ডাকিণী ৩৯তম পর্ব

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আলেসের অশরীরীর যেমন সর্বউচ্চ প্রভাবযুক্ত স্থান ছিলো বেসমেন্টের বন্দিশালা, তেমনি মারগারেটের অশরীরীর উচ্চ প্রভাবযুক্ত স্থান হলো কুয়োর ভেতর আর তার চারপাশে। শুক্রবার সকালে আমি আর মনিকা অফিসে যাওয়ার পথে কুয়োর কাছাকাছি হতেই মারগারেট মনিকার উপর বান মারে। ও হয়তো চাইছিলো মনিকাকে চিরতরে শেষ করে দিতে। কিন্তু আমি মনিকাকে নিয়ে ওর প্রভাবযুক্ত অঞ্চল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসায় ও সেদিন বেঁচে যায়। তবে ওর সামান্য রক্তবমি হয়। এ ঘটনার পর মারগারেট আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ও মনিকার উপস্থিতিতেই আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
শুক্রবার অফিস থেকে ফিরে আবার যখন বিদ্যুতের কার্ড আনতে যাচ্ছিলাম, মার্গারেট তার প্রথম পদক্ষেপ উঠায়। ও গাড়িটাকে কুয়োয় ফেলে আমাকে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছিলো। বুদ্ধিটা ভালই ছিলো। সীটবেল্ট বাধা থাকায় কুয়োর দেয়ালে গাড়ির ধাক্কায় আমার আভ্যন্তরীণ আঘাতের সম্ভাবনা সর্বনিম্ন ছিলো। আর ডুবে মরলে আমার আভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অক্ষতই থাকতো। তারপর সকালে যে যাদুর সাহায্যে ও মনিকাকে বমি করিয়েছিলো সেই একই পদ্ধতিতে আমায় বমি করিয়ে নিলেই দেহটা ওর ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠতো। কিন্তু আমি পড়ন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসলে ওর এত সুন্দর পরিকল্পনাটা ভেস্তে যায়।
তারপর আমি টাবে গোসল করতে ঢুকলে ও আবারো আমাকে খুন করার চেষ্টা করে। ও প্রথমে আয়না ভাঙ্গার শব্দ শুনিয়ে আমার মনযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। তারপর টাবে ফেলে খুন করতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু আমি উপস্থিত বুদ্ধি আর দৈহিক শক্তি বলে ট্যাব ফাটিয়ে সেখান থেকে জান্ত বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই।
কটেজের ভেতর খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে মারগারেট আমায় ওর সর্বউচ্চ প্রভাব যুক্ত অঞ্চল তথা কুয়োয় নিয়ে চুবিয়ে মারতে সচেষ্ট হয়। সেরাতে মনিকার খুঁজে আমি যখন কটেজের বাহিরে এসেছিলাম মারগারেট তখন আমার সামনে মনিকার কুয়োয় ঝাপ দেওয়ার মিথ্যা নাটক উপস্থাপন করে। আমিও বোকার মতো কুয়োর কাছে দৌড়ে যাই মনিকাকে বাচাতে। কিন্তু বলাবাহুল্য ওটা মনিকা ছিলো না। মনিকা তখন বাথরুমে ছিলো। মনিকা জানতোও না যে আমি ওকে খুজছি। সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে পর্ণ দেখতে বসে যায়, যখন আমি ওর চিন্তায় উন্মাদ হয়ে যাচ্ছিলাম। মারগারেট এই সুযোগটা নিতে চাইছিলো। ও আমায় বারবার কুয়োয় ঝাঁপানোর অনুরুধ জানাতে থাকে। কিন্তু ভাষাগত সমস্যার কারণে আমার মনে খটকা লাগে। সুইডিশ মেয়ে মনিকা কখনোই মারগারেটের মতো এতো ভালো পোলিশ বলতে পারতো না। অপরদিকে মারগারেটও মনিকার মতো ইংলিশ বলতে পারতো না। তাই মারগারেট বাধ্য হয়েই তখন আমাকে পোলিশ ভাষায় ডাকছিলো। ওর আশা ছিলো আমি হয়তো ওর ফাঁদে পা দিয়ে বোকার মতো কুয়োয় ঝাপ দিবো। আমি ভাষাগত সমস্যাটা উপেক্ষা করলেও পাগলের মতো কুয়োয় ঝাঁপ দেওয়া থেকে আমি বিরত থাকি। এর পরিবর্তে কটেজে ফিরে আসি দড়ি আর টর্চ আনতে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে মনিকাকে কটেজের ভেতরই পেয়ে যাই। ফলে সেদিন আর কুয়োয় ঢুকা হয় নি।
তারপর সেরাতে আমি ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘুমাতে চলে যাই। আমি ঘুমিয়ে পড়লে মারগারেট আবারো আমার উপর প্রভাব বিস্তার করে। স্বপ্নে আমায় কুয়োয় যেতে ঈঙ্গিত করে। আমিও বোকার মতো ভেবে বসি কুয়োটাই হলো সব রহস্যের মূল চাবিকাঠি। তারপর ঘুম ভাঙলে ও আবারো আমায় খুন করার চেষ্টা করে। তবে এবার গলায় হেডফোনের তার পেঁচিয়ে। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধির জোরে আমি তখন মরতে মরতে বেঁচে যাই। চুলের কাঁটার উপযুক্ত ব্যবহার আমায় সে রাতে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়।
এভাবে সুবিধা করতে না পেরে মারগারেট আমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। আজ সকালে উঠেই আমি বাথরুমে যেতে চাইনি। গতরাতে টাবে চুবানি খাওয়ার পর ওখানে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিলো না। সাতসকালে আম্মুর সাথে বিয়ে নিয়ে কথা বলতে বলতে আমার মাথা বিগড়ে গিয়েছিলো। রাগের চোটে কোন কিছু না ভেবেই আমি বাথরুমে ঢুকে পড়ি। মারগারেট একটা সাংঘাতিক আবিষ্কার করে বসে। ও বুঝে যায় রাগলে আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তাই রাগলে ও সহজেই আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আর আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ওর সামান্য একটা ইশারাতেই আমি অতি সহজে প্রাণ দিয়ে দেবো।
তারপর ও আয়নার প্রতিবিম্বে আমার কপালে ক্ষত চিহ্নটা দেখিয়ে আমাকে আরো রাগিয়ে তুলে। রাগে আমি চিৎকার করে উঠি ও আয়নাটা ভেঙে ফেলি। এ পদ্ধতিতে ও প্রথম প্রচেষ্টায়ই সাফল্য পেয়ে যায়। বাথরুমে ভাঙ্গচুরের শব্দ শুনে মনিকা ব্যাপারটা দেখতে আসে। কিন্তু রাগে অন্ধ আমি, ওর সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করি। খানিক পরে ওকে কাঁদতে দেখে আমার মধ্যে প্রচন্ড অনুশোচনাবোধ জেগে উঠে। কিন্ত এই অনুশোচনা আমায় শান্ত করার বদলে আমার রাগটাকে আরো উষ্কে দেয়। তারপর মারগারেট আমার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাকে ওর কুয়োতে নিয়ে যায়। সেই মৃত্যুগুহাতে। সেখানে ও আবারো আমাকে চুবিয়ে মারার চেষ্টা করে। কিন্তু আবারো আমি উপস্থিত বুদ্ধির জোরে, গাড়ির ট্রাশ বেলুনকে অবলম্বন করে আমি ভেসে উঠি। তারপর অনেক কষ্টে কুয়োর দেয়াল খুঁড়ে খুঁড়ে খাজ বানিয়ে তা বেয়ে বেরিয়ে আসি। অনেকক্ষণ কুয়োর ঠান্ডা পানিতে থাকার ফলে আমার হাইপো থারমিয়া ও কনকাশন হয়। কিন্তু হাইপোথারমিয়া হলে এক্সাইটেটরী নিউরোট্রান্সমিটার যেমন আসেটাইল কোলিন, এপিনেপ্রিন ইত্যাদি কাজ করা কমিয়ে দেয়। ফলে সহজে রাগ উঠে না। রাগ না উঠলে ও আমাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে না। তাই মারগারেট আমার হাইপোথারমিয়াকে যাদুবলে মনিকার দেহে স্থানান্তরিত করে। তাই কটেজে ফিরে মনিকাকে আমি ঠান্ডা দেহে লাইব্রেরীতে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর মাথা খানিকটা ঠান্ডা হলে আমি লাইব্রেরীর রহস্যটা ধরতে পারি ও বইটা পড়তে আগ্রহী হই। কিন্তু মারগারেট আমায় বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। ও লাইব্রেরীর দরজা আটকে দেয়। কিন্তু আমার হাতুড়ির ঘা এর সামনে দরজাটা দাড়াতেই পারে না। এক বাড়িতেই শেষ। কে মেরেছে দেখতে হবে না! সাঞ্জে যে হলো হাতুড়ি মাস্টার থরের আম্মা।
তারপর বইটা পড়ে সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এখন লাইব্রেরীতে বসে বসে দুটো প্রতিজ্ঞা করলাম।
১, সবর্দা রাগ দমন করে রাখবো। কিছুতেই ওই ডাইনীকে আমার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেবো না।
২, সব সময় ছুরিটা সাথে রাখবো। কোন ভাবে যদি মারগারেট আমাকে অনিবার্য মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয় তো এক টানে নিজের গলাটা কেটে দেবো। প্রয়োজন হলে আমি আত্মহত্যা করবো তবুও আমার দেহে অন্য কাউকে ঢুকতে দেবো না।
লাইব্রেরীর চার দেয়ালের ভেতর থেকে আবারো খিলখিল হাসি শুরু হলো। মনে মনে বললাম হাসো মারগারেট, হাসো। তোমার সকল ষড়যন্ত্র আমার কাছে উন্মোচিত হয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই তোমাকে এখান থেকে বিদায় করার একটা না একটা উপায় বের করেই ফেলবো। তোমাকে প্রিস্টের কাছে ফেরৎ পাঠিয়ে শেষ হাসিটা কিন্তু আমিই হাসবো।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.