ধরল। আর প্রিস্ট ছুরি দিয়ে আমার পরিধেয় কাপড় কেটে ফেলে আমাকে উলঙ্গ করে দিল। আমি লজ্জায় অপমানে সর্বশক্তি দিয়ে চেঁচালাম। আমার বিশ্বাস ছিল হয়তো মা মেরী আমার চিৎকার শুনে সাহায্য করতে আসবেন। কিন্তু এর পরিবর্তে প্রিস্টের বিশাল হাতের চড় খেয়ে আমি লুটিয়ে পড়লাম।”
এ পৃষ্ঠাটা পড়তে পড়তে আমার হাত পা অসার হয়ে আসতে শুরু করলো। অনেকটাই অনুমান করতে পারছিলাম এর পর অসহায় আলেসের উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কাঁপাকাঁপা হাতে পৃষ্ঠা উল্টালাম।
” ওরা আমাকে পাশের কক্ষের বিছানায় নিয়ে গিয়ে শেকলের সাথে বেধে দিলো। অতঃপর প্রিস্ট এসে আমার নগ্ন দেহে পানিপড়া ছিটিয়ে দিল।তারপর সে আমার দেহটাকে পুরো রাত জুড়ে চারবার ভোগ করল। আমি সারারাত মা মেরীকে ডেকেছি একটু সাহায্যের জন্যে। কিন্তু উনি আমার ডাক কবুল করেননি। সকালে আমাকে এই বিধ্বস্ত দেহেই সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরা আমাকে গোসলও করতে দেয়নি। আমার দুপায়ের মাঝখানে এতবেশী ব্যাথা করছিল যে আমি হাঁটতে পারছিলাম নাহ। কিন্তু রক্ষীদের নির্দয় চাবুকের আঘাতে টলতে টলতে কোনরকমে আমার সেলে পৌছালাম। সেলে মার্টিনী শুয়ে ছিল। আমাকে ঢুকতে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি খানিকটা ইতস্তত করলাম। আমার সারা দেহে রক্ত আর বীর্যের মাখামাখি। এ দেহে ওকে জড়িয়ে ধরলে তার কাপড় নোংরা হয়ে যাবে। কিন্তু ও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল নাহ। একটা সময় আমি ক্লান্ত দেহটা ওর বাহুডোরে এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে আমি আমার শৈশবে ফিরে গেলাম। দেখলাম গীর্জার প্রাঙ্গণে শিক্ষানবিশ ছোট্ট আলেসকে নিতে আমার বাবা মা এসেছেন। সাথে করে গরম ভূট্টা ভাজা আর রাইয়ের মন্ড নিয়ে এসেছেন। এসব পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে! তারপর বাবা মায়ের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বাড়ির পথ ধরলাম। সন্ধ্যার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দেখলাম মার্টিনী তার কাপড়ের ছোট্ট কোন ছিড়ে একটা রুমাল বানিয়েছে। আর মশক থেকে পানি নিয়ে সে রুমাল ভিজিয়ে আমার দেহের নোংরা রক্ত, বীর্য মুছে দিচ্ছে। ঘৃণায় আমার মুখ বেঁকে গেল। ছিঃ। এটা যদি শুদ্ধিকরণ তবে কালিমালেপন কি? কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গেলে আমি বাইবেলটায় লিখতে বসলাম। গতরাতের ঘটনা নিয়ে ঈশ্বরের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। এভাবে ভোগ হওয়া হয়তো আমার কপালে লিখা ছিলো। কিন্তু আমার একটাই আফসোস। আমি ঐ প্রিস্টের মতো এক সাক্ষাৎ শয়তানকে ধর্মাবতার ডেকেছি। তার পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছি। এর চেয়ে আমি মরে গেলেই ভাল হতো। ”
এই পৃষ্ঠাটা পড়া শেষে আমার সারাটা শরীর থরথর করে কাঁপছিল! নিঃসন্দেহে আলেস অনেক সাহসী আর মানসিক শক্তি সম্পন্ন ছিল। এতটা নির্যাতনের পরেও সে ভেঙ্গে পড়েনি। স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস অটুট রেখেছিল। কিন্তু ধর্মের ধ্বজা ধারিদের ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা আমাকে বিষ্মিত করে। একেই হয়তো বলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। এটাই হল ধর্ম ব্যবসার চরম রূপ। আলেসের মতই সেসব ধর্মব্যবসায়ীদের প্রতি ঘৃণায় নিজের অজান্তেই আমার মুখ কুঁচকে গেল। পরের পৃষ্ঠা উল্টানোর সাথে সাথেই আমার বেডরুমে অ্যালার্ম বেজে ঊঠলো! কি আশ্চর্য! আমি সারাটি রাত লাইব্রেরীতে আলেসের ডায়েরী পড়েই কাটিয়ে দিয়েছি! আলেসকে আমার একাকীত্বের বন্ধু, সুখ দুখের সাথী মনে হল। বিড়বিড় করে বললাম, তোমাকে ভালবাসি আলেস।

যাক। অনেক হয়েছে। এবার উঠে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গোছগাছ করতে শুরু করলাম। আমি আমার কটেজ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি নাহ। আমি এখানেই থাকব। আলেসের সাথে। আপাতত অফিসে যাচ্ছি। আলেসকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে নাহ। কিন্তু অফিসে যে যেতেই হবে। ব্রেকফাস্ট করে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

(চলবে)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা

One thought on “ডাকিণী (৪র্থ পর্ব)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.