ডাকিণী (১৮তম পর্ব)

লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা
(গল্পটিতে কিছু কিছু ১৮+ কন্টেন্ট আছে। তাই ছোটরা গল্পটি না পড়লেই ভালো।)
আমি ভেবেছিলাম একটা আংটি পড়া হাত আমার পা চেপে ধরেছে। এবার একটু একটু করে কবরের কাছে টেনে নিয়েই ঝপাং করে ভেতরে ঢুকিয়ে নেবে। মাটিতে পড়ে গিয়ে একটা গাছের শেকড়কে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। যেন প্রিস্ট আমায় টেনে নিয়ে যেতে না পারে। তবে অনেক্ষণ ধরে পায়ে টান না পড়ায় শেষে ঘাড় ঘুড়িয়ে আটকে যাওয়া পায়ের দিকে নজর দিলাম। নাহ। ওটা কোন মানুষের হাত নয়। একগুচ্ছ বুনো লতায় পা টা আটকে আছে। পা ছাড়াতে যেয়ে বুঝলাম ওটা কাঁটাওয়ালা লতা। পায়ের চামড়া মাংস সব ছিড়ে নিচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম। এই কবরস্থানটা দিনের বেলায়ই এতটা ভয়ঙ্কর। রাতে না জানি আরো কত কি! সিমেট্রির প্রধান ফটক দিয়ে বেরুবার সময় আবার গার্ড দুটোকে দেখলাম। ঠায় দাড়িয়ে আছে। কাল আমায় এদের চোখকেও ফাঁকি দিতে হবে। কি হবে ওরা যদি আমায় কবর খুড়তে দেখে ফেলে? চোখের সামনে শ্বশুরবাড়ি (কারাগারের) চিত্রটা ভেসে উঠলো।
বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সূর্য ডুবে গেলো। ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে এগারোটা বাজে। পোল্যান্ডে গ্রীষ্মে ২০ ঘন্টা দিন আর মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘন্টা রাত। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে কাজ সারতে হলে আমাকে এই চার ঘন্টার মধ্যেই শেষ করতে হবে। বুঝতে পারছি কাল অনেকটা বাঁচা মরার লড়াই হতে চলেছে। আমাকে এতে জিততেই হবে। আলেস সহ আরো শখানেক মেয়ের মুক্তিটা যে আমার হাতেই ঝুলছে।
বাড়ি ফেরে ডিনার সারলাম। কিছুতেই মাথা থেকে আগামীকালের দুশ্চিন্তা সরাতে পারছিলাম না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। সামনে একটা নির্ঘুম রাত অপেক্ষা করছে। ড্রয়িংরুমের ঘড়ি থেকে রাত বারোটার ঘন্টা বেজে উঠলো, ঢং ঢং। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাতে বেসমেন্টে ঘুমাবো। কটেজের বাকী সব ঘরের তুলনায় ওখানেই আলেসের প্রভাব সবচেয়ে বেশী। শেষ মুহুর্তে ও যদি কোন বার্তা দিতে চায় তবে যেন সহজেই স্বপ্নে দেখিয়ে দিতে পারে। ব্যাপারটা অনেকটাই স্বেচ্ছায় দুঃস্বপ্ন দেখার মতো। তবে আজ রাতের দুঃস্বপ্নটাই হয়তো কাল রাতে আমার প্রাণ বাঁচাতে পারে। একটা ফোন, বালিশ, বেডশীট আর আলেসের ডায়ারীটা সাথে নিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে বেসমেন্টে চলে গেলাম। সেই পরিচিত সেলে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করলাম। বেডশীটটা বিছিয়ে তার উপরে বালিশ রেখে শুয়ে পড়লাম। আমি জানি আজ স্বপ্নে আলেসকে দেখবই। অন্তত কালকের ভয়াবহ অভিযানের সাফল্য কামনা করতে আজ রাতে সে আসবেই। ফোনের আলোটা নিভিয়ে দিলাম। রাজ্যের ক্লান্তি আর নিরেট আধারে মুহুর্তেই ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম।
তার কিছুক্ষণ পরেই নিজেকে ঐ গীর্জার ছাদে আবিষ্কার করলাম। হাতে একটা কালো ব্যাগ ধরা। ওতে কুদাল, শাবল, এক বাণ্ডিল নাইলনের দড়ি, একটা বিশাল হাতুড়ি, একটা হেক্সো ব্লেড আছে। পকেট হাতড়ে একটা পেন্সিল টর্চ, একটা পকেট নাইফ, একটা লাইটার আর গাড়ির চাবি পেলাম। বেশ তো। এবার তাহলে যাওয়া যাক।
ব্যাগ থেকে দড়ি বের করে ক্রুশের সাথে ভাল করে বাধলাম। দড়ির অপর প্রান্ত ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দিলাম নিচে।তারপর রাত বারোটার ঘন্টা বাজতেই ব্যাগটা ছুড়ে ফেললাম সিমেট্রির দেয়ালের ভেতর। ওটা নিচের অন্ধকারে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেলো। তারপর দড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম সিমেট্রির ভেতরে। ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম আমার সামনে একটা নতুন কবর খুড়া। পেন্সিল টর্চের আলো ফেলতেই ওর ভেতরটা নজরে পড়লো। একটা মানুষের মতো আকারের বড় শুঁয়োপোকা ওতে কিলবিল করছে। ওর মাথায় দুই শুঁড়ের মাঝখানে আছে ঐ আংটিটা। আমি মরিয়া হয়ে পকেট থেকে নাইফ টা খুলে বাগিয়ে ধরে সেই কবরে ঝাপ দিলাম। সাথে সাথেই স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলো। হাতড়ে ফোনটা বের করে আলো জ্বালালাম। স্কিনে দেখলাম রাত দুটো বাজে। ঘুম ভাঙ্গার পর কেন জানি মনে হলো আলেস আমার পরিকল্পনাটা পছন্দ করেছে। না হলে ও এমন স্বপ্ন দেখাবে কেন? তবে ও প্রিস্টকে এতটাই ঘৃনা করে যে ওর লাশটার স্থলে একটা শুঁয়োপোকা দেখিয়েছে। আমি খুশি মনে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। সেরাতে আর কোন স্বপ্ন দেখিনি।
পরদিন সকালে উঠে প্রথমেই বেসমেন্ট থেকে স্টোররুমে গেলাম। একটু ঘাটাঘাটি করতেই একটা শাবল, কোদাল হেক্সো ব্লেড পেয়ে গেলাম। আর হাতুড়িটা সম্ভবত গ্যারাজে আছে। বেডরুমের খাটের নীচ থেকে কালো সাইড ল্যাগেজটা বের করে ওতে যা যা প্রয়োজনীয় সবই ভরলাম। তারপর ওটা গ্যারাজে নিয়ে গড়ির বুটে ঢুকিয়ে দিলাম। আজ আর অফিস শেষে বাসায় ফিরবো নাহ। সোজা কাজে লেগে পড়বো। গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে কটেজ থেকে বেরিয়ে আসলাম। তখন একবার রিয়ারভিউ মিররে চোখ গেলো। দেখলাম গাড়ির পেছনে আলেস হাসি মুখে কুয়োটার পাশে দাড়িয়ে আছে। আমি যদি আজ আংটিটা নিয়ে আসতে পারি তবে এটাই আলেসের সাথে আমার শেষ দেখা। এরপর ও হয়তো পরপারে চলে যাবে। কিন্তু কি হবে যদি আমি এই কটেজে আর না ফিরি? এই ভাবনাটাকে আমি দুরে সরিয়ে রাখতে চাই। তাই গাড়িতে ফুল ভলিউমে গান ছেড়ে এক্সেলারেটরে পা দাবিয়ে দিলাম। গাড়িটা ছুটে চলল অফিসের পথে।
(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.