ডাকিণী ৩৭তম পর্বঃ ক অংশ

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
প্রথম অধ্যায় নরবলিদান ও আত্মহনন এ ঈশ্বরের জন্যে আত্ম উৎসর্গ, ও বলিদান প্রথার বিশদ বর্ণনা দেওয়া আছে। অধ্যায়ের এক জায়গায় নিজ শিশু বলিদানকে সবচেয়ে মহিমান্বিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘৃণায় মুখ বাঁকালাম। এই নরবলি প্রায় সব ধর্মেই রয়েছে। মায়া সভ্যতায় সনাতন ধর্মে সূর্যগ্রহণের দিন সূর্যদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নরবলি দেওয়া হতো। প্রাচীন রেড ইন্ডিয়ানরা আমেরিকায় বহিরাগত নাবিকদের বলি দিয়ে তাদের মাংস খেত এই ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্যেই। এখনো আধুনিক ভারতে প্রায় প্রতি বছরই কতিপয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী তাদের কন্যা সন্তানকে ঈশ্বরের নামে বলিদান করেন আরেকটা পুত্র সন্তানের আশায়। খৃষ্ট ধর্মের কথা আর নাই বললাম। খৃষ্ট ধর্মের জন্মই হয়েছে ক্রুশে ঝুলিয়ে বলিদানের মাধ্যমে। তাই এ ধর্মের বলিদানের কথা কখনোই বলে শেষ করা যাবে না। প্রাচীন রোমে বড়দিনে যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে মহিমান্বিত করতে হাজার হাজার হাবশী দাসকে ক্রুশে ঝুলিয়ে বলি দেওয়া হতো।
উপলব্ধি করলাম ঈশ্বরের এই একনিষ্ঠ পূজারীরাই ঈশ্বরকে নরখাদক ও শিশুঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর চেয়ে তো নাস্তিকতাই ভালো। নাস্তিকরা ঈশ্বরকে বিশ্বাসই করে না তাই তাদের দ্বারা ঈশ্বরের অপমানিত হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাদের মতে যার অস্তিত্বই নেই তাকে কিভাবে অপমান করবে? ঈশ্বরের অপমান করে অতি ধার্মিকেরাই, নানাবিধ উৎকট ধর্মীয় আচার ব্যবস্থার মাধ্যমে।
দ্বিতীয় অধ্যায় আত্মাবাদ আত্মাবশীকরণ এ পৃথিবীর প্রাণী, মানুষ গাছপালার আত্মার একটা জামিতিক হিসাব দেওয়া আছে। এখানে বলা হয়েছে যদি জীব জন্তু ও মানুষের মোট জীবন্ত আত্মার পরিমান, গাছপালার মোট জীবন্ত আত্মার পরিমানের চেয়ে বেশী হয়ে যায় তবে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এই উক্তিটি অত্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্য মনে হলো। যদিও আত্মিক দিক থেকে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তবুও লেখিকা সেই অন্ধকার আচ্ছন্ন মধ্যযুগেই গাছপালার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার এ উপলব্ধি নিঃসন্দেহে প্রসংশার দাবিদার। তাছাড়া এই অধ্যায়ে অশুভ আত্মার ক্ষতি থেকে বাঁচতে কতগুলি মন্ত্র দেওয়া হয়েছে। ছোট দেখে একটা মন্ত্র আমি মুখস্থ করে নিলাম। বলা তো যায় না। কাজে লাগলেও লাগতে পারে।
তৃতীয় অধ্যায় মৃত্যুপুরী ও প্রত্যাবর্তন এ মৃত্যুর পর প্রাকৃতিক নিয়মে আত্মার পরপারে যাত্রা প্রতিহত করার ৭ টি পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো আমার মধ্যমায় পরা আংটি টা। এই অধ্যায়টা পড়ে এই আংটিটার রহস্য আমার কাছে সম্পূর্ণরূপে উদঘাটিত হলো।
আমি এতো দিন প্রিস্টকেই আংটির মালিক ভেবে ভুল করে এসেছিলাম। কিন্তু আমার আরো আগে বুঝা ঊচিৎ ছিলো যে ওই মাথামোটা সেক্স পাগল প্রিস্টের পক্ষে এমন চমৎকারি আংটি বানানো অসম্ভব। এই আংটিটা বানিয়েছিলো এই বুদ্ধিমতি মহিলাটাই। এই আংটিটা প্রিস্টের যৌনদাসী সংগ্রহের জন্যে বানানো হয়নি। ম্যারগারেট নিজের আত্মাকে সংরক্ষণ করতেই এই আংটিটা বানিয়েছিলো। প্রিস্ট হয়তো পরে কোনভাবে ওটা দখল করে নেয়।
আংটিটা মধ্যমা থেকে খুলে চোখের সামনে ধরলাম। আংটির মাঝখানের ঐ উজ্জ্বল লাল পাথরটা দিনের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠলো! কি অসাধারণ এই আংটির ক্ষমতা। কিন্তু আমার মধ্যমায় আংটির সাদা দাগ পড়ে গেছে। ব্যাপারটা আমার ভালো লাগলো না। আমার হাতে কেবল আমার বাগদত্তার আংটির দাগ থাকবে, অন্য কারো নয়। মারগারেটের আংটিটা তাই মধ্যমার বদলে কনিষ্ঠায় পড়তে গেলাম। কি আশ্চর্য! ওটা কনিষ্ঠায়ও একদম মাপ মতো আটোসাটো হয়ে বসলো। কিন্তু যে আংটিটা মধ্যমায় আটো সাটো হয়ে বসে সেটার তো কনিষ্ঠায় ঢিলা হওয়ার কথা! কনিষ্ঠা থেকে আংটিটা খুলে এবার বুড়ো আঙুলে পড়লাম। এবারো মাপে মাপে বসলো, একটু টাইট ও না আবার একটু ঢিলাও না। হঠাৎ মনে পড়লো বেসমেন্টের বন্দিশালায় আলেসের দেখানো সেই স্বপ্নের কথা। সেরাতে আমি আলেসের স্থলে ফাঁসিতে ঝুলে মারা গিয়েছিলাম। আমার দেহটাকে কুয়োয় চুবিয়ে লাইব্রেরীতে শুদ্ধ করে প্রিস্টের ভোগের জন্যে এনে দেওয়া হয়েছিলো। আমার অশরীরীর সামনেই ও আমার দেহকে ভোগ করতে শুরু করেছিলো। স্পষ্ট মনে আছে ওর বিশাল দেহের নীচে আমার দেহটা একদম ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো। ও একবার আমার মৃতদেহের হাতটা ওর হাতের মুঠোয় ধরেছিলো। চোখ বন্ধ করে সেই দৃশ্যটা মনে করার চেষ্টা করলাম। হা !! মনে পড়েছে। ওর বিশাল হাতের মুঠোয় আমার হাতটা খাঁচায় ঢুকানো টিয়াপাখির মতোই আটকে যায়! ওর হাতটা আমার হাতের থেকে দুই তিন গুন বড় ছিলো। ওর বিশাল হাতে বসানো সেই বড় পরিধির আংটিটাই যখন আমার হাতে উঠে আসে তখন ওটা তার আকৃতি বদলে ছোট হয়ে যায়! এতে খানিকের জন্যে আমার মনে হয় যে, প্রিস্ট আর আমার হাতের আকৃতি আঙুলের আকৃতি বুঝি সমান। কিন্তু হাত দুটো কখনোই সমান ছিলো না। এই আংটির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটা যার হাতেই যায় তার হাতের আকৃতিই ধারণ করে! অসাধারণ!
বইটা পড়ে জানতে পারলাম এই আংটিটা মৃত্যুর সময় যদি কেউ পড়ে থাকে তবে তার আত্মাটা পরপারে যাত্রা না করে ভুখন্ডে মুক্ত হয়ে ঘুরবে। তবে কপালে উত্তপ্ত আংটির ছ্যাকা দেওয়া থাকলে, মৃত্যুর সময় ঐ আংটিটা হাতে পড়ানো না থাকলেও আত্মা পরপারে পাড়ি দিবে না, যদি না সেই আত্মা পাড়ি দিতে একান্ত উদগ্রীব হয়।এবার মার্গারেটের প্রেতের কপালের সেই পোড়া দাগটার রহস্য খুলে গেলো।
আমি যখন আলেস বা মার্টিনীর আত্মাকে দেখেছিলাম তখন তাদের কপালে আংটির ক্ষত চিহ্নটা ছিলো না। কিন্তু গাড়ির আয়নায় বা স্বপ্নে যতবারই মারগারেট আমায় দেখা দিয়েছে ততবারই ওর আত্মার কপালে আংটির ক্ষত চিহ্নটা সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিলো। এর কারণ হলো অন্য মেয়েগুলিকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রিস্টের নির্দেশে জোর করে কপালে ছ্যাকা দেওয়া হয়। কিন্তু মারগারেট নিজেই নিজের কপালে আংটির ছ্যাকা দেয়। বুদ্ধিমান মহিলাটা হয়তো কোনক্রমে টের পেয়ে গিয়েছিলো যে প্রিস্ট ওর কাছ থেকে আংটিটা ছিনিয়ে নিতে চলেছে। তাই ওর এই অদ্ভুত কান্ড। উত্তপ্ত আংটি দিয়ে নিজের কপাল পুড়িয়ে সে তার আত্মার পরপারে যাত্রার পথ রুদ্ধ করে। সত্যি মহিলাটার সাহসের তারিফ করতে হয়। কিন্ত পরবর্তীতে প্রিস্ট আংটিটা দখল করে নেয় আর ওকে হত্যা করে।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.