ডাকিণী (২৫তম পর্ব)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
কাজ শেষে ওর কফিনের ডালাটা নামিয়ে দিলাম চিরজীবনের জন্যে। আরো সহস্র বৎসর পর হয়তো কেউ একজন একে খুলে আমারই মতো বিষ্ময়ে নির্বাক হয়ে যাবে! তখন ওরা কল্পনাও করতে পারবে না একে মারতে আমার কতটা কষ্ট হয়েছিলো। তবে ইদানীং যে হারে ডেভেলপার কম্পানি গুলি কাজ শুরু করেছে, তাতে সহস্র বৎসর দুরে থাক, আগামী দুমাসের মধ্যেই এখানে হয়তো একটা বিল্ডিং উঠে যেতে পারে।
ধ্যাত। এসব আজেবাজে ভাবনায় সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। সূর্য উঠেগেছে। তড়িঘড়ি করে এখান থেকে বেরুতে হবে। নইলে গার্ডরা ধরে ফেলবে। এই অর্ধনগ্ন অবস্থায় গোরুস্থানে ধরা পড়লে আমার দেয়ার মতো কোন কৈফিয়তই থাকবে না। হায় খোদা! আমি তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একটা গার্ডকে তো আমি কাল রাতেই সাইজ করে দিয়েছি। ও কি এখনো বাধা আছে ঠিক মতো, না কি ছাড়া পেয়ে তার সঙ্গী সাথিদের নিয়ে আসছে। এখন এসব দেখার সময় নেই। প্রিস্টের কবরে মাটি ভরাট করতে হবে। তারপর সবার নজর এড়িয়ে আলগোছে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। দ্রুত কোদাল হাতে কাজে নেমে পড়লাম। কোদালের হাতলে পেঁচানো ব্রা টা কাল রাতে কোপানোর সময়ই ঘর্ষণে ছিড়ে গেছে। নগ্ন হাতলের ঘর্ষণ শুধু দাঁতে দাত চেপে হজম করলাম। তবে কবর খুড়ার চেয়ে কবর ভরাট করা অনেক সহজ। স্তুপ করা আলগা মাটিটা কেবল টেনে গর্তে ফেলে দিলেই হয়। যে কবর খুঁড়তে রাতে দু ঘন্টার ও বেশী সময় লেগেছিলো তা আজ সকালে মাত্র দশ মিনিটে ভরে ফেললাম। সমস্ত জিনিসপত্র একে একে কুড়িয়ে ফের সাইড ব্যাগে ভরলাম। এখানে কাজ শেষ। এবার ফেরা যাক। ফেরার আগে কাল রাতের সুখি গার্ডটা কে একবার দেখতে হবে। দেখা হলে ওর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবো। ও ক্ষমা করুক আর না করুক শুধু আমার নামে মামলা না করিলেই হলো। পোল্যান্ডের আইন খুবই কড়া। এখানে সিকিউরিটির লোকজনের গায়ে হাত তুললে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বউচ্চ ২৫ বছরের জেল হওয়ার বিধান রয়েছে। বাঘ ছুলে আঠারো ঘা, আর পুলিশ ছুলে জেলের রুটি খা। তাই বাঘ বা পুলিশ, এদের কারো গায়েই হাত তোলা ঠিক না।
ওকে যে গাছের নিচে বেধেঁ রেখেছিলাম তার কাছে পৌছতেই আমার আত্মাটা শুকিয়ে গেলো। ওখানে কেউ নেই। শুধু আমার ছেড়া শার্ট আর পেন্টি পড়ে আছে। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। সাথে অন্তত দুই প্রস্থ দড়ি রাখা উচিৎ ছিলো। একমাত্র যে দড়িটা এনেছিলাম সেটা এখনো গীর্জার ছাদে ঝলছে। আর একটা দড়ি থাকলেই হাঁদাটা কে বাধতে এতো বেগ পেতে হতো না। আরো বড় ভুল হয়েছে বাধতে যেয়ে। আমার শার্ট দিয়ে না বেধে ওর প্যান্ট দিয়ে বাধলেই ভালো হতো। আসলে রাতের আধারে ওর প্যান্টের ব্যাল্ট খুলার ঝামেলায় যেতে চাইনি। তাই বলে পুরুষের প্যান্টের ব্যাল্ট খুলতে আমি একটুও অনভিজ্ঞ নই। অভির বেল্ট তো আমি চোখ বন্ধ করে খুলতে পারি। কিন্তু এটা একটা গার্ডের বেল্ট। পোল্যান্ডে সিকিউরিটির লোকেরা যোগাযোগের জন্যে বাংলাদেশী পুলিশদের মতো ইয়া বড়বড় ওয়াকিটকি ব্যবহার করে না। ওদের বেল্টেই ক্ষুদে ট্রান্সমিটার লাগানো থাকে। নিকষ আধারে বেল্ট হাতড়ানোর সময় ভুল করে যদি ঐ ট্রান্সমিটারের বাটনে একটা টিপ পড়ে ওটা সচল হয়ে যেতো তাহলেই খেল খতম ছিলো। যা হবার ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এবার এখান থেকে যাওয়া যাক।
যখনই উঠতে যাচ্ছিলাম তখন এক ঝাঁক গার্ডের হুইসেলের শব্দে আমু আৎকে উঠলাম। এই যাহ। তীরে এসে আজ তরী ডুবলো। গার্ডগুলি দেখছি এদিকেই আসছে। সিমেট্রির প্রধান ফটক থেকে সোজা সেই গাছটা বরাবর। তবে এখনো ওরা আমাকে দেখে ফেলার মতো এতটা কাছে নয়। এক দৌড়ে আমি গাছটার নিচে থেকে আমার ব্রা আর পেন্টিটা কুড়িয়ে আনলাম। আমি কোন সুত্র ফেলে যেতে চাই না। তারপর এক দৌড়ে আরেকটি কবরের নাম ফলকের নিচে গাঁ ঢাকা দিলাম।
গার্ড গুলিও হাবাগোবার মতোপ্রধান ফটক ছেড়ে সবাই এক সাথে এসে সেই গাছটার নীচে ভিড় করলো। ওরা জানতেও পারলো না ওদের গাফেলতির সুযোগ নিয়ে আমি সেই কখন গোরস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছি। সিমেট্রি থেকে বেরিয়েই একটা মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হলাম। আমার গাড়িটা সিমেট্রির পশ্চাৎ গেটে গীর্জা প্রাঙ্গণে পার্ক করেছিলাম। কিন্তু বেরিয়েছি প্রধান ফটক দিয়ে। তারমানে আমাকে এই অর্ধনগ্ন অবস্থায়ই প্রায় দু ব্লক ঘুরে আমার গাড়িটার কাছে পৌছতে হবে! এতো ভোরে রাস্তায় কাউকে দেখছি না। মাঝে মাঝে দু একটা গাড়ি সাঁ করে ছুটে চলে যাচ্ছে। হায় খোদা। আর একটু সাহায্য কর। একবার শুধু গাড়ির নাগালটা পেলেই হলো। ড্রাইভ করে সোজা কটেজে চলে যাবো।
ইতস্তত ভাবে ফুটপাত ধরে পা বাড়ালাম। প্রায় অর্ধেকটা পথ কোন বাধা ছাড়াই পেরিয়ে এসেছিলাম। ঐ তো গির্জার ছাদটা দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছা করছিলো দৌড়ে ছুটে যাই সেখানে। সেদিকে আরো দ্রুত পা চালালাম। কিন্তু কোত্থেকে যে চারটে মটোর সাইকেলে করে কতগুলি টিনএজ ছেলে পেলে এসে উদয় হল। ওরা আমায় ঘিরে বাইকে চড়ে চক্কর দিতে লাগলো। টিনএজ বয়সে যৌনাকাঙ্ক্ষা চরমে পৌছে। আমি নিজেও এই বয়সটা পেরিয়ে এসেছি। রাস্তায় এক অর্ধনগ্ন মেয়েকে দেখে এদের আকৃষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু এই স্বাভাবিক আচরণটাই আজ আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারো সাথেই সময় কাটানোর ইচ্ছা বা ধৈর্য আমার নেই। একটা পরিশ্রান্ত রাতের পর আমায় কটেজে ফিরে একটা ভালো ঘুম দিতে হবে। ওরা আমায় ঘিরে ফুটপাতের চারদিকে চক্রাকারে ঘুরছে আর আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করছে। এদের মধ্যে থেকে যদি একটা বাইকওয়ালা কে মাটিতে ফেলতে পারি তবে এই চক্রে একটা ছিদ্র সৃষ্টি হবে। সেই ছিদ্র গলে বেরিয়েই আমাকে গীর্জার দিকে দৌড়াতে হবে। আশাকরি ওরা খানিকক্ষণ তাদের পড়ে যাওয়া সাথিদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকবে। আশাকরি সেই সময়টুকুর সধ্য ব্যবহার করে আমি গীর্জার ভেতর গাড়ির কাছে পৌছে যাব। একবার গাড়িটা স্টার্ট দিতে পারলেই হলো। এদের সামনে দিয়েই বীরের মতো বেরিয়ে যাওয়া যাবে। যে ই লাগতে আসবে তাকেই পিষে চ্যাপটা বানিয়ে ফেলবো।
একটা নীল বাইককে প্রথমে টার্গেট করলাম। ওতে মাত্র একজন আরোহী। তাই ঘুর্ণয়মান বাইকগুলির মধ্যে একে ফেলাই সবচেয়ে সহজ হবে। পাঁক খেতে খেতে এরা ধীরে ধীরে চক্রের পরিধি কমিয়ে আনছে। নীল বাইকটার উপর আমি সার্বক্ষণিক চোখ রাখছি। ওটা আমার প্রায় নাগালের মধ্যেই। হঠাৎ এক পা সামনে এগিয়ে ওটার হ্যান্ডেল ধরে দিলাম এক হেচকা টান। আরোহী বাইক সহ উল্টে মাটিতে পড়ে গেলো।
আমার কপাল ভালই বলতে হবে। পড়ে যাওয়া বাইকে বেধেঁ আরেকটি বাইক হুমড়ি খেলো। কিন্তু অন্য দুটো বাইক এখনো আমাকে ঘিরে ঘুরেই যাচ্ছে। পড়ে যাওয়া বন্ধুদের প্রতি ওদের কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। কিন্তু ও দুটোর মধ্যে বেশ খানিকটা ফাঁকা যায়গা রয়েছে। ঐ ফাঁকা যায়গাটা লক্ষ করেই আমি ঝাঁপ দিলাম।
রাস্তার উপর ডিগবাজি খেয়ে খানিকটা গড়িয়ে গেলাম। দু কুনুইয়ের বেশ কয়েকটা জায়গায় চামড়া ছিলে গেলো। আমি সব কিছু উপেক্ষা করে উঠে দাড়িয়ে দিলাম এক ভোঁ দৌড়। আমার ধারণা ভুল ছিলো। ছেলে গুলি আহত বন্ধুদের জন্যে সময় নষ্ট করে নি। বরং তাতক্ষণাত আমাকে গালি দিতে দিতে পিছু ধাওয়া করলো। বাইকের শব্দটা ক্রমেই নিকটতর হচ্ছে। আমি ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকালাম না। শুধু রুদ্ধশ্বাসে গীর্জাপাণে দৌড়,,,,,,,
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.