ডাকিণী ৩৭তম পর্বঃ খ অংশ

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি সম্ভবত জেনে ফেলেছি কিভাবে ওকে কিভাবে হত্যা করা হয়। আমি গতরাতে আমার বেডরুমের ঝাড়বাতিটার সাথে ওকে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলতে দেখেছি। বেসমেন্টে সেরাতে আলেস আমাকে স্বপ্নে পুরো ব্যাপারটা দেখিয়েছিলো। আমার বেডরুমের ঠিক মাঝখানে আজকের ঝাড়বাতিটার স্থলে সেদিন একটা লোহার আংটা টানানো ছিলো। ছাদে ফাঁসিতে ঝুলানোর পর কুয়ো আর লাইব্রেরীতে শুদ্ধিকরণ শেষে আলেসের দেহটা সেই আংটা উল্টো খানিকক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা হয়। কিন্তু মারগারেটের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। আলেসের মতো ম্যারগারেটের বিচার জনসম্মুখে করা হয়নি। খুব সম্ভবত মারগারেট গীর্জার একজন সেবিকা ছিলো। গীর্জার সেবিকাকে যদি জনসম্মুখে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার জন্যে জনসম্মুখে বিচার করা হতো তবে তা গির্জার মান সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতো। তাই বিচারের বদলে প্রিস্ট ওকে চার দেয়ালের ভেতরে সেই আংটার সাথেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। কিন্তু বুদ্ধিমতী মারগারেট ব্যাপারটা অনুমান করতে পেরে তার আগেই কপালে আংটির ছ্যাকা দিয়ে রাখে। ওর বিশ্বাস ছিলো আটকে থাকা আত্মাটাকে হয়তো কোন একদিন অন্য কারো দেহে ঢুকাতে পারবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। ওর প্রিস্ট ওর আংটিটা ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয় নি, সে ওটাকে তার পারলৌকিক যৌনদাসী সংগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার শুরু করে। আর ওর লাশটা কুয়োতে ফেলে দেয়। তাইতো বদ্ধ কুয়োর জলের উপর ওর এত নিয়ন্ত্রণ।
প্রিস্ট প্রথমে অসহায় মেয়েগুলির জীবদ্দশায় কপালে সেই আংটি দিয়ে ছ্যাকা দিতো। তারপর তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মেরে ফেলতো। অবশেষে কতগুলি বশীকরণ মন্ত্র পড়তে পড়তে তাদের মৃতদেহের সাথে মিলিত হতো। এভাবেই সে সারাটি জীবন ধরে অশরীরী যৌনদাসী সংগ্রহ করে গেছে। বার্ধক্যে মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে এসে প্রিস্ট নিজ দেহটাকে মমি করে রাখার জন্যে তার অনুসারীদের অসিয়ত করে যায়। কারণ সেও মারগারেটের মতোই প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে প্রচন্ড আশাবাদী ছিলো। প্রিস্টের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তার কথা মতো তার দেহটাকে পাইনের আঠায় চুবিয়ে মমি বানিয়ে রাখে। কিন্তু ওরা মিশরীয় মমির মতো দেহের আভ্যন্তরিণ নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেয় নি। প্রকৃতপক্ষে এটা কোন সাধারণ মমি ছিলো না। ওটা একটা আস্ত মমি ছিলো। অন্য মমি গুলির মতো এর আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দেওয়া হয়নি। ব্যাপারটা আমার সেদিনই বুঝা উচিৎ ছিলো। আমি যখন ওর খোলা মুখে প্রস্রাব করি তখন তার সবটুকুই ওর খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থালীতে গিয়ে পৌছে। কিন্তু মিশরীয় মমির মতো যদি প্রিস্টের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বের করে নিয়ে গলাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হতো তবে সবটুকু প্রস্রাবই মুখ ভরে গড়িয়ে পড়তো। ওরা আস্ত দেহ মমিকরণের এক অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিলো যা ফারাওদের থেকেও আরো উন্নততর। তারপর প্রিস্ট সেই মমিদেহে ফিরে আসার প্রচেষ্টা চালায়। ও সম্ভবত সফল ও হয়। কিন্তু এতে ওর অনুসারীরা প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। ভয়ার্ত অনুসারীরা তাকে ধরে লোহার কফিনে বন্দি করে, তাতে তালা লাগিয়ে আংটি সহই কবরে দাফন করে দেয়। ফলে অন্য মেয়েগুলির আত্মার মতোই মারগারেটও আংটিটার সাথে কফিনে আটকা পড়ে। বদ্ধ কফিনে প্রিস্ট আবারো দম আটকে মারা যায়। কিন্তু মৃত্যুর সময় আংটি পরা থাকায় ওর আত্মাটা পরপারে যাওয়া থেকে রেহাই পায়। তার বদলে ওটা কফিনে আটকে পড়ে অন্য মেয়ে গুলির আত্মার উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সহস্র বছর পর আমি যখন সেই কফিনটা খুলে ফেলি তখন বাতাসের সংস্পর্শে প্রিস্টের দেহটা পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠে। প্রিস্টের আত্মাটা আংটিটাকে অবলম্বন করে আবার ওর দেহে প্রবেশ করে। দেহ ফিরে পেতেই ওর আদিম ক্ষুদাটা উথলে উঠে। ও আমার দিকে হাত বাড়ায়। ও আমায় ভোগ করতে চেয়েছিলো। তবে জীবন্ত নয়, মৃত। জীবনে অসংখ্য মৃতদেহকে ভোগ করতে করতে মৃতদেহ ভোগ করা ওর কাছে একটা নেশা হয়ে উঠেছিলো। সে জীবন্ত নারীদের চেয়ে মৃত নারীকেই ভোগ করে বেশী তৃপ্ত হতো। কারণ মৃতদেহ লাগামহীন ভোগে বাধা দেয় না। তাই সেরাতে কফিনের ভেতর সে প্রথমেই আমায় ভোগের বদলে মারতে উদ্ধত হয়। মৃতদেহের প্রতি এই বিকৃত আসক্তিটা কিছু মানুষের মধ্যে আগেও ছিলো, এখনো আছে। মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে নেক্রোফিলিয়া বলে। অত্যাধুনিক মেডিক্যালগুলির অন্ধকার মর্গের ভেতর ধোপাদুরস্তর পোশাকধারী সাড়ে তিন হাত লম্বা ডিগ্রীওয়ালা অনেক ডাক্তারকেই পাওয়া যাবে যারা শুধু যৌনবিনোদনের জন্যেই মর্গে রাত কাটায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ২০০৭ সালের প্রতিবেদন অনুসারে প্রতি ১২ জন মর্টিশিয়ান ও ফরেন্সিক ডাক্তারের মধ্যে অন্তত একজন নেক্রোফিলিয়ায় আক্রান্ত। যুগ বদলেছে, নতুন প্রযুক্তির পৃথিবী উদ্ভাসিত হচ্ছে, কিন্তু মানুষের মনের কালিমা এখনো কমেনি। আজো একটু ভালো করে খুঁজলেই আমাদের বর্তমান সমাজে প্রিস্টের মতো আরো অনেক নিকৃষ্ট মানসিকতার লোককেই পাওয়া যাবে। সমাজে এদের সংখ্যাই বেশী। ভালো মানুষের সংখ্যাই বরং এখন হাতে গোনা। এই মুষ্ঠিমেয় ভালোরা নিঃস্বার্থভাবে একাগ্রচিত্তে অসংখ্য খারাপের সাথে লড়ে যাচ্ছে বলেই মানব সমাজ এখনো টিকে আছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম ভালো আর খারাপের এ অসম লড়াইয়ে সাঞ্জে সর্বদাই ভালোদের পক্ষে থাকবে। ভালোর পক্ষে থাকবো, সর্বস্ব দিয়ে হলেও ভালো কাজে সাহায্য করে যাবো। ঠিক যেমন সে রাতে মার্টিনী আমায় সাহায্য করেছিলো। ও ঈঙ্গিতে আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিলো ঠিক কি করতে হবে। তারপর আর যায় কোথা? দিলাম প্রিস্টকে ঘেচাং করে। প্রিস্টের হাত থেকে আংটিটা কেটে পড়তেই মেয়েগুলির আত্মা মুক্ত হয়ে যায়। তারপর মুক্ত আত্মাগুলি একসাথে পরপারে পাড়ি জমায়। কিন্তু একজন থেকে যায়। আংটির মায়ায় ও ছুটতে থাকে আমার পেছন পেছন। মারগারেট। এই বিষ্ময়কর আংটির নির্মাতা।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.